এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  ব্লগ

  • দ্বন্দ্বসমাস ও কবির মুকুট

    শিবাংশু লেখকের গ্রাহক হোন
    ব্লগ | ২৭ এপ্রিল ২০১৭ | ৮৬০ বার পঠিত
  • শুদ্ধ সঙ্গীতের ভাষা মানে শুধু সুরের ভাষা। যেসব প্রাকৃতিক শব্দ থেকে মানুষের মনে সুরের ধারণা তৈরি হয়েছিলো, যেমন বিভিন্ন পশুপাখির ডাক, তা একান্ত ভাবে সুরের পর্দানির্ভর অনুভূতি। সৃষ্টি হবার পর বহুদিন পর্যন্ত সুর'কে কথার ভার বহন করতে হয়নি। আদিম সুরের ধারাটিকে যখন কথার অবলম্বন গ্রহণ করতে হয়েছিলো তখন তার পিছনে ছিলো দু'ধরনের প্ররোচনা। হয় অধ্যাত্ম নয় মানুষী প্রেমের পয়গাম পৌঁছে দেওয়া। পৃথিবীর সব দেশেই ধ্রুপদী সঙ্গীতে কথার কোনও ভূমিকা নেই। অন্যদিকে লোকগীতের যে ঘরানা, সেখানে শুধুই কথার শিল্প, সুর সেখানে বাহনমাত্র। কথাভিত্তিক বা বাণীভিত্তিক যে সঙ্গীতধারা'কে আমরা জানি তা পৃথিবীর সামগ্রিক গীতসম্ভারের একটা অংশমাত্র, অতএব তার ভূমিকাও সেই অর্থে সীমাবদ্ধ।
    ----------------------------------------
    একটা প্রশ্ন সবসময়েই প্রাসঙ্গিক থাকে। গীতিকবিতা, যা'কে আমি লিরিক নামেই অভিহিত করবো, তা কতোটা কবিতা? যাঁরা লিরিক তথা তা'কে ভিত্তি করে সঙ্গীতরচনা করেন, তাঁরা এই বিষয়টি নিয়ে বিশেষ স্পর্শকাতর। সারাপৃথিবীতেই লিরিক রচয়িতারা, বাংলায় গীতিকার, নিজেদের 'কবি', অর্থাৎ যাঁরা 'কবিতা' রচনা করেন তাঁদের সমান স্বীকৃতি দাবি করেন। কিন্তু অধিকাংশ পণ্ডিতই গীতিকারদের সেই স্বীকৃতি দিতে ঠিক রাজি ন'ন। এর মানে এই নয় লিরিকরচনা কবিতা রচনার চাইতে 'সহজ' বা সংস্কৃতিগতভাবে অকুলীন। আসলে উভয়ের ক্ষেত্রটাই একেবারে পৃথক। লিরিক সাধারণত শ্রাব্য সুরমাধ্যম, অন্যপক্ষে কবিতা একটি পাঠ্য মাধ্যম এবং সুরের সহযোগ প্রত্যাশী নয়। কবিতা অক্ষরের একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ নির্মাণ, অন্যদিকে লিরিক সুরনির্ভর রচনা। এই দু'টি শৈলির নির্মাণ ও সংযমের পরিভাষা আলাদা। কবিতার ভাষাটি'কে যদি বলা যায় সাহিত্যভাষা তবে লিরিকের ভাষাটি সুবোধভাষা। লিরিকের একটা দায় থাকে প্রথমবারেই শ্রোতার মনে 'বুঝে' যাবার মতো একটা অর্থের অভিঘাত তৈরি করা। অপরপক্ষে কবিতা'র 'অর্থে'র নানা স্তরবিভাজন থাকে। দুরূহতার মাপকাঠিতে ভিন্ন সমতল। কবিতা একবার কানে শুনেই তা'কে সম্পূর্ণতঃ আত্তীকরণ করা যায়না। অর্থাৎ কবিতাকে সাহিত্যের নানা ম্যানারিজম ও ফর্মের দুরূহতা'কে স্বীকার করে নিতে হয়। সাহিত্যের ছাত্র'কে কবিতার পাঠ নিতে গেলে একটা দীর্ঘ স্ট্রাকচার্ড পদ্ধতির মধ্যে দিয়ে আসতে হয়। লিরিকের সে দায় নেই।
    ---------------------------------------

    বঙ্কিম ভাবতেন, ভারতবর্ষের স্বর্ণযুগ মানে আর্যপুরুষের দাপটমুখর সময়কাল। কিন্তু পরবর্তীকালে সেই ভারতবর্ষ 'ধর্মশৃঙ্খলে' এমন বাঁধা পড়ে গিয়েছিলো যে তাদের উদ্যম, পৌরুষ সব বিসর্জিত হয়ে একদিকে 'ধর্মসাহিত্য' অর্থাৎ পুরাণ ইত্যাদি এবং অন্যদিকে কাব্যসঙ্গীত জাতীয় অলস, উদ্যমহীন বিলাসে নিমজ্জিত হয়ে পড়েছিলো। তার উপর আবার বঙ্গদেশে মানুষ নানা কারণে স্বভাব-অলস হবার পাপে আর্যতেজের গৌরব থেকে প্রথম থেকেই বঞ্চিত । উপরন্তু তাদের দ্বারা " উচ্চাভিলাষশূন্য, অলস, নিশ্চেষ্ট, গৃহসুখপরায়ণ চরিত্রের অনুকরণে এক বিচিত্র গীতিকাব্য সৃষ্ট