ছোটোলোকের শেষবেলা :  মলয় রায়চৌধুরী

এক

       ছোটোবেলা আর যুববেলার সবকিছু পালটে গেছে ; ইমলিতলা পাড়ার গোলটালির চালাবাড়িগুলো হয়ে গেছে ইঁটের দাঁত বেরোনো একতলা-দুতলা । আমাদের বাড়িটা চেনা যায় না । সামনের লাল রোয়াক, যার ওপরে বসে কপিলের দাদু বাচ্চাদের গালাগাল শেখাতেন, সেখান থেকেই দেয়াল উঠে গেছে ; যারা থাকে, তারা উঠোনে গরু পুষেছে, দেয়ালময় ঘুঁটে দেয়া, খোলা ছাদ নেই, ঘর উঠে গেছে, বাঁদরগুলোর দল শহর ছেড়ে চলে গিয়ে থাকবে । কপিলের প্রজন্মের কেউ বেঁচে নেই, আর নতুন প্রজন্মের ছেলে-মেয়েরা আমার নাম জানে ভুখি পিঢ়ি আন্দোলনের সংবাদ পড়ে । গলির ভেতরের চালাবাড়িগুলোও ইঁটের ; সব নতুন মুখ । চোর-ডাকাতদের শুয়োর মারবার আর গাঁজার ঝোপের বস্তিতে উঠেছে একতলা বাড়ি । মহাদলিতদের পাড়া দখল করে নিয়েছে মধ্যবিত্ত মধ্যজাত চাকুরে পরিবার । কুলসুম আপাদের বাড়ি ভেঙে শিয়া মুসলমান চারতলা আবাসন , মহিলারা বোরখায় । নাজিম-কুলসুম আপারা অন্য কোথাও চলে গেছে । কুলসুম আপা, আভাসে মনে হলো, আরব দেশে চলে গেছেন । মসজিদটায় কেউ আর খেলতে ঢোকে বলে মনে হলো  না, কেমন যেন ঘিঞ্জি আর নোংরা, যদিও বিশাল মিনার উঠেছে । ইমলিতলায় বাবা-জেঠার প্রজন্মের কেউই নেই, আমার প্রজন্মেরও কেউ নেই । পুরোপুরি অপরিচিত আমার নিজের ছোটোবেলার পাড়া ।

          ছোটোবেলার ব্রাহ্ম স্কুল রামমোহন রায় সেমিনারি হয়ে গেছে বিশাল, ইউনিফর্ম পরতে হয় ছাত্রছাত্রীদের, দুটো শিফট হয়, বাংলামাধ্যম উঠে গেছে, ব্রাহ্ম ধর্মের প্রভাব ফুরিয়ে গেছে ; ব্রাহ্ম কবি-লেখকদের বাংলা বই আর সম্পাদিত পত্রিকাগুলো আর নেই । পাটনা বিশ্ববিদ্যালয়েও বাংলা বিভাগ আছে কেবল পিএইচডি করার জন্য ।

          যুববেলার দরিয়াপুরও পালটে গেছে, আমাদের বাড়িটা তিনতলা পর্যন্ত দাদার বড়ো ছেলের ফোটোর জিনিসপত্রে ঠাশা, এখন বাবার স্টুডিও নেই, ক্যামেরায় ফোটোতোলার দিনকাল বিদায় নিয়েছে, ছোটো ক্যামরাও লাখ খানেকের বেশি দাম, বেশির ভাগ কাজ কমপিউটারে। বাবা এই পরিবর্তন দেখে যেতে পারলেন না । সামনের বারান্দা ভেঙে ফেলা হয়েছে । ওই বাড়িতে দাদার ছেলে থাকে না । শশুরের দেয়া ফ্ল্যাটে কদমকুঁয়ায় থাকে । আমার আর ছেলে-মেয়ের কোনোকিছুই সেখানে নেই। পাশের চুড়িঅলা, যার কাছে মা মুর্গি রাঁধতে শিখেছিলেন, জায়ফল দিয়ে, তার পরিবার চলে গেছে পাকিস্তানে । চুড়ির দোকানের ওপরে শিখ সরদার থাকতেন, যিনি প্রতি রাতে একজন বেশ্যাকে নিয়ে ফিরতেন, তিনি বহুকাল আগে মারা গেছেন । বাড়ির মালিক, যার পাশেই ছিল বাঁশের আড়ত, চারতলা বাড়ি তুলে ভাড়া দিয়েছে । সামনের কবরমাঠের জায়গায় সুন্নি মুসলমানদের বাড়ি আর দোকান । আল্লু মিয়াঁ আর ওর বারবার বিয়ে-দেয়া মেয়েদের খবর জানে না কেউ ।

        উত্তরপাড়ার সাবর্ণভিলা ভেঙে আবাসন তৈরি হয়েছে । আমি, দাদা, বড়দি, ছোড়দি, ডলি, মনু আমাদের অংশ বিক্রি করে দিয়েছি । যারা থাকে তারা আমার দুর্নামের সঙ্গে পরিচিত বলে দেখতে এসেছিল । আমি কাউকেই চিনতে পারলুম না । কাকাবাবু, মানে বিশেখুড়োর কোতরঙের জমিজমা আর বাড়ি বেচে দিয়েছে ওনার পোষ্যকন্যা ; কে জানে কোথায় চলে গেছে ! পাণিহাটিতে মামার বাড়ির অর্ধেকের বেশি, পুকুর আর জমিজমাসুদ্দু, বেচে দিয়েছিলেন ছোটোমামা ; সেই জায়গায় আবাসন উঠেছে । ‘নিলামবাটি’ লেখা পাথরটা আছে, একটা বাড়ির দরোজার সামনে, কিন্তু সেটায় দাদামশায় থাকতেন না । দাদামশায় যে সমবায় ব্যাঙ্ক প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, সেখানকার দেয়াল থেকে ওনার ফোটো গুদামঘরে চালান করা হয়েছে । পাণিহাটির মোচ্ছবতলা, চৈতন্যদেব বিশ্রাম নিয়েছিলেন বলে খ্যাত, এখন মনে হয় বোষ্টমদের নিয়মিত উৎসবের প্রাতিষ্ঠানিক জমঘট।  এখন পাণিহাটি থেকে ভুটভুটি যায়, কেবল ওপারে কোন্নোগরে নয়, বিভিন্ন জায়গায় ।  ছোটোবেলায় দাঁড়-বাওয়া নৌকো করে কোন্নোগর থেকে পাণিহাটি যেতুম । কোন্নগরে বড়জেঠিমার বাপের বাড়িতে কেউই আর নেই, তবে জগদ্ধাত্রী বারোমেসে মন্দির আছে ; সেখানকার কেউই চিনতে পারলো না আমাকে । ওনারাও অনেকটা জমি বিক্রি করে দিয়েছেন, যার ওপর আবাসন উঠেছে । বড়োজেঠিমার ভাইঝি আলো, সুন্দরী বলতে যা বোঝায়, তাইই ছিল, দাদা বিয়ে করতে চায়নি, কেননা দাদা চাইবাসায় এক বিবাহিতা যুবতীকে ভালোবাসতো, পরে যার এক বোনকে দাদা বিয়ে করেছিল -- ব্যাপারটা আছে শক্তি চট্টোপাধ্যায়-এর উপন্যাস ‘কিন্নর কিন্নরী’তে ।

         আমি নাকতলার ফ্ল্যাট বিক্রি করে চলে এসেছি মুম্বাই । ওই পাড়ায়, ওই ফ্ল্যাটে, ওই পরিবেশে জীবন কাটানো, এই বয়সে অসম্ভব হয়ে গিয়েছিল ।ছেলের এক বেডরুম ফ্ল্যাট আছে মুম্বাইতে । বুড়ো-বুড়ি চালিয়ে যাচ্ছি যেমন-তেমন ।  দাদা মারা গেছে । দাদার সাহিত্যিক বন্ধুরাও মারা গেছে । আমার ছোটোবেলার স্কুলের বন্ধু সবাই মারা গেছে, তরুণ শুর যুববেলাতেই লিউকোমিয়ায় মারা গিয়েছিল, বারীন গুপ্ত মারা গিয়েছিল মাথায় রক্তক্ষরণের দরুণ, সুবর্ণ উপাধ্যায়-এর সঙ্গে শেষ দেখা কলকাতায় পাঁচ বছর আগে - প্রোস্টেটের ভুল অপারেশনে রক্ত ঝরে, বলেছিল বেশিদিন বাঁচবে না । স্কুলের বন্ধু রমেণ ভট্টাচার্য আর অনিমেষ গুপ্ত নাকতলার কাছেই থাকতো, বাঁশদ্রোণী বাজারে দেখা হতো প্রায়ই, শুনেছি মারা গেছে । যুববেলার কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের মাত্র কয়েকজন টিকে আছে । সাহিত্যিক সঙ্গীদের মধ্যে টিকে আছে সুবিমল বসাক, প্রদীপ চৌধুরী, সুবো আচার্য, দেবী রায় আর ত্রিদিব মিত্র-আলো মিত্র।সুবিমল মাঝে-মধ্যে ফোন করে । স্ত্রী মারা যাবার পর সুবো আচার্য পুরোপুরি অনুকূল ঠাকুরের আশ্রমের সেবায় লেগে আছে ; ‘নারী নরকের দ্বার’ বলে ছেলেদের বিয়ে দেয়নি । প্রদীপের স্ত্রী মারা গেছে ; প্রদীপের দুটো চোখই খারাপ । ত্রিদিব বাড়ি করেছে হাওড়ায় । সুবিমল বাড়ি করেছে বেলঘরিয়ায়, দুই ছেলে, নাতি-নাতনি নিয়ে থাকে । দেবী রায় ফ্ল্যাট কিনে হাওড়ায় কোথাও থাকে ; স্ত্রী মারা যাবার পর সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। শৈলেশ্বর ঘোষ অপারেশান থিয়েটারে মারা গেছে, ওর স্ত্রী, মেয়ে-জামাই সবাই মারা গেছে, সুন্দর বাংলোবাড়ি একেবারে ফাঁকা, ভুতুড়ে । সুভাষ ঘোষ মারা গেছে ; এখন বাড়িতে ঢুকতেই সামনে সুভাষের বিশাল ফ্রেমে বাঁধানো ছবি, আগে ছিল জ্যোতি বসুর ছবি ।অবনী ধর আর বাসুদেব দাশগুপ্ত অশোকনগরে মারা গেছে । অরুণেশ ঘোষ জলে ডুবে মারা গেছে ; হয়তো আত্মহত্যাও করে থাকতে পারে । অনিল করঞ্জাই আর করুণানিধান মুখোপাধ্যায় মারা গেছে দিল্লিতে । উত্তরবঙ্গের হাংরি আন্দোলনকারী অলোক গোস্বামী আর রাজা সরকার কলকাতায়, দেবজ্যোতি রায় উত্তরবঙ্গেই আছে। ত্রিপুরা থেকে অরূপ দত্ত চলে এসেছে কলকাতায় ।

          বড়দি-ছোড়দির বিশাল জমিদারি বাড়ি, ‘সিলভ্যান হাউজ’, গেট দিয়ে ঢুকতেই দুইধারে ছিল বকফুল গাছের সারি, ফুলের বাগান, সব উধাও । সেখানে বিশাল আবাসন উঠেছে ।  কোটিপতি হয়ে ভাগ্নে পাটনা ছেড়ে চলে গেছে বিহারের বাইরে, লালু যাদবের স্যাঙাতদের কিডন্যাপগ্যাঙের ভয়ে । ভাগ্নি জয়ার ছেলে, রবীন্দ্রসঙ্গীতের চ্যানেল চালায়, নিজেও ভালো গায় ।

        পিসেমশায় তিনকড়ি হালদার, ওনাকে নিয়ে আমার একটা গল্প আছে “অপ্রকাশিত ছোটোগল্প” বইতে, আহিরিটোলার বাড়ি শরিকরা বিল্ডারকে দিয়ে দেবার ফলে ওই বাড়ির ছাদ থেকে লাফিয়ে আত্মহত্যা করেন, পকেটে যে চিরকুট পাওয়া গিয়েছিল তাতে লেখা, “আনন্দধারা বহিছে ভূবনে” । পিসেমশায়ের ছেলেদের ঠাকুমা একটা জমি দিয়েছিলেন হিন্দমোটরে, সেখানে ভাইয়েরা একটা করে ঘরে থাকে, আর আরেকটা ঘর রান্নার কাজে লাগে । সবচেয়ে বড়ো ভাই অজয় হালদার মানে সেন্টুদার বিয়ে দিয়েছিল দাদা দ্বারভাঙ্গার এক ঘি ব্যবসায়ীর মেয়ের সঙ্গে ; ঘি আর দিশি বিহারি মদ ঠররা খেয়ে ঘরজামাই সেন্টুদা সেখানেই মারা গেছে । পরের দিকে দাদার সঙ্গে কোনো কারণে সেন্টুদার বনিবনা ছিল না বলে পাটনায় এলে সেন্টুদা উঠতো দিদিদের বাড়ি । ছোটোবেলা আর যুববেলার কলকাতার বহু রাস্তার নাম পালটে গেছে, মামলার সময়ে ঘুরে বেড়াতুম সেই সব রাস্তায় ।

        নাগপুরে শশুরবাড়িও ভেঙে ফেলে তার মুসলমান মালিক, আমার মামাতো শালাদের মোটা টাকা দিয়ে, সেখানে হজ যাত্রীদের জন্য আশ্রয় তৈরি করছে, পাশেই নিজের জমিতে বিশাল মসজিদ তুলেছে যাতে এক সঙ্গে এক হাজার মানুষ নামাজ পড়তে পারে । আমার স্ত্রীর এক মুসলমান বন্ধু, প্রতিবেশি বাড়ির মেয়ে, হিন্দু যুবককে বিয়ে করে নাম পালটিয়ে মুম্বাইতে নাতি-নাতনিদের সঙ্গে থাকে । যে শালির আমি পাটনায় বিয়ে দিয়েছিলুম, সে, তার স্বামী পরপর মারা যাবার দরুন তাদের লেক গার্ডেনসের বাড়ি ভেঙে ফেলে ফ্ল্যাটবাড়ি উঠছে । 

দুই

 

         আজকে, এখন, মুম্বাইতে এসে, আয়না দেখা ছেড়ে দিয়েছি, বাইরে বেরোলেও চুল আঁচড়াই না,  পায়জামায় পেছনদিকে ছেঁড়া থাকলেও তাই পরেই বেরোই, কেননা কেউই আমার পেছন দিকে তাকানো দরকার মনে করে না,  নিঃসঙ্গতা আর একাকীত্বের গাড়ি পার্ক করার বেসমেন্টে অটোরিকশায় বসে টের পাচ্ছি যে স্মৃতি একেবারে ধুলোপড়া ত্যাবড়ানো,  স্ফটিক-স্বচ্ছ নয়, আমার, আমার আসেপাশের মানুষদের, অনেকের দেহে শ্মশানে জলভরা হাঁড়ি পড়ার শব্দসহ, বিজলি-চুল্লীতে চর্বি ফাটবার শব্দসহ, হুকবোতামের ছেদ-যতি-সেমিকোলনসহ, বয়স্ক-অল্পবয়স্ক ঘটনা নিজস্ব চরিত্র নিয়ে  উদয় হচ্ছে, আর যা ভুড়ভুড়ি কেটে ভেসে উঠছে, সেগুলোই, তড়িঘড়ি, উবে যাবার আগে, লিখে ফেলব, শাড়ির ভাঁজে পাট করে রাখা সুমিতা চক্রবর্তীর গ্রীষ্মশীত, রাতে ওনার বাগানের গাছেরা নিজেদের পরিচর্যা করতো, আমি ওনার সাম্যবাদী কিউবার লঝঝড় মোটরগাড়িতে, “আমি তোর অ্যামেচার বান্ধবী” ; তারপর যখন বুড়ি থুথ্থুড়ি, “কলকাতায় সবাই পার্টিকর্মী, দৃশ্য বা অদৃশ্য ঝাণ্ডা হাতে।” “শুধু কমিউনিস্টরাই বলতে পারবে কেন কমিউনিজম ফেল মারলো।” “মানববোমারা মরতেই থাকবে, এর আর শেষ নেই, দেখেনিস ।” “হিরোহিতোর সঙ্গে হ্যাণ্ডশেক করুন বা হিটলারের সঙ্গে, সুভাষচন্দ্র বোস আমার হিরো, আমার স্বপ্নের প্রেমিক ।” “লিখতে বসে সবচেয়ে আগে ভুলে যাবি তোর স্কুল-কলেজের ভাষা-শিক্ষকদের, নয়তো এগোতে পারবি না ।”  “বাঙালি মার্কসবাদীরা, যারা নিহিলিজমের বিরোধিতা করতো, তারাই পশ্চিমবঙ্গে নিহিলিজম ডেকে আনলো।” “অনুসরণকারীরা পিঠে ছোরা মারে কেন জানিস ? তারা তো পিছন থেকে অনুসরণ করে।” “ভিতুরা ভয়ার্ত কবিতার তত্ব বানায় আর সেই তত্বকে সমর্থন করে পরাজিতরা।” “আত্মহত্যার কোনো কারণ হয় না।” এখন একমাত্র রুটিন হল রাতে টয়লেটে পেচ্ছাপ করতে যাওয়া, প্রস্টেটের ঘড়িধরা চাপে ।

         নাড়ি তৈরির ম্যাজিক শুধু নারীই তো জানে। সেক্স করার সময়ে বার বার “আই হেট ইউ” বলার উপাদেয় রহস্য । আমি আগের জন্মে ঘুর্ণিঝড় ছিলুম পরের জন্মে গোরস্হান হবো ।   বহু ঘটনা পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে যাবে, যেতে দিতে হবে, পাশাপাশি গুরুত্বহীন ঘটনা হঠাৎই ঘা দিয়ে নিজেকে জাহির করবে , যাই হোক, সময়ের ধ্যাবড়া অনুক্রম জরুরি বলে মনে হয় না  । চাকুরিসূত্রে ভারতের এতো গ্রাম আর শহর ঘুরেছি যে হাতির পিঠে চেপে কোন গ্রামে গিয়েছিলুম, কোথায় উটের দুধ খেয়েছিলুম যেমন স্মৃতি থেকে ঝরে গেছে, তেমনই কোন নদীর পাশ দিয়ে মাথার ওপর ট্যুরের ক্যাঁদরা চাপিয়ে কোন গঞ্জে গিয়েছিলুম, মনে করতে পারি না, অথচ ঘটনাগুলো ঝাপসা হয়নি আজও ; অমন অজস্র টুকরো-টাকরা, বহুগ্রাম জলহীন বলে কেমন করে শিখে গিয়েছিলুম টয়লেট পেপারের রোল সঙ্গে রাখতে, আলের ওপরে বসে হাগতে, জল না খেয়ে বহুক্ষণ টিকে থাকতে । কে বলেছিল, “মাতৃভূমিতে শুধু গরিবরাই মরে?” মনে নেই । কে বলেছিল, “রাস্তার কুকুরদের কান নিয়ে জন্মেছিস?” মনে নেই । কে বলেছিল, “তুই বামপন্হী? শুনলেই সন্দেহ হয় তোর বাপ সোভিয়েত রুবল খেয়েছে !” মনে নেই । কে বলেছিল, “তোর ডানদিকে সিঁথে কাটা উচিত।” মনে নেই । কে বলেছিল “ঈশ্বরপ্রদত্ত বলে কিছু হয় না ?” মনে নেই । কে বলেছিল, “রাষ্ট্র চিরকাল লিবার্টি ইকুয়ালিটি ফ্র্যাটারনিটির বিরোধিতা করবে”, মনে নেই । কে বলেছিল, “লাথি না খেলে বিজ্ঞ হওয়া যায় না”, মনে নেই। কে বলেছিল, “ফাংশানাল লিঙ্গ না থাকলে জিনিয়াস হওয়া যায় না”, মনে নেই।       

          ১৯৬৪ সালে যখন পুলিশ কমিশনারের কাছে জানতে পারলুম যে আমার বিরুদ্ধে নালিশকারীদের তালিকায় সন্তোষকুমার ঘোষ আর আবু সয়ীদ আইয়ুব আছেন, শুনে বুঝতে পারলুম যে ছিপে ঠিক-ঠিক বঁড়শিই বেঁধেছি ।  ১৯৬২ সালে কলেজ স্ট্রিটে একটা মিছিলে উৎপল দত্তের হাতে হাংরি বুলেটিন দিতেই উনি আঁৎকে বলে উঠলেন, “হাংগরি জিন্নাড়িশন”, লিফলেটটা দুমড়ে ফেলে দিলেন রাস্তায়, দেখে, অন্য একজন মিছিলকারী সেটা তুলে পড়তে আরম্ভ করলে, চেয়ে নিয়ে বললুম, আপনার জন্যে নয় ।     ১৯৬৩ সালে গল্পকার শান্তিরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাওড়ার বাড়িতে গিয়েছিলুম । বললেন, “ওহে, একেবারে তোলপাড় করে ফেলেছ যে, ক্ষমতাবানদের চটিয়ে দিচ্ছ, তারা তোমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র চালাচ্ছে, জানো কি ?” বলেছিলুম, যা করার তা তো করে যেতে হবে, ডিরোজিও তো যা করার তাই করে গেছেন। জানি না কলেজ স্ট্রিটের প্রকাশকরা কেন শান্তিরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়কে চেপে দিলে । উদয়ন ঘোষ, শান্তি লাহিড়ির মতন ওনারও দুর্বলতা ছিল সন্দীপন, শক্তি, সুনীলের সঙ্গে চিপকে থেকে  আনন্দ পাবার ।

          ১৯৭১ সালে শঙ্খ ঘোষ একটা  প্রবন্ধ লিখেছিলেন, “শব্দ আর সত্য” শিরোনামে, ১৯৭১ সালে, রিমেম্বার ১৯৭১ সালে । কী লিখেছেন শুরুতেই তাঁর সাহিত্যিক-রাজনৈতিক গদ্যে ? লিখেছেন, রিমেম্বার ১৯৭১ সালে, যে, “কবিতা লেখার অপরাধে এই শহরের কয়েকজন যুবককে যে একদিন হাজতবাস করতে হয়েছিল, এটা আজ ইতিহাসের বিষয়।”  ২৮ ডিসেম্বর ১৯৬৫ সালে আমার এক মাসের কারাদণ্ডের আদেশ হয়ে গিয়েছিল তা উনি ১৯৭১ সালে জানতেন না ! পঁয়ত্রিশ মাস ধরে আদালতের চক্কর কাটতে হয়েছিল, তা উনি ১৯৭১ সালে জানতেন না, জানতেন কেবল একদিনের হাজতবাস । কী বলব ? হাংরি আন্দোলনের যাঁরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করেছেন, আবু সয়ীদ আইয়ুবের পর শঙ্খ ঘোষ, আর বাহুল্য বলা, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের নাম করতে হয় । শঙ্খবাবু  শৈলেশ্বর ঘোষকে টেনে নিয়ে গেছেন প্রতিষ্ঠানের কয়েদখানা বাংলা অ্যাকাডেমিতে । শঙ্খবাবুর সঙ্গে আমার একবারই দেখা হয়েছে, ওই বাংলা অ্যাকাডেমিতেই, হ্যাণ্ডশেকের জন্যে হাত এগিয়ে দিয়ে বলেছিলুম, আমার নাম মলয় রায়চৌধুরী, শুনে, নিজের কানে মনে হল যেন বলছি, আমি মিশরের ফ্যারাও দ্বিতীয় র‌্যামাসেজ । আর সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় আমেরিকায় বসে ভাবছিলেন মলয়টা কলকাতার সবকিছু লুটেপুটে খেয়ে ফেললো আর আমেরিকা থেকে ফিরে ‘আত্মপ্রকাশ’ নামে একটা তড়িঘড়ি উপন্যাস লিখেছিলেন সাগরময় ঘোষের হুকুমে যাতে ভয়ের চোটে লেখেননি যে বেশ্যালয়ে গিয়ে কী করতেন আমি কিন্তু উকিলের জানলা দিয়ে দেখেছি ষাটের দশকে পুরো কৃত্তিবাসের দল ঢুকছে অবিনাশ কবিরাজ লেনে, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় শকুনের কাঁধ উঁচু করে ।

          ১৯৭২ সালে, চেন্নাইয়ের গিণ্ডিতে একটা জ্যান্ত কেউটে সাপকে আমার হাতে জড়াতে দিয়েছিল পার্ক কর্তৃপক্ষ, ওঃ কি ঠাণ্ডা, নিজের সম্পর্কে ইপিফ্যানির গর্ব হয়েছিল । তারপর একটা পাইথনকে গলায় ফেলে দিল উত্তরীয়ের মতন করে, কী যে আনন্দ হয়েছিল, এই হল আমার সম্বর্ধনার সত্যিকারের উত্তরীয় । আমার অ্যাসিস্ট্যান্ট বলেছিল, ব্রাহ্মণ হয়ে জ্যান্ত সাপে হাত দিলেন, দেখুন বংশরক্ষা হয় কিনা । কী করেই বা কারাগারে আটক সাপদুটোর বংশরক্ষা হবে, বললুম তাকে, ছোবল দিয়ে ।    ১৯৭৫ সালে ফালগুনী রায়ের সঙ্গে শেষবার দেখা । পাটনায় অফিসে এসেছিল, তখন আমার লেখালিখি আঙুল ছেড়ে উধাও, বলল, সবাই আলাদা হয়ে গেছে, ও এখন দীপক মজুমদারের সঙ্গে, মাদক আর সোনাগাছি নিয়ে ভালোই আছে । হাংরি আন্দোলনের সময়ে প্রায়ই পাটনায় আসত ফালগুনী, ওর জামাইবাবু ছিলেন আমার ইকোনমিক্সের অধ্যাপক, অত্যধিক মোটা আর বেঁটে, রিকশায় চাপার আগে নাড়িয়ে দেখে চাপতেন, তা দেখে হাসতুম বলে চটা ছিলেন আমার ওপর, ফালগুনীর দিদি এসে আমার মাকে বলে গিয়েছিলেন যে, আমি ফালগুনীকে কুপথে নিয়ে গিয়ে নষ্ট করে দিয়েছি । ফালগুনীর প্রেমিকার বিয়ে হয়েছিল পাটনায়, ওর জামাইবাবুর বাড়ির কাছেই প্রেমিকা থাকতো লোহানিপুর পাড়ায় । আমরা দুজনে পাটনার গুলফি ঘাটে গিয়ে কিংবা গোলঘরের ওপরে বসে সরকারি দোকান থেকে কেনা গাঁজা-চরস ফুঁকতুম, মহেন্দ্রুঘাটে বসে ঠররা খেতুম । ফালগুনীর মৃত্যুর খবর পেয়েছিলুম লখনউ থাকতে ।

          ১৯৮৯ সালে মেয়ে অনুশ্রীর গোদরেজ টাইপরাইটার খারাপ হয়ে যেতে অনেক খুঁজেপেতে একজন মেকানিকের বাড়ির ঠিকানা পেয়েছিলুম । তখন থাকতুম সান্টাক্রুজে আর মেকানিক থাকতেন জুহুর গোয়ানিজ কলোনিতে । এখন অবশ্য সেই সান্টাক্রুজ-জুহু আর নেই, ধনীদের বিশাল অট্টালিকা আকাশে উঠে গেছে সর্বত্র। মেকানিকমশায়  যেদিন সারিয়ে দেবেন বলেছিলেন, সেই দিন আমি টাইপরাইটারটা নেবার জন্যে ওনার কুঁড়েঘরে গিয়ে অপেক্ষা করছিলুম, ওনার বুড়িবউ বললেন, এক্ষুনি এসে যাবে । আমার মুখ দাড়ি-গোঁফে ঢাকা, নাম এম আর চৌধারী । গাউনপরা বিশালবপু বুড়ি চুপচাপ বসেছিলেন । সামনের বাড়িতে গিটার বাজিয়ে হইচই গান গাইছিল যুবক-যুবতীরা । গোয়ানিজ বুড়ি হঠাৎ বলে উঠলেন, “এই প্রটেস্ট্যান্টগুলো আর হিন্দুগুলো, অত্যন্ত নোংরা আর ডিসিপ্লিনহীন, তাই তো দেশটার এমন অবস্হা, যখন ব্রিটিশরা ইনডিয়ায় ছিল আর পোর্তুগিজরা গোয়ায় ছিল তখন এদের এরকম দৌরাত্ম্য ছিল না ।” নিজেকে ফাঁস করলে বুড়ি মুষড়ে পড়বে ভেবে মুখ বুজে রইলুম ।     ২০০০ সালে কাণ্ডিভিলি মুম্বাইতে হার্ট অ্যাটাকের পর প্রতিদিন সকালে জগার্স পার্কে হাঁটতেযেতুম, সেখানে লাফটার ক্লাবের বুড়ো সদস্যদের সঙ্গে পরিচয় হল । সকলের মতন আমিও ওয়ান টু থ্রি হলেই ওপরে দুহাত তুলে জোরে-জোরে অকারণে হাসতুম, এছাড়া আর বুড়ো বয়সে হাসির সুযোগ নেই । একজন গুজরাটি আমার সঙ্গেই ফিরতেন, কী করেন জিগ্যেস করতে বলেছিলুম অবসর নিয়েছি, যা পেনশন পাই তাতেই চালাই। উনি কী করেন জিগ্যেস করতে বললেন যে, “সকালে-বিকেলে ক্লায়েন্টদের কুকুর হাগাতে নিয়ে যাই আর রাতের বেলায় মদ খেয়ে কবিতা লিখি, মাসে পঞ্চাশ হাজার হয়ে যায়।”

         —কুকুর হাগাতে ?

         —হ্যাঁ, কারোর তো সময় নেই, সবাই এ-শহরে টাকার ধান্দায় ছুটছে ।

         —আপনি তাদের কুকুরগুলোকে  সকাল-বিকেল হাগাতে নিয়ে যান ?

         —হ্যাঁ, সকাল পাঁচটা থেকে শুরু করি । কোন কুকুর কখন হাগতে প্রেফার করে প্রথম কয়েক দিনেই জেনে যাই, ক্লায়েন্টরাও আইডিয়া দেন ওদের হাগবার-মোতার সময়ের ।

         —কিরকম চার্জ করেন ?

         —কুকুরের ব্রিডের ওপর নির্ভর করে । রটউইলার হলে হাজার পাঁচেক প্রোপোজ করি, তারপর তিন হাজারে সেটল করি । অন্য ব্রিডের হলে কম নিই । তবে আমি নিজেকে ডগ ট্রেনার বলি, কুকুরগুলোকে আধঘণ্টা খেলাতেও হয় ।

        —একদিন আপনার কবিতা শুনব ।

        —আসবেন, ড্রিংক করেন তো ?

        —না, আপাতত বন্ধ, হার্ট অ্যাটাক থেকে সবে উঠেছি ; হার্ট অ্যাটাকের সময়েও হাগা পায়, বীর্য বেরিয়ে আসে । আত্মহত্যাকারীদের যেমন হয়, গু আর বীর্য বেরিয়ে আসে । আত্মহত্যাকারিনীদের কি কিছু বেরিয়ে আসে ?

         কুকুর হাগানোর সঙ্গে কবিতার যোগাযোগ আছে জেনে বেশ ভাল্লাগলো । কবিদের রেটও ব্রিড অনুযায়ী।

তিন

          ২০০৭ সালে আমস্টারডমের ডি ওয়ালেন খালপাড়ে গাইড মিস মারিসকা মাজুরের সঙ্গে আমরা একদল বিদেশী পর্যটক বেশ্যালয় দেখতে বেরিয়েছিলুম । মারিসকা এককালে নিজেও যৌনকর্মী ছিলেন । রেড লাইট শব্দটা এই বেশ্যালয় থেকেই ছড়িয়েছে । নেপোলিয়ানের আইনি অনুমতিপ্রাপ্ত বেশ্যালয়, মানুষের চেয়েও বড়ো কাচের শোকেসে লাল আলো জ্বেলে অপেক্ষা করছেন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে এসে জড়ো হওয়া যৌনকর্মীরা, রেট, সময় এবং পদ্ধতি বাঁধা ; তার বাইরে কিছু করতে চাইলে দরাদরি করতে হবে । প্রতিটি ঘরে লাল আলো । যে ঘরে নীল রঙের আলো সেঘরে অপেক্ষা করছে পুরুষ যৌনকর্মী । খালপাড়ে নানা রকমের যৌনকর্মের আর যৌনবস্তুর দোকান, ঘুরে-ঘুরে দেখলুম । চাবুক, চেস্টিটি বেল্ট, লিঙ্গের আকারের সিটঅলা সাইকেল, পর্নোগ্রাফির বই আর ফিল্ম, গাঁজা ফোঁকার দোকান, আবসাঁথ খাবার রেস্তরাঁ ইত্যাদি । দেখতে-দেখতে এগোচ্ছিলুম । হঠাৎ একজন মধ্যবয়সী হোঁচোট খেয়ে পড়ল আমাদের সামনে, ওপরে মুখ তুলে চলার ফল । মারিসকা মাজুর তাকে দুহাত ধরে টেনে তুলে দেখালেন রাস্তার ওপর ব্রোঞ্জের একটা ভাস্কর্য, অজস্র মানুষের চলার দরুণ চকচকে হয়ে গেছে । ভাস্কর্যটা হলো একজন পুরুষের ডান হাত একটি যুবতীর বাঁদিকের মাই টিপছে, ব্যাস ওইটুকুই, হাত আর একটা মাই । মারিসকা বললেন, আগে এই ভাস্করের নাম জানা যায়নি, এখন জানা গেছে ওনার নাম রব হজসন, লুকিয়ে ভোররাতে পুঁতে দিয়ে গেছেন।           

        ১৯৬১ সালে একবার খালাসিটোলায় পাশের লোকটা হাতে গেলাস নিয়ে কাঁদছিল দেখে আমারও কান্না পেয়ে গিয়েছিল ; পিসেমশায় খালাসিটোলায় গেলে নির্ঘাৎ কাঁদতেন, মা ওগো মা, বলে বলে কাঁদতেন; তারপর যেতেন সোনাগাছি । আমিও কেঁদে নিয়েছিলুম, পিসতুতো দাদা সেন্টুদার সঙ্গে অবিনাশ কবিরাজ লেনে  গিয়েছিলুম; সেন্টুদা বলেছিল, এখানেও স্কুল ফাইনাল, বিএ, এমএ করতে-করতে এগোতে হয়, সব শিখিয়ে দেবো তোকে, নিরোধ জানিস তো নিরোধ, সঙ্গে নিয়ে আসবি, ঠোঁটে চুমু খাবি না, ওখানে চাটবি না, দিনে-দিনে আসবি, দিনে-দিনে চলে যাবি, কেউ দেখতে পাবে না, রেটও দুপুর বেলায় হাফ, তখন কেউ শ্যাম্পু করা চুল আঁচড়ায়, কেউ পায়ের নখে নেলপেলিশ লাগায়, কেউ বারান্দায় বসে হাই তোলে, দিল খুশ হয়ে যাবে, ইচ্ছে করলে তুই পায়ে নেলপালিশ লাগিয়ে দিতে পারবি, চুল আঁচড়ে দিতে পারবি, এমনকি সেক্স করার আগে যদি গিল্টি ফিল করিস তাহলে সিঁথিতে সিঁদুর পরিয়ে দিতে পারবি, কালবৈশাখির ঝড় উঠলে আহিরিটোলা ঘাটে নেমে দুজনে চান করার ভান করতে পারবি ।     ১৯৬৪ সালে যখন হাংরি মামলায় গ্রেপ্তার হলুম তখন বড়োজেঠিমা বলেছিলেন, যারা পরীর গপপো জানে, যারা দত্যিদানোর গপপো জানে, যারা পুরাণের ভগবানদের গপপো জানে, তাদের কাছে নোংরা বই,  নোংরা গপপো বলে কিছু হয় না, কোনো বইকেই অচ্ছেদ্দা করা উচিত নয়, পুরাণের গপপো পড়লেই জানা যায় আমরা কোনো একজনের মতন ওই সব গপপোতে লুকিয়ে আছি, আমরা কি মহাভারতের গল্পতে নেই ? আছি, আছি রে আছি ।

          ১৯৬৩ সালে অ্যালেন গিন্সবার্গ যখন পাটনায় আমাদের বাড়িতে ছিল, একটা শতচ্ছিন্ন বই পড়তে দিয়েছিল, ওর পড়া হয়ে গিয়েছিল বইটা, “জার্নি টু দি এন্ড অফ দি নাইট”, লুই ফার্দিনাঁ সেলিন-এর লেখা, কালো রঙের মলাট, দারুন উপন্যাস। পরে সেলিন সম্পর্কে খোঁজখবর করে জানতে পেরেছিলুম যে লোকটা ঘোর ইহুদি-বিদ্বেষী ছিল আর ইহুদিদের বিরুদ্ধে প্যামফ্লেট ছাপিয়ে গালমন্দ করতো । গিন্সবার্গের বাবা-মাও ইহুদি, তবু, উপন্যাসটা অসাধারণ বলে, গিন্সবার্গের মনে হয়েছিল, আমার পড়া উচিত । বইটা সুভাষ ঘোষকে পড়তে দিয়েছিলুম তারপর কী হলো কে জানে, ওরা মুচলেকা লিখে, দলবেঁধে ক্ষুধার্ত, ক্ষুধার্ত খবর, ক্ষুধার্ত প্রতিরোধ থেকে আমায় ভেন্ন করে দিলে, কেন কে জানে ! । দলটার ত্রিদিব মিত্র নাম দিয়েছিল “মুচলেকাপন্হী”, ত্রিদিব আর আলো মিত্রকেও বাদ দিয়েছিল রাজসাক্ষীরা । আমিও ১৯৬৭ সালে কেস জিতে ছেড়ে দিলুম ওদের ‘গরিব-হওয়া-ভালো’ সঙ্গ । এই হওয়া, হয়ে-ওঠা যে কি জিনিস তা আজও বুঝুনি ।     ১৯৬৬ সালে বাসুদেব দাশগুপ্তকে দিয়েছিলুম লেনি ব্রুসের লেখা “হাউ টু টক ডার্টি অ্যান্ড ইনফ্লুয়েন্স পিপল” বইটা । ১৯৬৮ সালে, যখন আমি লেখালিখি ছেড়ে দিয়েছি, কৃষ্ণগোপাল মল্লিকের পত্রিকা “গল্পকবিতায়” বাসুদেব দাশগুপ্ত লিখেছিল “লেনি ব্রুস ও গোপাল ভাঁড়কে” । বাসুদেবের লেখাটা আমার পড়া হয়নি । কোনো কিছুই আর পড়তে ভালো লাগে না ।        

            ১৯৯৪ সালে প্রথম উপন্যাস লিখলুম, “হাওয়া৪৯” পত্রিকার জন্যে, “ডুবজলে যেটুকু প্রশ্বাস”, পাটনাইয়া বন্ধুদের নিয়ে । আমি প্রুফ দেখতে একেবারেই পারি না । দাদা কৃষ্ণগোপাল মল্লিককে বললেন প্রুফ দেখে দিতে । কৃষ্ণগোপাল ডেকে পাঠালেন ওনার বাড়িতে, বললেন, “টাকার ব্যাগটা অতনু রেখেছিল আলমারির ওপরে, বাড়ি ছেড়ে যখন চলে যাচ্ছে, তখন ব্যাগটা খাটের তলায় গেল কি করে ?” বার-বার চোখ চলে যাচ্ছিল মেঝেয়, ওনার পড়াশুনার টেবিলের পাশে মাকে চেন দিয়ে বেঁধে রেখেছেন, তিনি মাটিতে বিছানায় শুয়ে, চেন বাঁধা । বললেন, “প্রথম এসেছো তো, তাই অবাক হয়ে গেছো, আমার মায়ের খাই-খাই ব্যারাম, তাই বেঁধে রাখতে হয়ে।” শুনে, গায়ের লোম বেয়ে শিরশিরে হাওয়া বয়ে গেল। সিঁড়ি দিয়ে নেমে আমহার্স্ট স্ট্রিটে এসে আচমকা ফুঁপিয়ে উঠলুম ।  

        ওই সময় নাগাদই এডওয়ার্ড সাইদ এসেছিলেন কলকাতায়, নেতাজি ভবনে, সৌগত বসুর ডাকে, বক্তৃতা দিতে । বক্তৃতা দিতে-দিতে সাইদ বার বার প্রতিষ্ঠানবিরিধিতার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করছিলেন । আমি বসে ছিলুম পেছনের সারিতে কেননা সামনের সারি ছিল কলকেতিয়া কেঁদোদের জন্য । আমন্ত্রিতরা, বলা বাহুল্য, সবাই ছিল কলকাতার প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার চাঁই । প্রশ্নোত্তরের সুযোগ আসতেই আমি বললুম যে, “স্যার, আপনি এতোক্ষণ প্রতিষ্ঠানবিরোধিতার কথা বলছিলেন, অথচ এখানে তো সামনের সারিগুলোয় বসে আছেন পশ্চিমবাংলার তথা ভারতের প্রাতিষ্ঠানিক কর্তারা ।” সৌগত বসু, আশা করেননি যে এরকম একটা প্রশ্ন কেউ ছুঁড়ে দিতে পারে । উনি তড়িঘড়ি উঠে দাঁড়িয়ে বললেন যে, “এই কনট্রোভার্সি ডিসকাস করার মতো আমাদের হাতে সময় নেই, পরের বার উনি আসলে আমরা বিষয়টা নিয়ে আলোচনা করব ।”   

চার

        ১৯৮৮ সালে যখন নাকতলার ফ্ল্যাটটা কিনলুম, মাত্র দু লাখ টাকায়, তখন ওই মাপের ফ্ল্যাট মুম্বাইতে কম করে হলেও পঁচিশ লাখ, তাই লোকে যেভাবে আলুপটল কেনে, কিনে নিলুম, সাত পাঁচ না ভেবে । আসলে একটুকরো পশ্চিমবঙ্গ কিনেছিলুম, চারিদিক খোলা, অথচ কোনো বাড়ি থেকে কেউই দেখতে পাবে না যে আমি অনেক সময়ে ল্যাংটো হয়ে থাকি, সলিলা চেঁচামেচি করলেও ল্যাংটো থাকতে ভাল্লাগে । বাড়ির পেছনে পলাশের জঙ্গল, গাছে-গাছে কতো রকমের পাখি যাদের অধিকাংশকে চিনি না, মীজানুর রহমানের ত্রৈমাসিক পত্রিকার পক্ষী সংখ্যার সঙ্গে মিলিয়ে দেখি পাখিগুলোর নাম কী হতে পারে, পেছনে বিশাল পুকুর, পুকুরে মাছেরা চাঁদের আলোয় ঘাই মারে, দিনের বেলায় পানকৌড়িরা মাছ খেতে নামে, উড়ে গিয়ে নারকেল গাছে জাপানি পাখার মতন ডানা ছড়িয়ে শোকায়, অনেক সময়ে পলাশের বনে শেয়াল আসে, শেয়ালের ডাক শোনা যায় রাতে, প্রচুর বেঁজি, বাড়ির সিঁড়িতে সাপ লুকিয়ে থাকে, মশারির ওপর ফ্যানের ব্লেডে লেগে জোনাকিরা ঝরে পড়ে, দূরে দেখা যায় কালবৈশাখীর মেঘ এদিকেই আসছে । হায়, সব ক্রমশ উধাও হয়ে গেল, পলাশগাছগুলো কেটে ফেলা হল, পুকুর হয়ে গেল জঞ্জাল ফেলার ডোবা, তার পাশে বাঁশের আড়ত, মেট্রো রেল এলো, বাড়ির পর বাড়ির পর দেশলাই-বাড়ি, তারপর পশ্চিমবঙ্গের পাড়া-সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয় হলো একটু-একটু করে, বাড়ির সামনেই, প্রথম দিনেই, কচ্ছপ কেটে বেআইনি মাংস বিক্রি, কেনার জন্য কী ভিড় আর ঠেলাঠেলি, তারপর কমরেডরা এলেন পুজোর চাঁদা চাইতে, তাদের মনের মতন না হওয়ায়, একজন হুমকি দিয়ে গেল দুর্গাপুজো-কালীপুজোয় এই বাড়ির ছাদে চারটে লাউডস্পিকার লাগানো হবে ।

         মেজমাসির সঙ্গে নিমতায় দেখা করতে গেলে বলেছিলেন, “ওখানে ফ্ল্যাট কিনেছিস ? আনওয়ার শা থেকে গড়িয়া পর্যন্ত তো রিফিউজিদের  জঞ্জাল-পাবলিকে ঠাশা !” মেজমাসি রিফিউজিদের ওপর চটা ছিলেন কেননা তারা ওনার পুকুর থেকে মাঝরাতে মাছ ধরে নিয়ে চলে যেতো, সুপুরিগাছ থেকে সুপুরি আর নারকেল গাছ থেকে নারকেল পেড়ে নিয়ে যেতো । মেজমাসি মারা গেছেন ; ওনাদের জমিজিরেত পুকুর আর নেই নিমতায় ; ফ্ল্যাটবাড়ি উঠেছে ।   ২০০০ সালে পাঁচ লাখ টাকায় ফ্ল্যাট বেচে দিলুম, পঞ্চাশ বছরের পুরোনো ফ্ল্যাট। বেচে, ১৯৮৮ সালে করা নিজের বোকামি থেকে মুক্ত হওয়া গেল । বেচার দু বছর পর গিয়েছিলুম ওই পাড়ায়, দেখলুম আর শুনলুম পাড়ার ছেলেরা ক্রেতার সঙ্গে আপোষ করতে না-পেরে বারান্দার কাচে ঢিল মেরে-মেরে ভেঙে দিয়েছে, যিনি কিনেছেন তিনি কাগজ সেঁটে রোদবৃষ্টি থামাচ্ছেন । ক্রেতা ‘সিপিএম করতেন’ ; হয়তো পালটি খেয়ে ঘাসফুলে যাননি ।

        নাকতলায় অতিতরুণ কবি সুশান্ত দাশ আর কমরেড-কবি গৌতম নিয়োগী ১৯৯৫ সালে আমাকে ওদের পাড়ায় আবিষ্কার করে অবাক, হাংরি আন্দোলনের সঙ্গে মেলাতে পারছিল না আমাকে, ভেবেছিল শতচ্ছিন্ন পোশাকে একজন টিংটিঙে ভবঘুরেকে দেখবে, নাকে শিকনি চোখে পিচুটি, চামড়ায় চামউকুন, চুলে মৌমাছির চাক, দেখবে বাড়ি একেবারে আঁস্তাকুড়, কাকেরা শকড়ি খুঁটে খাচ্ছে । অফিসের বদান্যতায় কেনা সিনথেটিক কার্পেট, সোফা, টিভি ইত্যাদি দেখে আরও ঘাবড়ে গিয়ে থাকবে, রাজা সরকার আর অলোক গোস্বামীর মতন । তারপর যখন অফিস-প্রধানের কাজ করতে আরম্ভ করলুম, তখন অফিসের গাড়ি নিতে আসতো আর ফিরতুম তাতে । তবে গৌতম-সুশান্তর সঙ্গে পরিচয়ের পর পাড়ার লোকে আমাকে সিঁড়ির ওপরের পাদানিতে চাপিয়ে দিয়েছিল । সুশান্তর মা ছিলেন সিপিএম সমর্থক, দেয়ালে “গণশক্তি” সাঁটা হতো প্রতিদিন । মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় গদিতে বসার পর বললেন, সিপিএম তো আমাদের জন্য কিছুই করল না, সেই দেশভাগের সময়ের দুবেলা দুমুঠোর দারিদ্র্যেই পড়ে আছি। ভাতের হোটেল খুলে সংসার চালাতেন, আমরাও আনিয়ে খেতুম মাঝে-সাজে, রান্নার হাত খুবই ভালো।

         পশ্চিমবাংলার টেকটনিক প্লেটে যখন ধ্বস নামছিল, তখনই মুম্বাই চলে এলুম, শীতের পোশাক, বইপত্র আর আসবাব বিলিয়ে দিয়ে, গাড়িটা বেচে দিয়ে । বেচে,  গাড়িকেনার বোকামি থেকে ছাড়ান পেলুম। বইপত্র নিতে কোনো লোকাল গ্রন্হাগার রাজি হল না, শেষে সপ্তর্ষি ভট্টাচার্য ওর অ্যামবাসাডর গাড়ির ডিকিতে ভরে-ভরে কয়েক খেপে নিয়ে গিয়েছিল । তারপর মা-মাটি-মানুষ করতে গিয়ে সিনডিকেটের হাতে এমন প্যাঁদানি খেয়েছিল সপ্তর্ষি যে ভেলোরে গিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারল; কিন্তু ভেলোরের প্রভাবে এখন যিশুখ্রিস্টের গুণগান করে বেড়ায়, কেউ-কেউ বলে খ্রিস্টান হয়ে গেছে । সিনডিকেটের লোকেরা আমার দেয়া বইগুলোও অন্য বইপত্রের সঙ্গে ছিঁড়েখুড়ে নষ্ট করে দিয়েছিল । নাকতলা, শ্রীপল্লী, যাদবপুরের যে লাইব্রেরিগুলোয় বই দিতে চেয়েছিলুম, তারা টিটকিরি মেরে বলেছিল, হেঁঃ হেঁঃ, কবিতার বই, এসব কে পড়ে মশায়, আপনি একটা র‌্যাক দান করলেও ওসব বই রাখার জায়গা আমাদের নেই । নবারুণ ভট্টাচার্য তাই বলেছিলেন এই চুতিয়াদের ‘দেশ’ আমার নয়, উনি বোধহয় স্তালিনের সোভিয়েত রাষ্ট্রকে নিজের দেশ মনে করতেন ।

          শীতের পোশাক, ডবল-ব্রেস্ট স্যুট, সিঙ্গল-ব্রেস্ট স্যুট, থ্রিপিস স্যুট, টেরিউলের প্যাণ্ট, উলের সোয়েটারগুলো, ফুলশার্ট, সবই দিয়ে দিলুম পাড়ার বিহারি ধোপাকে । বললে, উঁচু জাতের লোকেরা এগুলো আমাদের গাঁয়ে পরতে দেবে না, ওদের মধ্যে যারা একটু গরিব তাদেরই বেচবো এগুলো । বেচে আমাদের পরার মতন সোয়েটার-চাদর কিনে মা আর বউকে দিয়ে আসবো । দোকান বন্ধ করে চলে গিয়েছিল পনেরো দিনের জন্যে, পাড়ার অনেকের জামা-কাপড় প্রেস করার জন্যে বাসায় রেখে কেটে পড়েছিল

          নিচেতলার ফ্ল্যাটমালিক ফণীবাবুর কাছে গ্যারেজ ভাড়া নিয়ে গাড়িটা রাখতুম ; একদিন গ্যারাজ খুলে দেখি গাড়ি থই-থই-গুয়ে ভাসছে ; নিচেতলার ভাড়াটেরা স্যানিটারি ন্যাপকিন ফেলে-ফেলে গু বেরোবার পথ বন্ধ করে দিয়েছে । কর্পোরেশান বললে পার্টি অফিসে যান, কর্মিদের সেখানেই পাবেন । পার্টি অফিস যিনি সামলাচ্ছিলেন তিনি বললেন, বাড়ির ভেতরের কোনো কাজের দায়িত্ব আমাদের নয়, ধাঙড়দের দিয়ে পরিষ্কার করান, বাঁশদ্রোণী বাজারে ভোরবেলা যে ধাঙড়রা কাজ পাবার জন্যে বসে থাকে তারা বলল, ও কাজ আমাদের নয়, মেথরদের কাজ, গাঙ্গুলিবাগানে মেথর কলোনিতে গেলুম, বাসিন্দারা বলল, ওরা শুধু ম্যানহোলের কাজ করে, গুয়ের কাজ করে না । অগত্যা ডাণ্ডালাগানো দুটো সুইপার কিনে, আমি খালি গায়ে গামছা পরে, সলিলা ব্লাউজ-শায়া পরে, গুয়ের পাঁক ঠেলে-ঠেলে, তিনতলা থেকে জলের পাইপ নামিয়ে গুয়ের ইঞ্চি দুয়েক হলুদ-সবুজ-কালচে চাদরকে পথে বের করে নর্দমায় ঢোকালুম । শিবুর চায়ের দোকানে তখন বামপন্হী দর্শকের পাল, শিবু অবশ্য হাওয়া বুঝে তৃণমূলে চলে গিয়েছিল । নর্দমার মুখটা গ্যারেজের কোনেই ছিল বলে রাস্তা নোংরা করতে হয়নি । মানুষের গু ধোবার ধান্দায় সেদিন দুপুরে তো রান্না হয়নি, পার্ক স্ট্রিটে মোক্যামবোতে লাঞ্চ আর হুইস্কি খেতে গেলুম। জানি না আর কোনও সাহিত্যিকের দু-ইঞ্চি পুরু গু ধোবার অভিজ্ঞতা আছে কিনা । সেই যে হয়ে-ওঠা, এটা বোধ হয় মহাপুরুষ আর মহানারী  হয়ে ওঠায় উত্তরণ ।

          নাকতলার লেটারবক্স পাড়ার আরেকটা ঝামেলা ছিল যখন-তখন মোহোল্লা কমিটির এক কমরেড ক্লাবের মাঠে তাঁবু খাটিয়ে, ভিয়েন বসিয়ে, লাউডস্পিকার লাগিয়ে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত অনুকুল ঠাকুরের শিষ্যদের দিয়ে বিটকেল বেসুরো গান গাওয়াতেন, খাবার জন্যে কি-ভিড় কি-ভিড়, তারপর মাঠময় স্টায়রোফোমের এঁটো থালা । এই গডম্যান জিনিসটা কিছুতেই বুঝতে পারি না ; যতোগুলো গডম্যানের কথা শুনি সকলেই তো পিঁজরেপোলের মালিক । বিজেপি এসে গডম্যানদের আর দ্যাখে কে ! মাঠের মাঝখানে একসময় পোস্টাল ডিপার্টমেন্টের লেটারবক্স ছিল বলে পাড়াটার নাম লেটারবক্স, কোনো এক সময়ে মাঠের একপাশে কেবল আমাদের বিল্ডিঙটাই ছিল ।    হাংরি আন্দোলনের সুবো আচার্য গডম্যানের ওই প্রাতিষ্ঠানিক পিঁজরেপোলে ঢুকে চোপোররাত্তির অনুকুল ঠাকুরের গুণগান করে বেড়ায় । সুবোর বাড়ি বিষ্ণুপুরে গিয়েছিলুম আমি সুবিমল আর ত্রিদিব, তখন ও ত্রিপুরার গোপন ডেরা থেকে ফিরেছে, কেননা আমার বিরুদ্ধে মামলা শুরু হয়ে গেছে, সে ছিল এক ভিন্ন সুবো আচার্য, বিষ্ণুপুরে ঘোরাঘুরি করে ধানখেতের ভেতর দিয়ে ল্যাংটোপোঁদে চারজনে একটা নদী পার হয়েছিলুম মাথায় পোশাক চাপিয়ে, গাছতলায় ল্যাংটোপোঁদে চারজনে গাঁজা টেনেছিলুম । এখন সুবো অনিশ্চয়তাকে এতো ভয় পায় যে কথায় কথায় গুরুদেব গুরুদেব ভজন গায় অথচ আগে ওর গুরুদেব ছিল সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় । “সুনীল বলেছে মলয় লিখতে জানে না”, সেকথা জানিয়েছিল আমাকে।  প্রদীপ চৌধুরী বলেছিল, ওটা সুবো আচার্যের ডিএনএতে রয়ে গেছে, গুরু, মন্ত্র, মনুসংহিতা, রক্ষণশীলতা ইত্যাদি, বংশানুক্রম অবদান ।

পাঁচ

                নাকতলায় একদিন টেলিফোন পেলুম, “মলয়, আমি উদয়ন বলছি, উদয়ন ঘোষ, আপনাদের পাড়ায় এসে গেছি, রিকশঅলাকে বলবেন ট্রান্সফরমার স্ট্যাণ্ড” । ২০০১ সালে আমার ছোটোগল্প নিয়ে একটা প্রবন্ধে উদয়ন  লিখেছিলেন, “যত দিন যাচ্ছে, মলয়ের লেখা যত পড়ছি, ততই মনে হচ্ছে, তাঁকে নিয়ে মহাভারত লেখা যায়।” তখনও পর্যন্ত ওনার সঙ্গে আমার সামনাসামনি দেখা হয়নি । ভাবলুম, যাক, কেদার ভাদুড়ির মতন আরেকজনকে পাড়ায় পাওয়া গেল মোদো-আড্ডা দেবার জন্য । একটা পিটার স্কটের বোতল কিনে হাজির হলুম, দেখি উদয়ন শয্যাশায়ী, মন খারাপ হয়ে গেল । আমায় দেখে বিছানা থেকে ধড়মড় করে উঠতে যাচ্ছিলেন, বারন করলেন ওনার স্ত্রী । হাঁপানিতে ধরেছে, লিখতে পারছেন না বলে ডিপ্রেশান, নানা রকম যন্ত্রপাতি ওনার বিছানা ঘিরে। আড্ডা হল কিছুক্ষণ, আমি যেমন শক্তি চট্টোপাধ্যায়কে বই ছাপাবার টাকা দিয়েছিলুম, উনিও দিয়েছিলেন, আমাদের দুজনের একই অভিজ্ঞতা । মাঝে-মাঝে যেতুম, উনি শয্যাশায়ী । ওনার আর শান্তিরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় আর শান্তি লাহিড়ীর একই অবস্হা, পঞ্চাশ দশকের তিনতিকুড়ি কবি-লেখকদের সঙ্গে চিপকে থেকে গর্ব বোধ করার দরুন নিজের লেখার সময় দুমড়ে ছোটো করে ফেলতে হয়েছিল । একদিন উদয়নের মেয়ের টেলিফোন পেলুম যে মারা গেছেন ।

          ২০১৪ সালে যখন “নখদন্ত” বইটার নতুন সংস্করণের মোড়ক উন্মোচন কাকে দিয়ে করানো হবে জানতে চাইলেন গুরুচণ্ডালীর কর্ণধার ঈপ্সিতা পাল, আমি বলেছিলুম, বইমেলায় যারা জিনিসপত্র ফিরি করে বেড়ায়, তাদের কাউকে দিয়ে । তেমনই একজনকে দিয়ে করিয়েছিলেন উনি । কলকাতায় থাকতে তরুণ কবিদের দেখেছি আগের দশকের কোনো টাকমাথা বা চুলে কলপদেয়া কাঁধে-চাদর কবি বা লেখককে দিয়ে “মোড়ক উন্মোচন”এর অনুষ্ঠান করিয়ে গদগদ হন, যেন ফুলশয্যায় কনডোমের প্যাকেট খোলাচ্ছে । আমার মনে হতো এইসব তরুণ কবি সারাটা জীবন অন্যের চিন্তাজগতে বসবাস করে কাটাবে, বেঁচে থাকার চারিদিকে যে সন্ত্রাস আর নোংরামি, তার সঙ্গে এদের পরিচয় হবে না কখনও । একজন ফিরিঅলাকে দিয়ে বইয়ের “মোড়ক উন্মোচন” করিয়ে কী যে আনন্দ কী বলব । 

         ১৯৯৬ সালে নাকতলায় বেশ আনন্দ হয়েছিল পাটনার এক ফুচকাঅলাকে দেখে, ফুচকা ভেজে, মশলা নিয়ে রোজ ময়দানে বিক্রি করতে যেতো । “পাটনাইয়া ফুচকাই বেচো, নাকি মশলায় অদল-বদল ঘটিয়েছো?” জিগ্যেস করতে বলেছিল, মিষ্টি সামান্য বেশি খায় বাঙালিরা, বাদবাকি পাটনাইয়া, পুরো কলকাতায় যতো ফুচকাঅলা আছে সবাই ভোজপুরি, বিহার আর পূর্ব উত্তরপ্রদেশের, তাই যতো ফুচকা বিক্রি হয় সব পাটনাইয়া । আমাকে কেউ যদি জিগ্যেস করে আপনার কী খেতে সবচেয়ে ভালো লাগে, তাহলে আমি ইলিশ-চিংড়ির কথা বলব না, ফুচকার কথা বলব । ফুচকায় আইরিশ ক্রিম ভরে খেতে দারুণ । যদি আমিষের কথা জিগ্যেস করে কেউ তাহলে বলব যে সুইডেনের আইকিয়ার মিট বল খেতে সবচেয়ে ভালো লাগে, গোরু-শুয়োরের মাংসকে জানিনা কী ভাবে স্পঞ্জের মতন নরম করে তোলে, এক ইউরোতে দশটা মিট বল, এক প্লেট আলুভাজা, একটা তিনকোনা প্যাসট্রি আর কফি, প্রতি রবিবার সকালে, আহা, আহা, আহা, তারপর আর লাঞ্চ করার প্রয়োজন হয় না । তবে ইউরোপের মাংসের প্রিপারেশন ভালো লাগে না, মনে হয় কাঁচা, অনেক সময়ে রক্ত বইতেও দেখেছি প্লেটের ওপর । হাংরি আন্দোলনের সময়ে শৈলেশ্বর ঘোষ আর সুভাষ ঘোষ গোরুর মাংস খেতে চাইত না, বেঁচে থাকলে বিজেপি দলের কর্মী হতে পারতো ।

         ১৯৬৬ সালে অনিল করঞ্জাই আর করুণানিধান মুখোপাধ্যায়কে তাক লাগিয়ে দেবার জন্যে দরিয়াপুরে আমার ঘরে একটা পেইনটিঙ তৈরি করে রেখেছিলুম ওরা দুজনে কাঠমাণ্ডু থেকে ফিরলে দেখাবো বলে, নাম দিয়েছিলুম “পেইনটিঙের ভাষাকে আক্রমণ” । কাজটা ছিল একটা সাদা কার্ডবোর্ডে আমার নুনুর চারিপাশের জমানো বাল, যাকে হিন্দিতে বলে ঝাঁট, আঠা দিয়ে সেঁটে তৈরি আমার আত্মপ্রতিকৃতি । ওরা দুজনে দেখেই থ, করুণা বললে, “শালা একেবারে ক্লাসিকাল আর্ট, যেন ইউলিসিস, বেনারস নিয়ে যাবো, হিপিগুলো দেখেই লেড়িয়ে যাবে, দশ-পনেরো ডলারে ঝেঁপে দেবো, বুঝলে, তোমার ইন্সটলেশান আর্ট পৌঁছে যাবে ইউউউউউ এসসসসসস এএএএএএএএ”। করুণা চুলগুলোতে  উপযুক্ত রঙ লাগিয়ে মুখকে আকর্ষক করে তুলল । ওদের সঙ্গে আমিও গেলুম বেনারস, কোর্টে কেস কবে উঠবে ঠিক নেই, সুবিমল বসাক যোগাযোগ রেখেছে হাইকোর্টের অ্যাডভোকেটের সঙ্গে । বেনারসে যাবার লোভ করুণাই দেখিয়েছিল, “গাঁজা-চরস-আফিম মিশিয়ে চারমিনারে পুরে ফোঁকো আর হিপিনীসেক্স করো, একজন মোটা হিপিনী আছে, যাকে কেউ সঙ্গিনী করতে চায় না, এক ব্যাটা হিপি তাকে বেনারসে ছেড়ে আরেকজনকে নিয়ে চলে গেছে, তাকে পাইয়ে দেবো, অনিল ওর নিউড আঁকতে ডাকবে, তখন চাক্ষুষ করে নিও।” দেখলুম মোটা হিপিনীকে, ম্যাডেলিন করিয়েট, পোশাকহীন, ঝলমলে হলুদ আলোয়, অনিলের স্টুডিওতে, আর আবার শুরু হল আমার লুচ্চাপ্রেমিক অ্যাডভেঞ্চার, “অরূপ তোমার এঁটোকাঁটা”। করুণা তিরিশ বছর আগে, অনিল দশ বছর আগে মারা গেছে।

         ১৯৪৭ সাল থেকে, কী খাবো আর কী খাবো না তা প্রকাশ করার স্বাধীনতা আমিও নিজের হাতে তুলে নিয়েছিলুম । কুমড়ো, ঝিঁঙে, ধুঁধুল, কুচোপোনা, মৌরলা, ট্যাঙরা, বিউলির ডাল আমি ইমলিতলায় খেতুম না । দরিয়াপুরে রান্নার বউ রাখলুম ১৯৭০ সালে আর সবকিছুই খাওয়া আরম্ভ করলুম, কেননা রান্নার বউ ছিল বরিশালের আর আমি তাকে বলতুম ধুঁধুলে গোটা  মশলা দাও আর কিমা দিয়ে রাঁধো, কুমড়োয় হিং ফোড়ন আর প্রচুর টোম্যাটো দাও, ঝিঁঙেতে রসুন দাও আর কাবলি ছোলা বাটা, বিউলির ডালে আস্ত রসুনকোয়া, বড়ি আর পালংশাক। সেই থেকে রান্নার রেসিপির একটা বই লেখার পরিকল্পনা মাথায় ঠাঁই করে নিয়েছে । ঠাকুমা ঠিকই বলতেন যে রান্নায় উচিত মশলা দিতে জানলে পাথরের টুকরোর তরকারিও খাওয়া যায় । আমি আসলে বেশ পেটুক । নোলা-সকসকে মানুষ বলতে যা বোঝায়। খিদে না থাকলেও ভালো খাবার দেখলে বা স্কচ বা সিঙ্গল মল্ট  দেখলেই খেতে ইচ্ছে করে । খিদে ব্যাপারটা মনের স্হিতি, পেটের নয়।

ছয়

             ১৯৭৯ সালে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের চাকরি ছেড়ে সিনিয়ার অ্যানালিস্ট হিসেবে অ্যাগ্রিকালচারাল রিফাইনান্স অ্যান্ড ডেভেলাপমেন্ট কর্পোরেশানের লখনউ দপতরে যোগ দিয়ে  কয়েকদিন স্টেশানের কাছে হোটেলে ছিলুম আর প্রতিদিন রাতে ওল্ড মংক খেয়ে পাঞ্জাবি সরদারের দোকানে পুরো চিকেন তন্দুরি খেতুম কুড়ি টাকায় । আরও চারজন সিনিয়ার অ্যানালিস্ট, সকলেই ধনী চাষিবাড়ির কৃষি-বিজ্ঞানী, আবদুল করিম, শেট্টিখেড়ে প্রভাকর, ডক্টর কুরকুটে আর মদন মোহন যোগ দিলে, যতোদিন না বাড়ি পাচ্ছি,  আমাদের থাকার ব্যবস্হা হল উত্তরপ্রদেশ ভূমি বিকাশ ব্যাংকের গেস্ট হাউসে । রান্নার ব্যবস্হা নিজেদের। প্রভাকর সম্পুর্ণ শাকাহারি, পেঁয়াজ রসুনও খায় না, আর করিমের আমিষ না হলে চলবে না । সিদ্ধান্ত হল একদিন প্রভাকর রাঁধবে একদিন করিম । আমরা বাসন মাজবো, ঝাড়ু দেবো, পোঁছাপুছি করব চারটে ঘর আর ড্রইং রুম । এই চাকরিতে প্রথমেই যেতে হয়েছিল হিমালয়ের তরাইতে আর্টেজিয়ান কুয়োগুলোকে কাজে লাগাবার প্রজেক্ট তৈরির কাজে, তার আগে জানতুম না যে মাটির তলা থেকে কনকনে ঠাণ্ডাজল আপনা থেকে ফোয়ারার মতন বেরোতে থাকে । রিজার্ভ ব্যাঙ্কের চাকরিটা না ছাড়লেই ভালো হতো ; ষাট হাজার টাকা পেনশন বেশি পেতুম ।

         করিমের মাংস রাঁধা দেখে আমাদের মাংস খাওয়া টঙে উঠল । মাংস কিনে এনে সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত জলে ভিজিয়ে রাখত যাতে শেষ রক্ত ফোঁটাও বেরিয়ে যায়, তবুও খেলুম মাংস, তাতে সজনে ডাঁটা মুলো বেগুন দেয়া । মাংসের সাম্বর, হায়দ্রাবাদি বিরিয়ানি আর হালিম রাঁধা অন্ধ্রের আবদুল করিমের কাছে শিখলুম । ওকে তারিফ করে হায়দ্রাবাদি বিরিয়ানি আর হালিম রাঁধায় টেনে নিয়ে গিয়ে আমাদের স্বস্তি । মুর্গি কিনে এনে করিম তাকে উনুনে ঝলসে নিতো যাতে রক্তের রেশ না থাকে ।  আর তার ফলে গ্যাসের উনুন থেকে আগুন বেরোনো চৌপাট হয়ে যেতো ।  অবসর নেবার পর নাভি পর্যন্ত পাকা দাড়ি নিয়ে করিম পাঁচবেলা নামাজ পড়তো, অন্ধ্রের গ্রামে একটা বাড়ি করেছিল সাতটা ঘরের, বিশাল বাংলো, ভেবেছিল বউ আর নাতিপুতি নিয়ে থাকবে, তা বউটাই মারা গেল ক্যানসারে । একটাই ছেলে হাসন্যায়েন হিন্দু মেয়ে বিয়ে করে থাকতে চায়নি বাপের সঙ্গে । লখনউ থাকাকালে করিম যেখানেই ট্যুরে যেতো, আমার ছেলের জন্য কোনো উপহার সেই জায়গা থেকে আনতো, নাকতলার ফ্ল্যাট বেচার সময়ে সবই পাড়ায় বিলি করে দিতে হয়েছে ।

         প্রভাকর ব্রেকফাস্টে দোসা সাম্বর বা ইডলি বানিয়ে দিতো । দোসা ইডলি আর সাম্বর বানাতে শিখে গেলুম, শিখে ফেলার পুরস্কার হিসেবে ও কর্ণাটকে নিজের গ্রাম থেকে একটা দোসা বানাবার চাটু এনে দিয়েছিল, যা এতো ভারি যে এখন আর তুলতে পারি না । তিন মাস পরে ইন্দিরানগরে বাংলোবাড়ি পেয়ে নতুন আস্তানায় গিয়ে পাটনা থেকে সলিলা, ছেলে-মেয়ে আর জিনিসপত্র নিয়ে এলুম । যে বাংলো পেয়েছিলুম, তাতে প্রচুর সাহায্য পেলুম চার কৃষি বিজ্ঞানী বন্ধুর, নিজে চাষ করার, বাগান করার, এমনকি ঘাস লাগাবার। আর প্রচুর বই, চাষবাসের বই, কিছুই জানতুম না আগে । সেই থেকে আমার মস্তিষ্ক হয়ে গেছে ক্যালাইডোস্কোপিক । নতুন চাকরিটাও এমন যে গ্রামে-গ্রামে চাষের উন্নতির রিপোর্ট দিতে হতো । গোরু, ছাগল, মোষ, বলদ, ষাঁড়, শুয়োর, হাঁস, মুর্গির যে কতো রকম প্রজাতি হয় সেই প্রথম জানলুম । মোষ-ষাঁড়-শুয়োরের সিমেন বের করার টেকনিক, সেই সিমেন মাদিদের যোনিতে পোরার টেকনিক, দেখতে দেখতে বেশ উত্তেজনা হতো । তার আগে তো দূর থেকে বাজরা আর জোয়ার খেতের তফাত টের পেতুম না।এই নতুন চাকরির দরুন সাহিত্যের সঙ্গে আমার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল । পাটনায় থাকতে তো চাষবাসের কিছুই জানতুম না, একটা গাছে এলাচ কোথায় হয় তা জানতুম না ।

         ১৯৫০ সাল থেকেই ঠাকুমা গরমকালে কেবল একটা গামছা কোমরে জড়িয়ে উত্তরপাড়ার খণ্ডহরে ঘুরে বেড়াতেন, ভাড়াটেদের সঙ্গে গ্যাঁজাতেন, ওনার মাইদুটো শুকিয়ে আমসি হয়ে গিয়েছিল । যখনই যেতুম কিংবা ঠাকুমা পাটনায় আসতেন, বলতুম, “তোমার মাই নিয়ে খেলবো” । ঠাকুমার মাইয়ের বোঁটা দুটো দুহাতে ধরে জুড়ে ছেড়ে দিতুম আর বলতুম, “ঝমমমম”। ঠাকুমা বলতেন, যথেষ্ট বয়েস হয়েছে তোর, “এবার বে-থা কর আর বউয়ের মাই নিয়ে ঝম ঝম কর দিকিনি।” বলতুম, “বউয়ের মাই তো আর তোমার মতন হবে না যে এক বোঁটার সঙ্গে আরেক বোঁটাকে মেলাবো।” ঠাকুমা বলতেন, “আমার মাইও এককালে তোর বড়োজেঠিমার চেয়ে পেল্লাই ছিল, বুঝেছিস, তোর দাদুর কতো গর্ব হতো।” ঠাকুমা মারা যাবার চার বছর পরে বিয়ে করলুম, নয়তো ওনাকে বলতুম, আমিও আমার বউয়ের মাই নিয়ে গর্ব করি , তোমাকে দেখাতে বলব একদিন ।

         ২০১০ সালে মালাডের ইনঅরবিট মলের ফুড কোর্টে বসে অপেক্ষা করছিলুম এক দম্পতির, সেদিন তাদের বিবাহবার্ষিকী, খাওয়াবে বলে কয়েকজনকে ডেকেছে । প্রায় সকলেই পৌঁছে গিয়েছিলুম । একজন যুবতী এগিয়ে এলো আমার দিকে, দুহাতে বিয়ের মেহেন্দি, এক হাতে প্লাস্টিকের চালুনি, আরেক হাতে বাঙলা পাঁজি আর দামি ব্যাগ । ইংরেজিতে আমাকে বলল, স্যার আপনাকে বাঙালি বলে মনে হচ্ছে, আমি এই ফোরটিন গ্রিনস কিনতে বেরিয়েছি কিন্তু কোথাও পাচ্ছি না, ক্রফোর্ড মার্কেটেও পাইনি; আপনি কাইন্ডলি বলতে পারবেন কি যে এই গ্রিনগুলো কোথায় পাবো ? জিগ্যেস করে জানলুম ও কানপুরের মেয়ে, বিয়ে করেছে বাঙালি যুবককে, শশুর-শাশুড়িকে ইমপ্রেস করার জন্য চোদ্দশাক খুঁজে বেড়াচ্ছে । চালুনিটা করওয়া চৌথের জন্যে । পাঁজি খুলে দেখলুম শাকের নাম দেয়া আছে, ওলপাতা, কেঁউ, বেতো, সরিষা, কালকাসুন্দে, নিম, জয়ন্তী, শাঞ্চে, হিলঞ্চ, পলতা, শৌলফ, গুলঞ্চ, ভাটপাতা আর সুষণী । বললুম, এই ফোরটিন গ্রিনসের কথা আমি নিজেই আগে জানতুম না, আমাদের বাড়িতে যে চোদ্দশাক হতো তাতে পালংশাকের সঙ্গে নটে, ধনে, সোয়া, লাউ, কুমড়ো, পালং, কলমি, যার কোনোটাই এই লিস্টে নেই । আমার স্ত্রী যুবতীটিকে বলল, পালংশাক কিনে নাও আর যা-যা গ্রিনস পাওয়া যাচ্ছে কিনে নাও আর তা শ্রেডিং করে রেঁধো, তোমার ইনলজ আনন্দিত হবেন । নিজেরা যে বাঙালিত্ব ছেড়ে দিয়েছি একজন অবাঙালী যুবতীকে তা করতে দেখে, করুণার ভাষায়,  লেড়িয়ে গেলুম ।

         মুম্বাই থেকে ফিরে সুভাষ ঘোষের বাড়ি চন্দননগরে গিসলুম ১৯৯৬ সালে, বহুকাল পর দেখা করার ইচ্ছে দমিয়ে রাখতে পারিনি বলে, স্টেশন থেকে বেরিয়ে দেখি সিপিএম-এর মিছিলে ঝাণ্ডা নিয়ে স্লোগান দিতে-দিতে যাচ্ছে সুভাষ ঘোষ, মন খারাপ হয়ে গেল । ওর বাড়ি গিয়ে দেখি বারান্দার এক কোণে সিপিএম-এর ঝাণ্ডার স্তুপাকার গোছা, ভেতরের ঘরে দেয়ালে ঝুলছে জ্যোতি বসুর ছবি, মনে হল ওর বাড়ি আসা বড্ডো ভুল হয়ে গেছে । প্রতিষ্ঠানবিরোধী ঢুকে গেছে প্রতিষ্ঠানের খাঁচায় । অবশ্য যখন ও মুচলেকা দিয়ে আমার বিরুদ্ধে রাজসাক্ষী হয়েছিল, তখনই হদিশ পেয়েছিলুম যে ও একা লড়তে ভয় পায়, ওর চাই মিছিলের আশ্রয়, ওর চাই কফিহাউসের তরুণদের জমঘট । বলল, “মফসসলে থাকলে বুঝতে এসব না করে টিকে থাকা কতো কঠিন”। নিজের বউ কণক ঘোষকেও হাংরি আন্দোলনের অন্তর্ভুক্ত করে ফেলেছে, যদিও কণক ঘোষের লেখার স্তর বাচ্চাদের  । এদিকে সিপিএমের লুম্পেনরা তখন গ্রামে-গ্রামে অবর্ণনীয় অত্যাচার চালাচ্ছে, বাড়ি-ধানের গোলা পোড়াচ্ছে, মুণ্ডু নিয়ে ফুটবল খেলছে, পেট্রল ঢেলে মানুষ পোড়াচ্ছে, মানুষদের জ্যান্ত মাটিতে পুঁতে দিচ্ছে, সুভাষের লেখায় তাদের দেখা মেলে না।

         মুম্বাই থেকে ফিরে ১৯৯৫ সালে প্রদীপ চৌধুরীর বাড়ি গিসলুম, দাদাকে আমাকে সলিলাকে শ্যাম্পেন খাওয়াবার নেমন্তন্ন করেছিল, শুনেছিলুম ফি বছর ফ্রান্সে কবিতা পড়তে যায় । শ্যাম্পেনের বোতলে ভরে দিশি বাংলা খাওয়ালো, ভেবেছিল আগে শ্যাম্পেন খাইনি কখনও । বহুকাল পর পুরোনো প্রদীপকে পেয়ে গেলুম, দেশ-বিদেশ ঘুরেও টসকায়নি, দি সেম ওল্ড কুমিল্লা ব্লোক, জিভের আড় ভাঙেনি । “হাওয়া ৪৯” পত্রিকায় প্রদীপ সম্পর্কে একটা লেখা লিখেছিলুম, প্রদীপের রাস্টিকেশানের যাবতীয় ডকুমেন্টসহ, প্রদীপ বলেছিল আমার গদ্যটার মতন আর কেউ ওকে বিশ্লেষণ করতে পারেনি । কিন্তু মুচলেকাপন্হীরা ওকে একঘরে করে দিতে পারে এই ভয়ে, লেখাটার সঙ্গে দেবার জন্যে একটা ফোটো তুলিয়ে দিয়ে গেল, যেন আমাকে লাথি দেখাচ্ছে । ওই ফোটোসহ ছেপে দিয়েছিলুম গদ্যটা । জানি না রাজসাক্ষীদের ও কেন এতো ভয় পেতো । তাদের অন্তর্ধানের পর পুরোনো প্রদীপ খোলোশ থেকে বেরিয়ে এসেছে । অভিমন্যু সিংহের সাইটে ইনটারভিউ দিয়ে যে ফোটো দিয়েছে তাতে প্রদীপের গলায় ঝুলছে বিজেপির পদ্মফুল ।

        মুম্বাই থেকে ফিরে ১৯৯৬ সালে শৈলেশ্বর ঘোষের বাড়ি গিসলুম, বেশ অনেকখানি জায়গা নিয়ে বাড়ি, পাঁচিলের গা ঘেঁষে দেবদারুর সারি বসিয়েছে, কিন্তু তা সত্ত্বেও পত্রিকার মলাটে ভিকিরির ছবি কেন, জিগ্যেস করতে বলল, ‘পাতা ফুঁকবে নাকি’ । আলমারি জুড়ে কেবল নিজের বই, সারি-সারি । মারা গেল অপারেশান থিয়েটারে । একে-একে মারা গেল ওর বউ, জামাই, মেয়ে । কিন্তু প্রচুর এনটিটি পয়দা করে গেছে ওর লেখাপত্তর সামলাবার ।

        আমি তো চিনতুম না, তাই প্রদীপ চৌধুরী বলেছিল শৈলেশ্বরের বাড়ি নিয়ে যাবে । যেদিন যাবার সেদিন গাপ মেরে শৈলেশ্বরকে আগাম খবর দিয়ে এলো, যাতে ও তৈরি থাকে। আমি আর দাদা ওর অপেক্ষায় গড়িয়ার বাস ডিপোয় দাঁড়িয়ে রইলুম ঘণ্টা দুয়েক । পরের দিন নিয়ে গিয়েছিল । মারা যাবার কয়েকদিন আগে শৈলেশ্বরের মেয়ে জীজা ঘোষ চিঠিতে প্রণবকুমার চট্টোপাধ্যায়কে লিখেছে যে, যে-পত্রিকায় মলয় রায়চৌধুরী আর সমীর রায়চৌধুরীর লেখা থাকবে তাতে যেন ওর বাবার লেখা প্রকাশ না করা হয় । মন্দ নয়, মারা যাবার আগে মুচলেকা-লেখক মেয়েকেও রাজসাক্ষ্যের দুর্গন্ধ মাখিয়ে যেতে পেরেছে। বেচারি । অনেক বকাসুর চেহারার অ্যাণ্ডাবাচ্চাও ছেড়ে গেছে আমার চোদ্দপুরুষ উদ্ধার করার জন্য।

        মুম্বাই থেকে ফিরে ১৯৯৬ সালে অবনী ধরের গল্পগুলো নিয়ে একটা বই যাতে বেরোয় তার চেষ্টা  করলুম । বাসুদেব, সুভাষ, শৈলেশ্বর, প্রদীপ কেন যে অবনী ধরের গল্পগুলো নিয়ে বই করতে চায়নি জানি না। অবনীও, সোনাগাছিতে বাসুদেবের সঙ্গে গিয়ে বেবি-মীরা-দীপ্তির সঙ্গে শোবার আর ধেনো টানার খরচাপাতি করেছে, বই বের করার কথা ভাবেনি । অবনীর বই বের করার প্রস্তাবটা দিতেই রাজি হয়ে গেল শর্মী পাণ্ডে, আমি একটা ভূমিকা লিখে দিলুম । বাচ্চা হচ্ছে না বলে শর্মী পাণ্ডের তখন বেজায় মন খারাপ, নানা হাসপাতালে নানা টেস্ট করিয়ে চলেছে, বেশ ব্যস্ত । তা সত্বেও আগ্রহ নিয়ে বের করে দিল বইটা । অবনী ধর এক কপি দিতে এসেছিল আমায়, বলল বইটার নাম “ওয়ান শট” এর বদলে “ওয়ান সট” হয়ে গেছে। বললুম শর্মীও বোধহয় আমার মতন ঘটি । বইটা বের করার পূণ্য হিসেবে একটা সুন্দর বাচ্চা পেয়েছে শর্মী, নাম রেখেছে “রূপকথা” । দারুণ । অবনী ধর  যে মারা গেছে তা ওর ছেলের টেলিফোনে জেনেছিলুম।

সাত

         ১৯৪৪ সালে ইমলিতলার গঞ্জেড়িরা কেউই বিশ্বাস করতে চায়নি যে ধবধবে শাদা শুয়োর হয় আর তার মাংস খেতে দিশি কালো শুয়োরের চেয়ে ভালো, ওরা ভেবেছিল আমি ইয়ার্কি করছি, “হাঃ হাঃ হমনিকে বুড়বক সমজ লইল কা ববুয়া” । আমি তাই আর ওদের ভুল ভাঙাইনি যে সূর্য পৃথিবীর চারিদিকে ঘোরে না ; জানি ওদের নাতিরা স্কুলে যেতে আরম্ভ করলে পাকা ভুরু কুঁচকে বসে থাকবে ।

         ১৯৬৫ সালে বেনারসে আমার “জখম” কবিতার হিন্দি অনুবাদ, যা কাঞ্চনকুমার করেছিল, তা লুকিয়ে সরকারি প্রেসে ছাপানোর ব্যবস্হা করে দিয়েছিলেন হিন্দি আর মৈথিলি ভাষার কবি নাগার্জুন । বাঁধানো অবস্হায় বইটা হাতে নিয়ে দেখলুম সাজাবার সময়ে কবিতার লাইন একেবারে ওলোট-পালোট হয়ে গেছে । এই-ই হল আমার কবিতার ফর্ম, বললুম নাগার্জুনকে, যেখান থেকে ইচ্ছে লাইন তুলে যেখানে চান বসিয়ে নিন, টোটাল কবিতায় কোনো হেরফের হবে না, আপনার বৌদ্ধধর্মের চত্বারি আর্যসত্যানি দুঃখই তো কবিতাটার বনেদ । ১৯৯৮ সালে মারা গেছেন নাগার্জুন ।

        ১৯৯৯ সালে ঈশ্বর ত্রিপাঠী এসেছিলেন নাকতলার ফ্ল্যাটে, একহাজার টাকা নিয়ে, আমাকে পুরস্কৃত করতে চান, ‘প্রমা’ পত্রিকায় প্রকাশিত আমার “উত্তরদার্শনিকতা” প্রবন্ধ পড়ে এতোই অভিভূত । আমি পুরস্কার নিই না বলে ওয়ান-টু-ওয়ান পুরস্কার দিতে এসেছিলেন, যাতে কেউ জানতে পারবে না, অথচ পুরস্কারও দেয়া হবে । টাকার তোড়াটা উনি সোফার কুশনের তলায় রেখে চলে যেতে চাইছিলেন । বললুম, আমি তো রামকৃষ্ণ নই, বইবাজারের কেষ্টবিষ্টুও নই,  লেখার জন্যে পুরস্কার নিই না, সম্বর্ধনা নিই না । উনি মুষড়ে পড়লেন, তুলে নিলেন টাকাটা আর কোনো কথা না বলে সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেলেন । ওনার মৃত্যুর খবর পেয়েছি বেশ দেরিতে । “কবিতা পাক্ষিক” পত্রিকার প্রভাত চৌধুরীও সম্বর্ধনার প্রস্তাব দিয়েছিলেন, আবার বলতে হল যে, আমি এই সবেতে নেই । হয়তো ওনার পছন্দ হয়নি ; তারপর থেকে ওনার পত্রিকায় আমার লেখা ছাপা হয় না ।

        ইমলিতলার গঞ্জেড়িদের জমায়েতে ইঁদুর পুড়িয়ে খাওয়া হতো ; ১৯৪৫ সালে আমি পুরোটা খাইনি, বমি করে ফেলব আঁচ করে, তবু একটুকরো মুখে দিয়ে চেখেছিলুম, বিটকেল সোঁদা গন্ধ, চেখে বমি করলুম । দাদা খেয়ে দেখেছিল, তাড়ি দিয়ে । তাড়ি আর ঠররা খাবার ট্রেনিঙ তো ইমলিতলায় । এখন যারা থাকে তারা হয়তো আংরেজি শরাব খায় ।

        ১৯৬২ সালে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের সহকর্মী শিউচন্দরের বাড়িতে ওর গ্রাম ছপৌলিতে গিয়েছিলুম। ওদের অনেক জমিজিরেত, ছাগল বলদ গোরু মোষ ঘোড়া । আমায় একটা ঘোড়ানীর পিঠে বসিয়ে, ঘোড়ানীর পিঠে জিন ছিল না, ঘোড়াটাকে শিস দিয়ে ওরা নিয়ন্ত্রণ করছিল, আমার লিঙ্গের তলায় ঘষটানি লেগে দাঁড়িয়ে গেল, ব্যাটারা জানতো কি হতে চলেছে, তাই শিস দিতে থাকলো, আর আমার বীর্যপাত ঘটা আরম্ভ হলে ঘোড়ানীর গলা জড়িয়ে ধরলুম, ঘোড়ানীর সঙ্গে এভাবে প্রেম করে  ব্যক্তিগত প্রেমের ইতিহাস তৈরি করলুম। শিউচন্দর মারা গেছে কুড়ি বছর আগে । রিজার্ভ ব্যাঙ্কের চাকরি ছেড়ে দিতে হয়েছিল নোটের বিষাক্ত গন্ধ আর ছোঁয়াচে রোগের জন্য ।

          রাতে শিউচন্দরদের বারদেউড়ির যে ঘরে আমাকে শুতে দিয়েছিল, হঠাৎ তার মধ্যে একজন বিহারি যুবতীকে ঠেলে দিয়ে শিউচন্দরের বাবা বললে, “লে রে ববুয়া, দেশি ঘোড়ি পর চঢ়” । মেয়েটার গন্ধে আমার হাড়-হিম করা ভয় দেখা দিল, দরোজা খুলে বললুম, যাও এক্ষুণি পালাও । ভিতু ছিলুম বেশ । যৌনকর্মে নারীও ভীতির কারণ হতে পারে ।

          ১৯৮৯ সালে মুম্বাইতে ফিয়াট গাড়ি কিনেছিলুম অফিস থেকে লোন নিয়ে । ড্রাইভ করতে বেরিয়ে রিভার্স করার সময়ে একটা ট্রাককে ধাক্কা মারলুম, গাড়ির পেছন দিক চুরমার । ডিলারের কাছে নিয়ে যেতে, বলল, প্রথম গাড়ি কিনে ড্রাইভ করতে বেরিয়ে শতকরা পঁচাত্তর ভাগ লোক অমন দুর্ঘটনা ঘটায়, আপনার ভাগ্য যে সামনে থেকে কাউকে ধাক্কা মারেননি ।

        ১৯৮৯ থেকে ১৯৯৪ পর্যন্ত সান্টাক্রুজের ফ্ল্যাট থেকে নারিমন পয়েন্ট পর্যন্ত প্রত্যেক দিন সকালে আধ ঘন্টায় পৌঁছে যেতুম, মেরিন ড্রাইভে বসে হাওয়া খেতুম । নানা জায়গায় বেড়াতে যেতুম । এখন মুম্বাইতে এতো গাড়ি যে চালানো অসম্ভব, এখন সান্টাক্রুজ থেকে নারিমন পয়েন্ট যেতে তিনচার-ঘণ্টা লাগে। ১৯৯৫ সালে কলকাতায় গিয়ে গাড়ি চালাতে বেশ মুশকিল হতো কেননা নাকতলায় থাকতুম গলির ভেতরে আর সিপিএম দলের পাবলিক রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে গ্যাঁজাতো, গাড়ি দেখেও সরে যেতো না, কেউ-কেউ বলতো, “বাঞ্চোৎ গাড়ি দেখাতে এসেছে”, অর্থাৎ রিফিউজিদের মার্কসবাদ ব্যাখ্যা, এরাই পুরো পশ্চিমবাংলাকে ডুবিয়ে দিয়েছে ; লোকগুলো বুঝতেই পারেনি যে কিছুদিনেই গদি থেকে উৎখাত হয়ে যাবে । প্রায়ই ক্লাচ খারাপ হতো । বেচে দিলুম গাড়ি ।

         ২০০০ সালে নাকতলার ফ্ল্যাটও বেচে দিলুম, এমনই একজনকে যে নিজের নামের মাঝখানে “হার্মাদ” লিখে সিপিএম করতো । মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় গদিতে বসতেই, সাঙ্গোপাঙ্গোদের নিয়ে তৃণমূলে পালিয়েছে । বললুম, কি, শেষ পর্যন্ত হার্মাদকে হমদর্দ করে ফেললেন, তৃণমূলে যোগ দিলেন ; প্রত্যুত্তরে উনি হেঁঃ হেঁঃ দিয়ে নিজের ক্ষুদ্রতা মুখময় ছড়িয়ে দিলেন । বিল্ডিংটা ছিল পঞ্চাশ বছরের পুরোনো ।

        ২০১৬ সালের ঘটনা, আরেকজন হার্মাদকে নিয়ে, তিনি চিরঞ্জীব বসু, নামের মাঝে ‘হার্মাদ’। জীবনানন্দের “অন্ধকার” কবিতা থেকে এই উদ্ধৃতি দিয়েছিলুম ফেসবুকে : “আবার ঘুমোতে চেয়েছি আমি অন্ধকারের স্তনের ভিতর যোনির ভিতর।” চিরঞ্জীব মন্তব্য করলেন, “আপনি এতো আধুনিক কিন্তু বাল ‘ভিতর’ লেখেন কেন ?” আরও অনেকের মন্তব্য ছিল, সকলেই ভেবেছেন, লাইনটা আমার । বুঝতে অসুবিধে হল না যে জীবনানন্দকে পড়াও ছেড়ে দিয়েছে বাঙালি পাবলিক । মন্তব্যগুলো পড়ে “কল্কি” পত্রিকার তরুণী সম্পাদক কৃতী ঘোষের উক্তিটা মনে পড়ে গেল, ‘ঝাঁট জ্বলে যায়। আচ্ছা, মেয়েদের কি ঝাঁট হয় ? কেমন যেন আনরোমান্টিক । তার চেয়ে লোমনাশক লাগিয়ে জায়গাটায় আলতা মাখিয়ে রাখলে শরীর বেয়ে গান বইতে থাকবে ।

         ২০০০ সালে মুম্বাইতে দ্বিতীয়বার হার্ট অ্যাটাকের পরে যখন নানাবতী হাসপাতালে থিতু হলুম, কার্ডিওলজিস্ট আমার স্ত্রীকে বললে, তিন লাখ টাকা তাড়াতাড়ি যোগাড় করুন, বাই পাস করতে হতে পারে। প্রথম হার্ট অ্যাটাকের পর অ্যানজিওপ্লাস্টি করিয়েছিলুম । তিন লাখ টাকা চাইলেই তো আর পায়খানা বা পেচ্ছাপের মতন হাসপাতালে জমা দেয়া যায় না । কলকাতা পাড়ি মারলুম । প্রভাত চৌধুরী আমার হার্ট অ্যাটাকের খবর শুনে ভূমেন্দ্র গুহকে নিয়ে এলো, তার আগে আমার সঙ্গে ভূমেন্দ্র গুহর পরিচয় ছিল না । উনি এক মাসেই সারিয়ে তুললেন, বাংলায় প্রেসক্রিপশান লিখে দিতেন, আমার জন্য ওয়েইং স্কেল আর ব্লাড প্রেশার মেশিন কিনে এনে দিয়েছিলেন ; পরিবর্তে আমি মাছ ভাজা আর স্কচ খাওয়াতুম । প্রতি সপ্তাহে একবার দেখতে আসতেন । হঠাৎ আসা বন্ধ করে দিলেন । হয়তো শরীর খারাপ হয়েছে ভেবে,ওনার বাড়ি গিয়েছিলুম, ভালো ব্যবহার করলেন না, প্রেসক্রিপশান-রিপোর্ট ইত্যাদি ছুঁড়ে ফেলে দিলেন । চুপচাপ ফিরে এলুম, মনখারাপ করে । একবার মদের ঘোরে বলেছিলেন যে সরকারি হাসপাতালে এক্স রে করে করে ওনার শুক্রকীটগুলো বাঁচে না, তাই আর বাচ্চা হয়নি । দাদা পরে খবর নিয়ে জানতে পারল যে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ভূমেন্দ্র গুহকে  বলেছেন, “মলয়ের জন্য অতো করার কি আছে, ওর তো কোনো সাহিত্যিক গুণই নেই।” এই একই কথা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বলেছিলেন মারাঠি লেখক-অনুবাদক অশোক সাহানেকে, মারাঠি নাট্যকার দিলীপ চিত্রেকে, ইংরেজি কবিতা লিখিয়ে আদিল জুসসাওয়ালাকে । আর অ্যালেন গিন্সবার্গকে তো বটেই ।

         ভূমেন্দ্র গুহর মৃত্যুর খবর জেনেছি ফেসবুকে ।

         ১৯৬২ সালে “ইল্লত” নামে একটা নাটক লিখেছিলুম, পড়ে প্রশংসা করেছিলেন সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, উনি “বহুরূপী” পত্রিকায় প্রকাশ করার জন্য দিলেন । বেশ কিছুকাল রেখে কুমার রায় বললেন, “আবোল-তাবোল হয়েছে, কোনো কল্পনা নেই, আধুনিকতার ছায়া নেই”। ফেরত নিয়ে “গন্ধর্ব” পত্রিকার নৃপেন সাহাকে দিলুম । উনি পড়ে বললেন ছাপবেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত ছাপলেন না, পাণ্ডুলিপি ফেরত নিয়ে আসার সময়ে দেখলুম ওর ওপরে চায়ের কাপ বা বিয়ারের বোতল রেখেছিলেন, টাকনা রেখেছিলেন । আমার পাণ্ডুলিপির প্রথম  রিজেকশান । ফেরত নিয়ে নিজে একটা পত্রিকা বের করলুম, “জেব্রা” নামে, আর তাতে প্রকাশ করলুম । সুভাষ আর বাসুদেবের হিংসে হল নাটকটা পড়ে । আমার লেখা উতরেছে কিনা জানার প্রধান মাপকাঠি ছিল হাংরি আন্দোলনের চার-চৌকড়ির হিংসে । ওদের দাঁতক্যালানে হিংসুটে হাসি দেখে বুঝলুম যে নাটকটা তাহলে ভালোই লিখেছি ।

         বহুকাল পরে, ‘চন্দ্রগ্রহণ’ পত্রিকার সম্পাদক প্রণবকুমার চট্টোপাধ্যায়, যিনি পঙ্কজ চট্টোপাধ্যায় নামে গল্প-উপন্যাস লেখেন, ‘গাঙচিল’ নামে এক প্রকাশন সংস্হার সঙ্গে যোগাযোগ করে আমার প্রকাশিত বইগুলো আরেকবার প্রকাশ করার তোড়জোড় করেছিলেন । কোন লেখাগুলো প্রকাশ করতে হবে আমি তার তালিকা তৈরি করে দিয়েছিলুম । সংস্হার কর্ণধার অধীর বিশ্বাস ২০১৬ সালে একটা প্রবন্ধ সংকলন প্রকাশ করে, আর কোনও সংকলন প্রকাশ করলেন না । অথচ তিনি তিনটি উপন্যাস আর সাক্ষাৎকারসমগ্র ইতিমধ্যে কমপোজ করিয়ে ফেলেছিলেন । দেড় বছর ফেলে রাখার পর বললেন আর আমার বই বের করবেন না । প্রণবকুমার চট্টোপাধ্যায় ডিটিপি করার খরচ দিয়ে সিডিগুলো কিনে নিলেন অধীর বিশ্বাসের কাছ থেকে । আমার বেশ অপমানজনক মনে হয়েছিল ব্যাপারটা । উনি আর প্রকাশ করতে চাইলেন না কেননা যেসব এনটিটি আমার চোদ্দপুরুষ উদ্ধার করার জন্য বকাসুর এণ্ডাবাচ্চা ছেড়ে গেছে তারা অধীর বিশ্বাসের ঘাড়ের ওপর পচা লাশের  গন্ধ ছড়াতে আরম্ভ করেছিল। জানতে পারলুম, যে-সংবাদপত্র গোষ্ঠিকে লোকে প্রতিষ্ঠান বলে মনে করে, তাদের খোচরদের চাপে উনি আর এগোননি, এদিকে উনি সুবিমল মিশ্র, সুভাষ ঘোষের বই বের করতে কিপটেমি করেননি । একদিক থেকে এটাকেও রিজেকশান বলতে হবে । রিজেকশানও আনন্দদায়ক হতে পারে, কেননা তা লেখকের বিরুদ্ধে তৈরি প্রাতিষ্ঠানিক ঘোঁটকে সহজেই ফাঁস করে ।

          ১৯৯০, ১৯৯৭, ২০০০ সালে সবসুদ্ধ তিনবার অ্যানজিওগ্রাফি করিয়েছি, ১৯৯৭ সালে একবার অ্যানজিওপ্লাস্টি । প্রতিবার নুনুর চারিধারের জঙ্গল পরিষ্কার করেছে একজন নার্স । তারপর অ্যানজিওগ্রাফি আর অ্যানজিওপ্লাস্টি করার সময়ে নুনু নিয়ে এদিক ওদিক নাড়াচাড়া করেছে কয়েকজন যুবতী নার্স । তাদের আচরণ দেখে মনে হতো যে নানারকম নুনু নিয়ে স্হাপত্য গড়ার অভ্যাস হয়ে গেছে । তাদের হাতে পড়ে নুনুর চরিত্রে বদল ঘটে গিয়েছিল, তা আর লিঙ্গ ছিল না ; হাসপাতাল থেকে ফিরে নুনুর লিঙ্গ হয়ে উঠতে কয়েকমাস লেগে গিয়েছিল ।

         ১৯৯৭ সালে যখন কলকাতার পিয়ারলেস হাসপাতালের আইসিইউতে ছিলুম প্রায় কুড়ি দিন, সেখানে যে ধরণের কাণ্ডকারখানা হতো তা লিখেছি “নামগন্ধ” উপন্যাসে । আমি সেসময়ে অফিসপ্রধান ছিলুম, আর বিকেলে একজন অফিসারকে নিয়ে গিয়ে ভর্তি করানো হয়েছিল, হেপাটাইটিস-বিতে আক্রান্ত, তার স্বাস্হ্য কেমন আছে জানাবার জন্য মাঝরাতে অ্যাডমিনিসট্রেটিভ ইনচার্জ ফোন করেছিল, ঘুমের ঘোরে ফোন তুলতে গিয়ে পড়ে গেলুম আর বাঁদিকের কানটা খাটের কোনায় লেগে রক্তারক্তি হয়ে গেল, রক্তচাপ নেমে গেল, সলিলা ট্যাকসি ডেকে ওই হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে ভর্তি করে দিলে । কান সেলাইয়ের পর ডাক্তাররা বললেন, ইসিজি নেয়া হয়েছে, এনার হার্টে ব্লকেজ আছে মনে হচ্ছে । ফলে প্রথমে অ্যাঞ্জিওগ্রাফি আর তারপর অ্যাঞ্জিওপ্লাস্টি । আই সি ইউতে, প্রত্যেকদিন কোনো-না-কোনো যুবতী নার্স লাঞ্চ আর ডিনার খাইয়ে যেতো, অতি যত্নে, হাসপাতালটায় মেয়েগুলোকে বলে সেবিকা । মুখের ভেতরে একজন কচি যুবতীর আঙুলের স্পর্শেই বোধহয় পনেরোদিনে চনমনে হয়ে গেলুম । মনে হতো, এদের  জড়িয়ে ধরে শুয়ে থাকার মতন আনন্দ আর নেই, এদের সঙ্গে সেক্স করা যায় না, জড়িয়ে ধরে বুকে মাথা রেখে ফোঁপানো যায় ।

          ১৯৮৮ সালে মারাঠি কবি অরুণ কোলাটকর বলেছিলেন ওনার বাড়ি যে গলিতে তার মোড়ে একটা ‘নেকেড স্ট্যাচু’ আছে । বাস থেকে নেমে নেকেড স্ট্যাচু আর নংগা মুর্তি জিগ্যেস করে ঘণ্টাখানেক ঘুরেও যখন হদিশ পেলুম না তখন একজনকে জিগ্যেস করলুম অরুণ কোলাটকর কোথায় থাকেন ? সে বলল, মারাঠি কবি তো ? চলুন দেখিয়ে দিচ্ছি । কোলাটকর মারা গেছেন ২০০৪ সালে । বিয়ে করেছিলেন একটি পার্সি যুবতীকে । বাচ্চা হলে সে অসুবিধায় পড়বে বলে বাচ্চা হয়নি ওনাদের । একটা ছোট্ট ঘরে থাকতেন । সবকিছু খাটের তলায়, টেনে বের করলে ডাইনিং টেবিল, লেখার টেবিল । ঘরের চৌকাঠে বসে কবিতা লিখতেন । কারোর সঙ্গে বিশেষ মিশতেন না ।

         যে বছর জন্মেছিলুম, ১৯৩৯ সালে, সেই বছরে জন্মের এক মাস আগেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ আরম্ভ হয়ে গেছে, সংসারে টানাটানি, রাতে অন্ধকার । বাড়ির সবাই আমার জন্মকে দুষেছিল, দ্বিতীয় যুদ্ধ আর বোমার ভয় আর অনটন আনার জন্য, কলকাতা থেকে আত্মীয়-জ্ঞাতিরাও এসে উঠেছিল আমাদের বাড়িতে । বড়জ্যাঠা তখন থেকেই লুঙ্গির চারখুঁটে গিঁট বেঁধে মুসল্লাপুর হাট থেকে ঝড়টি-পড়তি সব্জি কেনা আরম্ভ করেছিলেন, সাইকেলের হ্যাণ্ডেলে ঝুলিয়ে আনতেন । ইমলিতলার বাড়িতে বিজলিবাতি ছিল না, কলের জলও ছিল না । সকলকে রাস্তার কলে গিয়ে স্নান করতে হতো, খাবার জল ভরে আনতে হতো ।

            ইমলিতলা পাড়া ছাড়ার কয়েক বছর পরে ওই পাড়ায় গেলে অনেকে আমাকে চিনতে পারছিল না, কিন্তু পাড়ার চারটে কুকুর, মোতি, টাইগার, ভুতুয়া, দিলের, বুড়ো হয়ে লোম প্রায় উঠে গেছে, আমাকে দেখেই ছুটতে-ছুটতে এসে ল্যাজ নাড়ানো আরম্ভ করে দিয়েছিল । চারটে কুকুরই মারা গেছে ; ওদের পুঁতে দেয়া হয়েছে গঞ্জেড়িদের মাটির উঠোনে ।   ১৯৬৬ সালে বড়োজ্যাঠা মারা যাবার পর কিছুদিন ইমলিতলার বাড়িতে একা ছিলেন বড়জেঠিমা, স্টোভে রান্না করতেন, হরি হে হরি হে হরি হে বলে বলে স্টোভে পাম্প করতেন, ১৯৭৯ সালে একদিন স্টোভ ফেটে বেশ পুড়ে গিয়েছিলেন । দশ বছর পর ইমলিতলায়, নিজের পরিচয় দেবার আগে, কপিলের চাচিকে জিগ্যেস করেছিলুম, এই বাংগালি লোগ কোথায় চলে গেল । কপিলের চাচি, চিনতে পারেনি আমাকে, বলেছিল, ভস্মাসুরের বংশ, সবাই নিজের দৃষ্টিতে জ্বলেপুড়ে ছাই হয়ে গেছে । রাক্ষসের বংশ ! বাঙালিরা যাকে বলে ভস্মলোচন, তাকে বিহারিরা বলে ভস্মাসুর ।     ইমলিতলার বাড়িতে একটা ফোটো ছিল বড়ো জ্যাঠাইমার, দুহাতে ব্লাউজ দুদিকে মেলে আছেন, টপলেস দেখিয়ে, কেননা ওনার মাপের মাই আর কারোর ছিল না বাড়িতে, পাড়াতে শুধু কালুটুয়ার চাচির ছিল, তামাটে, জেঠিমার মতন গোলাপি-ফর্সা নয় । কে তুলেছিল জানি না, হয়তো বাবা, হয়তো কোনও কাকা, হয়তো মেজ-জ্যাঠা । ফোটোটা যদি সঙ্গে থাকতো তাহলে নন্দনতাত্ত্বিক আবু সয়ীদ আইয়ুবকে দেখাতে পারতুম, “এই দেখুন স্যার, আমার বড়োজেঠিমা” । বুঝতে পারতেন আমি কেমনধারা পরিবারের প্রডাক্ট ।

আট

          আমি আরেকবার প্রেমে পড়ে দুর্ভোগের জাঁতিকলে আটকাতে চাইনি বলে সলিলার সঙ্গে পরিচয়ের তিন দিনের মাথায়, ১৯৬৮ সালে বলেছিলুম,আমি আপনাকে বিয়ে করতে চাই, এ-ব্যাপারে কার সঙ্গে কথা বলতে হবে । ও বলেছিল মামাদের সঙ্গে । মনোনয়নে ইপিফ্যানির গর্ব হল । ১৯৬৮ সালে সলিলাদের বাড়িতে সাজানো কাপ আর শিল্ড দেখে প্রশ্ন করে জেনেছিলুম, ওগুলো সলিলার, হকি খেলে পাওয়া, স্টেট প্লেয়ার ছিল, কালার হোল্ডার, ম্যাচ জিতলে কাপে রাম ভরে খেতো । বেশ আনন্দ হয়েছিল যে টিপিকাল বাঙালি মেয়ের মতন নয় ।

          ইমলিতলার বাড়িতে মা বেশির ভাগ সময়ে রান্নাঘরে, দুটো মাটির উনোনে রান্না করছেন, বাসন-কোসনের বিশেষ শব্দ নেই । রান্নার কতো রকমের সুবাস । রাতে কেরোসিনের লম্ফ জ্বেলে রান্না, উনোনের আলোয় মায়ের গনগনে মুখ । ঝুলকালি ভুষো পড়ে রান্নাঘর এতো অন্ধকার যে ছয়মাস অন্তর রামরস দিয়ে রঙ করানো হতো। সব ঘরের চেয়ে রান্নাঘরকে মা বেশি ভালোবাসতেন । জ্যাকসন পোলকের বহু আগেই মা রান্নাঘরের দেয়ালে অমন তুলিহীন পেইনটিং এঁকেছিলেন’কড়াই থেকে দেয়ালে ছিটকে লাগা হলুদ-লংকার দরানি । কোনো ধার্মিক অনুষ্ঠান না হলে মা সিঁদুর পরতেন না, সলিলাকেও পরামর্শ দিয়েছিলেন যে প্রতিদিন সিঁদুর পরলে চুল পেকে যায় আর ঝরে পড়ে, তাই পরার দরকার নেই, শাঁখা-ফাঁকাও দরকার নেই । ফলে সলিলা সিঁদুর-শাঁখার পাট চুকিয়ে দিয়েছে বিয়ের পর-পরই । কিন্তু কোনো বাঙালি বামুন পরিবার আমাদের বাড়িতে ভিজিট দিতে আসছে শুনলেই একটা টিপ আর সিঁদুর পরে নেয়, কেননা কেউ-কেউ কথা শোনাবার সুযোগ ছাড়ে না ।

        বউদির শালীরা, যারা দাদার বাড়ির কাছে বাঁশদ্রোণীতে থাকে, তাদের রক্ষণশীল টিটকিরির ভয়ে সলিলা বেশ কিছুকাল দাদার বাড়ি যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিল। যখন নাকতলার ফ্ল্যাট বেচা ফাইনাল করে ফেলেছি, তখন দাদাকে বলেছিলুম, তোমার ওপরতলাটা আমাদের ভাড়া দাও, আমি মার্কেট রেটই দেবো, তা বউদি বললেন, কোথাও একতলা ভাড়া করে থাকগে যাও । অগত্যা চলে এলুম মুম্বাই । দাদার ছোটো ছেলে বিটু দাদার কাছে জানতে চেয়েছিল যে কেন আমাদের ওপরতলাটা ভাড়া দেওয়া হয়নি, উত্তরে দাদা ওকে বলেছিল, পরে প্রবলেম হতো । দাদার বোধহয় ভয় ছিল যে যেহেতু পাটনার বাড়ির ওপর আমি আর আমার ছেলে-মেয়েরা কোনো দাবি-দাওয়া জানাইনি, তাই ওপরতলায় থাকলে হয়তো ছাড়তে চাইবো না । ওপরতলায় থাকলে দাদাকে বাজে মারোয়াড়ি হাসপাতালে ভর্তি হতে দিতুম না, তাড়াতাড়ি মৃত্যুর পথে যেতে দিতুম না ।

         ১৯৫০ সালে রামমোহন রায় সেমিনারিতে ঢিল ছোঁড়াছুঁড়ি খেলায় আমার মাথা ফেটে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলুম, সেই দাগ এখনও আছে । আক্রান্ত হবার চিহ্ণ । বিরূপ সমালোচনা পড়ে কপালের দাগটায় হাত বুলিয়ে আলোচককে ভুলে যাই ।  বাবা যখন মারা গিয়েছিলেন, শ্রাদ্ধের সময়ে আমি ন্যাড়া হইনি । কিছুকাল পরে বাবার জন্য এতো মনকেমন করছিল যে একটা সেলুন দেখতে পেয়ে সোজা ঢুকে  গিয়ে ন্যাড়া হয়েছিলুম, আর ফেরার সময়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে, কেঁদেছিলুম । পথচারীদের মাঝে দাঁড়িয়ে কেঁদে, ভালো লেগেছিল, যা সমবেত শোকের কান্নায় হয় না । আমি পাটনা থেকে লখনউ চলে যাবার পর দাদা সপরিবারে পাটনায় চলে এসেছিল। বড়ো ছেলে পড়াশোনায় ভালো ফলাফল করতে পারেনি বলে তাকেই দোকানে বসিয়ে দিয়েছিল । বাবা আমার কাছে চলে এসেছিলেন লখনউতে । মা লখনউতে মারা যেতে বাবা পাটনায় কিছুদিনের জন্য ফিরে গিয়েছিলেন, তারপর কোতরঙের ভদ্রকালীতে  ছোটোকাকা বা বিশেখুড়োর বাড়িতে চলে গিয়েছিলেন, পশ্চিমবঙ্গে শেষজীবন কাটাবেন ভেবে । ছোটোকাকা বেশ প্যাঁচালো মানুষ ছিলেন, বাবার কেনা জমিজিরেত ঠাকুমাকে দিয়ে নিজের নামে লিখিয়ে নিয়েছিলেন । শেষে পাটনার বাড়িও ছোটোকাকা বাবাকে দিয়ে লিখিয়ে নিতে পারেন আঁচ করে দাদা বাবাকে পাটনায় নিয়ে চলে যান । আমি বাবাকে মুম্বাইতে নিয়ে আসিনি এটা আমার জীবনের একমাত্র রিগরেট হয়ে থেকে গেছে ।

      আমার বাবা রঞ্জিত রায়চৌধুরী জন্মেছিলেন বর্তমান পাকিস্তানের লাহোর শহরে, ১৯১২ সালে । পাঞ্জাবের মহারাজা রঞ্জিত সিংহ সম্পর্কিত গালগল্পে প্রভাবিত হয়ে ঠাকুমা বাবার অমন নাম রেখেছিলেন। রঞ্জিত সিংহ জন্মেছিলেন ১৩ই নভেম্বর ১৭৮০ । বাবাও জন্মেছিলেন ১৩ই নভেম্বর । ছয় ভাই আর এক বোনের মধ্যে বাবা ছিলেন তৃতীয় বা সেজ ভাই । অন্যান্য ভাইদের পোশাকি আর ডাক নাম দুটিই থাকলেও, বাবার ওই একটি নামই ছিল, রঞ্জিত । ঠাকুর্দার আদি নিবাস ছিল হুগলি জেলার উত্তরপাড়ায় । ১৭০৯ সালে উত্তরপাড়া শহরটির পত্তন করেছিলেন দাদুর পূর্বপুরুষ রত্নেশ্বর রায়চৌধুরী ।

        ঠাকুর্দা লক্ষ্মীনারায়ণ রায়চৌধুরী, পোরট্রেট আঁকতে পারতেন, এবং সেই সূত্রে তিনি বিভিন্ন রাজপরিবারের ডাকে সপরিবারে ভারতের এক রাজ দরবার থেকে আরেক রাজ দরবারে চলে যেতেন । লাহোরে গিয়ে তিনি ড্যাগেরোটাইপ ক্যামেরায় ফোটো তুলতে শেখেন, যাতে ফোটো তুলে তা থেকে ছবি আঁকতে সুবিধা হয় এবং রাজ পরিবারের মহিলাদের এক নাগাড়ে বসে থাকতে না হয় । সেসময়ে মেয়ো স্কুল অফ আর্টসের অধ্যক্ষ এবং লাহোর মিউজিয়ামের কিউরেটার ছিলেন রাডিয়ার্ড কিপলিঙের বাবা জন লকউড কিপলিঙ, যাঁর সঙ্গে পরিচয়ের ও তাঁর অধীনে কাজ করার সূত্রে তাঁর কাছ থেকেই তিনি ফোটো তোলা শেখেন । ফোটো তোলা হতো সরাসরি ব্রোমাইড পেপারে । পরে, কাচের প্লেটে নেগেটিভ ফিল্ম তোলা হতো, সেই নেগেটিভকে রসায়নে চুবিয়ে রেখে ফোটো গড়ে উঠত; তারপর সেই প্লেটের ওপর ফোটোর কাগজ রেখে, প্রয়োজনীয় আলো দেখিয়ে ফোটো প্রিন্ট করা হতো, আর সেই প্রিন্টকে রসায়নে চুবিয়ে, শুকিয়ে, স্হায়ীত্ব দেয়া হতো ।  

         ড্যাগেরোটাইপ ক্যামেরা ছিল বেশ ভারি ; বাইরে গিয়ে ফোটো তুলতে হলে তাকে বয়ে নিয়ে যাবার লোক দরকার হতো । বাইরে তোলা হচ্ছে বলে একসঙ্গে অনেকগুলো তুলে যেটা ভালো হল সেটা থেকে ফোটো তৈরি করা হতো । ফোটো তোলা হতো ক্যামেরা স্ট্যাণ্ডের ওপরে ক্যামেরা রেখে । ফোটো তোলার সময়ে হাত দিয়ে লেন্সের ঢাকনা খুলে, ‘স্মাইল প্লিজ’ বলে দু’এক সেকেণ্ডে আবার লেন্স পরিয়ে দেয়া হতো । স্টুডিওতে ফোটো তুলতে হলে প্রথম দিকে কুঁজোর মাপের হাজার-দুহাজার ওয়াটের বাল্বের আলোয় ফোটো তুলতে হতো, পরে অবশ্য বাল্বের মাপ ছোটো হয় । এখন প্রযুক্তির এত উন্নতি হয়েছে যে ড্যাগেরোটাইপের ঝঞ্ঝাটকে মনে হয় প্রাগৈতিহাসিক । বাবা এই ডিজিটাল প্রযুক্তি দেখে যেতে পারলেন না । শৈশবে তাঁকে দেখতুম শহরের বাইরে ফোটো তুলতে যাচ্ছেন কাজের লোক রামখেলাওন সিংহের কাঁধে ক্যামেরার বাক্স চাপিয়ে, নিজে ক্যামেরা তিন-ঠেঙে স্ট্যান্ড আর মাথায় চাপা দেবার কালো মোটা কাপড় । বাবা মারা যাবার পর যখন পাটনার বাড়ি ছেড়ে চলে আসলুম, দেখেছিলুম তিনতলার একটা ঘরে থাক-থাক কাচের প্লেট, কড়িকাঠ থেকে র‌্যাকে সাজানো । ইতিহাসবোধ না থাকলে যা হয়, আমি বা দাদা আমরা কেউই সেগুলো সংরক্ষণের প্রয়াস করিনি । দাদার ছেলেরা কাচঅলাকে ওজন দরে বিক্রি করে দিয়েছে ।

         দাদুর ছেলেরাও ফোটো তোলা আর ছবি আঁকায় সড়গড় হলে দাদু ১৮৮৬ সালে ফোটোগ্রাফির ভ্রাম্যমান ব্যবসা আরম্ভ করেছিলেন, এবং সংস্হাটির তিনি নাম দেন ‘রায়চৌধুরী অ্যাণ্ড কোং’ । হুগলি জেলায় গঙ্গা নদীর ধারে উত্তরপাড়ার পাশে এখন যেখানে বালি ব্রিজের সংলগ্ন ফ্লাইওভার, তখন একটা রাস্তা ছিল, সেখানে একটা দপতর খুলে নকাকাকে চালাতে বলেছিলেন । কিন্তু নকাকা তা সামলাতে পারেননি, স্ত্রীর সঙ্গে অবনিবনার দরুণ হঠাৎ বৈরাগ্যে আক্রান্ত হবার কারণে ।  দাদুর অমন ঘোরাঘুরির কারণে বড়জেঠা, মেজজেঠা, বাবা, পিসিমা আর নকাকার স্কুলে পড়া হয়ে ওঠেনি । দাদু হঠাৎ মারা যাবার পর তাঁর ছেলেরা পাটনায় থিতু হতে বাধ্য হন এবং তখন নতুনকাকা আর বিশেখুড়ো মানে ছোটোকাকাকে স্কুলে ভর্তি করা হয় । নতুনকাকা নিয়মিত স্কুল করলেও ছোটোকাকার আগ্রহ না থাকায় তিনি পড়াশোনা ত্যাগ করেন । জেঠাকাকাদের যেটুকু পড়াশোনা হয়েছিল তা রাজদরবারগুলোর শিক্ষকদের অবদান । দাদু সংস্কৃত আর ফারসি লিখতে-পড়তে পারতেন । বাবা ইংরেজি ভাষা আয়ত্ব করে ফেলেছিলেন ।

         দাদু বিভিন্ন সময়ে আফগানিস্তানের কাবুল-কান্দাহার এবং পাকিস্তানের বাহাওলপুর, চিত্রাল, হুনজা, ফুলরা, মাকরান ও লাহোরে  ছিলেন। আফগানিস্তানে ব্রিটিশদের যুদ্ধ আরম্ভ হবার পর লাহোরে চলে যান । বড়জেঠার মুখে শুনেছি যে বাহাওলপুরের সেই সময়ের ডাকটিকিটে আমিরের পোরট্রেট ছিল দাদুর আঁকা । ওই অঞ্চলের ছাগল, ভেড়া, দুম্বা ইত্যাদির মাংস আর শুঁটকিমাংস খাওয়ার সঙ্গে ঠাকুমা আর বাবার ভাইরা নিজেদের মানিয়ে নিলেও বাবা পারেননি, এবং তিনি সারা জীবন শাকাহারী হয়ে যান । বাবার মুখে শুনেছি যে বাজারে ঝোলানো গোরু, মোষ, ইয়াক আর কাটা উটের মাংস দেখার পর উনি আর মাংস খেতে পারতেন না, তাই নিরামিশাষী হয়ে যান । দুম্বা  একরকমের ভেড়া যার ল্যজের জায়গায় বাড়তি মাংস গজায়, আর বাড়তি লেজের মাংস, বড়জেঠার বক্তব্য অনুযায়ী, ছিল খুবই সুস্বাদু ।

         ফোটোগ্রাফির সূত্রেই দাদুর সঙ্গে উত্তর চব্বিশ পরগণার পাণিহাটি-নিবাসী আমার দাদামশায় কিশোরীমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরিচয় হয়েছিল । কিশোরীমোহন ছিলেন ম্যালেরিয়া রোগের উৎস আবিষ্কারক রোনাল্ড রসের সহগবেষক । রোনাল্ড রস স্বদেশে ফিরে যাবার পর কিশোরীমোহন ম্যালেরিয়া রোগের কারণ ও তা প্রতিরোধ করার জন্য গ্রামে-গঞ্জে ম্যাজিক লন্ঠনে স্লাইড দেখিয়ে প্রচার করতেন । এই স্লাইডগুলো তৈরি করে দিয়েছিলেন দাদু । কিশোরীমোহন তাঁর বড় মেয়ে অমিতার সঙ্গে বাবার বিয়ে দেন । বিয়ের সময়ে মায়ের বয়স ছিল ১৪ বছর আর বাবার ১৮ বছর । কিশোরীমোহন সম্পর্কে উইকিপেডিয়া আর নেটে অন্যত্র তথ্য আছে । বাবা নিজে শাকাহারী হলেও মাকে বাধ্য করেননি তাঁর আহারের রুচি অনুসরণ করতে ; আমি আর দাদা দুজনেই আমিষাশী । দাদু প্রতি বছর দুর্গা পুজোর সময়ে উত্তরপাড়া ফিরে যেতেন ; ছেলেদের বিয়ে দেয়ার কাজটাও সেরে নিতেন সেই সময়টুকুর মধ্যে ।

         দ্বারভাঙ্গা মহারাজের পরিবারের সদস্যদের ছবি আঁকার জন্য ডাক পড়লে দাদু সপরিবারে পাটনায় যান, আর সেখানেই হৃদরোগে মারা যান । পুরো পরিবার নির্ভরশীল ছিল দাদুর ওপর ; তিনি মারা যেতে ঠাকুমা বিপদে পড়েন । পাটনায় তাঁরা একটি মাটির দেয়ালের ওপর টালির চালার বাসা ভাড়া করে বিভিন্ন উপায়ে টাকা রোজগারের চেষ্টা করেন, কিন্তু কিছুতেই সফল না হতে পারায় বাবা দাদুর প্রতিষ্ঠিত সংস্হা ‘রায়চৌধুরী অ্যাণ্ড কোং’ এর সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে ছবি আঁকা আর ফোটো তোলার একটি স্হায়ী দোকান চালাবাড়ির কাছেই, বিহার ন্যাশানাল কলেজের সামনে, খোলেন । ঠাকুমার জাঠতুতো ভাই কলকাতা মিউজিয়ামের সহকিউরেটার লেখক ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়ের সুপারিশে বড়জেঠা  পাটনা মিউজিয়ামে চতুর্থ বর্গের একটি চাকরি পান । পরে অবশ্য তিনি নিজের যোগ্যতার দরুন পদোন্নতি পেয়ে পাটনা মিউজিয়ামের ‘কিপার অব পেইনটিংস অ্যাণ্ড স্কাল্পচার’ হয়েছিলেন। বড়জেঠা মাটির মূর্তি তৈরি করায় আর অয়েল-পেইন্টিং আঁকায় দক্ষ ছিলেন । ছোটোবেলায় ছুটির দিনে আমি মিউজিয়ামের এক থেকে আরেক প্রান্ত ঘুরে বেড়াতুম, চৌকাঠ ডিঙোতেই প্রাগৈতিহাসিক থেকে মহেঞ্জোদরোয়, সেখান থেকে অশোকের রাজত্বে !

         দাদু মারা যেতে, ঠাকুমা উত্তরপাড়ার বসতবাড়িতে, যা অবহেলায় খণ্ডহরের চেহারা নিয়ে ফেলেছিল,  থাকতে চলে গেলে, পরিবারের আর্থিক ভার পুরোপুরি এসে পড়েছিল বাবার কাঁধে । ঠাকুমা ছেলেদের আর তাদের বোউদের বলে দিয়ে যান যে আমার মা সংসারটাকে সামলাবেন । যেকোনো কারণেই হোক মেজজেঠা, নকাকা আর বিশেখুড়োর স্বভাব আর আচরণ এমন হয়ে দাঁড়িয়েছিল যে আমরা শৈশবে শুনতুম যে এঁরা কিছুটা অপ্রকৃতিস্হ, আধপাগল । দোকানের কাজে তাঁদের তেমন আগ্রহ ছিল না ; তাঁরা প্রকৃতই শিল্পীচরিত্রের বিপন্ন বিস্ময়ে আক্রান্ত অস্বাভাবিকতা পেয়েছিলেন । মেজজেঠা ঘুম থেকে উঠতেন দুপুরবেলা, তারপর জলখাবার খেতেন কোনো দোকান থেকে লুচি আলুর তরকারি কিনে রাস্তায় দাঁড়িয়ে, কখনও চুল আঁচড়াতেন না, বাড়ি ফিরে দাঁত মেজে স্নান করে বিকেলের দিকে দোকানে পৌঁছোতেন, এবং একটি ফোটোর সামনে বসে তাকে মাসখানেকে আঁকা অপূর্ব  ছবিতে দাঁড় করাতেন । নকাকা অনেক ভোরে উঠতেন, সবাইকে, শিশুদেরও ‘আপনি’ সম্বোধন করতেন, স্ত্রীর সঙ্গে বিশেষ কথা বলতেন না, জুতো পরার অভ্যাস ছিল না, কোরা ধুতি পরতেন, নিজের ধুতি-শার্ট নিজেই কাচতেন, কোনো এক ফাঁকে দোকানে গিয়ে বাড়িতে করার জন্য বাবার কাছ থেকে ‘কাজ’ চেয়ে আনতেন । ছোটোকাকা মাঝরাতে নিজের ঘরে ছোটোকাকিমার নানা আঙ্গিকের পোশাকহীন ফোটো তুলতেন আর দোকানে গিয়ে বাবাকে সাহায্য করার নাম করে ডার্করুমে ঢুকে সেই ‘অপ্সরা’ ফোটোগুলো প্রিন্ট করে নিতেন । উনি যখন উত্তরপাড়ায় পাকাপাকি চলে গেলেন তখন তাড়াহুড়োয় অ্যালবামগুলো নিয়ে যেতে ভুলে যান । আমি আর পিসতুতো দাদা সেগুলো আবিষ্কার করেছিলুম । ছোটোকাকা ৯০ বছর বয়সে মারা যান, নিঃসন্তান ; উত্তরপাড়ার বাড়ির অংশ ছোটো শালার প্রথম পক্ষের মেয়েকে দিয়ে গেছেন ।        

 নয়

         বাবা ভোরবেলা বেরিয়ে যেতেন আর ফিরতেন বেশ রাত করে । ফোটো তোলা, জিনিসপত্র বিক্রি আর ডার্করুমের কাজ তাঁকে একা করতে হত বলে ভোরবেলা জলখাবার খেয়ে সোজা গিয়ে ডার্করুমে ঢুকতেন, তারপর রাতে দোকান বন্ধ করার পর আবার ঢুকতেন ডার্করুমে । বিহারে সেসময় তাঁর কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল না, তাই কাজ পেতে অসুবিধা হতো না । মা আর বাবা দুজনের চরিত্রেই যে বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল তা হল সবায়ের সঙ্গে মানিয়ে চলা । বাবা বাড়ির প্রধান রোজগেরে হলেও নিজের ভাইদের আর তাদের ছেলে-মেয়েদের, মানে আমাদের জাঠতুতো খুড়তুতো ভাইবোনদের, সমান চোখে দেখতেন। বড়জেঠা ইমলিতলা বাড়ির ট্যাক্স দিতেন আর সবজি কিনতেন, বাবা বাদবাকি সমস্ত খরচ করতেন, ঠাকুমাকে টাকা পাঠাতেন, উত্তরপাড়ার বাড়ির ট্যাক্স দিতেন । চালগমের দোকানদারকে মাসে একবার, মায়ের তৈরি ফিরিস্তির কাগজ, দোকানে যাবার পথে বাবা দিয়ে যেতেন আর সে ইমলিতলার বাড়িতে পাঠিয়ে দিত । পরিবারের সদস্যদের পোশাকের জন্য বাবা দর্জিকে বলে রেখেছিলেন, তার দোকানে গিয়ে মাপ দিয়ে দিতে হতো, সে তৈরি করে বাড়ি পাঠিয়ে দিত । একইভাবে ছিল জুতোর দোকানের সঙ্গে বন্দোবস্ত । চুল কাটার জন্য মাসে একবার নাপিত আসত, পরে বাবার কাছ থেকে টাকা সংগ্রহ করে নিত ।

         ইমলিতলার বাড়িতে বাবা-মা-দাদা-আমি যে ঘরটায় থাকতুম সেটাই ছিল বাড়ির সবচেয়ে ছোটো ঘর । লন্ঠনের আলোয় পড়াশুনা করতে হতো । চেয়ার-টেবিল ছিল না, দোকানের মালপত্র যে প্যাকিংবাক্সতে আসত তার ওপর চাদর পেতে বই রাখার ব্যবস্হা ছিল । পাড়ার কুসঙ্গ-কুখ্যাতির প্রভাব দাদার ওপর পড়তে পারে অনুমান করে ম্যাট্রিক পাশের পর ১৯৪৯ সালে দাদাকে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছিল পাণিহাটিতে থেকে কলকাতায় পড়াশোনা করার জন্য । কলকাতায় দাদা সিটি কলেজে ভর্তি হন । কলেজে বন্ধু হিসেবে পান সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, দীপক মজুমদার, আনন্দ বাগচী প্রমুখ তরুণ কবিদের । দাদা বিহার সরকারের মৎস্য বিভাগে চাকরি পেলে তাঁর পোস্টিঙের জায়গায় বন্ধুরা একা বা দলবল নিয়ে পৌঁছোতেন । ছোটোবেলায় আমি একবার তাড়ি খেয়েছিলুম, মানে পাড়ার এক সর্বজনীন দাদু খাইয়ে দিয়েছিল । মুখে তাড়ির গন্ধ পেয়ে মা আমায় আমাদের ঘরে শেকল তুলে বন্ধ করে দিয়েছিলেন ; বাবা রাতে বাড়ি ফিরলে শেকল খোলা হয় । মায়ের সব সময় আশঙ্কা ছিল যে আমরা দুই ভাইও মেজদার মতন অসামাজিক চরিত্রের মানুষ হয়ে যেতে পারি । পাড়ায় মেলামেশায় কোনো নিষেধাজ্ঞা কিন্তু ছিল না । ছোটোবেলায় চোর-পুলিশ খেলতে গিয়ে অনেকের শোবার ঘরে ঢুকে খাটের তলায় লুকোবার স্মৃতি আছে ।

         ইমলিতলার বাড়িতে জলের কল ছিল না ; বড়জেঠা তো অফিস চলে যেতেন, জল ভরে এনে দেবার লোক না এলে দুপুরে বাবা যখন দোকান থেকে আসতেন, অনেক সময়ে নিজের স্নান করার জল নিজেই কল থেকে ভরে আনতেন। শীতকালেও ঠাণ্ডা জলে স্নান করতেন । দাদা আর আমি ইমলিতলায় রাস্তার কল থেকে জল ভরে এনেছি, রাস্তার কলে স্নান করেছি । বাবার নির্দেশ ছিল যে বাড়ির সব কাজ আমাদেরও করতে হবে, প্রয়োজনে কয়লা ভাঙা আর উনোন পরিষ্কার, জঞ্জাল ফেলে আসাও । বাবা রাস্তার কলে স্নান করতে লজ্জা পেতেন । ২০০৫ – ২০০৮ নাগাদ আমি কলকাতার রাস্তা থেকেও খাবার জল ভরে আনতুম পেপসির বোতলে করে, কেননা তিন তলায় কোনো ভারি জলের টিন নিয়ে বা মিনারাল ওয়াটারের বড়ো বোতল নিয়ে রিকশাঅলা উঠতে চাইত না । মাঝে-মাঝে দাদার বাড়ি গিয়ে দুটো থলেতে পেপসির বোতলে জল ভরে আমি আর আমার স্ত্রী সলিলা রিকশা করে নিয়ে আসতুম নাকতলার বাড়িতে। এই সমস্ত অসুবিধার জন্যেই নাকতলার ফ্ল্যাটটা বেচে মুম্বাইতে একরুমের ফ্ল্যাটে চলে আসতে হয়েছে ।

         বাবা চিরকাল শাদা পাঞ্জাবি, ধুতি আর পায়ে পামশু পরতেন । তাঁর ভাইয়েরা শাদা ছাড়া অন্যান্য রঙের শার্ট বা পাঞ্জাবি পরলেও বাবার পোশাকের অন্যথা হতো না, শীতকাল ছাড়া, যখন উনি নস্যি রঙের শাল গায়ে দিতেন, বা ওই রঙের উলের পাঞ্জাবি পরতেন । দোকানে যাবার তাড়ায় বাবার দ্রুত হাঁটা অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল । ইমলিতলায় থাকতে দুবার ওনার পা দোকানে যাবার পথে  ভেঙে গিয়েছিল ; বাবার পা ভাঙা মানে আর্থিক দিক থেকে বেশ বিপজ্জনক অবস্হা ; দাদাকে গিয়ে দোকানে বসতে হত । উত্তরপাড়া থেকে চাকুরিহীন কোনো জ্ঞাতির ছেলেকে নিয়ে এলেও তাদের অবাঙালি পরিবেশে মানিয়ে নিতে এতই অসুবিধা হত যে কয়েক দিনেই তারা ফেরত চলে যেত । পরে দরিয়াপুরে গিয়ে বাবার যখন আরেকবার পা ভেঙেছিল তখন আমি দোকানদারি করেছি । গরিব হলে যা হয়, গতি কেবল সরকারি হাসপাতাল, সেখানে কিউ, কেননা প্রায়ভেটে কোনো নার্সিং হোম ছিল না সেসময়ে ; এখন তো প্রতিটি রাস্তায় একজন করে হাড়ের ডাক্তার । বড়জেঠির এক বান্ধবীর স্বামী ছিল ছুতোর ; ওনার পা ভেঙে যেতে, জেঠিমার বান্ধবীর  কথামতো বাবার পায়ে বসাবার জন্য ছুতোরকে দিয়ে কাঠের খাপ তৈরি করিয়ে পায়ে বেঁধে রাখার ব্যবস্হা হয়েছিল । প্রথমবার বানিয়ে দেয়া খাপটা দ্বিতীয়বার কাজে লেগে গিয়েছিল ।

         বিহার ন্যাশানাল কলেজের সামনে যে দোকান ছিল সেই বাড়ির মালিক উঠে যাবার নোটিস দিলে বাবা পড়েন মহাবিপদে । বিকল্পের সন্ধানে বেরিয়ে তিনি তখনকার বারি রোডে দরিয়াপুরে একটা চালাবাড়ি কেনেন ; সেটা ছিল একজন কামারের হাপর-বসানো ঘর, পেছনে আর পাশে সামান্য জমিতে গাঁজাগাছের ঝোপ । এই এলাকাটাও সেসময়ে গরিবদের পাড়া ছিল, ধারণার অতীত দুস্হ সুন্নি মুসলমানদের পাড়া । বিহার ন্যাশানাল কলেজের সামনে যে দোকান ছিল তার মালিকের বিরুদ্ধে মামলা চলে বেশ কয়েকবছর ; সেই সুযোগে দরিয়াপুরে দোকানঘর তৈরি করে ফেলা হয় । তৈরি হয়ে গেলে পুরোনো দোকানের পাট গুটিয়ে বাবা চলে আসেন দরিয়াপুরে । ‘রায়চৌধুরী অ্যাণ্ড কোং’-এর খ্যাতির কারণে পুরোনো খদ্দেররা দরিয়াপুরে আসত । এখন এই সংস্হা চালায় দাদার বড় ছেলে হৃদয়েশ, জাপানি কোম্পানির প্রস্তাবমতো দোকানের নাম পালটে ফেলেছে ।

         দরিয়াপুরে যখন দোকান তৈরি হচ্ছিল তখন আমি ওই বাড়িতে একা থাকতুম, কেননা ইমলিতলার প্রাত্যহিক মাতালদের চেঁচামেচি আর ঝগড়াঝাঁটির দরুন পড়তে বসে বেশ অসুবিধা হত । তাছাড়া দরিয়াপুরে ইলেকট্রিসিটি ছিল, কলের জল ছিল। ছোটোদের হাতখরচের জন্য বাবা টাকা দিতেন না ; বলতেন যার যা চাই জানিয়ে দাও, কিনে এনে দেব । স্কুলের বাৎসরিক ফলাফলের রিপোর্টে বাবা কখনও কাউকে ‘গুড’ দিতেন না । নব্বুইয়ের কোঠায় মার্কস পেলেও দিতেন না ; বলতেন আরও বেশি পেতে হবে । দরিয়াপুরের বাড়িতে একা থাকলে আমার চরিত্রদূষণ ঘটতে পারে অনুমান করে বছরখানেক পরে মা আর বাবা রাতে শুতে আসতেন । মা টিফিন ক্যারিয়ারে করে রাতের খাবার আনতেন । দিনের বেলা ইমলিতলায় গিয়ে খেতে হতো । দরিয়াপুরের বাড়িতে একা থাকার সময়ে বন্ধুদের নিয়ে কিঞ্চিদধিক চরিত্রদূষণ যে ঘটত না তা বলা যাবে না ।

 

         বাবা আর মা দুজনেই মন্দিরে গিয়ে পুজো দেয়া বা তীর্থকর্ম করা ইত্যাদিতে আগ্রহী ছিলেন না ; আমার মনে হয় কাজের চাপে উনি সংস্কারমুক্ত করে ফেলেছিলেন নিজেকে । পরে দোকানের কাজ ছেড়ে দেবার পর বাবা হিন্দুধর্ম আর ঈশ্বর দেবী-দেবতায় আশ্রয় নিয়েছিলেন । আমি কখনও বাবা-মাকে তীর্থক্ষেত্রে বেড়াতে যেতে দেখিনি ।   জেঠা-কাকারাও কেউ আগ্রহী ছিলেন না ; পাটনার বাইরে যেতে হলে তাঁরা যেতেন কেবল দেশের বাড়ি, অর্থাৎ উত্তরপাড়ায় । তবে বাবা নিয়মিত পৈতে বদলাতেন, একাদশীর দিন লুচি খেতেন । কালীঘাটের কালী আমাদের পারিবারিক দেবতা, যেহেতু তা আমাদের কোনো পূর্বপুরুষের প্রতিষ্ঠিত, সেকারণে বাড়িতে পারিবারিক দেবতা আর তার সেবাযত্ন করার প্রয়োজন হতো না । গলায় মালার মতন ঝুলিয়ে পৈতে পরতেন বড়জেঠা আর ছোটোকাকা, যদিও খাওয়ার কোনো নিষেধ মানতেন না, মেজজেঠা কখনও পৈতে পরতেন আবার কখনও কুলুঙ্গিতে তুলে রেখে দিতেন ।  দাদার আর আমার ছোটোবেলায় পৈতে হয়েছিল বটে কিন্তু আমরা বছর শেষের আগেই স্বরূপে এসে জলাঞ্জলি দিয়েছিলুম । পৈতেহীন হবার কারণে বাবা ক্ষুণ্ণ হয়েছিলেন বলে মনে হয় না ; এই প্রসঙ্গে কখনও কোনো কথা তোলেননি।

        মা, বাবা এবং শিক্ষক, যে তিনজন মানুষ ব্যক্তিজীবনের অভিমুখ গড়ে দেয়, আমার জীবনে মা আর বাবার ভূমিকাই প্রধান । প্রকৃত অর্থে আমি কোনো শিক্ষক সেই সময়ে পাইনি যখন তা জরুরি ছিল । প্রাইমারি স্তরে ক্যাথলিক কনভেন্টে পেয়েছিলুম সিসটার আইরিনকে আর যাযক ফাদার হিলম্যানকে । শৈশবের বইতে বর্ণিত সমস্ত জিনিস যাতে নিজের চোখে দেখে যাচাই করতে পারি তার দিকে খেয়াল রাখতেন সিসটার আইরিন আর স্বদেশ আয়ারল্যাণ্ডে গেলে অনেককিছু সংগ্রহ করে আনতেন, স্কুল সংল্গন ফার্মে নিয়ে গিয়ে ফল, ফুল, গাছ, জন্তুতের চাক্ষুষ করাতেন । ফাদার হিলম্যানের সৌজন্যে আমি কনভেন্টে ভর্তি হয়েছিলুম ; উনি ফোটো তুলতে ভালোবাসতেন আর বাবার সঙ্গে ওনার বন্ধুত্ব হয়ে গিয়েছিল, আমাকে দোকানে দেখতে পেয়ে সাড়ে তিন বছর বয়সে নিয়ে গিয়ে ট্রানজিশান ক্লাসে ভর্তি করে দেন; সপ্তাহে একদিন চার্চে বাইবেল ক্লাসে নিয়ে গিয়ে ওল্ড আর নিউ টেস্টামেন্টের কাহিনি শোনাতেন । পরে যখন ব্রাহ্ম স্কুল রামমোহন সেমিনারিতে ক্লাস সিক্সে গিয়ে ভর্তি হলুম, কোনো শিক্ষকের সঙ্গে নৈকট্য গড়ে উঠল না ; এই স্কুলে যিনি আমাকে বাংলা সাহিত্যে আগ্রহী করলেন, তিনি গ্রন্হাগারিক নমিতা চক্রবর্তী , আমার ‘রাহুকেতু’ উপন্যাসের সুমিতাদি।

         মা আর বাবার কাছ থেকে যা পেয়েছি তা হল সততা, নিজের বিশ্বাসের সমর্থনে একক লড়াই করার চারিত্র্য । বাবা দোকানদার হয়েও সৎ ছিলেন, যা আজকের দিনে অকল্পনীয় । কেবল সৎ নয়, তাঁর ছিল সৎসাহস । হাংরি আন্দোলনের সময়ে আদালতের মামলায় বন্ধুরা যখন আমার বিরুদ্ধে মুচলেকা লিখে রাজসাক্ষী হয়ে গেল, আর লড়াইটা আমার একক হয়ে দাঁড়াল, তখন আমি আমার চরিত্রগঠনে মা আর বাবার অবদানের গুরুত্ব বুঝতে পেরেছিলুম । বাবা কলকাতায় লালবাজারে গিয়ে পুলিশ কমিশনারের সঙ্গে তর্ক করেছিলেন যে অমন মকদ্দমা কেন করা হয়েছে আর তখনই জানা যায় যে কলকাতার কয়েকজন সমাজকর্তা-বুদ্ধিজীবীর নালিশ কাজ করেছে এর পেছনে, যাদের বলা হয় এসট্যাবলিশমেন্টের ধারক-বাহক । মকদ্দমা চলার সময়ে বাবা কয়েকবার পাটনা থেকে দুএক দিনের জন্য দোকান বন্ধ করে কলকাতার ব্যাংকশাল কোর্টে আসতেন । যারা আমার সঙ্গে গ্রেপ্তার হয়েছিল আর চামড়া বাঁচাবার জন্য রাজসাক্ষী বা সরকার পক্ষের সাক্ষী হয়ে গেল তাদের পরিবারের কাউকে কোনো দিন আসতে দেখিনি কোর্টে ; অর্থাৎ তাঁরা তাঁদের ছেলের সাহিত্যকর্মকে সমর্থন করতে পারেননি।

         বাবা আমাদের বাড়ির ক্ষমতাকেন্দ্র হলেও ছোটোদের কাউকে শাসন করতেন না । তাঁর কাছে অভিযোগ জানালে তিনি বলতেন, “অ, ও শুধরে নেবে ।” তারপর যার বিরুদ্ধে অভিযোগ তাকে বলতেন, “কী, শুধরে নিবি তো ? বড় হয়েছিস, শুধরে নিতে শেখ।” বড়জেঠা শাসন করতেন, নিজে থেকে নয়, জেঠিমা-কাকিমারা অভিযোগ করলে, কিন্তু অভিযোগ করলে তিনি বিরক্ত হতেন । বড়জেঠার দুই মেয়ের বিয়ে আমার শৈশবেই হয়ে গিয়েছিল । মেজজেঠা আর কাকাদের মেয়েদের বিয়ের ব্যবস্হা করেন বাবা, তাঁদের শৈল্পিক উদাসীনতায় ওদের বয়স বেড়ে যাচ্ছিল ; তাছাড়া বিয়ের খরচের ব্যাপারটাও ছিল । মেজজেঠার এক মেয়ে মীনাক্ষী একজন বিহারি ছেলেকে বিয়ে করতে চাইলে মেজজেঠা অমত জানান ; মেজজেঠার অমত হওয়ায় বাবা তাঁকে বোঝালেও তিনি রাজি হননি । বাবা তাঁর বিরুদ্ধতা করে মেজজেঠাকে অপমানিত করতে চাননি । শেষে আমাকে টাকাকড়ি দিয়ে বলেন যে ওরা কোথায় গিয়ে বিয়ে করতে চাইছে সেখানে গিয়ে সম্প্রদান করে আয় । আমার ছোটোশালী রমলা এক যুবককে বিয়ে করতে চাইলে নাগপুরে অভিভাবকরা রাজি হলেন না, তখন তার বিয়েও দরিয়াপুরের বাড়ি থেকে হল । রমলা ২০১৬ সালে হার্ট অ্যাটাকে মারা গেছে ।

দশ

        দাদা যখন চাইবাসায় পোস্টেড ছিলেন সেখানে সুধীর চট্টোপাধ্যায়ের মেয়ে বেলার সঙ্গে পরিচয় হয়, আর দাদা পাটনায় গিয়ে বাবাকে বিয়ের কথা জানাতে তিনি তক্ষুনি রাজি হয়ে যান । দাদা আসলে ওই বাড়ির সাহিত্যানুরাগী বিবাহিতা যুবতী মন্টিদির প্রেমে পড়েছিলেন, মন্টিদি আর দাদা দুজনেই স্হিতাবস্হা বজায় রাখা মনস্হ করেন । পরিবারটির সঙ্গে যাতে চিরকালীন যোগাযোগ থাকে তাই দাদা বেলাকে বিয়ে করেন । শক্তি চট্টোপাধ্যায় তাঁর উপন্যাস ‘কিন্নর কিন্নরী’তে বিস্তারিত লিখেছেন এ-ব্যাপারে ।

         আমি অফিসের কাজে নাগপুরে গিয়ে কয়েকদিনের পরিচয়ের পরই রাজ্যস্তরের হকি খেলোয়াড় আর সহকর্মী সলিলা মুখোপাধ্যায়কে বিয়ের প্রস্তাব দিতে ওর অভিভাবকরা সেদিনেই সায় দেন । বাবাও টেলিগ্রামে অনুমোদন জানিয়ে দেন । কয়েকদিনের পরিচয়ের পরই এই বিয়েকে মা আর বাবা বলতেন, “তোদেরটা বৈপ্লবিক বিয়ে, পরিবারদের মাথা গলাতে হল না, হপ্তার পর হপ্তা রোদ-বৃষ্টি ঠেঙিয়ে প্রেম করতে হল না, ব্যাস, একজন আরেকজনকে বললি বিয়ে করব, করে ফেললি ।”

       আমি লেখালিখির চেষ্টা করছি, মায়ের কাছে সেকথা জানতে পেরে ১৯৫৮ সালে বাবা আগফা-গেভার্ট কোম্পানির একটা দামি ডায়েরি দিয়েছিলেন, আর তাতেই আমি কবিতা মকসো করা শুরু করেছিলুম । বাড়িতে ইংরেজি ভাষার পছন্দের বইয়ের সংগ্রহ গড়তে চাই জানতে পেরে বাবা বলতেন বইয়ের তালিকা তৈরি করে দিতে । বইয়ের দোকানে গিয়ে বই পছন্দ করে নিতুম আর পেয়ে যেতুম । বাংলা বই, বিশেষ করে কবিতার বই দাদা কলকাতা থেকে নিয়ে আসতেন । পরে বিদেশি বন্ধুদের কাছ থেকেও প্রচুর বই আর পত্রিকা পেতুম । হাংরি আন্দোলনের সময়ে কলকাতার পুলিশ আমায় গ্রেপ্তার করতে এসে আমার বইগুলো নিয়ে সারা ঘরে ছুঁড়ে-ছুঁড়ে ফেলেছিল । বাবার দোকানের কাচের আলমারি ভেঙে দিয়েছিল । মায়ের বিয়ের তোরঙ্গ ভেঙে লণ্ডভণ্ড করার সময়ে ওনার বিয়ের পুরোনো বেনারসি ভাঁজ থেকে ছিঁড়ে গিয়েছিল । কিন্তু আমাকে যখন কোমরে দড়ি বেঁধে, হাতে হাতকড়া পরিয়ে রাস্তা দিয়ে হাটিয়ে নিয়ে গেল পুলিশ,  তখন বাবাকে বেশ বিচলিত দেখেছিলুম, যা উনি সচরাচর হতেন না । ছোটোবেলায় আমি বাড়ি থেকে বেশ কয়েকবার পালিয়েছি ; ফিরে এসে মনে হয়নি যে বাবা বিচলিত ; উনি আমাকে এই প্রসঙ্গে কোনো কথা জিজ্ঞাসাও করতেন না । পরে, আমার মেয়ের কাছে গল্প করেছিলেন যে আমি ওনাদের না জানিয়ে বাড়ি থেকে পালাতুম।

         ১৯৬৩ সালের এপ্রিলে অ্যালেন গিন্সবার্গ আমাদের দরিয়াপুরের বাড়িতে এসে ছিলেন কয়েক দিন । তিনি নানা শহরে ঘুরে বেশ কিছু ফিল্মে ফোটোম তুলেছিলেন আর সেগুলো বাবাকে দেন ডেভেলাপ করার জন্য । বাবা ডেভেলাপ করে দ্যাখেন গিন্সবার্গ কেবল নুলো, ভিখারি, দুস্হ, পথের পাশে অসুস্হ লোক, কুষ্ঠরোগি– এদের ফোটো তুলেছে । তখন গিন্সবার্গের সঙ্গে ওনার একচোট ঝগড়া হয়েছিল । বাবা গিন্সবার্গকে বলেছিলেন, “তোমরা যতই বড় কবি-লেখক হওনা কেন, আমাদের দেশটাকে এইভাবেই দেখাতে চাইবে ; কেন ? ফোটো তোলার আর কোনো বিষয় কি নেই !” গিন্সবার্গ সম্পর্কে যে গবেষকরা আমার সঙ্গে দেখা করতে আসেন তাঁদের সবাইকে এই ঘটনার কথা জানালেও, কেউই নিজেদের লেখায় এই বিতর্কটা অন্তর্ভুক্ত করেননি । পরে , পাটনার বাড়িতে বা কলকাতায়, বিদেশিরা এলে আমি তাঁদের বলতুম যে ফোটো তুলে থাকলে দেশে ফিরে ডেভেলাপ আর প্রিন্ট করিও ।

         আমার মায়ের জন্ম ১৯১৬ সালে,   পানিহাটিতে । মায়ের ডাক নাম ভুল্টি ।  মায়ের বাবা, কিশোরীমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়, পানিহাটির  রামচাঁদ ঘাট রোডে ‘নিলামবাটী’ নামে এক একান্নবর্তি পরিবারের সদস্য ছিলেন ।  কিশোরীমোহন ছিলেন, কলকাতা ও সেকেন্দ্রাবাদে, ম্যালেরিয়া রোগের কারণ নির্ণয়কারী  ও ১৯০২ সালে সেকালে নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত ডাক্তার রোনাল্ড রস-এর সহকারী । তাঁর অবদানের জন্য ১৯০৩ সালে দিল্লি দরবারের সময়ে কিশোরীমোহনকে সম্রাট সপ্তম এডওয়ার্ডের স্বর্ণপদক দেয়া হয়েছিল । ২০১৩ সালে প্রকাশিত তাঁদের ‘দি ফ্লাইং পাবলিক হেল্হ টুল : জেনেটিকালি মডিফায়েড মসকিটোজ অ্যান্ড ম্যালেরিয়া কন্ট্রোল’ ( সায়েন্স অ্যাজ কালচার, ল্যাংকাস্টার, ইউ কে ) গবেষণাপত্রে উলি বিজেল এবং ক্রিস্টোফ বোয়েট অধ্যাপকদ্বয় জানিয়েছেন যে উপনিবেশের নেটিভ হবার কারণে কিশোরীমোহনের নাম রোনাল্ড রসের সঙ্গে সুপারিশ করা হয়নি ।    সমাজ সেবার কাজে স্ত্রীর গয়না এবং পৈতৃক সম্পত্তি বেচে, আর সঞ্চয়ের পুঁজি খরচ করে তিনি দেউলিয়া হয়ে যান, আর মায়ের বিয়ের কয়েক বছর পরই মারা যান ।

            সংসারের ক্ষমতা মায়ের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়ে যাবার পর মায়ের চরিত্রে লুকোনো কিশোরীমোহন বেরিয়ে আসে । প্রায়ই দেখতুম ইমলিতলার প্রতিবেশিরা  এসে মায়ের কাছে নিজেরদের আর্থিক দৈন্য আর পারিবারিক দুর্দশার গল্প করছে, আর মা তাদের সাহায্য করছেন, পয়সাকড়ি দিয়ে তো বটেই, চাল-ডাল, পুরোনো বাসনপত্র আর ব্যবহৃত জামাকাপড় দিয়ে । মায়ের বোনেদের বিয়ে আরও গরিব পরিবারে হয়েছিল বলে পুজোয় পাওয়া শাড়ি-চটি ইত্যাদি নিজে না পরে বোনেদের বা নিলামবাটীর দুস্হ জ্ঞাতিদের পাঠিয়ে দিতেন বা যখন নিজে যেতেন তখন নিয়ে যেতেন ।  যদিও মা পরিবারের ডি ফ্যাক্টো কর্ত্রী ছিলেন, কিন্তু ইমলিতলার বাড়িতে মা-বাবা-দাদা-আমি থাকতুম সবচেয়ে ছোটো ঘরটায় । লন্ঠনের আলোয় পড়াশোনা ।

         সবাইকে নিয়ে মিলেমিশে থাকার চারিত্রবৈশিষ্ট্যের দরুণ বড়জেঠা সংসারের সমস্ত ব্যাপারে মায়ের সঙ্গে পরামর্শ করতেন । আমার মনে আছে, ১৯৫১ সালে যে বছর প্রথম সাধারণ নির্বাচন হয়েছিল, কোন দলকে ভোট দেয়া হবে তা নিয়ে আলোচনার শেষে মায়ের নির্ণয় সবাই মেনে নিয়ে ছিলেন, অর্থাৎ যার যে দলকে ইচ্ছে ভোট দেবে ।  কলকাতায় নাকতলায় থাকতে অবাক লাগত দেখে যে বাড়ির কর্তা যে দলের সমর্থক, পরিবারের সকলেই সেই দলকে ভোট দ্যায়, অথচ তারাই আবার ডাইন্যাস্টিক পলিটিক্সের তর্ক তোলে !

         স্কুলে ভর্তি হয়ে টের পাই যে মা শুদ্ধ হিন্দি জানেন না, ইমলিতলার ‘ছোটোলোকি’ বুলি দখল করে ফেলেছেন, আর তার বহু শব্দ যে শুদ্ধ হিন্দিতে অশোভন, এমনকি অশ্লীল, তা উনি অনেক পরে জানতে পারেন, যখন আমরা ইমলিতলা ছেড়ে দরিয়াপুরে সুন্নি মুসলমান পাড়ায় চলে যাই । পানিহাটিতে মেয়েদের স্কুল তখনও ছিল না বলে মা নিরক্ষর ; নিজেকে শিক্ষিত করে তোলেন দাদা স্কুলে ভর্তি হবার পর ।

         ইমলিতলার বাড়িতে হিন্দুত্ব সামলাবার কাজ ছিল পুজারী বাড়ি থেকে আসা বড়-জেঠিমার । সেকারণে মা এবং কাকিমারা প্রতিদিনের ধর্মাচরণ থেকে নিজেদের আর আমাদের মুক্ত রাখতে পেরেছিলেন । জনৈক পাদরির আর্থিক সৌজন্যে প্রাইমারি স্তরে আমি ক্যাথলিক স্কুলে পড়েছিলুম ; মা ঘটিতে গরম জল ভরে আমার শার্ট-প্যান্ট আয়রন করে রাখতেন। আমার বাংলা বনেদ নষ্ট হয়ে যাচ্ছিল বলে মায়ের নির্দেশে আমাকে ব্রাহ্ম স্কুলে ক্লাস সিক্সে ভর্তি করা হয়েছিল ।

            দরিয়াপুরে পাকাপাকি চলে আসার পরও ইমলিতলার সদস্যদের দায়িত্ব মা ছাড়েননি ; সপ্তাহে এক দিন গিয়ে টাকাকড়ি আর চাল-ডাল-আনাজের ব্যাপারটা সামাল দিয়ে আসতেন । গোলা রোডের এক বানিয়ার দোকানে তালিকা দিলে সে যাবতীয় জিনিস ইমলিতলা আর দরিয়াপুরে পাঠিয়ে দিত । পুজোর সময়ে পোশাকের ভেদাভেদ মেটাতে সবায়ের জন্য ছিল একই কাপড়ের শার্ট আর ফ্রক, এমনকি জেঠা-কাকারাও সেই কাপড়ের শার্ট পরতেন ।   দাদা চাকরি পাবার পর দাদার চাকুরিস্হলে গিয়ে মা মাঝেমধ্যে সপ্তাহখানেকের ছুটি কাটিয়ে আসতেন । দরিয়াপুরের বাড়িতে কাজের মাসি রান্না করে দিত । নিম্নবর্ণের হাতে রাঁধা ভাত বাবা খেতেন না বলে ভাতটা আমিই বসিয়ে দিতুম । রান্নায় মাকে সাহায্য করতে হতো বলে ডাল-তরকারিও রাঁধতে শিখে গিয়েছিলুম ।    

         হাংরি আন্দোলনের সময়ে দাদার আর আমার বন্ধুরা কোর্টে আমার বিরুদ্ধে সাক্ষী হয়ে গেছেন শুনে মা, যিনি ছিলেন অত্যন্ত চাপা প্রকৃতির, নিজের ক্রোধ সামলাতে পারেননি । আমি তাদের চিঠি ইত্যাদি ছিঁড়ে ফেলছি দেখে বলেছিলেন, ‘সব নিয়ে গিয়ে গুয়ের ডাবায় ফ্যাল ; সব কটাই আহাম্মক, অকৃতজ্ঞ ।’  আমার আর দাদার লেখালিখি সম্পর্কে উনিই ছিলেন প্রধান উৎসাহদাত্রী । ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ নামে যে কবিতাটা নিয়ে মকদ্দমা হয়েছিল সেটা মা-বাবা-ঠাকুমা সকলেই পড়েছিলেন ।   হৃদরোগের লক্ষণগুলোর সঙ্গে তখন আমরা ততটা পরিচিত ছিলুম না, মাও তাঁর কষ্টের কথা বলতেন না । লখনউতে তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ১৮ই নভেম্বর ১৯৮২  মারা যান ।           

         ১৯৫০ থেকে চিনতুম ফণীশ্বরনাথ রেণুকে, হিন্দি ভাষার সাহিত্যিক, যখন তিনি নেপালের রাণাদের বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে আহত হয়ে ভর্তি ছিলেন পাটনার ভোমরপোখরের নার্সিং হোমে, বড়দিদের বাড়ির ঠিক সামনে, লতিকাদি সেখানে নার্স ছিলেন, লতিকা রায়চৌধুরী, রেণু ওনার প্রেমে পড়ে দ্বিতীয়বার বিয়ে করে রাজেন্দ্রনগরের ফ্ল্যাটে থাকতেন, জানতেন না আমি লেখালিখি করি । ১৯৬৪ সালে গ্রেপ্তার হবার পর জানলেন, আর হিন্দি পত্র-পত্রিকায় আমাদের নিয়ে নিয়মিত লিখলেন, যখন কিনা বাঙালা পত্র-পত্রিকা সেসময়ে আমাদের পোঁদে বাঁশ করে চলেছে। রেণু উদ্বুদ্ধ করলেন এস এইচ বাৎসায়ন অজ্ঞেয়কেও, আর উনিও আমাদের হয়ে কলম ধরলেন । রেণুর “বনতুলসী কা গন্ধ” বইতে “রামপাঠক কা ডায়েরি” নামের গদ্যে দীর্ঘ আলোচনা করেছেন হাংরি আন্দোলন নিয়ে । ওনার রাজেন্দ্রনগরের বাড়িতে প্রায়ই যেতুম সন্ধ্যায় মদ খেতে, আমি নিয়ে যেতুম গাঁজা, বেশ জমতো, আমাদের আড্ডা, অনেক তরুণ হিন্দি কবি-লেখকও আসতো । সকালে পৌঁছোলে তাড়ি খাওয়া হতো, তাড়ির ওপর এলাচগুঁড়ো ছড়িয়ে দিয়ে । রেণু মারা গেছেন ১৯৭৭ সালে । লতিকাদিকে রেণুর প্রথম পক্ষের ছেলেরা গ্রামে নিয়ে গিয়েছিল, সেখানে মারা যান ।

         ১৯৬৫ সালে হিন্দি কবি রামধারীসিং দিনকর ডেকে পাঠিয়েছিলেন ওনার বাড়ি, রেণুর বাড়ি যাবার পথেই ওনার বিশাল বাড়ি, ১৯৬৪ পর্যন্ত এম পি ছিলেন, সবে ফিরেছেন দিল্লি থেকে, বললেন, “আমি তোদের সম্পর্কে শুনেছি আর তোদের বিপ্লবকে সমর্থন করি।” বিপ্লব শব্দটা ব্যবহার করতে শুনে কিছুটা অবাক লেগেছিল, বুঝতে পেরে উনি বললেন, উনি একজন “খারাপ গান্ধীবাদী” কেননা যখন দ্রোহ দরকার তখন গান্ধীবাদে নিজেকে বেঁধে রাখলে চলে না । বলেছিলেন, যেখানে-যেখানে বক্তৃতা দিতে ডাকবে সেখানে-সেখানে তোদের সম্পর্কে বলব।” ওনার বক্তৃতার ফলে বহু হিন্দি পত্রিকায় আমার ফোটো আর হাংরি আন্দোলনের খবর বেরোতো । দিনকর মারা গেছেন ১৯৭৪ সালে ।

         ১৯৬৪ সালে তারাশঙ্করের টালার বাড়িতে দেখা করতে গিয়েছিলুম, তারাশঙ্করের মামারা পাটনার, ওনারা বলেছিলেন দেখা করতে, তারাশঙ্কর কথা বলতে চান আমাদের সঙ্গে । ওনাকে আমাদের বুলেটিনগুলো দিলুম । রেখে নিলেন । মেদিনীপুরে বক্তৃতা দিতে গিয়ে হাংরি আন্দোলনের বিরুদ্ধে বলে এলেন । পরে যখন রামধারি সিং দিনকরকে তারাশঙ্করের বক্তৃতার কথা বলেছিলুম, দিনকর বলেছিলেন, “ওয়হ পুরানে খেয়ালাতকে হ্যাঁয়, জানতা হুঁ উনহে।”

         ১৯৭৫ নাগাদ কলকাতায় দেবী রায়ের সঙ্গে দেখা করতে গেলে দেবী জানালো যে অন্নদাশঙ্কর রায় আমার সঙ্গে দেখা করতে চান । জানি না ১৯৬৪-৬৫ সালে দেখা করতে চাননি কেন । আমি তখন লেখালিখি করতে পারছি না, মনেই আসতো না কোনো কথা গুছিয়ে লেখার । ওনার বাড়ি গেলুম । রফিক হায়দার নামে একজন বাংলাদেশী কবি ছিলেন ওনার বাড়িতে, কিন্তু মনে হল তিনি আমাদের আন্দোলনের কথা শোনেননি, সম্ভবত তখন কলকাতা থেকে আন্দোলন চলে গেছে উত্তরবঙ্গে আর ত্রিপুরায় । অন্নদাশঙ্কর নিজের কথাই বলে গেলেন, আমি আর দেবী শ্রোতা, কেন দেখা করতে চেয়েছিলেন বুঝতে পারিনি । ওনার কথাগুলো দেবী লিখে নিয়েছিল একটা খাতায় ।

         ১৯৪৮ সালে, প্রথম নিল ডাউন হয়েছিলুম রামমোহন রায় সেমিনারিতে, হিন্দি স্যারের ক্লাসের বাইরে বারান্দায়, বৃষ্টিতে হিন্দি বই ভিজে চুপচুপে হয়ে গিয়েছিল বলে, বলেছিলেন, “রাষ্ট্রভাষাকা সন্মান করনা সিখো গধহা কঁহিকা ।” বারান্দার বাইরে তখন বৃষ্টি পড়ছে, তখনও জানতুম না যে ওটা রাষ্ট্রভাষা নয়, সরকারি ভাষা । গাধাদের দেখেছি বটে চুপচাপ দাঁড়িয়ে বৃষ্টিতে ভিজছে, আর ছাতামাথায় মানুষদের দিকে তাকিয়ে কান নাচিয়ে হাসছে ।

এগারো

         ১৯৮৮ সালে, ট্যুরে যাবো বলে লখনউয়ের বাস স্ট্যাণ্ডে অপেক্ষা করছিলুম ; হঠাৎ অধস্তন এক যুবতী অফিসার যার বয়স আমার অর্ধেক কোথা থেকে উদয় হয়ে আমার হাত ধরে বলে উঠল “চলুন পালাই” । বললুম, আমি রায়বরেলি গ্রামীণ ব্যাংকের বোর্ড মিটিং অ্যাটেণ্ড করতে যাচ্ছি । যুবতী বলল, “তাতে কী হয়েছে, আমিও যাবো আপনার সঙ্গে, অপেক্ষা করব ওদের দপতরে, মিটিং শেষ হয়ে গেলে দুজনে উধাও হয়ে যাবো কোথাও, আমার কাছে যথেষ্ট টাকা আছে, তৈরি হয়েই বেরিয়েছি ।” শুনে, মাথায় আর রগে হাতুড়ির আওয়াজ শুনতে পেলুম । এই অফিসার আমারই বিভাগের, প্রায় প্রতিদিন বাংলা শাড়ি আর শাঁখা-রুলি পরে অফিসে আসে, বলল, “আপনাকে যে ভালোবাসি তা আপনার স্ত্রী জানেন ।” কোনো রকমে ছাড়ালুম । মেয়েটি আত্মহত্যা করে নিলে । নিজের কাপুরুষ চরিত্রের জন্য বেঁচে গেলুম, ওফ । বিয়ের পর আমি আর কোনো লফড়ায় ফাঁসাতে চাইনি নিজেকে, সুযোগ পেলেও, মনে হয়েছিল এবার শান্তি দরকার, তবুও নিজেই অশান্তি ডেকে এনেছি, ভেতরের লোচ্চা-লোফার কামড়ে ধরেছে ।

         ১৯৯০ সালে,হিমালয়ের তরাইতে দেশি গোরুর সমীক্ষা করতে গিয়ে এক মরা বাঘিনীর প্রেমে পড়েছিলুম, মরা বাঘিনীর গোলাপি যোনি দেখে চাঞ্চল্য ঘটছিল লিঙ্গে । রাতের বেলায় বাঁশে চিৎ করে চার পা বেঁধে বাঘিনীকে রাখা হয়েছিল এক পাঞ্জাবি শিখের গ্যারাজে । প্রচুর ওল্ড মঙ্ক টেনে শুয়ে পড়েছিলুম বাঘিনীর বুকে, মাই চুষেছিলুম, আর কাঁদছিলুম, বাঘিনীকে ভালোবেসে, বীর্য ঝরিয়ে, উত্তরণের আরাম হল।  কবিসন্মিলন পত্রিকার সহসম্পাদক শংকর চক্রবর্তী এই ঘটনা নিয়ে লেখা আমার কবিতা পড়ে ব্যোম ; মধ্যবিত্ত বাঙালির কল্পনাজগত আক্রান্ত হলে বুঝতে পারি অস্তিত্ব ফাটিয়ে চৌচির করে আত্মসন্দেহের নীহারিকাপূঞ্জ ভরে দিতে পেরেছি । আসলে তাদের অভিজ্ঞতা বেশ সীমিত, ভারতবর্ষকে দেখেছে পর্যটকের চোখ দিয়ে । এটা নিয়ে আমি একটা গল্প লিখেছিলুম, অজিত রায়ের ‘শহর’ পত্রিকায়, ‘দুধসন্দর্ভ’ নামে।

         ১৯৮০ সালে, কোমরের তলা থেকে বিকলাঙ্গ এক অপরূপ সুন্দরী তরুণী কেরানিকে বাড়ি নিয়ে যাবার জন্যে আয়া আসেনি একদিন, ও যেতো পেরামবুলেটারের মতন একটা গাড়ি করে, কী করা যায় ভেবে উঠতে পারছিলুম না, কেরানি আর বিভাগীয়প্রধানের শ্রেণি-বিভেদ বেশ দৃষ্টিকটু । অফিস ছুটির পর আরেকজন মুসলমান অফিসারই ছিলেন আমার সঙ্গে, তিনি হিন্দু তরুণীকে তুলতে চাইলেন না, বাবরি মসজিদ তখন ভাঙা হয়ে গেছে, আমি পাছার তলায় হাত দিয়ে তুলে নিলুম, মনে হল তরুণীটি ইচ্ছেকরে নিজের যোনিকে আমার লিঙ্গের সঙ্গে চেপে ধরল, ওর হুইলচেয়ার ঠেলাগাড়ি পর্যন্ত নিয়ে যাবার সময় আমার প্রেমিকা-নিরপেক্ষ লিঙ্গ ফুলে উঠল, তরুণীর ইশারার  জন্য আপশোষ হল । ঘটনাটা নিয়ে আমার একটা ছোটোগল্প আছে, সুকুমার চৌধুরীর ‘খনন’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল, ‘অনিশ্চয়তা নিয়ে দুটি গল্পের বিনুনি : একটি প্রেমের অন্যটি রঙ্গকৌতুকের’ শিরোনামে । 

         ১৯৪৯ সালে, প্রথম স্ট্যাণ্ড আপ অন দি বেঞ্চ হয়েছিলুম, ইংরেজি ক্লাসে, ওয়র্ডসওয়র্থের ড্যাফোডিল্স কবিতা ব্যাখ্যা করার সময়ে আমি সিসটার আইরিনের দেয়া শুকনো ড্যাফোডিল্স ফুল দেখিয়ে বলেছিলুম, জানি স্যার, এই যে, বইয়ের ভাঁজ থেকে বের করে । শিক্ষক বলেছিলেন, “ইয়ার্কি মারবার জায়গা পাওনি, স্ট্যাণ্ড আপ অন দি বেঞ্চ।” উনি বুঝিয়েছিলেন যে কচুরিপানার বেগুনি রঙের ফুলকে বলে ড্যাফোডিল্স। যখন ইউরোপে গেলুম তখন পথের ধারে-ধারে দেখলুম ড্যাফোডিল্স ফুল, দেখলুম লাল রঙের ফুল যাকে ইউরোপীয়রা বলে পপি, অথচ যা পোস্তগাছের ফুল নয় ।    ১৯৪৯ সালে,দরিয়াপুর পাড়ায় সন্ধ্যায় মাতাল আর গঞ্জেড়ি মাস্তানদের মারামারি চেঁচামেচি চিৎকার শুরু হতো বলে, আমি তার চেয়েও জোরে চিৎকার করে পড়া মুখস্হ করার চেষ্টা করতুম। তার ফল হতো । বাইরের চেঁচামেচি বন্ধ হয়ে যেতো । দরিয়াপুরে আমাদের বাড়িটা ছিল একটা বাতিল গোরস্তানের ধারে ; গোরস্তানের কেয়ারটেকার আল্লু মিয়াঁ ঝুপড়ি তৈরি করে নিজের দুই মেয়েকে দিয়ে রাতের বেলায় ব্যবসা করাতো, তাদের বররা দালালের কাজ করতো, মাঝে-মাঝে টাকার বাঁটোয়ারা নিয়ে শশুর আর জামাইদের ভেতর ঝগড়া হতো, অকথ্য গালাগাল । সেটা ছিল ইমলিতলার পর আমার গালাগাল শেখার উঁচু ক্লাস ।

                   ১৯৯৪ সালে সলিলা চাকরি ছেড়ে দেবার পর ওকে সঙ্গে নিয়ে ট্যুরে যেতুম, পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে পরিচয় করানোর জন্যে । ১৯৯৫ সালে মালদায় গিয়ে স্তম্ভিত হলুম টেরাকোটা মসজিদ দেখে, তার আগে কেউ এই মসজিদগুলোর সংবাদ দেয়নি, সকলেই বিষ্ণুপুরের টেরাকোটা মন্দিরের কথা বলতো । সুবো আচার্যের বাড়ি বিষ্ণুপুরে, যখন গিয়েছিলুম তখন টেরাকোটা মন্দির দেখেছিলুম, ষোলো থেকে উনিশ শতকের মাঝে তৈরি । মালদায় গিয়ে জানলুম যে মসজিদগুলো তার বহু আগের । আদিনা মসজিদ তৈরি করিয়েছিলেন সুলতান সিকন্দর শাহ ১৩৬৪ থেকে ১৩৭৫-এর মাঝে । লোটন মসজিদ তৈরি হয়েছিল ১৪৭৫ সালে । ১৪৮০ সালে মিরশাদ খান তৈরি করিয়েছিলেন তাঁতিপাড়া মসজিদ । ১৫৩১ সালে কদম রসুল মসজিদ তৈরি করিয়েছিলেন সুলতান নুসরত শাহ ; এই মসজিদের কেয়ারটেকার একটা পায়ের ছাপ দেখিয়ে বলেছিলেন যে ওটা হজরত মোহম্মদের , শুনে পিলে চমকে গিয়েছিল, দেওবন্দিরা জানতে পারলে আস্ত খেয়ে ফেলবে লোকটাকে, সে আবার প্রতি সকালে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশ থেকে আসতো আর সন্ধ্যায় ফিরে যেতো । মসজিদগুলো দেখতে-দেখতে শৈশবের ইমলিতলা পাড়ার মসজিদের কথা মনে পড়ছিল, তার ভেতরেও আমাদের প্রবেশ অবাধ ছিল, এই মসজিদগুলোর মতন ।

          ১৯৬৫ সালে কলেজ স্ট্রিটে ছাতার খোঁচা দিয়ে এক ভদ্রলোক বললেন, “এই, তোরা আমার বাড়ি আসিস না কেন রে”?  সুবিমল বসাক ওনার কাছ থেকে ঠিকানা নিয়ে “আমরা যাবো যে কোনো দিন”, বলার পর উনি বললেন, “সকালের দিকে আসিস।” উনি চলে যাবার পর সুবিমল বলল, “জানো কে ? জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী।” গেলুম ওনার বাড়ি, মানিকতলায় নেমে, তারপর ধানখেতের ভেতরে আলের ওপর দিয়ে দূরে একটা চালাবাড়ি, সেরকমই নির্দেশ দিয়েছিলেন । আলের ওপর দিয়ে হাঁটার সময়ে বুঝতে পারলুম যে রাতের বেলায় সাপের ভয়ে ছাতাকে ছড়ির কাজে লাগান । ওনার বাড়িতে পৌঁছোলে, জানতে চাইলেন আমি কি-কি করেছি যে সবাই এতো চটে গেছে । সবই বললুম ওনাকে, মুখোশ, জুতোর বাক্সের রিভিউ, ব্ল্যাংক কাগজে গল্প, বিয়ের কার্ড, স্টেনসিল করা ড্রইং ইত্যাদি । বেশ হাসছিলেন শুনে, যখন শুনলেন যে জুতোর বাক্স রিভিউ করতে দিয়েছিলুম, তখন একেবারে জোরে-জোরে হাসতে লাগলেন । বললেন, “মামলা ঠুকেছে বলে বন্ধ করিসনি, তোরা না করলে কে-ই বা মুখোমুখি প্রতিবাদ করবে।” এখন ওই ধানখেতে আবাসনের পর আবাসন । বেশ কয়েকজন নামকরা কবি থাকেন সেই আবাসন-হয়ে-যাওয়া-ধানক্ষেতে । জানি না ধানক্ষেতের উড়ন্ত বাতাসের সবুজ গন্ধ তাঁরা পান কিনা ।

               ১৯৯৮ সালে কেদার ভাদুড়ির গাঙ্গুলিবাগানের বাসায় বসে মদ খাচ্ছি, একটি তরুণ প্রবেশ করতেই গম্ভীর হয়ে গেল কেদার, আমাকে বলল, পুরোটা চোঁচোঁ করে খেয়ে বাড়ি চলে যাও, কালকে আবার বসা যাবে। পরের দিন গিয়ে জানলুম তরুণটি কেদারের প্রথম পক্ষের ছেলে । টিউশানি করবার সময়ে কচি এক তরুণীর প্রেমে পড়ে তার সঙ্গে দৈহিক সম্পর্ক করে ফেলেছিল কেদার, তারপর তাকে বিয়ে করতে হয়েছিল, প্রথম বউকে ডিভোর্স দিয়ে । প্রথম বউয়ের ছেলে প্রতিমাসে খোরপোষের টাকা নিতে আসতো । কেদারের তরুণী বউ কখনও আসতো না গাঙ্গুলিবাগানের বাড়িতে, প্রতিবেশীদের কেউ একজন বলেছিল, “ও মা আপনার নাতনিও আছে, বলেননি তো !” তরুণী বউয়ের একটা মেয়ে হয়েছিল, তাকেও আসতে বারণ করে দিয়েছিল কেদার । কয়েক পেগের পর বলতো, “বড়ো যন্ত্রণা হে, বড়ো কষ্ট, বড়ো দুঃখ, ও শূলযাতনা তুমি বুঝবে না, কবিতায় লুকিয়ে রেখেছি, কাকেই বা বলব, কবিতাকেই বলি ।” কেদারের একটা চল্লিশ পাতার সাক্ষাৎকারে দ্বিতীয় পক্ষের বউ আর তার সঙ্গে আকস্মিক প্রেমের ঘটনার উত্তর দিতে চায়নি কেদার । কেদারের মৃত্যুর কথা জেনেছিলুম উত্তম দাশের ফোনে ।

         অশোক ফকিরের চম্পাহাটির চালাঘরে গিয়েছিলুম আমি আর সুবিমল ১৯৬৫ সালে, উনি পানের পাতায় আফিম চাটতে দিলেন, বেশ সুন্দরী বউ, অজন্তার দেয়ালে আঁকা নারীদের মতন বৌদ্ধ চোখ । ওই বউকে ফেলে অশোক ফকির এক বিদেশিনীর সঙ্গে আমেরিকায় হাওয়া । বিদেশিনী বউটা কিছুদিন আগে ইমেল করে নিজের জটাজুট সঙ্গে হরেকৃষ্ণ ছাপানো উত্তরীয় কাঁধে অশোক ফকির, ওর আর মন্দিরের ছবি পাঠিয়েছিল, গিন্সবার্গের লেখা চিঠি পাঠিয়েছিল যেগুলোর কপি আমেরিকায় অনামিকা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পাঠিয়েছিলুম । বিদেশিনী বউ বলেছিল অশোক ফকিরের আমেরিকাবাস নিয়ে একটা বই লিখেছে, কোনো পাবলিশার ছাপতে রাজি নয় । মার্কিন কনসুলেটে গিয়ে অশোক ফকির খবর যোগাড় করতো যে কারা-কারা কলকাতায় এসেছে আর কোন হোটেলে আছে । অশোক ফকিরের কারবার শুনে বাঙালি বউটার জন্যে মায়া হল । আমার লম্পট চোখ বুজলেই তার মুখ ভেসে ওঠে। আমেরিকাতেই মারা গেছে অশোক ফকির । শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় অশোক ফকিরকে নিয়ে একটা উপন্যাস লিখেছেন শুনেছিলুম ।   অশোক ফকিরের দেয়া আফিম খেয়ে প্রচণ্ড বৃষ্টিতে ওভারব্রিজের ওপর নেচেছিলুম আমি আর সুবিমল । অনেক রাত পর্যন্ত, সেসময়ে চম্পাহাটিতে এখনকার মতন নিত্যযাত্রীদের ভিড় ছিল না, একেবারে ফাঁকা স্টেশান, প্ল্যাটফর্মগুলোও ফাঁকা, অন্ধকারে ঢাকা । এখন চম্পাহাটিতে ট্রেন এলে নিত্যযাত্রীদের ঠেলাঠেলিতে অন্ধকার উধাও হয়ে যায়, ওরা সবাই যেন আফিম চেটে দৌড়োয় ।

         ২০০৭ সালে ইউরোপে গিয়ে নানা রকমের ওয়াইন খেয়ে আমি কোনো তফাত টের পাইনি, নেশার মাত্রাটুকু টের পেয়েছি, মদের চরিত্র নয় । গীর্জাতেও যে ওয়াইন তৈরি হয় তা জানতুম না ; গীর্জার ওয়াইন আর ফরাসিদেশের নাস্তিকদের কোম্পানির ওয়াইনে তফাত টের পাইনি । এদেশে কোনো মন্দিরে মদ তৈরি হলে ধুন্ধুমার বেধে যাবে । আসলে ইমলিতলার আর খালাসিটোলার দিশি মদ ঠররা আর বাংলার কয়েকটা আস্তরণ জমে গেছে আমার জিভের ওপর । বাংলা মদকে পিসেমশায় বলতেন ধান্যেশ্বরী ।     ১৯৬৫ সালে বেনারসে একজন হিপি চরস দিয়ে হনুমান তৈরি করত আর তার ল্যাজ ভেঙে ফুঁকতে দিতো । আরেকজন হিপি গঙ্গাজলের ঘটিতে এল এস ডি মিশিয়ে আনতো, তার সামনে জিভ বের করলে সে কয়েক ফোঁটা ফেলে দিতো । গঙ্গা তখন থেকেই ভিষণ নোংরা অথচ হিন্দুরা হোলি গ্যাঞ্জেস বলে বলে দুয়েকজন হিপি ওই জলে স্নান করতো । তার আগে অ্যালেন গিন্সবার্গ ওই নোংরা জলে স্নান করে ফোটো তুলিয়ে হিপিদের জন্য পথ দেখিয়ে গেছে । পাটনায় গঙ্গার ধারে হিসি করতে বললে, গিন্সবার্গ বলেছিল, তোমার হোলি রিভার, আর তুমি বলছ তার তীরে হিসি করতে !

                ১৯৮১ সালে লখনউতে চম্বল অঞ্চলের ট্যুরে বাবা মুস্তাকিম নামে এক ডাকাতের সঙ্গে দেখা হয়েছিল, যে আমার মাথায় হাত রেখে বলেছিল, “জিতে রহো” । ডাকাতের আশীর্বাদের দরুণ স্হানীয় কৃষি আধিকারিক বলেছিল, চম্বলে আর কেউ আপনার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না, যে গ্রামে ইচ্ছে যেতে পারবেন । সত্যিই, বহুবার চম্বলে ট্যুরে গেছি, প্রতিটি গ্রামে লোকেরা বেশ আপ্যায়ন করেছে, জমিদাররা তাদের বাড়ির পায়খানায় হাগতে দিয়েছে ।  ১৯৮৩ সালে গোরখপুরে ট্যুরে গিয়েছিলুম, সেখানকার মন্দিরে শিবের পুজোয় ত্রিশূল উৎসর্গ করতে হয়, যা আমার অধস্তন অফিসার করতে চাইছিল । আমি বাইরে বাগানে ছায়ায় অপেক্ষা করছিলুম । আচমকা একজন জটাধারী সাধু, ঠোঁটের কোনে ছিলিমের ফেনা,  জড়িয়ে ধরে বলে উঠেছিল, “জো তুমসে দুষমনি করেগা ওয়হ তুমসে পহলে মর জায়গা ।” কারোর মারা যাবার খবর পেলে তার সম্পর্কে সন্দেহ হয়, সাধুটার কথার জন্যে হয় না ।

                          ১৯৫৫ সালে ইনফ্যানট্রির ক্যাম্পে গিয়ে ভোর রাতে উঠে কুড়ি-তিরিশজন সবাই ল্যাংটো হয়ে হাগতে যেতুম, গোল হয়ে হাগতে বসতুম, পাদবার খেলা খেলতুম, ছোঁচাতুম চা খাবার অ্যালুনিমিয়াম মগ দিয়ে, যৌথভাবে উলঙ্গ হতুম, কোনো লজ্জা-বালাই নেই, প্রাগৈতিহাসিক কালখণ্ডে ফেরার সুযোগের জন্য সকলে মিলে হইচই করতুম ।    ১৯৬১ সালে অফিসের সহকর্মী সুশীল কুমার, মণিমোহন মুখোপাধ্যায়, অরুণ মুখোপাধ্যায় আর আমি চারজনে মিলে গিয়েছিলুম শিমুলতলায় । রাতের বেলায় একটা পাহাড়টিলায় চারজনে উলঙ্গ হয়ে ওঠার প্রতিযোগীতা করেছিলুম । সম্ভবত সুশীল কুমার জিতেছিল । পরের দিন একটা ছোট্টো পুকুর বা হাঁটুজল ডোবায় আমি, সুশীল আর অরুণ তিনজনে জলের তলায় লুকিয়ে লিঙ্গ দাঁড় করিয়ে জলের ওপরে ভাসিয়েছিলুম ; মণিমোহন চেঁচিয়ে উঠেছিল, “সাপ সাপ জলে সাপ আছে” । মণিমোহনকে সেই থেকে বলা হোতো “চপড়গাণ্ডু”; জল থেকে উঠে মণিমোহনকে বলেছিলুম, আপনাকে ওয়াটার অর্কিড দেখাতে চাইছিলুম।  “ডুবজলে যেটুকু প্রশ্বাস” উপন্যাসে আছে ঘটনাটা । ওয়াটার অর্কিড প্রদর্শনীর কথা বুড়ো বয়সেও মনে রেখেছিল মণিমোহন । সুশীল লিভারের ক্যানসারে মারা গেছে, মণিমোহন কিডনির । অরুণ পাগলিয়ে গেছে ওর জামাইয়ের পাল্লায় পড়ে, ও অবশ্য রিজার্ভ ব্যাঙ্ক পাটনায় চাকরির সময়েও পাগলিয়ে ছিল, ঘটনাটা আছে আমার ‘ডুবজলে যেটুকু প্রশ্বাস’ উপন্যাসে । মণিমোহনের মেয়ের সঙ্গে দাদা নিজের বড়ো ছেলের বিয়ে দিয়েছিল । অরুণের সঙ্গে দাদা বিয়ে দিয়েছিল নিজের এক শালির ।     

          ১৯৯৫ সালে মুম্বাই থেকে ফিরে সন্দীপনের সঙ্গে দেখা করতে গিসলুম ওনার চেতলার ফ্ল্যাটে, কি-নোংরা কি-নোংরা, ঘরে বসে আছেন মেঝেয়, সামনে একটা জলচৌকি, পাশে একটা থলে থেকে “আজকাল” সংবাদপত্রে জড়ো হওয়া পাঠকদের চিঠিতে চোখ বোলাচ্ছিলেন আর বাছাই করছিলেন । বললুম, লেখালিখি না করে এসব ফালতু কাজে সময় নষ্ট করছেন কেন, সামান্য টাকার জন্যে । উনি বললেন গল্পের ম্যাটার পেয়ে যাই । ভেতরে গিয়ে স্ত্রীকে কিছু বললেন, স্ত্রী সেজেগুজে বেরিয়ে গেলেন । যেমন কিপ্টে ছিলেন তেমনই, জামা-প্যান্ট পরে নিয়ে, দরোজায় তালা ঝুলিয়ে, বললেন, “চলো, সুকৃতিতে গিয়ে চা খাওয়া যাবে”। ট্যাকসির ভাড়া আমিই দিলুম, চা-কাটলেটের পয়সা আমিই দিলুম । মনে হল, এই একবার আড্ডাই যথেষ্ট, ওনার সেই উইট ফুরিয়ে গেছে, সেই যখন হাওড়ায় সাইকেলে চেপে ভোরবেলায়  দেবী রায়ের বাড়িতে হাংরি বুলেটিনের জন্যে লেখা দিতে আসতেন । সন্দীপন মারা গেছেন ২০০৫ সালে । এখন বুড়ো হয়ে টের পাই যে এই বয়সে পৌঁছে ঘরদোরের ধুলোবালি জমে থাকাটা কোনো গুরুত্বের ব্যাপার নয় ।

          ১৯৬৪ সালে হাতকড়া পরাবার সময়ে, কোমরে দড়ি বাঁধার সময়ে, পুলিশের মুখময় আলো খেলা করছিল, যেন আধুনিকতার ওপর ওদের একচ্ছত্র অধিকার, যেন এনলাইটেনমেন্ট কাকে বলে ওরাই কেবল জানে । কোমরে দড়ি বাঁধা আর হাতে হাতকড়া পরানোর ব্যাপারটা এনলাইটেনমেন্টের সঙ্গেই এসেছিল। রাস্তা দিয়ে যখন হাঁটিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল, পাড়ার কুকুরগুলোও আমার পেছন-পেছন কৈলাশযাত্রায় হেঁটেছিল ।                       ২০১১ সালে সৃজিৎ মুখোপাধ্যায় “বাইশে শ্রাবণ” ফিল্মে গৌতম ঘোষকে একজন পাগল হাংরিয়ালিস্ট কবি হিসাবে তুলে ধরলে, নিবারণ, যার লেখা কোথাও কেউ ছাপতে চায় না, রবীন্দ্রনাথ নামে পুলিশের এক খোচরকে, যে আবার লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদক,  মোবাইলে বারবার কবিতা ছাপানোর অনুরোধ করে, সেই চারশোবিশ ফিল্ম দেখে সবচেয়ে আনন্দ পেয়েছিল শুভা । কেন ? হাংরি আন্দোলনের কবিকে সৃজিৎ বদনাম করে, তাকে দিয়ে বইমেলায় আগুন ধরিয়ে, ধ্বসিয়ে দিয়েছে, তাই । না, সৃজিৎ আমার বা অন্য কোনো হাংরি কবির অনুমোদন নেয়নি, সম্ভবত এসট্যাবলিশমেন্টকে খুশ করার জন্য হাংরি আন্দোলনের কবিকে অহেতুক ঢুকিয়েছে কাহিনিতে ।  কাহিনি লেখককে অত্যন্ত অসৎ বলা ছাড়া আর কীই বা করা যেতে পারে। ফিল্মটায় যাদের নাম উল্লেখ করেছিল পরমব্রত, তাতে শৈলেশ্বরের নাম ছিল না, ও নিজের টাকলা গুরুদেবকে ধরে সৃজিৎকে দিয়ে আন্দোলনকারী হিসেবে নামটা ঢুকিয়েছিল, অথচ আন্দোলনের বিরুদ্ধে মুচলেকা দিয়ে মামলায় রাজসাক্ষী হয়েছিল ।

          সৃজিৎ ফিলমটায় একজন লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদককে পুলিশের খোচর হিসেবে দেখিয়েছে, এই ঘটনাটা সত্যি । পবিত্র বল্লভ নামে কুঁজো এক যুবক “উপদ্রুত” নামে একটা লিটল ম্যাগাজিন বের করত, বাসুদেব দাশগুপ্তের সঙ্গে বসত কফিহাউসে, সে ছিল পুলিশের ইনফরমার, হাংরি আন্দোলনের বুলেটিন, বই ইত্যাদি গিয়ে জমা দিত লালবাজার প্রেস সেকশানে । বাসুদেব মাঝে-মাঝে বলত বটে যে মুখোশ পাঠানো ঠিক হয়নি, জুতোর বাক্স দেয়া উচিত হয়নি, স্টেনসিল-ড্রইং কফিহাউসে বিলোনো ঠিক দেখায় না, ইত্যাদি-ইত্যাদি, কিন্তু সেই কথাগুলো যে পবিত্র বল্লভের, তা জানতে পারি যখন পবিত্র বল্লভ পুলিশের পক্ষের সাক্ষী হয়ে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে বেমালুম বলে গেল যে সে আমাকে চেনে, কফিহাউসে  আমার সঙ্গে আড্ডা দিয়েছে, তার কাছে আমি লেখা চেয়েছি, ইত্যাদি ।

বারো

          ১৯৯২ সালের ৭ই ডিসেম্বর, তখন আমি মুম্বাইতে, ওয়েস্টার্ন এক্সপ্রেস থেকে ডান ডিকে টার্ন নিয়ে মাহিমে ঢুকবো, দেখি দু দল মানুষ লাঠি, তরোয়াল, বর্শা, বন্দুক নিয়ে মারামারি করছে, পুলিশের দেখা নেই, মানুষ তরোয়ালের আঘাতে লুটিয়ে পড়ছে দেখে আর এগোলুম না, সোজা ব্যাক করে বাড়িতে । তার আগের দিন বাবরি মসজিদ ভাঙা হয়েছে বলে দুএক জায়গায় মারপিট হয়েছিল, কিন্তু এরকম খুনোখুনি আমি আগে দেখিনি । দাঙ্গা কাকে বলে তার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা হল । ভাগ্যিস গাড়িটা ছিল, তাই পালাতে সুবিধে হল, কেননা রাস্তায় বাস, অটো, ট্যাক্সি কিছুই দেখিনি ফেরার সময়ে, কেবল পলায়নকারীদের গাড়ি । কেন যে দাঙ্গা হয়, কেন একজন মানুষ ভিড়ের অংশ হতে রাজি হয়, অন্য সম্প্রদায়ের মানুষকে কাটতে বেরিয়ে পড়ে, জানি না ।

          ১৯৯৩ সালের ১২ই মার্চ, আমি ভিলে পার্লে বিল্ডিঙের অফিসের অ্যাডমিনিসট্রেটিভ ইনচার্জ । অধস্তন অফিসার কয়েকজন, “বাড়িতে কাজ আছে”,  বলে ছুটি নিয়ে কেটে পড়ল । একটু পরে মহিলা অফিসাররা এসে বলল যে শহরে গোলমাল চলছে স্যার আমরা বাড়ি যেতে চাই, কী গোলমাল জানে না, বললুম ঠিক আছে, যাও । তারপর শিব সেনা করে এমন একজন এসে বলল যে, স্যার শহরে পর-পর বোমা ফাটছে, কিছু একটা গোলমাল শুরু হয়েছে, হয়তো ট্রেন-বাস সব বন্ধ হয়ে যেতে পারে । হেড অফিসে ফোন করে জানতে পারলুম যে, হ্যাঁ, পুলিশ থেকে জানিয়ে দিয়েছে নানা জায়গায় বোমা ফাটানো হয়েছে, অফিস ছুটি করে বন্ধ করে দিন । পরের দিন কাগজে পড়লুম যে সন্ত্রাসবাদীরা ষড়যন্ত্র করে বোমা ফাটিয়েছে, অনেক মানুষ মারা গেছে । তার কিছুদিন পরে জানলুম কাণ্ডটা দাউদ ইব্রাহিম নামে একজন মাফিয়ার চেলাদের, যারা ঘটনার আগেই দুবাই পালিয়েছে । ঘটনাটার কথা মনে পড়লে ভয়ার্ত মহিলাদের মুখগুলো মনে ভাসে, তাঁদের কয়েকজন বুড়ি হয়ে স্বাস্হ্যের অবনতির কারণে মারা গেছেন ।

                  আমাদের বাড়িতে, ইমলিতলায়, দরিয়াপুরে, উত্তরপাড়ায়, জোরে পাদা আর ঢেঁকুরতোলায় কোনো বিধিনিষেধ ছিল না, বড়ো-ছোটো নির্বিশেষে সকলেই জোরে পাদতো আর ঢেঁকুর তুলতো । আমি এখনও জোরে পাদি, চেপে যাই না । এই এখন লিখতে-লিখতে পাদলুম বলে ইপিফ্যানির গর্ব হলো । কলকাতায় যে সাহিত্যসভাগুলো হয়, তাতে কাউকে পাদতে শুনিনি, কেউ কেউ পোঁদ একপাশে উঁচু করে, কবিতার শ্বাস নিচ্ছে তা দেখেছি ।    ৩০শে এপ্রিল ২০০৪ সাহিত্য অকাদেমির টেলিগ্রাম পেলুম যে ওরা আমাকে পুরস্কৃত করেছে ধর্মবীর ভারতীর “সুরজকা সাতওয়াঁ ঘোড়া” অনুবাদের জন্যে । পেয়েই মাথা গরম হয়ে গেল, নিজেকে শুনিয়ে বললুম, “কোন ইডিয়ট আমার নাম সুপারিশ করেছে, স্কাউণ্ড্রেলরা তো জানে আমি এইসব সাহিত্যিক তিকড়মবাজিতে নেই”। তার আগে আর পরেও, বহু মানুষকে, যাদের ইনটেলিজেন্ট বলে চালানো হয়েছে,  তাদের মনে হয়েছে স্টুপিড । প্রত্যাখ্যান করে সঙ্গে-সঙ্গে একখানা চিঠি দিলুম সাহিত্য অকাদেমিকে জানিয়ে যে, As a matter of priciple I do not accept literary and cultural prizes, awards, lotteries, grants, donations, windfalls etc. They deprave sanity. প্রত্যাখ্যান করে, ইপিফ্যানির গর্ব হল । পুরস্কার যে প্রত্যাখ্যান করেছি তা শঙ্খ ঘোষ জানতেন না, প্রণবকুমার চট্টোপাধ্যায়কে বলেছিলেন, তাই বুঝি, আমি জানতাম না তো ! প্রণব আবার চটে গিয়ে একটা কপি পাঠিয়েছিল ওনাকে!

                 ১৯৬৪ সালে পিসেমশায় যে উকিলকে হাংরি মামলার জন্যে বাছাই করেছিলেন, তার দপতর সোনাগাছির ঠিক উল্টো দিকে । উনি অঞ্চলের রেগুলার ভিজিটার ছিলেন বলে তাদের উকিলকে চিনতেন । পিসেমশায় বলেছিলেন, “এর মতন ফৌজাদরি উকিল সস্তায় পাবিনে।” উকিলের ঘরে বসে দেখতে পেতুম ফি শনিবার পার্বতীচরণ মুখোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে পুরো কৃত্তিবাস গ্যাঙ চলেছে ভেতরে । সেন্টুদা একবার বললেন, চল চল, ওরা যে বাড়িটায় ঢুকবে তার উল্টো দিকের বাড়ির বারান্দায় উঠে ওদের কারবার দেখতে পাবি । সত্যিই তাই । উল্টোদিকের বাড়ির দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখতে লাগলুম বুদ্ধদেব বসুর বদল্যার বইয়ের প্রভাব । অর্ধেক জীবন, সম্পূর্ণ জীবন, টুকরো জীবন ইত্যাদি স্মৃতিকথায় এনারা সবকিছু চেপে গেছেন।

         ১৯৭৬ সালে ট্যুরে যাচ্ছিলুম হাজারিবাগে, একটা গাড়ি ভাড়া করে, সঙ্গে আমার অধস্তন অফিসার। অফিসের এক পিওন, তার নাম “ডুবজলে যেটুকু প্রশ্বাস” আর “জলাঞ্জলি” উপন্যাসে দিয়েছি রসিক পাসওয়ান। আসলে পিওনটা ছিল রাজপুত, গোপাল সিং, কিন্তু এক পাসওয়ান মেয়েকে বিয়ে করার ফলে উঁচু জাতের পিওনরা ওর সঙ্গে মিশত না, রাজপুত-ভূমিহার অফিসাররাও ওর সঙ্গে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করত । ও বলল ওকে ওর গ্রামে ড্রপ করে দিতে, আমাদের যাবার পথেই পড়বে । এক জায়গায় গাড়ি থামাতে বলে ও বলল, জঙ্গলের ভেতরে ওর গ্রামে যেতে । চললুম ওর সঙ্গে, এতো ভেতরে তো গ্রাম দেখিনি তখনও । একটা ফাঁকা জায়গায় পৌঁছে দেখলুম কিশোর-কিশোরীদের বিয়ে হচ্ছে । গোপাল সিং তখন জানালো যে ও “মালে পার্টি” করে । তখন মাওবাদীদের উদ্ভব হয়নি, মার্কসিস্ট-লেনিনিস্টদের সংক্ষেপে বলা হতো মালে । বলব না যে শুনে কিছুটা অস্বস্তি হয়নি । দেখলুম যে জোড়ায়-জোড়ায় কিশোর-কিশোরী আর যুবক-যুবতীরা বসে আছে আর তাদের বিয়ে দিচ্ছে একজন বাঙালি যুবক, ময়লা ধুতি-পাঞ্জাবি, কাঁধে ব্যাগ, যে বইটা থেকে মন্ত্র পড়ছে সেটা “রেড বুক” । আমি নেপাল থেকে “রেড বুক” কিনে এনেছিলুম বলে দেখেই টের পেলুম । আদিবাসী যুবক-যুবতীর বিয়ে হচ্ছে ইংরেজি মন্ত্র পড়ে । বিয়ে দিয়েই যুবকটি উধাও হয়ে গেল । গোপাল সিং ওর নাম বলতে চাইল না । আমি “ডুবজলে যেটুকু প্রশ্বাস” আর “জলাঞ্জলি” উপন্যাসে এই যুবকটির নাম দিয়েছি অতনু চক্রবর্তী, অবশ্য অতনু চরিত্রে বহু পরিচিত বন্ধুসহ আমার নিজের জীবনের উপাদান আছে । গোপাল সিং ওই বিয়ের পর অফিসে ফেরেনি। আমিও অফিসে ফিরে চেপে গেলুম যে ওকে আমরা লিফ্ট দিয়েছি ।

          ১৯৬৫ সালে ডেভিড গারসিয়া নামে এক হিপি এসেছিল, গ্রিসে জুতোর দোকানে কাজ করে টাকা যা জমিয়েছিল তা নিয়েই এসেছিল, বলল, বাঙালি মেয়ের সঙ্গে প্রেম করতে চায় । দুদিনে কোথ্থেকে পাওয়া যাবে বাঙালি প্রেমিকা । অগত্যা সোনাগাছিতে ঢুঁ, কিন্তু দুপুরে নয়, ভিজিটিং আওয়ার সন্ধ্যায় । একটা কচি মেয়েকে পছন্দ হল ডেভিডের । মেয়েটার নাম মনে আছে, বেবি । বেবি বলল, ও বাবা, এতগুলো হাঘরেকে সামলাতে পারবো না, এই সায়েব আর কোনো একজন । সকলে প্রস্তাব দিল ফষ্টিনষ্টি করতে দিতে হবে। তাতে বেবি রাজি । ঘরে ঢুকে মাটিতে পাতা বিছানায় বেবি বসতেই বাসুদেব চকাচক চুমু খেয়ে নিল জড়িয়ে।  বেবির অনুরোধে আনানো হল দু-বোতল বাঙলা । খেলুম সবাই মিলে, টনক গোলমেলে হয়ে উঠলে কে যে বেবির কোথায় হাত ঢোকাচ্ছিল তার ঠিক নেই। বিপদ দেখে বেবি বলল, তোমরা বেরোও, আমি সায়েবের সঙ্গে পিরিত করে নিই । ডেভিড বেরোলো পিরিত করে, বলল, সাচ এ টিনিউইনি কান্ট অ্যান্ড স্মল বুবস, ইট ওয়াজ ওয়ানডারফুল । বেবি বুকের ওপর আঁচল ফেলে দরোজার ফাঁক থেকে মুখ বের করে বলল, আরেকজন কে আসবে চলে এসো । ঘোষভাইদের মধ্যে একজন তড়াক করে ঢুকে গেল আর মিনিট পাঁচেকেই সেরে বেরিয়ে এলো । হাঘরেদের খরচটা আমি দিয়েছিলুম । পরে, বেবির ঘরে বাসুদেব-অবনী-শৈলেশ্বর প্রায়ই যেতো, বাসুদেবের চিঠিতে বেবির বাড়ি বদলের দুঃখও আছে ।

          ডেভিড গারসিয়াকে নিয়ে দুমকা গিয়েছিলুম, দুমকায় দাদার বাড়িতে পায়খানার সামনে যে কাঁঠালগাছ ছিল তাতে এঁচোড়ের গা্য়ে প্যান্ট-শার্ট ঝুলিয়ে পায়খানায় ঢুকতে হতো । ডেভিড বলল ওদের গ্রামে ফিরে গিয়ে ও এই ধরনের বন্দোবস্ত করবে যাতে গাছে হয়ে থাকা ফলের গায়ে পোশাক ঝোলানো যায় । ভাঙের শরবত খেয়ে আমাদের সঙ্গে দোল খেলে ডেভিড জানতে চাইল এটা কি রিলিজিয়াস ফেসটিভাল । ওকে জানালুম যে হ্যাঁ, এটা একজন পলিগ্যামিস্ট ব্ল্যাক গডের স্প্রিং সিজন সেলিব্রেট করার ফেস্টিভাল ।

          পালামৌয়ের সদর শহর ডালটনগঞ্জে দাদার বাড়িতে ছিলুম ১৯৬৭ সালে, হরিণের ঠ্যাং দিয়ে গেল একজন সাঁওতাল, বঁটি দিয়ে কেটে রান্না হলো আর মহুয়ার রুটিসহ মহুয়ার মদ দিয়ে খাওয়া হলো, আমি কলকাতা থেকে কেস জিতে পৌঁছে গিয়েছিলুম ডালটনগঞ্জে, তাই সেলিব্রেট করা হলো বিহারি স্টাইলে, যদিও এখন শহরটা ঝাড়খণ্ডে ।   ডালটনগঞ্জে পৌঁছেছি শুনে স্হানীয় কবিরা একটা আড্ডার ব্যবস্হা করেছিল, যাকে ওদের ভাষায় বলে “গোষ্ঠী”, তাতে আমি আর দাদা মহুয়ার মদ খেয়ে বেশ ভালো বক্তৃতা দিয়েছিলুম ; ওখানেই একটা প্রেসে ছাপিয়েছিলুম অশ্লীলতা সম্পর্কে ম্যানিফেস্টো, “ইন ডিফেন্স অফ অবসিনিটি” পরে যেটা নানা ভাষায় অনুবাদ হয়েছে, শুনেছি গবেষক ড্যানিয়েলা লিমোনেলার কাছে। ড্যানিয়েলা ইতালীয় ভাষায় আমাদের আন্দোলন নিয়ে গবেষণা করছেন, তথ্য সংগ্রহ করতে কলকাতায় এসেছিলেন ২০১৪ সালে ।   ১৯৬৯ সালে আমি আর সলিলা গিয়েছিলুম ডালটনগঞ্জে, দাদা তখন অন্য একটা বাড়িতে, পিসতুতো দাদা সেন্টুদাও ছিল; আমাদের আপ্যায়ণের জন্যে গেঁড়ি-গুগলি দিয়ে বিরিয়ানি বানিয়েছিল, তা রাত জেগে খাওয়া হলো মহুয়ার মদ দিয়ে ।

         ২০১৪ সালে বিবিসির পক্ষ থেকে ডোমিনিক বার্ন এসেছিলেন হাংরি আন্দোলন নিয়ে রেডিও প্রোগ্রাম করার জন্য । হাংরি আন্দোলন সম্পর্কে উনি এতই ওয়াকিবহাল ছিলেন যে প্রশ্ন করলেন বঙ্গসংস্কৃতি, রবীন্দ্রনাথ, উনিশ শতক নিয়ে । পরে, ফোটোতে ওনার ঘামে ভেজা শার্ট দেখে সলিলা বলল, “এসিটা চালিয়ে নাওনি কেন ?” আসলে প্রতিটি ব্যাপারে অভ্যাস থাকা জরুরি ।  ১৯৭৯ থেকে গ্রামীণ উন্নয়নের ট্যুরে ইংরেজি-বাংলা-হিন্দিতে বক্তৃতা দিতে হতো। একটা গ্রামে বক্তৃতা দিচ্ছিলুম, একজন চাষি বলে উঠল, “ এই চিন্তাটা আগে আসেনি কেন মাথায়, তাহলে গ্রামের কাজ এগিয়ে যেতো, পড়ে থাকতো না বছরের পর বছর।” বলে ফেললুম, “আপেল কেন গেছ থেকে পড়ে, তা তো আমরা আগে জানতুম না, নিউটন নামে একজন সায়ের বলার পরে জানতে পারলুম।” চাষি বলল, আপেল কেন, আম, কাঁঠাল, নারকেল পেকে গেলে সবই আপনা থেকে পড়ে যায়, ভগবান সেরকমই নিয়ম করেছেন।” টের পেলুম যে নিউটন সর্বত্র চলে না, অভিকর্ষও সকলকে বোঝানো যায় না । বললুম,”ঠিকই বলেছো, যতক্ষণ না কোনো চিন্তায় পাক ধরছে ততোক্ষণ কেউই তার বিষয়ে জানতে পারে না ।”

          ১৯৬৫ সালে, সুবিমল বসাকের মাসির বাড়ি গিয়েছিলুম মুর্শিদাবাদের এক গ্রামে । রাতে মশারি টাঙিয়ে শুয়েছিলুম, সকালে দেখি মশারির চালে একটা সাপ, মশারি বেশ ঝুলে এসেছে, আমাদের নড়াচড়া আর চেঁচামেচিতে সাপটা ফণা তুললো, মশারির ভেতরে হাংরি বুলেটিন ছিল কাগজে মোড়া, সেইটে দিয়ে সাপটাকে মশারি থেকে বাইরে ছিটকে ফেললুম । আমাদের চেঁচামেচি শুনে সুবিমলের মাসি আর অন্য আত্মীয়রা জড়ো হয়েছিলেন এসে, তাঁরা সাপটার পিছু নিলেন, সেটা ঢুকে গেল এক গর্তে । বেরোলুম মশারির বাইরে । এক বৃদ্ধা চিনির কৌটো নিয়ে এলেন আর কাঠপিঁপড়ে-ভরা গাছের কাছ থেকে  সাপটা যে গাছের গোড়ায় ঢুকেছে সেখান পর্যন্ত লাইন করে চিনি ছড়িয়ে দিলেন, সাপের কোটরেও ছুঁড়লেন । দুপুরে ডেকে দেখালেন আধখাওয়া সাপ আর পিঁপড়ের ঝাঁক গাছের বাইরে, পিঁপড়েরা মাংসকণা নিয়ে নিজেদের বাড়ি নিয়ে যেতে অতিব্যস্ত । প্রেমিক-প্রেমিকার মতনই সাপ আর কাঠপিঁপড়েরা পরস্পরের নৈঃশব্দে আকৃষ্ট হয়।

          ১৯৭৯ সালে আমার লিঙ্গ দিয়ে পেচ্ছাপের বদলে রক্ত বেরিয়েছিল, রক্তচাপের দরুন, টাকার পাহাড়ের মাঝে দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে রক্তচাপ বেড়ে গিয়েছিল, ডাক্তার বললে ট্র্যাকিকার্ডিয়া, ছাতাপড়া-হিলহিলে-তেলচিটে নোটের পাহাড়, যা জ্বালিয়ে নষ্ট করতে হতো । তারপর দুমাস ছুটি নিয়ে দুবেলা ঘুমের ওষুধ খেতুম । “ডুবজলে যেটুকু প্রশ্বাস” উপন্যাসে আমি টাকার পাহাড় জ্বালানোর মারপ্যাঁচ ব্যবহার করেছি । ১৯৯৩ সালে আমি একশো কোটি, দুশো কোটি, পাঁচশো কোটি টাকার চেক সই করতুম, কল মানি মার্কেটে অফিসের হয়ে বাড়তি টাকা খাটাবার জন্যে । অতো টাকার চেকে সই করে-করে মনে হতো রাজার কুর্সিতে বসে আছি । কোটি-কোটি টাকা নষ্ট করেছি এককালে, ১৯৯৩ সালে কোটি-কোটি টাকা খাটিয়ে আয় বাড়ালুম । পরির দেশের কোষাধ্যাক্ষের মতন দিনের পর দিন কোটি-কোটি টাকার চেক সই করতুম ।

         ২০১০ সালে আমার বাঁ পা ফুলে গেল একদিন । ডাক্তারের কাছে দৌড়োলুম, ডাক্তার দেখে বলল, এই রোগ তো পুলিশ কন্সটেবল, ইশকুল-কলেজের টিচার আর ডাকপিওনদের হয়, আপনার হল কেমন করে । বললেন উরু থেকে পায়ের পাতা পর্যন্ত মোজা পাওয়া যায়, একজোড়া কিনে আজ থেকেই পরে থাকুন, কেবল শোবার সময়ে খুলে রাখবেন । ভেরিকোজ ভেইনস আক্রমণ করেছে পায়ে । সেই থেকে ভেরিকোজ ভেইনসের মোজা পরে থাকি, উরু থেকে পায়ের পাতা পর্যন্ত । স্বপ্নে অনেকের পোঁদে লাথি মারি, তাই হয়তো।

         ১৯৯৯ সালে প্রথম অজ্ঞান হয়ে পড়ে গিয়েছিলুম বাঁশদ্রোণী বাজারে । পাবলিক আমাকে শাক-সবজির ওপর শুইয়ে মাছের জলের ঝাপটা দিতে জ্ঞান ফিরল । অনেকে হাসপাতালে নিয়ে যাবার জন্যে টানাটানি করছিল বলে সলিলা কেঁদে ফেলে থামালো । তার পরেও অজ্ঞান হয়েছি প্রায় সাত বার । মাথার এম আর আই করিয়েছি । নিউরোলজিস্ট বললে, মেডিটেশান করো । বাড়িতে বসে মেডিটেশান করায় একাগ্র হতে পারি না । মন উড়তে থাকে, নানা ভাবনায়, নানা মুখশ্রিতে, নানা সংবাদে, অতীতের ঘটনায় । মেডিটেশান ছেড়ে দিতে হল ।  ছোটো গল্প-লেখিকা ঝুমা চট্টোপাধ্যায় বলল, “সখা হে, সবসময় মাথাকে জাগিয়ে রাখলে অমন রোগ তো হবেই ।”

              ১৯৯৮ সালে, মুম্বাইতে আমার অফিস পুনম চেম্বার্সের ছাদ সাততলা থেকে একের পর এক যখন ভেঙে-ভেঙে সশব্দে নিচে নেমে আসছিল তখন আমার হাত ধরে কেবিন থেকে বের করে নিয়ে গিয়েছিলেন একজন তরুণী, যিনি প্রথম পরিচয়ে আমাকে বলেছিলেন যে ওনার জরায়ু নেই । ১৯৯৭ সালে অবসর নেবার পর আমি আরেক অফিসারের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলুম অথচ তাকে বাঁচাবার চেষ্টা করেনি মীরা। বাড়িটা পড়ার ফলে উনিশজন মারা গিয়েছিল। ইনিই একমাত্র মহিলা যাঁর সঙ্গে অশ্লীল গল্প করেছি, ব্যাপারটা অবশ্য তিনিই আরম্ভ করেছিলেন, “আজকে কলা কিনিনি, বেগুন কিনেছি, কোকোনাট অয়েল কিনেছি”, আমাকে হতবাক করে । নারীর সঙ্গে অশ্লীল কথাবার্তা ! ওর সঙ্গে কথা বলার সময়ে মনে হতো এই ধনী-তনয়াকে আবু সয়ীদ আইয়ুবের সঙ্গে ভিড়িয়ে দিতে পারলে ভালো হতো ।

তেরো

                        ৪ঠা ডিসেম্বর ১৯৬৮ বিয়ের পর ১৯৬৯ সালের জানুয়ারিতে হনিমুন করার পরিকল্পনা করলুম শিমলা যাবার, শুনে সহকর্মী সুশীল বলল ওর গ্রাম চণ্ডীগড়ের কাছে রোপড় হয়ে যেতে, রোপড় যাবার পর ও আর ওর বউ-বাচ্চা আমাদের সঙ্গ নিল । রোপড়ে মাঠে হাগতে হতো ; আমার তো এনসিসির সময়ে মাঠে প্রতিদিন হাগার অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল । সলিলার ছিল না, কিন্তু নতুন অ্যাডভেঞ্চার মনে করে মাঠে গিয়ে ভোর রাতে হেগে নিয়েছিল যে কয়দিন ছিলুম । নতুন বউ মাঠে হাগতে যাচ্ছে, গ্রামীণ উন্নয়ন বিশেষজ্ঞের বউ বলে কথা।  শিমলায় গিয়ে বাস থেকে নামতেই হাঁটু পর্যন্ত ঢুকে গেল তুষারে । বাসের ছাদে রাখা ছিল বেডিং আর স্যুটকেস, তার ওপর তিন ইঞ্চের তুষার । পিছল পথে গিয়ে উঠলুম হোটেলে, সেই হোটেলের ওপর তলায় আমাদের হনিমুন স্যুট, সেখান থেকে বেরোলেই রাস্তা । দুজনে মিলে দুটো ওল্ড মঙ্ক খেয়েও শীত গেল না, তখন জড়াজড়ি করে অবিরাম সঙ্গম করলুম সারা রাত । সুশীল আর ওর বউ একটা ঘরে ছিল, বেয়ারা বলল রাতভর ওরা ঝগড়া করেছে । শিমলা থেকে ফেরার পর সুশীলের বউ একজন পাঞ্জাবির সঙ্গে পালিয়ে গেল । লোকেদের বউ পালিয়ে যায় কেন ? মনে হয় দুর্বল যৌনতা তার মুখ্য কারণ । “কৌরব” পত্রিকার কমল চক্রবর্তীর বউও কারোর সঙ্গে পালিয়ে যাবার ফলে পত্রিকাটাই রোশনাই হারিয়ে ফেলল । কমল ওর পুরো যৌনতা লাগিয়ে দিয়েছিল পত্রিকায়, বউয়ের দিকে খেয়াল দেয়নি । তবে বউ পালিয়ে গেলেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দেয়া সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছে, বউয়ের বদলে পুরস্কার পেলুম টাক ডুমাডুম ডুম । এককালে কৌরবে লিখতুম । আর ডাক পাই না ।

         শিমলা থেকে ফেরার পথে চণ্ডীগড়ে বাসস্ট্যাণ্ডে এসে একদল পাঞ্জাবি আর হিন্দি কবিলেখকরা ঘিরে ধরল কয়েকদিন থেকে যাবার জন্যে, ওরা আমার জন্যে সাহিত্যসভা করবে, ওরা যাকে বলে “গোষ্ঠী”, মদ-মুর্গি খাবার লোভে থেকে যেতে রাজি হলুম । এদিকে লেখালিখি তখন আমাকে ছেড়ে উধাও হয়ে গেছে, সঙ্গে কবিতাও নেই । হিন্দি আর পাঞ্জাবি পত্রপত্রিকায় ছবিসহ আমার সম্পর্কে খবর পড়ে ওদের উৎসাহ । নিজেরাই যোগাড় করে ফেলেছে আমার কবিতার হিন্দি অনুবাদ । গোষ্ঠীতে একজন যুবতী কবি মাতাল হয়ে  আমাকে জড়িয়ে ধরলেন, চুমু খাবার উপক্রম করেছিলেন । স্ত্রী সলিলা বেজায় খাপ্পা, যুবতীকে বলল, “সাহিত্যসভা করছেন না অন্যকিছু !” সলিলার পজেসিভনেস দেখে আহ্লাদে আটখানা হলুম ।

                         ১৯৬৭ সালে হিন্দি আর মৈথিলি ভাষার কবি রাজকমল চৌধারী, ভর্তি ছিল পাটনার রাজেন্দ্র সার্জিকাল ব্লকে, অত্যধিক মদ আর মাদকের দরুণ শরীর ঝাঁঝরা হয়ে গিয়েছিল । ওকে একটা আলাদা ঘরের ব্যবস্হা করে দিয়েছিল সরকার । হাসপাতালে বিছানায় শুয়ে রাজকমল বলেছিল, “ডাক্তার বলেছে অপারেশান করা যাবে না, অপারেশান করলে পুরো হাসপাতালে গাঁজা আর চরসের ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়বে।” মদ আর মাদকের লাইনে আমিই ওকে নিয়ে গিয়েছিলুম বলে প্রায়শ্চিত্ত হিসেবে প্রায়ই সন্ধ্যায় ওর সঙ্গে দেখা করতে যেতুম । একদিন ও বলল ওকে এক প্যাকেট কনডোম এনে দিতে। কনডোম কী করবে, শরীরের এই অবস্হায় ? বলল ওই তো নার্সকে জিগ্যেস করো, ও রাজি আছে । নার্স মাথা নেড়ে সায় দিল । পরের দিন কনডোমের প্যাকেট নিয়ে গিয়ে দেখি বিছানা খালি, নতুন চাদর আর বালিশের খোল, ওষুধ কিছুই নেই, ঘর ফাঁকা । সেই নার্সকে খুঁজে তাকে জিগ্যেস করতে সে বলল, আজ সকালেই উনি মারা গিয়েছেন, ওনার প্রথম পক্ষের স্ত্রী এসে শব নিয়ে গেছেন । কনডোমের প্যাকেটটা পাশেই গঙ্গায় ফেলে দিলুম ।

                 ১৯৮৫ থেকে যখন আবার লেখা আরম্ভ করলুম ঢাকা থেকে মীজানুর রহমান বললেন ওনার পত্রিকার জন্যে হাংরি আন্দোলন নিয়ে ধারাবাহিক লিখতে । লেখা আরম্ভ করলুম “হাংরি কিংবদন্তি” । প্রতিবছর আসতেন আমার নাকতলার ফ্ল্যাটে, সিঁড়ি দিয়ে উঠতে কষ্ট হলেও । মীজানুর যাতে লেখাটা আর না ছাপেন তাই শামসুর রাহমানের মাধ্যমে সুনীল, শক্তি, তারাপদ অনুরোধ করলেন মীজানুরকে । উনি ওনাদের বললেন, ঠিক আছে, আপনাদের কার্টুন আর ছাপবো না, তবে লেখাটা চলবে । শামসুর রাহমান ওনাকে বললেন, “প্লিজ, ঢাকা থেকে “হাংরি কিংবদন্তি” গ্রন্হাকারে প্রকাশ করবেন না । মীজানুর “হাংরি কিংবদন্তি” গ্রন্হাকারে প্রকাশ করলেন না কিন্তু আমার উপন্যাস “নামগন্ধ” প্রকাশ করলেন ঢাকা থেকে । আমাকে নিয়ে সাংস্কৃতিক রাজনীতি কেবল পশ্চিমবাংলাতেই হয় না, তা বাংলাদেশ পর্যন্ত ছড়িয়ে গেছে । মীজানুর রহমান মারা গেছেন দশ বছর হল ।         ঢাকা থেকে আরেকজন নিয়মিত আসতেন, তিনি বাংলাদেশের বিদ্যাসাগর সোসায়টির প্রধান । প্রতিবার এসে বলতেন যে তাঁকে হুমকি দেয়া হচ্ছে বন্ধ করে দেবার জন্য, বলা হচ্ছে যে বাংলাদেশে বিদ্যাসাগরের প্রয়োজন নেই । জানি না ওনার কী হল । আমি কলকাতা ছাড়ার পাঁচ-ছয় বছর আগেই ওনার আসা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল ।

           ২০০৪ সালের পর থেকে আমি এক ভ্যাবাচাকা মানসিকতায় ভোগা আরম্ভ করেছিলুম ; নিজের ভেতর থেকে লাফিয়ে বেরোবার বিপজ্জনক আনন্দ ? যেন মানব-বোমা হবার জন্য তৈরি হয়ে আছি, উদ্দেশ্যহীন, কী বলব একে? রাস্তার ধারে ইঁটের ওপর বসে তেলমালিশ করাবার মতন নিঃসঙ্গতা এটা নয় । বা, হয়তো, বর্তমানে আমি সেই স্হিতিতে বসবাস করছি, যে পরিসরে একাকীত্ব ও নিঃসঙ্গতা মিলেমিশে গেছে । আমি অস্তিত্ববাদী নই যে আমার এই একাকীত্ববোধকে ‘হিউমান কাণ্ডিশন’ হিসাবে মেনে নেবো ; হিন্দু পরিবারে জন্মে একাকীত্ববোধের খ্রিস্টধর্মী ‘হিউমান কন্ডিশন’ সম্ভব বলে মনে হয় না । কিয়ের্কেগার্দ, জাঁ পল সার্ত্রে, আলবেয়ার কামু, মরিস মার্লো পন্টি, কার্ল জাসপার্স প্রমুখের ভাবনাচিন্তার সঙ্গে খাপ খায় না আমার ভাবনাচিন্তা । ১৯৯৭ সালে যে আরথ্রাইটিস হয়েছিল তার রেশ থেকে গেছে গাঁটে-গাঁটে, সবচেয়ে বেশি বুড়ো আঙুলে, যে কারণে কলম ধরে লিখতে পারি না । সইসাবুদের যাবতীয় কাজ আমার বুড়ি স্ত্রীকে করতে হয়, যে আমার চেয়ে মাত্র দু’বছরের ছোটো ।

         এখানে বলে নিই, আমি একজন ইন্সটিঙ্কটিভ হিন্দু, কেননা দুর্গাপুজো দোল কালিপুজোর সময়ে আমার প্রবৃত্তিগতভাবে ভালো লাগে, অথচ আমি ঈশ্বরে বিশ্বাস করি না, মনুস্মৃতিতে বিশ্বাস করি না, ঋগ্বেদের দেবী-দেবতায় বিশ্বাস করি না, কেননা ওটা আমার ভেতরে কাজ করে না, ওটা আপনা থেকে গড়ে-ওঠা ব্লকেজ। কমিউনিস্টদের মতন আমি ভেবেচিন্তে বা বই পড়ে দেয়াল তুলিনি, বলেছি তো আমি বুদ্ধিজীবি নই । কলকাতায় অনেককে দেখেছি, “আপনি কি হিন্দু” জিগ্যেস করলে ভ্যাবাচাকা খেয়ে যায়, উত্তর দিতে পারে না, কেউ-কেউ বোবা সাজে, কেউ-কেউ ভেবেচিন্তে মরে যাবার পর দেহের গতি নিয়ে কথা বলে । মরে যাবার পর ? ডেড বডিও তাহলে চিন্তাভাবনা করে ! বুঝতে পারি যে তারা নিজের সম্পর্কে খতিয়ে দেখে না, নিজেকে যাচাই করে না, কেবল অন্যে কী করছে আর বলছে তা-ই নিয়ে কিচাইন ।

                   মৃত্যু সম্পর্কে, এই বয়সে যে ভীতি অনেকের হয়, তা দেখা দেয়নি এখনও । শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের সত্যিই ভীতি হয়েছিল, নাকি কবিতা লেখার জন্য মৃত্যুকে বিষয় করেছিলেন, মৃত্যু বিষয়ক কবিতা লিখেও তারপর চনমনে থাকতেন, মদ খাওয়াবার জন্যে আবদার করতেন । আমার তো যেন মনে হয় নিঃসঙ্গতার সঙ্গে মিশে-যাওয়া আমার বর্তমান একাকীত্বটা সহজাত, অন্তর্মুখ, স্বকীয় আত্মজ্ঞানের স্বনির্মিত ডামাডোল কারাগার, উন্মাদ প্রেমে আটক ব্যক্তিএককের মতন ; আমি যেন পুনরুদ্ধারের অযোগ্য এমন কোনো আত্মপরিসরে নিরুদ্দেশ হয়ে রয়েছি, আমাকে কেউ আর খুঁজে পাবে না । আমি নিজের বানানো স্বপ্রেমের বেদনাময় জেলখানা থেকে বেরোবার চেষ্টা করি, কয়েক দিনের জন্যে বেরোই, আবার নিঃসঙ্গতাময় একাকীত্ব কাবু করে ফ্যালে আমাকে । ইনটারনেটের অধিবাস্তব জগতে তৈরি মানব-সম্পর্কের মাধ্যমে দূর করার চেষ্টা করি নিঃসঙ্গতার একাকীত্ব ; অথচ পাঁচ হাজার বন্ধুর কেউ তো বাস্তব নয়, রক্তমাংসের নয় । তাছাড়া রক্তমাংসের মানুষ তো রয়েছে আশে-পাশে, কই কোনো রদবদল তো ঘটছে না আমার  সন্ত্রস্ত আত্মবোধে ।

         নিঃসঙ্গতার সঙ্গে একাকীত্বের পার্থক্য হল যে নিঃসঙ্গতার স্হিতি স্বীকার করে নেয় যে ব্যক্তিএককের পাশে প্রচুর লোকজন রয়েছে, কয়েকজন স্বজনও রয়েছে । অর্থাৎ সেই স্হিতিটা সাময়িক, তাকে বদলে ফেলা যায়, অন্যান্য লোকজনের সঙ্গে অর্থবহ যোগাযোগের মাধ্যমে । এমনকি ব্যক্তিএকক নিঃসঙ্গতার আনন্দ উপভোগ করতে পারে, সৃষ্টিশীল হয়ে উঠতে পারে । কিন্তু একাকীত্বকে সে উপভোগ করতে পারে না, তা আত্মপ্রেমের গিলোটিনে মাথা রাখার ফলে যন্ত্রণাদায়ক, দুর্দশাসৃষ্টিকারী, হাহাকারময় । একাকীত্বের স্হিতি ব্যক্তিএককের বাইরের নয় বলেই মনে হয় ; তা ব্যক্তিএককের মনে গড়ে ওঠে, কেমন যেন ফাঁকা-ফাঁকা লাগে। একা, আলাদা হয়ে বসে থাকার ব্যাপার নয় একাকীত্ব । একাকীত্ব হল ফোঁটায় ফোঁটায় সঞ্চারিত উপলব্ধি, বিপত্তিমূলক উপলব্ধি । শৈশব থেকে বাইরের সাময়িক নিঃসঙ্গতাগুলোর সঙ্গে আমার পরিচয় আছে, আর সেগুলো স্মৃতিকে খামচে ঘায়ের মতন রয়ে গেছে । বাইরের এজন্য বলছি যে সেসব নিঃসঙ্গতা ছিল সম্পর্কজনিত । ওই আত্মভঙ্গুর ঘটনাগুলোর কথা আমি মাঝে-মাঝে রোমন্হন করে নিরাময় খুঁজি, এখন স্মৃতির জাবর কেটে  দেখি ট্রমা থেকে কতোটা নিরাময় ঘটে ।

         আমি মনে-মনে ফিকশানগুলো মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেলে ছকে নিই, যেমন চোর-ডাকাতরা রাতের বেলায় পরিকল্পনা করে, তারপর যখন লিখতে বসি তখন নিজেকে খুঁচিয়ে-খুঁচিয়ে আবিষ্কার করতে থাকি, ফিকশানের চরিত্রগুলোর সঙ্গে নিজের সমস্যা ভাগ-বাঁটোয়ারা করি, লিখতে বসার আগে নিজের ভেতরে হারিয়ে যাবার চেষ্টা করি, তখন মনে হয় লেখালিখিই আমার প্রেমিকা, আমার লেখার শিকড় আমার চেতনায়, কেননা আমি একই ঘরে, একই বাড়িতে, একই পাড়ায়, একই রাস্তায়, একই শহরে, একই রাজ্যে সারা জীবন কাটাইনি । যখন গাঁজা-চরসের নেশা করতুম তখন নিজের আহ্লাদের জন্যেই করতুম, এখন লেখালিখির নেশা করি নিজের আহ্লাদের জন্যেই করি, পাঠক-পাঠিকাদের সঙ্গে সেই আহ্লাদের দুঃখ-কষ্ট ভাগ-বাঁটোয়ারা করে নিই । কেউ মনে রাখুক, এই ভেবে লিখি না । মরে যাবার পর আমার লেখার কি হবে তা নিয়ে চিন্তিত নই । লেখা শেষ হয়ে গেলে সাপের খোলোশ থেকে বেরিয়ে আসি টাটকা ত্বক নিয়ে ।  

চোদ্দ   

        আমি কবে জন্মেছিলুম, ম্যাট্রিকের সার্টিফিকেটে ১৯৩৯ থাকলেও, জানি না, তার কারণ, পাটনার মহাদলিতদের পাড়া ইমলিতলার বাড়িতে বয়স্করা মনে করতেন, ব্যাপারটা যে জন্মেছে  তার হর্ষোল্লাসের নয়, যিনি প্রসব করেছেন তাঁর ; সুতরাং প্রসবদিন বলে কিছু হতে পারে, জন্মদিন আবার কি ? যে জন্মেছে তার তো কোনো অবদান নেই যে তার জন্মদিন নিয়ে হুজুগ করতে হবে, সে কি নয় মাস কষ্টে ভুগেছিল, সে তো দিব্বি মায়ের পেটে হাত-পা ছুঁড়ে সাঁতার শিখেছে, চব্বিশঘণ্টা খেয়েছে, তারপর তার মায়ের প্রসব বেদনা উঠলে তার মা তাকে প্রসব করেছে। জীবনে কক্ষুনো সে মায়ের কষ্ট বুঝবে না । ঠিকই তো, নাড়ি শুধু মায়েদের গর্ভেই তৈরি হয় ।        প্রসবের জন্য বাড়ির বউরা যেতেন নিজের বাপের বাড়ি, প্রসবের দিনক্ষণের হিসেব রাখার দায়দায়িত্ব বাপের বাড়ির লোকেদের ; এখন তারা যদি মুকখু হয় তো কি আর করা যাবে ! তারা প্রসবের দিনটা লিখে রাখতে পারেনি ।

        আমার বাবা ছিলেন ছয় ভাই, প্রমোদ, সুশীল, রঞ্জিত, অনিল, সুনীল আর বিশ্বনাথ, এবং এক বোন কমলা । ঠাকুমা প্রসবের সময়ে নিজের বাপের বাড়ি যেতেন, কলকাতার পটলডাঙায়, বিরাট আঁতুড়ঘর ছিল সেখানে, আর সেই আঁতুড়ঘরে তাঁর পরপর ছেলে হয়েছে, মেয়ে হচ্ছে না বলে যখন ঠাকুর্দার মনখারাপ, তখন ঠাকুমা ওই আঁতুড়ঘরে মেয়ে প্রসব করেন । আমাদের আদি নিবাস, বড়িশা-বেহালা হলেও, ১৭০৯ সাল থেকে আদি নিবাস গঙ্গার পশ্চিম পাড়ে হুগলি জেলার উত্তরপাড়ায় চলে এসেছিল ; সেখানে “সাবর্ণ ভিলা” নামে একটা জমিদারি বাড়ি তৈরি করেছিলেন পূর্বপুরুষ রত্নেশ্বর রায়চৌধুরী, যে বাড়িটি শরিকি অবহেলায় এমনই পোড়োবাড়িতে রূপান্তরিত হয়েছিল, অশথ্থের শেকড়ের আলিঙ্গনে হাড়গোড়-ভাঙা যে, আবাসন তৈরির জন্য প্রোমোটারকে দিয়ে দেয়া হয়, আমিও তার ভাগ পেয়েছিলুম, ষাট হাজার টাকা ।

         বড়োজ্যাঠা, মানে প্রমোদের স্ত্রী নন্দরাণীকেও পাঠানো হয়েছিল বাপের বাড়ি হুগলি জেলার কোন্নোগরে । তাঁর মেয়ে হল, নাম রাখা হল সাবিত্রী বা সাবু । দ্বিতীয়বার প্রসবের জন্য গেলেন কোন্নোগর, আবার মেয়ে হল, ধরিত্রী বা ধাবু । ঠাকুমা হুকুম দিলেন যে নন্দরানীর আর বাপের বাড়ি গিয়ে প্রসব করা চলবে না, বড়োই অলুক্ষুণে ওনাদের আঁতুড়ঘর, ওদের বাড়ি ছেলে জন্মায় না । নন্দরাণীর ভাইয়ের বউ বাপের বাড়ি যাননি, কোন্নোগরের আঁতুড়ঘরেই পরপর দুটি মেয়ের জন্ম দিয়েছিলেন, আলো আর পূরবী, এবং তারপর আর সাহস করেননি, ভয়ে, যদি আবার মেয়ে হয় । নন্দরাণীও আর বাচ্চা প্রসব করতে রাজি হননি, কোন্নোগরে গিয়ে হোক বা ইমলিতলায়, যদি আবার মেয়ে হয় । সাবু-ধাবুর জন্মদিন বা নন্দরাণীর দুটি প্রসবের দিন মনে রাখা দরকার মনে করেননি ইমলিতলার বয়স্করা । ছেলে হল না বলে বড়োজেঠা একজন বেশ্যার কাছ থেকে দেড়শো টাকা দিয়ে মেজদাকে কিনেছিলেন ।

         মেজজ্যাঠা, মানে সুশীলের স্ত্রী করুণা আমাদের আদিবাড়ি উত্তরপাড়ার মেয়ে, তিনি প্রসবের জন্য গেলেন নিজের বাপের বাড়ি । ঠাকুমা আপত্তি করেননি, প্রসবের সময়ে করুণা বাপের বাড়ি গেলে, তিনি গঙ্গাস্নানে যাবার সময়ে একবার করুণাকে দেখে যেতেন, মাগঙ্গাকে রিকোয়েস্ট করতেন যেন করুণা অন্তত বংশরক্ষা করেন । মা গঙ্গা রিকোয়েস্ট রিফিউজ করে দিয়ে করুণাকে দিয়ে মেয়ে প্রসব করিয়েছিলেন, তাও মৃত । ঠাকুমা যাকে বলে আতঙ্কিত । স্ত্রী করুণাকে নিয়ে মেজজ্যাঠা চলে গেলেন ছাপরায় থাকতে, সেখানে তাঁর জন্য একটা ফোটোগ্রাফির দোকান খুলে দেয়া হয়েছিল । মেজজেঠিমার যখন যক্ষ্মারোগ হল তখন দোকানপাট লাটে উঠিয়ে দুই মেয়ে ডলি আর মনুকে নিয়ে পাটনায় চলে এলেন ।

         এরপর সেজভাই রঞ্জিতের স্ত্রী অমিতার পালা । ঠাকুমা নিষেধ করলেন না, কেননা আমার মায়ের বাপের বাড়ি ছিলই না, মায়ের বাবা কম বয়সে মারা যান, দিদিমা তিন ছেলে আর তিন মেয়ে নিয়ে ওঠেন গিয়ে তাঁর বাপের বাড়ি, মানে মায়ের মামার বাড়ি । বাপের বাড়ি তো আর নয়, মামার বাড়ি, ওদের ঘরের আঁতুড় ঘরে ছেলের পর ছেলে হবার রেকর্ড আছে । এবং লো অ্যাণ্ড বিহোল্ড, মা একটি ছেলে প্রসব করলেন। মামার বাড়িতে দাদার নাম রাখা হয়েছিল বাসুদেব । মামাদের দেয়া নাম, যে মামারা নিজেরাই নিজের মামার বাড়িতে থাকতেন । অমন নাম ঠাকুমার পছন্দ হল না, দাদার নাম রাখা হল সমীর, আদর করে সবাই মিনু বলে ডাকতেন ।

         বাড়ির পারিবারিক রাজনীতিতে মাকে অনেক ওপরে তুলে দিলেন ঠাকুমা, রান্নাঘর আর ভাঁড়ার ঘরের কর্তৃত্ব মায়ের, খরচের নির্দেশে দেবার অধিকার মায়ের । বলতেন, অজাতশত্রুদের মা । তখনও অজাতশত্রুর গল্প শুনিনি, লোকটা কে তাও জানতুম না, মানে বলা হয়েছিল, যার কোনো শত্রু নেই । আমরা শোত্তুরের মুখে ছাই দিয়ে পৃথিবীতে এসেছি ।

         আমাকে প্রসব করার সময়ে মায়ের মামার বাড়িতে আমাদের আর তেমন সামাজিক গুরুত্ব ছিল না। ইমলিতলার বাড়ি আর মহাদলিতদের কুঁড়েঘরের সারি, ওপচানো নর্দমা, পাড়ার বাচ্চাদের গলির নর্দমায় হাগা দেখে মায়ের ভাইদের, আর তাঁদের মুখে শুনে মায়ের মামাদের,  আমাদের পরিবার সম্পর্কে ধারণাটা ঘা খেয়েছিল । ওনারা ভেবেছিলেন সাবর্ণ চৌধুরী পরিবার, বিরাট রোশনাই আর ঝালরঝোলানো ঝিকমিকে ব্যাপার হবে । সাবর্ণ চৌধুরীরা যে ষষ্ঠ শতকের অরিজিনাল সাবর্ণ চৌধুরী পুরুষটার পরের প্রজন্মে বিয়োতে বিয়োতে জ্যামিতিক লাফে তত দিনে তিরিশ হাজারে পৌঁছে গেছে, আর তাদের বেশিরভাগই দারিদ্দিরে পটকান্তি খেয়েছে,  কেউ-কেউ রিকশা চালায়, মুটেগিরি করে, তা হদিশ করতে পারেননি ওনারা। মাকে দ্বিতীয়বার পাঠাতে রাজি হলেন না বাবা । মা আমাকে প্রসব করলেন হাসপাতালে, পাটনার প্রিন্স অব ওয়েল্স হাসপাতালে । ইমলিতলার বাড়িতে কোনো আঁতুড়ঘর ছিল না, মায়ের শরীরও, আমার কারণে, সুস্হ ছিল না । হাসপাতালের সেই বিলডিঙ, যে-হাসপাতাল বাড়িতে আমাকে মা প্রসব করেছিলেন, স্বাধীনতার পর তা ভেঙে ফেলে সেখানে রাজেন্দ্র সার্জিকাল ব্লক গড়ে উঠেছে । বড়োজ্যাঠা ডায়াবিটিসে আক্রান্ত হয়ে এই সার্জিকাল ব্লকে ছিলেন বেশ কয়েক মাস । আমার ছেলের মাথা ফাটলে কপালে স্টিচিঙের জন্যে গিয়েছিলুম এই হাসপাতালে ।

         —তোমরা হাসপাতালের কাগজপত্র রাখোনি ? রাখলে তো তা থেকে জানা যেত কবে কোন সালে মা আমাকে প্রসব করেছিলেন ।

        —ওসব কাগজপত্তর আবার বাড়িতে রাখে নাকি ? হাসপাতালের কাগজ, নার্সরা কতো রুগিকে ছুঁচ্ছে দিনভর, কাগজের সঙ্গে বাড়িতে আবার কোন ব্যামো ঢোকে তার কোনো নিশ্চয়তা আছে ?

        অন্তত আমার জন্মদিনের একটা পোক্ত প্রমাণের সম্ভাবনা ছিল ; কিন্তু জন্মদিনটা তো আর গুরুত্বপূর্ণ নয়, প্রসবের রুগি ভালোয়-ভালোয় বাচ্চা নিয়ে বাড়ি ফিরেছে, তাও দ্বিতীয়বারও কোলে ছেলে নিয়ে, এই তো যথেষ্ট ।

         —তোর ভাগ্য ভালো যে মেয়ে প্রসব করেনি তোর মা ।

        নককা, অনিলের বিয়ে হল কলকাতার ভবানীপুরের সেসময়ের আধুনিকা  অমিয়ার সঙ্গে । প্রসবের জন্য তিনি গেলেন ভবানীপুরে । তাঁর মেয়ে হল, খুকু । দ্বিতীয়বার গেলেন । আবার মেয়ে হল, রাখি ।

        নতুনকাকা সুনীলের বিয়ে হল উত্তরপাড়ার মেয়ে কমলার সঙ্গে । তিনি প্রসবের জন্য বাপের বাড়ি গেলেন । মেয়ে হল, পুটি ।

         দাদা আর আমি জন্মাবার পর ঠাকুমা আর জোর দিতেন না ; ছেলেদের বলে দিয়েছিলেন যার যেখানে ইচ্ছে বউদের পাঠাও, ছেলে হোক বা মেয়ে হোক, তোমরা নিজেরা বুঝো । নতুনকাকা ঠাকুমাকে বলেছিলেন, উনি অনেকগুলো বাচ্চা চান, প্রথম মেয়ের পর ওনার ছেলে তারপর মেয়ে, এইভাবে ছেলে-মেয়ের ছন্দ মিলিয়ে ছয়টা মেয়ে আর তিনটে ছেলে হল । ঠাকুমা বলেছিলেন এবার ক্ষান্তি দে, তিনটে ছেলে যথেষ্ট, এই উত্তরপাড়ার বারো ঘর-চার সিঁড়ির বাড়ি ভাগ-বাঁটোয়ারা হলে সকলের ভাগ্যে একটা করে নোনা ইঁট জুটবে ।

         ছোটোকাকা বিশ্বনাথ বিয়ে করলেন, উত্তরপাড়ার বাড়িতে ভাড়া থাকতেন গঙ্গোপাধ্যায় পরিবার, চিৎপুরের যাত্রা দলের ছোটো ফণী নামে যিনি খ্যাত ছিলেন, তাঁদের বড়ো মেয়ে কুচির সঙ্গে প্রেম করে । ওনাদের কোনো বাচ্চা হল না । ঠাকুমা বলেছিলেন, প্রেম করে বিয়ে করলে বাচ্চা হয় না, তার ওপর এক গোত্তরের বিয়ে ; ভাড়াটের মেয়ের তো আঁতুড়ঘরও নেই । প্রসবের দিন আর বাচ্চার জন্মদিনের হিসেব রাখার ঝক্কিঝামেলা পোয়াতে হল না ওনাদের । তবে বিয়ে হয়ে যাবার পর ঠাকুমা বেয়াইকে চব্বিশঘণ্টার নোটিস দিয়েছিলেন উত্তরপাড়ার বাড়ি ছেড়ে অন্য কোথাও গিয়ে বাড়ি ভাড়া নিতে । ওনারা আদপে কোথাকার লোক ছিলেন জানি না, তবে উত্তরপাড়াতেই বিভিন্ন পাড়ায় বাড়ি ভাড়া করে থাকতেন ।

         ছোটোকাকার ছোটোশালী ক্ষ্যামাঙ্করী বা খেমি ফ্রকের ওপর তার উঁচু বুক আর ফ্রকের তলায় খোলতাই উরু নিয়ে গরমের ছুটিতে বেড়াতে আসতো ইমলিতলার বাড়িতে, জড়াজড়ির খেলা খেলে পরস্পরের চরিত্র আলোয় আলো করার এইটিই আমাদের প্রথম সুযোগ ছিল  । গ্রীষ্মকালে, ইমলিতলার বাড়িতে, রাতের বেলায়, ছাদে মাদুর পেতে, গড়াগ্গড় শুতুম আমরা সবাই, মাঝরাত থেকে ঠাণ্ডার জন্য পায়ের কাছে গায়ে দেবার চাদর । আমার বয়স এগারো, খেমির তেরো । সবায়ের সামনে খেমিমাসি বলে ডাকতুম । ১৯৫০ সালে, মাঝরাতে, খেমির ঠেলা, কি রে, তোর বাপ তো রোজ-রোজ টাকা রোজগার করে, দাঁত মাজার মলম বেরিয়েছে আজকাল, তাই দিয়ে দুজনে দাঁত মাজবো, তাহলে গন্ধ হবে না । আমাদের দুজনের গায়ে একটাই চাদর, আর আমাদের হাত দুজনের শরীরের রহস্য খুঁজে বেড়াতে ব্যস্ত । আমার মাথা ওর ফ্রকের তলায় , ওর হাত আমার প্যান্টুলের ভেতর । তারপর একজন আরেকজনের ঠোঁট খাওয়া আরম্ভ করলুম, আপনা থেকেই ঘটে গেল প্রথম দিন, তাই খেমি বললে, মুখ মাজার মলমের ব্যবস্হা করতে । পাকা তালশাঁসের ঠোঁট । খেমির কথা বলার ঢঙ আর বেপরোয়াভাব আমি ব্যবহার করেছি আমার  ‘অলৌকিক প্রেম ও নৃশংস হত্যার রহস্যোপন্যাস’ নামের ডিটেকটিভ উপন্যাসের মিলি চরিত্রে ।

         কবে খেমি আবার গরমকালের ছুটিতে আসবে, এই আশায় থাকতুম । তিনবার তিন বছর এসেছিল, প্রতিবার বুকের তাপ আর তরাই বাড়িয়ে । তারপর খবর এলো যে খেমি মায়ের দয়ায় ভুগে মারা গেছে । মায়ের দয়া ! কোন মা ? শেতলাদেবী, দক্ষিণভারতে মারিআম্মান দেবী । রোগের বেলায় দেবী কেন জানি না, রোগ সারাবার বেলায় দেবতা । সাপে কামড়ালে, কিংবা যাতে না কামড়ায়, তাই মনসাদবীকে পুজো দাও । যাতে না মহামারী আরম্ভ হয় তাই ধূমাবতীর পুজো দাও, পর্ণশবরীর পুজো দাও । আর দেবতারা সকলের স্বাস্হ্য রক্ষা করে। অশ্বিনী যমজভাইরা, ধন্বন্তরী, ধাত্রীদেবতা আয়ুর্বেদের ডাক্তার !   খেমির মা ওকে আমার মায়ের আগে প্রসব করেছিলেন, তাই খেমি অনেক কিছু জানত, শিখিয়ে দিয়েছিল, যা পরে কাজে লেগেছে আমার, নিজেকে হাঁদা-গঙ্গারাম, যা খেমি আমাকে বলত, তা আর হতে হয়নি । খেমির জন্মদিন-মৃত্যুদিন জানা হল না আমার । কুচি-খেমির মায়ের নাম ছিল বিবসনা । ভাবা যায় এরকম অতিআধুনিক নাম, যার দেহে বসন নেই ? জানি না ইনি কোন পুরাণের দেবী ।  আমাদের দুজনের গা গরম হয়ে ওঠে, সেই গরমের যোগফল দুজনের গায়ের গরমের তিনচার গুণ বেশি । আকাশে তারায় তারা, দেখা যায় সপ্তর্ষি মণ্ডল, দেখা যায় চাঁদ । ইমলিতলা ছাড়ার পর অমন পরিষ্কার আকাশ কোথাও পাইনি আর ; খেমি ওই আকাশ নিয়ে গেছে নিজের সঙ্গে আর দিয়ে গেছে ধোঁয়াটে ডিজেলের কারখানার চিমনির শ্বাসের আকাশ ।     ফিসফিস করে, খেমি অর্থাৎ মিলি : এরকম হয় বুঝি ? এই ফুলে যাচ্ছে রে, গরমও হয়ে যাচ্ছে, আমার গায়ে কাঁটা দিচ্ছে রে, বুক ঢিপঢিপ করছে ; তোর কিছু হচ্ছে না ? মানে এখানে নয়, যেটা ধরে আছি? মনের মধ্যে কিছু? কিংবা বুকে ?    আমি হাত চালিয়ে দিতে ন্যাকড়া বাঁধা পেলুম । চাপা উত্তেজনায় বললুম, ও, নিজেরটা বেঁধে এনেছিস । কেন, চাস না যে হাত দিই ?

        খেমি বা মিলি : ধ্যাৎ বোকা, এখুন ধ্যাড়ানি চলছে, কালকে খুলব, তখন যতো ইচ্ছে হাত দিস ।

        খেমি বা মিলি ন্যাকড়া ঢিলে করতে হাত ঢোকালুম, কীরকম চটচটে । আমার হাতটা নিজের ফ্রকে পুঁছে খেমি বলেছিল, দেখলি তো ! কালকের দিনটা অপেক্ষা করতে পারলি না । তুই কিন্তু সত্যিই ষাঁড় । বড়বাজারে গিসলুম একবার, তখন দেখেছিলুম একটা ষাঁড় ওই করছে । একদম গোলাপি । কেন বলতো? তুই তো ফর্সা ।

        পরের দিন, মিলি বা খেমি আমার বাঁ হাতের মধ্যমা আঙুলটা নিয়ে বলেছিল, এইতে রাখ, শুধু রাখবি, নাড়াবি না কিন্তু, নাড়ালে কাল থেকে অন্য জায়গায় শোবো ।

         আমি আঙুলটা নাড়াতে-নাড়াতে বলেছিলুম, নাড়ালে কী হয় ?

         মিলি বা খেমি আমার বোতাম-খোলা প্যান্টে হাত ঢুকিয়ে টিপে-তিপে ফোলাতে লাগল আর বলতে লাগল, এই হয়, এই হয়, এই হয়, এই হয়, এই হয়, এটা আমার এটা আমার ।

         —কালকে দিনের বেলায় একটু দেখতে দিস ।

         —দেখে আবার কী করবি ? চুল দেখতে চাস ?

         খেমি দেখিয়েছিল, ছাদেতেই, দুপুর বেলায়, যখন সবাই ভাত খেয়ে ঝিমোচ্ছে । দেখেই বেশি ভালো লাগলো, হাত দেয়াদিয়ির চেয়ে । রগের কাছে দপদপানি ।

         খেমির আগে, ইমলিতলা পাড়ায়, কুলসুম আপার সঙ্গে একই ধরনের ব্যাপারে, আমার যে অভিজ্ঞতা হয়েছিল, আমি জানতুম যে বাড়াবাড়ি করলে ছড়ে গিয়ে কষ্ট হতে পারে ; ১৯৪৯ সালে, কুলসুম আপার সঙ্গে সম্পর্কের সময়ে আমার বয়স দশ । কুলসুম আপাদের ঘরটা ছিল অন্ধকার, ছাগল হাস মুর্গিদের ঘর, তাই দেখা হয়নি, তাছাড়া উনি ছিলেন বেশ কালো ।   কুলসুম আপার চরিত্র আমি ব্যবহার  করেছি ‘রাহুকেতু’ উপন্যাসে । ওনারা ছিলেন শিয়া মুসলমান পরিবার. ওয়াজেদ আলি শাহের পতনের পর পাটনায় পালিয়ে এসেছিলেন, বেশ গরিব হয়ে গিয়েছিলেন, একই শতচ্ছিন্ন পোশাক দিনের পর দিন, বোরখা পরতেন না কেউ, বাড়ির বউরা বিড়ি বাঁধতেন, হাসের ডিম, মুর্গির ডিম, হাস, মুর্গি, ছাগলের বাচ্চা বিক্রি করতেন । আমাদের বাড়িতে মুর্গির ডিম সেসময়ে নিষিদ্ধ ছিল বলে ওনাদের বাড়ি থেকে হাসের ডিম আনতে যেতুম । কুলসুম আপা গালিব আর ফয়েজ আহমদ ফয়েজ শোনাতে ভালোবাসতেন, আমার মতো নির্বাক মুগ্ধ শ্রোতা আর কোথায় পাবেন, যে ওনার কালো গভীর চাউনি গোল মোটা ঠোঁট গালে টোল দেখার নেশায় বুঁদ । ওনাদের বাড়িতে যে মাংস রাঁধা হচ্ছিল তার গন্ধে শ্রোতা মোহিত হয়ে খেতে চাইলে কুলসুম আপা বাটি করে এনে খাইয়েছিলেন, বলেছিলেন বাড়িতে কাউকে বলিসনি, পাড়ায় রটে যাবে । বলিনি কখনও যে গোরুর মাংস খেয়েছি । উনি জিভ দিয়ে আমার ঠোঁট পুঁছে দিয়েছিলেন । যেদিনই মাংস রান্না হয়েছে সেদিনই ব্ল্যাকমেল করেছি ঘষাঘষি খেলার আগে ।

         একদিন হাস-মুরগির অন্ধকার ঘরে শ্রোতার প্যান্ট খুলে নামিয়ে দিলেন, নিজের চুড়িদার নামিয়ে দিলেন আর শ্রোতাকে কষে জাপটে ধরে নিজেকে ঘষতে লাগলেন । শ্রোতার ভালো লেগেছিল বেশ, তাই রোজ যেতো, যদিও রোজ হাসের ডিম কেনার দরকার হতো না । এ-ব্যাপারেও কুলসুম আপা বলেছিলেন, তোর বাড়িতে কাউকে বলিসনি যেন । একদিন কুলসুম আপা শ্রোতাকে এতো বেশি জাপটে ধরে কাঁপতে লাগলেন যে শ্রোতার নুনু ছড়ে গেল, হাঁটতে অসুবিধা হল দুদিন । ভয়ে শ্রোতা তারপর কুলসুম আপার বাড়ি যাওয়া ছেড়ে দিয়েছিল । শ্রোতার জাঠতুতো-খুড়তুতো বোনরা ডিম কিনে আনতো । মেজজ্যাঠার ছোটো মেয়ে মনু জিগ্যেস করেছিল, “ছোড়দা, ওই কেলটে কালো কুচকুচে কুলসুমটা তুই কবে ওদের বাড়ি যাবি, জানতে চায় কেন রে ?”

         ‘আমদের জন্মদিন হয় না’ এই তত্ত্ব সম্ভবত ইমলিতলা বাড়ির সৃষ্টি । ঠাকুর্দা লক্ষ্মীনারায়ণ ও তাঁর দুই ভাই হরিনারায়ণ এবং বৈকুণ্ঠ  পর্যন্ত উত্তরপাড়ার সাবর্ণ চৌধুরীদের বংশলতিকা ১৯১১ সালে ‘বংশ পরিচয়’ নামে প্রকাশ করেছিলেন অমরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, যেটি বড়িশার সাবর্ণ চৌধুরী সংগ্রহালয়ে সংরক্ষিত  । ঠাকুর্দার প্রজন্ম থেকে আমাদের আর্থিক ডামাডোল আরম্ভ হয়, আর ইমলিতলায় এসে তো আমরা একেবারে ফেকলু পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিলুম । কাগজ দেখিয়ে ভারতীয় আম আদমির আত্মপরিচয় প্রমাণ করার প্রথা বোধহয় স্বাধীনতার পরই আরম্ভ হয়েছে । ঠাকুর্দার পরিচয় উইকিপেডিয়ায় আছে, তা থেকে জানা যায় উনি ১৯৩৩ সালে মারা যান, যে বছর দাদাকে মা প্রসব করেন । মানে, উনি নিজের বংশধরকে দেখে গিয়েছিলেন ।

           ১৭০৯ সালে উত্তরপাড়া শহরের পত্তন করেছিলেন রত্নেশ্বর রায়চৌধুরী, যিনি বড়িশার একান্নবর্তি জমঘট থেকে বেরিয়ে নিজের একটা আলাদা জমিদারি চাইছিলেন । সাবর্ণ রায়চৌধুরীরা ভঙ্গ কুলীন ছিল, যাদের বাড়িতে খাঁটি-বামুনরা তাদের মেয়ের বিয়ে দিত না । রত্নেশ্বর রায়চৌধুরী টাকা আর জমিদারির অংশ দিয়ে গরিব ব্রাহ্মণ যুবকদের ফুসলিয়ে জামাই করে এনেছিলেন উত্তরপাড়ায় । ছোটোবেলায় দেখেছি যে আমাদের চেয়ে তাদের রমরমা বেশি । ঠাকুমার কথায়, “তোর পূর্বপুরুষরা মাগিবাজি করে আর মদ খেয়ে সব তবিল উড়িয়ে দিয়েছে, ওরা কোম্পানির কাগজ কিনে-কিনে নিজেদের তবিল বাড়িয়ে নিয়েছে ।” কোম্পানির কাগজ যে কেন দামি তা জানতুম না ।      দাদুর প্রজন্মে পৌঁছে আমাদের তবিল ফাঁকা, বারোঘর চার সিঁড়ির খণ্ডহরের ইঁটে নোনা লাগা আরম্ভ, দিনে পায়রা রাতে চামচিকেতে ছয়লাপ  । দাদু প্রথম সুযোগেই উত্তরপাড়া থেকে কেটে পড়েন । ওনার অন্য দুই ভাই খণ্ডহর ছেড়ে পালাননি, তাঁদের নাতিরা কেউ-কেউ হিন্দ মোটরে হাতুড়ি পেটার কাজে নেমে গিয়েছিল ।

           এখানে একটা ঘটনার কথা বলি । স্বাভাবিক যে দাদাকে ঠাকুমা সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতেন । আমাকেও বাসতেন, তবে তা যে দাদার চেয়ে কম তা ওনার আচরণে টের পাওয়া যেতো । কলকাতার সিটি কলেজে পড়ার সময়ে দাদা ঠাকুমার সঙ্গে থাকতেন । হাংরি আন্দোলনে দাদার গ্রেপতারির সংবাদে ১৯৬৪ সালের সেপ্টেম্বরে ঠাকুমার হার্ট অ্যাটাক হয়েছিল, আর তিন দিন কোমায় থাকার পর মারা যান । দাদার গ্রেপ্তারির কথা যাতে ওনার কানে না যায় তা বড়োজ্যাঠা আগে থেকেই হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন । কিন্তু গ্রেপ্তারির পর ব্যাংকশাল কোর্ট থেকে জামিন নেবার ব্যাপারে বাবা-কাকা-জ্যাঠা-পিসেমশায় উত্তরপাড়ার বাড়িতে একত্রিত হয়েছিলেন । এতোজনকে দেখে ঠাকুমার সন্দেহ হয় । তাঁকে জানানো হয় মামলার কথা । শোনামাত্রই তাঁর হার্ট অ্যাটাক হয়েছিল । ওনার শুকনো মাইয়ের বোঁটা ওপরে তুলে তার তলায় স্টেথোস্কোপ রেখে ডাক্তার ঘোষণা করেছিল, “ডেড”।

         ঠাকুমার মৃত্যুদিন মনে রাখার অসুবিধা হয় না, তার সঙ্গে জুড়ে আছে আমাদের কোর্টে দৌড়োনোর অভিজ্ঞতা । কিন্তু পরিবারের অন্য কারোর মৃত্যুদিনেরও, যেমন ঠাকুর্দার বা ঠাকুর্দার ভাইদের, জ্যাঠা-বাবার, কাকিমা-জেঠিমাদের, কোনো হদিশ নেই ।

        —মৃত্যু দিনগুলো কেন মনে রাখোনি তোমরা ?

        —তুই বোকা না গাধা ; মৃত্যু দিন মনে রাখার আবার কি দরকার ।

        —বাঃ, মৃত্যুর জন্য শোক প্রকাশ করবে না তোমরা ?

        —ওসব নাটোক-নবেলে হয় । পূর্বপুরুষরা মারা গেলে বছরে একটা দিনই তর্পণ করতে হয়, তিল-গঙ্গাজল দিয়ে, আত্মাদের অশান্তি করার মানে হয় নাকি, ওনারা যে যেখানে আছেন সেখান থেকে আমাদের সবাইকে আশির্বাদ করেন, তোকেও ।

        তার মানে, আমাদের যেমন জন্মদিন হয় না, তেমনিই, মৃত্যুদিনও হয় না । ইমলিতলার বাড়ির তত্ত্ব অনুযায়ী আমরা যেমন জন্মাই না, তেমনিই আমরা মরি না । আমরা অজাতশত্রু ।

        অজাতশত্রু, জানা গেল, এই পাটনা শহরেরই লোক, রাজা ছিলেন, এই শহরের পত্তন করেছিলেন, তখন এই শহরের নাম ছিল পাটলিপুত্র । পাটলিপুত্রর ধ্বংসাবশেষ দেখতে বড়োজ্যাঠা নিয়ে গিয়েছিলেন আমাদের । গাইডের কাছে জানা গেল যে অজাতশত্রু ছিলেন মগধের রাজা, যিশুখ্রিস্টের জন্মের চারশো বছরেরও বেশি আগে গঙ্গার ধারে একটা ছোটো দুর্গ তৈরি করেছিলেন ।

       —পাটলিপুত্র নাম কেন ?

       —পাটলি হল এক ধরণের চাল আর পুত্র মানে ছেলে ।

       —চালের ছেলে ? অমন হয় নাকি ?

       —তা নয়, পাটলিপুত্র মানে পাটলির ছেলে, যিনি রাজা সুদর্শনের মেয়ের সন্তান ।

       —যিশুখ্রিস্টের জন্মের তিনশো বছর আগে গ্রিক ইতিহাস-লেখক লিখেছিলেন যে পাটলিপুত্র বেশ বড়োসড়ো শহর ।

       —এ তো দেখছি আমাদের জন্ম হয় না আমাদের মৃত্যু হয় না ধরণেরই গল্প, বড়োজ্যাঠা ।

       —তবে আর ইতিহাস বলেছে কেন । তুই গাইডকে জিগ্যেস কর, অজাতশত্রু কবে জন্মেছিল, কবে মারা গিয়েছিল, বলতে পারবে না ।

       আমি জিগ্যেস করা আরম্ভ করেছিলুম, গাইড আবার গল্প ফাঁদতে আরম্ভ করল ; পাটলিপুত্র ছিল একটা জলদুর্গ, গঙ্গা, গণ্ডক আর শোন নদীর তৈরি ত্রিভুজের মধ্যে, নন্দরাজত্ব, মৌর্যরাজত্ব, শুঙ্গরাজত্ব, গুপ্তরাজত্ব আর পাল রাজাদের রাজধানী । নানা জায়গা থেকে জ্ঞানীগুণিরা এখানে এসে জড়ো হতেন, যেমন এসেছিলেন চাণক্য ।

      —তাদের ছেলেরা সব বাহুবলি,ডাকাত, খুনি, চোরছ্যাঁচোড় আর রাজনীতিক হয়ে জন্মাচ্ছে ।

         বাবার ফোটোগ্রাফির দোকানের চাকর রামখেলাওন সিং ডাবর, দেয়ালে হেলান-দেয়া  বড়জ্যাঠার সাইকেলের সিটে আমাকে বসিয়ে ধরে থাকে, আরি আমি, অজাতশত্রু, হাতির ওপরে বসে রাজ্য জয় করতে বেরোই, হাতে তরোয়াল, যা ডাবরই তৈরি করে দিয়েছে, ফিলমে পাকানো লাল কাগজ মুড়ে-মুড়ে, ছড়ির মতন  । তরোয়াল ঘোরাই, হাতির পিঠে সামলাতে না পারলে রামখেলাওন সিং ডাবর হুকুম করে, ‘ঠিক সে বয়ঠিয়ে মহারাজ’ ।

          দাদা, দেখতে পেয়ে বলে ওঠে, ওঃ, আমাকে সিংহাসন দিয়েছিলেন ঠাকুমা, তুই বেদখল করে রাজত্ব চালাচ্ছিস, জানিস কি যে অজাতশত্রুর একটা হাতে কড়ে আঙুল ছিল না ; আর অজাতশত্রুর নাক উঁচু ছিল বলে প্রজারা ওনাকে বলতো পীনোন্নত ।

         দাদার সঙ্গে আমার পাঁচ বছর বয়সের তফাত, ভয় দেখাবার অধিকার আছে মনে করে এড়িয়ে যেতে ডাবর বলে, ‘হাঁ, সচ্চিমুচ্চি, লোগ কহতে হ্যাঁয়, উ চার উংগলিকে রাজা থে; হমরে বৈশালি মেঁ সবকোই জানত হ্যায়।’

         ঠাকুমাকে জিগ্যেস করা যাবে না, উনি উত্তরপাড়া ফিরে গেছেন । ক্লাসে হিসি পেলে অজাতশত্রু কেমন করে পারমিশান চাইতো তাহলে, কাকে জিগ্যেস করি ? সিসটার আইরিনের ক্লাসে আমি তো ওই ভাবেই অনুমতি চাই । কনভেন্টে কেউই পীনোন্নতর বাংলা বলতে পারবে না, অজাতশত্রুর নামই শোনেনি হয়তো মাদার সুপিরিয়র, সিসটাররা, সিসটার আইরিন আর ফাদার হিলম্যান ।

        ছোটোকাকাকে জিগ্যেস করলুম । তখনও উনি উত্তরপাড়া গিয়ে প্রেমে পড়েননি, বউ কুচিকে পাটনায় আনেননি । “আরে ধ্যুৎ, সব গাঁজাখুরি, রাজাদের নিয়ে ওদের দরবারিরা নানা গপপো ফাঁদে।”

       —আর উনি নাকি পীনোন্নত রাজা ছিলেন ?

       ছোটোকাকার হাসি, গমকে গমকে পেট চেপে ধরে হাসি, ডেকে আনল জেঠিমা আর মাকে । ছোটোকাকা ব্যাপারটা ওনাদের বোঝাতে, জেঠিমা বললেন, “নাক উঁচুদের উন্নাসিক বলে রে, আর যাদের মাইয়ের বোঁটা উঁচু, তাদের বলে পীনোন্নত, এই যেমন আমার, এই দ্যাখ, একে বলে পীনোন্নত, এখনও পীনোন্নত আছে। তুই তো অনেক কাল অব্দি পাড়ার বউদের মি খেয়ে বেড়িয়েছিস, পীনোন্নত জানিস না ?”

     —মি-এর উঁচু বোঁটাকে বলে পীনোন্নত ? সুদামিয়ার, কপিলের মায়ের, কৃষ্ণন্নার মায়ের, কালুটুয়ার চাচির, বিরজুর মায়ের, মুনসিজির বউয়ের সকলের মি-ই তো পীনোন্নত । দাদা আমাকে পিটুনি খাওয়াবার জন্যে বলেছে, তার মানে !

     আমার মায়ের বুকে পর্যাপ্ত দুধ হতো না বলে আমি পাড়ার নার্সিং মাদারদের কোলে পৌঁছে যেতুম ছোটো বেলায় । জেঠিমার কথায়, আমি ভোরবেলা উঠেও কান্না জুড়তুম, “মি খাবো, মি খাবো”, আর ছোড়দি, ধরিত্রী,  কোলে করে নিয়ে যেতো পাড়ার কোনো বাড়িতে আর সঁপে দিত তার কোলে ।

       অজাতশত্রুর কড়ে আঙুল ছিল কিনা তার ফয়সালা করার জন্য দুপুরে, বাবা যখন দোকানের কাজ সেরে লাঞ্চ খেতে এসেছেন, তখন জিগ্যেস করলুম ওনাকে । বাবা খেতে বসে গম্ভীর মুখে বললেন, “মা তোদের অজাতশত্রু খেতাব দিয়ে ভালো কাজ করেনি, অজাতশত্রুটা বাজে লোক ছিল, নিজের বাবা বিম্বিসারকে জেলে পুরে খুন করেছিল, কাকার রাজ্য কাশি আক্রমণ করে তাকে হারিয়ে দিতে, কাশির রাজা নিজের মেয়ের সঙ্গে অজাতশত্রুর বিয়ে দিয়ে দিলে, আর কাশি রাজত্বও দিয়ে দিলে, নিজের খুড়তুতো বোনকে বিয়ে করে নিলে, ছি ছি । ষোলো বছর যুদ্ধ করে গঙ্গার ওপারে লিচ্ছবিদের রাজত্ব দখল করে নিলে, এখন যাকে হাজিপুর বলে, নিজের ভাইদের রাজত্ব আক্রমণ করে সেগুলো দখল করে নিলে, অতো রক্তপাত ভালো নয় ।” বাবা শাকাহারি, তাই রক্তপাতের বিরুদ্ধে ।

       ডাবর বলেছিল, হাজিপুরের কলাকে বলে চিনিয়া কেলা, সবচেয়ে ছোটো মাপের কলা, অজাতশত্রুর ভয়ে কলাগুলো নাকি ছোটো আর একটু টোকো হয়ে গিয়েছিল ।

       —তাহলে বৈশালী আর মুজফফরপুরে এতো ভালো মিষ্টি লিচু কী করে হয় ?

       —চিন থেকে এনেছিল একজন পরিব্রাজক, তাই ওখানকার লিচুকে বলে শাহি লিচু, চায়না লিচু , আম্রপালী নামে একজন সুন্দরী ছিল, তার ছোঁয়া পেয়ে ওখানকার লিচু মিষ্টি।

       ঠাকুমা পাটনায় এলে বলেছিলুম, তুমি আমাদের অজাতশত্রু খেতাব ফেরত নাও ; বাবা বলেছে লোকটা বাজে ছিল। ঠাকুমা বললে, তোর দাদু তোর দাদাকে সমীর নাম দিয়ে গেছে, তার সঙ্গে মিলিয়ে তোর নাম তোর বাপ রেখেছে মলয়, আর কি, এই নামেই বংশের মুখ উজ্জ্বল কর ।

       —বংশের মুখ উজ্জ্বল ? সেটা কী ?

       —বড়ো হলে টের পাবি, অন্য লোকেরা যদি তোকে হিংসে করে তাহলে বুঝবি বংশের মুখ উজ্জ্বল করতে পেরেছিস । ।

       ঠাকুমা মারা গেলেন বলে আর বলার সুযোগ হয়নি যে, বড়ো হয়ে মুখ যা করেছি, বাড়ির লোকে তাকে মুখ উজ্জ্বল মনে করলেও, ব্যাঁকা মানুষরা তা মনে করে না । তারা নানারকম লেখালিখি করে, হিংসে করে ।

       বলেছিলুম, তুমি তোমার ছেলেদের ডাকনাম রাখোনি কেন ? ঠাকুমা বললে, “কেন ? তোর জ্যাঠাকে খোকা বলে ডাকি এখনও, তোর মেজজ্যাঠাকে মেজখোকা বলি, তোর বাপকে রঞ্জা বলি, তারপর আর কারোর ডাকনাম রাখিনি । তোর বাপের নাম তো মহারাজা রঞ্জিত সিং-এর নামে রেখেছিলুম, যখন তোর বাপকে প্রসব করেছিলুম, তখন লাহোরে থাকতুম, রঞ্জিত সিং এক-চোখ অন্ধ ছিল, ওর অনেকগুলো বউ ছিল, বাঁদিও ছিল, তাই বলে তোর বাপের রঞ্জিত খেতাব কি ফিরিয়ে নেবো ?

      —বাঁদি কি ?

      —যে বউদের লোকে বিয়ে করে না কিন্তু তাদের নিজের বাড়িতে বউদের মতন  রাখে । অজাতশত্রুরও অনেকগুলো বউ আর বাঁদি ছিল ।

      —দারুণ ব্যাপার ; আমিও বড়ো হলে অনেকগুলো বাঁদি রাখব ; বাচ্চা হলে বাঁদিদের দুধ খেতে পারব।

      —তা রেখো, কিন্তু আমার বারো ঘর চার সিঁড়ির সাবর্ণ ভিলায় এনোনি তাদের ।

      আমার অজাতশত্রু হবার শখের এখানেই ইতি । ঠাকুমাকে বললুম, “অজাতশত্রু কতোদিন রাজত্ব করেছিল লোকে হিসেব রেখেছে, ওর বাবা বিম্বিসার কতোদিন রাজত্ব করেছিল তার হিসেব রেখেছে লোকে, কিন্তু ওদের জন্মদিনের আর মৃত্যুদিনের হিসেব রাখেনি । তুমিও কবে তোমার ছেলেদের প্রসব করেছিলে তার হিসেব রাখোনি।”

পনেরো

        ঠাকুমা জেনে যেতে পারেননি যে এখন একজন লোক যে আসলে সেই লোকটাই, তা প্রমাণ করার জন্য কতো কাগজপত্র সামলে রাখতে হয়, হাসপাতালের বার্থ সার্টিফিকেট, কর্পোরেশানের বার্থ সার্টিফিকেট, ভোটার কার্ড, র‌্যাশান কার্ড, আধার কার্ড, টেলিফোনের বিল, পাসপোর্ট, ইলেকট্রিক বিল । ভাগ্যিস বিম্বিসার আর অজাতশত্রুর সময়ে ওসব বালাই ছিল না ।

        বড়ো জ্যাঠা মারা যেতে জেঠিমার পেনশন তুলতে গিয়ে কি হ্যাঙ্গাম; হাতেখড়ির মতন কষ্ট করে শেখা কম বয়সের সইয়ের সঙ্গে বুড়ি বয়সের সই মেলে না, পঁয়তাল্লিশ টাকা পেনশন তোলার জন্য আদালতে গিয়ে এফিডেভিট করতে হয়েছিল যে উনিই নন্দরানি, বড়োজ্যাঠার বউ । আজকালকার মতন, কোনও কাগজে বড়োজ্যাঠাও জন্মাননি, বড়োজেঠিমাও জন্মাননি । বড়োজ্যাঠার চাকরি ছিল পাটনা মিউজিয়ামে মূর্তিদের আর পেইনটিঙগুলোর ঝাড়াই-পোঁছাই, যার জন্য কোনো কাগজের দরকার হয়নি, ধ্যুৎ ভাল্লাগে না বলে মাঝে চাকরি ছেড়ে দিলেও, কিউরেটার বাড়িতে লোক পাঠিয়ে বাবা-বাছা করে আবার চাকরিতে বহাল রেখেছিল, অথচ বড়োজ্যাঠা চাকরি পেয়েছিলেন ঠাকুমার জাঠতুতো দাদার সুপারিশে, তিনি কলকাতা মিউজিয়ামের অ্যাসিস্ট্যাণ্ট কিউরেটার ছিলেন, লেখক ছিলেন, ওনার নাম ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায় । ইংরেজরা যাবার পরে বড়োজ্যাঠার চাকরির নাম হয়ে গেল কিপার অফ পেইনটিংস অ্যাণ্ড স্কাল্পচার, মাইনেও বেড়ে গেল, রিটায়ার করার সময়ে নব্বুই টাকা ।      মিউজিয়ামে বড়োজ্যাঠা একটা ঘর পেয়েছিলেন, গরমকালে ঘরের কল খুলে দিয়ে মেঝেয় জল ভরে দিতেন আর দুপুরে ইজি চেয়ারে শুয়ে নাক ডাকতেন । অফিস যেতেন পাঞ্জাবির ওপরে ধুতি, মাথায় হ্যাট, সাইকেলে তিন কিলোমিটার । আমার স্কুলের ছুটি পড়লে আমি ওনার সাইকেলের পেছনে ক্যারিয়ারে বসে চলে যেতুম ওনার অফিসে, দুপুরে খাবার জন্য টিফিনের কৌটো নিয়ে । টিকিট না কেটেই সারা মিউজিয়াম ঘুরে বেড়াতুম ।    বড়োজ্যাঠা অনেকসময়ে আমাকে সঙ্গে করে ঘরগুলোয় নিয়ে গিয়ে দেখাতেন কোনটা কার মূর্তি, কোন জিনিস কতো হাজার বছর আগেকার । একজন অপ্সরার মাই আর একজন গলাকাটা পুরুষের মূর্তির নুনু চকচকে ছিল, কেন তা জানতে দেরি হয়নি, দেখি মহিলা দর্শকরা গলাকাটা মূর্তির নুনুতে হাত দিয়ে টুক করে কেটে পড়ছে, আর একই কাজ করছে পুরুষ দর্শকরা অপ্সরার মাইতে হাত বুলিয়ে । আমি অপ্সরার মাইতে হাত দিতে পারতুম না, কেননা আমার হাত পৌঁছোত না । খেমির মাই অপ্সরাদের চেয়ে ছোটো ছিল; কুলসুম আপার মাই অপ্সরাদের চেয়ে কালো ।

         বড়োজ্যাঠার টয়লেটে গিয়ে প্যান্টুলের বোতাম খুলে দেখেছিলুম, শ্বেতপাথরের গলাকাটা মূর্তির চেয়ে আমার নুনু বড়ো । গলাকাটা মূর্তি, পরে বলেছিলেন বড়োজ্যাঠা, আলেকজাণ্ডারের । শুনে বেশ ভালো লেগেছিল ; তার মানে আমিও আমার নুনু নিয়ে পৃথিবী জয় করতে যেতে পারব । খেমি যদি বেঁচে থাকত তাহলে ওর মাইও হাতের পালিশ খেয়ে অপ্সরার মতন চকচকে আর বড়ো হতো, পীনোন্নত । কিন্তু ওর তো বিয়ে হয়ে যেত, ওর বরকে লুকিয়ে খেমির মাইয়ে হাত বোলাতুম, ওর ঠোঁট চেবাতুম, তালশাঁসের মতন খেতুম ।   বড়োজ্যাঠা মারা গেছেন, আমরা সেই দিনকার ঘটনা জানি । তবে তারিখটা কেউ মনে রাখেনি । বড়োজ্যাঠার জন্মদিন নেই, বড়োজ্যাঠার মৃত্যুদিন নেই । আলেকজাণ্ডারেরও নেই । বড়োজেঠা যেদিন মারা গেলেন, বাবা আমাকে অফিস থেকে ডেকে পাঠালেন জরুরি কাজ আছে, জানিয়ে । বাড়ি ফিরে দেখি কেবল নকাকিমা রয়েছেন, বললেন তাড়াতাড়ি খেয়ে নে, তোকে এক্ষুনি দিদিদের বাড়ি যেতে হবে । খেয়ে নিয়ে দিদিদের বাড়ি ছোটালুম সাইকেল । গিয়ে দেখি বড়োজেঠাকে বাঁশের মাচানে বেঁধে ফেলা হয়েছে । আমাকে যেতে হবে মুখাগ্নি করতে । সেই প্রথম শবকে ঘি মাখানো, পুরুত সতীশকাকার হুকুম অনুযায়ী মন্ত্র বলা আর কুশকাঠি-শরকাঠিতে আগুন ধরিয়ে মুখাগ্নি করার অভিজ্ঞতা, চিতাকে ঘিরে কাঁধে হাঁড়ি নিয়ে ফেলে দেয়া। শ্মশানে দাঁড়িয়েই কান্না পেয়ে গেলো, কাঁদলুমও, সতীশকাকা বললেন, হ্যাঁ, একে বলে শ্মশানবৈরাগ্য । হিন্দু মারা গেলে তার জ্বলন্ত দেহ থেকেও শেষবারের মতন শব্দগুলো পোড়া কাঠের সঙ্গে আকাশে ওড়ে, যাদের শব গোর দেয়া হয় তারা এই শেষ শব্দের গুঞ্জনের আহ্লাদ থেকে বঞ্চিত ।

          আমার এখন তিনটে জন্মদিন ; এগারোই কার্তিক, মায়ের বক্তব্য অনুযায়ী । উনত্রিশে অক্টোবর, স্কুলের সার্টিফিকেট অনুযায়ী । দোসরা নভেম্বর, ফাদার হিলম্যানের নির্ণয় অনুযায়ী । তিনদিন শুভেচ্ছা পাবার জন্য জন্মদিনের আর কীই বা চাই ।

          আমাদের বাড়িতে জন্মদিনকে উৎসব করায় আমার স্ত্রী সলিলার ভূমিকা আছে ; আমার মেয়ে হলে তার জন্মদিন পালন করা আরম্ভ হয় । তার আগে জন্মদিন যে অনুষ্ঠান হিসেবে আমোদ-আহ্লাদ করার দিন তা জানতেন না কেউ । মেয়ের জন্মদিন পালন করা আরম্ভ হলে দোসরা নভেম্বরকে আমার জন্মদিনের স্বীকৃতি দিয়ে খানাপিনার ব্যবস্হা আরম্ভ হয় । রেস্তরাঁয় গিয়ে ককটেল পার্টি করার সেই সূত্রপাত। এমনকি জন্মদিনে যে কেক কাটতে হয়, মোমবাতি নিভিয়ে হ্যাপি বার্থডে টু ইউ গাইতে হয়, তারও ।

ষোলো             

         বড়োজ্যাঠার দুই মেয়ে, সাবিত্রী আর ধরিত্রীর বিয়ে আমার শৈশবেই হয়ে গিয়েছিল, তার কোনো স্মৃতি ধরে রাখতে পারিনি । মেজজ্যাঠা আর কাকাদের মেয়ের বিয়ের ব্যবস্হা করেছিলেন বাবা, কেননা তাঁদের শৈল্পিক উদাসীনতায় ওদের বয়স বেড়ে যাচ্ছিল ; তাছাড়া বিয়ের খরচের ব্যাপারটাও ছিল । মেজজ্যাঠার ছোটো মেয়ে মনু বা মীনাক্ষী একজন বিহারি ছেলেকে ভালোবেসে বিয়ে করতে চাইলে, মেজজ্যাঠা অমত জানান । মেজজ্যাঠার অমত হওয়ায়, বাবা তাঁকে বোঝানো সত্ত্বেও তিনি রাজি হননি ; তাঁর বিরুদ্ধতা করে বাবা নিজে অংশ নিতে চাননি, আমাকে টাকাকড়ি দিয়ে বলেন, “ওরা কোথায় গিয়ে বিয়ে করতে চাইছে, সেখানে গিয়ে সম্প্রদান করে আয়।” সে এক মজার অভিজ্ঞতা, যেতে হয়েছিল খুসরুপুর নামে একটা ধাদ্ধাড়া গোবিন্দপুরের মন্দিরে, গিয়ে দেখি, সার বেঁধে বিয়ে হচ্ছে চত্ত্বরে । আমাকে একটা গোলাপি ধুতি দেয়া হয়েছিল, প্যাণ্ট খুলে পরে নিয়েছিলুম, তারপরে সম্প্রদান, বাঙালিদের বিয়ের মতন নয়, বা শহুরে বিহারিদের বিয়ের মতন নয় । ফেরার সময়ে পাটনা স্টেশানে নেমে রঙিন ধুতি খুলে প্যান্ট পরে নিয়েছিলুম ।

         মা মারা যান লখনউতে আমার কাছে থাকার সময়ে, ১৯৮২ সালের ১৮ই নভেম্বর হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে । বাবা মারা যান পাটনায়, ১৯৯১ সালের ৮ই অক্টোবর, তখন তিনি কাজ থেকে অবসর নিয়েছেন আর দোকান চালানো আরম্ভ করেছে দাদার বড়ো ছেলে টোটোন বা হৃদয়েশ । আমার এটাই প্রধান রিগরেট যে বাবাকে আমি মুম্বাইতে নিয়ে আসিনি, তখন তো আমি মুম্বাইতে চাকরি করছি, বেশ বড়ো ফ্ল্যাট পেয়েছি সান্টাক্রুজে, আশেপাশে নামকরা হাসপাতাল । মায়ের মৃত্যু সম্পর্কেও রিগরেট থেকে গেছে যে প্রতিবেশী হায়দার আলিকে না জানিয়ে প্রাইভেট হাসপাতালে ভর্তি করেছিলুম । নবাব পরিবারের হায়দার আলির প্রভাব ছিল সরকারি হাসপাতালে, আর লখনউতে সেসময়ে প্রাইভেট হাসপাতালের তুলনায় সরকারি হাসপাতালে যন্ত্রপাতি আধুনিক ছিল, ডাক্তাররা ছিল অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ।

 

          আমার চরিত্রগঠনে বা বিগঠনে খাঁটি অবদান মহাদলিতদের পাড়া ইমলিতলা ; সেখানকার অভিজ্ঞতা আমাকে শিক্ষিত করে তুলেছে, শিখিয়েছে মানসিক-ঔদার্য, সারগ্রাহীতা, তার প্রতিটি বাসিন্দা ছিল প্রতিষ্ঠানবিরোধী, বেপরোয়া, গোলমালকারী, স্হিতাবস্হাবিরোধী, যারা নিজেদের বলতো “দুনিয়াকা নাসুর”, মানে পৃথিবীর এমন নালি-ঘা যা সারে না, প্রথমে বিদেশি ও পরে স্বদেশি সরকার তাদের জীবনযাত্রার লড়াইকে মনে করেছে প্রতিরোধ-প্রতিবাদ, মনে করেছে মৌরসি-পাট্টার শত্রু, তাদের মনে করেছে বিপজ্জনক, অথচ তা ছিল ওদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা । জীবনকেচ্ছা প্রায় প্রতিদিনই ঘটতো ইমলিতলা পাড়ায় কিন্তু সেসব নিয়ে বাঙালি মধ্যবিত্তের মতন কেউই খিক-খিকে হাসি হাসতো না ।

         আর অবশ্যই বাড়ির-দোকানের দুই কাজের লোক, শিউনন্নি আর ডাবর । ১৯৫৫ সালে  বি এন কলেজের ছাত্র ইউনিয়ানের জুলুসে আমি সামনের দিকে হাঁটছিলুম, আমার আর তরুণ শুরের হাতে ব্যানার, কোথা থেকে ডাবর ছুটে এসে আমার হাত ধরে বলল, “ই সব মত কিজিয়ে, মারে যাইয়েগা।” কয়েকদিন আগেই পুলিশের গুলিতে দীনানাথ পাণ্ডে নামে এক ছাত্র মারা গিয়েছিল, অকারণেই পুলিশ গুলি চালিয়েছিল, কেননা ছাত্রদের দাবি ছিল বাসের সংখ্যা আর সময় বাড়ানোর ।  প্রতিবাদ করতে বেরিয়েছিলুম আমরা, দাবি ছিল জুডিশিয়াল এনকোয়ারির । শেষে নেহেরুকে এসে বক্তৃতা দিয়ে ছাত্রদের শান্ত করতে হয়েছিল ; মুখ্যমন্ত্রী এস কে সিং অবস্হা সামলাতে হেগে ফেলার পর । তখনই নেহেরুকে একেবারে সামনে থেকে দেখেছিলুম । হাবভাব দেখে মনে হয়েছিল বেশ উন্নাসিক মানুষ ।

         আমি আমার সহ্যশক্তি আর যুঝে যাবার ক্ষমতা ইমলিতলা পাড়া থেকেই পেয়েছি : হাতকড়া, কোমরে দড়ি, জেলহাজত, শত্রুদল, কুখ্যাতি, অপমান, অপপ্রচার, বিরোধিতা, কটূ মন্তব্য, বিশ্বাসঘাতকতা ।          ইমলিতলাতেই জেনেছি, প্রতিটি নারীর দেহে নিজস্ব সুগন্ধ থাকে যা শহুরে মহিলারা পারফিউম মেখে নষ্ট করে ফ্যালে , পারফিউম জিনিসটা তাই আমার পছন্দও নয় , পাড়ার সকলের বাসার মতনই আমাদের বাড়িতেও কলিং বেল ছিল না, বাড়ির কারোর সঙ্গে দেখা করতে হলে তার নাম ধরে ডাকতে হতো , নাম ধরে ডাকার এই বাচনিক সম্পর্ক হারিয়ে গেল ইমলিতলা ছাড়ার পর , ইমলিতলার দিনগুলো নিজস্ব রঙে আর গন্ধে দেখা দিতো, রাতগুলো দেখা দিতো কেরোসিন লন্ঠন আর রেড়ির তেলের লম্ফর শিখায় । কাউকে কখনও সোনার গয়না পরতে দেখিনি ইমলিতলায়, রুপোর গয়না কেবল বিয়েতে । আমি সোনার আঙটি পেয়েছিলুম আমার উপনয়নে, যা আমি খুলে পরিয়ে দিয়েছিলুম আমার প্রথম আর শেষ রোমান্টিক প্রেমিকাকে, সে পরে ওই আঙটি পরিয়ে দিয়েছিল তার নতুন প্রেমিককে, যাকে সে বিয়ে করেছিল আর পরে ডিভোর্স দ্যায় ; জানিনা সেই আঙটির কী হল শেষ পর্যন্ত, কেননা ওর বর ছিল স্মাগলার । স্মাগলারকে বিয়ে করে ওর বিখ্যাত বক্তব্য মনে রেখেছি, “টাকা হল ডলারের বেজন্মা বাচ্চা”।          ইমলিতলার মসজিদে লাউডস্পিকার ছিল না ; রমজানের সময়ে একজন ফকির ভোর রাতে গান গাইতে-গাইতে যেতো যাতে পাড়ার মুসলমান পরিবারের সদস্যদের ঘুম ভেঙে যায় । সেই ফকিরের এক হাতে সাপের মতন ব্যাঁকা ছড়ি আর অন্য হাতে লাউয়ের মোটা খোসা শুকিয়ে তাতে লোবানের ধোঁয়া।

         মা, বাবা আর শিক্ষক, যে তিনজন মানুষ ব্যক্তিজীবনের অভিমুখ গড়ে দ্যান, আমার জীবনে মা আর বাবার ভূমিকাই প্রধান । প্রকৃত অর্থে প্রাইমারি স্তরে কনভেন্ট ছাড়া, রামমোহন রায় সেমিনারি স্কুলে এবং পরে কলেজে ও বিশ্ববিদ্যালয়ে, আমি কোনো শিক্ষকের নৈকট্য এবং পথনির্দেশ ও বন্ধুত্ব পাইনি, সমাজে শিক্ষকের অবদানের অবনমন তখন থেকেই শুরু হয়ে গিয়ে থাকবে । এখন তো শিক্ষকতা ব্যবসায়ের পর্যায়ে চলে গেছে । স্কুল শিক্ষকরা স্কুল ছেড়ে কোচিং আর প্রাইভেটে পড়ানোয় বেশি রোজগার করছেন । রামমোহন রায় সেমিনারিতে আমি ক্রমশ মূর্খ হয়ে যাচ্ছিলুম ; বেঁচে গিয়েছিলুম উঁচু ক্লাসের ছাত্রী আর স্কুলের লাঞ্চ পিরিয়ডের সময়ের গ্রন্হাগারিক নমিতা চক্রবর্তীর কারণে ; সিসটার আইরিনের পর উনিই আমার প্রকৃত শিক্ষক । সিসটার আইরিন আর নমিতা চক্রবর্তীকে মনে করলেই আঁচ করতে পারি যে ওনাদের অস্তিত্বে কোথাও অবিনশ্বরতা ছিল, যার কিছুটা ধুলো আমায় মাখিয়ে দিয়ে গেছেন ওনারা  ।

         কনভেন্ট বা ক্যাথলিক ইশকুলে  ভর্তি হবার ঘটনাটাও ঐন্দ্রজালিক কেননা স্হানীয় ক্যাথেড্রালের যাযক ফাদার হিলম্যান, যিনি প্রচুর ফোটো তুলতেন, প্রায়ই আসতেন বাবার ফোটোর দোকানে, ওনার তোলা ফোটো ডেভেলাপ ও প্রিন্ট করাবার জন্য আর উনি বলতেন ভারত হল রামধনুর সাতটি রঙের বিস্ফোরণ । বাবার সঙ্গে ওনার প্রায় বন্ধুত্বের সম্পর্ক হয়ে গিয়েছিল । একদিন বাবা আমাকে দোকানে নিয়ে গিয়েছিলেন, খেলছিলুম, অসিযুদ্ধ করছিলুম অদৃশ্য দৈত্য-দানবদের সঙ্গে, সেসময়ের বক্স ক্যামেরায় ব্যবহৃত ফোটোর নেগেটিভের আস্তরণ, লম্বা লাল রঙের কাগজ দিয়ে পাকানো লাঠি নিয়ে, যা বাবার দোকানের কাজের লোক রামখেলাওন সিং ডাবর তৈরি করে দিয়েছিল। সেসময়ে ডিজিটাল ফোটোগ্রাফি আবিষ্কার হয়নি, শৌখিন ফোটো-তুলিয়েরা ক্যামেরাগুলো দিয়ে সাধারণত বারোটা বা ষোলোটা সাদা-কালো ফোটো তুলতো । ফিল্মের রিলগুলো হতো কাচকড়ার আর তার ওপরে লাল কাগজের আস্তরন । ফাদার হিলম্যানের মতন ধবধবে ফর্সা মানুষ আমি তার আগে দেখিনি ; মানুষের গায়ের রঙ এরকমও হয়, জেনে অবাক লেগেছিল ; ওনার পোশাকও এমন যে পুরো শরীর শাদা কাপড়ে ঢাকা, শুধু হাত দুটো বেরিয়ে, চুল সোনালী, চোখ কটা, এরকম চুলও দেখিনি আগে ।

         ফাদার হিলম্যান বাবাকে বলেন, “একে স্কুলে ভর্তি করেননি কেন এখনও ? এই বয়সে যা পড়বে স্মৃতিতে আজীবন থেকে যাবে ।” বাবা জানান, “কোনো স্কুলে তো এতো ছোটো বাচ্চাকে ভর্তি করা হয় না, আর কনভেন্টে পড়াবার সামর্থ আমার নেই, কেননা আমার আর আমার ভাইদের খরচের পর কিছুই বাঁচে না । আমার বড়ো ছেলে যে সরকারি স্কুলে পড়ে সেখানেই একে ভর্তি করব দুই বছর পরে।” ফাদার হিলম্যান বাবাকে বলেছিলেন. কনভেন্টে এতো ছোটো বাচ্চাদের একটা ক্লাস আছে, তার নাম ট্র্যানজিশান ক্লাস, আপনি কালকে একে নিয়ে আসুন আমি ভর্তি করে নেবো, নেভি ব্লু হাফপ্যান্ট, শাদা হাফ শার্ট আর নটিবয় শুজ কিনে নিন আজকে, টাই স্কুল থেকেই দেয়া হয়, ফিসের কথা ভাববেন না, মুকুব করার ক্ষমতা আমারই । সেদিনই বিকেলে স্কুলের ড্রেস কিনে দিলেন বাবা, এতো বাবুলাট পোশাক আগে পরিনি কখনও, জুতো পরে বাড়িতে গটগটিয়ে হেঁটে দেখালুম সবাইকে । রান্নাঘরের সারাদিনের কাজ সত্ত্বেও মা ঘটিতে গরম জল ভরে শার্ট-প্যান্ট ইস্তিরি করে দিতেন ।

         পরের দিন সকাল নটায় গিয়ে ভর্তি হয়ে গেলুম কনভেন্ট স্কুলে । জন্মদিন নির্ধারণ করলেন ফাদার হিলম্যান, দোসরা নভেম্বর । ভর্তি হয়ে টের পেলুম যে ইংরেজি ছাড়া অন্য ভাষায় কথা বললে শাস্তি পেতে হয় । ইংরেজি কেন, আমি তখন বাংলা আর হিন্দিও ভালো করে বলতে পারতুম না । চুপ থেকে, মাথা নেড়ে, কাজ চালাতে চালাতে রপ্ত হল ভাঙা-ভাঙা ভাষা । ফাদার হিলম্যান ছিলেন জার্মান, কিন্তু ইংরেজি আর হিন্দিতে কথা বলতে পারতেন ।          ভর্তি করিয়ে বাবা বলেছিলেন, “দুপুরে রাম খেলাওন সিং ডাবর টিফিন নিয়ে আসবে, আর ছুটির সময়ে ওর সাইকেলে করে বাড়ি ফিরবি । রোজই রামখেলাওন নিয়ে আসবে আর নিয়ে যাবে, কাল থেকে টিফিন নিজের সঙ্গে আনবি ।” এই স্কুলটা দাদার পাটনা কলেজিয়েট স্কুল থেকে আলাদা ; দাদার স্কুলে ঢুকেই দুধারে দুতলা ক্লাসবাড়ি, মাঝখানে সোজা পিচরাস্তা, বাড়ির পেছন দিকে দুটো বিশাল খেলার মাঠ, যেখানে ফুটবল আর ক্রিকেট খেলা হয়, আমি ওই মাঠে স্কুটার চালাতে শিখেছিলুম । ক্যাথলিক স্কুলে ঢুকেই একজন বউয়ের পাথরের মূর্তি, তার কোলে বাচ্চা, পেছনদিকে একজন লম্বা-দাড়ি মানুষ দাঁড়িয়ে, তার পায়ের কাছে দুটো ভেড়ার বাচ্চা । পরে ফাদর হিলম্যান হিন্দিতে জানিয়েছিলেন যে মাদার মেরির কোলে যিশু আর পেছনে সেইন্ট জোসেফ । মাদার মেরি ভার্জিন আর যিশুর বাবা হলেন ঈশ্বর স্বয়ং, মাদার মেরির বিয়ে হয়নি কেননা ঈশ্বরের সঙ্গে তো বিয়ে হতে পারেনা । ভার্জিন বলতে যে কী বোঝায় তার জ্ঞান হয়েছিল পরের স্কুল রামমোহন রায় সেমিনারিতে গিয়ে ।

         কনভেন্টের গেটের ভেতর ঢুকলে বাঁদিকে একটা সবুজ ঘাসের মাঠ, ছাত্র-ছাত্রীরা খেলছে, ডানদিকে ফুলের বাগান। যে ছাত্র-ছাত্রীরা খেলছে, কয়েকজনের গায়ের রঙ ফাদার হিলম্যানের মতন ফর্সা, চুলও সোনালী, কালো তো নয়ই । কেউই ওই বাগানে যাচ্ছে না, ফুল তুলছে না দেখে অবাক লাগল । ইমলিতলার ছেলেরা দেখতে পেলে সব ফুল উজাড় করে তুলে নিয়ে গিয়ে দুর্গামাতার মন্দিরের সামনে  বিক্রি করতে বসে যেতো, বিক্রি না করলেও চিবিয়ে মুচড়ে নষ্ট করে হাহা হিহি হাসতো সবাই মিলে । দাদার স্কুলে মাঠগুলো কনভেন্টের মাঠের চারগুণ বড়ো, তাতে বিশেষ ঘাস নেই । কনভেন্টের মাঠের মাঝখানে একটা গাছ, তার তলায় অজস্র ছোটো-ছোটো সাদা ফুল পড়ে রয়েছে, সেগুলোও কেউ তুলছে না । বাবা বলেছিলেন, ওটা বকুল ফুলের গাছ । তার আগে আমি বকুল ফুল দেখিনি ; ডানদিকের বাগানে যে ফুলগুলো হয়ে আছে সেগুলোও দেখিনি আগে । বাড়িতে দেখেছি শুধু গ্যাঁদা, গোলাপ, রজনীগন্ধা, বেলি, জবা আর জুঁইফুল, যখন বড়োজেঠিমা সত্যনারায়ণ পুজোর ব্যবস্হা করেন সংক্রান্তির দিন তখন; রামখেলাওন সেসব ফুল গিয়ে গঙ্গায় ফেলে আসে । কনভেন্টের ফুল গাছেই শুকিয়ে ঝরে যায় ।

          ঢং ঢং করে ঘণ্টা বাজতেই, ছাত্র-ছাত্রীরা, কোথায় সবাই এতক্ষণ ছিল জানি না, ছুটে এসে ডানদিকের বকুলগাছের মাঠে সার দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল ; ছোটোরা সামনে আর বড়োরা পেছনে, পাঁচটা সারি। একজন সিসটার, তিনিও ধবধবে সাদা, আমার হাত ধরে নিয়ে গিয়ে একটা সারির সামনের দিকে ছোটোদের সঙ্গে দাঁড় করিয়ে দিলেন আর আমার হাত দুটো নিয়ে হাতজোড় করিয়ে দিয়ে চলে গেলেন । সিসটাররা আর ফাদার হিলম্যান আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে আমাদের দিকে মুখ করে ইংরেজিতে গানের মতন করে কথা বলা আরম্ভ করলেন আর ছাত্র-ছাত্রীরা সকলে তাঁদের সঙ্গে সেগুলো বলতে লাগল । প্রতিদিন শুনে-শুনে একসময়ে মুখস্হ হয়ে গেলে আমিও বলতুম, কিন্তু তখন মানে জানতুম না, জানতুম না যে একে বলে প্রেয়ার বা প্রার্থনা। না জেনে যে ঈশ্বরের বন্দনা গান গেয়েছি, জানার পর যাঁর সম্পর্কে আমি আজও কিছুই জানি না, তার প্রার্থনাটা এরকম :-

                 আওয়ার ফাদার ইন হেভেন

                 হোলি বাই ইয়োর নেম

                 ইয়োর কিংডাম কাম

                 ইয়োর উইল বি ডান অন আর্থ অ্যাজ ইন হেভেন

                 গিভ আস টুডে

                 আওয়ার ডেইলি ব্রেড

                 অ্যাণ্ড ফরগিভ আস আওয়ার সিনস

                 অ্যাজ উই ফরগিভ দোজ

                 হু সিন এগেইনস্ট আস

                 ডু নট ব্রিং আস টু দি টেস্ট

                 বাট ডেলিভার আস ফ্রম ইভিল

                 আমেন ।

         প্রার্থনা শেষ হতেই সবাই নিজের ক্লাসের দিকে দৌড়োলো । আমাকে একজন সিসটার হাত ধরে একটা ঘরে নিয়ে গিয়ে সেই ঘরে যে সিসটার তখনই এসেছিলেন, তাঁকে কিছু বললেন ।

         ‘সিন’ ব্যাপারটা যে কি তা তখন জানতে পারিনি, এখনও জানি না । এখন যা জানি তার নাম গিল্ট।

         স্কুলে আমার ট্র্যানজিশান ক্লাসের শিক্ষিকা ছিলেন সিস্টার আইরিন, আমার প্রথম ক্রাশ, যাঁকে পরে সেকেন্ড স্ট্যাণ্ডার্ডেও পেয়েছিলুম । উনি এসেছিলেন আয়ারল্যাণ্ড থেকে । ফাদার হিলম্যানের মতন উনিও ধবধবে ফর্সা, কিন্তু ওনার মাথা পুরোপুরি ঢাকা, শরীরও শাদা কাপড়ে ঢাকা । ওনার চোখের তারা কালো আর গভীর ছিল, দাঁত ঝকঝকে সাদা, ঠোঁট গোলাপি । প্রথমদিন উনি নিচু হয়ে আমার মুখের কাছে মুখ এনে যা বলেছিলেন তা আমি বুঝতে পারিনি ; মনে আছে সিসটার আইরিনের চোখের তারায় আমার প্রতিচ্ছবি । উনি কয়েকটা পুস্তিকা আর একটি বই দিলেন, সবই ব্রিটেনে ছাপা, কার্ডও দিলেন একগোছা। মনে আছে, সেগুলো ছিল যিশুখ্রিস্টের, মাদার মেরির আর সান্টাক্লজের । বইটিতে প্রায় প্রতিটি পাতায় ছবি আঁকা ছিল । অন্য একটা পুস্তিকায় প্রতিটি পাতায় একটা করে ইংরেজি অক্ষর ছিল, সেগুলোর দিকে তাকিয়ে-তাকিয়ে সবাই সময় কাটাচ্ছিল, সিস্টার আইরিন আমার হাত থেকে পুস্তিকাটা নিয়ে খুলে ইশারায় দেখালেন যে সবাই যা করছে আমিও যেন তাই করি । পাতা উল্টে অক্ষর আর সঙ্গের ছবিগুলো দেখলুম ।

       পরে আরেকটা রঙিন পুস্তিকা খুলে সিসটার আইরিন নিজেই শোনাতে লাগলেন, পরের ক্লাসে যাকে নার্সারি রাইম বলে জেনেছি, “হে ডিডল ডিডল, দি ক্যাট অ্যন্ড দি ফিডল, দি কাউ জাম্পড ওভার দি মুন, দি লিটল ডগ লাফড টু সি সাচ স্পোর্ট, অ্যান্ড দি ডিশ র‌্যান অ্যাওয়ে উইথ দি স্পুন।” আরেকটা, “পিটার পিটার পাপ্মকিন ইটার, হ্যাড এ ওয়াইফ অ্যাণ্ড কুড নট কিপ হার, হি পুট হার ইন এ পাম্পকিন শেল, অ্যাণ্ড দেয়ার হি কেপ্ট হার ভেরি ওয়েল।” এই দুটো আমার মনে থাকার কারণ পরের ক্লাসেও এগুলো সবাই মিলে আবৃত্তি করতে হয়েছে, অভিনয় করে, আর তিন দশক পরে আমার মেয়েকে যখন এই স্কুলে ভর্তি করি, তখন তাকেও একই নার্সারি রাইম মুখস্হ করতে হয়েছে, অথচ ততদিনে পুরো স্কুলে কেরালিয় সিসটারদের নিয়ন্ত্রণ, বিদেশিনী কেউ নেই । পরের ক্লাসে এবিসিডি শিখতে হয়েছিল গেয়ে গেয়ে । ওয়ান টু থ্রি ফোরও গেয়ে । একটা নার্সারি রাইম মনে আছে, যেটা পরেও কাজে লাগত, “থার্টি ডেজ হ্যাথ সেপ্টেম্বর, এপ্রিল জুন অ্যাণ্ড নভেম্বর, থার্টি ওয়ান দি আদার্স ডেট, এক্সেপ্ট ইন ফেব্রুয়ারি টোয়েন্টি এইট, বাট ইন লিপ ইয়ার উই অ্যাসাইন, ফেব্রুয়ারি টোয়েন্টি নাইন।” তখন এগুলোর মানেই বুঝতে পারতুম না । নার্সারি রাইমের ছন্দ মনের ভেতরে বিরক্তির বীজ হয়ে থেকে গিয়েছিল, যে কারণে কবিতা লিখতে আরম্ভ করে ছন্দ ব্যাপারটাকে পছন্দ হতো না । দাদা শিখিয়েছিল গুণে-গুণে পয়ার ছন্দে লেখার কায়দা, কিন্তু তাতে আমি স্পিড বা গতি খুঁজে পাইনি ।

         বাংলা “আইকম বাইকম তাড়াতাড়ি, যদুমাস্টার শশুর বাড়ি, রেলকম ঝমাঝম, পা পিছলে আলুর দম”, আমার জাঠতুতো-খুড়তুতো বোনেরা মাটিতে হাঁটুমুড়ে বসে খেলতো, হাঁটুতে চাপড় মেরেমেরে, এক একটা হাঁটু আউট হয়ে গেলে যার হাঁটু বাঁচতো সে জিতে যেতো । সেরকমই, “ঝাঁকড়া চুলে তালগাছ তুই দাঁড়িয়ে কেন ভাই, আমার মতো পড়া কি তোর মুখস্হ হয় নাই, দাঁড়িয়ে আছিস কান ধরে ঠায়, একটুখানি ঘুমায় না তোর পণ্ডিত মশাই”, এটাও ছিল ওদের খেলা, কে এক পায়ে কতোক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে পারে, যে সবচেয়ে বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতো সে জিতে যেতো । এগুলো তাই আমার কখনও নার্সারি রাইম মনে হয়নি।

       কনভেন্ট স্কুলে, টিফিনের সময় গেটের কাছে  ছোট্ট দরোজা দিয়ে রামখেলাওন আমাকে টিফিনকৌটো এগিয়ে দিয়ে জিগ্যেস করল, “ইংরেজিতে কথা বলতে শিখে গেছেন তো, এবার থেকে আমার বাড়িতে টাকা পাঠাবার মানি অর্ডার আপনি ভরে দেবেন ।” আমি মাথা নাড়িয়ে সায় দিয়েছিলুম । স্কুলে  টিফিন খাবার হলঘরে ঢুকে খালি জায়গা দেখে খেতে আরম্ভ করেছিলুম ; অন্য ছাত্ররা প্রায় সবাই ইংরেজিতে নিজেদের মধ্যে কথা বলছে। একটা মেয়ে আমার পাশে এসে বসে ফিসফিসিয়ে বলল, হিন্দিতে, ও ইংরেজি বলতে পারে না, এমন করে হিন্দিতে কথাগুলো বলল, যে মনে হল বাঙালি, আমি বাঙলাতেই জিগ্যেস করলুম, “তোর নাম কী” । হাসি ফুটল ওর মুখে, ওর নাম নন্দিতা, ন্যানডি । আমিও আমার নাম বললুম । ন্যানডি বলেছিল, “ওঃ, তোর নাম ময়লা !”  ফিসফিসিয়ে কথা বলার সম্পর্ক তৈরি হল আমাদের । এই সম্পর্ক বহুদিন বজায় ছিল, তার কারণ নন্দিতাও কনভেন্ট ছেড়ে আমার সঙ্গেই রামমোহন রায় সেমিনারিতে গিয়ে ভর্তি হয়েছিল । সেখানে গিয়ে আমাকে ময়লা নামে ডাকার ফলে বেশ কয়েকজন সহপাঠী ময়লা বলে ডাকতো । ধনী পরিবারের ছিল নন্দিতা, হাইকোর্টের জজ ছিলেন ওর ঠাকুর্দা, টিফিনে আনতো অমলেট-টোস্ট আর স্যালাড, প্রতিদিন, তাই আমার আলুছেঁচকি বা আলুপটল বা টমেটো-কুমড়োর সঙ্গে রুটি ওর খেতে ভালো লাগত, যেমন আমার লাগত ওর অমলেট-টোস্ট-স্যালাড । আমরা দুজনে কনভেন্ট ছেড়েছিলুম আর রামমোহন রায় সেমিনারিতে গিয়ে বাংলা মিডিয়ামে ভর্তি হয়েছিলুম একই কারণে, ভারত স্বাধীন হয়ে গিয়েছিল আর আমাদের মাতৃভাষা বাংলা, ইংরেজির দাপটে আমাদের জিভ থেকে খসে-খসে ভুল পথে চলে যাচ্ছিল।

        টিফিনের পরের ক্লাসে ফাদার হিলম্যান এসে আমাদের নিয়ে চললেন স্কুল সংলগ্ন গীর্জায়, বাইবেল ক্লাস করার জন্য । গীর্জার ছাদ অনেক উঁচু, বিরাট হলঘর, দুপাশে বসার বেঞ্চ আর সামনে টেবিল, চারিদিকের দেয়ালে সন্তদের ছবি, তাদের সকলের মাথার পেছনে গোল জ্যোতি, আরও ওপরে, রঙিন কাঁচ দিয়ে তৈরি ভেড়া, দাড়িওলা মানুষ, ঘোমটা-দেয়া বউ, আরও নানা রঙের নকশা । একেবারে সামনে একজন মানুষের মূর্তি, তার হাতে পেরেক মেরে আর দুই পা জোড়া করে পেরেক মেরে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে । দেখে, সবচেয়ে প্রথমে আমার মনে হয়েছিল, এই ভাবে হাতে-পায়ে পেরেক ঠুকে কি একজন মানুষকে ঝুলিয়ে রাখা যায়, লোকটা কি খসে পড়বে না, লোকটা তো কাঠের সঙ্গে দড়ি দিয়ে বাঁধা নেই !

        ফাদার হিলম্যান একবার ইংরেজিতে, আরেকবার হিন্দিতে বুঝিয়ে বললেন যে যাঁকে অমনভাবে দেখা যাচ্ছে তাঁর নাম জিজাস খ্রাইস্ট, আর তার গল্প, তার বলা কথাগুলো, তিনি প্রতিদিন আমাদের শোনাবেন । যে কাঠে ওনাকে বিঁধে রাখা হয়েছে তার নাম ক্রস । আমাদের বললেন, হাতজোড় করে এক বুড়ো আঙুলের ওপর আরেক বুড়ো আঙুল রেখে ক্রস তৈরি করে টেবিলের ওপরে রেখে ওনার গল্প শুনতে । উনি একথাও বললেন যে টিফিনের পর সকলেরই একটু ঘুম পায়, তাই এই বাইবেলের গল্পের ক্লাস, ঘুম পেলেও ক্ষতি নেই । তারপর ওপরে রঙিন কাচে গড়া সন্তদের নাম বললেন ; প্রতিদিন বলতেন বলে মনে রয়ে গেছে, আরও মনে থেকে গেছে এইজন্য যে পাড়ার শিয়া মুসলমান পরিবারের মেয়ে কুলসুম আপাকে যখন কনভেন্ট স্কুলের আর সন্তদের বিষয়ে গল্প করেছিলুম, তখন উনি বলেছিলেন যে ওই সন্তরা ইসলাম ধর্মেও আছে, কিন্তু নামগুলো উচ্চারণ করা হয় আরবিতে, যেমন এনোখ হল ইদ্রিস, নোয়া হল নুহ, অ্যাব্রাহাম হল ইব্রাহিম, জেকব হল ইয়াকুব, অ্যারন হল হারুন, মোজেস হল মুসা, ডেভিড হল দাউদ, জোনা হল ইউনুস, জন হল ইয়াহায়া, জিজাস খ্রাইস্ট হল ইসা মসিহ । বেশ ভালো লেগেছিল শুনে, কনভেন্ট আমার আর কুলসুম আপাদের বাড়ির মাঝে সেতুবন্ধনের কাজ করেছে যেন ।

         পরে আজব লাগত যে জেকব লোকটার নামেই পাকিস্তানের ইয়াকুব খান, জন লোকটার নামে পাকিস্তানের ইয়াহিয়া খান । ডেভিড লোকটার নামে মাফিয়া-নেতা দাউদ ইব্রাহিম । ফাদার হিলম্যান এসব গল্প জেনে যেতে পারলেন না । দাউদ ইব্রাহিম দাঙ্গা, ডাকাতি, র‌্যানসাম, হুমকি, চোরাচালান করেও হিরো, ফিলমের পর ফিলম হয়ে চলেছে, খবরের কাগজের পাতা জুড়ে, টিভির পর্দাজুড়ে তাকে নিয়ে হইহই রইরই, আর গরিবগুলো দুটো রুটি চুরি করলেই প্যাদানির নাম গঙ্গারাম, লকআপে মৃত্যু । আসলে নিজের দুঃখ কষ্ট যন্ত্রণা খিদে প্রকাশ করার জন্যে শিক্ষা দরকার, চাকরি না পেলেও ক্ষতি নেই, যেমন দাউদ ইব্রাহিম, যৎসামান্য শিক্ষাকে কাজে লাগিয়ে পোঁদে বাঁশ করে দিতে পেরেছে । মানুষ “শব্দ” আবিষ্কার করেছে মৃত্যুদণ্ড লেখার জন্য ; তারপর মৃত্যুদণ্ড লিখে কলমের নিব ভেঙে ফেলার খেলা, এদিকে কলম কবেই তামাদি হয়ে গেছে, টিকে আছে কেবল মৃত্যুদণ্ড লেখার জন্য ।

সতেরো

         কুলসুম আপার গভীর প্রভাব থেকে গেছে আমার জীবনে ; কবিতার জগতে প্রবেশ ওনার মাধ্যমেই। কনভেন্টের গির্জায় গাওয়া গান যেমন শৈশবে বুঝতে পারতুম না, অথচ শুনতে ভালো লাগতো, তেমনি কুলসুম আপার বলা কবিতা বুঝতে পারতুম না, অথচ ওনার গলায় শুনতে ভালো লাগত । রামখেলাওন সিং ডাবর রহিম, দাদু, কবীরের কিছু-কিছু দোহা জানত আর আমাদের শাসন করার জন্য সেগুলো সময়মতন বলত ; শিউনন্দন কাহার বা শিউনন্নি নামে বাড়ির কাজের লোক তুলসীদাসের রামচরিতমানস মুখস্হ বলতে পারত, শিউনন্দনও রামচরিতমানস থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে শাসন করত আমাদের । শিউনন্নি বজরংবলীর ভক্ত ছিল, বিয়ে করেনি, পাড়ার আখাড়ায় গিয়ে কুস্তি লড়ত, মুগুর ভাঁজত, চেহারা ছিল কুস্তিগীরের, অনেক বয়সে বিয়ে করেছিল, যাকে বিয়ে করেছিল তার দুটো বাচ্চা ছিল আগের পক্ষের । শিউনন্নি আমাকে ওর কুস্তি লড়ার আখাড়ায় নিয়ে গিয়েছিল আমার বয়সীদের সঙ্গে কুস্তি লড়ে স্বাস্হ ফেরাবার জন্য, কেননা আমি রোগাটে ছিলুম । কুস্তি শেখার ড্রেস, মানে ল্যাঙোট, মায়ের কাছ থেকে দাম চেয়ে নিয়ে কিনে এনেছিল শিউনন্নি । ল্যাঙোট পরা বেশ কঠিন ছিল ওই বয়সে, কয়েকবার পেছনে নিয়ে গিয়ে সামনে এনে বাঁধতে হয় । কুস্তি শিখতে অসুবিধা ছিল না, অসুবিধা হতো কুস্তির আখাড়ার গেরুমাটি গা থেকে ধুয়ে তোলবার জন্য রাস্তার কলে গিয়ে স্নান করার, পাড়ার বউদের জল ভরা হয়ে গেলে তারপর আমার পালা, যদিও শিউনন্নি আমাকে কলের তলায় ঠেলে দিত যাতে স্নানটা সেরে ফেলতে পারি । কয়েকটা রবিবারের পরই পালোয়ান হবার উচ্চাকাঙ্খা ছেড়ে দিতে হলো । কুস্তির প্যাঁচ কাজে দিত যখন পাড়ার কারোর সঙ্গে লাট্টু বা গুলি খেলা নিয়ে বচসা আরম্ভ হতো ।

         সাঁতারও পুরো শেখা হয়ে ওঠেনি আমার । মামার বাড়িতে দাদা যখন ছিল, ১৯৫১ সালে,একবার পুকুরে শেখানোর চেষ্টা করেছিল, পুরো শেখার আগেই পাটনা ফিরতে হয়েছিল । দাদা মামার বাড়ি ছেড়ে উত্তরপাড়ায় থাকতে চলে গেলে, ১৯৫৩ সালে গঙ্গার ঘাটে নিয়ে গিয়ে শেখানোর চেষ্টা করেছিল, তা সত্ত্বেও শেখা হয়ে ওঠেনি । আরেকটু হলে তলিয়ে যাচ্ছিলুম, তাই ।

         ডাবর আর শিউনন্নির উদ্ধৃতি শুনতুম, কিন্তু পরোয়া করতুম না, কিন্তু গালে টোল ফেলে কুলসুম আপার কবিতা বলায় এমন আবহ গড়ে উঠত যেন উনি কবিতার মধ্যে দিয়ে নিজের দিকে টেনে নিয়ে চলেছেন । ফয়েজ আহমদ ফয়েজ আর গালিব ছিল ওনার প্রিয় কবি। কুলসুম আপা ইশতিমালিয়তের কথা বলতেন, যা পরে জেনেছিলুম, সাম্যবাদ ; ইশতিরাকিয়াতের কথা বলতেন, যা পরে জেনেছিলুম, সমাজবাদ ; মাসাওয়াতের কথা বলতেন যা পরে জেনেছিলুম সকল মানুষকে সমান মনে করা । ওনাদের পরিবারের কারণেই ইমলিতলা পাড়ায় দেশভাগের দাঙ্গার কোনো প্রভাব পড়েনি। স্কুল থেকে পাওয়া দুটো কার্ড উনি চেয়ে নিয়েছিলেন, একটা মুসার অন্যটা ইসা মসির ।

       কুলসুম আপার স্মৃতি জেগে উঠলেই ফয়েজের এই বিখ্যাত কবিতাটা মনে পড়ে যায়, যদিও কুলসুম আপা বেশির ভাগ প্রেমের কবিতা শোনাতেন :

       “মাতা-এ-লৌহ-ও-কলম ছিন গয়ি তো ক্যা গম হ্যায়

        কি খুন-এ-দিল মেঁ ডুবো লি হ্যায় উংগলিয়া ম্যায়নে

 

        জুবাঁ পে মোহর লগি হ্যায় তো ক্যা, কি রখ দি হ্যায়

        হর ইক হলকা-এ-জঞ্জির মেঁ জুবাঁ ম্যায়নে”

 

        যৌনতা ও স্পন্দিত ছোঁয়ার মাধ্যমে একজন কৌতূহলী বালকের মর্মে কবিতার গভীর ছাপ রেখে দেবার প্রথম শিক্ষাও কুলসুম আপার কাছে পেয়েছিলুম, আর বহুকাল পরে, তাঁর স্মৃতিতে, তাঁর খোঁজে ইমলিতলা পাড়ায় গিয়ে তাঁকে না পেয়ে, লিখেছিলুম এই কবিতাটা, “প্রথম প্রেম : ফয়েজ আহমদ ফয়েজ” শিরোনামে । কবিতাটার প্রথম লাইনটা মনে ছিল, এতোবার উনি শুনিয়েছিলেন, লেখার সময়ে ফয়েজের সংকলন থেকে বাকি অংশটা সংগ্রহ করেছিলুম :-

                গরমের ছুটিতে খালি-গায়ে  যখন নাজিমদের বাড়িতে

         লুডো খেলতে যাই, কুলসুম আপা রাস্তা পেরোবার ঢঙে

         বাঁদিক-ডানদিক তাকিয়ে দুহাতে দড়াম করে দরজা বন্ধ করে দ্যান

         আমার অন্ধকার স্যাঁতসেতে ঘরে এক হ্যাঁচকায় টেনে নিয়ে ।

                 আমি বলি, ‘ভোজপুরি বলবেন, আমি উর্দু বুঝতে পারি না ।’

                 উনি বলেন, ‘তুই চোখ বোজ, তাহলেই বুঝতে পারবি,

         এ তো খুব সহজ রে ।’ আমি চোখ বুজে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকি

         একগাদা হাঁসমুর্গির মাঝে ।

                 কুলসুম আপা বলেন, ‘মুঝে দে দে রসিলে হোঁঠ, মাসুমানা

         পেশানি, হসিঁ আঁখেঁ কে ম্যায় একবার ফির রঙ্গিনিয়োঁ মেঁ

         গর্ক হো জাউঁ…’

                 আমি বলি, ‘ধ্যাৎ, কী করছেন কী, আমার লজ্জা করে।’

                 উনি ওনার কালো মোটা ঠোঁটে বলতে থাকেন, ‘মেরি হস্তিকো

         তেরি ইক নজর আগোশ মেঁ লে লে হমেশা কে লিয়ে

         ইস দাম মেঁ মহফুজ হো জাউঁ জিয়া-এ হুস্ন সে জুল্মত-এ দুনিয়া

         মেঁ ফির না আউঁ…’

                 আমি বলি, ‘আঃ, ছাড়ুন না, এরকম করছেন কেন আপা ?’

                 উনি বলেন, ‘গুজিশতাঁ হসরতোঁ কে দাগ মেরে দিল সে

         ধুল জায়েঁ…’

                 আমি বলি, ‘ না না না…’

                 আপা ওনার ঘুমন্ত কন্ঠস্বরে, ‘ম্যায় আনে ওয়ালে গম কি

         ফিকর সে আজাদ হো জাউঁ মেরে মাজি ও মুস্তকবিল সরাসর

         মাভ হো যায়েঁ মুঝে ওয়হ ইক নজর, ইক জাভেদানিসি

         নজর দে দে ।’

                 আমি বললুম, ‘রোজ রোজ এরকম করেন কেন ?’

                 উনি বললেন, ‘তবে যে তুই বলছিলিস উর্দু বুঝতে পারিস না !’

 

         এখন জানি পেশানি মানে কপাল,  গর্ক মানে ডুবে যাওয়া, রঙ্গিনিয়োঁ মানে অলঙ্কৃত, হস্তি মানে অস্তিত্ব, আগোশ মানে আলিঙ্গন, দাম মানে ফাঁদ, মহফুজ মানে সঞ্চিত, জিয়া-এ-হুস্ন মানে সৌন্দর্য্যের আলো, জুল্মত-এ-দুনিয়া মানে অত্যাচারী জগত, গুজিশ্তা মানে অতীত, হসরতে মানে দুঃখ প্রকাশ, মুস্তকবিল মানে ভবিষ্যত, মাভ মানে মুগ্ধতা, সরাসর মানে পুরোপুরি, জাভেদানি মানে অনন্তকালীন । কবিতা কিন্তু তখনও আমাকে আকৃষ্ট করেনি, আকৃষ্ট করেছিল কুলসুম আপার বড়ো-বড়ো চোখ, গালের টোল আর বুকের দেহতাপ । কবিতা বলতে বাড়িতে সকলের ধারণা ছিল গান । কবিতার কোনো বই ছিল না ইমলিতলার বাড়িতে, বস্তুত কোনো বইই ছিল না । উত্তরপাড়ার খণ্ডহরে ফারসি আর সংস্কৃতভাষার বই ছিল, ঠাকুর্দার সময়কার । ঠাকুর্দার আগের পূর্বজদের তালপাতায় লেখে পুঁথি ছিল, আমাদের ইতিহাসবোধ না থাকায়, সেগুলো উত্তরপাড়া থেকে পাটনায় নিয়ে আসিনি, শরিকরা গেঁড়িয়ে বেচে দিয়া থাকবে ।

         কুলসুম আপাদের বাড়িতে রাস্তার সামনে বিড়ি-সিগারেটের যে ঘুপচি দোকানঘর ছিল, সেখানে বসে পরিবারের সবাই বিড়ি বাঁধত । আমার বিড়ি বাঁধার শিক্ষাও ওনাদের পাশে বসে ওই ঘরে । আরেকটা ব্যাপার জেনেছিলুম, ওনাদের দোকানের ঘরে ফ্রেমে বাঁধানো একটা মন্দিরের ছবি, আমি একদিন বলেছিলুম, তোমরা তো মুসলমান, মন্দিরের ছবি টাঙিয়েছ কেন ? কুলসুম আপার আব্বু বলেছিলেন, ওটা মন্দির নয়, ওটা আমাদের তীর্থক্ষেত্র কারবালা, পয়গম্বরের নাতি ইমাম হোসেনের সমাধি, যেমন তোদের কাশি । কুলসুম আপার দাদা মানে ঠাকুর্দা ওই তীর্থ করতে গিয়ে ছবিটা এনেছিলেন, নজাফ নামে একটা তীর্থ থেকে কারবালা পর্যন্ত তিরিশ ক্রোশ, মানে ষাট মাইল, হাঁটতে হয়েছিল, হাজার-হাজার তীর্থযাত্রীর সঙ্গে, রাতে রাস্তার ধারে ঘুমোতো সবাই । আরেকটা ছিল ফ্রেমে বাঁধানো সোনালী রঙের টিনের ডানাঅলা উড়ন্ত ঘোড়া, যার মুখটা মেয়েদের মতন ; ঘোড়াটার নাম ওনারা বলেছিলেন বুরাক, যাতে চেপে পয়গম্বর মক্কায় গিয়েছিলেন ।

         কুলসুম আপাদের বাড়িতে সময় কাটাতে ভালো লাগত তার কারণ আমাদের বাড়িতে দাদা আমার চেয়ে পাঁচ বছরের বড়ো, ওনার নিজের বন্ধুদের দল ছিল, বাঙালিদের পাড়া কদমকুঁয়ায় । মেজদা আমার চেয়ে তিন বছরের বড়ো, পাড়ার যে-সব ছেলেদের বখাটে বলে মনে করা হতো, মেজদার বন্ধু ছিল তারা, আমাকে তাই মেজদা পাত্তা দিত না । বড়োজ্যাঠার দুই মেয়ে আমার চেয়ে অনেক বড়ো, তাঁরা বিয়ে হয়ে শশুরবাড়ি চলে গিয়েছিলেন । অন্য বোনেরা সকলেই আমার চেয়ে বেশ ছোটো, ওরা নিজেদের মেয়েলি খেলা নিয়ে ব্যস্ত থাকতো । বাড়িতে নিঃসঙ্গতা কাটাবার জন্য পাড়ার সমবয়সী ছেলেদের সঙ্গে চোর-পুলিশ, গুলি বা লাট্টু বা ড্যাঙগুলি খেলতুম কখনও-সখনও। গু আর পাঁকের নর্দমায় লাট্টু বা গুলি পড়ে গেলে তুলে নিয়ে কলের জলে ধুয়ে নিতুম, অনেক সময়ে জাঠতুতো বা খুড়তুতো বোনেরা দেখে ফেললে বড়োজেঠিমাকে নালিশ করতো আর শুদ্ধ হবার জন্যে আমাকে সন্ধ্যাবেলায় ঠাণ্ডাজলে চান করতে হতো ।

         মনে পড়ছে, কুলসুম আপার সঙ্গে আমার যৌন সম্পর্কের কথা কেবল ঠাকুমাকে বলেছিলুম কেননা কেবল ওনার সঙ্গেই গোপন ব্যাপার শেয়ার করতে পারতুম । শুনে উনি বলেছিলেন, জীবনে আর কখনও একথা কাউকে বলিসনি, আমাকে বলেছিস বলেছিস, আর কারো কানে যেন না যায় । খেমির কথা চেপে গিয়েছিলুম ওনার কাছে, কেননা খেমির বেলায় কোনো অপরাধবোধ ছিল না । প্রথম রোমান্টিক প্রেমিকার বেলাতেও অপরাধবোধ ছিল না, তবুও ঠাকুমাকে বলিনি ।

                                  আরেকটা ঘটনা মনে পড়ছে । পাঁচ বছর বয়সে মা আমাকে ইমলিতলার একটা ঘরে শেকল তুলে বিকেল থেকে বন্ধ করে রেখে দিয়েছিলেন, তার কারণ পাড়ায় আমাকে তাড়ি খাইয়ে দিয়েছিল, ‘পি লে পি লে, কুছ না হোতউ’ বলে । ইমলিতলার অন্য বিহারি বাচ্চাদের সঙ্গে আমিও দু-ঢোঁক খেয়েছিলুম, আর তাড়ির গন্ধে ধরা পড়ে গিয়েছিলুম । তাড়ি খাবার জন্য মা শাস্তি দেননি, দিয়েছিলেন যাতে আমি মেজদার মতন কুসঙ্গে পড়ে কুপথে না যাই । ইমলিতলায় বিজলিবাতি ছিল না । অন্ধকার ঘরে রাত দশটা পর্যন্ত একা বসেছিলুম এক কোণে । বাবা রাতে কাজ থেকে ফিরলে শেকল খোলা হয়েছিল । হয়তো এই ঘটনার আর এই রকম আরও কিছু ঘটনার চাপে আমি ক্রমশ অমিশুকে, হিন্দু-নাস্তিক, অন্তর্মুখ, অন্তেবাসী, সীমালঙ্ঘনকারী, দ্রোহী হয়ে গিয়ে থাকব ; গ্রন্হকীট হয়ে গিয়ে থাকব । আত্মসন্ত্রস্ত থাকার উদ্বেগ ও উৎকন্ঠার বীজ পোঁতা হয়ে গিয়ে থাকবে মনের ভেতরে ।

         ক্যাথলিক স্কুলে ফিরি । একদিন ক্লাসের সবাইকে রাস্তার অন্য পারে একটা বাগানে নিয়ে যাওয়া হল , সেটার নাম ফার্ম, সেখানে দেখলুম সাদা রঙের শুয়োরদের লোহার জাল দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে একটা জায়গায়, তার আগে আমি সাদা রঙের শুয়োর দেখিনি, বাচ্চা শুয়োর যাদের আস্ত পুড়িয়ে ‘সাকলিং পিগ’ রান্না হয় ক্রিস্টানদের ভোজে । নন্দিতা বলেছিল, এই শুয়োরগুলো সিসটাররা খায়, এদের গা্য়ে এতো চর্বি যে চোখ বুজে আসছে, এর সসেজ খুব ভালো হয় খেতে, একদিন তোকে খাওয়াব । ইমলিতলায় গঞ্জেড়ি-জমঘটে কালো ছোটো মাপের শুয়োর এনে কানাগলির লোকেরা খায় জানি, পুড়িয়ে খায়, সেগুলোকে দেখে নোংরা লাগত । আমরা বাচ্চা শুয়োরদের সঙ্গে খেলার জন্য একটা আলাদা ঘেরায় ঢুকলুম, বেশ লাগছিল জড়িয়ে ধরতে, নাদুস-নুদুস ফর্সা শুয়োর । দেখলুম বিদেশি গোরু, কখনও দেখিনি আগে এতো বড়ো গোরু, বাঁটও অনেক বড়ো, দুধে ভর্তি মনে হল । তার মানে খাঁটি দুধ খায় সিসটার আইরিন আর ফাদার হিলম্যান ; আমাদের বাড়িতে রাজু গোয়ালা দুধ দিতে আসে যখন, মা ওকে জিগ্যেস করেন, আজকে কতোটা জল মিলিয়েছিস, জল মেলালে নোংরা জল মেলাবি না, কলের পরিষ্কার জল মেলাবি ।

         ফার্মে দেখেছিলুম কালো রঙের, প্রায় শকুনের মতন মাথা, ততই বড়ো পাখি, ওড়ে না, জাল দিয়ে ঘেরা একটা জায়গায় । ন্যানডি বলেছিল, ওগুলো টার্কি পাখি, খ্রিসমাসের বড়োদিনে যে ভোজ হয় তাতে খায়, বেশ নরম আর ভালো খেতে । ফার্মের মুর্গিগুলোও বড়ো মাপের । আমাদের ইমলিতলার বাড়িতে মুর্গির ডিম আর মুর্গি খাওয়া বারণ । নন্দিতার বাড়িতে কিছুই বারণ নয় । ওর টিফিনের দৌলতে প্রায় রোজই মুর্গির ডিমের অমলেট খেয়েছি ।

         ফাদার হিলম্যানের কাছে যিশুখ্রিস্টের গল্প শুনে আমি একদিন প্যাকিং বাক্সের দুটো কাঠ পাড় দিয়ে বেঁধে ক্রুসকাঠ বানিয়ে ইমলিতলার সমবয়সী বন্ধুদের নিয়ে পাড়ার গলিতে ঘোরা আরম্ভ করেছিলুম । পছনে যারা অনুসরণ করছিল তারা নিজেরাই “হিপ হিপ হুররে” স্লোগান দেয়া আরম্ভ করল, কেননা পাড়ার ফুটবল দল, কাবাড্ডি দল বা কুস্তিগির জিতলে এই ভাবেই স্লোগান দেয়া হতো । স্লোগান দিতে-দিতে দলবল নিয়ে বিরজুর বাড়ির কাছে পৌঁছোলে দেখলুম ওর মা মুখ গোমড়া করে বসে আছে, অন্যদের মতন আমায় দেখে হাসলেন না, আমি কী হয়েছে জানতে চাইলে বললেন ওনার ছোটো ছেলে চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়ে জেল খাটতে চলে গেছে, ছোলা ভেজে বিক্রি করার মতন কাঠ নেই । আমি ওনাকে ক্রুসকাঠ পিঠ থেকে নামিয়ে দিয়ে দিলুম, উনি জানতে চাইলে যতোটা পারি জিজাস খ্রাইস্টের গল্প বললুম, উনি শুনে বললেন, তুইই আমার ‘জিজুয়া’ । স্কুল থেকে ফিরে প্রতিদিনই জিজাসের ‘জুলুস’ বের করতুম দুটো কাঠ দড়ি দিয়ে বেঁধে আর নানা গলি ঘুরে দিয়ে আসতুম বিরজুর মাকে ।

         স্ট্যাণ্ডার্ড ফোরে উঠলুম ভারতের স্বাধীনতার সময়ে । কনভেন্টের মাঠে বিশাল সিল্কের ঝাণ্ডা টাঙানো হলো । সবাইকে এক প্যাকেট করে খাবার দেয়া হল । কিন্তু লক্ষ্য করলুম যে ফর্সা-সোনালী চুল ছাত্রীরা নেই, সিস্টার আইরিন আর ফর্সা সিসটাররা নেই, ফাদার হিলম্যানও নেই । বাড়ি ফিরে বাবাকে জিগ্যেস করতে উনি বলেছিলেন যে ওনারা আর ইনডিয়ায় থাকতে চান না, এতো দাঙ্গা আর গণ্ডোগোল হয়েছে আর চলছে, ওনারা নিরাপদ মনে করেননি, নিজেদের দেশে চলে গেছেন । শুনে মন খারাপ হয়ে গিয়েছিল । কনভেন্টে আর ভালো লাগছিল না । বাবা-মা নির্ণয় নিলেন যে আমার বাংলা কথাবার্তায় বিটকেল ইংরেজি আর পাটনাই হিন্দি বুলি ঢুকে গেছে, আমকে এবার বাংলা মাধ্যম স্কুলে দেয়া হবে, দাদার স্কুলে নয়, দাদার স্কুলে হিন্দি আর ইংরেজিতে পড়ানো হয় । স্বাধীনতার পরের বছর ভর্তি হলুম গিয়ে রামমোহন রায় সেমিনারিতে।

আঠারো

         বাংলা মাধ্যমের একটাই স্কুল ছিল পাটনায়, রামমোহন রায় সেমিনারি, ভর্তি হয়ে গেলুম । ভর্তির সময় আমার জন্মতারিখের কথা মনে পড়ল বাবা-মার, কেননা এই জন্মতারিখ ম্যাট্রিকের সার্টিফিকেটে থাকবে । কনভেন্টে ভর্তির সময়ে জন্মদিন নিয়ে ভাবেনি কেউ ; ফাদার হিলম্যান জন্মতারিখ জানতে চেয়েছিলেন, বাবা ওনাকে বলেছিলেন, আমার বড়োছেলের পাঁচ বছর পর ও জন্মেছে, শীতকালে, বোধহয় তখন নভেম্বর মাস । ফাদার হিলম্যান আমার জন্মদিন ধার্য করলেন দোসরা নভেম্বর ১৯৩৯ ।

        রামমোহন রায় সেমিনারিতে ভর্তি হবার সময়ে সেই বছরের পাঁজি খুলে দেখা গেল যে দোসরা নভেম্বর পড়ছে অমাবস্যা, ১৯৩৯-এর বছর নয়, যে বছর ভর্তি হতে গেলুম সেই বছরের পাঁজি দেখে । ২৯ অক্টোবর সব দিক থেকে ভালো পাওয়া গেল, পুরুতমশায় সতীশ ঘোষালও বললেন, এই দিনটা অনেক শুভ। ব্যাস, আমার জন্মদিন ধার্য হয়ে গেল ২৯ অক্টোবর ।

        কনভেন্টে ছিলুম স্ট্যাণ্ডার্ড ফোরে । ইংরেজিতে কথা বলতে পারার দরুন রামমোহন রায় সেমিনারিতে ভর্তি হয়ে গেলুম ক্লাস সিক্সে, বাংলা মিডিয়ামে । বড়ো হয়ে গিয়েছিলুম বলে  ডাবরকে পৌঁছে দেবার আর নিয়ে আসার কর্তব্য থেকে মুক্তি দেয়া হল । বাড়ি থেকে স্কুল প্রায় দেড় কিলোমিটার, হেঁটেই যাতায়াত করতে লাগলুম, কী শীত কী বর্ষা । বর্ষাকালে ভিজে-ভিজেই ইশকুলে যেতুম, তখন কিন্তু অমন ভিজলে জ্বর হতো না । জ্বরজারি হবার জন্যেও বোধহয় যৎসামান্য পয়সাকড়ি হওয়া দরকার ।এই ইশকুলের কোনো ইউনিফর্ম ছিল না, এখন হয়েছে শুনি । তখন বাড়ির পোশাক পরেই স্কুলে যাওয়া যেতো ; ইচ্ছে হলে ইস্তিরি করা পোশাকে, নয়তো যার যেমন ইচ্ছে । আমার কনভেন্টের পোশাক যতোদিন চলেছিল ততোদিন ওই পোশাকেই যেতুম । ভর্তির সময়ে বাঙালি কেরানিবাবু, যাঁর ছেলে রতন আমাদের ক্লাসে পড়তো, বলেছিলেন, “এই স্কুল অনেক পুরোনো, ১৮৯০ সালে ব্রাহ্মসমাজের স্হাপন করা, ওপরে ওই দুই ছাত্রের ফোটো দেখছো, ওরা ১৯৪২ সালের অগাস্ট ক্রান্তির সময়ে রাজ্যের অ্যাসেমব্লি ভবনে জাতীয় পতাকা টাঙাতে গিয়ে পুলিশের গুলিতে মারা যায়, ক্লাস নাইনের উমাকান্ত প্রসাদ সিনহা আর রামানন্দ সিংহ, অমন ডাকাবুকো হতে হবে তোমাকেও।” ইশকুলে যাবার পথে আর ফেরার পথে রাস্তার ইঁটে নটি  বয় শু দিয়ে লাথি মেরে-মেরে ডাকাবুকোপনা ফলাতুম ।

         এই কেরানিবাবুর সামনে, ১৯৫১ সালে, শাস্তি পেয়ে, ওনার ঘরে, সারাদিন ঠায় একা দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছিল, দেয়ালে হেলান দেবারও অনুমতি ছিল না । এই শাস্তি ছিল আরেক ধরণের ডাকাবুকোভাব দেখাবার ফল । কয়েকজন সহপাঠী ক্লাসের একটি মেয়েকে বিরক্ত করছিল বলে আমি জিওমেট্রি বক্স খুলে কম্পাস হাতে মোকাবিলার চেষ্টা করতে গিয়ে আহত করে দিয়েছিলুম দুজনকে । ইশকুল ছুটি হয়ে যাবার পর বিভিন্ন ক্লাসের ছেলে-মেয়েরা চলে গিয়েছিল, সন্ধ্যাও নেমে এসেছিল, শীতের সন্ধ্যায় অন্ধকারও ঘনিয়ে আসছিল, কেরানিবাবু চলে গিয়েছিলেন, একাই দাঁড়িয়েছিলুম, ভয়াবহ একাকীত্বের মাঝে, তারপর হেডমাস্টার ক্ষেত্রমোহন পোদ্দার মশায় স্কুল সংলগ্ন কোয়ার্টার থেকে এসে বাড়ি যাবার অনুমতি দিলেন । কনভেন্টে নানরা কখনও একা বোধ করতে দেননি, যদিও ইংরেজিতে কাজ চালাবার মতন সড়গড় হতে সময় লেগেছিল, তবুও ।

         রামমোহন রায় সেমিনারিতে, সবকটা ক্লাসঘরের বাইরে কালো বোর্ডে লেখা ছিল সেটা কোন ভাষার মিডিয়ামের কোন ক্লাস । আমি বাংলা মিডিয়ামের ক্লাস সিক্স বোর্ড দেখে পেছনের দিকে একটা সিটে বসতে যাচ্ছিলুম, একজন সহপাঠী বললে, তুই নতুন এসেছিস বোধহয়, এটা আমার সিট, তুই সামনের বেঞ্চে চলে যা। ক্লাসের দুটি সারিতে মেয়েরা, প্রায় সকলেই শাড়ি পরে, কয়েকজনের বয়স ছেলেদের তুলনায় বেশি ।এই স্কুলে ঘণ্টা বাজলে ক্লাস ঘরেই প্রেয়ার আরম্ভ হল, বাংলায় প্রার্থনা, কাউকে হাত জোড় করতে হলো না, বেশিরভাগ ছাত্র-ছাত্রী ক্লাস ফোর থেকে পড়ছে বলে তাদের মুখস্হ, গাইতে অসুবিধে হলো না, গলা ছেড়ে গাইতে লাগল সবাই, মনে হচ্ছিল স্কুলবাড়িটাই যেন গাইতে আরম্ভ করেছে । এই গান সম্পর্কে পরে আমাকে বোঝান ক্লাস নাইনের নমিতা চক্রবর্তী, যিনি সেসময়ে স্কুলের বাংলা লাইব্রেরির গ্রন্হাগারিকের দায়িত্বও টিফিনের সময় পালন করতেন । জীবনে প্রথমবার, ক্লাস সিক্সে আমি রবীন্দ্রনাথের গান আর কবিতার কথা শুনলুম ওনার কাছে । এখন স্কুলটির দুটো ভাগ হয়ে গেছে, সিনিয়ার আর জুনিয়ার; শুনেছি যে কেবল জুনিয়ার বিভাগেই প্রার্থনাটি সীমিত :-

                 আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে বিরাজ সত্যসুন্দর ।।

                 মহিমা তব উদ্ভাসিত মহাগগন মাঝে

                 বিশ্বজগত মণিভূষণ বেষ্টিত চরণে ।।

                 গ্রহতারক চন্দ্রপতন ব্যাকুল দ্রুত বেগে

                 করিছে পান, করিছে স্নান, অক্ষয় কিরণে ।।

                 ধরণী পরে ঝরে নির্ঝর, মোহন মধুশোভা

                 ফুলপল্লব-গীতবন্ধ-সুন্দর বরণে ।।

                 বহে জীবন রজনীদিন চিরনূতন ধারা

                 করুণা তব অবিশ্রাম জন্মে মরণে ।।

                 স্নেহ প্রেম দয়া ভক্তি কোমল করে প্রাণ,

                 কতো সান্ত্বন করো বর্ষণ সন্তাপ হরণে ।।

                 জগতে তব কী মহোৎসব বন্দন করে বিশ্ব

                 শ্রীসম্পদ ভূমাস্পদ নির্ভয়শরণে ।।

 

         আমার পাশে দাঁড়িয়ে যে ছেলেটা গাইছিল, তার নাম তরুণ শূর, বেঁটে, দোহারা, কালো তেল চুকচুকে চেহারা, গলায় যেন কিছু আটকে আছে বলে মাঝে-মাঝে ঘোঁৎ-ঘোঁৎ করে, তার মৃত্যু পর্যন্ত আমাদের বন্ধুত্ব বজায় ছিল, তাকে গানটা এতো খটমট কেন, আর গানটার মানে কী, জিগ্যেস করতে, বলেছিল, ওসব জেনে কী করবি, গাইতে হয় গেয়ে যা, এটা পরীক্ষায় আসে না, এটা বেমমোদের গান, রবিবাবুর লেখা ।

          —রবিবাবু আবার কে ?

          —রবিবাবু জানিস না ? ওই যিনি নোবেল প্রাইজ পেয়েছিলেন, লম্বা দাড়ি আর চুল ।          

          বুঝতে পারলুম, স্কুলটা ব্রাহ্মসমাজ পরিচালিত, তাই এই গান ।  এই প্রার্থনার মাধ্যমে আমি গলা ছেড়ে গান গাইবার সাহসও জুটিয়ে ফেলেছিলুম।  আরও দুজন সহপাঠী বারীন গুপ্ত আর সুবর্ণ উপাধ্যায়, আমরা চারজন মিলে দরিয়াপুরের ফাঁকা বাড়িতে একসঙ্গে জড়ো হলে বাংলা হিন্দি গানের আসর বসিয়ে ফেলতুম । কিন্তু বড়োজ্যাঠা আর ঠাকুমা যদি জানতে পারেন যে আমি বেমমোদের স্কুলে ভর্তি হয়েছি, রবিবাবুর গান গাইছি, তাহলে গঙ্গায় নিয়ে গিয়ে স্নান করাবেন, বাবাকেও নির্ঘাত গঙ্গাস্নান করাবেন, নতুন পৈতে পরাবেন ।

         ইমলিতলার বাড়িতে, পাটনায়, উত্তরপাড়ার বসতবাটিতে আর মামার বাড়ি পাণিহাটিতে, রবিঠাকুর নিষিদ্ধ ছিলেন ; তাঁর লেখা আর গানের প্রবেশাধিকার ছিলনা বাড়িতে । পাটনা আর উত্তরপাড়ায়, ঠাকুমা আর বড়োজ্যাঠা-জেঠিমার নিষেধাজ্ঞা অমান্য করার সাহস বয়স্কদেরও ছিল না । রবিঠাকুর লোকটি যে ঠিক কে, আর কেনই বা তাঁর নাম বা কাজ মুখে আনা যাবে না সে কৌতূহল নিরসনের প্রয়াস বড়োরাও করতেন না ।

        রবিবাবু লোকটিই যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, তা আমরা ভাইবোনরা, ইমলিতলায় টের পাই, আমি এই ব্রাহ্ম স্কুলে ভর্তি হবার দরুণ । রবিবাবুদের সম্পর্কে উষ্মার বীজ দাদু-ঠাকুমা বয়ে এনেছিলেন রাওলপিণ্ডি লাহোর কোয়েটা কোনো এক শহর থেকে । প্রথম আভাস মেলে একটি গানকে কেন্দ্র করে। বড়দি-ছোড়দি পণ্ডিত বুলাকিলালের কাছে শাস্ত্রীয় সঙ্গীত শিখতেন । বড়োজেঠিমা সংক্রান্তির দিন ইমলিতলার বাড়িতে সত্যনারায়ণের পুজো করতেন আর সেই উপলক্ষে ব্রাহ্মণ সমাবেশ হতো । পুরুতমশায় সতীশ ঘোষালের চাঁদ সদাগর হিতোপোদেশ শেষ হলে দিদিরা ঈশ্বর বন্দনার গান গাইতেন, ব্রজভাষা বা হিন্দি বা সংস্কৃতে । পুরুতমশায়ের অনুরোধে পণ্ডিত বুলাকিলাল একটা বাংলা ঠুংরি, সিন্ধু ভৈরবী রাগিনীতে, শিখিয়েছিলেন ছোড়দি সাবিত্রীকে । ছোড়দি সেতার বাজিয়ে গেয়েছিলেন, সঙ্গতে পণ্ডিতজি:-

                         কে ভুলালে হায়

                         কল্পনাকে সত্য করি জান, এ কি দায়,

                         আপনি গড়হ যাকে

                         যে তোমার বশে তাঁকে

                         কেমনে ঈশ্বর ডাকে কর অভিপ্রায় ?

                         কখনো ভূষণ দেও, কখনো আহার ;

                         ক্ষণেকে স্হাপহ, ক্ষণেকে করহ সংহার ।

                         প্রভূ বলি মান যারে, সন্মুখে নাচাও তারে–

                        হেন ভুল এ সংসারে দেখেছ কোথায় ?

         গান শেষ হলে বড়োজ্যাঠা আর পুরুতমশায় দুজনেই দুষলেন পণ্ডিতজিকে, অমন ম্লেচ্ছ গান শেখাবার জন্য । পণ্ডিতজি তর্ক দিয়েছিলেন যে শহরের বহু গণ্যমান্য পরিবারে তিনি এই গান শিখিয়েছেন । তাঁকে জানানো হয়েছিল যে তারা ম্লেচ্ছ । ইমলিতলা পাড়ার কাউকে কিন্তু কখনও ম্লেচ্ছ তকমা দেয়া হতো না । গানটা ভুলেই যেতুম, যদি না রামমোহন রায় সেমিনারিতে ভর্তি হতুম । এই স্কুলে প্রতিবছর ভাদ্রোৎসব হতো, কোনও এক রবিবারে, ছাত্রছাত্রী শিক্ষক-শিক্ষিকারা নৃত্যগীত ও নাটকের সন্ধ্যানুষ্ঠানে অংশ নিতেন, এবং অভিভাবকদের বলা হতো সেই অনুষ্ঠান দেখার জন্য । আমাদের বাড়ি থেকে মা-কাকিমারা আর বড়দি-ছোড়দি ছিলেন দর্শকাসনে । তাঁদের স্তম্ভিত আর আনন্দিত করে এই গানটি গেয়ে অনুষ্ঠানের সূত্রপাত হয়েছিল । ক্ষেত্রমোহন পোদ্দার যতকাল হেডমাস্টার বা প্রিন্সিপাল ছিলেন, ততদিন এই অনুষ্ঠান হতো ; তাঁর অবসরের পর, হিন্দিভাষীদের সংখ্যাধিক্যে, বন্ধ হয়ে গিয়েছিল বসন্ত উৎসব ।

        পুরুতমশায়-বড়োজ্যাঠার গানটি সম্পর্কে উষ্মার কারণ জানতে পারি বাবাকে জিগ্যেস করে । দাদু-ঠাকুমা যে-সময়ে লাহোর ইত্যাদি অঞ্চলে ট্যুর করে বেড়াচ্ছেন, সে-সময়ে ব্রাহ্মধর্মের প্রচারক নবীনচন্দ্র রায়ও ওই অঞ্চলে প্রচারে গিয়েছিলেন, এবং তাঁর মতাদর্শ, দাদু ও আরও কয়েকজন, বাঙালি ও পাঞ্জাবি, মেনে নিতে পারেননি। দাদু-ঠাকুমা নিজেদের গোঁড়ামি চাউর করে দিতে পেরেছিলেন বড়োজ্যাঠার মনে, আর বড়োজেঠিমা তো এসেইছিলেন পুরুতবাড়ি থেকে ।

        আমার শৈশবে পাটনার অধিকাংশ বাঙালি এলিট পরিবার ছিলেন ব্রাহ্ম, আদিধর্মের ব্রাহ্ম । পণ্ডিত নবীনচন্দ্র রায় সেই অংশেরই প্রতিনিধি ছিলেন । দাদু যখন আপার ইনডিয়ায় ছিলেন, তখনই পাঞ্জাব হাইকোর্ট আর ব্রিটেনের প্রিভি কাউন্সিল রায় দিয়েছিল যে আদি ধর্মের বা ‘আনুষ্ঠানিক’ ব্রাহ্মরা হিন্দু নয় । কেশবচন্দ্র সেনের নববিধান ব্রাহ্মরা ছিলেন ‘আনুষ্ঠানিক’ । প্রথমত, একান্নবর্তী পরিবারের গৃহকর্তা ও কর্ত্রীর ধার্মিক গোঁড়ামি এবং দ্বিতীয়ত বাঙালি এলিটসমাজ থেকে দূরত্বের কারণে, টুকরো হতে থাকা যাবতীয় ব্রাহ্মদের ‘বেমমো’ তকমা দিয়ে পরিত্যাজ্য করে দিয়েছিল ইমলিতলার বাড়ি। রামমোহন রায়ের লেখা ব্রহ্মসঙ্গীত সম্পর্কে সেকারণেই উষ্মা। ‘বেমমোদের’ হেয় করার বীজ আমার মাও এনেছিলেন পাণিহাটির ওনার মামার বাড়ি থেকে । তার কারণ সেকালের স্নাতকোত্তর, মায়ের মামারা বা আমার দাদুরা, ব্রাহ্মদের বিরোধীতা করতেন, কারণ ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের বিরোধিতা করে ব্রাহ্মসমাজের প্রায় প্রতিটি ট্রাস্টি ইংলণ্ডেশ্বরকে সমর্থন করে বিদ্রোহী সেপাইদের কড়া শাস্তি দাবি করেছিলেন ; ১৮৭১ সালে দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ঘোষণা করেছিলেন যে তাঁরা প্রথমে ব্রাহ্ম, তারপর ভারতীয় । ১৮৭২এর ম্যারেজ অ্যাক্ট অনুযায়ী একজন ব্রাহ্মকে লিখে দিতে হয় যে, “আমি হিন্দু বা মুসলিম বা খ্রিস্টান বা ইহুদি নই ।” মায়ের মামার বাড়ির লাইব্রেরিঘরে উনিশ শতকের মনীষীদের ছবি টাঙানো থাকতো, কিন্তু নোবেল প্রাইজ পাবার পরও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছবি টাঙানো হয়নি । মায়ের বড়োমামা অনাদিনাথ চট্টোপাধ্যায় বলতেন যে, “রবিবাবু ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতকে বিকৃত করেছেন” ; যতোদিন তিনি বেঁচেছিলেন, ওই বাড়িতে রবীন্দ্রসঙ্গীতের কদর হয়নি ।

        বাবা দরিয়াপুরে চলে আসার পর,  কালক্রমে কাকারা কোতরঙ আর উত্তরপাড়ায় চলে যাবার পর, মেজো জেঠিমাও তখন মারা গেছেন, ইমলিতলার বাড়ি প্রায় ভুতুড়ে হয়ে গিয়েছিল বলে বড়োজ্যাঠা আর জেঠিমা দিদিদের বাড়িতে থাকতে চলে গিয়েছিলেন । দিদিদের বাড়িতে প্রায়ই গানের আসর বসত । ক্লাস নাইনের পর আমি বড়ো একটা যেতুম না, ভাইফোঁটা ছাড়া । কেননা গেলেই দিদিরা বলতেন, তোর বিষয়ে অনেককথা কানে আসছে । বড়োজেঠিমা বলতেন, কুপথে যেওনি বাপু ।

        একবার বড়োজ্যাঠা দিদিদের বাড়িতে ওনার পরিচিতদের ডেকেছিলেন সত্যনারায়ণ পুজোর সান্ধ্যবাসরে । গিয়ে দেখি হলঘরে কার্পেটে বসে গান গাইছে বড়ো ভাগ্নি মঞ্জু, ওর সামনে ‘গীতবিতান’ খোলা,  ছোড়দি সেতার বাজাচ্ছেন, হারমোনিয়ামে বড়দি আর তবলায় সঙ্গত দিচ্ছেন বৃদ্ধ বুলাকিলাল । ইজিচেয়ারে চোখ বুজে গান শোনায় বিভোর বড়োজ্যাঠা । বড়োজেঠিমা দেয়ালে ঠেসান দিয়ে হাতজোড় করে বসে আছেন। গানটা এই, গীতবিতান পূজা পর্যায় থেকে, এখন সর্বত্র গেয়, ব্রহ্মসঙ্গীত :

                                        অন্তর মম বিকশিত করো

                                                অন্তরতর হে ।

                                       নির্মল করো, উজ্জ্বল করো

                                               সুন্দর করো হে ।

                                       জাগ্রত করো, উদ্যত করো,

                                              নির্ভয় করো হে ।

                             মঙ্গল করো, নিরলস নিঃসংশয় করো হে ।

                                        অন্তর মম বিকশিত করো

                                             অন্তরতর হে ।

                                        যুক্ত করো হে সবার সঙ্গে

                                          মুক্ত করো হে বন্ধ,

                                        সঞ্চার করো সকল মর্মে

                                          শান্ত তোমার ছন্দ ।

                             চরণপদ্মে মমচিত্ত নিস্পন্দিত করো হে,

                                    নন্দিত করো, নন্দিত করো,

                                         নন্দিত করো হে ।

                                   অন্তর মম বিকশিত করো

                                          অন্তরতর হে ।

         বাড়ির বয়স্কদের অজান্তে, রবীন্দ্রনাথ, রবিবাবু থেকে রবিঠাকুর হয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরে পৌঁছে আমাদের বাড়িতে প্রবেশ করে গিয়েছিলেন । ভারতীয় সংবিধান লাগু হবার পর, সমাজে ক্রমশ ক্ষমতা-নকশায় রদবদল ঘটতে থাকে, পাটনার সমাজকর্তাদের আসন থেকে বিদায় নিতে থাকেন ব্রাহ্মরা । ব্রাহ্মমন্দির মেয়েদের স্কুল, যে স্কুলে আমার জাঠতুতো-খুড়তুতো বোনেরা পড়ত, তা বন্ধ হয়ে যায়, মন্দির ভেঙে মার্কেট কমপ্লেক্স গড়ে ওঠে । বিধানচন্দ্র রায়ের প্রতিষ্ঠিত তাঁর বাবা-মায়ের নামাঙ্কিত মেয়েদের হাতের কাজ শেখার সংস্হা “অঘোর-কামিনী বিদ্যালয়” অবহেলায় ধুঁকতে থাকে । অথচ কেবল আমাদের আর আত্মীয়দের বাড়িতেই নয়, ব্রহ্মসঙ্গীত ওপরতলা থেকে চুয়ে গরিব বাঙালিদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়েছিল । পাণিহাটিতেও, একান্নবর্তী পরিবার যখন ভেঙে গেল, দাদুদের প্রজন্মের তিরোধানের পর, রবীন্দ্রনাথ তাঁর গান নিয়ে প্রবেশ করেছিলেন । অবশ্য ততদিনে রবীন্দ্রসঙ্গীত হয়ে গিয়েছিল পণ্যায়নের অন্তর্গত ।          

                    

উনিশ

               আমাকে নিজেকে কিছু একটা হয়ে উঠতে হবে, সেই হয়ে ওঠার জন্যে থাকা প্রয়োজন দার্শনিক পরিকল্পনা এবং স্বপ্ন, তাকে বাস্তবায়িত করার মতন প্রজ্ঞা ও ক্ষমতা, এই ধরণের ভাবনাচিন্তা ভারতবর্ষে ইংরেজরা আসার আগে ছিল না । ব্যক্তির হয়ে ওঠার তত্ত্বটা ইউরোপের, খ্রিস্টধর্মের । অতীত বাঙালিসমাজের পৃষ্ঠভূমিতে যে নামগুলো আমরা পাই, এবং যাঁদের আমরা মনে করি “হয়ে উঠেছিলেন”, যেমন অদ্বয়বজ্র, ক্রমদীশ্বর, ইন্দ্রভূতি, অতীশ দীপঙ্কর, চৈতন্যদেব, জগৎমল্ল, জহুরি শাহ প্রমুখ, তাঁরা কেউই নিজেদের কিছু একটা “হয়ে ওঠার”, অথবা প্রতিস্ব নির্মাণের, অথবা সাবজেক্টকে অবজেক্ট জগৎ থেকে পৃথক ও স্বনির্ভর মনে করার, কিংবা ব্রহ্মাণ্ডপ্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন সংস্কৃতি নামের কৃত্রিম জ্ঞানপরিধির কথা চিন্তা করেননি । তাঁদের তত্ত্ববিশ্বে তা সম্ভব ছিল না । তাঁদের আমরা যে কারণে জানি ও শ্রদ্ধা করি, ইউরোপীয় তত্ত্ববিশ্বে নির্মিত হলে তা সম্ভব হতো না ।

         ব্যক্তিসৃজনশীলতা ও ব্যক্তিস্বপ্নের বাস্তবায়ন সম্পর্কিত ইউরোপীয় মননবিশ্বের বাইরে বেরিয়ে, প্রজ্ঞাকে কৌমনিরপেক্ষ ব্যক্তিলক্ষণ হিসেবে আঁকড়ে না থেকে, ব্যক্তির কাজকে সমাজসৃজনরূপে কীভাবে আবার প্রতিষ্ঠা দেয়া যায়, আমার পক্ষে, কলেজে ঢোকার সময়ে তো বটেই, এখন সাতাত্তর বছর বয়সে পৌঁছেও, ভেবে কুলিয়ে ওঠা অসম্ভব । প্রাক ইংরেজ যুগের প্রকৃতি ও প্রকৃতিসঞ্জাত অজস্র দেবীদেবতাকে তাঁদের সিংহাসন থেকে তুলে ফেলে দিয়ে, ব্যক্তিমানুষকে অস্তিত্বের কেন্দ্রে বসিয়েছে ইউরোপীয় দর্শন । গ্রামীণ উন্নয়নের কাজে সারা ভারতে ঘোরাঘুরি করে, সাধারণ ভারতীয়দের দেখে এখন টের পাই কী ভয়ংকর সংকট তৈরি করে দিয়ে গেছে ইউরোপীয় দর্শন । পশ্চিমবঙ্গের বাঙালির সমাজ এখন ইউরোপীয় দর্শনে নির্মিত প্রতিস্বের ব্যক্তিএককে গড়া । আমার শৈশব যেহেতু ব্যক্তিএকক নির্মাণের কারখানায় গড়ে ওঠেনি, ইমলিতলা আর রামমোহন রায় সেমিনারি ইশকুলকে তার জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে বলতে পারি যে ব্যাপারটাকে আমি বেশ দূরত্ব থেকে অনুধাবন করতে পারি । তার মানে এই নয় যে আমি নিজস্ব একটা দার্শনিক স্হিতি গড়ে তুলেছি । আমার সাহিত্যকর্ম, সাহিত্যের প্রচলিত ধারণাকে ছাপিয়ে বৃহত্তর এলাকায় একারণেই প্রবেশ করে ।

         সনাতন বাঙালিসমাজে যাঁরা কিছু হয়ে উঠেছিলেন বলে এখন আমরা মনে করি, যাঁদের নাম আমি একটু আগে উল্লেখ করেছি, কিংবা বাউল, ফকির, সন্ন্যাসী, যা ইউরোপে ছিল না, নেই, তাঁরা এবং তাঁদের কাজকর্ম, আমরা সমাজ বলতে এখন যা বুঝি, তার বাইরে ঘটেছে । অর্থাৎ নিজের সামনে “অপর” মানুষকে দাঁড় করিয়ে নিজেদের “হয়ে ওঠা” প্রতপন্ন করতে হয়নি তাঁদের । তার মানে ইউরোপীয় স্বপ্নের বাস্তবায়নের জন্যে আসেপাশে লোকজন দরকার । ঠিক যেমন নেতা “হবার” জন্যে সভায় বক্তৃতা জরুরি ; লেখক “হবার” জন্য পুরস্কার ; কবি “হবার” জন্যে সম্বর্ধনা ।

         নিজের কাছে নিজে সৎ হওয়া ছাড়া আর কোনোকিছু কেনই বা হতে যাবে মানুষ ? অপরের জন্যে কিছু করা, এবং নিজের “হবে ওঠার” জন্যে নিজের সামনে অপর বা অপরদের দাঁড় করানো, দুটো একেবারে আলাদা ব্যাপার । অপরদের নিজের মালমশলা মনে করাটা মোনোসেন্ট্রিক, ইউনিপোলার, ইউনিলিনিয়ার । কেবল মানুষ নয়, সমস্ত ধারণাই দেখা যায় তাদের অপরের বিপরীতে নির্মিত । আমি বড়ো হয়ে “অমুক হবো” ভাবতে গেলে শৈশব থেকে আমার সামনে তমুক-তুসুক থাকা জরুরি । সবাই সৎ হলে কারোর আর আলাদা ভাবে সৎ হবার দরকার হয় না । ভাবনাটাই আসবে না মাথায় । সত্যি কথা বলতে কী, হয়ে ওঠার খপ্পরে পড়লে, বাঙালির আর সনাতন বাঙালিত্ব টেঁকে না ।

         চাকরি করার সময়ে দেখেছি, একজন নবযুবক অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার সতত চিন্তিত থাকে কীভাবে ম্যানেজার “হবে”, ম্যানেজার “হয়ে গেলে” অ্যাসিস্ট্যান্ট জেনেরাল ম্যানেজার, ডেপুটি জেনেরাল ম্যানেজার, জেনেরাল ম্যানেজার, চিফ জেনেরাল ম্যানেজার ইত্যাদি “হবার” চিন্তায় বিভোর থাকে । অবসরপ্রাপ্তি ঘটলেই যাবতীয় “হওয়াহয়ির” হাওয়া বেরিয়ে যায় । কবি-লেখকরা দেখি একইভাবে নানা পুরস্কারের সিঁড়ি বেয়ে কবি থেকে সুপারকবি “হবার” দিকে দৌড় দ্যান । প্রতিস্ব ব্যাপারটাই শেষে ফালতু হয়ে দাঁড়ায় । এ প্রসঙ্গে বলা চলে যে, ইংরেজরা আসার পর, বাঙালি ভাবুক ও শিল্পীসাহিত্যিক “চেতনা” নিয়ে যে সমস্ত গর্ব প্রদর্শন করেছেন, তার পৃষ্ঠভূমিটি ছিল দান-বিলোনো বলবান উপনিবেশবাদীর এবং অধীনস্হ সহজবশ্য গ্রাহীর । অনুশাসন কাঠামোটাই তো হেলেনিক । সে অনুশাসনের উৎসসূত্র ইউরোপের জ্ঞানভাণ্ডার, এবং ওই জ্ঞানকে প্রতিষ্ঠা দিয়েছিল তাঁদের শাসনক্ষমতা । তাঁদের জ্ঞানকাঠামো দিয়ে, তাঁদের নির্মিত বাস্তব দিয়ে তাঁরা জ্ঞানী, মনীষী, পপতিভাবান, নায়ক, ভাবুক, দার্শনিক ইত্যাদি চিহ্ণিত করার নকশাজাল বানিয়ে দিয়েছিলেন । ওই সমস্তের কোনোকিছু “হবার” স্বপ্ন কারোর থাকলে, তাঁকে ক্ষমতাজালটিকে মেনে নিয়ে, নিজের প্রতিস্বকে সেইমত নথি করাতে হবে । বলাবাহুল্য যে আমি শৈশব থেকে ওই ক্ষমতাজালটিকে অস্বীকার করার চেষ্টা করে গেছি, প্রান্তিক থেকেছি ।

         প্রান্তিকতার কারণে, যা আমার “ছোটোলোকের ছোটোবেলা” পড়লে জানা যাবে, ইংরেজরা আর ভারতীয় জাতিয়তাবাদীরা ভূমিপুত্রদের পিটিয়ে নিজেদের প্রতিবিম্ব বানাবার যে বিশাল জাল ফেলেছিল, তাতে ধরা দিতে অস্বীকার করার প্রবৃত্তি আমার আপনা থেকেই গড়ে উঠেছিল । যে দার্শনিকতা সবাইকে পিটিয়ে সমান করতে চায়, সেখানে বাউল, ফকির, সাধু-সন্ন্যাসীর উদ্ভব ঘটে না । ইংরেজদের সরবরাহ করা বাঙালি আত্মপরিচয়ের জগৎটিতে, আমাদের ইমলিতলার একান্নবর্তী পরিবারটি, তার অদ্ভুত ও অযাচিত প্রান্তিকতার দরুণ, প্রবেশ করার সুযোগ পায়নি । তা ছিল “নতুন”, এবং যাঁরাই সুযোগ পেয়েছেন, তাঁরাই আশ্রয় নিয়েছেন অবধারণাটিতে । অবধারণাটি বিশাল সময়প্রবাহে একটি প্রাথমিক মুহূর্ত চিহ্ণিত করতে চেয়েছিল, এবং তাতে শামিল হয়েছিলেন, কেন্দ্রস্হানীয় বাঙালি ; যখন কিনা আমাদের পরিবার ছিল প্রান্তিক।

        একজন মানুষের এই আকাঙ্খা যে, “আমি অমুক হবো”, অনিশ্চয়তার এলাকায় লুকিয়ে থাকে । কিছু একটা “হতে চেয়ে” সফল হতে হলে তো নিখুঁত হতে হবে । সর্বজনীনতার কারখানায় গড়া নিখুঁত । নিখুঁত হবার প্রধান বাধা অনিশ্চয়তা । আমার শৈশব-কৈশোর কেটেছে অমন অনিশ্চয়তার পরিমণ্ডলে । যা অনিশ্চিত তা অন্যরকম । যারা অন্যরকম তারা অপর । তারা ব্যবস্হাটিতে খাপ খায় না । অপর হতে হবে এই ভাবনা অপর লোকটি ভাবে না নিশ্চয়ই । আমি জানতুম যে আমি মিসফিট, গোলমাল সৃষ্টিকারী, স্হিতাবস্হার বিরোধী ; কিন্তু তাই বলে নিজেকে অপর ভাবিনি । কুলসুম আপাদের পরিবারকে অপর মনে হয়নি । পাড়ার মহাদলিতদের অপর মনে হয়নি । তারা নানা জীবিকার মাধ্যমে সংসার চালিয়েছে, যেমন বাবা ফোটোর দোকানের মাধ্যমে চালিয়েছেন ইমলিতলা, দরিয়াপুর আর উত্তরপাড়ার সংসার । ফলে আমার জীবনকে একটি ইউনিলিনিয়ার গল্পে বেঁধে ফেলা কঠিন । একজন মানুষের জীবনী সেহেতু বিভিন্ন লেখকের হাতে বিভিন্ন হতে বাধ্য । কেননা সময়প্রবাহ মালটিলিনিয়ার, এই ধারণা আমি ১৯৫৯ সালে পেয়েছিলুম অসওয়াল্ড স্পেংলারের “ডিক্লাইন অফ দি ওয়েস্ট” বই থেকে । কেন্দ্র থেকে বৃত্তপরিধির দিকে যে পরিবর্তনশীল রেখাগুলো টানা যায় তা অসংখ্য, তা গোনা যায় না । কেউ যদি হয়ে ওঠার বা আকাঙ্খাপূর্তির কাহিনি বাঁধতে চান, তাহলে ওই অজস্র পরিবর্তনশীল রেখা থেকে যে কোনো একটি বেছে নিয়ে বৃত্তের মাঝখান থেকে বেরিয়ে পরিধিতে পৌঁছোবার গল্প লিখতে হয় । অথচ যতোগুলো পরিবর্তনশীল রেখা সম্ভব ততোগুলো গল্প দিয়ে তো লোকটা গড়ে উঠেছে ।

         ধরা যাক শৈশব থেকে আমি বহু প্রাণী ও বস্তুর দিকে কেবল তাকিয়েছি, তাকাই, কারণে-অকারণে । শুধুমাত্র তাকাবার ইতিহাস আছে আমার । শুধুমাত্র স্পর্শের ইতিহাস আছে । কথা বলার ইতিহাস আছে । শোনার ইতিহাস আছে । সাক্ষাতের ইতিহাস আছে । বহু বাড়িতে ঢোকার আর বেরোনোর ইতিহাস আছে । হাঁটার ইতিহাস আছে । পোশাক পরার ইতিহাস আছে । চুল কাটার ইতিহাস আছে । তা থেকে কী-কী ছাঁটাই করে আমি আমার “হয়ে ওঠার” গল্প লিখব ? যে গল্পই লিখি না কেন, তা হবে সময়ের প্রতি একচোখোমি। স্হান বা স্পেসকে গুরুত্বহীন করে দেবে, এমন গল্প ।

         “হয়ে ওঠার” একটা পথ হিসাবে দাদা, কলকাতায় বহুকাল কাটিয়েছে,  বলল কলেজে ইকোনমিক্স আর ম্যাথামেটিক্স নিয়ে পড় । কলেজে ভর্তি হয়ে গেলুম আর ভর্তি হয়ে বুঝলুম ম্যাথামেটিক্স ব্যাপারটা আমার আয়ত্বের বাইরে তো ছিলই, ইকোনমিক্সেও গণিত লুকিয়ে আছে, তার নাম ইকনোমেট্রিক্স ।

কুড়ি

         ১৯৫৬ সালে এই বেড়া টপকে বেরিয়ে ইকোনমিক্সে স্নাতক পড়তে ঢুকলুম । মুখস্হ করতে আমি কোনো কালেই পারি না, তাই একটা বই ধরে-ধরে পুরোটা কয়েকবার লিখে নিতুম যাতে মনে থাকে । এই লেখালিখির দরুণ আকর্যণ করতে পারলুম নেপালি সহপাঠিনী ভূবনমোহিনী রাণা নামে মোটা কাচের চশমা পরা মোঙ্গোল সুন্দরীকে ; তার খাতাগুলো দরকার। দুজনে বন্ধু হয়ে গেলুম, আমার চুমু খাবার প্রস্তাবে রাজি হয়ে গেল ভূবনমোহিনী, ‘রাহুকেতু’ উপন্যাসে যার নাম রাণো । ওর জন্যে ইংরেজিতে একটা কবিতা লিখেছিলুম, সেটাই আমার শেষ ইংরেজি কবিতা । মেয়েরাও যে মদ খায় তা ভূবনমোহিনীকে চুমু খেতে গিয়ে টের পাই । পরে ঘটনাটা হিন্দি লেখক ফণিশ্বরনাথ রেণুকে বলতে, উনি বলেছিলেন, কী করেছ কি, জানো কি রাণারা নেপালে কতো ক্ষমতাবান, জানতে পারলে তোমায় জ্যান্ত পুঁতে দেবে । আমি ভূবনমোহিনীকে তাড়ি খাইয়েছিলুম । চুমুর প্রতিদানে ওর জন্যে ‘এক্সচেঞ্জ এ কিস’ নামে এই কবিতাটা লিখেছিলুম :

                   লেট ইওর পারফিউমড হ্যালো

                   ফল ফর এ ফিউ সেকেণ্ডস

                   টু এনাবল মি ইন পিকিং আপ

                   দি মেমরি অফ ইওর গ্ল্যানসেস

                   ইউ লেফ্ট ইন দি নোটস আই লেন্ট ইউ

                   নট ফর নাথিং ! অ্যাট লিস্ট ইউ শুড

                   এক্সচেঞ্জ এ কিস, ইভন ফ্লাইং উইল ডু ।

         ভূবনমোহিনী রাণা একমাত্র যুবতী যে আমাকে চুমু খাবার প্রতিদানে চড় মেরেছিল, কষে চড় । ‘রাহুকেতু’ উপন্যাসে লিখেছি ঘটনাটা । ফরাসি যুবতীকে চুমু খাবার ইচ্ছে পুরো হলো না, ওদের চুমুতে ফরাসি ভাষার নাকিসুর বাজনা থাকে বলে জানিয়েছিল উলিয়াম গথ নামে এক হিপি, কাঁচা মাছের সুবাস থাকে, কাঠমাণ্ডুতে একজনও ফরাসী যুবতী হিপি পাইনি, নইলে নির্ঘাৎ চুমু খেতুম, কচি ডাবের জল খাবার মতন করে, যে ভাষার সঙ্গে পরিচয় নেই সেই ভাষার যুবতীদের যোনি থেকেও গোপন সঙ্গীত ভেসে বেড়ায়, এটা আমার অভিজ্ঞতা।

         স্নাতকস্তরে দ্বিতীয় হয়ে বেরোলুম ১৯৫৮ সালে । ১৯৫৯ সালে বাংলায় লেখা কবিতায় বাবার দেয়া ডায়েরির পাতা ভরে উঠেছিল, যা ইচ্ছে লিখছিলুম, বেপরোয়া হয়ে, ইমলিতলার বেপরোয়াভাব চলে এসেছিল কবিতা লেখাতেও ।         স্নাতকোত্তরে ইকোনমিক্সে স্পেশাল পেপার নিলুম মনিটারি থিয়োরি, আর সেখানেও গণিতের ভুত পিছু ছাড়লো না । ১৯৬০ সালে স্নাতাকোত্তরেও দ্বিতীয় হলুম । আমার মতন আমার প্রিয় দুই অধ্যাপক, ডক্টর আর এন ত্রিপাঠী আর ডক্টর জে এন সিনহার মনও খারাপ হয়ে গিয়েছিল আমার ফলাফলে । জীবনে পরীক্ষায় প্রথম হওয়া আর হলো না । নমিতাদির চাপানো মার্কসবাদ তখন মাথায় পোকা হয়ে ঘুরছে, হয়তো কুলসুম আপার প্রভাবও থাকতে পারে, ইমলিতলার জীবন তো বটেই। ডক্টর জে এন সিনহা একবার রিজার্ভ ব্যাঙ্কের অফিসে এসেছিলেন জমিদারি বণ্ড ভাঙাবার জন্যে, আমাকে দেখে বললেন, “ইকোনমিক্স পড়ে শেষে এই কাজ করতে হচ্ছে!”         ওই সময়টা, ১৯৫৬ সালে ইনটারমিডিয়েট পাশ করে বেরিয়ে স্নাতকোত্তর হওয়া পর্যন্ত, আমি জীবনকে যতোটা পারা যায় জটিল করে তোলার চেষ্টা করে গেছি, যৌনতা, মাদক,যৌনতা, মাদক,যৌনতা, মাদক, যৌনতা, যখন কিনা সহপাঠীরা সবাই স্নাতক পড়তে ঢুকেই আরম্ভ করে দিয়েছে আইপিএস আইএএস আইএফএস, নিদেন স্টেট সার্ভিস কমিশনে ঢুকে যেতে । অনেকেই মাঝপথে পড়ে ছেড়ে আইপিএস আইএএস “হয়ে” গেল, আমি যখন স্নাতকোত্তর পাশ করলুম তখন ওরা প্রায় সবাই ঘুষের প্রাসাদ খাড়া করে ফেলেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের দরোজা দিয়ে বেরিয়েই ঘুষ নিতে পারা চাড্ডিখানি কথা নয় । আমার কোনো উচ্চাকাঙ্খা ছিল না, হবি ছিল না, পার্কে দৌড়োনো ছিল না, রোয়াকে বসে মেয়েদের সিটি বাজানো ছিল না । ছিল না ছিল না ছিল না ছিল না । অতীত জিনিসটাই যেন পচধরা । অতীতের কিছু ঘটনা থেমে যায়, কিছু ঘটনা চলতেই থাকে চলতেই থাকে চলতেই থাকে ।

             কলকাতার পুলিশ কমিশনার আমাকে বলেছিলেন, “সো ইউ আর দি টপ ডগ” । তখন “টপ ডগ” এর মানে জানতুম না বলে খারাপ লেগেছিল, মনে করেছিলুম কুকুর বলছেন । উকিলকে কথাটা বলতে উনি যখন মানে বোঝালেন তখন মন্দ লাগেনি । তবে উকিল বলেছিলেন যে, “পুলিশ কমিশনারের কথা থেকে মনে হচ্ছে আপনাকে একাই কেস লড়তে হবে ।”

                  দরিয়াপুরের দেয়াল আলমারি জুড়ে আমার ব্যক্তিগত গ্রন্হাগার বন্ধুদের ঈর্ষার ব্যাপার হয়ে উঠল। বিরল বই থাকলে নানান কিসিমের বন্ধুরা জুটে যায় । পুস্তক মহল থেকে সাম্প্রতিক ইংরেজি বই কিনে আনতুম আর বাবা বিল পেমেন্ট করে দিতেন । আমার মামলার সময়ে আমার অনুপস্হিতিতে অনেক বই চুরি হয়ে গিয়েছিল, মার্কুইস ডি সাডের “হানড্রেড টৌয়েন্টি ডেজ অফ সোডোম”, হ্যাভলক এলিসের “কমপ্লিট ওয়র্কস”, জঁ জেনের “আওয়ার লেডি অফ দি ফ্লাওয়ার্স”, ম্যালকম এক্সের জীবনী, ডস্টয়েভস্কির “কমপ্লিট ওয়র্কস”, বিট আন্দোলনের পত্র-পত্রিকা, অভিধানগুলো, অনেক বই ।        অনেক জীবন একই সঙ্গে অনেক আমি, জিততে হবে অথচ জানি না কি জিততে হবে, পারতে হবে অথচ জানি না কি পারতে হবে, পৌঁছোতে হবে অথচ জানি না কোথায় পৌঁছোতে হবে, কারণ নেই, মগজে মৌমাছির ঘামগান, জীবনের মানে খুঁজতে চোখ বুজে লাফিয়ে-পড়া, হয়তো, হতে পারে, পোশাকের আগ্রহ ছিল না, নিয়মিত কাচার দরকার ছিল না, জুতোর আগ্রহ ছিল না, নিয়মিত পালিশের দরকার ছিল না, হাতঘড়ির আগ্রহ ছিল না, কেবল মনে হচ্ছিল দেশে-দেশে স্টুপিডরা রাষ্ট্রকে চালায়, ইমলিতলার লোকগুলো সপরিবারে গরিবই থেকে যাবে হাজার বছর । মনুস্মৃতির পাহাড় মাথায় চাপিয়ে লোকে কী করে সাম্যবাদের স্বপ্ন দেখে জানি না, ভারতীয় সমাজ সম্পর্কে পশ্চিমবঙ্গীয় আঁতেলদের কোনো ধারণাই নেই , স্বাধীনতার ছয়টা দশক পেরিয়েও গ্রামগুলো জাতিপ্রথা দিয়ে ভাগবাঁটোয়ারা করা, জলভরার কুয়ো আলাদা, উঁচু জাতে প্রেম করলে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারা হয় বা কোতল করা হয়, কলেজে তারা ব্র্যাণ্ডেড জুতো, পোশাক, চশমা, পারফিউমসহ গেলে ধনী উঁচুজাতের আক্রমণে পড়ে, যুবতীরা নখপালিশ লাগিয়ে মুখ ব্লিচিং করে গেলে কুকথা শুনতে হয় । তাই আমার কাছে লেখালিখি আর সাহিত্য-শিল্প এক জিনিস নয় । আমি লেখালিখির শুরু থেকেই নিজেকে যাচাই করে নিয়েছিলুম।

একুশ

                দরিয়াপুরে, রান্নাঘরে মায়ের কষ্ট কমাবো ভেবে, মা এবার জীবন উপভোগ করুন ভেবে, ইনডেন গ্যাস সিলিণ্ডার কিনে দিলুম, ফ্রিজ কিনে দিলুম যাতে রোজ না রান্না করতে হয়, যাতে ওনার প্রিয় মাছের স্টক করে রাখতে পারেন, রাইস কুকার কিনে দিলুম যাতে ভাতের দিকে তাকিয়ে ঠায় বসে থাকতে না হয়, প্রেশার কুকার কিনে দিলুম যাতে রান্না তাড়াতাড়ি হয় । এই জিনিশগুলোকে রপ্ত করতে মায়ের অনেকদিন লেগে গেল, প্রায় বছর চারেক, ভয় পেতেন ওগুলোকে ; যুক্তি দিতেন যে ওগুলোর দরুণ রান্নায় স্বাদ হয় না । গ্যাস থাকতেও মা কয়লার উনুনের সামনে উবু হয়ে বসে রান্না করতে ভালোবাসতেন, পরে আমাকে বলতেন গ্যাসটা জ্বালিয়ে দিয়ে যা, নিভিয়ে দিয়ে যা । ফ্রিজ খুলতেন দূর থেকে একটা তোয়ালে দিয়ে হাতল ধরে, যদি শক মারে তার ভয়ে । প্রেশার কুকারের সিটির সঙ্গে তাল মেলাতে না পেরে পুড়িয়ে ফেলতেন । রাইসকুকার কোনোদিন ব্যবহার করলেন না । তবু মায়ের আনন্দ হল যে ওনার শ্রম কমাবার জন্য খেয়াল রেখেছি, বুড়ি বান্ধবীরা বেড়াতে এলে তাদের দেখাতেন । রান্নাঘর থেকে মাকে বের করে আনার জন্যে শেষে রান্নার বউ রাখতে হল, তারও যথেষ্ট বয়স হয়েছিল, তবু সিলিণ্ডারের গ্যাস, ফ্রিজ, প্রেশার কুকারে সড়গড় । পাটনা শহরে টিভি আসতেই, তখন শাদা-কালো, রঙিন হয়নি, মায়ের জন্যে একটা টেলিরামা টিভি কিনেছিলুম, প্রোগ্রাম সরকারি হলেও, দেখে আনন্দ পেতেন আর পাড়ার যতো বাচ্চারা, বেশিরভাগই দরিয়েপুরের মুসলমান পরিবারের, এসে জড়ো হতো ওনার চারিধারে মেঝের ওপর ।

        মা বলেছিলেন, একটা গাড়ি কেন এবার, লোকেদের বাড়ি যাই । কিন্তু কেনা হয়নি, পাটনার বাড়িতে গ্যারাজ তৈরির জায়গা ছিল না । কিনলুম বটে, ফিয়াট, পরে মুম্বাইতে, নাবার্ডে অ্যাসিস্ট্যান্ট জেনেরাল ম্যানেজার হয়ে, অফিস থেকে লোন নিয়ে । মা আর বাবা দুজনেই তখন মারা গেছেন । যখন লখনউতে বদলি হয়ে গেলুম তখন লখনউয়ের হেড পোস্টঅফিসে গিয়ে প্রতি শনিবার মাকে এসটিডিতে ফোন করতুম; পোস্ট অফিসে বুক করে অনেকের সঙ্গে লাইন দিয়ে অপেক্ষা করতে হতো, আধঘণ্টা পঁয়তাল্লিশ মিনিট পরে ডাক আসতো । এখনকার মতন মোবাইল হলে মায়ের সঙ্গে প্রতিদিন দুবেলা কথা বলা যেতো । 

 

                উত্তরপাড়ার চিলেকোঠার ঘরে, কলকাতায় পড়াশুনার সময়ে আস্তানা নিয়েছিল দাদা, বইয়ের স্তুপ, বন্ধুদের গ্যাঞ্জাম, সিগারেটের ধোঁয়া, আমি গিয়ে পড়েছি অনেক সময়ে, পরিচিত হয়েছি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, দীপক মজুমদার, আনন্দ বাগচির সঙ্গে । সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে মনে হতো ঘরণী টাইপের মানুষ । তার আগে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় আর শক্তি চট্টোপাধ্যায় আমাদের দরিয়াপুরের বাড়িতে এসে পাটনার ঠররা খেয়ে বারান্দায় বমি করে গেছেন । সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বলে গেছেন ওনাকে পাঠালে উনি আমার লেখা প্রকাশ করার ব্যবস্হা করবেন । দাদা চাকরি পাবার পর ধানবাদে থাকার সময়ে দীপক মজুমদারের সঙ্গে আড্ডায় উনি বলেন “ফিলজফি অফ হিসট্রি” পড়তে, দীপক মজুমদারকে দেখেছি ধানবাদে দাদার বাসন মাজছেন । দীপক মজুমদারকে মনে হয়েছে চাষি টাইপের মানুষ । ওনার বলা বিষয়ে বই পড়া আরম্ভ করি, আর লিখে ফেলি “ইতিহাসের দর্শন” যা পরে “বিংশ শতাব্দী” পত্রিকায় ধারাবাহিক প্রকাশিত হয়েছিল, সম্পাদক যদি জেনে যেতেন আমার বয়স কতো তাহলে ছাপতেন কিনা সন্দেহ । তারপর নমিতা চক্রবর্তীর প্ররোচনায় আরম্ভ করলুম মার্কসবাদ নিয়ে একটা দীর্ঘ প্রবন্ধ, যা বিমান মজুমদারের ছেলে, দাদার বন্ধু বুজলুদাকে পড়তে দিলে, বললেন, বই করে ফেলতে পারিস ।

         দাদা কলকাতার কলেজে পড়ার সময়ে প্রায়ই যেতুম উত্তরপাড়া, পাণিহাটি, কোন্নোগর আর আহিরিটোলা । পাণিহাটি থেকে আহিরিটোলা যেতে হলে শেয়ালদা স্টেশান হয়ে যেতে হতো । শেয়ালদা স্টেশান তখন উদ্বাস্তুদের ভাঙা সংসারে ছয়লাপ, কলকাতার রাস্তায় মিছিল, বাস-ট্রাম পুড়ছে, দেখে মনে হতো কেউ শোনার নেই । সেসময়ে সদ্য-সদ্য ট্র্যাজেডি থেকে জন্ম হয়েছে পশ্চিমবঙ্গের, আর নিজেকে মনে হতো শেকসপিয়ারের ট্র্যাজেডিগুলোর ভাঁড়দের মতন, কিং লিয়ারের ফুল, হ্যামলেটের কবরখুঁড়িয়েরা, ওথেলোর ক্লাউন, ম্যাকবেথের পোর্টার, অ্যাজ ইউ লাইক ইটের টাচস্টোন, টুয়েল্থ নাইটের ফেসটে । কলকাতার ওই সময়ের  দুর্দশার জোয়ারের ঢেউগুলোকে আমি ধরার চেষ্টা করেছি আমার ‘নামগন্ধ’ উপন্যাসে । মানুষের পীড়া দুর্ভোগ বাঁচার লড়াইয়ের যন্ত্রণা দেখে, তাদের অসহায় গোঙানি শুনে, নিজের ব্যর্থতা অনুভব করা সহজ হয়, টের পাওয়া যায় যে আমি একটা গাছের পাতাও নড়াবার সামর্থ রাখি না । শহরের হাওয়ায় তাদের বিলাপ আজও অভিশাপ হয়ে ভেসে বেড়ায় । নিজেকেই প্রশ্ন করি, কী করা যেতে পারে ? কলম দিয়ে ফোঁটায় ফোঁটায় বিষের চোলাই !

         দাদার সব বন্ধুদের দেখেছি তো ! কাউকেই মনে হয়নি দাদার মতন আর আমার মতন মিসফিট, গোলমালকারী, স্হিতাবস্হাবিরোধী ইমলিতলা-মার্কা ইনসেন টাইপের ; ওনাদের উচ্চাকাঙ্খা সাহিত্যকে আঁকড়ে কেরিয়ার করার  । অথচ আমার আর দাদার মতন ইমলিতলাপন্হী ইনসেন না হলে আন্দোলন গড়ে তোলা যাবে না । এনাদের বহু বাক্যের সঙ্গে মুখের দুর্গন্ধ লেগে থাকে, পায়োরিয়ার, বদহজমের, বায়ুর, দাঁতের ফাঁকে পচা ছাগলের, শব্দের অর্ধেক মানে তাতেই আটকে যায় । পরে এনাদের কাজকারবার দেখে পায়খানাগুলো পর্যন্ত লজ্জায় লাল হয়ে উঠেছে টাকা টাকা টাকা টাকা টাকা টাকা টাকা টাকা টাকা টাকা টাকা টাকা । আর সেই মোক্ষম দর্শন । টাকা হল ডলারের বেজন্মা বাচ্চা । ওনাদের সমবেত বা একক  কাজকারবার দেখে মনে হয়েছে, আমি বোধহয় একরকম স্টুপিড গর্ববোধে ভুগি, সুপিরিয়রিটি কমপ্লেক্সে, যাকে অ্যালেন গিন্সবার্গ বলেছিল “নাঈভ”, যার দরুন পরীক্ষায় দ্বিতীয় স্হান, প্রেমে লাথি, বন্ধুদের বিশ্বাসঘাতকতা, জোচ্চুরি, টাকা হাপিশ। পৃথিবীর সঙ্গে আমিও পাক খাই । ওহ, বলতে ভুলে গেছি, দাদার রোলেক্স ঘড়িটা এক বন্ধু হাপিশ করে দিয়েছিল চাইবাসায়, তারপর থেকে দাদা ঘড়ি পরা ছেড়ে দিলো ।

         পশ্চিমবঙ্গ কি সেই পঞ্চাশ-ষাটের ট্র্যাজেডি থেকে বেরোতে পেরেছে ? না, পারেনি, জানি না কখনও পারবে কিনা । তা থেকে গেছে, স্হায়ী বিশৃঙ্খলা, অকারণ ক্রোধ, অরাজকতা, নৃশংসতা, গণধর্ষণ, নারীপাচার  আর ঘৃণা নিয়ে । ওপর থেকে চুয়ে-চুয়ে পৌঁছে গেছে নিচের তলায়, যেখানে সামান্য কিছু নড়ে উঠলেই মানুষ ভয়ে আঁৎকে ওঠে, আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে, প্রতিপক্ষ থাকুক বা না থাকুক । যারা নায়ক হয়ে উঠতে চেয়েছিল তারাও কালক্রমে খোলোশ থেকে বেরিয়ে নির্মল জোকারের চেহারার সঙ্গে জনগণের পরিচয় করিয়ে দিয়েছে , জনগণ জোয়ারের সঙ্গে আসে ভাটার সঙ্গে যায়, তাদের জানা নেই যে শহর আর শহরতলিগুলো থেকে সৌন্দর্য্য কবেই পালিয়েছে, কেউই আর প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম হতে পারে না, বহু পরিবার ওই ট্র্যাজেডিকে পারিবারিক স্মৃতির আনন্দের সঙ্গে জড়িয়ে ফেলেছে, মাছের বদলে সেই আনন্দে তারা নিয়ে এসেছে বিরিয়ানি, স্টিউ, সসেজ, পাস্