এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  গপ্পো

  • জামাই বাবার কাশি

    মোহাম্মদ কাজী মামুন লেখকের গ্রাহক হোন
    গপ্পো | ২১ ডিসেম্বর ২০২৩ | ৫৯৪ বার পঠিত | রেটিং ৫ (১ জন)
  • ‘আচ্ছা, কউ আমারে, পোলাডার মইদ্যে কি কোন খুঁত আছে? সরকারী ইঞ্জিনিয়ার, ফর্সা, লম্বা চওড়া, ভাল বংশ - আর কী কী লlগবো তোমাগো কও?” সালাম সাহেব যখন কথাগুলো বলছিলেন, তার কপালের শিরা ফুলে উঠছিল, পুরো মুখ লাল হয়ে উঠছিল।

    ‘আর কিছু লাগবো না, তয় এট্রু খোঁজখবর করন লাগবো।“ – চিচিঙ্গাগুলি নিরীক্ষা করতে করতে বললেন রওশানারা।  বাছাই করতে জান বেরিয়ে যাচ্ছিল তার, প্রতিদিনই এই করে মানুষটা, হাবিজাবি দিয়ে ঘর ভরে ফেলে। বাজারে গেলেই লম্বা লম্বা কথা বলতে থাকে, আর সেই ফাঁকে যা-তা জিনিস ঢুকায় দেয় দোকানিরা থলের মধ্যে।

    ‘ খোঁজ-খবর তো কম করলা না, পুলা তো তোমাগো ঐদিকেরই, কিছু পাইলো তোমার ভাই-ব্রাদাররা?’- সালাম সাহেবের কণ্ঠে এবার মৃদু টিটকারির গন্ধ। মেয়ের বিয়ের আলোচনা রূপান্তরিত হয়েছে স্বামী-স্ত্রীর মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধে।

    ‘ আমার ভাইয়েরা কিছু পায় না বইলাই তো বেবাক সহি হইয়া যাইতেছে না। শরীরের মইদ্যে রোগ-বালাই থাকবার পারে! হেইডা তো আর বাইরে থোন দেহন যায় না।‘ রওশানারা একটা পচা চিচিঙ্গা পাশের ছালাটাতে ছুঁড়ে ফেলতে ফেলতে বলেন।

    ‘তাইলে আর কি! সরকারের কাছ থিকা ভাড়া কইরা গোয়েন্দা লাগায় দেও’ সালাম সাহেবের গলা আগের থেকেও চড়ে যায়।

    রওশানারা জবাব দেন না, এক মনে বাজার-সদাই বাছতে থাকেন, আর ফাঁকে ফাঁকে বাতাসে সরে যাওয়া ঘোমটাখানি টেনে তোলেন। সরকারী গোয়েন্দা তার দরকার নেই,  তার নিজেরই ভাতিজি আছে। একদিন কথায় কথায় বের হয়ে পড়েছিল যে, রোজিনা ছেলের বড় ভাবীর সাথে ক্লাস করেছে একই স্কুলে। আর তখনি এমনকি পাত্রের খাটের তলায় কী কী আছে, তাও খুঁড়ে আনার দায়িত্ব অর্পিত হয় রোজিনার উপর।

    দুইদিন পর রোজিনা আচলের কাপড় ঘঁষতে ঘঁষতে যখন ছেলের জীবনবৃত্তান্ত বর্ণনা করা শুরু করেছিল, রওশানারা তাকে থামিয়ে দিয়ে কণ্ঠটা চিকুন করে জানতে চেয়েছিলেন, “আগে ক, পোলার কুনো ব্যারাম আছেনি?” এক গাল হেসে দিয়ে রোজিনা মোটা কণ্ঠে জানিয়ে দিয়েছিল, “ যেই হারে ব্যায়াম করে, ব্যারাম আইবো কোথ থনে? নিশ্চিন্ত থাহেন ফুবুয়াম্মা, পোলারে একটা কাশ দিতেও হুনে নাই কেউ কহনো। ‘’

    এরপর রওশানারা রোজিনার সাথে আর কথা বাড়াননি, সোজা চলে গিয়েছিলেন শোবার ঘরে সালাম সাহেবের কাছে, আর আলনার কাপড় গোছাতে গোছাতে বলছিলেন “অহন কি হওনের বেলা? মাইয়ার বিয়া পাকাপাকি কেডায় করবো?”

    এরপর ধুমধাম করে বিয়েটা হওয়ার মাত্র মাস তিনেক পার হয়েছে, রওশানারার কাছে খবর আসে, জামাই নাকি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে বুকের ব্যথায় বেঁহুশ হয়ে। ঘরবাড়ি তালা দিয়ে সে সালাম সাহেবের হাতের উপর ভর করে প্রায় উড়ে যখন হাসপাতালটাতে পড়ে, তখন ডাক্তার রোগী পরিদর্শনে এসেছিলেন। জরুরী বিভাগের চিকিৎসা শেষে জামাই ততক্ষণে কেবিনে স্থানান্তরিত হয়েছে।  ডাক্তার যতই দুশ্চিন্তা না করতে না বলেন, ডাক্তারকে তিনি আরো বেশী করে ধরে রাখেন, “কিন্ত তার বাড়ির লোকজন যে বিয়ার আগে কইছিল, অসুখ-বিসুখ তো দূরের কথা, কোন লক্ষণও  দেখা যায় নাই কহনো।“

    “ লক্ষণ না থাকলে যে অসুখ হবে না, তা নয়। কোন উপসর্গ না থাকাটাই বরং বিপদজনক। অসুখ থেকে বাঁচতে হলে তাই লক্ষণের অপেক্ষায় থাকা যাবে না, শুরু থেকেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। আচ্ছা, আপনার জামাই কি কোন কারণে মানসিক চাপে ছিলেন? মানে, অফিসের প্রেসার? কারো সাথে কোন দ্বন্দ্ব?”

    ‘না, আমার জামাইয়ের তো আত্মীয়-স্বজন সবার লগেই সুসম্পর্ক…অফিসেও হুনছি, বেক্কলেরই প্রিয়।‘ উত্তরটা দিতে দিতে প্রমাদ গণেন রওশানারা। সম্বন্ধটা পাকা হওয়ার পরেই টের পেতে শুরু করছিলেন, তার জামাইয়ের আত্মীয়ের বহর অনেক লম্বাচওড়া। কথাটা আগে খোলসা করে নাই বলে রোজিনার দিকে যখন তেড়ে গিয়েছিলেন,  খিলখিল করে হেসে উঠেছিল সে, “আত্মীয়স্বজন বেশী থাকা তো ভালা, ফুবুয়াম্মা! আমার বইনের সেবাযত্নের অভাব হইব না। আপনি একদম চিন্তা কইরেন না, জামাইয়ের ঘরে যাওয়ার আগেই নিয়ম- কানুন বেবাগ হিগাই দিমুনে!“

    ডাক্তার কোন কথা না বলে প্রেসক্রিপশান লিখতে শুরু করেছিলেন। কিন্তু নীরবতা ভেঙে দেন রওশানারা, “ব্যাধিডা কি ধরতে পারছেন, ছার?”
    ‘ব্যাধি-ট্যাধি কিছু না। উপসর্গ বলতে পারেন। তবে কেয়ার না নিলে বিপদ হতে পারে।  জামাই যেন মানসিকভাবে চাঙ্গা থাকে, সেদিকে খেয়াল রাখতে বলবেন আপনার মেয়েকে।“

    ডাক্তারের রুম থেকে ‘প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা’ কথাটা ঘুরছিল রওশানার মাথায়। সালাম সাহেবকে বিষয়টা পাড়তেই, পত্রিকার পাতা থেকে মাথাটা বাড়িয়ে সোৎসাহে বলতে লাগলেন, “হেইডা বুঝতে হইলে একটা অসুখের লক্ষণ-আলা পোলার লগে তোমার ছোড মাইয়াডার বিয়া দিতে হইব।  দেখবা যত্নের চোডে রোগ ধারে কাছে ঘেঁষতে পারবো না, আর লক্ষণ লক্ষণই থাইকা যাইবো!”  
    স্বামীর দিকে একটা কঠোর দৃষ্টি হেনে যখন জামাইয়ের কেবিনে ঢুকলেন রওশানারা, বড় মেয়ে সুমি কাঁদতে কাঁদতে ঝাঁপিয়ে পড়ল তার বুকে। মেয়ের চুলগুলো ঠিক করে দিতে দিতে , “আরে বলদা না কি? ডাক্তারই তো কইল, জামাইয়ের কোন অসুখ নাই। একটা উপসর্গ খালি!“
     
    এরপর হঠাৎই একটা কাশি-বিষ্ফোরণ ঘরটাতে। প্রথমে কিছুটা কেঁপে উঠলেও দ্রুতই সামলে নেন রওশানারা, আর হাসিমুখে বলতে থাকেন মেয়েকে, “ ঐ ..ঐ যে...হুনলি!   কী  চেতা, তেজা জামাই আমার!! বাবাজির এক কাশিতে খালি কেবিন না, হাসপাতাল সুইদ্ধা কেমনে কাঁইপা উঠলো!“

    (সমাপ্ত)

    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • গপ্পো | ২১ ডিসেম্বর ২০২৩ | ৫৯৪ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • মোহাম্মদ কাজী মামুন | 2404:1c40:bc:bdac:1:0:569e:bf92 | ১১ মে ২০২৪ ১৪:৫৩531606
  • অনেক ধন্যবাদ হীরেনদা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। সুচিন্তিত মতামত দিন