• বুলবুলভাজা  আলোচনা  বিবিধ

  • গোধূলি গগনে নব পত্রালিকা

    শিবাংশু দে লেখকের গ্রাহক হোন
    আলোচনা | বিবিধ | ০৯ মে ২০২০ | ৯৯১ বার পঠিত | জমিয়ে রাখুন পুনঃসম্প্রচার
  • এক
    'তুমি কি, নাথ, দাঁড়িয়ে আছ আমার যাবার পথে'
    ~~~~~~

    একেকটা বয়সে একেক রকম। আর সব কিছুর মতনই। আমার রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনতে শেখা। মায়ের কাছে শেখা গান শোনার প্রথম পাঠ। পরের পর্বটির শুরু বছর দশেক পরে। গত শতকে সাতের দশকের প্রথম থেকে আমাদের শহরে টানা তিনদিনের রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্মেলন শুরু হয়। শীতকালে। উদ্যোগ নিয়েছিলেন বেঙ্গল ক্লাব। তখন জামশেদপুরে 'বিলাসবহুল ' প্রেক্ষাগৃহের পত্তন হয়নি। টিন ছাদের গুদামের মতো একটি হল। যেখানে কুড়ি শতকের দ্বিতীয় দশক থেকে দেশের সঙ্গীত, নাটক, সাহিত্যসংস্কৃতি জগতের শ্রেষ্ঠ নক্ষত্রেরা পায়ের ধুলো দিয়ে গেছেন। টিনের চেয়ারগুলি জামশেদপুরের পৌষে সন্ধে থেকে গভীর রাত পর্যন্ত টানা হিমে শীতল থেকে শীতলতর। কিন্তু যতো দেবতাপ্রতিম শিল্পীরা সেখানে মগ্ন উষ্ণতায় ধরে রাখতেন ভূতগ্রস্ত শ্রোতাদের নিবিষ্ট কলোসিয়ম।

    বাহাত্তর-তিয়াত্তর সালের কথা। আমরা সদ্য কলেজে গিয়েছি। বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। কলকাতায় মানুদা আর দিল্লিতে ইন্দিরা দেশে পুলিশ-রাজ জারি করার মানচিত্রটি তৈরি করছেন। সেই সময়েই জামশেদপুরের বেঙ্গল ক্লাব এই শহরে রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্মেলনের শ্রীগণেশ করেন। তার আগে নিয়মিতভাবে শহরের বিভিন্ন প্রেক্ষাগৃহে রবীন্দ্রসঙ্গীতের অনুষ্ঠান আয়োজিত হতো। তখন জামশেদপুর 'বাঙালি'দের শহর ছিলো। শহরের প্রতিপ্রান্তে বড়ো বড়ো বাঙালি পরিচালিত সংস্থাগুলি সক্রিয় ছিলো। বাঙালি উৎসব-অনুষ্ঠানগুলির উদযাপন অন্য ভাষাভাষী লোকজনের ঈর্ষা উদ্রেক করতো। এখন যেমন সরকার বাঙালিদের মধ্যে 'দেশদ্রোহী' খুঁজে বেড়ান। সেকালেও বাঙালিদের মধ্যে 'নকশাল' খুঁজে বেড়াতে বিহার সরকার খুব ব্যস্ত থাকতেন। সব কিছু সত্ত্বেও জামশেদপুরের বাঙালিরা নিজের আনন্দে বাঁচতো। এখনও বাঁচে। জাতটাই গোলমেলে।

    বাহাত্তর-তিয়াত্তরে তখন প্রথম কলেজ আমাদের । সপ্তাহশেষের তিনদিন জুড়ে গানের কার্নিভ্যাল। রবীন্দ্রসঙ্গীতের। আমাদের মাথার ভিতর ফুটে ওঠা কর্টেক্সের নতুন বাগান। কাকে বলে রবীন্দ্রসঙ্গীত? শৈশব থেকে গড়ে ওঠা ধারণা আর জানাশোনার ব্রিগেড মিটিং তিনদিন ধরে প্রতিমার মতো মূর্ত হয়ে উঠতো বেঙ্গল ক্লাবের নিরাভরণ মঞ্চটিতে। শাদা উইংস, শাদা স্কাই, নেভি নীল পিছনের পর্দা আর মেরুন ড্রপ। শাদা কাপড়ঢাকা তক্তপোশ, দুধারে বড়োজোর দুটি মাটির কলসে কয়েক ছড়া রজনীগন্ধার স্টিক। সবাই মঞ্চেই বসতেন। শান্তিদেব, সুচিত্রা, কণিকা, রাজেশ্বরী, নীলিমা, মায়া, সঙ্ঘমিত্রা, পূর্বা, অশোকতরু, সুবিনয়, চিন্ময়, অর্ঘ, সাগর, আরও কতোজন। হ্যাঁ, দেবতাদের রাজা হেমন্তও। শুধু জর্জদা ধারে একটি চেয়ারে, সামনে একটি টুলের উপর হারমোনিয়ম।
    মনটা হয়তো তৈরিই ছিলো বাবা-মা'র দৌলতে। কিন্তু 'কান'টা তৈরি হতে শুরু করে এইসব নক্ষত্রদের অনুকম্পায়। পরে ঠিকানা বদলে যায়। টেগোর সোসাইটির খোলা প্রাঙ্গনে মঞ্চ বেঁধে সম্মেলন হতো। সেখানেই আশি সালে জানুয়ারির এক রাতে শেষ শোনা জর্জদাকে মুখোমুখি। মনে পড়ছে ঠিক তাঁর আগে গেয়েছিলেন সুশীল মল্লিক। 'আজ আঁখি জুড়াইল হেরিয়ে'। সাতাত্তরে চলে যাই বাইরে। কিন্তু ঐ তিনদিন আসতেই হবে। পুরোনো বন্ধুদের এক সঙ্গে বসে জমিয়ে রবীন্দ্রসঙ্গীত। মলমলভেজানো ওডিকলনের মতো স্মৃতিগন্ধ এজন্মের সঞ্চয়। পরে টেগোর সোসাইটির সুরম্য প্রেক্ষাগৃহ গড়ে ওঠা। জুবিলি পার্ক থেকে শীতসন্ধ্যার অবিরাম তুহিন হাওয়ার ঝাপটা থেকে নিস্তার পাওয়া সঙ্গীতমুখর সন্ধ্যাগুলি।

    টাটাবাবার শহরে বঙ্গভাষীদের ক্যালেন্ডারে রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্মেলন একটি বার্ষিক কার্নিভ্যাল। এ শহরে সূক্ষ্মরুচি, পরিশীলিত বাঙালির অভাব এখনও নেই। হয়তো কমে গেছে আগের থেকে। যাঁরা আমাদের কাছে 'জামশেদপুর' ছিলেন, আগের প্রজন্মের সেই সব উজ্জ্বল মানুষগুলি প্রায় সবাই চলে গেছেন না-ফেরার দেশে। নতুন প্রজন্মের জীবনের প্রাথমিকতা হয়তো অনেকটাই আলাদা। কিন্তু আমাদের এবং আমাদের পরের প্রজন্মের বহু মানুষ অনেকটা অভ্যাসবশেই অপেক্ষা করে এই শীতকালীন গান-মেলার। দীর্ঘদিন না থাকার আড়ষ্টতায় গ্রামের সঙ্গে আমার গিঁটগুলিও অনেক ঢিলে হয়ে গেছে। কিন্তু কিছু মায়া তো থেকেই যায়। থাকুক, যতোদিন থাকে।

    পঁচানব্বইয়ে চলে যাই অনেকটা দূরে। আট-ন' বছরের ফাঁক। ক্ষণিকের অতিথির মতো ফিরে এসে নতুন পর্যায়ে আবার দুহাজার তিন থেকে ছয় পর্যন্ত কানগুলি ঝালিয়ে নেওয়া।'পুরোনো' শিল্পীরা তখন অনেকেই চলে গেছেন। নতুন প্রজন্মের শিল্পীরা তাঁদের স্থানে এসেছেন। প্রমিতা মল্লিক, রমা মণ্ডল, স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায়, অভিরূপ গুহঠাকুরতা, মোহন সিং প্রথম শুনি এই পর্বে। আবার দুহাজার সাতে স্থায়ীভাবে জামশেদপুর ছেড়ে যাওয়া। গত চোদ্দো বছর জামশেদ্পুরে রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্মেলনে যাওয়া হয়ে ওঠেনি। এখন তো আমার কোনও 'নিজের বাড়ি'ই নেই ও গ্রামে। বোন বললো এবার চলে এসো। একসঙ্গে বসে আবার গান শোনা যাবে। রামের বনবাস কেটে যাওয়ার আমেজের মতো আবার ইচ্ছে হলো গান শুনতে যাই। অনেক নতুন শিল্পীরা গাইবেন । তাঁদের গান সামনে বসে এখনও শুনিনি। ওটা প্রয়োজন।

    এবারের অনুষ্ঠানের প্রতি একটা অন্য টান ছিলো। গত দু দশক ধরে যেসব শিল্পীরা রবীন্দ্রসঙ্গীতকে শ্রোতাদের কাছে নিয়ে যাচ্ছেন, তাঁদের কয়েকজনের সামনে বসে গান শোনাবার কথা। এই গান নিয়ে কিছু কাজ করছি। সেজন্য একালের কিছু শিল্পীর গান সামনে বসে শোনা প্রয়োজন। রেকর্ড শুনে ঠিক সুবিচার করা যায়না। আসরে না শুনলে শিল্পীর সঙ্গে 'সুরের বাঁধন'টি গড়ে ওঠেনা। কয়েকজন নবীন প্রজন্মের শিল্পীর গায়ন শোনার সুযোগ পেতে চেয়েছিলুম। সরাসরি না শুনে সিদ্ধান্ত নেওয়া অনুচিত বোধ করি। এবারের লিস্টিতে ছিলেন, ইমন চক্রবর্তী, শ্রেয়া গুহঠাকুরতা, রোহিণী রায়চৌধুরী, কমলিনী মুখোপাধ্যায়, জয়তী চক্রবর্তী, অদিতি মহসিন এবং মনোজ মুরলি নায়ার, সাহেব চট্টোপাধ্যায়, মনোময় ভট্টাচার্য, শ্রীকান্ত আচার্য। ইমন চক্রবর্তী অবশ্য শেষ মুহূর্তে অসুস্থ হয়ে পড়ায় আসতে পারেননি।
    এবারের লিস্টিতে থাকা শিল্পীদের মধ্যে অদিতি মহসিনকে নিয়ে আমার মুগ্ধতা রয়েছে। তাঁর গান শুনছি গত দেড় দশক ধরে। তাঁর গায়ন আমাকে তৃপ্ত করে। কেন করে, তার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। মনে পড়ছে, পাঁচ-ছ বছর আগে শান্তিনিকেতনে মোহনদার (মোহন সিং খাঙ্গুরা) সঙ্গে আড্ডার সময় তাঁর কাছে জানতে চেয়েছিলুম, নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের মধ্যে কার গান তিনি আলাদা করে পছন্দ করেন এবং কেন? কয়েকটি নাম এলো বটে। কিন্তু অদিতির প্রতি তাঁর পক্ষপাতটি স্পষ্ট দেখেছিলুম। তিনি উল্লেখ করার আগেই আমি অদিতির নাম নিয়েছিলুম। তিনিও একমত হয়েছিলেন। অদিতির মাত্রাজ্ঞান আমাকে মুগ্ধ করে। আমার কাছে রবীন্দ্রসঙ্গীত মানে মাত্রা ও লয়জ্ঞান। 'মাত্রা' মানে তালের মাত্রা নয়। এখানে মাত্রা বলতে সংযমবোধের কথা বলা হচ্ছে। রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পীর গায়নকৌশল, প্রস্তুতি, পরিবেশন শৈলী, গ্যালারি থেকে ভেসে আসা করতালির শব্দ, সবই ব্যর্থ হয়ে যায়, যদি তাঁর 'সংযমবোধ'টি না থাকে। সব শিল্পের জন্যই এটা সত্য। কিন্তু রবীন্দ্রসঙ্গীতের জন্য যেন তা চরম সত্য। একই গান দশজন গাইলে এই মানদণ্ড থেকেই আমি তাঁদের ঔৎকর্ষ বিচার করি। মনোজ মুরলি নায়ারের গানও দীর্ঘদিন ধরে শুনছি। তাঁর সম্বন্ধেও আলাদা করে কিছু বলার নেই।
    আগের প্রজন্মের শিল্পীদের মধ্যে কণিকা, ঋতু এবং রাজেশ্বরীকে দেখেছি তাঁরা নিজেরা কখনও হারমোনিয়ম বাজিয়ে গাইতেন না । ঐ কাজের জন্য থাকতেন গোরা সর্বাধিকারী এবং রনো গুহঠাকুরতা । তাঁদের অবশ্য মূল শিল্পীরই এক্সটেশন বলা যেতে পারে। আলাদা কিছু নয়। রাজেশ্বরীকে অবশ্য কখনই হারমোনিয়ম-সহ গাইতে শুনিনি। পুরুষ শিল্পীরা সর্বদা নিজেরাই হারমোনিয়ম বাজাতেন। বিশেষ অন্যথা ছিলোনা। ব্যতিক্রম শুধু শান্তিদেব। এবার দেখলুম জয়তী এবং শ্রীকান্ত ছাড়া কেউই হারমোনিয়মে হাত দিলেন না। প্রথম যুগে কবি শ্রুতি ইত্যাদি প্রসঙ্গে এই যন্ত্রটি বর্জন করার পক্ষে যেসব যুক্তি দিতেন পরবর্তীকালে তা ধোপে টেকেনি। তার পিছনে প্রবল প্রতাপান্বিত পঙ্কজকুমারের প্রভাব তো ছিলো নিশ্চয়, কিন্তু কিছু অনিবার্যতাও ছিলো। নয়তো শান্তিনিকেতন বা শৈলজারঞ্জনের সঙ্গে ওতপ্রোত সুচিত্রা, সুবিনয় বা অশোকতরু কেন এই যন্ত্রটির উপর পূর্ণত নির্ভরশীল ছিলেন। রবীন্দ্রসঙ্গীত শ্রবণ ও পরিবেশনের অভিজ্ঞতা থেকে মনে হয় যন্ত্রটি জরুরি। নয়তো কীবোর্ডের অনুষঙ্গের উপর খুব বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়তে হয়। রবীন্দ্রসঙ্গীতে প্রিলিউড বা ইন্টারলিউডের সঙ্গে স্বচ্ছন্দ বাদ্যশিল্পী খুব বেশি নেই। ঐ মাত্রা ও লয়জ্ঞানের বিষয়টি এসে যায়।
    সম্মেলনের প্রথম শিল্পী ছিলেন শ্রেয়া গুহঠাকুরতা। রবীন্দ্রসঙ্গীত গায়নে তাঁর 'বংশগৌরব' বিদিত। তাঁর গান মুখোমুখি শুনিনি কখনও। এই মুহূর্তে রবীন্দ্রসঙ্গীতের প্রতিষ্ঠিত শিল্পীদের মধ্যে বহু প্রাক্তন 'দক্ষিণী'র ছাত্র-ছাত্রীদের পুরোভাগে দেখা যায়। তাঁদের অনেকের স্বরক্ষেপণের মধ্যে এক ধরনের পুরোনো মুদ্রাদোষ এখনও রয়ে গেছে। দু প্রজন্ম আগের মতই। মজার কথা হলো যাঁরা ঐ ঘরানার সেরা শিল্পী, যেমন ঋতু গুহকে দিয়ে যদি শুরু করি, তাঁরা সবাই কিন্তু ঐ মুদ্রাদোষ থেকে মুক্ত। সত্যি কথা বলতে কি, ব্যক্তিগতভাবে আমি গীতবিতানের প্রশিক্ষণে পরিণত শিল্পীদের প্রতি অধিক স্বচ্ছন্দ। অনস্বীকার্য, দক্ষিণীর প্রশিক্ষণে 'লয়জ্ঞান'টির প্রতি যে যত্ন নেওয়া হয়, তার মান দশে দশ। হতেই পারে। কিরানার ভক্ত হলে পাতিয়ালার প্রতি অনুরক্তি থাকবে না, এমন কোনও বাধ্যতা নেই।
    অন্য মাধ্যমে শ্রেয়ার গান আমি শুনি বেশ কিছুদিন ধরে। তাঁর গানের মধ্যে একটি সহজ সাবলীলতা রয়েছে। শব্দগুলিকে উচ্চারণ করার আগে যথেষ্ট প্রস্তুতি নিয়ে থাকেন। রবীন্দ্রসঙ্গীতের প্রতিটি শব্দের, প্রতিটি বর্ণের নিজস্ব মহিমা থাকে। শুধুমাত্র বলে গেলেই হয়না। এই লক্ষণটি তাঁর পিসিমার থেকে পেয়েছেন। তবে তাঁর পরিবেশনায় ঋতু গুহের প্রস্তরভাস্কর্যের মতো দার্ঢ্যটি থাকেনা। তার গঠন মৃৎশিল্পের মতো। শোভন ও আন্তরিক। মাত্রাজ্ঞান নিখুঁত। দক্ষিণীর শিক্ষার্থীদের মধ্যে শ্বাসাঘাত প্রয়োগের ক্ষেত্রে একটি বিশেষ ধরন থাকে। এক লহমার বিলম্ব থাকে প্রধান সুরগুলি স্পর্শ করার সময়। এই ধরনটি লয়কে একটা স্বাচ্ছন্দ্য দেয়। সমঝদার শ্রোতা সেটা বুঝতে পারেন। শিল্পীরা কোন কোন গান গেয়েছিলেন তা টুকে রাখিনি। কারণ সর্বৈব শ্রোতা হিসেবেই গিয়েছিলুম। ভারহীন, ভানহীন শ্রোতা। তবে শ্রেয়ার যে গানগুলি মনে পড়ছে তার মধ্যে ' আমার হিয়ার মাঝে', ' মাঝে মাঝে তব দেখা পাই', 'তোমায় নতুন করে পাবো'। দিনের সেরা ছিলো 'রূপসাগরে ডুব দিয়েছি'।
    প্রথম সন্ধ্যার দ্বিতীয় শিল্পী ছিলেন সাহেব চট্টোপাধ্যায়। স্বীকার করি আমি তাঁর গান আগে শুনিনি। বোনের কাছে শুনলুম ইনি ইদানিংকালে এই সম্মেলনে নিয়মিত এসে থাকেন। সুদর্শন একজন যুবাপুরুষ। একটি তুঁতে নীল রঙের উপর জরি-কাজের পাঞ্জাবি পরে তিনি মঞ্চে 'আবির্ভূত' হলেন। ভগ্নীশ্রী আমাকে আগেই সতর্ক করেছিলো এই গায়কের চলনবলন বিষয়ে। ঠিক যেভাবে বাল্যকালে একবার কিশোরকুমারকে, পরে কুমার শানু বা অভিজিৎকে স্টেজে আসতে দেখেছি, সেভাবেই এলেন তিনি। আগে মঞ্চ প্রস্তুত হলো। সহযোগী শিল্পীরা সুর বেঁধে তৈরি। 'তোমার আসন শূন্য আজি' গোছের একটা পরিবেশ। তিনি জনতার অভিবাদন নিতে নিতে আসন গ্রহণ করলেন। টিভি রিয়ালিটি শোয়ের মতো দেখনদারির চাপ। শুনলুম তিনি মুখ্যত একজন অভিনেতা। এতোদূর পর্যন্ত ঠিক আছে। কিন্তু গানের আগে এতো বেশি কথা বলতে লাগলেন, মনে হলো গান গাইবার কথাটি হয়তো তিনি ভুলেই গেছেন।
    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের একটি গল্প শুনেছিলুম। কবির শতবর্ষে তাঁরা কয়েকজন কবিবন্ধু রবীন্দ্র সদনে গিয়েছিলেন কবির গান গাইতে। সম্ভবত 'জয় তব বিচিত্র আনন্দ'। তাঁদের মতে তাঁরা বেশ ভালো গাইছিলেন। কিন্তু শ্রোতাদের মধ্যে কিছু অবাঞ্ছিত কোলাহল শোনা যেতে লাগলো। হঠাৎ তা খুব বেড়ে যাওয়ায় স্টেজের ঝাঁপ পড়ে গেলো। গায়করা বিস্মিত হয়ে কারণ জানতে চাওয়ায় কর্তৃপক্ষ বললেন তাঁদের পোশাক নিয়ে শ্রোতাদের আপত্তি আছে। তাঁরা সাধারণ কামিজ-পাতলুন পরেই গাইতে এসেছিলেন। ১৯৬১তে সেটা গ্রহণযোগ্য ছিলোনা। রবীন্দ্রসঙ্গীত গায়কদের পোশাক-আশাক নিয়ে নানা গল্পকথা প্রচলিত আছে। তা নিয়ে আলাদা লেখা হতে পারে। সেটা এখন মুলতুবি থাক। শুধু মনে পড়ছে, জামশেদপুরে সম্ভবত ১৯৮০র সম্মেলনে সুদর্শন গায়ক চিন্ময় চট্টোপাধ্যায় একটি কালো লংকোট ও চুড়িদার পাজামা পরে গাইতে এসেছিলেন। এটা মানতে হবে, তাঁকে দেখতে বেশ ভালো লাগছিলো। কিন্তু দুর্জনে কানাকানি করতে শুরু করলো, অনুষ্ঠানটি রবীন্দ্রসঙ্গীতের না কাওয়ালির? সেও তো চল্লিশ বছর আগের কথা।
    আজকাল প্রকাশ্যে রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইবার সময় পোশাক-আশাক কী হওয়া উচিত এ নিয়ে নানা ধরনের মত আছে। কিছুদিন আগে বিষয়টি নিয়ে শ্রীমতী ইমন চক্রবর্তীর আলোচনা শুনছিলুম। ব্যক্তিগতভাবে আমার ধারণা শিল্পীর পোশাক তাঁর রুচিবোধের প্রতিফলন। পোশাক একটা স্টেটমেন্ট। তা আন্ডার বা ওভার, যাই হোক না কেন, এড়িয়ে যাওয়া উচিত। শিল্পীর পোশাক যেন গানের অন্তর্লীন অনুভবের উপর চাপিয়ে দেওয়া প্রদর্শন না হয়ে ওঠে। এই গান গাওয়া মানে অষ্টমী পুজোর অঞ্জলি দিতে যাওয়া নয়। নয় বৃহৎ, স্থূল ভারতীয় বিবাহের জেল্লার অতিকথন অথবা বাপী লাহিড়ি জাতীয় কদর্যতা। যাঁদের ইচ্ছে হবে তাঁরা অনায়াসে জিনস-টি সজ্জিত হয়ে কবির গান গাইতে পারেন। কিন্তু দিনের শেষে যেন মনে থাকে, আমরা এমন এক ধরনের গান গাইতে বা শুনতে এসেছি যেখানে 'গান'টি ছাড়া আর কোনও স্টেটমেন্ট নেই। শিল্পীর তার উপরে আর কিছুই প্রতিষ্ঠা করার নেই।

    সাহেব গাইতে শুরু করার পরেও তাঁর কথা বলার স্রোতে যতি পড়েনি। রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতে বসে মানুষের কেন এতো কথা পায়, বুঝতে পারিনা। এই শৈলীটি একটি অন্তরঙ্গ শিল্প। স্রেফ নিজের সঙ্গে কথা বলে যাওয়া ছাড়া তার আর কোনও সার্থকতা নেই। এঁরা বহিরঙ্গের গায়ক। কণ্ঠসম্পদ বা তালিম থাকলেই যে রবীন্দ্রসঙ্গীত গাওয়া যায়না, এঁরা সেটা প্রমাণ করেন। যেসব দেবতাদের শুনে কবির গান বুঝেছি, তাঁরা কেউ মঞ্চে বসে একটি বাতুল শব্দ উচ্চারণ করতেন না। গানের মধ্যে দিয়েই ছিলো স্রষ্টার প্রতি তাঁদের আত্মসমর্পণ। শ্রোতাদের সঙ্গে 'রিলেট' করতে চাওয়ার দুর্মর বাসনায় এক ধরনের শিল্পী আরও আরও 'কুল' হতে চান। নিজের অভিনীত পরের ছবিটি দেখার জন্য সাহেব দর্শকদের মধ্যে প্রচারও করে ছিলেন সেদিন ।

    তিনি গেয়েছিলেন নানা গান। মূলত তাঁর 'রবীন্দ্রনাথের নতুন বৌঠান' নামক একটি অ্যালবামের গান সেগুলি। বিষয়টি শুনলেই সংকলনটির গভীরতা মালুম হয়। 'আমার পরাণ যাহা চায়', 'যে ছিল আমার স্বপনচারিণী', 'তুমি সন্ধ্যার মেঘমালা', 'তুমি রবে নীরবে' ইত্যাদি। এসবের সঙ্গে তিনি ভয়ানক কলরব করে গাইলেন 'যদি তোর ডাক শুনে'। ভঙ্গি দেখে মনে হলো দুর্গাপুজোয় বিসর্জনের বাদ্যভাণ্ডের আবহটিই তাঁর সন্ধান। এই গানটি নিয়ে জনমানসে একটা সম্পূর্ণ অন্যমাত্রার সংবেদনা রয়েছে। এঁরা কি সুচিত্রা মিত্র শোনেন না? শ্রোতাদের একাংশকে বিশেষভাবে আলোড়িত হতে দেখলুম। হয়তো শোম্যান হিসেবে শিল্পী এই সব শ্রোতার প্রবণতাগুলি সম্বন্ধে ওয়কিফ হাল।

    তাঁর গান শুনে আমার মনে হলো তিনি বাংলা সিরিয়লের সেটে দাঁড়িয়ে অসম্ভব প্যানকেক মেকাপ ও জবরজং পোশাকপরিহিতা নায়িকাদের উদ্দেশে গান ‘ছুঁড়ে’ দিচ্ছেন। ক্যামেরা ও আলোর প্রতি রয়েছে সচেতন ফোকাস। এঁদের ঠিক করে নিতে হবে, রবীন্দ্রসঙ্গীত না অভিনয়, কোনটা তাঁদের ঈপ্সিত লক্ষ? দু নৌকায় ভাসা চলবে না। তাঁরা কুন্দনলাল সহগল নন।
    কিশোর কুমার ছিলেন আমাদের টোটাল এন্টারটেইনর। ফ্রন্ট রো জনতার ভাষায় 'প্যয়সা উসুল' কলাবন্ত। ব্লাস্টিং পারফর্মার। কিন্তু তিনি ছিলেন এক অনন্য প্রতিভা। গানের কতো গভীরে মসৃণভাবে প্রবেশ করা যায় তিনি আমাদের ছড়ি হাতে শিখিয়ে দিয়ে গেছেন। তাঁর গান অনুকরণ করা যায়। তাঁকে যায়না। বম্বেতে একবার অভিজিতের অনুষ্ঠান দেখতে গিয়ে ব্যাপারটা বুঝতে পেরেছিলুম। রবীন্দ্রসঙ্গীত গাওয়া একটি 'আন্ডার-প্লে' শিল্প। সুবিনয় যখন 'কী রাগিণী বাজালে' উচ্চারণ করার পর আধ নিঃশ্বাস যতি নেন, আমরা নিজের অজান্তেই গেয়ে উঠি '....হৃদয়ে'। রবীন্দ্রসঙ্গীত নিছক 'এন্টারটেইনমেন্ট' নয়। তার স্তরটা অনেকটা আলাদা । রস পেতে গেলে নিজেকে সেখানে তুলে নিয়ে যাবার শ্রমটি করতে হবে।

    একজন ইতর শ্রোতা হিসেবে সাহেব চট্টোপাধ্যায় এবং তাঁর অনুগত শ্রোতৃমণ্ডলীকে বলতে পারি, তিনি প্রকৃতির থেকে কণ্ঠসম্পদ পেয়েছেন। পেয়েছেন দক্ষিণীর তালিম। তাঁর বাবুল সুপ্রিয় বা কিংবা কুমার শানু টাইপ মডেলের প্ররোচনার ফাঁদে পড়ার হবার দরকার নেই। 'স্মার্ট, প্রগলভ' শ্রোতারা এসব শুনলে হয়তো জনান্তিকে মন্তব্য করবেন 'জ্ঞান দিচ্ছে'। কিন্তু তাতে বস্তুস্থিতি পাল্টায় না। নিজেকেই পিছিয়ে পড়তে হয়। যদিও বাজার সংস্কৃতি ও রবীন্দ্রসঙ্গীত নামক ধারণা দুটি মেলানো একটি অক্সিমোরোন। কবিও বলতে ব্যর্থ হবেন, 'মেলাবেন, তিনি মেলাবেন'।

    দুই
    'তোমার সঙ্গে বিনা কথায় মনের কথা কইতে'
    ~~~~~~

    রবীন্দ্রসঙ্গীত অপ্রগলভ মানুষের শিল্প। গত দু'দশক ধরে আমাদের দেশে জীবনযাপনের চালিকাশক্তি হলো বাজার অর্থনীতি। প্রতিটি মানুষ, প্রতিটি জীবনের মূল্য ধরা হয় বাজারে তাদের চাহিদা কতোটা রয়েছে, সেই মাপে। ইংরিজিতে একটা শব্দ রয়েছে ' স্ট্রিট স্মার্ট' । বাংলায় বলা হয় ' চালাকচম্বা '। বিশেষণটির মধ্যে হয়তো কিঞ্চিৎ কৌণিক ব্যঙ্গ থাকে। কিন্তু আমরা লক্ষণটিকে এ যুগের জাগতিক সাফল্যের চাবিকাঠি মনে করি। আমাদের সন্তানদের উদ্বুদ্ধ করি এই 'গুণ'টি আয়ত্ব করতে। তারাও সেভাবে বেড়ে ওঠে। জাগতিক সাফল্য কতোটা আসে তার বিচার সব সময় করে ওঠা যায়না। কিন্তু তাদের উদ্বৃত্ত সময়ে গভীরতর চিন্তার পরিসরটি কমে যায়। উদাহরণ হিসেবে 'রবীন্দ্রসঙ্গীত' নামক চিন্তার অঙ্গনটির কথা ভাবা যেতে পারে। এই শিল্পটি যতোটা 'সরল' বোধ হয়, সেটা বোধ হয় ততোটাই কঠিন। 'কঠিন' বলতে বোঝাচ্ছি ফাঁকি দিয়ে এর তল পাওয়া যায়না। এই ধারাটি গাইতে যাওয়ার আগে তাকে পড়তে হয়। সযত্নে, সাবধানে, ভালোবেসে। প্রতিটি শব্দ থেকে, নির্মাণ থেকে উঠে আসে নতুনতর অর্থ, ব্যঞ্জনা, তাৎপর্য। বিশ বছর বয়সে যে গানটি যেভাবে পড়েছিলুম, ষাট পেরিয়ে তার অর্থ বা ব্যঞ্জনা আমার কাছে আলাদা হয়ে গেছে।

    মনে পড়ছে কয়েক দশক আগের কথা। সাবেক রবীন্দ্রভবনে একটা সুন্দর ছোট্টো হলঘর ছিলো। জলাশয় দিয়ে ঘেরা। মেঝেটা ছিলো কাঠের। আমরা কাঠের ঘর বলতুম। সেখানে এককালে বাংলা সভ্যতা-সংস্কৃতির মস্তো মস্তো লোকজন এসে কথা বলতেন। আমরা শুনতুম। বলতামও। একবার রবীন্দ্রমেলার সময়, সম্ভবত নব্বই সালে, সকালে আলোচনা সভার বিষয় ছিলো ' রবীন্দ্রসঙ্গীতের উপর বিধিনিষেধ তুলে দেওয়া উচিত কি না'। কারণ একানব্বই সালে কপিরাইটের দিন ফুরোবার ছিলো। সেই সভায় উপস্থিত ছিলেন আমাদের শহরের সাহিত্যসংস্কৃতি সমাজের মুখ্য ব্যক্তিরা। আলোচনা চলাকালীন দেখা গেলো অধিকাংশ বিদ্বান বক্তারাই স্থিতাবস্থার পক্ষে মত দিচ্ছেন। মনে পড়ছে সেই সভায় উপস্থিত ছিলেন এ শহরের রবীন্দ্রসঙ্গীত শিক্ষকদের মধ্যে প্রধান নামগুলিও।

    আমাকে যখন বলতে ডাকা হয়েছিলো, আমি কপিরাইট তুলে দেওয়ার পক্ষে সওয়াল করেছিলুম। কারণ আমার বিশ্বাস ছিলো, এতো দীর্ঘদিন ধরে মানুষের শ্রবণে ও মননে রবীন্দ্রসঙ্গীতের যে রূপটি দৃঢ়ভাবে আঁকা হয়ে গেছে, তাকে বিকৃত করা সম্ভব নয়। বরং কিছু নিহিত স্বার্থ মানুষের কবল থেকে রবীন্দ্রসঙ্গীত চর্চার স্বাধীনতাকে মুক্ত করা যেতে পারে। প্রবীণ মানুষদের মধ্যে আমার সপক্ষে সেদিন বলেছিলেন টেগোর সোসাইটির তৎকালীন সচিব। তাঁর দেওয়া উদাহরণটি আমার এখনও মনে আছে। কপিরাইট যদি উঠেও যায়, তবু কি কেউ 'এই উদাসি হাওয়ার পথে পথে ' 'অন্যরকম' করে গাইতে পারবেন। আর যদি গেয়েই ফেলেন, শ্রোতারা কি তা গ্রহণ করবে?
    আমাদের গ্রামে রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনতে আর বুঝতে শেখার ধারাটি এভাবেই রপ্ত করেছিলুম আমরা । সত্যিই তো, 'উদাসি হাওয়া' কি অন্যভাবে গাওয়া যেতে পারে? না গাইলে কেউ শুনবে? গত একশো বছর ধরে রবীন্দ্রসঙ্গীত গায়নে কী কী বিবর্তন ঘটেছে সেই নিয়ে 'জোড়াসাঁকো জংশন' লেখাটিতে যখন হাত দিয়েছিলুম, তখন এই সব অভিজ্ঞতা মনে রেখেই এগিয়ে যাওয়া।
    তখন ছিলুম হায়দরাবাদে। বহুদিন হলো। সে আমলে লোকে ইউ-টিউব নামক আশীর্বাদটির দাক্ষিণ্য পায়নি। একবার সরকারি কোনও কাজে কলকাতায় এলে এক বন্ধু একজন 'নতুন' শিল্পীর সিডি আমাকে উপহার দেন। তাঁর নাম বা গান আমি আগে শুনিনি। তিনি বলেন, শুনে দেখো। সম্প্রতি খুব ভালো গাইছেন। রবীন্দ্রসঙ্গীত বিষয়ক সেরা আর্কাইভ gitabitan.net এর স্রষ্টা, মার্কিনদেশবাসী বিখ্যাত রবীন্দ্রসঙ্গীত বিশেষজ্ঞ সুমিত রায় মশায়ও এঁর নাম আমাকে বলেছিলেন।
    জয়তী চক্রবর্তীর গান শোনা তখন থেকেই শুরু। প্রথম শ্রবণেই যে ব্যাপারটি কানে বেজেছিলো, তা হলো তাঁর কণ্ঠের 'তাজগি'। অর্থাৎ, বাংলায় যাকে বলে রিফ্রেশিং আদায়। পর্দাগুলো স্পষ্ট লাগছে, কিন্তু প্রখর নয়। উচ্চারণ সহজ, কিছু প্রমাণ করার নেই। পুনরাবৃত্তি নেই, এগিয়ে যাওয়া আছে। লিরিক গানে 'Progression' ব্যাপারটা খুব জরুরি। শাস্ত্রীয় গানের মতো অলংকরণ করলে চলেনা। যন্ত্র অনুষঙ্গে বা তাল বন্ধনে স্বাধীনতা নিয়েছেন, কিন্তু সংযম হারাননি। এই সব ঈপ্সিত চরিত্র থাকার জন্য তাঁর গান আমি মনোযোগ দিয়ে শুনি তখন থেকেই। সামনে বসে শোনা এই প্রথম।

    জয়তী যখন বসলেন, সাধারণ শ্রোতা হিসেবে একটু ক্লান্তই বোধ করছিলুম। কিন্তু তিনি যে গানটি দিয়ে শুরু করলেন সেই গান শুনলেই আমার এক প্রিয়তম অকালপ্রয়াত শিল্পীর কথা মনে পড়ে যায়। হ্যাঁ, রমা মণ্ডল,
    'বাজে বাজে রম্যবীণা বাজে...'
    তার কিছুক্ষণ পরেই আসবে রাগ-শ্রী ভাঙা তেওড়ার জাদুমগ্নতা...
    শুরুটা সম্ভবত করেছিলেন স্বয়ং সুচিত্রা। রাগভিত্তিক সুর অবলম্বনে রচিত রবীন্দ্রসঙ্গীতগুলি আলাদাভাবে চর্চা করার জন্য একটা উদ্যম নেওয়া হয়েছিলো নানা মহলে । তিনি উস্তাদ আমজাদ আলি'র সঙ্গে যুগলবন্দি করে একটি অ্যালবাম প্রকাশ করেছিলেন। এই প্রয়াসটির পর উস্তাদজির মননে রবীন্দ্রসঙ্গীতে রাগপ্রয়োগের কৌশলটি বেশ প্রভাব ফেলে। আমি অন্তত বার তিনেক তাঁর বিভিন্ন অনুষ্ঠানে স্বয়ং এ বিষয়ে মন্তব্য করতে শুনেছি।
    কলকাতা-কেন্দ্রিক রবীন্দ্রসঙ্গীত চর্চায় উৎসভিত্তিক, রাগভিত্তিক, মেজাজভিত্তিক ইত্যাদি নানা মাপদণ্ডে শিল্পধারাটির সন্ধান চলে। একটা প্রচলিত ধারণা আছে, রবীন্দ্রনাথ নানা উৎস থেকে সংগৃহীত সুরে কথা বসিয়ে নিজের সৃষ্টির ধারাটিকে সচল রেখেছিলেন। সেই গানগুলিই ছিলো তাঁর প্রকৃত 'অনুপ্রেরণা'। ধারণাটি আংশিক সত্য। প্রথম অংশটি সত্য, যেহেতু উৎস গানটিকে চিহ্নিত করা যায়। কিন্তু দ্বিতীয় অংশটি সত্য নয়, কারণ উৎস গানগুলির কাব্যমূল্য এককথায় উপেক্ষণীয়। বিশেষত ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের প্রচলিত প্রথা অনুযায়ী গানের লিরিক উপেক্ষিত থাকে। ধরা যাক, এই গানটি। এটি রাগ শ্রী'তে নিবদ্ধ একটি ধ্রুপদ থেকে নেওয়া হয়েছিলো। এর মূল কথাটি এই রকম,
    "তনু মিলন দে পরবর কী পরিবে মিয়াঁ
    হাঁ জী তনুকি পজবে অজ জো বাঁধিযে
    বাল পুছ দি জব মিয়াঁ।..." ইত্যাদি।
    যাঁরা অওধি ভাষা বোঝেন তাঁদের বোঝাবার প্রয়োজন নেই। যাঁরা ভাষাটি জানেন না, তাঁদের বলি গানটি কাব্যবিচারে নেহাত মূল্যহীন। এই সুরটি অবলম্বনে ১৯০৯ সালে কবি রচনা করেছিলেন 'কার মিলন চাও বিরহী'। তখন তাঁর বয়স আটচল্লিশ। নোবেল পাননি তখনও। ব্রাহ্মসমাজের প্রয়োজনে তাঁকে নিয়মিত 'পূজা' সঙ্গীত রচনা করতে হয়। এই গানটিও সেই সূত্রেই এসেছিলো। এক কথায় বলতে গেলে 'ফরমায়েসি' গান। কিন্তু মনস্ক শ্রোতা হিসেবে যদি আমরা বিশ্লেষণ করে দেখি তবে স্পষ্ট হবে বাণী ও কথার মেলবন্ধনে গানটি একটি 'নিখুঁত' রবীন্দ্রসঙ্গীত। সুর কোথা থেকে এসেছিলো, কোন প্রয়োজনে, সব কিছু তুচ্ছ বোধ হয়।
    কবি তাঁর বাণীকে প্রতিষ্ঠা করতে রাগ শ্রী'র সহায়তা নিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি রাগ-শ্রী আধারিত কোনও গান রচনা করেননি। এটি 'রাগপ্রধান' গীত নয়। পূর্ণতঃ রবীন্দ্রসঙ্গীত। কবি-সৃষ্ট সঙ্গীত ধারাটি আমাদের প্রাচীন শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের মতো'ই ক্ল্যাসিসিস্ট। তার বিবর্তন বা স্বভাবধর্মের মূল্যায়ণ করতে গেলে এই সত্যটি সতত মনে রাখতে হয়। এই বিষয়টি বুঝতে আমি উদাহরণ দেবো উস্তাদ রাশিদ খান গীত 'কার মিলন চাও বিরহী' গানটি। শ্রোতারা যদি মন দিয়ে শোনেন তবে বুঝতে পারবেন। উস্তাদজি নিজগুণে সতত আমাদের মাথায় থাকেন। কিন্তু তিনি রবীন্দ্রসঙ্গীতের কাছে পৌঁছোতে পারেননি।
    এই গানটি আমরা শুনতে শিখেছি সুচিত্রা মিত্রের দীক্ষায়। কণিকাও গেয়েছেন এ গান। আমাদের প্রজন্মের গায়কদের মধ্যে মনে পড়ছে ইন্দ্রাণী সেন, বন্যা বা শ্রীকান্তের নাম। পূর্বী ঠাটের পুরুষ রাগ শ্রী'র প্রধান সম্বল ঋষভের টান। ঋষভ ও পঞ্চমকে জড়িয়ে একটা মর্যাদাময় মোহ তৈরি করে এই সুর। কবি শ্রী-রাগ থেকে সেই মর্যাদাটি আহরণ করেছিলেন। গল্পটি সেখানেই শেষ হয়ে যায়। সৃষ্টি হয় একটি 'রবীন্দ্রসঙ্গীত'। গানটি শুরুর আগে যখন অঞ্জন বসু এসরাজে ঋষভ টানছিলেন মনে হয়েছিলো পূরবী বা পরজে কোনও গান আসছে। কিন্তু এলো তাদের সহোদর শ্রী। ষড়জ ছুঁয়ে ঋষভে জয়তী যখন 'কার মিলন চাও' সুর লাগালেন, তখনই স্পষ্ট হয়ে গেলো এই গানটি আজ কিছু হতে যাচ্ছে। হলও।
    ব্যক্তিগতভাবে আমি নোবেল পরবর্তী আত্মবিশ্বাসী রবীন্দ্রনাথের গানে বেশি আগ্রহী। 'গীতাঞ্জলি'র রবীন্দ্রনাথের চেয়ে গীতালি-গীতবীথিকার রবীন্দ্রনাথ আমাকে অধিক সাহচর্য দেন। কিন্তু এটাও মনে রাখতে হয় কবিকে এভাবে খণ্ডিত করা যায়না। ১৮৯৯ সালে কবি একটি গান লিখেছিলেন। ১৯০৩ সালে ব্রহ্মসঙ্গীত হিসেবে সেটি প্রকাশিত হয়। গীতবিতানেও আছে 'পূজা' পর্যায়ের মধ্যে। 'পূজা' ও 'প্রেমে'র এই যে পর্বভাগ, তার পিছনে গ্রহণযোগ্য কোনও ব্যাখ্যা আমি এখনও পাইনি। ১৮৯৯ সালে কবির বয়স ছিলো আটত্রিশ বছর। পূর্ণ যুবকই বলা যায়।ব্যক্তি জীবনে কয়েকটি ট্র্যাজেডি ঘটে গেছে। বলেন্দ্রনাথ অকালে প্রয়াত হয়েছেন। সুরেন্দ্রনাথ ও বলেন্দ্রনাথ মিলে কুষ্টিয়াতে যে ব্যবসাটি করেছিলেন, বলেন্দ্রনাথের অনুপস্থিতিতে কর্মচারীরা তহবিল তছরুপ করে তাকে লাটে তুলেছে। ঋণভারটি পুরো কবির স্কন্ধলগ্ন। তার মধ্যে কবি হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেললে তাঁর জন্য নিয়মিত অর্থসাহায্য করতে হয় তাঁকে। প্রিয় কাজ, 'ভারতী' পত্রিকার সম্পাদকীয় পদ থেকে ইস্তফা দিলেন। মানসিকভাবে পর্যুদস্ত। সে রকম একটা সময়ে এই গানটির সৃষ্টি। 'দিন যায়….’

    'দিন যায়রে দিন যায়' গানটি আমি প্রথম শুনেছিলুম রাজেশ্বরী দত্তের কণ্ঠে, এই রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্মেলনেই। সম্ভবত ১৯৭৫ সালে। এই গানের আর্তিকে 'ব্রহ্মসঙ্গীতে'র তকমায় বেঁধে রাখা যায়না। সুরটি নিয়েছিলেন একটি পঞ্জাবি টপ্পা থেকে। রাগ পিলু, তাল আড়া ঠেকা। এই তথ্যগুলো উপাদান মাত্র। মানুষ ও রক্তমাংসের মধ্যে যে তফাতটি রয়েছে, সেরকমই। পিলু রাগিণীকে শৃঙ্গাররসের সঙ্গে চিহ্নিত করা হয়। যে কোমল গান্ধার আর শুদ্ধ নিষাদের প্রয়োগ অন্য সময় যে শরীরী আবেদন নিয়ে আসে, এই গানে তা বিষাদের ফুল হয়ে মানুষের প্রতীতিকে ঢেকে ফেলে। কীভাবে কবি এই জাদুটি সৃষ্টি করেন, তা বুঝ লোক যে জানো সন্ধান।
    শ্রোতারা বলবেন, এতো ভারি ঝকমারি! রবীন্দ্রসঙ্গীত বুঝতে গেলে কি এতোশত জানতে হবে? বড্ডো চাপ! ধুর, অন্য কিছু শুনি না হয়। এর উত্তরে এইটুকুই বলা যায়, 'বড়ো' কিছু পেতে গেলে নিজেকেও প্রস্তুত করতে হয়। বাজারে সব কিছুই পাওয়া যায়। সোনা, আসল হোক বা নকল, দেখতে একই লাগে। শুধু মূল্যটা আলাদা।
    এই গানটি যাঁদের রেকর্ড থেকে আমরা শুনি, তাঁরা দুজনেই দিকপাল। রাজেশ্বরী ও সুচিত্রা। যে লক্ষণটি আমার সেদিন উল্লেখযোগ্য মনে হয়েছে, জয়তী একেবারে নিজের মতো করে গানটি গাইতে পেরেছেন। পূর্বজ দেবতাদের পিছুটান তাঁকে হৃদয়ে ঋদ্ধ করেছে নিশ্চয়, কিন্তু নিজের পথটি তিনি নিজেই কাটতে পেরেছিলেন সেদিন।
    জয়তী সেদিন বেশ কয়েকটি গান গেয়েছিলেন। কোনও গানেই তাঁর পারঙ্গমতা ঈপ্সিত স্তরের নীচে নামেনি। কিন্তু সেগুলি ছিলো প্রতিমার চালচিত্র। কিন্তু ঐ দুটি গান সেদিন প্রতিমা হয়ে উঠেছিলো। সেগুলি মনে থেকে গেছে। বস্তুত ঐ গানদুটি মনে মনে গাইতে গাইতে প্রস্থান করেছিলুম সেদিন। শেষের গানের রেশ নিয়ে কানে চলে এসেছি, কেউ কি তা জানে?

    রবীন্দ্রসঙ্গীতকে ইতর শ্রোতা হিসেবে দুভাবে ভাগ করে শুনি। একান্ত গান আর 'অশান্ত' গান। এই পর্বভেদের কি কোনও প্রাসঙ্গিকতা আছে? একটু ভেবে দেখা যেতে পারে।
    রবীন্দ্রসঙ্গীত গাওয়া খুব সহজ। শোনাটা আরও সহজ। অনেকেই ভাবেন। এই গানে নাকি কালোয়াতি গানের মতো প্রস্তুতি লাগেনা। ব্যাপারটা কি তাই? উত্তরটি এককথায়, না। কিন্তু তাহলে সত্যিটা কী? ভারতীয় সঙ্গীতশাস্ত্রে গানবাজনা নিয়ে বিশদ আলোচনা রয়েছে। অসংখ্য দিকপাল সঙ্গীতগুণী ও সাধকদের অভিজ্ঞতা পাওয়া যায় সেখানে। সবই ভরতমুনির নামে। তাঁর নাট্যশাস্ত্র ভারতীয় সঙ্গীতশাস্ত্রের তাত্ত্বিক ও নান্দনিক বিচারের উৎসস্রোত। একটি মহাসাগর প্রতিম আকর। আরও অনেক বিষয়ের সঙ্গে গান গাওয়ার সময় কীভাবে বিভিন্ন পর্দায় সুর লাগানো হয়, তা নিয়েও বিশদ চর্চা রয়েছে সেখানে। তিনি বলেছেন স্বর উৎপন্ন হয় শরীরের তিনটি স্থান থেকে; কণ্ঠ, বক্ষ ও নাভি। নাভিদেশ থেকে উদ্ভূত স্বরই শ্রেষ্ঠ। বক্ষ বা কণ্ঠদেশ থেকে যে স্বর উৎপন্ন হয়, তা অল্পপ্রাণ। বৈদিকযুগে যাঁরা মন্ত্রপাঠ করতেন, তাঁদের নাভিদেশ থেকে স্বর উৎপন্ন করার প্রশিক্ষণ নিতে হতো। ভরত মুনির পর ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের যে পরম্পরা পঞ্চম-ষষ্ঠ শতক থেকে আমাদের দেশে শুরু হয়েছিলো সেখানেও, বিশেষত মার্গসঙ্গীতে, নাভি মূল থেকে উঠে আসা স্বরের সাধনা করা হতো। পরবর্তীকালে নাট্যগীত, প্রবন্ধ বা অনেক পরে ধ্রুপদ বা ধামার সাধনার সূত্রে যে সব অন্য শৈলী, বিশেষত খ্যয়ালের উদ্ভব হয়, সেখানেও প্রধান সাধনা ছিলো নাভিজাত স্বর আয়ত্ব করা । রবীন্দ্রনাথের সঙ্গীতভাবনার ভিত্তিতে ছিলো ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের করণকৌশল। তাঁর গান গাইতে গেলেও শিল্পীদের এই সত্যটি মনে রাখতে হয়। রবীন্দ্রসঙ্গীত গায়নের প্রথমযুগ থেকেই তাঁর গানে কীভাবে সুর লাগাতে হবে, তা নিয়ে নানা ধরনের পরীক্ষানিরীক্ষা হয়েছে। সব রকম প্রয়াসের শেষে আমরা দেখেছি এই গান গাইবার জন্য কণ্ঠস্বরের গভীরতা থাকাটা অত্যন্ত জরুরি। পুরুষ ও নারীকণ্ঠনির্বিশেষে।

    রবীন্দ্রনাথের গানের ফ্রেমটি চারতুকের। অর্থাৎ ধ্রুপদ শৈলীর ছাঁচে। তিনি যখন সুর করেন, অস্থায়ী ও সঞ্চারীর সুরের কাঠামোটি পরস্পর পরিপূরক হয়। যাঁরা নিয়মিত চর্চা করেন, ব্যাপারটা জানেন। মন্দ্র থেকে তার সপ্তকে সুরের ওঠানামা যে বিন্যাসে করা হয়, সেখানে কণ্ঠস্বরের স্থিতিস্থাপকতা না থাকলে গানটি 'আদায়' হবেনা। এই গুণটি পুরোপুরি আয়ত্ব করার জন্য আমাদের শরীরজাত শ্বাসবায়ুর শক্তিটি যথাসম্ভব বাড়িয়ে তুলতে হয়। যাঁরা শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের সাধনা করেন, তাঁরা সর্বশক্তি দিয়ে প্রয়াস করেন। কিন্তু রবীন্দ্রসঙ্গীতের ক্ষেত্রে এতো অধ্যবসায় দুর্লভ।
    রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্মেলনের দ্বিতীয় দিন নবীন শিল্পী রোহিণী রায়চৌধুরীর গান শুনতে শুনতে এই ভাবনাটিই মাথায় ভাসছিলো। রোহিণীর গান উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া। দীর্ঘদিন ধরে পিতা ও দক্ষিণী তাঁকে প্রশিক্ষিত করেছেন সযত্নে । ফলে তুলনামূলকভাবে কম বয়সেই তিনি নিজের মতো করে গায়নচর্চা করতে পারেন । এই প্রথম রবীন্দ্রসঙ্গীতে একটি নারীকণ্ঠ শুনলুম যেটির স্বাভাবিক ভাবেই সি-ন্যাচরাল বা সি-শার্পে উৎসারিত হয়। সুরের পর্দায় চাপ পড়েনা। বয়সের সঙ্গে গলা ভারি হয়ে গেলেও কণ্ঠের সুর ধরে রাখাটা তাঁর পক্ষে অনেক সহজ হবে।

    এতো গেলো কণ্ঠসম্পদের কথা। তাঁর গায়নেও সহজ সাবলীলতা রয়েছে। সুর লাগানো, উচ্চারণের যতি ও ঘাত, সর্বোপরি লয় ধরে রাখা, তিনি অল্পবয়সেই আয়ত্ব করেছেন।
    রেকর্ডে শোনা তাঁর 'মাঝে মাঝে তব দেখা পাই' গানটিতে সানুনাসিক ঝোঁকটি কানে বাজে। হয়তো স্কেলটি একটু বেশি উচ্চগ্রামে বাঁধা ছিলো। কিন্তু সেদিনের অনুষ্ঠানে এই গানটিতে তিনি স্বচ্ছন্দ ছিলেন। আরও বেশ কয়েকটি গান গেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু আমি সেগুলি এই মুহূর্তে স্মৃতিতে ধরতে পারছি না। সেই সন্ধ্যায় তাঁর সেরা পরিবেশন ছিলো 'আহা তোমার সঙ্গে প্রাণের খেলা।'

    তিন
    'সে যে চিরদিবসেরই, নূতন তাহারে হেরি'
    ~~~~~~

    রবীন্দ্রসঙ্গীতের ক্ষেত্রে একটা বিষয় জজেও মানে। ন্যাচরাল পুরুষ কণ্ঠের জনপ্রিয়তা আকাশছোঁয়া। য়ুরোপিয় ঘরানা অনুযায়ী ব্যারিটোন ও টেনর কণ্ঠের গায়করা চিরকাল সফল হয়ে এসেছেন। পঙ্কজকুমার, কুন্দনলাল, হেমন্ত, জর্জদা, অশোকতরু, দ্বিজেন, কিশোরকুমার প্রমুখ, উজ্জ্বল উদাহরণ। তাঁদের সাফল্যের মূলে রয়েছে সুর লাগানোর টেকনিক। এঁরা ভরতমুনি কথিত নাভিজাত বা বক্ষজাত গভীরতা থেকে শ্বাসক্ষেপ করেন। সঙ্গীতের পরিভাষায় যাকে 'জোয়ারি' বলা হয়। রবীন্দ্রসঙ্গীতে বাণীর ওজন ধরার জন্য সুরের ভিত্তিটি সুদৃঢ় হওয়া প্রয়োজন। কারণটা আগেই বলেছি, দিনের শেষে রবীন্দ্রসঙ্গীত একটি ক্ল্যাসিসিস্ট শিল্প। আমার জ্ঞাতসারে এই ঘরানার এখনও পর্যন্ত শেষ প্রতিনিধি মোহন সিং খাঙ্গুরা।

    গত দুই দশকে যেসব পুরুষ শিল্পী জনগণেশের আনুকূল্য পেয়েছেন, তাঁরা সাধারণভাবে কণ্ঠনির্ভর, পেলব সুর লাগানোর কৌশলটির উপর নির্ভরশীল। গত শতকের সাতের দশকে রবীন্দ্রসঙ্গীত গায়নের এই ধরনটির রাজা ছিলেন সাগর সেন। তাঁর অনুগামী ছিলেন সুবীর সেন বা সুশীল মল্লিক। তাঁদের প্রশ্নাতীত জনপ্রিয়তা ছিলো। বিশেষত সাগর সেনের প্রতি বহু শ্রোতার মুগ্ধতা স্পষ্ট দেখা যেতো। এই শিল্পীদের মধ্যে রবীন্দ্রসঙ্গীতকে 'সহজ' করে গাওয়ার একটা সচেতন প্রয়াস কাজ করতো। সহজ সুরের কাব্যগীতিগুলি ছেড়ে দিলেও একটু আয়াসসাধ্য ব্রহ্মসঙ্গীতেও, যেমন, 'আজি প্রণমি তোমারে চলিব নাথ' ইত্যাদিও তাঁরা লঘু স্পর্শে সুর বিহার করতেন। সাগর সেনের প্রতি অভিযোগ উঠতো , তিনি ইচ্ছেমতো মিড়ের জায়গায় ট্রেমোলো ব্যবহার করে লয় ধরে রাখতেন। গানের বাণী উচ্চারণেও তাঁরা প্রয়োজনীয় ঘাতগুলি মোলায়েম করে চলিত পশ্চিমবঙ্গীয় বাগভঙ্গিকে বেশি অগ্রাধিকার দিতেন। এই লক্ষণগুলি পরিণত শ্রোতাদের কাছে গ্রহণযোগ্য ছিলোনা। কারণ, তখন আসরে বেশ কয়েকজন মহীরূহ পূর্ণমাত্রায় সৃষ্টিশীল ছিলেন। ইংরিজিতে যাকে বলে Full throated singing , তার অভাব ছিলোনা। কিন্তু বেশ কিছু শ্রোতার আনুগত্য সাগর সেন বা অন্যান্য গায়কদের একটা দাঁড়াবার জায়গা দিয়েছিলো। তাঁরা ঠিক Also ran ছিলেন না।
    নতুন শতকে পুরোনো নক্ষত্ররা সবাই বিদায় নিয়েছিলেন। পীযূষকান্তি খোলা গলায় গাইতেন। কিন্তু রবীন্দ্রসঙ্গীত যতোটা নাটকীয়তা বহন করতে পারে, তার সীমা তিনি প্রায়শ অতিক্রম করে যেতেন। এই ভাবে রবীন্দ্রসঙ্গীতে কাল্টসংস্কৃতির অবসান হয়ে যায়।

    এই সময় থেকে সাগর সেন ও তাঁর অনুগামীদের প্রবর্তিত সুর লাগানোর রীতিটি পুরুষ গায়কদের মধ্যে একচেটিয়া প্রাধান্য পেতে শুরু করে। তাঁদের গান এক ধরনের প্রীতিময়, কোমল আবহ সৃষ্টি করতো। রবীন্দ্রসঙ্গীতে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় লয় অক্ষুন্ন রেখে স্বরস্থান ও উচ্চারণের দাপট তাঁদের গানে পাওয়া যেতোনা। শান্তিদেব রেগে গিয়ে বলতেন 'অশিক্ষিত গলা'। এবারের সম্মেলনেই দুজন জনপ্রিয় রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী সাহেব চট্টোপাধ্যায় ও মনোময় ভট্টাচার্যের গায়নে 'বজ্র' শব্দের উচ্চারণ 'বজরো' হতে দেখলুম। জর্জদা বা সুচিত্রা, যেখানেই থাকুন না কেন, কষ্ট পাবেন।
    প্রশ্ন উঠতে পারে, ধান ভানতে এতো শিবের গীত কেন? কারণটা স্পষ্ট হবে যখন একালের পুরুষ কণ্ঠে গাওয়া রবীন্দ্রসঙ্গীত একটা বিষয় হয়ে ওঠে। এবারের সম্মেলনে দ্বিতীয়দিনে রবীন্দ্রসঙ্গীতের বর্তমানকালের ব্যস্ততম দুজন পুরুষ শিল্পী সঙ্গীত পরিবেশন করেছিলেন। জনপ্রিয়তার বিচারে আগেকার উপমান ব্যবহার করতে গেলে বলা যায় তাঁরা একালের 'হেমন্ত ও জর্জদা'। এই মুহূর্তে রবীন্দ্রসঙ্গীত আলোচনা করতে গেলে মনোময় ভট্টাচার্য ও শ্রীকান্ত আচার্যের নাম আসবেই। ঐ আসরে তাঁদের গান নিয়ে এই শ্রোতার মূল্যায়ণটিও লিখে রাখা যাক।
    জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা দুটো সব সময় সমানুপাতিক হয়না। বিশেষত গানবাজনার ক্ষেত্রে সেটা বারবার চোখে পড়ে। কানে শোনা একটা ব্যাপার। কিন্তু প্রাণে পাওয়া একেবারে আলাদা একটা অভিজ্ঞতা। 'মিষ্টি' বিশেষণটি গানের ক্ষেত্রে খুব চলে। মিষ্টি গান, মিষ্টি গাওয়া, মিষ্টি গলা। তাৎপর্য, যে গান কানকে তৃপ্তি দেয়। মসৃণ, মোলায়েম, সুরে বসা সহজ পরিবেশনা। কিন্তু কখনও পঙ্কজকুমার, হেমন্ত, জর্জদা, সুচিত্রা, রাজেশ্বরী, গীতা ঘটক, মোহন সিং, এ রকম আরও বহু শিল্পীর সম্বন্ধে 'মিষ্টি' বিশেষণটি ব্যবহার হতে দেখিনি। কারণ তাঁদের সঙ্গীতব্যক্তিত্বের সঙ্গে ঐ বিশেষণটি খাপ খায়না। রবীন্দ্রসঙ্গীত, পারঙ্গম শিল্পীকে একটা ব্যক্তিত্ব দেয়। যার শক্তিতে একজন গায়ক, শিল্পী হয়ে ওঠেন। এতো কথা বলার উদ্দেশ্য, রবীন্দ্রসঙ্গীতে 'মিষ্টত্বে' বিশ্বাসীরা চটজলদি জনপ্রিয়তার স্বাদ নিশ্চয় পেয়ে যান বটে। কিন্তু ওটা তো সঙ্গীতের গর্ভগৃহের বাইরে নাটমন্দির মাত্র। দেবতার কাছে পৌঁছোনো? তার কী হবে? কবির করুণায় বিচিত্র আনন্দ লাভ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মরীচিকা হয়ে দাঁড়ায়।
    মনোময় ভট্টাচার্যের খ্যাতির কথা শুনেছি। তাঁর গান রেকর্ডে শুনেছি বেশ কয়েকবার। তিনি নানারকম গান করেন। জীবিকার প্রয়োজনে এটা অপরিহার্য। একযোগে বহু ধরনের গান গেয়ে যাওয়ার বিপদ হলো কোনও শিল্পীই সব শৈলীর প্রতি একসঙ্গে সুবিচার করতে পারেন না। আমার জানার জগতে একমাত্র, এক এবং অদ্বিতীয় হেমন্ত মুখোপাধ্যায় ছাড়া আর কেউ সেই সিদ্ধি অর্জন করতে পারেননি। বাঙালি গায়করা সবাই কখনও না কখনও রবীন্দ্রসঙ্গীতের রেকর্ড করেছেন। জগন্ময় মিত্র থেকে শ্যামল মিত্র, মান্না দে থেকে সুবীর সেন। এঁরা সবাই নমস্য শিল্পী। কিন্তু 'রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী' হয়ে উঠতে পারেননি। অন্যদিকে পঙ্কজকুমার এতো রকম গান গেয়েও ‘রবীন্দ্রসঙ্গীত’ শিল্পী হিসেবেই সিদ্ধিলাভ করেছিলেন। নানা কারণেই এঁদের সঙ্গে বর্তমান কালের শিল্পীদের তুলনা করা যায়না। সময়ের সঙ্গে সব মানদণ্ডও পাল্টে যায়।
    নিয়মিত শ্রোতাদের থেকে জানতে পারলুম, প্রতি বারেই মনোময় অধিকাংশ গান চৌতাল বা তিন তালে পাখোয়াজের সঙ্গে গাইতে আগ্রহী থাকেন। এবারেও তিনি গাইতে বসে তাঁর অ্যালার্জিজনিত নাকের সমস্যা ও অন্যান্য বাতুল বিষয় নিয়ে কিছু বাক্যালাপ করলেন। তবে সাহেবের থেকে কম। তার পর তিনি বললেন যখনই তিনি রবীন্দ্রসঙ্গীতে তালবাদ্যের জাদুকর বিপ্লব মণ্ডলকে সঙ্গতকারী হিসেবে দেখেন তখনই পাখওয়াজ ছাড়া আর কিছু ভাবতে পারেননা। তিনি আটটি মতো গান গেয়েছিলেন সেদিন। তার মধ্যে পাঁচটিই পাখওয়াজের সঙ্গে। ভগ্নীশ্রী জানালেন অধিকাংশ গানই ইতোপূর্বে এই মঞ্চে বিভিন্ন সময়ে তিনি গেয়ে গেছেন। পরিচিত, রেকর্ড করা গানের বৃত্তের বাইরে বেরিয়ে নতুন গান আবিষ্কার করার ঝুঁকি এ প্রজন্মের খুব কম শিল্পীর মধ্যেই দেখেছি। এমন নয় যে এই প্রবণতা আগে ছিলোনা। কিন্তু তুলনায় অনেক কম।

    মনোময় সুকণ্ঠ, পেশাদার গায়ক। 'পেশাদার' শব্দটির সঙ্গে অনেক শ্রম ও ধৈর্য জড়িয়ে থাকে। অনেক প্রস্তুতির পরেই একজন গায়ক 'পেশাদার' শিল্পী হতে পারেন। মনোময়ও হয়েছেন। তাঁর শ্রম ও শিক্ষার প্রতি আমি সতত শ্রদ্ধাশীল।
    পেশাদারিত্ব শিল্পীকে একধরনের পরিপূর্ণতা দেয়। তিনি নিজেকে ছাড়িয়ে যেতে সঙ্কোচ করেননা। স্বোপার্জিত আত্মবিশ্বাসের জোরে তিনি ঝুঁকি নিতে পারেন। আড়াই হাজার গানের মধ্যে থেকে বহুশ্রুত, বহুচর্চিত তিন-চারশো গানের লক্ষ্মণরেখার মধ্যে বন্ধ না থেকে, পুনরাবৃত্তি না করে অল্পশ্রুত, অপ্রচলিত গান করার চ্যালেঞ্জ স্বেচ্ছায় নিতে পারেন। শুধু 'রেকর্ডে'র গানের ভরসায় না থেকে শ্রোতাকে নতুন সম্ভাবনার সন্ধান দিতে পারেন। দুর্ভাগ্য, মনোময় বা শ্রীকান্ত, কেউই এই সম্মেলনে সেই সৎ সাহস দেখাননি। তাঁরা কি স্থানীয় শ্রোতাদের গুণগ্রাহিতা বিষয়ে নিশ্চিত ছিলেন না? প্রতিবারের মতো মনোময় 'পিনাকেতে লাগে টংকার' গানটি আর সেদিন রিপিট করেননি। 'ডাকো মোরে আজি' এবং 'তোমারেই করিয়াছি' মনে পড়ছে। আরও আরও গোটা তিনেক গান গেয়েছিলেন পাখওয়াজের সঙ্গে। বিপ্লব মণ্ডলের সঙ্গত নিয়ে আর কী বলবো? পঁয়তাল্লিশ বছর ধরে আমি ওঁর গুণগ্রাহী। তবে তিনি যেভাবে ওজনদার, দ্রুত লয়ে বাজাচ্ছিলেন তাতে মনে হলো হয়তো গায়কের নির্দেশ ওরকমই ছিলো। মনোময়ের কণ্ঠস্বর উদাত্ত। খোলা আওয়াজে গান করেন। কিন্তু উচ্চারণে আধুনিক গানের মতো ক্যাজুয়াল ধরন কানে বাজে। 'ভালোবেসে সখি' বা 'অনেক কথা যাও যে বলি' তাঁর বহুশ্রুত গান। এই গান দুটির লয় নির্বাচন থেকে বাণীর মেজাজটি ফুটে ওঠে। সেখানেও মনোময় অকারণে দ্রুত হতে চেয়েছেন। জানিনা, হয়তো নিয়মিত এই সম্মেলনে গাওয়ার অভিজ্ঞতা থেকে তিনি অনুভব করেছেন শ্রোতাদের দ্রুতলয়ের গানের প্রতি দুর্বলতা বেশি। যদি কারণ তাই হয়, তবে বলবো তিনি শ্রোতাদের প্রতি সস্নেহ থাকতে চেয়ে রবীন্দ্রনাথের প্রতি সুবিচার করেননি। এই প্রসঙ্গে শ্রদ্ধেয় মোহন সিং খঙ্গুরার সতর্ক বাণীটি মনে পড়ে যাচ্ছিলো, "....রবীন্দ্রনাথের গানে লাউড কিছুর জায়গা নেই। যতই আজকাল বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র দিয়ে সেটাকে ‘ক্যাচি’ করে তোলার চেষ্টা হোক না কেন। এই গানে আনন্দ বা শোকের প্রকাশ গভীর।“
    দ্বিতীয় সন্ধ্যার শেষ শিল্পী ছিলেন শ্রীকান্ত আচার্য। তিনিও দক্ষিণীর প্রাক্তন ছাত্র এবং বহু ধরনের গান গেয়ে থাকেন। গত শতকের নব্বই দশকের মাঝামাঝি থেকে নিয়মিত আমাদের গান শোনাচ্ছেন। জনপ্রিয়তার মাপকাঠিতে তাঁর স্থান বেশ উঁচুতেই। তাঁর গান কখনও আমি মুখোমুখি শুনিনি। তাঁর জনপ্রিয়তার সঙ্গে সাযুজ্য রেখে আমার প্রত্যাশাও ছিলো বেশ খানিক। তিনি দক্ষিণীর ছাত্র হলেও তাঁর গায়নঘরানাটি সাগর সেনের। কণ্ঠ ও ওষ্ঠের পেলব, কোমল বিন্যাসে শ্রুতিসুখকর সঙ্গীত তাঁর কবচকুণ্ডল। শ্রোতা সাধারণের অকুণ্ঠ স্বীকৃতি পেয়েছেন তিনি গত প্রায় সিকি শতক। একটি প্রিয় গান 'আমার নয়ন তব নয়নের নিবিড় ছায়ায়' গাইবার আগে তিনি বললেন এই গানটি শ্রোতাদের সবার মনে সাগর সেনের গান হিসেবেই চিরমুদ্রিত হয়ে আছে। তিনি অবশ্য বালকবয়সে গানটি শুনেছিলেন স্বয়ং হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের মুখোমুখি বসে। সংযোগবশত এই গানটি আমি হেমন্ত ও সাগর, উভয়ের কাছেই 'মুখোমুখি' বসে শোনার সৌভাগ্য করেছিলুম। সেই অভিজ্ঞতা থেকে বলি গানটি এক হলেও উভয়ের নিবেদন একেবারে ভিন্ন। 'আকুল দিঠিতে শুধায় সে নীরবেরে' গাইতে গিয়ে হেমন্ত শ্রোতাকে যে বিস্তারের সন্ধান দেন, সাগরের আবেদনটি তার বিপরীতমুখী গার্হস্থ্য মাত্রার। সঞ্চারীতে 'আমার হৃদয়ে যে কথা লুকানো তার আভাষণ' গাইতে যাওয়ার নিভৃতি দুজনের একেবারে আলাদা। হেমন্তের বিস্তার বহতা নদীর মতো। সাগরের যেন নিশ্চিন্ত সরোবরের স্বাচ্ছন্দ্য। শ্রীকান্ত সাগরের পথেই শান্তিকল্যাণ খুঁজে পান।
    জানিনা কেন, শ্রীকান্ত কোনও তালবাদ্যের সঙ্গত ছাড়াই সেদিন গাইতে বসেছিলেন। শুনলুম, এই সম্মেলনে তিনি এভাবেই গেয়ে থাকেন। একথা সত্যি রবীন্দ্রসঙ্গীতের সঙ্গে তালবাদ্য আগে বাজতো না। প্রথম প্রচলন করেন পঙ্কজকুমার। কিন্তু অমিয়া দেবী বা সাহানা দেবীর কাল তো চলে গেছে। স্বরবিতান আসার পর প্রতি গানের নির্দিষ্ট তাল চিহ্নিত হয়েছে। আনুষ্ঠানিক অবসরে রবীন্দ্রসঙ্গীত তালবাদ্য ছাড়া অসম্পূর্ণ বোধ হয়। হারমোনিয়ম ছাড়া তিনি কীবোর্ড ও গিটারের সাহচর্য নিয়েছিলেন। শুরু করেছিলেন 'এমনি করেই যায় যদি দিন' গানটি দিয়ে। তাঁর গায়নভঙ্গির বৈশিষ্ট্য হলো সন্তর্পণে সুর লাগানো। অনেকটা তালাত মাহমুদের মতো। স্বরপ্রক্ষেপণে দাপটের সঙ্গে সুর লাগাতে তাঁকে দেখিনি কখনও। সচেতন যত্নের সঙ্গে বাণীতে পর্দা লাগাতে স্বচ্ছন্দ বোধ করেন। ছোটো পরিসরে, একান্ত পরিবেশে এই ভাবে সঙ্গীত পরিবেশন করলে উপস্থিত শ্রোতারা গানের সঙ্গে সহজে রিলেট করতে পারেন। কিন্তু রবীন্দ্রভবনের অতো বড়ো মঞ্চে, বিপুল শ্রোতা সাধারণের সামনে পরিবেশন করতে মনে হয় আরেকটু আনুষ্ঠানিকতা লাগে।
    গান নির্বাচনের ক্ষেত্রেও তিনি কোনও রকম 'ঝুঁকি' নেননি। যেসব গান তিনি গেয়েছিলেন তার মধ্যে ছিলো, 'আমার হৃদয় তোমার আপন হাতের দোলে' ও 'তোমার হলো শুরু' জাতীয় অতিপ্রচলিত, অতিশ্রুত রচনাগুলি। এমন নয় যে এসব গান অকুলীন বা পরিহার্য। শ্রোতা হিসেবে তাঁর স্তরের একজন শিল্পীর কাছে কিছু 'নতুন' প্রত্যাশা করা বোধ হয় অনুচিত নয়। তাঁর কণ্ঠস্বর শুনে সেদিন মনে হয়েছিলো কোনও কারণে তা দুর্বলতর হয়ে পড়েছে। তালবাদ্যের অনুশাসন মানা বোধ হয় একটু কঠিন হয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে রবীন্দ্রসঙ্গীতের একজন 'শীর্ষস্থানীয়' শিল্পী হিসেবে তিনি অন্তত আমাকে নিরাশ করেছেন।

    রবীন্দ্রসঙ্গীতে সহযোগী যন্ত্র ও তালবাদ্য সঙ্গত ভাবনার অপেক্ষা রাখে। উপযুক্ত সহযোগী শিল্পীর দাক্ষিণ্যে 'সাধারণ' গানও অসাধারণ হয়ে ওঠে। এই শিল্পটির সঙ্গে যাঁরা দীর্ঘদিন ধরে সনিষ্ঠভাবে যুক্ত তাঁদের কয়েকজনের কথা বলি।

    ‘এখন রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইছেন যাঁরা, তাঁদের অনেকেই উপযুক্ত নন – এটা মানছেন?’

    ‘অনেকেই উপযুক্ত নন– এটা অবশ্যই মানি। অনেকেই ভাল গাইছেন, শিক্ষা নিচ্ছেন, কিন্তু তা আপগ্রেড করেন না। শুধু গাইলেই হবে না, রবীন্দ্রনাথকে আরও চিনতে হবে, জানতে হবে। কেন, কী কারণে, কোন পরিস্থিতিতে তিনি গান লিখেছিলেন সেটাও অবগত হতে হবে। না হলে গানের সঙ্গে একাত্মতা আসবে কী করে?’

    (বিপ্লব মণ্ডল: একটি সাক্ষাৎকারের সময় )

    সম্ভবত সম্মেলনের দ্বিতীয় বছর থেকেই আমরা দেখি একজন সুদর্শন, দীর্ঘকায়, সস্মিত যুবক সেকালে রবীন্দ্রসঙ্গীতের বাঘ-সিংহদের সঙ্গে তবলা ও খোলে সঙ্গত করে যাচ্ছেন। তাঁর নাম বিপ্লব মণ্ডল। শুনলুম তাঁর তালিম উস্তাদ কেরামতুল্লাহ আর সন্তোষকৃষ্ণ বিশ্বাসের কাছে। শাস্ত্রীয় শৈলীতে ঐ পর্যায়ের প্রশিক্ষণ থাকা সত্ত্বেও শ্রোতাদের মুগ্ধ করেছিলো তাঁর পরিমিতি বোধ। লয়, ঠেকা, ঠোক, ধরতাই, অর্থাৎ রবীন্দ্রসঙ্গীতের সঙ্গে সঙ্গত করার জন্য জরুরি সব অঙ্গেই তাঁর নিপুণতা ছিলো ঈর্ষনীয়। টানা বাজিয়ে যাচ্ছেন সুচিত্রা থেকে ঋতু, সন্তোষ সেনগুপ্ত থেকে সাগর সেন, জর্জদা থেকে হেমন্ত, সবার সঙ্গে। মুখে সব সময় স্মিত হাসি আর সব রকম প্রস্তুতির আত্মবিশ্বাস। এক কথায় তিনি প্রথম আবির্ভাবেই শ্রোতাদের 'দিল জিত লিয়েঁ থে'।

    শুরুর দিনগুলো পেরিয়ে আসার বহু পরেও নানা অবসরে গান শুনতে গিয়ে শ্রদ্ধেয় বিপ্লব মণ্ডলের সঙ্গত শুনেছি প্রাণ ভরে। যেকোন সাধারণ গায়কের শাদামাটা গানকেও তিনি সঙ্গতের কৌশলে শ্রবণযোগ্য করে তুলতে পারেন। রবীন্দ্রসঙ্গীতে প্রত্যাশিত সংযম রেখার মধ্যে থেকেই চলিত দাদরা, কাহারবা তালবদ্ধ গানকেও তিনি নানা রকম ঠেকায় অলংকৃত করে তুলতে পারেন। খোলে সঙ্গত করার সময় তাঁর উঠান দেওয়া ঠেকা শুনলে রোমাঞ্চ জাগতো। তিনি এখনও তাই আছেন। পারদর্শিতার শীর্ষে। শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের সঙ্গে ক্রমাগত সঙ্গত করেও রবীন্দ্রসঙ্গীতে প্রযোজ্য সংযমবোধ থেকে তিনি কখনও বিচ্যুত হননা।
    এই বারের সম্মেলনেও হননি। ব্যতিক্রম সাহেব চট্টোপাধ্যায়ের 'একলা চলো রে'। তাঁর সঙ্গে পাখওয়াজ বাদনে শ্রীমণ্ডলের 'উৎসাহ' এই অধমের ধারণায় আতিশয্য মনে হয়েছে। জানিনা, প্ররোচনাটি শিল্পীদের দিক দিয়ে ছিলো না তাঁর দিক দিয়ে। তবে এতো দীর্ঘদিন ধরে তাঁর গুণমুগ্ধ একজন শ্রোতা হিসেবে তাঁর কাছে এ বিষয়ে বিনম্র নিবেদন থাকলো। এই প্রতিবেদনের শুরুতে তাঁর যে মন্তব্য দিয়ে আমি আলোচনার সূত্রপাত করেছি, সেটি শুধু সাধারণ শ্রোতাদের জন্যই নয়, সমস্ত রবীন্দ্রসঙ্গীত শিক্ষার্থীদের কাছে 'বেদবাক্য' হিসেবে স্বীকৃত হওয়া উচিত। তাঁর জ্ঞান, অভিজ্ঞতা, বাদনকৌশল আমাদের কাছে বাতিঘর। যতোদিন পারবো, তাঁর বাদন শুনে যাওয়ার আকাঙ্খা কমবে না। সেই অধিকারেই এই অভিমত জানানোর জানানোর ধৃষ্টতা করলুম।
    কীবোর্ড শিল্পী সুব্রত মুখোপাধ্যায়, যিনি 'বাবুদা' নামেই খ্যাত, তাঁর বাজনা শুনছি অন্তত দুই দশক। তাঁকে নানা রকম বাংলা গানের সঙ্গে সঙ্গত করতে শুনেছি। কিন্তু রবীন্দ্রসঙ্গীতের সঙ্গে তাঁর যন্ত্রবাদন একক্থায় নিখুঁত। পরিমিত, সংযত ও সুরেলা। হাজার প্ররোচনাতেও তিনি লক্ষচ্যুত হননা। অনুল্লেখ্য গানকেও তিনি নিজস্ব পারঙ্গমতায় শ্রুতিসুখ এনে দিতে পারেন। যদিও রবীন্দ্রসঙ্গীতের সঙ্গে কীবোর্ডের সাহচর্য বাঁশি ও বেহালার মতো পুরোনো সংযোজন নয়। ভি বালসারা থেকে শুরু করে যেসব শিল্পীর কুশল শৈলী আজ এই যন্ত্রটিকে রবীন্দ্রসঙ্গীতের ক্ষেত্রেও আবশ্যিক সঙ্গত করে তুলেছে, সুব্রত মুখোপাধ্যায় তাঁদের মধ্যে সামনের সারিতে থাকেন। তাঁর যোগদান শ্রোতাদের জন্য একটি বড়ো প্রাপ্তি।

    এসরাজ যন্ত্রটি খুব বেশি মানুষ চর্চা করেন না। জামশেদপুরও ব্যতিক্রম ছিলোনা। আমাদের সময়ে দেখেছি মাত্র কয়েকজনই যন্ত্রটিতে পারঙ্গম ছিলেন। এ শহরে রবীন্দ্রসঙ্গীতের সঙ্গে এসরাজে সঙ্গত করতেন কিছু গুণী মানুষ। । আমাদের কালে কলকাতায় যাঁকে প্রায় সব অনুষ্ঠানে দেখতুম, তিনি ছিলেন সুকেশ জানা। তাঁর পরে গত দু'দশক ধরে আমরা অঞ্জন বসুর এসরাজ শুনি নানা অনুষ্ঠানে। কবি যখন গানে সুরের কাঠামো তৈরি করেছেন, তখন তাঁর কানে এসরাজের সুরের গুঞ্জনই বাজতো। শ্রুতির ব্যাপারটি তো ছিলো'ই। তবে রবীন্দ্রসঙ্গীতে মিড়ের ব্যবহার এসরাজের সঙ্গে মিলিয়েই প্রয়োগ করা হতো। রবীন্দ্রসঙ্গীত ও এসরাজ পরস্পর অচ্ছেদ্য বন্ধনে বাঁধা। শুধু মাত্র অ্যাকাডেমিক নয়, ব্যবহারিক কারণেও যন্ত্রটির সহযোগিতা এই সঙ্গীতধারাটির জন্য বিশেষ প্রয়োজন। উপযুক্ত শিল্পী সুলভ না থাকায়, ইচ্ছে থাকলেও একালে রবীন্দ্রসঙ্গীতের সঙ্গে এসরাজের ব্যবহার যথেষ্ট দেখা যায়না। অঞ্জন বসু আমাদের জন্য এই ফাঁকটি ভরিয়ে দেন। রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্মেলনে তাঁর সুশিক্ষিত ছড়ের টানে উদগত সুরেলা সঙ্গত সমস্ত শিল্পীর পরিবেশনাকে ঋদ্ধ করেছে।

    রবীন্দ্রসঙ্গীতের অধুনা হাল-হকিকত নিয়ে যেকোনও আলোচনা শুধু আমার নয়, অযুত বাঙালির কাছে প্রাণবায়ুর মতো জরুরি এক অবলম্বন। তার শুদ্ধতা ও সমৃদ্ধি আমাদের জন্য অক্সিজেন প্রতিম। আমাদের পিতৃপুরুষদের থেকে যে উত্তরাধিকার আমাদের নসিব হয়েছে, প্রার্থনা করি আমাদের উত্তর প্রজন্মেও তার গরিমা অক্ষুন্ন থাকুক।
    আমাদের প্রজন্মের শ্রোতাদের মধ্যে একটি প্রকট উদ্বেগ চোখে পড়ে। নতুন প্রজন্মের শ্রোতাদের কাছে রবীন্দ্রসঙ্গীত কি প্রাসঙ্গিকতা হারাচ্ছে? আমি ব্যক্তিগতভাবে তা বিশ্বাস করিনা। নবীনরা নিজেদের মতো করে চিনে নেবেন এই শিল্পকে। এই তো কদিন আগে রাত বারোটা নাগাদ আমার কনিষ্ঠ কন্যার ফোন। এই অবরুদ্ধ সময়ে, প্রায় বিশ ঘন্টা ধরে এক নাগাড়ে বৃত্তিগত কাজে ছিন্নভিন্ন হয়ে তার ইচ্ছে হয়েছে একটু গান না গাইলে রাতে আর ঘুমোতে পারবে না। তার ইচ্ছে হচ্ছে একটুক্ষণ 'বিপুল তরঙ্গ রে' গাইবে। আমাকে বলে, সুর মেনেই গাইছি, কিন্তু হচ্ছে না। তুমি একটু গেয়ে শোনাও। বলি, এতো ক্লান্ত দেহে এই গানটা কি না গাইলেই নয়। বড্ডো কঠিন গান যে। না, এটাই গাইবো। ফোনে একটু বুঝিয়ে দিই। আধ ঘন্টা পরে আমাকে রেকর্ড পাঠিয়ে বলে, ঘুমোতে যাচ্ছি। কাল কথা হবে। ব্যতিক্রম নয়। আমি এইসব নবীন প্রজন্মের প্রতিনিধিদের স্পর্শ নিয়মিত পেয়ে থাকি। রবীন্দ্রসঙ্গীতের উত্তরাধিকার যাদের কাছে গরিমার অন্তর্লীন স্রোত।

    গোধূলি গগন মেঘে ঢাকা থাকলেও নব পত্রালিকারা সবুজ ছড়িয়ে যাবে। যাবেই। এটাই গুরুর আশীর্বাদ। এটাই অন্বিষ্ট আমাদের।

  • বিভাগ : আলোচনা | ০৯ মে ২০২০ | ৯৯১ বার পঠিত | | জমিয়ে রাখুন পুনঃসম্প্রচার
আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • Prativa Sarker | ১০ মে ২০২০ ১৩:০৩93168
  • এতো দীর্ঘ লেখাতেও কোথাও মনোযোগ বিচ্যুত হয় না। চমৎকার লাগল।

    হারমোনিয়াম নিয়ে রবীন্দ্রনাথের গান ও শুধু এস্রাজে ঐ গান, দুটিই শোনবার অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, শেষেরটির কোনো তুলনা হয়না। যে শিল্পী এস্রাজে গাইতে পারেন, আর যিনি এস্রাজ বাজাতে পারে,, দুইয়ের বিরলতাই বোধহয় এক্ষেত্রে প্রতিবন্ধক। 

    আমি শুধু তীরে বসে ঢেলা কুড়িয়েছি, এখন তাও বন্ধ, তবু লেখক যখন বলেন রবীন্দ্রসঙ্গীত গাওয়া সহজ নয়, এমনকী বড় বড় উস্তাদদের জন্যও, তখন ঠিক বুঝতে পারি তিনি ঠিক কী বললেন। শুধু গায়ক নয়, রবীন্দ্রসৃষ্ট তাল নিয়ে বাদকদের অস্বস্তিও দেখবার মতো। সহজ কথা যায় না বলা সহজে, প্রাণের গান প্রাণময় করে গাওয়াও খুব কঠিন। 

    যতোদূর মনে পড়ছে লেখাটি আগে পড়েছি। তবে হয়তো এতো বিস্তারিত নয়। 

    লেখক কি লাইজা আহমদ লিজাকে শুনেছেন ?  এই গায়িকার ওপর লেখার জন্য সাগ্রহ প্রতীক্ষা রইল। 

  • b | 162.158.167.149 | ১০ মে ২০২০ ১৫:৪১93169
  • খুব ভালো লাগলো। একেবারেই ক্লান্ত করে না। আলাদা করে সঙ্গতকারদের কথা লিখেছেন। ধন্যবাদ।
  • সুকি | 162.158.167.19 | ১০ মে ২০২০ ১৮:২৫93170
  • এর কিছু কিছু অংশ কি আগে কোথাও পড়েছিলাম? কেমন যেন তাই মনে হচ্ছে - তবে আরো পরিপূর্ণ পড়তে পেরে খুব ভালো লাগলো। 

  • শিবাংশু | ১০ মে ২০২০ ২২:২২93171
  • @প্রতিভা, সুকি,
    হ্যাঁ, আমার কিছু পোস্টে এই প্রসঙ্গগুলি এসেছিলো কয়েকমাস আগে। সেগুলি ছিলো জামশেদপুরের বন্ধুবান্ধবদের অনুরোধে করা সেখানের রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্মেলনের তাৎক্ষণিক মূল্যায়ণ। বিশ্লেষণের ব্যাপারে খামতি ছিলো। সেটাই করার চেষ্টা করলুম।

    আমরা সবাই নুড়ি কুড়োনোর দলে। বিকল্প মাত্র দুটি। হয় সাগরের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলা। এ জীবনে কিছুই হলো না ধরনে। নয় যথাসাধ্য পা ভিজিয়ে তটরেখা ধরে হেঁটে যাওয়া। যতোটুকু লাভ হয়।

    রবীন্দ্রসঙ্গীত নিয়ে আমার বড়ো লেখাটি গ্রন্থিত হবার সময় লাইজা আহমদ লিসাকে নিয়ে কিছু সংযোজন থাকবে।

    @ b,
    ধন্যবাদ। এই লেখাটির প্রথমে পর্বভাগ অনুযায়ী প্রকাশিত হবার পরিকল্পনা ছিলো। কিন্তু সম্পাদকরা স্থির করলেন সম্পূর্ণ লেখাটি একসঙ্গেই থাক।
  • বাহ | 162.158.165.67 | ১৩ মে ২০২০ ০৮:৫১93261
  • বাহ, ভাল লাগল।

    এইসব শিল্পীদের এই গানগুলির লিনক ও সংগে সংগে দেওয়া থাকলে পড়ার সংগেই মিলিয়ে নিয়ে পড়তে আরো ভাল লাগত। খুঁজে অবশ্য নেওয়াই যায়, কিন্তু তার জন্য পেজের লেখা থেকে বারবার বেরতে হবে। লেখার মধ্যেই এমবেড থাকলে আরো ভাল হত।
  • b | 162.158.50.241 | ১৩ মে ২০২০ ০৮:৫৫93264
  • কিন্তু এটা তো একটা অনুষ্ঠানের রিভিউ। সেখানে লেখক লিংক দিতে যাবেন কেন?
    লেখকের অন্য লেখাও আছে, "জোড়াসাঁকো জংশন আর জেন এক্স রকেটপ্যাড" সেখানে সব পাবেন।
  • পাঠক এবং শ্রোতা | 172.68.146.133 | ১৩ মে ২০২০ ০৯:১২93265
  • সেতো অনুষ্ঠানের রিভিউ বটেই। কিন্তু শিল্পীদের গলায় এই গানগুলির নমুন্য হিসেবে লিনকের কথা বলেছিলাম।
    অন্য লেখাটির লিনক পাওয়া যাবে? ধন্যবাদ।
  • বিপ্লব রহমান | ১৩ মে ২০২০ ০৯:৫৮93267
  • অপূর্ব  মায়াবী লেখা। তাবৎ গুণীগণ যেন গান নিয়ে চোখের সামনে দৃশ্যমান।

    শ্রীজাত বরাবরই খুব প্রিয়। তার গান ও গায়কীর কথা বেশী ভাল লেগেছে।  এপারে অদিতি মহসিন শ্রেষ্ঠ রবীন্দ্রনাথ সংগীত শিল্পীদের একজন। তিনিও এই লেখায় আসন পেতে যেন সন্মানিত। 

    বেংগল ক্লাব অমর হোক। আরও লিখুন। 

     

               

  • b | 162.158.50.247 | ১৩ মে ২০২০ ১১:২৮93271
  • এই নিন, একটা পর্ব।
    https://www.guruchandali.com/comment.php?topic=13460
    উপরে গুরুসন্ধানে গিয়ে "জোড়াসাঁকো জংশন" (উর্র্ধ্রিতি চিহ্ন ভুলবেন না) বলে সার্চ করে অন্য পর্বগুলিও পাবেন।
  • b | 162.158.50.247 | ১৩ মে ২০২০ ১১:২৯93272
  • *উদ্ধৃতি"
  • i | 108.162.249.63 | ১৫ মে ২০২০ ১১:০৪93344
  • শিবাংশুদার জোড়াসাঁকো জংশন পর্ব ১৪ তে আরো একটি পর্ব আসবে এমত আভাস ছিল - অনুমান করি, এই লেখাটি হয়ত সেই পর্বর সূচনা।
    এ'লেখাটি মূলত একটি অনুষ্ঠানের রিভিউ , তাই আলোচনায় পাঠকের অংশগ্রহণের সুযোগ কম এখানে। মানে আমার ঝগড়া করার সুযোগ বিশেষ নেই। শুধু দু একটি কথা-

    সমাপতন বলা যায় - এ এলেখা পড়ার ঠিক আগেই শ্রেয়া গুহঠাকুরতার লাইভ অনুষ্ঠান শুনছিলাম। সেদিন জামশেদপুরে শিল্পী জাগে নাথ জোছনারাতে গেয়েছিলেন কী না জানি না, শিবাংশুদাকে অনুরোধ করব শ্রেয়ার গলায় এই গানটি শুনতে ( যদি ইতিমধ্যেই না শুনে থাকেন)। সুবিনয় রায় কে মনে রেখে বলছি, বেহাগে নিবদ্ধ গানটি যতবার শুনেছি শিল্পীর গলায়- মুগ্ধ হয়েছি। রেশ থেকে গেছে বহুক্ষণ।

    জোড়াসাঁকো জংশনের ১৪ নম্বরে বাদ্যযন্ত্রের সঙ্গতের কথাও হয়েছিল। এইলেখায় সে প্রসঙ্গ এসেছে- ভালো লাগল। দূর্বাদল বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'অ্যারেঞ্জমেন্ট'ের পূর্ববর্তী যুগে সদনমঞ্চের সঙ্গতকারীদের নাম কন্ঠস্থ ছিল- এখন ভাবতে গিয়ে সবাইকে মনে পড়ল না-
    বিপ্লব মন্ডলের কথা লিখলেন- ভালো লাগল- তার আগে সুচিত্রা মিত্রর সঙ্গে যিনি বাজাতেন- রামদাস বন্দ্যোপাধ্যায়?

    আর এস্রাজ। 'কিছুই কিছুই নেই আমাদের আজ / আমরা কি বাজাবো না জলপাইকাঠের এসরাজ ?' ...
    হ্যাঁ সুকেশ জানা, অঞ্জন বসুকে মনে পড়ে গেল। সম্ভবত বুদ্ধদেব দাস ও বাজাতেন।
    সকলেই জানেন অশেষ বন্দ্যোপাধ্যায়ের এস্রাজ বাদনের কথা- রবীন্দ্রসঙ্গীতের সঙ্গতব্যতীত , ভারতীয় রাগসঙ্গীতে এস্রাজকে স্বয়ংসম্পূর্ণ বাদ্যযন্ত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা দেওয়ার ব্যাপারে অশেষ বন্দ্যোপাধ্যায়ের অবদান রয়েছে। শ্রী বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাদন সেভাবে শোনার সুযোগ হয় নি; কৈশোরে শ্রী রণধীর রায়ের রেকর্ড শুনে এস্রাজকে ভালোবেসে ফেলি। অসামান্য বাজাতেন।
    এখনকার তরুণ সঙ্গতকারীদের মধ্যে শুভায়ু সেন মজুমদারের নাম দেখি।
    কোনোদিন এস্রাজ নিয়ে লিখবেন আলাদা করে- এই অনুরোধ রইল।
  • শিবাংশু | ১৫ মে ২০২০ ১৩:৪১93348
  • @ i,
    দেখো, 'ঝগড়া'র কথায় বৈষ্ণব পদাবলীর কথা মনে পড়ে গেলো। কুপিতা রাধা 'ক' শুনলেই কলহান্তরিতা বোধ করেন। আবার পর মুহূর্তেই 'ক' মানেই কৃষ্ণের ছবি। রবীন্দ্রসঙ্গীত নিয়ে 'ঝগড়া'ও শেষ পর্যন্ত ইতিবাচী আলোচনা হয়ে ওঠে।

    'জাগে নাথ', আমি রমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় গীত ধরনটির সঙ্গে অধিক আশ্বস্ত থাকি। বিষ্ণুপুরের এই গুরু বিশ্বভারতীর আদি বটবৃক্ষদের একজন। তাঁকে অনুসরণ করেছেন মোহনদা। এই গানটির অনন্ত বিস্তার তাঁদের রূপায়ণে খুঁজে পাই। সুবিনয় রায় এক কথায় 'নিখুঁত'। তিনি আমার প্রিয়তম শিল্পী। তবু। শ্রেয়ার গান তো আমি সযত্নে শুনি। প্রিয় হয়ে ওঠার বহু লক্ষণ আছে তাঁর গানে। আমি তিনজনের গানেরই লিংক রাখছি এখানে।

    রামদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, মানুষটি এবং তাঁর বাজানো মনে আছে আমার। প্রবীণ, অতি সজ্জন, সংযত শিল্পী ছিলেন তিনি। অশেষ বন্দ্যোপাধ্যায়ের দুই বড়ো ভাই, পরেশ চন্দ্র এবং যোগেশ চন্দ্র (বটুবাবু), জামশেদপুরের প্রবীণ সঙ্গীতগুরু ছিলেন। আমাদের শহরে এসরাজের গুরু ছিলেন বটুবাবু। আমার মা তাঁর আদি ছাত্রীদের একজন ছিলেন। ভাইদের সূত্রে অশেষ চন্দ্রের একটি 'জামশেদপুর কানেকশন' ছিলো। রণধীর রায়ের নাম শুনলেই মনে হয় একটি দৈবী অপচয়। নিরুপায়, নিরর্থক।





  • i | 162.158.179.75 | ১৫ মে ২০২০ ১৭:৩২93358
  • শিবাংশুদা,
    শ্রেয়া গুহঠাকুরতার এই অ্যালবামটি বেশ পুরোনো। ইউটিউবের তারিখ ২০১৪ দেখালেও আমার ধারণা এটি তার অনেক আগের- মূল সিডিটি আমার কাছে আছে কিন্তু খুঁজে পাচ্ছি না এই মুহূর্তে। যেটা বলার , এই অ্যালবামের জাগে নাথ সেরকম কিছু মনে হয় নি, পরবর্তীকালে সামনাসামনি দুবার শুনে সত্যি ভালো লেগেছিল। আগের পোস্টে আপনাকে এই গানের কথা লেখার সময়, এই কারণেই অ্যালবামের লিংকটি দিই নি।
    আপনি শ্রী রমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের গীত ধরণের সঙ্গে অধিক আশ্বস্ত লিখেছেন- এই নিয়ে তো তর্ক চলে না। তবু আমার কথা বলি-
    রমেশচন্দ্র এবং পরবর্তীতে মোহন সিংহ এর গলায় এই গানে ধ্রুপদের গাম্ভীর্য , স্থৈর্য অটুট, অতীব সুগীত তবু সুবিনয় আমাকে অধিকতর স্পর্শ করেন - জাগো হে অন্তর জাগো র যে আর্তি সে তো নিজেই নিজেকে বলা - এই ব্যাপারটা সুবিনয়ে পাই আমি, মোহন সিংহ শুনলে মনে হয় যেন একটা আদেশ আসছে বাইরে থেকে , নিজের ভিতর থেকে নয়- মন সরে আসে গান থেকে -
    শ্রেয়া গুহঠাকুরতার গলায় যে দুবার এই গান শুনে ভালো লেগেছে- সুবিনয়ের আর্তি তাতে ছিল না- সেই মুগ্ধতা আবার অন্যরকম- একটা আস্ত জোছনারাত পেয়ে যেতাম যেন- সবাই বনে গেছে সেরকম জ্যোৎস্নারাত নয় এ- অনেকটা যেন বিমল করের খড়কুটোর সেই জ্যোৎস্না রাত -' টাঙাটা একটা ছোটো পল্লী ছাড়িয়ে ধূ ধূ ফাঁকায় পড়ল। চারপাশে উঁচু নীচু মাঠ, দু চারটি গাছ দাঁড়িয়ে আছে, আর্দ্র জ্যোৎস্নায় চরাচর যেন আচ্ছন্ন হয়ে আছে। ঘোড়ার গলার ঘন্টাটি ঝুমঝুম করে বেজে যাচ্ছে, কদমের শব্দ, চাকার শব্দ মিলে মিশে একটি অদ্ভূত ধ্বনি বিস্তার করেছে, কোচোয়ান তার গানটি গেয়ে যাচ্ছিল আপন মনে ' এই সময় ভ্রমর আর অমল একসঙ্গে গান গায়- এই লভিনু সঙ্গ তব। গানটি যখন শেষ হয়, ' কোচোয়ান আর গান গাইছিল না। ঘোড়ার কদম ফেলার তালে তালে তার গলার ঘন্টা ঝুমঝুম করে বেজে যাচ্ছিল। জ্যোৎস্নার কণাগুলি মাঠ ও বৃক্ষচয় থেকে তাদের চক্ষু তুলে যেন ঐ আনন্দিত তৃপ্ত যুবক যুবতীকে দেখছিল।'

    এই আর কি-
    পরে আরো কথা হবে।
  • ঝর্না বিশ্বাস | ১৫ মে ২০২০ ২৩:১৩93367
  • অসম্ভব ভালোলাগা শিবাংশুদা। গান নিয়ে আপনার আগেও লেখা পড়েছি। এটিও ভীষণ ভালোলাগল। সহজ, সপাট...ও সর্বোপরি সমৃদ্ধ হলাম। ভালো থাকবেন। 

  • শিবাংশু | ১৬ মে ২০২০ ১৬:৪৯93397
  • @ i ,
    যাক, 'ঝগড়া' করতে গিয়ে এসে যায় ভিন্টেজ ইন্দ্রাণী !! এটাই লাভ. .. :-)

    উত্তম বিশ্লেষণ। একেবারে একমত। তবে তুমি যেভাবে ভাবছো, আমি ঠিক আছি তার বিপরীত মেরুতে। তোমার কাছে এটি অন্তরের আর্তি, আমার কাছে বাহিরের আহ্বান। আঁধার রাতে একজন একলা, মুগ্ধপ্রাণ পাগল জ্যোৎস্নার প্লাবন দেখে 'তাঁহার' কথা স্মরণ করছে। যাঁর সঙ্গে 'জাগে বসুন্ধরা, অম্বর জাগে রে, জাগে রে সুন্দর সাথে'। আমি নিজে সেই 'নাথ' নই। শুধু তাঁর সঙ্গে শামিল হতে চাই। চরাচরের সঙ্গে এক হয়ে যেতে চাই। ভিতর থেকে বাইরে বেরিয়ে এসে। তুমি যেমন ভেবেছো। আমার অনুভবটি ধরা পড়ছে ধ্রুপদের দিগন্ত ছোঁয়া পুকারের মধ্যে। ঠুমরির অন্তস্তলে লুকিয়ে থাকা আকুতি হয়ে নয়।
    দিলীপ রায় একে বলেছেন 'কমলহিরের দ্যুতি'। যে যেদিক দিয়ে দেখে।

    আরেকটি কথা ঠিকই, শ্রেয়া এখন অনেক পরিণত হয়েছেন। দক্ষিণীর 'মুদ্রাদোষ', যেটা এই অ্যালবামটিতে বেশ কানে বাজে, তার থেকে অনেকটাই মুক্ত হয়েছেন এখন। সুযোগ পেলে শুনবো।

    @ ঝর্না,
    অনেক ধন্যবাদ। এই গান আমাদের বেঁধে বেঁধে রাখে ... :-)
আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত