• বুলবুলভাজা  আলোচনা  শিক্ষা

  • নতুন শিক্ষানীতি- প্রাথমিক শিক্ষার জন্য ভাল না খারাপ ? - পর্ব ৩

    অবন্তী চক্রবর্তী মুখোপাধ্যায়
    আলোচনা | শিক্ষা | ১৩ অক্টোবর ২০২০ | ৮৫৬ বার পঠিত
  • ৫/৫ (১ জন)
  • জমিয়ে রাখুন পুনঃসম্প্রচার
  • প্রস্তাবিত জাতীয় শিক্ষানীতিতে ৬০ পৃষ্ঠায় আলোচিত হয়েছে মোট ২৬টি বিষয়, যা চারটি প্রধানভাগে ভাগ করা হয়েছেঃ

    ১। বিদ্যালয় শিক্ষা (School Education)
    ২। উচ্চশিক্ষা (Higher Education)
    ৩। অন্যান্য মূল বিষয়গুলিতে মনোনিবেশ (Other key areas of focus)     
    ৪। এটিকে সম্ভব করে তোলা (Making it happen)

    যদিও আমাদের আলোচনাকে আমারা পশ্চিমবঙ্গের প্রাথমিক শিক্ষার মধ্যেই নিয়ন্ত্রিত রেখেছি। আমি আগেও বলেছি প্রাথমিক শিক্ষার সঙ্গে শিক্ষার অধিকার, কন্যাসন্তানের শিক্ষা, স্কুলে না আসা, সবকটি বিষয়ই ওতপ্রোতভাবে যুক্ত, কিন্তু সমস্ত সমস্যা একসঙ্গে আলোচনা করা বিচক্ষণতা হবে না বরং জট আরও পাকিয়ে যাবে এবং কোন কিছুরই সমাধানসুত্র পাওয়া যাবেনা। তাই প্রতিটি সমস্যাকে পৃথক ভাবে পর্যেষণা করতে হবে। আগের পর্বে বলেছিলাম, বিশিষ্ট শিক্ষকদের কাছে কিছু প্রশ্ন রেখেছি এই শিক্ষানীতির ওপর তাঁদের মতামত নিয়ে। কারণ আমার মনে হয়েছে, এই গবেষণামূলক প্রবন্ধটির জন্য একটি অপরিহার্য অঙ্গ হল এই শিক্ষানীতির বাস্তবায়ন সম্পর্কে পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষকদের মতামত জানা। তাঁদের প্রাত্যহিক অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে ব্যবহারিক জীবনে এই প্রস্তাবিত শিক্ষানীতির ভূমিকা তাঁরা সর্বতোভাবে অনুধাবন করতে পারেন। তাঁরা নির্ণয় করতে পারেন যে কীভাবে ও কতটা এই প্রস্তাবিত শিক্ষানীতি কার্যকর করা যায়। অতএব, আমি পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষকদের প্রতিনিধি হিসেবে কলকাতা শহর এবং জেলা থেকে দুজন অভিজ্ঞ শিক্ষকের কাছে আমার প্রশ্নমালা  পাঠিয়েছিলাম। অনেক কর্মব্যস্ততার মধ্যেও যে তাঁরা আমার প্রশ্নের উত্তর দেবার জন্য সময় বার করতে পেরেছেন তার জন্য আমি তাঁদের আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। অভিমত দিয়েছেন কলকাতা থেকে ২০১৫ সালে জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত উৎপল মুখোপাধ্যায়; Calcutta Orphanage Primary School এবং নব্যেন্দুবিকাশ দাস; ষষ্টিতলা মাধ্যমিক বিদ্যালয় (উ:মা:), মুর্শিদাবাদ।

    আমি প্রশ্নগুলিকে তিনভাগে ভাগ করেছিলাম :

    ক) পাঠ্যপুস্তক সম্পর্কিত
    খ) শিক্ষণ এবং মূল্যায়ন সম্পর্কিত
    গ) শিক্ষক সম্পর্কিত

    এই পর্বে শুধুমাত্র পাঠ্যপুস্তক সম্পর্কিত (ক) বিভাগটি আলোচিত হবে। এর সঙ্গে তিন বছর থেকে শিক্ষা এবং শিশুদের পুষ্টি এবং স্বাস্থ্য (মানসিকস্বাস্থ্য সহ), শিক্ষাব্যবস্থার বাইরে থাকা দারিদ্র্যের সমাধান নিয়েও শিক্ষকদের মতামত থাকবে।

     

    স্কুল পাঠ্যপুস্তকের সমান্তরাল পরিবর্তন সম্ভব?

    নব্যেন্দুবিকাশ দাস

    স্কুল পাঠ্য পুস্তকের সমান্তরাল পরিবর্তন এ বিষয়টি পুরো পরিষ্কার নয়।

    উৎপল মুখোপাধ্যায়

    পাঠ্যপুস্তক সময়ের নিরিখে পরিবর্তন বা পরিমার্জন করা সম্ভব। তবে তা উদার,স্বচ্ছ, বিজ্ঞানভিত্তিক হতে হবে। হটকরিতার সাথে নয়। রেগুলার শিক্ষক, শিক্ষাবিদ, গবেষক, অভিভাবকদের চাহিদা ও যুক্তিনির্ভর হতে হবে। এই পরিবর্তন সমাজ তথা দেশের চাহিদার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হওয়া আবশ্যক।

     

    পাঠক্রমকে পুনর্নির্মাণ কীকরে সম্ভব?

    নব্যেন্দুবিকাশ দাস

    নতুন জাতীয় শিক্ষানীতিতে দেশের শিক্ষাব্যবস্থার খোলনলচে পুরোপুরি পাল্টে দেবার প্রয়াস গ্রহণ করা হয়েছে। পাঠ্যক্রমের পরিবর্তন এর বাইরে নয়। গণিত, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, ইন্টারনেট, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং ডাটা বিষয়ক শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে এই নতুন শিক্ষানীতিতে। সমগ্র পৃথিবীর ভবিষ্যৎ অগ্রগতি এবং শিক্ষা এই বিষয়গুলি কে কেন্দ্র করে আবর্তিত হবে। সেই উদ্দেশ্যে পাঠ্যক্রমটিরও আমূল পরিবর্তন ঘটানোর কথা বলা হয়েছে। এই ভাবনাচিন্তা কে সাধুবাদ জানানো যায়। সঠিক বিশেষজ্ঞদের নিয়ে কমিটি গঠন করে পাঠ্যক্রমের সঠিক পরিবর্তনও পুনঃ নির্মাণ সম্ভব। লক্ষ্য রাখতে হবে এই ধরনের বিশেষজ্ঞ কমিটিতে যেন প্রতিটি রাজ্য ও প্রতিটি আঞ্চলিক ভাষার শিক্ষাবিদরা প্রতিনিধি হিসেবে থাকেন। শুধুমাত্র একটি কেন্দ্রীয় লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে এগোলে পাঠ্যক্রমের এই পুননির্মাণ ও পরিবর্তন সঠিক হবে না। একটি বেসিক পাঠ্যক্রম তৈরি করতে হবে এবং রাজ্য ও তার প্রয়োজনীয়তা অনুযায়ী সেই পাঠ্যক্রমে কিছু কিছু পরিবর্তন আনার মতো ফ্লেক্সিবিলিটি রাখতে হবে। পাঠ্যক্রমটিকে শুধু জ্ঞানমূলক, তথ্যমূলক, ব্যাখ্যামূলক না করে তার মধ্যে সমস্যা উপস্থাপিত করতে হবে যা শিক্ষার্থীরা সমাধান করবে। এভাবেই প্রবলেম বেসড পাঠ্যক্রম হিসেবে তৈরি করতে হবে নতুন পাঠ্যক্রমটিকে।

    উৎপল মুখোপাধ্যায়

    শিক্ষা একটি চলমান বিজ্ঞান।আজকের পৃথিবীতে পরিবেশগত পরিবর্তন ও বিজ্ঞান-প্রযুক্তির উন্নতির সাথে সাথে পাঠক্রম পুনঃনির্মাণ করা আবশ্যক।  পাঠক্রম পুনঃনির্মাণের জন্য সমীক্ষা করা প্রয়োজন ।এই বিষয়ে শিক্ষাবিদ,গবেষকরা মুখ্যভূমিকায় থাকলেও নিয়মিত শ্রেণি শিক্ষণ-শিখন অভিজ্ঞতায় সম্পৃক্ত শিক্ষক -শিক্ষিকাদের মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে।

     

    ন্যূনতম সম্ভাব্য ব্যয়ে জাতীয় মানের পাঠ্যপুস্তক - কী মত?

    নব্যেন্দুবিকাশ দাস

    ঘুরপথে শিক্ষা ক্ষেত্রে বেসরকারি অনুপ্রবেশের একটি সহজ উপায় হচ্ছে পাঠ্যপুস্তক। পাঠ্যপুস্তক তৈরি করা ছাপানো এবং বিক্রি করা পুরোটাই সরকারের হাতে থাকা উচিত। সরকারি স্কুলগুলোতে অবশ্য পাঠ্য পুস্তক বিনামূল্যে পাওয়া যায়। যুগে যুগে ছাত্রছাত্রীরা একটি বিষয়ের জন্য বিভিন্ন পাঠ্যপুস্তক ব্যবহার করেছে। ফলে পাঠ্যপুস্তক বিভিন্ন রকম থাকবে। কিন্তু সরকারকে দায়িত্ব নিয়ে একটি আদর্শ পাঠ্যপুস্তক এর সেট অবশ্যই তৈরি করতে হবে। পাঠ্যক্রম ছোট হবে ফলে বইও ছোট হবে এটাই স্বাভাবিক। এই ছোট বইগুলি অবশ্যই ন্যূনতম সম্ভাব্য ব্যয় তৈরি করা সম্ভব যদি সরকারের সদর্থক ইচ্ছা থাকে। উচ্চমানের পাঠ্যপুস্তক তৈরি না করে যেমন তেমন পাঠ্যপুস্তক এর একটি সেট যদি সরকার ছাত্র-ছাত্রীদের দেয় তাহলে সেটি শিক্ষাক্ষেত্রে পাঠ্য পুস্তক ব্যবসায়ীদের প্রবেশকে সুনিশ্চিত করবে। পাঠ্যপুস্তক তৈরি করার বিশেষজ্ঞ কমিটিতে সকল রাজ্য ও সকল ভাষার প্রতিনিধিদের অবশ্যই রাখতে হবে। সুনির্দিষ্ট ডাটাবেস তৈরির মাধ্যমে সেরা লেখকদেরকেই পাঠ্যপুস্তক গুলি লেখার দায়িত্ব দিতে হবে। একবার আদর্শ পাঠ্যপুস্তক এর একটি সেট তৈরি হয়ে গেলে বিভিন্ন ভারতীয় ভাষায় তার অনুবাদ করা খুব একটা কঠিন কাজ হবে না।

    উৎপল মুখোপাধ্যায়

    বর্তমান কর্পোরেট পুঁজির আধিপত্যের যুগে শিক্ষা একটি লাভজনক ব্যবসা।সেক্ষেত্রে নতুন শিক্ষানীতিতে পাঠ্যপুস্তকের বিষয়টি যেভাবে উঠে এসেছে তাতে সম্ভাব্য ব্যয়ে এবং গুণগতমানের পাঠ্যপুস্তক রচনা প্রায় অসম্ভব। উদাহরণ হিসাবে বলা যায় এন আই ও এসের অভিভাবকত্বে ডি এল এডের পাঠ্যপুস্তক ও প্রশ্নপত্রের আঞ্চলিক ভাষায় অনুবাদে অনেক ত্রুটি লক্ষ্য করা গেছে।সুতরাং জাতীয় শিক্ষানীতি, পাঠক্রম ও পাঠ্যসূচি অনুসরণ করে রাজ্যগুলিকে পাঠ্যপুস্তক রচনার দায়িত্ব অর্পণ করা উচিত।তাহলেই পাঠ্যপুস্তকের সম্ভাব্য মূল্যমান ও গুণমান বজায় রাখা সম্ভব।

     

    উচ্চমানের পাঠ্যপুস্তক লিখতে বিশেষজ্ঞদের উৎসাহ দিতে হবে বলা হচ্ছে, যা এনসিইআরটি জাতীয় পাঠ্যক্রমের ফ্রেমওয়ার্কের উপর ভিত্তি করে হতে পারে- কী মত?

    নব্যেন্দুবিকাশ দাস

    এটা খুবই ভালো উদ্যোগ। কিন্তু লক্ষ্য রাখতে হবে এনসিআরটির জাতীয় পাঠক্রমের ফ্রেমওয়ার্কের উপর ভিত্তি করে পাঠ্যপুস্তক তৈরি করতে গিয়ে সেগুলো যেন কেন্দ্রীয় চিন্তাভাবনার দোষে দুষ্ট না হয়। বিভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতির নাগরিক সমন্বয়েই ভারত রাষ্ট্র গঠিত। ইদানিং কেন্দ্রীয় সরকারের একটি হিন্দি জাতীয়তাবাদ সব ভারতীয়র ওপর চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এটি খুব মারাত্মক প্রবণতা। এটি ভারতবর্ষের বৈচিত্র্য ও অখন্ডতাকে শুধু বিনষ্টই করবে। ফলে একটি কেন্দ্রীয় ফ্রেমওয়ার্কের উপর ভিত্তি করে পাঠ্যপুস্তক রচনা করতে গিয়ে তা যদি বিশেষ কোনো একটি ভাষা ও সংস্কৃতির পরিচয় বাহক হয় তাহলে তা সফল হবে না। কেন্দ্রীয় ফ্রেমওয়ার্কের উপর ভিত্তি করে বিশেষজ্ঞরা অবশ্যই উচ্চ মানের একটি পাঠ্যপুস্তক এর বেসিক সেট তৈরি করুক। এই বেসিক সেটটি তারপর বিভিন্ন ভাষা ও রাজ্যের বিশেষজ্ঞরা তাঁদের রাজ্যের প্রয়োজনীয়তা অনুযায়ী পরিবর্তন ও পরিমার্জন করে নিতে পারবেন। পাঠ্যপুস্তক লেখার ক্ষেত্রে এই অপশনটি অবশ্যই রাখতে হবে।

    উৎপল মুখোপাধ্যায়

    পাঠ্যপুস্তক সবাই লেখেন না। বিশেষজ্ঞরা (কৃষিবিজ্ঞানীরা) এন সি আর টির ফ্রেমওয়ার্কের উপর ভিত্তি করে রচনা করলে নিশ্চিত তার গুণমান উচ্চমানের হবে।কিন্তু তা চূড়ান্ত ভাবে প্রয়োগ করার আগে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের(মেঠোচাষিদের) মতামত গ্রহণ করা উচিত।অনেকক্ষেত্রে দেখা গেছে শ্রেণী পঠন-পাঠনের স্বল্প  অভিজ্ঞতা সম্পন্ন বিশেষজ্ঞদের দ্বারা রচিত পাঠ্যপুস্তক পুনঃমুদ্রণ করতে হয়েছে।

     

    কী ভাবে উদ্ভাবন শক্তির প্রকাশ হবে, কী ভাবে প্রবলেম বেসড পাঠ্যক্রম হবে?

    নব্যেন্দুবিকাশ দাস

     শিক্ষার্থীদের উদ্ভাবনী শক্তির বিকাশ ঘটাতে গেলে পাঠ্যক্রমের সেই রকম ভাবে পরিবর্তন করতে হবে। পাঠ্যক্রম টিকে শুধুমাত্র তথ্যমূলক বা জ্ঞানমূলক না করে বিশ্লেষণধর্মী করতে হবে যাতে করে শিক্ষার্থীরা কোন সমস্যাকে বিশ্লেষণ করার সুযোগ পায় এবং নিজেদের উদ্ভাবনী ক্ষমতা প্রকাশ করার সুযোগ পায়। একইরকম ভাবেই প্রবলেম বেসড পাঠক্রম তৈরি হবে। পাঠ্যক্রমের প্রতিটি বিষয়ে এমন সব শিক্ষণীয় বিষয় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে যা শিক্ষার্থীদের সমস্যা সমাধানের পথ বের করতে উৎসাহী করে তুলবে। মুখস্থবিদ্যা নির্ভর পড়াশোনা প্রবলেম বেসড পাঠ্যক্রমের অন্তরায়।

    উৎপল মুখোপাধ্যায়

    শিক্ষকের শ্রেণি পরিচালনা পরিকল্পনাতে যেন অ্যাকশন রিসার্চ এর দৃষ্টিভঙ্গী থাকে।সরাসরি কোনো বিষয়ে প্রবেশ না করে শিক্ষার্থীদের সামনে রিলেটেড বিষয় উপস্থাপন এবং চ্যালেঞ্জ আনতে হবে। হাতেকলমে দলে আলোচনা করে তারা সেই চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করতে পারে এমন পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে।

     

    তিন বছর থেকে শিক্ষা নিয়ে কী মত?

    নব্যেন্দুবিকাশ দাস

    তিন বছর থেকে শিক্ষাদান বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। যে কারণে তিন বছর থেকেই শিশুদের শিক্ষাদানের ব্যাপারটি আনা হয়েছে সেই কারণটি সত্যি। দেখা যায় যে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যে সমস্ত ছেলে মেয়েরা ভর্তি হচ্ছে তাদের একটা বিরাট অংশের প্রথম শ্রেণীতে পড়ার যোগ্যতাই তৈরি হয়নি। তারা সঠিক ভাবে লিখতে পড়তে পারেনা যোগ বিয়োগ করতে পারেনা সংখ্যা চেনে না। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রথম শ্রেণীতে ভর্তি করার আগে বাচ্চাদের যদি pre-school শিক্ষার মাধ্যমে এই সব বিষয়গুলো শিখিয়ে দেওয়া যায় তাহলে সেটা তাদের পক্ষে ভালই হবে। অবশ্যই এখানে একটি বিষয় বলতেই হয় যে এই ব্যবস্থার ফলে প্রাইভেট  প্রি স্কুল এডুকেশন বিষয়টির অনেক বাড়বাড়ন্ত হবে। তবে অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্র গুলি কে যেভাবে গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে সেই ভাবে যদি আসলেই গড়ে তোলা যায় এবং সঠিক ট্রেনিং প্রাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ করা যায় তাহলে তিন বছর থেকে শিক্ষাদান বিষয়টি ফলপ্রসূ হতে পারে।

    উৎপল মুখোপাধ্যায়

    বিগত বেশ কয়েক বছর ধরে ব্যাঙের ছাতার মত বে-সরকারী নার্সারী স্কুল গজিয়ে উঠেছে। কর্পোরেট দুনিয়ায় ঘৌড়দৌড়ে তাঁর শিশুকে সফল প্রতিযোগী হিসাবে দেখার জন্য অভিভাবকরা ব্যস্ত হয়ে এইসব স্কুলে ভর্তি করছেন।সরকারী আয়বৃদ্ধির কারণে এগুলি অনুমোদন পাচ্ছে। কিন্তু স্কুলগুলির শিখন-শিক্ষণ পদ্ধতি কতটা শিক্ষা বিজ্ঞান সম্মত তা পরিদর্শন করার কোনো ব্যবস্থা নেই।ফলে এই সমস্ত স্কুল থেকে শৈশব তৈরি হওয়া শিশুরা স্বার্থপরতা ও তীব্র প্রতিযোগিতার মানসিকতা নিয়ে বড়ো হচ্ছে যা সমাজের পক্ষে আশাব্যঞ্জক নয়। সরকারী স্কুলে ৩ বছর বয়স থেকে প্রি-প্রাইমারি চালু হলে তা মঙ্গলজনক হবে আশা করা যায়।

     

    শিশুদের পুষ্টি এবং স্বাস্থ্য (মানসিকস্বাস্থ্য সহ), শিক্ষাব্যবস্থার বাইরে থাকা দারিদ্র্যের সমাধান করা- কে করবে, কী ভাবে হবে?

    নব্যেন্দুবিকাশ দাস

    শিশুদের শিক্ষার সঙ্গে পুষ্টি এবং শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়টি অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। শিশুদেরকে সঠিক খাদ্য দিয়ে পুষ্ট  করে তুলতে হবে,  তাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য সঠিক রাখতে হবে। কিন্তু এই কাজে বিদ্যালয় গুলিকে ব্যবহার করার কিছু বাস্তব সমস্যা আছে। মিড ডে মিলের অভিজ্ঞতা থেকে জানি, কিছু শিক্ষককে মিড ডে মিলের ব্যবস্থাপনা পরিবেশন ইত্যাদি নিয়ে ব্যস্ত থাকতে হয়। অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রগুলিতে পুষ্টি ও স্বাস্থ্যের দিকে নজর দিতে গিয়ে পড়াশোনার বিষয়টি পেছনের সারিতে না চলে যায় সেটা খেয়াল রাখতে হবে। আর, শিক্ষা ব্যবস্থার বাইরে থাকা ছেলেমেয়েদের দারিদ্র্যের সমাধান করা এই পথনির্দেশ বোধহয় শুধু শিক্ষানীতি থেকে পাওয়া যাবে না। তার জন্য আলাদা নীতি প্রণয়ন করতে হবে। শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের দিকে লক্ষ্য রেখে সর্বক্ষেত্রেই স্পেশাল এডুকেটর এবং কাউন্সিলর নিয়োগ করতে হবে যথেষ্ট পরিমাণে। সর্বোপরি প্রতিটি শিক্ষককেই ছাত্র-ছাত্রীদের মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি নজর রাখার মতন যোগ্যতা সম্পন্ন হতে হবে। বিএড কোর্সে এই বিষয়ে তাদেরকে শিক্ষাদান করতে হবে।

    উৎপল মুখোপাধ্যায়

    শিক্ষা ব্যবস্থার বাইরে থাকা সব শিশুকে বিদ্যালয়ের আঙিনায় আনতে হবে। পাড়া বা মহল্লা ভিত্তিক শিক্ষিত যুবক,ক্লাব গুলির সাথে ওই অঞ্চলের শিক্ষকদের মিলিত প্রচেষ্টায় এই কাজে ১০০% সফলতা আশা সম্ভব। একই সাথে তাদের পুষ্টি ও স্বাস্থ্যের জন্য শিক্ষা খাতে ব্যয় বরাদ্দ বৃদ্ধি করতে হবে।

     

    শিক্ষানীতির ১.৯ অংশে বলা হয়েছে ;  The responsibility for ECCE curriculum and pedagogy will lie with the MHRD to ensure continuity of curriculum and pedagogy from pre-primary school to primary school, and to ensure due attention to the foundational aspects of education. The implementation of early childhood education will be carried out jointly by the Ministries of HRD, Women and Child Development (WCD), Health and Family Welfare (HFW) and Tribal Affairs. A special joint task force will be constituted focontinuous guidance of the integration.  এই বিষয়টি নিয়ে কী মত?

    নব্যেন্দুবিকাশ দাস

    সরকারের সদিচ্ছা থাকলেই এই সকল মন্ত্রক এবং সংস্থা বা বডি গুলো একসঙ্গে মিলিত হয়ে এই বিষয়ে কাজ করা কোনো সমস্যা হবে না। যেহেতু প্রি স্কুল এর পাঠ্যক্রম ছাত্র-ছাত্রীদের ভবিষ্যতের ভিত তৈরি করবে ফলে এই পাঠ্যক্রম তৈরি করার সময় প্রত্যেকটি মন্ত্রক বা সংস্থা কে নির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে সৎ ভাবে কাজ করতে হবে।

    উৎপল মুখোপাধ্যায়

    এই বিষয়ে সহমত পোষণ করি।যদিও সরকারী অনেক ঘোষণা থাকলেও রূপায়নে ঘাটতি লক্ষ্য করা যায়। সুতরাং বিষয়টি আরও গুরুত্ব সহকারে রূপায়নে সচেষ্ট হতে হবে।

     

    পরবর্তী পর্বে, আমরা উৎপল মুখোপাধ্যায় এবং নব্যেন্দুবিকাশ দাসের শিক্ষণ, মূল্যায়ন এবং শিক্ষক সম্পর্কিত মতামত শুনব। এই প্রতিবেদনের শেষে আমি এই কথাই বলতে পারি যে, এই শিক্ষানীতিতে  অনেক ধোঁয়াশা রয়েছে, সুস্পষ্ট দিকনির্দেশ নেই, বিপুল পরিমাণ অর্থ কোথা থেকে যোগাড় হবে তার উল্লেখ নেই, এই অনিশ্চিয়তা বিভ্রান্তির সৃষ্টি করছে। আবার, অন্যদেশের সঙ্গে ভারতের শিক্ষানীতিকে তুলনা করাও ঠিক নয়, কারণ সামাজিক নিয়ন্ত্রণ, রাজ্য ও কেন্দ্রের দৃষ্টিভঙ্গী এবং রাজনৈতিক পদক্ষেপ পৃথক। উপরন্তু সমস্ত রাজ্যের প্রতিটি কোণে সমান ভাবে এই নীতি প্রয়োগ করাও সহজ হবেনা। তবুও, এই শিক্ষানীতি একটি পথনির্দেশক, এই নীতিতে যে লক্ষ্যগুলি বলা হয়েছে, যে উপরোধগুলি করা হয়েছে সেগুলির থেকে উপকারি ও  উপযুক্ত শব্দগুলি তুলে নিতে হবে। যেহেতু, অভীষ্ট কীভাবে  সম্পাদন হবে, কার দ্বারা হবে, এসব কোনো ব্যাখ্যা নেই, তাই আমাদের কাছে দুটি পথ খোলা আছে এক নির্দেশের জন্য অপেক্ষা করা অথবা কোন নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে অবেক্ষণ করে, অভিজ্ঞ শিক্ষক ও শিক্ষাবিদের অভিমত সংগ্রহ করে, গুরুত্ব সহকারে, পেশাদারিভাবে উপযুক্ত কাজ শুরু করা।

     


  • বিভাগ : আলোচনা | ১৩ অক্টোবর ২০২০ | ৮৫৬ বার পঠিত
  • ৫/৫ (১ জন)
আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। লড়াকু প্রতিক্রিয়া দিন