ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • জাপান ১১

    Rumjhum Bhattacharya লেখকের গ্রাহক হোন
    ১৩ মে ২০২২ | ৯৩ বার পঠিত
  • ইসুইএন বাগান থেকে হাঁটা পথেই তোদাইজি মন্দিরে পৌঁছে যাওয়াগেল। সকাল থেকে টই টই করে ঘুরছি তবু আমাদের ক্লান্তি নেই। এখন পৃথিবী বিখ্যাত দাইবুতসুদেন দেখতে চলেছি আমরা। নারাশহরের গর্ব এই মন্দির সম্রাট সমু ৭৪৫ সালে তৈরি করেন আর এইমন্দির উদযাপিত হয় ৭৫২ সালে। এই মন্দির স্থাপনার মধ্যে দিয়ে বলাযায় জাপানে বৌদ্ধ ধর্ম শাসকের আনুকুল্য আদায় করে নেয়। বারবারধ্বংস হয়েও পুনর্নির্মাণের মধ্যে দিয়ে এই মন্দির আজও বিশ্বের সবথেকে বড় কাঠের তৈরি মন্দির হিসাবে স্বীকৃতি পেয়েছে। নারা পার্কেরমধ্যে দিয়ে হাঁটতে লাগলাম। সেখানে অনেক হরিণ ঘুরে বেড়াচ্ছে। দেখলাম তারা টুরিষ্ট দেখতে অভ্যস্ত। কোন ভয় ছাড়াই বেশ আমাদেরকাছে চলে আসছে। কিছুটা এগোতে বিরাট কাঠের গেট চোখে পড়ল, নান্ডাইমান গেট। কারুকার্য করা প্রাচীন কাঠের দরজা দাঁড়িয়ে আছে১৮ টা পিলারের ওপর, যেন বিরাটত্বের প্রতিনিধি। মুগ্ধ চোখে দেখছি, আর এক পা এক পা করে এগোচ্ছি। কয়েকটা সিঁড়ি ভেঙে গেটেরকাছে পৌঁছে দু দিকে দুই ভীষণাকার কাঠের মূর্তি। এত মন্দির ঘুরেএখন বুঝে গেছি এঁরা হলেন দ্বাররক্ষী গার্ডিয়ান কিং। অশুভ শক্তিরপ্রবেশ আটকাতে এনাদের এখানে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। প্রায় আটমিটার করে উঁচু মূর্তি দুজনের একজনের খোলা মুখ , মহাবিশ্বেরজন্মলগ্নের সূচক। আর একটি মূর্তির মুখ বন্ধ। মহাবিশ্বের অন্তিমলগ্নের সূচক । ভিতর দিকে প্রবেশ করতেই একধারে একটা অশোকস্তম্ভ দেখতে পেলাম। এগোতে এগোতে প্রধান মন্দিরে ঢোকার গেটেপৌঁছোলাম। টিকিট কেটে মন্দির চত্বরে ঢুকতে চক্ষু ছানাবড়া। এতবড়আলোর কাঠের মন্দির আমি আগে কখনও দেখিনি। জানলামপৃথিবীর মধ্যে এই মন্দিরই নাকি কাঠের তৈরি সব থেকে বড়ো বিল্ডিং। কালো রঙের মন্দিরের ভেতরে অবস্থান করছেন দাইবুতসু, দ্য গ্রেটবুদ্ধ। পাঁচতলার সমান ব্রোঞ্চের বুদ্ধ মূর্তির সামনে দাঁড়িয়ে মনটাকেমন অন্য রকম হয়ে গেল। ভগবান বুদ্ধের যে দর্শন তার কিছুইজানা হয় নি এখনও।  যে পথে চলে তিনি সত্যকে জয় করেছিলেনআমাদের মতো নগণ্য মানুষের সে পথ দিয়ে চলার সাধ্য নেই। তবু এইশান্ত সৌম্য মূর্তির সামনে দাঁড়িয়ে এক অপার শান্তির বোধ মনকেআচ্ছন্ন করে তুলল। ক্ষণিকের এই পাওনাটুকু মন্দ কি? হোক নাঅসম্পূর্ণ জানা তবু সেদিনের সেই ক্ষণিকের উপলব্ধির দাম কি কিছুইনয়। ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগলাম মন্দিরের ভিতরে রাখা আরও কিছুমূর্তি। উচ্চতার মহিমায় বিভোর আমরা এবার পা বাড়ালাম কোবেরদিকে। নারায় অনেক কিছুই দেখা হল না আবার যা দেখলাম তাঅনবদ্য অভিজ্ঞতা হয়ে জায়গা করে নিল জীবনের পুঁজি ব্যাঙ্কে। যাদেখা হল না তার আফশোষ মনে পুষে রেখেই এবার আমরা দু’বোনকোবের পথে। ​
    এত কিছু দেখার পরে, এবং সকাল থেকে ঘোরার পর আমরা কেনকোবে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম সে কথা বলতে গেলে বাঙালীরজীবনের যে দিনমণি সর্বদা শোকে, দুঃখে, আনন্দে চির জাগ্রত সেইঠাকুরের প্রসঙ্গই চলে আসে। ১৬ ই জৈষ্ঠ্য, ১৩২৩ বঙ্গাব্দে (১৯১৬ সালে) কোবে বন্দরে তোসামারু জাহাজে করে এসেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। তাঁর জাপান-যাত্রী লেখায় কোবে সম্বন্ধে যা পড়েছি একশো তিন বছরপর সচক্ষে সেই কোবে শহর না দেখে জাপান থেকে ফিরি কি করে? যথারীতি ট্রেন মারফৎ নারা থেকে কোবে পৌঁছে গেলাম। স্টেশনেওসাকা থেকে এসে আমাদের সাথে যোগ দিলেন আমার কর্তা। সন্ধ্যানেমেছে কোবে শহরে। আমরা তিন জন স্টেশন চত্বর থেকে বেরোতেইহাঁ হয়ে গেলাম। এ যে ‘হঠাৎ আলোর ঝলকানি লেগে ঝলমল করেচিত্ত’। আলোয় আলো চারপাশ। কোবে হল বন্দর শহর। বিভিন্নদেশের জাহাজের আনাগোনা এখানে। কাজেই বড় বড় হোটেলরেঁস্তোরার ছড়াছড়ি চারপাশে। আমরা এ শহরের বিশেষ কিছুইদেখতে পারব না। কারণ রাতে ওসাকাতে আমাদের হোটেলে ফিরতেহবে। বাচ্চারা সেখানে আছে। যদিও এ দেশে নিরাপত্তা নিয়ে বিশেষচিন্তার কারণ নেই আর আমাদের দুই রাই কিশোরী যথেষ্ট চটপটে তাইএমন একটা সিদ্ধান্ত নিতে ভরসা পাওয়া গেল। স্টেশন চত্বরে আছে ঝাঁচকচকে একটা মল। আর দূরে আলো ঝলমলে এক উঁচু টাওয়ার দেখাযাচ্ছে। বুঝলাম এই হচ্ছে কোবে টাওয়ার। একটা ট্যাক্সি নিয়ে রওনাদিলাম কোবে টাওয়ারের দিকে। এমন শহর আমি এর আগে দেখিনিনি। মনে হল যেন কোন হলিউড সিনেমার সিনের মধ্যে ঢূকে পড়েছিআমরা। জাপানের শহর দেখার অভিজ্ঞতা আমাদের জীবনের একচরমতম অভিজ্ঞতা বলা চলে। উঁচু উঁচু আকাশ ছোঁয়া অট্টালিকাশহর জুড়ে মাথা তুলে আছে। প্রকৃতির লেশমাত্র দেখা যায় না।একশো বছর আগের যে কোবে দেখে রবীন্দ্রনাথ লেখেন, “এ তোলোহার জাপান, এতো রক্তমাংসের নয়। …….চীনেরা যেরকমবিকটমূর্তি ড্রাগন আঁকে --- সেইরকম। গায়ে গায়ে ঘেঁষাঘেঁষি লোহারচালগুলো ঠিক যেন তারই পিঠের আঁশের মতো রৌদ্রে ঝকঝক করছে। বড়ো কঠিন, বড়ো কুৎসিত----এই দরকার-নামক দৈত্যটা।“ সত্যিইযেন মানুষের দরকার পৃথিবীর অধিকাংশকে গ্রাস করে ফেলেছে। আজকের কোবে আলোকসজ্জায় জ্বল জ্বল করছে। বিনোদনেরসামগ্রী সব আছে বটে কিন্তু রাতের নিজস্বতা তার একান্ত হওয়ারসুযোগটুকু হারিয়েছে। রাতের যে আপনার এক জগত আছে সে জগতমানুষের দরকারের চাপে কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। ট্যাক্সিচালক  নামিয়েদিল কোবে টাওয়ারের দোরগোড়ায়। তড়িঘড়ি টিকিট কেটেএলিভেটরে করে ওপরে চড়ে পড়লাম। উচ্চতার কি মহিমা!! এত উঁচুথেকে কোবে শহর পুরোটাই দেখা যাচ্ছে। আলো ঝলমল একটাসাজানো শহর। সামনে ওসাকা উপসাগরের অংশ চোখে পড়ছে। বিরাট বড় একটা দৈত্যাকার চাকা, একটা সবুজাভ আলোয় উজ্জ্বলজেটি। এসব দেখতে দেখতে জোনাথন লিভিংস্টোন সিগালের কথামনে পরে গেল। রিচার্ড বাকের লেখা বইটা আমার কিশোরীবেলারউত্তোরণের আকাঙ্ক্ষাকে ওড়ার সুখ দিয়েছিল কল্পনায়। আজ যেন সেআকাঙ্ক্ষা সত্যিকারের ডানা মেলে ওড়া কি জানতে পারল। তিরিশতলার সমান উচ্চতা দার্শনিক করে তুলল আমায়। জীবনে আমরাকত কিছুই না ছুঁতে চাই। সে সব ছুঁতে গেলে আসলে পাওয়ার মোহত্যাগ করে বুঝি পাওয়ার পথটুকু দক্ষতার সঙ্গে পেরোবার চেষ্টা করতেহবে। রিচার্ড বাক যথার্থ বলেছেন, 
    “You will begin to touch heaven, Jonathan, in the moment that you touch perfect speed. And that isn’t flying a thousand miles an hour, or a million, or flying at the speed of light. Because any number is a limit, and perfection doesn’t have limits. Perfect speed, my son, is being there.”
      
    আমরা ফিরছি। কোবে থেকে ওসাকা, তারপর কাল সকালে ওসাকাথেকে কিয়োতো। সেখানে এখনও যে অনেক কিছু দেখার আছে। দ্রষ্টব্যকে পেতে হলে যাওয়ার পথটুকু পেরোতে হবে আনন্দের সঙ্গে এইভাবনা নিয়ে ফিরে চললাম হোটেলের পথে। যখন খেয়েদেয়ে বিছানানিলাম তখন প্রায় মাঝ রাত বলা চলে।
     
    তোদাইজি মন্দির
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ভ্যাবাচ্যাকা না খেয়ে মতামত দিন