• বুলবুলভাজা  পড়াবই  মনে রবে

  • খাদবপুরের মানববাবু

    অবন্তি মুখোপাধ্যায় চক্রবর্তী
    পড়াবই | মনে রবে | ০৯ আগস্ট ২০২০ | ৮২৫ বার পঠিত
  • জমিয়ে রাখুন পুনঃসম্প্রচার
  • মঙ্গলবার, ৪ অগাস্ট, সন্ধেবেলা যখন প্রথম মৈনাকদার (মৈনাক বিশ্বাস) দেয়ালে মানববাবুর কথা দেখলাম, ভীষণ একটা ধাক্কা যেমন লাগল পাশাপাশি মনে হল একটা যুগের বুঝি অবসান হল। নীলুদার (নীলাঞ্জন হাজরা) সঙ্গে কথা বলতে বলতে ঝড়ের মতো একটার পর একটা শট যেন আমার চোখের সামনে দিয়ে হু হু করে বেরিয়ে যাচ্ছে, আর আমি ডুবে যাচ্ছি সেই ২৫ বছর আগের খাদবপুরের দিনগুলোতে। খাদবপুর কেন বললাম তা বলছি একটু পরে।

    তখন আমি সবে মাধ্যমিক, কিন্তু বাংলা আকাডেমিতে দিব্য যাতায়াত, লাইব্রেরির থেকে Esperanto-র ওপর একটা বই নিয়ে বাবার ঘরে বসে বসে পড়ছি। বাবার সঙ্গে তখন একজন ঝকঝকে মানুষ তরতর করে অনেক গল্প করছেন, আমি কিছু শুনছি, কিছু বইতে মন। যাই হোক, একটা ছটফটে বাচ্চা মেয়েকে এস্পেরান্তো পড়তে দেখে তাঁর আমাকে খুব মজাদার লেগেছিল, সেদিনই প্রথম তাঁর মুখে শুনেছিলাম স্প্যানিশরা J কে খ বলে, আর উনি তার মানে খাদবপুরের অধ্যাপক!

    সেইদিন আমি বুঝিনি মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় তিনি যাঁর অনেক অনুবাদ আমার ইতিমধ্যে পড়া হয়ে গেছে, বাড়িতে তাঁর তরজমা করা অনেক বই। এরপর আবারও তাঁর সঙ্গে একদিন সেই একই ঘরে বাংলা আকাদেমিতে দেখা, বাবা আর উনি গল্প করছেন, আমি একদৃষ্টে তাঁর দিকে তাকিয়ে আছি। গল্পটা হচ্ছিল, উনি আমেরিকা গেছিলেন কদিন আগে, সেখানে ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে বেড়ালের খাবারের পাশাপাশি বই বিক্রি হচ্ছে। উনি বিশ্লেষণ করছেন, এইভাবেই তো ক্রেতার নাগালে বইকে পৌঁছে দিতে হবে। আমার কাছে সেইসময় ব্যাপারটা একটু ভাসাভাসা লাগলেও বুঝলাম তার মানে খুব ভালো একটা পলিসি এভাবে বই কিনতে পারা।

    তুলনামূলক সাহিত্যের ছাত্রী, মনে পড়ছে তখন ইউজি-থ্রি, পরীক্ষা চলছে, কদিন আগেই বাবার বিশাল অ্যাক্সিডেন্ট ঘটেছে, মন দিয়ে লিখছি। পিছন থেকে মানববাবুর গলা, “অবন্তী বাবা এখন কেমন আছেন?” মনটা ভরে গিয়েছিল। ভালো তো ওনাকে লাগতই ভীষণ এবার থেকে শ্রদ্ধা আরও বেড়ে গেল।

    রামকৃষ্ণ মিশনে স্প্যানিশ পড়ছি, দিব্যজ্যোতিদার (দিব্যজ্যোতি মুখোপাধ্যায়) কাছে লাতিন আমেরিকার তাজা খবর শুনছি, স্প্যানিশ অন্তপ্রাণ আমি মনে মনে প্রস্তুত হচ্ছি কবে আমি কবিতা অনুবাদ করব? আমি জানি মানববাবু হলেন একমাত্র মানুষ যিনি খবর রাখেন এখনকার লাতিন আমেরিকান লেখকদের। অপেক্ষা কবে মানববাবুর দেখা পাব, অনেক অনেক প্রশ্ন করার আছে। কার লেখা, কোন্‌ বই পড়ব, কোথা থেকে পাব? উনি বললেন নিকানোর পাররা... এরকমই চলছিল।

    আমার দাদাকে (অলখ মুখোপাধ্যায়) আমার থেকেও বেশি স্নেহ করতেন, দাদার কাছেই শুনেছিলাম মার্কেজ-এর সঙ্গে ওনার দেখা হয়েছিল, আর মার্কেজই বলেছিলেন খাদবপুর। আমি চলে এলাম এদেশে, স্প্যানিশের মায়া ছাড়তে পারিনি, আবার শুরু করলাম স্টেজ ফোর স্প্যানিশ পড়া, এখানকার ইউনিভার্সিটিতে তুলনামূলক সাহিত্য নিয়ে পিএইচডি শুরু করার কথা ভাবা, আর এইসবের পিছনে ওই ঝকঝকে মানুষটির প্রবল সমর্থন ছিল।

    আমার কাছে মানববাবু ছিলেন যেন একটি সেতু। শুধু স্প্যানিশ সাহিত্য নয়, পূর্ব ইউরোপের সাহিত্যের সঙ্গে আমার প্রথম আলাপ মানববাবুর হাত ধরেই। বলকান দেশগুলোর যে নিজস্ব চরিত্র তা তিনি খুব ভালো করে বোঝাতেন। তিনি বলতেন, সাহিত্য যেমন একটি মানুষের কথা, তেমনই সাহিত্য সেই মানুষটির সমাজের কথাও। তাই সেই সমাজটিকে না চিনলে কী করে চেনা যাবে তাঁর রচনা? মনে পড়ে যায়, বাংলা আকাদেমিতে একদিন পবিত্র সরকার, যিনি আমাকে ছোটো থেকে চিনতেন বলে পবিত্রকাকু বলে ডাকি, আলোচনা করছিলেন বাংলা ভাষার লোনওয়ার্ড নিয়ে। তখন বাংলা আকাদেমি থেকে বিদ্যাৰ্থী অভিধান প্রকাশের তোড়জোড় চলছে। বাবা সারাক্ষণ ব্যস্ত থাকত। সেই প্রসঙ্গেই পবিত্রকাকু আর বাবার আলোচনার মধ্যে ঘরে ঢুকলেন মানববাবু। তিনি তখন কথা প্রসঙ্গে বলছিলেন, কীভাবে বলকান দেশগুলোতে ছোটো ছোটো কত ভাষা গোষ্ঠী রয়েছে। তারা একে অপরের থেকে শব্দ ধার করে। সেই শব্দের অর্থ কেমন করে বদলে যায়। এই দেশগুলোর সীমানা তখন বারবার বদলে যাচ্ছিল। এই সীমানা বদলের, পরিচয় বদলের প্রভাব পড়ছিল সমাজে। পরে দাদা যখন তার একটি নাটক ‘মেডেল’–এ এই ক্যায়োটিক স্পেসটা ধরার চেষ্টা করেছিল, তাকে ভাষায় রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেছিল, মানববাবু খুব খুশি হয়েছিলেন। মানববাবুর বক্তব্য ছিল, আধুনিক মানুষের মনে চিন্তার যে ক্যায়োটিক স্পেস থাকে, তার সঙ্গে তার ভাষার প্রত্যক্ষ মিলটা প্রকাশিত হওয়া জরুরি। মানববাবু অ্যাসথেটিক্সের এই যে রূপটা তুলে ধরতেন, তাঁর পড়ানোয়, তাঁর আলোচনায়, তাতে গর্ব হয় যে, এমন একজন শিক্ষক পেয়েছিলাম।

    মনে পড়ে যায়, ফেলুদার গল্পে সিধুজ্যাঠা যে মনের দরজা-জানলা খুলে রাখার কথা বলেছিলেন, তা যেন মানববাবুর সঙ্গেই মিলে যায়। অথচ, এমনিতে কথা কম বলতেন। অনেক সময় দেখেছি, কত লোক কথা বলছে, মানববাবু চুপ করে বসে। কিন্তু তাঁকে বলতে বললে, কী সুন্দরভাবে সিঁড়ির মতো করে লজিক সাজিয়ে নিজের মননে উপনীত হতেন। ক্যায়োটিক স্পেস থেকে এই লজিক্যাল উত্তরণের ধরনটাও তাঁর কাছ থেকে শিক্ষণীয় ছিল। পিজিতে উনি অনেক ক্লাস নিয়েছিলেন, ওনার প্রত্যয়, ওনার দৃঢ় মতামত, ওনার রসবোধ, ওনার মুখ টিপে হাসি এ সবই বিখ্যাত, কিন্তু এ সবের ওপরে আমাকে যেটা সব থেকে বেশি মুগ্ধ করত, তা হলো পড়াতে পড়াতে ওঁকে কোনও দিন নোট্‌স দেখতে হত না। পড়াতেন ছাত্র-ছাত্রীদের চোখের দিকে সোজা তাকিয়ে। কথাগুলো মর্মে ঢুকে যেত।




    মানবেন্দ্রবাবুর স্কেচ: হিরণ মিত্র
    থাম্বনেল গ্রাফিক্স: স্মিতা দাশগুপ্ত
  • বিভাগ : পড়াবই | ০৯ আগস্ট ২০২০ | ৮২৫ বার পঠিত
  • জমিয়ে রাখুন পুনঃসম্প্রচার
আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • | ১০ আগস্ট ২০২০ ১৫:২০96132
  • পড়ছি, ভাল লাগছে।
  • Tim | 2607:fcc8:ec45:b800:f4da:34a:419:f21a | ১০ আগস্ট ২০২০ ২০:৪৭96139
  • প্রত্যেকটি স্মৃতিচারণ থেকে এত সুন্দর সব টুকরো টাকরা উঠে আসছে! ভালো লাগলো।
  • শিবাংশু | ১৪ আগস্ট ২০২০ ১৪:১৫96237
  • শিক্ষকরা এভাবেই বেঁচে থাকেন কালান্তরের চ্যালেঞ্জ উপেক্ষা করে। মানববাবুর জঁরটা ছিলো আদিযুগের কৃষ্ণকমল ভট্টাচার্য বা হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর ঘরানার। যাঁদের ক্ষুধা কখনও নিবৃত্ত হয়না। লাভটা হয় আমাদের।
  • বোধিসত্ত্ব দাশগুপ্ত | 202.142.75.25 | ১৪ আগস্ট ২০২০ ১৭:১৭96240
  • 'খা'দবপুর প্রসঙ্গে একটা হিলারিয়াস গল্প শুনেছি , সত্যি মিথ্যা জানিনা।
    আপারেন্টলি একজন সিনিয়র অধ্যাপক-সম্পাদক একদিন মানব বাবু র ঘরে বসে তাঁর জন্য অপেক্ষা করছিলেন। ইতিমধ্যে এক নবীন ছাত্র ও স্যারের দেখা পাবার আশায় সেই ঘরে আসেন। এর পরে অপেক্ষারত দুই‌ সাক্ষাতপ্রার্থীর কথোপকথন শোনা যায় নিম্নরূপে ঘটেছিল:---
    প্রবীণ অধ্যাপক-সম্পাদক: আপনি কি মানবের ছাত্র?
    বিনীত নবীণ ছাত্র: আজ্ঞে হ্যাঁ।
    প্র.অ.স: মানবের কাছে কি পড়েন , ভাষা না সাহিত্য ?
    বি.ন.ছ: আজ্ঞে দুটিই।
    প্র.অ.স.: বাঃ,‌স্প্যানিশ ভাষা‌ বুঝি?
    বি.ন.ছ: আজ্ঞে।
    প্র.অ.স: (কাগজ কলম বাগিয়ে, তাতে বাংলায় 'মানব' লিখে ) আচ্ছা বেশ এটা কি লিখেছি বলুন তো।
    বি.ন.ছ(অবাক‌ হয়ে): আজ্ঞে স্যারের নাম।
    প্র.অ.স: আহা বানান উচ্চারণ করুণ।
    বি.ন.ছ.; (অবাক হয়ে) আজ্ঞে,‌ম এ আকার, দন্ত্য ন, ব। মা-ন-..
    প্র.অ.স: হয়নি, ক্লাশ বোধহয় নিয়মিত করা হয় না, এটা হবে, ম এ আকার, দন্ত্য ন,‌ব, "বানর"।
    (এর পরে দুজনেই খেয়াল করেন, পেছনে স্যার এসে উৎসুক মুখ করে শুনছেন, তবে দুজনের ই সাক্ষাৎ-উদ্দেশ্য সফল‌ হয়ে ছিল কিনা , সে ব্যাপারে
    কোন‌গল্প নেই।
আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত