• হরিদাস পাল  পর্যালোচনা (রিভিউ)  সিনেমা

  • তাসের ঘর : দুর্দান্ত স্বস্তিকায় নারীমুক্তি?

    বিপ্লব রহমান লেখকের গ্রাহক হোন
    পর্যালোচনা (রিভিউ) | সিনেমা | ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ৩৭১ বার পঠিত
  • ৫/৫ ( ১ জন)
  • জমিয়ে রাখুন পুনঃসম্প্রচার

  • “হইচই” মুভি স্ট্রিমে সদ্য মুক্তিপ্রাপ্ত “তাসের ঘর” বাংলা ছবিটি নিঃসন্দেহে আট-দশটা বাজারী ছবির ভীড়ে ব্যতিক্রম, একই সঙ্গে ষোল আনা বাঙালিয়ানা, আবার হলিউডি ধাঁচেরও, এর বিভাগ করা যেতে পারে, নাটকীয়, রহস্য, রোমাঞ্চ ইত্যাদি।


    যারা ছবিটি দেখেছেন, তারা জানেন, যারা দেখেননি, তাদের জন্য বলছি, এই সিনেমা “পথের পাঁচালী” না হলেও বাংলা ছবির ইতিহাসে নির্ঘাৎ একটি মারাত্মক দাগ কেটে যেতে বাধ্য।  


    স্বস্তিকা মুখার্জি দুর্দান্ত একক অভিনয়ে পুরো ছবি টেনে নিয়ে যান, বলেন একজন একা, নির্যাতীতা গৃহবধুর কথা। কৌশিক সেনের “টিকটিকি”তে মাত্র দুজন অভিনেতা ছিলেন, দৃশ্যমান এবং ছায়া দৃশ্যমান চরিত্র ছিল পাঁচটি। সেখানে পুরো ছবির শ্যুটিং হয়েছে ড্রইং-ডাইনিং-এ।


    “তাসের ঘরেও” প্রায় তাই। স্বস্তিকা মুখার্জি “দুপুর ঠাকুর পো”র সেক্সি ইমেজ ভেঙে এই ছবিতে আটপৌরে শহুরে গৃহবধু “সুজাতা” নামক মেয়েটির দিনের পর দিন গৃহ নির্যাতনের কথা বলে। সরাসরি ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে, দর্শককে উদ্দেশ্য করে দেওয়া বিবৃতি যেন গল্পের ছলে অভিনয়ে মুর্ত করা। উপস্থিত চরিত্র সুজাতা, তার স্বামীর আভাস এবং শয্যাশায়ী খনখনে ডাইনি শাশুড়ি- এই তিনটি মাত্র। অনুপস্থিত চরিত্র—সুজাতার স্বামীর গার্ল ফ্রেন্ড, তার স্বামী এবং পাশের বাড়ির বাচাল মেয়েটি।


    এটি আসলে সাদাকালো বাংলায় গৃহবধু নির্যাতন ও তার “অক্ষম প্রতিবাদের” কাহিনী। কেন “অক্ষম প্রতিবাদ”? একটু পরেই তা জানতে পারবেন।


    খুব সংক্ষেপে এই হলো ছবির কাহিনী। “তাসের ঘর” ছবিতে স্বস্তিকা মুখার্জি, মানে সুজাতা নামের গৃহবধুটি রিপোর্টাজ ধাঁচে ক্যামেরা, মানে দর্শককে উদ্দেশ্য করে সহজভঙ্গিতে বলা গল্পের সুচনাটুকু অনেকটা এরকম :


    “গাছ আমার বড় প্রিয় জানেন? কারণ ওরা কথা বলতে পারে না। কথা কি, আওয়াজই করে না। আমি ভাবি মাঝে মাঝে, ওদের কী ইচ্ছে করে না, একে অপরের সঙ্গে কথা বলতে? একে অপরকে বুঝতে? সারাক্ষণ চুপটি করে নিজেদের মধ্যে কি করে কে জানে! আমিও একাই থাকি বাড়িতে বেশিরভাগ সময়। একা মানে, একদম একা।…”


    “সরি না, একদম একা নয়। ওই পাশের বাড়ির মেয়েটা আসে মাঝে মাঝে গপ্পো করতে। কতো কথা ওর, বাবা! যারা এতো কথা বলে তাদের আমার মোটে পছন্দ হয় না। মাঝে মাঝে মনে হয়, (দাঁতে দাঁত ঘষে) ওকে একেবারে চুপ করিয়ে দেই। কতোবার কতোভাবে বোঝানোর চেষ্টা করেছি, ওর সাথে আমার কথা বলতে ভাল লাগছে না, গপ্পো করতে ইচ্ছে করছে না, মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছি, কথার উত্তর দিইনি, মুখ ভেঙেওছি, বোঝেই না।…”


    “আমি বাবা আমার রান্নাবান্না নিয়ে থাকি। রান্নাবান্না বলতে মনে পড়লো। একদিন একটু সাজুগুজু করতে ইচ্ছে করেছিল বলে নেলপলিশ পরেছিলাম। তারপর আমাদের মেয়েদের যা হয়, একটা হাত হলুদ হয়ে গেল।”


    “আরো একটা কথা, রান্নাঘরে যা ইঁদুর হয়েছে না, ভাবতে পারবেন না। সংসার পেতে বসেছে ওরা।”


    “রান্নার প্রতি আমার একটা অন্যরকম টান আছে। সেই ছোট্টবেলা থেকে। রান্নাবান্না ছাড়া না, আমার একটা জিনিষ খুব টানে—গন্ধ। সবকিছুর মধ্যে গন্ধ পাই আমি। বাড়িতে যখন একা একা থাকি, এ ঘর ও ঘর করি, গান গাই, (গুনগুন করে, কোথাও আমার হারিয়ে যাওয়ার নেই মানা, মনে মনে) তখন আমি সবকিছুর মধ্যে একাকীত্বের গন্ধ পাই।”…


    “আমার হাজবেন্ডের অবশ্য এসব ভাল লাগে না। ওর যে কি ভাল লাগে, কে জানে? আমাকে যে ভাল লাগে না, এইটুকু জানি। আমার সাথে কথা বলে না। সে একদিক থেকে ভালই হয়েছে বরং, বেশী কথা বললে আমি আবার বিরক্ত হই। তারচেয়ে এটাই ভাল না? যে যার নিজের মতো থাকি। একই বাড়িতে, এক ছাদের তলায়, কাছে, তা-ও কতো দূরে। আমিও কথা বাড়াই না। ও ওর মতোন থাকে, আমি আমার মতোন।”…


    “(টবের গাছের পাতা শুঁকে নিয়ে) আমার গাছেরা যেমন থাকে, একা একা, কেউ কারো সাথে কথা বলে না, কেউ কারো ব্যাপারে মাথা ঘামায় না। তাই না, বলুন?”


    মুভি ট্রেইলার দেখুন :



    তবে এ ছবির পরিনতি মারাত্মক। মুভি ট্রেইলারের শেষ বাক্যও শেষ করা হয়েছে ২০২০ সালকে উল্লেখ করে, “এই বছরটা তো বিষে বিষ!”




    লক্ষ্মনীয়, এই ছবি মুক্তির সাথে বাঙালি পুরুষ জাতির শৌর্যবীর্য দিকে দিকে প্রকাশিত হচ্ছে। স্বস্তিকার অভিনয় শিল্প ও  কাহিনীর চরিত্রের সাথে মানানসই লকডাউনে ঈষৎ আটপৌরে পোষাক ইত্যাদিতে স্যোশাল মিডিয়ায় রীতিমতো ভার্চুয়াল যৌন হেনস্তার বান ডেকেছে। কেন স্বস্তিকা পোস্টারে অন্তর্বাস ও আঁচল সরে যাওয়া স্তনাভাস দেখালেন, কেন ফেসবুক “হইচই” পেজের বিজ্ঞাপনে তিনি স্মার্ট হেয়ার স্টাইলে নারী মুক্তির কথা বললেন, এ নিয়ে কি বিভৎস ধর্ষমর্ষকামী অগনিত একের পর এক কুৎসিত মন্তব্য।


    মনে হয়, এরই প্রতিবাদে ৩ সেপ্টেম্বর মুক্তিপ্রাপ্ত এই ছবি আরো বেশী বেশী করে সারা বিশ্বে প্রচার হওয়া উচিৎ। জাগো নারী, বহ্নিশিখা!


     সবশেষ, “তাসের ঘর” নিয়ে বিবিধ বেটাগিরির জবাব দিলেন স্বস্তিকা নিজেই :


  • বিভাগ : পর্যালোচনা (রিভিউ) | ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ৩৭১ বার পঠিত
  • ৫/৫ ( ১ জন)
  • জমিয়ে রাখুন পুনঃসম্প্রচার
আরও পড়ুন
কাঠাম - Rumela Saha
আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • Prativa Sarker | ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২০ ১৭:২৯96978
  • ছবিটি দেখবার উৎসাহ পেলাম।  

  • Prativa Sarker | ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২০ ১৭:৩১96979
  • তবে পরিণতিটা না বললেই ভাল হতো বোধহয়।    

  • বিপ্লব রহমান | ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২০ ২০:৩৭96984
  • প্রতিভা দি,

    অনেক ধন্যবাদ, তুমিই প্রথম পাঠক, এ এক পরম পাওয়া।

    আর ঠিকই বলেছ, সবটুকু বলে দিলে ছবি দেখার মজা থাকে না। তাই সম্পাদনা করে পরিনতিটুকু বাদ দিয়েছি।

    #

    অফটপিকে, চণ্ডালের এটিই প্রথম চলচ্চিত্র পর্যালোচনা, নইলে মাইনাস সিক্স বাই ফোকালে কতোটুকুই বা আর দৃশ্যমান!

  • একলহমা | ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২০ ০৯:৫০97250
  • ভালো লিখেছেন বস। লেখার সাথে পুরোপুরি একমত। স্বস্তিকা দুরন্ত অভিনয় করেছেন। এবং চলচ্চিত্রটি তার সব কটি বিভাগেই খুব ভালো হয়েছে। 

  • বিপ্লব রহমান | ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২০ ১০:২৬97251
  • একলহমা,

     

    সত্যিই ছবিটি উল্লেখযোগ্য, আর চণ্ডালের লেখাটি ভাল লেগেছে জেনেও খুশী হলাম। কিন্তু তাই বলে একেবারে “বস!” কাম সারছে  J)

আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত