• হরিদাস পাল
  • খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে... (হরিদাস পাল কী?)
  • কাটমানি ও সজলকান্তির গপ্প

    Anjan Banerjee
    বিভাগ : আলোচনা | ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০ | ৩৯৩ বার পঠিত
  • রাস্তার ধারে বারোতলা ফ্ল্যাট বাড়ি উঠছে। গলির মুখে বালি স্টোন চিপস স্তুপাকার। পাশ কাটিয়ে একটা সাইকেল বের করতেও কসরত করতে হচ্ছে। গলির মধ্যে গাড়ি টাড়ি ঢোকা তো দূরের ব্যাপার।সজলবাবু পাড়ার পুরনো বাসিন্দা। বিরক্তিতে মুখ কুঁচকে দাঁড়িয়ে ছিলেন গৌরের কচুরির দোকানের পাশে। অনিন্দ্য ঘোষ শালপাতার ঠোঙা থেকে তরকারি মাখিয়ে কচুরি মুখে পুরে চিবোচ্ছিল পরমানন্দে। কচুরি ঠাসা মুখেই সজলবাবুর দিকে তাকিয়ে বলে— ‘ কি আ..য়ম্ভ ক..য়ে..ছে এ..য়া ব..য়ু...ন তো কাকু...কো...য়ঁ মা..য়েঁ হ..য়...’

    সজলবাবু বিরক্তিমাখা মুখে অনিন্দ্যর দিকে না তাকিয়েই বিরসমুখে জবাব দিলেন, ‘ আমি আর কি দেখব ? তোমাদেরই তো দেখার কথা এখন। ইয়াং ব্লাড... তোমরাই তো এখন... ‘
    অনিন্দ্যর মুখের কচুরি এখনও পুরোটা নামেনি। গলায় প্যাসেজ খুঁজছে । কথা বলার অবস্থায় নেই। চোখ বুজে হাত নেড়ে নেড়ে বক্তব্য পেশের চেষ্টা করল— যার মানে হল, কাকেই বা কি বলব, এদের হাত অনেক লম্বা।
    সজলবাবু মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে বাড়ির দিকে হাঁটা দিলেন।

    সুচন্দ্রা বাড়ির গলি ঝাঁট দিচ্ছিল।রাস্তা থেকে পায়ে পায়ে বালি এসে উঠছে বাড়ির মধ্যে।সজলবাবু দরজা ঠেলে বাড়ির বারান্দায় পা রাখতে যাচ্ছিলেন ।সুচন্দ্রা রুক্ষ স্বরে বলে উঠল, ‘ দাঁড়াও দাঁড়াও ... আর কাজ বাড়িও না। জুতো বাইরে ভাল করে ঝেড়ে টেড়ে তবে ঘরে ঢোক। খাটতে খাটতে হাড়মাস এক হয়ে গেল। কি ভাগ্য করে যে জন্মেছিলাম....।’ সজলবাবু চুরির দায়ে ধরা পড়া লোকের মতো দাঁডিয়ে রইলেন। জানেন, এর অন্যথায় অবান্তর কথার ফুলঝুরি ছুটবে।
    রাত্রে শোয়ার আগে চুল বাঁধছিল সুচন্দ্রা। দাঁতে ফিতে চেপে খোপা বাঁধতে বাঁধতে বলল, ‘ ফ্ল্যাটগুলো কিন্তু খুব সুন্দর হচ্ছে। ব্যালকনিতে দাঁড়ালে সময় কেটে যায়। দক্ষিণমুখো ... কি হাওয়া...।’ এর পরেই লম্বা শ্বাস ফেলবে সুচন্দ্রা — ‘আ..র আমাদের আর ওসব ভেবে কি হবে.. ‘ । সজলবাবু রাত্রিকালীন ওষুধপত্র খেয়ে শোয়ার তোড়জোড় করতে থাকেন। সুচন্দ্রার স্বগোতোক্তি চলতে থাকে, ‘ যার টাকা আছে তার সব আছে.... আমাদের আর ওসব ভেবে কি হবে... দামও খুব বেশি না... চার হাজার টাকা স্কোয়্যার ফুট।বিশ বছর কেটে গেল একভাবে।হু : ..উ: ...’ , বলে আর একটা তীক্ষ্ণ শ্বাস ছাড়ে । সজলবাবুর কাছে যা প্রাণঘাতী মিসাইল সম।তিনি পাশ ফিরে শুয়ে পড়েছেন।আর কথা বাড়াবার ঝুঁকি নিতে চান না। কাল সোমবার। ভোরে উঠে ছুটতে হবে শালিমার ফোরশোর রোডে। পনের টন স্টীল- SAIL-এর অ্যাঙ্গেল, চ্যানেল আর জিন্দাল-এর পাইপ লোড হবে।যাবে বনগাইগাঁওয়ে, বি ও আর এল-এর পেট্রোকেম প্রোজেক্টে। কাল গোটা দিন ধকল যাবে। বয়স বাডছে। এত চাপ আর নিতে পারেন না সজলকান্তি মুখার্জী।
    একটু পরে ঘরের আলো নিভে যায় আজকের মতো।

    সজল-সুচন্দ্রার এক মেয়ে এক ছেলে। মেয়ে ক্লাস ইলেভেন,বাংলা মাধ্যম এবং ছেলে ক্লাস নাইন,ইংলিশ মিডিয়াম। দুজনেই মোটামুটি ভাল পডাশোনায় । কিন্তু এদের এগিয়ে নিয়ে যাবার খরচ ক্রমশ বেডে চলেছে।

    সাড়ে পাঁচটা বেজে গেছে। ছোট বেলা। ছায়া ঘন হয়ে এসেছে ।দৈত্যের মতো ক্রেনে টনটন লোহা উঠছে। হাইড্রোলিক মেশিনে ওজন হয়ে ট্রাকে বোঝাই হচ্ছে। অপরিচ্ছন্ন গোডাউন ধুলোয় ধুলো। মল মূত্রের দুর্গন্ধ আসছে কোথা থেকে। এখনও কাজ অনেক বাকি। বিলটি হবে, ইনভয়েস হবে, পাইপের ডিলার তিন টন পাইপ ফেলে দিয়ে গেছে প্রায় আধ কিলোমিটার দূরে আর একটা গোডাউনে , সেখানে ট্রাক নিয়ে গিয়ে পাইপ তোলাতে হবে , কাঁটা করতে হবে লেবারারদের তোয়াজ করে , ম্যানুয়াল মেশিনে।এদিকে ট্রাকের ড্রাইভারটা গাঁইগুঁই করে যাচ্ছে একনাগাডে। এরা দু তিনটে গোডাউনে ঘুরে ঘুরে মেটিরিয়াল লোড করতে চায় না। বড় সুখী টাইপের। তাকেও তোয়াজ করতে হচ্ছে মাঝে মাঝে চা সিগারেট ঘুষ দিয়ে। বয়স বাড়ছে। এত ধকল আর নিতে পারেন না সজলবাবু। রাত নটা নাগাদ পেমেন্টের ব্যাপার চুকল। দশ চাকার ট্রাক রওয়ানা দিল ডানলপের দিকে। আজ রাতের জন্য ওখানেই গ্যারেজ হয়ে থাকবে।

