• বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়।
    বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে।
  • ব্রজঠাকুরের বোধোদয়

    দীপ্তেন
    বিভাগ : মোচ্ছব | ০১ জানুয়ারি ২০২০ | ৮৩ বার পঠিত
  • "কী করে যে লোকেদের বোঝাই? ঠাকুরদের ডাকি। আসেন। দেবতারা সবাই আসেন।পরিষ্কার দেখি। একেবারে পরিষ্কার। আগে তো গা ছমছম করতো। গায়ে কাঁটা দিতো। আর এখন দ্যাখো - একদিন বাদ গেলেও, না দেখা পেলে আর ভালো লাগে না"। ব্রজঠাকুর বলেন।

    একটু দম নেন। সকালের দিকে হাঁপের টান আর দুচ্ছাই এই সিগারেটের নেশাটাও কাটাতে পারছেন না। বার বার গলা খাঁকারি দিয়ে থেমে থেমে বলেন।

    চক্কোত্তি ডাক্তারের ভাবলেশহীন মুখ। "সিগারেটা ছাড়ুন,আর এই কর্টিজেন ইনহেলার। রোজ । নিয়ম করে দুবেলা। ঐ অ্যাটাক হওয়ার জন্য অপেক্ষা করবেন না। এ ছাড়া চিকিৎসা নেই"। খুব বিরক্ত ভাবে বলেন ডাক্তারবাবু। পঞ্চাশটাকা ফী নিতেও ভোলেন না। শ্রদ্ধাটদ্ধার বালাইই নেই, কেমন একটা রাগ রাগ ভাব।

    ব্রজঠাকুর তো ঈশ্বরচিন্তায় ডুবে থাকেন। সামান্য জমি জিরেত। কিছু ফলের গাছ। দোকানটা চালায় ভাগ্নে মোহন, আর সংসার চালায় মোহনের বিধবা মা শান্তি। শান্তিবালা আর ছেলে মোহন, বড়ো ভালো মানুষ ওরা। তবে এও ঠিক কোন অকূলে ভেসে যেতো যদি ব্রজগোপাল ঠাঁই না দিতো। তা ব্রজঠাকুরেরও তো বয়স হল। কে দেখে সংসার?

    হাঁপানি আর ভগবানের চিন্তা -এই নিয়েই জীবন। ব্রজঠাকুর বলেন তাঁর অলৌকিক দর্শনের কথা, চুপচাপ শুনে যান শান্তি।

    তাঁর মাথার উপর ছাদ।  ছেলেটার খাওয়া দাওয়ার কষ্ট নেই। ব্রজঠাকুর বেলাবেলি খেয়ে শুয়ে পড়েন। বলেন আমি যোগনিদ্রা দেই। তো বেশ। দুপুরে দোকানের ঝাঁপ বন্ধ করে বাড়ী আসে মোহন। মায়ে পোয়ে খায়। জীবনে এতো শান্তি কখনো পায় নি শান্তিবালা।

    স্বামী ঘর থেকে বার করে দিলে ছোটো ছেলে নিয়ে লোকের বাড়ী বাস। এর বাড়ী, তার বাড়ী। বারবার ঠাঁই বদল। আশ্রিতের জীবন। অনিশ্চয়। দুর্ভাবনা আর অপমান।

    ব্রজঠাকুরের সাথে কথা বলে এবারে মোহনের একটা বিয়ে দেবেন শান্তিবালা।

    ব্রজঠাকুর বলতে থাকেন -"পষ্টো দেখি গো। মা দুগ্গাকে দেখি। শিবঠাকুরকে। তিন চোখ জ্বলজ্বল করছে। দেখে ভয় পেয়ে গেলুম রে। ত্রিশূল নিয়ে একেবারে হাঁই হাঁই করে আকাশ থেকে ধেয়ে আসছে - আমি তো ছুটেই পালিয়ে গেলাম"।

     

    গল্পটা বহু, বহুবার শোনা শান্তিবালার। তাও হুঁ হাঁ করতে থাকেন। আর পটলের খোসা তুলে রাখেন। আলুর খোসা, লাউএর খোসা - সব মিশিয়ে বেসন আর পোস্ত দিয়ে ভাজবেন। মোহন বড়ো ভালবাসে। ছেলেটা সেই শিশু বয়স থেকেই অনাদরে বড়ো হল, এখন একটু নিশ্চিন্তি। সুখ। নির্ভয় ঘুম। খাবারের জন্য আব্দার।

    ব্রজঠাকুর একই কথা বলে যান আর বার বার দরজার দিকে তাকান। কেউ যদি আসে। তো আসে, প্রায়ই আসে।

    সেদিন মালতী আসে, মেয়েকে নিয়ে। "বাবাঠাকুর, আমার মেয়েটারে কিছু দ্যান। সারাদিন কেমন ঝিম মেরে থাকে। কথা কয় না, কেবল হাঁ করে তাকায়ে থাকে। বারো বচ্ছর বয়স হলো, এখনো বিছানায় পেচ্ছাপ করে দেয়।"

    মেয়ে সামনেই বসে। বড়ো বড়ো চোখ করে সত্যি হাঁ করে মায়ের কথা শোনে। কোনো তাপ উত্তাপ নেই।

    একটু থতমত খান ব্রজঠাকুর। তিনি তো ঈশ্বরের কোলের ছেলে - বড়ো ভালো লাগে তার ভগবানের সাথে কথা বলতে,ধর্ম নিয়ে কথা বলতে।

    আশীর্বাদের ভংগিতে হাত তোলেন । অভয় মুদ্রা মালতী মাথা ঝাঁকায় -"না, ঠাকুর। একটা মাদুলি দ্যান"। মাদুলি? মাদুলি কোথায় পাবেন ব্রজঠাকুর? তিনি ঐ সব যাদু তো জানেন না। তিনি চাইছেন সৎসংগ। চাইছেন আশীর্বাদ করতে। চাইলে মন্ত্র দিতে,দীক্ষা দিতে।

    এরা জানে না, ব্রজঠাকুর যৌবনে শহরে গিয়ে কলেজে পড়েছেন - ইংরাজী জানেন, সংস্কৃতও কিছুটা। বাড়ীতে বেদ,উপনিষদ,নানান পুরাণ ছাড়াও রয়েছে কোরাণ আর বাইবেল। সবই তো প্রাণের টানে।

    কিন্তু এরা চায় শুধু তুকতাক।

    ঠাকুর বড়ো ভালোবাসেন ধর্মের বই পড়তে। যে ধর্মেরই হোক। নতুন বই দেখলে গায়ে কাঁটা দিতো, উদ্দীপনা হত। রামকৃষ্ণের জীবনী পড়ে উদ্বুদ্ধ হন। এই অনুভুতি,এ রোমাঞ্চ কি ওনারও  হত?

    কতো ছেলেবেলায় মা মারা গেলেন। বাবা বেঁচে। কিন্তু কেমন অনাথের মতনই বড় হলে ব্রজগোপাল। বাবা সংসারে থাকতেন নিরাসক্ত হয়ে। না,না, ধর্ম টর্ম নয়। দোকান আর জমি,বাস্তুভিটে। অল্পস্বল্প সুদের কারবার। কখনো দাদনে টাকা ঢালা। ছেলের সাথে স্নেহ ভালোবাসার কোনো সম্পর্কই ছিলো না। ভালো করে ছেলের মুখও দেখতেন কি না সন্দেহ।

     

    তবে দায় দায়িত্বে কোনো অবহেলা করেন নি। সব সংস্থানই করে গেছেন। খুব জ্বরে ব্রজগোপাল চোখ মেলে দেখেছেন হরিনাথ ডাক্তারকে বাড়ীতে নিয়ে এসেছেন বাবা। ওষুধের শিশি আর জল খাটের পাশেই। কিন্তু গায়ে মাথায় হাত বোলাননি তিনি কোনোদিন। কেমন আছো এই প্রশ্নটুকুও নয়। দেখাই হতো বা কখন দুজনের? জ্বর কমলে ব্রজ আবার স্কুলে যেতে শুরু করলো, বাবা নজর করতেন তো ঠিকই কিন্তু কোনো মন্তব্য করতেন না।

    একমাত্র ছেলের জন্য কখনো, কোনোদিন কিছু নিয়ে আসেন নি। আগ বাড়িয়ে কিছু না, কোনোদিনও না। নতুন বছর, দুর্গাপূজা এসেছে - আবার চলে গেছে। এই পাড়া গাঁ ঘেষা আধা শহরে সে যুগে জন্মদিনের চলও ছিলো না । নিরানন্দ, নিরাসক্ত। ব্রজগোপাল কখনও অভিমানও করেন নি। জানতেনই না, অভিমান কী করে করতে হয়।

    বড় হচ্ছেন যখন জামা কাপড়ের টান পড়লে নিজেই পাড়ার ইকবালকাকুর দোকানে গিয়ে জামা কাপড় নিয়ে আসতেন। হাপ প্যান্টের বদলে ফুলপ্যান্ট। গেঞ্জি জাঙিয়া। শার্ট। কোনো সখের কিছু নয়। শুধু শরীরটা লম্বা হচ্ছে বা পুরোনো কাপড় ছিঁড়ে গেছে - এই কারনে। ইকবালকাকু বাবার কাছ থেকে টাকা নিয়ে নিতো। বাবা কখনও জানতেও চান নি কীসের জন্য এই খরচা।

    পড়াশুনায় সুবিধে হল না। কলেজে বছর দুয়েক কাটিয়ে হাল ছেড়ে দিলেন ব্রজগোপাল। মাথায় কিছুই ঢুকতো না। স্কুলে বা কলেজে একাকীই কেটে গেলো ব্রজর। কোনো বন্ধু হয় নি। কেউ না। নিজেই সিদ্ধান্ত নিয়ে কলেজ ছেড়ে একদিন চলে এলেন ব্রজ। বাবা ভাবলেশহীন মুখে বসে থাকলেন। বকলেন না, বারণ করলেন না, বোঝালেন না।

    এমনিভাবে একদিন ব্রজকে ডেকে নিয়ে গেলো পাড়ার লোকে - তাদের ছোটো হার্ডওয়ারের দোকানে পড়ে আছেন বাবা - তাঁর মৃতদেহ। বডি। শহরের ডাক্তারবাবু লিখে দিলেন ব্রট ডেড। শ্মশাণে অল্প দু চারজন।একটা অনর্থক জীবন অনাদরে চলে গেলো। কেউ টেরও পেলো না।

    মা তো কবেই নেই, বাবাও চলে গেলেন। আত্মীয় স্বজন কেউ ছিলো? ব্রজ কখনো দেখেন নি। বাইশ বছর বয়েস।

    তো ব্রজগোপাল চিরকালই ভগবানের বাচ্চা। তিনিই আগলে রাখতেন। আলমকাকু দোকান দেখতেন বাবার কর্মচারী হয়ে। বাবা নেই তো অনাথ দোকানের ভার নিলেন উনি। কী করে যে ঐ অসময়ে অমন সৎ লোক ছিলো কে জানে? দোকান চললো আগের মতোই। ব্রজ গিয়ে মাঝে মাঝে বসতো, কিন্তু কিছুই বুঝতে পারতো না। আলমকাকুই সামলাতেন।

    আর ব্যবসাই বা কী? ছোটো হার্ডওয়ারের দোকান। তিরিশ বছর পরেও ছোটোই থেকে গেলো। টুকটাক,মাঝে মধ্যে দু একটা সামান্য কন্ট্রাক্ট। গর্মেন্টের এক আদটা।

    শহরতলির এদিকটা শহর কেমন জানি মুখ থুবড়ে পড়ে আছে।গেরস্ত ঘর কিছু। সাদামাটা।জমির উপর শকুন ওড়ে না।

    সে সময়েই বাড়ির হাল ধরতে আলমকাকু পাঠিয়ে দিলেন ময়নাকে। সে তখন বারো তেরো বছরের খুকী। তার মাসী দেখতো ব্রজ আর তার বাবার ছেঁড়াফাটা সংসার। তারও দিন ফুরালো। তো ময়না চলে এলো।

    দুই বানভাসি মানুষ। কিছু খড়কুটো ধরে ভেসে থাকা।

    প্রথমে ময়না পারতো না কিছুই। কোনোরকমে ডালেভাতে করে দিতো। দুপুরবেলা দোকান থেকে এসে খেতে বসে ব্রজর কান্না পেতো। কোনোদিন আলুনি, কোনোদিন নুনকাটা। কোনোরকম সবজীর ঘ্যাঁট। বিস্বাদ। আদসেদ্ধ, পোড়া।

    সেই ময়নাও ডাগর হল। ফ্রক ছেড়ে শাড়ি পরলো। তার রান্নার হাতও পাকা হল।

    সেই সময় থেকেই ব্রজগোপালের অলৌকিক দর্শন শুরু হল। দোকান থেকে ফিরে যতোটা পারে সময় বাড়ীতেই কাটায়। ধর্মের বইপড়ে। পড়ে আর ভুলে যায়। আবার পড়ে, আবার ভুলে যায়। বারবার পড়ে।পাড়া পড়শী, অল্প কজন যারা চিনতেন, সামান্য হলেও ভক্তি শ্রদ্ধা করতেন,তাঁরাই তখন  ব্রজঠাকুর বলে ডাকতেন ব্রজগোপালকে। পথে ঘাটে দেখা হলে প্রণামও করতেন এক আদজন।।

    প্রথমটায় কী রকম ঝাপসা দেখতেন। ছায়ার মতন। দেখেছি কি দেখিনি বোঝা যেতো না। আস্তে আস্তে ভালো করে দেখা দিতে লাগলেন তাঁরা। ঠাহর করে দেখতেন ব্রজগোপাল। দেখতেন সেই সব লম্বা মানুষ। বলিষ্ঠ, ফর্সা। মাথায় জটাজুট, পরণে বাঘছাল। হাতে কমন্ডুল।

    চিনতে শিখলেন,এরা সব পুরাযূগের মুনি ঋষিরা। ভরদ্বাজ মুনি,বশিষ্ঠ,বিশ্বামিত্র। যাজ্ঞবল্ক্য। আরো কতো।

    এই কথা কাকেই বা বলবেন ব্রজগোপাল? একবারই আলামকাকুকে বলতে যেরকম পুরু চশমার ফাঁক দিয়ে কটাক্ষে তাকিয়ে জোরে উনি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন তাতে আর কোনোদিন সাহস হয় নি তাকে বলতে। তো ময়নাকেই বলতেন।

    ময়না শুনতো। মন দিয়ে শুনতো।

    এমনি করেই ব্রজ বুড়ো হতে লাগলো। ব্রজর খেয়াল থাকে না। সে শুধু অন্ধকার বাগানের দিকে চুপ করে তাকিয়ে থাকে। একা একা,বুঁদ হয়ে। আর বাড়ীতে ঠাকুরদের আনাগোনা বেড়ে গেলো।

    একটা দুটো জোনাকির মিটমিটে আলো , মালতীলতার উপর অনাদরে পড়ে থাকে গেঁয়ো জ্যোৎস্নার আলো। বাড়ীতে হ্যারিকেনের আলো , কেরোসিনের গন্ধ। রান্নার গন্ধ। ধোঁয়া ধোঁয়া এলোমেলো হাওয়া। একটা সোঁদা ভাব।

    সাঁঝের বেলা দেখেন রাস্তা দিয়ে হেঁটে আসছেন তিনজনা। সামনে সেই আলোময় এক শ্যামল পুরুষ, পরণে কৌপিন, পিঠে তীর ধনুক। তার পিছনে মলিন পোষাকের এক রাজনন্দিনী। আর সবশেষে আরেক সুদর্শন যুবা, তার পিঠেও তুণীর, হাতে দৃঢ় ধনুক। কখনো আকাশ থেকে নেমে আসেন এক বিশালদেহী পুরুষ, তাঁর ক্রুদ্ধ মুখ। হাতে একুশ প্রজন্মের হত্যাকারী বিশাল কুঠার, ঝলসে ওঠে। ঘরের কোণায় ত্রস্ত পদে হেঁটে যান লক্ষ্মী,তাঁর ঝাঁপিতে কী থাকে?

    আর ঘরও বদলায়। কখনো  সখনো টের পান ব্রজগোপাল। ময়না বলে কী বিচ্ছিরি এই তোষোক। কবেকার চাদর। মনাবাবুর দোকান থেকে নতুন নিয়ে এইচি। আলম কাকুকে বলেছি পয়সা দিয়ে দিতে। নতুন হেরিকেন আসে। ঝকঝকে কাঁচ। হঠাৎ করে টের পান পেতলের গেলাশ টাও নতুন। একটা জানালায় পর্দা লাগে। বড্ডো অবাক হন ব্রজগোপাল।

    ঝিঁ ঝিঁ পোকা ডাকে, ব্যাঙের আওয়াজ। ময়না এসে ডাকে - দাদা ,খেতে আসো গো। ব্রজগোপাল ডাল ভাত সবজী সব একসাথে মেখে নিয়ে খায়। কী স্বাদ,সে আর খেয়াল করেন না। পাশের বাঁশঝাড়ে শন শন আওয়াজ হয়। ব্রজগোপাল শোনেন দূরে, কতো দূরে শোনেন,ঘন্টার ঢং ঢং আওয়াজ। ক্বচিৎ নাকে আসে ধূপধুনোর গন্ধ।

    টি টি টি টি করে কোন পাখি ঝটপটিয়ে উড়ে যায়।

    ব্রজগোপালের খাওয়া শেষ হলে ময়না নিজে খেয়ে বাসন মেজে বাড়ী যায়। যাবার আগে মনে করিয়ে দেয়, "টিউকলের মিস্তিরে খপর দিও। আর রেশনের চিনি কিন্তু ফুরিয়ে এসছে। এই হপ্তাতেই লাগবে"। ব্রজর কাছ থেকে হাঁ হুঁ করে কোনো সাড়া না পেয়ে বিরক্ত হয়ে চলে যায়।

    মিলিয়ে যাওয় হলুদ শাড়ির দিকে তাকিয়ে থেকে বিব্রত বোধ করে ব্রজগোপাল। কী যেনো বলে গেলো ময়না যাওয়ার আগে? হঠাৎই মনে পড়ে, এক ঝলকের মতন,ময়না ছোটোবেলায় একটা হলুদ রঙের ফ্রক পরতো না?

    সেই ময়নার বিয়ে ঠিক হল। কাঁদলো খুব। একদিন এসে বল্লো, দাদা, আমি চলে গেলে তোমার কী হবে? আমি তো বিয়ে করে শহরে চলে যাবো। কে দেখবে তোমায়? সে কাঁদে।

    জড়িয়ে ধরলো কি ব্রজগোপালকে? মনে করতে পারে না ব্রজগোপাল। কেউ তো ক্খনো ব্রজগোপালকে জড়িয়ে ধরে নি। সারাজীবনে। কখনো না।কখনো না। তাও মনে পড়ে না। ময়না বলে, তোমার কাছেই থাকতে চাই দাদা। তোমায় ছেড়ে যেতে চাই না। ফুঁপিয়ে কাঁদে ময়না।

    ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে ব্রজগোপাল। তার মুখে কথা আসে না। সে বুঝতেও পারে না। সে শুধু চুপ করে থাকে। যেনো তার জিভ আটকে গেছে। কখন ময়না তাকে ছেড়ে দেয়। চলে যায়।

    ব্রজগোপালের কি ইচ্ছে করেছিলো ময়নার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে? ময়নার কাটাকুটি মুখের থেকে চোখের জল মুছিয়ে দিতে? মনে পড়ে না,ব্রজগোপালের সেই কথা। 

    আর কোনোদিনও দেখে নি তাকে ব্রজগোপাল। শহরে যারা যায়,তারা কি আর ফেরে না?

    ক`দিন বেশ কষ্ট গেলো ব্রজগোপালের।কী খাবে? নোংরা জামা কাপড়। ঘরে ধুলো। বড়ো ফাঁকা লাগে। কীসের শুণ্যতা? বড়ো ফাঁকা লাগে।  

    আর ঠাকুরের কী কৃপা দ্যাখো। সদ্য কিশোর মোহনকে নিয়ে শান্তিবালা এলো। আচমকাই। ভাসতে ভাসতে ডুবতে ডুবতে তাদের আর কোনো ঠাঁই ছিলো না । সেই কবে শুনেছিলো আছে তার এক জ্ঞাতি ভাই। আশায় আশায় সেই খানেই একটু মাথা গোঁজার জন্য এসেছিলো শন্তিবালা আর মোহন।

    সেই না বলা গল্পোগুলো ব্রজগোপাল এখন বলেন শান্তিবালাকে। শোনে কি শোনে না, শান্তিবালা হুঁ হুঁ করেন। আর তরকারি কাটেন। বড়ি দেন ছাদে। হুস হুস করে তাড়ান কাকেদের। বিছানা রোদ্দুরে দেন। সেলাই করে দেন ফাটা পাঞ্জাবি। দুধ গরম করে মুখের সামনে ধরেন ছেলে আর ছোটো ভাইএর। বাড়ীতে ঠাকুর দেবতারা এলেন কি গেলেন,সেই নিয়ে তাঁর অন্তত মাথাব্যথা নেই। কখনো সখনো ব্রজগোপাল ডাকেন "দিদি, ঐ যে। দেখতে পাচ্ছো?"। অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকেন শান্তিবালা। কবেকার আধ ভাঙা তুলসী মঞ্চ। বেলগাছ। আগাছার ঝোপ। আকন্দ ফুল ফুটে আছে। কী দেখবো? ব্রজগোপাল আঙুল তুলে দেখান "ঐ যে রাজমুকুট পরে হেঁটে যাচ্ছেন, উনি যুধিষ্ঠির । দ্যাখো কী সুন্দর দেখতে"। শান্তিবালা সসম্ভ্রমে মাথা নেড়ে চলে আসেন।

    মোহনও বড়ো হল। আর আলমকাকু তিনদিনের জ্বরে সেই যে শুলেন আর চোখ মেললেন না। তো মোহনই দোকানপাট দেখতে শুরু করলো। বেশ লায়েক ছেলে। ব্রজগোপালের খাঁ খাঁ জীবন খুব নিশ্চিন্ত। । 

    ব্রজগোপালের চোখে কী ছানি পড়লো? বড়ো ঝাপসা দ্যাখেন চারদিক। যেনো এক ধোঁয়ায় ভরা আকাশ। কুয়াসার মতন। কানেও কম শোনেন। বা শোনার ইচ্ছেটাও চলে যাচ্ছে। দেবতারা আসেন, ছায়ায় ভরা উঠানে। নিকানো দাওয়ায়। লাউমাচার নীচে। ঋষিরা বসেন। নিঃসীম রাত্রে এক দারুন ওম ধ্বনি ওঠে চরাচর জুড়ে। মেঘের মতন শংখ বাজে আকাশে। 

    জষ্ঠিমাসের ঘেমো বিকেলে দাওয়ায় বসে থাকেন ব্রজগোপাল। বাইরে ঝাঁ ঝাঁ রোদ। আকাশে কোনো মেঘ নেই, জলের গন্ধও নেই কোনো। 

    বসে থাকতে থাকতেই কিরকম মাথাটা ঘুড়ে যায়।ডাকতে গিয়েও পারেন ন। জিভ ভারি হয়ে আসে। টের পান, কেমন করে সব কিছু ধীরে, খুব খুব ধীরে চলতে থাকে। আকাশে চিক্কুর কাটা চিল কেমন থমকে যায়, গাছের থেকে একটা পাতা পড়তে থাকে,পড়তেই থাকে,অনন্তকাল ধরে। কে যেনো তাকিয়ে থাকে তার দিকে।

    অবাক হয়ে বুঝতে পারেন,কে যেন মাথার কাছে বসে। তার খুব জ্বর। গা পুড়ে যাচ্ছে।

    মনে পড়লো ,মনে পড়ল। আনেকদিন আগে কার যেনো কুন্ঠিত হাত ,খুব স্নেহে তার মাথায়,কপালে বুলিয়ে দিচ্ছিলো। জীবনে একবারই। আর জিজ্ঞেশ করছিলো "খুব ব্যথা? ব্যথা কি দাদা?"  একবারই। ভালোবেসে।

    হলুদশাড়ি চিনতে পেরে চমকে ওঠেন ব্রজঠাকুর। "ময়না?"

    শুনতে পান, কারা যেনো চিৎকার করে উঠছে। ভয় পেয়েছে কেউ। কারা যেন ত্রস্ত পায়ে ছুটে আসে।

    তাও মনে পড়ে, ব্রণর দাগ,শুকনো গালে জল ঝরে পড়ে, "আমি চলে গেলে তুমি খাবে কী করে গো দাদা?"

    ব্র্জগোপাল বিস্ময়ে আবার বলেন "ময়না?" বলতে চান। ভালো করে বলতে পারেন না।আওয়াজ জড়িয়ে গেছে।

    ডুকরে কাঁদেন শান্তিবালা। "মা এসেছে ছেলেকে নিয়ে যেতে। মাকে ডাকছে গো"।

    শেষ নিঃশ্বাস ফেলার আগে একবারের জন্য অনেক কিছু বুঝতে পারেন ব্রজগোপাল। অনন্ত তৃপ্তিতে তার মন ভরে যায়। উপছে ওঠে।

    মোহন বলে" না গো মা। মা দুগ্গাই এয়েছিলেন। মামুরে নিয়া যেতে। দ্যাখো না, মুখ কেমন খুশি খুশি"।




    বছর শুরুর গুরুচন্ডা৯ - সূচিপত্র »
  • বিভাগ : মোচ্ছব | ০১ জানুয়ারি ২০২০ | ৮৩ বার পঠিত
  • আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা ভাইরাস

  • পাতা : 1
  • | 237812.69.563412.99 (*) | ০২ জানুয়ারি ২০২০ ০৫:২৪80128
  • পচা গপ্পো ডিডিদাদা
    :-(
  • de | 236712.158.895612.166 (*) | ০২ জানুয়ারি ২০২০ ০৮:৫১80129
  • বাঃ! ভালো লাগলো -
  • একক | 236712.158.895612.176 (*) | ০৩ জানুয়ারি ২০২০ ০৭:৪০80130
  • এইটে বেশ তদগত
  • করোনা ভাইরাস

  • পাতা : 1
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত