• বুলবুলভাজা  ইস্পেশাল  ইদের কড়চা  ইদের কড়চা

  • প্রাসঙ্গিক শোকসমূহ

    সাদিয়া সুলতানা
    ইস্পেশাল | ইদের কড়চা | ২৮ মে ২০২১ | ৬৭৩ বার পঠিত
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন পুনঃপ্রচার
  • ১.

    যুবকটির চোখে বুদ্ধিজীবীদের মতো ভারি ফ্রেমের চশমা। কাচের স্বচ্ছতা ভেদ করে দুই চোখের নিচের গর্ত দেখা যাচ্ছে যা ওর বয়সের সঙ্গে বেমানান। আরও বেমানান যুবকটির মুখের গাম্ভীর্য। নিজের পরিচয় দেবার সময় সে আমাকে বোঝাতে চেষ্টা করেছে যে সে আমার সম্পর্কে সব জানে এবং সে অসম্ভব প্রজ্ঞাবান ও স্পষ্টভাষী। এমন অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী মানুষকে ঘায়েল করার মোক্ষম অস্ত্র আছে আমার পকেটে। এই যেমন প্রথম কথাতেই তাকে বুঝিয়ে দিতে হবে, ‘রোসো বাছা, এই মাটি তোমার আগে আমি ছুঁয়েছি, ছোট বড় সব দেয়াল তোমার জন্মের আগেই টপকে গেছি।’

    যুবকটি মুখ খোলার আগেই আমি ওকে চোখের ইশারাতে থামিয়ে দিই। যেন ভীষণ জরুরি কিছু মনে পড়েছে, সে কোনো কথা বললেই আমি তা ভুলে যাবো।

    শঙ্খ চায়ের কাপ হাতে ঘরে ঢুকেছে। আমি না তাকিয়েও বুঝতে পারি যুবকটি আড়চোখে শঙ্খকে দেখছে। দেখছে না শুধু ওর লোভী জিভ লকলক করছে। লোভ করুক, দেখুক। শঙ্খ দেখার মতো মেয়ে বটে। সামনে পড়লে একুশ বছর বয়সের মেয়েটিকে যে কোনো পুরুষই সব ব্যস্ততা ঝেড়ে দেখতে বাধ্য। শঙ্খও নিজেও তা জানে।

    শঙ্খ কোমরের কাছে গুঁজে রাখা আঁচলের খুঁট কায়দা করে ছেড়ে দেয়। ওর আদুল পেটে শ্বেতশঙ্খের মসৃণতা। এবার আমিও চোখ বন্ধ করে শঙ্খকে দেখি। ওর নগ্ন শরীর দেখি। উন্মুক্ত গ্রীবা, স্তন, নাভিমূল, জঙ্ঘা দেখি।

    টেবিলে চায়ের কাপ রেখে কমলা শাড়ি পরিহিতা শঙ্খ ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যায়। যুবকটি প্রস্থানরত শঙ্খকে দেখছে। কমলা রং মিলিয়ে না যাওয়া পর্যন্ত ওর দৃষ্টি দরজার দিকে নিবদ্ধ থাকে।

    আমি বিষয়টা উপভোগ করতে করতে মুখ খুলি, ‘মেয়েটি কে জানো?’
    ‘না।’
    ‘মেয়েটি আমার রক্ষিতা। ওর নাম শঙ্খ। আমার দেয়া নাম।’

    আমার কথা শুনে যুবকটি এমনই চমকে ওঠে যে ওর গলায় চা আটকে যায়। সে প্রচণ্ড বেগে কাশতে থাকে। আমি টেবিলের ওপরে রাখা তারহীন কলিংবেলে দুটো চাপ দিই। শঙ্খ ছুটতে ছুটতে ঘরে ঢোকে। ও জানে দুটো ঘন্টাধ্বনির অর্থ হলো, জরুরি কোনো কারণে ওর ডাক পড়েছে। কাশির শব্দ শুনে শঙ্খ বুঝতে পারে এখন ওর কী করা উচিত। ও ছুটে গিয়ে এক গ্লাস পানি এনে যুবকটির সামনে ধরতেই সে এক চুমুকে পানিটুকু নিঃশেষ করে ফেলে।

    আমি সহানুভূতিমাখা কণ্ঠে জানতে চাই, ‘এখন ঠিক আছো তো?’

    যুবকটিকে দেখে মনে হয়, সে ভীষণ মুষড়ে পড়েছে। যদিও সে তার গ্রীবা টান টান করে রাখার চেষ্টা করছে। কিছু একটা বলে সে। আমি শুনতে পাইনি ভেবে নিজেই কথার পুনরাবৃত্তি করে। শোকসন্তপ্ত যুবকটির কণ্ঠস্বর অস্পষ্ট শোনায়।

    ‘বাবা অসুস্থ। টাকার দরকার। ঢাকায় নিতে হবে।’

    যুবকটিকে এখন তার পাওনাদার বাবা আকবর আলীর মতো মামুলি মানুষ বলে মনে হচ্ছে। যে ব্যবসার প্রয়োজনে আমি টাকা ধার নিয়েছিলাম, অন্য সবকিছুর মতো তা আমি ধরে রাখতে পারিনি। তবে কিছু আঁকড়ে ধরে না থাকতে পারার ব্যর্থতায় আরোপিত শোক উদযাপন করার মানসিকতা যে সবার থাকে না, সেই বিষয়টি এই যুবকের জানা দরকার।

    ‘বাবা তো নিজে আসতে পারে না। বলল আপনি যেন টাকাটা দিতে দেরি না করেন।’

    এবার যুবকটি কোর্ট-কাছারির কথা তোলে না। তার গলায় আপসের সুর। শুরুতে যে আত্মবিশ্বাস নিয়ে সে কথা শুরু করেছিল তা এখন শঙ্খের আঁচলে গড়াগড়ি খাচ্ছে। আমি যুবকটির কথার কোনো উত্তর দিই না। মুখে স্মিত একটা হাসি ঝুলিয়ে রেখে ওকে বিদায় দিই। আর যাবার আগে পুনরায় শঙ্খের হাতে তৈরি এক কাপ চা খাওয়াই।



    ২.

    শঙ্খের চরিত্রের এই দিকের প্রতি আমার চুম্বক আকর্ষণ। সারাদিন এই যে এতবার কর্কশ সুরে বেল বাজে তবু ও বিরক্ত হয় না। আমার এমার্জেন্সি বেল বা সদর দরজার বেল যেটাই বেজে উঠুক না কেন ও ছুটে চলে। গেটে দাঁড়ানো ভিখারি, দুধঅলা, সবজিঅলা, পাওনাদার, উটকো আগন্তুক কারো ডাকেই ও কখনো বিরক্ত হয় না।

    কদিন আগে এ বাড়িতে তো পুলিশি উৎপাত হতো। এখন আমার বিরুদ্ধে নতুন কোনো মামলা-মোকদ্দমা না হওয়ায় তাদের আসা বন্ধ হয়েছে। সেদিন হানিফ বলছিল, দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে আমি আগের ধান্দায় থাকলে নির্ঘাৎ শত শত মামলা খেতে হতো। হাতে দুএকটা দেশি বা বিদেশি অস্ত্র দিয়ে বনজঙ্গলে মেরে ফেলে রেখে পুলিশ এতদিনে সুরতহাল, ময়নাতদন্ত সেরে ফেলতো।

    হানিফ নিজে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। গতমাসে দুটো মামলায় জঙ্গি হিসেবে ওকে আসামি করা হয়েছে। গ্রেপ্তারের আতঙ্কে দিন পনেরো আগে আমার বাসায় তিন দিন তিন রাত থেকে গেছে হানিফ। ঐ সময়ে শঙ্খের দিকে ও সারাক্ষণ শকুনের থাবা বাড়িয়ে ছিল। সেদিন বড়বাজার রেলওয়ে জংশন থেকে কেন সে নিজে শঙ্খকে তুলে আনেনি তা নিয়ে একবার আফসোসও করেছে।

    এককালে হানিফ আমার শিষ্য ছিল। ওর চোখ-মুখের টাটানো যন্ত্রণা দেখেও তাই আমি ওকে ক্ষমা করে দিয়েছি। উল্টো হানিফ যে কদিন আমার বাসায় ছিল সেই কদিন ওর অতৃপ্ত শরীর-মন আমাকে প্রচ্ছন্নভাবে তৃপ্ত করেছে।

    পত্রিকাঅলা এসেছে। শঙ্খ দৈনিক পত্রিকা নিয়ে কোমরের কাছে গুঁজে হাত বাড়িয়ে একটা ফ্যাশন ম্যাগাজিন চেয়ে নেয়। পত্রিকাঅলা গর্বিতভঙ্গিতে ওকে ম্যাগাজিনটি দিয়ে বলে, ‘রাইখা দাও। দেখা হইলে কালকা ফেরত দিও। না ফেরত দিলেও চলে।’

    আমি বারান্দায় বসে দেখতে পাই এভাবে শঙ্খের সঙ্গে কাঙ্ক্ষিত-অনাকাঙ্ক্ষিত অতিথিরা আলাপ জমানোর চেষ্টা করে। শঙ্খের চোখে-মুখে তখন প্রশ্রয়ের আলো খেলা করে। শঙ্খ দক্ষ শিকারীর নিশানায় কারো কারো প্রতি অভিযোগেরও তির গাঁথে। যে তিরে ঘায়েল হতে পুরুষেরা উদগ্রীব হয়ে ওঠে।

    শঙ্খকে যেদিন আমি পাই সেদিন ওর সৌন্দর্য দেখতে পাইনি। ভীরু আর নাজুক একটা কবুতর ছানার মতো ও বড়বাজার রেলওয়ে জংশনের কোণে বসে কাঁপছিল। আমি সেদিন ইদবাজারের তোলা তুলে দলবলসহ প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে সিগারেট ফুঁকছিলাম। আমি এগিয়ে গিয়ে জেরা করতেই শঙ্খ সশব্দে কেঁদে উঠেছিল। নিজের সম্পর্কে বেশি কিছু জানায়নি। বলেছিল, স্বামীর অবর্তমানে ওর শ্বশুরবাড়ির লোকজন ওকে দিনরাত ভয়ংকরভাবে খাটায়, তাই বাড়ি থেকে পালিয়ে এসেছে।

    সেদিনের পর থেকে আজ পর্যন্ত ওকে আমি কখনো কাঁদতে দেখিনি। কোমরে গুলিবিদ্ধ হয়ে যখন আমি হাসপাতালে ভর্তি ছিলাম তখন দুএকদিন ওর উদ্বিগ্ন চোখ দেখেছি। চোখ ভেজেনি।

    আমার জন্য চোখ ভেজানোর মানুষ পৃথিবীতে থাকার কথাও না। আমার আসল মা-ই আমার জন্য কখনো কাঁদেনি। আসলে তাকে নিজের জন্য এত বেশি কাঁদতে হতো যে আমার জন্য কাঁদার সময় হতো না।

    একবার আমি বাবার ঘড়ি পরে স্কুলে গিয়েছিলাম। দোকান থেকে ফিরে বাবা আমাকে তালগাছের ডাগুর দিয়ে মেরে আমার হাতের তালু ফাটিয়ে ফেলেছিল। রক্তাক্ত আমি যখন মাগো মাগো করছিলাম তখন মা ঘরের পর্দার আড়ালে ভেজা কবুতরের মতো কাঁপছিল। আমি এভাবে যতবার মার খেতাম ততবার মা অমন করে দাঁড়িয়ে দেখতো। আমিও মায়ের মার খাওয়া দাঁড়িয়ে দেখতাম।

    শঙ্খ বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে। হরিণীর মতো সরল চোখ মেলে বলছে, ‘গতকালের দুধ কিন্তু নষ্ট হয়ে গেছে দাদা।’

    উদ্বিগ্নভঙ্গিতে দুধঅলা মাথা নাড়াচ্ছে, ‘কও কী? জ্বাল দিতে দেরি করছিলা?’

    ‘না। আপনি দেয়ার পরপরই জ্বাল দিয়েছি। পরে ভাবলাম, দাদার কোনো ভুল হয়েছে। এমন তো হবার কথা না।’

    ‘ইস! আচ্ছা তাইলে আজ আরেক বোতল বেশি নাও।’
    দুধঅলা দাঁতে জিভ কাটে, ‘কী কা-! তুমি ভুল বুইঝো না কিন্তু।’
    হাসির ঝংকার ওঠে, ‘দাদা যে কী বলে!’

    মিনারেল ওয়াটারের দুটো হাফ লিটারের বোতল শঙ্খের হাতে দিতে দিতে লোকটা আলগোছে ওর করতল ছুঁয়ে দেয়। বোতল দুটো দুহাতে ধরে শঙ্খ দুধঅলার দিকে এমন একটা ইঙ্গিতপূর্ণ হাসি ছুঁড়ে যার তির তীক্ষ্ন ভাবে আমার শরীরের স্পর্শকাতর অংশে এসে বিঁধে।

    আকাশে মেঘ থৈ থৈ করছে। শারদ সকালে বৃষ্টির ভাব। শঙ্খ ঝিরঝিরে বৃষ্টিকণ্ঠে বলে, ‘যাই দাদা, ছাদের কাপড় তুলবো।’ আমি হুইলচেয়ারের চাকা ঘোরাতে ঘোরাতে নিজের ঘরে চলে আসি। টেবিলের ওপরে রাখা কলিংবেলে তিনবার চাপ দিই। শঙ্খ এবার উড়ে চলে আসে। শঙ্খ জানে এখন ওকে কী করতে হবে।



    ৩.

    সেদিন কবুতর দুটো উড়তে পারছিল না। একটার মাথা থেকে ময়ূর-পেখমের মতো নীল পালক ক্রমান্বয়ে হালকা হতে হতে লেজ অবধি সাদা। গলার কাছে ফোলা ফোলা গাঢ় নীল পালক। আরেকটা কবুতর ছিল দুধসাদা। দুটো কবুতরের ডানাতেই লাল স্কচটেপ আটকানো ছিল। কবুতর জোড়া ফরিদ ভাইয়ের কাছ থেকে কিনেছিলাম আমি। দাম ছিল আশি টাকা। ফরিদ ভাই কিছুতেই দাম কমাচ্ছিল না। আমার সৎ মায়ের ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে সেদিন সকালে একশ টাকা সরিয়ে ছিলাম আমি। ফেরার সময় লাতু কাকার ‘দি হাতেখড়ি বুকস্টোর’ থেকে একটা স্কচটেপও কিনেছিলাম।

    ফরিদ ভাই শিখিয়ে দিয়েছিল বাড়িতে নতুন কবুতরকে পোষ মানাতে হলে এমন করে ডানা আটকে রাখতে হয়। চাইলে ডানা হালকা কেটেও দেয়া যায়। ফরিদ ভাইয়ের চিলেকোঠার ঘরের পাশে কাঠের ঘরভর্তি প্রায় একশ কবুতর ছিল। আপাতদৃষ্টিতে তার মতো কবুতরপ্রেমীর কাছে বা আমার মতো তেরো বছরের কিশোরের কাছে এ ধরনের কাজ নির্মম মনে হবার কথা ছিল। কিন্তু তা হয়নি। আমি ফরিদ ভাইয়ের শেখানো বিদ্যেমতে কবুতর জোড়াকে পোষ মানিয়েছিলাম।

    ফরিদ ভাইয়ের কাছ থেকে আশি টাকা মূল্যে কেনা ময়ূরী আর শোভা ছাড়া ছোটবেলায় কোনো বন্ধু ছিল না আমার। যেদিন দুধসাদা শোভাকে উদবিড়াল এসে ছিঁড়েখুঁড়ে ওর রক্তাক্ত লাল পালকগুচ্ছ মাটিতে ফেলে রেখে গিয়েছিল সেদিন জীবনে প্রথম ও শেষবারের মতো আমার মনে হয়েছিল জগতের সব দুঃখ আর শোক ভোলার জন্য অন্তত একজন বন্ধুর সঙ্গ চাই।

    পাড়ার ছেলেরা একে-অন্যের বন্ধু ছিল। আমাদের বাড়ির পেছনে জলার উত্তরে ওরা সবাই দলবেঁধে খেলতো। বর্ষা-বাদল কিছুই মানতো না। ফুটবল, ক্রিকেট, দাঁড়িয়াবান্ধা। আমি মাঝেমাঝে লোভীর মতো জলার ধারে হাঁটতাম। ভাবতাম ওরা আমাকে ডাক দিবে। ওরা আমাকে ডাকতো না। ওদের কেউ একজন আমাকে ভুল করে দেখে ফেললে তর্জনি উঁচিয়ে বলতো, ‘দ্যাখ দ্যাখ, ওই বাড়িটা ওদের। ওর বাপ বাড়ির কাজের বুয়ারে বিয়া করছে।’ কেউ আবার খিলখিল করে হাসতো, ‘ওদের বাড়িতে কেউ কাজে যায় না। বুয়ারা গেলেই ওর বাবা ধরে পেট বানায় দেয়। খুব খচ্চর ওই বুড়ো।’

    ঐ ছেলেরা আমার বন্ধু না। আমার কোনো বন্ধু ছিল না। আমার দুজন মা ছিল। আমার আসল মায়ের ডানা ছাঁটা ছিল আর সৎ মায়ের ডানায় ছিল স্কচটেপ। আর আমার বাবা ছিল শিকারি বাজ। গৃহপরিচারিকাকে বিয়ে করে তিনি আমার আসল মাকে বাড়ির ভৃত্য করে রেখেছিলেন। আমার আসল মায়ের ফ্যাঁচফ্যাঁচে কান্নায় বিরক্ত হয়ে বাবা মাঝেমাঝেই চিৎকার করে বলতেন, ‘ছিনাল মাগী মরেও না।’ আমার আসল মা তার স্বামীর অনুগত ভৃত্য ছিল। তাই একদিন ইঁদুর মারা বিষ খেয়ে সে মরে গিয়েছিল।

    শঙ্খের হাতে ক্রিমরঙা কবুতরটি ফড়ফড় করে ওঠে। কবুতরটির ক্রিমরঙা লেজের চারপাশে কালো কালো ফুটকি। শঙ্খ কবুতরের গলায় হাতের আদর দিতে দিতে আমার দিকে তাকায়।

    ‘বাড়ির পেছনের বাগানে জামগাছের নিচে বসেছিল। আমাকে দেখে ওড়ার চেষ্টাও করেনি।’

    কবুতরটি ডানা ঝাপটায়। দেখে আমার ফরিদ ভাইয়ের কথা মনে পড়ে। আমার ডানা ছাঁটা মায়ের বিষ খাওয়ার কথা মনে পড়ে।

    ‘ওর ডানাতে স্কচটেপ মেরে দে।’
    শঙ্খ আঁতকে ওঠে। ‘কী বলেন? উড়তে পারবে না তো!’
    ‘উড়তে পারলে তো পোষ মানবে না।’
    ‘যে পোষ মানার সে এমনিতেই মানে।’

    শঙ্খ ওর পোষমানা হাসি হাসে। এই হাসিতে আমার অমোঘ আকর্ষণ। ছোটবেলায় ফরিদ ভাইয়ের প্রতিও আমার দুর্দান্ত আকর্ষণ ছিল। আমার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল ভাই আমার কাছ থেকে কবুতরের বিনিময়ে কোনো টাকা নেবে না। কিন্তু ফরিদ ভাই সবকিছুর বিনিময়ে সবার কাছ থেকে টাকা নিতেন। কেবলমাত্র চিলেকোঠার ঘরে আমার প্যান্ট খোলার সময় উনি আমাকে টাকা দিতেন।

    ঐ চিলেকোঠার ঘরে প্রথম যেদিন যাই, সেদিন ব্যথায় আর অপমানে আমার খুব খারাপ লেগেছিল। এক দৌড়ে বাড়ি ফিরে মায়ের আঁচলের নিচে লুকাতে চেয়েছিলাম। আমি জানতাম মায়ের আঁচল নোংরা, মসলা-ঘামে ভেজা। তবু লুকানোর কথা মনে আসতেই সেই ভেজা আঁচলের কথা আমার মনে পড়েছিল। কিন্তু গৃহস্থালি কাজে ব্যস্ত মায়ের আমার কথা মনে পড়েনি। মা পিছু ফিরেও দেখেনি আমার চোখের ভয়।



    ৪.

    এখান থেকে আমার আসল মায়ের কবরটা দেখা যায়। কবরটা এখন আর তেমন উঁচু নেই। উপুড় হওয়া মানুষের পিঠের মতো সামান্য ভেসে আছে। কবরের মাথার কাছে চালতাগাছ না থাকলে আমার পক্ষে জায়গাটা সনাক্ত করা মুশকিল হতো। বর্ষা এলে এই বাড়ির চারপাশ রীতিমতো জঙ্গলে ভরে ওঠে। আগে সারাবছরই বাগানটা আগাছায় ঢাকা থাকতো। অবশ্য এখন আগের মতো বাগানে ঝোপ-জঙ্গল না থাকায় চালতাতলার উঁচু অংশের চারদিকে ইটের ঘের দেখে কারো মনে হতেই পারে এখানে কোনো কবর আছে।

    চালতা গাছটা উপরে উঠতে উঠতে বেশ ঝোপড়ানো হয়েছে। গাছের নিচের দিকের ডালপালা ছাঁটা। কবরের ডানপাশে অনেকটা জায়গাজুড়ে ল্যান্টেনার কাঁটাময় শাখায় বর্ণিল ফুল ফুটেছে। তবে কবরের ওপরটা আগাছাহীন। ভালো করে খেয়াল করলে বোঝা যায় আজকাল কেউ বিশেষ যত্ন করছে চালতাতলার। শঙ্খ নিশ্চয়ই। কে বলেছে ওকে? ওখানে একজন ভীতু, দুর্বল আর গুরুত্বহীন মানুষ শুয়ে আছে? হঠাৎ মনে পড়ে, আমিই বলেছিলাম। যেদিন প্রথমবারের মতো ছায়াটা দেখে চমকে উঠেছিলাম। সেদিন।

    শঙ্খের হাতে নিড়ানি। ও দু হাঁটু ভাঁজ করে বসে বাগানের মাটি খুঁড়ছে। হাত আর নিড়ানি দিয়ে মাটি ঝরঝরে করে কিসের যেন বীজ ছড়িয়ে দিচ্ছে। মগের মুখ হাত দিয়ে আটকে ধরে বৃষ্টির ছাঁটে পানি দিয়ে এদিক-সেদিক হাঁটছে। এবার গুনগুন করতে করতে ও ঘরের দিকে যাচ্ছে।

    শঙ্খ আসার পর থেকে এই মাটি আর বন্ধ্যা নেই। এই বাড়ির টিনের সীমানাপ্রাচীর ঘিরে থাকা সারি সারি সুপারি গাছেও সবুজ, লাল, কমলা সুপারির থোকা এসেছে। বাগানের পশ্চিমপাশে সীমের মাচা ছেয়ে গেছে সবুজ ডোগায়। সাদা সাদা সীম ফুল ঊর্ধ্বমুখী হয়ে সূর্যকে দেখার চেষ্টা করছে। পাখি গাইছে। যে বাগানে একটা শালিক পর্যন্ত দেখিনি শঙ্খ আসার পর থেকে সেখানে টিয়া, কবুতর, ঘুঘু অব্দি নেচে বেড়ায়।

    কেউ এসেছে। শঙ্খের উৎফুল্ল কণ্ঠস্বর শুনতে পাচ্ছি। আমি এর আগে কখনো ওর এমন মুখরিত স্বর শুনিনি। শঙ্খ এমনিতে আমার সাথে খুব কম কথা বলে। বেল না বাজালে খাওয়ার তাগিদ ছাড়া ও আমার ঘরে ঢোকে না। আমার ঘরের বামপাশের ঘরে ও থাকে। এই পূর্বভিটা পশ্চিমদুয়ারী বাড়িতে স্কুলঘরের মতো টানা তিনটি ঘর। সামনের চেয়ে বাড়ির পেছনে বেশ প্রশস্থ খোলা জায়গা। আগে সেখানে জঙ্গল ছিল। শঙ্খ লোক ডেকে পরিষ্কার করে কিছু ফুলের গাছ লাগিয়েছে। সকালে ও আমার টেবিলে কিছু লাল-হলুদ ফুল রেখে গেছে। ওর চুড়ো খোঁপাতে আজ লাল গোলাপ গোঁজা দেখেছি।

    শঙ্খ ঘরে ঢুকেছে। ওর মুখ ম্লান। ‘সেই ছেলেটা এসেছে। সেদিন যে এসেছিল।’ আমি ইশারা করে শঙ্খকে অনুমতি দিতেই ও যুবকটিকে ডেকে আনে। যুবকটির চোখে আজ রুগ্ন বিষণ্নতা। মসৃণ চুল অবিন্যস্ত। সবুজ রঙের টি শার্টের দুটো বোতামই খোলা। চশমাভেদী চোখজোড়ায় নরম আলো। ওর বাবা আকবর আলী মারা গেছে। মৃত্যুশোকে বিপর্যস্ত মানুষের অসহায় চেহারা দেখে সহানুভূতি দেখাতে হয়। যুবকটির শোকাহত চেহারা দেখে শঙ্খ ঝিমিয়ে পড়েছে। ও চা আনতে ভুলে গেছে।

    ‘কীভাবে মারা গেল? একদিন এসেছিল এই বাড়িতে। আহা, বড় ভালো লোক ছিল। আমাকে মা বলে ডাকল।’ যুবকটি ডুকরে কেঁদে ফেলে। চশমা খুলে হাতের পিঠে চোখের পানি মোছে। আমার আসল মা যেদিন মারা গেল সেদিন খিঁচুনি উঠে তার শরীর বাঁকা হয়ে গিয়েছিল। দেখে আমার সৎ মা ভয়ে ঘর ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিল। আমিও। এই বাড়ির পেছনে যে জঙ্গল ছিল সেখানে গিয়ে চুপ করে বসেছিলাম। কাঁদার মতো কোনো মানুষ লাশের আশেপাশে ছিল না। বাবাকে পুলিশ ধরেছিল মায়ের মৃত্যুর এক সপ্তাহ পর। বেঁচে থাকতে যে লোকটাকে মা জব্দ করতে পারেনি, মরে গিয়ে জব্দ করেছিল ভীষণ।

    শঙ্খ মায়াগলায় ঘরের নীরবতা ভাঙে। ‘মন খারাপ করবেন না। নিজেকে সামলান। আমরা সবাই একদিন মারা যাবো।’

    যুবকটি পুনঃপুনঃ চোখ মোছে। ‘ভালো মানুষ ছিল আকবর আলী ভাই। আমি হাত বাড়ালে কখনো না করেননি।’
    ‘খুব বিপদ এখন। টাকাটা খুব দরকার।’
    ‘কীসের টাকা?’

    সময় খুব দ্রুত গতিতে চলতে থাকে। কেবল অসময়ে এসে থমকে যায়। আর চলতে চায় না। সব শোক আর আপদ তখন একটা বিন্দুকে কেন্দ্র করে জড়ো হতে থাকে। যুবকটির চোখের মণিতে ওর সকল শোক জমে বিস্ফারিত হবার উপক্রম হয়।

    ‘এটা কী বললেন আপনি? আমার বাবার পাওনা টাকা!’
    ‘ও কথা ভুলে যাও খোকা।’
    ‘দেখেন আমি কিন্তু আপনাকে ছেড়ে দিবো না। আমি কোর্ট পর্যন্ত যাবো।’
    ‘যাও দেরি করো না। চাইলে সাথে করে শঙ্খকে নিয়ে যেতে পারো। দুই রাত ফেরত না দিলেও চলবে।’
    ‘কেমন মানুষ আপনি? অসভ্য, বর্বর। ইতর কোথাকার!’

    আমি হাতের নোকিয়া মোবাইল সেটের দিকে তাকাই। মোবাইলের প্রথম সারির তিনটি বোতাম ক্ষয় হয়ে গেছে। অনেকদিন কারো কল আসে না। এই বাড়িতে কোনো টেলিভিশন নেই। ডিশ বা ইন্টারনেট সংযোগ নেই। বর্হিপৃথিবীর সাথে যোগাযোগের মাধ্যম বলতে এই মুঠোফোন আর খবরপ্রাপ্তির মাধ্যম বলতে দৈনিক পত্রিকা। টেবিলে আজ পত্রিকা দেখতে পাচ্ছি না। পত্রিকার জন্য একবার বেল বাজালেই চলে। আমি বেল বাজাইনি তবু শঙ্খ ঘরে ঢুকেছে। ওর এক হাতে চায়ের কাপ আরেক হাতে প্লাস্টিকের ছোট জার। আমি খেয়াল করি, এই মুহূর্তে ওর চলনে চেনা চটুলতা নেই। ও কি যুবকটির প্রেমে পড়ে যাচ্ছে?

    ‘চিনি দিই নাই। এক চামচ দিবো?’
    ‘না, হাফ চামচ।’

    আমি শৈথিল্য ভেঙে জেগে উঠি। ‘এখানে কেউ চা খাবে না শঙ্খ।’ শঙ্খের হাত কেঁপে ওঠে। হাতের কাপ না নামিয়ে ও নীরবে ঘর ছেড়ে চলে যায়। ক্রিমরঙা কবুতরটি ঘরে ঢুকেছে। এলোমেলো দুপা ফেলে উৎসুক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। হয়তো আমার নির্লিপ্ততা যুবকটির মতো ওকেও বিস্মিত করে তুলেছে।



    ৫.

    কী অদ্ভুত না! এই যে রাত নেমে আসে বাতাসে বাতাসে, আকাশ চুইয়ে নেমে আসে অন্ধকার, সেই অন্ধকারই আবার ভোরের আলোর ইঙ্গিতে মিলিয়ে যায় আকাশেই!

    এমন অসময়ে ঘুমাই না আমি। মাথাটা দুপাশে চেপে আসছে। বাইরে আলো ডুবতে শুরু করেছে। জানালার কাচে কুয়াশা নিশ্বাসের ছাপ ফেলছে। ছেলেবেলায় এমন ভেজা কাচে আঙুল টেনে টেনে নানান নকশা আঁকতাম। গাড়ি আঁকতাম সবচেয়ে বেশি। রংহীন গাড়ির ছবি বেলা বাড়লেই হাওয়ায় উড়ে যেতো।

    বড় হয়ে অমন একটা কালো বড় গাড়ির মালিক বনে যাবার পর আর কোনোদিন কুয়াশা ভেজা স্লেটে গাড়ি আঁকা হয়নি। আমার একটা গাড়ি ছিল। গাড়ির চাকা ঘূর্ণিপাকে ঘুরতো। এ গলি, সে গলি। বউবাজারের সবচেয়ে বড় সিমেন্টের দোকানের মালিক ওসমানকে একদিন ঐ গাড়িতে করে উঠিয়ে নিয়ে বেধড়ক পিটিয়েছিলাম। আমার সহচর নাদিমের বউটাকে বড় নাচাচ্ছিল বুড়োটা। ইচ্ছে ছিল ওকে ঠিকাদার নিতাইয়ের মতো পদ্মার চরে নিয়ে বাদাম খেতের মধ্যেই পুঁতে রাখবো। নিতাইয়ের মৃত্যু অমন এক সূর্যডোবা সময়েই হয়েছিল। কিন্তু সূর্য ডোবার মুখে ওসমান বুড়োটা এমন কান্নাকাটি শুরু করেছিল যে নাদিমের অনুরোধে ওকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছিলাম। যদিও আর উঠে দাঁড়াতে পারেনি ওসমান।

    সন্ধের মুখে প্রায় প্রতিদিনই এমনভাবে পেছনে ফিরে যাই। ছায়াচ্ছন্ন সময়ে আলোর বুড়বুড়ি ওঠে যেন। সামনে তাকাই। আচমকা দেখি বাগানের ঝোপের ভেতরে একটা ছায়াশরীর আড়াল হচ্ছে। অবিন্যস্ত আঁধার ক্রমশ গাঢ় হতে হতে জানালার কাচে লেপ্টে যাচ্ছে। দীর্ঘক্ষণ একটানা অন্ধকারে তাকিয়ে থাকায় গাছগাছালির পাতার ছায়া কাচের আড়াল উপচে চোখের সামনে আরো স্পষ্ট হয়ে উঠছে। আমি শুয়ে আছি। আমার পা দুপাশে ভি ভঙ্গিতে ছড়ানো। এখন চাইলেও আমি ইচ্ছেমতো এদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না।

    আমার আসল মা যেদিন মারা যায় তার আগের রাতে আমি এই বিছানায় টানটান হয়ে শুয়ে ঘুমের ভান করে ছিলাম। পাশে শুয়ে থাকা মায়ের শরীর থেকে বাড়ির ঝিদের মতো তেল-মসলার উৎকট গন্ধ আসছিল। প্রচণ্ড অস্বস্তিতে আমার কপালের দুপাশে শিরা লাফাচ্ছিল। হঠাৎ মা তার খরখরে হাত আমার বুকে রাখায় আমার অসহ্য লাগছিল। ভীষণভাবে খেপে উঠে আমি বাবার মতো অকথ্য ভাষায় গালি দিয়ে মায়ের হাত সরিয়ে দিয়েছিলাম। মা বিনা বাক্যব্যয়ে খাট থেকে নেমে মেঝেতে শুয়ে পড়েছিল।

    ঘরের আলো জ্বালানো হয়নি। আজ শঙ্খ কি খানিক উদাসীন? খেয়াল করা হয়নি। থাকুক উদাসীন, আঁধারও থাক। মন্দ লাগছে না। অকস্মাৎ কারো নড়াচড়ার শব্দ পাই। শঙ্খ এলো কি? পাশ ফিরে মেঝেতে চোখ পড়তেই দেখি একটা ছায়া গুটিসুটি মেরে শুয়ে আছে।

    ‘কে? কে?’

    কেউ জবাব দেয় না। ভয় পাইনি। চমকে উঠেছি কেবল। এই ঘরের মেঝেতে মাঝেমাঝেই এই ছায়াশরীর শুয়ে থাকে। শরীরের গড়নটা আমি ঠিকঠাক চিনে উঠতে না উঠতেই তা আঁধারে মিলিয়ে যায়। ভয় না পেলেও আজও ঘটনার আকস্মিকতায় আমার ধাতস্থ হতে কয়েক মিনিট লাগে। এখন শঙ্খকে আমার খুব দরকার।

    তিনবার বেল বাজাতেই শঙ্খ ঘরে ঢোকে। ঘরের আলো জ্বালায়। আমার দিকে তাকাতে তাকাতে ওর স্বর্ণাভ মুখ কমলারঙা হয়ে যায়। কাঠের দরজার ভারি পাল্লা টেনে শঙ্খ ধীর পায়ে এসে আমার কাছাকাছি দাঁড়ায়। ওর শরীরে পদ্মের ঘ্রাণ। আমার নিঃশ্বাস ভারি হয়ে আসে। শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে বুকে জমা বাতাসের বদলে আগুন গরম ভাপ বের হয়। বাতাসের উষ্ণতা টের পেয়ে শঙ্খ ওর সেই বিখ্যাত হাসি হাসে। বরাবর হাসির সাথে ওর চোখ হাসে, আজ হাসির বদলে বিদ্যুৎরেখার মতো চিকন একটা জলরেখা ঝলসে ওঠে ওর চোখের তারায়।

    আমাকে কিছু বলতে হয় না। শঙ্খ জানে এখন ওর কী করণীয়। নারীশ্রেষ্ঠা পদ্মিনীর ভঙ্গিতে ও আড়মোড়া ভাঙে। মিনিটখানেক সময় নেয়। তারপর রাতআকাশে বেপথে ঘোরা তারার মতো একে একে ওর শরীরের সব কাপড় খসে যেতে থাকে। সেই সঙ্গে ধীরে ধীরে খসে পড়তে থাকে আমার জীবনের প্রাসঙ্গিক শোকসমূহ। আমি পলকহীন তাকাই। দুধসাদা পেলব শরীরের নারীটিকে আমার ছেলেবেলার পোষা কবুতর শোভার মতো দেখায়। আমার সৎমা এভাবে আমার বাবার সামনে নিরাভরণ দাঁড়িয়ে থাকতো।

    ঠিক তেত্রিশ বছর আগে জানালার ভাঙা হুড়কোর গোলাকার ছিদ্র দিয়ে এক চোখের তীক্ষ্মতায় যেভাবে আমি পৃথিবীর সবচেয়ে মোহনীয় দৃশ্যটি দেখতাম ঠিক সেভাবে আজ শঙ্খকে দেখতে থাকি। শঙ্খ হাসে। মুহূর্তের জন্য আমার মনে হয় আজ এই হাসিতে বিপুল সংশয়। আমি তবু ধরে নিই ওর হাসি আজ আরও মোহনীয়, আরও রহস্যময়।



    ৬.

    টুংটাং টুংটাং ঘন্টা বাজছে। ঘুম তাড়ানিয়া শব্দ হচ্ছে। বুক টলটল করছে। ঘুম নেই এখন। সারা দুপুর, বিকেল ঘুমিয়েছি।

    বাইরে ঝমঝম ঝুমঝুম বৃষ্টি পড়ছে। হাওয়া বৃষ্টিকে ঠেলে ঠেলে চালতা তলায় নিয়ে যাচ্ছে। ওখানে আমার আসল মায়ের প্রায় হারিয়ে যাওয়া কবর। কবর সংলগ্ন নতুন ঢিবিটার ওপরে পানি তরঙ্গের মতো আছড়ে পড়ছে। ঢিবির চুড়ো মাটি মিশে যাচ্ছে মাটিতে।

    এমন বৃষ্টি দেখলে শঙ্খ উঠানে নেমে প্রজাপতি, প্রজাপতি পাখনা মেলতো। আমার আসল মা-ও উন্মনা হতো। ঘর ছেড়ে বেরিয়ে বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে দেহের তেল-মসলার চিটচিটে গন্ধ ধুয়ে ফেলার চেষ্টা করতো আপ্রাণ। প্রতি চেষ্টাতে ভুর ভুর গন্ধ ছুটতো আরও। পালানোর জন্য আমিও ছুটতাম, বৃষ্টি দেখে শঙ্খ যেমন ছুটতো তেমন।

    বৃষ্টি বাড়ছে। উঠান ডুবতে বসেছে। শঙ্খের লাগানো বীজ, চারা ধুয়ে যাচ্ছে। জানালার কার্নিশে পালকে স্কচটেপ সাঁটা ক্রিমরঙা কবুতরটি চোখ মুঁদে বসে আছে। জানি কেউ আসবে না, তবু টেবিলে রাখা বেল বাজাচ্ছি, একবার...দুবার...তিনবার…

  • বিভাগ : ইস্পেশাল | ২৮ মে ২০২১ | ৬৭৩ বার পঠিত
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন পুনঃপ্রচার
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • সায়ন্তন চৌধুরী | ২৮ মে ২০২১ ২১:২২106516
  • একটু ছকে বাঁধা আর বানিয়ে তোলা লেগেছে; ভাষা কোথাও কোথাও ধারালো ও আনরোমান্টিক হতে পারত। তবুও ভালোই। কিছু সম্পাদনার ত্রুটি আছে, যেমন নিরাভরণ নিরাবরণ হবে।

  • সাদিয়া সুলতানা | 180.211.242.55 | ২৮ মে ২০২১ ২১:৫৬106520
  • অশেষ ধন্যবাদ সায়ন্তন চৌধুরী। এ ধরনের গল্প প্রথম লিখেছি। আপনার মতামত গল্পটাকে ঠিকঠাক করতে সাহায্য করবে আমাকে। কৃতজ্ঞতা জানাই।

  • নিবেদিতা আইচ | 73.2.170.148 | ২৯ মে ২০২১ ০৬:৫২106532
  • গল্পটা অন্যরকম। পাঁচ নম্বরটা পড়তে বেশি ভাল লাগল। 

  • Prativa Sarker | ২৯ মে ২০২১ ২০:০৩106588
  • গল্প বলার ধরনটা খুব টানল।

  • সাদিয়া সুলতানা | 180.211.242.72 | ৩১ মে ২০২১ ০০:১২106651
  • পড়ার জন্য ধন্যবাদ ❤️

  • লীনা | 202.134.8.131 | ০৪ জুন ২০২১ ১৫:৪৫494546
  • খুব সুন্দর গল্প, মন দিয়ে পড়লাম। তোমার শক্ত গাঁথুনির বিন্দু বিন্দু শব্দমালা চরিত্রগুলো চোখের সামনে আনতে বাধ্য। আর প্রকৃতি, পরিবেশ, পরিস্থিতি ও মানুষ যে এক মিথষ্ক্রিয়া শক্তি তোমার, সেটা,বরাবর এই গল্পে উপস্থিত! ❤️

  • সাদিয়া সুলতানা | 180.211.242.43 | ০৭ জুন ২০২১ ০৭:৪৭494683
  • পড়ার জন্য অশেষ ধন্যবাদ লীনা।

আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। সুচিন্তিত মতামত দিন