    রাত এগারোটা নাগাদ বাগবাজারে গোপীমোহন দত্ত লেনের বাড়িতে পৌঁছলেন সজলবাবু। ঘরে ঢুকে দেখলেন ছেলে কম্বল গায়ে দিয়ে শুয়ে আছে চোখ বুজে। সজলবাবুর ঢোকার আওয়াজ পেয়েও চোখ খুলল না। সজলবাবুর কেমন সন্দেহ হওয়ায় কপালে হাত দিয়ে দেখলেন, জ্বর টর এসেছে কিনা। এই সময়ে পাশের ঘর থেকে মেয়ে বান্টি এসে ঢুকল। বলল, ‘ পাপুর পক্স হয়েছে। ডাক্তারবাবু, মানে অম্বরীশ সরকার এসেছিলেন। মা গেছে ওষুধ কিনতে এখনও ফেরেনি। ঘরে কোন টাকা রেখে যাওনি.....মা খুব রাগারাগি করছিল। সুভাষকাকুর কাছ থেকে টাকা চেয়ে নিয়ে ডাক্তারবাবুকে দিল। ঘরে সাড়ে তিনশো টাকার মতো ছিল। সেটা নিয়ে ওষুধ কিনতে গেছে। ডাক্তারবাবুর কথা শুনে মনে হল খুব কস্টলি অ্যান্টিবায়োটিক প্রেসক্রাইব করেছেন। ওই টাকায় কটা ক্যাপসুল হবে জানি না।’
    — ‘ ক্যাপসুল ! পক্সে তো কোন ওষুধ লাগে না। পক্সের অ্যান্টিবায়োটিক ! ... চিকেন পক্স তো কদিন পরে এমনি সেরে যায়।’
    —‘ না বাবা এখন সিস্টেম চেনজ্ হয়ে গেছে....’ বান্টি হঠাৎ প্রসঙ্গ পরিবর্তন করে— ‘....জান বাবা সুভাষকাকুরা না গাড়ি কিনেছে। আজকে দুপুরে চালিয়ে নিয়ে এল। অর্ক তো ড্রাইভিং লাইসেন্স পেয়ে গেছে। লাল রঙের অল্ট...কি সুন্দর দেখতে... আমারও খুব ড্রাইভিং শিখতে ইচ্ছে করে...’। অর্ক হল প্রতিবেশী সুভাষ দাশের বড় ছেলে।
    সজলকান্তি অনাবশ্যক কথা না বলে পায়ে চটি গলিয়ে রাস্তায় বেরোলেন সুচন্দ্রার সন্ধানে পার্বতী মেডিক্যাল হল-এর দিকে।

    পরদিন সকালে পাপুর গোটা দেহ ভরে গেল বসন্তের গুটিতে। অম্বরীশ সরকারের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানালেন, ওতে ভয়ের কিছু নেই। তিনদিন পরেই গুটি শুকোতে আরম্ভ করবে। সকাল দশটা নাগাদ সজলবাবু অফিসে বেরোবার জন্য তৈরী হলেন। উপায় নেই। আজ মেটিরিয়াল ডেসপ্যাচ হবে। তার খোঁজ খবর করতে হবে। এই ট্রান্সপোর্ট কোম্পানিগুলো ভীষণ ঘেতো। পেছনে লেগে না থাকলে ঝুলিয়ে দেবে। তাছাড়া ডিলারদের ইনভয়েস আর রোড চালানের কপি দুটো কালেক্ট করতে হবে সম্বিতকে পাঠিয়ে। ওটা আজকেই সাইটে কুরিয়ার করতে পারলে ভাল হয়। বেরোবার মুখে সুচন্দ্রা বলল, ‘ টাকাপয়সা কিছু রেখ গেছ তো.... দেখ আবার কারো কাছে হাত পাততে না হয় ! ‘ সজলবাবু বললেন, হ্যাঁ হ্যাঁ আলমারিতে আটশো টাকা আছে।’
    — ‘ দুগ্গা দুগ্গা ... সাবধানে যেও... সময়টায় খুব খারাপ পড়েছে... কবে যে একটু ঝাড়া হাত পা হব...সবাই কেমন...আর উনি এত বচ্ছর ধরে চাকরি করে কি যে করলেন...সবই কপাল...’
    সজলবাবু দ্রুত নিষ্ক্রান্ত হলেন কথার চাকা আর বেশি গড়াবার আগেই।
    বাড়ি ফেরবার সময় সন্ধে সাতটা নাগাদ শ্যামবাজার ট্রামডিপোর সামনে একটা হকার স্টলের সামনে দাঁড়িয়ে গেলেন। দুজোড়া কাপডিশ কেনা খুবই দরকার। সুচন্দ্রা অনেকদিন ধরে তাগাদা দিচ্ছে। পকেটে একশো পঁচিশ টাকা আছে।
    একজোড়া কাপ প্লেট দেখে খুব পছন্দ হল।
    — ‘ এটা কেমন পড়বে ভাই ? ‘
    দোকানদার কাপডিশ দুটো তুলে ঠনঠন করে বাজিয়ে বলল, ‘লিন,
    হাতে লিয়ে দেখুন... পিওর পোর্সেলিন।’
    — ‘হ্যাঁ.. তা কত পড়বে ?’ সজলবাবু পুনরাবৃত্তি করেন।
    — ‘ আশি টাকা জোড়া ... ইটালিয়ান পোর্সেলিন বড়দা... ‘।
    তার মানে দু সেটের দাম একশো ষাট টাকা। সজলকান্তি বেশ দমে যান। ফিরে আসবার চেষ্টা করেন— ‘ একটু কমসম কর ভাই। এ তো বড্ড বেশি বলছ।’
    — ‘ ঠিক আছে... পঁয়াত্তর দেবেন। এর কমে কোথাও পাবেন না হারগিস...ঘুরে দেখে আসুন।বউনির টাইম তাই.... ‘
    এরপর প্রায় দশমিনিট ধরে নানান কিসিমের কাপ প্লেট নাড়াচাড়া করে পরখ করতে লাগলেন সজলবাবু , যদি তার বাজেটের নাগালে এসে যায়। কিন্তু কিছুতেই ম্যানেজ হচ্ছিল না। অন্তিম চেষ্টা হিসেবে আর একটা সেট-এর দিকে হাত বাড়াতে যেতেই দোকানদার হাত দিয়ে আড়াল করল— ‘ থাক থাক ছেড়ে দিন .... বহুৎ হয়েছে... অন্য দোকানে দেখুন.... লেবে না ...ফালতু ঘাঁটাঘাঁটি... বউনির টাইমে বেকার লাফরা....’
    — ‘ দেখুন, আপনি কিন্তু অপমান করছেন ....আপনি এটা করতে পারেন না ....’ , সজলকান্তির কান লাল হয়ে ওঠে। মৃদু প্রতিবাদের চেষ্টা করেন।
    — ‘আরে দূ..র... ঠিক আছে ঠিক আছে... লেবে না, কিছু না ... ফালতু ঘাঁটাঘাঁটি .... আজিব লোক সব....’
    সজলবাবু আর নোংরামি না বাড়িয়ে সেখান থেকে সরে গেলেন। সুচন্দ্রার কথা মনে পড়ল— অর্থ হল মানুষের জীবনের রক্ত বুঝলে....
    পরদিন রবিবার। ছুটির দিন। সজলবাবু বাজারে যাচ্ছিলেন। অজিতের দোকানের সামনে এসে দেখলেন সাতাশ বছরের ছেলে সাগ্নিক একটা আনকোরা নতুন ঝকঝকে মোটর বাইকের ওপর বসে আছে। তেজী, কামনাময় চিতাবাঘের মতো গড়ন ।সজলবাবুকে দেখে একগাল হেসে বলল — ‘কাকু এটা নিলাম।’
    সাগ্নিক বেলেঘাটায় সেল ট্যাক্স অফিসের ক্লাস থ্রি স্টাফ। বছর দুই হল চাকরিতে ঢুকেছে।
    — ‘ ও আচ্ছা বেশ বেশ । খুব সুন্দর। তা কত পড়ল ? ‘ সজল নিয়ম মাফিক প্রতিক্রিয়া দেয় ।
    — ‘ এ..ই সব নিয়ে সাড়ে তিনের মতো ‘
    — ‘ও আচ্ছা, খুব ভাল। সাবধানে ইউজ কোর । চলি হ্যাঁ... এ..ই বাজারে যাব একটু ... ‘
    — ‘ হ্যাঁ কাকু আসুন। আপনাদের চড়াব একদিন... ‘
    সজলকান্তি ভাবলেন, তার বাবাও সরকারি অফিসের কর্মচারি ছিলেন। সেকশানের সবাই অ্যাকাউন্টস মাস্টার বলে ডাকত।
    জীবনে সাইকেল ছাড়া নিজস্ব আর কোন বাহনে চড়ার সামর্থ্য হয়নি। মারা যাবার পর ব্যাঙ্ক ব্যালান্স দেখা গেল তিনশো উনিশ টাকা সাতান্ন পয়সা।

    শনিবার সম্বিৎ দুটো ডিলারের কাছে গিয়েই ফিরে এসেছে । স্টীল এবং এম এস পাইপ কোনটারই ইনভয়েস রেডি হয়নি জি এস টি আর ভ্যাট-এর কি সব গোলমালের জন্য। সজলবাবু ঠি..ক করলেন আজ সোমবার তিনি নিজেই যাবেন। আর একটা প্রোজেক্টের মেটিরিয়াল রিকোয়্যারমেন্ট এসেছে। সে ব্যাপারেও কথা বলতে হবে।কোটেশন নিতে হবে। তাদের কোম্পানি টার্ন কি জব করে। ইনস্টলমেন্ট, কমিশনিং, মেনটেনেন্স সবকিছু। বেলমেটিক্স কোম্পানির মালিক মেটিরিয়াল পারচেজের ব্যাপারটা পুরোপুরি তার ওপর ছেড়ে দিয়েছেন। আর কারো ওপর একেবারেই ভরসা নেই তার। এটা বোধহয় সজলবাবুর প্রায় আড়াই দশকের দীর্ঘ প্রতিষ্ঠিত সততার জন্য। অন্য কেউ কেউ কাটমানি খেয়ে এতদিনে লালে লাল হয়ে যেত।কিন্তু বেতন বৃদ্ধির ব্যাপারে মালিক কখনও উপুড় হস্ত হন না। সংসারের টানাটানি আর কাটে না। তবে পরের দিনও কাজটা হল না। স্টীল অ্যান্ড মেটাল এজেন্সির মালিক অনুপস্থিত থাকায়। কোটেশান ডিলিং-এর ব্যাপারে অধস্তন কারো সঙ্গে কথা বলে লাভ নেই।
    তার পরের দিন, অর্থাৎ মঙ্গলবার বেলা তিনটে নাগাদ তিনি তার অফিস স্টিফেন হাউস থেকে বেরোবার জন্য পাঁচতলায় লিফটের বোতাম টিপে দাঁড়িয়ে আছেন, এমন সময় প্রভাস দত্ত সেখানে কোথা থেকে উদয় হয়ে বলল, ‘সজলদা একটু কথা ছিল আপনার সঙ্গে।’ সজলবাবু জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে প্রভাসের দিকে তাকিয়ে রইলেন।প্রভাসের বয়স পঁয়ত্রিশ ছত্রিশ হবে। সে থাকে তার বাড়ির খুব কাছেই, প্রায় এক পাড়াতেই। এই বিল্ডিং-এই একটা মিউচুয়াল ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানিতে কর্মরত। লিফট এসে গেল। প্রভাস বলল— চলুন, নীচে নামবেন তো। আমিও নীচেই যাব।
    নীচে নেমে প্রভাস বাঁ পাশে পানের দোকান থেকে পান কিনে, মুখে পুরল, ‘ সজলদা, একটু দাঁড়ান। দুটো সিগারেট কিনে একটা পকেটে রাখল। আর একটা ধরাল। সজলবাবুর সিগারেট খাওয়া মানা। বছর দুই আগে একটা ছোট হার্ট অ্যাটাক হয়ে গেছে।
    প্রভাস দত্ত পান চিবোতে চিবোতে বলল, ‘ সজলদা... বলব কি ,বলতেও খারাপ লাগে। নেহাৎ আপনার প্রতিবেশী, আর বান্টিকে ছোটবেলা থেকে দেখছি তাই ....
    বান্টি যার তার সঙ্গে মিশছে আজকাল । ওই যে সাগ্নিক বলে ছেলেটা, মোটেই ভাল এলিমেন্ট নয়। বান্টি ওর সঙ্গেই যখন তখন... এখন তো আবার বাইক কিনেছে মালটা...তাতেই এখন...।আপনার মতো লোকের মেয়ে হয়ে যে কি করে.... যাক আপনি দেখুন একটু।বান্টি তো আমার বোনের মতো তাই বলা আর কি...
    হৃদরোগের ধাক্কা সামলে ওঠা নিপাট সরল কোন মানুষকে এসব বলা আর তার বুকে ছুরি বসানো একই কথা। তবু প্রভাস অবলীলাক্রমে এসব বলে গেল এবং সিগারেটে শেষ টানটা মেরে টুকরোটা টুসকি মেরে ফেলে দিয়ে, ‘ আ..চ্ছা, সজলদা আপনি তা’লে এগোন অাস্তে আস্তে।আমার তো আবার একগাদা কাজ পড়ে আছে ওপরে ‘ , বলে চলে গেল প্রভাস। সে এত তথ্য কি করে সংগ্রহ করল, কোথা থেকে সংগ্রহ করল কিছুই জিজ্ঞাসা করা হল না সজলবাবুর। তার দু পা পাথরের মতো ভারী হয়ে গেল। দু’কানের গোডায় যেন লক্ষ ভোমরা ভোঁ ভোঁ করতে লাগল। তিনি ভাবলেন, সুচন্দ্রা কি এসব জানে ? যাই হোক, তিনি নিজেকে টেনে নিয়ে যেতে লাগলেন নেতাজি সুভাষ রোডের দিকে।

    রামানন্দ গোয়েলের মুখোমুখি বসলেন সজলবাবু।
    — ‘ এই নিন, আপনার সব ডকুমেন্ট রেডি। একটু লেট হয়ে গেল ।আপনাদের নেক্সট অ্যাসাইনমেন্ট কোথায় হচ্ছে ? ‘ রামানন্দ গোয়েল হাসিমুখে জিজ্ঞাসা করেন।
    — ‘এখনও ফাইনাল হয়নি। পরশু ডিব্রুগড়ে বিডিং আছে। দেখা যাক কি হয়।’ সজলবাবু অন্যমনস্কভাবে উত্তর দেন।
    — ‘ ও, আচ্ছা আচ্ছা... দেখবেন একটু।বেলমেটিক্সের পারচেজ তো মোটামুটি আপনার হাতেই। চা খাবেন তো ? ‘
    সজলবাবু কিছু না বলে চুপ করে বসে রইলেন। মি. গোয়েল বেল বাজিয়ে চায়ের অর্ডার দিলেন। তার বোধহয় কোথাও বেরোবার কথা। একটু উসখুস করছিলেন।ধৈর্য্য ধরে অপেক্ষা করছিলেন সজলবাবুর কাপের চা শেষ না হওয়া পর্যন্ত। সজলবাবু নীরবে আনমনা হয়ে চুমুক দিচ্ছিলেন কাপে। দুবার ঠোঁট ফাঁক করলেন কি একটা বলার জন্য। দুবারই কোন শব্দ বেরোল না মুখ দিয়ে।রামানন্দ গোয়েল ডেস্কটপের মনিটরে কি একটা দেখতে লাগলেন মন দিয়ে।তিনি সময় নষ্ট করার পাত্র নন।
    সজলবাবু চায়ে শেষ চুমুক দেবার পরই গোয়েল দাঁড়িয়ে পড়লেন।
    — ‘ চলুন । যাবেন তো ? আমিও বেরোব। চেম্বার অফ কমার্সে মিটিং আছে সাড়ে চারটায়।’
    সজলবাবু আবার কি যেন একটা বলতে গেলেন। কথা আটকে গেল। কোনমতে বললেন , ‘ হ্যাঁ চলুন। ‘
    উল্টোদিকে কোল ইন্ডিয়া অফিসের সামনে গোয়েলের গাড়ি পার্ক করা আছে । ড্রাইভার গাড়ি ঘুরিয়ে এদিকে নিয়ে আসছে। রামানন্দ সজলবাবুকে বললেন, ‘আপনি স্টিফে ন হাউসে ফিরবেন তো ? চলুন আপনাকে ড্রপ করে দিই ।’
    — ‘ না না ঠিক আছে । আমি এখন ওদিকে যাব না ... বলছিলাম কি...’ , সজলবাবুর দুবার ঢোক গিললেন, তারপর কোনক্রমে কটা কথা বেরিয়ে আসে তার মুখ দিয়ে অসংলগ্নভাবে— ‘আমি তো অনেক বছর ধরে ...মানে..আপনাদের সেলটা দেখছি... আমার ওই একটু ... মানে যদি আপনার অসুবিধে না হয়...খুব দরকার তাই...’ , বলে সজলবাবু মাথা নীচু করে প্রায় অবশ হয়ে দাঁডিয়ে থাকেন।তার তিন পুরুষে কেউ এসবে ধাতস্থ ছিল না। তিনিই বা হবেন কি করে ?
    রামানন্দ গোয়েল কিছু বুঝতে না পেরে হাঁ করে তাকিয়ে রইলেন সজলকান্তির দিকে। সত্তর বছরের প্রবীন এবং পোড় খাওয়া ব্যবসায়ী মানুষ তিনি।কয়েক সেকেন্ড লাগল তার ব্যাপারটা ধরতে।
    —-‘ ও... আচ্ছা আচ্ছা... হ্যাঁ শিওর শিওর...নিশ্চই নিশ্চই। আপনি তো কখনও বলেননি... তাই ... ‘
    তক্ষুণি ওয়ালেট বার করলেন এবং তার থেকে দশটা পাঁচশো টাকার নোট বার করে এগিয়ে ধরলেন সজলবাবুর দিকে ।
    সজলবাবু কোনরকমে কথা কটা বলে ফেলে অন্যদিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। দুপাশে ব্যস্ত মানুষের স্রোত বইছে।
    রামানন্দ গোয়েল সজলবাবুর দুটো হাত ধরে টাকাটা গুঁজে দিলেন। তার কাঁধে হাত দিয়ে সজলবাবুর বিমর্ষ চোখের দিকে তাকিয়ে মাস্টারমশায়রা যেভাবে বালক ছাত্রদের বোঝায় সেভাবে বললেন, ‘ এটা রাখুন। এতে কোন দোষ নেই। এটা আপনার প্রাপ্য। মানুষ বাঁচার জন্য কত কি করছে। আপনি তো কখনও বলেননি তাই.... এটা আপনি আর আমি ছাড়া আর কেউ জানবে না। আমরা চেম্বার অফ কমার্সে সবাই আপনার কথা বলি... ‘
    ড্রাইভার গাড়ি ঘুরিয়ে নিয়ে এসে মালিকের জন্য অপেক্ষা করছে।
    গোয়েল গাড়ির দিকে পা বাড়ালেন। যেতে বললেন, ‘ ডোন্ট ওয়ারি... আবার ডিল হলে ...আবার শিওর... আপনি একটা বাইক কিনে নিন। দেখবেন কেমন তেজী চিতাবাঘের মতো ছুটবে ।আই উইল হেল্প ইউ... ও কে.... চিন্তা করবেন না....
    রামানন্দ গোয়েল গাড়িতে উঠে গেলেন।

    সজলবাবু যখন বাড়িতে পৌঁছলেন ঘড়িতে তখন নটা বেজে পাঁচ মিনিট। বাড়িতে ঢোকার মুখে কানে আসল সুচন্দ্রা উঁচু গলায় কাকে কি বলছে। মনে হচ্ছে পাপুর কোচিং-এর মাস্টার সুনীল বিশ্বাসকে কিছু বলছে। ভদ্রলোকের বড় বারফাট্টাই।কোচিং ক্লাস থেকে কামানো কাঁচা পয়সার গরমে ফুটছে। বোধহয় সজলবাবুর ব্যাপারে কিছু মন্তব্য করেছিল। সজলবাবু ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে শুনতে পেলেন সুচন্দ্রা গলা উঁচিয়ে বলছে — যান যান নিজের চরকায় তেল দিন। সজলকান্তি মুখুজ্জের নখের যুগ্যি হতে গেলে সাতবার জন্ম নিতে হবে। নেহাৎ কপাল খারাপ তাই..... নইলে আপনাদের মতো মাস্টারদের পকেটে পুরে ঘুরত। ওর সাতপুরুষে কখনও কেউ দুনম্বরী করেনি। জীবনে কারো কাছে এক পয়সা হিস্যা খায়নি কখনও....!

    পাঁচিলের ওপর দিয়ে অন্ধকারে একটা বেড়াল হেঁটে যাচ্ছে বিষণ্ণ মুখে। সজলকে দেখে দাঁড়াল । অনুযোগের সুরে বলল— মিয়াঁও... !
    পরদিন দুপুরে রামানন্দ গোয়েলের ব্যক্তিগত ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে পাঁচহাজার টাকা ঢুকল। প্রেরক, শ্রী সজলকান্তি মুখার্জি ।
  • বিভাগ : আলোচনা | ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০ | ৩৯৩ বার পঠিত
  • আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা ভাইরাস

  • পাতা : 1
  • | 172.69.134.56 | ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০ ১৬:৫৭91076
  • ধুসস বড্ড ক্লিশে গপ্প।
    এই সুচন্দ্রা দেবী কিছু অর্থ উপার্জনকারী কাজকম্ম কল্লেও পারেন তো।
  • একলহমা | 108.162.237.57 | ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০ ১৭:৫৬91077
  • দমুদির সাথে একমত।
  • করোনা ভাইরাস

  • পাতা : 1
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত