• বুলবুলভাজা  আলোচনা  স্বাস্থ্য

  • অতিমারীর অভিজ্ঞতায় নগর পরিকল্পনার প্রশ্ন

    কৌশিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    আলোচনা | স্বাস্থ্য | ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২১ | ৫১৪ বার পঠিত
  • সাম্প্রতিক অতিমারীর নগর-অভিযান

    চীনের সমৃদ্ধ শহর Wuhan-এ করোনা ভাইরাস এর প্রাদুর্ভাবের পর থেকেই বিশ্বের শিল্প-সমৃদ্ধ শহরগুলিতে ক্রমশ তার সংক্রমণ ঘটে - নিউ ইয়র্ক, সাও-পাওলো, লন্ডন, মিলান, মস্কো, জোহানসবার্গ। এগুলোই ছিল সংক্রমণের উৎস বা ঝটিকা-কেন্দ্র। বিশ্বায়িত তথা সংযুক্ত বর্তমান বিশ্বে সংক্রমণের ঝুঁকি আরও বৃদ্ধি পায়। কিছু বছর আগে ঘটা সার্স বা ইবোলা সংক্রমণ অনেকটাই একটি ছোট ভৌগোলিক অঞ্চলে সীমাবদ্ধ – এমন আন্দাজ করা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে তা আফ্রিকা ও অন্যত্র ছড়াতে থাকে মূলত বিশ্বের এই দ্রুত সংযোগ-ব্যবস্থার জন্য। কোভিড-১৯ এর সংক্রমণের দ্রুততার জন্য ভাইরাসের সংক্রমণ ক্ষমতা যেমন দায়ী, তেমনি দায়ী বিশ্বের দ্রুত সংযোগ ব্যবস্থা। এটা লক্ষণীয় যে অতিমারীর প্রথম পর্যায়ে শিল্পোন্নত পশ্চিম ইয়োরোপের দেশের তুলনায় তাদেরই প্রতিবেশী পোল্যান্ডের মতো দেশে সংক্রমণের প্রসার কম ঘটে। যার অন্যতম কারণ হলো তাদের জনসংখ্যার একটি বড় অংশ (প্রায় ৪০ শতাংশ) বাস করে গ্রাম ও মফস্বলের দিকে।

    সম্প্রতি নগরায়নের প্রসার ঘটার থেকেও অনেক বড় কথা হল - কত দ্রুত সে প্রক্রিয়াটি ঘটে চলেছে। যেমন, নগরের প্রবল বৃদ্ধির হারের পরিণতিতে, ম্যানহাটনে যেখানে প্রতি বর্গ কিলোমিটারে প্রায় ৩০,০০০ মানুষ বাস করে, সেখানে এদেশে ধারাভি-র মতো মুম্বাইয়ের বস্তিতে জন-ঘনত্ব তার ১০ গুণ। অর্থাৎ এমন মহানগরগুলির বৃদ্ধির হার, তাদের নাগরিক পরিষেবা ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশ দেওয়ার বা বহন-ক্ষমতার তুলনায় অনেক গুণ বেশি। তদুপরি, হাতে-গোনা কিছু দেশ বাদে, জনস্বাস্থ্য-পরিকাঠামো রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের চরম অবহেলা ও অযত্নের অসহায় শিকার - দীর্ঘ বহু দশকে স্বাস্থ্য-ক্ষেত্রে ব্যয়-বরাদ্দ থেকেই তা স্পষ্ট। জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্রে প্রতিটি দেশবাসীর স্বাস্থ্যের অধিকার যে সাংবিধানিক অধিকারের মধ্যে পড়ে - এই প্রসঙ্গ কেউ ভারতে উত্থাপন করে না, সম্ভবত বিশ্বাসও করে না!

    বিশ্বজোড়া অতিমারী এই প্রথম নয়, তবু গত প্রজন্ম ও বিগত মহামারীর থেকে যা কিছু আমরা শিখে থাকি - তা ঠিকমতো প্রয়োগ করার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে এমন দ্রুত-বর্ধনশীল মহানগরগুলির ক্ষেত্রে। তবে এই অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতেও বেশ কিছু শেখার আছে, এমনকি ধারাভির বাসিন্দাদের আপৎকালীন ব্যবস্থা থেকেও! যেমন, উগান্ডার কাম্পালাতে মূলত অপারগ বা বয়স্কদের জন্য স্থানীয় উৎপাদকরা একটি অ্যাপের সাহায্যে সাইকেলে জরুরী জিনিসগুলি পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করেছেন। এমন সব উদ্যোগের ফলে রোগের সংক্রমণ ও মৃত্যুর সংখ্যা হয়তো কম হতে পারে, কিন্তু নাগরিকদের জীবিকা হারানো, অনাহার, ভিন্ন রোগীদের চিকিৎসা-বিভ্রাট ও অন্যান্য দুর্ভোগের কোনও যথাযথ হিসাব বা তথ্য পাওয়া দুষ্কর হয়ে দাঁড়াবে তথ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করার সুদক্ষ ব্যবস্থার অভাব ও অনীহার জন্য।
    মহামারী চিত্র : দুই শতাব্দী আগে পিছনে তাকালে এমন মহামারীর চিত্র মেলে প্লেগ (১৮৯৬ - ৯৯) – যেটি বম্বে শহরের তত্কালীন শিল্প-বাণিজ্য ক্ষেত্রের অভিজাতদের স্বাস্থ্য ও বাণিজ্যিক স্বার্থের প্রবল বিঘ্ন ঘটিয়েছিল। পরিস্থিতি বণিক সভা ও মালিকপক্ষকে আর্থ-সামাজিক সুস্থিতির সঙ্গে রোগ ও স্বাস্থ্য-বিধানের আন্তঃসম্পর্ক খুঁজতে বাধ্য করে। কারখানা–মালিকরা (Bombay Mill Owners Association, BMOA) শ্রমিক-বিক্ষোভের আশঙ্কায় বম্বেতে শ্রমিকদের আবাসন-প্রকল্প নিয়ে পরের দুই দশক ধরে বিতর্ক চালাতে থাকে। মালিকদের বক্তব্য - শ্রমিকদের পরিযায়ী স্বভাবের মূল কারণ হল তাদের অস্বাস্থ্যকর ব্যয়বহুল বাসস্থানগুলি। তাঁরা আরও বলেন - হস্তক্ষেপের মাধ্যমে এই শহরে স্বাস্থ্যসম্মত, আনন্দদায়ক শ্রমিক আবাসন গড়ে বম্বের বস্তিগুলি নির্মূল করা সম্ভব।

    এক শতাব্দী পরে বর্তমান মহামারীর সময়ে শিল্পপতি রতন টাটা এক আলোচনা চক্রে প্রায় একই প্রসঙ্গ আলোচনা করছেন দেখা গেছে। বাস্তবে প্লেগ-মহামারীর এক দশক পরেই এই সমস্ত বিতর্ক বিস্মৃতির গর্ভে চলে যায় - শিল্প বাণিজ্যের চাকা আপন গতি ফিরে পাওয়ার ফলে মিল-মালিকরা ও সমাজে প্রভাবশালী, ধনীদের স্বার্থ মিটে সুখনিদ্রা ফিরে পাওয়ার পরেই।
    বম্বে শহরে পরিকল্পনার সূত্রপাত ১৮৯০-এর দশকে প্লেগের পরে ১৮৯৮ সালে বম্বে ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট (BIT) গঠিত হয় দ্বিমুখী লক্ষ্যে – ১) শিল্প ও বাণিজ্যের সুস্থিতি সুনিশ্চিত করা এবং ২) দরিদ্র ও শ্রমিক শ্রেণীর জন্য স্বাস্থ্যসম্মত আবাসনের ব্যবস্থা করা। এর ফলে বাড়িওয়ালা অধ্যুষিত বম্বে পুরসভা ও শহরের সম্পত্তি-মালিকদের সঙ্গে BIT-র স্বার্থের সংঘাতের সূত্রপাত ঘটে। তারা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও মানুষের দুর্দশার মূল্যে বিপুল মুনাফার জন্য অতিরিক্ত নির্মাণ করে চলেছে – এই মর্মে এক ব্রিটিশ আমলা রোষ প্রকাশ করেন। BIT-র চেয়ারম্যান “বিল্ডিং বাই ল” বিধিকে আরও কঠোর করার চেষ্টা করেন, কিন্তু বাড়িওয়ালা ও ধনীদের বাধায় তা বাস্তবায়িত হয় নি। শেষে মীমাংসা হয়, শুধুমাত্র নতুন নির্মাণ করতে হলে এই কঠোর বিধিতে করতে হবে। যাই হোক, BIT এই উপলক্ষ্যে যে জন-স্বাস্থ্য সংক্রান্ত বিধি বলবৎ করেছিল, সেটি পুরসভার পরিকল্পনা পদ্ধতির অঙ্গীভূত ছিল ১৯৭০-৮০র দশক পর্যন্ত। তারপর নানা সময়ে কিছু কাজ করলেও, সারা দেশে উদারীকরণ প্রক্রিয়ায় বেসরকারীকরণের ঝোঁক ও “মুক্ত বাজার” আর্থ-সামাজিক জীবনকে সার্বিক ভাবে নিয়ন্ত্রিত করতে থাকে। পরিবেশ ও জন-স্বাস্থ্য সংক্রান্ত বিধিকে সমৃদ্ধি ও তথাকথিত উন্নয়নের প্রতিবন্ধক বলে প্রবল প্রচার শুরু হয় ক্ষমতার নানান স্তম্ভ থেকে। কায়েমি স্বার্থের চাপে একদিকে যেমন প্রচলিত পরিবেশ ও বন বিষয়ক আইনের ফাঁক ফোকর দিয়ে নানা কৌশলে হিসাবের মারপ্যাঁচে তথাকথিত উন্নয়ন প্রকল্পের অনুমোদন ঘটে, পাশাপাশি মূল আইনগুলিকেই শিথিল করার জন্য তাদের একটা গোষ্ঠী সর্বদাই সচেষ্ট।

    নগরায়ন ও নাগরিক পরিবেশ

    নগর পরিকল্পনা নিয়ন্ত্রণ করে নাগরিক-পরিবেশকে – যার সুপরিকল্পিত প্রভাব পড়ে স্বাস্থ্যের ওপরে। সঙ্গে একটি রেখচিত্রের মাধ্যমে পারস্পরিক সংশ্লিষ্ট বিষয় গুলির আন্তঃসম্পর্ক উপস্থাপিত হল (তথ্য সূত্র - ১)। পরিকল্পনার সরাসরি প্রভাব থাকে নির্মিত পরিবেশ (Built Environment) এর উপরে – বাড়ির লাগোয়া উন্মুক্ত জমির মাপ, রাস্তা এবং এসবের এক প্রণালী যা কিছু মিলিয়ে মানুষের জনবসতি গড়ে ওঠে সে সব কিছুর ব্যবস্থাপনার ওপরে। এই বিশেষ পরিমণ্ডলটি কম বেশি অন্যান্য সংশ্লিষ্ট পরিমণ্ডলগুলির গড়নকে নির্ধারণ করে; যদিও ব্যক্তি, গোষ্ঠী ও প্রশাসনের হাতে অল্প কিছু সিদ্ধান্তের অবকাশ থাকে।
    মানচিত্রের প্রতিটি বহিঃ-পরিমণ্ডল প্রভাবিত করে আন্তঃ-পরিমণ্ডলে দেখানো প্রাকৃতিক পরিবেশ তথা মানুষের স্বাস্থ্য ও আনন্দকে। যেমন শুদ্ধ জল-বাতাস, সাইকেল-আরোহী ও পথচারীর নিরাপত্তা, দৃষ্টিসুখের মাধ্যমে, খেলার মাঠের সুযোগ বাড়িয়ে অথবা কমিয়ে নির্মিত পরিবেশ স্বাস্থ্যকর জীবনধারাকে উত্সাহিত বা নিরুত্সাহ করে থাকে। বাজার-অর্থনীতি থেকে উদ্ভূত ও প্রশাসনের পোষিত নগরায়নের বেশ কিছু রীতি নাগরিকের অস্বাস্থ্যকর অভ্যাসকে বৃদ্ধি করে। বিশ্বের মহানগরীগুলির উপান্তে যে ভাবে বিলাসবহুল অফিস/বিপণী, বিনোদন-কেন্দ্র ও স্বল্প-ঘনত্বের আবাসনের প্রসার ঘটে চলেছে, তার ফলে মোটরগাড়ি-নির্ভর অস্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রায় অভ্যাস ঘটে। সঙ্গে বাড়ে রাস্তা উন্নয়নের ব্যয়। হাঁটার মতো দৈনিক শারীরিক সক্রিয়তা কমার ফলে রোগের বৃদ্ধি ঘটছে। এসব অঞ্চলের গণ-পরিবহনের অভাবে কর্মহীন, বৃদ্ধ, ও শিশুরা সেখানেই আবদ্ধ থাকছেন। উল্লেখ্য, কোনও নগরের পুনর্নবীকরণ বা তার উপান্তে প্রসারণের পরিকল্পনায় অবশ্যই যথাযথ সমীক্ষার ভিত্তিতে সঠিক সংখ্যায় হাসপাতাল/স্বাস্থ্য-কেন্দ্র ও শিক্ষা/কৃষ্টি-কেন্দ্রের ব্যবস্থা রাখতে হবে।


    নগর পরিকল্পনা নিয়ন্ত্রণ করে নাগরিক-পরিবেশকে – যার সুপরিকল্পিত প্রভাব পড়ে স্বাস্থ্যের ওপরে


    বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) প্রকল্প

    বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) তরফে, আশির দশক থেকে সারা ইওরোপে Healthy City Project শীর্ষক প্রকল্পে নগর পরিকল্পনাকারীদের সঙ্গে এক প্রশ্নমালার মাধ্যমে সংযোগ স্থাপনের প্রয়াস সীমিত সাফল্য পায়। কিন্তু একদিকে বেসরকারী মুনাফা ও সরকারি ব্যয়-বরাদ্দের দ্বন্দ্ব, অন্যদিকে নগরায়নের কর্তারা ক্রমবর্ধমান মোটর-গাড়ি, অঞ্চল বিভাজনের (Zoning) অগ্রাধিকারের সঙ্গে স্বাস্থ্যবিধির সংঘাত খুঁজে পান। স্বাস্থ্যকে নগরায়নের কেন্দ্রীয় উদ্দেশ্য নির্ধারণের লক্ষ্যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ১৯৯৮ সালে প্রকাশ করে – “Healthy Urban Planning – A WHO guideline to people”। এতে জনস্বাস্থ্যের পরিবেশগত, সামাজিক ও অর্থনৈতিক নির্ধারকগুলিকে (Determinants) নিয়ন্ত্রণের বিষয়টিকে তুলে ধরা হয়েছে। মানুষের স্বাস্থ্য, শরীর ও মনের স্বাচ্ছন্দ্য এবং জীবন-মানের উত্কর্ষকে নগর-পরিকল্পনার কেন্দ্রীয় উদ্দেশ্য স্থির করা হল। কিন্তু আক্ষেপের বিষয় হল বেশির ভাগ পুরসভার “Healthy City” বিভাগে কোন নগর-পরিকল্পনাকারী না রেখে চিকিত্সক বা জনস্বাস্থ্য-বিশারদ দিয়ে ভরে ফেলা হল। (Ref: Healthy urban planning in European cities - Hugh Barton, Marcus Grant, Claire Mitcham and Catherine Tsourou)

    এখন নগরের সংবেদনশীল অঞ্চলগুলিকে দুইভাবে রক্ষা করার দুটি পদ্ধতি সম্ভব:
    (ক) কোন অঞ্চলের শব্দ বা বায়ু-দূষণের উত্সকে আটকাতে যথাযথ ফিল্টার জাতীয় প্রযুক্তির ব্যবহার।
    (খ) নগরের এই দুই অঞ্চলের মধ্যে ব্যবধান সৃষ্টি, যেমন,
    ১) পরস্পর-বিরোধী ভূমি-ব্যবহারের মধ্যে একটি প্রশমনকারী অঞ্চল (Buffer Zone) ছেড়ে রাখা, যেমন, শহরের একটি দিক অফিস-অঞ্চল ও কর্মী-মেস জাতীয় ব্যবহারে সীমাবদ্ধ থাকবে। এই ধরনের ব্যবস্থার অসুবিধা হল – এই দুই ধরনের অঞ্চলের মধ্যে মোটরগাড়ি ইত্যাদি চলাচল ঘটবে, যেটি আবার স্বাস্থ্যবিধির অগ্রাধিকারের বিপরীত। তাছাড়া, অফিস অঞ্চলটির পরিকাঠামো ২৪ ঘণ্টার মধ্যে একটি বড় সময় অব্যবহৃত থাকবে। অথবা, এর বিপরীতে,
    ২) এমন প্রশমনকারী অঞ্চলকে সদ্ব্যবহার করে পার্ক, খেলার ময়দান, বাইক-ওয়ে সমন্বিত একটি প্রাকৃতিক সবুজ করিডোর নির্মাণ।

    স্বাস্থ্যের জন্য নগর-পরিকল্পনা – এক ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গী

    নাগরিক পরিবেশ একটি জটিল সামাজিক-রাজনৈতিক ব্যবস্থা – যেখানে বহু পরস্পর বিরোধী স্বার্থ, প্রত্যাশা ও অগ্রাধিকারের পারস্পরিক ক্রিয়া ঘটে থাকে। প্রচলিত রীতি ভেঙ্গে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গীতে স্বাস্থ্য সম্মত নগর-পরিকল্পনা করার পূর্বশর্ত হল কিছু স্বাস্থ্য-বিষয়ক উদ্দেশ্যের স্বীকৃতি, যেমন:

    ১) স্বাস্থ্যসম্মত জীবনধারার সুযোগ সৃষ্টি
    ২) সামাজিক সংহতি ও সহযোগী সামাজিক সমন্বয়-ব্যবস্থা
    ৩) কর্ম সংস্থান, উত্কৃষ্ট সুযোগ-সুবিধা ও মুক্ত অঞ্চলের (open space) সহজলভ্যতা
    ৪) গ্রহণীয় মাত্রার শব্দ ও নির্মল বায়ুর এক আকর্ষণীয় পরিবেশ
    ৫) উত্কৃষ্ট জল সরবরাহ ও পয়ঃপ্রণালী
    ৬) জলবায়ু রক্ষার্থে দূষিত বায়ু নির্গমন নিয়ন্ত্রণ
    ৭) শক্তি সাশ্রয়কারী ও সৌর-শক্তির সদ্ব্যবহারকারী বাস্তু/নগর পরিকল্পনা
    ৮) মেট্রো-রেল, ট্রাম, সাইকেলের মতো পরিবেশ-বান্ধব পরিবহন ব্যবস্থা
    ৯) শহরের বর্জ্য পদার্থের পুনর্ব্যবহার ও ফেলার উপযুক্ত ব্যবস্থা,
    এবং
    ১০) তাপীয় দ্বীপ বা Heat island তৈরী হতে না দেওয়া।

    বন্য প্রাণী নিয়ে ব্যবসা, অরণ্য-নিধন, জমির চরিত্র বদল, জৈব-জ্বালানির যথেচ্ছ ব্যবহার, এবং সর্বোপরি, বন্য প্রাণীর আবাস (habitat) ধংসের মাধ্যমে জীব-বৈচিত্র্য বিনাশ -এই সব কাজই করোনা মহামারীর মতো ঘটনা অনিবার্য করে তুলেছে। প্রাণী–উদ্ভিদের সঙ্গে মানুষের ভারসাম্য বিঘ্নিত হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ব্যাপক অভিঘাত ও সাম্প্রতিক অতিমারী বিষয়ে গবেষণা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিল যে জীবজগতের প্রতিটি সদস্যর অস্তিত্ব কম-বেশি এক অচ্ছেদ্য সূত্রে গাঁথা রয়েছে! তার ভারসাম্য বিপর্যস্ত হলে সংকট আসন্ন।
    বাস্তবে নগরায়ন হলো এক রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-সামাজিক ও বাস্তুতান্ত্রিক প্রক্রিয়া। মানুষ ও বস্তুর একত্রীকরণের জন্য এর ফলে নগরের সীমানার প্রসার ঘটতেই থাকে। অব্যবহৃত কারখানা অঞ্চল, কৃষিজমি, পরিত্যক্ত খনি - সর্বস্ব এই প্রক্রিয়াতে আত্মসাৎ হয়। এই প্রক্রিয়ায় প্রায়শই জমির সনাতন চরিত্রে অবাঞ্ছিত হস্তক্ষেপ ঘটে। তদুপরি, নাগরিক জীবনশৈলীকে সচল রাখার জন্য সর্বদাই এক বিশাল পরিকাঠামো তথা শিল্পের (industry) দরকার হয় - যেটি উপকরণের সন্ধানে পরিবেশের সহন-সীমাকে লঙ্ঘন করে ধংসের দিকে ঠেলতে থাকে। এই পরিমণ্ডলের সঙ্গে নগরায়নের সম্পর্কটি দাঁড়িয়ে থাকে শোষণ, অবিচার ও নিপীড়নের ওপরে ধনতন্ত্রের ক্ষেত্রে – সমস্ত মতান্তর ও প্রতিবাদকে নিশ্চিহ্ন করে।
    এক প্রবীণ বিশিষ্ট সাংবাদিকের (দেবাশিস মজুমদার (গণমাধ্যম দৈনিক)) বয়ানে – “আন্তঃরাজ্য ভ্রাম্যমান শ্রমিকরা ভারতের অর্থনৈতিক ভিত্তি মজবুত করার অন্যতম কান্ডারী। দেশের অর্থনীতি সভ্যতার পিলসুজ। তাদেরকে সহজেই আমরা গালভরা শব্দ ‘পরিযায়ী’ তকমা জুড়ে দিই। কিন্তু চরম দুর্ভাগ্য, ভিন-রাজ্যে বা বিদেশে থাকার জন্য রেশন, স্বাস্থ্য-বীমাসহ অন্যান্য সামাজিক সুরক্ষা যোজনার বিষয়গুলো থেকে তারা বঞ্চিত। শুধুমাত্র ভোটের সময় তাদের কথা মনে পড়ে প্রশাসকদের । মারণ করোনা ভাইরাস আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে বুঝিয়ে দিল, পরিযায়ী শ্রমিকদের মৌলিক মানবাধিকারকে অবজ্ঞা করা, তাদের বাস্তব সমস্যার প্রতি অন্ধ থাকা, প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা, কিভাবে সঙ্কটকালে গোটা দেশকে চরম বিপর্যয়ে ফেলতে পারে।” এই বিষয়ে “এক দেশ এক রেশন কার্ড” এর উদ্যোগ সম্প্রতি নেয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। খাদ্য সুরক্ষার বিষয়টি এদেশে জীবন ও জীবিকার সাংবিধানিক অধিকারের অন্তর্ভূক্ত। তাই অসংগঠিত ক্ষেত্রের কর্মীদের এই দায়িত্ব তাদের মালিকের ওপরে সম্পূর্ণ ছেড়ে না দিয়ে রাষ্ট্রকেই এটি সুনিশ্চিত করতে হবে।

    অতিমারীর ক্ষয় ক্ষতির নিরিখে পাশ্চাত্য দেশগুলি ও ভারত

    চলতি অতিমারিতে সেপ্টেম্বর ২০২০ মাসের এক বিশেষ দিন পর্যন্ত মোট হিসাব নিলে ভারতে এই রোগে মৃত্যুর হার যেখানে দাঁড়িয়েছে প্রতি ১০ লক্ষ জনসংখ্যাতে ৭০ জন, পাশাপাশি সেদিন পর্যন্ত এই হার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ১০ লক্ষ জনসংখ্যাতে ৬৩৩ জন এবং ব্রাজিলে প্রতি ১০ লক্ষ জনসংখ্যাতে ৬৬৮ জন। ভারতের case fatality rate হল ১.৫৬ শতাংশ, যেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই হার হল ২.৮৫ শতাংশ এবং ব্রাজিলের ক্ষেত্রে এই হার ২.৯৯ শতাংশ। প্রসঙ্গত পাশ্চাত্যের দেশগুলোর তুলনায় ভারতের মতো আফ্রিকার দেশগুলির শহরাঞ্চল ও ঘন-বসতিপূর্ণ এবং দূরত্বের মতো স্বাস্থ্যবিধি ঠিকমতো মেনে চলাও দুষ্কর; উপরন্তু স্বাস্থ্য পরিষেবার পরিকাঠামো অপ্রতুল। তা সত্বেও ভারত ও আফ্রিকাতেই মৃত্যুহার কম - যা এক রহস্য বলা চলে। এর সম্ভাব্য কারণ নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে নানা মত ও তার খানিক অংশ বর্তমানে পরীক্ষাধীন থাকলেও, যেটুকু জানা গেছে সেই কারণগুলি হলো -

    ১) আফ্রিকার বা ভারতের জনসংখ্যার গড় বয়সের (২৬.৮ বছর) তুলনায় ব্রাজিল বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গড় বয়স বেশি - যথাক্রমে ৩৮.৫ ও ৩৩.২ বছর।
    ২) ভারত ও আফ্রিকার মতো বহু উন্নয়নশীল দেশে সূর্যালোক অপরিমিত হওয়ার ফলে জনসংখ্যার মধ্যে ভিটামিন ডি-র ঘাটতি নগন্য, যে সুবিধাটি পাশ্চাত্য দেশগুলিতে নেই। এই ভিটামিন ডি-স্বল্পতার সঙ্গে করোনা রোগ সংক্রমণের একটি সম্পর্ক সাম্প্রতিক সমীক্ষায় মিলেছে বলে জানা যায় (তথ্য সূত্র - ৭)।
    ৩) পাশ্চাত্য দুনিয়ার মানুষদের খাদ্যাভ্যাস, জীবনযাত্রা ইত্যাদি ক্ষেত্রে কিছু ভিন্নতার কারণে তাঁদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ভারতীয়দের ও আফ্রিকানদের থেকে কম মনে করেন অনেকে। যদিও এই বক্তব্য প্রমাণ সাপেক্ষ।
    ৪) সর্বোপরি, এই সব উন্নত শীতের দেশে আমাদের মতো জানলা-দরজা খোলা রাখার রীতি প্রায় নেই। কেন্দ্রীভূত শীতাতপ-নিয়ন্ত্রিত বাড়ি ও গাড়ির রীতি ও অভ্যাসের প্রভাবও খানিক পড়ে ভাইরাস সংক্রমণের ক্ষেত্রে। কারণ দেখা গেছে মুক্ত পরিবেশের তুলনায় ঘরের মধ্যে বা ঐ ধরনের বদ্ধ স্থানেই সংক্রমণের ঘটনা দেখা গেছে অনেক বেশি। এছাড়া নিম্নলিখিত বিষয়গুলি এক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক -
    Heating, ventilation and air-conditioning (HVAC) systems এর ক্ষেত্রে বিশ্ব-স্বাস্থ্য-সংস্থার (WHO) মতে বদ্ধ পরিবেশে একই বায়ুর ঘুরতে থাকা কমানোর জন্য, বায়ুর পরিবর্তনের মাধ্যমে ও ফিল্টারকে পরিষ্কার করার মাধ্যমে সংক্রমণের সম্ভাবনা কমানো সম্ভব।
    কিন্তু এই ভাবে টাটকা বায়ুর ব্যবস্থা ও যন্ত্রের মধ্যে ফিল্টার ইত্যাদির সময়মতো যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ সব ক্ষেত্রে বাস্তবে কতটা সম্ভব হয়েছে বা এখনও হয়ে চলেছে - এটি হয়তো প্রশ্নের উর্ধ্বে নয়! তাই বিশদ তথ্য সংগ্রহ এক্ষেত্রে দূরূহ হলেও, মৃত্যুর বর্ধিত হারের সঙ্গে এর কিছুটা সম্পর্ক থাকতে পারে - এমন সন্দেহ করার কিছু কারণ আছে।

    সারণী: করোনা সংক্রমণ ও আবহাওয়ার তাপমাত্রার সম্পর্ক, ৪ ঠা মে ২০২১ তারিখে অতিমারীর অবস্থা
    দেশ প্রতি দশ লক্ষ জনে সংক্রমিত মানুষের সংখ্যা আবহাওয়ার তাপমাত্রা (ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড)
    চেক প্রজাতন্ত্র ১৫,২৬১ -১ থেকে ১৯
    মার্কিন   যুক্তরাষ্ট্র ৯৯,৯০৫ - ৪ থেকে ৩২
    সুইডেন ৯৫,৯০৩ - ৩০ থেকে ২০
    ইজরায়েল ৯১,১৮৩ ১২ থেকে ৩০
    নেদারল্যান্ড ৮৮,৩৫৮ ৬ থেকে ১৭
    ফ্রান্স ৮৬,৪৯০ ৬.৫ থেকে ২১.৫
    বেলজিয়াম ৮৫,৭০৪ ৩ থেকে ১৮
    ইতালি ৬৭,০৭৯ ৬ থেকে ২৮
    আর্জেন্টিনা ৬৬,৩৩৮ ১৪ থেকে ২৮
    ব্রিটিশ   যুক্তরাষ্ট্র ৬৪,৮৫১ ৬ থেকে ১৯
    চিলি ৬৩,১৪৮ ১১.৪ থেকে ২৫.৫
    তুরস্ক ৫৭,৫৮২ ৫.৫ থেকে ২৩.৫
    কলম্বিয়া ৫৬, ৫৯৩ ১৮ থেকে ৩৫
    রোমানিয়া ৫৫,৩২৪ -৫ থেকে ২৯
    পেরু ৫৪,৩৮৮ ১৪.৯ থেকে ২৬


  • অন্যান্য নানা কারণের সঙ্গে আবহাওয়ায় তাপমাত্রার সঙ্গেও এই বিশেষ ভাইরাস-সংক্রমণের গতির একটি সম্পর্ক আছে বলে বহু গবেষক মনে করেন। এই বিশেষ ভাইরাসের অনুকূল তাপমাত্রা হল - ৬.২৮ থেকে ১৪.৫১ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড। আরেকটি গবেষণাপত্র অনুসারে, যে দেশের বেশির ভাগ সময় প্রাকৃতিক তাপমাত্রা ২ থেকে ১৭ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড-এর মধ্যে থাকে, সেই দেশগুলিতেই সংক্রমণ বেশি - যেমন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, ইতালি, স্পেন। সারণীতে উল্লিখিত দেশগুলির মধ্যে খুব কম দেশের তাপমাত্রা এর উপরে থাকে। উপরন্তু এই দেশগুলির স্বচ্ছল জীবনধারায় দিনের বেশির ভাগ সময় দরজা জানলা খোলা রেখে রোদ-বাতাস ঘরে ঢোকানোর পরিবর্তে সব বন্ধ অবস্থায় শীতাতপ-নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় বাস করা পছন্দ করে। সেটি এমন অতিমারীর সময়ে জনস্বাস্থ্যের দিক দিয়ে হয়তো সর্বদা স্বাস্থ্যকর নয়। এই ব্যবস্থার উপরে নির্ভরশীলতা বেশি হওয়ায়, তার অল্প ত্রুটি-বিচ্যুতির বিরূপ প্রভাব অতিমারী সংক্রমণের উপরে অনেকটা বেশি করে পড়ার আশঙ্কা।
    The Lancet পত্রিকার ১ মে ২০২১ সংখ্যায় এক নিবন্ধের প্রকাশের সঙ্গেই বাস্তবে এই বিষয়ে চর্চার সম্পূর্ণ নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে বলা যায়। এটির উপসংহার অংশে বলা হয়েছে - বায়ুর কিছু নমুনায় SARS Cov 2-এর উপস্থিতির প্রত্যক্ষ প্রমাণ না পাওয়ার জন্য, সামগ্রিক ভাবে বায়ুবাহিত সংক্রমণের সাক্ষ্যকে উপেক্ষা করাটা ভুল হবে। তাঁদের মতে, বায়ুবাহিত-পন্থায় যে এই ভাইরাসের সংক্রমণ ঘটে থাকে - সে ব্যাপারে ধারাবাহিকভাবে জোরালো প্রমাণ পাওয়া গেছে।
    প্রায় ডজন-খানেক বিশ্বসেরা বিশেষজ্ঞ অভিমত দিয়েছেন যে Ventilation তথা HVAC বিষয়ে প্রচলিত নিয়মগুলি বায়ুবাহিত সংক্রমণ রোধ করতে ব্যর্থ হচ্ছে। বদ্ধ অভ্যন্তরীণ স্থানে বহুজনের সমাবেশ ঘটলে - তার থেকে শ্বাস বায়ু বাহিত এরোসল-এর মাধ্যমে রোগ সংক্রমণ প্রায়ই ঘটে চলেছে। সম্প্রতি করোনা ভাইরাসের উপরে গবেষণায় এমনই তথ্য উদঘাটিত হয়েছে। তার পরিপ্রেক্ষিতে এই বিশেষজ্ঞরা সংশ্লিষ্ট নিয়মাবলীর সংশোধনের জন্য আবেদন করেন। বিজ্ঞানের পত্রিকায় প্রকাশিত প্রবন্ধে এই বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীদের মত হলো - খাদ্য, স্বাস্থ্য বিধান (sanitation) এবং পানীয় জলের নিরাপত্তার বিষয়ে সরকারী আইন যথেষ্ট কঠোর; কিন্তু বায়ুবাহিত রোগ-জীবাণুর বিষয়ে তেমন জোর দেওয়া হয় না।
    তাঁদের মতে এর কারণ হল - জল বা খাদ্যবাহিত রোগ সংক্রমণের ক্ষেত্রে সেগুলির উৎস পরিদর্শন/নজরদারি করে চিহ্নিত করা যত সহজ, বায়ুবাহিত রোগের উৎস চিহ্নিত করা মোটেই তেমন সহজ নয়। তাঁরা কারণ হিসাবে আরো বলেন - বাড়ির নকশা-রচয়িতা বা স্থপতিরা আবাসিকদের তাপমাত্রা সংক্রান্ত স্বাচ্ছন্দ্য, শক্তির সাশ্রয় ইত্যাদি বিষয়কে এক্ষেত্রে যতটা গুরুত্ব দিয়ে থাকেন, আবদ্ধ বাতাসে রোগজীবাণুর পরিমাণ বিষয়টি সে তুলনায় অনেক তুচ্ছ ভাবে দেখা হয়। এই প্রবন্ধে দাবি করা হয়েছে - রেস্তোরাঁ, জাহাজ ও স্কুলে চালানো সমীক্ষার তথ্য অনুসারে শ্বাসবায়ু - নির্গত রোগজীবাণুর সংক্রমণ আবদ্ধ ঘরটির বায়ুর মাধ্যমে ঘটতে পারে। Prof Noakes-এর বক্তব্য অনুসারে আবদ্ধ স্থানের/ঘরের বায়ুর গুণমান বিষয়ে সরকারী মানদণ্ডের কাঙ্ক্ষিত আমূল পরিবর্তন হতে চলেছে এক রীতিমত বিপ্লব।

    অনেক সময়েই এমন কিছু ঘটনা দেখা যাচ্ছে - যেখানে মানুষ সংক্রমিত হচ্ছেন বাইরে ঘোরাফেরার সময়ে নয়, বরং ঘর, রেস্তোরাঁ, বা ক্লাসরুমের মতো কোনো আবদ্ধ স্থানে থাকার সময়েই। এর সঙ্গে কারণ হিসাবে থাকে সেখানে কোনো করোনা সংক্রমিত ব্যক্তির উপস্থিতি - তাঁর উপসর্গ থাকুক বা না থাকুক।

    এমন সংক্রমণের ঝুঁকির মাত্রাটা অনেকাংশে নির্ভর করে দুটি বিষয়ের ওপর - সংক্রমিত ব্যক্তির সংখ্যা ও ঘরের আয়তন। তাদের জোরে কথা বলা, গান গাওয়া, হাঁচি, কাশি ইত্যাদির মাধ্যমে এরোসল তথা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র শ্বাসজনিত জলকণা ছিটকে ঘরের বাতাসে ভাসতে থাকে। এক গবেষকের মতে - এমন ঘরের বাতাসে ভেসে থাকার সময়-সীমা তিন ঘন্টা পর্যন্ত হতে পারে। কোনো বার-এ যেমন যত বেশিজন ধূমপায়ী, তত বেশি মাত্রায় ধোঁয়া বাতাসে জমতে থাকে ও বদ্ধ ঘরের পরিসরের মধ্যে যতটা ছড়ানো সম্ভব ছড়িয়ে ঘরটা প্রায় অন্ধকার হয়ে যায়, এরোসলের মাধ্যমে ভাইরাসের ক্ষেত্রেও একই।

    এবারে দৃষ্টি দেওয়া যাক দুটি পরিভাষার ওপরে:

    Ventilation rate - এটি হলো প্রতি একক সময়ে (ঘন্টা বা মিনিট) কত পরিমাণ বায়ুকে শীতাতপ-নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে।
    Air change rate - এটি পাওয়া যায় ventilation rate-কে ঘর বা আবদ্ধ স্থানটির আয়তন দিয়ে ভাগ করে।

    ভাইরাস সংক্রমণের ক্ষেত্রে এবং কোনো প্রকল্পের নকশা তৈরীর সময়ে এই দ্বিতীয় পরিমাপকটির গুরুত্বই বেশি। কারণ এটির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক আবদ্ধ পরিসরটির বায়ুর গুণমানের (air quality)। এই বিশেষ পরিমাপকটির থেকে হিসাব পাওয়া যাবে - ঐ আবদ্ধ ঘর থেকে জীবাণুবাহী বাতাসকে কত কম সময়ের মধ্যে বের করে দেওয়া সম্ভব। যত দ্রুত এমন জীবাণুবাহী বাতাসকে বের করা সম্ভব হবে, ততই সংক্রমণের আশঙ্কা কমানো যাবে।

    পশ্চিমবঙ্গ সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ দপ্তরের অধীন হাসপাতালের CCU/HDU-এর জন্য বর্তমানে একটি রীতি-সংহিতা প্রচলিত রয়েছে। সেই নির্দেশিকা অনুসারে প্রতি ঘর-পিছু প্রতি ঘণ্টায় অন্তত মোট ৬ বার বাতাস বদল করতে হবে, তার মধ্যে অন্তত প্রতি ঘণ্টায় ২ বার বাইরের বাতাস দিতে হবে। বেশির ভাগ বাড়ি বা ইমারতে সাধারণত দেখা যায় যে ২০ শতাংশ টাটকা বাতাসকে ভরে বাকি ৮০ শতাংশ ব্যবহৃত বাতাসকেই পুনঃসঞ্চালনের মাধ্যমে সদ্ব্যবহার করা হয়। দেশে বিদেশে প্রচলিত যে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার রীতিটি সাধারণ ভাবে এমনই - যেটির প্রচলিত প্রযুক্তি অধুনা HVAC (Heating, ventilation and Air conditioning) নামে সমধিক পরিচিত।

    এই বিষয়ে ভারতের National Building Code ছাড়া প্রামাণ্য রীতি-নির্দেশিকা রয়েছে ASHRAE (The American Society of Heating, Refrigerating and Air-Conditioning Engineers) সংস্থার। একটি ৩৫ জনের ক্লাসরুমে এই নির্দেশিকা অনুসারে ১০০০ বর্গফুট ক্ষেত্রফলের একটি ঘরে মিনিটে ৫০০ ঘনফুট বাইরের টাটকা বাতাসকে ভরার প্রয়োজন। সারা বিশ্বেই এই সংস্থার রীতি নির্দেশিকা প্রযোজ্য। ASHRAE সংস্থাটি স্কুল, ক্রেশ, হাসপাতাল, কম্পিউটার ল্যাবের মত বাণিজ্যিক ইমারতের জন্য ভিন্ন ভিন্ন মানদণ্ড নির্ধারণ করে দিয়েছে - প্রতি ক্ষেত্রে কতটা পরিমাণ বাইরের টাটকা বাতাসকে প্রেরণ বা মিশ্রণ করতে হবে।

    কিন্তু এই প্রশ্ন খুবই সঙ্গত যে সর্বত্র এই নির্দেশিকা অক্ষরে অক্ষরে পালন করা হয় কিনা! যদি না হয়, সেক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ বায়ুর গুণমান ও সেই সঙ্গে সেখানে বাসকারী মানুষের সংক্রমণের আশঙ্কার মাত্রা বৃদ্ধি পাবে স্বাভাবিক কারণেই। এর সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত রয়েছে নজরদারি প্রশাসনিক সংস্থাগুলির সক্রিয়তাসহ সামগ্রিক ভাবে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও গুণমান নিশ্চিতকরণের প্রশ্নটি। নিয়মিত সময়ের ব্যবধানে এই যন্ত্রগুলির সমস্ত ফিল্টার পরিষ্কার না করলে তার বাইরে থেকে আসা দূষিত পদার্থ, জীবাণু ইত্যাদিকে আটকানোর ক্ষমতা ও তার ফলে অভ্যন্তরীণ বায়ুর গুণমান কমে যাবে। কিন্তু এটা উল্লেখ্য যে - কোনো বদ্ধ-পরিসরে শুধুমাত্র অভ্যন্তরীণ বাতাসের গুণমানই সংক্রমণের ক্ষেত্রে একমাত্র বিচার্য বিষয় নয়। বরং মাস্ক ব্যবহার, দৈহিক দূরত্ববিধি বজায় রাখা ইত্যাদি নিয়ে যে বৃহত্তর কর্মপ্রণালী, তারই এটি অঙ্গ হিসাবে দেখতে হবে।

    বাণিজ্যিক ইমারত ছাড়াও আরও অনেক বাড়ি/ইমারত ব্যক্তিগত মালিকানায় থাকে সব দেশেই। সেগুলির ক্ষেত্রে কি একইভাবে সক্রিয় নজরদারি ও গুণমান রক্ষা বাস্তবে সম্ভব হয়? ভারতবর্ষের মত তথাকথিত উন্নয়নশীল দেশগুলোর চিত্র এই বিষয়ে তেমন উজ্জ্বল না হবার আশঙ্কা যথেষ্টই থেকে যায়। এসব সত্বেও আমাদের দেশে প্রতি লক্ষ জনসংখ্যা-পিছু সংক্রমণ ও মৃত্যু অনেক কম পাশ্চাত্য দেশের তুলনায়। এর অন্যতম কারণ হল ভৌগোলিক কারণে বেশির ভাগ অঞ্চলে আমাদের দেশের তাপমাত্রা, এই বিশেষ ভাইরাসের অনুকূল যে তাপমাত্রা: -৬.২৮ থেকে +১৪.৫১ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড, তার থেকে উপরে থাকে।

    ২০২১ জানুয়ারী-ফেব্রুয়ারী মাসে মুম্বাই শহরের করোনা সংক্রমিত রোগীর প্রায় ৯০ শতাংশ এসেছে বহুতল অট্টালিকা গুলি থেকে (তথ্য সূত্র -১৩)। কলকাতা শহরেও সংক্রমিত রোগীর ৬৫ শতাংশ এসেছে বহুতল অট্টালিকা থেকে (তথ্য সূত্র - ১১)। জনস্বাস্থ্য আধিকারিক ও পুর-কর্তা/কর্মীদের মতে বস্তিবাসীদের তুলনায় এই ধরনের বহুতলের আবাসিকদের মধ্যে সুরক্ষা-বিধি অমান্য করার ঝোঁক অনেক বেশি, এমনকি নিজে সংক্রমিত হলেও। এই রকম অট্টালিকায় অনেকে দিনের বেশিরভাগ সময় দরজা-জানলা খোলা রেখে রোদ-বাতাস ঘরে ঢোকানোর পরিবর্তে সব বন্ধ অবস্থায় শীতাতপ-নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাতে বাস করা পছন্দ করে। ঘরে খোলা বাতাস ও রোদ খেলানোর সনাতন রীতি নিঃসন্দেহে স্বাস্থ্যকর। বহুতলের লিফটে বদ্ধ পরিসরে কোনো সংক্রমিত ব্যক্তি জেনে বা না জেনে যাতায়াত করলে তাঁর শ্বাস-নির্গত এরোসল কয়েক ঘন্টা ভাসমান অবস্থায় থেকে অন্যকে সংক্রমিত করার আশঙ্কা, বিশেষত মাস্ক ও সুরক্ষাবিধি মেনে না চললে। লিফটগুলির exhaust fan-এর ক্ষমতা বাড়িয়ে অভ্যন্তরীণ বদ্ধ, দূষিত বাতাসকে আরো দ্রুত বের করার ব্যবস্থা করা দরকার - যাতে সংক্রমণের আশঙ্কা কমে। এ ধরনের অট্টালিকার আরেক আশঙ্কার জায়গা হল কমোড ইত্যাদির সঙ্গে যুক্ত পাইপগুলি। কমোডের সঙ্গে যুক্ত U-trap অংশটিতে যে জল থাকে water seal হিসাবে, সেটি অসাবধানে শুকিয়ে গেলে সেই পথে নিচের ফ্ল্যাটের দিক থেকে ভাইরাস সংক্রমণের অল্প মাত্রায় আশঙ্কা থাকে। তুলনায় P-trap-এ এই আশঙ্কা কম থাকে। সুতরাং প্রকৌশলীদের সচেষ্ট হওয়া দরকার এক্ষেত্রে একটি কোনো বাড়তি সুরক্ষা ব্যবস্থার আবিষ্কার করতে।

    অপহৃত স্বপ্নের বিনির্মাণ ও নবনির্মাণ

    আজকের এই বিশ্বব্যাপী মহামারী-জনিত সার্বিক বিপর্যয়-এর মুহূর্তে আবার সেই হারানো স্বপ্নের সন্ধান প্রাসঙ্গিক হতে পারে। পরাধীন যুগের মানুষ ভাবতেন - ভারতবাসীর শ্রমে যে বিপুল সম্পদ তৈরী হচ্ছে, দেশ স্বাধীন হলে তাই দিয়েই গড়ে উঠবে স্বপ্নের ভারত। এখনকার করোনা- মহামারীতে আমাদের জীবনে অন্যতম প্রধান সংকট হলো জীবিকার এবং তারই সঙ্গে জুড়ে রয়েছে যুগোপযোগী পেশামুখী শিক্ষা ও স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর ঘাটতি। তথ্য অনুসারে এদেশে প্রায় ১২.২ কোটি মানুষ জীবিকা হারিয়েছেন (Ref: BBC news, 6May 2020)। একটি সমীক্ষা অনুযায়ী অসংগঠিত ক্ষেত্রের জীবিকায় যুক্তদের ৮০ শতাংশ কর্মী ২০২১ সালে কর্মচ্যুত হয়েছেন। প্রথাগত শিক্ষা ও পেশার ছকবাঁধা ব্যবস্থায় সব নাগরিকের কর্মসংস্থান অনিশ্চিত এই পরিস্থিতিতে। এই সংক্রমণের মূল শিকার হল বড়ো ও মাঝারি শিল্পসমৃদ্ধ মহানগরীগুলি।

    বর্তমানে আমাদের দেশের অর্থনৈতিক পিরামিডের রূপ হলো – ১২.৮ কোটি (১.২৮ বিলিয়ন) মানুষ মাসে দশ হাজার টাকারও কম পারিবারিক আয়ে জীবনযাপন করে এবং তাদের মধ্যে ৭০ মিলিয়ন (৭ কোটি) মাসিক ৬০০০ টাকার বা তারও কম পারিবারিক আয়ে জীবনযাপন করে – যাদের জীবত্কালে তাদের জীবনযাত্রার মানের উন্নতি ঘটা সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে মাইক্রো-ফিনান্স এক যুগান্তকারী ভূমিকা নিয়ে ৫ কোটি পরিবারকে তার সঙ্গে সংযুক্ত করলেও তার চেয়েও বড় কথা হল এই ঋণ নেবার পর কিভাবে তার সদ্ব্যবহার করে পরিবারটি উপকৃত হচ্ছে। এর ফলে যদি পরিবারটি তাদের সম্প্রদায় বা অঞ্চলের মধ্যে শুধু কোনক্রমে টিকে থাকে (subsistence entrepreneurs), তাতে পরিবারটির প্রয়োজন মিটলেও, তার শিল্পোদ্যোগের ফলে যদি কোনো উদ্বৃত্তের (surplus) সৃষ্টি অথবা কর্মসংস্থান তৈরী না হয় - তাহলে বিষয়টি একটি পর্যায়ে আটকে থাকবে, তার উত্তরণ ঘটবে না।

    Centre for monitoring Indian Economy-র এক সমীক্ষায় দেখা যায় ২০১৮ সালে ১ কোটি কর্মসংস্থান নষ্ট হয় এবং এই পরিস্থিতির সুরাহা হয়নি। চারপাশে যে ভাবে চা ও পান-বিড়ি ইত্যাদির ছোট দোকান এবং ই-রিকশা ইত্যাদি গাড়িতে ভরে যাচ্ছে, তাতে স্পষ্ট আভাস মেলে যে অর্ধ-শিক্ষিত ও প্রশিক্ষণ-বিহীন জীবিকার এমন প্রসার। নিচে ২০১৬ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে এক কর্মসংস্থানের চিত্র দেয়া হলো:

    শিক্ষা  ৫ম শ্রেণী পর্যন্ত ৬ষ্ঠ-৯ম  ১০ম –১২শ  স্নাতক ও উর্ধে
    কর্মসংস্থান (কোটি):৩.৮১.৮১.৩০.২৯

    স্পষ্টতই তথাকথিত কম-শিক্ষিত বা অশিক্ষিতদের কর্মসংস্থান বেড়েছে তুলনায় বেশি। যত শিক্ষিত, ততই তার সুযোগ কম। অর্থাৎ উত্কর্ষ-যুক্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ তুলনামূলকভাবে কম বাড়ার ফলে মানুষ নিজের যোগ্যতার চেয়ে নিচের স্তরের জীবিকা নিতে বাধ্য হচ্ছেন।

    বিশিষ্ট লেখিকা জয়া মিত্রের মতে, “ভারতবর্ষের মত দেশে কৃষি ছিল শুধুমাত্র একটি উত্পাদন পদ্ধতির চেয়ে অনেক বেশি। দীর্ঘকালের অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান এবং বাস্তবসম্মত কলা ও বিজ্ঞানচর্চার ওপর নির্ভরশীল সংস্কৃতি ছিল এদেশের কৃষিসংস্কৃতি। সরাসরি কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত মানুষের চেয়ে অনেক বেশি সংখ্যক মানুষ গ্রামসমাজের অন্য অনুসারী কাজকর্মের সঙ্গে যুক্ত থাকতেন। প্রাকৃতিক সম্পদ অপেক্ষাকৃত কম ব্যবহার করা হত বলে দিন চলতো অপেক্ষাকৃত কম উপকরণে।” বর্তমান নিবন্ধকারের মতে যেকোন প্রকল্পই হোক না কেন, সর্বদাই তা মহানগরীগুলিতে কেন্দ্রীভূত হওয়ার অতিরিক্ত ঝোঁক অনেক সময়ে যুক্তিহীন। এছাড়া বৃহৎ শিল্পপতিরা ও আমলা/বাবুরা বেশির ভাগ সময়েই পছন্দ করেন ক্ষমতার কেন্দ্রে মহানগরের বিনোদন ও পরিকাঠামোর সুবিধায় বসবাস।

    ভারত সরকারের ২০১৮-র নীতি-আয়োগ প্রতিবেদন অনুসারে দিল্লী, ব্যাঙ্গালোর, চেন্নাই, হায়দ্রাবাদ-সহ দেশের মোট ২১ টি শহরে ভূগর্ভস্থ জল নিঃশেষিত হয়ে যাবে ২০২০ সালের মধ্যে। এর ফলে ১০০ মিলিয়ন (১০ কোটি) ভারতবাসী বিপন্ন হতে চলেছে। এতদ্সত্বেও, প্রস্তাবিত আবাসন-পরিকল্পনাতেও (NUPF 2018) লক্ষ্য মহানগরগুলিতে ঘন-সন্নিবিষ্ট উচ্চ আবাসন – যা অবাস্তব, অস্বাস্থ্যকর, পরিবেশ-ঘাতক, এবং সুস্থিত উন্নয়নের ধারণার প্রতিকূল। সেজন্য সর্বদাই সচেষ্ট থাকতে হবে যত বেশি সম্ভব কর্মপ্রার্থীকে নিয়োগের উপযোগী ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, মফস্বল শহর ও গঞ্জ বা গ্রামীণ এলাকায় গড়ে তোলা। প্রয়োজনে এর জন্য কারিগরী-শিক্ষার অগ্রাধিকারে ও শিক্ষাক্রমের রদবদল আনা চাই। এজন্য সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রগুলি নিয়ে যথাযথ সমীক্ষা, তথ্য-বিশেষণ ও সামগ্রিক পরিকল্পনা-রচনা দরকার। প্রতি জেলায় অন্তত একটি কারিগরী-শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে Incubation Centre-এর মাধ্যমে আগ্রহী শিক্ষার্থীদের গবেষণা ও শিল্পস্থাপনে প্রাথমিক পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহায়তার নিশ্চয়তা দিতে হবে। “আধুনিকীকরণ-শিল্পায়ন-নগরায়ন” - আধুনিকতার এই সহজ পন্থার সরল সমাধানের মোহে বিভ্রান্ত না হয়ে, সমবায় ইত্যাদি নানাবিধ বিচিত্র বিকল্পের উদ্ভাবনে সর্বদাই সচেষ্ট থাকতে হবে।

    তাই একদিকে নগরায়ন-তত্ত্বে আমূল পরিবর্তন আনতে হবে এবং কর্মসংস্থানের জন্য অতিকায় শিল্পের ওপরে এতদিনকার অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে আনতে হবে - এই দিকটা হলো বিনির্মাণ। কিন্তু রাষ্ট্রায়ত্ব শিল্পের নির্ণায়ক ভূমিকার মর্যাদা একটুও কমানো চলবেনা। পাশাপাশি মাঝারি, ছোট, ও কুটির শিল্পের এবং কৃষিতে জোয়ার আনতে হবে, বিশেষত পল্লী অঞ্চল, ছোট, ও মাঝারি শহরগুলিতে। এই উদ্ভাবন ও নবনির্মাণে জোয়ার আনার জন্য অগ্রবাহিনী হলো বিজ্ঞানমনস্ক ছাত্র ও যুবা - দেশে দেশে তাদেরই আঘাতে অচলায়তন ভেঙে পড়ছে এযুগেও। তাদেরই জনজীবনের সাংস্কৃতিক নেতৃত্বে আসতে হবে।

    লেখক ভূতপূর্ব মুখ্য বাস্তুকার, পূর্ত দপ্তর এবং অতিথি অধ্যাপক, আই-আই-ই-এস-টি শিবপুর।

    তথ্যসূত্র:

    1) Healthy urban planning in European cities, HUGH BARTON, MARCUS GRANT, CLAIRE MITCHAM and CATHERINE TSOUROU
    2) Global urbanization created the conditions for the current coronavirus pandemic,
    The Conversation, York University
    3) After the Pandemic, Will We Rethink How We Plan Our Cities? The COVID-19 pandemic is not a crisis of the city, but the crisis of a certain kind of city. - Hussain Indorewala and Shweta Wagh
    4) “Small is beautiful”, E.F. Schumacher, 1973
    5) “Industrialisation In India”, Jana Hambrock and Sebastian Hauptmann
    6) " A health care facility allocation model for expanding cities in developing nations", Basu, Jana and Bardhan
    7)"Nutritional status of patients with COVID-19", IJID, International Journal of Infectious Diseases
    8) “The role of temperature on the global spread of COVID 19 and urgentsolutions “,
    I. Roy, International Journal of Environmental Science and Technology
    9)“Ventilation and air filtration play a key role in preventing the spread of COVID-19 indoors”,
    RAMON PADILLA , USA TODAY
    10) ASHRAE Handbook ( The American Society of Heating, Refrigerating and Air-Conditioning Engineers)
    11)এই সময় " দৈনিক , ১৬ মে ২০২১
    12)Ten scientific reasons in support of airborne transmission of SARS-CoV-2,
    Trisha Greenhalgh Jose L Jimenez Kimberly A Prather Zeynep Tufekci David Fisman Robert Schooley
    13) India Today, March 12, 2021
    14) BBC news, 6May 2020
    15) Climate and the spread of COVID-19,Simiao Chen, Klaus Prettner, Michael Kuhn, Pascal Geldsetzer, Chen Wang, Till Bärnighausen & David E. Bloom
    Scientific Reports volume 11, Article number: 9042 (2021)
  • বিভাগ : আলোচনা | ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২১ | ৫১৪ বার পঠিত
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:

কুমুদি পুরস্কার   গুরুভারআমার গুরুবন্ধুদের জানান


  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। মন শক্ত করে মতামত দিন