ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • তোতাকাহিনী ২

    Parikshit Manna লেখকের গ্রাহক হোন
    ২৫ জুন ২০২২ | ৮৬ বার পঠিত
  • ।।  তোতাকাহিনী - ২ ।। 
    কলমে - পরীক্ষিৎ মান্না 

    রাজামশাই গত হয়েছেন বহুদিন হয়ে গেল। তৎকালীন পরামর্শদাতারাও ব্রাত্য হয়েছেন। রানি এখন রাজ্য চালানোর পাঠ অনলাইনেই নেন। দিনকাল মোটেই ভাল নয়। বিশ্বাস করা যায় না কাউকে। বিশ্বাস নেই প্রায় নিজের ছায়ার প্রতিও। নিন্দুকের সংখ্যাও বেড়েছে। তার সাথে পাল্লা দিয়ে প্রচারকের সংখ্যা। পোষ্যের সংখ্যাও দিন দিন আকাশ ছুঁচ্ছে। সকলকে নিয়েই চলতে হয়। গণতন্ত্র বলে কথা! আগেকার দিন তো আর নেই। রাজার কথাই শেষ কথা ছিল সেই সময়। তবু, মাঝেমধ্যে কিছু সিদ্ধান্ত নিতেই হয় একান্ত নিরুপায় হয়ে। এই যেমন, তোষামুদে নির্বাচন, প্রশাসনিক পরিবর্তন, উপঢৌকন বাছাই ইত্যাদি ইত্যাদি। এর মধ্যে আবার উড়ে এসে জুড়ে বসেছে তোতার পরিবার। শুনলাম, ওরা নাকি সেই তোতার উত্তরসূরি, যাকে রাজামশাই বিদ্যাদিগ্গজ বানানোর চেষ্টা করতে গিয়ে মেরেই ফেলেছিলেন। 

    রানি সেই পথই মাড়ালেন না। ওদের তাড়ালেন না। সোনার খাঁচায় আটক করলেন না। উল্টে ওদের জন্য বানিয়ে দিলেন একটা মাঠ, আকাশ, গাছগাছালিসমৃদ্ধ রেপ্লিকা। খরচ হল ভালই। জিনিসটা দেখতে হুবহু খোলা জায়গার মত হলেও, খোলা নয়। তোতাদের চলাফেরা বা ওড়ার যা রেঞ্জ, সেই পরিমাণ জায়গা নিয়ে খামারবাড়ির মত এক পাখিরালয়। যা প্রায় অদৃশ্য হাইভোল্টেজ বৈদ্যুতিক তার দিয়ে ঘেরা। তোতারা সেখানে স্বাধীনভাবেই ঘুরে বেড়ায়। বসবাসের অনুকূল পরিবেশ পেয়ে ওদের মনের ক্ষোভ বিক্ষোভ প্রায় উধাও। রানিমা কি আর জানেন না যে তোতার পরিবার তলে তলে নিন্দুক আর প্রচারকদের সঙ্গেও যোগাযোগ রেখে চলেছে! তাই তো এই ব্যবস্থা। ওদের সঙ্গে যোগাযোগও ছিন্ন হল, আবার পোষ্যও করা হল তোতার উত্তরসূরিদের। এই বিশালাকার স্তপতিটির নাম রানি নিজেই দিয়েছেন - মুক্তি-মায়া।

    সেদিন এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে রানিমা ব্যাখ্যাও দিয়েছেন এ বিষয়ে। "ইতর প্রাণী থেকে শুরু করে মানুষ, আনুবীক্ষণিক অ্যামিবা থেকে শুরু করে বটবৃক্ষ মায় এই পৃথিবীর প্রতিটি সূক্ষ্মকণা (যথা - ইলেকট্রন ইত্যাদি।) মুক্তি চায়। মুক্তি চাইতে গিয়ে তারা নিজেদের মধ্যে আরো নিবিড় সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। তাই মুক্তি অধরা থেকে যায়। মুক্তি হল মায়ারই নামান্তর।" 

    আর শিক্ষা দীক্ষা? দিচ্ছেন, কিন্তু এ শিক্ষা পুঁথিগত নয়, ব্যবহারিক জীবনে খুঁটে খাওয়ার শিক্ষা। বলা তো যায় না, বাতাসেরও কান আছে। কখন কে বা কারা বলে বসে, "এ রাজ্য মূর্খ তৈরির আধার!" তাই রানিমা ওদের শেখাচ্ছেন নিজের খাবার নিজে তৈরির প্রকল্প। জমি চষে দানাশস্য আবিষ্কারের এই অভিনব শিক্ষাটির উনি নাম দিয়েছেন - স্বনির্ভরতা।

    ভালই কাটছে দিন। তোতাদেরও। রানিমারও। পূর্বপুরুষ হত্যার ষড়যন্ত্রীর পরের প্রজন্মকে মেরে প্রতিশোধ নিতে আসা তোতা পরিবারের মগজ এখন ভোঁতা! ভুলতে বসেছে ইতিহাস। পোষ মানানোর খেলায় আপ্লুত হয়ে তারা এখন রানির সভায় জয়ধ্বনি দেয় শিস্ দিয়ে। মানুষের গলা নকল করে কথা বলার প্রাগৈতিহাসিক তোতাপ্রতিভা, খুঁটে খাওয়ার শিক্ষা আর উপঢৌকনাদির আতিশয্যে ঢাকা পড়েছে প্রায়। ক্রমে, তোতারা হয়ে উঠছে আজ্ঞাবহ দাস। ঠিক যেমনটা চেয়েছিলেন রানি। রানিমা তর্জনী তাক করলে ওরা মানুষের গলায় বলে ওঠে, "আহা কি সুন্দর এই পৃথিবী।" রানি মধ্যমা তুললে - "কী অপূর্ব এ দানাশস্য! আমাদের নিজস্ব সংগ্রহ।" রানি চোখ বুজলে তোতারাও চোখ বোজে। তারপর শিস দিয়ে রানির রচিত কোনো বিখ্যাত কবিতা আবৃত্তি শুরু করে। রানির অন্য পোষ্যরা অবাক হয়ে উপলব্ধি করে তা। সেই উপলব্ধিই ক্রমে জন্ম দিল হিংসার। 

    রানির চোখের সামনেই একদিন ঘটে গেল বিপদ। তোতাদের প্রতি রানির অতি আদিখ্যেতা অন্য পোষ্যদের করে তুলল বিদ্রোহী। সুযোগ বুঝে নিন্দুক আর প্রচারকেরাও ধিকি ধিকি জ্বলা আগুনে ঘি হয়ে অবতীর্ণ হল। মুক্তি-মায়ার আকাশে লেজার আলো ফেলে দেখানো শুরু হল প্রাচীন ইতিহাস। একদিন স্বনির্ভরতার পাঠে কে যেন শিস দিয়ে শুনিয়ে গেল, "....বই ধর, ওটা হাতিয়ার।" 

    আর রাজসভায় তো তোতাদের বিরুদ্ধে বাকি পোষ্যদের সম্মুখসমর তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করলেন রানি স্বয়ং। বাধা দিলেন না। বরং উৎসাহ আর অনুপ্রেরণায় ভরিয়ে দিলেন - যতক্ষণ না তোতারা নিশ্চিহ্ন হচ্ছে। 

    পরদিন খবরে প্রকাশ পেল রানির দুঃখজনক শোকবার্তা - 

    "ওরা অবুঝ, ওরা আমার পোষ্য-ই,
    ওদের স্মৃতি রাখব বুকে অবশ্যই।" 

    গ্রামে গ্রামে সেই বার্তা রটি গেল ক্রমে। গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে, অঙ্গরাজ্যে, ভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ল তা। আর ভীমরুলের চাকে ঢিল পড়ার মত ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি উড়ে আসতে লাগল রানির রাজ্যে। পাখিদের শ্রেণিবিভাগ আছে, আবার সম্প্রীতিও আছে। রাজনীতি নেই। তাই ভেদাভেদও নেই। রাজ্যবাসী দেখতে পেল ছোট, বড়, মাঝারি আকৃতির পাখির দলকে। ওরা নিমেষেই ধূলিসাৎ করল মুক্তি-মায়াকে। এবার হয়ত রানির পালা। ওরা এগোচ্ছে। ওদের শরীরে জঙ্গুলে উদ্দীপনা, ওদের ঠোঁটে মানুষের গলা নকল করা স্লোগান -

    "আমরা পোষ্য, ধিক্কার করি বশ্যতাকে
    যুগে যুগে যেন এই শিক্ষাটা বজায় থাকে!" 

                            [শেষ]
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। মন শক্ত করে মতামত দিন