• বুলবুলভাজা  আলোচনা  বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি

  • ক্রোমিয়াম ক্রমে আসিতেছে

    অনির্বাণ বসু লেখকের গ্রাহক হোন
    আলোচনা | বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি | ০৭ জুন ২০০৯ | ৪০৭ বার পঠিত
  • এরিন ব্রকোভিচ ছবিটার কথা মনে আছে নিশ্চয়?

    অন্তত এটুকু তো সবার মনে আছেই, যে ,এই ছবির নাম-ভূমিকায় অভিনয় করে জুলিয়া রবার্টস অস্কার পেয়েছিলেন। আসুন, এরিন ব্রকোভিচ চরিত্রটির কথাও একটু মনে করে দেখি। এরিন কিন্তু কোনো কাল্পনিক চরিত্র নন, এক্কেবারে রক্তমাংসের মানুষ। নব্বই দশকের শুরুর দিকে। আর্থিক, পারিবারিক্‌ নানাবিধ ্‌সমস্যার প্রতিকূলতায় নানা ঘাটে ঠোকর খেতে খেতে বত্রিশ বছরের এরিন সবে তখন একটু থিতু হয়েছেন, কোনরকমে একটি ল ফার্মে কেরানীর কাজ জুটিয়ে। যদিও ল স্কুলে পড়ার কোনো অভিজ্ঞতাও ছিলো না এরিনের। আর সেখানেই সেই ঐতিহাসিক মামলা লড়ে নজর কেড়ে নিলেন এরিন। নজরে এনে দিলেন পরিবেশ দূষণের প্রায় অজ্ঞাত এক কালপ্রিট - ক্রোমিয়াম কে।

    বস দিয়েছিলেন একটি রিয়েল এস্টেটের প্রো বোনো কেস। দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ার হিঙ্কলি শহরে প্যাসিফিক গ্যাস অ্যান্ড ইলেক্ট্রিক কোম্পানির একটি বাড়ি কেনা সংক্রান্ত। আপাত নিরীহ এই কেসের কাগজপত্র ঘাঁটতে ঘাঁটতে ই এরিনের নজরে এসেছিলো রক্তের নমুনা পরীক্ষার কিছু রিপোর্ট। না, কেতাবী আইনী ডিগ্রী বা প্রশিক্ষণ ছিলো না বটে এরিনের, কিন্তু ছিলো ছাই উড়িয়ে দেখার ইনস্টিংট। আর তার তাড়নাতেই শুরু হলো আরও তথ্য জোগাড় করা শুরু। তথ্য আর তদন্ত জানালো,গোটাগুটি তিরিশ বছর ধরে প্যাসিফিক কোম্পানির কম্প্রেসর ষ্টেশন থেকে বিষাক্ত ক্রোমিয়াম লিক করে মাটির তলার জলে মিশেছে, কোম্পানীর জ্ঞাতসারেই। সেই জল থেকে বিষক্রিয়া। ফল ? ছোট্টো হিঙ্কলি শহরে প্রচুর মানুষ অসুস্থ। কারুর নাক থেকে রক্ত পড়ার ক্রনিক রোগ তো কারুর, হ্যাঁ, ক্যান্সার। এক এক করে ৬৩৪ জন বাসিন্দাকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে প্রমাণ জোগাড় করে,তাদের হয়ে অয়েল জায়ান্টের বিরুদ্ধে অবশেষে ল স্যুট আনলো এরিনের মেসরি ও ভিটিটো ল ফার্ম। লড়লেন এরিন। তিন বছর

    ধরে চলার পরে ১৯৯৬ সালে ঐতিহাসিক এই মামলার রায় বেরোল। প্যাসিফিক গ্যাস অ্যান্ড ইলেক্ট্রিক কোম্পানি, হিঙ্কলির অধিবাসীকে ৩৩৩ মিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য হয়। দূষণজনিত বিষক্রিয়ার জন্য এটাই এখনও পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিপূরণ। রাজনৈতিক মহল থেকে মিডিয়া সবাই নড়েচড়ে বসল, এ নিয়ে হলিউডি সিনেমাও হল আর আমরা জানলাম ক্রোমিয়াম-জনিত বিষক্রিয়ার ভয়ঙ্কর বাস্তবতার কথা। জানলাম বটে ,কিন্তু জেনে খুব কিছু লাভ হয়েছে কি, অন্তত আমাদের দেশে ? সেটা জানার আগে একটা প্যারার ব্রেক এবং ...

    একটু ব্যাকগ্রাউন্ড

    গ্রীক ক্রোমা, মানে রং থেকে ক্রোমিয়াম নাম। যে ক্রোমিয়ামের রং য়ে পান্না হল সবুজ, রুবি হল লাল। তো, এমনি ই নানান রং করার কাজে ক্রোমিয়ামের ব্যবহার। হ্যাঁ, ঠিক ই ধরেছেন, মার্কিন মুলুকের স্কুল বাসগুলির চোখ ধাঁধানো ঐ ক্রোম ইয়েলোর নাম ভূমিকাতেও এই ক্রোমিয়াম ই। পিগমেন্ট বানানো ছাড়াও এর ব্যবহার চামড়া ট্যান করার কাজে, কাঠ সংরক্ষণে, কুলিং টাওয়ারে মর্চে ধরা বন্ধ করতে, ক্রোম-প্লেটিং এর কাজে ইত্যাদি ইত্যাদি। তো এহেন কাজের জিনিসকে পরিবেশের জন্য বাজে বলা কেন ?

    বিষক্রিয়া সম্বন্ধে দু একটা টেকনিক্যাল কথা তালে বলতেই হয়, যা জানলে একটু সুবিধে হয় পুরো ব্যাপারটা বুঝতে । সেই দশ-বারো ক্লাসের একটু রাসায়নিক রিক্যাপ।

    সব ক্রোমিয়াম বাজে নয়, কেউ কেউ বাজে

    তিনটে আলাদা আলাদা ফর্মে ক্রোমিয়াম পরিবেশের মধ্যে থাকতে পারে। এক, জলে দ্রাব্য হেক্সাভ্যালেন্ট ক্রোমিয়াম, দুই অদ্রাব্য ট্রাইভ্যালেন্ট ক্রোমিয়াম আর তৃতীয় জন, মৌল ক্রোমিয়াম। ভ্যালেন্ট মানে সোজা বাংলায় হাত, যে হাতে করে অন্য কোন মৌলের সাথে হাত মিলিয়ে যৌগ বানানো যায়।

    এই তিনটে ফর্মের মধ্যে ষড়ভুজ ক্রোমিয়াম (

    Cr (VI)
    ) হল সবচেয়ে বিষাক্ত। নি:শ্বাসের সঙ্গে শরীরে ঢুকলে নাক দিয়ে রক্ত পড়া, আলসার আর শেষ অবধি নাকের মাঝের পাতলা হাড়ে ফুটো হয়ে যায়। এছাড়া ক্রোমিয়ামের বিষক্রিয়ায় কিডনি, লিভার স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষতি থেকে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। পানীয় জল বা খাবারের সঙ্গে বেশীমাত্রায় শরীরে গেলে নাক, গলা বা ফুসফুসের ক্যান্সার অবধারিত। আর বিষফোঁড়ার মত, এই ফর্মটিই সবচেয়ে বেশি করে লাগে।

    কিন্তু তার চেয়েও বেশি চিন্তার কারণ , এই

    Cr (VI)
    এর জলের সাথে সখ্যতা। এই সব শিল্পের বর্জ্য থেকে বা যেখানে ক্রোমিয়াম ব্যবহারের জন্য রাখা হয় সেখান থেকে লিক করে ক্রোমিয়াম মিশে যায় মাটির তলার জলে, পুকুরে, নদীতে। এছাড়াও আছে ক্রোমিয়ামের আকরিক ক্রোমাইটের খনি থেকে আসা বর্জ্য। কিভাবে ছড়ায় এই দূষণ? মাটির নিচের জল মোটামুটি সব দেশেই পানীয় জলের উৎস। এই জল এক জায়গায় থেমে থাকে না। উঁচু থেকে নিচুর দিকে প্রবাহিত হয় মাটি/পাথরের মধ্যে ফাঁক খুঁজে নিয়ে। কিন্তু গতিবেগ সাধারণত খুব কম। গড় পড়তা ধরা যাক দিনে ১ মিটার। কাজেই আজকে যেখানে ক্রোমিয়াম ফেলা হচ্ছে সেখান থেকে আপনার বাড়ির জলের উৎস যদি ২ কি.মি দুরে হয় আর জল যদি আপনার বাড়ির দিকে এগোতে থাকে তাহলে আপনার বাড়ির জলে ক্রোমিয়াম আসতে সময় লাগবে প্রায় সাড়ে পাঁচ বছর। ফলে দূষণ প্রকাশ পেতে অনেক সময় কয়েক দশক লাগে। আর যখন টের পাওয়া যায়, তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে।

    তবে হলাহলের কথা ভেবে কে বা কবে অমৃত মন্থন বন্ধ রেখেছে? শিল্পের চাকাও বন্ধ হয়না। বন্ধ করাটা কাজের কথাও না। কাজের কথা হল বরং ,এই বিষকে বিপদসীমার নীচে বেঁধে রাখতে পারা বিষক্ষয় করার উপায় বের করা।

    বেরিয়েও গেছে। বর্জ্য ক্রোমিয়ামের ছটি হাতের তিনটি কেটে তাকে নির্বিষ করার বিভিন্ন পদ্ধতি। আর সব দেশেই এই মারাত্মক বিষের পরিমাণ নিয়ন্ত্রন করার জন্য আইন রয়েছে। লিটারপ্রতি পানীয় জলে হেক্সাভ্যালেন্ট ক্রোমিয়ামের গ্রহনযোগ্য মাত্রা হল আমেরিকায় ১০০ মাইক্রোগ্রাম (এক মিলিগ্রামের এক হাজার ভাগের এক ভাগ), ইউরোপে ৫০ মাইক্রোগ্রাম, আর ভারতে ৫০ মাইক্রোগ্রাম। আমাদের দেশে কলকারখানা থেকে আসা দূষিত জলের ক্ষেত্রে ১০০ মাইক্রোগ্রাম (প্রতি লিটারে)। আর যে সব শিল্পের ক্ষেত্রে বাতাসে মিশে যায় ক্রোমিয়ামের গুঁড়ো, সেক্ষেত্রে প্রতি ঘনমিটার বাতাসে ১০০ মাইক্রোগ্রাম হল গ্রহণযোগ্য মাত্রা। এটা অবশ্য আমেরিকার আইনে। তবে সাধারণ বুদ্ধিতেই বোঝা যায় যে দেশ বিশেষে বিষক্রিয়ার তারতম্য হয় না। কাজেই এই গ্রহণযোগ্য মাত্রাগুলি সব দেশের মানুষের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।

    শিবঠাকুরের আপন দেশে

    পরিবেশ-বিষয়ক আইনের এনফোর্সমেন্ট আসলে একটি প্রহসন মাত্র।

    একটা উদাহরণ দিলে ব্যাপারটা পরিষ্কার হবে। ১৯৮৪ তে ভোপাল গ্যাস দুর্ঘটনার পর ভারত সরকারের ঘুম ভাঙলে বছর দুই বাদে পরিবেশ আইন পাস হয়। এই আইন অনুযায়ী আরো তিন বছর বাদে তৈরী হয় বিপজ্জনক বর্জ্য সংক্রান্ত নিয়ম-কানুন। বেটার লেট দ্যান নেভার প্রবচন স্মরণ করে যিনি বলবেন, এতো মন্দের ভালো, তাঁর জন্য আরো কিছু তথ্য আছে। এর ছয় বছর বাদে, ১৯৯৫ সালে দিল্লির একটি

    NGO, Research Foundation for Science, Technology, and Ecology
    -র পিটিশনের উত্তরে সুপ্রীম কোর্ট দেশে তৈরী হওয়া ও আমদানী করা বিপজ্জনক বর্জ্যের পরিমান ও কিভাবে এই বর্জ্য নষ্ট করা হয় তা সম্পর্কে পলিউশন ক®¾ট্রাল বোর্ডগুলির কাছে তথ্য জানতে চায়। এবং তখন দেখা যায় যে রাজ্য পলিউশন ক®¾ট্রাল বোর্ড থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় পলিউশন ক®¾ট্রাল বোর্ড কারুর কাছেই কোনো তথ্য নেই।!!

    শেষে যে সুপ্রীম কোর্টই এই বিষয়ে একটি হাই পাওয়ার কমিটি তৈরী করে ও এই কমিটি ২০০১ এ সুপ্রীম কোর্টে রিপোর্ট জমা দেয়, সে অন্য গল্প। এই কমিটির রিপোর্ট ও একই সাথে চলা অন্যান্য অনুসন্ধানে উঠে আসে চমকে দেওয়ার মত সব তথ্য। তার মধ্যে ক্রোমিয়াম-দূষণের ওপর কয়েকটি কেস স্টাডির মাধ্যমে আমাদের দেশের অবস্থাটা দেখার চেষ্টা করব।

    গুজরাট পলিউশন ক®¾ট্রাল বোর্ডের হিসেব অনুযায়ী, বদোদরার কাছে গরবা শিল্পাঞ্চল এলাকায়, হেমা কেমিক্যাল নামে একটি রঙের কারখানা, গত ২০ বছর ক্রোমিয়াম বর্জ্য ফেলেছে। পরিমাণটা কত জানতে চান ? ৭৭,০০০ হাজার মেট্রিক টন। ২০০১ এর একটি গবেষণায়,

    National Institute of Occupational Health of Ahmedabad
    জানায় যে হেমা কেমিক্যাল এর কর্মীদের রক্তে ক্রোমিয়ামের পরিমান স্বাভাবিকের (পরীক্ষায় ব্যবহৃত ক®¾ট্রাল সাবজেক্টদের) তুলনায় দ্বিগুণ। অথচ মাটিতে, মাটির নিচের জলে, Ùথানীয় জলাশয়ে (পুকুর, নদী ইত্যাদি) কতখানি দূষণ ছড়িয়ে পড়েছে সেই ব্যাপারে কোন কাজই হয়নি। এমনকি কাছাকাছি জনবসতিগুলোতে মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর এই দূষণের কি প্রভাব তা নিয়েও কোন কাজ হয়নি। তবে স্থানীয়

    NGO
    পর্য্যাবরন সুরক্ষা সমিতির দাবি, এখানেও মানুষের রক্তে ক্রোমিয়ামের পরিমান যথেষ্ট বেশী। এবার এই বিষয়ে সুপ্রীম কোর্ট মনিটরিং কমিটির ২০০৪ সালের রিপোর্ট কি বলছে একটু দেখে নিই। এই কমিটির রিপোর্টে বলা হয় যে  ""১৯৮৯-এ বিপজ্জনক বর্জ্য আইন কার্যকর হওয়ার পর থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত এই সংস্থা, কারখানার আশেপাশে বেআইনীভাবে ৭৭০০০ টন বিষাক্ত ক্রোমিয়াম বর্জ্য ফেলেছে। আর ১৯৬৫ থেকে ১৯৮৯ অবধি যে ঠিক কত বিষাক্ত বর্জ্য ছড়িয়েছে, তার কোন হিসেব নেই। বিষাক্ত বর্জ্য কতদূর ছড়িয়েছে তার কোন ম্যাপ না এই সংস্থা তৈরী করেছে, না কর্তৃপক্ষ (গুজরাট পলিউশন ক®¾ট্রাল বোর্ড)''। এলাকার জনস্বাস্থ্যের ওপর দূষণের প্রভাব সম্বন্ধে সুপ্রীম কোর্ট মনিটরিং কমিটির মন্তব্য : ""

    the contaminated soil and groundwater has exposed the residents of the Gorwa industrial region to dangerous toxins and thus gravely endangered their health and well-being
    ''।

    এবার দেখা যাক কেমন আছেন হেমা কেমিক্যালের কর্মীরা? ১৯৯৯ থেকে ২০০১ এর মধ্যে ক্রোমিয়ামের বিষক্রিয়ায় মারা যান ৯ জন কর্মী।

    National Institute of Occupational Health of Ahmedabad
    আর বদোদরার ফ্যাক্টরি ইন্সপেক্টর্‌স্‌ অফিসের উদ্যোগে করা স্বাস্থ্যপরীক্ষায় পাওয়া তথ্য হল এইরকম



  • ১৪.৮% কর্মীর রক্তে ক্রোমিয়ামের পরিমাণ গ্রহণযোগ্য মাত্রার তুলনায় অনেক বেশি। কিছু কিছু ক্ষেত্রে প্রতি ১০০ মি.লি. রক্তে ২৭ মাইক্রোগ্রাম অবধি (যেখানে ভারতে পানীয় জলের ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য মাত্রার (প্রতি লিটারে ৫০ মাইক্রোগ্রাম) সঙ্গে তুলনা করলে দাঁড়ায় পাঁচ গুণেরও বেশী)।




  • ক্রোমিয়াম সম্পর্কিত জৈব-রাসায়নিক (

    biochemical
    ) অস্বাভাবিকতা ও তার থেকে অসুস্থতার উপসর্গ দেখা গেছে ২৫% "হাই রিস্ক' কর্মীদের মধ্যে।




  • হেমা কেমিক্যাল ইউনিট ১ এর ১৩ জন কর্মী

    Nasal septum perforation
    এবং ১৬ জন কর্মী ডার্মাটাইটিসের শিকার।




  • হেমা কেমিক্যাল ইউনিট ২ এর ৩০ জন কর্মী

    Nasal septum perforation
    এবং ১১ জন কর্মী ডার্মাটাইটিসের শিকার।


  • সুপ্রীম কোর্টের প্রোঅ্যাকটিভ হওয়ার দৌলতে সরকারী রেগুলেটরি সংস্থাগুলির ঘুম অনেক দেরীতে ভাঙলেও, পরিবেশকর্মীরা, বিশেষ করে পর্য্যাবরন সুরক্ষা সমিতি, ও পিপ্‌ল্‌স্‌ ইউনিয়ন অফ সিভিল লিবার্টিস অনেকদিন থেকেই হেমা কেমিক্যালের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। মিডিয়ার একাংশও। কিন্তু তাতে ফল হয়নি কিছুই। ২০০৪ অবধি হেমা কেমিক্যাল দূষণ নিয়ন্ত্রনের জন্য কিছুই করেনি। রহস্যজনকভাবে গুজরাট পলিউশন ক®¾ট্রাল বোর্ডও কোনো অজ্ঞাত কারণে হেমা কেমিক্যালের ক্ষেত্রে সরকারী আইন কার্যকর করতে অদ্ভুত গড়িমসি করেছে। হেমা কেমিক্যালের মালিকের রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে আইনকে বুড়ো আঙুল দেখানোর কথা মনিটরিং কমিটিও তাদের রিপোর্টে উল্লেখ করেছে। সুপ্রীম কোর্ট অবশ্য হেমা কেমিক্যাল-কে ৩.৯ মিলিয়ন ডলার জরিমানা করে ও দূষিত অঞ্চলে রেমিডিয়েশনের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেয়।

    আসলে বিপজ্জনক বর্জ্য-আইন না মানার প্রবণতা ও আইন এনফোর্স করার জন্য প্রয়োজনীয় সচেতনতা, সদিচ্ছা ও পরিকাঠামোর অভাবের কারণে চিত্রটা সব রাজ্যেই একই রকম। উত্তরপ্রদেশেও ক্রোমিয়াম-জনিত দূষণ ক্রমশ ভয়াবহ আকার নিচ্ছে।

    Central Pollution Control Board
    -এর '৯৭সালে প্রকাশিত স্ট্যাটাস রিপোর্ট -

    Groundwater Quality in Kanpur, Status Sources and Control Measures
    এ দেখা যাচ্ছে কানপুরের বেশ কিছু অঞ্চলে মাটির নিচের জলে ক্রোমিয়ামের পরিমান ভারত সরকারের বেঁধে দেওয়া দূষণ সীমার থেকে ১২৪-২৫৮ গুণ বেশী। এই ক্রোমিয়াম আসছে আসলে ট্যানারি ও বেসিক ক্রোম-সালফেট বানায় এমন কোম্পানিগুলোর বর্জ্য থেকে। বিপদের ঝুঁকির মধ্যে থাকা মানুষের সংখ্যা প্রায় ৩০,০০০!

    এবার একটু নজর দেওয়া যাক ঘরের কাছে কলকাতার দিকে। এখানেও দূষণের মূল কারণ হল ট্যানারি। চামড়া রঙ করা ও সংরক্ষনের কাজে লাগে ক্রোমিয়াম। ক্রোমিয়াম আসে লেড স্মেল্টিং কারখানার বর্জ্য থেকেও। ব্যবহারের পর বর্জ্য ক্রোম-সলিউশন নির্বিচারে ফেলে দেওয়া হয় মাটিতে, ওয়েটল্যান্ডে। সেখান থেকে মাটির তলার জলস্তরে ক্রোমিয়াম পৌঁছে যাওয়া শুধু সময়ের অপেক্ষা। দূষণ রিপোর্টেড হয়েছে সায়েন্স সিটির কাছে আরুপুটো গ্রাম, ট্যাংরা, ও তিলজলাতে। এর মধ্যে মাটির তলার জলস্তর বেশ উঁচুতে হওয়ায় ট্যাংরাতে দূষণ ছড়িয়ে পড়ার আশংকা বেশী। আর এই বেপরোয়া ভাবে ডাম্প করা ক্রোমিয়াম প্রকৃতির নিয়ম মেনে পানীয় জলে মিশবেই। আর কাল হোক কি কুড়ি বছর বাদে হোক সেই বিষাক্ত জল পান করবে আপনার বা আমার পরিবারের কেউ। হিসেব বলছে কলকাতা ও কাছাকাছি অঞ্চলে প্রায় ২০০,০০০ মানুষের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা।

