• খেরোর খাতা

  • প্রতিবন্ধকতার অন্তর্ভুক্তিকরণে আইনি লড়াই একমাত্র পথ!

    Dr. Bubai Bag লেখকের গ্রাহক হোন
    অন্যান্য | ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ৪১২ বার পঠিত
  • ৪/৫ (১ জন)
  • জমিয়ে রাখুন পুনঃসম্প্রচার
  • ১৯৯৫ সালের ‘প্রতিবন্ধী মানুষ আইন’ এবং ২০১৬ সালের ‘প্রতিবন্ধী মানুষ অধিকার আইনে’র উদ্দেশ্য ছিল সমস্ত ধরনের প্রতিবন্ধকতাযুক্ত মানুষদের সমান সুযোগ, সম্পূর্ণ অংশগ্রহণ এবং অধিকার নির্ভর সমাজে উত্তরণ ঘটানো।  সেই প্রয়াসের বিঘ্ন ঘটায় প্রতিবন্ধী মানুষদের বারেবারে আদালতের দ্বারস্থ হতে হয়েছে। সম্প্রতি ‘আর্য রাজ বনাম চণ্ডীগড় প্রশাসন ও অন্যান্য’ (সিভিল অ্যাপিল নম্বর ২৭১৮ অফ্‌ ২০২০) মামলা তার বহিঃপ্রকাশ।

    শিক্ষা তথা উচ্চশিক্ষায় আঙিনায় শারীরিক প্রতিবন্ধকতার সম্পূর্ণ অংশগ্রহণে মামলাটি নিঃসন্দেহে যুগান্তকারী। ২০১৯ সালে ‘গর্ভমেন্ট কলেজ অফ্‌ আর্ট’-এর প্রকাশিত এক বিজ্ঞাপনকে কেন্দ্র করে মামলার সূচনা। সেখানে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের যোগ্যতার ক্ষেত্রে নূন্যতম চল্লিশ শতাংশ নম্বরের কথা বলা হয়। অন্যদিকে তফশিলি জাতি উপজাতির শিক্ষার্থীদের জন্য ছিল নূন্যতম পঁয়ত্রিশ শতাংশ। সংরক্ষিত কাঠামোর মধ্যে এহেন বৈষম্যের প্রেক্ষিতে বিচারপতিগণের পর্যবেক্ষণ ছিল সমস্ত অনগ্রসর সম্প্রদায়ের মধ্যে সমান সুযোগ আবশ্যক। এপ্রসঙ্গে ২০১২ সালের দিল্লী হাইকোর্টে অনুরূপ মামলার (রীট পিটিশান (সি) নম্বর ৪৮৫৩ অফ্‌ ২০১২) উল্লেখ করে বলা হয় তফশিলি জাতি উপজাতির মত প্রতিবন্ধী মানুষেরাও দীর্ঘদিন সামাজিক অনগ্রসর সম্প্রদায় হিসেবে বিবেচিত। ফলে ২০১৬ সালের আইনে’র ৩৪ নং ধারাকে মান্যতা দিয়ে শিক্ষাক্ষেত্রে নুন্যতম পাঁচ শতাংশ এবং কর্মসংস্থানের নূন্যতম চার শতাংশ আসন সংরক্ষণকে কার্যকরী করতে বলা হয়।     

    প্রতিবন্ধকতাযুক্ত মানুষদের অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে মামলাটির গুরুত্ব অপরিসীম। শারীরিক প্রতিবন্ধকতার সঙ্গে সঙ্গে মানসিক বা বৌদ্ধিক প্রতিবন্ধকতার জন্য উপযুক্ত পরিবেশ ও পরিকাঠামো নির্মাণ স্থান পেয়েছে। বলাবাহুল্য সর্বভারতীয় স্তরে এখনও খুব কম সংখ্যক প্রতিষ্ঠানে বৌদ্ধিক বা মানসিক প্রতিবন্ধীদের ডিপ্লোমা বা ডিগ্রী প্রদান করা হয়। শারীরিক ভাবে বিশেষত দৃষ্টিহীন বা চলনজনিত মানুষেরা উচ্চশিক্ষার সুযোগ লাভ করলেও বৌদ্ধিক বা মানসিক প্রতিবন্ধকতার ক্ষেত্রে সুযোগের অভাব রয়েছে। এমনকি বৌদ্ধিক প্রতিবন্ধকতার জন্য স্থাপিত বিশেষ প্রতিষ্ঠানগুলিতেও ডিগ্রী বা ডিপ্লোমা প্রদানের ক্ষমরা নেই। ফলে সংবিধান কর্তৃক সমান সুযোগ বা সমানাধিকারের চেতনা স্বীকৃত হলেও বাস্তবে প্রতিবন্ধকতার কারণে তারা বঞ্চিত থেকে গিয়েছে।

    সুপ্রীম কোর্টের এহেন পর্যবেক্ষণের প্রেক্ষিতে স্বাধীনতা পরবর্তী প্রশাসনিক ঐতিহ্যের উল্লেখ করা যেতে পারে। নেহরু’র কল্যাণকর রাষ্ট্র ভাবনায় তফশিলি জাতি উপজাতির সঙ্গেই প্রতিবন্ধকতা সম্পর্কিত ভাবনাচিন্তা অগ্রসরিত হয়। সেই চেতনায় এখনও তফশিলি জাতি উপজাতির সঙ্গে প্রতিবন্ধকতার উন্নতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় সমাজ কল্যাণ বা অধুনা সামাজিক ন্যায়বিচার ও ক্ষমতায়ন দপ্তরের অধীনে রয়েছে। সমাজের দূর্বলতর গোষ্ঠী তফশিলি জাতি উপজাতির মত প্রতিবন্ধকতাজনিত বৈষম্যের অবসানের লক্ষ্যে শিক্ষা বা কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে সংরক্ষণ প্রচলিত হয়েছিল। তাসত্বেও উচ্চশিক্ষায় যোগ্যতা অর্জণে নূন্যতম নম্বরের বিভাজন এবং কর্মসংস্থানে আবেদনে অতিরিক্ত ফি কাঠামোর অস্তিত্ব আশ্চর্যের।

    মোটামুটিভাবে সর্বজনবিদিত ভারতের মত উন্নয়নশীল রাষ্ট্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির অন্যতম প্রধান কারণ অর্থনৈতিক পশ্চাদপদতা। দরিদ্র প্রতিবন্ধীদের পক্ষে সম্পদের ব্যবহার এখনও সোনার পাথর বাটি। বর্তমান অতিমারি পর্বে তাদের অবস্থা অধিকতর শোচনীয় হয়েছে। সাম্প্রতিক অনলাইন শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে মানিয়ে নিতে না পেরে ভারতের ৪৩% শিশু শিক্ষাঙ্গণ ত্যাগ করেছে। বাস্তবিক প্রেক্ষাপটেও বিদ্যালয়, গ্রন্থাগার থেকে শুরু করে জনপরিসরের অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান এখনও সুগম্য নয়। ফলে স্বাভাবিক বিকাশ ব্যাহত হয়। তাই তথাকথিত শারীরিক সক্ষমদের সঙ্গে সর্বক্ষেত্রে পারদর্শী হয়ে উঠতে পারে না। সেই কারণে প্রতিবন্ধকতার জন্য সমান সুযোগ আবশ্যক। ফলে যোগ্যতা অর্জণে নূন্যতম নাম্বারের বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। যদিও জাতিগত প্রান্তিকতার সঙ্গে প্রতিবন্ধকতাজনিত প্রান্তিকতার তুলনা অবান্তর। উভয়কার বৈষম্যের অভিজ্ঞতা সমজাতীয় নয়।

    দীর্ঘকালীন রাজনৈতিক দর-কষাকষিতে তফশিলি জাতি উপজাতিগণ অধিকার রক্ষায় অধিক সচেষ্ট হলেও প্রতিবন্ধকতার ক্ষেত্রে তা দেখা যায় না। সত্যি বলতে তারা এখনও ভোট রাজনীতির অঙ্গ হয়ে উঠতে না পারায় রাজনৈতিক দর-কষাকষিতে অপারক। ঐতিহ্যগতভাবে প্রতিবন্ধকতার সঙ্গে সেবার চেতনা যুক্ত থাকায় দয়া করুণার উপাদান অধিক সক্রিয়। তাছাড়া সংবিধানের ১৪ থেকে ১৮নং ধারায় ‘জাতি-ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গ’ নির্বিশেষে সাম্যের কথা বলা হলেও সেখানে প্রতিবন্ধকতাজনিত বৈষম্যের কোন উল্লেখ ছিল না। তবে সংবিধানের ৪১ নং ধারায় বয়স্ক, দুর্বল, অসুস্থ মানুষদের সঙ্গে প্রতিবন্ধী মানুষদের রাষ্ট্রের সাধ্যমত ক্ষমতানুযায়ী উন্নয়নের চেষ্টা করবে। ‘সাধ্যমত ক্ষমতা’ শব্দদ্বয়ের কারণে আজও চলনজনিত প্রতিবন্ধকতার উপযুক্ত পরিবহণ (বিশেষত বাস, ট্রাম) এবং সুলভ শৌচালয়ের উপস্থিতি দেখা যায় না। দেখা যায় না দৃষ্টিহীন বান্ধব গ্রন্থাগারের উপস্থিতি এবং বধির উপযোগী সাংকেতিক ভাষায় কোন সচেতনতার প্রসার। ফলে স্বাভাবিক অধিকার থেকে তারা অনেকাংশে দূরে সরে গিয়েছে।  

    সেই প্রেক্ষিতে রায় ভীষণ সময়োপযোগী। ২০১১ সালের আদমশুমারী অনুসারে সমগ্র জনসংখ্যার ২.৬৮ শতাংশ বা প্রায় তিন কোটির অধিক প্রতিবন্ধকতাযুক্ত মানুষ রয়েছে। এক বেসরকারী সমীক্ষায় উঠে এসেছে ভারতে শারীরিক প্রতিবন্ধকতার মাত্র শূন্য দশমিক সাত পাঁচ শতাংশ সংগঠিত (সরকারী ও বেসরকারী) কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত। কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে এহেন হতাশাজনক চিত্রের পশ্চাতে শিক্ষা তথা উচ্চশিক্ষার বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিকাঠামোগত বাধা, কর্মকর্তাদের নেতিবাচক মনোভাব সর্বোপরি যোগ্যতার ক্ষেত্রে নূন্যতম নম্বর অন্তরায় হয়েছে। তাই অধিকাংশ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তফশিলি জাতি উপজাতির সংরক্ষিত আসন পূর্ণ হলেও প্রতিবন্ধকতার সংরক্ষিত আসন খালি থেকে যায়। যা নিয়ে রাষ্ট্রীয় স্তরে প্রকৃত নজরদারির অভাব ছিল। সেই জন্য রায়ের বাস্তবায়ন আবশ্যক। কারণ শিক্ষার প্রসার হতে পারে প্রতিবন্ধকতার অন্তর্ভুক্তির অন্যতম পথ।।       

  • বিভাগ : অন্যান্য | ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ৪১২ বার পঠিত
  • ৪/৫ (১ জন)
আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • Tapas Das | ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২০ ২৩:০৯97575
  • বাঃ

আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। দ্বিধা না করে মতামত দিন