এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • বুলবুলভাজা  ধারাবাহিক  গপ্পো  শনিবারবেলা

  • ঠাঁইনাড়া – অন্য পর্ব (৫,৬)

    ষষ্ঠ পাণ্ডব
    ধারাবাহিক | গপ্পো | ১৭ ডিসেম্বর ২০২২ | ৩০৮ বার পঠিত | রেটিং ৪ (২ জন)
  • এই আখ্যানের সকল চরিত্র ও ঘটনাবলী সম্পূর্ণ কাল্পনিক। ভৌগোলিক ও সামাজিক বর্ণনা আখ্যানের চাহিদানুসারে কাল্পনিকভাবে চিত্রিত। বাস্তবের কোনো চরিত্র, ঘটনা বা স্থানের সাথে কোনোপ্রকার মিল কাকতালীয় মাত্র এবং তা সম্পূর্ণরূপে লেখকের অনিচ্ছাকৃত। আখ্যানে বর্ণিত কোনো চরিত্রের দেওয়া বক্তব্যের দায় সংশ্লিষ্ট চরিত্রের মাত্র। তার জন্য কোনোভাবে লেখকের দায় নেই।
    'ঠাঁইনাড়া'-র মূল পর্বটি পাওয়া যাবে এই পাতায়
    মূল ছবি - Zaid mohammed




    সায়েরা যে চুরি হয়ে গেছে, জাহেরা এটা প্রথমে বুঝতেই পারলেন না। তিনি অন্দরমহলে ফিরে এসে দেখেন পেছনের দরজা খোলা, মাহিরা জ্বরের ঘোরে ঘুমাচ্ছে কিন্তু কোথাও সায়েরা নেই। প্রথমে ভাবলেন সায়েরা বুঝি পেছনের দরজা খুলে কোথাও গেছে, যদিও সেটা হবার কথা না। বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পরেও সায়েরা যখন ফিরল না, জাহেরা তখন ভয় পেয়ে গেলেন। তিনি নাজির খাঁ’কে বিষয়টি জানালেন। নাজির খাঁ বিষয়টি পাত্তা দিলেন না। বললেন,
    - দেখো হয়তো আশেপাশে কারো বাসায় গেছে।
    - সায়েরা রাতের বেলা দূরে থাক দিনের বেলাতেও প্রতিবেশী কারো বাসায় যায় না। তারা আমাদেরকে ছোটো নজরে দেখে।

    জাহেরা জোরে কেঁদে ফেললে মাহিরা ঘুম থেকে উঠে পড়ে। প্রথমে সে বুঝতে পারে না কী হয়েছে, আম্মা কাঁদছে কেন। ঘটনা শুনে সেও ‘বুবু’ ‘বুবু’ বলে চিৎকার করে কাঁদতে থাকে। নাজির খাঁ তাঁর কাজের লোকদের কয়েক জনকে আশেপাশে খুঁজতে পাঠান। ঘণ্টাখানেক খুঁজে তাঁরা বিফল হয়ে ফেরত আসেন। নাজির খাঁ জাহেরাকে আশ্বাস দেন—সকাল হলে তিনি পুলিশে খবর দেবেন। পরদিন সকালে ওয়াটগঞ্জ থানা থেকে দুইজন সেপাই এসে বাড়ির সবাইকে জিজ্ঞাসাবাদ করে চলে যায়, কিন্তু সায়েরার খোঁজ আর পাওয়া যায় না। নাজির খাঁ একবার জিজ্ঞেস করেছিলেন সায়েরার সাথে কোনো ছেলের প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল কিনা, সেকথা পুলিশও জিজ্ঞেস করেছিল। কিন্তু জাহেরা, মাহিরা, ঝি লালুর মা বা অন্য কারো জানা মতে সায়েরার সাথে কারো বিশেষ কোনো সম্পর্ক ছিল না। এই যুদ্ধের বাজারে সায়েরার কী হতে পারে সেটা বুঝতে জাহেরার অসুবিধা হয় না, কিন্তু ঘরের ভেতর থেকে জোয়ান মেয়ে চুরি যেতে পারে এটা কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলেন না। ঘরের লোকের সহায়তা ছাড়া এটা যে সম্ভব না সেটা বুঝতে কষ্ট হয় না, কিন্তু সেই লোকটা কে তা আর ধরতে পারেন না। জাহেরা একবার ভাবেন, যা থাকে কপালে মাহিরাকে নিয়ে তিনি গাঁয়ে ফিরে যাবেন। আবার ভাবেন, গাঁয়ে গেলে খাবেন কী এটা যেমন বড় প্রশ্ন তেমন সেখানে মাহিরাও যে চুরি যেতে পারে না অমনটা নয়, ইদানীং সব জায়গা থেকেই মেয়ে চুরি হচ্ছে। তারচেয়ে তাঁরা এখানেই যদি থেকে যান তাহলে কখনো সায়েরা যদি খারাপ লোকদের কবল থেকে পালাতে পারে তাহলে তাঁর কাছে আবার ফিরে আসতে পারবে।

    নাজির খাঁ বাইরে প্রকাশ না করলেও মনে মনে বেশ ক্ষুণ্ন হলেন। তাঁর পরিকল্পনা ছিল দুটো মেয়েকে একসাথে চুরি করানোর। পেছনের দরজায় কেউ এলে দুই বোনই একসাথে যেত বলে ভেবেছিলেন কাজটা সহজ হবে। কিন্তু মাহিরা অসুস্থ হয়ে পড়ায় আর ঐ সময়ে বা’র বাড়ি থেকে ভেতর বাড়িতে কেউ চলে আসায় তাঁর পরিকল্পনা ভণ্ডুল হয়ে যায়। এখন একই কায়দায় বা ভিন্ন কোনো কায়দায় মাহিরাকে চুরি করাতে গেলে ধরা পড়ে যাবার সম্ভাবনা আছে। একটা কাজ করা যায় – মা-মেয়ে দুজনকে একসাথে তুলে নিয়ে গেলে হয়। তবে সেটা আরও কিছু দিন পরে করতে হবে, এবং সম্ভব হলে এই বাড়ির বাইরে কোথাও বেড়াতে গেলে তখন করতে হবে নয়তো পুলিশ সন্দেহ করতে পারে। সায়েরা চুরি যাবার পর থেকে জাহেরা একেবারে চুপ হয়ে যান, মাহিরাকে সব সময় আগলে রাখেন। নাজির খাঁ আর আজকাল তাঁকে আর নিজের ঘরে ডাকেন না – হয়তো ভয়ে, হয়তো আগ্রহ হারিয়ে। নাজির খাঁ অপেক্ষা করতে থাকেন কবে মা-মেয়েকে পাচার করার সুযোগ পাওয়া যাবে। এই অপেক্ষার মধ্যে ১৩৫২ সনের শ্রাবণ মাসে যুদ্ধ শেষ হয়ে যায়।

    যুদ্ধ শেষ হতে সব পরিস্থিতি দ্রুত পালটে যেতে থাকে। নাজির খাঁ’র ব্যাবসায়ের রমরমা বেশ অনেকটা কমে আসে। কংগ্রেস আর মুসলিম লীগের তৎপরতা বাড়তে থাকে, হিন্দু মহাসভার জোরও বাড়তে থাকে। বাতাসে ভাসে খুব শীঘ্র আজাদী এসে যাবে, সাথে এ’কথাও ভাসে আজাদীর সাথে সাথে হিন্দুস্তান ভেঙে পাকিস্তানও হয়ে যাবে যেখানে সব মুসলমানকে পাঠিয়ে দেয়া হবে। নাজির খাঁ মনে মনে কামনা করেন, কলকাতা যেন পাকিস্তান হয় তাহলে এখানকার হিন্দুরা হিন্দুস্তানে চলে গেলে তাদের ফেলে যাওয়া বাড়ি-দোকান-ব্যাবসা দখল করা যাবে। হিন্দুস্তান বা পাকিস্তান কোনোটাই জাহেরার বোধে আসে না। একটা জায়গা হিন্দুস্তান বা পাকিস্তান হলে সেটা কি দেখতে অন্য রকম হয়ে যাবে? সব মুসলমানকে যদি পাকিস্তানে পাঠানো হয় তাহলে তাদের এখনকার বাড়িঘর, দোকানপাটের কী হবে? পাকিস্তানে গিয়ে তারা থাকবেটা কোথায়? করবেটা কী? জাহেরা বুঝুন আর না বুঝুন ১৩৫২ সনের শীতকালে অনুষ্ঠিত বাংলার প্রাদেশিক নির্বাচনে ১১৯টা মুসলমান আসনের মধ্যে ১১৩টা আসন মুসলিম লীগ জিতে যায়, হুসেইন শহীদ সোহরাওয়ার্দী বাংলার প্রধানমন্ত্রী হয়ে যান। তাতে পাকিস্তান যে হবেই সে বিষয়ে মুসলমানদের মধ্যে আর সন্দেহ থাকে না, সাথে কলকাতা কী করে পাকিস্তান হবে সেই ভাবনাও শুরু হয়ে যায়। এই প্রকার ভাবনা চিন্তার সাথে সাথে হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যকার সন্দেহ আর অবিশ্বাস বাড়তে থাকে। ১৩৫৩ সনের শ্রাবণ মাসের শেষ শুক্রবারে মুসলিম লীগ পাকিস্তানের দাবিতে ‘ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে’ পালনের ঘোষণা দেয়। শুক্রবার সকাল হতে একটু একটু করে উত্তেজনা বাড়তে থাকে। রাজাবাজার, কলাবাগান, কলেজ স্ট্রীট, হ্যারিসন রোড, কলুটোলা আর বড়বাজার এলাকায় সংঘর্ষ শুরু হয়ে যায়। একসময় উত্তরে বিবেকানন্দ রোড, দক্ষিণে বৌবাজার স্ট্রীট, পূর্বে আপার সার্কুলার রোড, আর পশ্চিমে স্ট্রান্ড রোড ধরলে তার মাঝে কলকাতার যে অংশ হয় সেখানে নরক নেমে আসে। টানা চার দিন ধরে সেই নরকের আগুন জ্বলতে থাকে কলকাতার এখানে সেখানে। মানুষ মানুষকে খুন করল, মেয়েদেরকে ধর্ষণ করল, ঘরে আগুন দিল, লুট করল। যে খুন করল আর যে খুন হল তারা পরস্পরকে হয়তো চিনতও না। তাদের মধ্যে কোনো ব্যক্তিগত রেষারেষি ছিল না। শুধুমাত্র ধর্মীয় পরিচয় বিবেচনা করে এক ধর্মের মানুষ নির্বিকারচিত্তে আরেক ধর্মের মানুষকে খুন করে গেল। যারা খুন করে তাদের কেউ কেউ ঘরে-দোকানে আগুনও লাগায়। শুধু খুন করে এদের হিংসার জ্বালা বোধকরি মেটে না। যারা সুযোগসন্ধানী তারা এই ফাঁকে বাড়িঘর-দোকানপাট লুট করে। যারা খুন করে বা লুট করে তাদের কেউ কেউ ধর্ষণও করে। তাদের উল্লাস শুনলে মনে হয় এক একটা ধর্ষণে তারা বোধকরি খুন বা লুটের চেয়ে বেশি আনন্দ অনুভব করে।

    শনিবার রাতে কারা যেন বা’র বাড়ির দরজায় জোরে জোরে লাথি মারছিল আর দরজা খুলে দেবার জন্য গালাগালি করছিল, কিন্তু তারা কোনো শ্লোগান দিচ্ছিল না। বাড়িতে নাজির খাঁ, তিন-চার জন তাঁর কাজের মানুষ, জাহেরা-মাহিরা এবং ঝি লালুর মা ছাড়া কেউ ছিলেন না। ঝি আগের দিন কাজ করতে এসে দাঙ্গায় আটকা পড়ে গিয়েছিলেন। এমন অবস্থায় ঘরের দরজা খুলে দেবার প্রশ্নই ওঠে না। আক্রমণকারীরা কাঠের গুঁড়ি বা পাথরের মত ভারি কিছু দিয়ে আঘাত করে সদর দরজা ভেঙে ফেলল। মশাল হাতে ভেতরে ঢুকে সব ঘর তছনছ করে খুঁজতে লাগল। জাহেরা-মাহিরা-ঝি ভাঁড়ার ঘরের বড় বড় বস্তা আর বাক্সগুলোর আড়ালে পালালেন। নাজির খাঁ সম্ভবত ছাদ দিয়ে অন্যত্র পালাবার চেষ্টা করছিলেন। নাজির খাঁ’র কাজের মানুষদেরকে বা’র বাড়িতেই পাওয়া গেল এবং মুহূর্তের মধ্যে ছুরি, ভোজালীর আঘাতে তারা মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন। আক্রমণকারীদের কেউ কেউ ছাদে উঠে পড়েছিল, সেখানে তারা নাজির খাঁ’কে আবিষ্কার করে। ‘নেড়ে শালাটাকে পেয়েছি রে!’ বলে তাদের উল্লাস ধ্বনি থেকে বোঝা গেল তারা নাজির খাঁ’কে আগে থেকে চিনত এবং পরিকল্পনা করেই এই বাড়িতে এসেছে। নাজির খাঁ’কে ধরে তারা শোবার ঘরে নিয়ে এসে আলমারী খুলিয়ে টাকাপয়সা লুট করল, তারপর তাঁর বিছানাতেই ফেলে কুপিয়ে টুকরো টুকরো করে ফেলল। এরপর ঘরের যা জিনিসপত্র সহজে নিয়ে যাওয়া যায় তা লুটে নিয়ে গেল। একটা দল খুনোখুনিতে ছিল না, কিছু লুটও করেনি – তাদের লক্ষ্য ছিল ভেতর বাড়ি। প্রতিটি ঘর, রান্না ঘর, বারান্দায় তারা কী যেন খুঁজে শেষে ভাঁড়ার ঘরের ভেতরে জাহেরাদের তিনজনকে আবিষ্কার করে। এইবার এই দলটি ‘নেড়েটার মাগীগুলোকে পেয়ে গেছি রে!’ বলে উল্লাস করে ওঠে। তারা জাহেরাদেরকে টেনে হিঁচড়ে ভেতরের শোবার ঘরে নিয়ে এসে উপর্যুপরি ধর্ষণ শুরু করে। ধর্ষণ কি জিনিস তা জাহেরা বা ঝিয়ের জানা থাকলেও তেরো বছরের মাহিরার অজ্ঞাত ছিল। তাকে ধাক্কা মেরে মাটিতে ফেলে চেপে ধরাতে সে চেঁচাচ্ছিল, কিন্তু প্রথমবার তাকে যখন বিদ্ধ করা হল তখন সে এক অপার্থিব জান্তব চিৎকার দিয়ে উঠল। পাশের খাটে ধর্ষণের শিকার জাহেরা এতক্ষণ সব কিছু সহ্য করছিলেন কিন্তু মাহিরার চিৎকারে তাঁর সহ্যের বাঁধ ভেঙে গেল। তীব্র কণ্ঠে গালাগালি করতে করতে আর অভিশাপ দিতে দিতে তিনি তাঁর উপরে উপগত লোকটিকে আর তাঁর দু’হাত-পা চেপে ধরা লোকগুলোকে ধাক্কা দেবার চেষ্টা করলেন কিন্তু কেউ একজন প্রচণ্ড জোরে তাঁর মুখে কয়েকটি ঘুষি মেরে তাঁর চিৎকার বন্ধ করে দেয়। শীঘ্রই মাহিরার চিৎকার অসহনীয় গোঙানিতে পরিণত হল। ক্রমাগত ধর্ষণ আর আঘাতে জাহেরা নিজেও অচেতন হয়ে পড়েন।

    জাহেরার যখন জ্ঞান ফেরে তখন তিনি দেখতে পান ঝি দেয়ালে হেলান দিয়ে মেঝেতে পা লম্বা করে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। তাঁর গায়ে কোনোরকমে একটা শাড়ি জড়ানো, গলায় মুখে আঘাতের দাগ। তাঁর কাছেই মেঝেতে নগ্ন, রক্তে মাখামাখি অচেতন মাহিরা পড়ে আছে। তার সারা শরীরে আঘাতের চিহ্ন। জাহেরা আস্তে আস্তে উঠে নিজের গায়ের কাপড় ঠিক করেন। ঝি’কে নিয়ে দুজনে মিলে মাহিরাকে তুলে কুয়োতলায় নিয়ে যান। ঝি এক হাড়ি জল গরম করে আনলে তা দিয়ে মাহিরাকে স্নান করিয়ে পরিষ্কার শাড়ি পরান। গায়ে জল পড়তে মাহিরা জ্ঞান ফিরে পায়। চোখ মেলে আম্মা আর ঝিকে দেখতে পেয়ে বুঝতে পারে আপাতত ভয়ের আর কিছু নেই। জাহেরা ভাবলেন, একবার যেহেতু আক্রমণ হয়ে গেছে তাই আবার আক্রমণ হয়তো হবে না, কিন্তু তার নিশ্চয়তাই বা কোথায়! অতএব পরিস্থিতির উন্নতি হওয়া মাত্র কলকাতা ছেড়ে গাঁয়ে ফিরে যেতে হবে। ভাঙা সদর দরজা মেরামত করা যাবে না দেখে তার পাল্লাগুলো সোজা করে আটকে ভাঙাচোরা চেয়ার, টেবিল, খাট দিয়ে সেটা বন্ধ করে দিলেন। আপাতত পেছনের দরজা দিয়ে যাতায়ত করলেই চলবে। ঝি’কে সাথে নিয়ে সারা বাড়ি ঘুরে ভাঙাচোরা জিনিস ফেললেন, পরিষ্কার করলেন। লাশগুলো দাফন করা দরকার, কিন্তু সে কাজ এখন কে করবে! তাই তাঁরা একটা একটা করে লাশ কাপড় পেঁচিয়ে রাতের আঁধারে টেনে নিয়ে পেছনের গলির শেষ প্রান্তে ফেলে দিয়ে আসলেন। জাহেরা কসাই বাড়ির মেয়ে – ছোটোবেলা থেকে রক্ত, মাংস, চর্বি, হাড় নেড়ে বড় হয়েছেন, কিন্তু সেসব তো গরু বা পাঁঠার, মানুষের নয় তাই নাজির খাঁ’র লাশের টুকরোগুলো একসাথ করতে গিয়ে দু’জনেই বমি করে দিলেন। এসব শেষ হলে সারা বাড়ি ক্ষার আর গরম জল দিয়ে ধুলেন। সোমবার ফৌজের লোকজন মাঠে নামাতে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হল। ঝি আর থাকতে চাইলেন না, তিনি চলে গেলেন। বোঝাই যাচ্ছিল তিনি আর কখনো এই বাড়িতে ফিরে আসবেন না। 

    আততায়ীর দল নাজির খাঁ’র ঘরে থাকা টাকার বড় অংশ লুটে নিতে পারলেও সেটাই সব ছিল না। একটা গুদাম ঘরে পুরনো আসবাবপত্র, আর সচরাচর দরকার হয় না এমনসব জিনিস তালাবদ্ধ করে রাখা হতো। সেই ঘরের ভেতরে একটা চোরা কুঠুরিতে একটা সাবেকী আমলের লোহার সিন্দুক রাখা ছিল। তাতে অল্প কিছু নগদ টাকা, আর বেশ কিছু সোনার গয়না রাখা ছিল। নাজির খাঁ বলতেন, 
    “মাটি খাঁটি
    সোনায় আধা
    কাপড়চোপড়ে গাধা”
    (অর্থাৎ, জমিতে বিনিয়োগ উৎকৃষ্ট, স্বর্ণে বিনিয়োগ করলে মুনাফা অর্ধেক, আর পোশাকে ব্যয় করলে তা সমুদয় নষ্ট।)

    নাজির খাঁ মাটিতে কোথায় বিনিয়োগ করেছিলেন সেটা জাহেরার জানা না থাকলেও এই সোনার গয়নাগুলোর হদিস তিনি জানতেন। একদিন তিনি নাজির খাঁ’কে শোবার ঘরের দেয়ালের তাকে রাখা একটা চীনেমাটির সোরাহীর ভেতর থেকে একছড়া চাবি বের করে ঐ ঘরে ঢুকতে দেখেছিলেন। কৌতুহলবশত তিনি দরজার ফাঁক দিয়ে উঁকি দিয়ে নাজির খাঁকে সিন্দুকের ভেতর থেকে একটা মখমলের থলে বের করে তাতে কিছু গয়না রাখতে দেখেছিলেন। অন্যের সম্পদের ওপর জাহেরার লোভ কখনোই ছিল না, তাঁর মেয়েদেরও কখনো হাত টানের স্বভাব নেই, কিন্তু আজ তাঁর পক্ষে নাজির খাঁ’র টাকাপয়সা গয়না নেয়া ছাড়া বাঁচার উপায় নেই। জাহেরা ভাবলেন, নাজির খাঁ’র ফেলে যাওয়া সম্পদের ওয়ারিশান তাঁর স্ত্রী-সন্তানেরা, কিন্তু তাঁরা কারা বা কোথায় থাকেন সেটা কেউ জানেন না। তাছাড়া এক অর্থে জাহেরা কি তাঁর স্ত্রী নয়? না হয় মৌলভী ডেকে তাঁদের শাদী পড়ানো হয়নি কিন্তু তাঁরা তো স্বামী-স্ত্রী’র মতই ছিলেন। সে’হিসাবে নাজির খাঁ মারা যাবার পরে তাঁর সম্পদে জাহেরার হক্ব আছে বৈকি। অন্য কেউ চলে আসার আগে জাহেরা সিন্দুকটা খুলে টাকাপয়সা আর গয়নার থলেটা বের করে নিজের জিনিসপত্রের ভেতর লুকিয়ে ফেললেন।

    শুক্রবারে শুরু হওয়া দাঙ্গা আসলে সোমবারে পুরোপুরি শেষ হয়নি। ঐ চারটা দিনের পরেও নানা জায়গায় বিচ্ছিন্নভাবে হামলা চলেছে। ১৩৫৪ সনের শ্রাবণ মাসে যখন সত্যি সত্যি দেশ ভাগ হয়, বাংলার পূর্ব অংশ এত দিনের আলোচনার পাকিস্তানের অংশ হয়ে যায় তখনও ঐ দাঙ্গার রেশ চলেছে। পুলিশের খাতায় তার কোনোটা ডাকাতি, কোনোটা ব্যক্তিগত বা পারিবারিক রেষারেষি, কোনোটা পাড়াতো সংঘর্ষ হিসাবে লিপিবদ্ধ হলেও আসলে ঐসব খুনোখুনি-লুটপাট-ধর্ষণ সবই ছিল এক অনিঃশেষ দাঙ্গার ধারাবাহিকতা। অবিশ্বাস আর ঘৃণার ফল্গুধারা কখনো নিঃশেষিত হয় না, ভাঙা সম্পর্ক আর কখনো জোড়া লাগে না। এসবে রেশ চলছে দশকের পর দশক ধরে।

    দাঙ্গার প্রকোপ কমতে জাহেরা দিন চালানোর বাস্তব সমস্যায় পড়লেন। এই বাড়িতে তিনি এখন আছেন বটে কিন্তু কতদিন থাকতে পারবেন তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। বাড়িটার মালিক নাজির খাঁ’ই ছিলেন কিনা তাও জানা নেই। এখানে থাকা গেলেও আয়ের কোনো সংস্থান নেই। নাজির খাঁ’র ব্যাবসাপত্র মূলত চোরাচালান সংশ্লিষ্ট বলে তাঁর মৃত্যুর সাথে সাথে সেসবও শেষ হয়ে গেছে। তাছাড়া জাহেরার পক্ষে বাড়ির বাইরে গিয়ে বাজারহাট করার উপায়ও নেই। এটা গাঁ নয়, কলকাতা শহর – এখানকার তেমন কিছু তিনি চেনেন না। মড়ার গন্ধে ভাগাড়ে যেমন শকুন এসে হাজির হয়, তেমন কোথা থেকে নাজির খাঁ খুন হবার সংবাদ পেয়ে হাবিব লস্কর এসে হাজির হলেন। হাবিব আশা করেছিলেন নাজির খাঁ’র ঘরে নিশ্চয়ই অনেক টাকাপয়সা ছিল যা জাহেরা হাতাতে পেরেছেন, কিন্তু জাহেরা জানালেন খুন করার আগে আততায়ীর দল নাজির খাঁ’কে দিয়ে সিন্দুক খুলিয়ে সবকিছু নিয়ে গেছে। এই কথায় হাবিব আশাহত হলেন। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে হাবিব জিজ্ঞেস করলেন,
    - তোমরা পালাতে পেরেছিলে তো?

    এই প্রশ্নের আসল মানে কী সেটা জাহেরা বোঝেন। তিনি আগেই ঠিক করেছিলেন মেয়েসহ তাঁর ধর্ষিতা হবার কথাটি কাউকে জানাবেন না। মেয়েকেও এই ব্যাপারে পই পই করে বুঝিয়ে বলেছেন – এসবের কথা লোকে জানলে তোর আর বিয়ে হবে না, লোকে খারাপ পাড়ায় নিয়ে বেচে দেবে। জাহেরা জানেন এই অন্যায় ও পাশবিকতার কোনো দিন বিচার হবে না, ধর্ষণকারীরা অপরিচিত বলে কোনো প্রতিশোধ নেবারও উপায় নেই, তাই হাবিবের প্রশ্নের উত্তরে তিনি কায়দা করে বললেন,
    - পালাতে না পারলে এতক্ষণ কি বেঁচে থাকতাম?
    - কোথায় পালিয়েছিলে?
    - পেছনের দোর দিয়ে বের হয়ে গলির শেষ মাথার বাড়ির পেছনের নালায় এক রাত লুকিয়ে ছিলাম।
    - তাহলে এখন কী করবে?
    - জানি না কী করব। তবে এখানে আর থাকা চলবে না। জান বাঁচানোর জন্য গাঁয়ে ফিরে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই।
    - আগে তো বলেছিলে সেখানে বেড়াতে যাবারও উপায় নেই।
    - সেদিন আর আজ এক নয়। একসময় গাঁয়ে পেটের ভাত জোটানোর উপায় ছিল না বলে কলকাতা এসেছিলাম। গাঁয়ে এখনো ভাত জোতানোর উপায় নেই, কিন্তু এখান কলকাতা থাকলে স্রেফ মারা পড়তে হবে।
    - গাঁয়ে না হয় নিজের ভিটেয় থাকলে, কিন্তু খাবে কী?
    - পাটকরুনি ঝি হব, ঘুঁটে কুড়োব, শুকনো ডালপালা কুড়োব, মাঠের ধান কুড়োব, শাক তুলব, ফল-ফুল কুড়োব, হাতপাখা বানাব, মাদুর বুনব, দরকার পড়লে ভিক্ষে করব – মোটকথা যা পারি তাই করব। আমাদের দুটো মানুষের একবেলার ভাত জুটে যাবে।

    ১৩৫৩ সনের ভাদ্র মাসের এক ভোরে ওয়াটগঞ্জ থেকে রওনা দিয়ে প্রথমে পায়ে হেঁটে তারপরে দইঘাট দিয়ে নদী পাড় হয়ে আবার হেঁটে হাবিবের সাথে জাহেরা আর মাহিরা দুপুরের আগে মুন্সীডাঙ্গা এসে পৌঁছায়।





    তিন বছর পরে বাড়ি ফিরে দেখা গেল জাহেরাদের বাড়ি আর আগের মত নেই। ঢোকার মুখের গোয়ালঘরটা তুলে দিয়ে সেখানে ঘর তুলে কারা যেন থাকে। জাহেরাদের মূল ঘরটাতে আরেকটি পরিবার থাকে। পেছনের রান্নাঘরটাকে দু’ভাগ করে দুই পরিবারকে দেয়া হয়েছে। কেবল কুয়োতলা আর পায়খানা আগের মত আছে। জাহেরা সোজা ইয়াকুব শেখের ঘরে গিয়ে তাঁকে জিজ্ঞেস করেন,
    - কাকা! এসব কী?
    - এসব কী মানে?
    - আমাদের ঘরে এরা কারা থাকে? গোয়ালঘর তুলে দিয়ে সেখানে ঘর তুলল কে? রান্নাঘরই বা দুভাগ করল কে?
    - তোমাদের ঘর মানে? এই বাড়িঘর তোমাদের হয় কী করে?
    - এসব কী বলছেন? আমরা কলকাতাতে যাবার আগে বাড়িঘর আপনার জিম্মায় দিয়ে গেলাম।
    - মিথ্যে কথা বলছ কেন? কলকাতা যাবার আগে তুমি জমিসহ বাড়িঘর আমার কাছে নগদ দুইশ’ টাকায় বেচে গেছো।
    - কাকা এসব কী বলছেন? আমি আবার টাকা নিলাম কখন!
    - এখন অস্বীকার করলে তো হবে না, পাড়ার লোকে সাক্ষী আছে। ডাকো ওসমান আর রহমতকে। জিজ্ঞেস করে দেখো তাদেরকে।

    জাহেরা বুঝলেন ইয়াকুব শেখ যা কিছু করেছেন সব আঁটঘাট বেঁধেই করেছেন, সাথে প্রতিবেশী ওসমান আর রহমতকে দলে ভিড়িয়েছেন। এখানে চেঁচামেচি করে কোনো লাভ হবে না। মাহিরাকে নিয়ে জাহেরা আলীর দাদীর সন্ধানে যান। তিনি প্রভাবশালী মানুষ, হয়তো তিনি একটা উপায় করতে পারবেন। সরদারপাড়ায় আলীদের বাড়িতে গিয়ে জাহেরা অবাক হয়ে দেখেন ওদের বাড়িঘরগুলো আগের মত নেই। জানা গেল জাহেরারা মুন্সীডাঙ্গা ছাড়ার অল্প কিছু দিন পরেই ওলাউঠায় আলীর দাদী ইন্তেকাল করেছেন। শরীকদের মধ্যে বাড়ি ভাগাভাগি হয়ে গেছে। কারো কাছে আশ্রয় না পেয়ে আলীকে নিয়ে তার মা মালেকা নিজের বাপের বাড়ি পদ্মপুকুরে চলে গেছেন। এই উপায়টুকুও না থাকায় জাহেরা ভাবলেন, পরে তহসিল অফিসে গিয়ে এই জমির দলিল-পর্চা খুঁজে বের করে দেখতে হবে সিএস খতিয়ানে কার নাম লেখা আছে। দেখতে হবে ইয়াকুব শেখ খতিয়ান পালটে নিজের নামে নামজারী করে ফেলেছেন কিনা। কাজগুলো সহজ নয়, সময়সাপেক্ষ এবং ব্যয়সাপেক্ষ। জাহেরার একার পক্ষে এগুলো করা সম্ভব না। বেলডুবি গিয়ে ভাইদেরকে বলে দেখতে হবে তাঁদের কেউ দৌড়াদৌড়ি করতে রাজি হবেন কিনা। 

    মুন্সীডাঙ্গাতে জাহেরাদের ঠাঁই না হওয়াতে হাবিব বেশ চিন্তায় পড়ে গেলেন, কারণ তাঁর নিজের বাড়ি বুড়িখালীতে জাহেরাদেরকে নিয়ে ওঠা যাবে না। চিন্তিত হাবিবকে জাহেরা নিজেই সমাধান জানান,
    - দাদা, চলো বেলডুবিতে আমাদের বাড়িতে যাই। আমার ভাইয়েরা একেবারে তাড়িয়ে দেবেন বলে মনে হয় না। পরে তাঁদের সাথে কথা বলে দেখি এখানকার বাড়িঘর উদ্ধার করা যায় কিনা।
    - হ্যাঁ, বেলডুবিতে যাওয়াই ঠিক হবে। এখানে আর সময় নষ্ট না করে চলো পা চালিয়ে দেই।
    বেলডুবিতে পৌঁছাতে পৌঁছাতে তাঁদের প্রায় সন্ধ্যা হয়ে গেল। গাঁয়ে ঢোকার আগে জাহেরা হাবিবকে বললেন,
    - দাদা! তুমি আর আমাদের সাথে এসো না। আমার ভাইয়েরা তোমাকে ঠিক পছন্দ করেন না। তোমার সাথে এসেছি দেখতে পেলে রাগ করবেন।

    জাহেরার তিন ভাই করিম, গফুর আর খলিল যে হাবিবকে খুবই অপছন্দ করেন সেটা হাবিবও জানেন। তার কিছুটা জাহেরার প্রতি হাবিবের আগ্রহের কারণে আর কিছুটা নানাকালীন সম্পত্তির ভাগাভাগি নিয়ে। তিন ভাইয়েরই ধারণা হাবিব একটা জোচ্চোর, লম্পট। জমিজমার ভাগে তাঁদেরকে তো ঠকিয়েছেই আবার বিয়ে হয়ে যাবার পরেও তাঁদের বোনের সাথে ঘেঁষাঘেষি করে। তাই হাবিব দ্বিরুক্তি না করে জাহেরাদেরকে বেলডুবিতে রেখে বুড়িখালীর পথে চলে যান। জাহেরার ভাইয়েরা এক কালে কসাইয়ের কাজই করতেন, কিন্তু অবস্থা পড়ে যাওয়ায় এখন দিনমজুরি করেন, নিজেরা কৃষিকাজ ভালো জানেন না বলে যে সামান্য জমি আছে সেটা কৃষকদের কাছে বর্গা দেন। বাচ্চাসহ বোনকে আশ্রয় দেয়া তাঁদের পক্ষে সম্ভব না, কিন্তু জাহেরার এছাড়া আর যাবার কোনো জায়গা নেই। ভাইয়েরা ঠাঁই না দিলে বেলডুবিতেই কোথাও ঝুপড়ি বানিয়ে থাকতে হবে।

    পোঁটলাপুঁটলি আর মেয়েকে নিয়ে জাহেরাকে বাপের বাড়িতে হাজির হতে দেখে খলিলের স্ত্রী ফরিদা চেঁচিয়ে উঠলেন,
    - বলি বিবি সাহেব, কলকাতার নাগরের কোল ছেড়ে এই ভিখিরিদের বাড়িতে কী মনে করে আসলেন? তাও আবার আণ্ডাবাচ্চাসমেত!
    - চেঁচিও না ভাবী। এটা আমার বাপের বাড়ি। এখানে আমি আসতেই পারি। আর কলকাতায় ঝিগিরি করতাম, বেশ্যাগিরি না।
    - তা বড় মেয়েকে কোথায় রেখে এসেছ? কলকাতায়? নাকি মেয়ে কোনো নাগরের সাথে ভেগেছে?
    বাঁ হাতে পোঁটলা আর ডান হাতে মাহিরার মুখ চেপে ধরে জাহেরা বললেন,
    - মেয়েদের বাপ খুন হল পরে কেউ দেখতে যাওনি। আমাদের কী হাল হল সেটার খোঁজ নাওনি। আকালে বড় মেয়েটা ভেদবমি হয়ে মরলো সে খবরও রাখো না। রায়টে বাড়ির মালিক খুন হল বলে চলে আসতে হল।
    দুই পক্ষের ঊঁচু গলার কথায় বাড়ির ভেতর থেকে ভাইয়েরা আর তাদের বাচ্চারা বের হয়ে আসলেন। ঝগড়া আপাতত স্থগিত হল, জাহেরা-মাহিরাও আপাতত পুরনো গোয়ালঘর, যেটা এখন ঢেঁকিঘর হয়েছে সেখানে ঠাঁই পেলেন।

    ভাইদের বাড়িতে যে কেউ তাঁকে বসিয়ে খাওয়াবে না সেটা জাহেরা বিলক্ষণ জানতেন। আপাতত মাথা গোঁজার একটা ঠাঁই হলে চলবে। সেটার যখন একরকম ব্যবস্থা হয়েছে তখন বাকিটা তিনি নিজে বন্দোবস্ত করবেন। সমস্যা হচ্ছে মাহিরাকে নিয়ে। এই বয়সী মেয়েকে চোখে চোখে না রাখলে বিপদ। রায়টের সময় একটা সর্বনাশ হয়ে গেছে, অমন কিছু আর হতে দেয়া যাবে না। ঢেঁকিঘরে একটা ঢেঁকি আছে বটে তবে বর্গা জমির সামান্য ধান ভানা ছাড়া সেটার ব্যবহার খুব কম। ছোটোখাট কাজকর্ম যাঁতা, হামানদিস্তা বা শিলপাটাতেই সারা যায়। কখনো সখনো প্রতিবেশী কেউ এসে তাঁদের ধান ভাঙিয়ে নিয়ে যান। জাহেরা ভাবলেন ঢেঁকিটাকে কাজে লাগানো যাক। গ্রামের বাড়ি বাড়ি ঘুরে লোকের ধান বা চাল এনে এটা দিয়ে ভাঙিয়ে আয় করবেন, তবে এই কাজটা নিয়মিত পাওয়া যাবে না। এমনিতেই গাঁয়ে পাটকরুনি ঝিয়ের কাজ কম, আকাল বলে সেটার প্রয়োজন আরও কমেছে। ঘুঁটে, শুকনো ডালপালা, ফুল কুড়োনো যেতে পারে তবে সেসব বেচা যায় না। জ্বালানী জোগাড় করলে সেটা ভাইয়ের বৌয়েরা নিয়ে যাবে। শাক তুললে, মাঠের ধান বা ফল কুড়োলে নিজেরা খাওয়া যাবে, তবে সেসব মেলে খুব কম, আর অনেক ছেলে-বুড়োও সেসব কুড়োয়। হাতপাখা বা টুকরি বানিয়ে, মাদুর বুনে অল্পস্বল্প আয় করা যায় বটে তবে জাহেরা ওসব কাজ বিশেষ পারেন না। জাহেরার ইচ্ছে একটা ‘ঊষা’র হাত সেলাই মেশিন কিনে টুকটাক সেলাইয়ের কাজ করার। মুন্সীডাঙ্গা থাকতে সরদার পাড়ার মান্নাফ দাদার বৌকে হাত মেশিন চালাতে দেখে তখন তারও খুব ইচ্ছে করতো অমন মেশিন কেনার। তাহলে টুকরোটাকরা কাপড় দিয়ে মেয়েদেরকে সুন্দর সুন্দর জামা বানিয়ে দেয়া যেত। তখন একে তো মেশিন কেনার মত অত টাকা কখনো হাতে থাকতো না, তার ওপর রুস্তমের আবার মেশিনে সেলাই ফোঁড়াই পছন্দ ছিল না। তার কথা, আমরা কি খলিফা নাকি যে কাপড় সেলাই করবো! আমাদের কাজ কারবার গরু-পাঁঠা-মাংস-হাড়-চর্বি নিয়ে। রুস্তম পছন্দ না করলেও এখন জাহেরার সেলাই-ফোঁড়াইয়ের মত কাজ করা আবশ্যক, তাছাড়া এখন সেলাই মেশিন কেনার মত টাকা হাতে আছে।

    জাহেরার অবশ্য আরও একটা পরিকল্পনা আছে। তাঁর ইচ্ছে গাঁয়ে না থেকে ওয়াটগঞ্জে ফিরে যাওয়ার। তিনি সেখানে খারাপ পাড়ার কাছে মেয়েদেরকে দোকান চালাতে দেখেছেন। ফুল বা পান বা শরবত বা তামাকের দোকান দেয়া যায়। তিনি ভালো কাবাব, নিহারী, পায়া বানাতে পারেন। কাবাবের দোকান দিতে টাকা একটু বেশি লাগবে, তবে একবার দোকান দিতে পারলে অবস্থা ফিরতে সময় লাগবে না। ভদ্র পাড়ায় মেয়েরা কাবাবের দোকান দিতে পারবে না তবে খারাপ পাড়ার কাছে দেয়া যাবে। কলকাতায় নিজামের কাবাব চললে জাহেরার কাবাবও চলতে পারে। তাছাড়া তাঁর মনের গভীরে একটা ভাবনা অহর্নিশ জ্বলতে থাকে – সায়েরা এখন কোথায়? ঘরের ভেতর থেকে জোয়ান মেয়ে চুরি করে নিয়ে যাওয়া সহজ ব্যাপার নয়। এখানে স্পষ্টতই নাজির খাঁ’র হাত ছিল, যদিও সেটা প্রমাণ করার উপায় নেই। যারা ঘর থেকে মেয়ে চুরি করে নিয়ে যায় তারা সেই মেয়েকে কী করে সেটা বোঝার জন্য পণ্ডিত হতে হয় না। জাহেরার ইচ্ছে কলকাতার সব খারাপ পাড়াতে খুঁজে খুঁজে দেখবেন যদি তাঁর কলিজার টুকরার সন্ধান পাওয়া যায়। তাহলে সেই পাড়ার বাইরে তিনি দোকান দিয়ে বসবেন আর উপায় খুঁজবেন কী করে মেয়েকে সেই নরক থেকে উদ্ধার করা যায়।

    মৃত পিতামাতার সম্পত্তিতে মুসলমান নারীর তাঁর ভাইয়ের অর্ধেক পরিমাণ অধিকার থাকলেও বাস্তবে খুব বেশি জন সেই ভাগ পান না, আর পেলেও দেখা যায় যেসব জমির কাগজপত্র নিয়ে সবচেয়ে বেশি ভেজাল আছে, অথবা ফসল হয় না এমন বন্ধ্যা জমি বোনকে দেয়া হচ্ছে। করিম, গফুর বা খলিল কারোরই জাহেরাকে পৈত্রিক সম্পত্তির ভাগ দেবার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে ছিল না। তাঁদের মতে, মেয়ে নিয়ে জাহেরাকে যে ঢেঁকিঘরে থাকতে দেয়া হয়েছে সেটাই ঢেড়। তাঁদের স্ত্রীরা মাহিরাকে উদয়াস্ত খাটিয়ে আশ্রয়ের ব্যাপারটি ওসুল করেন, এবং সে’কথা তাঁরা সামনাসামনিই বলেন। জাহেরার সেলাই মেশিন কেনা হয়নি একটা কথা ভেবে। তিনি যদি সেলাই মেশিন কেনেন তাহলে তাঁর ভাই আর ভাইয়ের বৌয়েরা ভাববেন জাহেরা কলকাতা থেকে অনেক টাকা নিয়ে এসেছেন। তখন তাঁরা টাকার জন্য জাহেরার জীবন অতিষ্ঠ করে তুলবেন, নিরাপত্তাও আর থাকবে না। তাই জাহেরা ঢেঁকি পাড় দিয়ে, এটাসেটা কুড়িয়ে, কাঁথা আর টুকটাক কিছু হাতে সেলাই করে বহু কষ্টে মেয়েকে নিয়ে টিকে থাকার চেষ্টা করতে লাগলেন।

    যে রাতে নাজির খাঁ খুন হন সেই রাতের কথা মাহিরা বা জাহেরা কেউই ভুলতে পারেননি – ভুলতে পারার কথাও না। প্রায় রাতে মাহিরা ঘুমের ঘোরে “না! না! না!” বলে চিৎকার করে ওঠে। জাহেরা তাকে দু’হাতে সাপটে ধরে নিজের বুকের সাথে চেপে রাখেন। কানে কানে ফিসফিসিয়ে বলেন, “আর ভয় নেই মা! আর ভয় নেই”। মেয়েকে জাহেরা যা বলেই সান্ত্বনা দেন না কেন, তিনি নিজে মনে করেন ভয়ের দিন আসলে শুরু হয়েছে কেবল। মানুষের ভেতরে যে ঘৃণা, অবিশ্বাস, ক্রোধ আর হিংসা দেখেছেন সেসবের আগুন সহসা নেভার কথা না। সে আগুন কবে এবং কীভাবে আবার জ্বলে উঠবে সেটা তিনি জানেন না। তবে সেটা যে জ্বলবেই এই ব্যাপারে তাঁর সন্দেহ নেই। জাহেরার খুব ইচ্ছে করে এমন কোথাও পালিয়ে যেতে যেখানে তিনি মেয়েকে নিয়ে স্বাধীনভাবে, মর্যাদার সাথে বাঁচতে পারবেন। যেখানে তাঁদেরকে অনাহারে থাকতে হবে না, ধর্ষিতা হতে হবে না, অন্যের করুণায় বাঁচতে হবে না। ছোটোবেলা থেকে শুনে আসছেন উত্তর-পূর্বে কামরূপ-কামাখ্যা বলে এক দেশ আছে যেখানে মেয়েরা নিজের ঘরে-বাইরে স্বাধীনমত চলতে পারেন, যে কাজ ইচ্ছে সেই কাজ করতে পারেন, যখন যেখানে খুশি তখন সেখানে যেতে পারেন। পুরুষরা নাকি সেখানে মেয়েদের ভেড়া হয়ে থাকেন। দুনিয়াতে আসলেই অমন কোনো দেশ আছে কিনা কে জানে! তবে থাকলে সেখানে চলে যাওয়াটাই ভালো হতো।

    ১৩৫৪ সনের জৈষ্ঠ্য মাস থেকে চারদিকে জোর আলাপ ওঠে আজাদী আসছেই তবে দেশ হিন্দুস্তান আর পাকিস্তানে ভাগ হবে। হিন্দুস্তান থেকে সব মুসলমানকে নাকি পাকিস্তানে তাড়িয়ে দেয়া হবে হবে, আর পাকিস্তানের হিন্দুদেরকে হিন্দুস্তানে। কলকাতা হিন্দুস্তান হবে নাকি পাকিস্তান হবে এটা নিয়ে দফায় দফায় নানা রকমের কথা শোনা গেলেও হাওড়া যে হিন্দুস্তানেই থাকবে তাতে কোনো সন্দেহ থাকে না যদি না গোটা বাংলাই পাকিস্তান হয়ে যায়। হাওড়া হিন্দুস্তান হলে জাহেরারা, তাঁর ভাইয়েরা, আত্মীয়-পরিজনেরা কোথায় যাবেন? ঢাকা, চাটগাঁ, মৈমনসিং-এর নামই কেবল তাঁদের শোনা; সেসব দেশে তাঁদের কেউ কখনো যাননি। মুসলমানদের একাংশ বলতে লাগলেন, মুসলমানদের পাকিস্তানে চলে যাওয়টাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। সেখানে মুসলমানদের সরকার হবে, ফলে সব সরকারী চাকুরী আর বরাদ্দ মুসলমানরা পাবে। আর হিন্দুস্তানে পড়ে থাকলে হিন্দুদের গোলামী করতে হবে, কোনো চাকুরী পাবে না। হিন্দুদের কেউ কেউও বলা শুরু করলেন, সময় থাকতে মুসলমানদের উচিত এখানকার জমিজমা ছেড়ে দিয়ে ঢাকা, চাটগাঁ, মৈমনসিং-এ চলে যাওয়া। আগেভাগে পাকিস্তানে চলে গেলে সেখানকার ভালো ভালো জমির ভাগ পাবে, ভালো চাকুরী মিলবে। এই সময়ে একসাথে কয়েকটা দল খুব তৎপর হয়ে উঠল। একটা দল গাঁয়ে গাঁয়ে মুসলমানদেরকে লোভ দেখাতে লাগল পাকিস্তানে মানে ঢাকা, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রামে চলে গেলে কত লাভ! এখানকার জমি ওখানকার জমির সাথে বদলাবদলি করলে বেশি জমি পাওয়া যাবে। এখানকার জমি বিক্রি করলে যে টাকা পাওয়া যাবে তা দিয়ে পাকিস্তানে দ্বিগুণ জমি কেনা যাবে। পাকিস্তানে গেলেই সরকারী চাকুরি মিলবে, নানা সুযোগ সুবিধা মিলবে ইত্যাদি। ঠিক এখনই এসব করার দরকার নেই তবে প্রস্তুতি নিয়ে রাখা ভালো, তাতে পাকিস্তান ঘোষণা হলে দ্রুত, সহজে ওখানে গিয়ে থিতু হওয়া যাবে। আরেক দল কোনো লোভ দেখানোর পথে গেল না। তারা সরাসরি গাঁয়ে গাঁয়ে মুসলমানদেরকে জানাতে লাগল, পাকিস্তান হয়ে গেলে কোনো মুসলমানের আর হিন্দুস্তানে থাকার অধিকার থাকবে না। সুতরাং হয় সময় থাকতে তাদেরকে যে দাম বলা হবে সেই দামে বাড়িঘর-জমিজিরেত বেচে দিয়ে ওদিকে চলে যেতে হবে, নয়তো একবার পাকিস্তান ঘোষণা হয়ে গেলে তখন আর মুসলমানদের কাছ থেকে কিছু কেনা হবে না – তাদেরকে স্রেফ গলাধাক্কা দিয়ে হিন্দুস্তান থেকে বের করে দেয়া হবে।

    জাহেরার ভাইদের কাছে দুটি দলই আসে। প্রথম দল তাঁদেরকে জানায় এখানকার গাঁয়ের বাড়িঘর-জমিজিরেত দিলে ঢাকার কসাইটুলিতে বাড়ি আর মাংসের দোকান দেয়া হবে। সেখানে একবার যেতে পারলেই হল, তখন করিম-গফুর-খলিলরা নিজেদের পৈত্রিক ব্যাবসা করে আরামে দিন কাটাতে পারবে। এই দলের কথায় করিমরা একটু বিভ্রান্ত হয়ে যায়। স্থাবর সব কিছু ছেড়ে দিয়ে সপরিবারে অজানা দেশে যেতে ভয় হয়। আবার মনে হয় এখানেও খেয়ে-না খেয়ে থাকতে হচ্ছে ওখানে এরচেয়ে খারাপ আর কী হবে! বরং নিজের জাত-ধর্মের মানুষদের সাথে থাকতে পারলে একটু নিরাপদ থাকা যাবে। গ্রামের বদলে শহরে থাকলে কাজ পাওয়ারও সুবিধা হবার কথা। দ্বিতীয় দলটি একটু ঠারেঠোরে যে কথা বোঝায় তা হচ্ছে, গরু কাটা মুসলমান কসাইদের ওপরে এখানকার লোকজনের বেশ রাগ আছে। এসব নিচু জাতের লোকজন যদি থেকে যায় তাহলে দেশ আজাদ করে বাঙালী ভদ্রলোকদের কী লাভ হবে! এইসব পাপিষ্ঠ, নেড়েদেরকে হিন্দুস্তানে ঠাঁই দেয়া ঠিক হবে না। ভালো কথায় এরা পাকিস্তানে চলে না গেলে এদেরকে মেরেধরে তাড়িয়ে দেয়া উচিত হবে। যারা বলেন, পাকিস্তান যাই হোক হিন্দুস্তান সব ধর্মের মানুষের দেশ হবে তাঁরা এত ক্ষীণকণ্ঠ যে করিমরা তাঁদের কথায় ভরসা পান না। তাঁরা ভাবেন, আপাতত যেমন আছে তেমন চলুক, আজাদী চলে আসলে তখন দেখা যাবে কী করা যায়। এমন দোলাচল, হাজারো রকমের আলোচনা, লক্ষ রকমের মতামত, আশা-আশ্বাস-স্বপ্ন, হতাশা-হুমকি-ত্রাসের মাঝে ১৩৫৪ সনের শ্রাবণ মাসে দেশ আজাদ হয়ে যায়।

    দেশ যে আজাদ হয়ে গেল সেটা মাহিরা দূরে থাক জাহেরা পর্যন্ত ধরতে পারেন না। সব কিছু তো আগের মতই আছে। দেশটা তো আগেও হিন্দুস্তান ছিল, এখনো তাই আছে। দেশ চালানো সায়েবদেরকে আগে বিশেষ একটা দেখা যেত না এখন কারা দেশ চালায় সেটা বোঝা যায় না। আগের মতই যাবতীয় দাপট পুলিশ-দারোগা-সেপাই-তহসিলদার-সাব রেজিষ্ট্রার-কালেক্টরদের। অবশ্য এখন তার সাথে কংগ্রেস-মহাসভার নেতাকর্মীদের দাপট বেড়েছে। মুসলিম লীগের লোকজন পালাতে শুরু করেছে। দেশ-গ্রাম থেকে খুব বেশি মুসলমান পরিবার যে চলে যেতে শুরু করেছে তা নয় তবে আস্থার অভাব, অনিশ্চয়তা, চাপা ভয় সবাইকে কুরে কুরে খাচ্ছে। এর মধ্যে আশেপাশের নলপুর, খেজাপুর, বেলকুলাই, ঘোষালচকে কয়েকজন মুসলমান খুন হয়ে গেলেন। একটু ভালোভাবে লক্ষ করলে বোঝা যায় খুনগুলো তাঁদেরকেই করা হয়েছে যাদের অবর্তমানে তাঁদের জায়গা-সম্পত্তি দখল করা সহজ হবে। ওসব সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার প্রতিক্রিয়া বা ফল নয়, সাম্প্রদায়িক সংখ্যালঘুদেরকে বাগে পেলে সংখ্যাগুরুদের কারো কারো আচরণ কেমন হতে পারে তার নমুনা মাত্র। এমন এক একটা ঘটনা সংখ্যালঘুদের মধ্যে যে আতঙ্ক ছড়ায় সেটাই হচ্ছে লক্ষ্য। তখন তিল ঘটনা মুখে মুখে তাল হয়ে যায়। করিমরা ভাইয়েরা ভাইয়েরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করেন, পড়শিদের সাথে পরামর্শ করেন, কিন্তু স্থির করতে পারেন না কী করবেন। যে আড়কাঠি ঢাকার কসাইটুলিতে বাড়ি আর দোকান দেবার কথা বলেছিলেন তাঁর সন্ধান পাওয়া যায় না। নতুন এক আড়কাঠি আসেন, তিনি বলেন তাড়াতাড়ি ঢাকায় গিয়ে পাকিস্তানের সরকারী খাতায় মুহাজির হিসেবে নাম লেখাতে পারলেই থাকার জমি আর কাজ মিলবে। তবে যাতায়ত খরচ আর সরকারী আপিসের খরচ হিসেবে বেশ কিছু নগদ দিতে হবে। হাতে নগদ না থাকলে এখানকার জমি বা সোনার গয়না দিলেও হবে। করিমরা নিজেরা আবারও পরামর্শে বসেন। এই দফা খলিল দ্বিধা ঝেড়ে ফেলেন। তিনি ঘোষণা দিলেন, আর কেউ যাক বা না যাক তিনি সপরিবারে পাকিস্তানে চলে যাবেন। সেখানকার লোকজন তো বাংলা ভাষাতেই কথা বলেন, বেশিরভাগ জন আবার মুসলমান – তাহলে এতো ভাবার কী আছে! এদেশে থাকলেও নিত্য অভাবের সাথে লড়াই করতে হবে। তারচেয়ে ঐ দেশে একবার ভাগ্যটা যাচাই করা যাক। অবস্থা বেশি বেগতিক দেখলে আবার দেশে ফিরে আসা যাবে। এখন করিম, গফুর আর জাহেরা তাঁদের পরিবার নিয়ে খলিলের সাথে যাবেন কিনা সেটা তাঁদের ব্যাপার।



    ক্রমশ...

    ওয়ারিশান = উত্তরাধিকার
    হক্ব = অধিকার
    শরীক = উত্তরাধিকারী
    নানাকালীন সম্পত্তি = মৃত মাতামহের সম্পত্তিতে মায়ের অংশ
    খলিফা = দর্জি
    ওসুল = পরিশোধ


  • ধারাবাহিক | ১৭ ডিসেম্বর ২০২২ | ৩০৮ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • | ২২ ডিসেম্বর ২০২২ ১৭:৪২514786
  • প্রায় একই গল্প শুধু বিপরীত দর্পণে। 
  • aranya | 2601:84:4600:5410:5ded:86a6:8679:d818 | ২৩ ডিসেম্বর ২০২২ ০২:১৮514798
  • আগ্রহের সাথে পড়ছি। কষ্টের, কিন্তু জরুরী লেখা 
  • ষষ্ঠ পাণ্ডব | 103.98.204.123 | ২৪ ডিসেম্বর ২০২২ ১২:২১514822
  • @দঃ
     
    আসলে দর্পণটাও এক - যদি মানুষগুলোকে ধর্মীয় বা পূর্ব-পশ্চিম দিক দিয়ে বিবেচনা না করি। এই প্রান্তিক জনগোষ্ঠী সব জায়গাতেই এমন বার বার মার খায়, উদ্বাস্তু হয়। 
  • ষষ্ঠ পাণ্ডব | 103.98.204.123 | ২৪ ডিসেম্বর ২০২২ ১২:২৩514823
  • @aranya :
     
    ধন্যবাদ। সারা জীবন কষ্ট করা এই মানুষগুলোর নির্বন্ধ। উদ্বাস্তু হয়ে অন্য ভূমিতে গেলেও এদের কষ্ট, অপমানের কোন হ্রাস হয় না।
  • Kuntala | ২৪ ডিসেম্বর ২০২২ ২০:৩১514825
  • উফ, মেয়েদের  কি  যে  কষ্টের  জীবন  
  • ষষ্ঠ পাণ্ডব | 103.98.204.123 | ২৬ ডিসেম্বর ২০২২ ১৪:২০514850
  • @Kuntala:
     
    নিঃসন্দেহে। হাবিবদের জন্য পৃথিবীটা যত সহজ, জাহেরাদের জন্য সেটা ততটাই কঠিন। পদে পদে হাবিবরা জাহেরাদের জন্য পৃথিবীটাকে নরক বানিয়ে রাখে।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। লুকিয়ে না থেকে মতামত দিন