• টইপত্তর  অন্যান্য

    Share
  • নারী দিবস

    দ্যুতি
    অন্যান্য | ০৮ মার্চ ২০২০ | ১৯৭ বার পঠিত | জমিয়ে রাখুন
  • #নারী #মুখ #নারী #সুখ

    আমার দেখা প্রথম নারী নিশ্চয়ই আমার মা। মা বাগবাজারের মেয়ে। জন্ম আর বেড়ে ওঠার জীবনে অদ্ভুত বাঁক, মোচড় মায়ের। তখনকার নক্সাল জীবন, কিছু প্রভাব এমন পরেছিল যে মা জীবনের কিছু কথা খুব বুক বাজিয়ে বলতে চান না। আমিও তাই অল্প স্বল্প জানি। তবে এটুকু বুঝি কপালের নাম গোপাল। তাই কোনো ভুল বশত বাড়ির আর কারোর খোঁজে এসে মাকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। এক দু রাত হাজত বাস করতে হয়েছিল। কিছু ভয়ঙ্কর মুহূর্ত কেটেছিল যার জন্য মায়ের পড়া বন্ধ হয়ে উড়িষ্যাতে মাসির বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হয়। হ্যাঁ, যারা ওই সময় কি হোতো, হয়েছিল খোঁজ রাখেন তারা কিছুটা বুঝবেন। দাদুর ছ সাতটির পর কনিষ্ঠা সন্তান, দাদুর বেশ বয়স তখন তাই। এমত অবস্থায় ঝামেলা মিটলে আবার এসে স্কুলে ফেরাতেও কিছু গোল বেধেছিল। তাই অবস্থা সুবিধের না দেখে সবাই ভালো পাত্র দেখে বিয়ে দেওয়াটাই সমীচিন মনে করেন। জেল ফেরত মেয়েকে ঘরের বউ করার মতো মানসিকতা কটা বাড়ির থাকে জানি না। ওই যে কপাল আর গোপাল, আমার বাবা গোপাল ওদিকে নাকি বিয়ের কথায় বলেছিলেন, এমন কোনো মেয়ে যদি থাকে যে কোনো বিপদে পরেছে, বিয়ে হচ্ছে না, তবেই বিয়ে করার কথা ভেবে দেখতে পারেন। ভগবান দাদা এমন করেই জোট বাঁধার গল্পগুলো ছকেন। সেই সাথে মায়ের গলার গান, প্রথম দিন ঠাকুমা মায়ের গলায় 'বৃন্দাবনের কালো কোকিল রে' শুনেই ঠিক করে ফেলেছিলেন এ মেয়েই সেজ ছেলের বউ হবে। এ ঘটনা মাকে জীবনে অনেক বড় শিক্ষা দিয়েছিল বুঝি। কিছু না হয়েও জড়িয়ে পরেছিল সেই নাবালিকা মেয়েটি। আর সেই থেকে অন্যায়ের প্রতিবাদ করাটা কেমন রক্তে মিশে গেছিল। মা কোনোদিন একচুল অন্যায় দেখে থেমে থাকে না আজো। আর আমার রক্তেও যেন সেটা বইছে ভীষণ ভাবে বুঝি।

    হ্যাঁ আজ ফেসবুকে নারীবাদ আওড়াতে বসে আমার সেই বাবাকে শত শত পেন্নাম, ঠাকুমাকে কুরনিশ। আমরা বড় হয়েছি, হাওড়া বাড়িতে দেখেছি তখনো সেজ বৌমা নামে বেশ একটা গুণ গুণ ফিস ফিস হোতো। এমন কিছু বনেদী ঘর নয় আমাদের, তাই আত্মীয় মহলে এই ফিস ফিস স্বাভাবিক। সাথে একদিন এও শুনলাম আমার মামার বাড়ির দাদুর নাকি দুটো বিয়ে। আমার বড় মাসি নাকি আগের পক্ষের। এসবের মানে যারা বলতো তারাও ভালো বুঝতো না, কারণ তারা তো আমার থেকে বছর তিন চারের বড় মোটে। খুব অবাক হোতাম, সত্যি জানতে ঠাকুমাকে ধরতাম। মাকে বলার সাহস করিনি তখন। ঠাকুমার কথায় সব পরিস্কার হোতো। সহজ ব্যাপার একি বাড়িতে কেমন করে ফিস ফিস হয় বুঝতে শিখলাম। যতটা তখন বুঝতাম এখন বুঝি আরো বেশি। সেই বোঝায় জুড়েছে গভীরতা। জীবনে মা আর ঠাকুমা তাই আমার দেখা সেরা নারী। কোনো ভরং নেই। প্রচন্ড মনের জোড়। প্রচন্ড মানব দরদী, অনেক গুণে গুণী। এঁদের নির্ভেজাল ঈশ্বর ভক্তি আমার আরেক বিস্ময়। এটা আমি একটু হলেও এড়িয়ে চলি। যুগের সাথে এটুকু মানিয়ে নিয়েছি। ঠাকুমার বড় ছেলে হৃদরোগে শেষ শয্যায়। ঠাকুমা মনে মনে বলছেন, 'ব্রহ্মময়ী, বাবলুকে আমার আর কষ্ট দিও না, তুলে নাও'। এর পর বড় জ্যেঠু মারা যেতে শ্মশান যাত্রীদের নিজে জল টল দিয়েছেন শুনেছি। আর আমি অবাক হোতাম ভক্তি দেখে। 'অন্নপূর্ণা মা তুমি শ্মশানে শ্যামা ' গাইতে গাইতে চানের জল ঢালতে ঢালতে হাপুষ কাঁদতো ঠাকুমা। সেই পারিবারিক ধারাকে মা আজো বয়ে নিয়ে চলেছে।

    আরেকজনের কথায় আসি। জন্ম বরিশালে সেই অনেক আগে, সত্তর বছর হবে। বিশাল তাঁবেদারিতে বড় হচ্ছিলেন, পাঁচ বছর অব্ধি নাকি নিজে খায়নি হাতে করে। কে বলে মেয়ে ফ্যালনা। সবার কোলে আদরে মৃদু দোল খেতে খেতে বড় হতে লাগলেন দুলি, দোলাবাঈ ওরফে মৃদুলা। হঠাত রায়ট, হিন্দু মুসলিম দাঙ্গা, ততোদিনে আরো তিন মেয়ে চার ছেলেতে সংসার বোঝাই। ভিটে মাটি ছেড়ে এপার বাঙলায় আসতে হোলো। রিফুজি ক্যাম্পে আস্তানা। ভাসার নাম, ডোবার নামও জীবন। খড় কুটোর মত নিজেরা ভেসে এলেন। সেই সংগ্রাম যিনি প্রত্যক্ষ করেছেন, তাঁর কাছে মেয়ে জীবন পাপ মনে হোতেই পারে। এক একটা জীবন বাবা মায়ের কাছে কতোটা নিরাপত্তা খোঁজে সেটা উনি দেখেছেন বুঝেছেন। চোখের সামনে অনেক দেখেছেন, মুস্কিল হোলো, সেসব বলতে পারলেন না কোনোদিন। শুধুও লজ্জা, ভয় সম্বল। যা কিছু পুরাতন তাকে পিছু ঘুরে আর দেখতে চান না। কিন্তু ওই পুরাতনেই সব সুখ ছিল। তাই এই মানুষটিকে যখন শাশুড়ি হিসেবে পেলাম মানতে মানাতে বেগ পেতে হয়েছিল। কিন্তু ওনার আদ্যন্ত যখন বুঝি করুণা হয়। এই মানুষটি এক সময় সংসারের হাল ধরতে করেন নি এমন কাজ নেই। বিয়ে, ছেলে হবার পর সরকারি চাকরি ছেড়ে দেন। সেই থেকে প্রচন্ড সংসারী তিনি। জীবনের কত বাঁক, কতো চড়াই উতড়াই। আমরা যেগুলো নিয়ে নিয়ম ভাঙার খেলা খেলি, এঁনারা সসেগুলোকেই রীতি রেওয়াজ বলে মেনে এসেছেন। সবাইকে প্রতিবাদ করতে শেখায় না আমাদের সমাজ। তাই মনে হয়, এমন অনেক মানুষ পরিস্থিতির দায়ে এমন মন থেকে কুঁকড়ে যান।
    আমাদের দেশের সব মেয়েদের এই বোধ নেই, এই শিক্ষা নেই। তাই এরা নিজেদের সব কথা জানাতে ভয় পায়। যুগ বদলেছে, আজ আমরা যদি না বদল আনি কি করে হবে। মেয়ে, ছেলে ভাবার দিন আর নেই। সবাই সবাইকার পাশে দাঁড়াই। আমার ছেলে যখন প্যাডম্যান চ্যালেঞ্জ এর পোস্ট করে এই প্রজন্মের জন্য গর্ব হয়। অনেক অন্ধকার চারদিকে, এখনো অনেক কাজ, তাই এসো সুস্থ চিন্তা করি, কাজ করি। অন্যের জন্য কিছু করার তাগিদ বাড়ুক। আমরা মানুষ হয়ে বাঁচি।
  • বিভাগ : অন্যান্য | ০৮ মার্চ ২০২০ | ১৯৭ বার পঠিত | | জমিয়ে রাখুন
    Share
আরও পড়ুন
- - স। র। খান
আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত