এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  ব্লগ

  • সেখ সাহেবুল হক

    সেখ সাহেবুল হক লেখকের গ্রাহক হোন
    ব্লগ | ২৫ জুন ২০১৭ | ৮৫০ বার পঠিত
  • শ্রীজগন্নাথ ও ছোটবেলার ভিড়
    -----------------------------------------------------------
    মামাবাড়িতে নাতি হিসেবে কদর তো ছিলোই। ভাগনা হিসেবে ছিলো আলাদা ব্যাপারস্যাপার। সেযুগে রোগী দেখে ফেরা মামার ব্যাগ হাতড়ে মিলতো আঙুর, কখনও মুগবেড়িয়ার স্কুলমোড়ের জনপ্রিয় রসমালাই, বা কালো পলিথিনে জামরুল…!
    মামা তাঁর বন্ধুদের আমায় নিয়ে মজা করে একটা কথাই বলতেন, “ভাগনা জগন্নাথ, ঠিকভাবে সেবা না করলে অমঙ্গল হবে”। ব্যাস এভাবেই প্রথম জগন্নাথ শব্দটির সাথে পরিচয়।

    এভাবে জগন্নাথ দেবের জলজ্যান্ত অবতার হয়েও আমি ছয় বছর বয়স পর্যন্ত রথ দেখিনি। মেদিনীপুরে মামাবাড়িতে বিভিন্ন গাড়িতে, বাড়িতে, এমনকি মন্দিরে জগন্নাথদেবকে দেখতাম। অথচ জানতামই না উনিই শ্রীজগন্নাথ।

    হাওড়ার একেবারে পাড়াগাঁ ছেড়ে ৯৮ সালে কাকদ্বীপে এলাম। তারপরই প্রথম রথ দেখা, পাঁপড়ভাজা, রথের ভিড়ে হাঁটা। প্রথম উল্টোরথ দেখার আগে পর্যন্ত আমার মনেহতো উল্টোরথে রথ বুঝি উল্টে চলে। ভুল ভেঙে দিলো সময়।

    এরপরের রথগুলো সত্যিই অন্যরকম ভালো কাটতো। দিনকয়েক আগেই রথ বের করে রাখা হতো দুর্গামন্দিরের মাঠে, তারপর নির্দিষ্ট দিনে রথ সাজানো হতো ফুল, নানা প্লাস্টিকের সামগ্রী দিয়ে। রথের গায়ে আঁকা জগন্নাথ-শুভদ্রা-বলরামের ছবি। রথের চূড়ায় ছোট্টছোট্ট পতাকা লাগানো।

    বিকেল হলেই মেলা জমতে থাকে। মাথার ভিড়, রাস্তার দুপারে নানা দোকানের পসরা, জগন্নাথ প্রস্তুতি নিচ্ছেন মাসিরবাড়ি ‘বামুন পাড়া’ যাওয়ার জন্য।

    নিশি কাকুর চায়ের দোকানের সামনে জিলিপির অস্থায়ী দোকান বসেছে। আরো অনেক জিলিপি দোকানের ভিড়ে এটাই জনপ্রিয়। গরম গরম জিলিপ ভাজা হচ্ছে, ভিড় জমছে।
    পাঁপড় ভাজা হচ্ছে জিলিপির পাশেই। জিলিপি কিনতে গেলে পাঁপড় খেতে হবেই। ফুচকার দোকানে মেয়েদের ভিড়, সে ভিড় ভেদ করে ফুচকা খাওয়া। এক টাকায় চারটে ফুচকা, কি অপরূপ তার স্বাদ! ফাউ চাইতেও ইচ্ছে করতো না।
    একটু পেরিয়ে আদিত্যকাকুর চপ দোকান, সেখানে আজ ঢুকতে পারা যাচ্ছে না। চপ, ঘুগনী, বোমের জয়জয়কার।
    মশলামুড়ির দোকানে একটাকায় মুড়ি মিলতো তখন। নারকেলের সরু টুকরো মুড়ির উপর ঠোঙা উপুড় করে একগাল মুড়ি মুখে নিয়ে আলতো কামড়ে নারকেল কেটে নেওয়া। ধনেপাতার গন্ধে, দাঁত কামড়ে বসে কাঁচা লংকার টুকরো। ঝালে ‘উহহহ’ করে ওঠা ছোটবেলায় তখনো ভেজাল ঢোকেনি।

    পকেটে দুই ভাইয়ের মেলার হাতখরচ কুড়িটাকা। এর মধ্যে এতোকিছু করা সত্যিই খুব চাপের। প্লাস্টিকের বন্দুক পনেরো টাকা, জলে চলতে পারা টিনের নৌকা পাঁচটাকা, পেছোনে টানলে সামনে যাওয়া গাড়ি কুড়িটাকা, গান হওয়া মোবাইল পঁয়ত্রিশ টাকা। উসমানকাকুর খেলনা দোকানের সামনে দিয়ে গেলে রোমাঞ্চ লাগে। কিছু জমানো টাকায় কিনে ফেলা খেলনা মোবাইল। বোতাম টিপলেই গান হচ্ছে - “বুমরো বুমরো শাম রঙ বুমরো”। কখনো আবার - “চলে ছইয়াঁ ছইয়াঁ…”। আবার অন্য বোতাম টিপলে মেয়ে গলা বল উঠছে - টুট.টুট.টুট...হ্যালো। গাড়িটা কেনা হয়নি। উলটোরথে কিনে ফেলার প্ল্যান করলাম দুইভাই। হাতে নিয়ে কয়েকবার টেস্ট ড্রাইভ সেরে রেখেছি। রিমোট দেওয়া গাড়িটা বাজেটের বাইরে চলে যাচ্ছে তাই ওটা বাতিল।
    মানুষের কেনাকাটা দেখতাম। কেউ কাঁঠাল কিনছেন দামাদামি করে, কেউ লেবুচারা নিচ্ছেন। কোন বৌ কিনে নিচ্ছেন সস্তায় ঝুড়ি। বাচ্চা ছেলের খেলনার জন্য অনুনয়, লুটিয়ে কাঁদা, কিনে দিতে না পারা বাবা-মায়ের বিব্রত মুখ...।

    প্রায় সন্ধ্যে হয়ে এসেছে। রথের উপর চেপে বসেছেন ঠাকুর মশাইরা। গায়ে নামাবলীর পোষাক। ঢাকের বাদ্যি বাজছে। রথের উপর থেকেই গান হচ্ছে - “জানি তোমার প্রেমের যোগ্য আমি তো নই…”। মাঝেমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কিছু ঘোষণা। বাতাসা হরিলুট শুরু হলো। মানতের বাতাসা ছুঁড়ে দেওয়া হচ্ছে দুর্গামন্দিরের মাঠে, কখনো পিচ রাস্তায়। জনতার ভিড় হাত বাড়িয়ে বাতাসা লুফে নিতে চাইছে। মাটিতে পড়ে যাওয়া বাতাসাও ভক্তিভরে তুলে নিচ্ছেন মানুষেরা। এরই মধ্যে চাঁপাদির সাথে দেখা। মাকে নিয়ে দুই বোনে বেরিয়েছে ওরা। ভীড়ে বাতাসা কুড়োতে পারছে না। আমি বাতাস কুড়িয়ে ওদের হাতে দিচ্ছি...। হরিলুটের মাঝে বাচ্চা বাচ্চা ছেলেমেয়েদের রথে তুলে আবার নামিয়ে দেওয়া হচ্ছে। বোধহয় এটা অনেকের মানত থাকে। রথে চড়ানোটা মঙ্গলকর বলেই...।

    রথ এবার এগোবে। মাইকে ঘোষণা হলো। ভিড় রথের সামনে জমায়েত হলো। নির্দেশমতো রথ এগোবে, সবুজ পতাকা দেখালে রথ এগোবে, নীল পতাকা হলে রথে টান দেওয়া বন্ধ হবে। এছাড়া মাইকে নির্দেশ থাকবেই পর্যায়ক্রমে থেমে যাওয়ার, এগিয়ে যাওয়ার। যাওয়ার পথে বাড়ির ইলেক্ট্রিকের তারগুলোকে লম্বা বাঁশ দিয়ে উপরে তুলে ধরা হবে, যাতে চূড়া ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।

    রথে টান পড়লো। গড়গড়িয়ে রথ এগোচ্ছে ঢাকের বাদ্যি চড়া হচ্ছে। রথ আস্তে আস্তে এগিয়ে চলছে, শ্রীজগন্নাথ দেব মাসিরবাড়ি চলছেন। আমারো মনে পড়েছে মামাবাড়ি। ভিড়ে রোমাঞ্চ জাগে। আমি মানুষের উন্মাদনা দেখছি, ভক্তি দেখছি, মুগ্ধ হচ্ছি।
    অনেক ছোটখাটো রথ নিয়ে বাচ্চারা রের হয়েছে। তাদের উন্মাদনাও দেখার মতো।

    আস্তে আস্তে রথ চোখের সামনে দিয়ে চলে গেলো। মনখারাপ হলো আমার। এতো মানুষের হাট ভাঙতে দেখলে মনখারাপ হওয়া স্বাভাবিক। অপেক্ষা উল্টোরথ পর্যন্ত, গাড়িটা শেষপর্যন্ত কেনা হবে কিনা সেই সংশয়ের রোমাঞ্চকর গল্প। ঠিক যেন আনন্দমেলার ক্রমশ লেখা ধারাবাহিক উপন্যাস।

    এমনই ছিলো সেসব রথের দিন। পকেটে পয়সার টান ছিলো, কিন্তু খুশিরা বিস্কফার্ম বিস্কুটের বিজ্ঞাপনী লাইন ছিলো না। সব স্বাদের ভাগ দেওয়ানেওয়া চলতো। একটাকার ঝালমুড়ি, পাঁচটাকার ফুচকা, দু চারপিস জিলিপিতেই শান্তি ছিলো।
    তখনকার ভক্তিবোধে বিদ্বেষ ছিলো না। ক্রমে বাবার কাছেই শেখা - “রথযাত্রা লোকারণ্য মহা ধুমধাম, ভক্তেরা লুটায়ে পথে করিছে প্রণাম।”। রথের মেলায় গণদেবতার সমাগম দেখেই বড় হওয়া।
    হরেকৃষ্ণ মামার বাবা রথের দায়িত্বে আজও বড় ভূমিকা নেন। তিনি আমাদের দাদুর মতোই একান্ত কাছের।
    বড় হওয়ার পরে রথের মেলায় সেই অনুভূতিটা পাই না ঠিকই। কিন্তু খেটে খাওয়া মানুষের উন্মাদনা বা ভক্তি কিছুই কমেনি।

    ইদানীং ঈদ-রথযাত্রা নিয়ে রাজনীতি টানার নোংরামি দেখি। কিন্তু আজও পথই দেবতা, মানুষকে দেখি গণদেবতার বেশে। রথের পাঁপড়, ঈদের সিমুইয়ের মধ্যে যে অভিন্ন আন্তরিকতা, আত্মার টান। সেসব রাজনৈতিক চক্রান্তকে ছাপিয়ে যায়। বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনায় নিজেকে ব্যর্থমনোরথ মনে হয়েও রথটা আজও তেমনই আছে।

    #হককথা
  • ব্লগ | ২৫ জুন ২০১৭ | ৮৫০ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • Arindam | 213.132.214.86 (*) | ২৭ জুন ২০১৭ ০৫:০১60420
  • ভাল লাগার অনুভূতি টুকু স্বাদু। বর্তমানের পঙ্কিলতা তাকে বিস্বাদ করতে পারেনি!
  • utpal mitra | 212.191.212.178 (*) | ২৭ জুন ২০১৭ ০৯:৫৬60421
  • বড়ো ভালো । আরও লিখুন
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। কল্পনাতীত মতামত দিন