• হরিদাস পাল
  • খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে... (হরিদাস পাল কী?)
  • বিসর্জন

    Abhijit Majumder
    আলোচনা : বিবিধ | ১৮ ডিসেম্বর ২০১৯ | ১১৪ বার পঠিত

  • লাল রঙের বড় বাড়িটার সামনে দিয়ে গত কয়েক বছরে বেশ কয়েকবার হেঁটে গেছে রাজিয়া। কখনো একা। কখনো ওর দলের সঙ্গে। কিন্তু কখনও ভেতরে ঢোকার সাহস হয় নি।

    বাড়িটার সামনে দুদিকে দুটো রোয়াক। তাতে অলস দুপুরে রিকশাওয়ালারা গামছা ঘুরিয়ে হাওয়া খেতে খেতে বিশ্রাম নেয়, অন্য সময়ে কুন্ডলী পাকিয়ে ঘুমোয় রাস্তার নেড়িগুলো। দুটো রোয়াকের মাঝখানে একটা সবুজ রঙের কারুকাজ করা কাঠের দরজা। এত ভারী যে ছোটবেলায় রাজিয়ার ওগুলোকে লোহার বলে মনে হত। সেই বিরাট দরজাটা ডান পাশে আটকানো একটা শ্বেতপাথরের নামফলক। তার ওপর কালো দিয়ে প্যাঁচানো হরফে লেখা “সিংহভবন”।

    সিংহভবনের দরজা খোলা থাকলে রাস্তা থেকে সোজা দেখা যায় দেবীদালানে শোভা পাচ্ছেন কুলদেবী সিংহবাহিনী। অষ্টভূজা দেবীমূর্তি কাঞ্চনবর্ণা ও রক্তাম্বরা। সর্বাঙ্গে শ্বেতশুভ্র অলংকার। হাতে শাণিত অস্ত্র ও অভয়। অলংকার, অস্ত্র, বস্ত্র, সবই এখানে মাটির। সিংহবাহিনী এখানে সম্পূর্ণ মৃণ্ময়ী।

    শোনা যায়, সেই কোন এক কালে এক বিজয়া দশমীর রাত্রে জমিদার রাজেন্দ্রনারায়ণ সিংহরায় স্বপ্নে দেখেছিলেন লাল শাড়ি পরা এক কিশোরী কাঁদতে কাঁদতে তাঁকে বলছে, “বাবা, তোমার এত বড় বাড়িতে সবার জায়গা হয়, শুধু আমারই জায়গা হল না? শুধু আমাকেই ভাসিয়ে দিতে হল?” তারপর থেকে সিংহভবনে শুধু ঘট নিরঞ্জন হয়, মূর্তি বিসর্জন হয় না।

    আজকে সিংহভবনের ভারী দরজাটা খোলাই ছিল। রাজিয়া রাস্তা থেকে দেখল দেবীর দেহে নতুন রং, পরনে নতুন গয়না। ক’দিন আগেই পুজো গেছে। সিংহরায় পরিবারে দুর্গাপুজোর ঠাটবাট গেলেও এখনও অন্তত প্রতি পুজোয় এটুকু করা হয়। রাজিয়া দরজার বাইরে থেকে খানিক অপলকে তাকিয়ে রইল সেই মাতৃমূর্তির দিকে। তারপর চোখ বুজে প্রণাম সেরে দ্বিধাগ্রস্ত পা রাখল সিংহভবনের সাদা-কালো খোপকাটা পাথরের দালানে।

    ঢোকার সরু প্যাসেজটার দুদিকের দেওয়ালের ওপরদিক দিয়ে গেছে সার সার হরেক লাইন। ইলেক্ট্রিক, ফোন, কেবল কানেকশন। আর নীচের দিকে সার সার করে লাগানো বিভিন্ন মাপের লেটার বাক্স। বাক্সের অবস্থান দেখে বোঝা যায় কে কোন তরফের। যত বড় তরফ, বাক্স তত উপরের দিকে। আর বাক্সের রঙচঙ, কারুকাজ দেখে বোঝা যায়, কার বর্তমান আর্থিক অবস্থা কেমন। সিংহবাড়িতে লেটারবাক্স পারিবারিক আর অর্থনৈতিক হায়ারার্কির পকিচয় বহন করে।

    রাজিয়া দেখল সবথেকে উপরের সারির কোণার দিকে রাজনারায়ণ সিংহরায়ের ম্রিয়মাণ কালো রঙের লেটার বাক্স। বহুদিন রং পড়ে নি তার গায়ে। ভালো করে চেষ্টা করলে পড়া যায় দুটো নাম। রাজনারায়ণ, আর তাঁর ছেলে রাজেশনারায়ণ। কোনও লেটারবক্সেই কোনও মেয়ে-বউয়ের নাম নেই। ওই যে বললাম, সামাজিক হায়ারার্কি।

    ****
    জড়োসড়ো পায়ে সিঁড়ি দিয়ে তিনতলায় ওঠার সময় রাজিয়া বুঝতে পারছিল বিভিন্ন অ্যাঙ্গেল থেকে নানা কৌতুহলী চোখ ওকে জরিপ করছে। অলস নিঝুম দুপুর। অনেকেই বাড়ি নেই। যারা আছে, তাদের মধ্যেও বেশির ভাগ ঘুমোচ্ছে। ভাগ্যিস, নইলে এই কাটাছেঁড়া আরও তীক্ষ্ণ, আরও তীব্র হত।

    এটা হবেই, জানা কথা। তাই গত দশ বছরে বেশ কয়েকবার একা বা ওর দলের সঙ্গে এই বাড়ির সামনে দিয়ে হেঁটে গেলেও ভেতরে কখনো পা রাখার কথা ভাবে নি রাজিয়া। তিনতলায় উঠে আসা তো পরের কথা। ওকে ওর দীক্ষা মা বলেছিল পুর্বাশ্রমের কথা ভুলে যেতে। এই নিয়ম। তাই রাজেশনারায়ণকে মুছে ফেলে ওকে দেওয়া হয়েছিল নতুন নাম। দীক্ষা মা জিজ্ঞেস করেছিল, “কি নাম নিবি রে বেটি?” রাজেশের মনে পড়েছিল ছোটবেলার কথা। ইস্কুলে ইতিহাস পড়ার সময় কেমন কখনো নিজেকে মনে হত লক্ষীবাই, কখনো রাজিয়া সুলতানা। পুরনো নামের সঙ্গে মিলিয়ে নিজের নতুন নাম রেখেছিল ও। রাজিয়া।

    পূর্বাশ্রমের কথা এতদিন তো ভুলেই ছিল। তাই এমনকি পুজোর কদিন মনটা হু হু করলেও কখনও এদিকে পা মাড়ায় নি ও। কিন্তু আজ আর কিছু করার নেই। তাই একপ্রকার বাধ্য হয়েই সিংহভবনের চৌকাঠ পেরোতে হল রাজিয়াকে।

    উকিল বলেছে, এনআরসিতে নাম তুলতে হলে বার্থ সার্টিফিকেটটা যেভাবেই হোক নিয়ে যেতে হবে। বাকি কাগজপত্র, অপারেশানের সার্টিফিকেট সব যোগাড় হয়ে গেছে। শুধু এইটাই বাকি।

    জীবনও কখনো কখনো কিছু কৌতুক করে। আজ রাজিয়ার নাগরিকত্ব প্রমাণের কাজে লাগবে দশ বছর আগে বিসর্জন হয়ে যাওয়া রাজেশনারায়ণের জন্মনথি। যাকে কেউ মনে রাখে নি। রাজিয়া নিজেও না।

    *****
    গঙ্গার পাড়। গতকাল দুর্গাপুজোর কার্নিভ্যাল হয়ে গেছে। তাই এদিক ওদিক পড়ে আছে শোলার মুকুট, গাঁদাফুলের মালা। ইতিউতি ঘুরে বেড়াচ্ছে কয়েকটা বাচ্চা আর কিছু কুকুর।

    রাংতার মুকুটগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে রাজিয়ার মনে পড়ল ছোটবেলার কথা। কেমন খাতার পাতা ছিঁড়ে মুকুট বানাত ও। তারপর মায়ের কাজল দিয়ে কপালে আঁকত ত্রিনয়ন। নিজেকে মনে হত মহালয়ার দিন টিভিতে দেখা দুগ্গাঠাকুর।

    অক্টোবরের শেষ। তার ওপর কালকে রাত্রে বৃষ্টি হয়ে গেছে। তাই হাওয়াটা বেশ ঠান্ডা। কমলা ওড়নাটা ভালো করে গায়ে জড়িয়ে নিল রাজিয়া। তারপর কাদা থেকে তুলে একটা ছেঁড়া মুকুট মাথায় পড়ল ও। ব্যাগ থেকে ছোট হাত আয়নাটা বের করে নিজেকে দেখল। মুখটা তেলতেলে হয়ে আছে, ধেবড়ে আছে চোখের কাজল।

    বাড়িতে ওর জন্মনথি পাওয়া যায় নি। বাবা বাড়ি ছিল না। রাজিয়া জানত সেটা। মা বলল, সিংহবাহিনীর কাছে রাজনারায়ণ পুত্রই চেয়েছিলেন, সন্তান নয়। তাই পুত্র হওয়ার পরীক্ষায় ব্যর্থ হওয়া সন্তানের কোনও চিহ্ন বাড়িতে রাখতে চান নি। তাই একদিন ওর সব কাগজপত্র, ছবি, জামাকাপড় একসাথে গঙ্গায় ভাসিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। তারপর পুত্রের পিন্ডদান করে রাজনারায়ণ বাড়ি ফিরেছিলেন। এখন গোটা সিংহভবনে রাজেশের আর কোনও অস্তিত্ব নেই। একমাত্র লেটার বাক্সটা ছাড়া।

    ছেঁড়া মুকুটটা মাথায় পড়ে গঙ্গার দিকে পা বাড়াল রাজিয়া।ঠান্ডা জলে পা ডুবিয়ে খানিকক্ষণ অপেক্ষা করল। তারপর আস্তে আস্তে ব্যাগ থেকে বার করল পনেরো হাজার টাকা খরচ করে যোগাড় তৈরী করা এন আর সির যাবতীয় কাগজপত্র। এক মিনিটের অপেক্ষা। তারপর কাগজপত্র শুদ্ধু সেই ফাইলটা একটানে গঙ্গায় ছুঁড়ে দিল রাজিয়া।

    পরিবারের কাছে পুত্র হয়ে ওঠার চেষ্টায় একবার নিজেকে ক্ষতবিক্ষত করেছে রাজেশ। দেশের কাছে আবার সেই পরীক্ষায় বসার অপমান সহ্য করার শক্তি রাজিয়ার দেহে আর অবশিষ্ট নেই।
  • বিভাগ : আলোচনা | ১৮ ডিসেম্বর ২০১৯ | ১১৪ বার পঠিত
আরও পড়ুন
Run for Unity - Abhijit Majumder
আরও পড়ুন
#আমি - Jinat Rehena Islam
আরও পড়ুন
ক্ষমা - Rumela Saha
আরও পড়ুন
আয়না - ন্যাড়া
  • আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা

  • পাতা : 1
  • | 237812.69.453412.236 (*) | ১৮ ডিসেম্বর ২০১৯ ০৪:৪৭50983
  • ...
  • করোনা

  • পাতা : 1
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত