এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • দুর্গাপূজোর অন্য গল্প ( শেষ পর্ব)

    Mousumi Banerjee লেখকের গ্রাহক হোন
    ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২২ | ১৫০ বার পঠিত
  • পরদিন  বিজয়া দশমী । একটু বেলা হল সকালে উঠতে।  তৈরী হয়ে গেলাম মণ্ডপে। দশমী পূজো  শেষের দিকে। এইবার শরীর ও মনে ক্লান্তি উঁকিঝুঁকি মারছে।  মায়ের মুখখানা  আজ যেন কেমন লাগছে!  মা তো আজ কৈলাসে পাড়ি দেবেন । দেবাদিদেব রয়েছেন তাঁর অপেক্ষায়।  তবুও কেন বিষণ্ণ মুখ তাঁর?  নাকি উমার জায়গায় নিজেকে বসিয়ে ফেলেছি? নিজেরও কি মনে হচ্ছে সেই আজন্ম পরিচিত ঘরকে  ফেলে আসার দিনের কথা?
    আরতি শুরু হল। ঢাক, কাঁসর ঘন্টা, শঙ্খ, ধুনোর গন্ধ  সবই এই কয়েকদিনের মতোই ।  তবুও  আজ কেন দু চোখ ছাপিয়ে জল আসছে?
    পুরোহিতমশাই ক্ষমা প্রার্থনা করছেন মায়ের কাছে, সকলের হয়ে। তারপরেই ঘট নাড়িয়ে দিলেন। দর্পণ নিয়ে মায়ের মুখের  সামনে ধরে  প্রতিবিম্ব  দেখে বড় আবেগতাড়িত কন্ঠে মন্ত্র পড়ছেনঃ
    "ওঁ উত্তরে শিখরে দেবি ভূম্যাং পর্বতবাসিনী।
    ব্রহ্মযোনি সমুৎপন্নে গচ্ছ দেবি মমান্তরম্।।
    ওঁ গচ্ছ গচ্ছ পরং স্থানং স্বস্থানং পরমেশ্বরি
    সংবৎসরে ব্যতীতে তু পুনরাগমনায় চ।।"
    এরপর জল ভরা পাত্রে মায়ের   পাদপদ্মের প্রতিচ্ছবি দেখার পালা ।  মন্ত্রের শেষ দুটি লাইন কানে বাজছিল। মন বড় খারাপ করছিল  প্রতিবারের মতোই।  আবার পরের বছরের জন্য দিন গোণা শুরু। ততদিন মা থাকবেন হৃদয়মধ্যে।

    বিকেল চারটে থেকে দেবীবরণ।  মাকে নিয়ে পাঁচটা নাগাদ পৌঁছলাম। এ কদিনে আমার বন্ধু, দিদি ও বৌদিরা মায়েরও বন্ধু হয়ে গিয়েছেন সকলে।  সুন্দরভাবে বরণের সুযোগ করে দিলেন সকলেই মাকে। কলকাতায় পাড়ার পূজোয় ভীড় থাকে। একটু আধটু সমস্যা হয়েই থাকে। মা তাই খুব খুশী। আমি সেইবছর প্রথম দেবীবরণ করেছিলাম। মা শিখিয়ে দিয়েছিলেন উমার হাতে পান দিয়ে মুখে মিষ্টি দিয়ে কানে কানে যেন বলি, "আবার এসো মা।"  বলতে গিয়ে আমার চোখে জল এসে গেল। যাই হোক, এরপর কিছুক্ষণ আমাদের দিদি, বৌদিদের সঙ্গে সিঁদুর খেলে মা আর আমি বাড়ি ফিরলাম।  সাতটা নাগাদ বিসর্জনে বেরোন হবে। গাড়ি এসে গিয়েছে দুটো। চার কিলোমিটার দূরের  কানহান নদীতে প্রতিমার বিসর্জন হবে।

    ওদিকে নবরাত্রি পূজোর  প্রতিমা দুপুরেই বিসর্জন হয়ে গিয়েছিল। কোলিয়ারি  কলোনির স্টেডিয়ামে সেদিন রাবণ দহন।  একটু সময়ের জন্য সেখানেও  গিয়েছিলাম।  রাবণ দহনের সঙ্গে সঙ্গে সেখানে 'সোনা পাতা' ( সম্ভবতঃ শমীবৃক্ষের পাতা) আদান প্রদানের মাধ্যমে পরস্পরের শুভেচ্ছা বিনিময়ের রীতি আমার কাছে নতুন ছিল। ঘরে ফিরে বিজয়ার প্রণাম ও শুভেচ্ছা সারার পালা। প্রতিবেশীরাও একে একে এসে বাবা,  মাকে প্রণাম করে যাচ্ছেন।  সোনা পাতা দেওয়া নেওয়া চলল,  সঙ্গে মিষ্টিমুখ।

    জ্ঞানবধি কলকাতা শহরের বারোয়ারী পূজোই আনন্দ করে দেখেছি।  সে পূজোয় পুষ্পাঞ্জলি দিয়েছি আর মায়ের সঙ্গে দশমীর সন্ধ্যায় প্রণাম করে এসেছি।  ভিনরাজ্যে এসে দুর্গাপূজোকে বড় আপন করে পেয়েছিলাম।  বাঙালীদের পরিচালিত পূজোর বাজেট মোটেও বড় ছিল না।  হাতে গোণা বাঙালী পরিবার সেখানে। তাঁদেরই আয়োজিত পূজো।  আন্তরিকতার অভাব একেবারেই না থাকায়  সেই পূজো প্রাণের পূজো হয়ে উঠেছিল।  বড় আনন্দের এমন পূজো।  দু দিন বাদেই ছিল 'বিজয়া সম্মিলনী।'  ঐদিনে বাবা, মা রা কলকাতা ফিরে গেলেন দুপুরের ট্রেনে । স্টেশন থেকে ফিরে  ঘর বড্ড  বেশী যেন ফাঁকা লেগেছিল সেদিন।   মন খারাপ বুকে নিয়ে সন্ধ্যায় বিজয়ার আড্ডায় যোগ দিয়েছিলাম।  সেদিন আনন্দ  হুল্লোড়ের হাট বসেছিল।  রাতে ঘরে  যখন ফিরলাম মন তখন অনেকটাই হালকা।

    এরপর  মাঝখানে কোজাগরী পূর্ণিমার দিন বাদে দেওয়ালি পর্যন্ত চলল বাঙালীদের ঘরে ঘরে পালা করে  বিজয়ার উৎসব পালন। সেখানে কিন্তু বাঙালী ছাড়াও অন্য ভাষাভাষীর সকলেই উপস্থিত থেকেছেন আনন্দের সঙ্গে।

    ঘর ছেড়ে অন্য রাজ্যে বা দেশে আনন্দের উপকরণ খুঁজে নেওয়া সহজ নয়। ভালো, মন্দ , সুখ, দুঃখ নিয়ে আমাদের  জীবন। মন্দ আছে বলেই ভালোর  অনুভূতি হয়  অথবা দুঃখ আছে বলেই সুখের পরশে মন আনন্দে ভরে ওঠে।   প্রবাসের পূজো নিয়ে লিখতে গিয়ে সেই ফেলে আসা  দিনগুলোকে নতুন করে অনুভব করলাম।   সেইসময়ের সেইসব  মানুষজনের সান্নিধ্য অনুভব করলাম এই লেখাটি লিখতে গিয়ে।  অনেকেই আজ অন্য জগতের বাসিন্দা। কত কথা,  কত ঘটনাই তাঁদেরকে ঘিরে ! স্মৃতির খাতার পাতায় সেসব রঙীন  ছবি হয়ে  ধরা দিল । কত রঙের ব্যবহার সেখানে! হাসি, কান্না, আনন্দ, দুঃখ --- সবকিছুতেই লেগেছে নানা রঙের ছোঁওয়া। কোনোটা গাঢ়, কোনোটা ফিকে। এই লেখাতে থাকল শুধুই  আনন্দের রঙে রঙীন স্মৃতির কথা।

    সমাপ্ত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ভ্যাবাচ্যাকা না খেয়ে মতামত দিন