ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • জাপান ১৪

    Rumjhum Bhattacharya লেখকের গ্রাহক হোন
    ২৬ মে ২০২২ | ১০৯ বার পঠিত
  • কিয়োতো, ওসাকা, নারা, কোবে এসব চারদিনে ঘুরে আমরা সবাই খুব ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম। শনিবার আর রবিবার জেবরাজের ছুটি থাকে তার সঙ্গে সে সোমবারও ছুটি নিয়েছে আমাদের গাড়ী করে কিছু জায়গা ঘোরাবে বলে। শনিবার কোথাও বেরোলাম না। রবিবার সকালবেলা উঠে লাঞ্চ তৈরি করে গাড়িতে নিয়ে ওদাইবা যাওয়া স্থির হল। ওখানেই বিচের ধারে বসে খাওয়া হবে। কিয়োতোর গলিতে গলিতে ঘুরেছি আমরা। সেখানে সনাতন জাপানী বাড়ি দেখার পরে টোকিও-তে মর্ডান জাপান দেখতে বেরোলাম। জাপানের রাস্তাঘাটে সামান্য কাগজের টুকরো খুঁজে পাওয়া দায়। এখানে আবর্জনা সংগ্রহ করে সেগুলোর সুষ্ঠূভাবে ডিসপোজাল একটা দেখার মতো বিষয়। সবওয়ার্ডের নিজস্ব গার্বেজ কর্ণার আছে। প্রত্যেক বাড়িতে দুটো করে ডাস্টবিন রাখতে হয়। একটা পচনশীল জিনিসের জন্য, আর একটা অপচনশীল জিনিসের জন্য। এই দুই ধরণের আবর্জনা আলাদা করে জমা করা হয়। জাপানে প্লাস্টিক প্রচুর ব্যবহার হয় কিন্তু যেটা এ দেশের থেকে শিক্ষণীয় তা হল প্ল্যাস্টিকের রিসাইক্লিং করা। পরিবেশের কথা মাথায় রেখে প্লাস্টিকের জিনিস আলাদা করে জমা করে তা রিসাইক্লিং করা হয়। পথের ধারে গারবেজ কর্ণারে সারি সারি নোংরা ফেলার প্যাকেট জড়ো করা। সে ছবি না তুলে পারা গেল না। আমরা পৌঁছোলাম ওদাইবা। ওদাইবা আসলে মানুষের তৈরি দ্বীপ বলা চলে। এডো যুগে তোকুগাওয়া শোগুনেটের আমলে সমুদ্র দিয়ে যাতে কোন আক্রমণ এডো অঞ্চলে না হতে পারে তার জন্য ওদাইবা দুর্গের কাজ করবে বলে বানানো হয়। এখন ওদাইবা টুরিষ্ট স্পট। নীল জলের খাঁড়ির ওপারে সারি সারি মাথা তুলে দাঁড়ানো বিভিন্ন ডিজাইনের বিল্ডিং। একটা সুন্দর ব্রীজ নাম যার রেনবো ব্রীজ। জানলাম রাতের বেলা রামধনু রঙের আলো জ্বলে তাই ব্রীজের নামটি রেনবো। মাথা তুলে দাঁড়িয়ে স্টাচ্যু অফ লিবার্টি। বাচ্চারা বিচে খেলা করতে লাগল। বিচের ধার দিয়ে সুন্দর বাঁধানো রাস্তা। আমরা বাড়ির থেকে নিয়ে যাওয়া মাদুর বিছিয়ে আর মাথার ওপর ছাতা লাগিয়ে বিচে বসে দুপুরের নীল আকাশ, খাঁড়ির বুক থেকে ভেসে আসা ঠান্ডা বাতাস উপভোগ করতে লাগলাম। আমার কর্তাটি ছটফটে মানুষ। বেশিক্ষণ এক জায়গা বসা তার ধাতে সয় না। বসে বসে কিছুটা ভাবুক হয়ে গেছি, কিছুটা আনমনাও। কিছুক্ষণ পরে দেখি কর্তামশাই দূরে কার সাথে দাঁড়িয়ে হাত নেড়ে নেড়ে খুব গল্প করছে। আবার একবার আলিঙ্গনও করে ফেলল। আমি তো হতবাক। এত তাড়াতাড়ি জাপানী ভাষা শিখে ফেলে, আলাপ করে ঘনিষ্ঠও হয়ে গেল!!!! তিনি যে মিশুকে মানুষ জানতাম, তবে এতটা মিশুকে জানতে পারিনি। দেখি দুজনেই আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে। আমি ভীত হয়ে পড়ি। আমি যে জাপানী একবর্ণও বুঝি না। কাছে আসতে দেখলাম  আমারই ভ্রম। সঙ্গের মানুষটি পরিস্কার বাংলায় বলে উঠলেন, চিনতে পারছেন ম্যাডাম? আমি যথারীতি চিনতে পারিনি। তবে বুঝলাম কর্মসূত্রে ওনার সঙ্গে যোগাযোগ। আনন্দ বলল আমি এখুনি আমার মিসেস আর বাচ্চাদের ডাকছি। কিছুটা দূরের সারি সারি বহুতলের দিকে হাত বাড়িয়ে বোঝালো কাছেই তার বাড়ি। তাই সে তার বউ বাচ্চাদের ডাকতে চায় আমাদের সঙ্গে দেখা করানোর জন্য। আমরাও খুশি, এই বিদেশে বাঙালি পরিবারের সান্নিধ্য পেতে পারি ভেবে। পৃথিবীতে লক্ষ লক্ষ মানুষ জন্মাচ্ছে। বলা চলে লক্ষ লক্ষ গল্পও জন্মাচ্ছে সেই সঙ্গে। আনন্দের গল্পটাও বেশ রোমাঞ্চকর। ইঞ্জিনীয়ারিং ডিগ্রী নিয়ে ইন্ডিয়াতেই চাকরি জীবন শুরু করে। তারপর একটা জাপানি কোম্পানীতে চাকরি পেয়ে টোকিওতে আসে কাজের সূত্রে। ভাল লেগে গেল জাপান। নিজের চেষ্টায় ও দেশের ভাষা শিখে নাগরিকত্ব নিয়ে ফেলে এখন রীতিমতো সরকারি চাকরি করছে টোকিওতে। আনন্দের বউ প্রিয়াঙ্কা কলকাতায় থাকে। ওদের দুই ছেলেরই জন্ম টোকিওতে। কাজেই তারা জন্মগত ভাবে জাপানি। বড়টি পড়ে জাপানি স্কুলে। প্রিয়াঙ্কা কলেজ সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষা দিয়েছে রেজাল্টের অপেক্ষায় দিন গুনছে। ওদের সঙ্গে দেখা হয়ে অনেক কথা জানতে পারলাম জাপান সম্বন্ধে। আনন্দ জাপানে প্রায় পাঁচ বছর কাটিয়ে ফেলেছে। ভাল থাকার আর ভাল লাগার জন্য মানুষ কি না পারে। ওরা জাপানের খাবার খেতে অভ্যস্ত, জাপানের ভাষায় কথা বলছে। আমরা এক সঙ্গে বসে বাড়ির তৈরি ইডলি চাটনি মিষ্টি এসব খেলাম। ওরা সানন্দে যোগ দিল। বলল অনেকদিন পর ভারতীয় খাবার খেয়ে বেশ ভাল লাগল। আনন্দ বলল মাউন্ট ফুজি দেখতে আমাদের সঙ্গে যাবে। ও বেড়াতে খুব ভালবাসে। ইতিমধ্যে বার কয়েক সেখানে ঘোরা হয়ে গেছে। তবু গাড়ি চালিয়ে আবার যেতে রাজি হয়ে গেল। আমরাও আনন্দের সঙ্গে আনন্দের সঙ্গ লাভে উৎসাহ দেখালাম। ফোন নম্বর বিনিময় হল। আবার দেখা হবে এই আশ্বাস দিয়ে বিদায় নিল সে। হঠাৎ করে আবহাওয়া সম্পুর্ণ বদলে গেল। ঝির ঝির বৃষ্টি শুরু হতে আমরাও বাড়ির পথে এগোবার সিদ্ধান্ত নিলাম। কারণ পরের দিন আমাদের  কামাকুরা যাওয়ার কথা আছে। সপ্তাহের মধ্যে তিনদিনের জন্য হাকোনে যাওয়ার পরিকল্পনা আছে। পরের শনিবার শিবুয়া লাইন আর রবিবার মাউন্ট ফুজি। তারপর আমাদের ফেরার বাঁশি বেজেই যাবে। 
    ফিরতি পথে গিঞ্জা দেখতে যাওয়া হল। এই চত্বরে অনেক বড়ো বড়ো দোকান। টোকিও-র চুয়ো ডিসট্রিক্টে গিঞ্জায় বিরাট বড়ো মার্কেট আছে। বড়ো বড়ো আন্তর্জাতিক দোকান আছে এখানে, আছে ঝাঁ চকচকে জুয়েলারি শপ, প্রচুর কফি শপ, নাইট ক্লাব। সন্ধ্যায় যখন পৌঁছোলাম আলো ঝলমল করছে সে সব দোকান পাট, রাস্তাঘাট। জাপানের শহর বলো কি মফঃস্বল। রাস্তা এখানে সব মসৃন, আবর্জনা শূন্য, ট্রাফিক সিগনাল লাগানো। ১৬১২ থেকে ১৮০০ সাল পর্যন্ত এখানে রূপোর কয়েন তৈরি হত তাই এই অঞ্চলের নাম হয়েছে গিঞ্জা, যার অর্থ রূপোর ট্যাঁকশাল। বিধ্বংসী আগুনে সব পুড়ে ছারখার হয়ে গেলে মেজি সরকার এখানে মর্ডান জাপান তৈরি করার উদ্দেশ্য নিয়ে ইঁট, বালু সিমেন্ট দিয়ে বিল্ডিং তৈরি করে একটুকরো মর্ডান জাপান নির্মাণ করেন বলা চলে। 
    টোকিওর আর এক বিখ্যাত শপিং এরিয়া হল আকিহাবারা। আকিহাবারা হল ইলেক্ট্রনিক্স হাব। সেখানে গিয়ে দেখেছি কত যে ইলেক্টনিক্সের দোকান তার হিসাব নেই। জাপানে সেকেন্ড হ্যান্ড ইলেক্ট্রনিক্স জিনিস বেশ ভাল কন্ডিশনে পাওয়া যায় এবং চোখ বুজে কেনা যায় কারণ ঠকানো কি তা এ জাতি জানে না। সেকেন্ড হ্যান্ড বস্তুর গায়ে তার কি ডিফেক্ট তা বেশ স্পষ্ট করে বুঝিয়ে দেওয়া থাকে এবং সেই অনুযায়ী জিনিসের লেভেল ঠিক করা হয়। এ গ্রেড, বি গ্রেড, সি গ্রেড ইত্যাদি ইত্যাদি। আমরা ওখান থেকে দুটো তিনটে জিনিস কিনে লাভবানই হয়েছি। চিনা জিনিসের মতো ঠুনকো জিনিস বেচে লোক ঠকানোয় বিশ্বাস করে না এ জাতি। জাপানে আগুন লাগার সমস্যা ছিল প্রচুর। এই আকিহাবারা অঞ্চল এক সময়ে (১৮৬৯) আগুনে পুড়ে ছারখার হয়ে যায়। তখন আগুন থেকে রক্ষা পেতে আগুনের দেবতা আকিবা-র স্রাইন তৈরি হল এখানে। সেই থেকে এ জায়গার নাম হল আকিবাগাহারা যা লোক মুখে আজ আকিহাবারা।সেই আকিহাবারা আজ জমজমাট শপিং এরিয়া। আকিহাবারাতে অনেক থিম রেস্ট্রুরেন্ট আছে। ফুটপাত চলতে চলতে পুরোণো সামন্ততান্ত্রিক জাপানের দাসীর (যাকে বলা চলে মেড) সনাতন সাজে কয়েকজন মেয়ে বেশ ডাকাডাকি করতে লাগল। তাদের রেস্ট্রুরেন্টে যাওয়ার জন্য। শুনলাম এখানে একটা রেস্ট্রুরেন্টে পোষা পেঁচা আছে। খদ্দেররা সেখানে গিয়ে পেঁচার গায়ে হাত দিতে পারে। পেঁচার সঙ্গ উপভোগ করতে পারে।
    পাবলিক টয়লেট 
     
    আবর্জনা ফেলার ব্যবস্থা
     
     
     
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। খেলতে খেলতে প্রতিক্রিয়া দিন