• বুলবুলভাজা  আলোচনা  বিবিধ

  • করোনা সংলাপ - প্রথম কিস্তি

    স্বাতী ভট্টাচার্য্য লেখকের গ্রাহক হোন
    আলোচনা | বিবিধ | ১৭ এপ্রিল ২০২০ | ১৪০৪ বার পঠিত
  • জমিয়ে রাখুন পুনঃসম্প্রচার
  • করোনা সংলাপ ১

    আমাদের গ্রামে পঁচিশটা পরিবার দুদিন না খেয়ে আছে। ওদের রেশন কার্ড নেই, প্রধান ওদের সই করে কুপন দেয়নি, তাই রেশন তুলতে পারছে না। কেরোসিন নেই, গ্যাস কেনার পয়সা নেই, কাঠকুটো দিয়ে রান্না হচ্ছে, তাই এখানে গ্রামের লোকে একবেলা ভাত রাঁধছে। ভাত আর আলুসেদ্ধ খেয়েছে সবাই, এই পয়লা বৈশাখের দিনও। কলকাতার বাজারে নাকি লোকে তিন-চার হাজার টাকার ইলিশ কিনেছে আজ? সত্যি নাকি, দিদি? একজন গেছিল কলকাতার একটা বাজারে, সে বলল। আমরা গ্রামের লোকেরা না খেয়ে মরলে কলকাতার বড়লোকেরা কী খাবে? চাল-সব্জি কিছু ফলাতে তো পারবে না, ওরা তখন টাকা খাবে, কম্পিউটার খাবে, মাউস খাবে।

    [দক্ষিণ ২৪ পরগনার এক নারী সংগঠনের নেত্রীর সঙ্গে]
    (সঙ্গের ছবি ওই গ্রামের নয়)



    করোনা সংলাপ ২

    উত্তর ২৪ পরগনার গাইঘাটা ব্লকের সুটিয়া গ্রাম পঞ্চায়েতে থাকি। আমার বাড়ি থেকে কিছুটা দূরে, সিঙেরডাঙা গ্রাম আর সুটিয়া বাজারের মধ্যবর্তী জায়গায় রয়েছে আদিবাসী পাড়া। প্রায় ৭২টি পরিবারের বাস। বাসস্থান বলতে দু-একটা সরকারি প্রকল্পের পাকা বাড়ি ছাড়া সবই বাঁশের খুঁটির নড়বড়ে ঝুপড়ি। বেশির ভাগই দিনমজুর, এখন কাজ নেই। গ্রামে ঢুকলেই দেখা যাচ্ছে, চারিদিকে শুধুমাত্র একটু খাবারের জন্য যেন হাহাকার চলছে। এমন ১৬-১৭টা পরিবার দেখলাম, যারা রেশনের চাল ভিজিয়ে খাচ্ছে। কারণ খিদের জ্বালায় হাঁটা-চলার ক্ষমতাও তাদের নেই। রান্না করার কাঠ কুড়োতে যেতে পারছে না।

    [জ্যোতিপ্রকাশ ঘোষের সঙ্গে]
    (সঙ্গের ছবি ওই গ্রামের নয়)



    করোনা সংলাপ ৩

    আজ এক হোটেল বয়ের সঙ্গে দেখা হল। সে বলল, সাফানগর গ্রামে থাকি। ঘরে বিদ্যুৎ নেই। কেরোসিন নেই। ছোট ছেলে সারাবছর লন্ঠনের আলোয় পড়ে। এখন তেল নেই। তাই কটা মোমবাতি রেশন থেকে দিলে,ছেলেটা আমার পড়া লেখাটা ঠিকঠাক করতে পারত।

    তার ছেলে এখন ভোরে উঠে পড়াশুনো শুধু দিনের আলোতেই করছে।

    [দক্ষিণ দিনাজপুরের একটি জেলার সরকারি আধিকারিকের সঙ্গে]
    (সঙ্গের ছবি ওই গ্রামের নয়)



    করোনা সংলাপ ৪

    জলপাইগুড়িতে এক ভদ্রলোক এসেছেন। বড় কোম্পানিতে কাজ করেন, মাঝারি একটা হোটেলে ছিলেন। লকডাউন শুরু হতে হোটেল বন্ধ, তাঁকে বার করে দিয়েছে। তিনি এখন পাশে চায়ের দোকানে দুটো বেঞ্চি জোড়া করে রাতে শুচ্ছেন। দুদিন কেবল মুড়ি বিস্কুট খেয়ে ছিলেন, এখন আমরা খাবার দিচ্ছি। জলপাইগুড়ি আর হলদিবাড়ির ৩৮জন মনোরোগী আর ভবঘুরে, যারা রাস্তায় থাকে, তাদের যে খাবার বিলি করছি, সেই খাবারই দিচ্ছি। বুঝলেন, এই সময় টাকা থেকেও লাভ নেই।

    এই সেদিন ফোন পেলাম, জলপাইগুড়ি সদর হাসপাতালের চত্বরে রয়েছেন কোচবিহার কোর্টে প্র্যাকটিস করা এক উকিল। শিশুপুত্রকে নিয়ে স্ত্রী ভর্তি, দশ বছরের মেয়েকে নিয়ে তিনি হাসপাতাল চত্বরে দুদিন ধরে সামান্য শুকনো খাবার ছাড়া কিছু জোগাড় করতে পারেননি। "ওনাকে খেতে দাও, যত টাকা লাগে দেব," বললেন আমার পরিচিত। আমরা গিয়ে দেখি, দুর্বলতায় তাঁর হাত-পা কাঁপছে, ছোট মেয়েটি নেতিয়ে পড়েছে। আমরা জলপাইগুড়ি সুপারস্পেশালিটি হাসপাতালে রোগীর আত্মীয়দের রান্না-করা খাবার দিচ্ছি। এ বার সদর হাসপাতালেও কিছু দিন দিতে হল। আমাদের নীতি অনুসারে, সবই বিনা পয়সায়। এখন অন্য একটি সংস্থা সদর হাসপাতালে দিচ্ছে। এই মানুষগুলোর সঙ্গে টাকা থাকলেও খাবার কেনার উপায় নেই, সব দোকান বন্ধ। তাই বলছি, এখন টাকা থাকলেও লাভ নেই।

    [গ্রিন জলপাইগুড়ি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার অঙ্কুর দাসের সঙ্গে]



    করোনা সংলাপ ৫

    আমাদের গ্রামে অধিকাংশ লোকই পরিযায়ী শ্রমিক। কেউ কেউ মিডল ইস্টে যায়, বেশির ভাগ কেরল আর বম্বে। আমি একটা সরকারি ব্যাঙ্কের একটা কাস্টমার সার্ভিস পয়েন্ট চালাই গ্রামে। আটটার পরে খুলি। কদিন থেকে দেখছি, ভোর চারটে থেকে লোক লাইন দিচ্ছে। একশো, দুশো, পঞ্চাশ, যে যেমন পারছে তুলে নিচ্ছে। অ্যাকাউন্ট ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে, দেখতে পাচ্ছি। পাশের ই-ব্যাঙ্কিং সেন্টারে আরেকটা লাইন পড়ছে, জনধন অ্যাকাউন্টে পাঁচশো টাকা ঢুকলো কিনা চেক করার জন্য। সে লাইন ভাবতে পারবেন না, তিনশো-চারশো জন দাঁড়িয়ে থাকছে। পুলিশ দিয়ে লাইন সামলাতে হচ্ছে। লোকের হাতে আর টাকা নেই। যারা চেয়ে খায়, তারা তবু কিছু না কিছু পাচ্ছে। যারা খেটে খায়, তাদের অবস্থা এখন আরও খারাপ।

    [কান্দি ব্লকের মহলন্দী গ্রাম পঞ্চায়েতের এক বাসিন্দার সঙ্গে]
    (সঙ্গের ছবি ওই গ্রামের নয়)




    করোনা সংলাপ ৬

    বালুরঘাট ব্লকের কাশমুলাই গ্রামে মানুষ গাছের কচি পাতার দিকে তাকিয়ে আছে। কখন পাতা শুকিয়ে ঝরে পড়বে, তবে তাই দিয়ে রান্না হবে। রান্না কী হচ্ছে? ত্রাণ দিতে গিয়ে আমার বন্ধুরা দেখে এসেছে, গরু যে ঘাসপাতা চিবিয়ে খাচ্ছে, তাই সিদ্ধ করে গ্রামের মানুষ খাচ্ছে। মানুষ আর পশুর খাবার এক হয়ে গিয়েছে। গ্রামে বেশ কিছু আদিবাসী পরিবার, তাদের আধার, ভোটার কিচ্ছু নেই, রেশন কার্ডও না। এখন কুপন পেয়ে রেশনের দু কেজি চাল পেয়েছে। কিন্তু রাঁধবে কী দিয়ে, কাঠকুটো, শুকনো পাতা ছাড়া এখন আর কোনও জ্বালানি নেই এই গ্রামে।

    [বালুরঘাটের একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার সদস্যের সঙ্গে]
    (ছবিটি কাশমুলাই গ্রামের এক বৃদ্ধার)




    করোনা সংলাপ ৭

    ধুবুলিয়ার দিকে যাচ্ছিলাম, দেখি এক বৃদ্ধা দুপুর রোদে হাঁটতে হাঁটতে যাচ্ছেন। জাতীয় সড়ক দিয়ে হেঁটে হেঁটে কোথায় চলেছেন? হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন, নাতনির মুখে শুনেছেন, অ্যাকাউন্টে নাকি ৫০০ টাকা দিয়েছে সরকার। খোঁজ নিতে হাসাডাঙা থেকে ধুবুলিয়া সাত কিলোমিটার হেঁটে ব্যাঙ্কে যাবেন বলে বেরিয়েছেন পঁয়ষট্টি বছরের সনকা ঘোষ। কাঠফাটা রোদ থেকে বাঁচতে ময়লা আঁচলটা মাথায় জড়িয়েছেন। ঘরে পাঁচটা লোক, রেশনের দশ কেজি চাল ছাড়া কিছু নেই। রাজনৈতিক দলের লোকেরা কিছু পরিবারকে সাহায্য করেছে, কিন্তু সনকারা পার্টি করেন না, তাই পাননি কিছু। রাস্তায় তখন ট্রাক ড্রাইভারদের খাবার ও জল দেওয়া হচ্ছিল। সনকাদেবীকেও দেওয়া হল।

    [কৃষ্ণনগরের এক সাংবাদিকের সঙ্গে]
    (ছবিতে সনকা ঘোষ)




    [লেখাগুলি ফেসবুকে প্রকাশিত এবং লেখিকার অনুমতিক্রমে গৃহীত]

  • বিভাগ : আলোচনা | ১৭ এপ্রিল ২০২০ | ১৪০৪ বার পঠিত
আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • aranya | 162.158.63.11 | ১৮ এপ্রিল ২০২০ ০৮:৩৩92438
  • কি ভয়ংকর :-((
  • | ১৮ এপ্রিল ২০২০ ১৭:২১92464
  • প্রায় কাছাকাছি কিছু অভিজ্ঞতা হল মহারাষ্ট্রে। মুলশি পিরঙ্গুট চাকন - একই অবস্থা।

  • রৌহিন | 108.162.215.123 | ১৯ এপ্রিল ২০২০ ১৮:৩০92537
  • হ্যাঁ ভয়ঙ্কর ছাড়া কী বা বলতে পারি। ভয় এবারে সত্যিই পাচ্ছি - কোভিডকে না। মানুষকে
আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। লড়াকু মতামত দিন