
ইণ্ডাকশন ওভেনটাও আবার মতি বৌয়ের খুব পছন্দ। কালো কাচের কুকটপটা ও ছোট্ট টেবিলের মত ব্যবহার শুরু করল। বাসন মেজে ধুয়ে জল সমেত ওটার ওপরেই রাখতে লাগলো। যত বোঝাই যে ওটা বৈদ্যুতিন যন্ত্র, হাজার বললেও শোনেনা। শেষে বিদ্যুতের দেবতা একদিন আর সহ্য করতে না পেরে দিলেন রামধাক্কা, মতি উলটো দিকের দেয়ালের ওপরে ছিটকে পড়লো। তার পরে ঐ কাজ বন্ধ হল। মিক্সার গ্রাইণ্ডার নিয়েও মতির দারুণ কৌতূহল। সব দেখিয়ে দিলাম, কোন বাটিতে কী হয়, কিন্তু মতির পরীক্ষা নিরীক্ষা করা স্বভাব। ও আবার যেকোনো বাসন ছোট সাইজের হলে বেশি পছন্দ করে। একদিন আমি কলেজ থেকে বাড়ি ফিরে দেখি মিক্সি খারাপ হয়ে গেছে। কারণ হল মতি মিক্সির চাটনি বানানোর ছোট বাটিটায় ঘণ্টা খানেক ধরে আদা রসুন বাটার পরীক্ষা চালিয়েছে। ... ...

এই দুটো কাজ সুসম্পন্ন হলে, একমাত্র তারপরই, নীল নদের রহস্য ব্যাখ্যা করা সম্ভব। হ্রদের থেকে জন্ম নেওয়া লুয়ালাবা নদী অজস্র হ্রদের মধ্যে দিয়ে বিপুল জলধারা নিয়ে যে দুটি দেশের মধ্যে দিয়ে বয়ে চলেছে, সেই দেশদুটি হল রুয়া (স্পেক যাকে বলেছেন উরুওয়া) ও মান্যুয়েমা। এই নদীর বিপুল জল রাশি দেখলে অবাক না হয়ে পারা যায় না। ইউরোপ এই প্রথম জানল যে ট্যাঙ্গানিকা ও কঙ্গো নদীর পরিচিত উৎসগুলির মধ্যে লক্ষ লক্ষ নিগ্রো জাতির বসবাস। যে সাদা মানুষেরা আফ্রিকার বাইরে এমন শোরগোল তোলে, তাঁদের এই নিগ্রোরা কখনও চোখেও দেখেওনি, তাদের কথা শোনেওনি। অসাধারণ শ্বেতাঙ্গদের প্রথম প্রতিভূ হিসেবে ডাঃ লিভিংস্টোনকে দেখার সৌভাগ্য যাদের হয়েছিল, তিনি মনে হয় তাদের মনে একটা অনুকূল ধারণা তৈরি করতে পেরেছেন। ... ...

একদিন হল কী, আমি দোতলায় বাচ্চাদের মাংস রান্না করেছি, তেল কড়াটা বারান্দায় একপাশে সরিয়ে রেখেছি। কর্ণাকে নিয়ে কোনো ঝামেলা ছিলনা। একজায়গায় বসিয়ে খাইয়ে, মুখ মুছিয়ে, পিঠ চাপড়ে দিলেই ঘুমিয়ে পড়তো। ওর পর্ব মিটিয়ে ছুটকীকে নিয়ে পড়তাম। ও দৌড়োতো, আমিও থালা নিয়ে প্রতিযোগিতায় নামতাম। মেয়ে মাংসের তেলকড়া নিয়ে তেল মাখতে বসল, সেই ফাঁকে আমি দুটো দুটো গাল মুখে ঢুকিয়ে দিই। এমন সময়ে রুণাদা বাটি ভরা টমেটোর চাটনি দিয়ে গেল। আমি জানি রুণাদা যে বাটিটাতে চাটনি এনেছে, সে বাটিটাও আগে খাবার জলে ধুয়ে নেয়। এখানে সমুদ্র কাছে বলে ভূগর্ভস্থ জলস্তর ভূপৃষ্ঠের খুব কাছাকাছি। তাই মাটির স্তরে জল প্রাকৃতিক ভাবে ফিল্টার হবার সুযোগ পায়না। টিউবয়েল খুঁড়লে এক পাইপে জল পাওয়া যায়, লোকে তাই আরও গভীরে যাবার জন্য খরচ করেনা। আর এই জল খেয়ে ঘরে ঘরে পেটের বালাই। আমরা যতদিন থাকি খাবার জল কিনতে হয়। বাড়িতে খরচ করে মেশিন বসাতে ভয়। পরের বার এসে হয়তো দেখবো, ভোল্টেজের জন্য মেশিন পুড়ে গেছে, বা ঝেড়ে মুছে সব ফাঁকা। ... ...

এইভাবে যতদূর সম্ভব গবেষণা করে, এলিফ্যান্টাইন বা তার থেকেও দূরে গিয়ে নিজের পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে আর অন্যের মুখের কথা থেকেও এইটুকুই জানতে পেরেছি। এলিফ্যান্টাইন শহর পেরিয়ে আরও উজানে যেতে গেলে এলাকাটা খাড়া উপরের দিকে উঠে গেছে, তাই, এখানে, নৌকার দুদিকে দড়ি বেঁধে এগোতে হয়, যেমনটা লাঙ্গলে বলদ জোতার সময় করতে হয়; কিন্তু দড়ি ছিঁড়ে গেলে স্রোতের টানে নৌকা ভেসে চলে যায়। এইভাবে চার দিনের পথ চলা। এখানে নীল নদ এঁকেবেঁকে চলে। বারো শোয়েনি পথ এইভাবে চলতে হয়; আর তারপরে একটা সমভূমি আসে, সেখানে নীল নদ একটা দ্বীপের চারপাশে প্রবাহিত হয়; এর নাম ট্যাকোম্পেসো। এলিফ্যান্টাইনের লাগোয়া উজান এলাকায় ও দ্বীপটার অর্ধেকাংশে ইথিওপিয়ানরা বাস করে; বাকি অর্ধেক অংশে মিশরীয়রা থাকে। এই দ্বীপের কাছেই একটা বিস্তীর্ণ হ্রদ রয়েছে, যার সীমানা বরাবর ইথিওপিয়ান যাযাবরদের বাস। ... ...

– রাঁচীর দেহাতি চিকেন রান্নাটা কি ফণীজেঠুর আনা চিকেন দিয়ে করা সম্ভব? যদি হ্যাঁ হয় তা'লে কোন কথা নেই। যদি না হয়, তবে কেন সম্ভব নয়? দিশি চিকেন আর দেহাতি চিকেনের তফাৎ কী? – দিশি চিকেন আর দেহাতি চিকেন – ব্যাপারটা একই। ওটা ভাষার তফাৎ। পোল্ট্রির বাইরে যেসব মুরগি বাড়িতে পোষা হয়, স্বাভাবিক খাদ্য খেয়ে বাঁচে, ওষুধ ইঞ্জেকশন দিয়ে মাংস বাড়ানো হয়না, তেমন চিকেন। তবে হ্যাঁ, বাংলায় যে জাতের মুরগি পোষা হয়, আর ঝাড়খন্ডী আদিবাসীরা যেমন পোষে, তাদের মধ্যে কিছু আলাদা থাকতে পারে। দিশি মোরগের জাতিভেদ বিষয়ে আমার কিছু জানা নেই। ... ...