    পাশের রাজ্য ওড়িশাও পিছিয়ে নেই। অবশ্য তীব্র খরা, অনাহারে মৃত্যু, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও সাম্প্রতিক সাম্প্রদায়িক হানাহানির মধ্যে ক্রোমিয়াম দূষণ সবচেয়ে আন্ডাররেটেড। এই রাজ্যে দূষনের মূল কারণ ক্রোমাইট আকরিকের খনি। খনির বর্জ্যের মধ্যে থাকে দ্রাব্য ক্রোমিয়াম যা মিশে যায় মাটির নিচের জলে বা কাছাকাছি পুকুর, নদীতে।

    Orissa Voluntary Health Association
    এর সার্ভে অনুযায়ী, খনি অঞ্চলে ৮৪.৭৫% ও শিল্প এলাকার গ্রামগুলিতে ৮৬.৪ ২% মৃত্যুর কারণ হল খনি থেকে হওয়া দূষণ। ক্রোমিয়াম দূষণে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ২.৬ মিলিয়ন ছাড়িয়ে গেছে।

    তালিকা বাড়িয়ে আর লাভ নেই। শুধু আর একটা কেস স্টাডি এক লাইনে বলে নেব। চেন্নাইয়ের কাছে রানীপেট-এ ক্রোমিয়াম দূষণে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ৩.৫ মিলিয়নেরও বেশী। এই কেস-স্টাডি গুলোর মধ্যে দিয়ে উঠে আসা খন্ডচিত্রগুলো সামগ্রিক অবস্থা সম্বন্ধে একটা ধারণা অবশ্যই দেয়। সেই ধারণাটা হল - এই ভাবে চলতে থাকলে অবধারিতভাবেই এক বিপর্যয়ের দিকে এগোচ্ছি আমরা। কিন্তু সময় থাকতে কি একটু সচেতন হয়ে এই বিপদ এড়ানো যায় না? পরিবেশ আইন সঠিকভাবে এনফোর্স করা, দূষণ কতটা ছড়িয়ে পড়েছে তার ম্যাপ তৈরী করে অবিলম্বে প্রতিকারের ব্যবস্থা নেওয়া, প্রতিটি রাজ্যে মানুষের ও পরিবেশের কথা ভেবে (লগ্নীকারী কেমিক্যাল কোম্পানির স্বার্থের জন্য নয়) পরিবেশ সংক্রান্ত পলিসি গ্রহণ করা - এই রকম ছোট অথচ দৃঢ় কয়েকটা পদক্ষেপ নিলেই লক্ষ লক্ষ মানুষকে এই বিপদের হাত থেকে বাঁচানো যায়।

    নাকি আমাদের অপেক্ষা করে থাকতে হবে কোনো ভারতীয় এরিন ব্রকোভিচের জন্য?

    সূত্র:

    http://www.thebiographychannel.co.uk/biography_story/1564:1812/2/Erin_Brockovich.htm

    http://www.worstpolluted.org

    T. Chakrabarti and C Alvares. Supreme Court Monitoring Committee on Hazardous Wastes:Hazardous Wastes of Hema Chemicals, Vadodara. 2004.

    C. Pellerin and S.M. Booker. Reflections on hexavalent chromium: health hazards of an indusrial heavyweight. Environmental health perspectives, pages 402–407, 2000.

    D.C. Sharma. By Order of the Court: Environmental Cleanup in India. Environmental Health Perspectives, 113(6):A394, 2005.

    জুন ৭, ২০০৯

     

  • বিভাগ : আলোচনা | ০৭ জুন ২০০৯ | ৪০৭ বার পঠিত
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:

কুমুদি পুরস্কার   গুরুভারআমার গুরুবন্ধুদের জানান


  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। আদরবাসামূলক মতামত দিন