• বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়।
    বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে।
  • কোভিড-১৯ পরিস্থিতিতে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ভূমিকা - জনস্বাস্থ্য অভিযানের পক্ষ থেকে কিছু পর্যবেক্ষণ

    অনুবাদঃ গুরুচণ্ডা৯
    আলোচনা : বিবিধ | ৩০ এপ্রিল ২০২০ | ৮০৫ বার পঠিত

  • করোনা মোকাবিলার জন্য ঘোষিত লকডাউন এখন চতুর্থ সপ্তাহ পার করে পাঁচ নম্বর সপ্তাহে ঢোকার মুখে দাঁড়িয়ে আছে। একথা বলাবাহুল্য যে লকডাউনের অভিজ্ঞতা কারুর পক্ষেই খুব একটা সুখপ্রদ নয়। সমগ্র জনজীবনের উপরে এই অতিমারী ভয়ঙ্কর প্রভাব ফেলেছে আর একথা বলাই যায় ভবিষ্যতের ছবিটাও খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয়। এই প্রেক্ষিতে দাঁড়িয়ে জনস্বাস্থ্য অভিযানের পক্ষ থেকে এই রিপোর্টে দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজ্য, পশ্চিমবঙ্গের অতিমারী মোকাবিলার হালহকিকত আলোচিত হয়েছে । দেশের অন্য বড়ো রাজ্যগুলির তুলনায় এই রাজ্যের অস্বাভাবিক কম আক্রান্তের সংখ্যা এবং এই রাজ্যের স্বাস্থ্যদপ্তরের "মেডিক্যাল অডিট সিস্টেম" এর ঠিক করে দেওয়া করোনাসংক্রান্ত মৃত্যুহার একইসাথে মনোযোগ আর আলোচনা-পর্যালোচনার দাবি রাখে। করোনা পরিস্থিতির মোকাবিলায় রাজ্যের ব্যবস্থাপনা, কম টেস্টের সংখ্যা, এইরকম মাপের একটি বিপর্যয় সামলানোর মতো রাজ্যের স্বাস্থ্য-ব্যবস্থার ক্ষমতা বা অপ্রতুলতা আর সেইখান থেকে ভবিষ্যতের জন্য কিছু নির্দেশিকা - এইসবকটি বিষয়ই আলোচিত হয়েছে এই রিপোর্টে । এই লকডাউন এমনিতেই একটা সঙ্কটের চেহারা নিয়েছে আর সেইসঙ্গে সরকার যদি সংক্রমিত রোগী আর তাদের সংস্পর্শে আসা লোকজনকে চিহ্নিত করতে বারবার ব্যর্থ হয়, যদি এই লোকজনদের যথেষ্টসংখ্যায় টেস্ট আর আইসোলেশনের আওতায় না আনতে পারে তাহলে এই লকডাউন শুধু লক্ষ্যচূত হবে তাই নয় এই অতিমারী তখন মহামারীর আকার নেবে।

    কোভিড-১৯ সংক্রান্ত মৃতের সংখ্যা কম দেখানো:

    পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পক্ষ থেকে কোভিড-১৯ এর কারণে মৃত্যুকে নির্ধারণ করার জন্য একটি কমিটি গঠন করেছেন। এইরকম অভিযোগও উঠেছে, করোনা আক্রান্ত রুগী যাঁরা মারা যাচ্ছেন, তাদের যদি অন্য কোনো রোগ থেকে থাকে, তাদের মৃত্যু এই কমিটির ঠিক করে দেওয়া করোনাজনিত কারণে মৃতের তালিকায় স্থান পাচ্ছে না। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে করোনাজনিত মৃতের সংখ্যা কমিয়ে দেখানোই এই কমিটি তৈরী করার পিছনের মূল উদ্দেশ্য। বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়ায় বেশ কিছু জুনিয়র ডাক্তার ইতিমধ্যেই অভিযোগ করেছেন উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষ কীভাবে তাঁদের মৃত্যুর শংসাপত্র লিখতে বাধ্য করেছেন। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ লুকোনোর জন্য মৃতের শংসাপত্র দিতে দেরি করা করার অভিযোগও উঠে এসেছে বেশ কিছু জায়গায়।

    এই সবকটি উদাহরণ মেলালেই স্বাস্থ্যকর্মীদের অধিকার খর্ব করা ও সর্বোপরি জনসাধারণের কাছে এই অতিমারীর সংক্ৰান্ত সঠিক তথ্যগোপনের এক বিপজনক প্রবণতা চোখে পড়ছে। কিন্তু তথ্যগোপনের এই চেষ্টা আদতে করোনা রোগ মোকাবিলার সার্বিক ক্ষমতাকেই খাটো করছে আর এই রাজ্যের পরিস্থিতিকে আরো দুর্বল করে তুলছে।

    আক্রান্ত রুগীর সংখ্যায় গরমিল:

    যে গরমিল সবচেয়ে আগে চোখে পড়ছে তা প্রতিদিন কেন্দ্র সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রক আর রাজ্য সরকারের স্বাস্থ্য দপ্তর কর্তৃক প্রকাশিত আক্রান্ত রুগীর সংখ্যার পার্থক্য দেখলেই পরিষ্কার করে বোঝা যাবে। রাজ্যের স্বাস্থ্য বুলেটিন প্রতিদিন 'একটিভ' বা বর্তমানে কজন ভর্তি আছেন সেই সংখ্যা প্রকাশ করে, যেখানে কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য দপ্তর প্রকাশ করে মোট আক্রান্তের সংখ্যা। সেই সংখ্যার পার্থক্য যদি আমরা মেনেও নিই, তাহলেও মোট মৃত ও সুস্থ হয়ে ওঠা মানুষের সংখ্যা ও 'একটিভ’ রোগীর সংখ্যার যোগফল কেন্দ্রীয় দপ্তরের মোট কেস সংখ্যার ধারেকাছে পৌঁছতে পারে না। সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার সাথে যুক্ত বহু চিকিৎসক ইতিমধ্যেই আশংকা প্রকাশ করেছেন রাজ্য স্বাস্থ্যদপ্তরের বুলেটিনে প্রকাশিত আক্রান্তের সংখ্যা প্রকৃত রুগীর সংখ্যার থেকে অনেকটাই কম দেখানো হচ্ছে।

    রাজ্যে কম সংখ্যায় করোনা টেস্ট:

    এখনও এই রাজ্যে প্রতিদিন ৪৫০ কাছাকাছি টেস্ট হচ্ছে কিন্তু দেশের অন্যান্য রাজ্যেই এই সংখ্যাটা ৫০০ থেকে ৬০০র মধ্যে ঘোরাফেরা করছে।

    পশ্চিমবঙ্গ প্রতি দশলক্ষ প্রতি ২৫জনের টেস্ট করছে কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের সমান জনসংখ্যার অন্যান্য রাজ্যে যেমন মধ্যপ্রদেশ, কর্ণাটক, তামিলনাড়ু , গুজরাট, রাজস্থানে এই সংখ্যাটা যথাক্রমে ১২৬, ১৩৯, ১৪১, ১৭০, ৩৬৫। গোটা দেশের ক্ষেত্রে এই গড় সংখ্যা ১০৫এর কাছাকাছি। কলকাতা বাদে এরাজ্যে অন্যান্য মেডিক্যাল কলেজে টেস্ট এখনও অবধি হওয়ার খবর নেই।

    নিচের সারণীতে পশ্চিমবঙ্গে দিনপ্রতি করোনা টেস্টের সংখ্যাটা দেখলেই ছবিটা সম্পূর্ণ হয়ে যাবে।



    • কিন্তু এই কম সংখ্যার টেস্ট কম টেস্টকিটের সঙ্গে সম্পর্কিত নয় নাইসেড কলকাতা দপ্তর টেস্টিংয়ের মূল দ্বায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা আর গোটা পূর্বভারটের টেস্টিং কিট এইখান থেকেই সরবরাহ করা হয়। খবরে প্রকাশ, এই রিপোর্টে লেখার সময় অবধি নাইসেড ৪২৫০০ খানা টেস্টিং কিট পেয়েছে তাদের সদর দপ্তর থেকে। ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ ভাইরোলজি রাজ্য সরকারকে দশহাজার টেস্টিং কিট পাঠিয়েছে গত ২৮শে মার্চ। নাইসেড আরও ৪৫০০০ টেস্টিং কিট রাজ্য সরকারকে পাঠিয়েছে।

    • টেস্টিং পদ্ধতি নিয়ে ধোঁয়াশা: সরকারি নির্দেশ অনুযায়ী কোভিড-১৯ সন্দেহ বা উপসর্গ সহ সমস্ত রোগীকে পরীক্ষার ফল না আসা পর্যন্ত আইসোলেশন ওয়ার্ডে রাখতে হবে। সেই সরকারি নির্দেশনামায় এটা লেখা ছিল সমস্ত করোনা পজিটিভ রোগীকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব নির্দিষ্ট কোভিড-১৯ হাসপাতালে স্থানান্তর করতে হবে। কিন্তু উদাহরণ হিসেবে যদি ১৯শে এপ্রিলের সরকারি বুলেটিন দেখা হয়, সেদিন অবধি ৩২৩৩জনকে সরকারি হাসপাতালের আইসোলেশনে রাখা হয়েছে আর ১৩৫৬০ জনের 'কোয়ারেন্টাইন' করে রাখা হয়েছে। আবার একই সাথে ১৯ তারিখ অবধি মোট টেস্ট হয়েছে ৫০৪৫ জনের। কোনো ব্যক্তি বা চিকিৎসককে শুধুমাত্র উপসর্গের উপর ভিত্তি করে নমুনা পরীক্ষা করতে দেওয়ার অনুমতিও দেওয়া হয়নি।

    • করোনারোগীর সংস্পর্শে আসা লোকেদের টেস্ট: উপসর্গ থাকা রোগীদের টেস্ট করা ছাড়াও তাঁদের সংস্পর্শে যাঁরা এসেছেন বা 'সেকেন্ডারি কন্ট্যাক্টস'-দের করোনা পরীক্ষাও কিন্তু সমানভাবে করা উচিত। প্রশাসনের কাছ থেকে এইরকম পরিস্থিতিতে আরও সক্রিয়তা আর তথ্যনির্ভরতা কিন্তু সময়ের দাবী। যদিও রাজ্য ও কেন্দ্রীয় প্রশাসনের তরফ থেকে এখনও অবধি কমিউনিটি ট্রান্সমিশনের কথা স্বীকার করা হয়নি, এই রাজ্যে চিহ্নিত হটস্পটগুলিতে এন্টিবডি টেস্টিং অবিলম্বে চালু করে দেওয়া উচিত। এই রিপোর্ট লেখার সময় অবধি সেইরকম কোনো খবর এসে পৌঁছয়নি। অপ্রতুল টেস্ট ও তৎপরবর্তী কম পজিটিভ টেস্টের সংখ্যা একটা সাময়িক স্বস্তি দিতে পারছে বটে, কিন্তু এই পরিস্থিতি যে কোনো সুপ্ত আগ্নেয়গিরির আকার নেবে না, সেটাকে নিশ্চিত করার জন্যই যথেষ্ট পরিমানে টেস্ট আর সক্রিয়ভাবে মোকাবিলা করার মতো উপযুক্ত কাঠামো গড়ে তোলা আশু কর্তব্য।

    • রাজ্যসরকারের স্বাস্থ্য দপ্তর গত ১৯শে এপ্রিল যা তথ্য প্রকাশ করেছিল তাতে দেখা যায়, সেদিন অবধি রাজ্যের হাতে ১৭,৫০০টি কিট ছিল কিন্তু সেদিন অবধি হওয়া কোভিড টেস্টের সংখ্যা ৫০৪৫। সহজ পাটিগণিতের হিসেবে রাজ্য নিজের টেস্টিং ক্ষমতার মাত্র ২৮.৮৮% কাজে লাগাতে পেরেছে।

    • এনএবিএল (NABL) কর্তৃক অনুমোদিত এই রাজ্যে কমপক্ষে ৩০টি রেপিড টেস্টের জন্য উপযুক্ত পরীক্ষাকেন্দ্র রয়েছে।

    • তাসত্ত্বেও এখনও অবধি এই রাজ্যে আইসোলেশনে থাকা সবাইকেই টেস্ট করা কি হচ্ছে? যদি ধরে নেওয়া হয়,তাদের সবাইকে টেস্ট করা হচ্ছে, তাহলে অংকের নিয়মে কোয়ারান্টাইনে থাকা লোকেদের মধ্যে খুব অল্প সংখ্যক লোকদেরই টেস্ট করা হচ্ছে। এইটার মানে দাঁড়াচ্ছে উপসর্গবিহীন অথচ আক্রান্ত ব্যক্তিদের কোনো টেস্টই করা হচ্ছে না, কিন্তু কমিউনিটির মধ্যে ছড়ানোর পেছনে এই গোষ্ঠীই সবচেয়ে বড়ো ভূমিকা পালন করে।

    • সারি ( SARI ) রোগীদের পরীক্ষা: মেডিক্যাল রিসার্চ কাউন্সিল বা আইসিএমআর তাঁদের জার্নালে তীব্র শ্বাসকষ্টে ভোগা রুগীদের উপর কিছু তথ্য প্রকাশ করেছিলেন। সেই তথ্য অনুযায়ী এইরকম ৫৯১১ রোগীদের মধ্যে ১.৮% করোনা পজিটিভ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিলেন। এই রিপোর্টেই এই রাজ্যের ৫ পরীক্ষাকেন্দ্রের মধ্যে ২৫৬ তীব্র শ্বাসকষ্টে ভোগা রুগীদের মধ্যে ৩.৫%কে করোনা আক্রান্ত হিসেবে পাওয়া যায়। যদিও সরকারি নির্দেশ অনুযায়ী এই রাজ্যের তীব্র শ্বাসকষ্টে ভোগা সমস্ত রোগীরই লালারস পরীক্ষা করার কথা। তবে রাজ্যের স্বাস্থ্যদপ্তরের ওয়েবসাইটে এবিষয়ে কোনো তথ্যই চোখে পড়েনি। এই তথ্যের অনুপস্থিতিই হয়তো এরাজ্যের অসম্ভব কম টেস্টিং, অস্বাভাবিক কম আক্রান্ত ও করোনা সংক্রান্ত প্রাণহানির সংখ্যার দিকে নির্দেশ করে।

    • সেইসাথে রাজ্যের তরফে আক্রান্তর সংখ্যা ছাড়া মোট কতজনকে রোজ টেস্ট করা হচ্ছে সেসম্পর্কে কোনো তথ্য প্রকাশ করা হচ্ছেনা। বিশেষজ্ঞদের মতে একটি পজিটিভ কেসের ক্ষেত্রে একই ব্যক্তির তিন থেকে চারবার টেস্ট করা হয়ে থাকে, সেক্ষেত্রে আগেই উল্লিখিত ৫০৪৫টি টেস্টের মধ্যে কতজন আলাদা আলাদা ব্যক্তিকে টেস্ট করা হয়েছে সেই বিষয়ে কোনো তথ্যই রাজ্যের তরফ থেকে জানানো হয়নি।


    ডাক্তার ও স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপত্তা:

    এটা অনস্বীকার্য যে করোনার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ডাক্তার ও স্বাস্থকর্মীরাই কিন্তু একদম সামনের সারিতে রয়েছেন। কিন্তু তাঁদের জন্য উপযুক্ত সরঞ্জামের (PPE) অপ্রতুলতার খবর কিন্তু ইতিমধ্যেই সংবাদ মাধ্যমে চলে এসেছে। যদিও এই সরঞ্জাম সংগ্রহের দিক থেকে ঘাটতির কোনো খবর নেই, রনাঙ্গনের অভিজ্ঞতা অন্যরকম। স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য যথেষ্ট সংখ্যক পিপিই না থাকার জন্য, ওয়েস্ট বেঙ্গল ডক্টর'স ফোরামের পক্ষ থেকে আশঙ্কার খবর সংবাদমাধ্যমে ইতিমধ্যেই উঠে এসেছে। ফোরামের হিসেবমতো প্রতি রোগীপিছু দেখাশোনার জন্য ছয়জন করে স্বাস্থ্যকর্মীর প্রয়োজন হয় আর এই সঙ্কটের সময়ে কেবলমাত্র সুরক্ষা সরঞ্জামের অভাবের কারণে ছয়জন স্বাস্থ্যকর্মীর অনুপস্থিতি প্রশাসনের অকর্মণ্যতা আর অমানবিক দিক প্রকট করে তুলছে। সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার সাথে যুক্ত জুনিয়র ডাক্তাররা কলকাতা আর রাজ্যের অন্যত্র উপযুক্ত সুরক্ষাকবচের কথা বারেবারেই উল্লেখ করছেন। এই রিপোর্ট লেখার সময় অর্থাৎ ১৯.০৪.২০২০ অবধি রাজ্যের মোট স্বাস্থ্য সুরক্ষাসরঞ্জামের একটি ছবি নিচের সারণীতে উঠে এসেছে:




    উপরে উল্লিখিত সরঞ্জাম রাজ্যের ২৭টি বেসরকারি হাসপাতালসহ ৮৮টি স্বাস্থ্য পরিষেবা কেন্দ্রে দেওয়া হয়েছে।

    জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের অনুপস্থিতি: 

    সংবাদমাধ্যমে ইতিমধ্যেই প্রকাশিত, দেশের অগ্রণী জনস্বাস্থ্য বিষয়ক সংস্থা অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অফ পাবলিক হেলথের কলকাতা অফিসকে কিভাবে সামগ্রিক পরিকল্পনা থেকে দূরে সরিয়ে রাখা হয়েছে, যদিও জনস্বাস্থ্য ও মহামারীর মতো বিষয়ে তাঁদের দক্ষতা প্রশ্নাতীত, তবুও তাঁদের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতাকে এখনও অবধি একটুও ব্যবহার করা হয়নি, পরামর্শও চাওয়া হয়নি। নাইসেডের আঞ্চলিক অধিকর্তাও একই অভিযোগ করেছেন একটি সর্বভারতীয় বৈদ্যুতিন সংবাদমাধ্যমের কাছে যে তাঁদের কাছে দিনে ১৫-২০টার বেশী নমুনা সরকারের কাছ থেকে পাঠানো হচ্ছে না পরীক্ষার জন্য। এবং সবচেয়ে মজার কথা রাজ্যের করোনা চিকিৎসার মূল ভরকেন্দ্র বেলেঘাটা আইডি হাসপাতাল ও নাইসেডের আঞ্চলিক দপ্তর একই চত্বরে অবস্থিত।

    জনস্বাস্থ্যের পক্ষ থেকে সুপারিশ:


    • কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলে করোনা কেস সন্দেহে আক্রান্তের সংখ্যা একটু বাড়তে দেখলেই সেখানে প্রশাসনের পক্ষ থেকে টীম পাঠিয়ে যত বেশী সংখ্যায় সম্ভব নমুনা সংগ্ৰহ করা উচিত। যদি কোনো অঞ্চলে রোগাক্রান্তের সংখ্যা শূন্যও হয়ে থাকে সেই অঞ্চলের ফ্লু-তে আক্রান্ত রুগীদের মধ্যে অন্তত ১০ শতাংশের র‌্যাপিড টেস্ট করানো উচিত আর র‌্যাপিড টেস্টের যদি করোনাপজিটিভ ফল আসে তাঁদের তৎক্ষণাৎ আরও টেস্ট করাটা প্রাথমিক কর্তব্য। এরপরেও যদি পজিটিভ টেস্টের সংখ্যা বাড়ার লক্ষণ দেখা যায় তাহলে আর ১০ শতাংশ নয়, ফ্লুতে আক্রান্ত সমস্ত রুগীদেরই করোনা টেস্টের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। এই ব্যাপারে (ITITT) অর্থাৎ আইডেন্টিফাই , টেস্ট, আইসোলেট, ট্রিট, ট্র্যাক - এই পাঁচটি পদক্ষেপের একসাথে ব্যবহার একটা স্বীকৃত প্রচলিত পদ্ধতি।

    • এই লকডাউন করার পিছনে প্রাথমিক উদ্দেশ্য ছিল ফ্লু বা জ্বরে আক্রান্ত রোগী ও কোভিড রোগীদের সরাসরি সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের টেস্ট করা আর উপসর্গবিহীন কিন্তু কোভিড-১৯ এর বাহক ব্যক্তিদের চিহ্নিত করা।

    • একইসাথে রাজ্যের উচিত ফ্লুতে আক্রান্ত ব্যক্তিদের খুঁজে বার করা আর সম্ভব হলে যাঁরা দেশ বা রাজ্যের মধ্যে হলেও বাইরে থেকে এসেছেন তাঁদের চিহ্নিত করা। এখনও অবধি যেকটি রাজ্য করোনা মোকাবিলায় সাফল্যের মুখ দেখেছে, সেখানে এই পদ্ধতি কাজে এসেছে। ফ্লুতে আক্রান্ত ব্যক্তিকে স্বাস্থকর্মীদের দল নিকটবর্তী করোনা চিকিৎসা কেন্দ্রে তাড়াতড়ি নিয়ে যাওয়ার মধ্যেই কিন্তু সাফল্যের মূল মন্ত্র লুকিয়ে আছে।

    • একইসাথে জনসাধারণকে এই লড়াইয়ে সামিল করাটাও একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। জনসাধরনের মধ্যে থেকে করোনা আক্রান্ত সন্দেহভাজনদের খুঁজে বার করার জন্য স্বেচ্ছাসেবী ও বিভিন্ন সংগঠনদের সাহায্য নেওয়ার কথা ভাবা যেতে পারে। জনস্বাস্থ্য বিষয়ক বিজ্ঞপ্তি ও সরকারি নির্দেশিকা সম্বন্ধে জনসাধারনকে অবহিত করার ক্ষেত্রে এই সংগঠনগুলির ভূমিকা অনস্বীকার্য।

    • ইন্ডিয়ান মেডিক্যাল কাউনিসিলের নির্দেশ অনুযায়ী, করোনা চিকিৎসাকেন্দ্রে সমস্ত রোগী যাদের ইনফ্লুয়েঞ্জা ও সাথে উপসর্গ দুইই আছে, এন্টিবডি টেস্ট বাধ্যতামূলক। তাতে হটপস্ট চিহ্নিতকরণ আর রেপিড টেস্ট অতি দ্রুত শুরু করা যাবে।

    • প্রাথমিক স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপত্তা, তাঁদের জন্য উপযুক্ত প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম আর ব্যবস্থাপনার সাথে যুক্ত আধিকারিকদের জন্য সরঞ্জামের যথেষ্ট ব্যবস্থাও থাকা উচিত।

    • যেহেতু এই রাজ্য এখন দ্বিতীয় পর্যায়ের লকডাউনের শেষদিকে চলে এসেছে, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সামাজিক সংগঠনগুলির সাথে আলোচনা করে এই লকডাউন তোলার প্রস্তুতি শুরু করে দেওয়া উচিত।

    • রাজ্যের তরফ থেকে সরকারিভাবে এখনও জানানো হয়নি এইরাজ্যে ঠিক কোন কোন জায়গাগুলি হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত আর এই নিয়ে নানা মতামত বাজারে ঘুরছে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলিও এই ব্যাপারে কোনো সুনির্দিষ্ট খবর দিতে পারেনি। এই ধোয়াঁশার থেকে বার হওয়ার জন্য সরকারের তরফ থেকে এই হটস্পটগুলি নিয়ে সুনির্দিষ্ট চিন্তাভাবনা সবাইকে জানানো আশু কর্তব্য।

    • এই হটস্পটের বাসিন্দাদের করণীয় কর্তব্য নিয়েও সরকারের তরফ থেকে জানানোর কোন উদ্যোগ, তাদেরকে সচেতন করার মতো কোন পদক্ষেপ এখনও অবধি দেখা যায়নি।

    • এই অতিমারীর বিরুদ্ধে লড়াই দুএকদিন বা দু-একমাসের নয়। এটার জন্য প্রয়োজন দীর্ঘ লড়াইয়ের প্রস্তুতি। বিশেষত অবস্থা যদি আরও গভীর হয়, দীর্ঘদিনের জন্য সম্পূর্ণভাবে কেন্দ্রীভূত ব্যবস্থা এই অতিমারীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আশানুরুপ ফল নাও দিতে পারে। রাজ্যের গঠন করা টাস্ক-ফোর্স আর অন্যান্য সংস্থাগুলির ভাবা উচিত কিভাবে এই পরিচালন ব্যবস্থাপনাকে আরও বিকেন্দ্রীকরণ করা যায়, আরও বেশি করে পৌর ও স্থানীয় প্রশাসনিককেন্দ্রগুলিকে ত্রাণবন্টন ও আনুষাঙ্গিক কাজে ব্যবহার করা যায়।


    এই লকডাউন আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব দুর্ভোগ নিয়ে আসার অশনিসঙ্কেত ইতিমধ্যেই দিয়ে দিয়েছে। পরিযায়ী শ্রমিকদের দুরবস্থা তার একটা বড়ো উদাহরণ। এই অতিমারীর সঙ্কটের সময়ে সমাজের প্রান্তিক ও দরিদ্রশ্রেণীর মানুষদের সুস্থসবল থাকাটা অবশ্যপ্রয়োজনীয়। সমাজের এই বড়ো অংশের মানুষের জন্য খাদ্য ও পুষ্টির সংস্থান সরকারের একটা প্রাথমিক কর্তব্য তবে সরকারি রেশন ব্যবস্থা এই ক্ষেত্রে যথেষ্ট নাও হতে পারে, কারন এই প্রান্তিক মানুষদের অনেকের কাছেই এই রেশন সংগ্ৰহ করার মতো উপযুক্ত পরিচয়পত্র নেই। তাই গোটা রাজ্যে অপুষ্টিজনিত কোনো রোগ যেন মাথা তুলতে না পারে, সেটাকেও সরকারকেই সুনিশ্চিত করতে হবে।

    * এই প্রবন্ধ ১৯শে এপ্রিল 2020 অবধি পাওয়া সমস্ত তথ্যের ওপর নির্ভর করে লেখা হয়েছে

    তথ্যসূত্র:

    i) https://www.sundayguardianlive.com/news/bengal-sitting-coronavirus-time-bomb#.XpxxhcEedak.whatsapp

    ii) Variables for Confirmed cases for State include : active cases+discharged cases+death due to COVID 19

    iii) Health bulletins, news reports and open-source platforms

    iv) https://www.deccanherald.com/national/east-and-northeast/covid-19-west-bengal-govt-identifying-areas-for-rapidantibody-testing-822230.html

    v) https://www.indiatoday.in/india/story/central-lab-says-mamata-govt-not-sending-enough-samples-for-covid-19-testsas-bengal-reports-fewer-cases-1666467-2020-04-13

    vi) Memo no: HPH/9M-21/202079

    vii) Isolation is further defined as separation of individuals who are ill and suspected or confirmed of COVID-19.

    viii) https://www.deccanherald.com/national/east-and-northeast/covid-19-west-bengal-govt-identifying-areas-for-rapid-antibodytesting-822230.html

    ix) https://www.indiaspend.com/wp-content/uploads/2020/04/IndianJMedRes000-5151206_141832.pdf

    x) http://www.ijmr.org.in/preprintarticle.asp?id=282179

    xi) https://www.wbhealth.gov.in/uploaded_files/corona/Bulletin_West_Bengal_16.04_.2020_.pdf

    xii) https://www.indiatoday.in/india/story/west-bengal-doctors-forum-hits-out-at-govt-says-not-enough-tests-beingconducted-1667141-2020-04-15

    xiii) https://www.wbhealth.gov.in/uploaded_files/corona/For_Upload_Unit_wise_Cummulative_Logistics_Distributio

  • বিভাগ : আলোচনা | ৩০ এপ্রিল ২০২০ | ৮০৫ বার পঠিত
আরও পড়ুন
ভয় - Jeet Bhattachariya
  • আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা

  • করোনা

  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত