• হরিদাস পাল
  • খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে... (হরিদাস পাল কী?)
  • দুগ্গা দুগ্গা ******

    Anjan Banerjee
    বিভাগ : আলোচনা | ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০ | ২১৮ বার পঠিত
  • এদিকে এক পাহাড় । ওদিকে এক পাহাড় । মাঝখানে নদী। সেই নদীতে বাঁধ দিয়ে তৈরী হয়েছে সরন্তি ড্যাম। শাল, পলাশ, শিশু, সেগুনের জঙ্গলে ঘেরা এই আদিবাসী গ্রাম। ফাগুন চোত মাসে রুখা সরন্তি সেজে ওঠে পলাশের সাজে। লাল মাটির পাশে সবুজ ধানক্ষেত।ওই ধানক্ষেতের ওপারে চার্চের জমি। সেন্ট অ্যাগনেস চার্চ। বেশ বড়সড় ইমারত। জমির চারপাশে দেড় মানুষ সমান লোহার রেলিং। গেট খুলে ভেতরে গেলে বেশ শান্তির পরশ লাগে যেন। পুব দিকে শাল সেগুনের বনের মাথা টপকে সূয্যির আলো পড়ে সকালবেলায়, চার্চের দুধসাদা দেয়ালের গায়ে। ওখানে মূল দরজার ওপরে প্রভু যীশুর শ্বেত পাথরের পূর্ণ মূর্ত্তি । মূর্ত্তির নীচে লেখা, “ হে ভারাক্রান্ত ও পরিশ্রাম্ত পথিকেরা আমার নিকট আইস আমি তোমাদিগকে বিশ্রাম দিব “

    রাঙা রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে এই ভর দুপুরের তাপে হাঁফ ধরে যায়।ছাতা মাথায় নরেন দেখে অনঙ্গ আসছে। স্যামসন কিসকু। মানে আমাদের অনঙ্গ কিসকু। মিশকালো গায়ের বর্ণ। নরেনেরই জাতভাই। চার্চের ফাদার জন বাস্কে। তা তার পাল্লায় পড়ে চার্চে গিয়ে সাহেবদের কি সব বাণী, মন্তর পড়ে টড়ে কিরিস্তান হয়েছে। তারপর নাম পাল্টে গেল। তা যা করেছে ভালই করেছে, নরেন হাঁসদা ভাবে। তার মতো বোকা তো কেউ নয়। এখন খেতে পরতে পাচ্ছে। অনঙ্গের একটা ছেলে একটা মেয়ে আছে। চার্চের অ্যাংলো ইন্ডিয়ান স্কুলে পড়ে। ভালই আছে। গেরামের উঁচু জাতের গন্যিমান্যিরা এখন আর তার সঙ্গে কাঠি করতে সাহস করে না।
    স্যামসন, মানে অনঙ্গ বলল, ‘ কিরে নরেন, কেমন আছিস ? তোর ছাওয়াল কেমন ? আরে, তোর দুর্দশা দেখলে কষ্ট হয়।তুইও যেমন একগুঁয়ে.... কিছুতেই বাপ ঠাকুদ্দার ধম্ম ছাড়বি না ! এই দেখনা, কেমন দিব্বি আছি আমি। ছাড়, এবার ছাড় ওসব। ওই তো তোর বৌটাকেই দেখনা। আগে ফাদারের ঘরদোর সাফ করত, জামাকাপড় কাচত, এঁটো বাসন মাজত। এখন ওসব কিছুই করতে হয় না।একবেলা ফাদারের খানা পাকায় শুধু। সামনের মাসে শুনছি নান হয়ে যাবে। ‘ও, আচ্ছা’ , নরেন হাঁসদা মাটির দিকে তাকিয়ে বলে মৃদুস্বরে। তারপর একবার ঢোক গিলে বলল, ‘ আর ...আর ওর সঙ্গে যে মরদটা থাকত.....’
    — ‘ ও-ই দেখ....তুই দেখছি কিছুই খবর রাখিস না.... সে তো একটা চুরির কেসে ফেঁসে গেল। চার্চে একটা পেতলের দামি মূর্ত্তি গায়েব। ও ব্যাটা ফেঁসে গেল। কেরালায় হেড কোয়ার্টারে খবর গেল। তাড়িয়ে দিয়েছে ওকে। তুই একটু ভাব। ভেবে চিন্তে দেখ কি করবি। গেরামে হিঁদুরা কিন্তু হাড় বজ্জাত এ কথা হাড়ে হাড়ে বুঝেছিস নিশ্চই। তা, পীরের দরগায় গেলেও হাজারো হ্যাপা। পলিটিশিয়ানদের দড়ি টানাটানি সামলাতে সামলাতে ন্যাজেগোবরে হবি একেবারে। তার চেয়ে আমাদের এই চার্চই ভাল। ও.... ওই দেখ, কথায় কথায় অনেক বেলা হয়ে গেল। মেলা কাজ পড়ে ।আমি আসি তা’লে...’ , বলে হনহন করে চলে গেল অনঙ্গ মাথায় ছাতা ধরে।

    নরেন ভাবল, দুগ্গা তো এখন একা। একবার গিয়ে দেখা করলে কেমন হয়। শিমূল গাছের ছায়ায় ওই যে কোয়ার্টারের ঘরগুলো। ওখানে একটা ঘরে কি ও একা থাকে ? ছেলেটাকেও সঙ্গে নিয়ে গেলে হয়। ছেলেটাকে দেখলে ওর হয়ত একটু মায়া জাগতে পারে।এখন যদি ফিরে আসে.... ছেলেটার বড্ড কষ্ট। একা একা বনে বাদাড়ে ঘুরে বেড়ায় । নান হবে তো কি হল। ভগবান তো মানুষেরই জন্য। এইসব সাতপাঁচ ভেবে নরেন সিদ্ধান্ত নিল , একদিন সুযোগ বুঝে বাপ ব্যাটায় শিমূল গাছের তলায় গিয়ে দাঁড়াবে— চার্চে যাবার মুখে দুগ্গার নিশ্চই চোখে পড়বে ।
    তা, তারা দুজনে গিয়ে দাঁড়াল শিমূল গাছগুলোর তলায়। চোত মাস ।দূরের বন রাঙা পলাশে ছেয়ে আছে।বেশ গরম। তবে ঝিরিঝিরি হাওয়া দিচ্ছে।ভীষণ উত্তেজনায় নরেন ঘেমে চান করে গেল। একটাই ভাবনা ঘুরেফিরে পাক খেতে লাগল নরেন হাঁসদার মনে- দুগ্গা কি তার ডাকে সাড়া দেবে ? ছেলেটার মুখের দিকে তাকিয়ে যদি একটু মায়া হয়। একা একা বনে বাদাড়ে ঘুরে বেড়ায় ....
    ওই তো দুগ্গা না ? হ্যাঁ দুগ্গাই তো আসছে। পরণে আঁটোসাঁটো নীল পাড়ের সাদা শাড়ি । কাঁধে একটা ঝোলা। ও-ই তো আসছে। চেহারাটা বেশ রোগা হয়ে গেছে।মুখও তো ফ্যাকাশে মতো। এই যে অনঙ্গ বলল, দিব্যি সুখে আছে। যাকগে। নরেনের বুক ঢিপঢিপ করতে লাগল।
    ও নরেনকে দেখতে পায়নি।শিমূল গাছের বাঁ পাশ ধরে এগিয়ে যাচ্ছিল। নরেন আচমকা ডাকল- দু..গ্গা.. । চলন্ত গাড়িতে যেমন বেমক্কা হ্যাঁচকা লাগে তেমনিভাবে দুগ্গা থেমে গেল। ভীষণ অবাক হয়ে নরেনদের দিকে তাকাল। সেই চাউনিতে ভীষণ ভয় মাখান। দুগ্গা তার ছেলের দিকে অপলকে তাকিয়ে রইল কয়েক মুহুর্ত, ঠিক গাভী যেভাবে তার বাছুরের গা চাটে সেভাবে।
    দেখে নরেনের খুব কষ্ট হল। দুগ্গা যখন মাঠপাড়ার সেই মানুষটার সঙ্গে পালিয়ে গিয়েছিল তখনও এত কষ্ট হয়নি।
    নরেন ছেলের হাত ধরে দু পা এগিয়ে গেল। দুগ্গা তাদের ছেড়ে চলে যাবার পর থেকে পাঁচ বছরের ছেলেটার সেই মা, সেই বাপ। বুকে বল আনল নরেন।
    — ‘ ও দুগ্গা বলছি কি.... তুই ত এখন একা... আর ত নিষেধ দেখি না। তুই যদি এখন ফিরে আসিস.... এই দেখ তোর ছেলেটা... আমরা যদি তিনজনায় মিলে দূর কোন গাঁয়ে ঠাঁই নিই....’
    নরেনের গলায় কাকুতি উৎসারিত হয়, সেই যেন অপরাধী।
    ভীরু চোখে তাকিয়ে রইল দুগ্গা।তার শরীর কেঁপে কেঁপে উঠতে লাগল। কেন তা ঠাওর পেল না নরেন। দুগ্গা কি লজ্জা পাচ্ছে !
    নিজেকে একটু সামলে নিয়ে দুর্গা মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে রইল। একটু যেন দম নিল।লম্বা শ্বাস ছাড়ল।
    — ‘ এখন আর আমার ফেরবার উপায় নেই গো.... ‘ এদিক ওদিক দেখে নিয়ে খুব সন্তর্পনে, যেন কেউ শুনতে না পায় সেভাবে বলল দুর্গা ‘আমি লুঠ হয়ে গেছি। তোমরা চলে যাও শিগ্গীর। দিনের পর দিন নষ্ট হয়ে চলেছি।চারবার ....খসিয়েছি। শরীরে আর কিছু নেই। তোমরা চলে যাও.... ‘
    নরেন কি বলতে যাচ্ছিল। চাপা পড়ে গেল তীক্ষ্ণ গলায় ‘ দুর্গা ....‘ ডাকে।
    ফাদার উইলিয়াম বাস্কে ওই ওখানে চার্চের গেটের পাশে দাঁডিয়ে আছে। মিশকালো গায়ের রঙ। পরনে দুধসাদা পাদ্রীর আলখাল্লা। জ্বলন্ত চোখ দুটো চশমার কাঁচের নীচে এখান থেকেও ঠাওর করা যাচ্ছে। চশমার কাঁচের নীচে, গনগনে চোখ। গলায় রুপোর চেনে বাঁধা ক্রশ ঝুলছে।।
    আর একবার ঠিকরে উঠল আওয়াজ - ‘ দুর্গা ..... ‘

    দুর্গা শিউরে উঠল । কেঁপে উঠল নরেন হাঁসদা। নরেনের পাঁচ বছরের ছেলে শম্ভুনাথের মা দুর্গা ঝড়ের গতিতে ভীরু হরিণীর মতো ছুটে ফাদারের পাশ দিয়ে চার্চের মধ্যে ঢুকে গেল ।

    শম্ভুনাথ অবোধ শংকায় কাঁটা হয়ে নির্নিমেষে তাকিয়ে রইল ।
    ****** ******* ******
  • বিভাগ : আলোচনা | ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০ | ২১৮ বার পঠিত
  • আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা ভাইরাস

  • করোনা ভাইরাস

  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত