ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • ছায়াঘড়ি

    দীপাঞ্জন মুখোপাধ্যায় লেখকের গ্রাহক হোন
    ২৮ মে ২০২২ | ৩৩৮ বার পঠিত | রেটিং ৫ (১ জন)
  • সকালে মোবাইলে অ্যালার্ম বাজলে প্রথমেই মোবাইলটা তুলে নিয়ে অ্যালার্মটা অফ করে দেখে নিই কিছু নোটিফিকেশন এসেছে কিনা | তারপর আরো আধ ঘন্টা ঘুমিয়ে নিই | আধঘন্টা বাদে দ্বিতীয় অ্যালার্ম বাজলে সত্যিকারের ঘুমটা ভাঙে | এটাই অভ্যেস | কিন্তু আজকে একটাও অ্যালার্ম বাজেনি, তাই চোখ খুলে প্রথমেই মনে হল প্রচুর দেরী হয়ে গেছে |

    বিদ্যুৎবেগে মোবাইলটা তুলে লক স্ক্রিনে সময় দেখতে পেলাম না | ছুটলাম বাথরুমে | তারপর চান করে বেরিয়ে আবার ইচ্ছে হল সময় দেখার | আনলক করে মোবাইলের হোম পেজে ঘড়ির উইজেটটা পেলাম না | উদ্ভট ব্যাপার |

    খটকা লাগল, ঘড়ির উইজেটটা কি কোনো কারণে কাল রাতে ডিলিট করে দিয়েছি ?

    গলি থেকে বেরিয়ে বড় রাস্তায় ওঠার মুখেই ছোট পান বিড়ির দোকান | রঙ বেরঙের লজেন্সের বয়াম | সারি দিয়ে ঝুলছে পানমশলার প্যাকেট | ফ্লাস্কে চা বানিয়ে রাখা | আগে কোনদিন তাড়ায় এর দোকান থেকে কিছু কিনি নি | এমন ভাবে অ্যালার্ম সেট করা থাকে যে বাসস্টপে যেতে না যেতেই নটার বাসটা পাই |

    কটা বাজে নিশ্চিত না হতে পারলেও ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় বলছিল আজকে নিশ্চিত আমি নটার বাস মিস করেছি | কাজেই এক কাপ চা খাওয়া যেতে পারে |

    "একটা ফুল চা হবে?" "দশ টাকা" | চা টা নিলাম | খয়েরি, হালকা দুধ মেশানো |

    চা খেতে খেতে মোবাইলে এবার ভালো করে ঘড়ির উইজেটটা খুঁজলাম | অফিসের মেসেজ গ্রুপে অলরেডি কিসব মেসেজ আসছে, টুং টুং আওয়াজ | আমি ভয়ে খুলছিনা, টেনে সরিয়ে দিচ্ছি নোটিফিকেশন | দেরী হবার ভয় |

    মোবাইলটা রিস্টার্ট করলাম | চা অর্ধেক শেষ | অবিশ্রান্ত গাড়ি যাচ্ছে | দুচাকা চারচাকা | অফিস গুলোর বড় বড় বাস | এই শহরের রাস্তায় লোকজনকে হাঁটতে দেখা চন্দ্রগ্রহণের মত দুর্লভ একটা ব্যাপার | তার কারণও আছে, বড় রাস্তাগুলোয় ফুটপাথ বলে কিছুর অস্তিত্ব নেই বললেই চলে |

    আমি ছাড়া আর কেউ দাঁড়িয়ে নেই দোকানে | লোকটা পান সাজাতে সাজাতে রেডিও শুনে যাচ্ছে | জকি ভাট বকছে | ট্রাফিক আপডেট দিচ্ছে | শুধু, একটা গান থেকে আরেকটা গানে যাওয়ার মাঝে সে কটা বাজে বলতে ভুলে যাচ্ছে | বিজ্ঞাপন চলছে | আমি ভাবছি আজ স্ট্যান্ড আপ কলটা মিস হবে | হোয়াট ইউ ডিড ইয়েস্টারডে , হোয়াট আর ইউ গনা ডু টুডে, এনি ব্লকারস ?

    চা শেষ | মোবাইল রিস্টার্ট হয়ে গেছে কিন্তু ঘড়ি এখনো দেখাচ্ছে না !

    টাকা মিটিয়ে জিজ্ঞেস করলাম - "দাদা কটা বাজে?" "কেউ বাজে না, সব ভালো" "সময় জিজ্ঞেস করছি" "সময়, সেটা কি ?" থমকে গেলাম- "সময় মানে যেটা ঘড়িতে দেখে | ঘড়ি আছে ?" লোকটা মোবাইল লাউড্স্পীকারে রেডিও শুনছিল | স্মার্টফোন না, পুরোনো আমলের | এগিয়ে দিল | এই আদ্যিকালের মোবাইলেরও হোমপেজে বড় করে ঘন্টা মিনিট দেখাতো | কিন্তু এখন এতেও নেই |

    বাসস্টপের ছায়ায় গিয়ে দাঁড়ালাম |

    দুচাকায় যারা সাঁ সাঁ করে চলে যাচ্ছে , এদিক ওদিক কাটিয়ে , বাঁদিক দিয়ে বাসদের ওভারটেক করে, তাদের কারুর হাতে ঘড়ি নেই | ব্যাপারটা আমি ভাবছিলাম, সত্যি আমার ফ্ল্যাটেও ঘড়ি নেই , মোবাইলের ঘড়িটাই সম্বল | আগে চল ছিল কলেজে ভর্তি হবার সময় হাতঘড়ি কিনে দেবার, বাবা মার কাছে শুনেছি |

    আমার অফিসেরই আরো দুজন এলো বাসস্টপে | বাঁচা গেলো, চেনা মুখ | এক ব্যক্তি আমার দিকে হাসিমুখে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন - "নটার বাসটা মিস করেছেন?" "হ্যাঁ ঠিক এই তো, কটা বাজে এখন ?" "এখন , ওই দশটা হবে |" "শিওর আপনি ? মোবাইলে দেখাচ্ছে? "

    তিনি একথায় অবাক হলেন খুব - "মোবাইল দেখে কি হবে? মোবাইলে সময় দেখায় নাকি !" "তো দশটা বাজে এক্ষুনি তো বললেন" "হ্যাঁ, সে তো এই বাসস্টপের ছায়াটা দেখে বললাম |" "ছায়া দেখে সময় ?" "সূর্যঘড়ি জানেন না ? এভাবেই তো লোকে কবে থেকে দিনের বেলা সময় মেপে আসছে , ছায়া দেখে" |

    আরেকজন মহিলাও অবাক হয়ে শুনছিলেন | তাকে অফিস থেকে ফেরার বাসে অনেকবার জিমের পোশাকে দেখেছি, অফিসের জিম ব্যবহার করেন | তার হাতে একটা স্মার্ট ওয়াচ, গোলমতন | কিন্তু সেদিকে তাকাতে তিনি নিজের থেকেই বললেন -"এটাতে হার্টবিট ,সারাদিন কতখানি হাঁটলাম , কত ক্যালরি খরচ হল সেসব দেখায় | সময় কেন দেখাবে ? হিসেব মত ওই ছায়াটা ঠিক 0.৫ ইঞ্চি সরলেই বাস টা চলে আসার কথা | "

    "শিখে নিন ছায়া দেখে সময় মাপাটা | এমন কিছু হাতি ঘোড়া ব্যাপার তো আর না " - পাশ থেকে অন্যজনের মন্তব্য ছুটে আসে |

    বাসে উঠে একদম শেষে বসার জায়গা ফাঁকা | ঝাঁকুনি খুব শেষের সিটে | সামনের দিকে ড্রাইভারের সিটের পিছনে একটা এলইডি তে সময়টা দেখায় | আজকে এলইডি জ্বলছে না | উইন্ডশিল্ডের পিছনে ড্যাশবোর্ডে একটা বালিঘড়ি বসানো | ব্যাগ থেকে অফিসের ল্যাপটপ বের করে দেখতে পারতাম | কিন্তু কেন জানিনা আমার নিশ্চিত মনে হল ওখানেও সময় দেখাবে না |

    আমি রোজ বিকেল চারটে সাড়ে চারটের সময় রুক্মিণীর সাথে চা অথবা কফি খেতে যাই |

    ট্রাফিকের স্রোতের ওপর গড়াতে গড়াতে বাসটা অফিসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল | বাসে বাকি সবাই যথারীতি মোবাইলে মুখ, কান গুঁজে বসে আছে | আমি ফোনের ইন্টারনেট খুলে দ্রুত খুঁজতে শুরু করি, কিভাবে ছায়া দেখে সময় বলা যায় | কেননা আমাকে শিখে নিতে হবে, কিভাবে ঘড়িহীন কাটিয়ে ফেলা যায় আস্ত একটা জীবন |

    রুক্মিণীর 'লাস্ট সীন' দেখাচ্ছে না | মেসেজ করতে গিয়েও আঙ্গুলটা সরিয়ে নিই | অফিসে গেলে তো দেখা হবেই | পাশের কিউবিকলেই তো বসে |

    ঠিকই তো, অত তাড়াহুড়োর কি আছে ! বাসে উঠে যখন পড়েছি, গন্তব্যে তো পৌঁছে যাবোই একসময় | ফিরতি বাসে ফিরেও আসব ফ্ল্যাটে | শুধু, রুক্মিণীর সাথে প্রতিদিন বিকেলবেলার ওই চা অথবা কফি খেতে খেতে গল্পটা যেন মিস না হয়ে যায় |
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • Bratin Das | ২৮ মে ২০২২ ০৯:৩৯508149
  • আমাদের  স্কুলের দীপু নাকি?
  • Prajjwal Pal | ২৯ মে ২০২২ ০০:৫৫508193
  • দারুণ
  • Pradip Kumar Biswas | ২৯ মে ২০২২ ১৩:০৯508204
  • আমার মনে হচ্ছিল এটি সমান্তরাল দুনিয়ার গল্প  যেখানে আমাদের অনেক অভ্যাসের জিনিস বদলে যায় আবার কিছু বদলায় না । 
  • asiskumar banerjee | ০৯ জুন ২০২২ ০৭:৫২508649
  • সুন্দর 
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। লাজুক না হয়ে প্রতিক্রিয়া দিন