• বুলবুলভাজা  গপ্পো

  • মহারাজ বিশাখ

    দীপ্তেন লেখকের গ্রাহক হোন
    গপ্পো | ২৪ অক্টোবর ২০১৫ | ২৯৪ বার পঠিত
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন পুনঃপ্রচার
  • “কোথাও একটা বাধা থাকিয়া যাইতেছে।  আমার সুবিশাল বাণিজ্যতরী ডুবিয়া গেলো। অম্বরী মৃগের পশম, শিলাজতু। অভ্রশিলা। নীলকণ্ঠীমৃত্তিকার পেটিকা। শতমালিকার মধু।”


    “সমুদ্রের তুফান।”


    “না। শুধু তুফান নয়। কেউ আমারে পিশাচী বাণে বিদ্ধ করিয়াছে। মাল্লা কহিলো, বালার্ক বৃক্ষের গুঁড়ি - যা হাওয়াতেও ভাসিয়া যায় এমন হাল্কা। সেই পালকের মতন কাষ্ঠখন্ডও সাগরের জলে ডুবিয়া গেলো। দুইটি কালো হাত সাগরের বুক হইতে সহসা উঠিয়া - সব কাড়িয়া লইলো। মন্ত্রঃপূত সিদ্ধ যন্ত্রে কিছুই হইলো না”


    দেবতা চুপ করিয়া থাকেন।


    “নৌকার নিকটে জল কালো হইয়া উঠিয়াছিলো। আকাশের কালো মেঘের সাথে সাথে মিশিয়া যাইতেছিলো সাগরের রং। সাগরের অন্তঃস্থল হইতে একটি গুম গুম ধ্বনি। আমার তরীর চারিপাশ ঘিরিয়া রাখিয়া ছিলো অলাতচক্রের ন্যায় অগ্নিব্যূহ”


    “তবে উহা পিশাচীর বাণ। চতুশ্চক্র বাণ। মারাত্মক “


    “তুমি কী করিতেছিলে মহাদেবতা? সাগর পাড়ি দিবার আগে তোমায় পাটলী ফুল দিলাম, এগারোটি কালো মোরগ, তোমার শ্রীকন্ঠের আশীর্বাদী অতসী ফুলের দিব্যমাল্য, নিজ হাতে বাঁধিয়া দিলাম  মাস্তুলে তোমার জয়কেতনের উপর। উদিত সূর্যের ছবি আঁকিলাম রক্ত চন্দনের ফোঁটা দিয়া। পঞ্চমুখী শাঁখের গুঁড়ো দিয়া”


    “কপালের লিখন। আমার জয় পতাকা ছিলো তাই মাল্লারা ফিরিয়া আসিলো।”


    “তবে কি পিশাচীর ক্ষমতাই বেশী? তোমার পায়ের চন্দন কাঠের খড়ম, তামার মংগল ঘট, দৈব সুরায় ভরা তিন সোনার ঘড়া। কেহ, কেহই রক্ষা করিতে পারিলো না আমার বহর? ডুবিয়া গেলো অতল দরিয়ায়?”


    নিশ্চুপ দেবতাকে আবার প্রশ্ন করে বৈশাখ।”হেলায় উড়াইয়া পুড়াইয়া দাও যক্ষ পিশাচদের। পর্বতেরে খণ্ড খণ্ড করো ভ্রূকুটির এক ইংগিতে। আর ঐ লাকিনীর এতোই স্পর্দ্ধা হইলো তোমার ভক্তের পণ্য লুঠিয়া লইলো?” 


    দেবতা কথা কহেন না, আবার শিলীভুত হইয়া যান। প্রস্তর হইতে প্রস্তর। বাক্যহীন, অনুভূতিহীন। এক অপরূপ খোদিত শিলাখণ্ড মাত্র। গাঢ় হরিদ্রা বর্ণের জ্বলমণির মূর্তি আবার মূর্তির রূপ ধারণ করে। 


    মন্দির থেকে দ্রুত বাহির হইয়া আসেন বিশাখ।    


    পুরোহিত আসেন কাঁপিতে কাঁপিতে।”আজ্ঞে ,উপচারে কোনো ত্রুটি ছিলো না। সংকটমোচন ,সর্বসুখ,  সফলকাম সব যজ্ঞই সমারোহে হইয়াছে। পণ্যের দোষমোচন পূজাও করিয়াছি। বাকী? বাকী তো কিছুই ছিলো না”


    বিশাখ বলেন”রাজদৈবজ্ঞ স্বয়ং শাস্ত্র দেখিয়া সুসময় গণনা করিয়াছিলেন। সাগর দেবীর মন্দিরে ভেটও গিয়াছিলো। মানত করা হইয়াছিলো অষ্টরত্নের বাজুবন্ধ। তা হইলে? লাকিনীর এতো স্পর্ধা আসিলো কীরূপে ?”


    বিশাখ বড় চিন্তিত হইয়া পড়েন। কোনখানে ত্রুটি তাঁর?   


    নিমগাছের পাতা ওড়ে ঝুর ঝুর। সুগন্ধী দখিনা বাতাস বয়। বিশাখ মহারাজ চিন্তাকুল দৃষ্টিতে আকাশে দেখেন। নির্মেঘ সুনীল আকাশ। কিছু পথভোলা সাদা মেঘ ইতঃস্তত উড়িয়া বেড়ায়। অদূরে কোনো বৃক্ষে অস্ফুট ঘু ঘু আওয়াজ। বিশাখের প্রিয় ঘোটকী তমোহা হৃষ্ট ধ্বনি করে। অধৈর্য্য খুরে উড়ায় ধুলি।  বিশাখের সহসাই চোখে পড়ে কাপালিকে।


     “বিশাখ মহারাজের জয় হোক”


    “কাপালি? এইখানে মহাদেবতার মন্দিরে কি চাইস তুই?”


    “মহারাজের কুশল। শ্মশানে মশানে থাকি। আমি ভৈরব। মহারাজের সুমঙ্গল চাই। আমি আপনার প্রজা”


    “কাপালি। তুই লাকিনীর ভক্ত। তুই আমার শত্রু”


    “মহারাজ। লাকিনী আপনারও দেবতা। উনি আপনার ভিক্ষার্থী। আপনার পূজা চান। মহাদেবতার সাত মহলার মন্দির নয়। গাঁয়ের বাইরে সপ্তাশত্থ গাছের নীচে তেল সিঁদুরে মাখানো দেবীশিলা। সেখানে আপনার হাতের দুটি পুষ্প চান দেবী”.


    “মহাদেবতা ছাড়া আমার কোনো আরাধ্য নাই। আর কোনো দেব বা দেবীর পূজা আমি করিবো না।”


    “আপনার মঙ্গল হবে। আপনার তরী আমার সাগরের বুক থেকে উঠে আসবে। মর্মরের খনিতে দুই আঙুল মাটি, এর নীচেই আবার পাইবেন স্ফটিকের বিশাল ভাণ্ডার”


    ক্রোধে বিশাখের নাসারন্ধ্র স্ফূরিত হয়। হুঙ্কার দিয়া কহিলেন”নিশ্চিত হইলাম। লাকিনীর শাপেই আমার গড়ুরপংখী মহাতরীরে সাগরে হারাইয়াছি। সাগরের ঢেউরে কালো করিয়া ঘোর কৃষ্ণবর্ণ দুই পিশাচীর হাত জলের অতলে টানিয়া লইয়াছে আমার মহার্ণব।”বিশাখ আর অপেক্ষা করিলেন না। তমোহার পৃষ্ঠে বসিয়া দ্রুত অশ্ব ছুটাইলেন। পশ্চাতে শুনিলেন কাপালির সতর্কবার্তা”মহারাজ, দেবীর হাত হইতে পলাইতে পারিবেন না। পারিবেন না।”


    রাজপ্রাসাদের প্রাঙ্গনে ঢুকিয়া রক্ষীর হস্তে তমোহার লাগাম দিয়া দুই পা হাঁটিয়াছেন কী তীব্র হাহাকারের শব্দে চমকিয়া পিছন ফিরিলেন। 


    শংখশুভ্র তমোহার অঙ্গ নীল হইয়া গিয়াছে। তাহার চক্ষু ঠিকরাইয়া বাহির হইয়া আসিতেছে। এক অদৃশ্য ফাঁসে নীল জিহ্বা বাহির করিয়া তমোহা মনুষ্যকন্ঠে আর্তনাদ করিয়া ঢলিয়া পড়িলো। তাঁহার শেষ দৃষ্টিতে প্রিয় প্রভুর প্রতি আকুতি। স্তম্ভিত  অশ্বরক্ষী স্থাণুবৎ দাঁড়াইয়া আছে। ত্রাসে সেও বিস্ফারিত নেত্র। 


    সরোষে বিশাখ আকাশে তাকায়। সুনীল আকাশে দূরে চিক্কুর কাটে বাজপক্ষী। 


    “লাকিনী”ঘৃণার সহিত বিকৃত কণ্ঠে উচ্চারণ করিয়া বিশাখ তমোহার প্রাণহীন দেহের পাশে বসিয়া পড়েন। তমোহার স্থির চোক্ষে একবিন্দু অশ্রু টলমল করে। কী যাতনায় কী বেদনায় কেহ জানিবেনা। অনেক সংগ্রামের একান্ত সংগী, অনেক যাত্রার একমাত্র সাথী চেতনের এই মর্মান্তিক বিদায়, শেষ মনুষ্যকণ্ঠের হাহাকার বিশাখের কর্ণকুহর ভরিয়া রাখে। 


    শোকসন্তপ্ত বিশাখ মস্তক নীচু করিয়া প্রাসাদে প্রবেশ করেন। পরাজিত।   নিজের অঙ্গনেই তাঁহার বিশ্বস্ত অশ্বরে রক্ষা করিতে পারিলেন না। কোনো সুদূর মহাসাগরে কেমনে বাঁচাইবেন তাঁর দ্রব্য সামগ্রীরে?  


    নিশীথে শয্যাগৃহের দ্বার বন্ধ করিয়া শুধুমাত্র অম্বুদ তৈলের সুগন্ধী ক্ষীণ প্রদীপ জ্বালাইয়া প্রবেশ করেন মহারানি। চক্ষু মুদ্রিত করিয়া শয়ান বিশাখ। শুনিতে পান ভারী কিংখাবের  খস খস ধ্বনি। পদমল্লিকার মৃদু শিঞ্জিনী। রত্ন বলয়ের ঠিন ঠিন। প্রয়াগদেশের সুগন্ধী এলাচের মৃদুতম সৌরভ। সুগন্ধের আভাস। 


    মেনকা দেখেন প্রৌঢ় মহারাজ নিথর শুইয়া রহিয়াছেন। শিয়রে মহাদেবতার দান দিব্য তরবারি সূর্য্প্রকাশ ক্ষীণতম আলোকে অগ্নিখদ্যোতের ন্যায় ক্ষণে জ্বলিতেছে ক্ষণে নিভিতেছে। বলিষ্ঠ বক্ষে শুধু গাঢ় প্রঃশ্বাসের আওয়াজ।


    অলিন্দ হইতে দেখা যায় নিঃসীম ঘোর কৃষ্ণ আকাশ। বাহিরের বিশাল মহাষ্টপী বৃক্ষের শন শন শব্দ। 


    “তমোহা বাঁচিলো না?”


    “না। আত্মবিশ্বাসে তমোহার কণ্ঠেপরাই নাই বিন্দুনাগের অস্থিমালা। কপালে আঁকি নাই স্বস্তিচিহ্ন। আমার মুহূর্তের অসতর্কতায় লাকিনী উহারে গ্রাস করিলো”, ক্ষোভে মহারাজ ওষ্ঠ দংশন করেন।


    “মহাদেবতা তোমারে নিষেধ করেন নাই লাকিনীরে মাত্র দুইটা পুষ্প দিতে। তবে কেনো এই সর্বনাশী দর্প?”


    “তোমারে নির্দেশ দিয়াছিলাম এই বিষয়ে তুমি আমারে কোনো উপরোধ করিবে না। কখনও নয়।”


    “কিন্তু আমিও মহারানি। এ রাজ্যের সুখ দুখঃ আমারও সুখ দুঃখ।”কিয়ৎক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া মহারানি আবার কহিলেন বর্বত রাজ্যের প্রত্যন্ত প্রদেশে আকাশ ছাইয়া নামিয়াছে তক্ষকীট। সেই কোটি কীট মহামেঘের মতন আকাশ ছাইয়া সকল শস্য ভক্ষণ করিয়াছে। বৃক্ষে পত্র পর্য্যন্ত নাই। দুর্ভিক্ষ। অনাহার। সকলেই অমঙ্গলের আশঙ্কায় ব্যাকুল”।


    বিশাখ উত্তর না দিয়া পাশ ফিরেন। তাঁহার ক্রোধতপ্ত শ্বাস শয্যারে উত্তপ্ত করিয়া তোলে। কখন ঘুমাইয়া পড়েন। সহসা নিদ্রা ভাঙিয়া নেত্র উন্মীলিত করিয়া দেখেন সন্মুখে রূপযৌবনমত্তা সালংকরা লাকিনী। তাহার অস্থির নেত্রমণি ঘূর্ণায়মান। বিষধর সূত্রবত চিকণ সর্পেরা লাকিনীর  কেশের বন্ধনীতে জড়াইয়া আছে। অবজ্ঞকটাক্ষে তাহারে বিদ্ধ করিয়া তাম্রবর্ণা লাকিনী নিঃশব্দ অট্টহাসে বিশাখেরে প্রকম্পিত করে।


    “তমোহা বাঁচিলো না। বড় বিশ্বাস করিয়াছিলো তোমায়, মহারাজা বিশাখ।”


    “মহাদেবতার দিব্যি, তাঁহার ত্রিশূলের দিব্যি, লাকিনী তোরে আমি হত্যা করিবো”


    কৃপার নয়নে লাকিনী তাঁহারে হেরিল। অদৃশ্য সমীরণ প্রবাহে তাহার কেশদাম উচ্ছ্বসিত সামুদ্রিক ঢেউয়ের  ন্যায় ফুলিয়া ফাঁপিয়া তাহার মুখমণ্ডলেরে ছটার ন্যায় ঘিরিয়া ধরিল। রেশমের গাছির ন্যায় শতেক সর্প উদ্যত ফণায় দুলিয়া দুলিয়া তাহার শিরোভূষণ হইলো। 


    লাকিনি কহিলো”মহারাজ বিশাখ, আমি শুধু দুটি নগণ্য পুষ্পাঞ্জলি চাহি, তোমার নিকট। কৃপাপ্রার্থীর এইটুকু সম্মানও দান করিতে তুমি অক্ষম? তবে শ্রবণ করো, তমোহাই তোমার শেষ ক্ষতি নয়। যেমনি তোমার বাণিজ্যতরী ডুবিলো, প্রদেশে আসিলো কোটি শস্যভূক পতঙ্গ, তেমনই আমার রোষে তোমার রাজত্ব পরিবার প্রাসাদ কিছুই অবশিষ্ট থাকিবে না। রক্ষা পাইবে না ফুল্লরাও।” 


    মুহূর্তে বিশাখের হস্ত সূর্য্প্রকাশেরে স্পর্শ করিলো। অমনি ফুৎকারে প্রদীপের আলো নিভাইয়া অন্ধকারে মিলিয়া মিশিয়া লাকিনী  অন্তর্হিত  হইলো।  


    ফুল্লরা,ফুল্লরা,ফুল্লরা। মহারাজ বিশাখের নিঃশব্দ আর্তি প্রাসাদের কোণে কোণে ছড়াইয়া পড়িল। ফুল্লরা তাঁহার নয়নের মণি, তাঁহার প্রাণভ্রমরা। দুলালী তাঁহার কন্যা, তাঁহাদের একমাত্র সন্তান।


    নিঃসন্তান দম্পতির বহু পূজার পরিণতি। মহাদেবতার আশীর্বাদে মহাদেবতার করুণায় প্রাপ্তি এই মহাধন। মহাদেবতা স্বয়ং আবির্ভূত হইয়া স্বহস্তে মহারাজেরে দিয়াছিলেন জন্মদায়ী ভেষজ। সেই ভেষজ ভক্ষণেই গর্ভধারণ হইলো মহরানির। জন্মক্ষণে সূতিকাগৃহে অযুত ঘণ্টাধ্বনির শঙ্খবাদনের মধ্যে মহাদেবতা আসিয়া সদ্যপ্রসূতা ফুল্লরারে নিজক্রোড়ে নিয়া তাহার কণ্ঠে চুম্বন করিয়াছিলেন। তদবধি ফুল্লরার কন্ঠে স্বস্তিচিহ্ন বর্তমান। কাহারও সাধ্য নাই ফুল্লরারে আঘাত করে।     


    প্রভাতে চিন্তিত বিশাখ সিংহাসনে আসন গ্রহণ করিলেন। রাজ পুরোহিত শুভবাণী মন্ত্র উচ্চারণ ও শান্তিজল প্রক্ষালনের পর কহিলেন “জয় হোক মহারাজের। মহারাজ, আমি বৃদ্ধ হইয়াছি। চক্ষুও ম্লান। মন্ত্রগুলিও যথাযথ স্মরণে আসে না। আজ্ঞা করুন, আমি কাহারো হস্তে দায়িত্ব অর্পণ করিয়া হিমেলশিখরের আশ্রমে শেষ যাত্রা করি।”


    বিশাখ প্রখর দৃষ্টিতে তাকাইলেন।”পুরোহিত, এই কথা কহিতে তুমি আমার চক্ষে চক্ষু রাখিতে পারিতেছ না। ক্ষুদ্র তস্করের ন্যায় তোমার মুখ মলিন। কিসের অপরাধবোধে তোমার কণ্ঠ আজ স্তিমিত ?”


    পুরোহিত কম্পিত কণ্ঠেকহিলেন”নিশীথে লাকিনিদেবী আসিয়া আমারে ত্রাসিত করেন। গৃহদ্বারে কৃষ্ণ পেচকেরা তাহাদের দুর্গন্ধ পালকের স্তূপ রাখিয়া যায়। ঊষাকালে আচমনের নিমিত্ত প্রাঙ্গনে পা রাখিতেই দেখিলাম হস্তীর পদের তুল্য স্থূল কালসর্প কুড়িহস্ত উচ্চতায় বিশাল ফণা বিস্তার করিয়া দুলিতেছে। তাহার বিষ নিঃশ্বাসে মুহূর্তে আমার প্রাঙ্গনের গুঞ্জপুষ্প মালতী লতা স্থলপদ্মের কলিগুলি দগ্ধ হইয়া গেলো। আমি প্রাণপণ চেষ্টা করিলাম স্বস্তিকামন্ত্র জপিতে, পিশাচমারণ মন্ত্র জপিতে, কিন্তু কোনো মন্ত্রই আমার স্মরণে আসিলো না। মহারাজ, আমার প্রতি ক্রূর দৃষ্টি হানিয়া সেই মায়াসর্প মৃত্তিকায় বিলীন হইলো।”


    কম্পিত অসহায় অতিবৃদ্ধ রাজপুরোহিত তাহার নিষ্প্রভ চক্ষু মেলিয়া মহারাজের দিকে মুখ তুলিলেন।”আমার প্রাণের ভয় করি না মহারাজ। আর কতদিবসই বা বাঁচিবো? কিন্তু লাকিনির শাপে আমার স্ত্রী পুত্র কলত্র সবই বিনাশ পাইলে....”অবরুদ্ধ কণ্ঠে রাজপুরোহিত তাঁহার বাক্য সম্পূর্ণ করিতে পারিলেন না।         


    অসহায় বোধ করেন বিশাখ। তিনি অভয় দেন,”আমি মহাদেবতারে কহিব। জানি না আমার কোন ত্রুটিতে তিনি অসন্তুষ্ট হইয়াছেন ? এতো সমারোহে আমি তাঁহার জন্য অষ্টাদশ পূজা করিলাম, উনবিংশতি যজ্ঞ করিলাম। শত সহস্র মহিষ ও ব্যাঘ্রের রক্তে বলিস্থান ধৌত হইলো।”। কিয়ৎক্ষণ ভাবিয়া বিশাখ কহিলেন”প্রজারক্ষা ও রাজ্যবর্ধনই রাজনের কর্তব্য। শংকিত প্রজাদের অভয়দানে অসফল, তাহাদের বিশ্বাসের ভাগী না হইতে পারিলে আমি কাহারেও ধরিয়া রাখিবো না। মঞ্জুমাস পূর্ণ হইলে আপনি আশ্রম গমন করুন।”  


    সন্ত্রস্ত রাজপুরোহিত কাকুতি করেন”অনুমতি করেন মহারাজ, আমি অদ্যই যাত্রা করি।”মহারাজের ক্রোধে আরক্ত মুখ দেখিয়া তিনি থরথর কম্পিত কণ্ঠে বলেন”মহাসর্প ভূমধ্যে প্রবিষ্ট হইবার পূর্বেও কহিয়াছিলো সূর্যাস্তের অগ্রেই গৃহত্যাগ করিতে হইবে, তাই”। পুরো বাক্য কহিতে পারিলেন না। অধোবদনে রাজার নিকট বিদায় লহিয়া চলিয়া গেলেন। বিশাখ লক্ষ্য করিলেন ত্রস্ত রাজপুরোহিত বিদায়কালে তাহারে আশীর্বাদ করিতেও বিস্মৃত হইয়াছেন।


    মুখ্যমন্ত্রী প্রবেশ করিলেন। তাঁহার কণ্ঠ শুষ্ক। কহিলেন”মহারাজ। রাজধানী সুবর্ণনগরীর প্রান্তেই তক্ষকীটেরে দেখা গিয়াছে। এ বড় ভয়ানক তক্ষকীট। শুধু শস্যই নহে, গবাদি পশুগণের রক্ত শোষণ করিয়া কৃষকদের সর্বনাশ করিতেছে। উহারা দলে দলে প্রত্যন্ত অরণ্যে ও পর্বতগুহায় আশ্রয় লইতেছে।”   


    বিশাখ কহিলেন বৈজ্ঞানিকেরা কী বিধান দিয়াছেন? 


    “বিধান, নিদান কোনো কিছুতেই তক্ষকীটেদের প্রতিহত করা যাইতেছে না। তাহারা উড়িয়া আকাশেরে কৃষ্ণ পুঞ্জ মেঘের মতন আবৃত করিতেছে, কখনো প্রান্তরের উপর দিয়া এক বিশাল সরীসৃপের ন্যায় বক্ষে হাঁটিয়া আসিতেছে। মুহূর্তে প্রান্তরের শ্যামল দূর্বাঘাস ভক্ষণ করিয়া ঊষর মৃত্তিকায় ধুলি ঝড় তুলিতেছে। মৃত্তিকার নিম্ন হইতে কোনো গহ্বর বা কূপ হইতে সহসা বাহির হইয়া নিমেষে বৃক্ষদের নিষ্পত্র করিয়া তুলিতেছে, মহারাজ, এই তক্ষকীটের হস্ত হইতে রক্ষা নাই”।   


    “কেমনে তক্ষকীটেরা দাবানল ভেদ করিয়া আসিতেছে? নিম্বার্ক বৃক্ষের কটু বল্কল জ্বালাইয়া যে ধূম হয় তাহাতে তক্ষকীটেরা বিতাড়িত হয়।”


    “মহারাজ , এই সকল তক্ষকীটেরা অগ্নিভেদ করিয়া উড়িয়া আসিতেছে। কটু ধূম্রে উহাদের কোনো ক্ষয়ক্ষতি হইতেছে না। যে পক্ষী সকল পূর্বে এই তক্ষকীটেদের ভক্ষণ করিয়া থাকিতো তাহারা এইবার কীটেদের দেখিলেই উর্ধ্বশ্বাসে উড়িয়া যাইতেছে”


    “কী উপায়ে রক্ষা করি প্রজাদের? মহামন্ত্রী?”ব্যাকুল কণ্ঠে প্রশ্ন করেন বিশাখ মহারাজ।


    মুখ্যমন্ত্রী অধোবদনে নিশ্চুপ হইয়া থাকেন। কিয়ৎক্ষণ পরে লুণ্ঠিত স্বরে কহিলেন”যেই সব গৃহে লাকিনির ধ্বজা উড়িতেছে, যেইসব শস্যক্ষেত্রে লাকিনির সর্পচিহ্নিত হরিদ্রা বর্ণের জয় পতাকা শোভা পাইতেছে ওই সব স্থানে তক্ষকীটের উপদ্রব নাই।”


    বিশাখ স্তম্ভিত হইয়া পড়েন। এতো দ্রুত লাকিনি তাহার মৃত্যুজাল বিস্তারিত করিতেছে যে বিশাখ নিঃশ্বাস নিবারও অবকাশ পাইতেছেন না। উৎকণ্ঠিত বিশাখ সভাভঙ্গের আদেশ জারি করিয়া দ্রুত পদে গর্ভমন্দিরের প্রতি প্রস্থান করিলেন।


    মন্দিরে আসিয়া বিশাখ দেখিলেন মন্দিরে না রহিয়াছে প্রহরী, না রহিয়াছে পূজারী। অষ্টপ্রহর চামর দুলাইতো দেবসহচরীরা। ঘৃত ও কর্পূরে সম্পৃক্ত সহস্র প্রদীপ জ্বলিত দীপস্তম্ভে। পুষ্পমাল্যে, নৈবদ্যে, সুগন্ধী ধূপে, সহস্রে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ঘণ্টকের শিঞ্জিনীতে মন্দির পুর্ণ থাকিতো। এক্ষণে কিছু নাই। কেহ নাই। 


    দ্বারে এক বৃদ্ধা ন্যূব্জা বসিয়া আছে।মহারাজ চিনিলেন। পূজারীর মাতামহী। বিকৃতমস্তিষ্কের এই মহিলা মহারাজের অগণিত আশ্রিতদের একজন।


    অস্বচ্ছ চক্ষু তুলিয়া বৃদ্ধা কহিলো,”কেহ নাই। শূন্য হইতে এক অজগর আসিয়া সেবিকাদের গিলিয়া লইলো। বাকীরা পলাইলো।”


    “বৃদ্ধা ,তুমি পলাইলে না কেন”?


    “না, এই মন্দিরই আমার আশ্রয়। ইহা ছাড়িয়া কোথাও যাইবো না”।


    “তো মরিবা।”


    “মরিবো। কিন্তু পলাইবো না। অজগরের ভয়ে নয়। তক্ষকীটের ভয়ে নয়।এইখানে মহাদেবতার মূর্তির সম্মুখে দাঁড়াইয়া থাকিবো।”


    মহারাজ গর্ভমন্দিরে প্রবেশ করিলেন। স্ফটিকের দীপদান ভুলুণ্ঠিত। স্বর্ণময় পূজাসামগ্রী কতক মাটিতে, কতক অজগরের সুবিশাল দেহের চাপে ভগ্ন। বেদীর উপর মহাদেবতার আবক্ষ মূর্তি। জ্বলমণি আজ নিষ্প্রভ। 


    মহারাজেরে দেখিয়া প্রস্তর মূর্তির পাষাণ চক্ষু উন্মীলিত হইলো। বড় ম্লান সেই দৃষ্টি। অসহায়। যেন অপরাধী।


    বিশাখ উচ্চকণ্ঠে কহিলো”মহাদেবতা। এইসব কী হইতেছে? কী রূপে তোমার অনুগতের এই সর্বনাশ? কোথায় তোমার সেই চণ্ড রূপ! একদা খর্বট উপজাতির লক্ষ সেনানীরে তুমি দাবানলে দগ্ধ করিয়াছিলে, তোমার মায়ায় দিগন্তব্যাপী প্লাবনে ভাসিয়া গিয়াছিলো নাগেদের নৌবহর। আজ লাকিনির দৌরাত্মে আমার দেশ বিপর্য্যস্ত। এক্ষণে কোথায় তুমি? রক্ষাকর্তা?”


    প্রস্তর মুর্ত্তির উন্মীলিত নয়ন করুণায় আর্দ্র হইলো। সজল নয়নে মহাদেবতা তথাপি নিশ্চুপ থাকিলেন। কোন বন্ধন তাঁহারে বাঁধিলো? কোন কুণ্ঠায় তাঁহার বাক রুদ্ধ আজিকে?


    চক্ষের সম্মুখে সেই জ্বলমণির আবক্ষ মূর্তি গুঁড়া গুঁড়া হইয়া গেলো। রেণু রেণু প্রস্তরের ভস্ম বাতাসে মিশিয়া গেলো এক সর্বব্যাপী দীর্ঘশ্বাসের সহিত। স্তম্ভিত বিশাখ শুনিলেন এক মায়াবী অট্টহাস্য। লাকিনির খল খল হাস্য। 


    বিশাখ প্রাণপণে চিৎকার করিয়া উঠিলেন,”কিসের অপরাধ আমার মহাদেবতা? কেন আমারে পরিত্যাগ করিলে?”ধূলিময় মন্দিরে কোনো উত্তর মিলিলো না। বিচূর্ণ মুর্তির বেদীর উপর দুটি উজ্জ্বল গুঞ্জ পুষ্প। যেন অপেক্ষা করিতেছে মহারাজের অঞ্জলির জন্য। ক্রোধে পুষ্পদুইটিরে পদতলে নিষ্পেষিত করিলেন বিশাখ।


    বাহিরে দ্রুত আসিয়া বিশাখ অন্তঃপুরের দিকে রওয়ানা হইলেন। উর্ধ্বে তাকাইয়া দেখিলেন আকাশে এক রক্তিম ছটা। যেন ক্রোধে আরক্ত হইয়া রহিয়াছেন নভোমণ্ডলের দেবতা। ঘোর হরিদ্রা বর্ণের ভয়ংকর মেঘের পুঞ্জ পশ্চিম আকাশে ঘন হইতেছে। এক দুর্বার ঝঞ্ঝার আভাস। 


    চকিতে চক্ষু পড়িল মন্দির সংলগ্ন কুয়ার উপর। এক বিশাল অজগর নিঃশব্দে কূয়ার মধ্যে প্রবিষ্ট হইতেছে। তাকাইয়া দেখিলেন বৃদ্ধা  কোথাও নাই। বিশাখ ছুটিয়া কূয়ার উপর ঝুঁকিয়া পড়িয়া দেখিলেন অজগর কূয়ার জলে ডুবিয়া গেলো। কূয়ার জল মুহূর্তে বাষ্পীভুত হইলো। পড়িয়া রহিলো কিছু রক্তবর্ণ কর্দম। 


    বিশাখ ছুটিলেন ঊর্ধ্বশ্বাসে। অন্দরমহলের মুখ্য দ্বারে পৌছাইয়া দেখিলেন দ্বার রুদ্ধ। সজোরে পদাঘাত করিতেই ধুলিসাৎ হইয়া গেলো প্রস্তর কঠিন অর্বুদ কাষ্ঠের দ্বার। বিশাখ দৃকপাত করিলেন না। 


    জনশূন্য মহলে ঢুকিয়া ছুটিলেন নিজের শয়ন কক্ষের দিকে। চিৎকার করিলেন”ফুল্লরা,ফুল্লরা”আবার আর্তনাদ করিলেন”মেনকা, মহারানী, ফুল্লরা”। দরজা ভাঙিয়া মহলে ঢুকিয়া দেখিলেন মেনকার দেহ মাটিতে পড়িয়া। গভীর পরিখা, সর্পতাড়ন গন্ধলতার বেষ্টনী, হিংস্র সর্পভূক মহানকুলের দল - সবই বিফলে গেলো। কোন ছিদ্র দিয়া আসিলো নিশানাগিনীর দল। তাহাদের বিষবাষ্পে প্রাণ হারাইয়াছে প্রাসাদের সকলেই। দেখিলেন বৃদ্ধ রাজপুরোহিতের প্রাণহীন দেহ। প্রভু আজ্ঞায় দেশত্যাগ করেন নাই। তার প্রায়শ্চিত্ত করিয়াছেন লাকিনির শাপে।


    শয়নকক্ষে দেখিলেন ফুল্লরা মস্তক নীচু করিয়া বসিয়া আছে। ঘন কুঞ্চিত  কেশদামে তাহার মুখানি আবৃত। ছুটিয়া তাহারে ক্রোড়ে নেন মহারাজ। ফুল্লরার স্বর্ণতনু থির থির করিয়া কাঁপিতেছে, দেখিলেন তাহার মৃগনয়নদুট তে অন্তহীন ত্রাস ও বেদনা জমাট বাঁধিয়া রহিয়াছে।   


    দেখিলেন তাহার গণ্ডদেশ জ্বরতপ্ত, দেখিলেন কোনো প্রগাঢ় যাতনায় তাহার ক্ষীণ বক্ষ পিঞ্জর  উঠিতেছে নামিতেছে। দেখিলেন তাহার নিঃশ্বাস ক্রমশ দুর্বল হইয়া আসিতেছে। প্রবলে তাহারে আঁকড়িয়া ধরিলেন। নিজের বক্ষে পেষ্টন করিয়া তাহারে নিজের হৃৎপিণ্ডের মাঝারে লইতে চাহিলেন। বহু কষ্টে ফুল্লরা যেন তাঁহারে চিনিতে পারিলো, শুষ্ক ওষ্ঠে মৃদুতম স্মিত আভা। কোনোক্রমে ফুল্লরা কহিলো”পিতা”, আর ঢলিয়া পড়িলো। তাহার রেশমী কেশদাম দুই হস্তে লইলেন। চুম্বন করিলেন তাহার স্থির চক্ষে। তাহার নিষ্পাপ কিশোরী হস্তদুইটিকে সজোরে নিজ হস্তে ধারণ করিলেন। প্রাণহীন অবলা মুষ্টি হইতে দুইটি গুঞ্জ পুষ্প খসিয়া পড়িলো। মহারাজ লক্ষ্য করিলেন বালিকার কণ্ঠদেশে আর স্বস্তিচিহ্ন নাই। জন্মাবধি মহাদেবতার স্নেহচুম্বনের মংগল প্রতীকটিও বিলীন হইয়াছে।   


    বিশাখ উঠিয়া মেনকার নীলবর্ণ শীতল দেহরে প্রাণপণে ঝাঁকাইয়া কহিলেন”কন্যারে রক্ষা করিতে পারিলি না?”    


    ক্ষোভে হতাশায় বিদীর্ণ মহারাজ পদাঘাতে সরাইয়া দিলেন প্রিয় মহারানির প্রাণশূন্য দেহ। 


    দৃপ্ত পদক্ষেপে একাকী চলিলেন অমোঘ চূড়ায় মহাদেবতার মুখ্য মন্দিরে। আজ তাঁহার বাহন তমোহা নাই। পশ্চাতে নাই রাজছত্রধারীগণ।


    চামর দোলাইয়া শোভাযাত্রায় নাই অনুচরীরা। নাই পুরোহিত ও মন্ত্রগায়কের দল। 


    বিহ্বল মহারাজ একাকী চলেন। পথিমধ্যে ছুঁড়িয়া ফেলিয়া দেন তাহার উষ্ণীষ। মধ্যমণির বিবর্ণতাতে তাঁহার দৃকপাত নাই। 


    জনশূন্য উষর প্রান্তর। আকাশে অমঙ্গলের কুজ্ঝটিকা। পত্রপুষ্পহীন বৃক্ষেরা সভয়ে দাঁড়াইয়া আছে। আর কোনো প্রাণীর প্রশ্বাসের শব্দটুকুও নাই। 


    মন্দিরে উপস্থিত মহারাজ বিশাখ জ্বলমণির মূর্তিরে দেখেন। “তোমারেই বধ করিবো মহাদেবতা”। এই বলিয়া কোষ হইতে বাহির করেন তাহার শত সংগ্রামজয়ী কৃপাণ সূর্য্প্রকাশেরে। হায়! কোথায় সেই ক্ষুরধার সুর্য্যসম উজ্জ্বল প্রখর অসি? মরিচায় ঝুর ঝুর এ এক জীর্ণ লৌহ শলাকা মাত্র। সেই সূর্য্প্রকাশ - যাহার দ্বারা এক আঘাতে খণ্ডন করিয়াছিলেন গণ্ডার। দ্বিখণ্ডিত করিয়াছেলেন বিশাল বটবৃক্ষ। সেই চিরসখা সূর্য্প্রকাশ। আজ সেও বিশাখেরে ছাড়িয়া চলিয়া গিয়াছে,  রাখিয়া গিয়াছে তাহার ভঙ্গুর কঙ্কাল।  


    প্রস্তরমূর্তির নয়ন উন্মোচিত হইলো। কী ভাষা ছিলো সেই দেব চক্ষুদুটিতে বুঝিলেন না বিশাখ। শুধু নির্নিমেষ তাকাইয়া রহিলেন তাঁহার আরাধ্য দেবতার প্রতি। 


    অকস্মাৎ গুম গুম গুম শব্দে অমোঘ পাহাড় কাঁপিয়া উঠিল। চমকিত বিশাখ দুই পদ পিছাইয়া আসিলেন। হেরিলেন বজ্রপ্রস্তর নির্মিত বেদী সহ জ্বলমণির বিশাল প্রস্তর মূর্তি মৃত্তিকায় প্রোথিত হইতেছে। স্থাণুবৎ মহারাজ দেখিলেন মণি মাণিক্য খচিত দেবগৃহ অতলে চলিয়া যাইতেছে। অপরূপ কারুকার্যখচিত স্তম্ভ, বংশ পরম্পরায় নিপুণ শিল্পীদের সাধনার ফল। নিমেষে নিমেষে মন্দির ভূমিতে গহ্বর সৃষ্ট হইতেছে, যেন নরক ভৈরবীর আদিগন্ত মুখ ব্যাদান। এক এক গ্রাসে বিলুপ্ত করিতেছে নাটমন্দির, দেবশিখর, উপচার গৃহ, বৃন্দবাদনের প্রাঙ্গন। সুদূর পর্বত শিখর হইতে প্রস্রবিনী শঙ্খশুভ্রা নির্মল জলধারা,যা একদিন ধৌত করিত মহাদেবতার চরণ দুটি ,সহসা শুকাইয়া গেলো। পুণ্য দির্ঘীকার পূত সলিল ফোয়ারার ন্যায় ঊর্ধ্বে উৎক্ষিপ্ত হইলো। দগ্ধ হইলো মন্দির  উদ্যানের পুষ্পবীথি। অবশেষে মন্দিরের শীর্ষ কলসও বিলীন হইলো। 


    ভগ্নস্তূপের ধূসর ধূলি আস্তরণ হইতে প্রকাশিত হইলো লাকিনি। সম্রাজ্ঞীর বেশে নয়। চিরবস্ত্রা পরিহিতা সুশান্ত মুরতি। অলংকারের লেশমাত্রও নাই। কেশবিন্যাসে নাই উদ্যত ফণিনীরা। ঘুর্ণায়মান চক্ষুদুটি সকাতর।   প্রসারিত হস্তে দুইটি গুঞ্জ পুষ্প। অনুনয়ে  ইংগিতে কহিলেন পুষ্প দুইটি লইতে।


    একবার, মাত্র একবার। বামহস্তে পুষ্প দুইটিরে লইয়া লাকিনির পদপ্রান্তে ফেলিলেই ফিরিয়া পাইবেন। তাঁহার ধন মান। দুরন্ত তমোহা।  ঐশ্বর্য্য। রাজত্ব। মেনকা ও ফুল্লরারে। হয়তো মহাদেবতারেও। 


    মুহূর্তে বিশাখের বিহ্বলতা দূর হইলো। তিনি প্রবল বেগে ছুটিয়া পর্বতের কিনার হইতে সহস্র হস্ত নিম্নে প্রস্তর ভুমিতে ঝাঁপাইয়া পড়িলেন। মৃত্যুময়ী ধরিত্রী তাঁহাকে আলিঙ্গন করিতে যেন ছুটিয়া আসিলো। যে নিমেষ টুকুতে তাঁহার জ্ঞান ছিলো, প্রাণ ছিলো, বিশ্বাস ছিলো সেই ক্ষণে শুনিতে পারিলেন বিশ্ব ভুবন কাঁপাইয়া কাহারা যেন জয়ধ্বনি দিলো জয় মহারাজ বিশাখের জয়। নিম্নের প্রস্তর ভূমিতে তাঁহার দেহ ছিটকাইয়া পড়িলো।  কঠিন আঘাতে তাঁহার দেহ ছিন্ন বিছিন্ন হইলো।


    অমরাবতীতে সজল নয়না অভিমানিনী লাকিনিরে সপ্রেমে আলিঙ্গন করিয়া বিষণ্ণ মহাদেবতা কহিলেন।”রে প্রেয়সী আমার।পারিলাম না। আমি হারিয়া গেলাম। আমরা পরাজিত। মহারাজ বিশাখেরই জয় হইলো।”


    *****************************************************************

  • বিভাগ : গপ্পো | ২৪ অক্টোবর ২০১৫ | ২৯৪ বার পঠিত
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন গ্রাহক পুনঃপ্রচার
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • পাতা :
  • Arpan | 125.118.14.16 (*) | ২৭ অক্টোবর ২০১৫ ০৫:১০87396
  • খাইসে! তাইলে খাড়াইল যে উনি হইলেন গিয়া ওঁয়াদের মানস কন্যা!!

    ঃ) ঃ)
  • de | 24.96.78.181 (*) | ২৭ অক্টোবর ২০১৫ ০৫:৩১87397
  • লেখার ধরণ ভারী সুন্দর লাগলো।

    চাঁদ সদাগর বা এখানে মহারাজা বিশাখ - নন-কম্প্রোমাইজিং অ্যাটিটিউডটাই চোখে ধরা পড়ে। হাজার চাপের কাছেও যাঁরা মাথা নোয়ান না। সেজন্যই ভালো লাগে।

    জেন্ডার অ্যাঙ্গলটা স্যান বা এতোজ বলার পড়ে মনে হোলো - ওটাও আরেকটা দিক থেকে দেখা। দুটোই সত্যি, এই অ্যাম্বিগুইটির জন্যই মঙ্গলকাব্য এখনো টানে!
  • Arindam | 213.132.214.83 (*) | ২৯ ডিসেম্বর ২০১৫ ০৭:৫৮87398
  • কিছু এডিটিং প্রয়োজন, নচেৎ খাসা হয়েছে।
  • i | 134.168.158.206 (*) | ২৫ জানুয়ারি ২০১৬ ০৯:২৯87399
  • লেখাটা জোরে জোরে পড়লে শব্দে শব্দে নেশা হয়ে যায় কেমন।
আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • পাতা :
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। মন শক্ত করে মতামত দিন