সবাই জানে যে হাতির দাঁতের ব্যবসা কেন্দ্রগুলো নীল নদের পেথেরিকের নামাঙ্কিত শাখা ধরে প্রায় ৫০০ মাইল অবধি ছড়ানো। এই কথাটাও অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে যখন বলা হয়েছিল যে গোন্ডোকোরো, ৪° উত্তর অক্ষাংশে, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২০০০ ফুট উপরে অবস্থিত আর এদিকে যে জায়গায় থামা হয়েছিল সেই ৪° দক্ষিণ অক্ষাংশের জায়গাটারও উচ্চতা সমুদ্রতল থেকে ২০০০ ফুটের সামান্য বেশি। দুটো নদীই সমুদ্র থেকে ২০০০ ফুট উঁচুতে, একে অপরের থেকে ৮° অক্ষাংশ দুরে, অথচ দুটোকে এক ও একই নদী বলা হচ্ছে, এই ব্যাপারটা কিছু মানুষের কাছে একটা ভারি আশ্চর্য কথা বলে মনে হতে পারে। তবে বিস্ময় প্রকাশে লাগাম পড়ানো ভাল, এটা বুঝতে হবে যে এই বিপুল, বিস্তৃত লুয়ালাবা মিসিসিপির চেয়েও চওড়া, এটা একটা হ্রদজাত নদী; মাঝে মাঝেই এত বিপুল-পরিমাণ জল একেকটা ছড়ানো হ্রদ তৈরি করে ফেলেছে; তারপর আবার খানিক সরু হয়ে চওড়া নদীর চেহারা নিয়েছে, আবার আরেকটা হ্রদ তৈরি করেছে, আর সে কারণেই, ৪° অক্ষাংশ বা তার থেকেও উত্তরে ডাক্তার আবার একটা বড় হ্রদের কথা শুনেছিলেন। যতক্ষণ না লুয়ালাবা, যেখানে ডাক্তার থেমেছিলেন আর বাহর গজলের দক্ষিণতম বিন্দু, যেখানে পেথেরিক এসেছিলেন, এই দুটি নদীর উচ্চতা নিখুঁত নির্ভুল ভাবে জানা যায়, ততক্ষণ আমাদের অপেক্ষা করা ছাড়া গতি নেই। ... ...

উমমম, দারুণ জিনিস এনেছে আজ, মাঝারি সাইজের একেবারে টাটকা জীয়ন্ত চিংড়ি মাছ। পুরোনো স্মৃতি মনে আসে। ওয়েটল্যান্ডে যখন দু’জনে চাকরি করতাম, কর্তা একবার পুকুরের গলদা চিংড়ি রান্না করে অফিসে নিয়ে গিয়েছিল। চিংড়িগুলো এতটাই তাগড়া ছিল, যে দুটো চিংড়ি ছ’ টুকরো করে আমরা ল্যাবের ছ’জন প্রোজেক্ট সায়েন্টিস্ট টিফিনে হাপুস হুপুস করে খেয়েছিলাম। সে গলদার দাঁড়াগুলো একেবারে নেভি ব্লু আর মোটা মোটা। কাঁকড়ার দাঁড়ার মতো দাঁতে চেপে ভেঙে খেতে হয়েছিল। কিন্তু এগুলো গলদা নয়, চাপড়া চিংড়ি। রান্নার বৌদের হাতে ছাড়লে ওরা সেই একটাই জানে – সেটাই করবে। ডুমো ডুমো আলু, নারকেল বাটা, আর সেই কাঁচা কাঁচা পেঁয়াজ বাটা দিয়ে মিষ্টি মিষ্টি ঝোল। ওরা যা পারে করুক। আমি একটু চিংড়ি আলাদা করে চিংড়ি থেঁতো বানাব। ... ...

উগুহহা বন্দর থেকে একদল ব্যবসায়ীর সঙ্গে তিনি রওনা হলেন প্রায় সোজা পশ্চিমদিকে, উরুয়ার উদ্দেশে। পনের দিন হেঁটে পৌঁছালেন বামবারেতে। এটা মান্যেমার প্রথম গুরুত্বপূর্ণ হাতির দাঁতের ভাণ্ডার। স্থানীয়রা জায়গাটাকে বলে, মান্যুয়েমা। প্রায় ছ'মাস ধরে তিনি বামবারেতে আটকে রইলেন। পায়ে একটা ঘা হয়েছিল, মাটিতে পা ফেললেই সঙ্গে সঙ্গে তার থেকে পুঁজ-রক্ত বেরচ্ছিল। সেরে ওঠার পরে, তিনি উত্তর দিকে রওনা হন। বেশ কিছু দিন পর লুয়ালাবা নামের এক প্রশস্ত হ্রদ-জাত নদীর পাশে এসে পৌঁছান। এই নদী উত্তর ও পশ্চিম দিকে বয়ে চলেছে। কিছু কিছু জায়গায় আবার দক্ষিণ মুখোও তার চলা। সব মিলিয়ে বেশ গুলিয়ে দেওয়া ব্যাপার। এক থেকে তিন মাইল পর্যন্ত চওড়া নদী। নিজের জেদ ছেড়ে তিনি এর আঁকাবাঁকা গতিপথ অনুসরণ করার চেষ্টা করেন, শেষকালে দেখলেন লুয়ালাবা গিয়ে পড়েছে সরু, দীর্ঘ কামোলোন্ডোর হ্রদে। যেখানে গিয়ে পড়েছে সেই জায়গাটা মোটামুটি ৬° ৩০' অক্ষাংশ। আর একে দক্ষিণে অনুসরণ করে, তিনি আবার সেইখানে এসে পৌঁছেছিলেন যেখানে তিনি লুয়াপুলাকে মোয়েরো হ্রদে প্রবেশ করতে দেখেছিলেন। ... ...

আজ সকালের পাতে ঠাকুমা দিল ভোগের সাবুখিচুড়ি, তার সাথে মনিপিসির হাতে বানানো সাবুর পাঁপড়। পাত উঠে যেতেই মা ব্যাগ গোছাতে শুরু করল। আমার অবশ্য আজ সেসবে মন নেই। স্কুল না যাবার আনন্দে আমি ঠাকুমার পেছন পেছন ঘুরে বেড়াচ্ছি। উঠোন জুড়ে ধুয়ে দেওয়া কাপড়ে জাম-জামরুল গাছের পাতা গলে পড়েছে রোদ। সে রোদ তেতে উঠছে একটু একটু করে। ভাদুড়ি বাড়ির বাগানে একটানা ডেকে চলেছে ঘুঘুপাখিটা। আমাদের বাজারের ব্যাগ উঠোনে পড়ল। মুসা’র মা কচুর পাতায় ব্যাগ উপুড় করতেই বেরিয়ে এল বরিশালী চওড়া ইলিশ আর বেলেমাছ। চকচকে বেলে মাছগুলো নদীর মাছ, বড়বাজারে খুব কমই এমন মেলে। ঠাকুমার খুব পছন্দের মাছ এটা। এ ক’দিনে বাবা এই মাছ জোগাড় করে উঠতে পারেনি। ... ...

একবার মামারা রাজরাপ্পার মন্দির থেকে বলির মাংস নিয়ে এল। বড়দিদা রান্না করল পেঁয়াজ-রসুন ছাড়া। ওভাবে যে পাঁঠার মাংস রান্না করা যায়, সেও আমার রাঁচীতেই দেখা। আর মাংস রাখতে হলে আমরা তো ফ্রিজে রাখি। রাঁচীতে শীতকালে কাঁচা মাংস একরাত রাখতে হলে বালতি করে ঢাকা দিয়ে বারান্দায় রাখা হত। বাইরে যা ঠান্ডা, ওটাই ফ্রিজের কাজ করবে বলে। আরও একটা জিনিস রাঁচীতে শিখেছিলাম। যদি দু’-তিন দিন ধরে ট্রেন বা বাস জার্নি করতে হয়, আর বাইরের খাবার খেতে অসুবিধে থাকে, তাহলে দুধ দিয়ে ময়দা মেখে লুচি করতে হয়। তিনদিন ঠিক থাকে, খারাপ হয় না। সঙ্গে আচার নিতে হবে। নইলে তরকারি অতদিন তো থাকবে না। ... ...

মনিপিসি এগিয়ে দিল ডুমো করে কাটা ভাপিয়ে রাখা মানকচু। কড়াইয়ে আরো খানিক সর্ষের তেল পড়লো। তাতে তেজপাতা ফোড়ন। দেরি না করে তাতে পড়লো ভাপিয়ে রাখা মানকচু। হলুদ লবণ দিয়ে নেড়েচেড়ে তাতে ঠাকুমা বাটি থেকে মিহি করে বাটা জিরে আর শুকনো মরিচ বাটা দিয়ে দিল। এরপর বাটি ধুয়ে খানিক জলও। জল পেয়ে কড়াইয়ের তেলমশলা ধোয়া ছেড়ে দিল। খুন্তি দিয়ে খুব ভালো করে সেই মশলা কষাতে লাগল ঠাকুমা। ... ...

– সুমিতাদিদা আর নিনাদিদা এখন কেমন আছেন, মা? – আছেন বলতে জরাগ্রস্ত, নব্বই ছুঁই ছুঁই। আর নিনাদিদা তো মানসিকভাবে সুস্থ নয়, অল্পবয়সে উত্তমকুমারকে বিয়ে করবে বলে পাগল হয়ে গিয়েছিল। তাই বিয়ে-থাও হয়নি। – মানে? উত্তমকুমারকে বিয়ে করতে চাইতো? – হ্যাঁ, হাসছিস? বহুমেয়েই তখন এমন পাগল ছিল। স্টার থিয়েটারে শ্যামলী দেখে নিনাদিদা পাগল হয়ে গেল। রোজ স্টারের দরজায় বসে থাকত। উত্তমকুমার কখন ঢুকবেন, কখন বেরোবেন। তারপর ধীরে ধীরে বিকার গ্রাস করলো। বলতো, উত্তমকুমার ওকে নিয়ে যাবে। মেহগনি কাঠের কারুকাজ করা পুরোনো ড্রেসিং টেবিলের বিরাট আয়নার সামনে সেজেগুজে বসে থাকতো, উত্তমের সঙ্গে বেরোবে বলে .... ... ...

লুন্ডা বা লোন্ডা দেশে পা রাখার পরেপরেই, কাজেম্বে শাসিত এলাকায় প্রবেশ করার আগে, লিভিংস্টোন চাম্বেজি নামের একটা বেশ গুরুত্বপূর্ণ নদী পেরিয়েছিলেন। দক্ষিণের সেই ব্যাপ্ত, বিশাল নদী, যে নদীর নামের সঙ্গে লিভিংস্টোনের নাম চিরকাল জড়িয়ে থাকবে, তার সঙ্গে এর খুবই নামের মিল। ব্যাপারটা সেই সময়ে লিভিংস্টোনকে বিভ্রান্ত করেছিল, আর সেই কারণেই, তিনি এই নদীকে তার প্রাপ্য মনোযোগ দেননি, বিশ্বাস করেছিলেন যে চাম্বেজি তাহলে আদতে জাম্বেজিরই উৎস ধারা, আর তাই তিনি মিশরের যে নদীর উৎসের সন্ধান করছেন, তার সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক বা যোগাযোগ নেই। পর্তুগিজ তথ্যের সত্যতার উপর গভীর বিশ্বাস রাখাই তার দোষ হয়েছিল। এই ত্রুটি সংশোধনের জন্য তাকে অনেক, অনেক মাসের ক্লান্তিকর পরিশ্রম করতে হয়েছে, অনেক পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। ... ...

– জেঠিমা, তার মানে পুতুল দিদা যে এমন হৈ চৈ করে, সেটা মনের দুঃখ ঢেকে রাখার জন্য? এসব এত কিছু তো জানতামই না। – মানুষের মনের খবর কেই বা রাখতে পারে বাবু। – জেঠিমা, তুমি মোহনবাগানের গল্প বলতে গিয়ে বলেছিলে, স্বামীর মৃত্যুতে ভেঙে পড়েছিলেন কুমুদিনী। পুতুলদিদাও কি ভেঙে পড়েছে? – এসব কথা তো আর কাউকে জিজ্ঞেস করা যায় না। বুঝে নিতে হয়। তবে আগের পিসি আর এখনকার পিসির মধ্যে কিছুটা তফাৎ তো আছেই। তোর জেঠুও ঐজন্য সবসময়ে দেখিস না পিসির সঙ্গে টরেটক্কা করে যায়? আগের পিসিকে জাগিয়ে রাখার চেষ্টা করে। আর রইল কুমুদিনীর কথা। নিজের কথা তিনি নিজেই বলে গেছেন। ... ...

বাবিসা সর্দারের গ্রামে থাকাকালীন, হ্রদের পশ্চিম তীরের থেকে এক মিশ্র-বর্ণের আরব এসে পৌঁছায় ও খবর দেয় যে মাজিতুর একটা দল তার সব কিছু লুঠ করেছে। ঘটনাটা এমন একটা জায়গায় ঘটেছে যেটা তারা এখন যেখানে আছেন তার থেকে কমপক্ষে ১৫০ মাইল উত্তর-বায়ু (উত্তর-উত্তর-পশ্চিম) কোণে। ডাক্তার ও জোহানাদের সর্দার মুসা দু'জনেই সেটা খুব ভাল করে জানেন। মুসা খুব আগ্রহ নিয়ে আরবদের গল্প শুনেছিল আর সেটা পুরো বিশ্বাস করেছিল। তার অবশ্য অন্য কারণ ছিল, সেটা এখনই বলব। ... ...

সাবুধানার দুধে এবার পড়ল ছোট করে কেটে রাখা বড়দাদির গাছের কচি তালশাঁস। আবার অনবরত নাড়া পড়ে দুধ-সাবুতে। তালশাঁসগুলো একটু জল ছেড়ে ছোট হয়ে আসতেই ঠাকুমা কোরানো নারিকেল ছড়িয়ে খাবড়ি নামিয়ে ফেলে। তাঁলশাসের পায়েস পাথরের বাটিতে ঢেলে ঠাকুমা নিবেদন করে দেয়ালে ঝুলানো রাধাকৃষ্ণের ছবির সামনে। কমলা রঙের পদ্মজবা পড়ে সেখানে। ঠাকুমা দু’হাতে তালি দিয়ে গেয়ে ওঠে, “হে কৃষ্ণ করুণা সিন্ধু দীনবন্ধু জগৎপথে। গোপেশ গোপীকা কান্ত রাধা কান্ত নমহস্তুতে…” ... ...

পরে আমি অনেক ভেবেছি জানিস। সকালের পায়েস, বিকেলে সেটা কয়েকমাসের বাচ্চার পক্ষে বিষ, গ্রামে তো অত ঢাকা-চাপা দেবার অভ্যেস নেই। আর এ বাড়িতে সব কিছু কাজের লোকের ওপরে নির্ভর। রুপোর টাকার কোনো দরকার ছিল না। তাও যখন দেওয়া হল, সেটা মুখে লাগানোর আগে গরম জলে ফুটিয়ে নেওয়া দরকার ছিল। আর এ জায়গাটা ঊপকূল। ভূগর্ভস্থ জলস্তর মাটির খুব কাছে। বিভিন্ন স্তরের মধ্যে দিয়ে গিয়ে প্রাকৃতিকভাবে ফিল্টার হওয়ার সুযোগ পায় না। তাই জলের কোয়ালিটি খুব খারাপ। এখন আমরা বড়রা কেনা জল খাই। ঐ জলে ধুয়ে বাচ্চার মুখে দেওয়া অন্যায় হয়েছিল। আমি কিন্তু তখন প্রফেসর। পুঁথিগত জ্ঞান-বিজ্ঞান সবই জানা ছিল। কিন্তু আমি হাতেকলমে রান্নাবান্না নিয়ে মাথা ঘামাতাম না। বইয়ের জগতে বাস করতাম। সবকিছুতে বড়দের ওপরে নির্ভর করে চোখ বুজে বসে থাকতাম। আমি তখন মা হয়েছি, তবে প্রকৃত মা হতে পারিনি। অযোগ্য ছিলাম। সেই ঘটনা থেকে আমি প্রতিজ্ঞা করলাম, রান্না আমায় শিখতে হবে। আর হেঁশেলে কর্ত্রী হতে হবে। মূর্খ রাঁধুনিদের ওস্তাদি বন্ধ করতে হবে। আর সন্তানের খাওয়া দাওয়ার জন্য গুরুজন, লঘুজন কারোর ওপরে ভরসা করব না, ভগবান এলেও না। ... ...

এক রাতে আমার নোট-বই বের করলাম, আর তাঁর মুখ থেকে তাঁর ভ্রমণ সম্পর্কে বক্তব্য শোনার জন্য বসলাম; নিঃসংকোচে তিনি তাঁর অভিজ্ঞতার কথা বললেন। তার একটি সারসংক্ষেপ নিচে দেওয়া হল। ডাঃ ডেভিড লিভিংস্টোন ১৮৬৬ সালের মার্চ মাসে জাঞ্জিবার দ্বীপ থেকে রওনা দেন। পরের মাসের ৭ তারিখে তিনি সদলবলে কিন্ডিনি বে থেকে আফ্রিকার অভ্যন্তরের উদ্দেশ্যে রওনা হন। তাঁর দলে ছিল বোম্বাই থেকে আসা বারোজন সিপাই, কোমোরো দ্বীপপুঞ্জের জোহানার নজন লোক, সাতজন মুক্তি পাওয়া দাস, আর দু'জন জাম্বেজির লোক। তাদের পরীক্ষামূলক ভাবে দলে নেওয়া হয়েছিল। এছাড়া ছটা উট, তিনটে মোষ, দুটো খচ্চর আর তিনটে গাধা। এইরকম মোট ত্রিশজন লোক সঙ্গে ছিল, যাদের মধ্যে বারোজন যেমন সিপাই ছিল, যারা দলকে পাহারা দেবে। তাদের বেশিরভাগই এনফিল্ড রাইফেল দিয়ে সজ্জিত। সেই রাইফেলগুলো বোম্বাই-এর সরকার ডাক্তারকে উপহার দিয়েছিল। ... ...

অনেকক্ষণ থেকেই দেখছিলাম, ছোট জা আমাকে চোখ মটকাচ্ছে। ... একটু দূরে আছে বলে ওর ইশারা বুঝতে পারিনি, খাওয়ার দিকেই একতানমন হয়ে ছিলাম। পরে কথা বলে বুঝলাম, জা আমার খাওয়া দেখে ইশারা করছিল, এখনই অতটা পরিমাণ খেয়ে না নিতে। ওর কথাটাকে সত্যি করে, চাটনির পরে এল সাদা ভাত আর ঘি। তারপর একে একে পোস্ত ছড়ানো লাল শাক ভাজা, মুড়োর ডাল, ছ্যাঁচড়া, মাছের কালিয়া, পাঁঠার মাংস, ঘন টমেটোর চাটনি, দই, মিষ্টি, পান। এমন দুই পর্বের খাওয়া দেখে, খেয়ে আমার মনটা ভীষণ অবাক, আর পেটটা খুব ক্লান্ত হয়ে গেল। ... ...

এরপর তাড়াতাড়ি বারবেলা আসার অদম্য ইচ্ছে নিয়ে আমি ঢুকে পড়লাম স্কুলের গণ্ডিতে। ঊষাদি, মঞ্জুদি, অশোকাদি, আল্পনা-আপা, নুরজাহান-আপা – যত না পড়া ধরে, তারচেয়ে বেশি গল্প করে। কার বাসা গতবছরের বন্যায় ডুবে গিয়েছিল, কে যুদ্ধের বছরে শরণার্থী হয়ে ক্যাম্পে গিয়েছিল, কার বাড়ির আতা গাছে ফল ধরেছে — সে সব গল্পে গল্পে যতটুকু পড়া বাদ পড়ে, তার সবটুকুই ষোলোআনায় পুষিয়ে দেয় দীপঙ্কর স্যার। কড়া ধাঁচের ছোটখাটো মানুষটি শুধু স্কুলে পড়িয়েই ক্ষান্ত হয় না, প্রতিদিন বিকেলে বাসাতেও যায় আমাকে পড়াতে। কিন্তু আজ বিকেলে আমি কী ভাবে দীপঙ্কর স্যারের কাছে পড়ব? আমি মনে মনে পণ করে ফেলি, স্যার যতই বকা দিক, আজ আমি ছুটি নেবই নেব। ... ...