• বুলবুলভাজা  ধারাবাহিক  খেলা  শনিবারবেলা

  • ভারতের অপারেশন টোকিওঃ পর্ব ৪

    সৌরাংশু
    ধারাবাহিক | খেলা | ১১ সেপ্টেম্বর ২০২১ | ৩৪৯ বার পঠিত | রেটিং ৪ (২ জন)
  • শুরু হল নতুন সিরিজ, চতুর্বর্ষীয় হুজুগে দেশ থেকে যাঁরা এবারের অলিম্পিকে গেলেন তাঁদের মধ্যে সত্যিকারের মেডেলের সম্ভাবনা কাদের ছিল এবং বাকিদের, মেডেল না পেলেও, সর্বোচ্চ পারফরম্যান্স কোথায় দাঁড়াত, সেই নিয়ে কাটাছেঁড়া। চলছে বিভিন্ন ডিসিপ্লিন-ভিত্তিক একটা বীক্ষণ । এই পর্ব কুস্তি নিয়ে।


    কুস্তি

    কুস্তি বা মল্লযুদ্ধের কথা উঠলে আমাদের ফিরে যেতে হবে সেই মহাকাব্যে। যেখানে বালী আর সুগ্রীব রাজ্যপাট নিয়ে লড়ছেন। অথবা মহাভারতের জরাসন্ধের আখড়ায় ভীম তাঁকে পরাস্ত করছেন। বস্তুত কুস্তি বা মল্লযুদ্ধ বা রেসলিং মানব ইতিহাসের সর্বপ্রথম কমব্যাটিভ স্পোর্টস। যেখানে নিজের অধিকার, অন্ন, বস্ত্র বা বাসস্থানের জন্য দুই পুরুষের মধ্যে ‘দো দো হাত’ হচ্ছে। কুস্তি ছিল তখন পৌরুষের প্রতীক।

    প্রাচীন গ্রীস, ব্যাবিলন, মিশর, পারস্য বা রোমেও এই মল্লযুদ্ধের চল ছিল। মেসোপটেমিয়ার লোকগাথার নায়ক গিলগামেশ তাঁর নেতৃত্ব কায়েম করেন মল্লযুদ্ধে এনকিডুকে হারিয়েই। গ্রীক লোকগাথা অনুযায়ী জিউস মল্লযুদ্ধে ক্রোনোসকে হারিয়ে পৃথিবীকে টাইটানদের হাত থেকে রক্ষা করেন।

    বর্তমানে, তুরস্কে সারা গায়ে তেল মেখে মল্লযুদ্ধকে জাতীয় ক্রীড়ার মর্যাদা দেওয়া হয়। অথবা জাপানের সুমো, কেরালার গাট্টা গুস্তি বা গ্রীক প্যানক্রাক্টন, মল্লযুদ্ধের বিভিন্ন ধারা বিভিন্ন দেশে প্রাচীন কাল থেকেই জনপ্রিয় হয়ে চলে আসছে।
    সে সব থাক, প্রথম অলিম্পিকেই গ্রেকো-রোমান বিভাগে কুস্তিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। যা সর্বসাধারণের জন্য ওপেন টুর্ণামেন্ট ছিল। ফ্রিস্টাইলে যেমন পা ব্যবহারের বাধা নেই, প্রতিপক্ষকে ল্যাং মেরে ফেলে দিতে, গ্রেকো-রোমানে পা ব্যবহার করা যায় না। কার্ল শ্যুমান বলে এক জার্মান সোনা জেতেন। কার্ল শ্যুমান জিমনাস্টিক্স, অ্যাথলেটিক্স এবং ওয়েটলিফটিং-এও অংশ নিয়েছিলেন। জিমনাস্টিক্সের হরাইজন্টাল বার ও প্যারালাল বারের দলগত বিভাগে এবং ভল্টিং হর্সের ব্যক্তিগত সোনা জেতেন। অলিম্পিকের ইতিহাসে তিনিই প্রথম এবং একমাত্র ব্যক্তি যিনি একাধিক খেলায় সোনা জিতেছেন।

    ব্রিটিশাধীন ভারত প্রথমবারের জন্য অংশ নেয় অলিম্পিক কুস্তিতে ১৯২০ সালে। সেবারই প্রথম ভারতীয়রা ভারতের হয়ে অংশ নেন। কুমার নাভালে এবং রণধীর সিন্দেস কুস্তিতে অংশ নেন, কিন্তু মেডেল জেতার জায়গায় পৌঁছতে পারেননি।
    এর ১৬ বছর পর বার্লিনে ৩জন অংশ নেন এবং ২৮ বছর পর আবার দুই বাঙালি সহ ছ’জনের দল পাঠানো হয় কুস্তিতে। সেবারই প্রথম হকির সোনা আসে আর অনন্ত ভার্গব ও কে ডি যাদব নিজ নিজ ওজন বিভাগে তৃতীয় রাউন্ডে পরাস্ত হন। কেডি যাদব অবশ্য ব্যান্টমওয়েট বিভাগে পরের বারের হেলসিঙ্কি অলিম্পিকে ব্রোঞ্জ জেতেন। প্রথম ভারতীয় হিসাবে প্রথম ব্যক্তিগত মেডেল।
    এরপর ৫৬ বছর ধরে বিভিন্ন সময়ে কেশব মঙ্গাভে, সুদেশ কুমার, জগমিন্দর সিং, রাজিন্দর সিং মেডেলের খুব কাছে পৌঁছেও জিততে পারেননি। শেষে বেজিং-এ এই জিংক্সটা ভাঙেন সুশীল কুমার। রেপোচেজের সুবিধা নিয়ে ব্রোঞ্জ জিতে। রেপোচেজের অর্থ হল, আপনি যাঁর কাছে হারলেন, তিনি যদি ফাইনালে ওঠেন তাহলে তিনি যাঁদের যাঁদের ফার্স্ট রাউন্ড থেকে সেমি ফাইনালে হারিয়েছেন, তাঁরা একে একে নিজেদের মধ্যে লড়বেন ব্রোঞ্জ মেডেলের জন্য। সুশীল রুপো জয়ী ইউক্রেনের মল্লবিদ আন্দ্রে স্তাদনিকের কাছে হারেন প্রি কোয়ার্টারে, কিন্তু রেপোচেজের সুবিধা নিয়ে পরপর দুজনকে হারিয়ে ব্রোঞ্জ নিশ্চিত করেন।
    এরপর প্রতিটি অলিম্পিকেই কোনও না কোনও পদক এসেছে। লন্ডনে সুশীল এক ধাপ উঠে রুপো জেতেন, সঙ্গে যোগেশ্বর দত্ত ৬০ কিলো বিভাগে ব্রোঞ্জ। রিওতে তো প্রথমবারের জন্য মহিলাদের ৫৮ কিলো বিভাগে ব্রোঞ্জ জেতেন সাক্ষী মালিক।

    একটা গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট, এই যে ভারত ১৯২০ থেকে এবং ১৯৩৬ থেকে নিয়মিত কুস্তিতে প্রতিদ্বন্দ্বী পাঠাচ্ছে অলিম্পিকে, এদের মধ্যে গ্রেকো রোমান কুস্তিতে খুবই কম অংশ নেন, একমাত্র বলার মতো পারফরম্যান্স ‘৯২এর বার্সিলোনায় পাপ্পু যাদবের গ্রেকো রোমানে ৪৮ কিলো বিভাগে অংশ নেওয়া। কারণ কী?
    আসলে গ্রেকো রোমান পূর্ব ইউরোপে যতটা জনপ্রিয় ভারতে নয়। ভারতের কুস্তির আঁতুড়ঘর বলে পরিচিত হরিয়ানা পাঞ্জাবের আখড়া গুলোয় যে দঙ্গল চলে সেটা সম্পূর্ণভাবে দেশীয় ফ্রিস্টাইল। বালি, মাটির পিটে লাঙ্গোট পরে খালি গায়ে দো দো হাত। গ্রেকো রোমান সেখানে শুধুমাত্র সাই ক্যাম্পগুলোতেই চলে। তার উপর ২০১৬য় যে পদকের আশা ছিল, সেই সন্দীপ যাদব নরসিং যাদবের সঙ্গে একইসঙ্গে ডোপ টেস্টে ধরা পড়েন।

    নরসিং যাদবের কথা যখন উঠল তখন রিও-র আগের নাটক নিয়ে দু কলি তো গাইতেই হয়। ৭৪ কিলোগ্রাম বিভাগে নরসিং যাদব অলিম্পিক ট্রায়ালে বিজয়ী হয়ে রিও অলিম্পিকের জন্য নির্বাচিত হন। এদিকে সেরা অলিম্পিয়ান সুশীল কুমার ৬৬ কিলো থেকে ৭৪ কিলো বিভাগে চলে এসেছেন। ওদিকে নরসিং যাদব এশিয়ান গেমস ও বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে ব্রোঞ্জ পেয়েছেন এই বিভাগে। কিন্তু সুশীল অলিম্পিক ট্রায়ালে অংশ নিতে পারেননি আঘাতের জন্য। এবং বারবার করে নরসিং যাদবের সঙ্গে একটা ট্রায়ালের জন্য অনুরোধ করে যাচ্ছেন। যুক্তি, তিনি দুবারের অলিম্পিক মেডেলিস্ট এবং লেজেন্ড। যাই হোক, রেসলিং ফেডারেশন অব ইন্ডিয়া তাঁর যুক্তি তখন মেনে নেয়নি। তারপর হঠাৎ করে নরসিং যাদব এবং সন্দীপ যাদব নাডা অর্থাৎ জাতীয় ডোপিং অথরিটির র‍্যান্ডম টেস্টিং-এ ধরা পড়েন নিষিদ্ধ বস্তু ‘মেটানডিয়েনোন’ মূত্রে পাওয়া যায়। এখন সে সময়ে কোনও গুরুত্বপূর্ণ প্রতিযোগিতা ছিল না, শুধু মাত্র প্রস্তুতি টুর্নামেন্টই ছিল ইস্ট ইউরোপে। আর সন্দীপের তো তাও ছিল না। নরসিং অভিযোগ করেন দুদিন আগেই ডাল খেতে গিয়ে তাতে সবুজ গ্যাঁজলা দেখে দুজনেই ফেলে দেন, কিন্তু মুখে গেছিলই। সন্দেহের তির সুশীলের দিকে ঘোরে, যা স্বাভাবিকভাবেই সুশীল অস্বীকার করেন। নাডা এবং ফেডারেশন উভয়ই নরসিং-এর যুক্তি মেনে নেয় এবং নরসিংকে অলিম্পিকের দলে রাখে। কিন্তু বাধ সাধে ওয়াডা, বিশ্ব ডোপিং অথরিটি। তারা উপযুক্ত প্রমাণাভাবে টেস্টিং রিপোর্টকেই গুরুত্ব দিয়ে নর সিংকে ৪ বছরের জন্য নির্বাসিত করে। সন্দীপকেও।
    তাহলে? এবারে আসি এই অলিম্পিকের প্রস্তুতির গল্পে। বছর তিনেক আগে ফেডারেশনের সভাপতি অনুযোগ করছিলেন যে কুস্তিতে পুরুষদের ৬৫ কিলো বিভাগে বজরং পুনিয়া এবং মহিলাদের ৫০ কিলো বিভাগে ববিতা ফোগট ছাড়া তেমন বলার মতো কেউ নেই।

    রেসলিং ফেডারেশন অব ইন্ডিয়ার সভাপতি, ব্রিজ ভূষণ শরণ সিং, আপাদমস্তক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হয়েও দশ বছর ধরে কুস্তি ফেডারেশনের মাথার উপর বসে আছেন। বলতেই পারি যে ওঁর সময়েই তো সব থেকে বেশি উন্নতি হয়েছে। কিন্তু দাঁড়ান অত দ্রুত সিদ্ধান্তে আসার প্রয়োজন নেই। তার আগে আমরা দেখি কারা কারা এবার ভারতের হয়ে কুস্তিতে অলিম্পিকে গেছিলেন এবং তাঁদের সম্ভাবনা কেমন ছিল।
    পুরুষদের ক্ষেত্রে চারজন, সুমিত মালিক (১২৫ কিগ্রা), দীপক পুনিয়া (৮৬ কিগ্রা), বজরং পুনিয়া (৬৫ কিগ্রা) এবং রবি দাহিয়া (৫৭ কিগ্রা)। মহিলাদের ক্ষেত্রে সোনম মালিক (৬২ কিগ্রা), অংশু মালিক (৫৭ কিগ্রা), বিনেশ ফোগট (৫৩ কিগ্রা) এবং সীমা বিসলা ( ৫০ কিগ্রা)।

  • এদের মধে আবার ডোপ টেস্টে ধরা পড়ে সুমিত মালিক নির্বাসিত হন।
    দীপক পুনিয়াঃ দীপক পুনিয়া ৮৬ কিলো বিভাগে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে রুপো জিতেছিলেন ২০১৯এ। আসলে বাঁ কাঁধের চোটের জন্য তিনি অংশ নিতে পারেননি ফাইনালে। সেই দীপক পুনিয়া পরপর দুটি বাউট জিতে সেমিফাইনালে অলিম্পিকের স্বর্ণ বিজেতা অ্যামেরিকার ডেভিড টেলরের কাছে হারেন। তারপর রেপোচেজে প্রথম রাউন্ডে বাই পাবার পরেও সান মারিনোর মাইলস আমিনের কাছে অতিরিক্ত রক্ষণাত্মক হয়ে মাত্র ৫ সেকেন্ড আগে তিন পয়েন্ট খুইয়ে হারেন। আমিন একটা শেষ মুহূর্তের মুভে পুনিয়ার রক্ষণ ভেঙে তাঁকে পালটি মারেন। ফলস্বরূপ পুনিয়া সেমি ফাইনালে উঠেও পরপর দুটি বাউট হেরে প্রায় নিশ্চিত ব্রোঞ্জ খোয়ান।

    বজরং পুনিয়াঃ ভারতীয় কুস্তি দলের অন্যতম উজ্জ্বল নক্ষত্র। গত এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ, কমনওয়েলথ গেমস ও এশিয়ান গেমসে সোনা জিতেছিলেন। শুধু তাই নয়। বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে তিনি একটি রুপো এবং দুটি ব্রোঞ্জ জিতেছিলেন। সহজ ড্রয়ের সুযোগ নিয়ে তিনি সেমিফাইনালে পৌঁছে তো যান কিন্তু আজারবাইজানের হাজি আলিয়েভের কাছে টেকনিকাল পয়েন্টে হারেন। বিশেষত দ্বিতীয়ার্ধের তিন মিনিট আলিয়েভ দুর্দান্ত ডিফেন্ড করেন বজরং-এর যে কোনও আক্রমণ। যদিও সেই হতাশা থেকে বেরিয়ে এসে ব্রোঞ্জ মেডেল ম্যাচে কাজাখস্তানের দৌলত নিয়াজবেকভকে ট্যাকটিকাল বাউট লড়ে হারিয়ে দেন তিনি।

    রবি দাহিয়াঃ রবি দাহিয়া এশিয়ান চ্যাম্পিয়ন, পরপর দু বার ৫৭ কিলো বিভাগে। এবং নিজের নামের প্রতি সুবিচার করে তিনি ফাইনালে পৌঁছন, কিন্তু রাশিয়ার দুবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন জাউর উগুয়েভের কাছে লড়ে হারেন এবং সুশীল কুমারের লন্ডন অলিম্পিকের পর আবার একটি রুপো কুস্তিতে ভারতের ঘরে তোলেন।
    অংশু মালিক বা সোনম মালিকের আবার ড্র খুব টাফ পড়ে। আর সীমা বিসলার অলিম্পিক কোয়ালিফাই করাটাই একটা বড় কৃতিত্ব। তাহলে আসতে হয় বিনেশ ফোগটের কথায়।

    বিনেশ ফোগটঃ ‘দঙ্গল’ সিনেমাটার কল্যাণে ফোগট নামটা ফোকগাথায় চলে গেছে ভারতীয় কুস্তির। ফোগটদের ছয় বোন। এদের মধ্যে পাঁচজনই ভারতের হয়ে বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় মেডেল জিতেছেন। কিন্তু বিনেশ গত ছয় সাত বছরে তাঁর জাঠতুতো দিদি গীতাকেও ছাড়িয়ে গেছেন। সেই বিনেশের উপরে অনেক অনেক আশা ছিল। রিওতে দুর্ভাগ্যজনকভাবে, হাঁটুর গুরুতর চোটে কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে নিজেকে সরিয়ে নিতে বাধ্য হন। কিন্তু তারপর ফিরে এসে ২০১৭ থেকেই টপ ফর্মে। স্পোর্টস অথরিটি অব ইন্ডিয়া (সাই)-র টার্গেট অলিম্পিক পোডিয়াম স্কিম (টিওপিএস) তাঁকে অধিক উচ্চতায় ট্রেনিং করার জন্য হাঙ্গারিয়ান কোচ ওলার আকোসের তত্ত্বাবধানে পাঠায় বুলগারিয়ায়। তারপর হাঙ্গারিতে এবং পোলান্ডে একটি প্রস্তুতি টুর্নামেন্টে অংশ নিয়ে তিনি আবার ফিরে যান বুদাপেস্টে। সব মিলিয়ে শুধু মেডেল নয়, সোনার পদকের আশা করতেই পারতাম আমরা বিনেশের কাছে।

    কিন্তু অলিম্পিকে এক অন্য বিনেশকে দেখা যায়। বিনেশ প্রথম রাউন্ডে বর্ষিয়ান সোফিয়া ম্যাটসনকে হারাতেই খুব বেগ পেলেন। সেই আক্রমণাত্মক বিনেশকে দেখা যাচ্ছিল না, যিনি প্রতিপক্ষকে দম ফেলার সুযোগ না দিয়ে মুহুর্মুহু আক্রমণে কাহিল করে ফেলেন। বরং ওয়েট অ্যান্ড ওয়াচ খেলছেন। চোখের নিচে কালি, ক্ষিপ্রতা নেই। তবু জিতলেন সুপিরিয়র টেকনিকের জন্য। কিন্তু প্রাক্তন বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ও ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়ন বেলারুসের ভেনেসা কালাদজিস্কায়ার কাছে সরাসরি হারলেন। গত অলিম্পিকে চোটের কারণে হয়নি আর এবারে অজানা কারণে। পরে জানা যায় যে প্রথম রাউন্ডের আগেই তিনি অসুস্থ বোধ করছিলেন। অতিরিক্ত পরিশ্রম, ক্লান্তি? কে জানে? তবে এসব বলে তো ডব্লিউএফআই-এর হাত থেকে পার পাওয়া যায় না।
    বিশেষতঃ সভাপতি ব্রিজ ভূষণ শরণ সিং এদ্দিন ধরে চুপচাপ দেখছিলেন। ২০১৯এ যখন জিজ্ঞাসা করা হয় তখন পরিষ্কার করে কোনও পরিকল্পনার কথা বলতে পারেননি। কিন্তু মাত্র দুটি মেডেল নিয়ে ফেরার পর তাঁর আস্ফালন বাড়ে। গেমস শুরু হবার আগেই ঘোষণা করে দেন যে ফেডারেশন বিনেশ এবং সোনম মালিককে কারণ দর্শাও নোটিস জারি করা হবে। এবং বিনেশকে সাস্পেন্ড করা হবে! কেন?
    কারণ তিন বছর ধরে বিদেশি কোচের কাছে প্র্যাক্টিশ করার পর বিনেশের নাকি ‘ল্যাজ মোটা’ হয়েছে। তারপর তিনি নাকি টোকিওয় গিয়ে বাকি মল্লবীরদের সঙ্গে থাকেননি। প্র্যাকটিশও করেননি। এমনকি দেশের জার্সি পরেও তিনি প্রথম রাউন্ডে কুস্তি করেননি। এতেই থেমে থাকলেন না সিং সাহেব। ছুঁচোবাজির মতো যেদিকে পারেন অভিযোগের তির ছুঁড়লেন। অভিযুক্ত করলেন, সাইয়ের টপ্স প্রোগ্রামকে, আর তার সঙ্গে অলিম্পিক গোল্ড কোয়েস্ট এবং জেএসডব্লিউ-র মতো বেসরকারি সংস্থাগুলির ক্রিয়া কলাপ নিয়ে তাঁর অসন্তুষ্টি প্রকাশ করলেন। অলিম্পিক গোল্ড কোয়েস্ট বিলিয়ার্ডের গীত শেঠি এবং ব্যাডমিন্টনের প্রকাশ পাদুকোনে দ্বারা তৈরি সংস্থা, যারা মেডেলের সম্ভাবনা আছে এমন অ্যাথলিটদের লালন পালন করে। বিজয় কুমার, গগন নারং, সাইনা নেহওয়াল, মেরিকম ও পিভি সিন্ধু এই ওকিউএস-এর সহায়তার কথা তাঁদের পদক সাফল্যের ক্ষেত্রে মুক্তকন্ঠে স্বীকার করেছেন। কুস্তিতে এবারে তাঁদের কাছে ছিলেন সোনম মালিক।
    অপরটি হল জেএসডাব্লিউ-র তত্ত্বাবধানে রয়েছেন সাক্ষী মালিক, বজরং পুনিয়া এবং প্রবীণ রাণার মতো কুস্তিগির।

    একে মেডেল পাননি, তার উপর দুঃসময়ে পাশে দাঁড়ানোর বদলে এরকম অভিযোগ। বিনেশ সত্যিই ভেঙে পড়লেন। পরবর্তীকালে নোটিশের উত্তরে যা বললেন এবং সংবাদ মাধ্যমের কাছে যা প্রকাশ করলেন তা সত্যিই ভাবনার। বিনেশ রিওর চোটের পর বেশ কয়েকবার মানসিক চাপের ভয়ানক শিকার হয়েছেন। মনোবিদের সঙ্গেও বেশ কিছু সময় দীর্ঘ পরামর্শ করতে হয়েছে এর আগেও। প্রথম রাউন্ডের দিনও গা গুলোনো মাথা যন্ত্রণা ইত্যাদি উপসর্গ দেখা দিয়েছিল। ইলেক্ট্রোলাইট জল বা নুনের ট্যাবলেট খেয়েও কিছু কাজ হয়নি। বমি হয়, অসম্ভব মাথা যন্ত্রণা। এই নিয়েই তিনি প্রথম রাউন্ড জিতে যান, কিন্তু একই দিনে বিকেলে কোয়ার্টার ফাইনালে শেষ রক্ষা হয়নি। শারীরিকভাবে দুর্বল বিনেশের দ্বিতীয়বারের জন্য স্বপ্ন চুরমার হয়ে যায়।

    আর বাকি অভিযোগ? কোভিড প্রোটোকল মেনে তিনি যা করার করেছেন। ২৮শে জুলাই পৌঁছোবার পর সকল মল্লবিদকেই বাধ্যতামূলক নিভৃত বাসে যেতে হয়, কিন্তু বিনেশ পূর্ব ইউরোপ থেকে আসায় দরকার পড়েনি। তিনি তখন আলাদা ম্যাটে অনুশীলন করছিলেন। ৩ তারিখ থেকে বাকিদের সঙ্গে অনুশীলন শুরু করেন। হাঙ্গারিয়ান কোচ আকোসের তত্ত্বাবধানে ছিলেন বোলে ফেডারেশনের রাগ। কিন্তু ফেডারেশন নিজেই বা কোন সুবিধার ব্যবস্থা করে দিয়েছে! বছরের পর বছর ধরে কন্ট্যাক্ট স্পোর্টসে ভারতের ভালো রেজাল্টের সঙ্গে সঙ্গে যা এসেছে তা হল ডোপিং-এর বদনাম। যে কারণে এবার ভারোত্তোলনে একের বেশি প্রতিযোগী পাঠানোই সম্ভব হয়নি। আর বেসরকারি উদ্যোগ নিয়ে রাগ কারণ তারা ফেডারেশনের তোয়াক্কা না করে, কেন্দ্রীয় যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় ও সাইয়ের সঙ্গে সমন্বয়ে সংগঠিত ভাবে অলিম্পিক ক্রীড়ায় ভারতের উন্নতির চেষ্টা করছে।

    সুপ্রিম কোর্ট বা ভারত সরকারের নজর ক্রিকেটের উপর পড়তেই পারে, সেখানে দুর্নীতি হলে তা বন্ধের জন্য ব্যবস্থা নেওয়াই উচিত। কিন্তু বিসিসিআই একটি বেসরকারি সংস্থা এবং সর্বোপরি সরকারের উপর নির্ভরশীল নয়। কিন্তু যে সমস্ত সংস্থা নির্ভরশীল তারা? বছরের পর বছর ধরে রাজনীতি করা মাথার উপর বসে থেকে প্রতিটি সংস্থার কঙ্কালের বিক্রয় সুনিশ্চিত করছেন সে ব্যাপারে সর্বোচ্চ আদালত নিশ্চুপ। বিনেশের ঘটনাটা আবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল। কিন্তু সংবাদমাধ্যমে জোর গলায় কেউ প্রতিবাদ করেছে দেখেছেন? হ্যাঁ যাঁরা ক্রীড়াবিদ তাঁরা জানেন, বোঝেন বলে ট্যুইটারে সমর্থনে নেমেছেন। কিন্তু এই যে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপের সিলেকশন ট্রায়ালেও বিনেশ হেরে গেলেন মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে তার দাম কে দেবে?

    শেষ খবর পাওয়া অনুযায়ী উত্তর প্রদেশ সরকার হকিতে ওড়িশার পদাঙ্ক অনুসরণ করে ২০৩২ পর্যন্ত ভারতীয় কুস্তিকে স্পন্সর করার কথা ঘোষণা করেছে। কিন্তু হকি নিয়ে যে উন্মাদনা ওড়িশায় আছে বা রাজ্য সরকারের হকি নিয়ে যে সদিচ্ছা আছে সেটা উত্তর প্রদেশের ক্ষেত্রে বলা যাবে বলে বলতে পারি না। শুধু তো সেরা প্রতিযোগীরাই নয়, তৃণমূল স্তর থেকে প্রতিভা তুলে আনতে গেলে ফেডারেশন এবং সরকার এবং বেসরকারি সংগঠনগুলিকে একযোগে নিরবচ্ছিন্ন কাজ করতে হবে। কিন্তু ইগো যেখানে প্রবল সেখানে ভালো ফলের আশা করাটা কতখানি যুক্তিযুক্ত তা মেঘাচ্ছন্নই থাকে।


  • বিভাগ : ধারাবাহিক | ১১ সেপ্টেম্বর ২০২১ | ৩৪৯ বার পঠিত | রেটিং ৪ (২ জন)
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • | ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২১ ১২:৪২498062
  • এই সিরিজটা ভারী পছন্দের। 
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:

কুমুদি পুরস্কার   গুরুভারআমার গুরুবন্ধুদের জানান


  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। যা খুশি মতামত দিন