• টইপত্তর  অন্যান্য

  • একা মানুষের দোকা মানুষটি : আমার জালাল ভাই

    কুলদা রায়
    অন্যান্য | ২৭ মে ২০১৩ | ৩৬০ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কুলদা রায় | 34.90.93.220 | ২৭ মে ২০১৩ ০৯:৩৩609849
  • এক.
    আমি ভাই একা মানুষ। একা চলতে পছন্দ করি। দোকাতে আমার মেলে না।

    শিশুকালে রোগা পটকা ছিলাম বলেই ঠাকুরদা বলতেন ভিড়ে-ভাড়ে যাবি না। আমি ঠাকুরদাকে মান্য করি। দোকা মানুষ দেখলেই একটু তফাতে দাঁড়াই। এ কারণেই ফুটবল খেলা দেখেছি গাছের ডালে চড়ে। দাবা খেলেছি সঙ্গীহীনভাবে। ব্যাড বিন্টনে সিঙ্গেলস। ক্রিকেটে থার্ড ম্যান। হলে সিট পেতে যতটুকু ততটুকুই পলিটিক্যাল—নো শ্লোগান। চাকরিতে শহরে নয়—গ্রামে। ক্ষেতে খামারে।

    আমি একবার ক্লাশে ফার্স্ট হয়েছিলাম। সে বছর ক্লাশই করি নি। স্যাররা চিনতেনই না। বরাবার যে ছেলেটি ফার্স্ট হত—মাসুদ, মাসুদ আলী খান, সেই উপলক্ষে আমাকে এক সন্ধ্যায় অন্ধকারে চাবুক দিয়ে পেটাল। তারপর থেকে নিয়ত করেছি—সারা জীবনে আর ফার্স্ট হওয়া যাবে না। ফার্স্ট হলে লোকে চিনে ফেলে। চাবুক মারে। তাই পিছনের সারিতে থাকতে হবে। ইউনিতে যখন বুঝলাম আবার ফার্স্ট হওয়ার উপক্রম হচ্ছে, তখন আমার গবেষণা তত্তাবধায়ককে কাচুমাচু করে বলেছিলাম—স্যার আমায় বিদায় দেন।

    তিনি অবাক হয়ে বললেন—কাল তোমার ভাইবা। এখন আবার কোথায় যাবে?বললাম, বাঁচতে যাই। আপনের পরীক্ষায় আমার কাজ নাই।তিনি সব শুনে বলেছিলেন, তুমি চিন্তা কইরো না বৎস। তোমাকে ভাইবাতে এমন নম্বর দেব যে তোমার আর ফার্স্ট হওন লাগবে না।
    স্যার তাঁর কথা রেখেছেন। আমি বেঁচে বর্তে আছি।

    চাকরিতে সবাই যখন ঢাকায় থাকতে চায়----আমি তখন আড়ালে আবডালে থাকি। ধরা দেই না। কপালগুণে এমন এক এলাকায় পোস্টিং হয়ে গেলো—যেখানে আমার বাপ--দাদা চৌদ্দগুষ্ঠীর কেউ কখনো যায়নি। যাওয়ার কোনো সুযোগও নেই। সেটা বরিশালের পেয়ারা বাগানে। যেয়ে দেখি, বস নামে যিনি আছেন বা থাকার কথা-- তিনি নেই। তিনি কোনোকালে থাকেনই না। যিনি হাফ বস তিনি মাঝে মাঝে স্যুটকেস নিয়ে আসেন। ভাউচারপাতি বানান। বিল তুলে শ্বশুরবাড়ি চলে যান। আমাকে দেখে তিনি রেগে গেলেন। ভাবলেন, তার একজন ভাগীদার এসে গেছে। বললেন, শোনো ব্রাদার, অফিসে তোমার আসার কাম নাই। বাড়িতে বেতন পাঠায়া দিমু। বিজিনেস--টিজিনেস করার চেষ্টা কর।

    আমার বাপের মুদিদোকান। এই জিনিসটা আমি কোনোকালে ভালো বুঝি নি। বুঝতে চেষ্টা করি নি বলেই বাপ--দাদা আমাকে পরিবার থেকে মাইনাস করে দিয়েছিলেন। সেটা এখন অবধি টিকে আছে। না টেকার কোনো কারণ নেই। এই হেতু আমি বসকে লুকিয়ে লুকিয়ে একা একা পেয়ারা বাগানে ঘুড়ে বেড়াই। গাছের পাতা সবুজ হয়। আষাঢ়ে পেয়ারা পাকে। চাষিরা নৌকা ভরে হাটে তোলে। গোড়ায় সীমবীজ বোনে। অঙ্কুর হয়। গাছ বেয়ে ডালে ওঠে। আর খাল পারে মাচার উপর হাওয়ায় দোলে লাউগাছ। পথের পাশে পেঁপেগাছে ফল পেকে ওঠে। সে সময় সেহাঙ্গলের মাঠে চেগা-পাখি খ খ করে ডেকে ওঠে। মাথার উপরে রোদ চড়ে। মেঘ জমে ধীরে ধীরে। কে এক সোনাবরু বুড়ি আমাকে দেখে গামছা এগিয়ে দেয়। বলে, মুখ মোছো। নেল্লা হয়ে বসি তার পায়ের কাছে। হাত পাখা দিয়ে বাতাস করতে করতে বোনাবরু বুড়ি বলে, বাপজানেরা বুঝি অনেকগুলান ভাই-বইন?একটু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করি, কেনো দাদীজান?তিনি এক ক্রোস রূপেশ্বর ধানের মুড়ি আর নলেন গুড় দিয়ে বলেন, তোমার চেহারা দেইখা মনে লয় শিশুকালে পেট ভইরা দুধ পাও নাই। মেলা ভাই-বইন থাকলে মায়ে পেট ভইরা দুধ দ্যায় ক্যামনে রে বাপ! এইবার সোনাবরু ধ্বলি গরুর দুধ নিয়ে আসেন। তার নাকে নোলক একটু একটু দোলে। দুধের বাটিটা মুখের সামনে তুলে বলে—খাও, খাও বাছা। হেলা কইরো না।

    সন্ধ্যার পরে দূরের গাঁয়ে বাড়ীতে বিজয় সরকারের গান হয়। আমি সন্ধ্যা নদীর কিনারে দাঁড়িয়ে শুনি—কে একজন হেমন্তের পাতা ঝরার মত গান করে—পোষাপাখি উড়ে যাবে একদিন, আমি ভাবি নাই তো মনে, ও সজনী...। এই গানটিকে তখন নদীর মত আমার নিজের ছায়া মনে হয়। ছায়াটি আমার সঙ্গে হাটে। তাকে ধরা যায় না। দূরে দূরে থাকে।

    দুই.
    যখন দেশ ছেড়ে এসেছি—তখন যাদের কথা ভেবে আমার জননী স্বস্তির শ্বাস ফেলেছিলেন, এখনো ফোনে কথা হলে মা বলেন, হ্যারে, তোর অমুক দাদার সঙ্গে দেখা হয়? অমুক ক্লাশমেটের সঙ্গে দেখা হয়? বলি—হয়ই তো। কাল দাদার সঙ্গে বেড়াতে গিয়েছিলাম। তমুক ক্লাশমেটের বাসায় দাওয়াত খেয়েছি। ফোনসেটের কাছে বসা আমার বড় মেয়ে আমার কথা শুনে হাসে। ছোট মেয়েটি অবাক হয়। এই অমুক--তমুকের নাম তারা কখনো শোনে নি। তারা জানে আমার জানাশোনা লোক হল ইকুয়েডরের হোজে লোপেজ অথবা আফ্রিকার জুলিয়াস ওলুওকুনো। অথবা হাইতির হানস পিয়ের।

    শীতে-বরফে ঘরের বাইরে ঘোরাঘুরির সময় কম বলেই একদিন ইন্টারনেটে বসে পড়ি। পত্রিকা পড়ি। গান শুনি। মুভি দেখি। এর মধ্যে বাংলাদেশে নির্বাচন ঘনিয়ে এলো। সেটা ২০০৮ সালের ঘটনা। ফিওনা জনসন নামে এক সহকর্মী দেখালো তার ফেসবুক। সেখানে সে কুটকুট করে লেখে, হাই। কিছুক্ষণের মধ্যেই বন্ধুরা উত্তর দেয়, গুডি গুডি। ইউ?

    একদিন স্কুল জীবনের একটি ছবি ছাপিয়ে লিখল, এর মধ্যে তিন নম্বরে বসে নেল্লি। আজ কুড়ি বছর নেল্লির দেখা নেই। নেল্লি, তুমি কি আছো? দুএকদিনের মধ্যেই নেল্লি তার ফেসবুকে উঁকি দিয়ে বলল, আছি—আছি রে ফিওনা ডার্লিং। আছি ফ্লোরিডায়। লেখার নিচে নেল্লির হাসি হাসি মুখের একটা ছবি। পাশে তার বয়ফ্রেন্ড আলবার্তো ড্যান্স করছে।

    এই ফিওনা আমাকে একটা ফেসবুকের একাউন্ট খুলে দিল। সে একটি একাউন্ট খুলে দিল। বলল—নেও, তোমার জন্য হাজার জানালা খুলে দিলাম।

    সেই শুরু। উজ্জ্বল বসাক নামে ঢাকা ওয়ারীর এক ছেলে এক জানালায় উঁকি দিয়ে আমাকে নির্বাচনের খবরাখবর সারারাত ভরে দিল। আমি মুগ্ধ। উজ্জ্বলকে আর কখনো দেখতে পাইনি। সে পোষাপাখির মত নয়—বুনো পাখির মত উড়ে গেছে। আরেকজন পলাশ এসে কবিতা লিখে দিয়ে গেল। বলল, বুদ্ধদেব বসু তার প্রিয়। এই পলাশ পাঠিয়ে দিল বাংলা লেখার লিঙ্ক—অভ্র কী-বোর্ড। k-লিখলে ক হয়, R-লিখলে র হয়।
    নির্বাচনের পরের দিনই দেখি ব্রাত্য রাইসু নামে কে একজন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জেতায় মনের দুঃখে পাগলপ্রায়। তিনি তারস্বরে রাজাকারদের পক্ষে সোয়াল করছেন। কি ভেবে তাকে একটি একটি প্রশ্ন লিখলাম। পড়ে তিনি ব্রাত্য রাইসু নামে এই লোক বললেন, আপনে কেডায়?

    আমি ভয় পেয়ে আঁতকে উঠি। বলি-- আমি কেউ না। শুনে তিনি খুশি না। অজানা-অচেনা এক লোক আমাকে ছড়-বেছড় গালি দিয়ে গেল। বুঝলাম—দুনিয়া ভরা আমার ক্লাশ এইটের সহপাঠি মাসুদ আলী খানেরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছেন। বাঁধা পেলেই চাবুক হাতে ঝাঁপিয়ে পড়েন। বলেন তুই কেডারে? আমি বলে উঠি--আমি, ভাই কেউ না’দের দলে। কেউ না। কেউ না।

    ফলে নেট ঘেটে ‘এই আপনে কেডারে’দের খুঁজে বের করি। তাদের ডাল-পালা কাণ্ড-কারখানা শেকড়-বাকড় খুঁজে পাই। গভীরভাবে চিনতে পারি। বুঝতে পারি—এই আপনে কেডারা চিনে জোঁক। এই জোঁকেরা মানুষের সম্প্রীতিকে চুষে খেতে চায়--পুরনো হিংসা জারী করতে চায়। এদের জন্য একটু লবণের ব্যবস্থা থাকা দরকার। লবণ দিলেই এনারা সাফ সুতরা। খুব কঠিন কাজ না।

    তিন.
    এই ভাবে একদিন নেট থেকে পথে পথে ঘুরি। পথের মধ্যে ঘুরে ঘুরে সেই পেয়ারা বাগান ধরতে যাই। জলের গান শুনতে চাই। পাতায় পাতায় পদ্ম দেখতে চাই। এই ঘোর গতির মধ্যে বিপাকের ভেতরে বিড় বিড় করে বলি--জলকে জলের মত ভেবেছি, পদ্মপাতায় জলদেবী বসে। মনে করার চেষ্টা করি--বোন ঋষিকা মৌসুমী লিখত, আমাদের বাগানে একটি টুনটুনি পাখি বাসা বেঁধেছে। আমি তখন ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে। ঢেউ গুনছি। আর বুঝতে পারছি-- টুনটুনি পাখিটি আমার বুকের মধ্যেই উড়ে আসছে। পাখিটি প্রাণজ। ওর প্রাণ আমার প্রাণে বাঁধা। সেই মধ্য আশিতে। বোন ঋষিকা মৌসুমীর কাছে লিখতে লিখতে অনেক গল্পের বীজ উপ্ত হয়েছিল।

    আর আজ আমি নিজেই একটি টুনটুনি নয়-- সমুদ্রপাখি। ডানা নেই। আছে হাহাকার। চোখ খুলে দেখি আমার বড়ো মেয়েটি খট খট করে লিখছে। আর ছোট মেয়েটি আমার কাছে কাগজ আর কলম দিয়ে বলেছে-- লেখ বাবা। লেখ। --কী লিখব মা? --তোমার ইচ্ছে। ইচ্ছে লেখ।
    মেয়েটি একটি আঁকাবাঁকা দাগ দিয়েছে কাগজের উপরে। বলে, কি লিখছি জান বাবা? লিখেছি----একটি পরীকথা। আর এই দাগটি হল আকাশযথা। অই দাগটি-- মাটিব্যাথা। ফুল ফুটেছে। চাঁদ উঠেছে। হাতি নাচছে। ঘোড়া নাচছে।

    হা হা হা। কী রূপ লিখছে আমার মেয়ে। যেন পাতা। একটি গাছ। ভরভরন্ত ফল। মিষ্টি সুবাস। কী সহজ। কী সরল। প্রাণদায়ী। আমি এই গাছটির নিচে একটু বসি। আর আমার বড়ো মেয়েটি পিয়ানো বাজায়। ছোট মেয়েটি নিষ্পত্র ডানা মেলে উড়ে যায় তার আকাশ-যথায়।

    আমি আমার বড়ো মেয়েটির সঙ্গে লিখি। ছোট মেয়েটির সঙ্গে লিখি। লিখতে লিখতে হাঁটতে শিখি। হেঁটে হেঁটে অনেকদিন পরে কাজে যাই। বসে থাকি। বিড় বিড় করে বলি, এসো ঘুম। এসো আনন্দ। এসো জীবন। হে কদম, পক্ষীভুত রোদ।

    ততদিনে স্বজনের ভস্ম থেকে নতুন পাখিরা এসে গেছে। আমার কাঁধে এসে বসেছে। ওদের লেজটি দেখে আমার প্রাণ নতুন করে ভরে এসেছে। আমি লেজের ছায়াটিকে মনে করে লিখেছি। ছায়াটির নড়াচড়া দেখে হেসেছি। আর কিছু নয়। অন্য কিছু নয়। সোহম। আমি সে-ই। সে-ই আমি।
    কী দরকার অন্য কিছুর।

    চার.
    এই সোহম ব্যাপারটি পেয়েছি রবীন্দ্রনাথে। রবীন্দ্রনাথের মেজ মেয়েটি মৃত্যু শয্যায়। বাবার হাত ধরে আছে। তির তির করে বলছে—বাবা বল। বাবা বল। রবীন্দ্রনাথ বলছেন, পিতা নহসি। শুনতে শুনতে মেজ মেয়েটি চোখ বন্ধ করে ফেলল। কবি মেয়ের পাশ থেকে উঠে পড়লেন। এখন ভোর হচ্ছে। পাখি ডাকছে। বাতাস বইছে। নদী কুল কুল করছে। গাছে গাছে আলোর নাচন। একা একা এই আলোর ভিতরে হাঁটতে হাঁটতে রবীন্দ্রনাথ বলছেন—সোহম। সোহম। সেই আমি। আমি-ই সেই। তার পাশ থেকে কে একজন ফকির সাহেব বলছেন, আয়নাল হক। আয়নাল হক। আমিই সেই। সে-ই আমি। আমি ছাড়া আর কে! আমি-ই সেই একা মানুষটি। সেই মানুষটি সব বহুকে একার মধ্যে ধারণ করে আরো বড় একা হয়ে আছেন। তার দোকা লাগে না।

    এই রবীন্দ্রনাথই পাঠিয়ে দিলেন জালাল ভাইকে। আমার জালাল ভাই। একদিন ফোন করে বললেন, আমার নাম মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান জালাল। থাকেন মার্কিন দেশের ডালাসে।

    তিনি আমাকে রবীন্দ্রনাথ বিষয়ে অনেক বইপত্রের কথা বললেন। পাঠিয়েও দিলেন মেইলে। আমি মাঝে মাঝে পড়ি। আর রবীন্দ্রনাথ এই পড়ার মধ্যে দিয়েই দেবেনবাবুর সঙ্গে নৌকায় করে পতিসরে বেড়াতে যান। বৌদির সঙ্গে ছাঁদে বসে গান করেন। ভবতারিণীকে বিয়ে করেন। বেলফুল নামে তার শিশু বড় মেয়েকে নিয়ে কোলকাতা থেকে পদ্মানদী পার হয়ে শিলাইদহে চলে আসেন। জমির মধ্যে দাঁড়িয়ে কলিগ্রামের কালু শেখের কাছে শুনছেন, এবারে ধান তো সব মহাজনে লইয়া গেলো গা হুজুর। আপনেরে কর দিমু কি কইরা?

    কবি একটু আকাশ পানে তাকিয়ে বলছেন, সাহাবাবুদের হাত থেকে শেখদের বাঁচাতে হবে। শুনে কালু শেখ আবদুল মুন্সীরে ডেকে বলছে, দেহো, দেহো, মুন্সী চাচা, এ দেহি মানুষ না। এঁরে ফেরেশতা ফেরেশতা লাগে।

    জালাল ভাই বলেন, এই রবীন্দ্রনাথকে তুমি লেখো। আমি লিখতে শুরু করি।

    এর মধ্যে জালাল ভাই মক্কা শরীফ থেকে হজ্ব করে আসেন। বলেন, রাষ্ট্রের কোনো ধর্ম হয় না। ধর্ম হল ব্যক্তিগত বিশ্বাস। ধর্ম যার যার---রাষ্ট্র সবার। আগে মানুষ—তারপর কেউ মুসলিম। কেউ হিন্দু। কেউ খ্রিস্টান। কেউ বৌদ্ধ। কেউ আস্তিক। কেউ নাস্তিক। সবাইকে নিয়েই রাষ্ট্র। রাষ্ট্রের চোখে সবাই সমান। সমান সমান অধিকার। কেউ প্রথম বা দ্বিতীয় শ্রেণীর নয়।

    ফাঁকে ফাঁকে জালাল ভাই বলেন মুক্তিযুদ্ধের কথা। মুক্তিযুদ্ধের বিবরণী। তার ইতিহাস। আর এই জনপদের মানুষের হাসি হাসি মুখের জলেভাসা কথা। ৩০ লক্ষ শহীদের কথা। ২ লক্ষ ধর্ষিত নারীদের কথা। বলেন, কপিলমুনীর সেই গুরুদাসীর একাত্তরে স্বামী-পুত্র-কন্যা হারানোর শোকগাথা। পিরোজপুরের ভাগীরথী নামের এক গ্রাম্য নারীর আখ্যান--যাকে পাক- মিলিটারি মোটর-সাইকেলের পেছনে দড়ি দিয়ে বেঁধে সারা শহরে ঘুরিয়েছিল। শরীর থেকে রক্ত ঝরতে লাগল। এবড়ো থেবড়ো রাস্তায় মাংশ ছিড়ে ছিড়ে পড়ল। চোখের সামনে পথের উপরে ঘষটে ঘষটে ভাগীরথী মারা গেল। অথবা ময়মনসিংহের রশীদ নামের ভাস্কর লোকটির কাহিনী যাকে হিন্দুদের পুজার মূর্তি বানানোর অপরাধে গাঙিনার পাড়ে যীশুর মত মেরে ফেলা হল। জালাল ভাইয়ের এইসব কথা শুনে আমার মনে পড়ে এই একাত্তরেই পাঠ ক্ষেতে লুকোতে গিয়ে আমরা মিলিটারির গুলি খেতে খেতে বেঁচে গিয়েছিলাম। আমাদের একটি বোন নীরবে হারিয়ে গেলো। তাকে আমরা আর বড় হতে দেখিনি। মনেও রাখিনি।

    কিন্তু জালাল ভাই মনে রেখেছেন। খুঁজে খুঁজে সব স্মৃতি ধরে রেখেছেন। কাউকে ভুলতে দেবেন না। গড়ে তুলেছেন ব্যক্তিগত উদ্যোগে মুক্তিযুদ্ধের আর্কাইভ। সংগ্রহ করে রেখেছেন দেশ বিদেশের পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত খবর, প্রতিবেদন, ছবি, প্রেসনোট, বিদেশী দূতাবাসের প্রেরিত চিঠিপত্র। বই-পত্র, গান, কবিতা, প্রবন্ধ, নিবন্ধ, ভিডিও, পোস্টার, প্রেসনোট, গোপন ডকুমেন্ট। প্রকাশিত বই--জার্নাল।

    তিনি শুধু দেখতে চান একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় অর্জিত স্বাধীন সার্বভৌম গণতান্ত্রিক ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশের নির্মল মুখোচ্ছবি।
    এ-ই আমার জালাল ভাই। আমার পেছনের মানুষটি। সামনের মানুষটি। আমার অগ্রজ। সেই সুদূর ডালাস থেকে তিনি আমার পাশে পাশে ছায়া হয়ে থাকেন। আমি তাঁর হয়ে লিখি। তাঁর কথা লিখি। আমার সঙ্গে তিনিও লেখেন। বিস্ময়ে দেখি--আমি একা হতে চাইলেও তিনি একা হতে দেননা। পুরো বাংলাদেশকে আমার সঙ্গী করে দেন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:

কুমুদি পুরস্কার   গুরুভারআমার গুরুবন্ধুদের জানান


  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
    • কি, কেন, ইত্যাদি
    • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
    • আমাদের কথা
    • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
    • বুলবুলভাজা
    • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
    • হরিদাস পালেরা
    • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
    • টইপত্তর
    • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
    • ভাটিয়া৯
    • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
    গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
    মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


    পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। মন শক্ত করে প্রতিক্রিয়া দিন