এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • বুলবুলভাজা  ভোটবাক্স  পঞ্চায়েত নির্বাচন-২০২৩

  • পঞ্চায়েত - আমডাঙা থেকে বসিরহাট

    সৈকত মিস্ত্রী
    ভোটবাক্স | পঞ্চায়েত নির্বাচন-২০২৩ | ১৫ জুলাই ২০২৩ | ৯৪২ বার পঠিত | রেটিং ৪.৩ (৩ জন)
  • পঞ্চায়েত ভোটের চোখে-দেখা বা কানে-শোনা অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখা চাওয়া হয়েছিল। এই লেখাগুলো কয়েকটি এলাকার বিবরণ। অসম্পূর্ণ, কিন্তু অভিজ্ঞতাভিত্তিক। আপনার জানানোর মতো অভিজ্ঞতা থাকলে আপনিও লিখতে পারেন। পাঠান  [email protected]  এ।


    থ্রি নট থ্রি রাইফেল বাগিয়ে ধরে আড়ষ্ট কনস্টেবল বললেন- 'স্যার, আমাকে একটু গার্ড দিয়ে রাখুন। গুলি চালানোর অর্ডার নেই, শুনেছি এইসব অঞ্চলে বন্দুক ছিনতাই হয়। বন্দুক গেলে চাকরিতে টান পড়বে' ২০২৩ এর ত্রিস্তরীয় পঞ্চায়েত নির্বাচনে ভোটকর্মীদের নিরাপত্তা দিতে আসা রাজ্যপুলিশের নিরাপত্তারক্ষীরা নিজেরাই নিরাপত্তাহীনতায় অস্থির, ভোটার বা ভোটকর্মী কোন ছাড়? অঞ্চলটি আমডাঙা। পুলিশের মুখে এ-কথা শুনে ভোটকর্মীরা হাসবেন না কাঁদবেন বুঝে উঠে পারছেন না। কিংকর্তব্যবিমূঢ় দশা তাঁদের।

    ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের জন্যই নাকি একদা ত্রিস্তরীয় পঞ্চায়েত ব্যবস্থার প্রচলন। সাধরণ মানুষ ক্ষমতার উৎস হয়ে উঠবেন তত্ত্বে বিশিষ্টরা এমনটা ভেবেছেন। 'পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি অর্থনীতি'র ভবিষ্যত ভাবতে গিয়ে প্রাজ্ঞ অজিত নারায়ণ বসু এককালে গ্রামের দাওয়ায় বসে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের ভাবনা ভবেছিলেন। আজও গ্রাম আছে। খুঁজলে দাওয়াও মিলবে। তবে সেখান থেকে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ২০২৩ সালে এসে সম্ভবপর বলে মনে হয়না। তত্ত্ব আর বাস্তবতায় যে আসমান জমিন ফারাক সময়ের সাথে তা কেবল জীবন্ততর হয়েছে তাই নয়। বরং মানুষ জীবনের অভিজ্ঞতায় বুঝে নিয়েছে তার রোজকার যাপনের নির্ধারক ক্ষমতাটি থাকে সরকার-প্রশাসনের কেন্দ্রে আর বন্দুকের নলে। বর্তমানে ফি-ভোটে বন্দুকের নল যেভাবে উদারতর হচ্ছে - তারপর এই ভোটকে সাধারণের নির্বাচন - এটা ভাবাটা বেশ বিলাসিতা বলেই মনে হয়।

    হুইল চেয়ার, ক্রাচ, কিংম্বা প্রায় শয্যাশায়ী অশীতিপর অসমর্থ প্রৌঢ়-প্রৌঢ়া ভোটকেন্দ্রে সকালেই লাইন দিলেন। দেখলে মনে হবে সত্যিই গণতন্ত্রের উৎসব। ভোটকর্মীর এই মনে-হওয়া মুখ থুবড়ে পড়ল এদের দু একজনের সাথে দু-চারটি বাক্যালাপের পরই- 'এত অসুস্থতা নিয়ে প্রায় শুয়ে শুয়ে ভোট দিতে এলেন?' - ভোটদাতা সটান উত্তর দিলেন- 'না এসে কী করব? ওরা বলল নাহলে বৃদ্ধ ভাতাটা যে বন্ধ হয়ে যাবে।" 'ওরা' কারা? ওরা যারা, ওরা... তারা। অর্থাৎ কিনা যারা অটো -টোটো ভাড়া করে এদের ভোটকেন্দ্র পর্যন্ত নিয়ে এসেছেন। ভোটটাও যারা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নিজেরাই দিয়ে দিয়েছেন। যারা লক্ষ্মী ভাণ্ডার, বৃদ্ধ ভাতা দেন -- তারাই হল 'ওরা'। আমার এক সহকর্মীর এমন অভিজ্ঞতা শুনে সাময়িক ঘোর লাগল। আবার সেটা মিলিয়ে গেল এটা ভেবে ভোটতান্ত্রিক গণতন্ত্র দাঁড়ানো দেওয়া- নেওয়ার উপর। সুতরাং, এ তো প্রত্যাশিতই। আমাদের মানতে একটু অসুবিধা হয়।

    নদী পার করে পি মাইনাস ওয়ান এলাকায় একদিন আগেই ভোটকর্মীরা পৌঁছে গেছিলেন সন্দেশখালি ওয়ানে। ডিসি- আরসি থেকে সবটা বুঝে-সুজে বাক্স প্যাটরা এবং একজন সশস্ত্র রক্ষীনিয়ে ভোটকেন্দ্রে হাজির ভোটকর্মীরা। ভোটকর্মীরা হাজির হতে তাঁদের দেখা পাওয়া গেল। সহাস্যে, কিঞ্চিত করজোড়ে উষ্ণ অভ্যর্থনা করলেন তাঁরা 'স্যার, একটু মানিয়ে গুছিয়ে নেবেন। এখানে অঞ্চল আর সমিতির ভোট নেই। শুধু জেলার ভোট! আমরা আছি, সবটা ম্যানেজ দিয়ে দেব।' যেমন কথা, তেমনি কাজ। তারা ম্যানেজ দিয়েছেন ভোটের সকাল থেকে। ভোট কেন্দ্রে তাঁদেরই একজন ধৈর্য ধরে সক্কাল থেকে দাঁড়িয়ে রইলেন বক্সের কাছে। ভোটাররা আসলেন। ভোটার ব্যালটও হাতে নিলেন এই অবধি। তারপর তাঁরাই সে ভোটটা 'জায়গা মত দিয়ে দিলেন। ভোটাররা সেই ব্যালটটুকু নিয়ে শুধুমুধু বাক্সে ফেললেন। বলা যায় বাক্সে ব্যালট ফলার কষ্টটা ওঁদের করতে দিলেন না ভোটাররা। ত্রিস্তরীয় পঞ্চায়েতের জেলা পরিষদ ভোট শেষ হতে এই দ্বীপে বেশি সময় লাগেনি। তাঁদের ম্যানেজের অনুগ্রহে সকাল সকাল ভোটকর্মী এবং তাঁদের রক্ষী সান্ত্রীটি রিসিভিং সেন্টারে পৌঁছাতে পেরেছেন। তারপর কর্তাদের বুঝিয়ে দিয়ে সোজা বাড়ি মুখো পাড়ি। এই ব্লকে বিজয়ী শাসকদলের প্রার্থীরা অঞ্চল এবং সমিতিতে কোন প্রতিদ্বমতা ছাড়াই বিজয়ী হয়েছেন। সুতরাং ভোটের সবটাই শান্তিতে সমাপ্ত হয়েছে। বিরোধী দলের এজেন্টও ভোটকেন্দ্রে শান্ত হয়ে বসে থেকে পিট পিট করে সবটা দেখেছেন। বিরক্ত হয়ে, কিছুটা ক্রদ্ধস্বরে বলে গেলন সহকর্মী জনৈক ভোটকর্মী।

    আমডাঙা অঞ্চলের ৪৬নং বুথে (সংখ্যা পরিবর্তিত) সকাল থেকে চলল 'শান্তির' পঞ্চায়েত নির্বাচন। সব দলের এজেন্ট ভোটকেন্দ্রে বসেছিলেন শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত। কিন্তু সেই তাঁদের কয়েকজন নানা লোকের আইকার্ড নিয়ে নানা নামে ভোট দিতে এলেন। বারবার। তাঁদের কয়েকজনের সাথে প্রথম পোলিং অফিসারের এমন চেনাজানা হয়ে গেল প্রতিবারই তাঁরা এলে, পোলিং অফিসার উদার হাসি হেসেছেন। বুঝিয়ে দিয়েছেন ওঁরা 'তেনার' খুব চেনা।একটু আগে যিনি ছিলেন মিহির সেন, কিছু সময় বাদে তিনি হরিদাস পাল হয়ে, হরিদাস পালের প্রমাণপত্রাদি সহ ভোটকেন্দ্রে হাজির। পোলিং অফিসার সরেশ লোক। ওঁদের এই ম্যাজিক দেখে না হেসে কোথায় যান। ভোটকর্মীর হাসির উত্তরে তারাও হেসেছেন, হেসে হেসে বারে বরে ভোট দিয়েছেন। অন্যদলের এজেন্টরাও এই ভেলকি দেখেছেন বসে বসে। বাইরে ভিতরে একদম শান্তিপূর্ণ নির্বাচন। ভোটকর্মী আমাদের সহনাগরিক। সংবেদনশীল তাই যথেষ্ট বিরক্ত হয়েছেন।

    আর একটি জেলার অন্য একটি ব্লকে দেখা গেল অন্যরকম ছবি।

    বিকেল পাঁচটার পরও ভোটকেন্দ্রের বাইরে জনা সত্তর লোক দাঁড়ানো। ভোটকর্মীরা কিউ স্লিপ ইস্যু করলেন সত্তরটা। দ্রুততায় ভোট চলছে। তাঁদের কয়েকজন বার বার ভোট দিয়ে যাচ্ছে এরইমধ্যে। আধঘণ্টা ভোট চলার পর স্কুলের গেটে তালা দিলেন ভোটকর্মীরা। ভোটকর্মীরা নিশ্চিন্ত- এতক্ষণে ভোট শেষের পথে। এবার বাড়ি ফেরা যাবে। কিছুক্ষণ না যেতেই আরও সত্তর- আশিজন লোক আসলেন। গেট ধরে ঝাঁকানোর সাথে চেঁচামেচি জুড়লেন- 'তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে দিতে হবে। তাঁরা ভোট দিতে না পারলে কেউ বাইরে যেতে পারবেনা।' বন্দুক আগলে নিরাপত্তারক্ষী ততক্ষণে জড়সড়। অগত্য আবার কিউ শ্লিপ বিলি করা হল। ভোটকর্মীরা সিদ্ধান্ত নিলেন যতক্ষণ ভোটার, ততক্ষণ ভোট চলবে। তবে, কাজের গতি একটু শ্লথ করে দিলেন যাতে অনেকে বিরক্ত হয়ে ফিরে যায়। ভোট চলল রাত্রি সাড়ে দশটা অবধি। মোট ইস্যু করা ব্যলট মেলাতে গিয়ে দেখা গেল মোট ভোটারের থেকে বেশি ব্যলট ইস্যু হয়েছে। শেষে সংখ্যাতত্ত্বের গোঁজা মিল দিয়ে ভোটকর্মীরা ডিসি-আরসি মুখো পাড়ি দিলেন এই আশায় যে- বিরোধীশূন্য গণনাকেন্দ্রে গণনাকর্মীরা এই হিসেবের অতিরিক্ত ব্যালটগুলোও ক্যানসেল করে দিয়ে নিশ্চয়ই সংখ্যা মিলিয়ে দেবেন। ঘটনাটি হুগলির একটি ব্লকের।

    ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা হোক বা চেনা- জানা মহলের ভোটকর্মীদের সমষ্টগত অভিজ্ঞতা "কমবেশি" একইরকম। বিজয়ী পক্ষের ভোট করানোর ধরণটা যেন সব জায়গায় একইরকম। বোঝা যায়, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের পঞ্চায়েতে, কোন কেন্দ্রীভূত ক্ষমতার প্রেরণায় দলীয় কর্মীরা কম-বেশি একই প্রশিক্ষিত দক্ষতায় ভোট করিয়েছেন। এই একই রকম প্রশিক্ষণ ও তার প্রয়োগটাই যথেষ্ট চিন্তার এবং আতঙ্কের। সন্ত্রাস কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং সেগুলো অত্যন্ত পরিকল্পিত ও সংগঠিত।

    এমন চেনা ছবির বিপরীত ছবিও কোথাও কোথাও দেখা গেছে। বসিরহাট ২ নং ব্লকের ১১০ নং বুথে, লক্ষ্মণকাটি ফ্রী প্রাইমারি স্কুলে। বিকেলে ভোটকর্মীরা পৌঁছানোর পর পরই একজন দলবল নিয়ে হাজির হলেন। ভোটকর্মীরা তখন আগামি দিনের ভোটের আয়োজনে ব্যস্ত। লোকটি জানালেন প্রিসাইডিং অফিসারের সাথে তিনি কথা বলবেন। ব্যস্ত প্রিসাইডিং দেখিয়ে দিলেন ঝানু প্রথম পোলিং অফিসারকে। যা কথা তাঁর সাথে বলতে হবে। লোকটি গলা নামিয়ে জানালেন -'স্যার আমি শাসক দলের প্রার্থী। এই বুথে কেন্দ্রীয় বাহিনী থাকবে তো? না থাকলে এখনই ব্যবস্থা করুন। বিরোধীরা বাইরে থেকে লোকজন এনে ঝামেলা করবে।' ততক্ষণে প্রথম পোলিং অফিসার বুঝে নিয়েছেন - এই অঞ্চলে শাসকের দশা বেশ করুণ। বিরোধীরা শক্তিশালী। লোকটিকে জিজ্ঞেস করে জেনে নিলেন পোলিং অফিসার - এখানে বিরোধী হল আইএসএফ। তারই ভাগ্নে আইএসএফের প্রার্থী। সে বেশ লোকজনও জুটিয়েছে। ফলে মামার হাল বেশ কাহিল। পোলিং অফিসারও ততক্ষণে সবটা বুঝে সরেস উত্তর দিলেন - আরে বাইরে এই একজন পুলিশ দেখছেন, কিন্তু আসলে বুথটা কেন্দ্রীয় বাহিনীর নজরে। সিসি ক্যামেরার লেন্স দেখিয়ে পোলিং অফিসারও গলা নামিয়ে বললেন - এই যে ক্যামেরা দেখলেন, এটা সরাসরি আমাদের মুখ্যমন্ত্রী দেখছেন নবান্নে বসে।বিরোধীরা ঝামেলা করার আগেই বাহিনী পাঠাবেন। আরে, ভাবছেন কেন আমরাও তো আপনাদের.... প্রার্থী নিশ্চিত মনে চলে গেলেন। পরদিন অবশ্য ভোটকেন্দ্রে অন্যছবি দেখলেন ভোটকর্মীরা। হেরে যাওয়ার আশঙ্কা থেকে শাসক মামা একটু হৈচৈ করার চেষ্টা করলেই, বিরোধী ভাগ্নের চোটপাটে চুপটি করে বসে রইলেন। পোলিং অফিসাররা মনে মনে নিশ্চয়ই হেসেছিলেন। বুথে বিকেল ৫ টার পরও ভোটারদের লম্বা লাইন। ভোটারদের দাবি আগের ভোটগুলোয় তারা নিজের ভোট দিতে পারেনি। এবার দেবে। ফলে কোন স্লিপ ইস্যুকরে লাভনেই। ভোট চলল রাত ৯ টা অবধি। ১১৭৬ টি ভোটের মধ্যে বুথটিতে পোল হয়েছিল ১১৩২ টি। কথাচ্ছলে আমার ভোটকর্মী বন্ধুটি অকপটে বলে ফেললেন। বোঝাগেল, এই ঘটনায় তিনি বেশ খুশি।

    ২০২৩ এর পঞ্চায়েত নির্বাচনে, গত নির্বাচনের তুলনায় শাসকের বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জেতার সংখ্যা কমেছে। বহু জায়গায় এবার নির্বাচন হয়েছে। যেখানে বিরোধীরা প্রতিরোধ গড়েছে, সেখানে গণ্ডোগোল, সন্ত্রাস, রক্তপাত অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠেছে। বিপরীতে, দেখা গেছে সমস্ত বিরোধীরা নিচু তলায় অলিখিত জোট তৈরি করেছে। এক বনাম এক। সেটা গণনার দিকে তাকালেও আরও স্পষ্ট বোঝা গেছে। সব পক্ষের জোটের পরও শাসক দলের এই মরিয়া, একতরফা ভোট ও বুথ দখলের প্রচেষ্টা সফল হল কী করে? প্রশ্নটার সহজ উত্তর প্রশাসনিক ক্ষমতাহীন বিরোধিতা আসলে অনেকক্ষেত্রে কাগুজে বাঘের মত দশা। বিরোধীদের সেই হাল হয়েছে।

    তবে, আরও একটা বিষয় আলোচনা করে নেওয়া দরকার। শহর বা শহরতলিতে বসে নিরাপদ জীবনের ঘেরাটোপে, আর্থিক নিশ্চয়তায় বসে রাজ্য সরকারের সামাজিক নানা প্রকল্পকে যতই বিদ্রূপ করা হোক না কেন - গ্রামজীবনে, আর্থিকভাবে অনিশ্চিতবিত্তে বাস করা লোকজনের ক্ষেত্রে এই প্রকল্পগুলির গুরত্ব অনেক। ফলে সেখানে বিরোধীদের খুব একটা সুবিধা করতে পারার কথা না। এটাও একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। পক্ষান্তরে এই বিষয়টাতে শাসকের আত্মবিশ্বাস আরও বেশি থাকার কথা ছিল। কার্যক্ষেত্রে তা দেখাগেল না। বরং কিছুটা অনিশ্চয়তার আশঙ্কায় শাসককে ভোটে ছাপাছাপি করতে হল। কিন্তু এই অনিশ্চয়তা কেন? এর উত্তর নানাবিধ।

    লক্ষ্য করার মত বিষয়- গ্রামের দরিদ্রতম অংশের মানুষজন, গায়ে খাটা শ্রমের কাজ করতে অনেকে ভিনদেশে পাড়ি দেন - যেমন ধরা যাক, উত্তর ২৪ পরগণার হিঙ্গলগঞ্জ ব্লকের যোগেশগঞ্জ, কালীতলা সহ সন্দেশখলি ১ এবং ২-এর শিতুলিয়া, আতাপুর সহ অঞ্চলগুলিতে বহু পরিবারের পুরুষ চেন্নাই, তামিলনাড়ু, ব্যাঙ্গালোর বা হায়দ্রাবাদে কাজ করতে যান। কেউ একা কেউবা সপরিবারে। কারণ প্রবাসের ওই সব অঞ্চলে মজুরি বেশি। বাইরে কাজ করার সুবাদে এইসব পরিবার অনেকটাই আর্থিক ভাবে স্বনির্ভর। আবার, এলাকায় না থাকার কারণে 'দুয়ারে সরকার' ক্যাম্পে তারা উপস্থিত হতে পারেনা। সামাজিক প্রকল্পে এদের অনেকের নাম নথিভুক্ত নয়। এই পরিবারগুলোর যেসমস্ত বৃদ্ধ বৃদ্ধারা বাড়ি থাকেন, তারাও সরকারি সুযোগ-সুবিধা পাননা অনেকেই। এই পরিবার এবং এমন শ্রেণির মানুষজনেরা শাসক বিরোধী।এ ই রাজ্যে কাজ না থাকায় প্রবাসী হতে হওয়াটা অবশ্যই তাদের মধ্যে উষ্মার জন্ম দিয়েছে। এদের সমর্থন অনেকটাই বিজেপির উপর। এটা শাসকের পক্ষে যথেষ্ট মাথা ব্যথার কারণ। পরিপ্রশ্ন থাকতে পারে, এই অংশটা কত শতাংশ? এটা বিশেষ অঞ্চলের বিশেষ ফ্যাক্টর হতে পারে। শাসকের দুশ্চিন্তার সামগ্রিক কারণ তো নয়। শুধু উত্তর ২৪ পরগণা নয়, দক্ষিণ ২৪ পরগণা, মুর্শিদাবাদ, মালদা, নদীয়ার বিপুল সংখ্যক মানুষ পরিযায়ী শ্রমিকের কাজে বাইরে থাকেন। তাদের অনেকে ভোটও দেননা। আবার এদের পরিবারগুলোও শাসকের বিরোধী। এগুলো বিশেষ এলাকায় স্থানীয় ফ্যাক্টর। তবে এই ঘটনাগুলিকে কেবল বিচ্ছিন্ন বিষয় বলে দেখাটা ঠিক নয়। সম্ভবত শাসকও সেটা আঁচ করে।৷ তাই ভোটে অনুপস্থিত এদের অনেকের ভোটই ওঁদের কল্যাণে বাক্সে ঠাঁই পায়। এসব নেতিবাচক দিক বাদ দিলেও, শাসকের জেতার জন্য বহুবিধ কারণ উপস্থিত। তবু, রাজ্যজুড়ে শাসকদলকে এমন সন্ত্রাস করতে হল কেন? এখানেই গণতন্ত্রের রহস্য লুকানো আছে।

    এবারের পঞ্চায়েত নির্বাচনে অনেক নতুন নতুন দিক সামনে এনেছে। যে মতুয়া জনগোষ্ঠী ভারতীয় জনতা দলের প্রতি অতিরিক্ত অনুগ্রহ দেখিয়েছিল আগের ভোটগুলিতে, তারা সেখান থেকে কিছুটা সরেছে বলেই মনে হয়। পশ্চিমাঞ্চলে একটা সময় কুর্মি সমাজ, আদিবাসী সমাজ ভারতীয় জনতা পার্টির প্রতি আস্থাশীল হয়েছিল- এবারের ভোটে দেখা গেল তদের আত্মপরিচিতির লড়াই বড় হয়ে উঠছে। তারা নিজস্ব জাতিসত্তার বোধে লড়ছেন। ভারতীয় জনতা পার্টির দিক থেকে তারা মুখ ফেরাতে শুরু করছেন। ভোট রাজনীতির পাটিগণিতে যা শাসককে বাড়তি সুবিধা দিয়েছে। তারপরও বহুক্ষেত্রে, বলা ভালো বেশিরভাগ ক্ষেত্রে শাসকদল 'অবাধ জনাদেশে' আস্থা রাখতে পারল না। শাসককে জনাদেশ তৈরি করে নিতে হল।

    দীর্ঘ ৩৪ বছর রাজ্য এ শাসন করা সিপিএম ফ্রন্ট এবারের ভোট প্রচারে- তৃণমূলের চুরিকে ইস্যু করেছে। বিজেপি কংগ্রেসও মোটামুটি চুরি, সিন্ডিকেট রাজকেই ইস্যু করেছে। সেখানে শাসকদলের প্রচার জুড়ে ছিল- লক্ষ্মীভাণ্ডার, কন্যাশ্রী সহ নানা প্রকল্প, যেগুলি দরিদ্র সাধারণ মানুষের স্বার্থের সঙ্গে সংযুক্ত। যেগুলো গ্রমীণ অর্থনীতিকে প্রভাবিত করেছে। সাধারণ পরিবারে কিছিটা নগদ অর্থের জোগান দিয়েছে। সাধারণ পরিবার, নিম্নবিত্ত পরিবারে মাসান্তে ৫০০ বা ১০০০ টাকা আজও একটা বিষয়।' আমার ভাতাটা বন্ধ হবে না তো?' এটাই সাধারণ - দরিদ্র মানুষের কাছে ভোটের বড় ইস্যু এবং আশঙ্কা। আর এই গণতন্ত্রের পাটিগণিতে বেশিরভাগ, ভোটার দরিদ্র অসহায়- মতামতহীন। যেটা বুঝতে বিরোধীরা অসমর্থ হয়েছে। বিরোধী, বিশেষত বিজেপি দলের নেতাদের একশ দিনের কাজের টাকা বন্ধ করে দেবার হুমকি মানুষজনকে শাসকমুখী করতে বাধ্য করেছে। শাসকদলের জেতার অসংখ্য কারণের পরও, বিরোধীরা বিশেষত ভারতীয় জনতা পার্টি প্রাপ্ত ভোটের একটা বড় শতাংশ ভোট পেয়েছে। বিগত নির্বাচনের তুলনায় সিপিএম এবার বেশি ভোট পেয়েছে গণনার পরিসংখ্যান তাই বলছে। অন্তত যে পকেট ভোট অন্যদলে চলে গিয়েছিল বলে কথিত - এবার তার অনেকটা ফেরত এসেছে। বাকিটা বলাবাহুল্য প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিজেপি অথবা একদা তৃণমূল, বর্তমানে নির্দল হয়ে দাড়ানো প্রার্থীদের ব্যালটে গিয়েছে। যেসব অঞ্চলে বিক্ষুব্ধ তৃণমূল প্রার্থী নির্দল হয়ে দাঁড়িয়েছেন- সেখানে সিপিএম বা বিজেপির ভোট শতাংশ অন্যান্য জায়গার তুলনায় অনেকটাই কম। অনেকটা শত্রুর শত্রু আমার বন্ধু – এই ফ্যাক্টর কাজ করেছে।

    এতসব বিষয়ের পরও ২०২৩- র পঞ্চায়েত নির্বাচনে শাসকদল তৃণমূল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে। এবার প্রশ্ন, ধরে নিলাম, সত্যি যদি বেশিরভাগ ক্ষেত্র জনগণ নিজেরা জনদেশ দিতে পারতেন- তাহলে কি এ রেজাল্টই হতো? এর উত্তর অমীমাংসিত। অনুমান করা চলে, তৃণমূলের আসন কমলেও জয়ী আসনের দিক থেকে তারাই এগিয়ে থাকত। কারণ, চুরিটুরি এদেশে কোন ইস্যু নয়।

    ভোট পাওয়ার এতগুলি কারণ সত্ত্বেও শাসক এবারও এত বেপরোয়া হয়ে উঠল কেন? একি বিরোধীশূন্য পঞ্চায়েত তৈরির অঙ্গীকার না আত্মবিশ্বাসের অভাব? লাগামছাড়া চুরি- দুর্নিতিতে নিমজ্জিত শাসক কি নিজেরাই ভরসা হারাচ্ছে যদি জনগণ ভোট না দেয়। ভোট দিক না দিক আমদেরই থাকতে হবে, আমাদেরই খেতে হবে - এই আপ্তবাক্য শাসকের উঁচু তলা থেকে নিচুতলা পর্যন্ত গেঁথে আছে। সংসদীয় গণতন্ত্রে দলকে জীবন্ত রাখতে ভোটে জেতাটা জরুরি। আর কিছু না বুঝুক এটা কলিখতে না পারা কর্মীটিও জানেন। তাই ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার এত লড়াই। ভোটকে কেন্দ্র করে এবার সন্ত্রাস হয়েছে। ফি বছরই সন্ত্রাস হয়। রক্ত ঝরে। তবে এবারেরটার সাথে যুক্ত হয়েছে নির্বাচন কমিশন, এবং সরকার। অনেক প্রশ্ন এবং অমীমাংসিত উত্তরের ভিড়ে, এবারের সন্ত্রাসের ধরণ,রক্তপাতের তীব্রতা দেখে নির্বাচন বিষয়ে একটাই আতঙ্ক মনে উঁকি দেয় ২০২৩ এর এই মডেল আগামী নির্বাচনে এরাজ্যের স্থায়ী নির্বাচনী মডেল হয়ে উঠবে নাতো? এর উত্তর পেতে আমাদের আরও কিছুটা সময় অপেক্ষা করতে হবে।



    •প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণের ভিত্তিতে লিখিত।
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক।
  • ভোটবাক্স | ১৫ জুলাই ২০২৩ | ৯৪২ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • Amitava Sen | ১৫ জুলাই ২০২৩ ১১:৫৪521247
  • খুব ভালো লেখা।
  • Amit | 203.221.141.30 | ১৫ জুলাই ২০২৩ ১৪:৫৬521250
  • এতক্ষনে একটা ঠিকঠাক লেখা পাওয়া গেলো দুনিয়ার আজেবাজে হ্যাজের মধ্যে। ধন্যবাদ লেখককে। 
  • aranya | 2601:84:4600:5410:3550:e818:3bd9:f19d | ১৬ জুলাই ২০২৩ ০৭:৩৯521291
  • ভাল লেখা। 
    'সাধারণ পরিবার, নিম্নবিত্ত পরিবারে মাসান্তে ৫০০ বা ১০০০ টাকা আজও একটা বিষয়।' আমার ভাতাটা বন্ধ হবে না তো?' এটাই সাধারণ - দরিদ্র মানুষের কাছে ভোটের বড় ইস্যু এবং আশঙ্কা'
    - বর্তমান সরকারের বিবিধ জনমুখী প্রকল্প - কন্যাশ্রী, লক্ষ্মীশ্রী, মা ক্যান্টিন ইঃ খুবই দরকারী এবং তৃণমূলকে ভোট এনে দিচ্ছে, দেওয়ারই কথা। 
    এই প্রকল্প গুলো যখন একবার শুরু হয়েছে, সরকার পরিবর্তন হলেও এগুলো চলবে, যেহেতু সব দলই দেখছে যে এতে মানুষের উপকার হচ্ছে, মানুষ খুশী হচ্ছে এবং তা ভোটবাক্সেও প্রতিফলিত হচ্ছে। ' আমার ভাতাটা বন্ধ হবে না তো?' -  এই আশংকা অমূলক,  মনে হয় 
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ভ্যাবাচ্যাকা না খেয়ে মতামত দিন