• বুলবুলভাজা  ধারাবাহিক  গান

  • গানের ঝর্ণাতলায় ( তৃতীয় পর্ব )

    দীপংকর বসু লেখকের গ্রাহক হোন
    ধারাবাহিক | গান | ০৫ সেপ্টেম্বর ২০১১ | ২৮৬ বার পঠিত
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন পুনঃপ্রচার
  • (৪)

    মূলত আমার বাবা স্বর্গত পদ্মলোচন বসু এবং শ্রী স্যামল কুমার দত্ত চৌধুরীর উদ্যোগে আর সেই সঙ্গে জামশেদপুরের টেলকো অঞ্চলের আরো বহু সংস্কৃতিমনস্ক মানুষের সহায়তায় টেলকোতে রবীন্দ্র সংসদ নামে একটি সাংস্কৃতিক সংস্থা গড়ে উঠেছিল। সংস্থাটি একদিকে যেমন সংগীত, চিত্রকলা, হস্তকলা ও আরো নানাবিধ বিষয়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছিল, তেমনি প্রতি বছর রবীন্দ্র জন্মোৎসব পালন করত। দুদিন ব্যাপী অনুষ্ঠানে রবীন্দ্রনৃত্যনাট্য, গীতিআলেখ্য, নাটক প্রভৃতি মঞ্চস্থ করত। এই সব অনুষ্ঠানে যোগ দিতাম আমরা ছোটো বড় সকলেই। অনুষ্ঠানটি সুচারুভাবে সম্পন্ন করার জন্য মহড়া চলত সেই ফেব্রুয়ারি বা মার্চ মাস থেকে। আর একটি শাখা ছিল সংস্থাটির - রবীন্দ্র পাঠচক্র। এটি পরিচালনা করতেন জামশেদপুর শহরের এক বিশিষ্ট কবি তথা সাহিত্যসেবী স্বর্গত গোপালহরি বন্দ্যোপাধ্যায়। আত্মপ্রচারবিমুখ মানুষ্টি রবীন্দ্রনাথ তথা বাংলা সহিত্যের প্রতি তাঁর আন্তরিক ভালোবাসার জোরে পাঠচক্রের সাপ্তাহিক অধিবেশনগুলি পরিচালনা করে গেছেন প্রায় কুড়ি বছর কালব্যপী।

    যাই হোক, এই গুরুগম্ভীর কার্যক্রমের মধ্যেই নিছক আড্ডাও জায়গা করে নিত কোন কোন সময়ে। এই রকম কোন আড্ডায় একবার প্ল্যানচেটে স্বর্গগত মানুষদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের কথা ওঠে। পরপর বেশ কয়েকটি প্ল্যানচেটের আসর বসেছিল সে সময়ে - যে সমস্ত মৃত ব্যক্তিদের আত্মার সঙ্গে প্ল্যানচেটে যোগাযোগ করা গিয়েছিল তাঁদের মধ্যে উল্লেখ যোগ্য হলেন রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ। প্ল্যানচেটে রবীন্দ্রনাথের আত্মার সঙ্গে কথপোকথনের কালে কেউ দেবব্রত বিশ্বাসের গায়ন সম্পর্কে রবীন্দ্রানাথের আত্মার অভিমত জানতে চাইলে জবাব পাওয় গিয়েছিল যে তৎকালীন রবীন্দ্র সংগীত শিল্পীদের মধ্যে দেবব্রত বিশ্বাসই হলেন সর্বোৎকৃষ্ট গায়ক।

    সংবাদটি বাবা চিঠি লিখে জর্জদাকে জানালে উত্তরে জর্জদা একটি দীর্ঘ চিঠি লেখেন । চিঠিটির প্রতিলিপি তুলে দিলাম পাঠক পাঠিকাদের জন্য।

    কলকাতা
    ৫/১২/৭৭

    প্রীতিভাজনেষু পদ্মলোচনবাবু,
    বহুদিন বাদে হঠাৎ আপনার ১।১১।৭৭ তারিখের চিঠি এল পড়তে পড়তে আমার একটি বহুপুরোনো গল্প মনে পড়ে গেল।শুনেছি (ঠিক কিনা জানিনা) রবিবাবুর অনিষ্টকর নয় এমন কিছু ব্যামো ছিল। রবিবাবু যখন লেখার কাজে নিবিষ্ট ভাবে ব্যস্ত থাকতেন তখন হঠাৎ কোন কিছুর প্রয়োজন হলেই তাঁর পূত্রকে রথীইইইইইইইইইইইইই রথী বলে চেঁচিয়ে ডাকতেন। এই ব্যারামটি নাকি আর একজন নামজাদা লেখকের মাথায় সংক্রমিত হয়েছিল। লেখকটির নাম তারাশঙ্করবাবু। তারাশঙ্করবাবুও নাকি খুব মশগুল হয়ে লেখার কাজ চালিয়ে যেতেন। লিখতে লিখতে হঠাৎ যখন তাঁর একটু হুঁকোয় তামাক খাবার ইচ্ছে হত তখন তিনিও হঠাৎ রথীইইইই রথী বলে চেঁচিয়ে ডাকতে শুরু করতেন। পরে অবশ্যি নিজের ভুল বুঝতে পেরে তাঁর পুত্রের আসল নাম ধরেই ডাকতেন। কিন্তু ব্যামোটি রবিবাবুর কাছ থেকেই পেয়েছিলেন বলে প্রায়ই এই ধরণের ভুল হত। রবিবাবুর নাকি আরেকটি ব্যামো ছিল - প্ল্যানচেট প্ল্যানচেট খেলা। হাতে এবং মাথায় যখন কোন কাজ থাকতনা তখন নাকি তিনি এই খেলাটি খেলতে খুব ভালবাসতেন। গতবৎসর কোন একটি পত্রিকাতে (দৈনিক নয়) দেখেছিলাম শ্রী অমিতাভ চৌধুরী নামে একজন লেখক রবিবাবুর এই প্ল্যানচেট প্ল্যানচেট খেলা নিয়ে অনেক কিছু লিখেছিলেন। আপনার চিঠিখানা পড়ে বেশ বুঝতে পারলাম রবিবাবুর ঐ খেলার ব্যামোটি আপনাকে এবং ওখানকার সেই চক্রের সভ্যদেরকে বেশ জেঁকে ধরেছে। এই খেলাটি সম্বন্ধে আমার কোন ধারণাই নেই। তবে আপনাকে তো কয়েক বৎসর আগে আমি জানিয়েছিলাম যে গান আমি শিখিনি - কিন্তু গানে গানে ক্রিকেট খেলার কায়দাটি আমি খুব রপ্ত করে ফেলেছিলাম। মনে আছে তো? বহুদিন আগেই এই খেলায় আমার বোলিংএ আউট হয়েছিলেন অনেকেই - যাঁরা জীবিত নেই তাঁদের মধ্যে ছিলেন ইন্দিরা দেবী চৌধুরাণী (রবিবাবুর ভ্রাতুস্পুত্রী), প্রশান্ত মহলানবীশ, প্রফুল্ল মহলানবীশ (তাঁকে বুলাদা ডাকতাম), অনাদি দস্তিদার, রথীন্দ্রনাথ, চারুচন্দ্র ভট্টাচার্য্য এবং ব্রাহ্ম সমাজের বহু নামকরা লোক। যাঁরা জীবিত আছেন তাঁদের নামের উল্লেখ করা এখানে প্রয়োজন নেই। পরলোকগতদের নাম কেন উল্লেখ করলাম তার কারণ পরে বলছি।

    রবিবাবুর আরো দুটি কঠিন ব্যামো ছিল - আপনারা তা জানেন কিনা জানিনা। এক নম্বর হল - তিনি অত্যন্ত কানপাতলা লোক ছিলেন - আর দুই নম্বর ব্যামোটি হল - তিনি নানা সময়ে নানান ধরণের উল্টোপাল্টা কথা বলতেন।

    আপনারা নিশ্চয়ই জানেন যে রবীন্দ্রসংগীত-অবিজ্ঞ পণ্ডিত ও জ্ঞানী ব্যক্তিদের মতে আমি রবীন্দ্রসংগীত জগতে "হরিজন" - আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ - আমি এই রবীন্দ্র সংগীতের শুদ্ধতা বিনষ্ট করে বিকৃত করেছি। প্রায় দশ বৎসর হয়ে গেল এই অভিযোগ শুরু হয়েছিল। কিন্তু যে সব পরলোকগত ব্যক্তিদের নাম আগে উল্লেখ করেছি তাঁদের মধ্যে দুজন ছাড়া (অর্থাৎ ইন্দিরাদেবী ও অনাদিদা) কারুরই রবীন্দ্রসংগীত সম্বন্ধে কোন পাণ্ডিত্য বা জ্ঞান ছিলনা - তবুও তাঁরা আমার গানের খেলায় আউট হয়ে গিয়েছিলেন। আমার মনে হচ্ছে তাঁদের আত্মা পরলোকে পৌঁছেই রবিবাবুর আত্মার কাছে আমার সম্বন্ধে নানা কানমন্ত্র দিয়েছিলেন - এবং তিনি ওঁদেরকে খুব ভালোবাসতেন বলেই ওঁদের কথা বিশ্বাস করেছিলেন। কানপাতলা লোক ছিলেন তো। কিন্তু বর্তমান কালে রবীন্দ্রসংগীত জগতে আমার কী হাল তার রিপোর্ট রবিবাবুর আত্মা এখনো পননি। তাই আপনাদের প্ল্যানচেটে ওঁর আত্মা আমার সম্বন্ধে ঐ ধরণের মন্তব্য করেছেন। হালে জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র পরলোকে যাত্রা করেছেন - তাঁর আত্মা আবার রবিবাবুর কাছে আমার সম্বন্ধে কী রিপোর্ট করবেন কে জানে?

    দুইনম্বর ব্যামোর কথায় বলি -উনি যে নানা সময়ে নানা উল্টোপাল্টা কথা বলতেন - আপনি নিশ্চয়ই তা জানেন। তা ছাড়া উনি নিজেই তা ইহলোকে স্বীকার করে গিয়েছিলেন। উনি লিখেছিলেন - "মত বদলিয়েছি। কতবার বদলিয়েছি তার ঠিক নেই" (সংগীত চিন্তা ২৪১ পৃ:) সুতরাং ভবিষ্যতে আপনাদের সেই চক্র যদি রবিবাবুর আত্মর সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন তাহলে আবার হয়ত দেখবেন যে ওঁর আত্মার মতে দেবব্রত বিশ্বাস একটি অতি নিকৃষ্ট গাইয়ে। কারণ উনি মত বদলাতেন - পরলোকবাসী হয়ে মত বদলাবার অভ্যাসটি ছাড়বার মত কোন কারণ ঘটেছে কিনা জানিনা।

    যাই হোক - প্ল্যানচেটের আমার সম্বন্ধে খবরটি চক্রের বাইরের কাউকে দয়া করে বলবেননা - কারণ তা হলে আপনাদের জন্য এমন একটি ব্যবস্থা হতে পারে যাতে আপনারা "জামশেদপুর টু রাঁচী"।

    শরীর খুব খারাপ - হাঁপানি এবং সর্বাঙ্গে বাতের বেদনায় খুব কষ্ট পাচ্ছি। আশাকরি সপরিবারে ভালো আছেন।

    আন্তরিক শুভেচ্ছা ও নমস্কারান্তে - আপনাদের জর্জদা।

  • বিভাগ : ধারাবাহিক | ০৫ সেপ্টেম্বর ২০১১ | ২৮৬ বার পঠিত
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন গ্রাহক পুনঃপ্রচার
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। পড়তে পড়তে প্রতিক্রিয়া দিন