• বুলবুলভাজা  ধারাবাহিক  স্মৃতিকথা

  • উত্তরবঙ্গ - ১৩

    শমীক মুখোপাধ্যায় লেখকের গ্রাহক হোন
    ধারাবাহিক | স্মৃতিকথা | ২০ এপ্রিল ২০১১ | ৩৯১ বার পঠিত
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন পুনঃপ্রচার
  • ল্যাংটা

    এরা সকলেই আজ জীবনে সুপ্রতিষ্ঠিত, আসল নামে যাবার প্রয়োজন নেই, হস্টেলের নিকনেমের আশ্রয় নেওয়াই তাই শ্রেয় মনে করলাম। রসিকজন ঠিক চিনবে, ল্যাংটা কে।

    ল্যাংটার নাম কেন ল্যাংটা হয়েছিল, সে আর এতদিন বাদে মনে নেই, তবে যদ্দূর মনে পড়ে র‌্যাগিংয়ের সময়ে সে ঐ চা-বাগানে দৌড়ের সময়ে জামা-কাপড় খুলে "ল্যাংটা' হবার সম্ভাব্যতা সম্পর্কে আশঙ্কা প্রকাশ করে ফেলেছিল আগেভাগেই। সেই থেকে সিনিয়রেরা তার নাম দিয়ে দিয়েছিল ল্যাংটা।

    ইলেক্ট্রিকালে আমাদের ইয়ারে ছিল একটি মেয়ে। সুজাতা। বর্ধমানের এক গ্রামের দিকে বাড়ি, "স'-এর দোষ ছিল উচ্চারণে। ফার্স্ট ইয়ারের প্রথম সপ্তাহে সে আমাকে প্রকাশ্যে "এই সোমীক, সোন্‌' বলে ডেকেছিল, কারণটা ছিল নেহাৎই নিষ্পাপ, কোনও একটা বই দেবার বা নেবার ছিল, কিন্তু সেই থেকে আমার নামের সাথে সুজাতার নাম জুড়ে গেল। প্রসঙ্গত, আমার ইনটেক র‌্যাগিংয়ের পর হলেও গান গাইতে হয়েছিল প্রচুর, আর অনেক সুমন নচি অঞ্জনের গান গেয়েছিলাম বলে আমার নাম হয়ে গেছিল জীবনমুখী। শর্টে জীনু। আমার উইংয়ের বন্ধুরা আমাকে এখনো জীনু বলেই ডাকে। ... তো, সেই জীনু আর সুগু, মানে সুজাতাকে নিয়ে বিরিয়ানি কিছু কিঞ্চিৎ তৈরি হল হস্টেলে।

    আমি তখন সদ্য দাগা খেয়ে এসেছি। কমলা রংয়ের সালোয়ার কামিজ আর ঘিয়ে রংয়ের সোয়েটারের সেই "না' বলার ঘা বুক থেকে তখনো মোছে নি। সেই সময়ে অন্য কোনও মেয়ের সাথে নিজেকে জড়ানো, কেমন পাপ-পাপ একটা ফিলিং হত। আদারওয়াইজ, সুজাতা মেয়েটা মন্দ ছিল না, খুব মিষ্টি পানপাতা কাটিং মুখ, কেবল প্রস্থে ছিল আমারও অর্ধেক। তো, যাই হোক, আমি দেখলাম, সুজাতার সঙ্গে আমার "কিছু নেই' এটা মার্কেটে প্রতিপন্ন করতে গেলে লাভ তো হবেই না, উল্টে আওয়াজে আওয়াজে আমার জীবন ওষ্ঠাগত হবার চান্স আছে। অতএব, আমি এই সব ইনিশিয়াল আওয়াজ খুব রেলিশ করতে লাগলাম এবং সমস্ত আওয়াজের জবাবেই আমি সবাইকে বলে বেড়াতে লাগলাম, হ্যাঁরে, সুগুর ওপর আমার বেজায় ব্যথা, কবে যে যাবো ওর সাথে দেখা করতে ... ইত্যাদি ইত্যাদি।

    দেখলাম, ফল হল। আওয়াজ আস্তে আস্তে কমে গেল। লোকেও বুঝল যে আমার কোনও ব্যথা নেই সুজাতার ওপর। কিন্তু চিরস্থির কবে নীর হায় রে জীবন নদে ইত্যাদি প্রভৃতি, দেড়শো জনের ব্যাচে পাঁচটি মাত্র মেয়ের ওপর ব্যথা খাবার ছেলে কম হল না।

    সুজাতার ওপর ল্যাংটার ব্যথাটা আমি, বা আমরা অনেকদিন আগেই অনুভব করেছিলাম। অল্পবিস্তর আওয়াজও দিয়েছিলাম। ততদিনে সেই পুরনো ঘা শুকিয়ে গেছে, কিন্তু "ভালোবাসা' ব্যাপারটার প্রতি আমার কেমন একটা সফট কর্নার রয়েই গেছিল। কেউ কাউকে ভালোবেসেছে বুঝতে পারলে, কেমন মায়া হত, নিজের মধ্যে একটা কারণহীন ভালোলাগা তৈরি হত। এ সবই পশ্চদ্‌পক্কতার লক্ষণ, পরে বুঝেছিলাম, যখন নিজে সত্যিকারের প্রেমে পড়েছিলাম।

    যাই হোক, ততদিনে ক্যাম্পাসে আমাদের সুদীর্ঘ চার বছর অতিক্রান্তপ্রায়। আমরা ফোর্থ ইয়ারের হস্টেলে। সেখানে প্রত্যেকের জন্য একটা করে রুম। রুম না বলে খুপরি বলাই ভালো। ছ-ফুট বাই ছ-ফুট। একটা খাট, একটা টেবিল-চেয়ার, আর দাঁড়াবার জন্য একচিলতে জায়গা। ব্যস।

    আমাদের চিরন্তন অভ্যেসমতো সন্ধ্যেটা কাটতো টাউনে ঘোরাঘুরি করে, বাওয়ালবাজি করে। পড়াশোনা শুরু হত রাত দশটার পর। সেদিন ছিল শনিবার। পরদিন ছুটি। সোমবার কিছু সেশন্যাল জমা দিতে হবে, বেশি রাত পর্যন্ত জেগে নামিয়ে দেওয়া যাবে, পরদিন তো রোব্বার, সেই অভিপ্রায়ে ল্যাংটা এল আমার রুমে, রাতের খাওয়া সেরে।

    সেশন্যালের কাজ খানিক করার পরেই বোঝা গেল তেমন কিছু না, ও কাল-করলেও-চলবে টাইপের। ল্যাংটারই দেখলাম, ঠিক মন নেই, কিছু একটা তোলপাড় করছে ওর ভেতরে।

    অবশেষে রাত প্রায় সাড়ে বারোটা নাগাদ, লজ্জার মাথা খেয়ে, বিনা সিগারেটে বিনা মদে ল্যাংটা জিজ্ঞেস করেই ফেলল, জীনু, তুই সুজাতাকে কি ভালোবাসিস?

    এবার আমার ফ্যাক করে হাসার পালা। কিন্তু সামনে অসহায় আর্ত প্রেমিককে দেখে হাসতেও পারলাম না। কতকটা কনসোলেশনের ভঙ্গিতে বললাম, না-রে। আমার ল্যাজ অন্য জায়গায় বাঁধা আছে। আর যাই করি, ইঞ্জিনীয়ারিং কলেজের মেয়ের সাথে আমি প্রেম করব না। (এর অর্ধেক ঢপ, তখন আমি অন্যত্র ল্যাজ বাঁধবার চেষ্টা করছিলাম মাত্র, সেটা সফল হয় আরও এক বছর পর, তখন আমি অলরেডি জলপাইগুড়ি ছেড়ে চলে এসেছি)

    ল্যাংটা কন্‌ভিন্সড হল। মনে মনে বোধ হয় ভাবল, এর কাছে মনের কথা বলা যায়। আমিই ওকে হাল্কা হাল্কা করে এই ঐ তাই জিজ্ঞেস করে করে ভেতরের প্রেম জাগিয়ে তুললাম। তখন কী আর জানতাম, সারারাত জাগতে হবে আমাকে ওর একতরফা প্রেমকাহিনি শোনার জন্য!

    সত্যি সারারাত জেগেছিলাম। ধৈর্য ধরে শুনেছিলাম এক বাচ্চা প্রেমিকের ভালোলাগার গল্প। বাচ্চাই বটে। ফোর্থ ইয়ারে পড়লেও ল্যাংটার বয়সোচিত ম্যাচিওরিটি তখনো আসে নি, অথবা, কে জানে, প্রেমে পড়লে অনেক ম্যাচিওর্ডও ইম্ম্যাচিওর্ড মনে হয়। হয় তো ইম্ম্যাচিওর্ড কথাটাও ঠিক হল না, আসলে ছেলেটা ছিল বড্ড সরল মনের। ... সেই কবে হংকং মার্কেটে যাবার দিন বাসস্ট্যান্ডে দেখে সুজাতাও ঐ একই জায়গায় যাবার জন্য রেডি, ও সুজাতাকে টিকিট কেটে দিয়েছিল বাসে, সুজাতা তাতে মিষ্টি হেসে থ্যাঙ্কিউ বলেছিল, তারপরে ফেরার পথে ও সুজাতাকে লেডিজ হস্টেলের গেট অবধি পৌঁছে দিয়েছিল, কিন্তু মনের কথা বলি-বলি করেও বলতে পারে নি, ...শুনতে শুনতে মনের মধ্যে অনেক কিছু ফ্ল্যাশব্যাক চলছিল। ক্লাস টুয়েলভে সেই তার হাসি দেখে, তার তাকানো দেখে "কটাক্ষ' কথাটার মানে অনুভব করতে শিখেছিলাম, কতদিন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে প্র্যাকটিস করেছি, কেউ জানতে পারে নি, কেউ না, তবু বলতে পারি নি, ... হুবহু মিলে যাচ্ছিল। তফাৎটা শুধু চার পাঁচ বছরের।

    ল্যাংটাও বোধ হয় এত ভালো শ্রোতা এর আগে কখনও পায় নি। ইন ফ্যাক্ট সেই বয়েসে আমার ভীষণ ধৈর্য ছিল, আর প্রেমকাহিনি শুনতে কার না ভালো লাগে? শুনছি, বুঝতে পারছি যে-যে ইনস্ট্যান্সের উদাহরণ দিয়ে ও আমাকে বোঝাবার চেষ্টা করছে যে, সুজাতাও মনে মনে ওকে চায়, সেগুলো একেবারেই মীনিংলেস, কিন্তু সে-সব কথা বলে তার হ্যালু কাটাতে ইচ্ছে হল না। আপাত-অর্থহীন নানা অ-ঘটনার ঘটনাবলীতে যখন গল্প থামল, ঘড়িতে তখন বাজে সকাল সাড়ে পাঁচটা। আকাশ লাল করে সূর্য উঠছে। রোববারের সকালটা ভোগে গেল।

    আমরা দুই বিরহী প্রেমিক চার বছরের মাথায় সেই সকালে প্রথমবারের জন্য মর্নিং ওয়াক করতে বেরোলাম। চা-বাগানের মাথায় হাল্কা লেপের মত জড়িয়ে আছে কুয়াশা, তার বুক চিরে হুশ্‌-হুশ করতে করতে বেরিয়ে গেল আসামগামী কোনও এক্সপ্রেস ট্রেন, কিংবা কে জানে, কামরূপ বা তিস্তা-তোর্সা ঢুকল বোধ হয়। আমরা লেডিজ হস্টেলের দিকের রাস্তাটা ধরলাম। সারা ক্যাম্পাস ঘুমিয়ে, কেউ দেখবে না, কেবল কিছু স্বাস্থ্যসচেতন প্রফেসরদের সাথে দেখা হয়ে যাওয়া ছাড়া, তা, তাতে আর কবে ফোর্থ ইয়ার ভয় পেয়েছে!

    লেডিজ হস্টেলও ঘুমিয়ে ছিল, স্বাভাবিকভাবেই। পাশ দিয়ে আমরা বেরিয়ে গেলাম, ল্যাংটা দীর্ঘশ্বাস গোপন করল। তারপরে কলেজ মোড়ে গিয়ে পাঁউরুটি আর ঘুগনি দিয়ে ব্রেকফাস্ট, ফিরে এসে যে-যার রুমে এসে ঘুম।

    ... বলবার মত বিশেষ কোনও ঘটনা ছিল না এটা, তবু, টুকরো টাকরা স্মৃতির মতই সেই রাতটা মনে রয়ে গেছে। চারটে বছরের অনেকগুলো রাতের মধ্যে একটা রাত।

    কাকা

    ঐ একই ডেকোরাম মেনে কাকারও আসল নাম আর লিখলাম না। রসিকজন, বিশেষত আমাদের সময়কালের লোকজন যারা পড়বে এই লেখা, তারা নিশ্চয়ই একডাকে চিনবে কাকাকে, আর খুব মাথা চুলকোবে কাকার আসল নামটা মনে করার জন্য। আমার নিজেরও কাকার প্রথম নামটাই কেবল মনে আছে এখন, পদবিটা ভুলে মেরে দিয়েছি বেমালুম।

    কাকা নিজেও একেবারে পছন্দ করত না তার আসল নাম ধরে ডাকা। কাকার মুখটা এমনিতেই ছিল গালাগালির আখড়া, তার ওপরে তাকে কেউ যদি "কাকা' না বলে তার আসল নাম ধরে ডাকত, কাকা গালাগাল দিয়ে তার চোদ্দপুরুষ উদ্ধার করে ছাড়ত। সেই থেকে প্রবাদ চালু হয়ে গেছিল, কাকার আসল নামটাই আসলে একটা জঘন্যতম গালাগাল, সেই জন্যেই কাকা অত রেগে যায়। পরে আমরা মজা করে কাউকে খুব গালাগাল দেবার ইচ্ছে হলে কাকার আসল নামটা রেফার করতাম।

    মুখে অষ্টপ্রহর গালাগালির ফোয়ারা ছুটলেও, কাকার মতন ভালো মনের মানুষ খুব কম ছিল। বেশ পরোপকারী ছেলে। কাকা আমাদের উইংসে থাকত না, সে থাকত অন্য উইংসে। কিন্তু সর্বক্ষণ তাকে অন্য অন্য উইংসেই দেখা যেত। প্রতি মুহূর্তে সে কারুর না কারুর পেছনে লেগে চলেছে, মুখে গালাগালির বন্যা, কিন্তু কখনও তার ওপর কাউকে রাগ করতে দেখি নি। কাকা নাকি ঘুমের ঘোরে স্বপ্নেও গালাগাল দিয়ে যেত। কাকে দিত সে অবিশ্যি জানা যায় নি কখনও, কারণ ঘুম থেকে ওঠার পরে কাকার স্বপ্ন মনে থাকত না।

    লতা, রফি ও অন্যান্য গানের প্রতিভা

    কোন্‌ ইয়ার এখন আর মনে নেই, একদিন রমাবৌদি এসে আমায় বলল, জীনু ফোর্থ ইয়ার হস্টেলে চল্‌, একজনকার সাথে আলাপ করিয়ে দেব, রফিদা। তুই তো গান টান নিয়ে থাকিস, মস্তি হবে।

    রমাবৌদি ছিল খেলার জগতের লোক, গানের জগতের নয়, পরে ও আমাদের কলেজের স্পোর্টস সেক্রেটারি হয়েছিল। কিন্তু ঐ রফিদার সাথে আলাপ করিয়ে দেবার ব্যাপরে ওর কাছে আমি কৃতজ্ঞ। রফিদার আসল নাম কী ছিল মনে নেই, সে ছিল আমাদের রেসপেক্টে ফিফ্‌থ ইয়ার, মানে, আমরা তাকে কলেজে কোনওদিন দেখি নি, আমরা যে বছর কলেজে ভর্তি হই, সেই বছরই রফিদা পাস করে বেরিয়ে ফিলিপ্‌স জয়েন করেছিল। কিন্তু কোনও কারণে রফিদাকে মাঝে মাঝেই জলপাইগুড়ি আসতে হত; আর জলপাইগুড়ি এলেই হস্টেলে আসা তার মাস্ট ছিল।

    সেই রকমই একবার রফিদার সাথে আলাপ হল, রফিদা তখন ভক্তজনপরিবেষ্টিত হয়ে বসে গুলতানি মারছে। খানিক বাদেই শুরু হল তার গান। আর কেউ না, মহম্মদ রফিরই গান সে গাইত, আর পুরো মনে হত আমাদের সামনে স্বয়ং রফিই যেন গান গাইছেন। গান শেখা নেই, তালিম নেওয়া গায়ক নয়, কিন্তু সেই সন্ধ্যেয় প্রথম শুনলাম যখন, সুহানী রাত ঢল চুকি হ্যায়, না জানে তুম কব আওগে, তারপরেই ও দুনিয়া কে রাখওয়ালে, আর তারপরে ইয়াদ না জায়ে বীতে দিনোঁ কি, পুরো রুমটার পরিবেশ বদলে গেল লহমায়। গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল, চারপাশের সবকিছু মুছে গেল, কেবল সুরটা ভেসে ভেসে চলল বাইরে বড় মাঠের প্রান্তে জ্বলতে থাকা হ্যালোজেনের হলুদ আলোর দিকে, সেই আলোর রেশ ছাড়িয়ে আরো পেছনে, অন্ধকার চা-বাগানের ভেতরে।

    এই রকম আরেকজন ছিল লতাদা। নামেই বোঝা যাচ্ছে, এ লতা মঙ্গেশকরের গলায় গান গাইত, এবং গাইত একজন ছেলে হয়ে। শুনতে
    বেশ অবাক লেগেছিল। লতা অবশ্যই এর নিকনেম, আসল নামে আর না-ই বা গেলাম, আমরা সবাইকেই এই রকম নিকনেমেই বেশি চিনতাম।

    লতাদা ছিল আমাদের রেসপেক্টে ফোর্থ ইয়ার। লতাদার সম্পর্কে শুনে প্রথমেই ভেবেছিলাম, নিশ্চয়ই ব্যাপারটা ওভারহাইপ্‌ড। একটা
    ছেলে যতই চেষ্টা করুক, সে কী করে সম্পূর্ণভাবে মেয়েদের গলায় গাইতে পারবে? কিছু হলেও একটু বিকৃতি তো নজরে আসবেই! তা
    ছাড়া লতা মঙ্গেশকরের নিজের স্কেলটাও আম গায়িকাদের থেকে বেশ উঁচুতে, এফ শার্প না কী যেন, সচরাচর কেউ ঐ স্কেলে গায় না।
    সেই স্কেলে একজন ছেলের পক্ষে গাওয়া তো একেবারেই সম্ভব নয়। লোকে নিশ্চয়ই বাড়িয়ে বলছে।

    আমি যে কতটা ভুল ভেবেছিলাম, তা বুঝলাম যেদিন সামনাসামনি বসে লতাদার গান শুনলাম। যাবার বেলায়, পিছু থেকে ডাক দিয়ে
    কেন বলো, কাঁদালে আমায়। ... সামনে, মুখোমুখি বসে থেকেও, স্রেফ চোখটা বুজে থাকলে যে-কেউ মনে করবে খুব মিষ্টি সুরেলা
    গলার একটা মেয়ে গাইছে। অনেকটা আমাদের ইপিস্তার মতন। :-) একটা বাইশ তেইশ বছরের ছেলের যে এমন সুন্দর মেয়েদের গলা হতে পারে, এ নিজের কানে না শুনলে বিশ্বাস করা যাবে না।

    আবার যাঁরা গান-টান নিয়ে চর্চা করেন, তাঁরা জানেন, গলার মাইক-ফিটনেস বলে একটা ব্যাপার থাকে। স্বয়ং মহম্মদ রফির গলা নাকি ছিল বেশ ফ্যাঁসফেঁসে। কেবল মাইক্রোফোনের সামনে পড়লে সেই গলায় জাদু খেলে যেত, পুরো ভারত যার প্রেমে পড়ে যেত। আমাদের উইংয়ে ছিল ইন্দ্রজিৎ বলে একটা ছেলে। তোতলামির দোষ ছিল, কেবল গান গাইত অসাধারণ, বিশেষত কিশোরকুমারের গান, গানের সময়ে একবারও তার কথা আটকাতো না। কিন্তু তার গানের অসাধারণত্ব সীমাবদ্ধ ছিল কেবল ঘরোয়া চৌহদ্দির মধ্যেই। মাইকে তার গলা একেবারেই ফিট করত না, বেশ বাজে লাগত। কিন্তু লতাদার বেলায় দেখেছিলাম এই এক অদ্ভুত ব্যাপার। সামনাসামনি বসে তো মিষ্টি লেগেছিল বটেই, প্রথম মাইকে তার গান শুনি কলেজের কালচারাল প্রোগ্রামে; গেয়েছিল আরতি মুখোপাধ্যায়ের "এক বৈশাখে দেখা হল দুজনায়'। সে গানের মাধুর্য যেন সবকিছুর ওপরে ছিল। গোটা অডিটোরিয়াম মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনেছিল সেই গান। গলার মিষ্টত্বের যেন কোনও শেষ থাকত না লতাদা যখন মাইক্রোফোনের সামনে গাইত।

    লতাদা, রফিদা পরেও এসেছিল কলেজে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে, গান গাইতে। কলেজ ছাড়ার পরে আর, যা-হয়, যোগাযোগ রাখা হয়ে ওঠে নি।

    (চলবে)


  • বিভাগ : ধারাবাহিক | ২০ এপ্রিল ২০১১ | ৩৯১ বার পঠিত
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন গ্রাহক পুনঃপ্রচার
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ভ্যাবাচ্যাকা না খেয়ে মতামত দিন