ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • টইপত্তর  ভ্রমণ  যুগান্তরের ঘূর্ণিপাকে

  • তেহরানের স্বপ্ন 

    সে
    ভ্রমণ | যুগান্তরের ঘূর্ণিপাকে | ২৩ জানুয়ারি ২০২২ | ৬৯২ বার পঠিত | রেটিং ৫ (১ জন)
  • সেবার গরমের ছুটিতে বিলেতে বেড়াতে যাবার প্ল্যান। লন্ডন। ফরেন কান্ট্রিতে পড়াশুনো করছি, আর লাইফে একবার অন্তত লন্ডন যাবো না এ কি হতে পারে? সবাই যায় অন্তত একবার সেদেশে। কত কি আছে লন্ডনে, গাদাগাদা মিউজিয়াম, রাস্তা, অক্সফোর্ড স্ট্রীট, পিকাডিলি-সোহো, কত কী শুনেছি লোকের মুখে— গ্রীনিচের রেখা, আমাদের ওপর ১৮০ বছর রাজত্ব করে গেছে যে জাত, তাদের দেশটা দেখে না এলে দেশে ফিরে মুখ দেখাব কেমন করে? যেতে গেলে টিকিট লাগবে, ভিসা লাগবে, থার্ড ওয়ার্ল্ডের নাগরিক আমরা, ফার্স্ট ওয়ার্ল্ডে ঢুকতে গেলে যোগ্যতা প্রমাণ করতে হবে। টিকিট কাটতে আর ভিসা নিতে গেলাম মস্কো। পেল্লায় শহর। অ্যাত্তোবড়ো শহর আমি লাইফে বড়ো একটা দেখিনি। আর সেইরকম পরিস্কার পরিচ্ছন্ন। থাকব কোথায় জানি না, তো হুট করে পৌঁছে গেলাম ইউনিভার্সিটি হোটেলে। স্টুডেন্ট হিসেবে ইউনিভার্সিটি হোটেলে একটা ঘর ভাড়া নেওয়ার একটা অধিকার তো থাকেই। হোটেলের রিসেপশানে প্রথমে গাঁইগুঁই করল, জায়গা নেই, হাউসফুল ইত্যাদি বুঝিয়ে; এখন সামার ভেকেশানের টাইম দলে দলে ছাত্রছাত্রী আসছে ফ্লাইট ধরতে, ট্রেন ধরতে, সবাই ইউনিভার্সিটি হোটেলে ঘরভাড়া নিতে চায়, জায়গা কোথায় অত?
    আমাকে অত সহজে কাটিয়ে দেওয়া গেল না— চুপচাপ ভালোমানুষের মতো গুটিগুটি হোটেলের বিরাট লবিতে সোফার ওপর ব্যাগ রেখে, সেটাকে বালিশ বানিয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম। ঘন্টা তিনেক পরে দেখি বৃদ্ধা রিসেপশনিস্ট আমাকে ঘুম থেকে তুলে হাতে রুমের চাবি দিচ্ছে। আঠেরো তলার একটা থ্রীসীটার রুম। চুপি চুপি এটাও বলে দিলো, কাউক্কে যেন না বলি! রাত তখন একটা ফ্যাক্টা হবে। রুমে এসে দেখি ফাইভস্টার ফেসিলিটি, জানলা দিয়ে দেখা যাচ্ছে আলোয় ঝলমল করছে মস্কো স্টেট ইউনিভার্সিটি, আর মাঝখানে বিরাট একটা জায়গা জুড়ে জমাট অন্ধকার, বিশাল বনভূমি শহরের মধ্যিখানেই। ঘরে আমি একা, তিনটে খাটের একটা দখল করে আরমসে ঘুম দিলাম।
    পরের দিন থেকে রোজ ভিসার লাইনে হত্যে দিয়ে পড়ে থাকি। একটা নম্বর পেয়েছিলাম, ৭০ বা ৮০ হবে মনে নেই, দিনের শুরুতে একবার রোলকল হয়, আর দিনের শেষে, আর নম্বর রোজ পাঁচ দশটা করে এগোয়। এই পদ্ধতিতে কবে আমার ব্রিটিশ ভিসা পাওয়া হবে তা নিয়ে ঘোর সন্দেহ লাগে। সারাদিন কয়েকশো লোকের ভীড় হয় এম্ব্যাসীর দরজার সামনে, সব আমাদের মতো থার্ড ওয়ার্ল্ডের ছাত্র ছাত্রী আর সোভিয়েত দের লাইন আলাদা। মাঝে মাঝেই দেখি ভীড়ে দাঁড়াতে দাঁড়াতে ধৈর্য হারিয়ে ফ্যালে কেউ কেউ লেগে যায় ঝপাঝপ মারপিট। ধপাধপ্ কিল ঘুঁষি, আবার পনের কুড়ি সেকেন্ডের মধ্যেই সব ঠিকঠাক চুপচাপ।
    আমি সময় পেলেই শহরে ঘুরি, টইটই করে বেড়াই, আর দুমদাম জিনিষ কিনি, কিনতে কিনতে এমন হাল হলো যে একদিন একটা সুটকেস কিনতে হলো জিনিসগুলো ভরে রাখবার জন্যে। সুটকেস কিনে এনে সব জিনিষপত্তর গুছিয়ে গুছিয়ে ভরে রেখে, সেই জানলাটার এক্কেবারে পাশে গিয়ে উঠে বসলাম। কোনো গরাদ টরাদ নেই, পাল্লা পুরো খোলা, কোনো ভার্টিগো না থাকায় মাথা ঘুরে যাওয়া বা সেরম ভয়টয় ও করল না। ফুরফুরে হাওয়া দিচ্ছে, রাত নটার কাছকাছি, যদিও সূর্য অস্ত যায় নি; বসে বসে বেশ একটা স্যাটিস্ফ্যাকশান হচ্ছে এই ভেবে যে, ভিসা যদি আল্টিমেটলি না ও পাই, যদি ধৈর্যে না কুলোয় তবুও আফশোস নেই, শপিং যা করেছি তাতেই আমার মস্কো আসার সমস্ত ধকল পুষিয়ে যাবে। একেকবার বাইরের সীনসীনারী দেখছি, মেঘ ভাসছে, নীচে রাস্তায় তরুণ তরুণীরা ঝলমলে জ্যাকেট গায়ে হেঁটে যাচ্ছে, যানবাহন গাড়ী সবই চলছে নীচে, আওয়াজ আসছে না এত ওপরে; আবার ঘাড় ঘুরিয়ে ঘরের মধ্যিখানে নেভি ব্লু রংএর সুটকেসটা দেখছি, ভাবছি, আর দুয়েক দিন দেখেই রিটার্ণ করব সোজা তাশকেন্ত। কাল শুক্রবার, ভিসার লাইনে দাঁড়াতে হবে, তারপরে শনি রবি কাজ এগোবে না এম্ব্যাসী বন্ধ, সোমবার লাস্ট ট্রাই নেবো, হলে হোলো, না হলে ব্যাক টু প্যাভিলিয়ন।
    এইসব ভাবতে ভাবতে হঠাৎ দেখি ঘরের দরজার হাতলটা নড়ছে, দরজাটা খুলে গেল, আমিও চমকে গিয়ে পিছু হটতে গিয়ে আরেকটু হলেই নীচে "ইন্দিরা গান্ধি স্কোয়ার" এ ডিরেক্ট ল্যান্ড করছিলাম। দরজা খুলে ঘরে ঢুকল আমারই মতো আরো দুই ছাত্রী। বোঝা গেল, যে অ্যাদ্দিনে হোটেল সত্যিই হাউসফুল হলো।
    প্রথমে একটু সৌজন্য বিনিময়ের পর ওরা যে যার জায়গা বুঝে নিলো। আমি সুটকেস চাবি ঘুরিয়ে বন্ধ করে আমার আলমারিতে সরিয়ে রাখলাম। ওরা একজন তুনিসিয়া থেকে অন্যজন ইরাণ।
    রাত তখন ভালোই হয়েছে, ওদেরকে শুভরাত্রি জানিয়ে লেপের ভেতরে ঢুকে পড়েছি। ওরাও অল্পক্ষণের মধ্যে আলো নিভিয়ে দিলো। মনে হোলো ওরা আগে থেকেই দুজন দুজনকে চেনে, হয়ত একই শহরে থাকে, হয়ত একই হোস্টেলে থাকে বা হয়ত একই ক্লাসে পড়ে দুটোয়।
    ঘুমটা ভাঙ্গলো আরো কিছুক্ষণ পরে, ঘড়ি দেখিনি, কিন্তু ঘরে আলো জ্বললে আমি ঘুমোতে পারিনা। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলাম সারা ঘর লন্ডভন্ড ওরা নিজেদের ব্যাগসুটকেস তছনছ করছে, কি খুঁজছে কে জানে। কোনো আওয়াজ শব্দ করছে না বটে, মাঝে মাঝে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে নিচ্ছে আমি জেগে গেলাম কিনা, আমিও চোখ বুজে ঘুমোবার ভান করলাম। এবং ঐভাবেই ঘুমিয়ে পড়লাম। সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি কন্যাদ্বয় হাওয়া, অবিশ্যি নিজেদের জিনিষপত্র আবার গুছিয়ে রেখেছে, অল্প কিছু এটা সেটা এদিকে সেদিকে পড়ে রয়েছে, চিরুনি, লিপস্টিক, পারফিউম, এইসব।
    আবার দৌড় দিলাম ব্রিটিশ এম্ব্যাসী। আমার সিরিয়াল নম্বর আজ এগিয়ে এসেছে ৪৫ বা ৪২ অবধি, মোট কথা অবস্থা একবারেই আশাপ্রদ নয়।
    এভাবে দিনের পর দিন এই লাইনে দাঁড়ানো আর পোষাচ্ছে না। কেমন যেন সন্দেহ হয় যে এত কম লোক প্রত্যেকদিন ভিসা পেতে পারে না। ছাত্রছাত্রীরা সব এদিক ওদিকে বসে গল্প স্বল্প করছে, আমি ক্যাবলার মত গেটের পুলিশটার দিকে এগিয়ে গেলাম। এদিকে একটা মুরুব্বি টাইপ কোনো আফ্রিকান দেশের ছোকরা আমার ওপর নজর রাখছিলো। আমি পুলিশের সঙ্গে খোশগপ্পো জুড়ে দিলাম, "শুনছি, পোল্যান্ড নাকি যে কোন দিন বেরিয়ে যাবে, এই গ্রীষ্মেই?"
    এই প্রশ্নে সমাজতান্ত্রিক পুলিশ ঘেবড়ে গিয়ে বললো, "কী চাই? লাইনে দাঁড়ান!"
    -লাইনে তো গত সাতদিন ধরেই দাঁড়াচ্ছি, আজই লাস্ট, আর দাঁড়াবো না বুঝলেন? আচ্ছা ঐ পোল্যান্ডের খবরটাকি গুজব নাকি ক্যাপিটালিস্টদের প্রোপ্যাগান্ডা?
    -পাসপোর্ট দেখি!
    এই নিরীহ প্রশ্নের জন্যে পুলিশ কেন, কেজিবির বাবাও পাসপোর্ট বাজেয়াপ্ত করতে পারে না। (ওহ্ আবার সেই ভুল, পুলিশ নয়, মিলিৎসিয়া)। দূরে সেই মুরুব্বি আফ্রিকান কার সঙ্গে কথা বলছে, আমার দিকে নজর রাখছে হয়ত। পুলিশের সামনেই আমি ব্যাগ থেকে দশটা রুবল বের করে, পাসপোর্টের মধ্যে ঢুকিয়ে পুলিশের হাতে দিলাম, লুকোছাপা করে লাভ নেই। ও দেখতে পেয়েছে যে দশ রুবল দিয়েছি। ইচ্ছে না হলে ও নেবে না। অ্যাজ সিম্পল অ্যাজ দ্যাট। লোকটা জেনুইন ভালো লোক, টাকাটা পকেটে রেখে দিলো, পাসপোর্টটাও সঙ্গে রাখল, বলল সাইডে অপেক্ষা করতে।
    সকাল নটায় এম্ব্যাসীর ভিসা ক্লার্ক এসে দরজার বাইরে দাঁড়াতেই তার হাতে কয়েকটা পাসপোর্ট জমা দিলো পুলিশ, কয়েকজনের নাম ধরে ডাকা হলো; মুরুব্বির নাকের ডগা দিয়ে আমি গটগট করে ভিসা অফিসে ঢুকে গেলাম....
    মাস্কভা নদীর তীরে হলুদ রঙ্গের এম্ব্যাসী বাড়ী ঠিক যেন কোনো জমিদারের বাগানবাড়ী। যে পথটুকু ভিসা ক্লার্ককে অনুসরণ করতে করতে গেছি, চারিদিকের দৃশ্য কী মনোরম, কী মনোরম! ইয়াবড়োবড়ো টকটকে গোলাপে ভরা বাগান, ফোয়ারা, অফিসের ভেতর চারদিকে কত সুন্দর সুন্দর গালচে, ঝাড়বাতি, ওরিয়েন্টাল কাজকরা ফুলদানী এইসব দেখে টেখে মনে হচ্ছিল আরব্য উপন্যাসের প্রাসাদের মত। ভিসা নিয়ে বেরোতে বেরোতে প্রায় দশটা বেজে গেল। গোটা চারেক ট্র্যানসিট ভিসা নেবার ছিলো, হল্যান্ড বা বেলজিয়াম (যেকোনো একটা পেলেই চলত), দুটো জার্মানী (পশ্চিমেরটায় ভিসা ডিপার্টমেন্টের ব্যবহার অত্যন্ত খারাপ), আর পোল্যান্ড (পাঁচ মিনিটের ব্যাপার)। শুক্রবারের বাজার, তার ওপর একেকটা এম্ব্যাসী একেকটা জায়গায়, পোল্যান্ড হল্যান্ড হয়ে গেল, কিন্তু পশ্চিম জার্মানীর এম্ব্যাসীর ভিসা অফিসারের কী পোজ্পাজ্! অকারণে হম্বিতম্বি,এই মারে কি সেই মারে অ্যাটিটিউড। সেই অনেকটা "সায়েব খুব মেজাজী, আর আজ খুব রেগে আছেন!" গোছের লোক। তার ওপর রাশিয়ান তো বলেই না, ইংরিজিও জানে না। গ্যাটগ্যাট্ করে এসে ভিসা ফর্ম দিয়ে গেল হাতে হাতে, আমরা প্রায় কাঁপতে কাঁপতে কাগজগুলো নিলাম ও ফর্ম ফিলাপ করলাম। এরপরে সেই মেজাজী অফিসার আমাদের হাত থেকে প্রায় ছিনিয়ে নিয়ে গেল, ফর্ম ও পাসপোর্ট; অনেকটা সেই পরীক্ষার সময়সীমা শেষ হয়ে গেলে যেমন ইনভিজিলেটর খাতা ছিনিয়ে নেয়, সেইরকম। এই পুরো ঘটনাটা আমি কোনোদিনও ভুলতে পারব না। পাঁচরুবল করে ভিসা ফি জমা দিয়ে, স্ট্যাম্প লাগিয়ে যখন বাইরে এলাম, সেদিনের মতো পূর্বজার্মানীর এম্ব্যাসীর গেটে তালা পড়ে গেছে। সেই সোমবার অবধি অপেক্ষা, তর আর সইছে না।
    আমরা যারা এম্ব্যাসীতে একসঙ্গে ভিসা নিয়েছিলাম, কেউই কাউকে আগে দেখিনি, চিনিও না, তবুও বাইরে বেরোবার পরে আমাদের মধ্যেই একজন স্বগত প্রশ্ন করল, "লোকটা এত বাজে ব্যবহার করছিলো কেন বলতো?"
    আরেকজন উত্তর দিলো "কোষ্ঠকাঠিন্য!"
    সেই মন্তব্য শুনে বাকি সকলের সে কী হাসি... তখন আমরা যখন তখন হাসতে পারতাম, চেনা অচেনা যে কারও সঙ্গে। রাস্তায় নামতেই বৃষ্টি এলো। জুন মাসের মস্কোর বৃষ্টি। পুরো ভিজবার আগেই একটা শেড চাই, গাছ বা গাড়ীবারান্দা। জানি যে এ বৃষ্টি থেমে যাবে অল্পক্ষণ পরেই, আবার ঝলমলিয়ে উঠবে রোদ।
    হাঁটতে হাঁটতে অনেক এলোমেলো ঘুরলাম। মন ফুরফুরে, গলা ছেড়ে গাইছি, হাতে আছে মেট্রোর ম্যাপ, পথ হারাবার উপায় কিছুতেই নেই, তাই একটা ডাস্টবিন দেখেই তাড়াতাড়ি মেট্রোর ম্যাপটা সেখানে ফেলে দিয়েছি। তারপরে নিজের মনে হাঁটা। কিন্তু মস্কোকি কাউকে পথ হারাতে দেয়? আনাচে কানাচে ছড়িয়ে রেখেছে মেট্রো, সেই ফিরতে হলো হোটেলে।
    ঘরে ঢুকে দেখি ইরাণী মেয়েটি ঠিক আমার মতো জানলার ওপরে বসে আছে। আমি ঢুকতে নেমে এলো।
    - অন্যজন কই?
    - চলে গেছে।
    - তুনিসিয়া?
    - না ফ্রান্স, ট্রেনে।
    - আর তুমি?
    - আমিও যাবো, দুতিন দিনের মধ্যে
    - ইরাণ? মানে তেহরাণ?
    - পাগোল? প্যারিস্। আমার আত্মীয়েরা থাকে। মায়ের বোন।
    একটু পরে মেয়েটি আমার কাছে এগিয়ে এসে প্রশ্ন করল, "কাল রাতে আমি খুব চিন্তায় পড়েছিলাম, আলো জ্বালিয়ে একটা জিনিস খুঁজছিলাম, তোমার অসুবিধে হয়নি তো ঘুমোতে?"
    আমি ন্যাকা সাজলাম, - কই নাতো আমি তো কিছুই টের পাইনি! এবার একটু থেমে ও আবার বলতে থাকে, "আসলে একটা খুব দরকারী ওষুধ, সবসময় আমার ব্যাগে থাকে, কী করে যে হারালো জানি না, ভীষণ চিন্তা হচ্ছে... যদি কিছু হয়ে যায়..."।
    - কী ওষুধ? তুমি তাহলে এখুনি ডাক্তারের কাছে যাও পলিক্লিনিকে কিম্বা ওষুধের দোকানে...
    - ধূর বোকা মেয়ে!
    হেসে প্রায় গড়িয়ে পড়ল মেয়েটি, এ ওষুধ সে ওষুধ নয় রে, এ হলো পিল্, জন্মনিয়ন্ত্রণের...!
    হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়লাম এবার আমিও। বেজায় সংক্রামক সে হাসি।

    পরের দিন শনিবার। সকালে আমরা দুজনে নেমে এসেছি একদম একতলায়, যেখানে রেস্টুরেন্ট। ব্রেকফাস্টে কালো রুটি, মাখন আর কালো কাভিয়ার। কাভিয়ারকে রুশ ভাষায় বলে ইক্রা, আর এই ইক্রাগুলো যেমন খাঁটি (আর্টিফিশিয়াল ইক্রা যে হয়, তা ই জেনেছি অনেক পরে) আর তেমন সুস্বাদু, দামও গায়ে লাগবার মতো নয়। আর ছিলো সঙ্গে "স্মেতানা", এর ইংরিজি অনুবাদ "সাওয়ার ক্রীম" হলেও রাশিয়ান স্মেতানা দুনিয়ার অন্য কোথাও পাওয়া দুঃসাধ্য। (জার্মানীতে "কোয়ার্ক"বলে যা পাওয়া যায়, বা তা আর যা ই হোক স্মেতানা নয়)।
    এ মুহূর্তে ঘরে ফিরে যাবার মতো ফ্রাস্ট্রেটিং কিছু হতে পারে না। আমরা বেরিয়ে এলাম রাস্তায়। মেট্রো স্টেশন অবধি হেঁটে যাওয়া যাবে না, বাসে উঠলাম তারপরে মেট্রো নিয়ে শহরের মধ্যিখানে "পার্ক কুলতুরী"।
    এই পার্ক কুলতুরীর মেট্রো লাইন টা গোল, এক্কেবারে গোল। মানে কেউ যদি ঐ লাইনে মেট্রোতে চড়ে বসে তো সে যতক্ষণ খুশি পারে ট্রেনের মধ্যেই থেকে যেতে পারে, কোনো লাস্ট স্টপ নেই। আজ হয়ত এসব মেট্রো লাইনের নাম পাল্টে গেছে।
    আমরা ওপরে উঠে এলাম। বিরাট পার্ক, পার্কের মধ্যে লেক, লেকের মধ্যে নৌকো, আর চাদ্দিকে রেস্টুরেন্ট, গাছে ফুলে বাগানে জঙ্গলে একাকার ব্যাপার।
    একটা কথা বলা হয় নি, এ কটা দিন আমি যথারীতি পূর্ব অভ্যাসমতো সালোয়ার কামিজ ওড়না ইত্যাদি পরে ঘোরাঘুরি করেছি। সকালে যখন রেডি হচ্ছিলাম, মেয়েটি প্রশ্ন করল, "তোমার জিন্স্ নেই?"
    - আছে।
    আমার সসঙ্কোচ উত্তর। জিন্স্ পরতাম শুধু প্রাণের দায়ে, খুব ঠান্ডায়, যখন এক হাঁটুর ওপরে বরফ জমত। নইলেই আমার মরাল গার্জেনেরা তেড়ে মেরে আসবে, এই ভয়ে জিন্স্ থাকত এমার্জেন্সী পারপাসে। কারণ ইন্ডিয়ান লেড়কিদের সাড়ী ঔর সালোয়ার সুটেই সবচেয়ে সুন্দর দেখায় একথা কে না জানে?
    - তাহলে জিন্স্ পরে নে।
    এই ঝলমলে সামারে জিন্স্? বলাই বাহুল্য, যে আমার সঙ্গে সাকুল্যে একটাই জিন্স্ তায় হাল ফ্যাশানের নয়, অতি বাজে ঢোলা কাটিং (যাতে ফিগার প্রমিনেন্ট হয়ে না ধরা পড়ে), তার ওপরে একটা বিরাট ঢোলা শার্ট (আমার মরাল গার্জেনেরা ছোটো শার্ট পরা মেয়েদের "রেস্পেক্ট" করত না; তাই "রেস্পেক্ট্" পাবার জন্যে, সামনে পেছনে লম্বা ঝুলওয়ালা শার্ট পরতাম)। ঐ মেয়েটার কালেকশানে কী সুন্দর সুন্দর সব জিন্স্ আর দারুণ দারুণ সব টপ। সেগুলো পরতে খুব ইচ্ছে করছিলো, কিন্তু সাইজ ওর আমার থেকে একটু বড়ো হবে, আমি খুবই রোগা তখন আর ওর চেয়ে লম্বাও কিছুটা, তাই লজ্জার মাথা খেয়েও চাইতে পারলাম না।
    তারপরে ভাবলাম, "এই-ই ভালো হলো, ওব্যেস নেই, খামোখা সঙ্কোচ বোধ হতো, এই বুঝি বুক দেখা গেল, পেট দেখা গেল"।
    মেয়েটাকে দেখে বেশ ওপরচালাক মনে হচ্ছিলো, খুব গার্জেনি ফলাচ্ছে আমার ওপরে - আমায় নিরীহ ক্যাবলা পেয়ে। কী দরকার আমার ওর সঙ্গে যাবার? ও একাই যাক না! আমি নাহয় পরে আলাদা বেরোবো। ইচ্ছে হলে যাবো, না হলে যাবো না, ব্যাস। কিন্তু কী একটা অদ্ভুত টান, হয়ত ওর সততার প্রকাশ, সেই যে এক ঝটকায় কন্ট্রাসেপ্টিভ নিয়ে বলেছিলো, সেটাই আমাকে ওর দিকে টানছিলো। আমি ওকে মনে মনে ক্রিটিসাইজ করবার কে? ওতো আমার কোনো ক্ষতি করেনি। আমিই বরং ভীতু, কিছুটা অসৎ। কাজ হাসিলের জন্যে পেয়াদাকে ঘুষ দিই। ও কি দেয়? আমার পরিস্থিতিতে হলে কি দিতো? হয়ত দিতো। একটা দুটো সত্যি কথা বললেই যে সে ধোয়া তুলসীপাতা হবে, এমন কোনো মাথার দিব্যি আছে নাকি? তবু ওর সঙ্গ ছাড়তে পারি না। আইসক্রীম খেলাম ফ্রেশ স্ট্রবেরি দিয়ে বানানো, তারপরে আরো অনেক ঘুরতে ঘুরতে পৌঁছে গেছি "আর্বাৎ"।
    প্যারিসে যেমন মমার্ত্র, মস্কোয় তেমন ছিলো আর্বাৎ। "ছিলো" লিখলাম, কারণ আজকের মস্কো আমার সম্পূর্ণ অপরিচিত। আর্বাতে গাড়ী চলে না, ইঁট আর পাথরের রাস্তা, খুব পুরোনো রাস্তা, লম্বা সেই রাস্তার ওপরে চাইলে হাঁটো বসো গড়াগড়ি খাও কেউ তোমাকে বকবে না, মারবে না। আমার তাশকেন্তের গার্জেনরা নেই, আমি জিন্স্-টিশার্ট পরেছি,আমার সঙ্গে আরেকটা মেয়ে হাঁটছে, তার হেভি ফ্যাশনদুরস্ত জামাপ্যান্ট, মন আমার আনন্দে উড়ছে। কেউ গান গাইছে, কেউ ছবি আঁকছে, তাও সেকি একরকমের গান? এক রকমের ছবি? এ বলে আমায় দেখ তো ও বলে আমায় দেখ। এককোণে দাঁড়িয়ে ছিলো গোটা পাঁচেক ছোকরা হেভি কায়দা করে, তারা আমাদের ডাকলো!
    সর্বনাশ! আমার বুক ধড়ফড়। "আওয়াজ" খেলাম নাকি? কলকাতায় ইস্কুলে যেতে আসতেই "আওয়াজ খাওয়া" ওব্যেস হয়ে গেছে, এসব ক্ষেত্রে "শুনতেই পাইনি" গোছের ভান করে, বুকের ওপর ব্যাগ বা বইটই চাপা দিয়ে চুপচাপ মাথা নীচু করে হেঁটে চলে যেতে হয়, একদম পাত্তা দিতে নেই, তাতে নিজেরই অপমান। কেউ যদি আওয়াজ দেয়, সেই অবধি ঠিক আছে, কিন্তু যদি হাত ধরে একটা টান মারে? তখন? নিজের ইজ্জৎ রক্ষার দায়িত্ব আমার নিজের। বেচাল করলে তখন নিজেরই বিপদ। মেয়েদের ইজ্জৎ বলে কথা। একবার ইজ্জৎ হারালে সেকি আর কোনোদিন ফেরৎ আসবে? আমি পা চালালাম। এবং কয়েক পা এগিয়ে গিয়ে দেখি মেয়েটি আমার সঙ্গে নেই। পেছন থেকে সে ডাকল আমায়, "এদিকে আয়, এদিকে আয়" - (ইজিসুদা, ইজিসুদা —রাশিয়ানে)!"
    কী কেলো! পেছন ফিরে দেখি, ঐ ছেলেগুলোর সঙ্গে ও হেসে হেসে কথা বলছে। অগত্যা ফিরতে হলো ঐ দলটার সামনেই। ছেলেগুলোর মধ্যে দুজনের হাতে গীটার। ওরা আমাদের গান শোনাতে চায়। তবে এক শর্তে। গান শোনাবার পরে, ওরা এখানে আরো গ্যাঁজাবে, এবং তখন আমাদের থাকতে হবে ওদের সঙ্গে। কী বিপদ! এ কেমন অদ্ভুত আবদার? আমি চোখের ইশারায় মেয়েটিকে কিছু একটা বলতে গিয়ে পুরো ধরা পড়ে গেলাম। মেয়েটি ওদের বলল, আগে গান শোনাও তোমরা, তারপরে দেখছি।
    এর পরে ঝ্যাংঝ্যাং করে গীটার বাজিয়ে গান হলো, গান প্রায় শেষ হতে চলেছে, মেয়েটি চশমা টশমা খুলে হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে প্রায় আঁতকে উঠল।
    - হায়, হায়! আমাদের ভীষণ দেরী হয়ে গেছে, আমাদের বন্ধুরা অপেক্ষা করছে আর্বাতের ঐ মোড়ে।
    - সত্যি?
    - বিশ্বাস না হয় তো দেখবে চলো আমাদের সঙ্গে!
    আমরা কেটে পড়লাম সেখান থেকে। কত গুলো অজানা ভয়ের ওপর ভিত্তি করে কেটেছিলো আমার জীবনের বেশ কিছু বছর। সেগুলো আসলে একজিস্টই করে না? আমি হাওয়ায় ভর করে ভেসে চলছিলাম আর্বাতে।

    উড়তে উড়তে আর ভাসতে ভাসতে যখন রাস্তার শেষপ্রান্তে পৌঁছেছি আমরা, সেখানে আবার শুরু হচ্ছে বাস্তব। বাস্তব, কিন্তু আগের মতো নয়, জ্যারা হটকে। চওড়া রাস্তায় শনিবারের বাজারেও খুব ব্যস্ততা।
    মেয়েটিকে বললাম, শুধু ইস্ট জার্মানীর ভিসার জন্যেই আটকে গেলাম, নইলে এই রবিবারেই হয়ত ট্রেন ধরতে পারতাম।
    - বাকি সব ভিসা পেয়ে গেছিস?
    - গেছি।
    - তাহলে ওটা না নিলেও চলবে, ট্রেন বর্ডারে এলে ওখানেই নিয়ে নিবি, যেতে পাঁচ মার্ক আর ফিরবার সময়ে পাঁচ মার্ক।
    - মাইরি!
    আমি আনন্দে প্রায় দৌড়তে লেগেছি টিকিট অফিসের দিকে, ও-ও আসছিলো সঙ্গে। টিকিট অফিসে পৌঁছে দেখি রবিবারের টিকিট নেই। আগামী দেড়মাসের সব টিকিট রিজার্ভড্। আরো দশ কুড়ি রুবল ব্যাগ থেকে বের করে একটা লাস্ট ট্রাই নেব কিনা ভাবছি, — ঘুষ ছাড়া এদেশে যে কোন কাজ হওয়া খুব মুশকিল, হঠাৎ চোখ পড়ে গেল পাশের কাউন্টারের বিমর্ষ চেহারার এক ছোকরার দিকে। বেচারার কাছে, ঠিক আমার মতই টিকিট, তবে রবিবারের। অথচ ও এখনো ভিসা পায় নি, কাঁদো কাঁদো মুখে পরের কোনো তারিখের টিকিট খুঁজছে, আর কাউন্টারের মহিলাটি ওকে ঝাঁঝিয়ে বলছে, "কত্তোবার বলেছি, টিকিট নেই, টিকিট নেই! আমি কি টিকিট প্রসব করব?"
    আমি আমার টিকিটটা ছেলেটিকে দিলাম, ওর তো হাতে চাঁদ পাবার মতো মুখ হয়ে গেল। আর ওর টিকিটটা আমি নিয়ে নিলাম। আর টুক করে, ভিসার লাইন কীকরে ছোটো করে ফেলতে হয়, সেই মন্ত্রটুকু ঐ অচেনা ছেলেটিকে বলে দিয়ে আমরা সিঁড়ি বেয়ে দুড়দাড়িয়ে ফের রাস্তায়।
    সামনেই মেট্রো, আমাকে গুছিয়ে নিতে হবে, জল এবং খাবার দাবার কিনে নিতে হবে আজ পথের জন্যে, সময় বেশি নেই... শনিবার সবকিছুই তাড়াতাড়ি বন্ধ হয়ে যাবে। ট্রেন সোভিয়েত ইউনিয়নের সীমানা পেরিয়ে গেলে রুবল মূল্যহীন, সব খাবার ডলার ভাঙিয়ে কিনতে হবে, যতটা পারি খাবার রুবল দিয়ে কিনে ফেলি এখন। মেয়েটি মেট্রো স্টেশনের ভেতর অবধি এলো একেবারে প্ল্যাটফর্মে, কিন্তু ও তখন আমার সঙ্গে ফিরবে না। হয়ত এস্কালেতর বেয়ে অন্য লাইনে গিয়ে অন্য ট্রেন ধরবে। আমার ট্রেন আসছে। মেয়েটি বলল, আজ একটু ঘুরব, আজ শনিবার —আমার কিছু বন্ধুবান্ধব আছে মস্কোয়, আজ রাতে ফিরব না, কাল রবিবার , উঁহু কালও হোটেলে সকাল সকাল ফিরছি না, তোর তো কাল দুপুরে ট্রেন, অতএব তোর সঙ্গে আমার আর দেখা হচ্ছে না। বাই।
    ট্রেনের দরজা খুলে গেছে, আমি ভেতরে, ভীড় নেই খুব বেশি, আমি দরজার সামনেই দাঁড়িয়ে আছি। অ্যানাউন্সমেন্ট হচ্ছে ভেতরে, "আস্তারোঝনা, দ্ভেরি জাক্রিভায়ুৎসা" (সাবধান! দরজা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে...), হঠাৎ খেয়াল হলো ওর নাম তো আমি জানি না, কখনও জিগ্যেসই করা হয় নি। কি ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি।
    - অ্যাই তোর নাম কী?
    - রাইদা। রাইদা জাব্বানি। আর তোর নাম?
    আমিও বললাম নাম আমার, কিন্তু ততক্ষণে অটোম্যাটিক দরজা বন্ধ হয়ে গেছে, ট্রেন চলতে শুরু করেছে।
    সেদিন গুছিয়ে খাবার দাবার বাজার করলাম। পথের খাবার, জল, আর এক ব্লক সিগারেট। নামটাও মনে আছে সেই সিগারেটের; রোদোপি, বুল্গেরিয়ান তামাক। হয়ত সেই কোম্পানী উঠেই গেছে এতদিনে।
    তাশকেন্তে আমরা লুকিয়ে সিগারেট খেতাম। কারণ সিগারেট স্মোকিং মেয়েদের স্বাস্থ্যের জন্যে বেশিবেশি ক্ষতিকর। মেয়েদের পেটে বাচ্চা হয় কিনা, তাই। বাচ্চা পয়দা করার মত কাজে যাতে ব্যাঘাত না ঘটে, মেয়েদের সিগারেট খাওয়া মানা। অবশ্য লুকিয়ে খাওয়া যেতে পারে। কিংবা এক্কেবারে ওপেন এয়ারে, খোলা আকাশের নীচে, যেখানে গার্জেনমন্ডলীর বাবাও দেখতে পাবে না। আর দেখতে পেলেও বুঝতে পারবে না, কারণ আমার পরণে এখন জিন্স্ আর শার্ট। শার্টের ঝুলটা একটু বেশী লম্বা, কিন্তু আমি আরেকটা উপায় বের করে ফেলেছি, শার্টের নীচের কটা বোতাম খুলে নিয়ে গিঁট মেরে কায়দা করে পরা। আরে: ফ্যাশন কি আমি ঐ মেয়েটার চেয়ে কিছু কম জানি নাকি? আর এসব সত্ত্বেও যদি ঐ মাতব্বরেদের কেউ আমাকে দেখে ফ্যালে, তারপর চিনে ফেলে জ্ঞান দিতে আসে, তবে আমি জাস্ট ডিনাই করব। বলবই না যে আমি কোন দেশীয়। জাস্ট ভাগিয়ে দেব ওদের, ঠিক যেভাবে টুস্কি দিয়ে উড়িয়ে দিলাম, পুড়ে শেষ হয়ে আসা সিগারেটটা।
    পরের দিন হোটেলের ভাড়া চুকিয়ে, "বেলারুস্কি ভাকজাল" (যে রেল ইস্টিশানের থেকে ট্রেন ধরার কথা ছিলো, সেটার নাম)-এর গুদাম ঘরে আমার বিপুল সম্পত্তি ভর্তি নেভি ব্লু সুটকেস্ জমা করে দিয়ে, হালকা চালে প্ল্যাটফর্মে এলাম। ট্রেন দাঁড়িয়ে রয়েছে, ছাড়বে আড়াইটেয়।
    আমি চলেছি এক অচেনা সফরে, অচেনা অজানা দেশের মধ্য দিয়ে দিয়ে। এদের প্রায় কারোরই ভাষা জানি না আমি, কালচার তো আরো বহুদূর। মনে মনে ঐ না দেখা দেশগুলো সম্পর্কে অনেক কিছু আন্দাজ করে নিচ্ছি, যেগুলো পরে হয়ত মিলবে না, ঠিক যেমন প্রেডিকশনের সঙ্গে বিলকুল মেলেনি ইরাণী মেয়েটি।
    মাঝরাতে ট্রেন পৌঁছবে ব্রেস্ট্, সেখানেই শ্বেতরাশিয়া(বেলোরুস্)-র তথা সোভিয়েত দেশের সীমান্ত পেরিয়ে আবিষ্কার করব নতুন নতুন দেশ।
    সেবারের সফর খুব উত্তেজনাময় হয়েছিলো, আর রহস্য রোমাঞ্চে ভরপূর, বেড়ানোর পাশাপাশি শপিং চলছিলো সাধ্যের ভেতরেই। তবু কেন জানিনা, ড্রেস মেটিরিয়ালের দোকানে গিয়ে পাঁচমিটার-পাঁচমিটার করে সালোয়ার সুটের পিস্ আর কেনা হলোনা। লন্ডন থেকে ফেরার আগের দিন খুব সাহস করে একটা আকাশি রঙের জিন্স কিনি, কুড়ি পাউন্ড দিয়ে। স্কীন টাইট। পরে অনেক অনেক ব্যবহারে, ওর হাঁটুদুটো ছিঁড়ে যায়, আরো প্রিয় হয়ে ওঠে জিন্সটা আমার কাছে। কারণ ততদিনে হুইটনি হিউস্টনের "আইল বি য়োর বেবী টুনাইট" কাঁপিয়ে ফেলেছে দুনিয়া, এম্ টিভির টপ টেনে নাম্বার ওয়ান! কিন্তু সেতো অনেক পরের কথা। সেই ১৯৮৯-৯০ এই আমার দুনিয়ায় অনেক কিছু পাল্টে গেল। আসলে হয়ত গোটা দুনিয়াটাই পাল্টাচ্ছিলো, পোল্যান্ড বেরিয়ে গেল সমাজতন্ত্রকে কলা দেখিয়ে, ৮৯এর নভেম্বরে হুড়্মুড়্ করে ভেঙ্গে গেল বের্লিনের দেয়াল, যে দেয়ালের এপার আর ওপার দুদিকই দেখা হয়ে গেছল সৌভাগ্যক্রমে।
    আর একটা জিনিষ বেরিয়ে গেল ক্রমে আমার ভেতর থেকে, অকারণ ভয়, অচেনা জুজুকে সমীহ করে বলা, "... তোমায় নত হয়ে যেন মানি, তুমি কোরোনা কোরোনা রোষ..."।

    ৯ই নভেম্বর ১৯৮৯ এ কোথায় ছিলাম আমি? ছিলাম সোভিয়েত দেশের তাশকেন্ত শহরে; সেদিন সন্ধ্যে সাড়ে আটটায় টেলিভিশনের খবরে খুব একটা হাঁকডাক করে পাঁচিল ভাঙার খবর প্রচারিত হয় নি, বলতে গেলে ঐ খবর যতটা সংক্ষেপে সম্ভব প্রচারিত হয়েছিল, যদিও সারা দেশ জুড়ে উত্তেজনা ছিলো টানটান।
    কিন্তু যেদিনের কথা বলব বলে এত পাঁয়তাড়া কষছি, সেদিনটা ঐ ১৯৮৯ এরই জুলাইয়ের শেষে কোনো একটা দিন। এখন আর ইচ্ছে করছে না পুরোনো পাসপোর্ট ঘেঁটে জার্মান ডেমোক্র্যাটিক রিপাবলিকের স্ট্যাম্প দেখে ঠিক তারিখটুকু মিলিয়ে নিতে, কিন্তু আমি নিশ্চিত যে সেটা ছিলো জুলাইয়ের শেষের কোনো দিন, সেদিন পশ্চিম ইয়োরোপে গরমের ছুটির কয়েকটা দিন কাটিয়ে ফিরছি সোভিয়েত ভূমিতে। পুরো যাত্রাটাই ছিলো স্থল আর জলপথে; তারমধ্যে দুই জার্মানীই ট্রেনে করে যাতায়াত। যাবার সময়ে ট্রেন থেকে জার্মানীতে নামিনি ফিরবার পথে নামলাম পশ্চিম বের্লিনে। ১২ ঘন্টার ট্র্যানজিট ভিসা ছিলো পশ্চিম জার্মানীর, ইন্ক্লুডিং ল্যান্ড বের্লিন। সবে তখন সকাল আটটা, পশ্চিম বের্লিনের সেই স্টপ অবধিই যাবে আমার ট্রেন, নেমে যেতে হলো সকলকেই। স্টেশনের বাইরে জায়গাটার নাম "জুলগিশের গার্টেন" , অর্থাৎ চিড়িয়াখানা আশেপাশেই কোথাও। খবর নিয়ে জানা গেল, এখান থেকে ট্রেন বদল করতে হলে বিকেল অবধি অপেক্ষা করতে হবে। টিকিট কাউন্টারের চারপাশে জটলা, আমারই মত কিছু স্টুডেন্ট উশখুশ্ করছে কখন কাউন্টারে লোক আসবে, সেই প্রতীক্ষায়। ঘড়িতে বলছে সকাল নটা। ব্যাগেজ বলতে কাঁধে একটাই ব্যাগ, সেটা তেমন ভারীও নয়। মনে মনে খুব ইচ্ছে আমার, একটা ভালো মিউজিক সিস্টেম কিনব, ডবল ক্যাসেট ওয়ালা, কিংবা একটা সিন্থি (এক সিনিয়র স্টুডেন্টের ঘরে দেখে এসেছি দুর্দান্ত একটা সিন্থেসাইজার, সে গেলবছর পশ্চিম বের্লিন থেকে কিনেছিলো, পাঁচটা অক্টেভ তাতে, আর কতো রকমের বাজনার আওয়াজ বেরোয় সেটা থেকে)। দাম কত পড়বে জানি না, পকেটে সাকুল্যে একশরও কম ডলার। তিন ডলার ইজ ইকুয়ালটু পাঁচ ডয়েচ মার্ক এরকম একটা হিসেব সবসময় করে রাখি মাথায়। অবিশ্যি পুর্ব জার্মানীর ট্রান্জিট ভিসা কিনতে হবে, পাঁচ ডয়েচ মার্ক তার দাম, সেটাকা আলাদা করে সরিয়ে রেখেছি।
    ছাত্রদের (আমি ব্যতীত আর কোনো ছাত্রী নেই তখন সেখানে) জটলায় গিয়ে যেচে আলাপ করলাম, এরা সবাই রাশিয়ানে কথা বলছে। বোঝা গেল আমরা সকলেই সন্ধের ট্রেন ধরবার মতলবে আছি। এর মধ্যে কাউন্টার খুলে গেছে, কাঁচের জানলার ওপাশে একজন সুন্দরী মহিলা, ইংরিজি বোঝেন না। আমরাও কেউ জার্মান জানিনা। অনেক কষ্টে সৃষ্টে হাত টাত নেড়ে টিকিট দেখিয়ে যা বোঝা গেল, তা হচ্ছে আমাদের টিকিট আছে কিন্তু রিজার্ভেশন নেই। রাতের ট্রেনে যেতে হলে নৈশকালীন রিজার্ভেশন লাগবে যার দাম মাথা পিছু পঞ্চাশ ডয়েচ মার্ক।
    মাথায় বজ্রাঘাত। সময় বয়ে যাচ্ছে হুহু করে। ট্রানজিট ভিসা শেষ হতে আর ঘন্টা দশেক বাকী, পকেটে সীমিত টাকা যার বিনিময়ে মিলবে ট্রেনের রিজার্ভেশন অথবা কিনলেও কিনতে পারি আমার স্বপ্নের সিন্থেসাইজার।
    দ্রুত চিন্তা করতে লাগলাম আর সেইসঙ্গে স্ক্যান করছিলাম চারপাশের পরিস্থিতি। যে ছাত্রগুলো জটলা করছিলো, বুঝলাম ওদের অনেকের কাছেই পঞ্চাশ ডয়েচ মার্ক নেই। এদের মধ্যে একটি ছেলের সঙ্গে বেশ বন্ধুত্ব হয়ে গেল। নাম পেদ্রো। ল্যাটিন অ্যামেরিকার কোনো একটা দেশের, সম্ভবত: পেরু। সেও যাবে সোভিয়েত দেশ, এদিকে ওর সমস্যা আমার থেকেও বেশি। বেচারার এন্ট্রি ভিসার মেয়াদ ফুরোচ্ছে সেইদিনই, অথচ ট্রেনে করে শ্বেতরাশিয়ার (বেলারুস) বর্ডার পৌঁছোতে পৌঁছোতে ক্যালেন্ডারের তারিখ আরো এগিয়ে যাবে অন্তত: এক দিন। অবিশ্যি এ নিয়ে ওর মধ্যে খুব একটা টেনশনের ছাপ দেখতে পেলাম না। সারাদিন ঘুরলাম দুজনে বের্লিনের রাস্তাঘাটে, সেদিন আবার ছিলো শনিবার। পেদ্রো যে সোভিয়েত এম্ব্যাসীতে গিয়ে এন্ট্রি ভিসার মেয়াদ বাড়িয়ে নেবে সে উপায় পর্যন্ত নেই।
    স্টেশন এলাকাটা একেবারেই বাজার এলাকা। দেহব্যবসার দোকানপাটে জ্বলজ্বল করছিলো। ওরকম শোকেসের দিকে তাকাতে অভ্যস্থ ছিলো না আমার চোখ। পঞ্চাশ ডয়েচ মার্কের বিনিময়ে "পীপ শো", আরো কতো কি! রাস্তার মোড়ে মোড়ে ফরেন কারেন্সি ভাঙ্গাবার বুথ। সেখানে আবার মিনিটে মিনিটে ওঠা পড়া করছে ডলারের দর। ধাঁ করে বেশ ভালো দর পাবার মুহূর্তে ডলার ভাঙ্গিয়ে ফেলতে না পারলে, নিজেকে "লুজার" মনে হতে বাধ্য। ঐ এলাকা দ্রুত পেরিয়ে আমরা চলে গেছি একটু স্বস্তিকর জায়গায়, যেখানে চোখ তুলে তাকাতে অস্বস্তি নেই, নিজেকে পন্যসামগ্রীগোত্রীয় মনে হচ্ছেনা যেখানে। সামনেই একটা অদ্ভুত সুন্দর দোকান, যেখানে আমার পছন্দের জিনিসটি সাজানো রয়েছে শোকেসে। সিন্থেসাইজার। বেশ দরদাম করে কিনলাম জিনিসটা, রীতিমতো বার্গেন প্রাইস, দোকানদার একজন রাশিয়ান, নির্ঘাৎ সোভিয়েত দেশ থেকে পলাতক। সিন্থির সঙ্গে ফাউ পেলাম একটা মেকাপ কীট।
    দোকান থেকে বেরিয়ে মনটা খুশী, পকেট প্রায় খালি এবং এটাও স্থির যে উইদাউট রিজার্ভেশনই আমরা আজ ধরছি রাতের ট্রেন। এমন সময়ে তেড়ে এলো বৃষ্টি, দুজনের দৌড়ে গিয়ে ফুটপাথের এক গাড়ীবারান্দায় দাঁড়ানো, কোত্থেকে উদয় হলো একটা লোক, দুর্বোধ্য জার্মান ভাষায় আমাদের রীতিমতো বকে ধমকে গাড়ীবারান্দা থেকে তাড়ালো; তার অল্প পরেই অবশ্য বৃষ্টি থেমে গেল, আর আমরাও রাগের মাথায় টিকিট না কেটে বের্লিনের মেট্রোয় চড়লাম (ভাগ্যিস টিকিট চেকার ধরেনি) এবং ফিরলাম সেই বড়ো স্টেশনটায়।
    সকালে যেসব ছাত্ররা জটলা করছিলো ওখানে তারা অধিকাংশই কে কোথায় চলে গেছে। দুজন মাত্র ছিলো, তারা জানালো একটু পরেই লোকাল ট্রেন ধরে আমরা ঢুকে যেতে পারি পূর্ব বের্লিনে, তারপর সেখান থেকে চেষ্টা করব রাতের ট্রেন ধরবার। উত্তম প্রস্তাব। বিকেল হয়ে এসেছে। বর্ডারগামী ট্রেন এসে পৌঁছোলো প্ল্যটফর্মে। সেটায় চড়ে আমরা জনা চারেক অচেনা ছাত্রছাত্রী হৈহুল্লোড় করতে করতে পৌঁছোলাম চেক পয়েন্টে।
    এটা ঠিক পুরোটা আন্ডারগ্রাউন্ড নয়। ট্রেন থেকে নেমে লম্বা রাস্তা শুধু হাঁটা হাতে লাগেজ নিয়ে। আমার একহাতে আদরের সিন্থি, অন্যকাঁধে ব্যাগ। অনেকের সঙ্গে প্লটার (এসব তারা কিনেছে পশ্চিম থেকে, পার্সোনাল কম্পুটার বা প্লটার তখন খুব বিক্রি হতো চড়া দামে সোভিয়েত ইউনিয়নে, তবে মাথা পিছু একটাই অ্যালাও করত সোভিয়েত কাস্টমস)। অত ভারী ভারী জিনিষ হাতে নিয়ে অতটা হাঁটা একটু কষ্টকর। অজস্র কাউন্টার। মাথার থেকে উঁচু লেভেলে জানলা, তার ওপাশে পুর্ব জার্মান ইমিগ্রেশন কাউন্টার। হাত উঁচু করে বাড়িয়ে দিলাম পাসপোর্ট আর তিন ডলার। দাম্ দাম্ করে ট্রানজিট ভিসার ছাপ পড়ল পাসপোর্টে "DDR" (ডয়েচে ডেমোক্রাটিশে রেপুব্লিক, যে দেশে ডেমোক্র্যাসীর নামগন্ধ নেই!)।
    আবার হাঁটা, তারপরে একটা হলঘরের মতো জায়গায় জড়ো হয়েছি সকলে। এদিকে বাথরুম পেয়েছে ভীষন। সামনেই টয়লেট। ব্যবহার করতে লাগবে ৫০ ফেনিগ, পূর্ব জার্মানীর ফেনিগ। সরকারী হিসেবে পূর্ব-পশ্চিমের মার্কের দাম সমান সমান, যদিও ব্ল্যাক মার্কেটে এ হিসেব ছিলো সম্পূর্ণ অন্যরকম। একটা পশ্চিমি ৫০ ফেনিগের কয়েনের বিনিময়ে বাথরুম ব্যবহার করে এলাম বাইরে। একটা তোরণ, বিশাল সেই তোরণের নীচে আমরা জড়ো হয়েছি, সেখান থেকে সিঁড়ি দিয়ে নেমে চারপাশে অনুভব করলাম একটা ধূসর শহর। আগাগোড়া ধূসর। পশ্চিম বের্লিনের নিয়ন শোভিত পীপ-শোয়ের দোকান যদিও নেই, কিন্তু নেই কোনো রং, সবই ধূসরের বিভিন্ন শেড। সন্ধ্যা নেমে গেল, গ্রীষ্মকাল বলেই নামল দেরিতে। পোলিটিক্যাল ইকনমিক্সের ক্লাসে প্রোফেসর সাদিকভ আমাদের কি চমৎকার পড়াতেন "আদর্শ সমাজতান্ত্রিক দেশের কাঠামো" উদাহরণ সহকারে। ইম্পেরিয়ালিজমের সর্বোচ্য স্তর, সেখান থেকে কী ভাবে সমাজতন্ত্রে অবশ্যম্ভাবী ট্রানজিশন হয়। দুনিয়ার সবচেয়ে সফল সমাজতান্ত্রিক দেশটির নামও আমাদের ঠোঁটের গোড়ার রেডি থাকত। সেই দেশ আসলে বিচিত্র ধূসর শেডের কোলাজমাত্র? হায়রে, আমি যে প্ল্যান করেছিলাম অনেক অনেক ডার্ক চকোলেট কিনব! এই আবছায়া অন্ধকারে কোথায় খুঁজব এখন চকোলেটের দোকান?
    একটা থমথমে সন্ধ্যা। শান্ত প্রায়ান্ধকার পথে হাঁটছি চার সাথী, আর কয়েকশো পা এগিয়ে এদিকের স্টেশন, ঢিল ছোঁড়া দূরত্বে বের্লিনের দেয়াল। ফাঁকা স্টেশন, খোলা আকাশ, খুব কম লোক। একপাশে আস্তে আস্তে জড়ো হচ্ছে চেকপয়েন্ট পেরিয়ে আসা পূবগামী ট্রেনের সন্ধানী যাত্রীরা। ওদের কি রিজারভেশন আছে সবার? কখন আসবে ট্রেন? টিমটিমকরে জ্বলছে কিছু বাতি। খোলা আকাশের নীচে আমরা, আকাশে মেঘ নেই এই যা ভরসা। অনেকেই বসে পড়েছি প্ল্যাটফর্মে। সারাদিন খাইনি, কিন্তু আমার সত্যিই খিদে পায় নি, তেষ্টাও নেই। মনে আনন্দ পছন্দের সিন্থি কিনতে পেরেছি বলে, তাতেই যেন পেট ভরে রেয়েছে। অন্যদিকে দুশ্চিন্তা, ট্রেনে যদি উঠতে না দেয়? কোথায় যাবো এত রাত্তিরে ওপাশে কয়েকজন স্লীপিং ব্যাগের মধ্যে শুয়ে পড়ল। আমি ব্যাগ আর সিন্থি আঁকড়ে, তারই ওপরে মাথাটুকু এলিয়ে দিলাম। এভাবে কতক্ষণ কেটেছে জানিনা। হঠাৎ ধড়মড়িয়ে উঠলাম পেদ্রো আমায় ঝাঁকিয়ে তুলে দিচ্ছে ঘুম থেকে। কোথায় আমি? ঠাওর করতে করতেই দেখি প্ল্যাটফর্মে ঢুকছে আমার পরিচিত গাঢ় সবুজ রঙের সোভিয়েত ট্রেন। এই অল্প আলোয় যদিও ভালো বোঝা যাচ্ছে না তার রং, তবু ঐ ট্রেনটুকুই যেন আমার ভরসা, আমার চেনা দেশের চেনা মাটির গন্ধ আর মায়া ভরা তার আনাচে কানাচে। কিন্তু ট্রেনে উঠব কেমন করে? সব রিজার্ভড কামরা, — হুড়্মুড় করে তাতে ঝাঁপিয়ে পড়ছে বাকী যাত্রীরা। বিরাট বিরাট কম্পিউটারের বাক্স, প্লটারের বাক্সের ঠেলায়, মানুষের ধাক্কায় আমি দরজার কাছেই ঘেঁষতে পারছিনা যে! এত গুঁতোগুঁতির মধ্যে পারব কেমন করে? পেদ্রো আমাকে বলল, "তোর জিনিসগুলো আমার হাতে দে। তারপরে ট্রেনে ওঠ্, তারপরে আমি তোর জিনিস জানলা দিয়ে ভেতরে ফেলে দেবো"। তাই করলাম। ট্রেনের একপাশে করিডোর, অন্যপাশে রিজার্ভড কামরা। আমার কোনো সীট নেই, ওপেন টিকিট; আমি করিডোরে ভীড় বাঁচিয়ে একটা জানলার পাশে এসে অতি কষ্টে কাঁচ নামাতে পেদ্রো এক এক করে আমার জিনিস, ওর নিজের জিনিস সব তুলে দিলো আমার হাতে। একটু পরে দেখলাম ও নিজেও উঠতে পেরেছে। আমি দাঁড়িয়ে আছি করিডোরে, ভয়ে আমার গলা শুকিয়ে যাচ্ছে। এখনো যদিও কডাক্টর গার্ড টিকিট চায় নি, তবুও ভয় করছে, মনে হচ্ছে আমার লুকোবার একটা জায়গা চাই। একে একে সবাই যার যার কম্পার্টমেন্টে ঢুকে গেল। আমার সঙ্গের অন্য সঙ্গীরা এই ওয়াগনে ওঠে নি, তাদের দেখতে পেলাম না। করিডোরের শেষ প্রান্তে গার্ডের নিজের কেবিন। তাকে তার ইউনিফর্ম আর টুপি দেখেই চেনা যাচ্ছে। অন্যপ্রান্তে দুজন ইমিগ্রেশন পুলিশ। পূর্বজার্মানীর। পেদ্রো আর আমি, ঠিক মিউজিক্যাল চেয়ারের খেলায় হেরে যাওয়া পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে, সব সীট ভরে গেছে শুধু করিডোরে দুজন দাঁড়িয়ে যাদের কোনো রিজার্ভেশন নেই।
    এরই মধ্যে ট্রেন ছেড়ে দিয়েছে আমরা দুলছি অল্প অল্প করে ট্রেনের ঝাঁকুনিতে, টিমটিমে আলোয় তখনো দেখা যাচ্ছে বের্লিনের পাঁচিল, অন্ধকার ছায়ার মতো। পুলিশ দুটো নিজেদের মধ্যে গল্প করতে লাগলো, অন্যদিকে গার্ড চা খাচ্ছে। আমার ঘুম পাচ্ছিলো, করিডোরের মেঝেতে বসে পড়লাম, তারপর ঘুমিয়ে পড়লাম মেঝেতেই।
    -"বিলিয়েৎ! পাসপোরৎ!"
    কতক্ষণ ঘুমিয়েছিলাম জানিনা। গার্ড টিকিট আর পাসপোর্ট চাইতে ঘুম ভেঙ্গে গেছে।
    "আপনার তো রিজার্ভেশন নেই!" গার্ডের রাশিয়ান উচ্চারণে অদ্ভুত একটা টান। পরে জেনেছিলাম সে পোল্যান্ডের লোক।
    "না, নেই। আসলে ..আমি ঠিক সময় পাই নি..." আমতা আমতা করে যাতা মিথ্যে বলতে শুরু করেছি।
    "কিন্তু কোনো সীট খালি নেই এই ট্রেনে আজ রাতের জন্যে, কী করবেন তাহলে?" গার্ড প্রশ্ন করল আমাকে।
    "আমার শোবার জায়গা চাইনা, যদি এই করিডোরেই বসে থাকি আজ রাতটা?"- আমার তাৎক্ষণিক সলিউশান।
    "উঁহু, সেটা হয় না!" গার্ড আমার টিকিট আর পাসপোর্ট নিয়ে চলে গেল। আমি এত টায়ার্ড, যে আবার বসে পড়লাম; ভাবতে লাগলাম, কখন সকাল হবে? কখন পোল্যান্ড আসবে? তার আরো কতো পরে আসবে বেলারুস? আর এইসব ভাবতে ভাবতে আবারো ঘুমিয়ে পড়লাম। অল্প ঝাঁকুনি এবার। না, কেউ ডাকেনি। রাত আরো গভীর হয়েছে, ট্রেন থেমেছে পূর্ব জার্মানীর কোনো একটা স্টেশনে, করিডোরের আলোগুলো অধিকাংশই নেবানো, শুধু দুইপ্রান্তে দুটি টিমটিমে বাল্ব জ্বলছে। কে একজন একটু দূরে জানলার কাঁচ নামিয়ে সিগারেট খাচ্ছে। লম্বা ছায়ামূর্তি। কোন স্টেশন এটা? বাইরে কিছুই দেখা যায় না। এবার পেদ্রোকে দেখলাম; ওর ব্যাগটাও আমার ব্যাগের কাছেই ছিলো, ও ব্যাগ নিতে এদিকে এলো, সঙ্গে সেই দুটো পুলিশ, এরা দিব্যি রাশিয়ান জানে; পূর্বজার্মানীর পুলিশ। একটু পরেই আসবে পোল্যান্ডের বর্ডার। ওরা নামিয়ে নিয়ে গেল পেদ্রোকে। ওর সোভিয়েত দেশে ঢুকবার ভিসার মেয়াদ পেরিয়েছে, রাত বারোটা তার মানে পেরিয়েছে বেশ কিছুক্ষণ আগেই। পেদ্রো অবিশ্যি প্রাণপনে বোঝাচ্ছে পুলিশদুটোকে, কিন্তু কে কার কথা শোনে! এর নামই কি অ্যারেস্ট করে নিয়ে যাওয়া?
    আবার আরেকটা ঝাঁকুনি, ট্রেন ছেড়ে দিলো, পুলিশ দুটো নেই, পেদ্রো ও নেই, করিডোরে আমি একা। গার্ড আসছে। সে আমাকে একটা ভদ্রস্থ বসবার জায়গা দিতে চায়, কিন্তু ডলার চাইছে, কিংবা ডয়েচ মার্ক।
    নেই। আমার কাছে ডলার নেই, মার্ক নেই, যাছিলো ফুরিয়ে গেছে বের্লিনেই। আছে রুবলের চেক, যা বেলারুস অবধি না পৌঁছোলে ভাঙ্গানো যাবে না। যে করে হোক আমাকে ঐ অবধি পৌঁছতেই হবে। হঠাৎ আমার পায়ের দিকে নজর পড়ে গার্ডের। রূপোর নূপুর পায়ে। তাকে খুলে দিলাম নূপুর, রিজার্ভেশনের দাম। ঠিক সেই মুহূর্তের জন্যে অবলুপ্তি ঘটল টাকা-পয়সা-মুদ্রার। বার্টার সিস্টেমের এক নতুন উদাহরণ তৈরী করতে করতে আন্তর্জাতিক ট্রেন তখন পূর্ব জার্মানী পেরিয়ে পোল্যান্ডে ঢুকছে।

    ট্রেনটা পোল্যান্ডে ঢুকবার সঙ্গে সঙ্গেই গল্পটা শেষ হয়ে যায় না অ্যাকচুয়ালি। যেটা হয় সেটা হচ্ছে যে মাথার মধ্যে অসংখ্য চিন্তা এলোপাতাড়ি ঘোরাঘুরি করে। এটা তো ফিরবার পথ। কই যাবার টাইমে তো এত সব ভাবি নি। তখন নতুন নতুন দেশ দেখবার আনন্দে মশগুল ছিলাম। এখন বেড়ানোর পাট শেষ হয়ে গেছে, ঘরে ফিরছি, তাই মন অনেকটা শান্ত। ঘরে ফিরছি মানে হস্টেলে ফিরব, বিদেশের হস্টেলে, ওটা আমার নিজের দেশ নয়— তবু "ঘর" শব্দটা মনে করলেই ঐ হস্টেলের ঘরটা কল্পনা করছি। ভাবছিলাম, আমি কি তবে দেশ থেকে ক্রমশ দূরে চলে যাচ্ছি?
    চিন্তায় ভাটা পড়ে, গার্ড আমার জন্য কোন ফাঁকা বার্থ জোগাড় করতে না পেরে তার নিজের কেবিনেই নিয়ে যায়। মোটামুটি প্রশ্বস্ত সেই কেবিন। একজনের মত শোবার জায়গা এবং টেবিল চেয়ার, ইত্যাদি। একটা ইলেকট্রিক কেটলিতে জল ফুটছে। গার্ড আমায় জিরিয়ে নিতে বলে, তার নিজের বিছানা ছেড়ে দেয়। আমি গুটিশুটি মেরে হাঁটুর ওপর থুতনি ঠেকিয়ে বসে থাকি। ঘুম কেটে গেছে। সে চেয়ারে বসে যাত্রীদের টিকিটপত্র খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে আর একতাড়া কাগজে পাতা উল্টে পাল্টে খশখশ করে কীসব লিখতে থাকে। মাঝখানে একবার চা বানায়, টিনের কৌটো খুলে বিস্কুট বের করে। নিজে খায়, আমাকেও অফার করে। এক দুবার কেবিনের বাইরে চলে যায়, মধ্যরাতে পোল্যান্ডের নাম না জানা কিছু কিছু স্টেশনে ট্রেন থামে। কাচের জানলার বাইরে অন্ধকার, কেবিনের মধ্যে আলো জ্বলছে, বাইরেটা দেখা যায় না। একটা দুশ্চিন্তা মাথার মধ্যে ঘুরে ঘুরে আসছে, পেদ্রোর কী হবে! ছেলেটার সঙ্গে কতগুলো ঘন্টা এক সঙ্গে ঘুরলাম, অথচ ওর ঠিকানা তো দূরে থাক কোন শহরের কোন ইন্সটিটিউটে কোন বিষয় নিয়ে কোন ইয়ারে পড়ে সেগুলো পর্যন্ত জানা হয় নি। ওর পুরো নামটাও জানি না। ওর নিজের দেশ কোনটা, পেরু না একোয়াদোর, নাকি গুয়াতেমালা, একবার কি বলেছিল আর্জেন্টিনা, উঃ কিছুতেই মনে পড়ছে না। ওকে ওরকমভাবে নিয়ে গেল কোথায়? ওর কাছে টাকা পয়সা বিশেষ কিছু ছিল বলে মনে হয় না, অন্তত আমি দেখিনি ওকে বিশেষ কিছু কিনতে, খরচ করতে। বা হয়ত আছে, আমাকে বলে নি বলেই কি নেই? নিশ্চয় আছে। নিশ্চয় কিছু না কিছু একটা ব্যবস্থা হয়ে যাবে ওর। হ্যাঁ হ্যাঁ নিশ্চয় কিছু হয়ে যাবে। এইরকম ভাবতে ভাবতে নিজেকে ভোলাতে ভোলাতে আমি উবু হয়ে বসে বসেই ঝিমোতে থাকি।
    ঝিমোতে ঝিমোতে নিজেই কাত হয়ে একপাশ ফিরে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। ঘুম ভাঙল গার্ডের ডাকে। ধড়মড়িয়ে জেগে উঠে দেখি ঘরের বড়ো আলোটা নেবানো, কিন্তু বাইরে থেকে আলো আসছে, সূর্য ওঠেনি, ঊষা কাল। কাচের বাইরে দেখা যায় চাষের ক্ষেত, গ্রাম, ছোট ছোট বাড়ি, আলো যত বাড়ছে তারা তত স্পষ্ট হয়ে উঠছে। গার্ড জানায়, আর কিছুক্ষণ পরেই আসছে আসছে ভার্শাভা, পোল্যান্ডের রাজধানী। ভার্শাভা সেন্ট্রাল স্টেশনে জায়গা কিছু খালি হবে। তখন আমি চলে যেতে পারি পাশের কম্পার্টমেন্টে। সে আমায় আবার চা বানিয়ে খাওয়ায়। বাজে চা, বিচ্ছিরি খেতে, তবু খাই নইলে লোকটা মনে কষ্ট পাবে।
    ভার্শাভা সেন্ট্রালের আন্ডারগ্রাউন্ডে ট্রেন থামবে আমি জানি, যাবার সময়ও থেমেছিল। অমন ঝলমলে স্টেশন আমি আগে কখনো দেখিনি। আমি ব্যাগ কাঁধে নিয়ে উঠে দাঁড়াতেই সেই গার্ড আমার কাছে এসে নিজের পকেটে থেকে বের করে আনে ঐ নূপুরজোড়া, আমায় ফিরিয়ে দেয় সেগুলো। আমি ফেরৎ নিতে অস্বীকার করলেও সে জোর করে ওদুটো ধরিয়ে দেয় আমার হাতে, বলে — আমার মেয়ের জন্য এগুলো নেব ভেবেছিলাম, কিন্তু, না থাক, ওর মনে হয় পছন্দ হবে না।
    ভার্শাভা। তার মানে তো খুব বেশি আর দেরি নেই সোভিয়েত ইউনিয়নের বর্ডারে পৌঁছতে। মাঝখানে বড়ো সড়ো তেমন কোন স্টপেজ নেই, কয়েক ঘন্টা পরে পোজনান-এ থামবে একবার, তারপর ছোট কয়েকটা স্টপ। দুপুরের মধ্যেই পৌঁছে যাব ব্রেস্ট শহরে, বেলারুস। পেদ্রোর যদি ভিসার সমস্যা সমাধান হয়ে যায়, তাহলে ওর টিকিটের কী হবে? ভিসার সমস্যা আজ সমাধান হবেও না, আজ তো রবিবার। সব বন্ধ। এটা তো আফগানিস্তান নয়, যে শুক্রবারে ছুটির দিন। তার মানে পেদ্রোকে অপেক্ষা করতে হবে আরো। অন্তত যতক্ষণ না সোমবার হচ্ছে। সোমবারের আগে তো কোন সরকারি অফিস খুলবে না। সবই কল্পনা করছি। তার মানে সোমবার অবধি পেদ্রো থাকবে পুলিশের হেফাজতে। অদ্ভূত ভীতু প্রাণী তো আমরা। একবার সাহস করে সেই পুলিশদুটোকে জিগ্যেস করতে পারিনি যে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে ছেলেটাকে। জিগ্যেস করলে কি আমাকেও ধরে নিয়ে যেত? একেবারেই না। তবু আমি প্রশ্ন করবার সাহস দেখাই নি। ভয়ের দুনিয়ায় থেকে থেকে, ভয়ের দুনিয়ায় বেড়ে উঠতে উঠতে এরকমই আমাদের নর্ম্ হয়ে গেছে। পালানের বাবার মতো। হ্যাঁ, সেই খারিজ সিনেমার পালানের বাবার মতো, তার নাম ছিল হয়ত হারান। নিজের ছেলের মৃতদেহ দেখতে এসেও ভয়ে কুঁকড়ে অনুমতির অপেক্ষায় বসে ছিল। নিজের অধিকার জানত না। তাও তো ও গরীর মূর্খ লোক। আমি লেখাপড়া শিখছি, দেশ বিদেশে একা একা বেরিয়ে পড়ছি ব্যাগ কাঁধে ঝুলিয়ে, এমনকি নিজে মেয়েমানুষ হওয়া সত্ত্বেও ভয়ডর করি না যে নানান অজানা বিপদের সম্ভাবনা আছে। সেই আমি সামান্য একটা প্রশ্ন করতে ভয় পেলাম পুলিশের।
    যে জিনিস ভুলতে চাইব, সে আরো বেশি করে করে মনের মধ্যে উঁকি দেবে। দেবেই। যতই জানলার বাইরের প্রকৃতি দেখবার ছলে নিজেকে ভোলাতে চাইছি, তত অস্বস্তি একেবারে পেড়ে ফেলছে। বরং অন্য কিছু ভাবা যেতে পারে। আরে, এতক্ষণ ধরে পোল্যান্ডের মধ্যিখান দিয়ে যাচ্ছি আর এই কথাটা ভুলে গেলাম কীকরে, এই পোল্যান্ডেই তো আমাদের চেনাশোনা কে একজন থাকে না? এখন থাকে কিনা জানি না, তবে বছর তিনেক আগে তো থাকতেন। বাসু-র বাবা। তিনি তখন ছিলেন এখানকার ইন্ডিয়ান অ্যাম্বাসাডার। বাসু আমার থেকে সিনিয়র ছিল, ওর ভাল নাম টা শ্রীনিবাস না বাসুদেব সেটা পর্যন্ত জানা হয় নি। ও তখন তাশকেন্তে ডাক্তারি পড়ছিল সেকেন্ড কিংবা থার্ড ইয়ারে।
    পেদ্রোর প্রসঙ্গ ভুলবার চেষ্টা করতে আমি বাসুর ব্যাপারে মনে করবার চেষ্টা করি। বছর চারেক আগে, যখন সবে তাশকেন্তে এসেছি, তখনই আর পাঁচটা সিনিয়র ছাত্রদের ভীড়ে বাসুর সঙ্গে আলাপ হয়েছিল। তামিল ছেলে। হিন্দিটা বলবার খুব চেষ্টা করত, ভুলভাল বলত। ওর হিন্দির ভুল ধরত হিন্দিভাষীরা। যেমন এক রবিবার দুপুরে মেডিকেল স্টুডেন্টদের হস্টেলে নিমন্ত্রিত হয়ে গেছি। আর একজন সিনিয়র ভারতীয় নৌশাদ আলির ঘরে তারস্বরে মুকদ্দর কা সিকন্দরের লং প্লেয়িং রেকর্ডে বাজছে সেই "সালাম এ ইশক মেরি জান জারা কবুল কর লো" গান টা। নৌশাদ এদিকে বাসুর হিন্দি ভাষার জ্ঞান পরীক্ষা করতে বদ্ধপরিকর। ইশক শব্দের অর্থ যে "লাউ" (love), সেটা ওর জানা ছিল না, ব্যস্ অমনি নৌশাদ বাসুর মা বোন তুলে খিস্তি করতে লাগল, আব্বে থোড়া বহৎ হিন্দি তো সিখ্ লে। জিনিসটা বিহারি ভার্সেস তামিল গোছের মারপিটে পৌঁছয় নি সেদিন, কারন তখন ইন্ডিয়ানদের মধ্যে প্রচণ্ড ইউনিটি ছিল, কাশ্মিরী ছাড়া আর কারোর পেছনে লাগা হতো না, ক্যাটেগোরিক্যালি। তার ওপর বাসু তো অ্যাম্বাসাডারের ছেলে, ওর পাসপোর্টটা পর্যন্ত লাল, ডিপ্লোম্যাটিক পাসপোর্ট।
    সেই বাসুর সঙ্গে এর পরেও গোটা তিন চার বার দেখা হয়েছে। হাঁপানিতে ভুগত, সবসময় সঙ্গে রাখত ইনহেলার। বছর তিনেক আগে একদিন মার্চ মাস নাগাদ তাশকেন্তের সব ইন্ডিয়ানরা জড়ো হয়েছিলাম তাশকেন্ত ১নং মেডিকেল ইন্সটিটিউট সংলগ্ন হাসপাতালের পাশের একটা বাড়িতে। মোট ৫৫ জন। বাসুকে ধরলে ৫৬। সেখানে বাসুর বডি এনে রাখা হয়েছিল একটা লম্বা বেদির ওপর। পাশেই মর্গ, সেখান থেকে। গত রাতে অ্যাজমা জনিত অ্যাটাকে বাসু মারা গেছে। আমরা সকলে আপাদমস্তক সাদা কাপড় দিয়ে ঢাকা ডেডবডিটার দিকে তাকিয়ে ছিলাম, কেউ কাপড়টা সরিয়ে মাথাসহ মুখটা অনাবৃত করবার সাহস দেখাচ্ছিল না। সর্বকনিষ্ঠ জুনিয়র আমিও না। শেষে মর্গেরই কে একজন যেন এসে কাপড়টা সরিয়ে দিতে আমরা এক এক করে কাছে গিয়ে বাসুকে দেখে এসেছিলাম। সেদিনও আমাদের মধ্যে কেউ সাহস করেনি এগিয়ে গিয়ে কাপড়টা সরিয়ে মৃতের মুখটা দেখতে। বাসুর বাবা মা বোন, এরা সবাই খবর পেয়ে ডিরেক্ট ইন্ডিয়া চলে যায়, আমাদের সিনিয়ররাও বাসুর দেহ দিল্লিতে পাঠানোর চেষ্টায়, কে কে বডির সঙ্গে যাবে সেই কম্পিটিশানে নাম লেখায়। এই ই একমাত্র সুযোগ, যেখানে ফ্রি তে রিটার্ণ টিকিট পাওয়া যায়। অনেক সিনিয়র ভিড় করে মেডিক্যাল ইন্সটিটিউটের ডীনের অফিসে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করতে। কে লেখাপড়ায় কত ভাল, কে বাসুর রুমমেট ছিল, কে সাউথ ইন্ডিয়ান, কে দিল্লিতে থাকে অতএব দিল্লি ভালো চেনে, ইত্যাদি নানান রকম ক্রাইটেরিয়া দিয়ে বাছ বিচার শুরু হয়ে যায়, সেই সঙ্গে রেষারেষি পোলিটিক্স। বাসুর ডেডবডি ওষুধ দিয়ে রাখা থাকে মর্গে দুদিন, তারপর যেই ফ্লাইটের দিন আসে, সেদিন ই ঘোষণা হয় দুজন বিজয়ীর নাম, সন্তোষ এবং গীতা। গীতা নিজে তামিল, তার অধিকার বা যোগ্যতা আছে বাসুর সঙ্গে যাবার, কিন্তু সন্তোষ চান্স পেল কীকরে? সে তো উড়িষ্যার ছেলে, এমনকি মেডিক্যালের ছাত্রও নয়, উড়িষ্যাকে কি কোনভাবে সাউথ ইন্ডিয়া বলা চলে? তাহলে দিল্লির ছেলেদের চান্স দেওয়া হলো না কেন? এই অবিচারের বিরুদ্ধে অনেক চাপা বিদ্বেষ তৈরী হয়, কিন্তু ডীনের অফিসের ডিসিশান বদলায় না। সেদিন সন্ধেয় গীতা ও সন্তোষ দুজনে ট্রফি বিজেতার মত বীরের গর্বে বাসুর বডি নিয়ে ফ্লাইটে ওঠে। জানা যায় ওরা একেকজন দুটো তিনটে করে জেনিৎ ক্যামেরা নিয়েছে সঙ্গে। ডেডবডি নিয়ে যাচ্ছে তো, দিল্লির কাস্টমস ওদের লাগেজ চেক করবে না। তাছাড়া ওদের সঙ্গে রয়েছে বাসুর পাসপোর্টটা, ডিপ্লোম্যাটিক পাসপোর্ট বলে কথা, বাসু মারা গেছে ঠিকই কিন্তু টুকটুকে লাল রঙের পাসপোর্টটার তখনো অনেক তেজ।
    সেই বাসুর বাবা কি এখনো পোল্যান্ডেই পোস্টেড? ছেলের মৃত্যুর পর তিন বছর কেটে গিয়েছে, কেমন আছেন ভদ্রলোক কে জানে।

    বেলা পড়ে গেছে ব্রেস্ট পৌঁছতে পৌঁছতে। এখানে এক কি দেড় ঘন্টা দাঁড়াবে ট্রেন। এর মূল কারন দুটো। আসতে যেতে সীমান্তে ট্রেনকে অনেকক্ষণ দাঁড়াতেই হবে, সমস্ত সীমান্তেই এ ছাড়া উপায় নেই। এক তো কাস্টমস এবং ইমিগ্রেশনের নিয়ম বিধি পালন করা। সে বড় সহজ কাজ নয়। সমস্ত জিনিসপত্র ট্রেনের মধ্যে রেখে দিয়ে টাকা পয়সা পাসপোর্ট ইত্যাদি নিয়ে ট্রেন থেকে সকলকে নেমে দাঁড়াতে হয়। ট্রেন চলে যায়। ঐ সময়ে কাস্টমসের চেকিং হয় ট্রেনে। পরে ছাড়ার টাইমে ঘোষণা করে ট্রেন কোথায় আসছে সেখানে গিয়ে দাঁড়াতে হয় তখন। যাবার সময়ও এমন হয়েছে। এ তো গেল এক নম্বর কারন। কিন্তু দু নম্বর কারনটা আরো বেশি ইম্পরট্যান্ট, সেটা হচ্ছে ঐ সময়ে ট্রেনের চাকা বদলানো হয়। প্রথমে আমরা নামি ভার্শাভাগামী প্ল্যাটফর্মে, কিন্তু যখন উঠি তখন ট্রেন দাঁড়ায় মিন্সকগামী প্ল্যাটফর্মে। সারা সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রায় সমস্ত রেলপথে, দুটো রেল এর মধ্যবর্তী দূরত্ব ইয়োরোপের অন্য দেশগুলোর থেকে একটু আলাদা। অন্য দেশগুলো একটা নির্দিষ্ট স্ট্যান্ডার্ড মেনে চলে, সোভিয়েত দেশে এই দূরত্ব সামান্য একটু বেশি, একটু বেশি চওড়া। সেই কারনে এক দেড় ঘন্টা লেগে যায় সমস্ত রেলগাড়ির চাকার দূরত্ব বদলিয়ে সোভিয়েত ট্র্যাকের উপযুক্ত করে তুলতে।
    এতক্ষণে চেনা দেশে ফিরে আসা গেছে, চেক ভাঙিয়ে টাকা তুলেছি রেল স্টেশনের কাউন্টার থেকে। ফুটপাথের ওপর গাছতলায় এক বুড়ি আপেল বেচছিল, তেরো পয়সা করে কিলো। তাইই কিনলাম খাব বলে। সমস্ত অভিজ্ঞতা দুশ্চিন্তা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বাকি যাত্রীদের সঙ্গে অপেক্ষা করছি তখন ট্রেনের অপেক্ষায়, বিকেলবেলা ট্রেন ছেড়ে দিলে কাল ভোরে পৌঁছব মস্কোয়। তারপরতো সব চেনা পথ, চেনা ছক।
    নিজেকে বিজয়ীর মত লাগে। মিশন সাকসেসফুল। আজ অবধি তাশকেন্ত থেকে কোন ইন্ডিয়ান মেয়ে একা ইয়োরোপ ঘুরতে যাবার সাহস দেখায় নি। গাদা গাদা মেয়ে গেছে পশ্চিমে ঘুরতে, কিন্তু হয় দল বেঁধে ছেলেদের সঙ্গে, নয় নিজ নিজ বয়ফ্রেন্ড কি বরের সঙ্গে। আমিও যাবার আগে একটা দল খুঁজেছিলাম, পাই নি। তাশকেন্ত থেকে ভারতীয় কি বাংলাদেশিরা অনেকেই যাচ্ছিলো পশ্চিম ইয়োরোপ ঘুরতে, তাদের কে বলেওছিলাম যদি আমায় সঙ্গে নেয় কেউ। নেয় নি সঙ্গে। কাটিয়ে দিয়েছে, বা বলা যেতে পারে ভাগিয়ে দিয়েছে। এর কারন আমি নিয়ম ভেঙেছি, এটা নিয়ম ভাঙার শাস্তি। আমি এমন একজনের সঙ্গে মিশি, যে একঘরে। সেই অপরাধে এক এক করে অনেক ভারতীয় আমার সঙ্গে মেশে না। সেই একঘরে হয়ে যাওয়া মানুষটার নাম মীনাক্ষি। মীনাক্ষি মদন। আমার বেস্ট ফ্রেন্ড। এবং সে আমার বেস্ট ফ্রেন্ড থেকে যাবে আমৃত্যু, এইরকমই আমাদের অলিখিত অকথিত আন্ডারস্ট্যান্ডিং।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • সে | 2001:1711:fa42:f421:a0e0:dccc:e2ca:8880 | ২৩ জানুয়ারি ২০২২ ১৪:৫৩735428
  • .
  • Ranjan Roy | ২৫ জানুয়ারি ২০২২ ১৯:৪০735447
  • দমবন্ধ করে একনাগাড়ে পড়লাম। 
    আরবাত স্কোয়ার!
    আনাতোলি রীবাকোভের কিশোর উপন্যাস 'ছোরা' এবং  রাজনৈতিক উপন্যাস 'চিল্ড্রেন অফ দ্য আরবাত স্কোয়ার' পড়ে অনেক কিছু কল্পনা করেছিলাম। মেলে নি, মেলার কথাও নয়। 
    আরও চাই। 
  • জয় | 82.1.126.236 | ২৫ জানুয়ারি ২০২২ ২১:০৮735450
  • উরিব্বাস! যেমন অভিজ্ঞতা তেমনি লেখা। সেদি, ভ্রমন কাহিনীর সব বেড়া ভেঙে দিচ্ছেন। ভ্রমন কাহিনীর নতুন সংজ্ঞা হয়ে উঠছে আপনার লেখা পত্তর।
  • kk | 2600:6c40:7b00:1231:b992:bab1:21e8:6d6c | ২৫ জানুয়ারি ২০২২ ২১:২১735451
  • এই লেখাটা আমার একটা ছবির মত লাগলো। যেসব ছবির সামনে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। তখন আস্তে আস্তে আরো আরো লেয়ারে আরো আরো অন্য গল্প দেখা যায়।
    আপনি কীবোর্ড / সিন্থেসাইজার বাজান জানতামনা। ভালো লাগলো শুনে।
  • সে | 2001:1711:fa42:f421:ddfa:2afd:9c5a:40e5 | ২৫ জানুয়ারি ২০২২ ২২:৫৬735457
  • kk
    না না, বাজাতে জানি না, শখ হয়েছিল শেখার, শেখা হয় নি।
     
    এই লেখার পরের একটা পর্ব আছে, সেটা পরে লিখব।
  • ar | 173.48.167.228 | ২৬ জানুয়ারি ২০২২ ০৬:৫২735463
  • অনবদ্য লেখা।
    আপনার বা-লার পাতার (প্রোঃ শঙ্কুর??!!) গল্পগুলোর কোন লিঙ্ক নেই? সেগুলো এখানে পোস্ট করে দেওয়ার অনুরোধ রইল।
  • | ২৬ জানুয়ারি ২০২২ ১৫:৩৯735465
  • অ্যায়, এইটাই খুঁজেছিলাম কবে যেন। আলাদা করে দেওয়ায় থ্যাঙ্কু থ্যাঙ্কু। দারুণ লেখা। 
     
    তেহেরাণ গেছিলেন পরে কখনো? 
  • সে | 2001:1711:fa42:f421:2907:3f3a:780b:4d5a | ২৬ জানুয়ারি ২০২২ ১৫:৪৩735466
  • না। ইরানে যাবার প্ল্যান আছে।
  • Sandipan Majumder | ২৬ জানুয়ারি ২০২২ ২৩:৩৮735469
  • লেখার  গুণে একটানে পড়লাম। খুব ভালো  লাগলো। 
  • অমিতাভ চক্রবর্ত্তী | ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২২ ০৯:৪৯735589
  • জার্মানির অংশটা এখন পড়ে নিলাম - উঠলো বাই-এর ক্রমপর্যায় হিসেবে। ওদিকে ম-ম পড়া হয়ে রয়ছে। বেশ একটা পূর্ণতার বোধ হচ্ছে। laugh তেহরান আবার কদিন বাদে পড়ব। আপনার এই গল্পগুলো নিয়ে ওটিটি-তে সিরিয়াল চালু করলে চমৎকার চলা উচিত। 
     
    আপনার ফেসবুক লিঙ্ক পেলে বেশ হত। 
  • সে | 2001:1711:fa42:f421:d5ee:e24d:c118:83 | ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২২ ১৫:১১735608
  • https://m.facebook.com/#!/joshita.ghosh
     
    এই নিন অমিতাভবাবু।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ভালবেসে প্রতিক্রিয়া দিন