এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • মনুষ্যত্বের গর্ব‌

    প্রত্যয় ভুক্ত লেখকের গ্রাহক হোন
    ০১ জুন ২০২৪ | ১৮৭ বার পঠিত
  • গর্বের মাস?- এই যে এই বিপুল পৃথিবী, নানা জায়গায় নানা মানুষ, নানা ধর্ম-সংস্কৃতি, নানা ধরনের মন মানসিকতা, সেই মিশ্রণে মিশে আছি আমি, আমরা; দিকে দিকে মানুষের দিগন্ত, জীবের চেতনার দিগন্ত নিয়ত উন্মোচিত হচ্ছে, আলো-অন্ধকার-ছায়ার খেলা চলেছে নিরন্তর আমাদের চিত্তলোকে।
     
    এখন পৃথিবীতে বড়ো সুখের সময় নয় সত্যি। জরতী পৃথিবীর অন্নপাত্র নিঃশেষপ্রায়, দিকে দিকে চিতার আগুনের হল্কা মুখে এসে লাগে, পোড়া মাংসের গন্ধে শ্বাস নিতে কষ্ট হয়, গরম বাতাসের দীর্ঘনিশ্বাসে চোখের জল ও শুষে নেয় উষর মাটি, তারি মধ্যে চিৎকৃত শিবারব আমাদের চিত্ত বৈকল্য ঘটায়, সত্য-সুন্দর-শিব, শান্ত-শুভ-অদ্বৈতের যে শ্বাশ্বত আদর্শ মানুষের তার বিপরীতে এমন শ্রীহীন কুৎসিত অশ্লীল স্ব-প্রদর্শনী ও তীব্র সম্ভোগপ্রবণতা, শ্মশানের মধ্যে একনাগাড়ে উচ্চনিনাদে নিজেকে বিজ্ঞাপিত/পণ্যায়িত করার ও অপরকে 'অপর' বানানোর আর দাবিয়ে রাখার এমন বিষম প্রবণতা চিরন্তন মানবপ্রকৃতির অন্তরাত্মাকে পর্যন্ত কলুষিত করে তোলে, ক্রমশ যেন মুক্তির দুয়ারগুলি বাইরে রুদ্ধ হয়ে যাচ্ছে মনে হয়।
     
    তাই এবার, এইসব ব্যাক্তিগত ও বিশ্বব্যাপী বিপর্যয়গুলির মুহূর্তে ফিরে তাকাই আপন অন্তরের পানে, প্রথম প্রথম আলো ঠেকে না অনভ্যস্ত চোখে-মন বিমর্ষ ও বিরূপ হয়ে ওঠে, আপন চিত্তদৈন্যের ধিক্কারে মন বিকল হয়ে আসে, সব আশাই যেন হারায় অতল আঁধারে।
     
    কিন্তু জানি, আছে আনন্দনিকেতন, নিজের মধ্যেই আছে-কত দূরে জানিনা, কিন্তু তারি মলয় বাতাস কখনো গায়ে এসে লাগে বৃষ্টির পরের বসন্তবিকালের দখিনা বাতাসে, একলা রাতের গভীর ভেজায়, বুদ্ধপূর্ণিমার রাতের চাঁপা-গন্ধরাজ-রজনীগন্ধার সুবাসে। প্রকৃতি নিরুত্তাপ, নির্বিকার আমাদের এই একলা‌ প্রাণের গোপন সব দুঃখ, মানবের নিরন্তর সংঘর্ষ আপন সত্তার সাথে-আদিমের সাথে অর্বাচীনের, বর্বরের সাথে সুন্দরের, সত্যের সাথে মোহের, জ্ঞানের সাথে মূঢ়তার, তথ্যনিষ্ঠার সাথে সংস্কারের, বিশ্বাসের সাথে সংশয়ের, গর্বের সাথে লজ্জার এই যে সব সতত ক্রিয়াশীল দ্বান্দ্বিক বিরোধ-সমন্বয়, আমাদের ক্রমেই মানুষ হিসেবে গড়ে তুলছে বা ভাঙছে- তার সাথে আপাত সম্পর্করহিত এই বিস্তৃত বহিঃপ্রকৃতি।
    কিন্তু এ আপনার এবং আমাদের অজানিতে আমাদের অন্তঃপ্রকৃতিকে নিয়ত আলোড়িত ও প্রভাবিত করছে- আমাদের সৌন্দর্যপিপাসু মনে সৌন্দর্যবোধকে জাগিয়ে তুলছে জ্যোৎস্নাদীধিতি বিধৌত পূর্ণিমা বা জীবের প্রাণরক্ষার‌ সংগ্রাম আর জীবনের অনিত্যতা সম্বন্ধে অহরহ সচেতন করে তুলছে এই বিশাল পার্থিব সংহারযজ্ঞ- যেখানে কেবলি বিভেদ জীবের সাথে জীবের মৌলিক প্রকৃতিতে, একের উপর অন্যের এই অধিকার স্থাপনের প্রয়াস প্রেম-প্রীতি বা হিংসার আশ্রয়ে, এসবকিছুই  নিত্য‌ই আমাদের অবচেতনে নব নব ভাব, ভাবনা, জিগীষার উন্মেষ ঘটাচ্ছে- তাই  বাহ্যপ্রকৃতি ও মানবের অন্তঃপ্রকৃতি অঙ্গাঙ্গীভাবে সংশ্লিষ্ট।
     
    এবার তাই ফিরে চাইছি মানবের হিংসা-রিরংসা-প্রণয়-ক্ষোভ দীর্ণ জগৎ থেকে আপন নিভৃত অন্তর্জগৎটির পানে, আর এই সসাগর জীবের, সৌন্দর্যের ও বিরাটের আকর এই বহু বৈচিত্র্যময় পৃথিবী, তার‌ও সীমানার বাইরে যে মহাবিশ্ব তার নৈসর্গিক আলো-অন্ধকারের পানে, ইন্দ্রিয়াতীত সব অনুভব, প্রজ্ঞা এবং বোধির পানে।সেখানে হোক আমাদের সত্য আশ্রয়- যে বাহ্যিক বিরুদ্ধশক্তিগুলি ক্রমাগত খর্ব করছে মানবের মহতী শ্বাশ্বতী অধিকারগুলিকে, অবমাননা করছে মানবের পরমসত্তার, সেগুলির বিপ্রতীপে আমাদের অভিযান হোক কঠোর, বন্ধুর পথে, মলিনতা, অসত্য, ভীতি, বাইরের কলঙ্ক ও অন্তরের লজ্জা ত্যাগ করে আমাদের নিভৃত সাধনা হোক ক্রমশ সেই বিরাট মানুষটি হয়ে ওঠার যে আমাদের অন্তরে সুপ্ত এবং গুপ্ত, প্রবুদ্ধ এবং প্রকাশিত হবার ঐকান্তিক প্রতীক্ষায়। বাইরের ক্ষুদ্রতা যেন আমাদের অন্তরের ঐশ্বর্যগুলিকে ম্লান না করে, হাটের ধুলা মার্জনা করতে পারি যেন নির্জনে সুরধুনীর ধারায়, মলিন বসনখানি ত্যাগ করে প্রেমের বসনখানি যেন নিতে পারি নিজদেহে, আর সমবেতভাবে উপনীত হতে পারি সেই সত্যের পথে দেবযানে, ব্যাষ্টিসত্তার স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখেও যেন মিলতে পারি সমষ্টির মাঝারে, একাত্মভাবে প্রার্থনা করতে পারি-" অপাবৃণু"; হে বিরাট, হে উদার, উন্মোচিত কর হিরন্ময় আবরণ, সত্যের মুখটি, দুয়ারটি খুলে দাও, "তমসো মা জ্যোতির্গময়" অন্ধকার থেকে আলোতে নিয়ে যাও এবং আলোর জ্যোতিতে চোখ ধাঁধিয়ে ভুলিয়ে দিয়ো না, নিয়ে চলো আলো-অন্ধকার, শুভ-অশুভ, শুচি-অশুচি, অজ্ঞান-জ্ঞানের দ্বৈতের পরপারে অদ্বৈতে, তোমার প্রকাশ হোক আমাদের মাঝে ও আমরাও প্রকাশিত হ‌ই তোমার আলোকে, জগতের সবকিছুই আমাদের দৃষ্টিতে তোমার জ্যোতিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠুক।
     
    এই গর্বের মাসের সূচনায়, বাইরের এই ক্লেদ, গ্লানি আর কদন্নের মুষ্টিভিক্ষার থালি ত্যাগ করে যেন‌‌ উপভোগ করতে পারি ভূমাব্যাপিত তোমার এবং তার সাথে এক ও অভিন্ন একক আমার ও সম্মিলিত সকলের আনন্দকে, স্থিত হ‌ই স্ব-তে, আমাদের গর্ব হোক তোমারি গর্ব হে নাথ, হে জীবনস্বামী, এই গর্ব হ‌উক আমাদের অন্তে-তোমারে চেয়েছি, চেয়েছি নিজেকে, বহন করেছি সুকঠিন দায়িত্বের ভার মনুষ্যত্বের, নিজেদের, আপন সত্যে, অনন্তের মাঝে, বাইরের জীর্ণতা, দীনতায় মানবনা অন্তরের নিত্য মানবের পরাজয় , মর্যাদার পরাভব। ক্ষুরধার শঙ্কিল পঙ্কিল বাট, কিন্তু পেরিয়ে যেন যাই হে প্রভু, পেরিয়ে যেন যাই এই নিজের‌ই ওপর, আমাদের ওপর, তোমার ওপর দৃঢ় বিশ্বাসে ভর করে। 

    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • যোষিতা | ০১ জুন ২০২৪ ১৭:০৯532572
  • আমাদের এখানে ১৫ জুন শনিবারে প্রাইড। আমি ফোটো আপলোডিয়ে দেব সেদিন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। আলোচনা করতে মতামত দিন