• খেরোর খাতা

  •  রমানাথ রায় সম্পর্কে দু-একটি কথা যা আমি জানি (৪) 

    ভাষা ভাষা লেখকের গ্রাহক হোন
    ০৫ জুন ২০২১ | ১৮১ বার পঠিত


  • ডোনা আমাদের পাড়ায় একেবারেই বেমানান। ওরকম নামের মেয়ে আমাদের পাড়ায় হয় না। আমাদের পাড়ার মেয়েদের নাম হবে লক্ষ্মী অথচ শরীরে কোনও লক্ষ্মীশ্রী থাকবে না। থাকবে কী করে? পেট পুরে কোনোদিন খেতেই পায় না। কিংবা নাম হবে সরস্বতী। যার পেটে এক আনাও বিদ্যে নেই। তো বোঝাই যাচ্ছে, পেটে খাবার কিংবা বিদ্যে দু’টোরই বিশেষ অভাব আমাদের পড়শিতে। এ অবধি পড়ে যদি কেউ ভাবেন, অবশ্য তেমনটা কেউ ভাববেন না বলেই বিশ্বাস, যে পাড়ার কার্তিক-গণেশদের অবস্থা কিছুটা অন্যরকম, তবে সেটা ভুল ভাবাই হবে। খাবারের ব্যাপারে ছেলেতে-মেয়েতে তারতম্য করার মতো সামান্য সামর্থ্যটাই বা কোথায়? তবু হয়-ও নিশ্চয়ই। তবে লেখাপড়ার ক্ষেত্রে এ বলতেই হয়, মাধ্যমিক পাশের সংখ্যায় ছেলেরাই এগিয়ে। উচ্চমাধ্যমিকেও তাই! আরে! তাহলে ‘কিছুটা অন্যরকম’ ভাবাটা তো ততটা ভুল হয়নি!

    কিন্তু বলার কথা যেটা, গ্র্যাজুয়েট তখনও একজনও নয়! একজনও নয় মানে যে ছেলেদের মধ্যেও একজনও নয়, তা তো বোঝাই যাচ্ছে, বরং মেয়েদের মধ্যে ভগবতী এক চুল দূরত্বে দাঁড়িয়ে আছে — মাত্র একটা পেপারে ব্যাক। সেখানে তো ভোলা দু-দু’টো পেপারে আটকে গেছে।

    তো ডোনা প্রসঙ্গে এই ভূমিকা একেবারে অপ্রাসঙ্গিক মোটেই নয়! কারণ এই যে এত হিসেব, এত স্ট্যাটিসটিক্স, তাতে ডোনাদের বাড়ির হিসেবটা বাদ রাখা হয়েছে।

    আসলে ডোনাদের বাড়ি তো আমাদের পাড়াতে হয় না। একসময় ছিলও না। আমাদের পাড়া থেকে মিনিট দশেক দূরত্বে সেনপাড়া। ডোনাদের বাড়ি ছিল ওই সেনপাড়ায়। কী এক পারিবারিক ঝামেলায় ডোনার বাবা এক কথায় পৈতৃক বাড়ি ছেড়ে প্রথমে আমাদের পাড়ার এক মণ্ডলবাড়িতে ভাড়ায় উঠে এল। তারপর জমি কিনে বাড়িও করে ফেলল। আমাদের কলোনি-কাম-বস্তি এলাকায়, পাশের পাড়ার সাথে অহেতুক জুড়ে থাকা ওইটুকু মাত্র পারচেস্ড ল্যান্ড। আর তাতেই ডোনাদের বাড়ি। তাই এই খালপাড়ের নিকাশিপাড়ায় ডোনাদের ওরকম তিনতলা বাড়ি যতটা বেমানান, ঠিক ততটাই বেমানান ডোনা নিজে।

    এগুলো না বললেও চলে, সকলেই জানেন, তবুও বলেই রাখি — ডোনা পড়াশুনোয় অত্যন্ত মেধাবী, অপূর্ব তার গানের গলা। এটা ঠিক জানা নেই, শোনা কথা — রান্নার হাতও নাকি অসাধারণ, যে খেয়েছে তার প্লেট নাকি আর মাজতে হয়নি। হাত ধোয়া সে-ও নাকি নিতান্ত নিয়মরক্ষারই শামিল। এগুলো গুণ তো বটেই, তবে আসল ব্যাপার তো অন্য জায়গায়। এমন রূপসী এক মানবী কখনও যে এই ধরাধামে পা রেখেছে, তাই তো কেউ দেখেইনি; শোনেওনি। এমন এক সুন্দরী যার কোনও দেমাক নেই, চোখ মেললেই দেখা যায়। তাই নতুন সেনবাড়ির সামনেটায় সব সময়েই কেমন মেলা মেলা ভাব! লোকে কাজ করছে, কাজে বেরোচ্ছে, কাজ থেকে ফিরছে, দোকানে বিক্রিবাট্টা চলছে, একটু বড়রা ফুটবল খেলছে, তার চেয়ে বড়রা ক্যারাম বা তাস, তবে একটা চোখ যেন ঠিক দোতলা কি তিনতলার বারান্দায়। গোলকিপারের পায়ের তলা দিয়ে বল গলে (গোলে) যাচ্ছে, ফাঁকা গোলে বল ঠেলতে ভুলে যাচ্ছে স্ট্রাইকার, রেড-এর কভার দিতে বেস্-এর ঘুঁটি ফেলতে ডবল ফাইন হচ্ছে! হচ্ছে হামেশাই। ডোনা যখন পাড়ায় থাকে না, মানে ইউনিভার্সিটি বা অন্য কোথাও, বিশেষ করে বেশ কিছুদিনের জন্য কোথাও বেড়াতে গেলে পাড়াটা কেমন যেন ঝিমিয়ে পড়ে। বললে বিশ্বাস হবে না, নিঝুম চারপাশটায় নেমে আসে গাঢ় অন্ধকার। সে এক ঘোর অমানিশা!

    সে যাই হোক। যার যা বোঝার বুঝে নিয়েছে আর খামোখা বাড়িয়ে লাভ নেই।

    একটা উত্তম-সুচিত্রা, রাজ-নার্গিস-এ দীক্ষিত জাতি — জানে অসম্ভব, তবুও কল্পনার রাশে কিছুতেই লাগাম লাগাতে পারে না। একই সাথে বড় হতে থাকা দুই ভাই একই বিছানায় শুয়ে ভাবে, একসাথে খেলে ওঠা দুই বন্ধু ভাবে আর আমাদের থেকে বড়দের কথা না বলাই সমীচীন, সেটা ভালো দেখায় না। ভালো শোনায়ও না। মোটকথা সবারই শয়নে-স্বপনে ওই একটাই ভাবনা। ভাবনাগুলোর সীমা ফুলে ফেঁপে বড় হতে হতে একে অপরের সাথে ধাক্কাও খেতে থাকে। গণ্ডগোলও বেঁধে যায় প্রায়ই। তাতে অসুবিধে হয় ঠিকই, তবু আমাদের ‘পাড়া বা পুরুষ’ দৃষ্টিভঙ্গিতে তো আর ব্যাপারটা তেমন অস্বাভাবিক নয়!

    অস্বাভাবিক হচ্ছে ডোনার তরফে ভাবনা। একটা গরিব-হাঘরে ছেলে একটা বড়লোক সুন্দরী মেয়ের প্রতি একতরফা প্রেমে হাবুডুবু খেতেই পারে, তা বলে উল্টোদিক থেকে এক ধনী সুন্দরী মেয়ের পক্ষে একটা গরিব ছেলের প্রেমে পড়ার সম্ভাবনাটা ছিল নিতান্তই অবাস্তব। অন্তত আমাদের কাছে। অবশ্য যদি অলীকই হবে, তবে দিনের পর দিন, শেষ পর্যন্ত সুচিত্রা উত্তমের কিংবা নার্গিস রাজের প্রেমে পড়ছিল কী করে? আর দেখা তো গেল, ডোনাও এর বাইরে খুব অন্যরকম কিছু ভাবছে না। সে যত ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার পাত্রের বিশাল লাইন ওর জন্য হত্যে দিয়ে পড়ে থাকুক না কেন! অবশ্য এই গল্পগুলোর শেষে সেই দীন-দরিদ্র ছেলেটির অনেকানেক গুণ যে বেরিয়ে পড়বে, সে কথা স্বতন্ত্র!

    সুতরাং অতগুলো ভিন্ন ভিন্ন ভাবনা যে যার নিজের কক্ষপথে নিজস্ব গতিতে তিন ভুবনের পারে ঘুরপাক খেতে থাকলে, কিছুদিনের মধ্যে একটা যুদ্ধ অনিবার্য হয়েই পড়ে এবং একদিন শুরুও হয়ে যায় সেই যুদ্ধ। শেষ হওয়ার পর জানা গেল, যার আর এক নাম নাকি ছিল স্বয়ম্বরসভা। আর কোন স্বয়ম্বরসভাই বা কোনও কঠিন পরীক্ষা ছাড়া মীমাংসিত হয়েছে? গোড়ায় ঠিক নিশ্চতভাবে জানা যাচ্ছিল না যে এতে আদৌ ডোনার মত আছে কিনা? ডোনার মতো একজন স্বয়ম্ভর মহিলার ক্ষেত্রে এরকম একটা স্বয়ম্বরসভা বেশ অস্বাভাবিকই বটে! তবে একসময় পাড়ার সব রথী-মহারথীর নাম নথিভুক্ত হয়ে গেলে আর প্রতিদিনই কোনও না কোনও ইন্দ্রপতন হতে থাকলে ব্যাপারটার গুরুত্ব বুঝে নাকি ডোনা নিজেই ঘোষণা করেছে — এটাই ওর স্বয়ম্বরসভা। সে ঘোষণা কে শুনেছে জানা নেই, তবে সে খবর চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে মুহূর্তেই। এভাবেই হয়তো নিজের রাজি হওয়ার খবরটা পেয়ে থাকবে স্বয়ং ডোনা!

    আমি প্রথম থেকেই জানতাম যে আমার কোনও চান্স নেই। মানে কোনও আউটসাইড চান্সও নেই। তাই আমি নাম লেখাবার কোনও চেষ্টাই করিনি। আমি দেখেছি, কোনও কিছুতে ভালো হলে তো কথাই নেই, আবার একেবারে খারাপের দিকে হলেও নজরে পড়ার একটা সুযোগ থাকে, সেই হিসেবে মানুষ বিখ্যাত বা কুখ্যাত হয়। কিন্তু আমার মতো সব কিছুতেই এরকম নাগাড়ে মাঝারিদের যে কোনও সম্ভাবনা নেই, সেটুকু নিজে বুঝতে পারাই ছিল আমার একমাত্র পুঁজি! মাধ্যমিকে সেকেন্ড ডিভিশন, উচ্চমাধ্যমিকে কোনোমতে সেকেন্ড ডিভিশন, মোটেই গান না গাইতে পারা, মাঝারি বলতে মোটে পাঁচ ফুট ছ’ইঞ্চির উচ্চতা, পাড়ার ফুটবলে চান্স পাই ঠিকই, তবে কোচ যখন নামায়, তখন সাতাশি কি নব্বই মিনিট হয় হয় আর কি! আয়নায় নিজের মুখ নাহোক একশোবার দেখি, তার মধ্যে চুলই আঁচড়াই বার ষাটেক, নিজেরই কোনও ভরসা জাগে না তো আর কেউ ফিরে তাকাবে সে গুড়ে বালিই! তা এহেন গড়পরতার ডোনাসাফল্যে একটা বিপুল শক্তিশালী চিত্রনাট্য লাগে!

    অনেক পরে জানতে পারি, যদিও নিজে থেকে নাম লেখাতে যাইনি, তবু আমার নাম নথিভুক্ত হয়েছিল। আসলে নাম-লেখানোর প্রথম দিন, পাড়া-বেপাড়া, গ্রাম-মফস্বল, মিউনিসিপ্যালিটি-পঞ্চায়েত থেকে আসা উজ্জ্বল সব পাণিপ্রার্থীতে এত ভীড় হয়েছিল যে বিশেষ টাস্ক ফোর্স নামিয়েও সামলানো যায়নি। ব্যাপক লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাস, জলকামান ইত্যাদির পর ঠিক হয় আর নাম লেখানো হবে না। পাড়ার জিনিস পাড়াতেই থাকবে ভিত্তিতে পাড়ার সকলেরই নাম নথিভুক্ত হয়। আমারটাও তাই বিনা উদ্যোগে মুক্তিদার মুক্তাক্ষরে আপনিই লিপিবদ্ধ হয়ে যায়। যেহেতু জানতামই না আমিও লড়াইয়ের ময়দানে আছি, তাই লড়াইয়ের ময়দানের ধারকাছও কোনোদিন মাড়াইনি। মূল যুদ্ধক্ষেত্র যদিও ছিল খালপাড়ের ওয়াটারলু, তবে ইতিউতি, চোরাগোপ্তা মারপিট যে সারা শহর জুড়েই চলছে, তার খবরও আসতে লাগল প্রায়ই। একদিন শোনা গেল সুভাষ সরোবরে বিরাট বোমাবাজি, তো আর একদিন ভিক্টোরিয়ায় দিনে দুপুরে পেটোবাজি, আবার কোনোদিন বোটানিক্যাল গার্ডেন থেকে দু’টো প্রায় যায়-যায় কেস উদ্ধার করে পি.জি.-তে ভর্তি — সবই নাকি ওই ডোনার জন্য। ওঃ! হোঃ! বলতেই ভুলে গেছি এই যুদ্ধই কালক্রমে ‘ম্যাডোনা’ নামে প্রসিদ্ধি লাভ করে। ডোনার জন্য পাগল — ম্যাড ফর ডোনা — ম্যাড ডোনা হয়ে শেষ পর্যন্ত ‘ম্যাডোনা’-য় এসে থিতু হয়।

    আমি যুদ্ধক্ষেত্রের দিকে না এগোলে কী হবে, যুদ্ধক্ষেত্রই একদিন এগিয়ে এল আমার কাছে। হঠাৎ-ই যেন শুনতে পাই আমার নাম ডাকা হচ্ছে। রণাঙ্গন ততদিনে স্পনসরে স্পনসরে গিজ গিজ করছে। প্রতিযোগীর সংখ্যা যে অনুপাতে কমছে, ঠিক সেই ব্যস্তানুপাতে বাড়ছে স্পনসরশিপের সংখ্যা। এমনকী ইউ.এন.-ও নিজেকে জড়িয়ে নিয়েছে। গত সপ্তাহ থেকে এক পর্যবেক্ষকও নিয়োগ করেছে। তা তিনদিন আগে থেকেই শুনছিলাম, লড়াই নাকি এখন মূলত গদাই আর শঙ্করের মধ্যে এসেই দাঁড়িয়েছে। গতকাল থেকে নাকি মূলত-টাও বাদ গেছে। তো লড়াই যেহেতু একেবারে শেষ পর্যায়ে, তাই গেছি ওয়াটারলু। চাক্ষুষ দেখে আসি শেষ পর্যন্ত কে ডোনাকে পেল! সেদিন পাঁচ মিনিট করে লড়াই হচ্ছে আর দশ মিনিটের বিজ্ঞাপনের বিরতি। তা বলে এ মনে করার কোনও কারণ নেই যে আসলের চেয়ে সুদ বেশি। তখন পাঁচ মিনিট করে যে লড়াই হচ্ছে, এই ঢের। দিনের পর দিন লড়ে লড়ে গদাই আর শঙ্করের কারোরই দাঁড়াবার ক্ষমতা নেই তখন। তার চেয়ে বরং শপারস্টপে কুড়ি পারসেন্ট ছাড়ে কুস্তিগিরদের নেংটি বিক্রির বিজ্ঞাপন দেখা হাজার গুণে ভালো। ঠিক তখনই শুনি, মাইকে বারবার আমার নাম ডাকা হচ্ছে। যেহেতু ইউ.এন.-এর প্রতিনিধি চলে এসেছে, তাই মোট কুড়িটি ভাষায় ঘোষণা হচ্ছে। বাংলা ছাড়া আদৌ আর কোনও ভাষা জানি কিনা, আমি সাড়া দিতে পারব কিনা, সে সব নিয়ে কোনও ভাবনাই নেই! অবশ্য নামের জায়গাটা কুড়িটা ভাষাতে প্রায় একইরকম শোনাচ্ছিল!

    অর্গানাইজারদের কাছে পৌঁছে বুঝলাম, যেহেতু আমি তখনও অবধি যুদ্ধে লড়িনি, তাই আমি জিতিনি। আবার যেহেতু আমি যুদ্ধে নামিইনি, তাই হারিওনি! অত বড় লিস্ট থেকে একে একে কেটে গেছে সবার নাম। রয়ে গেছে শুধু গদাই আর আমার নাম। সত্যি ভাগ্যের কী অদ্ভুত পরিহাস! গদাইয়ের সাড়ে ছ’ফুট দশাসই চেহারার সামনে সাড়ে পাঁচ ফুটিয়া প্যাংলা মার্কা চেহারা নিয়েও আমি ঋজু দাঁড়িয়ে আছি আর গদাই দশ সেকেন্ডের বেশি সোজা পায়ে দাঁড়াতেই পারছে না। গদাই মাটি নিলেই ইউ.এন. অতি উৎসাহে মাটির ওপর চাপড় মেরে মেরে এক থেকে দশ গুনতে শুরু করে দিচ্ছে আর অদ্ভুত, প্রত্যেকবার গোনা ‘সাত’-এ পৌঁছলেই গদাই নড়ে উঠছে, ‘আট’-এ উঠে বসছে, ‘নয়’-এ কীভাবে যেন ঠিক দাঁড়িয়ে পড়ছে, ‘দশ’-এ লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে আর না-গোনা ‘এগারো’-য় আবার মাটি নিচ্ছে। ইউ.এন. সাথে সাথে সক্রিয় হচ্ছে যতক্ষণ না আবার ‘দশ’-এ পৌঁছচ্ছে। এভাবে বেশ কয়েকবার হওয়ার পর আর ভালো লাগল না। গোড়ার দিকের মজা আর পাওয়া যাচ্ছে না, এবার ‘দশ’-এ গদাই লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিতেই আঙুল দিয়ে একটা টোকা মাত্র দিলাম, সেই যে গদাই দশ হাত দূরে ছিটকে পড়ল, পরের সাত দিনে বহু ‘দশ’ গোনাতেও উঠতে পারল না। আই.সি.ইউ.-তে আরামে বিশ্রাম নিয়েছে। একেই বোধহয় বলে চিত্রনাট্য সাথে আছে করবে আমার কী?

    এরপর যথারীতি পুষ্পবৃষ্টি হয়। কোথা থেকে যে ওই সাড়ে সাঁইত্রিশ কেজির জয়মাল্য ঠিক টিপ করে আমার গলায় এসে পড়ে আর কোথা থেকে যেন ভেসে আসতে থাকে — ডিং ডঙ — দিজ পোরশন অফ মালা ইজ স্পনসর্ড বাই মালাবার কোস্ট — তার কিছুক্ষণ বাদেই হয়তো আর এক নতুন মালা — অ্যান্ড অমুক মালাকার স্পনসর্স দিজ পোরশন। এভাবে চলতেই থাকে। এরই মধ্যে সলজ্জ ভঙ্গিতে ডোনা আমার সামনে এসে দাঁড়ায়। ফুলের মানে মালার ঘায়ে মূর্ছা না গেলেও তখন থেকেই মনে হচ্ছে কলার বোনটা বোধহয় গেছে, তবু ডোনা অত কাছটায় এসে দাঁড়ালে, বিগ লঙ শট্ আচমকাই বিগ ক্লোজ শট্ হয়ে গেলে যে জার্ক লাগার তা তো লাগেই! তার পরেও সীমাহীন মোহগ্রস্ততায় আমার বাহ্যজ্ঞান লোপ পাওয়ারই উপক্রম হয়। কোনোমতে সামলে নিয়ে ওই মালাই পরিয়ে দিই ডোনার গলায়। ডোনাও মুহূর্তখানেকের বেশি সময় নেয় না, মালা আবার যথাস্থানে, আমার গলায় এসে স্থিত হয়। হয়ে যায় মালাবদল!

    তবে মালাবদল মানেই যে সেদিন থেকেই আমরা স্বামী-স্ত্রী, তা মোটেই নয়। সব কিছুরই একটা সামাজিক রীতিনীতি আছে। আর বিয়ের ক্ষেত্রে বোধহয় তা সবচেয়ে বেশি।

    বাড়িতে বাড়িতে কথাবার্তা হয়। ঠোকাঠুকি লাগে আবার হাসি-মশকরাও হয়। ধীরে ধীরে সম্পর্ক কুটুম্বিতার দিকে এগোতে থাকে।

    পাত্র-পাত্রীতেও কথাবার্তা হয়। ঠোকাঠুকি লাগে আবার হাসি-মশকরাও হয়। ধীরে ধীরে সম্পর্ক ভালোবাসার দিকে এগোতে থাকে।

    এটাকে ঠিক শর্ত বলা যায় না। ঠিকঠাক বললে হয়তো আব্দার বলা যেতে পারে।

    ডোনা আমায় বলে, আগে বি.এ., তারপর বিয়ে।

    আমি বলি, তার মানে এখনও তিন বছর! মানে মিনিমাম তিন বছর আর কি!

    ডোনা বলে, এর তো অন্য কোনও শর্টকাট নেই। এ তো করতেই হবে!

    আমি বলি, তুমি পড়ালে বোধহয়, হলেও হতে পারে।

    ডোনা বলে, আমাদের গল্পে তো ‘বোধহয়’-এর কোনও জায়গা নেই।

    আমি বলি, তথাস্তু।

    এটাকেও ঠিক শর্ত বলা যায় না। ঠিকঠাক বললে হয়তো অনুরোধ বলা যেতে পারে।

    আমি বলি, আচ্ছা! ডোনা! তুমি যে সামনের মাস থেকে ইউনিভার্সিটি জয়েন করছ, তা কোন পোস্টে?

    ডোনা বলে, অ্যাসিস্টেন্ট প্রফেসর।

    আমি জিজ্ঞেস করি, তুমি কতদূর উঠতে পারবে?

    ডোনা বলে, এর পর অ্যাসোসিয়েট, তারপর প্রফেসর। হতে পারি!

    আমি প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়ে জিজ্ঞেস করি, ভাইস চ্যান্সেলর মানে উপাচার্য হতে পারবে না কোনোদিন?

    ডোনা মুচকি হাসে, চেষ্টা করলে হতেও পারি!

    আমি জিজ্ঞেস করি, আর চ্যান্সেলর?

    ডোনা বলে, না, চ্যান্সেলরটা তো একটা সেরিমোনিয়াল পোস্ট!

    কী পোস্ট?

    মানে আনুষ্ঠানিক আর কী! মানে ওটা আসলে একটা এক্স অফিসিও পোস্ট।

    এ তো আরও ঘেঁটে গেল!

    ডোনা এবার একটা বাচ্চা ছেলেকে বোঝাচ্ছে ভঙ্গিতে বলে, এক্স অফিসিও বলতে পদাধিকার বলে। যেই ওয়েস্ট বেঙ্গলের গভর্নর হবে, সেই বাই ডিফল্ট স্টেট ইউনিভার্সিটিগুলোর যেমন ধরো যাদবপুর, কলকাতা — এগুলোর চ্যান্সেলর হবে। আবার সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি যেমন বিশ্বভারতীর ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী। নিজে ক অক্ষর গোমাংস হলেও চ্যান্সেলর হতে কোনও বাধা নেই। গভর্নর বা প্রাইম মিনিস্টার হলেই হল। বাই ডিফল্ট এটা হবেই।

    ডোনা এতকিছু বলে, সব যে বুঝি তা নয়! তবে একটা ব্যাপারে বেশ ধন্দেই পড়ে যাই। তাই জিজ্ঞেস করি, উপাচার্যর চেয়ে আচার্য বড়, তবুও উপাচার্যকে নিয়েই বেশি হইচই কেন?

    ডোনা বলে, কারণ ইউনিভার্সিটির প্রতিদিনকার, ডে-টু-ডে কাজের হেড হচ্ছেন উপাচার্য।

    আমি উৎকণ্ঠিত গলায় বলি, ডোনা তুমি কোনোদিন উপাচার্য হোয়ো না।

    ডোনা হাসতে হাসতে বলে, ও! মা! কেন?

    আমার গলায় তখনও উদ্বেগ, তাহলে সারারাত ঘেরাও হয়ে থাকবে।

    ডোনা বলে, রোজ রোজ তো আর ঘেরাও হব না। আর সারা রাত ঘেরাও হয়ে থাকব, শুধুমাত্র এই কারণে উপাচার্য হব না?

    উদ্বিগ্ন আমি বলি, শুধুমাত্র? আর তারপর তুমি পুলিশ ডাকবে। পুলিশ দিয়ে ঘেরাও তুলবে। তখন কুকুর-বেড়াল ছাড়া তোমার জন্য কাঁদার আর কেউ থাকবে না।

    কেন তুমি?

    আমি হয়তো থাকব। সে তো কুকুর-বেড়ালের সাথে মিশে। চেনাই গেল না হয়তো আমায়! গৌরবে বহুবচন ভালো, তা বলে কি বহুবচনের গৌরব ভালো?

    আচ্ছা! বাবা! আচ্ছা! কথা দিচ্ছি আমি কোনোদিন উপাচার্য হব না। ইস্ আমার বোধহয় ডায়রেক্ট ভাইস চ্যান্সেলর হিসেবেই জয়েন করার একটা চান্স ছিল! কী আর করা যাবে! হল না।

    আমি সেদিন একটা কথা বুঝেছিলাম, ‘বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্র’-এ আচার্যর চেয়ে উপাচার্য অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আমি এতদিন ঠিক বুঝতাম না, কেন বিয়ের কার্ডে এরকমটা লেখা থাকে যে — এতদুপলক্ষে মানে এই উপলক্ষে আপনার উপস্থিতি একান্ত কাম্য। তার মানে বিয়েটা সবার কাছে একটা উপলক্ষ মাত্র! পাত্র আর পাত্রীর কাছেই একমাত্র তা লক্ষ্য। সেই লক্ষ্যে ধাপের পর ধাপ পেরোতে পেরোতে ‘বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্র’ আর নজরেই আসে না।

    (ক্রমশঃ)
  • বিভাগ : অন্যান্য | ০৫ জুন ২০২১ | ১৮১ বার পঠিত
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:

কুমুদি পুরস্কার   গুরুভারআমার গুরুবন্ধুদের জানান


  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। লড়াকু মতামত দিন