হইল। সেই গীতিকাব্যও উচ্চাভিলাষশূন্য, অলস ভোগাসক্ত গৃহসুখপরায়ণ। সে কাব্যপ্রণালী অতিশয় কোমলতাপূর্ণ, অতি সুমধুর, দম্পতিপ্রণয়ের শেষ পরিচয়। অন্য সকল প্রকার সাহিত্যকে পশ্চাতে ফেলিয়া, এই জাতিচরিত্রানুকারী গীতিকাব্য সাত আট শত বৎসর পর্যন্ত বঙ্গদেশে জাতীয় সাহিত্যের পদে দাঁড়াইয়াছে। এই জন্য গীতিকাব্যের এত বাহুল্য।" নিদারুণ অভিযোগ। বঙ্কিম যখন এই লেখাটি লিখেছেন তখন জোড়াসাঁকোর বিরাট মানুষগুলি প্রাচ্য-পাশ্চাত্যের নানা শৈলি, প্রকরণকে আত্মস্থ করে গীতিনাট্য, নৃত্যনাট্য, অপেরা ইত্যাদি পূর্ণ উদ্যমে সৃষ্টি করে যাচ্ছেন। তখন সাহিত্যসমাজে কুলীন ছিলো অধ্যাত্মিক বা দেশপ্রেমবিজড়িত উদাত্ত কাব্যচর্চা। মনে হচ্ছে সমাজের মুভার আর শেকারদের কাছে গীতিকবিতা বা লিরিক নেহাৎ এক জল-অচল বিনোদন মাত্র।
    ------------------------------------------------
    কবিতা ও লিরিকের উত্তমর্ণতা বা অধমর্ণতার বিচার নিয়ে সুদীর্ঘকাল ধরে সারা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মস্তিষ্কগুলি ভাবনাচিন্তা করে এসেছেন। সেই সব মেধামুখিন উপলব্ধিগুলিকে সংক্ষিপ্ততম সাধারনীকরণ করেও এখানে ধরানো যাবেনা। সে চেষ্টাও করবো না। তবে একটা কথা অবশ্য মনে রাখা প্রয়োজন বাংলা লিরিকও প্রাক রবীন্দ্রপর্বে দেশেবিদেশে তার অন্যান্য সহযাত্রীদের মতো-ই 'কবিতা'র 'অভাবী আত্মীয়'ই ছিলো। বঙ্কিমের উল্লিখিত অবস্থান থেকে এই ধারণাটি বিশেষ প্রকট হয়ে প্রকাশ পাচ্ছে। রবীন্দ্রনাথ একা আমাদের ভাষায় এই হিসেবটি উল্টে দিয়েছেন। পরবর্তীকালে তাঁর সমতুল কাউকে পাওয়া যায়নি বটে, কিন্তু বাংলায় লিরিক রচনাকারীদের সঙ্গে 'কবি'দের পার্থক্যটি অন্যান্য ভাষা'র তুলনায় কমে গিয়েছে। তার ফলে আমাদের সন্ধান'টি অনেকটা দূরবীনের বিপরীত দিক দিয়ে দেখা চরাচরের মতো দেখাবে।
    --------------------------------------
    ভবভূতি বলেছিলেন, " বিপুলা চ পৃথ্বী, কাল নিরবধি"। মানুষের বোধ-বুদ্ধি-রুচি সব কালনিয়ন্ত্রিত। কালের ধর্ম হলো পরিবর্তিত হওয়া। তাই কোনও পরিভাষা, উপলব্ধি, মননই চিরস্থায়ী নয়। তিনশো বছর আগে মানুষ যে প্রকাশভঙ্গিটিকে 'গান' বলে জানতো, আজ তার থেকে আমূল পরিবর্তন হয়ে গেছে। পাঁচ-ছশো বছর আগের বিদ্যাপতি বা জয়দেবের রচিত গান এখনও মানুষ গায়। গীতগোবিন্দমে সব গানের রাগ-তাল নির্দেশ দেওয়া আছে, তা মেনেই গায়। কিন্তু তা কি আর জয়দেবের নিজের সময়ের সঙ্গে মিলবে? তাই 'গান' কী বা 'কবিতা' কা'কে বলে, কখন তা সফল হয়, সার্থক হয়, তা'র কোনও সরল সমীকরণ নেই। অসংখ্য মানদন্ড রয়েছে, কোনটাই তুচ্ছ বা ভ্রান্ত নয়। কবিতা হোক বা গান, আসলে তা একধরণের দূষণমুক্ত, অক্সিজেনভরা হাওয়ার প্রবাহ। আমাদের বোধের জানালা দিয়ে ঢোকে, দরজা দিয়ে বেরিয়ে যায়। যতো হাটের ধূলা, মনের কালো উড়িয়ে দিয়ে অনন্তের দিকচক্রবালে। আমরা তাকে অনুভব করি, কিন্তু মুঠোয় ভরে রাখতে পারিনা। তাকে পেতে গেলে জীবনের সব দরজা-জানালা হাট করে খুলে রাখতে হবে। কখনও তা ঝোড়ো বাতাস, কখনও ভেজা আবেশ, কখনও বা বসন্তসমীর। একভাবে এটাকে 'যতমত, ততো পথ' বলা যেতে পারে। লক্ষ্য তো একটাই। দিনের শেষে শিল্পের আয়নায় নিজের বোধবুদ্ধির পরিধিটা মেপে নেওয়া। শান্তি পাওয়া, অশান্তিও। তাও তো একটা পাওয়া। নয়তো বীণা বাজবে কী করে?
    ----------------------------
    শ্রেয়ত্বের যে দায় কবিতাকে বহন করতে হয় তার স্ফূর্তি ঘটে কবির স্বাধীন চিন্তা ও শৈলির কৌশলের মধ্যে দিয়ে। লিরিকের দায় অন্য জায়গায়। তাকে নির্দিষ্ট সুর-তাল-লয়ের মধ্যে বাঁধা হয়ে থাকার বন্ধন স্বীকার করতে হয়। লিরিকের ক্ষেত্রে দেখি শব্দ প্রয়োগে কখনও বা ধ্বন্যাত্মক শব্দ বা কখনও আবার ভারি তৎসম শব্দের আশ্রয় নিতে হয় সুর বা লয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখার প্রয়োজনে। লিরিক শ্রুতিমধুর হওয়া প্রয়োজন। বাংলাগানের আদিরূপ অর্থাৎ কীর্তন রচয়িতারা কোমল ও ললিত বাণী প্রয়োগ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। সুর বা তাল ও লয়ের জগতটি, বিশেষত মেলোডি প্রকরণে, সম্পূর্ণত আবৃত্ত বা বৃত্তীয় চলনটি মেনে চলে। তাই এই গীতিশৈলিতে শব্দগুলিকে সুরের সম ফাঁক মেনে চলতে হয়। এই জাতীয় বন্ধনের খাঁচায় স্বতস্ফূর্ত কবিতার শরীর স্বস্তি পায়না। অন্ত্যমিলের যে আবশ্যিক অনিবার্যতা তাতে কয়েকটি বিশেষ বর্ণ, যেমন র, ন, ল বা আকারান্ত, ইকারান্ত ও একারান্ত শব্দকে প্রাথমিকতা দিতেই হয়। রবীন্দ্রপরবর্তী পর্বে বাংলাগানের লিরিক'কে রেকর্ড, সিনেমা বা রেডিও'র বাজার অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করেছে। রবীন্দ্রনাথ বা সমসাময়িক দ্বিজেন্দ্র, রজনীকান্ত বা অতুলপ্রসাদের গীতরীতিকে এ জাতীয় বাজার অর্থনীতির অনিবার্যতা বহন করতে হয়নি। বিভিন্ন 'হিট' গানের সঙ্গে তাল রাখার দায়ে গীতিকারদের অনেক সময়ই আপস করতে হয়েছে। শ্রোতাসাধারণের প্রত্যাশা বা ইচ্ছা এক্ষেত্রে নান্দনিকতার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধ সৃষ্টি করেছিলো। বাংলাগানকে শিল্পের অভিমুখ থেকে সরে বিনোদনের গড্ডলিকায় সামিল হতে হয়েছে বার বার। লোকপ্রিয় গীতিকারদের কাব্যদক্ষতা আদৌ আছে কি না তার প্রমাণ দেওয়ার সুযোগ তাঁদের কাছে বিশেষ আসেনি। এই প্রবণতাটি শুরু হয় নজরুলের সময় থেকে। নজরুল ছিলেন টোটাল কম্পোজার। পরবর্তীকালে এই ক্ষমতা দেখাতে পেরেছিলেন সলিল চৌধুরী ও সুমন। কিয়দংশে জটিলেশ্বর, মৌসুমি। যদিও সলিলের লিরিক অনেক সময়ই সুরের প্রয়োজনে আপোস করেছে। সুমন লিরিক নিয়ে আপোস করেননি বটে, কিন্তু তাঁর সুরে পুনরাবৃত্তি এসে গেছে বিভিন্ন গানে। একশো বছর আগে বাংলা কবিতায় নির্দিষ্ট বিষয়বদ্ধতা ছিলো বিশেষভাবে প্রকট। কবিরা তাঁদের বিভিন্ন বিষয়ভিত্তিক ভাবনাগুলিকে প্রকাশ করতে চাইতেন কাব্যমাধ্যমে। তা প্রকৃতিপ্রেম, মানুষীপ্রেম, দেশপ্রেম, ভগবৎপ্রেম যে কোনও কিছুই হতে পারে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে অসংখ্য বিবর্তনের ধারায় কবিতার শরীর, ভাষা, শৈলি ক্রমশ বিমূর্ত হয়ে যেতে থাকে। বিষয়গুলির মধ্যে পরিবর্তন আসেনি, কারণ তারা চিরন্তন। কিন্তু প্রকাশভঙ্গির নিরন্তর ভাঙাচোরা ও পুনর্গঠন তাকে আপাতভাবে দুরূহ করে তুলতে থাকে। যে কাব্যচর্চা এককালে ছিলো কীর্তন, রামায়ণগান, শ্যামাসঙ্গীত বা কবিগান, মূলত সঙ্গীতমাত্র, সেটি রবীন্দ্রপ্রভাবে কবিতা ও লিরিকে বিভক্ত হয়ে যায়। রবীন্দ্রনাথ দু'টি ধারার প্রতিই সমান সুবিচার করতে পারতেন। কিন্তু তাঁর উত্তরসূরিরা সে পর্যায়ের উৎকর্ষ স্পর্শ করতে পারেননি। কিন্তু যেহেতু শ্রোতৃসাধারণের কাছে 'গীতবিতান' ও 'স্বরবিতান' , দুইই সুলভ, তাঁদের প্রত্যাশাও তাই অত্যন্ত বেড়ে যায়। পরবর্তীকালের বাংলাকাব্যে কবি ও গীতিকারের ভার্টিক্যালগুলি একেবারে পৃথক হয়ে যাবার ঘটনাটি তখন থেকেই শুরু হয়। ঘর পৃথক হওয়া পর্যন্ত শৈলেন রায়, হীরেন বসু, হিমাংশু দত্ত বা অজয় ভট্টাচার্য প্রমুখের 'কবিত্বশক্তি' নিয়ে মানুষের সংশয় ছিলোনা। কিন্তু এই জলবিভাজনটি ঘটে যেতে তাঁদের লেখায় ক্রিয়াপদের গীতিকরণ বা আবৃত্ত দশমিকের মতো কিছু বহুব্যবহৃত কয়েনেজ ও ইমেজারি ক্রমশ প্রকট হয়ে ওঠে এবং কবিতাপাঠকদের বিরূপ প্রতিক্রিয়া আকর্ষণ করে। শ্যামল গুপ্ত বা গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার পর্যন্ত বাংলা গীতিকবিতার যাত্রায় এই ধরণের সাজানো শব্দ ও তার ক্রমাগত প্রয়োগ তাদের বাংলাকবিতার মূলধারা থেকে বহুদূরে নিয়ে চলে গেলো। কারণ যতোদিন গেছে, গীতিকারদের উপর সুরকারদের চাপ ক্রমশ বেড়ে উঠেছে। এই চাপের পিছনে বাজারের সমর্থন ও আনুকূল্য ছিলো। তাই গীতিকারদের খেলার মাঠটি বিশেষ ছোটো হয়ে যায়। টিকে থাকার অনিবার্যতায় তাঁরা গতানুগতিকতার ঊর্ধে যাবার প্রয়াস বিশেষ করেননি। তবে এটাও স্বীকার্য যে হঠাৎ আলোর ঝলকানির মতো নানা গানে তাঁদের কাব্যকৌশল প্রতিফলিত হয়েছে বহুবার। কিন্তু 'কবি' হয়ে ওঠার স্বীকৃতি তাঁদের কাছে অধরাই থেকে গেছে। অত্যন্ত 'সফল' গীতিকার পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই জন্য বারবার আক্ষেপ করে গেছেন। তাঁর অবসাদরোগের পিছনে হয়তো এটাও একটা কারণ ছিলো।
    ------------------
    এই মূহুর্তে বাংলাগানের বাণীর মধ্যে সংলাপবাহুল্যের লক্ষণ খুব স্পষ্ট। প্রাত্যহিক জীবন ও দৈনন্দিন যাপনের সঙ্গে 'সাযুজ্য' রাখার চাপ বিচিত্র শব্দবন্ধ ও ইমেজারির জন্ম অবশ্যই দিচ্ছে, কিন্তু কবিতার সঙ্গে ওতপ্রোত মননের স্ফূরণ বা উপলব্ধিকর্ষিত শ্রমের চিহ্ন অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অনুপস্থিত। সুরযোজিত নাটকীয় মূহুর্ত বা ঘটনাক্রমের অস্থির চিত্রকল্প তাৎক্ষণিক কৌতূহল তো অবশ্যই জাগায়, কিন্তু কবিতার মতো দীর্ঘস্থায়ী অনুরণন জাগিয়ে তুলতে পারেনা। এটা মনে করা অন্যায় হবেনা যে এখনও বাংলা লিরিক, বাংলা কবিতার সমগোত্র হয়ে ওঠার ক্ষমতা অর্জন করেনি। হয়তো এভাবে ভাবাটাই অসমীচীন। কারণ লিরিক ও কবিতা বাস্তবিকভাবে দুটো পৃথক ভাষামাধ্যম। তাদের পারস্পরিক ডায়নামিক্সগুলি মাপার কোনও সাধারণ মাপকাঠি নেই। চিরকালীন এই দ্বন্দ্বসমাসের ব্যাসবাক্যে বদলের সম্ভাবনা এই মূহুর্তে নেই বলাটাই বিধেয়। কবির মুকুটের দাবিদার শুধু কবিরাই থেকে যাবেন, এটাই ভবিতব্য।

    (সৌজন্যঃ কালিমাটি অনলাইন)
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • ব্লগ | ২৭ এপ্রিল ২০১৭ | ৮৬০ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • অভিষেক | 52.110.175.219 (*) | ২৭ এপ্রিল ২০১৭ ০৪:১১59526
  • আচ্ছা একটা প্রশ্ন- বাংলা কবিতা বা ভারতীয় ভাষায় কবিতা আমরা যাদেরকে বলি তারা কি ইউরোপ স্পর্শীত একটা আঙ্গিক নয়?
    রামায়ণ কে আমরা কি গান বলেছি না কবিতা? মহাকাব্য শব্দ তো ইউরোপের epic poetryর তুলনায় জন্ম নেয়।
    কাব্য বলে একটা সুস্পষ্ট ধারা ছিলো,কিন্তু তা ছিলো আখ্যানকাব্য। যার মূল রস, ভাব ছিলো অন্য রকম এবং কালে কালে নানা অলঙ্কারশাস্ত্রের নিগড়ে আড়ষ্ট ভাবে বাঁধা।
    গীতগোবিন্দ,সদুক্তি কর্ণামৃত,পদাবলী সাহিত্য কি কাব্য না গান? কাব্য মুহূর্তের অন্বেষণ কিম্বা রসের সন্ধান ছিলোনা তা বলছিনা, কিন্তু তা কখনই আধুনিক অর্থ নিয়ে আধুনিক কবিতার মতন ছিলোনা।
    তাই ষাট পার হওয়া রবীন্দ্রনাথকে ব্যোদলেয়ার শুনে চমকে উঠতে দেখে অবাক হইনা।
    বু ব, প্রেমেন, সুনীল,শক্তি এবং তারপরের যে বিপুল আধুনিক বাংলা কবিতা নামক স্তম্ভ তৈরি হলো যার সাথে বলছেন বাংলা লিরিক আজও কাব্যমূল্যে সমকক্ষ নয়, তার মধ্যে যে প্রচ্ছন্ন হয়ে আছে ইউরোপ!
    তাই কবিতা বনাম লিরিকের মধ্যে এই তুলনায় যেন অল্প হলেও ইউরোপ বনাম প্রাচীন ধারার একটা তুলনা অবয়ব পায়। কোন দিক এগিয়ে বলা কঠিন, বা আদোৌ তুলনা সমীচীন কিনা সেটাও। কালিদাসের সাথে বিদ্যাপতির তুলনা হয়,রবীন্দ্রনাথেরও বোধহয় করা যায়।কিন্তু সমর সেনের বা জয়দেব বসুর বা চন্দ্রিলের কী হয়!
    তবে ঠিক, আঙ্গিক কাছাকাছি এসে যেতেই পারে। চলচিত্রে সুখেন দাস কি নেই নাকি!! মিশ্র আঙ্গিকের জন্ম ও হতে পারে- কখনো যখন কাব্যশব্দ সুরের বাহনে রস সঞ্চারিত করে। গজলে বা রবীন্দ্রনাথের গানেই এমন কিছু কিছু বোধহয় পাওয়া যেতে পারে।
    আরও এক মোক্ষ্মম কথা হলো কে শুনছে। রয়ানী, হাপু শোনা কানে আনন্দভৈরবী হয়ত গম্ভীরা শুনেই বেজে উঠতে পারে।
  • কল্লোল | 233.186.147.102 (*) | ২৯ এপ্রিল ২০১৭ ০৬:৩১59527
  • এবিষয়ে ততো অধিকারী নই, তাই কুন্ঠাভরে একটি ভাবনা বয়ান করি।
    রামায়ণ বা মহাভারত গানই ছিলো। বেদের মন্ত্রও তো গানই। এগুলো আবৃত্তি নয় গাওয়াই হতো। কিন্তু মেঘ্দূত বা রঘুবংশ গাওয়া হতো বলে কোথাও উল্লেখ দেখিনি। আবার এ বঙ্গদেশে গীত গোবিন্দ, মনসা মঙ্গলসহ সমস্ত মঙ্গলকাব্যই গেয়। আবার বিভিন্ন অঞ্চলের নানান পার্বন উপলক্ষে গান ছিলো - ভাদু টুসু, গম্ভীরা, গাজনের গান, আগমনী গান, ধর্মঠাকুরের গান, বনবিবি, ওলাবিবির গান। মনসা ঝঁপানের গান, দক্ষিন বঙ্গের মুসলমানেদের গাজীর গান, বাইচের গান, বিয়ের গান।
    কিন্তু হঠাৎই মনে হলো, সুফি ও ভক্তি আন্দোলনের সাথে গীতিকাব্যের কোন যোগাযোগ আছে কি? যেখানে সাধনের একটা উপায় গান। কাওয়ালি, গীত, গজল, ভজন, কবীরের দোঁহা, বঙ্গদেশের বাউল, ফকিরি গান ও সর্বোপরি শ্রীচৈতন্যের কীর্তন, যে সব গানে বাণীর জায়গাটি প্রধান - সে কিছু বলতে চায়।
    একটু আলাদা করে বাংলার কীর্তন বোধহয় উল্লেখের দাবী রাখে যেখানে বাণী ও সুর এবং সুরে ধ্রুপদী ও লোক আঙ্গিকের এক অসাধারণ সমন্বয় ঘটেছে।
    অধিকারীজনে কি বলেন?
  • শিবাংশু | 192.66.97.178 (*) | ০৩ মে ২০১৭ ০৯:৫৬59528
  • অভিষেক,
    'মহাকাব্য' আর 'কবিতা' এক সংজ্ঞা নয়। আমাদের দেশে য়ুরোপিয় 'এপিক' শব্দের অনুবাদে আমরা 'মহাকাব্য' শব্দটি ব্যবহার করি। 'কেম্ব্রিজ' অনুযায়ী এপিকের অর্থ হলো "a film, poem, or book that is long and contains a lot of action, usually dealing with a historical subject:" মহাকাব্যের রচয়িতা কোনও একক মানুষ ন'ন। তা একটি দীর্ঘ সময়কালের ফসল। তার বিশালতা, গভীরতা, ব্যপ্তি, বৈচিত্র্য একটা সম্পূর্ণ সভ্যতার আধার। কাব্য বা কবিতা মূলত এককের সৃষ্টি। অনেক ছোটো ক্যানভাসে। যেমন 'রামায়ণ' মহাকাব্যের একটা খুব ছোটো আখ্যান নিয়ে লেখা হলো 'মেঘনাদবধকাব্য'। দুটো'ই ভাষাগতভাবে ক্ল্যাসিসিস্ট মেজাজের রচনা। কিন্তু একেবারে পৃথক তার অভিঘাত। আয়তনে দীর্ঘ বা বীররসপূর্ণ হলেই তা 'মহাকাব্য' হয়ে যায়না। যেমন আমাদের মঙ্গলকাব্যের ঐতিহ্য। আবার ব্যক্তিপ্রেমের ছলে ভগবৎপ্রেম নিয়ে যেসব লেখা হয়েছে, যেমন পদাবলী কীর্তন বা গীতগোবিন্দম, সেগুলি মুখ্যত গেয়। নামেই তার প্রকাশ। সেগুলি ঠিক পরবর্তীকালের 'কবিতা' নয়।

    আপনি য়ুরোপস্পৃষ্ট যে শৈলিটির কথা বলছেন, তা খণ্ডকবিতা'র জগৎ। আমাদের দেশে কিছু খণ্ডকবিতার চাষ ছিলো, তবে তা একান্তভাবে অধ্যাত্মিক ভাবসম্পৃক্ত। মধ্যযুগের দোহা, ভজন, সুফি ভক্তিগীতি বা বাণী জাতীয় রচনাগুলি। অন্যদিকে ফার্সি শ্যেরশ্যায়রি'র প্রভাবে রচিত কাব্যসমূহ। এই দুটিও কিন্তু 'খণ্ডকবিতা'র ছলে লেখা হলেও আসলেও মুখ্যত গেয়। তাদের সঙ্গে উত্তর শেক্সপিয়র য়ুরোপিয় ঢঙে লেখা খণ্ডকবিতার কোনও মিল নেই। আমরা ঐ শৈলিটি আশ্রয় করেছি য়ুরোপের দৌলতে। রবীন্দ্রনাথের সময় থেকে বাংলাকবিতায় এই শৈলিটি কেলাসিত হয়েছে। এই মূহুর্তে 'বাংলাকবিতা' বলতে আমরা এই শৈলিটিকেই বুঝি। ব্যক্তি অনুভূতির তীব্রতা, তীক্ষ্ণতা, গভীরতা যখন সমষ্টির কালচেতনার প্রাসঙ্গিকতা স্পর্শ করে তখন একটি খণ্ডকবিতা সার্থক হয়ে ওঠে। এই শর্তটি রক্ষা করতে গিয়ে খণ্ডকবিতা, অর্থাৎ 'আধুনিক' কবিতা (পড়ুন, কবিতা) ক্রমশ দুরূহ হয়ে ওঠে। এই দুরূহতা ধারণ করার সামর্থ্য লিরিকের নেই। তার দায় অন্যরকম। যেভাবেই রচিত হোক না কেন, লিরিকের মুখ্য দায় বিনোদনমুখী। কবিতা এক্ষেত্রে পূর্ণ স্বাধীন। তার কোনও বিনোদনের দায় নেই। যাঁদেরকে সে স্পর্শ করবে, তাঁরাও পেয়ে যাবেন তাকে। সম্পূর্ণ মৌনতার শিল্প। আজকের কবিতাকে অনেকে এলিটিস্ট বলে থাকেন। কিন্তু বিচারটি অতো সহজ নয়। আপন অন্তরালের যে মানুষটি জটিল, তাই একলা, তাকে নিয়েই এই শব্দশিল্প। একলা হওয়া বিলাস নয়, নয় বিচ্ছিন্নতা মানসিক রোগ। ছাঁচে ফেলা সমাজনীতির নিগড়ে বাঁধা দৈনন্দিন, সকলকে এক মাত্রার শুশ্রূষা দিতে পারেনা। অথচ এই সমস্ত একলা মানুষই সমূহের অংশ হতে চায়। ক্রম উন্নত, পরিশ্রুত, পাপরহিত সমূহের স্বপ্ন তাদের তাড়না করে বেড়ায়। এই যাত্রাটি জটিল, দুরূহ। তাই এই সব যাত্রীর ভাবপ্রকাশ কারো কারো কাছে দুরূহ মনে হয়। কবিতা তাই কখনও দুরূহ, কিন্তু আন্তরিক। লিরিককে জটিলতার চাপ সইতে হয়না।

    কালিদাসের সঙ্গে বিদ্যাপতির 'তুলনা' ঠিক হয়না। না বিষয়ে, না শৈলিতে, না শিল্পগুণে। সময়কালের ব্যবধানও দীর্ঘ। উপরন্তু কালিদাসও ঠিক কোনও একক ব্যক্তি ন'ন। তিনি একটি প্রবাদ, একটি ধারণা, একটি যুগ। বিদ্যাপতি একক ব্যক্তি। যদিও তাঁর নামে চলা বহু রচনা অন্যের লেখা। ক্ল্যাসিসিস্ট হলেই পরস্পর তুলনা করা যায়না। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে কালিদাসের কোন মানদণ্ডে তুলনা হতে পারে? আমাদের ভাষাসংস্কৃতির অঙ্গনে রবীন্দ্রনাথের ভূমিকা জলবিভাজকের। তিনি একযোগে সবার প্রেয়, আবার 'ত্যাজ্য'ও বটে। বুব বা সমর সেনের প্রজন্ম রবীন্দ্রনাথের 'পথ রুধে থাকার' এলেমকে চ্যালেঞ্জ করেছিলো। সুনীল ও তাঁর প্রজন্মের জোড়া লাথিতে রবীন্দ্ররচনাবলী মাটিতে লুটোবার গপ্পো'ও রয়েছে। আবার একান্তক্ষণে তাঁর ঝর্ণাধারার নির্জনে আত্মসমর্পণ করার উপাখ্যানও অতি সুলভ। "কবিতারে লিরিক করি, লিরিকেরে কবিতা" করার যে বিপুল শক্তি তাঁর ছিলো, এতোদিনেও গুণগতভাবে ক্রমপর্যায়ে তার সঙ্গে তুলনীয় কেউ হতে পারেননি।

    তবে এটা ঠিক গানের মতো'ই একাকী কবির নহে তো কবিতা, দ্বৈতভাবই শেষ কথা।

    কল্লোলদা,

    প্রাচীনকাল থেকেই যা কিছুই 'গাওয়া' হয়, তা সব সময় 'গান' হয়ে ওঠেনা। তার সহজ উদাহরণ হিসেবে আমরা নানা আদিম উপজাতিক 'লোক'সঙ্গীতকে নিতে পারি। রামায়ণ, মহাভারত বা কালিদাসের কাব্য মোটামুটিভাবে একসময়েই সংকলিত ও লিখিত হয়েছিলো। তার আগে সব শ্রুতির অংশ। তার কোনও আখ্যান যদি কোথাও, কখনও গীত'ও হয়ে থাকে তবে তা বিক্ষিপ্ত প্রয়োগ। তবে গ্রন্থিত হবার পর এসব ঐতিহ্য সমাজের কুলীনশ্রেণীর অধিকারে ছিলো। কৌমসমাজে প্রচলিত কাব্য বা সাঙ্গীতিক ঐতিহ্যের ধারাটি সম্পূর্ণ সমান্তরাল। সেগুলি লোকযানের অঙ্গ। পদাবলী কীর্তন বা গীতগোবিন্দম লোকযানের অংশ নয়। মাঝখানে রয়েছে মঙ্গলকাব্যের এলাকা। এই পর্বের শেষ মহীরুহ ভারতচন্দ্রও একটি জলবিভাজক পর্ব। শৃঙ্গাররসের বা ভক্তিরসের যে খণ্ডকবিতাগুলি রামপ্রসাদ থেকে ঈশ্বর গুপ্ত, নিধুবাবু পর্যন্ত এসেছে, তার শুরু কিন্তু ভারতচন্দ্র থেকেই। এসব রচনাই মুখ্যত গেয়। ইংরেজ আসার আগে পর্যন্ত কবিতা ও লিরিকের পার্থক্য স্পষ্ট হয়নি।
  • অভিষেক | 52.110.175.174 (*) | ০৩ মে ২০১৭ ১২:২৪59529
  • শিবাংশুদা,
    মোটের ওপর আপনার সাথে একমত তবে কিছু খটকা আছে। শাব্দিক শিল্প এবং খন্ডমুহূর্ত নিয়ে গভীর দৃষ্টি নেই,ভাষার দখলও তথৈবচ অতএব বয়ানে খামতি থেকে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকলো।
    'আধুনিক কবিতা' আর 'কবিতা' এই দুইএর মান নির্ধারকতা এবং বিভাজনের সীমা নিয়ে কিছু অস্পষ্টতা আছে বলে মনে করি। রামায়ণ,মহাভারত বা দূতকাব্যগুলো যদি ছেড়েও দিই এবং খন্ড কাব্যশৈলি খুঁজি - তার মধ্যে ব্যক্তিগত কথা প্রায় নেই বললেই চলে।অন্ত্যত প্রাকইউরোপস্পর্শী যুগে।
    রবীন্দ্র,বিদ্যাপতি বা কালিদাসের তুলনা চলেনা সার্বিক ভাবে- মানি।কিন্তু খন্ডেও কী তাই? রাবীন্দ্রিক মানসে কি বিদ্যাপতি বা কালিদাসের ভাব এক ছটাকও নেই!
    অবশ্যই একক মানুষ হিসেবে বিদ্যাপতি,বাল্মীকি, কালিদাস কারুর কাজই দেখিনা। যথার্থ বললে - ইউরোপীয় মহাকাব্য নয় বরং স্মার্ত ঘরানারই এক প্রশাখা দেখি ওই জাতের শৈলিতে।এবং আপনি খুব সুন্দর করে এই শৈলির রূপরেখাগুলো বলেছেন। সভ্যতা না হলেও একটা বিশাল, ব্যাপক সময়ের চাহিদা এবং আধার বটেই।
    তবু বলব কবিতা থাকে গানেও। আধুনিক কবিতা যাকে বলি সেই কবিতাকে ধরছিনা।খন্ড কাব্য মুহূর্ত - একক মানুষের মৌন মুহূর্ত - ব্যক্ত হতে চাওয়া রিপুর ফেটে পড়া বিস্ফোরণ এবং নিভৃতি জ্বলতে থাকা একান্ত নিরবতা এর সবটাই কিন্তু পাঠকের চোখের মতন শ্রোতার কানের কাছেও ধরা দ্যায়। বিরল মুহূর্তে শব্দের মতন সুরও পরিশ্রুত গভীরতার তেজ নিয়ে ধাক্কা মেরে ফ্যালে, তাড়নার কামড় বসিয়ে দেয়, সেবা শুশ্রূষা ছাপিয়ে এসে মেরেও ফ্যালে কিছুক্ষণের জন্যে।
    আর দুরূহতা গেয়শিল্পের মধ্যেও আছে বলে মনে করি। যদিও একে কাব্যবোধের শ্রেষ্ঠ ধ্রুবক বলব কিনা তা বলা যায়না। গেয়শিল্প, যদি লিরিককবিতার কথাই ধরি, পাঠে সম্পূর্ণ ধরা দিতেই পারে না। এর সঠিক এবং সম্পূর্ণ বিনিময় হতে গেলে সুরকেও চাই। হয়ত বা ছন্দ-তাল-লয়কেও। এবং সার্বিক অবয়ব নিয়ে এই শৈলি তখনই হয়ে ওঠে আর এক জটিল স্বপ্নবাস্তব- স্বপ্নের মায়া আবরণ থাকলেও যখন তখন সে সব ছিঁড়েখুঁড়ে ফেলে মনের সূক্ষ্ম তন্ত্রীদের টান মারতে পারে।
    মনস্তাত্ত্বিক ভাবে বোধ্যশব্দের থেকে সুরকে আরও অনেক বেশী জটিল মনে করি। মানুষের অবোধ্যতার ইতিহাস অনেক বড় বলেই।
    গান-কবিতার সংজ্ঞা আধুনিককালে যেখানে এসে জমাটবদ্ধ হয়েছে সেটাকে নির্মোহ হয়ে ক্রিটিকালি কিছুটা বিশ্লেষণ করতে চাই এইজন্যেই।
    সীমিত অবস্থানে দুচারটে কথা বলে ফেললাম। মূর্খের জানেনই তো সংকোচ কম হয়। আপনার আলোচনা পড়ে বেশ ভালো লেগেছে। আশা করবো যে আরও পড়ার সুযোগ পাবো...অনেক জটিল কথা সহজ করে বলেছেন....
    সুরবোধ সম্পন্ন কেউ লিখুন না কিছু..
  • অভিষেক | 52.110.175.174 (*) | ০৩ মে ২০১৭ ১২:৩২59530
  • লিরিকের মুখ্য দায় বিনোদনমুখী --- এই অংশটা নিয়ে কিন্তু কিছুটা প্রতিবাদ করে গেলাম শিবাংশুদা।

    এই কথাটা মানতে গেলে যা যা দেখে অস্বস্তি হয় তা হয়ত সংখ্যায় খুব কম। কিন্তু যতটা বেশী হলে অস্বস্তিটা হয়েই যায় ততটাই গভীর...
  • একক | 52.109.168.138 (*) | ০৩ মে ২০১৭ ১২:৫৪59531
  • আধুনিকতাকে এভাবে ডিফাইন করা বেশ গোলমেলে , তবে , যেটুকু ধারনা হয় ; আধুনিকতার ধারনাটি সুচিত হচ্চে কেন্দ্রশুন্যতা দিয়ে, যা কিনা মানুষের তাবত আত্মানুসন্ধান প্রক্রিয়ার বিবর্তন। ঠিক এই জায়গা থেকেই ফর্ম আর আবর্তনের দায় স্বীকার কর্ছেনা কারন তা অকেন্দ্রিক। লক্ষ্যনীয় যে ,এমনকি উতকেন্দ্রিক ও নয়। এটাকে কেও বল্ছেন ছন্দ হীন ইত্যাদি। সঙ্গীত অপরদিকে , ভ্যনিশিঙ্গ পয়েন্ট এর শিল্প, কাজেই কন্ভার্জেন্স জিনিশটি তার ধর্ম , বেতাল কে বারবার গাছে ফিরে উল্টো হয়ে ঝুল্তেই হয়।
  • শিবাংশু | 113.217.234.188 (*) | ০৪ মে ২০১৭ ০৮:০৬59532
  • অভিষেক, একক,

    ১. 'আধুনিক' কবিতা শব্দটিতে আমি কোট-আনকোট ব্যবহার করেছি এটাই বোঝাবার জন্য যে এ একটা জেনেরিক পরিভাষা। স্বভাবধর্মে নয়। 'আধুনিকতা'র পরিভাষা প্রত্যহ বদলে যায়। সেটাই তার শাশ্বত ধর্ম। অতএব 'আধুনিক কবিতা' বা খণ্ডকবিতা এই দুই শব্দের অবস্থান ভিন্ন নয়। আমার পিতৃদেবের কালে শক্তি বা বিনয় 'আধুনিক' কবি ছিলেন। আমার কাছে শুধু কবি।
    ২. ইংরেজ আসার আগে কবিতায় ব্যক্তিগত কথোপকথন থাকতো না। শুধু কবিতায় কেন? কোনও শিল্প মাধ্যমেই থাকতো না। এটা য়ুরোপিয় প্রবণতা। 'ফুল্লরার বারোমাস্যা' ব্যক্তিগত সংলাপ নয়। এই এক্সপ্রেশনটিকে জায়গা করে দিতেই খণ্ডকবিতার সৃষ্টি। এখন সেটাই মুখ্য স্রোত হয়ে গেছে। কারণ এই মূহুর্তে সারা বিশ্বে কবিতা নিজস্ব ব্যাকরণ অনুসরণ করে। যা তার মাতৃভাষার ব্যাকরণ থেকে প্রায়ই আলাদা হয়ে যায়। যে ব্যাপারটা একক বলতে চাইছেন। কবিতার ক্ষেত্রে কোনও কেন্দ্রিত ব্যাকরণীয় অনুশাসন প্রযোজ্য হয়না। লিরিকে এটা হতে পারেনা। কারণ তাকে ভাষা ছাড়া সঙ্গীতেরও ব্যাকরণ মেনে চলতে হয়।
    ৩. কবিতা নদীর মতো। গঙ্গোত্রীর জল সাগরে এসে মেলার সময়ও তার কিছু অস্তিত্ত্ব বেঁচে থেকে যায়। কিন্তু মধ্যপথে সেই নদীতে আরো শতনদীর জল এসে মেশে। তারাও সমান সত্য। রবীন্দ্রনাথে তাঁর পূর্বসূরির দল খুব প্রত্যক্ষভাবে উপস্থিতি জানান। এই ঘটনাটি সব কবির জন্যই সত্য ও স্বাভাবিক।
    ৪. সুর যোজনা করে গাওয়া হলেই একটি কবিতা লিরিক হয়ে যায়না। যেমন সুকান্তের কবিতায় সলিল বা হেমন্ত। আরো বহু নিদর্শন রয়েছে তার। লিরিক যখন লেখা হয়, তখনই তার ভাগ্য নির্ধারিত থাকে। তার যাবতীয় আলংকরিক বা গঠনের সূত্রগুলি শেষ পর্যন্ত সুর-লয়-তালের শর্ত মেনে লেখা হয়। সেখানে "খন্ড কাব্য মুহূর্ত - একক মানুষের মৌন মুহূর্ত - ব্যক্ত হতে চাওয়া রিপুর ফেটে পড়া বিস্ফোরণ এবং নিভৃতি জ্বলতে থাকা একান্ত নিরবতা এর সবটাই কিন্তু পাঠকের চোখের মতন শ্রোতার কানের কাছেও ধরা দ্যায়। " অনুভূতি ধারণ করার মতো ইন্টেনসিটি থাকেনা। নাম আসতে পারে সুমনের। সে তো আমি উল্লেখ করেছি। তাঁর গানের বিন্যাস, গঠন, অলংকার ইত্যাদি নিয়ে এই পাতাতেই আমি ও বন্ধুরা অনেক আলোচনা করেছি। পুনরাবৃত্তি করছিনা। তাঁর গানের চলন বা ধর্ম, লিরিক শৈলির নয়।
    ৫. 'গেয়শিল্পের দুরূহতা' মানে ঠিক কী বলা হচ্ছে সেটা স্পষ্ট হলোনা। গেয়শিল্পে বাণীর দুরূহতা আমি কোথাও পাইনি। কিছু শ্রোতার কাছে মার্গসঙ্গীতে সুর-লয়-তালের দুরূহতা বাধা সৃষ্টি করে অনেক সময়। কিন্তু তাকে স্পর্শ করার জন্য অনুশীলন লাগে। যেকোনও শিল্পমাধ্যমকে উপভোগের নাগালে আনার মতো'ই। আপনার মন্তব্যে তাও রয়েছে, "মনস্তাত্ত্বিক ভাবে বোধ্যশব্দের থেকে সুরকে আরও অনেক বেশী জটিল মনে করি।"
    ৬. "লিরিকের মুখ্য দায় বিনোদনমুখী --- এই অংশটা নিয়ে কিন্তু কিছুটা প্রতিবাদ করে গেলাম..." এই লিরিক মানে মূলস্রোতের লিরিক। সেখানে বিদ্রোহ, বিরূপতা, প্লেনস্পিকিং ইত্যাদি থাকতেই পারে। কিন্তু শৈলির বিচারে তা পুনরাবৃত্তির শিল্প। কেন্দ্রমুখী,সুরের অনুশাসনে বাঁধা। আগেই লিখেছি কবিতাকে সুর দিলেই কবিতাটি লিরিক হয়ে যায়না।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। মন শক্ত করে প্রতিক্রিয়া দিন