• টইপত্তর  সিনেমা

    Share
  • মলয়ের লেখাপত্তর

    মলয় রায়চৌধুরী
    সিনেমা | ০৭ এপ্রিল ২০২০ | ৪৫৬৪ বার পঠিত | | জমিয়ে রাখুন
  • গোদার-এর মাওবাদী পর্ব : একটি সমালোচনা
    [ মাওইস্ট ইনটারন্যাশানালিস্ট মুভমেন্ট পত্রিকার ২৬ জানুয়ারি ২০০৪ সংখ্যায় প্রকাশিত ]

    ‘চীনা, বা বরং, চীনা পদ্ধতিতে: ফিল্ম নির্মাণ’, সাধারণত ‘ল্যা চিনোয়া’ নামে পরিচিত, যা ১৯৬৭ সালের ফরাসি রাজনৈতিক চলচ্চিত্র হিসেবে জাঁ-লুক গোদার পরিচালনা করেছিলেন।
    ১. লা চিনোয়া [ চীনা], পরিচালক জাঁ-লুক গোদার, ১৯৬৭
    ২. লে ভনদে [ পুর্ব দিকের বাতাস ], পরিচালক জাঁ-লুক গোদার, ১৯৬৯
    ৩. তু ভা বিয়ঁ [ সব ঠিক আছে ], পরিচালক জাঁ-লুক গোদার, ১৯৭২

    ২০০৪ সালে এই ফিল্মগুলো দেখে আমরা একটি প্রশ্নের উত্তর দিতে চাই এবং তা হল গোদার সিরিয়াস ছিলেন কি না । আজ আমরা যখন দেখি পশ্চিমে মাওয়ের ইমেজ অভিনব বিজ্ঞাপনের সাথে মিশে গেছে, তা আসলে মাওকে বিদ্রূপ করার কৌশল এবং তার মাধ্যমে সংস্কৃতিগুলোতে ভোক্তা আবেশের শক্তি প্রদর্শন করা হয়, এমনকি চীন থেকে দূরে থাকলেও। সর্বোপরি, আজ মাওয়ের ইমেজ মূল স্রোতোধারায় ব্যবহারটি বিপরীতমুখী, কারণ এটি চীনে দুর্দান্ত বিজ্ঞাপন প্রচারের গুরুত্ব পায় আর সবাই জানেন যে মাও একজন কমিউনিস্ট ছিলেন। বিপরীতে, সংস্কৃতি বিপ্লবের (১৯৭৬ সালে) সময় গোদার একজন উন্নত চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসাবে মাওয়ের ইমেজগুলো পুরোপুরি গুরুত্ব সহকারে ব্যবহার করেছিলেন -- এবং এমনকি মাওয়ের জন্য একটা জিংগল তৈরি করেছিলেন। আমরা বলতে পারি যে এই ফিল্মগুলোতে যাথার্থ্য আছে, মাওবাদী রাজনীতি, তত্ত্ব এবং পদ্ধতির বোঝাপড়া আছে।

    ১৯৬৭ সালে "লা চিনোয়া" মুক্তি পেয়েছিল দেখে অবাক হতে হয় । গোদার যে কেবল মাও আর সোভিয়েত সংশোধনবাদী নেতাদের মাঝে ভাঙনকে ধরতে পেরেছেন তা-ই নয়, গোদার সেই ভাঙনকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন।তিনি ছিলেন সময়োচিত । "লা চিনোয়া" এবং "উইন্ড ফ্রম দ্য ইস্ট" -এ গোদার সোভিয়েত সংশোধনবাদ, ফরাসী "কমিউনিস্ট পার্টি", সামাজিক-গণতন্ত্র এবং শ্রমিক আমলাতন্ত্রের নিন্দা করেছেন।

    "পূর্ব দিকের বাতাস" ফিল্মে প্রচুর আকর্ষণীয় বিষয় রয়েছে তবে ফিল্মের সবচেয়ে বড়ো অবদান এবং তর্কসাপেক্ষভাবে গোদারের সামগ্রিক অবদানগুলি চলচ্চিত্র নির্মাণ-তত্ত্বের অন্তর্গত কারণ "পূর্ব দিকের বাতাস" এবং "লা চিনোয়া" ফিল্মগুলো সম্পর্কে গোদার জানান যে তিনি ঠিক কোন কারণে মাওবাদীদের বিশ্বাস করেন এবং কেমন করে ফিল্ম তৈরি করা উচিত । গোদার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন তা হল প্রলেতারিয়েত কীভাবে সংগ্রাম করবে এবং ফিল্মের দ্বারা কীভাবে সর্বহারা শ্রেণীর পক্ষে উপকার পাওয়া যায়, যদিও বর্তমানে আমরা যে সমস্ত ফিল্ম দেখি তাতে বেশিরভাগ উপস্থাপনা এবং পদ্ধতিগুলি শাসকদের উপকার করে।

    মাও-যুগের গোদার বলেছিলেন যে, সর্বহারা শ্রেণীর অবস্হা নিয়ে সমাজতাত্ত্বিক চলচ্চিত্রগুলো যদি সংঘর্ষের চিত্রণ বাদ দেয় তবে তারা কার্যকর হয় না।শ্রমিকদের ভয়াবহ অবস্থা প্রকাশের ফলে হতাশা ঘটবে কিন্ত পাশাপাশি কর্মকাণ্ডও ঘটতে পারে, সুতরাং কীভাবে বিদ্রোহ করা যায় তা ফিল্মে দেখানো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

    রাজনৈতিকভাবে এই ফিল্মগুলোতে এমন কিছু ব্যাপার আছে যা আমাদের পছন্দ নয়, বিশেষত "তু ভাঁ বিয়ঁ"[ সব ঠিক আছে] ফিল্মটি, যা মূলত একটি খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্রকে ফরাসী কর্মীদল কর্তৃক অধিগ্রহণ সম্পর্কে । ফ্রান্সে গোদারের সময়ের ঘটনাগুলো আজকের দিনে যেমন, তার তুলনায় সেই সময়ের সাম্রাজ্যবাদী দেশের শ্রমিকদের অবস্হা আরও ঘোলাটে ছিল ।
    দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে, ফরাসিদের তাদের অর্থনীতৈক অবস্হা পুনর্গঠন করতে হয়েছিল এবং এমনকি বুদ্ধিজীবীরাও ভেবেছিলেন যে সাম্রাজ্যবাদী ঝোল টানা ভালো, কেননা তাহলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছাকাছি পৌঁছানোর পক্ষে সহায়ক হওয়া যাবে আর মার্কিন জীবনের মানদণ্ডে পৌঁছোনো যাবে।

    গোদার তাঁর সময়ের অন্যান্য অনেকের মতো ভেবেছিলেন যে তিনি সম্ভবত এমন এক সময়ের মধ্য দিয়ে জীবনযাপন করছেন যেখানে সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলিতে ফরাসিদের দেখাদেখি সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থিত সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব আসবে। যদি এটা সত্য হতো যে ফরাসি শ্রমিকরা শোষিত হচ্ছিল, তবে তাদের সম্পর্কে গোদারের দৃষ্টিভঙ্গি মাওবাদী মানদণ্ড দ্বারা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সঠিক হতো। অন্যান্য বেশিরভাগ ব্যাপারে গোদার সঠিক হলেও এই একটি ব্যাপারে তিনি ভুল ।

    ২০০৪ সালের সুবিধাজনক অবস্হান থেকে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে ১৯৬৮ সালের মে মাসে সংঘর্ষময় ধর্মঘটে বিজয়ের দরুন বেতন অনেক বেড়ে গিয়েছিল এবং মজুরি বৃদ্ধি পেয়েছিল যা কিনা ফ্রান্সে সাম্রাজ্যবাদী পরজীবিতার হাতকে শক্তিশালী করে তুলেছিল। "তু ভাঁ বিয়ঁ"[ সব ঠিক আছে]-এর মাংস-প্রক্রিয়াকরণ কারখানার মহিলা শ্রমিকের চরিত্র যা বলে তার চেয়ে বেশি কিছু প্রমাণ করার দরকার হয়নি, যে কিনা অলঙ্কৃত উক্তিতে জানায় যে, বস যদি এক ডলার দেয় তবে শ্রমিকরা প্রত্যেকে এক হাজার ডলার চায় -- যেন সেই পারিমাপের মান কোথাও থেকে উড়ে আসে। ফিল্মের শেষে একদল তরুণ একটি সুপার-মার্কেটে "ভাঙচুর" ধরণের গোলমালের আয়োজন করে যেখানে লোকেরা টাকাকড়ি না দিয়ে ঠেলা ভরে-ভরে জিনিসপত্র নিয়ে পালায়।

    অবশ্যই এটি একটি ভাল প্রসঙ্গ যে কেনই বা লোকেরা সুপার মার্কেটের দোকানগুলোকে টাকা দেবে, যখন সমাজ অর্থ যোগাতে পারে না, কিন্তু ফিল্মটির পুরো সুরটি সাম্রাজ্যবাদী দেশের শ্রমিকদের অর্থনৈতিক দাবির দিকে খুব বেশি ঝুঁকে ছিল - সাম্রাজ্যবাদীরা কীভাবে নিজের এবং তাদের দালালদের সুবিধার জন্য তৃতীয় বিশ্বকে শোষণ করে তা দেখানোর পরও গোদার সামাজিক-গণতন্ত্র এবং সংশোধনবাদ থেকে নিজেকে পৃথক রাখতে পেরেছিলেন ।

    ফরাসী শ্রমিকদের প্রতি গোদারের বিশ্বাসকে বাদ দিয়েও, যাদের শোষণ করা হচ্ছে এবং তাদের সমর্থন করার উপযুক্ত কারণ আছে, এই চলচ্চিত্রগুলোর সাথে আমাদের খুব কমই দ্বিমত রয়েছে। একথা বলা একটা কঠিন শর্তের মতো মনে হতে পারে, তবে বাস্তবে, গোদার তাঁর চলচ্চিত্রগুলোয় চিন্তা করার পদ্ধতিগুলো শেখান। "লা চিনোয়া" দর্শকদের বোঝাবার চেষ্টা করে যে তাঁর সময়ে মার্কসবাদ-লেনিনবাদ কীভাবে বিজ্ঞান ছিল। অতএব অর্থনৈতিক জীবনের তথ্যগুলি পরিবর্তিত হতে পারে, কিন্তু সত্যে পৌঁছানোর কয়েকটি প্রাথমিক পদ্ধতি বদলায় না । এই কারণেই আমরা এখনও গোদারের মাওবাদী পর্বকে, ফরাসি শ্রমিকদের প্রকৃতির সাথে তাঁর সঙ্গে আমাদের মতবিরোধ সত্ত্বেও তরতাজা হিসেবে দেখি । ফ্রান্স সম্পূর্ণরূপে একটি পরজীবী জাতিতে পরিণত হয়েছিল, তবে গোদার এই ফিল্মগুলোতে যা বলেছিলেন তার বেশিরভাগ আজও বর্তমান।

    “পূর্ব দিকের বাতাস” ফিল্মে যখন গোদার তত্বনির্মাণকে ফিল্ম প্রোডাকশনের মূল কাজ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন, তখন তাঁর সময়ে ফরাসি কর্মীদের প্রতি তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি কী তার গুরুত্ব ছিল না। চলচ্চিত্রের প্রধান দায়িত্বের প্রশ্নটি এখনও অবধি অনুত্তরিত রয়ে গেছে। আরও বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে ফরাসি কর্মীদের সম্পর্কে তাঁর ধারণা ভুল ছিল, তবে মূল কাজটি নিয়ে প্রশ্ন এখনও থেকে গেছে।

    প্রধান দায়িত্বের বিষয়ে গোদারের সঙ্গে আমরা একমত নই, কারণ আমরা একে বলি, "জনগণের মতামত সৃষ্টি এবং ক্ষমতা দখলের জন্য নিপীড়িতদের স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান নির্মাণ"। আমাদের দৃষ্টিকোণ থেকে, "লা চিনোয়া"-র চেয়ে "ম্যাট্রিক্স" এর অবদান বেশি । তবে, আমরা যদি গোদারের মাপকাঠিকে গ্রহণ করি তবে বলতে পারি যে "লা চিনোয়া" ফিল্মটা "ম্যাট্রিক্স" এর চেয়ে বড় অবদান রেখেছে, কারণ "লা চিনোয়া" সাংস্কৃতিক বিপ্লবে উৎপন্ন মাওবাদী পদ্ধতি এবং নির্দিষ্ট তত্ত্বগুলিকে সরাসরি সামলায়। বিপরীতে, "ম্যাট্রিক্স" সম্ভবত বাইরের ভারী হস্তক্ষেপ ছাড়া মাওবাদের গুরুত্বর বিবেচনা করতে পারে না। এর মধ্য দিয়ে আমাদের এই প্রশ্নটি উত্থাপনের অর্থ হল যে, এই মুহূর্তে আন্তর্জাতিক সর্বহারা শ্রেণি এবং এর সাম্রাজ্যবাদী দেশ বিশেষত মিত্রদের, আসলে কী প্রয়োজন। তত্ব নির্মাণ বা আরও দ্রুত এবং বিস্তৃত আবেদন সহ এমন কোনও কিছুর মধ্যে আমাদের বেছে নিতে হবে। এটিও একটি বৈজ্ঞানিক প্রশ্ন - মূল কাজটি সম্পর্কে আমরা অথবা গোদার সঠিক কিনা। হয় এক বা অন্য দৃষ্টিভঙ্গি বিপ্লবকে ত্বরান্বিত করবে।

    কেউ কেউ বলতে পারেন যে এই ফিল্মগুলো উপদেশ দেবার মতো "ডাইডাকটিক", তবে বাস্তবে গোদার দর্শকদের বিভিন্ন শিবিরের পার্থক্য করার চেষ্টা করেছেন: ১) পাশ্চাত্য সাম্রাজ্যবাদী শিবির ; ২) ব্রেজনেভের সোভিয়েত সহ সামাজিক-গণতান্ত্রিক / সংশোধনবাদী ও শ্রম আমলা শিবির ইউনিয়ন ; ৩) সর্বহারা শিবির। প্রতিটি শিবির এই সিনেমাগুলিতে তার বক্তব্য রাখে এবং গোদার দেখান যে প্রথম দুটি একটি আরেকটির সঙ্গে যুক্ত । মানুষ এই সংঘর্ষগুলোর দিকগুলো আলাদা করতে পারার সময়, গোদার সম্ভবত "ডাইডাকটিক" চলচ্চিত্রটিকে বুর্জোয়া চলচ্চিত্র হিসাবে বিবেচনা করেছিলেন, সংঘর্ষ ছাড়াই উপস্থাপনা করেছিলেন।

    গোদারের তত্ত্ব নির্মাণের প্রধান কাজটা, দর্শকদের আর অর্থ-বিনিয়োগকারীদের এড়াবার খাতিরে চলচ্চিত্র পরিচালকদের উপর একটি ভারী বোঝা চাপিয়ে দেয়। সম্ভবত তাঁর কাজের অনুরণনটির বেশিরভাগ অংশই "শৈল্পিক বিশ্বস্ততা"র প্রশ্নে মাথা গলানো থেকে উদ্ভূত, এটা এমন একটা প্রশ্ন যা যে-কোনও শৈল্পিক পাতি-বুর্জোয়াকে ক্ষুব্ধ করে । তত্ব নির্মাণের দায়টা গোদারের জনপ্রিয় "আর্টসি" বা "হাই ব্রাউ" ভাবমূর্তির সঙ্গে খাপ খায়।

    ওনার এই ফিল্মগুলোর সাথে আমাদের উপরোক্ত কয়েকটি মতবিরোধ সত্ত্বেও, আমাদের এও বিশ্লেষণ করা উচিত যে গোদারের মাওবাদী পর্বটি সঠিক ছিল কিনা। সোভিয়েত সংশোধনবাদকে বারবার মারাত্মকভাবে আক্রমণ করাটা সোভিয়েত ইউনিয়ন আর ফরাসি কমিউনিস্ট পার্টির মতন উপগ্রহ দলগুলোর দেউলিয়াপনা প্রমাণ করেছে । কেবলমাত্র সবচেয়ে বিভ্রান্ত রুশপ্রেমীগুলোই বিশ্বাস করত যে খ্রুশ্চেভ / ব্রেজনেভ যুগটি ছিল "সমাজতন্ত্র"।

    "পূর্ব দিকের বাতাস"-এ দেখা যায় ফিল্মটি স্ট্যালিনকে নিয়ে তর্ক-বিতর্ক করছে। তখনকার দিনে এবং আজকালও একটা জনপ্রিয় চর্চা হল - স্টালিনের কেন্দ্রীভূত অর্থনৈতিক পদ্ধতির বিপরীতে "স্বায়ত্তশাসন"। গোদার "স্বায়ত্তশাসন" আন্দোলনের ইতিহাসে আলোকপাত করে দেখিয়েছেন, কীভাবে তা সর্বহারা শ্রেণিকে অবহেলা করে পাশ কাটিয়েছে।গোদার স্টালিনের সময়কার শিল্পকে দোষারোপ করার সময় স্ট্যালিনের অধীনে সমস্ত শিল্পীদের তার জন্য দায়ি করেছিলেন -- এমনকি তখন থেকে ট্রটস্কির অত্যধিক শৈল্পিক প্রভাব লক্ষ করে ব্রেস্ট-লিটোভস্কের সন্ধি হওয়ার পরেও লেনিনকে খোঁচা দিয়েছেন - “স্বায়ত্বশাসনের” প্রশ্নে গোদার পুরোপুরি স্ট্যালিনের পক্ষ নিয়েছেন এবং টিটোর যুগোস্লাভিয়ায় "স্বায়ত্তশাসন" এর আদর্শগত অভিব্যক্তি প্রদর্শন করেছেন। মাও ১৯৬৩ সালে তাঁর প্রবন্ধে শ্রমিক আভিজাত্য, শ্রমিক আমলাতন্ত্র এবং সংশোধনবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রশ্নগুলিকে একসাথে যুক্ত বলে প্রতিপাদন করে কড়া জবাব দিয়েছিলেন । গোদার সম্ভবত " যুগোস্লাভিয়া কি সমাজতান্ত্রিক দেশ? " প্রবন্ধটা পড়েছিলেন।

    ১৯৬০ এর দশক থেকে ১৯৮০-এর দশক পর্যন্ত প্রতিবিপ্লবীরা মার্কস ও লেনিনের অনুগামীদের মতামতকে সরিয়ে যুগোস্লাভিয়াকে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেছিলেন যাতে মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাওবাদ থেকে পুঁজিবাদে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে এমন লোকদের মাঝ-পথের ঘর হিসাবে কাজে লাগাতে চেয়েছিলেন । যুগোস্লাভিয়া ছিল “স্বায়ত্বশাসিত উদ্যোগের” সঙ্গে "বাজার সমাজতন্ত্র "। লক্ষণীয়ভাবে অনুপস্থিত ছিল মাও বা স্ট্যালিন ধাঁচের কেন্দ্রীয় অর্থনৈতিক শক্তি।তবু যখন সোভিয়েত ইউনিয়নে স্ট্যালিনের প্রভাব শেষ হয়ে গিয়েছিল আর গর্বাচভ/ইয়েল্তসিন বুর্জোয়াজি খোলাখুলি আবির্ভুত হল, তখন সবচেয়ে হিংস্রভাবে যুগোস্লাভিয়া ভেঙে টুকরো-টুকরো হয়ে গেল । সেই গণহত্যার সন্ত্রাস আমাদের মতন মার্কস, এঙ্গেলস, লেনিন, স্টালিন এবং মাওয়ের অনুসারীদের অবাক করেনি, কারণ যুগোস্লাভিয়ার জনগণের বৈষয়িক ভিত্তি এবং পথনির্দেশক ছিল স্হানীয় স্তরে। "বিশ্বব্যাপী চিন্তাভাবনা করুন, স্থানীয়ভাবে কাজ করুন" স্লোগানের এটা একটা গভীর ভুলের উদাহরণ হতে পারে । অর্থনৈতিক "স্বায়ত্তশাসন" যা করেছিল তা হ'ল প্রদেশগুলোকে একে অপরের ঘাড়ে চাপতে উৎসাহিত করেছিল। সেটাই সংকীর্ণ প্রাদেশিক যুদ্ধের বৈষয়িক ভিত্তি তৈরি করেছিল।

    "স্বায়ত্তশাসন" প্রিয় যুগোস্লাভিয়ার ভয়ংকর পতন প্রমাণ করে যে পুঁজিবাদের পর তাৎক্ষণিকভাবে জরুরি হল কেন্দ্রিয় সমাজতন্ত্র এবং তা সম্পর্কে মার্কস এবং এঙ্গেলসের তত্ত্বগুলি একেবারে সঠিক। সর্বহারা শ্রেণীর সংহতি ভঙ্গ করার জন্য "স্বায়ত্তশাসন" আরেকটি শব্দ। "স্বায়ত্তশাসন" আসলে সর্বহারা ও পুঁজিবাদী শ্রেণীর উভয়ের ওপরে লাঠি ঘোরাতে চাইছে এমন পাতি-বুর্জোয়া শ্রেণীর শব্দ। নারীদের প্রশ্নের ক্ষেত্রেও একই কথা। অবশ্য, জেনডার ব্যাপারটা শ্রেণীর প্রশ্ন থেকে তুলনামূলকভাবে স্বায়ত্তশাসিত, কারণ সমস্ত নারীই শ্রমিক নন, তবে একথা সত্য যে স্বায়ত্তশাসন এবং জেন্ডার প্রশ্নে ব্যক্তিবাদ নিপীড়িত ও শোষিতদের একতা ভঙ্গ করে। নারীর এগিয়ে যাওয়ার প্রশ্নে বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক গোষ্ঠী-স্তরের উত্তর খুঁজে বের করার বিকল্প নেই। এটা ব্যক্তির স্বতন্ত্র অনুভূতি, বা স্বতন্ত্র ক্ষমতা বা এমনকি বিকেন্দ্রীকরণের প্রশ্ন নয় ।

    মার্কসের মূল্যের শ্রম তত্ত্ব জোর দিয়েছিল যে শ্রমিকরা কীভাবে একটি নিরপেক্ষ প্রশ্নে ঐক্যবদ্ধ হতে পারে - অর্থাৎ যা তাদের নিজস্ব শ্রম। কারা শোষিত এবং কারা নয় সে সিদ্ধান্ত নেওয়ার উপায় না থাকলে সর্বহারা ঐক্যের ক্ষতি হবে। শোষণ এবং ক্ষতিপূরণের প্রশ্নগুলিকে খুব গুরুত্ব সহকারে নিতে হবে তা না হলে এর পরিণতি হবে গণহত্যার যুদ্ধ যেমন যুগোস্লাভিয়ায় দেখা গিয়েছিল। কেবলমাত্র তাদের কারখানা বা প্রদেশে নয় পুরো দেশ এবং পুরো পৃথিবীর অন্যান্য শ্রমিকদের সাথে কীভাবে চলতে হবে তা শেখা শ্রমিকদের একটি মূল কাজ। "স্বায়ত্তশাসনের পরিবর্তে" শোষিতদের "মূল্যমানের শ্রম তত্ত্ব" প্রয়োজন। কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষকে অবশ্যই একে অপরের পরিস্থিতি দৃঢ়ভাবে জানতে সহায়তা করতে সফল হতে হবে। শ্রমিকরা যদি একে অপরের বস্তুগত অবস্থা দৃঢ়ভাবে অনুভব করতে অক্ষম হয়, তবে তারা পুরোপুরি ঐক্যবদ্ধ হতে সর্বোচ্চ সম্ভাব্য স্তরে ব্যর্থ হবে। একটি কেন্দ্রিয় অর্থনৈতিক শক্তির মাধ্যমে শ্রমিকরা একে অপরের মধ্যে তাদের সম্পর্কগুলোর সামঞ্জস্য করতে পারে। সেই ক্ষমতা না থাকলে যুগোস্লাভিয়া-ধরণের পরিস্থিতি তৈরি হতে বাধ্য।

    এই ফিল্মগুলোর সংলাপসমূহের শব্দাবলী মাও-যুগের গোদারের চলচ্চিত্রগুলিতে অগ্রগতির প্রধান বোঝা বহন করে। দ্বিতীয়ত, গোদার সীমাবদ্ধ ক্রিয়া ব্যবহার করেন, রক্ত-লাল রঙ নিক্ষেপ করে এবং চরিত্রগুলোকে রক্তাক্ত করে তুলে ফিল্মে তুলে ধরা তাঁর পরিচিত ক্রিয়া। তৃতীয়ত, গোদার এছাড়াও দর্শকদের বোঝাবার জন্য ব্যবহার করেছেন এবং দেখিয়েছেন ফটোগ্রাফি বা ফিল্মের ছবিগুলো কীভাবে বুর্জোয়া শ্রেণির পক্ষে সহজেই কাজে লাগানো যেতে পারে ।”তু ভাঁ বিয়ঁ" ফিল্মের শেষে, গোদার ফ্রান্সের এমন ফুটেজ দেখিয়েছেন যার পটভূমিতে নির্বোধ ট্যুরিজম বা ফরাসী জাতীয়তাবাদী জিংগলগুলো বাজিয়ে শুনিয়েছেন । "পূর্ব দিকের বাতাস" ফিল্মে গোদার সাধারণ ফুটেজ ব্যবহার করে বুর্জোয়া চলচ্চিত্র নির্মাণকারী দুটি চরিত্রের অভিনয় উপস্হাপন করেছেন। আমরা দুর্দান্ত মেক-আপ, প্রপস এবং ম্লান আলো দিয়ে একটি কংকুইস্তাদর ফিল্মের ভাবনা কল্পনা করে নিই, তবে গোদার আমাদের দেখিয়েছেন একজন লোক একজন বন্দীকে, প্রকাশ্য দিনের আলোয়, বিশেষ ব্যাকগ্রাউন্ড ছাড়াই টেনে নিয়ে চলেছে --যা প্রকৃত অভিনেতারা দেখতে পায় কোনোরকম প্রপস ছাড়াই --- যা বেশ সাদামাটা। বুর্জোয়ারা যখন কিনা দর্শকদের দুর্দান্ত পটভূমির সৌন্দর্য দেখায়, তাঁর মাওবাদী পর্বে গোদার আমাদের দেখান যে সৌন্দর্য আসলে থাকে সংগ্রামে ।
    [ ইংরেজি থেকে অনুবাদ করেছেন মলয় রায়চৌধুরী ]
  • বিভাগ : সিনেমা | ০৭ এপ্রিল ২০২০ | ৪৫৬৪ বার পঠিত | | জমিয়ে রাখুন
    Share
আরও পড়ুন
- - স। র। খান
আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • মলয় রায়চৌধুরী | 162.158.158.200 | ০৭ এপ্রিল ২০২০ ১১:০৯730468
  • জাঁ-লুক গোদার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আর্মেনীয় পরিচালক আরতাভাজ পিলিশান-এর
    অনুবাদ : মলয় রায়চৌধুরী
    আরতাভাজ পিলিশান ( ১৯৩৮ ) একজন আর্মেনীয় চিত্রনির্মাতা, যাঁর কাজ সম্পর্কে ইউরোপে জাঁ লুক গোদারই প্রথম আগ্রহ দেখান । পিলিশান একাধারে তথ্যচিত্র ও কাহিনিচিত্র নির্মাতা , চিত্রনাট্য রচয়িতা, চলচ্চিত্রশিল্পের ইতিহাস রচয়িতা এবং ফিল্ম তাত্ত্বিক । সিনেমাটিক দৃষ্টিকোণের ‘ডিসট্যান্স মন্তাজ’ শৈলী প্রয়োগের জন্য তিনি খ্যাত, যেমন কৃষ্ণসার হরিণদলের সঙ্গে বিশাল পলায়নকারী মানুষদের তুলনামূলক দৃশ্য । চিত্রনির্মাতা সের্গেই পারাজানোভ বলেছেন যে, পিলিশান একজন বিরল প্রতিভাধর চিত্রনির্মাতা । পিলিশানের ফিল্মগুলো তথ্যচিত্র এবং ফিচার ফিল্মের মিশ্রণ, অনেকটা আভাঁ গার্দ চিত্রনির্মাতা ব্রুস কনারের মতন, প্রথানুগত তথ্যচিত্রের মতন নয়। কিন্তু তা মায়া ডেরেনের মতো আভাঁ গার্দ সংজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত করা যায় না, অর্থাৎ ওনার ফিল্মকে ‘অ্যাবসার্ড সিনেমা’ বলা যায় না । পিলিশানের ফিল্মগুলোকে বলা হয়েছে ‘কাব্যিক দৃষ্টিভঙ্গীকে ফিল্মে নামিয়ে আনার প্রয়াস’ । ফিল্মনির্মাণে উনি পুরোনো ফিল্মের সংগ্রহশালা থেকে কথাবস্তু নিয়ে মিশিয়েছেন, দুটি টেলিফোটো লেন্সের মাঝে তোলা দৃশ্যের মিশেল ঘটিয়েছেন । কিন্তু ওনার সংলাপহীন ফিল্মগুলো বেশ সংক্ষিপ্ত, ছয় মিনিট থেকে ষাট মিনিটের মধ্যেই আবদ্ধ । অবশ্য সঙ্গীত আর ধ্বনি-প্রয়োগকে তিনি বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন । ওনার বেশিরভাগ ফিল্ম কালো-শাদায় তোলা । গোদার-এর সঙ্গে তাঁর কথাবার্তা প্রকাশিত হয়েছিল ‘লে মন্দে’ পত্রিকার ২ এপ্রিল ১৯৯২ সংখ্যায় ।

    জাঁ-লুক গোদার : কেমন পরিস্হিতিতে আপনি কাজ করেছেন ?
    আরতাভাজ পিলিশান : আমি আমার সব ফিল্মই আরমেনিয়ায় তুলেছি, তবে মসকো থেকে সাহায্য নিয়েছি । আমি পুরোনো ব্যবস্হার গুণগান করতে চাই না, কিন্তু তার বিরুদ্ধে নালিশও করতে চাই না । অন্তত ওদের একটা সিনেমাটিক ইন্সটিটিউট ছিল, যেখানে খুব ভালো প্রশিক্ষণ পাওয়া যেতো । চিত্রনির্মাণ আমরা কেবল সোভিয়েট ইউনিয়নেই শিখিনি বরং সারা পৃথিবীতে শিখেছি, আর সেসময়ে প্রত্যেকেরই নিজের কন্ঠস্বর খুঁজে পাবার সুযোগ ছিল । আমি এতো কম ফিল্ম তৈরি করেছি বলে তখনকার এসট্যাবলিশমেন্টকে দায়ি করতে চাই না ; বলা যায় যে, আমার কিছু ব্যক্তিগত সমস্যা ছিল । আমি জানি না নতুন ব্যবস্হায় কী ঘটতে চলেছে । আশা করি আমি ফিল্মের কাজ চালিয়ে যেতে পারব ; সমস্যা তো সব সময়েই থাকে, যেমন ফ্রান্সে রয়েছে, প্রযোজনা সম্পর্কিত সমস্যা আর জনগণের মাঝে সম্পর্কের সমস্যা । এখন পর্যন্ত আমার সবচেয়ে বড়ো সমস্যা হল ফিল্ম তৈরি করার পর তার বিতরণ ।
    জাঁ-লুক গোদার : আমি জানতে পারলুম কেননা নিয়নে তথ্যচিত্রের উৎসবে ওগুলো দেখানো হচ্ছিল, আমি যেখানে থাকি তার কয়েক কিলোমিটারের মধ্যে । লুসানের সিনেমাথেকের পরিচালক ফ্রেডি বশ, সেগুলোর কপি করার জন্য “সোভিয়েট নিয়ম” অনুসরণ করেছিলেন : উনি রাতের বেলায় কপি করতেন আর আমাদের দেখাতেন -- অ্যানে-মারি মিয়েভিল আর আমাকে । আমার ওপর সেগুলো গভীর প্রভাব ফেলেছিল, কিন্তু পারাদজানভের ফিল্ম থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ; উনি মনে হয় পারস্যের জাজিম বোনা আর সাহিত্যের ঐতিহ্যের কাছাকাছি । আপনার ফিল্মগুলো, আমার মনে হয়েছে, কেবল সিনেমাটিক ঐতিহ্য থেকেই জন্মাতে পারে । যেমন আইজেনস্টাইন, দোভঝেঙ্কো আর ভেরতভ একটা ফিল্ম তৈরি করে এমন প্রভাব ফেললেন যাকে বলা চলে ফ্ল্যাহার্টি বা কিউবার তথ্যচিত্র নির্মাতা সানটিয়াগো আলভারেজের মতন । বলা যায় এক ধরণের ফিল্ম, যা একই সঙ্গে মৌলিক এবং ঐতিহ্যময়, একেবারে আমেরিকার বাইরে, যেগুলো পৃথিবীর চলচিত্রজগতে বেশ ক্ষমতাধর । এমনকি রোম শহরও, খোলামেলা একটা মহানগর, আমেরিকার কাছে ঋণী । যখন দখলকারীর কবজায় দেশটা থাকে, তখন প্রতিরোধের সমস্যা হল কেমন করে তাকে প্রতিরোধ করা হবে । আমি যখন আপনার ফিল্মগুলো দেখলুম তখন মনে হয়েছিল, তথাকথিত সমাজবাদী ব্যবস্হার যতোই গলদ থাকুক, একটা সময়ে কয়েকজন ক্ষমতাবান ব্যক্তিত্ব ভিন্নভাবে চিন্তা করতে সফল হয়েছিলেন । হয়তো তা বদলে যেতে চলেছে । আমার কথা যদি বলি, বাস্তবের , আর তাকে ব্যবহারের প্রতিনিধিত্বকারী উপায়গুলোর সমালোচক হিসাবে, আমি রুশ চিত্রনির্মাতদের টেকনিককে পুনরাবিষ্কার করলুম, যাকে ওনারা বলতেন মন্তাজ । গভীর চিন্তার ফসল হিসাবে মন্তাজ, যে অর্থে আইজেনস্টাইন এল গ্রেকোকে বলেছিলেন টোলেডোর সবচেয়ে বড়ো মন্তাজশিল্পী ।
    আরতাভাজ পিলিশান : মন্তাজ সম্পর্কে আলোচনা করা কঠিন । শব্দটা নিঃসন্দেহে ভুল । হয়তো বলা উচিত “শৃঙ্খলার প্রণালী”। টেকনিকাল প্রসঙ্গের বাইরে গিয়ে, গভীরতার প্রতিফলন হিসাবে আলো ফেলা ।
    জাঁ-লুক গোদার : মন্তাজের রুশ প্রতিশব্দ কী ? কোনো প্রতিশব্দ নেই ?
    আরতাভাজ পিলিশান : হ্যাঁ, মন্তাজ ।
    জাঁ-লুক গোদার : যেমন, উদাহরণ দিই, “ইমেজ” শব্দের দুটি প্রতিশব্দ আছে রুশ ভাষায়। সেগুলো কাজে লাগে । প্রতিটি দেশের সিনেমাটিক শব্দের একটা করে অভিধান হলে আগ্রহের ব্যাপার হবে । আমেরিকানদের দুটো শব্দ আছে : “কাটিঙ” আর “এডিটিঙ” ( শব্দটা “এডিটরদের” কাজের সঙ্গে যুক্ত, সেই লোকগুলো কিন্তু ফরাসি ভাষায় যাদের বলা হয় “editeur’, তা নয়, এই ফরাসি শব্দটা অনেকটা “প্রযোজক” বলতে যা বোঝায়, তাই। শব্দগুলো দিয়ে একই জিনিসকে বোঝায় না, আর ওরা “মন্তাজ” বলতে যা বোঝায় তার ধারেকাছে আসে না ।
    আরতাভাজ পিলিশান : অভিধাগুলোর দরুণ কথা বলতে আমাদের অসুবিধা হয় । একই সমস্যা হয় “documentaire” ( documentary ) শব্দ নিয়ে । ফরাসি ভাষায় আপনারা যাকে বলেন “কাহিনিচিত্র”, রুশভাষায় আমরা তাকে বলি “শিল্পচিত্র” । অথচ ফরাসিতে সব ফিল্মই শৈল্পিক হতে পারে । রুশ ভাষায় আরও দুটি অভিব্যক্তি আছে, “played film” এবং “non-played film” ( গোদার শব্দদুটির প্রতিশব্দ করেছিলেন “le cinema joue” এবং “cinema non joue” -- এই সাক্ষাৎকারের পর গোদার একটা ছোটো ভিডিও তুলেছিলেন Les enfants jouent a la Russie অর্থাৎ ‘রাশিয়ায় শিশুদের খেলা’ নামে । )
    জাঁ-লুক গোদার : ও ব্যাপারটা আমেরিকানদের মতন, যারা গল্পের চিত্রায়নকে বলে “ফিচার ফিল্ম” । ফিচার মানে মুখের বৈশিষ্ট্য, বাহ্যিক গঠন, যে ব্যাপারটা ‘তারকা’দের চেহারা থেকে এসেছে । এই সমস্ত ব্যাপার বুঝতে পারার জন্য অনেক কিছু করা দরকার, যেমন ধরা যাক ফরাসি “copie standard” ( যাতে শব্দ আর ছবি একত্রিত করা হয় ), ইংরেজরা তাকে বলে “married print”, আমেরিকানরা বলে “answer print”, ইতালীয়রা বলে “copia campoione” ( first-rate copy ) -- আর তা মুসোলিনির সময় থেকে চলে আসছে। কিন্তু সবচেয়ে সিরিয়াস ব্যাপার হল documentaire/documentary-র ভুল ব্যাখ্যা । আজকাল তথ্যচিত্র ও কাহিনিচিত্রের মধ্যে পার্থক্য, তথ্যচিত্র এবং কমার্শিয়াল ফিল্মের মধ্যে পার্থক্য, এমনকি তাকে শৈল্পিক ফিল্ম বললেও, তথ্যচিত্রের একটা নৈতিক ভঙ্গী থাকে যা ফিচার ফিল্মের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয় । “নিউ ওয়েভ” সব সময় দুটিকে মিশিয়ে ফেলেছে ; আমরা বলতুম যে রাউচ অত্যন্ত চিত্তাকর্ষক তার কারণ উনি কাহিনি তৈরি করতেন তথ্যচিত্রের গুণাগুণ দিয়ে, আর রেনোয়াও তাই করতেন, কেননা উনি তথ্যচিত্র তৈরি করতেন কাহিনির গুণাগুণ দিয়ে ।
    আরতাভাজ পিলিশান : ব্যাপারটা আর পরিচালনার সমস্যা নয় । ফ্ল্যাহার্টিকে অনেক সময়ে তথ্যচিত্র নির্মাতা বলে মনে করা হয় ।
    জাঁ-লুক গোদার : ওহ, নিশ্চয়ই । উনি একজন তথ্যচিত্র নির্মাতা, যিনি সবাইকে এবং সমস্তকিছুকে পরিচালনা করেছেন । নানুক, ম্যান অফ আরান, লুইজিয়ানা স্টোরি -- প্রতিটি শট পরিচালনা করা হয়েছে অত্যন্ত সাবধানে । ওয়াইজম্যান যখন বড়ো ডিপার্টমেন্টাল স্টোরগুলোকে নিয়ে ফিল্ম তৈরি করলেন, ‘দি স্টোর’, উনি ডিপার্টমেন্ট স্টোরগুলোর নিজেদের পরিচালনা আর কাহিনিকেও গুরুত্ব দিয়েছিলেন ।
    আরতাভাজ পিলিশান : একই কারণে আমি কখনও ফিল্মস্টুডিও বা টেলিভিশন স্টুডিওর কাঠামোর ভেতরে কাজ করার প্রস্তাব দিইনি । আমি এমন জায়গা খোঁজার চেষ্টা করেছি যেখানে শান্তিতে ফিল্ম তোলা যায় । অনেক সময়ে তা টিভির জন্যেও করতে হয়েছে । সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল নিজস্ব ভাষায় কথা বলতে পারা, নিজের ফিল্মের ভাষায় । অনেক সময়ে লোকে বলে যে ফিল্ম হল অন্যান্য শিল্প আঙ্গিকের সমন্বয় । আমি তাকে সত্যি বলে বিশ্বাস করি না । আমার ধারণা, ব্যাপারটা শুরু হয়েছিল ‘টাওয়ার অফ ব্যাবেল’-এ, যেখানে আরম্ভ হয়েছিল ভাষার বিভাজন । টেকনিকাল কারণে অন্যান্য শিল্প আঙ্গিকের পর তা দেখা দিয়েছে, কিন্তু বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে তা আগে এসেছে । আমি বিশুদ্ধ সিনেমা তৈরির চেষ্টা করি, যার জন্য অন্যান্য শিল্প থেকে কিছুই নিই না । আমি একটা এমন সেটিঙ খোঁজার চেষ্টা করি যার চারিধারে আবেগের চৌম্বকীয় ক্ষেত্র গড়ে তোলা যায় ।
    জাঁ-লুক গোদার : কিছুটা নিরাশাবাদী হবার কারণে, আমি সমস্ত ব্যাপারের আরম্ভের আগেই শেষটা দেখতে পাই । আমার কাছে, সিনেমা হল শিল্পের শেষ প্রতিভাস, যে ধারণাটা পাশ্চাত্য জগতের । অসাধারণ পেইনটিঙের যুগ শেষ হয়ে গেছে, অসাধারণ উপন্যাস উধাও হয়ে গেছে। সিনেমা ছিল, আপনি যদি মানেন, ব্যাবেলের আগেকার ভাষা, যা সবাই বিষয়টায় শিক্ষা ছাড়াই বুঝতে পারতো । মোৎসার্ট রাজকুমারদের সামনে বাজাতেন, চাষারা তা শুনতো না, যখন কিনা চ্যাপলিন সকলের জন্য অভিনয় করতেন । ফিল্মনির্মাতারা এই অনুসন্ধানে বেরিয়ে পড়েছিলেন যে ফিল্মের ভিত্তির জন্য কী মৌলিক, আর এই ধরণের অনুসন্ধান, আমি আরেকবার মনে করিয়ে দিই, অনেকটা পাশ্চাত্য জগতের ব্যাপার । এটা একটা মন্তাজ । এই বিষয়ে লোকে অনেক আলোচনা করেছে, বিশেষ করে পরিবর্তনের সময়ে । বিংশ শতাব্দীতে সবচেয়ে বড়ো পরিবর্তন ছিল রুশ সাম্রাজ্যের সোভিয়েত রাষ্ট্রে রূপান্তরণ ; স্বাভাবিকভাবে, রুশরাই সেই অনুসন্ধানে সবচেয়ে বেশি প্রগতি করেছিল, তার কারণ বিপ্লবের ফলে সমাজ নিজেই আগের আর পরের মন্তাজ তৈরি করে ফেলছিল ।
    আরতাভাজ পিলিশান : ফিল্ম নির্ভর করে তিনটি ব্যাপারে : পরিসর, সময় এবং বাস্তব বিচলনে । এই তিনটি উপাদান প্রকৃতিতে বর্তমান, কিন্তু শিল্পের ক্ষেত্রে কেবলমাত্র সিনেমা তাদের পুনরাবিষ্কার করতে পারে । তাদের ধন্যবাদ যে বস্তুর গোপন ক্রিয়াকে আবিষ্কার করা সম্ভব। আমি নিশ্চিত যে ফিল্ম দর্শনের, বিজ্ঞানের, শিল্পের ভাষায় যুগপৎ কথা বলতে পারে । প্রাচীন যুগ হয়তো এই অভেদের সন্ধান করতো ।
    জাঁ-পল গোদার : এই একই ব্যাপার পাওয়া যাবে যদি আমরা অভিক্ষেপের ধারণা সম্পর্কে ভাবি, যেমন তা উদ্ভূত আর বিকশিত হয়েছিল যতক্ষণ না আমরা তা টেকনিকালি অভিক্ষেপের যন্ত্রাদির ক্ষেত্রে প্রয়োগ করেছি । গ্রিকরা প্ল্যাটোর বিখ্যাত গুহার তত্বের কথা কল্পনা করতে পেরেছিলেন । এই পাশ্চাত্য ধারণা, যা বৌদ্ধধর্ম বিশ্বাসীরা অনুমান করেননি, অ্যাজটেকরাও করেননি, খ্রিষ্টধর্মে অবয়ব পেলো, যা গড়ে উঠেছে কোনও বৃহৎ আশার বনেদের ওপরে । পরে তা গণিত বিশেষজ্ঞদের মাঝে ব্যবহারিক আঙ্গিকের বিষয় হয়ে উঠলো, যাঁরা আবিষ্কার করলেন -- আবার সেই পশ্চিমের ব্যাপার -- বর্ণনামূলক জ্যামিতি । পাসকাল এই ব্যাপারে অনেক খেটেছিলেন, সেই একই ধার্মিক, আধ্যাত্মিক অনুচিন্তন, মোচক সম্পর্কে তাঁর ধারণার ব্যাখ্যা দিয়ে । পরে আমরা পেলুম জাঁ-ভিক্টর পোন্সলেট, নেপোলিয়ানের সৈন্যবাহিনীর এক বিদ্বৎজন। তাঁকে রাশিয়ার কারাগারে বন্দী করে রাখা হয়েছিল, আর সেখানেই তিনি আকারের বৈশিষ্ট সম্পর্কে তাঁর তত্ত্বের ছক কষতে পারলেন, যা কিনা বস্তু সম্পর্কে আধুনিক তত্বের বনেদ। কারাগারে ওনার আবিষ্কার কাকতালীয় ছিল না । ওনার সামনে ছিল একটা দেয়াল, আর সব কারাবন্দীরা যা করে তিনিও তাই করছিলেন: উনি দেয়ালে অভিক্ষেপ ঘটালেন । পালাবার উগ্র ইচ্ছে । গণিতবিদ হবার দরুণ তিনি নিজেকে সমীকরণে প্রকাশ করলেন । উনিশ শতকের শেষে এলো প্রযুক্তিগত উপলব্ধির সঙ্গতি । সেই সময়ে একটা আগ্রহব্যঞ্জক ব্যাপার ছিল ফিল্মে শব্দের অনুপ্রবেশ । এডিশন প্যারিসে এসেছিলেন ডিস্কের সঙ্গে চোখে দেখা যায় এমন দর্শনীয় টেপ নিয়ে। তা এখনকার মতনই কমপ্যাক্ট ডিস্কের ব্যাপার ছিল, যা আজও কিছু স্টুডিও ব্যবহার করে, তার সঙ্গে ফিল্মের ডিজিটাল শব্দাবলীকে মেশাবার খাতিরে । আর তা একটা প্রচলিত ধারা হয়ে উঠল ! অসম্পূর্ণতা নিয়েই, অন্যান্য ছবির মতন, তা চলতে লাগল, আর টেকনিকে উন্নয়ন ঘটাতে পেরেছিল । কিন্তু লোকেরা তা চাইতো না । লোকেরা সাইলেন্ট সিনেমা পছন্দ করত ; তারা কেবল দেখতে চাইতো ।
    আরতাভাজ পিলিশান : শেষ পর্যন্ত যখন শব্দ এলো, বিশ শতকের শেষে, মহান চিত্রনির্মাতারা, যেমন গ্রিফিথ, চ্যাপলিন আর আইজেনস্টাইন, ব্যাপারটা সম্পর্কে তাঁদের ভীতি ছিল । তাঁদের মনে হয়েছিল শব্দের অনুপ্রবেশ তাঁদের এক পা পেছিয়ে নিয়ে যাচ্ছে । তাঁরা ভুল ছিলেন না, কিন্তু তাঁরা যে বিষয়ে ভাবছিলেন, তা সেই কারণে নয় ; শব্দ মন্তাজের মাঝে মাথা গলায়নি, তা ইমেজকে সরিয়ে তার জায়গায় আসতে চেয়েছিল ।
    জাঁ-লুক গোদার : ইউরোপে ফ্যাসিজমের উথ্থানের সঙ্গে টকিজের প্রযুক্তি এসেছিল, আর সেই সময়েই আবির্ভাব হয়েছিল বক্তাদের । হিটলার ছিল একজন বড়ো বক্তা, মুসোলিনিও তাই, চার্চিল, দ্য গল আর স্ট্যালিন । টকি ছিল ভাষার ওপরে থিয়েটারের দৃশ্যের বিজয়, আপনি একটু আগে যে কথা বলছিলেন, ব্যাবেলের অভিশাপের আগে ভাষা যে অবস্হায় ছিল ।
    আরতাভাজ পিলিশান : ভাষাকে পুনরুদ্ধার করার জন্য আমি যা ব্যবহার করি তাকে বলব “চিত্রকল্পের অনুপস্হিতি” । আমার মনে হয় লোকে ছবিগুলো শুনতে পায় আর আওয়াজকে দেখতে পায় । আমার ফিল্মগুলোতে ছবিগুলো আওয়াজের পাশেই সংশ্লিষ্ট হয়ে অবস্হান করে আর আওয়াজগুলো ছবির পাশে । এই পারস্পরিক বিনিময়গুলো থেকে যে ফলাফল পাওয়া যায় তা নির্বাকযুগের ফিল্মের মন্তাজ থেকে আলাদা, কিংবা বলা ভালো, যে “ফিল্মগুলো কথা বলত না” তাদের থেকে ।
    জাঁ-পল গোদার : আজকালকার দিনে ছবি আর আওয়াজ পরস্পর থেকে দূরে সরে যাচ্ছে ; লোকে টেলিভিশন সম্পর্কে বেশি ওয়াকিবহাল । একদিকে ছবি আর আরেক দিকে আওয়াজ, এবং এখন আর এই দুটির পরস্পরের সঙ্গে স্বাস্হ্যকর ও বাস্তব সম্পর্ক নেই । তারা নিছক রাজনৈতিক প্রতিবেদন হয়ে গেছে । সেই কারণেই পৃথিবীর প্রতিটি দেশে বিশ্ব-টেলিভিশন এখন রাজনীতির কবজায় । আর এখন রাজনীতি নতুন ধরণের ছবি গড়ার প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে ( তথাকথিত “হাই ডেফিনিশন” ), এমনই একটা আঙ্গিক যা বর্তমানে কেউই চায় না । এই প্রথমবার রাজনৈতিক ক্ষমতাধারীরা বলতে বাধ্য হয়েছেন : তোমরা এই জানালা দিয়ে এই ফিল্মের ছবিগুলো দেখতে পাবে । এমন ছবি, যার আঙ্গিক একতলার ছোটো জানালার মাপের, ফুটপাথের স্তরে একটা ছোটোখাটো ব্যাপার, যার আঙ্গিক চেকবইয়ের মতন ।
    আরতাভাজ পিলিশান : আমি ভেবে অবাক হই যে টেলিভিশন আমাদের কী দিয়েছে। তা দূরত্বকে নিশ্চিহ্ণ করে দিতে পারে বটে, কিন্তু কেবল সিনেমাই সময়কে পরাজিত করতে পারে, মন্তাজ টেকনিকের দরুন । সময়ের এই জীবাণু -- সিনেমা তার ভেতর দিয়ে যেতে পারে । কিন্তু টকি আসার আগে ওই পথে তা বেশ দূরে সরে গেছে । সন্দেহ নেই যে তার কারণ হল মানুষ ভাষার চেয়ে বড়ো, শব্দের চেয়ে বড়ো । আমি মানুষের ভাষার চেয়ে মানুষকে বেশি বিশ্বাস করি।
    [ ইংরেজি থেকে বাংলায় অনুবাদ : মলয় রায়চৌধুরী ]
  • মলয় রায়চৌধুরী | 162.158.158.200 | ০৭ এপ্রিল ২০২০ ১১:১০730469
  • জাঁ-লুক গোদার-এর প্রেমিকা ও প্রথম স্ত্রী আনা কারিনার সাক্ষাৎকার
    অনুবাদ : মলয় রায়চৌধুরী
    কাভে জাহেদি একজন মার্কিন চিত্র পরিচালক । তাঁর বাবা-মা ইরান থেকে আমেরিকায় চলে গিয়েছিলেন, সেখানে কাভে জাহেদির জন্ম হয় ; জাহেদির জন্মের বছরই জাঁ-লুক গোদারের ‘ব্রেথলেস’ ফিল্মটি মুক্তি পেয়েছিল । তিনি ছিলেন গোদারের ভক্ত । আনা কারিনা ( ১৯৪০ - ২০১৯ ) যখন বার্ধক্যে পৌঁছে গেছেন তখন এই সাক্ষাৎকারটি নিয়েছিলেন কাভে জাহেদি ।
    জাহেদি : আপনি কি এখনও অভিনয় করছেন ?
    কারিনা : জানো, আমি এখন বুড়ি হয়ে গেছি তো, তাই আর অভিনয়ের প্রস্তাব বেশি পাই না, কিন্তু তা থেকেও আমি যে চরিত্র পছন্দ করি তাতেই কেবল অভিনয় করি । আমি চিরকাল এই রকমই ছিলুম । আমি টাকার পেছনে বা ওই ধরনের ব্যাপারের পেছনে ছুটিনি । যদি ভালো হয়, তাহলে অভিনয় করি, এমনকি ছোটো ভূমিকাতেও । কিন্তু আমার পছন্দ না হলে, আমি বলে দিই, “হ্যালো, গুডবাই”, ব্যাস ।
    জাহেদি : আপনি কি আরও কিছু করতে চান, যতোদিন বেঁচে আছেন, মারা যাবার আগে ?
    কারিনা : মারা যাবার আগে ? দেখবো…( হাসতে থাকেন ) । তুমি বেশ মজার লোক ! না, আমি জানি না । অনেক মানুষের সঙ্গে দেখা করে আমি খুশি আর, তোমাকে বলি, লোকে হাসে। আমি লোকেদের হাসাই । বেশ ভালো ব্যাপার । বেশ ভালো সময় কাটে । আর যেখানে আমি থাকি, প্রতিবেশীদের সবাইকে আমি চিনি । আমি তিন পা হেঁটেছি কি, কেউ বলে ওঠে, “আনা, কেমন আছেন ?” বুঝলে, অনেকটা গ্রামের মতন ।
    জাহেদি : তার মানে আপনি জীবন উপভোগ করছেন ?
    কারিনা : বুঝলে, আমি চিরকালই উপভোগ করেছি । অনেকসময়ে উথ্থান-পতন তো থাকেই। কিন্তু আমি দিব্বি টিকে গেছি ।
    জাহেদি : তাহলে এখন কোন ব্যাপারটা গুরুত্বপূর্ণ, যাতে আপনি আগ্রহী ?
    কারিনা : আমি তিনটে বই লিখেছি -- দুটো বাচ্চাদের জন্য । আমি “আগলি ডাকলিঙ” আবার নতুন করে লিখেছি । তুমি জানো তো, হ্যান্স খ্রিশ্চিয়ান অ্যান্ডারসন । আমি নতুন করে লিখেছি, আধুনিক ভার্শান । তারপর আমি লিখেছি ‘দি লিটল মারমেইড’ যেটা পরের বছর প্যারিসে সঙ্গীতনাট্য হবে ।
    জাহেদি : আপনার ভারশানের ?
    কারিনা : হ্যাঁ, আমার ভারশানের ।
    জাহেদি : দারুণ । তার মানে আজকাল আপনি লেখালিখি করছেন ?
    কারিনা : আমি লিখছি, আমি গান গাইছি, আমি যা করছি, জানো তো…
    জাহেদি : আপনি যে ফিল্মগুলো পরিচালনা করেছিলেন, আমি সেগুলো খুঁজছিলুম । আমি সেগুলো কোথাও খুঁজে পাচ্ছি না ।
    কারিনা : কে জানে, জানি না । জীবন এই রকমই । হয়তো তুমি জানতে পারার আগে মারা যেতে পারো ।
    জাহেদি : ( হেসে ) : হ্যাঁ, হয়তো, আপনার তেমনই ঘটার সম্ভাবনা ।
    কারিনা : প্রথমটার নাম ছিল “একসঙ্গে থাকা”। Vivre Ensemble. আমি নিজে প্রযোজনা করেছিলুম ।
    জাহেদি : আশা করি একদিন সেটা খুঁজে পাবো ।
    কারিনা : আমিও তাই ভাবি ।
    জাহেদি : গোদার আমাকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করেছিলেন । আর আপনারা দুজনে যে ফিল্মগুলো করেছিলেন সেগুলো ওনার সবচেয়ে ভালো ফিল্ম । আর অনেক গৌ্ররবজনক । আমি চিরকাল ভেবেছি আপনার আর গোদারের সম্পর্ক নিয়ে একটা ফিল্ম করব । আমি জানি, একজন পরিচালক এখন গোদার আর অ্যানে উইয়াজেমস্কির সম্পর্ক নিয়ে একটা ফিল্ম করছেন, ঠিক কি না ?
    কারিনা : ওহ, আমি সে ব্যাপারে জানি না তো ।
    জাহেদি : হ্যাঁ, যে ভদ্রলোক ‘দি আর্টিস্ট’ তৈরি করেছিলেন ।
    কারিনা : আচ্ছা ?
    জাহেদি : হ্যাঁ, উনি একটা ফিল্ম করছেন, আর আমার মনে হয় লুই গারেল তাতে গোদারের ভূমিকায় অভিনয় করছেন ।
    কারিনা : লুই গারেল গোদারের ভূমিকায় অভিনয় করছেন ? উনি তো আমার বন্ধু ! আমি জানতুম না !
    জাহেদি : দু দিন আগে অ্যানাউন্স করা হয়েছে ।
    কারিনা : দুদিন আগে ? আমি তো এখানে দশ দিনের বেশি রয়েছি । দারুণ খবর ।
    জাহেদি : অ্যানে উইয়াজেমস্কি একটা বই লিখেছিলেন ।
    কারিনা : হ্যাঁ, আমি সেটা পড়েছি ।
    জাহেদি : ফিল্মটা সেই বই থেকেই তৈরি হবে । কিন্তু, আমি বলতে চাই, গোদারের সঙ্গে আপনার সম্পর্ক ফিল্মের ইতিহাসে তো আরও গুরুত্বপূর্ণ ।
    কারিনা : সেটা...আমি অবাক । আমি সত্যই বিস্মিত । ওরা ওই বইটা থেকে ফিল্ম তৈরি করছে?
    জাহেদি : হ্যাঁ ।
    কারিনা : হ্যাঁ, বইটার নাম…
    জাহেদি : উন অন আপরেস ( এক বছর পরে )।
    কারিনা : হ্যাঁ ।
    জাহেদি : গোদারের সঙ্গে আপনার সম্পর্ক নিয়ে কেউ ফিল্ম তৈরি করতে চাইলে আপনি কি রাজি হবেন ?
    কারিনা : ওহ, না । আমি তা চাইব না ।
    জাহেদি : কেন ?
    কারিনা : কেননা, তুমি জানো, ব্যাপারটা ব্যক্তিগত ।
    জাহেদি : আপনাদের সম্পর্ক নিয়ে স্মৃতিকথা বা তেমন কিছু লিখতে চান না ?
    কারিনা : মানে, সেটা আলাদা ব্যাপার । তুমি তো ফিল্মের কথা বলছ, নয়কি ?
    জাহেদি : হ্যাঁ । আপনি যদি স্মৃতিকথা লেখেন তাহলে শেষ পর্যন্ত কেউ না কেউ একটা ফিল্ম করবেই ।
    কারিনা : মানে, আমি মারা গেলে হয়তো ঠিকই হবে । আমি ভাবছি ব্যাপারটা বেশ মজার, কেননা বইটা, আমি জানি না, ওটা বিচ্ছিরি, নয়কি ?
    জাহেদি : ওহহো । আপনি ওই মহিলাকে চিনতেন ?
    কারিনা : হ্যাঁ, ও তো এখন লেখিকা । ও আর অভিনেত্রী নয় । অ্যানে উইয়াজেমস্কির সঙ্গে জাঁ-লুক গোদারের বিয়ে হয়েছিল, আমার পরে ।
    জাহেদি : আপনাদের দুজনকে ছাড়া আর কারোর সাথে ওনার বিয়ে হয়েছিল কি ?
    কারিনা : না । ও আমাকে বিয়ে করেছিল তারপর সোজা গিয়ে বিয়ে করল অ্যানেকে।
    জাহেদি : আপনাদের বিচ্ছেদের পর ?
    কারিনা : সবায়ের নামই অ্যানে । বেশ মজার ব্যাপার ।
    জাহেদি : আর অ্যানে-মারি মেলভিল, ঠিক বলছি তো ?
    কারিনা : হ্যাঁ, সেই মেয়েটার নামও অ্যানে । আর প্রথমজন যাকে ও জানতো তার নাম ছিল অ্যানে কোলেত ।
    জাহেদি : তাই নাকি ? আপনাকে দেখার আগে যে মেয়েটির সঙ্গে ওনার সম্পর্ক ছিল তার নামও অ্যানে ?
    কারিনা : হ্যাঁ ।
    জাহেদি : ওহ, মজার ব্যাপার । আপনাদের এখনও নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা হয় ?
    কারিনা : ও কারোর সঙ্গেই কথা বলে না ।
    জাহেদি : হয়তো উনি বিরক্ত কিংবা হয়তো উনি…
    কারিনা : না, ও চায় না, আমার ধারণা । কে জানে, ঠিক জানি না । আমি কীই বা জানি ? আমি তো আর ওর মাথার ভেতরে থাকি না ।
    জাহেদি : শেষ কবে ওনার সঙ্গে দেখা হয়েছিল ?
    কারিনা : অনেক, অনেক কাল আগে । কিন্তু এক সময়ে ও একজনকে বলেছিল, “আনা কারিনার সঙ্গে যোগাযোগ করো, কারণ আমার সম্পর্কে ওই সবচেয়ে ভালো জানে ।”
    জাহেদি : সে কথা সত্যি, তাই না ?
    কারিনা : মানে, ওর সম্পর্কে কোনো খারাপ কিছু বলার নেই আমার ।
    জাহেদি : ওনার মধ্যে কী এমন দেখে আপনি প্রেমে পড়েছিলেন ?
    কারিনা : জানো তো, আমি তখন আঠারো বছর বয়সী, বা তার কাছাকাছি ।
    জাহেদি : ১৯৫৯ ?
    কারিনা : হ্যাঁ, ঠিক বলেছ ।
    জাহেদি : “ব্রেথলেস”-এর সময়ে ?”
    কারিনা : হ্যাঁ । ও আমাকে একটা ছোটো ভূমিকায় অভিনয় করতে বলেছিল কিন্তু আমি তা করিনি কেননা আমার পোশাক খুলে ফেলতে হতো ।
    জাহেদি : উনি আপনার চেয়ে দশ বছরের বড়ো ছিলেন ?
    কারিনা : দশ বছর পুরো ।
    জাহেদি : উনি ছিলেন ২৮ বছরের আর আপনি ১৮, ঠিক তো ?
    কারিনা : হ্যাঁ, সেই সময়ে বয়সের ক্ষেত্রে সেটাকে অনেক বেশি তফাত মনে করা হতো।
    জাহেদি : এখনও অনেক তফাত মনে করা হয় ।
    কারিনা : ততোটা নয় আজকাল । সবকিছু পালটে গেছে । কিন্তু সেই সময়ে, তুমি যদি একজন নারী হতে, তোমার কোনও কন্ঠস্বর থাকতো না । তুমি যদি নারী হতে, তাহলে ব্যাপারটা স্রেফ : “সুন্দরী হও আর মুখ বুজে থাকো।”
    জাহেদি : কিন্তু আপনারা প্রেমে পড়লেন Le Petit Soldat ( ছোটো সৈনিক ) করার সময়ে, তাই তো ? গোদারের কোন ব্যাপার আপনাকে প্রেমে পড়তে বাধ্য করেছিল ?
    কারিনা : ও অত্যন্ত চিত্তহারী ছিল, আর আমি ওর প্রতি আকর্ষিত হই । আমি কখনও টের পাইনি । ব্যাপারটা এমন যে তুমি সামলাতে পারছ না । আমি অনেকটা, কী বলব, তুমি কী বলো ব্যাপারটাকে ?
    জাহেদি : চৌম্বকত্ব ?
    কারিনা : মানে, আর কোনো কিছু না ভেবেই । ও আমাকে একট ছোটো প্রেমপত্রে লিখেছিল, “আমি তোমাকে ভালোবাসি, মাঝরাতে কাফে দ্য লা পাইতে দেখা করো”-- এমন ছিল যে আমি তাছাড়া আর কিছু করতে পারতুম না । আমি তার কারণ ব্যাখ্যা করতে পারব না ।
    জাহেদি : আর আপনার সেসময়ে একজন বয়ফ্রেণ্ড ছিল, তাই না ?
    কারিনা : হ্যাঁ, ওর খুব খারাপ লেগেছিল ।
    জাহেদি : তার মানে গোদার আপনাকে ওই চিঠি লেখার আগেই আপনি ওনার প্রেমে পড়েছিলেন?
    করিনা : হ্যাঁ, কারণ আমরা তিন মাস ধরে শুটিঙ করছিলুম । সেটা ছিল দীর্ঘ ফিল্ম কেননা আমরা সাধারণত তিন সপ্তাহে শুটিঙ শেষ করে ফেলতুম ।
    জাহেদি : ঠিক, ওনার জন্য সময়টা দীর্ঘ্য ।
    কারিনা : ঠিক, বেশ দীর্ঘ্য । আর আমরা শুটিঙ থামিয়ে দিলুম, আর দুজনে দুজনের দিকে অনেকক্ষণ চেয়ে থাকতুম । ব্যাপারটা ছিল একটু একটু করে পরস্পরের দিকে টান । ব্যাখ্যা করা কঠিন । অনেক সময়ে ব্যাপারটা এরকমই ( দুই হাতে তালি বাজান কারিনা ) বুঝলে ? কিন্তু তা ছিল অত্যন্ত ধীর, একটু একটু করে, প্রেমে পড়া একটু একটু করে, ওর প্রতি আকর্ষিত হওয়া, কাছাকাছি হওয়া । জানি না কেমন করে সেটা বোঝাবো । বোধহয় আমার কাছে উপযুক্ত শব্দ নেই । কিন্তু, হ্যাঁ, আমি সেখানে গেলুম, কাজের পর, মাঝরাতে কাফে দ্য লা পাইতে । ও সেখানে বসে একটা কাগজ পড়ছিল, আর আমি ওর সামনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিলুম। আর আমার মনে হচ্ছিল তা ঘণ্টার পর ঘণ্টা । যদিও তা হয়তো তিন মিনিট বা দুই মিনিট ছিল। আর ও হঠাৎ বলে উঠল, “ওহ এসে গেছো তুমি । চলো যাওয়া যাক।”
    জাহেদি : তারপর কোথায় গেলেন আপনারা ?
    কারিনা : আমরা ওর হোটেলে গেলুম । পরের দিন সকালে, আমার ঘুম ভাঙেনি, আর ও আমার আগেই বেরিয়ে গেল আর ফিরল একটা সুন্দর ধবধবে ড্রেস নিয়ে । আমি সেটা Le Petit Soldat-এ পরেছিলুম । শুধু আমার জন্য । বিয়ের পোশাকের মতন, বুঝলে ?
    জাহেদি : তার মানে আপনারা দুজনে এক সঙ্গে রাত কাটালেন আর সকাল বেলায় যখন আপনার ঘুম ভাঙল আপনার জন্য একটা ড্রেস কিনে এনে উনি হাজির হলেন ?
    কারিনা : হ্যাঁ । তুমি যদি ফিল্মটা আবার দ্যাখো, শাদা ফুলের নকশাকাটা ড্রেসটা তোমার মনে পড়বে ।
    জাহেদি : আর উনি সকালবেলায় কিনে আনলেন, আপনারা দুজনে একসঙ্গে রাত কাটাবার পর?
    কারিনা : মানে, যখন আমার ঘুম ভাঙলো, তখন ও ছিল না ।
    জাহেদি : হতে পারে উনি আগেই কিনে রেখেছিলেন ?
    কারিনা : না, আমার মনে হয় ও কিনতে গিয়েছিল । রাতের আগে সেটা ঘরে ছিল না ।
    জাহেদি : ওই ফিল্মটা অপরূপ, কেননা আপনাকে ওনার ভালোবাসা প্রতিটি শটে দেখতে পাওয়া যায়, যেমনভাবে উনি আপনাকে ফিল্মে উপস্হাপন করেছেন । ওটা যেন কেউ একজন প্রেমে পড়ছে আর দর্শক তা ঘটতে দেখছেন । ওটা একটা গুরুত্বপূর্ণ নথি ।
    কারিনা : আমরা প্রেমে পড়ছিলুম । কিন্তু জানো, আমি রাশেসগুলো কখনও দেখিনি । সেই সময়ে আমি জানতুম না তুমি যে বিষয়ে কথা বলছ । কিন্তু ফিল্মে হয়তো, এখন মনে হয়, হ্যাঁ, তাই।
    জাহেদি : আমি বলতে চাইছি, দেখলে স্পষ্ট বোঝা যায় ।
    কারিনা : নিশ্চয়ই, আমার স্মৃতিতে রয়ে গেছে ।
    জাহেদি : ঠিক আছে, La Petit Soldat-এর পর আপনার যুগল হয়ে উঠলেন, তাই তো ? আপনার বয়ফ্রেণ্ডের সঙ্গে সম্পর্ক ভেঙে গেল ?
    কারিনা : হ্যাঁ, আর তারপর আমার কোনও বন্ধু হয়নি ।
    জাহেদি : কোনও বন্ধু নয় ?
    কারিনা : না, কোনও বন্ধু নয় । কেননা আমি জাঁ-লুক গোদারের কাছে গিয়েছিলুম, তাই আমার কোনও বন্ধু জোটেনি ।
    জাহেদি : তার মানে আপনি একরকমভাবে একঘরে হয়ে গিয়েছিলেন ?
    কারিনা : হ্যাঁ । আমরা যখন ওর গাড়ি করে প্যারিসে ফিরলুম, ও বলল, “তোমাকে কোথায় ছেড়ে দেবো ?” আর আমি বললুম, “তুমি আমাকে ছেড়ে দিতে পারো না, কেননা আমার আর কেউ নেই । আমার শুধু তুমি আছ ।”
    জাহেদি : তার কারণ আপনাকে আগের জীবন সম্পূর্ণ ছেড়ে আসতে হয়েছিল ?
    কারিনা : হ্যাঁ, ঠিক তাই । আর তারপর ও বলল ঠিক আছে ।
    জাহেদি : তখন আপনি ওনার সঙ্গে থাকা আরম্ভ করলেন ?
    কারিনা : হ্যাঁ, হ্যাঁ, শঁজে লিজের কাছে রু শাতুব্রিয়াঁয় ইতালিয়া নামে একটা হোটেলে ।
    জাহেদি : আর তারপর ?
    কারিনা : আমরা সেখানে থাকা আরম্ভ করলুম, আর মাঝে মাঝে এসে ও বলত, “তুমি কি কাটিঙ রুমে যেতে চাও ?” বুঝলে, উনি ফিল্মটার কাটিঙ করছিলেন । আমি বলতুম যে হ্যাঁ । তারপর একদিন ও এসে বললে, “আমাদের জন্য তোমাকে একটা ফ্ল্যাট খুঁজতে হবে।” তাই আমাদের জন্য লা ম্যাদেলিয়েঁর পেছনে একটা ফ্ল্যাট ভাড়া নিলুম । আমরা কিছুদিন সেখানে ছিলুম আর তারপর Le Petit Soldat ফ্রান্সে ব্যান হয়ে গেল, তুমি তো জানো, আর মনে হল যেন আমি এতোদিন কিছুই করিনি । কিন্তু তারপর আমি মিশেল দেভিলের কা্ছ থেকে আরেকটা ফিল্মের প্রস্তাব পেলুম । ( ১৯৬৩ সালে ব্যান তুলে নেয়া হয়েছিল ) ।
    জাহেদি : ওহ, হ্যাঁ, মিশেল দেভিলে, হ্যাঁ, বেশ বড়ো চিত্রনির্মাতা । কিন্তু আমার একটা প্রশ্ন করার ছিল, আমাদের হাতে আর বেশি সময় নেই । ( হাতঘড়ি দ্যাখে )। আমাদের আর সময় নেই।
    কারিনা : তুমি যতক্ষণ ইচ্ছে সময় নিতে পারো ।
    জাহেদি : আমার তিনবার বিয়ে হয়েছে, আর আমি যখন ভাবি কোন কারণে বিয়ে ভেঙে গেল, আমি বলতে পারি আমাদের বিয়ে ভেঙে গেছে এই কারণে বা ওই কারণে । আপনিও তো কয়েকবার বিয়ে করেছেন, তাই না ?
    কারিনা : হ্যাঁ । ( গোদারকে ডিভোর্সের পর তিনবার বিয়ে করেছিলেন )
    জাহেদি : আপনি যখন গোদারের সঙ্গে সম্পর্ক ভেঙে যাবার কথা ভাবেন, তার প্রধান কারণ কী বলবেন ?
    কারিনা : ওহ, আমি যে-কোনো একজনকে চাইছিলুম, বুঝলে, নিছক একজন বন্ধু । আমি ভেবেছিলুম আমার জীবন চিরকালের জন্য বরবাদ হয়ে গেছে, আমার প্রেমের জীবন । তাই আমি একজন বন্ধুর মতন মানুষকে বিয়ে করলুম ।
    জাহেদি : আপনি কি এখন গোদারের বিষয়ে বলছেন না অন্য কোনো লোকের সম্বন্ধে ?
    কারিনা : না, জাঁ-লুকের পরে । যখন জাঁ-লুককে বিয়ে করি তখন অপ্রাপ্তবয়স্ক ছিলুম, জানো তো?
    জাহেদি : তার মানে A Woman is a Woman ফিল্ম করার সময়ে আপনার কুড়ি বছর বয়স ছিল ?
    কারিনা : হ্যাঁ ।
    জাহেদি : ওই ফিল্মটা খুব সুন্দর । কিন্তু আমার প্রশ্ন হল : আপনারা দুজনে আলাদা হলেন কেন ? সম্পর্কটা বেশ ঝামেলার আর কঠিন ছিল । প্রধান কারণ নিয়ে আপনি কী বলবেন ?
    কারিনা : বড়ো, বড়ই দুর্বহ ।
    জাহেদি : উনিই দুর্বহ ছিলেন নাকি…
    কারিনা : ওর ওজন অনেক ছিল ( হাসেন ) । বড্ডো দুর্বহ ছিল, সমস্ত পরিস্হিতিতে । ও ছিল বড়োই...বড়োই একপেশে চিন্তার মানুষ ।
    জাহেদি : ব্যাপার তো কোনো একরকমভাবে হতে হবে ? উনি কি সমস্ত ব্যাপারে অনড় থাকতেন? পজেসিভ ?
    কারিনা : না, ও অনেকসময়ে চলে যেত আর ফিরত না ।
    জাহেদি : আর তা আপনাকে ক্ষুব্ধ করত ? মানে, আমি বলতে চাইছি, তা আমাকেই ক্ষুব্ধ করে তুলবে ।
    কারিনা : হ্যাঁ, বলতে চাই, কোনো টেলিফোন ছিল না । এখনকার মতো ছিল না ।
    জাহেদি : ( হাসে ) ঠিক, যেমন, “তুমি এখন কোথায় ?”
    কারিনা : ব্যাপারটা সত্যিই সমস্যাজনক ছিল, আর আমি তখন একেবারে একা, বুঝেছ, আর তা সত্যিই মাথা খারাপ করে দেবার মতন ছিল । ও উধাও হয়ে যেত আর বলত, “আমি সিগারেট কিনতে যাচ্ছি”, আর ফিরত তিন সপ্তাহ পর ।
    জাহেদি : আর কোথায় যেতেন উনি ?
    কারিনা : ও বেশ জটিল । ওহ, ও আমেরিকায় চলে গেল ফকনারের সঙ্গে দেখা করতে ।
    জাহেদি : উইলিয়াম ফকনার ?
    কারিনা : হ্যাঁ, কিংবা ও চলে যেত সুইডেনে ইঙ্গমার বার্গম্যানের সঙ্গে দেখা করতে । ও চলে যেত ইতালিতে রোবের্তো রোসেলিনির সঙ্গে দেখা করতে । বুঝলে, চলে যেত এখানে সেখানে ।
    জাহেদি : তো উনি ফকনারের সঙ্গে দেখা করলেন ?
    কারিনা : আর কেমন করে আমি তা জানতে পারতুম জানো ? ও উপহার নিয়ে ফিরত ( হাসলেন ) আর আমি দেখতুম মোড়কটা ইতালীয় নাকি সুইডিশ বা যাহোক ।
    জাহেদি : তাহলে আপনারা একসঙ্গে কতোকাল দুজনে সুখি ছিলেন বলে মনে হয় ?
    কারিনা : আমরা যখন শুটিঙ করতুম তখন আমরা বেশ সুখি থাকতুম, সব সময়ে ।
    জাহেদি : আর তারপর যখন শুটিঙ বন্ধ হল, তখন আপনার আবার খারাপ লাগতো ?

    কারিনা : হ্যাঁ, জানো, তারপর ও চলে যেত । ও হয়তো বলত, “আমি তোমাকে দক্ষিণ ফ্রান্সে নিয়ে যেতে চাই।” আমি বলতুম, “দারুণ হবে”। আর আমরা গাড়ি চালিয়ে দক্ষিণ ফ্রান্সে গিয়ে কিছুটা হাঁফ ছেড়ে বাঁচতুম । আর আমরা দুশো কিলোমিটার গাড়ি চালিয়ে যেতুম, আর ও বলতেন, “ওহ আমি দক্ষিণ ফ্রান্সে যেতে চাই না ।”
    জাহেদি : উনি মত বদলে ফেলতেন ?
    কারিনা : আমি বলতুম, “কী বলতে চাইছ তুমি ? মানে, তুমি বললে আমরা সেখানে আনন্দ করতে যাবো।” আর আমি ওকে ভালোবাসতুম। আর ও বলত, “আমাকে ফিরে যেতে হবে ফ্রাঁসোয়া ত্রুফোর সঙ্গে কথা বলার জন্য।”
    জাহেদি : আপনার সঙ্গে ত্রুফোর বন্ধুত্ব ছিল ?
    কারিনা : হ্যাঁ, গভীর ।
    জাহেদি : আপনি ওনাকে পছন্দ করতেন ?
    কারিনা : হ্যাঁ, অনেক ।
    জাহেদি : ওনাকে মনে হয় ভালো লোকদের মধ্যে একজন ।
    কারিনা : হ্যাঁ । তারপর বলল, “আর জাক রিভেত । আমাকে ওদের সঙ্গে কথা বলতে হবে কারন ওদের কয়েকটা কথা বলব, আমাকে কাজ করতে হবে ।” তাই আমি বললুম, “ঠিক আছে, তাহলে ফেরা যাক ।” তাই আমরা প্যারিসে ফেরার জন্য রওনা দিলুম । তারপর ও বলল, “তোমাকে বেশ মন খারাপ দেখাচ্ছে…।” আমি বললুম, “না তো, আমি একটু হতাশ হয়েছি, তুমি তো জানো, তুমিই বললে, আমরা দক্ষিণ ফ্রান্সে যাবো । আমি তো তোমার কাছ থেকে কিছুই চাইনি -- তুমিই আমাকে বললে দক্ষিণ ফ্রান্সে যেতে।” ও তখন বলল, “আসলে, তুমি যদি তেমন অনুভব করো, তাহলে আমরা এক্ষুনি দক্ষিণ ফ্রান্সে যাবো।” তাই আমরা আবার পেছন ফিরলুম, আর ব্যাপারটা চলতেই থাকল, চব্বিশ ঘণ্টা ধরে, কেননা তখনকার দিনে ফ্রিওয়ে ছিল না, জানো তো, কোনো হাই ওয়ে ছিল না, কোনো ফ্রিওয়ে ছিল না । আর তারপর হঠাৎই, ও বলল, “আমরা প্যারিসে ফিরে যাচ্ছি ।” আর তারপর ও আমাকে বলল, “তোমাকে এখন বেশ ক্রুদ্ধ দেখাচ্ছে।” আমি বললুম, “হ্যাঁ।” আর তাই বললুম, “গাড়িটা থামাও,” আর আমি গাড়ি থেকে নেমে পড়লুম। রাস্তায় চব্বিশ ঘণ্টা কাটিয়ে আমি ভীষণ চটে গিয়েছিলুম, বুঝলে তো ? আমরা পেছিয়ে আসছিলুম আর ফিরে এগিয়ে যাচ্ছিলুম দক্ষিণ ফ্রান্সের দিকে। আমি চললুম, “আমি দক্ষিণ ফ্রান্সে যাবার প্রস্তাবে হেগে দিই।” আর গাড়িতে আঘাত করতে আরম্ভ করলুম।
    জাহেদি : আপনার ব্যাগ দিয়ে ?
    কারিনা : না, পা দিয়ে ।
    জাহেদি: ওহ, লাথি মেরে ?
    কারিনা : হ্যাঁ, লাথি মেরে, গাড়িটাকে । ও বলল, “তুমি হিস্টিরিয়াগ্রস্ত হয়ে পড়েছ।” আর জবাবে আমি বললুম, “হ্যাঁ, তুমি আমাকে মোটর চালিয়ে-চালিয়ে মাথা খারাপ করে দিয়েছ।” আর আমরা সত্যিই লা কোতের দাজুরে গেলুম না । আমরা পরের সকালে ওর বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করতে গেলুম ।
    জাহেদি : শুনে মনে হচ্ছে বিয়ে করার পক্ষে উনি একজন জটিল মানুষ ।
    কারিনা : হ্যাঁ । ও তাইই...বলা যেতে পারে অন্য কারোর সঙ্গে থাকার মতো মানুষ ও নয়।
    জাহেদি : ঠিক ।
    কারিনা : ঠিক ।
    জাহেদি : তাহলে Le Petit Soldat করার সময়ে সব কিছু ভালো কেটেছিল । আপনারা প্রেম করছিলেন । Une Femme Est Une Femme শুটিঙ করার সময়ে আপনারা দুজনে মানিয়ে চলছিলেন, তারপর একটা ঘটনা ঘটল, রাগারাগি হল । আপনি পোয়াতি হলেন, আর আপনার গর্ভপাত হয়েছিল, ঠিক তো ?
    কারিনা : হ্যাঁ। ফিল্মটা করার সময়ে আমি পোয়াতি হয়ে গিয়েছিলুম ।
    জাহেদি : Une Femme Est Une Femme করার সময়ে ?
    কারিনা : হ্যাঁ ।
    জাহেদি : তার কারণ ফিল্মটা ছিল সন্তান পাবার আশা নিয়ে ।
    কারিনা : আমার মনে হয় আমার আরজেনটিনা যাওয়া একেবারে উচিত ছিল না...কেননা তার আগে আমি মিশেল দেভিলের ফিল্ম Tonight or Never করেছিলুম । তারপর আমরা গেলুম মার দ্য প্লাতা ফিল্ম ফেসটিভালে । আমার অতো দীর্ঘ্য যাত্রা করা একেবারে ঠিক হয়নি ।
    জাহেদি : আর আপনি এই সারাটা সময় পোয়াতি ছিলেন ?
    কারিনা : হ্যাঁ । আমি ছিপছিপে ছিলুম বলে বোঝা যেতো না । আর আমার মনে হয় আমার যাওয়া উচিত ছিল না, কেননা যখন ফিরলুম তখন আমি অসুখে পড়লুম ।
    জাহেদি : আপনি সন্তান হারালেন ?
    কারিনা : হ্যাঁ, বেশ কয়েক মাস পরে । আমি শয্যাশায়ী ছিলুম । তখন ওরা কিছুই টের পায়নি।
    জাহেদি : কতো মাসের পোয়াতি ?
    কারিনা : প্রায় সাড়ে ছয় মাসের । আমি সত্যিই ভয়ানক অসুস্হ ছিলুম । আমি তখন অসুখে, আর তারপর আমার মেজাজ খারাপ হয়ে গেল কারণ আমাকে শল্য চিকিৎসা করাতে হল আর আমি আত্মহত্যা করতে চাইলুম আর সেইসব ব্যাপার । তারপর আমরা করলুম Bande a part.
    জাহেদি : ঠিক তার পরেই ?
    কারিনা : ঠিক তার পরেই নয় । তার মাঝে আরও ফিল্ম করেছিলুম ।
    জাহেদি : গোদারের পরবর্তী ফিল্ম ?
    কারিনা : হ্যাঁ, আমি সব সময়েই অসুস্হ থাকতুম ।
    জাহেদি : পোয়াতি হওয়া কি পরিকল্পনা করে করা হয়েছিল? আপনি সন্তান চাইছিলেন ?
    কারিনা : হ্যাঁ ! নিঃসন্দেহে !
    জাহেদি : আপনি সন্তান পাবার চেষ্টা করছিলেন ?
    কারিনা : না, আমরা সন্তান পাবার চেষ্টা করিনি, এমনিই এসে গিয়েছিল ।
    জাহেদি : আর তারপর, তা ছিল একরকম শেষের শুরু ?
    কারিনা : মানে, যেহেতু ও তখনও ছিল, বুঝলে, আর তারপর পরের দিকে ও হাসপাতালে আসত আর আবার চলে যেত । ব্যাপারটা বেশ জটিল ছিল । হ্যাঁ, বুঝলে, তখন আমাদের কথা বলার মতন বিশেষ কিছু ছিল না, মানে মহিলাদের ।
    জাহেদি : আপনি তা ফিল্মেও দেখতে পাবেন ।
    কারিনা : আমাদের কোনো অধিকার ছিল না । তাই, বুঝলে, বেঁচে থাকার জন্য টাকাকড়ির প্রয়োজন হলে, বেশ কঠিন, বুঝলে, তোমার কাজ ছিল স্রেফ বসে থাকা আর শোনা আর সুন্দরী সেজে থাকা কেননা, সেটা বাদ দিলে, আর কোনো কিছু করার ছিল না ।
    জাহেদি : হ্যাঁ, ব্যাপারটা একরকম মারাত্মক ।
    কারিনা : “Sois belle et tais-toi.” এইটাই হল সারকথা । “সুন্দরী সেজে থাকো আর মুখ বন্ধ রাখো।”
    জাহেদি : ওটা তো ফিল্মের টাইটেল, তাই না ?
    কারিনা : হ্যাঁ ! ওই নামে একটা ফিল্ম আছে !
    [ ফিল্মমেকার পত্রিকায় প্রকাশিত । ২০১৬ সালের ৯ মে নেয়া সাক্ষাৎকার ]
    ইংরেজি থেকে অনুবাদ করেছেন মলয় রায়চৌধুরী
  • মলয় রায়চৌধুরী | 162.158.158.200 | ০৭ এপ্রিল ২০২০ ১১:১২730470
  • অ্যান উইয়াজেমস্কির মৃত্যু: তাঁর শেষ সাক্ষাৎকার নিয়েছেন কারেল ফিতোসি
    অনুবাদ : মলয় রায়চৌধুরী
    অ্যান উইয়াজেমস্কি ছিলেন যাদু-সঙ্গি জাঁ-লুক গোদারের সহযোদ্ধা এবং সর্বোপরি "লা চিনয়েস" এর অবিস্মরণীয় নায়িকা। তিনি সত্তর বছর বয়সে মারা যান। ‘রিডাউটেবল’ ফিল্মটির’ মুক্তি উপলক্ষে প্যারিস ম্যাচ-এর প্রতিনিধি কারেল ফিতোসি অ্যানে উইয়াজেম্সকি ও ফিল্মের অভিনেতা, যিনি গোদারের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন, লুই গ্যারেলের সঙ্গে দেখা করে সাক্ষাৎকারটি নিয়েছিলেন ।
    অ্যানে উইয়াজেম্সকি অল্প বয়সী যুবতী হিসাবে পরিচালকদের মধ্যে সবচেয়ে বিপ্লবী জাঁ-লুক গোদারের সহচরী ছিলেন এবং তাঁদের জীবনের সেরা বছরগুলি দুটি বইয়ে ("উনে এনার্জি স্টুডিওজ" এবং "আন আন এপ্রিস") নথিবদ্ধ করেছেন । গোদারের সঙ্গে কাটানো জীবন নিয়ে তাঁর “আন এন এপ্রিস” থেকে মিশেল অ্যাজানাভিশ্যু তৈরি করেছেন একটি কমেডি-প্যাশটিশ , "দ্য রিডাউটেবল"। লুই গ্যারেল সিনেমার সংস্কৃতিতে বেড়ে ওঠেন, তাঁর বাবা ফিলিপে নিউ ওয়েভ-এর সরাসরি উত্তরাধিকারী, যাঁকে গোদার এক সময়ে তাঁর উত্তরসূরি বলে অভিহিত করেছিলেন। আজ, চৌত্রিশ বছর বয়সী , লুই গারেল প্রতিভার সাথে অ্যান উইয়াজেমস্কির প্রাক্তন স্বামী গোদারের চরিত্রে অভিনয় করেছেন। অভিনেতা এবং লেখক অ্যানে বাইরে সেন্ট জার্মেইন-ডেস-পেরসের একটি বারে দেখা করেছিলেন। সেখানেই নেয়া হয়েছিল তাঁর শেষ সাক্ষাত্কার।
    কারেল ফিতোসি : "লে রিডাউটেবল" চলচ্চিত্রটির প্রকল্প আপনাকে একত্রিত করার আগে আপনি কি একে অপরকে জানতেন?
    লুই গারেল: আমার বাবা ফিলিপ , "সিক্রেট চাইল্ড" এর দুটি ছবিতে চিত্রগ্রহণ করার পর থেকে অ্যানে আমাকে শিশু হিসাবে দেখেছিলেন, তারপরে ১৯৮৩ সালে তিনি এতদিন সূর্যের আলোয় কাটিয়েছিলেন ...
    অ্যানে উইয়াজেমস্কি : আপনি ওই ফিল্ম করার সময়ে জন্মেছিলেন, তাই আমরা আপনার মা ব্রিজিটকে আর আপনাকে দেখতে হাসপাতালে গিয়েছিলুম।
    লুই গারেল : আর আমরা এই বছর কানেতে ছবিটির স্ক্রিনিংয়ের সময় একে অপরকে আবার দেখছি।
    কারেল ফিতোসি : অ্যানে, আপনি কেন কাহিনিটিকে ফিল্মের জন্য মানিয়ে নিতে মিশেল অ্যাজেনাভিশ্যুর সাথে একমত হয়েছিলেন?
    অ্যানে উইয়াজেম্সকি : কারণ আমি তাঁর ফিল্মগুলো পছন্দ করি আর তাছাড়া আমি এই ধারণায় বিশ্বাস করি যে উনি সেগুলো নিয়ে একটা কৌতুক-নকশা ফিল্ম তৈরি করবেন। লুই গারেলের নির্বাচন তাৎক্ষণিকভাবে আমার কাছে গ্রহণযোগ্য বলে মনে হয়েছিল।
    লুই গারেল : আমার প্রথমে প্রকল্পটা দুর্বোধ্য মনে হয়েছিল। কারণ গোদারের পবিত্র ব্যক্তিত্বকে স্পর্শ করা বেশ নিষিদ্ধ মনে হয়েছিল। মিশেল অ্যাজানাভিশ্যুস ওই জগত থেকে এসেছেন বলে মনে হয় না, তাঁর ফিল্মগুলো সাধারণ মানুষের কাছে আরও খোলামেলা। আমি নিজেকে বুঝিয়েছিলুম যে এ সম্পর্কে কথা বলার জন্য তিনি প্রয়োজনীয় দূরত্ব রেখে ফিল্ম করতে পারবেন।
    কারেল ফিতোসি : ফিল্মে মিশেল অ্যাজানাভিশ্যুর নিজের জীবন এবং ক্যারিয়ার নিয়ে কিছু কথা রয়েছে ...
    লুই গারেল : তা নিঃসন্দেহে আছে । গোদার অস্ত্রের মতো চলচ্চিত্র বানাতে চেয়েছিলেন এবং ওনার ফিল্মগুলো একটি আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল, কারণ দর্শকরা তাঁকে বোঝেনি। মিশেল ততটা চরম ছিল না, তবে তিনিও তাঁর প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং ভুল বোঝাবুঝি-সম্পর্কিত চলচ্চিত্র "দ্য সার্চ" দিয়ে তৈরি করেছিলেন যা কানে প্রদর্শিত হবার সময়ে দর্শকরা শিস দিয়েছিল। যখন তিনি অ্যানের বইটি পড়েছিলেন তখন তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে এরকম সম্বন্ধ তার আগে অন্য কারোর সাথেও ঘটেছিল।
    অ্যানে উইয়াজেম্সকি : ১৯৬৮ সালে, জাঁ-লুক ইচ্ছাকৃতভাবে অন্য একটি ফিল্ম চালু করতে চেয়েছিল। ওর এই আকাঙ্ক্ষা প্রবল ছিল, তবে ওর চারপাশের লোকেরা, আমাদের মধ্যে, তাঁর পদ্ধতির বিষয়টি বুঝতে পারে নি। আমিও পারিনি।
    লুই গারেল : আপনি কি তাঁর সাথে "লা চিনয়েস" ফিল্ম তোলাটা উপভোগ করেছেন?
    অ্যানে উইয়াজেম্সকি : ফিল্মটা খুব ভাল ছিল এবং একই সাথে আমিও সেই সময়ে জটিল চরিত্রের ছিলুম, কারণ আমি ওনার প্রথম স্ত্রী আনা কারিনার দুর্দশায় পড়তে ভয় পেয়েছিলুম। অ্যাভিগঁ ফেস্টিভ্যালে স্ক্রিনিংয়ের ঠিক আগে আমেরিকান হাসপাতালে গিয়ে ভর্তি হতে হয়েছিল, কারণ আমি সেই দিন বেশ মাতাল হয়ে পড়েছিলুম। সেই সময়, জাঁ-লুক গোদার আন্তরিকভাবে আশা করেছিলেন যে ছবিটি প্রথম পর্বে নেওয়া হবে। তিনি আমাদের বেইজিং ভ্রমণের পরিকল্পনাও করে ফেলেছিলেন আর আমাকে একটি বড়ো চাইনিজ কোট কিনে দিতে চেয়েছিলেন। তিনি নিজে ঠিক কেমন মানুষ তা জেনেও মাওবাদীদের বৈঠকে গিয়েছিলেন।
    কারেল ফিতোসি : আপনি কি মনে করেন ১৯৬৮ সালের মে মাসই আপনাকে গোদারের থেকে আলাদা করে দিয়েছিল?
    অ্যানে উইয়াজেম্সকি : ১৯৬৮ সালের পরে, আমি হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলুম, কারণ আমি সর্বহারা বামপন্থী আর তাদের খবরের কাগজ "জ্যাকাসিউস" এর মতামতের বিপক্ষে ছিলুম। বলতে গেলে আমার বেশ দার্শনিক বদহজম হয়েছিল। জাঁ-লুককে, একে অপরকে, চলচ্চিত্রের কারণে ভালোবাসতুম। তিনি আমাকে "এলোমেলো বালথাজার" ছবিতে স্পট করেছিলেন বলেই তাঁর ছবি আমার পছন্দ হয়েছিল। আর পরে আমরা আলাদা হয়ে গেলাম কারণ আমাদের প্রত্যেকেরই সিনেমা সম্পর্কে আলাদা ধারণা ছিল, আমাকে ওনার সিনেমার ঐতিহ্য মেনে নিতে হয়েছিলl
    কারেল ফিতোসি : কোনও অভিনেত্রীর তার পরিচালকের সঙ্গে জীবনযাপনের বিষয়টি কী তাদের সম্পর্ককে জটিল করে তোলে?
    অ্যানে উইয়াজেম্সকি : আমাদের মধ্যে প্রচণ্ড ঈর্ষা ছিল, বার্নার্দো বার্তোলুচির সাথে গোদারের প্রতিদ্বন্দ্বিতাও ছিল, যাঁরা জাঁ-লুকের সঙ্গে ছিলুম বলে আমাকে কোনও চরিত্রের জন্য অভিনয়ের প্রস্তাব দেননি ... তাছাড়া আপনি, লুই, কীভাবে আপনার স্ত্রীর সাথে কি ঘটছে তার খবর রাখেন ?
    লুই গারেল : এটি খুব ভাল প্রসঙ্গ, তবে আমি এই পরিবেশে বড় হয়েছি। একটি শ্যুট নেভিগেশনে ঘনিষ্ঠতা খুব তীব্র হয়ে উঠলেও কিন্তু মাত্র দুই মাস চলে। একবার শেষ হয়ে গেলে, সমস্ত কিছু শেষ হয়ে যায়। এটাও ভয়ঙ্কর ব্যাপার যে কীভাবে কোনও দম্পতি একত্রিত হয়েছিল অথচ শেষ পর্যন্ত তাদের কীভাবে দূরে সরিয়ে নিয়ে গেল।
    কারেল ফিতোসি : অ্যানে, বিচ্ছেদ হওয়ার পরে গোদারের সঙ্গে আপনার দেখা হয়েছে ?
    অ্যানে উইয়াজেম্সকি : কানে "প্যাশন" উপস্থাপনা চলাকালীন আমি তাঁর সাথে আবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছিলুম । ছবিটি খুব খারাপভাবে দর্শকরা নিয়েছিল, আর আমি ওনার হোটেলে একটা চিরকুট লিখে রেখে খোঁজ করছিলুম। আমি ওনার সঙ্গে দেখা করতে পেরেছিলুম । আমি ওনাকে বলেছিলুম যে ছবিটি আমার দুর্দান্ত লেগেছে। উনি জবাব দিয়েছিলেন যে , "আমি আর কখনও তোমার কাছ থেকে মতামত শুনতে চাই না, আমি তোমাকে আর কখনও বিপদে ফেলতে চাই না, আমি তোমার কাছ থেকে আর বেশি কিছু আশা করি না" । এর পরে, আমি আর কখনও গোদারের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করিনি।
    কারেল ফিতোসি : আপনি কি তাঁকে আপনার গল্পের বইয়ের প্রকাশের কথা জানাননি?
    অ্যানে উইয়াজেম্সকি : না । কারণ লোকেরা ওনার সম্পর্কে যা লিখেছিল তাতে উনি কখনও সাড়া দেননি। সুতরাং গ্যালিমারের আইন বিভাগ প্রকাশের বিরোধিতা করলেও, প্রকাশক আঁতোয়া গ্যালিমারের সাথে আমার মতের মিল ছিল যে গোদার আমাদের বিরুদ্ধে হস্তক্ষেপ করবেন না। এবং এটিই ঘটেছে।
    লুই গারেল : আপনি যখন আপনার বইটি লিখেছিলেনন, তখন কি আপনি মানুষের সম্পর্কে ক্রুদ্ধ ছিলেন ?
    অ্যানে উইয়াজেম্সকি : আমার জীবনের দ্বিতীয় পর্বে শত্রুতা ব্যাপারটা জলবায়ুর মতন অনুভূত হয়েছে । যেন আমি জাঁ-লুকের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছি। ধরা যাক আমাদের সম্পর্কে এমন আদান-প্রদানের অনুপস্থিতি ছিল, যা আমাকে আঘাত করেছিল।
    কারেল ফিতোসি : আপনি কি ওনার ছবিগুলি দেখতে যাচ্ছেন?
    লুই গারেল : আমি, আমি ওনাদের সব কয়টা ফিল্ম দেখতে যাচ্ছি। আমার বাবাও যাচ্ছেন। আমার পছন্দ হয়েছিল "ফিল্ম সোশ্যালিজম"। অন্যদিকে, আমি "ভাষার বিদায়" বুঝতে পারিনি। ওনার দর্শন বেশ উজ্বল আর শব্দ এবং চিত্রের উপর একটি সত্য প্রতিচ্ছবি দেখান উনি। তবে আমি মনে করি এগুলি বুঝতে আপনাকে অন্তত দশ বছর অপেক্ষা করতে হবে। ফিল্মগুলো বাস্তব আধুনিকতার পোস্টেরিয়েরি নেয় এবং প্রায় ক্লাসিক হয়ে যায়।
    কারেল ফিতোসি : এই জঙ্গি সিনেমা এখনও আছে কি?
    লুই গারেল : হ্যাঁ, সিনা ডু রেল ফিল্মউৎসবে, যেখানে আমি যাই না, কারণ নামটি আমাকে দুশ্চিন্তায় ফেলে! [তিনি হাসেন] এমন সমান্তরাল সিনেমা রয়েছে যা বাণিজ্যিক নেটওয়ার্কগুলিতে টাকা রোজগারের জন্য তৈরি করা হয় না। তবে অ্যানে, আপনার কাছে আমার একটি প্রশ্ন রয়েছে: যখন আপনারা একসাথে ছিলেন, আপনি কি অন্য শিল্পীদের সাথে যোগাযোগ রাখতেন?
    অ্যানে উইওয়াজেম্সকি : রিভেতে খানিকটা সময় ত্রুফো সঙ্গে ছিলেন। তাঁর সাথে ফিল্ম না করার জন্য আমি খুব দুঃখিত। যখন তিনি "লা চিনয়েস" এর স্ক্রিনিং ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন, তখন তিনি আমাকে বলেছিলেন: "অ্যানে, আপনার সঙ্গ কী দুর্দান্ত, আপনি কি অভিনেত্রী নন?" একথা আমাকে খুশি করতে পারেনি, তবে তা এমন দরদ নিয়ে বলা হয়েছিল ...
    কারেল ফিতোসি : আপনি কী মনে করেন যে আজ জাঁ-লুক গোদারের অবদানের এখনও কিছু বাকি রয়েছে?
    লুই গারেল : অনেক দর্শক এখনও তাঁর অবদানের জন্য অপেক্ষা করছে। এটা বিরল। তিনি শিল্প জগতে এবং সাধারণ মানুষের জন্য একজন আইকন হয়ে রয়ে গেলেন । কারণ যদি আমরা দর্শকদের সিনেমা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করি তবে তাঁরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে "ত্রুফো বা গোদার" বলবে। গোদার হলেন আধুনিক সিনেমার উদ্ভাবক, তিনি সিনেমার ভাষা বদলেছেন। এমনকি এখন যদিও তিনি বেশিরভাগই গবেষকদের বিষয়বস্তু । তিনি ১৪৩ টি ছবির শুটিং করেছেন…
    কারেল ফিতোসি : আপনি কি তাঁর কোনও উত্তরাধিকারী দেখতে পাচ্ছেন?
    লুই গারেল : না, কারণ তাঁর স্টাইলটি এতটাই দুঃসাধ্য, যে, কেউ এর দ্বারা অনুপ্রাণিত হওয়ার সাথে-সাথে তা তৎক্ষণাত প্রদর্শিত হবার ক্ষমতা তৈরি করে ফেলবে। বেশির ভাগ পরিচালক একথা দাবি করেছেন, কারণ তাঁর ছবিগুলি দেখার সময় তাঁরা সকলেই হতবাক হয়ে যান। আমার প্রজন্ম খুব মুগ্ধ হয়েছিল। তবে বিশ-বছর বয়সের তরুণদের সম্ভবত তাঁর সাথে আরও একটি সম্পর্ক রয়েছে। আমরা উদাহরণস্বরূপ জাভিয়ের ডোলানের সাথে এই ব্যাপারটা ঘটতে দেখেছি : তাঁর কল্পনাটি স্পষ্টভাবে অন্য কোথাও ঘাপটি মেরে আছে।
    কারেল ফিতোসি : তবে তাঁরা ২০১৪ সালে কান ফেস্টিভাল জুরি পুরস্কার ভাগ করে নিয়েছেন।
    লুই গারেল : এটি ছিল জুরিদের চোখের পলকে দেখা । ডোলান এমন একজন পরিচালক যাঁর চলচ্চিত্রগুলির প্রত্যাশা - আমি সেগুলো নিজেই দেখেছি - সম্ভবত গোদারের মতোই ছিলেন। তিনি একজন তারকা ছিলেন, তেমনি ডোলনও ।
    কারেল ফিতোসি : অ্যান, "রিডাউটেবল" এর কান প্রদর্শনে আপনি খুব সরল ছিলেন। আপনি কি সিনেমা মিস করবেন?
    অ্যানে উইয়াজেম্সকি : আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, না আর করব না। কানে, আমি প্রথমবারের মতো সিঁড়ি বেয়ে উঠেছিলাম, একটি দলের অংশ হওয়ার আনন্দটি পুনরায় আবিষ্কার করেছি। তবে আমি একই সাথে দুটি জিনিস করা ভাল মনে করি না। আমার দুটি জীবন ছিল, অভিনয়ের জীবন এবং একজন লেখকের জীবন, যা এতটাই নিঃসঙ্গ…
    কারেল ফিতোসি : জাঁ-লুক গোদার কি "পুনঃনির্মাণযোগ্য" সম্পর্কে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিলেন?
    লুই গারেল : না, তিনি তাঁর নতুন ছবিটির শুটিঙ করছেন, আমি মনে করি তাতেই তাঁর আগ্রহ সবচেয়ে বেশি।
    অ্যানে উইয়াজেম্সকি : এটি ধারাবাহিক। তাঁকে নিয়ে এমন অনেক কিছুই লেখা হয়েছে, তিনি কপিরাইট দাবি করার কেউ নন।
    লুই গারেল : তাঁর এই বিষয়ে একটি দুর্দান্ত বক্তব্যও আছে। তিনি বলেছিলেন: "এখানে আমার কোনও কপিরাইট নেই, কেবলমাত্র হোমওয়ার্ক রয়েছে।"
    প্যারিস ম্যাচ পত্রিকায় প্রকাশিত [ ইংরেজি থেকে অনুবাদ করেছেন মলয় রায়চৌধুরী ]
  • মলয় রায়চৌধুরী | 162.158.158.200 | ০৭ এপ্রিল ২০২০ ১১:১৪730471
  • গোদারের দ্বিতীয় স্ত্রী অ্যানে উইয়াজেম্সকির আত্মজীবনী নিয়ে তৈরি ফিল্ম ‘রিডাউটেবল’ ( আমেরিকায় নাম ‘গোদার মোনামো” )
    রিভিউ করেছেন ফিলিপ কেম্প
    “গোদার মোনামো” ( Godard Mon Amour ), প্যাশটিশ-নির্মাতা মিশেল অ্যাজানাভিশ্যু ( ‘দি আর্টিস্ট’ এবং ‘ওএসএস : ১১৭’ খ্যাত Michel Hazanavicious ) জাঁ-লুক গোদারের জীবনের একটি ঘটনাবহুল সময়ের সালতামামি তৈরি করেছেন । যে সময়টা তিনি নিয়েছেন সেটি ৩৭ বছর বয়সী গোদারের সঙ্গে উনিশ বছর বয়সী অভিনেত্রী অ্যানে উইয়াজেম্সকির বিবাহিত জীবন, ফরাসি ছাত্রদের মে ১৯৬৮ সালের দ্রোহ, যে দ্রোহের কারণে সেই বছর কান ফিল্ম ফেস্টিভাল বাতিল হয়ে গিয়েছিল, ইত্যাদি নিয়ে। ফিল্মটি অ্যানে উইয়াজেম্সকির স্মৃতিকথা (Un An Après বা One Year After”)-এর ঘটনানির্ভর । গোদার, যখন তাঁর বয়স ৮৭ বছর, এবং তিনি “Le Livre d’Image” ফিল্মটি কান ফিল্ম ফেস্টিভালে প্রদর্শনের জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলেন, মিশেল অ্যাজানাভিশ্যু তাঁকে নিয়ে ফিল্ম তৈরি করছেন বলা হয়েছিল, তিনি বলেছিলেন, “মূর্খ, মুর্খের আইডিয়া।” ব্যাপারটা কিন্তু তা নয় । ধারণাটা অসাধারণ । তবে ফিল্মটা উৎকট । উইয়াজেম্সকির জন্ম ১৪ মে ১৯৪৭ এবং মৃত্যু ৫ অক্টোবর ২০১৭ ।

    কিন্তু অস্বাস্হ্যকর মুগ্ধতা বাদ দিয়ে নয় । গোঁড়া গোদারপ্রেমীদের কাছে “গোদার মোনামো” একটি অপরিহার্য ঘৃণা-দর্শন । যাঁরা গোদার সম্পর্কে দোনামনা, সেই দলবাজদের দৃষ্টিতে ফিল্মটা একধরণের মজার খোরাক যোগাবে । কিন্তু গোদারকে তীব্র সমর্থন ছাড়াই আপনি এই ফিল্মে বেরঙা, হালকা, ঝকঝকে রঙের বাদামের গুঁড়ো-মাখানো বিস্কুট খেতে পাবেন । ফি্ল্ম আরম্ভ হলে আপনি গোদার সম্পর্কে দুয়েকটা কথা জানতে পারবেন -- কিংবা ফ্রান্স, রাজনীতি, যৌনতা আর সিনেমা ইত্যাদি -- কিন্তু নিশ্চিত হতে পারেন যে ফিল্ম শেষ হলে আপনি টের পাবেন যে বিশেষ কিছুই জানতে পারলেন না ।

    গোদার, ভালোর জন্য হোক বা খারাপ, একজন সিনেমাটিক চিন্তাবিদ, এমনই একজন যিনি চেষ্টা করেছেন, বহুপ্রসূ এবং বিতর্কিত কেরিয়ারে, ফিল্ম মাধ্যমের দার্শনিক সম্ভাবনা এবং বৌদ্ধিক সারবস্তু, তাকে যাতে করে তোলা যায় ধারণা এবং তর্কবিতর্কের, গল্পের, ছবির এবং আবেগের আধেয় । কিন্তু অ্যাজানাভিশ্যু তার সম্পূর্ণ উল্টো দেখিয়েছেন ও করেছেন : চিত্রকল্প এবং শৈলীর অভ্রান্তচিত্ত দক্ষ নির্মাতা যাঁর বিশেষ কিছু বলার নেই এবং বিশ্বাসও নেই যে কিছু একটা বলতে হবে । গোদারের সবচেয়ে অনুকরণীয় অবদানগুলোকে দখল করে নিয়ে--- বিভিন্ন সুরের মিশ্রণে ভয়েস-ওভার, পরিচ্ছদের টাইটেলগুলো পর্দায় ঝলকে-ওঠা, ফুর্তিবাজ সম্পাদনা, নগ্ন নারীদের ধাঁধায় কথাবার্তা -- এগুলোয় শ্রদ্ধার চেয়ে বেশি আছে প্রতিশোধের স্পৃহা । “গোদার মোনামো” অক্লান্ত প্রয়াস করেছে তার প্রধান চরিত্রকে নিজস্ব অগভীরতায় চুবিয়ে দিতে ।

    ১৯৬৭ এবং ১৯৬৮ সালে গোদার একজন বিখ্যাত ও বিতর্কিত চিত্রপরিচালক, নিজের সময়ের একজন সাংস্কৃতিক নায়ক, নিজের খ্যাতিকে ঘষে তুলে ফেলতেও যিনি পেছপা নন এবং নিজের শিল্পকে সমসাময়িক রাজনৈতিক আবহাওয়ার সঙ্গে খাপ খাওয়াবার চেষ্টা করছেন । উইয়াজেম্সকি ( যাঁর ভূমিকায় অভিনয় করেছেন স্টেসি মার্টিন ), রক্ষণশীল লেখক ফ্রাঁসোয়া মরিয়াকের নাতনি, তখন সবে আরম্ভ করেছেন La Chinoise ফিল্মে অভিনয়, বামপন্হী ফরাসি যুবা-সংস্কৃতির মাওবাদী বাঁক-সম্পর্কিত ফিল্ম, গোদারের ব্যাঙ্গাত্মক অবদান । মেয়েটি বিয়ে করেন গোদারকে এবং মহানন্দে তার পরাণসুন্দরী ও যৌনতার আদর্শ হয়ে ওঠেন, গোদারের তিরিক্ষি মেজাজকে আকর্ষক আর তাঁর বুদ্ধিবৃত্তিকে যৌনতাবর্ধক মনে হয় মেয়েটির ।

    লুই গারেলের অভিনয়ে আংশিকভাবে গোদারের অনন্যসাধারণ প্রতিভা বাকচাতুর্যে মনোহর হয়ে ওঠে, কিন্তু ফরাসি ফিল্মে তাঁকে নেয়াটা বেশ হাসি-ঠাট্টার ব্যাপার । ( লুই গারেলের বাবা, ফিলিপে, একজন চিত্রপরিচালক, যাঁকে বলা হয় ককতো আর গোদারের সন্তান ) । লুই গারেল একজন শক্তিশালী অভিনেতা, তাছাড়া, দেখে মনে হয়, তিনি যশস্বী লোকেদের বেশ চালাকচতুর ছদ্মবেশী । পপুলার সংস্কৃতির ভিন্ন মহাবিশ্বে, ওনার অভিনীত গোদার, একটি বোকা পুরুষব্যাঙের ক্যাঁকো কন্ঠস্বর আর হালকা বদহজমের মেজাজ নিয়ে, ‘শনিবার রাতের শো’ এর অ্যাঙ্করের মতন সপ্তাহশেষের ঘোষক বা ‘নোংরা বিপদের’ প্রতিযোগীর মতন দেখায় ।

    ফিল্মটিতে গোদারকে নিয়ে যে মজা করা হয়েছে, তাতে দেখা যায়, তিনি কাচের গেলাস ভাঙছেন, অনেক সময়ে প্রদর্শনকারীদের দিকে ছুঁড়ে, যা থেকে মনে হয় যে অ্যাজানাভিশ্যু সুযোগ খুঁজেছেন ভিড়ের অজস্র মানুষের কথা তুলে ধরার । অনেকসময়ে, ঝাণ্ডা ওড়ানোর গুঞ্জনে, একজন গোদার-প্রেমী এসে গোদারের ষাট দশকের ফিল্মের, যেমন ‘ব্রেথলেস’ ও ‘কনটেম্পট-এর গুণগান’ করে যাবে । বিশ্রী ভদ্রতা থেকে সরাসরি নোংরামিতে নেমে যাওয়াটা পরিচালক অ্যাজানাভিশ্যুর প্রতিক্রিয়াশীল বিচ্যুতি এবং তাঁর সৃজনশীল, আদর্শিক এবং মানসিক সংকটের লক্ষণ।

    গোদার চেয়েছেন ফিল্মনির্মানণে এমনই এক অভিমুখ হয়ে উঠুক যা তাঁর রাজনৈতিক গরজের প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে পারবে, এক দ্রোহী সিনেমার জন্ম হোক যা সমস্ত বুর্জোয়া ও পরম্পরাগত ব্যাপারকে সমালোচনায় অনড় থাকবে । বর্তমানে, এই উচ্চাকাঙ্খাকে টিটকিরি মারা ছাড়া, কোনোকিছুই তেমন সহজ নয়, এবং ষাটের দশকের রাজনীতি-প্রভাবিত শিল্পগুলোকে সেই সময়েও অনেকের মনে হয়ে থাকবে নির্বোধ, কৌতুকপূর্ণ বা অতিমাত্রায় অভিব্যক্ত। তবে এই ধারণা যে চলচ্চিত্র পুঁজিবাদী মৌজমস্তির চেয়ে বেশিকিছু দিতে পারে এবং ব্যক্তি-এককের আত্মপ্রকাশকে ছাপিয়ে যেতে পারে--- তা শোষণ-পীড়নের বিরুদ্ধে হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে কিংবা সমবেত কল্পনার পথ প্রশস্ত করার কথা ভাবতে পারে-- তাকে বাতিল করা চলে না । ১৯৬৮ সালের পর গোদারের পরীক্ষা-নিরীক্ষা, যা অলস-চিন্তায় এই ফিল্মে একটি রুদ্ধপথ হিসাবে দেখানো হয়েছে, মনে হবে সেই পথে যাত্রা করা হয়নি ।

    অ্যাজানাভিশ্যুর যদি সিনেমা ও রাজনীতি সম্পর্কে স্পষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য ধারণা থাকত, তাহলে তাঁর এই পরামর্শ যে গোদারের উচিত ছিল সিনেমা অথবা রাজনীতির মধ্যে কোনও একটা বেছে নেওয়া, তাহলে অমন বিধেয়কে মান্যতা দেয়া যেতে পারত । প্রেমের বিষয়ে বলতে হলে, যা কিনা এই ফিল্মের প্রতীয়মান কেন্দ্রবিন্দু, তাও আরেকটা সুযোগ নষ্ট করার উদাহরণ। কেউই তর্ক জুড়বে না যে গোদার একজন ভালো মানুষ । ফিল্ম সমালোচক হিসাবে আবির্ভাবের সময় থেকে মানববিদ্বেষ তাঁর ব্যক্তিত্বের অংশ হয়ে আছে, এবং তাঁর জীবনীতে বন্ধুত্বভঙ্গ ও পোড়ানো সেতুর ছড়াছড়ি । কিন্তু গোদারের চরিত্রে যিনি অভিনয় করেছেন, সেই লুই গারেলের নষ্টামি সত্ত্বেও, এই ফিল্ম তাঁকে মোটেই একজন আকর্ষণীয় পাজি-লোক করে তোলে না ।

    স্টেসি মার্টিন, যিনি অ্যানে উইয়াজেম্সকির ভূমিকায় অভিনয় করেছেন, তিনি একজন কমনীয় ও নিবেদিত অভিনেত্রী, কিন্তু ফিল্মটা গোদারের নিজের দৃষ্টিতে উইয়াজেম্সকিকে সম্পূর্ণ আয়তনিক নারী হিসাবে দেখার চেয়েও খারাপ । মেয়েটি নিজের স্বামীকে ততোদিন ভালোবাসেন যতোদিন না তাঁর স্বামী সম্পর্কটাকে অসম্ভব করে তুলছেন । লোকটি নার্সিসিস্টিক, পেশায় হিংসুটে আর যৌনতায় পজেসিভ ; সে বিতৃষ্ণ হয়ে পড়ে যখন তার স্ত্রী একটি ইতালীয় ফিল্মে অভিনয় করার সুযোগ পায় যাতে তাকে নগ্ন হতে হবে । এর প্রতিক্রিয়া হিসাবে অ্যাজানাভিশ্যু দেখিয়েছেন এমন একটি দৃশ্য যাতে লুই গারেল ( গোদার ) এবং স্টেসি মার্টিন ( উইয়াজেম্সকি ) দুজনেই উলঙ্গ হয়ে সিনেমায় নগ্নতার নান্দনিকতা নিয়ে তর্ক-বিতর্ক করছেন । এই ধরণের আত্ম-প্রসঙ্গ উথ্থাপনকে “গোদারীয়” হিসাবে ফিল্মের শিক্ষার্থীরা প্রাথমিক পর্বের ক্লাসে চালিয়ে দিতে পারে । এই ব্যাপারটা অ্যাজানাভিশ্যুর পরিচয় সহজেই ফাঁস করে ।

    মিশেল অ্যাজানাভিশ্যু নিউ ওয়েভ আইকন গোদার ও তাঁর প্রেরণাময়ী দ্বিতীয় স্ত্রী অ্যানে উইয়াজেম্সকির বিয়ে ভাঙার গল্প তুলে ধরেছেন খেলাচ্ছলে, অযৌক্তিকভাবে আর অনেক সময়ে ঘৃণ্য আক্রমণ করে । অভিনেত্রী উইয়াজেম্সকি ১৯৬৬ সালে সিনেমাজগতে প্রবেশ করেছিলেন রবার্ট ব্রেসঁর Au hasdard Balthazar ( এলোমেলো বালথাজার ) এবং পরের বছর অভিনয় করেন গোদারের La Chinoise ( চীনারা ) ফিল্মে । তিনি গোদারকে বিয়ে করেন এবং ১৯৭০ সালে আলাদা হয়ে যান, যদিও আইনি ডিভোর্স কার্যকরী হয় নয় বছর পর । Un an Apres ( এক ছর পর )কে বলা যেতে পারে গোদারের বিরুদ্ধে উইয়াজেম্সকির প্রতিশোধগ্রন্হ । আর মিশেল অ্যাজানাভিশ্যুর ফিল্মকে বলা যেতে পারে একজন নিম্নমানের পরিচালকের ঈর্ষা প্রণোদিত কর্মকাণ্ড ।
    ইংরেজি থেকে অনুবাদ : মলয় রায়চৌধুরী
  • মলয় রায়চৌধুরী | 162.158.158.200 | ০৭ এপ্রিল ২০২০ ১১:১৭730472
  • গোদার-এর ‘ব্রেথলেস’ ফিল্মে জাম্পকাট শৈলীর উদ্ভাবনা ও তা নিয়ে বিতর্ক
    মলয় রায়চৌধুরী
    এক
    ফরাসি ভাষায় উচ্চারণ জাঁ-লুক গোদা, ইংল্যাণ্ডে উচ্চারণ জাঁ-লুক গোদার, হলিউডে উচ্চারণ জাঁ-লুক গোহদার । নামগুলোর ক্ষেত্রে আমি ইংল্যাণ্ডের উচ্চারণ ব্যবহার করছি ।
    ১৯৯৪ সালে ‘মানবতা, সাহিত্য ও সাম্যবাদ’ ( Michelanea. Humanisme, litteratur og kommunikation ) [Aalborg: Alborg Universitetsforlag, 1994, ed. Inge Degn, Jens Høyrup ] প্রবন্ধে রিচার্ড রাসকিন জঁ-লুক গোদার-এর ‘ব্রেথলেস’ ফিল্মে জাম্পকাট শৈলীর উদ্ভাবনা সম্পর্কে আলোচনায় বিভিন্ন বিতর্ককে বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে সবাই একতরফাভাবে শৈলীটিকে নিয়েছেন ; সম্পূর্ণ পরিপ্রেক্ষিত তাঁরা বুঝতে পারেননি । তাছাড়া কয়েকজনের মন্তব্যকে ঈর্ষান্বিত বলা যায় । এ-পর্যন্ত চুয়াল্লিশটি ফিল্ম করেছেন গোদার ; তার মধ্যে ‘ব্রেথলেস’ প্রথম ।

    কাহিয়ে দ্যু সিনেমা ( সিনেমা সম্পর্কিত নোটবুক ) পত্রিকার সূত্রে যে চিত্রপরিচালকরা একত্রিত হয়ে ফরাসি সিনেমায় নতুন ঢেউ বা নব তরঙ্গ বা নবকল্লোল এনেছিলেন, জঁ-লুক গোদার তাঁদের অন্যতম । ফিল্ম-পত্রিকাটি ১৯৫১ সালে আরম্ভ করেন আঁদ্রে বাজিঁ, জাক দোনিয়োল-ভালক্রোজ এবং জোসেফ-মারি লো দুচা । এই পত্রিকাটির পূর্বসূরী ছিল ‘রেভ্যূ দ্যু সিনেমা’ ( সিনেমার রিভিউ ) যার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন প্যারিসের দুটি ফিল্ম ক্লাবের সদস্যরা ( ‘অবজেকটিভ ৪৯’ এর রবার্ত ব্রেসঁ, জাঁ ককতো এবং আলেকজান্দ্রে অসত্রুচ ) এবং ‘সিনে ক্লাব দ্যু কার্ত্যে লাতাঁ ( লাতিন কোয়ার্টারের সিনেমা ক্লাব ) । ১৯৫৭ সালে এরিক রোমার পত্রিকাটির সম্পাদক হবার পর তাতে প্রবন্ধ লেখা আরম্ভ করেন ফিল্ম সম্পর্কে নতুন ভাবুক একদল যুবক, যেমন জাক রিভেত, জঁ-লুক গোদার, ক্লদ শাবরোল এবং ফ্রাঁসোয়া ত্রুফো প্রমুখ, যাঁরা পরে পৃথিবীর অত্যন্ত প্রভাবশালী চিত্রনির্মাতা হিসাবে খ্যাত হন। আঁদ্রে বাজিঁর সঙ্গে এই যুবকদের সম্পর্ক ছিন্ন হয় ১৯৫৪ সালে, ত্রুফোর প্রবন্ধ ‘লা কোয়ালিতে ফ্রাঁসে’ বা ‘ফরাসি বৈশিষ্ট্য’ প্রকাশিত হবার পর ।

    ‘ব্রেথলেস’ ( A bout de souffle ) জঁ-লুক গোদার পরিচালিত একটি অপরাধ-নাট্য ফিল্ম, যার কাহিনি তিনি নিজেই লিখেছিলেন, যদিও ফ্রাঁসোয়া ত্রুফো কাহিনিটির ছক পেয়েছিলেন সংবাদপত্রে প্রকাশিত একটি ঘটনা থেকে এবং সেটিকে কিছুটা রদবদল করে ফিল্ম তৈরি করেন গোদার । কাহিনিটি জাঁ-পল বেলমোন্দো নামে এক ভবঘুরে অপরাধী আর তার মার্কিন বান্ধবী জিন সেবার্গকে কেন্দ্র করে আবর্তিত । এটিই গোদারের প্রথম ফিচার ফিল্ম এবং অভিনেতা হিসাবে বেলমোন্দোকে প্রতিষ্ঠা ও খ্যাতি এনে দ্যায় । ফরাসি নিউ ওয়েভ সিনেমার প্রভাবশালী ফিল্ম হিসাবে স্বীকৃতি পেয়েছে ‘ব্রেথলেস’, এক বছর আগে মুক্তি-পাওয়া ফ্রাসোঁয়া ত্রুফোর ( Francois Truffaut ) ‘দি ৪০০ ব্লোজ’ এবং অ্যালাঁয় নেস ( Alain Resnais )-এর ‘হিরিশোমা, মন আমোর’-এর পাশাপাশি । ফিল্মগুলো ফরাসি চিত্রনির্মাণশৈলীর দিকে আন্তর্জাতিক আলোচক-দর্শকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সফল হয় । গোদারের ফিল্মটি সাহসী কল্পনা এবং অপ্রচলিত জাম্পকাট উদ্ভাবনের জন্য আন্তর্জাতিক স্তরে চর্চার বিষয় হয়ে উঠেছিল । ফিল্মটি প্রথম যখন ফ্রান্সে মুক্তি পায় তখন কুড়ি লক্ষ দর্শক তা দেখেছিলেন ।

    মিশেল ( জাঁ-পল বেলমোন্দো ) একজন বিপজ্জনক অপরাধী যে নিজেকে হলিউডি ফিল্মের হামফ্রি বোগার্ট-এর মতন বেপরোয়া মনে করে । মার্কিন ক্লাসিকাল ফিল্মের যুগে হামফ্রি বোগার্ট ছিলেন ফিল্ম ও মঞ্চাভিনেতা এবং অভিনয়ের গুণে তিনি হয়ে ওঠেন মার্কিন সংস্কৃতির একজন আইকন। আমেরিকার ফিল্ম ইন্সটিটিউট বোগার্টকে ক্লাসিকাল মার্কিন সিনেমার সবচেয়ে বড়ো পুরুষ অভিনেতার খেতাব দিয়েছিল । মার্সাইতে একটা মোটরগাড়ি চুরি করার পর মিশেল একজন অনুসরণকারী পুলিশকে গ্রাম্য পথে খুন করে । পুলিশের কাছ থেকে পালিয়ে বেড়ানো নিষ্কপর্দক মিশেল তার প্রেমিকা প্যাট্রিশিয়া ( জিন সেবার্গ )এর দিকে সাহায্যের হাত বাড়ায় । সেবার্গ একজন ছাত্রী, যে সাংবাদিক হতে চায়, প্যারিসের রাস্তায় ‘নিউ ইয়র্ক হেরাল্ড ট্রিবিউন’ বিক্রি করে । দোটানায় পড়ে প্যাট্রিশিয়া বোকার মতন তাকে নিজের ফ্ল্যাটে আশ্রয় দ্যায় । মিশেল মেয়েটিকে ফোসলাবার পাশাপাশি ইতালিতে পালাবার জন্য ঋণের চেষ্টা করে । প্যাট্রিশিয়া জানায় সে গর্ভবতী, সম্ভবত মিশেলের বাচ্চার । পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে প্যাট্রিশিয়া জানতে পারে যে মিশেল একজন ফেরারি অপরাধী । শেষ পর্যন্ত প্যাট্রিশিয়া মিশেলকে ধরিয়ে দ্যায় আর পুলিশ আসার আগেই প্যাট্রিশিয়া মিশেলকে জানিয়ে দ্যায় সে কী করেছে । জেলেতে জীবন কাটানোর জন্যে তৈরি হয়ে, প্রথমে নিজেকে ভাগ্যের হাতে ছেড়ে দিয়ে, পালাবার চেষ্টা করে না । পরে পালায়, আর পুলিশ তাকে দীর্ঘক্ষণ তাড়া করে রাস্তায় গুলি করে মারে । মৃত্যু পথযাত্রী মিশেলের শ্বাস ফুরিয়ে আসে, সে ‘ব্রেথলেস’ হয়ে মারা যায় ।

    মিশেলের মৃত্যু দৃশ্যটি মনে রাখার মতন, কিন্তু যাঁরা ফরাসিভাষা জানেন না তাঁদের কাছে ফিল্মের শেষ সংলাপগুলো বিভ্রান্তির সৃষ্টি করেছে । মূল ফরাসিতে সংলাপের উদ্দেশ্য ছিল অনিশ্চয়তা গড়ে তোলা ; তাতে টের পাওয়া যায় না যে মিশেল প্যাট্রিশিয়াকে নাকি জগতসংসারকে দোষারোপ করছে, এবং এটাও অস্পষ্ট যে প্যাট্রিশিয়া মিশেলের নিন্দা সম্পর্কে প্রশ্ন তুলছে, নাকি একটা ফরাসি শব্দ সম্পর্কে প্রশ্ন তুলছে ; মার্কিন হবার দরুন ফরাসিতে অভিব্যক্ত লজ্জার ধারণা সে বুঝতে পারছে না ।

    গোয়েন্দা ভিতাল আর প্যাট্রিশিয়া মরণাপন্ন মিশেলের কাছে পৌঁছলে তাদের মধ্যে এইভাবে কথাবার্তার আদানপ্রদান হয় :

    মিশেল : ব্যাপারটা বিরক্তিকর, সত্যি ।
    প্যাট্রিশিয়া : ও কী বলল ?
    ভিতাল : ও বলল “তুমি একজন সত্যিকারের স্কামব্যাগ।”
    প্যাট্রিশিয়া : স্কামবাগ কী জিনিস ?

    ১৯৮৩ সালে ‘ব্রেথলেস’ ফিল্মটি হলিউডে রিচার্ড গেয়ার আর ভ্যালেরি কাপরিসকিকে নিয়ে তৈরি হয়েছিল, কিন্তু তা গোদারের ফিল্মটির মতন সাড়া ফেলতে পারেনি ।

    দুই

    ‘ব্রেথলেস’-এর কাহিনি মোটামুটি ‘দি নিউজ ইন ব্রিফ’ সংবাদপত্রে প্রকাশিত একটি ঘটনার ছায়া। ঘটনাটি ছিল মিশেল পোরতেল নামে একজন লোকের আর তার মার্কিন সাংবাদিক বান্ধবী বিভারলি লিনেটের । ১৯৫২ সালে পোরতেল একটা গাড়ি চুরি করেছিল তার অসুস্হ মায়ের সঙ্গে দেখা করার জন্য, আর তা করতে গিয়ে লে হাভরেতে গ্রিমবার্গ নামে একজন পুলিশকে খুন করে ফ্যালে । খবরটা ফ্রাঁসোয়া ত্রুফো পড়েছিলেন আর ক্লদ শাবরলের সঙ্গে ঘটনাটা নিয়ে ফিল্ম করবেন ভেবেছিলেন, কিন্তু কাহিনির ছক নিয়ে দুজনের মতের মিল না হওয়ায় তাঁরা ব্যাপারটা বাতিল করে দ্যান । সেই সময়ে গোদার টোয়েন্টিয়েথ সেনচুরি ফক্সের এজেন্টের কাজ করতেন এবং প্রযোজক জর্জ দ্য বোরগেয়াকে বলেন যে ওনার সাম্প্রতিক ফিল্মটা ভালো হয়নি। দ্য বোরগেয়া গোদারকে ‘আইসল্যাণ্ডের জেলে’ ( Pecheur d’Islande ) নামে একটা কাহিনির চিত্রনাট্য লিখতে বলেন । ছয় সপ্তাহ চিত্রনাট্যে খাটাখাটুনির পর বিরক্ত হয়ে গোদার প্রস্তাব দেন ‘ব্রেথলেস’ তৈরি করার । ১৯৫৯ সালে শাবরোল আর ত্রুফো তাঁদের ছকে নেয়া ছবিটা এই শর্তে দ্য বোরগেয়াকে দিতে রাজি হন যদি তা গোদার পরিচালনা করেন । ত্রুফো আর শাবরোল তখন নামকরা পরিচালক, আর তাঁদের নামের দরুন টাকা তুলতে প্রযোজকের অসুবিধা হয়নি । ফিল্মের ক্রেডিটে ত্রুফোকে মূল লেখকের স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে এবং শাবরোলকে টেকনিকাল পরামর্শদাতা । শাবরোল পরে জানিয়েছেন যে উনি মোটে দুইবার ফিল্মের সেটে গিয়েছিলেন আর ত্রুফোর অবদান সীমিত ছিল গোদারকে অনুরোধ করে লিলিয়ান ডেভিডকে একটা ছোটো ভূমিকায় অভিনয় করতে দেবার । ফিল্মে নিউ ওয়েভ পরিচালক জাক রিভেত অভিনয় করেছেন গাড়ির ধাক্কায় রাস্তায় মরে পড়ে থাকা একজন লোকের ।

    ফিল্মটা তুলতে-তুলতেই গোদার চিত্রনাট্য লিখেছেন । উনি ত্রুফোকে বলেছিলেন, “গল্পটা মোটামুটি একজন যুবককে নিয়ে যে মৃত্যুর কথা ভাবে আর একজন যুবতী যে ভাবে না”। বাস্তব জীবনের মিশেল পোরতেল ছাড়া নায়কের উপাদান গোদার নিয়েছিলেন চালবাজ ও বেপরোয়া চিত্রনাট্যকার পল গেগফের চরিত্র থেকে, যে ফিল্ম মহলে যুবতীদের ফুসলিয়ে আকর্ষণ করার জন্য খ্যাত ছিল । জেনেভায় থাকার সময়ে চিনতেন এমন লোকেদের থেকেও কয়েকটি চরিত্রের উপাদান নিয়েছিলেন গোদার । ত্রুফো জানিয়েছেন যে, “কাহিনির শেষটায় বদল ঘটাবার পরিকল্পনা গোদারের নিজস্ব কেননা তাঁর লেখা চিত্রনাট্যে ফিল্ম শেষ হবার কথা ছিল রাস্তা দিয়ে নায়কের হেঁটে চলে যাওয়ার দৃশ্যে, আর পথচলতি লোকেরা তার দিকে তাকিয়ে দেখছে, এইরকম, যেহেতু প্রতিটি সংবাদপত্রে অপরাধীর ফোটো প্রকাশিত হয়েছে । গোদার ফিল্মের ভয়ঙ্কর পরিণতি বেছে নিয়েছিলেন তার কারণ উনি আমার চেয়েও দুঃখি প্রকৃতির মানুষ ।”

    তিন
    ১৯৫৯ সালে সিনেমা জগতে জঁ লুক গদার-এর ‘ব্রেথলেস’ ফিল্মটি জনগণের সামনে আসার পর নানা রকমের তর্ক জোড়া হয়েছে যে ঠিক কোন কারণে পরিচালক একটি ফিল্ম-সম্পাদনার ক্ষেত্রে চিত্রনাট্যের ধারাবাহিকতা থেকে সরে গিয়ে বৈপ্লবিক টেকনিক প্রয়োগ করলেন । রিচার্ড রাসকিন বিভিন্ন তর্কগুলো আলোচনা করেছেন এবং বলেছেন যে প্রতিটি তর্কই প্রমাণসাপেক্ষ । ‘ব্রেথলেস’-এর আলোচনায় প্রত্যেকে নিজের মতামত দিয়েছেন ; অন্যের মতামতকে গুরুত্ব দেননি ।

    যদিও তাঁর প্রবন্ধে যে কথাগুলো রাসকিন বলেছেন তা আগে প্রকাশিত হয়নি, গোদার-এর জাম্পকাট ব্যাখ্যায় এক নতুন দিক উন্মোচন করার চেষ্টা করা হয়েছে । দেখা যাবে যে কোনো বৈপ্লবিক টেকনিক প্রয়োগ হলে তা বিভিন্ন ধরণের ব্যাখ্যার সুযোগ গড়ে তোলে । যেহেতু এই ফিল্মটি পৃথিবীর সিনেমার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকচিহ্ণ, এবং ফিল্ম নির্মাণের নতুন তরঙ্গ ( la nouvelle vague ) এর প্রতিনিধিত্ব করে, যাঁরা ফিল্ম নির্মাণের ইতিহাসে আগ্রহী এবং এখনকার সম্পাদনাকর্মের সঙ্গে যুক্ত, বিভিন্ন ফিল্মশৈলীর রদবদলের খেয়াল রাখেন, তাঁরা ফিল্মনির্মাণের নান্দনিকতার সমস্যাগুলোর সন্মুখীন হতে পারবেন । মনে রাখা দরকার যে ফ্রান্সে পঞ্চাশের শেষ ও ষাটের দশকের উথালপাথালের সামাজিক রাষ্ট্রীয় বীজভূমিতে পালিত হয়েছিলেন গোদার।

    সবচেয়ে কম খোশামুদে ব্যাখাটি দিয়েছেন পরিচালক ক্লদ ওতো নাহা ( Claude Autant-Lara ), যাঁকে ত্রুফো তীব্র আক্রমণ করেছিলেন, ওপরে উল্লেখিত, ১৯৫৪ সালের জানুয়ারিতে ‘কাহিয়ে দ্যু সিনেমা’ পত্রিকায় প্রকাশিত ‘ফরাসি সিনেমার একটি নির্দিষ্ট ধারা’ ( Une certaine tendance du cinema francais ) প্রবন্ধে । ক্লদ ওতো নাহা, যিনি মনে করতেন যে নতুন তরঙ্গের তরুণ সমালোচকগুলো তাঁর কেরিয়ার ধ্বংস করে দিয়েছে, তিনি গোদার-এর ঘোরপ্যাঁচ সম্পাদনার নিম্নোক্ত ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন । ১৯৮৩ সালে রেনে প্রেদালকে দেয়া সাক্ষাৎকারে ক্লদ ওতো নাহা বলেছিলেন যে আমিই এই তরুণগুলোকে প্রতিষ্ঠা দিয়েছিলুম আর এরা আমাকেই উপড়ে ফেলে দিয়েছে ।

    “ব্রেথলেস ফিল্মের আসল গল্পটা আমি জানি আর আমি বলতে পারি যে ওটা নিছক একটা চমক ! একজন ছোটোখাটো প্রযোজক একজন ছোটোখাটো পরিচালককে ভাড়া করেছিলেন অপরাধীদের নিয়ে একটা ছোটোখাটো ফিল্ম তৈরির জন্য যা ৫০০০ মিটারের বেশি হবে না । কিন্তু পরিচালক ৮০০০ মিটার ফিল্ম তুলে ফেললেন ; প্রযোজক বললেন ছবিটা কাটছাঁট করতে, কিন্তু পরিচালক রাজি হলেন না । তারপর পরিচালককে বাধ্য করা হল । সাহস দেখাতে গিয়ে, প্রযোজকের ওপর চটে গিয়ে গোদার নিজেই কাটছাঁট করলেন, যেভাবে পারেন, যেখান-সেখান থেকে, যাতে ফিল্মটা বাজারে বিক্রি না হয়। কিন্তু মজার ব্যাপার হল, ফিল্মটা পুরো তৈরি হয়ে গেলে, প্রযোজক জর্জ দ্য বোরগেয়া ( Georges de Beauregard ) মনে করলেন যে ব্যাপারটা বুদ্ধিকৌশলময়, প্রতিভা প্রয়োগ করে সম্পাদনা করা হয়েছে, অসাধারণ কাজ । পরিচালক প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন যে তাঁর ফিল্মকে কাটাকুটি করা অসম্ভব, কিন্তু উনি যা করলেন তা কাজে লেগে গেল । তখন গোদার নিজেকে আবিষ্কার করলেন, এবং পরের ফিল্মগুলোতে, উনি আরও বেশি করে গোদার সৃষ্টি করতে লাগলেন ! মাথামুণ্ডুহীন ফাঁকতাল্লা গড়া, চলতে থাকা দৃশ্যের মাঝখান থেকে দুম করে ছাঁটাই, এগুলোকে নাম দেয়া হল ফিল্মের নতুন নান্দনিকতা । এটা একটা ফ্যাশান হয়ে দাঁড়াল। আর ফ্রান্স হল সিনেমায় চালিয়াতির দেশ - এমন একটা দেশ যেটা সব হুজুগেই মেতে ওঠে, তাতে যাই হোক না কেন !”

    অনেকটা ক্লদ ওতো নাহার ব্যাখ্যার কাছাকাছি, কিন্তু ততোটা খোশামুদে নয় যদিও, মন্তব্য করেছিলেন রবের বেনায়ুঁ ( Robert Benayoun ) । যেখানে ক্লদ ওতো নাহা বলেছিলেন যে প্রযোজককে শিক্ষা দিতে গোদার ফিল্মটাকে ফালতু করে ফেলতে চেয়েছিলেন, সেখানে বেনায়ুঁ বললেন যে, গোদার জাম্পকাট প্রয়োগ করেছিলেন ফিল্মটার অবধারিত হেলাছেদ্দা থেকে বাঁচাবার খাতিরে, তা না করলে সমালোচকরা তাঁর মুণ্ডুপাত করতো । ১৯৬২ সালের জুন সংখ্যা ‘পজিটিফ-৪৬’ পত্রিকায় তিনি লিখলেন :

    “যে ফিল্মটা দেখানো যাবে না, গোদার তাকে যথেচ্ছ কাটছাঁট করলেন, যাতে সমালোচকরা তা দেখে বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে ওঠেন, আর অমন বাজে ভাবে তৈরি একটা ফিল্ম দেখে,তাঁরা প্রশংসা করে তাঁকে বরং সাহায্যই করলেন, নতুন ফ্যাশান আনার জন্য । ফিল্মের অপচয় ঘটাবার সংশোধনাতীত পরিচালক, অত্যাচার ও ভীতিপ্রদর্শন সম্পর্কে আপত্তিকর বক্তব্যের মূর্খ স্রষ্টা, একজন আত্মপ্রচারকামী, গোদার লোকটি প্রতিনিধিত্ব করেন ফরাসি সিনেমার বুদ্ধিহীন অশিক্ষা আর কাঁচকড়ার ধাপ্পার বেদনাদায়ক অধঃপতনকে ।”

    চার
    ১৯৮০ সালে ‘সিনেমার সত্য ইতিহাসের পরিচয়’ ( Introduction à une véritable histoire du cinéma) প্রবন্ধে গোদার নিজের অবস্হান স্পষ্ট করেছিলেন । তিনি জানিয়েছিলেন যে ‘ব্রেথলেস’ ফিল্মের অমন সম্পাদনার প্রয়োজন হয়েছিল তার দৈর্ঘ্য কম করার জন্য, কিন্তু ক্লদ ওতো নাহা যে কারণ দেখিয়েছেন সেজন্য নয় । গোদার বলেছেন যে চুক্তি অনুযায়ী ফিল্মটার দৈর্ঘ্য এক ঘণ্টা কমানো জরুরি ছিল, এবং তার জন্য প্রযোজক কোনো চাপ সৃষ্টি করেননি, এবং তিনি নিজেও ফিল্মটার দৈর্ঘ্য ১৩৫ - ১৫০ মিনিট রাখতে চাননি । তিনি জানিয়েছেন যে অনভিজ্ঞতার কারণে ফিল্মটার দৈর্ঘ্য বেশি হয়ে গিয়েছিল, এবং তাকে ছোটো করা জরুরি ছিল : “প্রথম ফিল্ম সব সময়েই বেশ দীর্ঘ্য হয় । তার কারণ বেঁচে থাকার তিরিশ বছর পর লোকে তার প্রথম ফিল্মে সবকিছু পুরে দিতে চায় । ফলে তা সব সময়ে দীর্ঘ্য হয়ে যায় । আর আমি সেই নিয়মের বাইরের মানুষ ছিলুম না । আমি একটা ফিল্ম তৈরি করেছিলুম যা ছিল সওয়া দুই ঘণ্টা বা আড়াই ঘণ্টার ; আর ব্যাপারটা অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছিল, কেননা চুক্তি অনুযায়ী ফিল্মটা দেড় ঘণ্টার বেশি হবার কথা ছিল না । আর আমার স্পষ্ট মনে আছে কেমন করে আমি কেটে ফেলবার বিখ্যাত উপায় আবিষ্কার করলুম, তা এখন বিজ্ঞাপনগুলো প্রয়োগ করে : আমরা প্রতিটি দৃশ্য বাছাই করলুম আর একটা নিয়ম মেনে যেখানে ছাঁটা যায় কেটে ফেললুম, আর সেই সঙ্গে ফিল্মের গতি-ছন্দটা বজায় রাখার চেষ্টা করলুম । যেমন ধরা যাক, বেলমোন্দো আর সেবার্গ একটা মোটরগাড়িতে যে সময়ে ছিল, আর নিজেদের মধ্যে কথা বলছিল, একবার একজনের শট নেয়া হয়েছিল, আরেকবার অন্যজনের । এই জায়গাটায় এসে, ছোটো করার খাতিরে, দুজনকেই ছাঁটাই করার বদলে, সম্পাদক আর আমি একটা কয়েন টস করলুম ; আমরা বললুম, দুজনকেই একটু-একটু ছাঁটাই করার বদলে, ওদের যে কোনো একজনকে চার মিনিট ছাঁটাই করে দেয়া যাক, যাতে মনে হয় সেটা একটাই শট । টস করার ফলে বাদ গেল বেলমোন্দো, টিকে গেল সেবার্গ ।”

    বেলমোন্দোকে দেখা যাচ্ছে না কিন্তু দৃশ্যের বাইরে তার সংলাপ ছিল : ‘হায় ! হায় ! হায় ! আমি একজন মেয়েকে ভালোবাসি যার গলা বেশ সুন্দর, বুক বেশ সুন্দর, কন্ঠস্বর বেশ সুন্দর, হাতের কব্জি বেশ সুন্দর, কপাল বেশ সুন্দর, হাঁটু বেশ সুন্দর...কিন্তু সে বড্ডো ভীরু।’ এই সংলাপ যখন শোনা যায় তখন দেখা যায় চুরি করা গাড়িতে প্যাসেঞ্জার সিটে বসে আছে সেবার্গ ; বেলমোন্দো গাড়িটা প্যারিসের রাস্তায় চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছে । একবার অভিনেত্রীর মাথা, আরেকবার সরাসরি আলোছায়া, পৃষ্ঠভূমিতে দাঁড়িয়ে-থাকা বা চলন্ত মোটরগাড়ির শটগুলোর একটা থেকে আরেকটার অসম্বদ্ধতা গোদার-এর জাম্পকাট শৈলী প্রয়োগের শ্রেষ্ঠ উদাহরণ, পরপর সাতটি অমন দৃশ্য দ্রুত ঘটে যায় ।

    অন্যান্য আলোচকরা এই জাম্পকাটকে জাঁ-পল বেলমোন্দো অভিনীত মিশেল পোইচা ওরফে ল্যাসলো কোভাক চরিত্রের সিনেমাটিক অভিব্যক্তি হিসাবে মান্যতা দিয়েছেন, যে চরিত্রটির বিবেকদংশন বলে কোনও ব্যাপার নেই ; যে ঠাণ্ডা মাথায় একজন মোটরসাইকেল-আরোহী পুলিশকে খুন করতে পারে, কিংবা পেচ্ছাপখানায় একটা লোককে পিটিয়ে বেহুঁশ করে তার টাকাকড়ি নিয়ে কেটে পড়তে পারে । এই দৃষ্টিভঙ্গীতে দেখলে, ফাঁকফোকরগুলো মর্মার্থপূর্ণ, কেননা তা ফিল্মে চরিত্রগুলোর আচরণের সঙ্গে খাপ খেয়ে যায় । ফলে ফিল্মটাকে যেভাবে সম্পাদনা করা হয়েছে, আর চরিত্রগুলোর আচরণ চিত্রিত করা হয়েছে , তারা কাঠামোগতভাবে মানিয়ে গেছে ।

    যেমন ধরা যাক, ‘কাহিয়ে দ্যু সিনেমা’ পত্রিকার এপ্রিল ১৯৬০ সংখ্যায় লুক মোলে লিখেছেন, “যেহেতু ফিল্মের চরিত্রগুলোয় এক ধার থেকে প্রতিফলিত হয় নৈতিক জাম্পকাট, ফিল্মটি গড়ে উঠেছে জাম্পকাটের অনুবর্তীতা নিয়ে।” নিউইয়র্ক টাইমস সংবাদপত্রে "ব্রেথলেস" এর সমালোচনায় বোসলে ক্রাউথার (১৯৬১ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি), আরও মজাদার কথা লিখেছিলেন। ক্রাউথার এই পর্যালোচনাতে বলেছিলেন যে, বেলমোন্দো এমন একজন অভিনেতা যিনি সময় শুরু হওয়ার পর থেকে সবচেয়ে কার্যকর সিগারেট-ফুঁকিয়ে আর ঠোঁটে বুড়ো আঙুল ঠেকানো পুতুল । ক্রাউথারের মতে, “সংযোগহীন ছাঁটকাটগুলো গড়ে তুলেছে ছবির শ্রুতিকটুতা-- যা ফিল্মটায় এই জন্য মানিয়ে গেছে যাতে যৌবনের জটিল উপাদানকে প্রদর্শনের করা যায়, যে যুবকেরা সবসময়ে অস্পষ্ট, অসন্তুষ্ট, পশুস্বভাবের এবং কারও বা কোনও কিছুকে পাত্তা দেয় না, এমনকি নিজেদেরও গুরুত্ব দেয় না।”

    জাম্পকাটের সংকেতকে বিস্তারিত পাঠোদ্ধারের প্রয়াস করেছেন অ্যানি গোল্ডম্যান, ‘সিনেমা এবং আধুনিক সমাজ’ Cinéma et société moderne [Paris: Denoël/Gonthier, 1971/1974), pp. 85-86.] পত্রিকায় প্রকাশিত আলোচনায় । গোল্ডম্যানের মতে, ব্যক্তি-এককের মাঝে সম্পর্ক প্রদর্শনের ক্ষেত্রে গোদার জাম্পকাট শৈলী প্রয়োগ করেননি ; এই দৃশ্যগুলোতে, যেখানে মিশেল আর প্যাট্রিসিয়ার ভূমিকায় বেলমো্ন্দো আর সেবার্গ অভিনয় করছেন, সম্পর্ক চিত্রায়িত হয়েছে তাদের আদিম গুরুত্বের কারণে । কিন্তু যেখানে সামাজিক জগতকে চিত্রায়িত করা হয়েছে - যেমন পুলিশটাকে খুন করার -- ফিল্মের উপস্হাপনে খাপছাড়াভাব দেখানো হয়েছে, সম্পাদনা সেখানে হয়ে উঠেছে নির্বস্তুক, শটগুলোর মধ্যে তৈরি করা হয়েছে ফাঁকফোকর, কেননা মিশেলের দৃষ্টিতে সমাজের কর্তৃত্ব যারা করে তাদের প্রতিনিধিদের নিয়ে তৈরি ঘটনা গুরুত্বহীন । “কর্মকাণ্ডটাকে সংক্ষিপ্ত করা হয়েছে, দ্রুততার ছাপ দেওয়ার উদ্দেশ্যে নয়, কারণ নায়ক ঘটনাটিতে আগ্রহী নয় । তার কাছে, এবং দর্শকদের কাছে, যারা জগতকে মিশেলের ভাবনা দিয়ে পরখ করছে, তাদের কাছে এইসব ঘটনাবলীর কোনও গুরুত্ব নেই, কেননা সমাজের ব্যাপারে মিশেল মাথা ঘামায় না । পরিচালক তাই এই দৃশ্যগুলোকে অবহেলায় তুলে ধরেছেন, এমনকি সময়ে-সময়ে দুর্বোধ্যভাবে ।”

    রিচার্ড রাসকিন বলেছেন, এটা দুর্ভাগ্যজনক যে গোল্ডম্যান নিজের দাবি প্রমাণ করার জন্য বিভিন্ন দৃশ্যের আলোচনা করে দেখাননি যে, যেখানে জাম্পকাট প্রয়োগ করা হয়েছে আর যেখানে করা হয়নি, সেই দৃশ্যগুলোতে সামাজিক ও ব্যক্তিগতের ধারাবাহিকতা উপস্হাপন কেমনভাবে করা হয়েছে । ব্যক্তি সম্পর্কের ক্ষেত্রে তিনি কেবল একটাই উদাহরণ দিয়েছেন এবং তা দিয়ে ফাঁকফোকর তৈরি আর ধারাবাহিকতা বজায় রাখার গোল্ডম্যান মডেল প্রয়োগ করা যায় না।

    পাঁচ
    গোদার-এর জাম্পকাটকে ফিল্ম তৈরির নতুন নান্দনিকতা হিসাবেও দেখা হয়েছে, সিনেমার থোড়-বড়ি-খাড়ার একঘেয়ে ডিসকোর্স থেকে মৌলিক পৃথগীকরণ, ভিন্ন পথ আবিষ্কার, এবং অন্যান্য শিল্পে যে বৈপ্লবিক শৈলী প্রয়োগ করে পরিবর্তন আনা হচ্ছে, ফিল্মনির্মাণের ক্ষেত্রেও তাকে নিয়ে এলেন গোদার । ১৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৬১ সালে ফিল্মটি রিভিউ করে আমেরিকার ‘টাইম’ পত্রিকা লিখেছিল যে, ফিল্মের ভাষাতে গোদার নিয়ে এসেছেন কিউবিজম । “দুঃসাহসিকভাবে কিউবিক শৈলী প্রয়োগ করে গোদার একত্রিত করেছেন তাঁর ফুটেজ । প্রতি মিনিটে, অনেক সময়ে প্রতি সেকেণ্ডে, তিনি ফিল্ম থেকে কয়েক ফিট ছাঁটাই করেছেন, তারপর পরিবৃত্তি ছাড়াই আবার জোড়া লাগিয়েছেন । তা সত্বেও কাহিনিকে অনুসরণ করা যায়, কিন্তু প্রতিটি ছাঁটাইয়ের দরুণ ফিল্ম যেমন-যেমন তাল-ছন্দের অধৈর্য প্রবাহে এগিয়ে চলে, তা নায়কের অবধারিত অধঃপতনের অমোঘ পীড়াদায়ক সিঁড়িগুলোর ধাপের দিকে ইশারা করে । আরও সূক্ষ্মভাবে, কৌতুকটি সময়কে বিকৃত করে, পুনর্বিন্যাস করে, পুনঃব্যবস্থা করে - অনেকটা পিকাসো যেমন তাঁর পেইনটিঙ ‘আভিনঁর যুবতীরা’ ( Les Demoiselles d’Avignon )-এ পরিসরের হেরফের ঘটিয়েছেন । সমস্ত অর্থবহ ধারাবাহিকতা বিস্ময় সৃষ্টি করে ।”

    ‘ফিল্ম কোয়ার্টারলি’ পত্রিকার ১৯৬১ সালের বসন্ত সংখ্যায় ‘ব্রেথলেস’ ফিল্মের সমালোচনাকালে আরলেন ক্রোচে গোদারের সম্পাদনাকে তুলনা করেছিলেন জ্যাজ সঙ্গীতের সঙ্গে । তিনি বলেছিলেন যে গোদার যে নান্দনিক শৈলী সৃষ্টি করলেন তা মর্মার্থ থেকে কিছুটা সরে গিয়ে ফিল্ম-মাধ্যমকেই আগ্রহের কেন্দ্র করে তুললেন । “ব্রেথলেস” হল পদ্ধতিগত কল্পনা, সিনেমাটিক জ্যাজ সঙ্গীত । ফিল্মটি দেখার সময়ে গোদারের প্রধান উদ্দেশ্যকে অনুভব করা যায়, যে, তিনি সবার ওপরে সিনেমার একত্রিত টুকরোর স্বয়ংসম্পূর্ণ শৈলী গড়ে তুলতে চেয়েছেন - শট, ছবি, আইকনোগ্রাফি -- যে সমস্ত উপাদান নিয়ে ‘কাহিয়ে দ্যু সিনেমা’ পত্রিকায় তাঁরা আলোচনা করতেন । গোদারের বাস্তব সব সময়ে সিনেমাটিক ; ক্যামেরার উপস্হিতি রয়েছে সেখানে, সেলুলয়েডের দীর্ঘ ফাঁকফোকরের এলোমেলো বিচরণ কিংবা সংক্ষিপ্ত ঝাঁকুনি রয়েছে। সুষম ছাঁটাই আর ডিজলভ প্রায় নেই বললেই চলে; আর ছাঁটাইগুলো প্রায়ই এতো দ্রুত যে কয়েক মুহূর্তের জন্য দর্শক বিলকুল হতভম্ব হয়ে যান । যেমন ধরা যাক সেই দৃশ্যটি, যেখানে বেলমোন্দোর প্যারিসে আগমন দেখানো হয়েছে, এইভাবে : শহরের একটা লঙ শট, একটা গাড়ি এসে দাঁড়ায়, বেলমোন্দো টেলিফোন বুথে ঢোকে, ফোন করে, জবাব দেয় না কেউ, বেরিয়ে আসে, বেলমোন্দো একটা দরোজার সিঁড়িতে, একটুখানি সংলাপ, বেলমোন্দো কেয়ারটেকারের ডেস্কের ওপর থেকে চাবি চুরি করে, বেলমোন্দো ফ্ল্যাটের বাথরুম থেকে বেরোয়, বেশ দীর্ঘ একজন পুরুষ । কাটছাঁট করা এই সিকোয়েন্স এক মিনিটের কম দেখতে পায় দর্শক ; কোনও অবস্হান্তর ঘটে না, কোনও ধারাবাহিকতা থাকে না । প্রায়ই ছাঁটাইগুলো একই শটের ভেতরে দেখা যায় । কেটে কিংবা প্যান করে, অ্যাকাডেমিক মন্তাজের শৈলীতে, কোনো রকম মর্মার্থ আরোপ করা হয় না । ব্যাপারটা স্রেফ সিনেমা জগতের ।”

    ১৯৬৩ সালে প্রকাশিত তাঁর ‘দি কনটেমপোরারি সিনেমা’ গ্রন্হে পেনিলোপ হুসটন বলেছেন, গোদারের নন্দনশৈলী হল কাহিনি বা ন্যারেটিভ থেকে সরে গিয়ে তাৎক্ষণিক অভিজ্ঞতা সঞ্চারিত করার প্রয়াস, যা কিনা সিনেমাটিক ভাষার পটভূমিতে নির্মিত । “ফিল্মটি সম্পাদনা করা হয়েছে, জাম্পকাটের দ্বারা, যাতে প্রথাগত সময়ানুক্রমকে ভাঙা যায় ( আমরা একটি ঘটনার শুরু আর শেষটা দেখি কিন্তু মাঝখানটা দেখতে পাই না ), আর বারবার দৃষ্টিকোণ ও স্হানকে বদল করা হয় । এই ধরণের কৌশল নিছক শৈলীগত অভিনবতা নয় । তা ফিল্ম তৈরির মনোভাবকে স্পষ্ট করে তোলে । পরিচালকের উদ্দেশ্য যদি হতো একটা বিরাট দর্শকদলকে টেনে এনে গল্প দেখানো, তাহলে তিনি দর্শকদের সাহায্য করতেন যাতে তারা সহজে বুঝতে পারে : যদি একটা চরিত্র দেখাতে চায় যে সে কিছু একটা করতে যাচ্ছে, আর তারপর একটা ছাঁটাই এসে যায়, আমরা অপেক্ষা করি কখন সে সেই কাজটা করতে যাচ্ছে, আমরা সিনেমা দেখে-দেখে অমনভাবে চিন্তা করতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি । কিন্তু চিত্রনির্মাতা যদি গল্প নিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে ততো চিন্তিত না হন, দর্শকদের জড়িয়ে নেন ন্যারেটিভকে ছাপিয়ে গিয়ে একটা অভিজ্ঞতার সংবেদন উপভোগ করতে, জীবনে যে ধরণের গোলমাল আর অনিশ্চয়তা দেখা দেয়, তাহলে সেইসব প্রথাগত তারগুলোকে কেটে ঝুলিয়ে দেয়া চলে । ফিল্মটা নিজের যুক্তি খুঁজে পেয়ে তা দর্শকদের ওপরে চাপিয়ে দিতে সফল হয় । “আমরা যা দেখতে পাই তা হল পরিচালক আমাদের যা দেখাতে চেয়েছেন : যদি তাঁর মনে হয় কোনও অংশ বিরক্তিকর আর তা বাদ দিয়ে দিতে চান, তাহলে ধরে নিতে হবে যে দর্শকরা সিনেমার প্রচল রীতিনীতির সঙ্গে তাঁর মতনই যথেষ্ট পরিচিত । নিঃসন্দেহে ‘ব্রেথলেস’ ফিল্মে, চরিত্রগুলোয় যে জীবনবোধ ও উদ্দীপনা গোদার আরোপ করেছেন, তার বাইরে তাদের অস্তিত্ব নেই । ফিল্মটি নিজেই একটি আধুনিকতাবাদী বা উত্তরাধুনিক শিল্পবস্তু ; এবং অন্যান্য আধুনিকতাবাদী বা উত্তরাধুনিক শিল্পবস্তুর ক্ষেত্রে যা ঘটে, দর্শকরা পরিচালকের উত্তেজনার অংশভাক হয়ে ওঠেন ; পর্দা আলোকিত হয়, সময়ের পরীক্ষা-নিরীক্ষা, সিনেমার ভাষা্য অনুসন্ধান ইত্যাদি তাঁদের মনেও পরিচালকের আহ্লাদ জাগিয়ে তোলে ।”

    সম্পাদনার সময়-প্রবাহে বিরামহীনতার মৌলিক নিয়মকে অস্বীকার করার গোদারীয় কর্মকাণ্ডকে সিনেমাটিক শিল্পে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসাবে দেখা হয়েছে । অন্য দৃষ্টিতে, বিশেষ করে ষাটের দশকের আগের সিনেমাটিক ‘ঐতিহ্য’ অনুসারী পরিচালক ও সমালোচকদের চোখে, যাকে মনে করা হয়েছে ধ্বংসাত্মক, এই তর্কে গোদারের জাম্পকাট একটি গঠনমূলক কাজ।

    গোদার নিজে, অন্তত একবার যা বলেছেন, তা কিন্তু ততো ইতিবাচক নয়, যতোটা তাঁর গুণগ্রাহীরা জাম্পকাট প্রয়োগের প্রয়োজনীয়তায় জোর দিয়ে বলেছেন । ‘ফিল্মস অ্যাণ্ড ফিল্মিঙ’ পত্রিকায় আগস্ট ১৯৬১ সালে প্রকাশিত গর্ডন গাউকে ‘ব্রেথলেস’ সম্পর্কে দেয়া সাক্ষাৎকারে, তাঁকে যখন প্রশ্ন করা হয় যে ‘ব্রেথলেস’ ফিল্ম তোলার সময়ে তাঁর মনে ঠিক কী কাজ করেছিল, তার জবাবে গোদার বলেছিলেন যে তিনি কোনো নিয়ম মানতে চাননি, আর ফিল্ম তৈরি করার প্রচলিত নিয়মাবলীকে অস্বীকার করতে চেয়েছিলেন । তাঁর মতে ‘হিরোশিমা, মন আমোর’, হল নতুন সিনেমার পথিকৃৎ, আর ‘ব্রেথলেস” ছিল পুরোনো সিনেমার সমাপ্তি । তিনি ফিল্মটা তুলেছেন বাস্তব লোকেশানে আর বাস্তব ঘরে, কোনও স্টুডিওর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল না । পরে অবশ্য গোদার ফিল্মস্টুডিওতে কাজ করেছেন আর জানিয়েছেন যে স্টুডিওতে কাজ করার সুবিধাও আছে । ‘ব্রেথলেস’ ফিল্মে তিনি হ্যাণ্ড-ক্যামেরা ব্যবহার করেছিলেন, কেননা তিনি অধৈর্য চরিত্রের মানুষ, এবং যখন তিনি ছবি তোলার জন্য তৈরি, তখন তিনি ক্যামেরার অবস্হানের জটিলতা নিয়ে চিন্তা করতে চান না । আর ফিল্ম তোলা শেষ হবার পর, তিনি কাটছাঁট করেছিলেন সিনেমাটিক নৈরাজ্য আনার খাতিরে, আনতে চেয়েছিলেন প্রযুক্তিগত কালাপাহাড়ি । ওই একই সাক্ষাৎকারে গোদার বলেছেন যে জাম্পকাট প্রয়োগ করার সময়ে তাঁর মাথায় অমন ধারণা ছিল না যে ব্যাপারটা মিশেলের গোলমেলে মানসিকতার প্রতিনিধিত্ব করবে, তবে গোদার এ-কথাও বলেছেন যে চরিত্রটা স্বাভাবিক হলে তিনি টেকনিকটা তার ক্ষেত্রে প্রয়োগ করতেন না ।

    অ্যানিয়েস গুইমো ( Agnes Guillemot ), যিনি ষাটের দশকে গোদারের অধিকাংশ ফিল্ম সম্পাদনা করেছিলেন বা গোদারের সঙ্গে সহসম্পাদনা করেছিলেন, তিনি ‘কাহিয়ে দ্যু সিনেমা’ পত্রিকার ১৯৯০ সালের নভেম্বর সংখ্যায় প্রকাশিত থিয়রি জুস ( Thierry Jousse ) ও ফ্রেদেরিক স্ত্রসকে ( Frederic Strauss ) দেয়া সাক্ষাৎকারে গোদারের অভিনব সম্পাদনাশৈলী সম্পর্কে এই কথাগুলো বলেছেন : “গোদার জাম্পকাটের বিশেষজ্ঞ নন, তিনি সিনেমার শ্বাস-প্রশ্বাসের বিশেষজ্ঞ, এবং এই দুটি ব্যাপার এক নয় । তাছাড়া সিনেমার শ্বাস নেয়ার ক্ষেত্রে সম্পাদকদের কাটছাঁটের তথাকথিত প্রথাগত রীতিনীতি ছিল একটা বিরাট বাধা । গোদার হলেন ফিল্মনির্মাণে সাহস ও স্বাধীনতার বিশেষজ্ঞ । সম্পাদনার ক্ষেত্রে সিনেমা কেমন হওয়া উচিত সে কথা মাথায় রাখতেন গোদার ।
    [ রচনাকলাল : ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ]
  • "ছোটোলোকের জীবন" প্রকাশিত হয়েছিল 'আখর' পত্রিকায় | 141.101.107.239 | ০৭ এপ্রিল ২০২০ ১২:০৩730473
  • ছোটোলোকের জীবন : মলয় রায়চৌধুরী

    আমি আজও আমার প্রথম বইটা লেখার চেষ্টায় বাংলা ভাষাকে আক্রমণ করে চলেছি ।
    ইমলিতলায় ছিলুম বামুনবাড়ির মহাদলিত কিশোর ।
    দেখি খুল্লমখুল্লা লেখার চেষ্টা করে কতোটা কি তুলে আনতে পারি উপন্যাস লিখতে বসে ঘটনা খুঁড়ে তোলার ব্যাগড়া হয় না জীবনকেচ্ছা লিখতে বসে কেচ্ছা-সদিচ্ছা-অনিচ্ছা মিশ খেয়ে যেতে পারে তার কারণ আমি তো আর বুদ্ধিজীবি নই জানি যে মানুষ ঈশ্বর গণতন্ত্র আর বিজ্ঞান হেরে ভুত ।
    ঘোঁচু ছিলুম স্বমেহন বলুন ম্যাস্টারবেশান বলুন আমাকে শুরু করতে হয়েছিল কলেজে ঢুকে আসলে জানতুমই না একদিন পাটনার গান্ধি ময়দানে বসে রুমালে চিনেবাদাম রেখে আমি সুবর্ণ তরুণ আর বারীন খাচ্ছিলুম সুবর্ণ তরুণকে বলল এই তুই বড়োগুলো খেয়ে নিচ্ছিস জবাবে তরুণ বলল কি করব বল চিন্তায় আছি আজকাল দিনে তিন বার হাত মেরে ফেলছি আমি জানতে চাইলে হাত মারা আবার কি ব্যাপার সুবর্ণ বললে শালা হাত মারা জানিস না নুনুর খোসার তলায় যে নোংরা থাকে তা পরিষ্কার করিস না বারীন বলল বাঞ্চোৎ মেয়ে ফাঁসিয়ে বেড়াচ্ছিস হাত না মারলে খোসার তলার নোংরা যদি কোনো মেয়ের লাবিয়া মাইনরায় ঢুকে যায় তার লাইফ হেল হয়ে যাবে বললুম আরে শালা চুতিয়া কাহিঁকা হাত মারা কী জিনিস সেটাই বলবি তো তাহলে খোসার তলাকার নোংরা পরিষ্কার করব সুবর্ণ বলল নুনুতে সাবান লাগিয়ে ডান হাতটা এইভাবে নিবি আর নুনুকে সাবান মাখাতে থাকবি ব্যাস ফণফণিয়ে বেরিয়ে পড়বে তোর লিকুইড ডায়মণ্ড কি লজ্জা কি লজ্জা নাইটফল নিয়েই ছিলুম মজায় নিজেই পায়জামা পরের দিন সকালে কেচে ফেলতে হতো নয়তো ধোপাটা “ই কাহেকা দাগ লগলই” বলে টিটকিরি মারবে তাই কলেজে ঢুকে চেককাটা গাঢ় রঙের লুঙ্গি পরা শুরু করেছি যাক শুরু হয়ে গেল আমার ম্যাস্টারবেশানের কালখণ্ড সমস্যা হল যে বুড়ো বয়সে প্রস্টেটের জন্যে ইউরোলজিস্টকে দেখাতে গেলে ডাক্তার জিগ্যেস করলে আর ম্যাস্টারবেশান করেন না বললুম না কেন দরকার হয় না বউ আছে তো বউয়ের মেনোপজ হয়ে গেছে ডাক্তার বললে আপনাদের লোকে ভুল বুঝিয়েছে ম্যাস্টারবেশান পঞ্চাশ বছরের পর আবার শুরু করতে হয় যাতে প্রস্টেট গ্ল্যাণ্ড মরে না যায় আপনি ভাবলেন বউয়ের সঙ্গে শুলেই কাজ হয়ে গেল তা ঠিক নয় শোয়াটা মনের ব্যাপার দেহের ব্যাপার হল ম্যাস্টারবেশান যাকগে আপনি তো যে বয়সে পৌঁছেচেন আর ম্যাস্টারবেশান করে লাভ হবে না কেননা প্রস্টেট গ্ল্যাণ্ড অলরেডি মরে গিয়ে ফুলতে আরম্ভ করেছে শুধু ওষুধ খেয়ে ওর ফোলা থামিয়ে রাখতে হবে বছরে একবার সোনাগ্রাফি আর পেচ্ছাপের রিপোর্ট আনবেন তাহলেই হবে মনে রাখবেন ম্যাস্টারবেশনে প্রমোদকর লাগে না।
    সেক্স ? চিরকাল দিনের আলোয় চোখ খুলে রেখে আমার ভালো লাগে রাতের অন্ধকারে নয় রাতে হলে জোরালো আলো চাই । হাড়কাটা হোক, সোনাগাছি হোক, কালীঘাট হোক, খিদিরপুর হোক, পার্কস্ট্রিটের সন্ধ্যা হোক, ফ্রিস্কুল স্ট্রিট হোক, সব দিনে কিংবা আলোয় । খাটে নয়, চোটে ।
    যখন প্রথম পর্ণোগ্রাফিক ফিল্ম দেখলুম তখন ভাবলুম যে কেন এদের ম্যাজিক রিয়্যালিস্ট ফিকশান বলা হয় না ।
    বাঙালি সাহিত্যিকদের চাঁদমারি ভাগ্য যে তাঁদের ইউরোপীয় সাহিত্যের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হয় না বাংলা পাল্প ফিকশন হল ঘোলা জলের আয়নায় মুখদর্শন ।
    সাহিত্যজগত থেকে ছিঁড়ে নিজেকে আলাদা না করলে লেখালিখি করা যায় না আমাকে বোঝার চেষ্টা করা হেঁয়ালি তাই আমার লেখালিখিকে বুঝুন ।
    আমি সাহিত্যিক লাউডগাগিরিতে ভুগি না বুঝলেন তো আমার লেখালিখি নিছক সাহিত্য নয় গণপাঠককে আনন্দ দেবার জন্যে নয় তা পাঠককে চৌচির করে তার ভেতরে সমাজরাষ্ট্রের গুগোবর ভরে দেবার জন্যে আর আমি শিল্প ব্যাপারটার বিরুদ্ধে কেননা আমাকে সারিয়ে প্রাচীন গ্রিক হেলেনিক সমাজের যোগ্য করে তোলা যাবে না আমি চাই না যে আমার শবযাত্রায় কবি-লেখকরা ভিড় করুক একজনকেও চাই না সবচেয়ে আনন্দের ব্যাপার হলো যখনই মরি না কেন যুবাবস্হায় মারা যাবো মাঝে পনেরো বছর মরে গিয়ে যাচাই করে নিয়েছিলুম আমি লেখালিখি বেছে নিইনি লেখালিখি আমাকে বেছে নিয়েছে লেখকদের একেবারে তলায় নেমে গিয়ে ধাঙড় হতে হয় জানি পরের জন্মে ঘুর্ণিঝড় হয়ে জন্মাবো ।
    কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টোর কপি কৈলাস পর্বতে তুলে রেখে এসেছি দেখলুম আগেই কেউ মনুস্মৃতি রেখে গেছে ।
    প্রথম আদিম মানুষ যেমন পাথরের ছোরা আবিষ্কার করেছিল তেমনই আমি নিজের লেখালিখির অস্ত্রশস্ত্র আবিষ্কার করে ফেলেছি কিন্তু সার্কাসে যে লোকটা সিংহদের আগুনের ভেতর দিয়ে লাফাতে বাধ্য করত তাকে আমি ছোটোবেলায় মাফ করতে পারিনি আমার সবক’টা দুঃস্বপ্ন চোখ খুলে কেননা ঘুমে সবচেয়ে রসালো স্বপ্নগুলো দেখি ভোরের পুকুরে মৌরলা-ঝাঁকের মতন সুন্দুরীদের দল আমার উচ্চাকাঙ্খা ছিল একটা বিশাল বেশ্যালয় কিনি আর চোরাকারবারের মালিক হয়ে লুকিয়ে বেড়াই কিন্তু যখন ভারতীয় বাস্তবে পচতে থাকি তখন মগজে লেখা আসেনা মনে হয় সেসময়ে কেউ একজন আমাকে একটা শ্মশান বা গোরস্তান উপহার দিক হোমো স্যাপিয়েন মানুষের প্রথম যে করোটি পাওয়া গিয়েছিল তা যে আমার লেখালিখিই তার প্রমাণ।
    দেশটা দিনকেদিন চুতিয়ায় ভরে উঠেছে গুয়ের সমুদ্রে ডানে পড়ি বা বাঁয়ে । একজন কমিউনিস্ট নেতাকে জিগ্যেস করেছিলুম, দেশভাগের সময়ে তো ঢাকা থেকে পালিয়ে এসেছিলেন ধর্ম বাঁচাবার জন্য, তা এখানে এসে নাস্তিক হয়ে গেলেন যে ? ঢাকাতেই নাস্তিক থাকতে পারতেন, এই ধর্ম হোক বা সেই ধর্ম, নাস্তিকের আবার ধর্ম হারাবার ভয় আছে নাকি । শুনে, তাঁর চটি হয়ে উঠলো স্পোর্টস শু ।
    আমার দু’রকম চোখ নিয়ে রাস্তায়-রাস্তায় হাঁটতে আমার ভালো লাগে আমি তখন তাকিয়ে থাকি কিন্তু দেখি না অন্য সময়ে তাকাই আর দেখি পৃথিবীর কতো-কতো শহর গ্রাম গঞ্জের পথে-পথে এই ভাবেই চকরলস কেটেছি ।
    আমাকে নিয়ে ঠাকুমা অপূর্বময়ীর অতিকথায় বলা আছে যে আমি দু’বছর বয়সে ‘কুজঝটিকা’ স্পষ্ট উচ্চারণ করেছিলুম কিন্তু কনভেন্ট ইশকুলে ভর্তি হবার পর আর পারতুম না বলে রামমোহন রায় সেমিনারিতে ভর্তি হলে বাংলার মাস্টারমশায় এক্ষুনি নাম মনে পড়ছে না ও হ্যাঁ কর্মকারবাবু তবে ওই ইশকুলে টিচারদের পদবি বা নামে বাবু যোগ করতে হতো ব্রাহ্মধর্মের ফিকে-রেশ হিসেবে বলেছিলেন “শব্দটা অরুন্ধুতী নয় রে অরুন্ধতী তুই কি ঘটি ” সহপাঠী তরুণ শূরকে জিগ্যেস করি ঘটি কী রে গাণ্ডু ঘটি জানিস না পাটনাইয়া বওড়াহা ভঁয়সালোটন কোথাকার বাঙালের বিপরীত সমাস বাঙাল-ঘটি দ্বন্দ্বসমাস নীলাংশুবাবুর ক্লাসে জানতে পারবি উনি চাটগাঁর সত্যিই জীবনকে মরচে-পড়া থেকে বাঁচাতে হলে জিভে পালিশ দিয়ে রাখতে হবে ভালোবাসা এক রকমের কল্পনার অসুখ আর আমার ঠাকুমার নাম জানেন তো “অপূর্বময়ী” তাঁর শাশুড়ির নাম “মাতঙ্গিনী”। ঠাকুমার ছোটো বেয়ানের নাম বিবসনা । এমন অসাধারণ নামগুলোকে লোপাট করে দিয়েছে কসমোপলিটান আধুনিকতা ।
    তিন বছর বয়সে মহাদলিতদের পাড়া ইমলিতলার গলিতে লেত্তি দিয়ে লাট্টু ঘোরাতে শিখে যাই হাতের তালুতে কেয়া চকরলস কাটিস হ্যায় বাঙালিয়া গিল্লি-ডাণ্ডা বা ড্যাংগুলি খেলার চেষ্টা করতে গিয়ে কপালে আলু নিয়ে ফিরি তিন বছর বয়সেই কনভেন্টে ভর্তি হবার জন্য নটিবয় শু কিনতে গিয়ে জানতে পারি যে আমার বাঁ পায়ের চেয়ে ডান পা বড়ো পায়ের কড়ে আঙুলের পাশের আঙুল ছোটো জানতে পারি যে আঁস্তাকুড়ের দিকে একবার তাকালেই যেমন টের পাওয়া যায় তা বাতিল জঞ্জালের জমঘট তেমনিই অনেক লোকের দিকে এক পলক তাকিয়েই বুঝতে পারি যে তার জীবনের গর্তে আছে শুধুই টাকাকড়ি শুধুই শুধুই ইমলিতলায় বসবাস না করলে ইমলিতলাকে জানতে পারা অসম্ভব ইমলিতলার নানা রঙের নানা কাপড়ের নানা পোশাকের তাপ্পি মারা ক্যাঁদরায় আমি মোড়া সমস্যা হল যে আমি আবার খোলের ভেতরে ঢুকে যেতে পারি না আর তো গুটিপোকা নই বদলে গেছি তবু আজও সুন্দরীদের দিকে তাকালে মন দুঃখে ভরে ওঠে ।
    চার বছর বয়সে ন্যাড়া ছাদে উঠে ঘুড়ি উড়িয়ে পাতা-হাতে ছড়ির মার খেয়েও ওড়াতুম আর অন্যের ঘুড়ি কেটে নাচতুম কপিলের দাদু একভাঁড় তাড়ি খাইয়েছিল আর মা মুখ শুঁকে গন্ধ পেয়ে ঘরে বন্ধ করে রেখেছিল “তাড়ি নিশা নহি হ্যায় খোখা ভুখ সে বচাতা হ্যায় বদন মেঁ তন্দুরুস্তি” কি করেছি আর কি করতে পেরেছি তার জন্য আপশোষ নেই অনেক মন্দিরে দেখতুম উপস্হিত সবাই মাটিতে একেবারে বোবা হয়ে বসে আছে ঈশ্বরের শব রাখা রয়েছে সামনে পুরুষের আধ্যাত্মিকতা ব্যাপারটা বেশ সন্দেহজনক তখন থেকেই যদিও মা-বাবা আদরযত্ন করে মানুষ করেছিলেন তবু একা রয়ে গেছি ইমলিতলার ছাদে প্যাকিংবাক্সে মাটি ভরে তাতে ফুলের গাছ পুঁতে ফুলগুলোর সঙ্গে বন্ধুত্ব করতুম কেন্নোদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করতুম উচ্চিঙড়ের সঙ্গে কাঠবিড়ালিদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করতুম গেঁড়ি-গুগলিদের সঙ্গে শুঁয়াপোকার সঙ্গে বন্ধুত্ব করতুম ফাঁদে পড়া ইঁদুরের সঙ্গে বন্ধুত্ব করতুম ঘরে আটক চড়ুইপাখির সঙ্গে বন্ধুত্ব করতুম বড়ো হওয়া মানে কুৎসিত অনিশ্চয়তার সঙ্গে বন্ধুত্ব করা ।
    পাঁচ বছর বয়সে রাস্তার কলে চান করার সময়ে যাকে ইচ্ছে কনভেন্টে শেখা ‘ফাক ইউ’ বলতুম আর ইংরেজিতে তার সঙ্গে কথা বলেছি বলে তার আনন্দ উপভোগ করতুম ইমলিতলার গঞ্জেড়িদের মানে যারা গাঁজাচরস টানে তাদের জমায়েতে ছিলিম টানতে গিয়ে কেশেছি শুয়োরের মাংসের ঝোল খাইয়ে বনসি দুসাধ কাশি থামিয়েছিল “জিনদিগি ববুয়া য়হাঁ সে ওয়াহাঁ” শুয়োরের মাংস হয়ে যায় কতো কি শিখেছি কনভেন্ট ইশকুলে হ্যাম বেকন প্রোসিয়েটো সসেজ টেরিনস জেলাটিনো সালামি বোলোনা জামবন ট্যাকব্যাক মোরটাডেলা উইনার শুয়োর মানে গোলাপি শুয়োর যারা ঠোঁটে লিপ্সটিক মেখে জন্মায় আঘাতহীন শৈশব হয় না কখনও মা কখনও বাবা কি মনে করিয়ে দেননি তুই বাতিলের দলে তুই একটা ফালতু উধাও হবার আগে কেউই বিদায় জানিয়ে হাত নাড়ে না যেমন-যেমন বুড়ো হও তেমন-তেমন তুমি তোমার বুড়ির মধ্যে তোমার মা-বাবাকে খুঁজে পাও যে তোমাকে চিপকে থাকবে যা বুড়ো বয়সে তোমার বড্ডো দরকার ।
    ছ’বছর বয়সে সারাদিনে একবস্তা কয়লা একা ভেঙেছি প্রায়ই প্রায়ই প্রায়ই আর মামার বাড়ি পাণিহাটির পুকুরে ছিপ ফেলে মাছ ধরেছি বঁড়শিতে আটকানো মাছের লাফানি-ঝাঁপানি সে কী মজা “দেখি কী মাছ ধরেছিস ? কী মা্ছ ওটা?” জানি না বঁড়শিতে আটকাচ্ছে তুলে নিচ্ছি “খোট্টা মেড়ো কোথাকার, মাছের নাম জানিস না বিভাস ওকে আজকে মাছের বাজারে নিয়ে গিয়ে মাছেদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিস” আসলে ইমলিতলার সব রকমের আনন্দে ভোগার প্রচুর সুযোগ পেয়েছি অথচ আমি আজও এই বুড়ো বয়সেও লেখালিখি করি তার কারণ আমি খুঁজে পাইনি যে আমি লোকটা কে প্রথম কবিতার বই “শয়তানের মুখ” কৃত্তিবাস প্রকাশনী থেকে বেরোলেও কলকাতায় কলেজ স্ট্রিট এলাকার প্রেসগুলো আমার নাম দেখে ছাপতে চায়নি মানুষের মুখ আর শয়তানের মুখে পার্থক্য ছিল না ছাপাতে হয়েছিল বহরমপুরে মণীশ ঘটক ব্যবস্হা করে দিয়েছিলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় প্রকাশক কিন্তু যে-কবিতাগুলো ছাপার পর আমার ভালো লাগেনি তাতে “CANCELLED” রাবার স্ট্যাম্প মেরেছিলুম বলে সুনীল গাঙ্গুলি খাপ্পা অথচ নবারুণ ভট্টাচার্য তাঁর পত্রিকায় আমার কবিতার বই রিভিউ করাতে চাননি আমার গদ্য ছাপতে চাননি কেননা আমার “নামগন্ধ” উপন্যাসে যিশু বিশ্বাস নামে চরিত্রের বাবার মোটর গাড়ি চুরি হয়ে গিয়েছিল সেই থিয়েটার হলের সামনে থেকে যেখানে বিজন ভট্টাচার্যের “নবান্ন” অভিনয় হচ্ছিল ব্যাপারটা এতোই আনন্দদায়ক যে মনে হয় তা বুঝি দুঃখ সময়ের রঙ হয় কুচকুচে কালো চাইবাসার রোরো নদীর ঠাণ্ডা জলে চান করতে গিয়ে একাকীত্বের মাতনে মেতেছি আসলে আমি তো একজন আউটসাইডার জেলের দেয়ালে কয়েদিরা যা লিখে রাখে তা আমাকে উদ্দেশ্য করে । আমি বুলগাকভ পড়িনি ।
    সাত বছর বয়সে ঘুঁটে ভেঙে তার তলায় প্যাকিং-বাক্সের কাঠের টুকরো সাজিয়ে কয়লা রেখে উনোন ধরাতে পারতুম সকালে দাঁত মাজার জন্যে সাদা রঙের ছাই বড়োজ্যাঠার জন্যে আলাদা করে রাখতুম মহাদলিত গঞ্জেড়িদের তবেলায় হাতে তমঞ্চা নাড়িয়ে দেখেছিলুম তেমন ভারি নয় অনেক সময়ে দুর্ভোগ অদৃষ্টের কোপ থেকে বাঁচায় আদালতের জজ যখন জিগ্যেস করেছিলেন “আর ইউ গিল্টি” তখন মিথ্যে কথা বলেছিলুম যে না আমি গিল্টি নই কিন্তু কতো যে বেআইনি কাজ করেছি তমঞ্চার গুলি চালানোর মতন তা উনি জানতে চাননি আসলে সবচেয়ে ক্ষতিকর হল মানুষের নাম যা গাঁজা ফুঁকে বা পাঁড় মাতাল হয়েও মগজ থেকে যায় না তার জন্য বদ্ধউন্মাদ হতে হয় চুল কাটার সময়ে সেলুনের আয়নায় নিজেকে আগন্তুক মনে হওয়ার সেই শুরু সকলকেই যে বুঝে উঠতে পারি তা নয় এই যে লিখতে বসেছি নিজের কন্ঠস্বর শুনতে পাচ্ছি না শুনতে পাচ্ছি পাণ্ডুলিপির গলার আওয়াজ আমার নিজের জীবন আমি বেঁচে নিচ্ছি ব্যাপারটা ত্যাবড়ানো নিঃশেষ না করে ছাড়ে না অস্হির অপরাধবোধে টইটুম্বুর তবুও আমার জীবন একেবারে টানটান ।
    আট বছর বয়সে আলোয় গড়া চামড়ার কালো তেলালো কুলসুম আপার সঙ্গে প্যাণ্টুল খুলে লেংটুর ঘষাঘষি খেলেছি “কোশিশ কর উল্লু কহিঁকা কোশিশ কর নহিঁ তো গোস্ত নহিঁ খিলাউঙ্গি” ওনার গায়ে জংধরা লোহার গন্ধ নোনতা তন্দুরি-চিকেন বুক ওনাদের বাড়ির গোরুর মাংসর মোগলাই খেয়ে বাড়ি ফিরে মাকে মিথ্যে কথা বলেছি টাটকা মাংস আর রাঁধা মাংসের লোভে প্রায়ই মিথ্যে কথা বলেছি ইউ আর গিল্টি ইউ কেননা আমি তো দার্শনিক মিথ্যে কথা বলার অধিকার আছে আর খিদে তো জীবনশৈলী জেনেছি অন্ধকারে চোখের চরিত্র পালটে যায় আঙুলের ডগায় চোখ গজিয়ে ওঠে গির্জা মন্দির আর মসজিদের মধ্যেকার গন্ধ কিন্তু এক নয় রোমান্টিক প্রেম হল একেবারে অবাস্তব ব্যাপার নয়তো তক্ষুণি-চেনাকে স্পর্শ করলেই দুপক্ষের কালো জঙ্গলে কেন তরল ব্যাপার খেলা করতে থাকে বুঝতে পারছেন এই যে হ্যালো শুনছেন ছায়াদের ভুতুড়ে জগত সেই যে আমার নানা রঙের দিনগুলি তাতে কালো রঙের মাত্রা বেশি তখন জানতুম না কী কোশিশ করতে বলছেন কুলসুম আপা প্রেম জীবনকে থামিয়ে রাখে কিছুক্ষণ কিছুদিন কয়েকমাস কয়েকবছর ব্যাস কাফেরের সঙ্গে যৌনসংসর্গ করে কুলসুম আপাকে জন্নতে লুকিয়ে-চুরিয়ে যেতে হবে ।
    নয় বছর বয়সে ব্লেড দিয়ে মুর্গির গলা কেটে গলা চিপে থেকেছি যাতে রক্ত বেরিয়ে স্বাদ না নষ্ট হয় চুড়িঅলা শিখিয়েছিল মুর্গির মাংস জায়ফল দিয়ে রাঁধলে গন্ধ কেটে যায় ছাদে দাঁড়িয়ে পালক ওড়া দেখেছি বুক-ওঁচানো মেয়েদের দিকে চোখ চলে গেলে ফিরিয়ে নিইনি মনে হয়েছে ওর হাতে কাতলা মাছের চোখ খুবলে আশীর্বাদী আংটি পরিয়ে দিই বলি উইল ইউ ম্যারি মি তুমি কি ঝড়ের চিরুনি দিয়ে চুল আঁচড়াও প্রতিটি প্রেম তার এক্সপায়ারি ডেট নিয়ে আসে তবু আমার মনে নেই শেষ কবে অবিবাহিতা যুবতীর আদর খেয়েছি পাহাড় ধ্বসে পড়লে তার চূড়াটা নামে সব শেষে অথচ তার ভারেই পাহাড়ের অধঃপতন সৎ আর সত্যবাদী হলে প্রেম উবে যায় যুক্তিতর্ক আমার সহজপ্রবৃত্তিকে দুমড়ে-মুচড়ে কিম্ভুতকিমাকার করে দিয়েছে কেউই ব্যাখ্যা করতে পারে না কাকে আলোকপ্রাপ্তি বলে অথচ মানুষ ভয় পেলেও বোকার মতন হাসে যারা ড্রিফটার তাদের আমি পছন্দ করি না ।
    দশ বছর বয়সে নমিতা চক্রবর্তী মানে নমিতাদিকে ‘ভালোবাসি তোমাকে’ লেখা চিরকুট দিয়েছিলুম যা উনি যত্ন করে বারো বছর রেখে দিয়েছিলেন চুমু খেতে চাইলে দিতেন হয়তো কিংবা নিশ্চই ওনার-আমার দুজনেরই সাহস হয়নি ইঁদুরের দিকে তাকিয়ে গোখরোও ভিতু হয়ে যায় অনেক সময়ে কেবল “পুঁজিবাদ নিপাত যাক”, “দুনিয়ার মজদুর এক হও” এই সব শুনতে নমিতাদির ভাল্লাগে ধুসসালা, “বই পড় বই পড় বই পড় বই পড় এই বইগুলো নিয়ে গিয়ে পড়” ফলে কাগজ পড়ি চিরকুট পড়ি ঠোঙা পড়ি পোস্টার পড়ি বাংলা হিন্দি ইংরেজি ভোজপুরি মৈথিলি আর দাদার সঙ্গে গঙ্গায় সাঁতার শিখতে গিয়ে ডুবে যাচ্ছিলুম বলে পরে চুমু খাবার মতনই সাঁতার শেখার সাহস হয়নি অথচ আমার জীবন আরম্ভ হয়েছিল নমিতাদির দেয়া প্রথম রবীন্দ্রনাথ থেকে তার আগে আনপঢ় ছিলুম ভাষাকে আক্রমণ করার গোপন চাবিকাঠি দিয়েছিলেন উনি কর্তৃত্বকে আমি ইন্সটিংক্টিভলি ঘৃণা করি সমস্যা হল যে আমার নিজের কোনো বোন ছিল না ইসকুলের টিচাররা কোনোদিন শব্দের রহস্য বুঝিয়ে উঠতে পারেননি ।
    এগারো বছর বয়সে বাবার ফোটাগ্রাফির দোকানে বসে জিনিসপত্র বিক্রি করে তা ‘দিবসান্তে কতো টাকা রোজগার হইল’ ( Income ) বাঁদিকে আর ‘দিনভর কি বিক্রয় হইল’ ( Items ) ডানদিকে খেরোর খাতায় লিখে রাখতুম বাবা কি পুঁজিবাদি উনি বলেন “বাড়িটা বানাবার জন্যে আর ভাইদের সংসারের জন্যে পুঁজিতে টান পড়ছে” বাবা কি মজদুর আট ঘণ্টা ডার্করুমে কাটান অক্সিজেনের অভাবে প্লুরিসি হয়ে গেল মেজদা মারা গিয়ে আমাদের পরিবারে অমর হয়ে আছে জানেন কি আমার বাবা-কাকা-জ্যাঠা জীবন শুরু করেছিলেন ফিরিঅলা হিসেবে রঞ্জক সাবান জামের ভিনিগার পদ্মফুলের শুকোনো বিচি নিচুতলায় বসবাস না করলে পুরো সমাজ সম্পর্কে কিছুই জানা যায় না পর্ণোগ্রাফির ফিল্মের চরিত্রদের মতন সাংবাদিকরা তাদের মালিকের অনৈতিকতায় ভোগে তারা বিমূর্ত ভাবনাচিন্তাকে ভয় পায় বিশেষ করে দোজখ-নাজেলের আতঙ্ক ।
    বারো বছর বয়সে ইশকুলের পত্রিকায় ইংরেজিতে কবিতা লিখেছিলুম যা পড়ে রামমোহন রায় সেমিনারির সব-বিষয়ের মাস্টারমসায় অধিকারীবাবু বলেছিলেন “বাঃ, বেশ ভালো লেখার হাত তা ওটা কি তোমার মাতৃভাষা” কিন্তু কথিত যে আমার মধ্যে একজন কবিকে আবিষ্কার করেন ঠাকুমা অপূর্বময়ী যখন ইশকুলের কাগজে ইংরেজিতে কবিতা উনি দেখেছিলেন আমার মধ্যে একজন দার্শনিককে আবিষ্কার কেননা বলেছিলুম ‘‘যে কাজ বাড়ির গুরুজনরা জানতে পারেন না তা খারাপ কাজ নয় ‘’ প্রথম প্রেমিকার আবদারে হিন্দিতে লেখা ছবি আঁকা পানু পড়ার নেশা গাঁজার ধোঁয়ার মতন মিথ্যে কথা ঢের-ঢের বলেছি ইউ আর গিল্টি সেমিনারি ইশকুলে ভর্তি হয়ে বুঝেছি এই হল আসল ইশকুল যেখানে আমার সহপাঠীরা নিজেদের মধ্যে প্রথম হবার লড়াই করে চলেছে উচ্ছৃঙ্খল দ্রোহী মনখোলা ম্যাভেরিক আপোষহীন দুঃসাহসিক নিয়ম ভাঙতে ওস্তাদ নিল ডাউন স্ট্যাণ্ড আপ অন দি বেঞ্চ হাতে-ছড়ি কানমলা গালে-চড় এতো আদেশ মেনে নিতে তৈরি হলেও যা ইচ্ছে তাই করো এরা কেউই কনভেন্ট ইশকুলের সহপাঠীদের মতন শান্ত সুশীল স্বভাবের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন নয় কোনোকিছুতেই অবাক হয় না আশ্চর্য হয় না যেন ঝড়ের ভেতর দিয়ে এসেছে গায়ে ধুলোর চাদর গা ঝাড়লে সোনার গুঁড়ো ওড়ে ভিজে কুকুরদের জল ছেটানোর মতন একটা আইসক্রিম আমরা আটজন সহপাঠী মিলে চেটে খাই।
    দার্শনিক হলেও তেরো বছর বয়সে ইমলিতলার পেঁকো নর্দমা থেকে কারোর ফেলে-দেয়া বেলুন তুলে ফোলাতে চেষ্টা করার পর কলেরার ভুতে ধরেছিল আমায় কলেরা সারাবার জন্য বড়জেঠিমার বন্ধু রামপতিয়া আমার গলায় হাঁঙরের দাঁতের মালা পরিয়ে রোগ সারিয়েছিল আসলে ছাগলের দাঁত যেগুলো মছুয়াটুলির কসাইরা মাথা বিক্রির সময়ে ফেলে দ্যায় বাড়ির লোকে তাই বলে অক্ষয় ডাক্তারের ইনজেকশানে সারেনি তেরো বছর বয়সে ছোটোকাকিমার বোন খেমির পাশে ছাদে চাদরের তলায় শুয়ে কুলসুম আপার শেখানো খেলা খেলেছি বোতামবুকো সুন্দুরী আমার চেয়ে বয়স বেশি মাসি বলবি তবে গায়ে হাত দিতে দেবো ঠোঁটের কোনে রূপকল্পের ফেনা ফ্রকে কেরোসিন লম্ফর দপদপানি “জানিস, আমি চাই চেঙ্গিজ খান ওর ঘোড়ার পিঠে আমাকে উল্টো করে চাপিয়ে নিজের দেশে নিয়ে গিয়ে বাঁদি করে রাখুক সেটা হবে সত্যিকারের প্রেম” “মনে রাখিস তোর সঙ্গে যা করছি তা প্রেম নয় এটা ঠুনকো পিরিতি দুজনে রাসযাত্রার দোলনার মতন যে যার জায়গায় ফিরে যাবো” “ঠুনকো পিরিতিতে চোখ চোখের দিকে তাকাবে নাক নাকের গন্ধ শুঁকবে কান কানের কথা শুনবে হাত হাতের সঙ্গে ফিসফিস করে ছোঁবে ঠোঁট ঠোঁটের শ্বাস শুনবে পা পায়ের তাপ নেবে কিন্তু পুরো শরীর পুরো শরীরের সঙ্গে মিলবে না মিললেই ঘ্যাচাঙ শরীরের আর মানে থাকবে না” মাথা থেকে মাথায় উকুন দিয়ে গিয়েছিল ক্ষ্যামাঙ্করী ওর উকুনদের জন্যে আজও মনকেমন করে তারপর তো জানলুম যতো যুবতী ততো রকমের যুবতী ফুটপাথের রোদ যুবতীদের যে ছায়াসৌন্দর্য গড়ে তোলে তা অতুলনীয় আমি তাতে ঘামের গন্ধ পেতুম অবিবাহিতা মেয়ের প্রথম ধাপ হল সাহস আমার দোজখে যাওয়া নিশ্চিত আমি কাফের বলে হাকিয়া দোজখে যাবো তারপর ছাকার দোজখে যাবো বাপজ্যাঠা মুর্তিপূজক বলে তারপর যাবো জ্বাহীম দোজখে কেননা আগুন ঘিরে বিয়ে করেছিলুম আর ওয়াইল দোজখে তো যাবই কেননা আই অ্যাম গিল্টি কিন্তু রোমান্টিক ছিল না বলে কুলসুম আপা কিংবা ক্ষ্যামাঙ্করীকে প্রেমিকা বলতে বাধো-বাধো ঠেকছে মনে থাকে যেন সুযোগ পেলে ছেড়ে দেয়া বোকামি ।
    চোদ্দ বছর বয়সে পাণিহাটির শ্রাবণী ওরফে ফুলটু নামের এক উদ্বাস্তু কিশোরীকে কনভেন্টের নিউ ইয়ার কার্ডে তার ফ্রকের প্রশংসা করে প্রেমপত্র লিখে সুনসান দুপুরের জানলা গলিয়ে ফেলে এসেছিলুম বারকয়েক শেফালিকে প্রতারণা করে নিজেকে ভালোবাসছিলুম কার্ডগুলো হাত-ঘুরে অনেক কাল পরে পুলিশ আমার মায়ের তোরঙ্গ ভাঙার সময়ে খুঁজে পেলেও বাজেয়াপ্ত করেনি মায়ের হাতে সেগুলো তুলে দিয়েছিলেন ছোটোমামা তোর ছেলের কিত্তি দ্যাখ প্রেম করার আর মেয়ে পেলো না শেষে হাড়হাভাতে রিফিউজি মাথায় তেল দেবার পয়সা নেই আমাদের পুকুরে এসে চান করে তামার ফুটো-পয়সা গায়ের রঙ শ্রাবণী তার মানে জানতো আমি কোন বাড়িতে থাকি আমার লোচ্চামি-লোফরামি এমনই যে ইউ আর গিল্টি নিজেকে প্রেমিক বলে মনে করি আর মনে করে নিজেকে ভালোবাসি প্রেমপত্রের কুকিত্তি শুনে তিনজন সহপাঠী বলেছিল ওসব ফালতু কেন করিস তার চেয়ে বেশি আনন্দ হবে হাত মারলে তরুণ বলেছিল চোখ বুজে রিটা হেওয়ার্থের ছবিটা মনে কর স্যামসন অ্যাণ্ড ডেলাইলার হাফল্যাংটো পোস্টারের ছবিটা এলফিনস্টোনের দেয়ালে সাঁটা কিংবা ক্লাসের যুথিকাকে চোখ বুজে শাড়ি-ব্লাউজ খুলে নে ওর মাইদুটো ক্লাসে সবার চেয়ে ডবকা পরে পরিয়ে দিস প্রকৃতি পাহাড় থেকে ঝর্ণাদের এমনিকরেই ঠেলে দ্যায় দেখিসনি তুই তো বামুন আগুনকে ওসকাবার জন্যে বেরিয়ে গেলে বলবি “ওম সোয়াহা” যদি রেগুলার হাত না মারিস তাহলে ডগায় হলদে রঙের নোংরা জমে যাবে চুলকুনিতে ধরবে তরুণের লিঙ্গ জংলি ঘোড়াদের গান শোনায় পরে হাজার-হাজার পোশাক এইভাবে খুলেছি যতোদিন না সত্যিকারের পোশাক খোলার সুযোগ এসেছে হিটলারের একটাই অণ্ডকোষ ছিল তবু কতো সাহসী লোকটা অ্যাঁ আমার দু-দুটো অণ্ডকোষ তুবুও কিন্তু-কিন্তু-রোগে ভুগি অথচ আমি দার্শনিক ধুসশালা এর চেয়ে স্বপ্নদোষ কতো আনন্দের ফোয়ারা শেষই হতে চায় না তবে নিজের পায়জামা নিজে কাচার ঝুটঝামেলা ।
    পনেরো বছর বয়সে সহপাঠী তরুণ শূরের সঙ্গে প্রথমবার বাড়ি থেকে পালিয়েছিলুম ট্রাকে করে ড্রাইভার ঠররা নামের দিশি মদ খেতে বললেও খাইনি প্রেস্টিজের ব্যাপার সন্ধেবেলা ধানক্ষেতে ট্রাকের তেরপল পেতে বেশ্যাকে সঙ্গম করতে বললেও করিনি তরুণ বলেছিল ওদের মুখে বিটকেল গন্ধ আসলে আমার সাহসে কুলোয়নি অণ্ডকোষের ব্যাঙাচিদের গিটার যতোদিন পারিস নিজেই বাজাতে থাক সিগারেটের আগুনকে শ্বাস ধার দিই পানামা সিজার্স বার্কলে ক্যাপ্সট্যান তারপরেও আটবার পালিয়েছি একবার নৌকোয় এলাহাবাদ বেশ-কিছু কবিতা পাঠের আসরে শ্রোতা হয়ে বসে থেকে সন্দেহ হয়েছে এই কবির বিচি-দুটো আছে তো নাকি সরকারকে উপহার দিয়েছে লেখায় রক্তের ঝাপটা দিতে পারেনি হ্যালো শুনছেন ভিড়েঠাশা ট্রেনের জানলা দিয়ে হিসি করেননি বোধহয় কুকুরেরা ফুলের গাছে মোতে না বাড়ি ফেরার পর মা বা বাবা জানতে চাননি কোথায় গিয়েছিলি ।
    ষোলো বছর বয়সে রাস্তায় পড়ে-থাকা লাশের হাঁমুখ থেকে নর্দমার মাছি উড়িয়ে সোনার দাঁত একটা লোক উপড়ে বের করে নিয়েছিল বলে মন খারাপ হয়ে গিয়েছিল শালা আমিও তো উপড়ে নিতে পারতুম সাহস হয়নি যদিও মাথায় খেয়াল এসেছিল বাঙালি বাড়িতে দেখেছি শবের চোখের পাতা বন্ধ করে দেয়া হয় যাতে সে জানতে না পারে যে তার সামনে দাঁড়িয়ে-থাকা আত্মীয়-বন্ধুদের কার-কার শোকে সততা নেই যে বয়সে পৌঁছে ঘুমই একমাত্র বন্ধু সেই বয়সেই ঘুম আপনাকে ছেড়ে চলে যায় হ্যালো শুনছেন প্রতিটি বন্ধুত্ব তার এক্সপায়ারি ডেট নিয়ে আসে খাদে লাফাবার সময়ে আত্ম্ত্যাকারিণী মৃত্যুর কথা ভাবে না যার বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিতে চলেছে তার কথা ভাবে প্রেম ভেঙে গেলে তা একদিক থেকেই ভাঙে একই সঙ্গে দুদিক থেকে কদাচিৎ ।
    সতেরো বছর বয়সে শুভার কান্নার গন্ধে টের পাই সে আসলে উনিশ শতকের ব্রাহ্ম তরুণীর মতন অস্হাবর জীবন নিয়ে জন্মেছে বলি তুই তো নদীর রক্ষিতা প্রেম তো ধাপার মাঠ সবই আছে তাতে যা বাতিল যা ব্যবহার করা যা বেছে নিয়ে আবার ব্যবহার করা যেতে পারে যেমন ভাঙা হারমোনিয়াম রিড নিয়ে চলে গেছে কাগজকুড়ুনিয়া যেন নক্ষত্রদের মাঝে একঘরে হয়ে আছে আমার চারিদিকে মাথার ওপর আকাশ চারিদিকে পৃথিবী আমি কিন্তু একটাই স্হাবর জীবন নিয়ে জন্মাইনি ভাষার বেড়াজাল কাটিয়ে লেখালিখিকে বেরোতেই হবে হবেই হবে হুগলি জেলার কোন্নোগরে বড়োজেঠিমার বাপের বাড়ি গিয়ে দেখতুম জেঠিমার ছোটো ভাইঝি শাড়ি পরে পুজোর ফুল তুলছে ব্লাউজ নেই, মাই দেখা ষাচ্ছে ইচ্ছে করে আঁচল সরিয়ে ফর্সা মাই দেখাচ্ছে টাটকা গোলাপি নিপল দেখাচ্ছে অনেক সময়ে আমাকে শব্দের কুয়াশা ঘিরে থাকে আর শব্দগুলো ন্যারেটিভ খুঁজে বেড়ায় আমি আর কী করি ছায়াগুলোকে খেয়ে আলোয় পালটাতে চেষ্টা করি এই যা এটাই আমার আসল সমস্যা যে আমি সর্বক্ষণ ভালোবাসায় মশগুল থাকতে চেয়েছি একজন ছেড়ে চলে গেলে আরেকজনের আর যতোদিন না বুড়ো হয়েছি আমার প্রেম এক নারী থেকে আরেক নারীতে চলে গেছে নয়তো নিজের ভেতরে নিজেই শব নিয়ে চলাফেরা করতে হতো ।
    আঠারো বছর বয়সে বাবা আমায় প্রাণদণ্ড দিলেন, আগফা-গেভার্টের একটা চওড়া বড়ো ডায়েরি উপহার দিয়ে বললেন “একেই বন্ধু করে নে, একেই তোর যা ইচ্ছে বলিস” আমাকে আমার ইচ্ছেরা পেয়ে বসল সাহিত্যিক সন্ত্রাসবাদী হবার ইচ্ছে প্রায়ই মনে হয়েছে বাবা তাঁর ফোটোগ্রাফির নেশা আর ব্যবসা থেকে আমাকে দূরে সরিয়ে দিতে চেয়েছিলেন যাতে ফোটোগ্রাফি আমার স্টিল ছবিতোলা কল্পনাশক্তিকে নষ্ট না করে যাতে আমি দিনেরবেলার চেয়ে রাত্রিবেলাকে বেশি ভালোবাসি যাতে আমি কখনও নিজের বয়সের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে না পারি যাতে আমি কখনও উন্মাদ না হয়ে যাই যাতে আমি সারা জীবন তল্লাশি চালাই যে সমাজ আসলে কাদের আমি কেবল আমার পাঠক-পাঠিকাদেরই ভালোবাসি কেননা তারা আমাকে মনে করে অন্ধকার গুহার নিবাসী মেগালোম্যানিয়াক মেলোম্যানিয়াক বিবলিওম্যানিয়াক কোরিওম্যানিয়াক ড্রোমোম্যানিয়াক গ্রাফোম্যানিয়াক সাইকোটিক আর খুঁজে বের করি “প্রবেশ নিষেধ” নোটিস টাঙানো দেখলে ভেতরে ঢুকতে ইচ্ছে তো করবেই অ্যাঁ বলুন ঠিক কিনা ।
    উনিশ বছর বয়সে যদি আমস্টারডম শহরের ডি ওয়ালেন খালপাড়ে যৌনকর্মীদের হাজার দুয়েক লাল আলো জ্বালানো বিশাল শোকেসে দাঁড়িয়ে থাকা হাফল্যাংটো শরীর দেখতে-দেখতে হাঁটতুম তাহলে আমার দুহাজার প্রেমিকা হতো আর ওই শহরেই থেকে যেতুম রেমব্রাঁ, আলবেয়ার কামু, ফ্রন্স হালসেমা, ম্যাক্স ইউভে, বেন ক্রামেস, পিয়েত বামবেরগান, ইয়ন ব্লাসের, সাইমন ফন কোললেন, উরবি এমানুয়েলসনদের মতন আমি মাতাল অবস্হায় লেখালিখি করি না ।
    আমি জীবনে কখনও সংখ্যাগরিষ্ঠের দলে ভিড়তে পারিনি পারি না পারবো না ভাগ্যিস মুচলেকাপন্হীরা ভয়ে আমাকে ছেড়ে পালিয়েছিল বস্তুত বন্ধুদের ঘৃণার চেয়ে দ্বিতীয় আহ্লাদ হয় না হাংরি আন্দোলন থেকে কবেই বেরিয়ে এসেছি তবুও কলকাতায় পৌঁছোতেই রাজসাক্ষীরা ভাবলো ওই আবার এসে গেছে আপদটা।
    স্মৃতি কী ? স্মৃতি হল খোস পাঁচড়া দাদ ফোড়া ঘা চুলকুনি একজিমা সোরিয়াসিস খুজলি—সময় ওদের ওপর একের পর এক ধুলোর চাদর বিছিয়ে আবছা করে দ্যায় ওরা মনে করিয়ে দ্যায় যে বাছা তোমার অতীত বলে সত্যিই একটা ব্যাপার আছে কটকটে বাস্তব আর তাতে তুমি একলা নেই বহু মানুষ-মানুষী আছে ঘাপটি মেরে এরা সবাই অক্টোপাসের শুঁড় দিয়ে আমাকে জাপ্টে ধরে নিজের গল্প বলার জন্যে শুষে নিতে চায় আমাকে শিখিয়েছে একা থাকার ইন্দ্রজাল ঐতিহ্যের পাহাড় মাথার ওপর থেকে তুলে ফেলে দিয়েছে মহাদলিতের ইমলিতলা আমি ঐতিহ্যহীন বাবার দেয়া ডায়রিতে যা আমাকে গ্রেপ্তার করার সময়ে পুলিশ বাজেয়াপ্ত করে নিয়েছিল প্রথম পাতায় সবুজ কালিতে লিখি “কাউকে বা কোনোকিছু একঘেয়ে লাগলে ছেড়ে দিতে হবে” রাত একটা সাঁইত্রিশ ডায়েরির পাতায় নিঃশ্বাস হলুদ আলোর শ্বাস দায়িত্বজ্ঞানহীন মুক্তিবোধের বিশৃঙ্খলা ।
    অনেককিছু ভুলে কি আর যাচ্ছি না ! ভুলে যাচ্ছি ভুলে যাচ্ছি ভুলে যাচ্ছি ভুলে যাচ্ছি ! ভুলে যাওয়া মহাঅপরাধ, ভুলে গেলে সত্য চাপা পড়ে যায় ।
    কয়েকজন বুদ্ধিজীবি বা অচেনা জনগণের জন্যে আমি লিখি না স্পষ্ট হয়ে গেছে তা আমি লিখি বাবার দেয়া দণ্ডাদেশ মুকুবের জন্য লেখা আমার অবসেশান মহাভারত যদি আজও বাচনিক থাকতো লিখে ফেলা না হতো আমি তাতে প্রবেশ করে কৃষ্ণের বিপরীতে নিজের চরিত্র গড়ে তুলতুম এক গেলাস ঈশ্বর মানে ভোদকা সোভিয়েত দেশের সময়ে ঈশ্বরকে ভাগিয়ে দেয়া হয়েছিল বলে দসবিদানিয়া কমরেড ইমলিতলার গাঁজা-চরস ফুঁকিয়েরা নিজেদের ইচ্ছেমতন রাতের আকাশের চাঁদ আর তারাদের যেখানে ইচ্ছে সরিয়ে দিতে পারতো অথচ মানুষহীন তল্লাটে একা ফাঁকা মাঠে পূর্নিমার চাঁদ দেখে আমি আতঙ্কিত হই ।
    আনলার্ন আনলার্ন আনলার্ন আনলার্ন আনলার্ন এই একমাত্র শিক্ষার বাংলা প্রতিশব্দ জানি না ।

    ##
    আজকে, এখন, সাতাত্তর বছর বয়সে, আয়না দেখা ছেড়ে দিয়েছি, বাইরে বেরোলেও চুল আঁচড়াই না, পায়জামায় পেছনদিকে ছেঁড়া থাকলেও তাই পরেই বেরোই কেননা কেউই আমার পেছন দিকে তাকানো দরকার মনে করে না, নিঃসঙ্গতা আর একাকীত্বের গাড়ি পার্ক করার বেসমেন্টে রিকশায় বসে টের পাচ্ছি যে স্মৃতি একেবারে ধুলোপড়া ত্যাবড়ানো, স্ফটিক-স্বচ্ছ নয়, আমার, আমার আসেপাশের মানুষদের, অনেকের দেহে শ্মশানে জলভরা হাঁড়ি পড়ার শব্দসহ, বিজলি-চুল্লীতে চর্বি ফাটবার শব্দসহ, হুকবোতামের ছেদ-যতি-সেমিকোলনসহ, বয়স্ক-অল্পবয়স্ক ঘটনা নিজস্ব চরিত্র নিয়ে উদয় হচ্ছে, আর যা ভুড়ভুড়ি কেটে ভেসে উঠছে, সেগুলোই, তড়িঘড়ি, উবে যাবার আগে, লিখে ফেলব, শাড়ির ভাঁজে পাট করে রাখা সুমিতা চক্রবর্তীর গ্রীষ্মশীত, রাতে ওনার বাগানের গাছেরা নিজেদের পরিচর্যা করতো, আমি ওনার সাম্যবাদী কিউবার লঝঝড় মোটরগাড়িতে, “আমি তোর অ্যামেচার বান্ধবী” ; তারপর যখন বুড়ি থুথ্থুড়ি, “কলকাতায় সবাই পার্টিকর্মী, দৃশ্য বা অদৃশ্য ঝাণ্ডা হাতে।” “শুধু কমিউনিস্টরাই বলতে পারবে কেন কমিউনিজম ফেল মারলো।” “মানববোমারা মরতেই থাকবে, এর আর শেষ নেই, দেখেনিস ।” “হিরোহিতোর সঙ্গে হ্যাণ্ডশেক করুন বা হিটলারের সঙ্গে, সুভাষচন্দ্র বোস আমার হিরো, আমার স্বপ্নের প্রেমিক ।” “লিখতে বসে সবচেয়ে আগে ভুলে যাবি তোর স্কুল-কলেজের ভাষা-শিক্ষকদের, নয়তো এগোতে পারবি না ।” “বাঙালি মার্কসবাদীরা যারা নিহিলিজমের বিরোধিতা করতো তারাই পশ্চিমবঙ্গে নিহিলিজম ডেকে আনলো।” “অনুসরণকারীরা পিঠে ছোরা মারে কেন জানিস ? তারা তো পিছন থেকে অনুসরণ করে।” “ভিতুরা ভয়ার্ত কবিতার তত্ব বানায় আর সেই তত্বকে সমর্থন করে পরাজিতরা।” “আত্মহত্যার কোনো কারণ হয় না।” এখন একমাত্র রুটিন হল রাতে টয়লেটে পেচ্ছাপ করতে যাওয়া, প্রস্টেটের ঘড়িধরা চাপে ।
    নাড়ি তৈরির ম্যাজিক শুধু নারীই তো জানে। সেক্স করার সময়ে বার বার “আই হেট ইউ” বলার উপাদেয় রহস্য । আমি আগের জন্মে ঘুর্ণিঝড় ছিলুম পরের জন্মে গোরস্হান হবো ।
    বহু ঘটনা পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে যাবে, যেতে দিতে হবে, পাশাপাশি গুরুত্বহীন ঘটনা হঠাৎই ঘা দিয়ে নিজেকে জাহির করবে , যাই হোক, সময়ের ধ্যাবড়া অনুক্রম জরুরি বলে মনে হয় না । চাকুরিসূত্রে ভারতের এতো গ্রাম আর শহর ঘুরেছি যে হাতির পিঠে চেপে কোন গ্রামে গিয়েছিলুম কোথায় উটের দুধ খেয়েছিলুম যেমন স্মৃতি থেকে ঝরে গেছে তেমনই কোন নদীর পাশ দিয়ে মাথার ওপর ট্যুরের ক্যাঁদরা চাপিয়ে কোন গঞ্জে গিয়েছিলুম মনে করতে পারি না, অথচ ঘটনাগুলো ঝাপসা হয়নি আজও ; অমন অজস্র টুকরো-টাকরা, বহুগ্রাম জলহীন বলে কেমন করে শিখে গিয়েছিলুম টয়লেট পেপারের রোল সঙ্গে রাখতে, আলের ওপরে বসে হাগতে, জল না খেয়ে বহুক্ষণ টিকে থাকতে । কে বলেছিল, “মাতৃভূমিতে শুধু গরিবরাই মরে?” মনে নেই । কে বলেছিল, “রাস্তার কুকুরদের কান নিয়ে জন্মেছিস?” মনে নেই । কে বলেছিল, “তুই বামপন্হী? শুনলেই সন্দেহ হয় তোর বাপ সোভিয়েত রুবল খেয়েছে !” মনে নেই । কে বলেছিল, “তোর ডানদিকে সিঁথে কাটা উচিত।” মনে নেই । কে বলেছিল “ঈশ্বরপ্রদত্ত বলে কিছু হয় না ?” মনে নেই । কে বলেছিল, “রাষ্ট্র চিরকাল লিবার্টি ইকুয়ালিটি ফ্র্যাটারনিটির বিরোধিতা করবে”, মনে নেই । কে বলেছিল, “লাথি না খেলে বিজ্ঞ হওয়া যায় না”, মনে নেই। কে বলেছিল, “ফাংশানাল লিঙ্গ না থাকলে জিনিয়াস হওয়া যায় না”, মনে নেই।
    ১৯৬৪ সালে ‘কবিতা ভবন’-এর দরোজা খুলে বুদ্ধদেব বসু সামনে দাঁড়াতেই, যখন বললুম “আমার নাম মলয় রায়চৌধুরী”, উনি সঙ্গে-সঙ্গে দড়াম করে দরোজা বন্ধ করে দিয়েছিলেন । বন্ধ দরোজার সামনে দাঁড়িয়ে, বুদ্ধদেব বসু দরোজা বন্ধ করে দিলেন বলে, হুররেএএএএএএএএ বলে চেঁচিয়েছিলুম, যাতে উনি শুনতে পান । বুদ্ধদেব বসু, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, জয় গোস্বামী, সুবোধ সরকার, কেউই রাস্তার ধারে বসে নর্দমায় হাগেননি, তাই তাঁরা অমর ।
    ১৯৬৪ সালে যখন পুলিশ কমিশনারের কাছে জানতে পারলুম যে আমার বিরুদ্ধে নালিশকারীদের তালিকায় সন্তোষকুমার ঘোষ আর আবু সয়ীদ আইয়ুব আছেন, শুনে বুঝতে পারলুম যে ছিপে ঠিক-ঠিক বঁড়শিই বেঁধেছি । ।
    ১৯৬২ সালে কলেজ স্ট্রিটে একটা মিছিলে উৎপল দত্তের হাতে হাংরি বুলেটিন দিতেই উনি আঁৎকে বলে উঠলেন, “হাংগরি জিন্নাড়িশন”, লিফলেটটা দুমড়ে ফেলে দিলেন রাস্তায়, দেখে, অন্য একজন মিছিলকারী সেটা তুলে পড়তে আরম্ভ করলে, চেয়ে নিয়ে বললুম, আপনার জন্যে নয় ।
    ১৯৬৩ সালে গল্পকার শান্তিরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাওড়ার বাড়িতে গিয়েছিলুম । বললেন, “ওহে, একেবারে তোলপাড় করে ফেলেছ যে, ক্ষমতাবানদের চটিয়ে দিচ্ছ, তারা তোমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র চালাচ্ছে, জানো কি ?” বলেছিলুম, যা করার তা তো করে যেতে হবে, ডিরোজিও তো যা করার তাই করে গেছেন। জানি না কলেজ স্ট্রিটের প্রকাশকরা কেন শান্তিরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়কে চেপে দিলে । উদয়ন ঘোষ, শান্তি লাহিড়ির মতন ওনারও দুর্বলতা ছিল সন্দীপন, শক্তি, সুনীলের সঙ্গে চিপকে থেকে আনন্দ পাবার ।
    ১৯৭১ সালে শঙ্খ ঘোষ একটা প্রবন্ধ লিখেছিলেন, “শব্দ আর সত্য” শিরোনামে, ১৯৭১ সালে, রিমেম্বার ১৯৭১ সালে । কী লিখেছেন শুরুতেই তাঁর সাহিত্যিক-রাজনৈতিক গদ্যে ? লিখেছেন, রিমেম্বার ১৯৭১ সালে, যে, “কবিতা লেখার অপরাধে এই শহরের কয়েকজন যুবককে যে একদিন হাজতবাস করতে হয়েছিল, এটা আজ ইতিহাসের বিষয়।” ২৮ ডিসেম্বর ১৯৬৫ সালে আমার এক মাসের কারাদণ্ডের আদেশ হয়ে গিয়েছিল তা উনি ১৯৭১ সালে জানতেন না ! পঁয়ত্রিশ মাস ধরে আদালতের চক্কর কাটতে হয়েছিল, তা উনি ১৯৭১ সালে জানতেন না, জানতেন কেবল একদিনের হাজতবাস । কী বলব ? হাংরি আন্দোলনের যাঁরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করেছেন, আবু সয়ীদ আইয়ুবের পর শঙ্খ ঘোষ, আর বাহুল্য বলা, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের নাম করতে হয় । শঙ্খবাবু শৈলেশ্বর ঘোষকে টেনে নিয়ে গেছেন প্রতিষ্ঠানের কয়েদখানা বাংলা অ্যাকাডেমিতে । শঙ্খবাবুর সঙ্গে আমার একবারই দেখা হয়েছে, ওই বাংলা অ্যাকাডেমিতেই, হ্যাণ্ডশেকের জন্যে হাত এগিয়ে দিয়ে বলেছিলুম, আমার নাম মলয় রায়চৌধুরী, শুনে, নিজের কানে মনে হল যেন বলছি, আমি মিশরের ফ্যারাও দ্বিতীয় র‌্যামাসেজ । আর সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় আমেরিকায় বসে ভাবছিলেন মলয়টা কলকাতার সবকিছু লুটেপুটে খেয়ে ফেললো আর আমেরিকা থেকে ফিরে ‘আত্মপ্রকাশ’ নামে একটা তড়িঘড়ি উপন্যাস লিখেছিলেন সাগরময় ঘোষের হুকুমে যাতে ভয়ের চোটে লেখেননি যে বেশ্যালয়ে গিয়ে কী করতেন আমি কিন্তু উকিলের জানলা দিয়ে দেখেছি ষাটের দশকে পুরো কৃত্তিবাসের দল ঢুকছে অবিনাশ কবিরাজ লেনে, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় শকুনের কাঁধ উঁচু করে ।
    ১৯৭২ সালে, চেন্নাইয়ের গিণ্ডিতে একটা জ্যান্ত কেউটে সাপকে আমার হাতে জড়াতে দিয়েছিল পার্ক কর্তৃপক্ষ, ওঃ কি ঠাণ্ডা, নিজের সম্পর্কে ইপিফ্যানির গর্ব হয়েছিল । তারপর একটা পাইথনকে গলায় ফেলে দিল উত্তরীয়ের মতন করে, কী যে আনন্দ হয়েছিল, এই হল আমার সম্বর্ধনার সত্যিকারের উত্তরীয় । আমার অ্যাসিস্ট্যান্ট বলেছিল, ব্রাহ্মণ হয়ে জ্যান্ত সাপে হাত দিলেন, দেখুন বংশরক্ষা হয় কিনা । কী করেই বা কারাগারে আটক সাপদুটোর বংশরক্ষা হবে, বললুম তাকে, ছোবল দিয়ে ।
    ১৯৭৫ সালে ফালগুনী রায়ের সঙ্গে শেষবার দেখা । পাটনায় অফিসে এসেছিল, তখন আমার লেখালিখি আঙুল ছেড়ে উধাও, বলল, সবাই আলাদা হয়ে গেছে, ও এখন দীপক মজুমদারের সঙ্গে, মাদক আর সোনাগাছি নিয়ে ভালোই আছে । হাংরি আন্দোলনের সময়ে প্রায়ই পাটনায় আসত ফালগুনী, ওর জামাইবাবু ছিলেন আমার ইকোনমিক্সের অধ্যাপক, অত্যধিক মোটা আর বেঁটে, রিকশায় চাপার আগে নাড়িয়ে দেখে চাপতেন, তা দেখে হাসতুম বলে চটা ছিলেন আমার ওপর, ফালগুনীর দিদি এসে আমার মাকে বলে গিয়েছিলেন যে আমি ফালগুনীকে কুপথে নিয়ে গিয়ে নষ্ট করে দিয়েছি । ফালগুনীর প্রেমিকার বিয়ে হয়েছিল পাটনায়, ওর জামাইবাবুর বাড়ির কাছেই প্রেমিকা থাকতো লোহানিপুর পাড়ায় । আমরা দুজনে পাটনার গুলফি ঘাটে গিয়ে কিংবা গোলঘরের ওপরে বসে সরকারি দোকান থেকে কেনা গাঁজা-চরস ফুঁকতুম, মহেন্দ্রুঘাটে বসে ঠররা খেতুম । ফালগুনীর মৃত্যুর খবর পেয়েছিলুম লখনউ থাকতে ।
    ১৯৮৯ সালে মেয়ে অনুশ্রীর গোদরেজ টাইপরাইটার খারাপ হয়ে যেতে অনেক খুঁজেপেতে একজন মেকানিকের বাড়ির ঠিকানা পেয়েছিলুম । তখন থাকতুম সান্টাক্রুজে আর মেকানিক থাকতেন জুহুর গোয়ানিজ কলোনিতে । এখন অবশ্য সেই সান্টাক্রুজ-জুহু আর নেই, ধনীদের বিশাল অট্টালিকা আকাশে উঠে গেছে সর্বত্র। মেকানিকমশায় যেদিন সারিয়ে দেবেন বলেছিলেন, সেই দিন আমি টাইপরাইটারটা নেবার জন্যে ওনার কুঁড়েঘরে গিয়ে অপেক্ষা করছিলুম, ওনার বুড়িবউ বললেন, এক্ষুনি এসে যাবে । আমার মুখ দাড়ি-গোঁফে ঢাকা, নাম এম আর চৌধারী । ওনার বিশালবপু বুড়ি চুপচাপ বসেছিলেন । সামনের বাড়িতে গিটার বাজিয়ে হইচই গান গাইছিল যুবক-যুবতীরা । গোয়ানিজ বুড়ি হঠাৎ বলে উঠলেন, “এই প্রটেস্ট্যান্টগুলো আর হিন্দুগুলো, অত্যন্ত নোংরা আর ডিসিপ্লিনহীন, তাই তো দেশটার এমন অবস্হা, যখন ব্রিটিশরা ইনডিয়ায় ছিল আর পোর্তুগিজরা গোয়ায় ছিল তখন এদের এরকম দৌরাত্ম্য ছিল না ।” নিজেকে ফাঁস করলে বুড়ি মুষড়ে পড়বে ভেবে মুখ বুজে রইলুম ।
    ২০০০ সালে কাণ্ডিভিলি মুম্বাইতে হার্ট অ্যাটাকের পর প্রতিদিন সকালে জগার্স পার্কে হাঁটতে যেতুম, সেখানে লাফটার ক্লাবের বুড়ো সদস্যদের সঙ্গে পরিচয় হল । সকলের মতন আমিও ওয়ান টু থ্রি হলেই ওপরে দুহাত তুলে জোরে-জোরে অকারণে হাসতুম, এছাড়া আর বুড়ো বয়সে হাসির সুযোগ নেই । একজন গুজরাটি আমার সঙ্গেই ফিরতেন, কী করেন জিগ্যেস করতে বলেছিলুম অবসর নিয়েছি, যা পেনশন পাই তাতেই চালাই। উনি কী করেন জিগ্যেস করতে বললেন যে, “সকালে-বিকেলে ক্লায়েন্টদের কুকুর হাগাতে নিয়ে যাই আর রাতের বেলায় মদ খেয়ে কবিতা লিখি, মাসে পঞ্চাশ হাজার হয়ে যায়।”
    —কুকুর হাগাতে ?
    —হ্যাঁ, কারোর তো সময় নেই, সবাই এ-শহরে টাকার ধান্দায় ছুটছে ।
    —আপনি তাদের কুকুরগুলোকে সকাল-বিকেল হাগাতে নিয়ে যান ?
    —হ্যাঁ, সকাল পাঁচটা থেকে শুরু করি । কোন কুকুর কখন হাগতে প্রেফার করে প্রথম কয়েক দিনেই জেনে যাই, ক্লায়েন্টরাও আইডিয়া দেন ওদের হাগবার-মোতার সময়ের ।
    —কিরকম চার্জ করেন ?
    —কুকুরের ব্রিডের ওপর নির্ভর করে । রটউইলার হলে হাজার পাঁচেক প্রোপোজ করি, তারপর তিন হাজারে সেটল করি । অন্য ব্রিডের হলে কম নিই । তবে আমি নিজেকে ডগ ট্রেনার বলি, কুকুরগুলোকে আধঘণ্টা খেলাতেও হয় ।
    —একদিন আপনার কবিতা শুনব ।
    —আসবেন, ড্রিংক করেন তো ?
    —না, আপাতত বন্ধ, হার্ট অ্যাটাক থেকে সবে উঠেছি ; হার্ট অ্যাটাকের সময়েও হাগা পায়, বীর্য বেরিয়ে আসে । আত্মহত্যাকারীদের যেমন হয়, গু আর বীর্য বেরিয়ে আসে । আত্মহত্যাকারিনীদের কি কিছু বেরিয়ে আসে ?
    কুকুর হাগানোর সঙ্গে কবিতার যোগাযোগ আছে জেনে বেশ ভাল্লাগলো । কবিদের রেটও ব্রিড অনুযায়ী।
    ২০০৭ সালে আমস্টারডমের ডি ওয়ালেন খালপাড়ে গাইড মিস মারিসকা মাজুরের সঙ্গে আমরা একদল বিদেশী পর্যটক বেশ্যালয় দেখতে বেরিয়েছিলুম । মারিসকা এককালে নিজেও যৌনকর্মী ছিলেন । রেড লাইট শব্দটা এই বেশ্যালয় থেকেই ছড়িয়েছে । নেপোলিয়ানের আইনি অনুমতিপ্রাপ্ত বেশ্যালয়, মানুষের চেয়েও বড়ো কাচের শোকেসে লাল আলো জ্বেলে অপেক্ষা করছেন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে এসে জড়ো হওয়া যৌনকর্মীরা, রেট, সময় এবং পদ্ধতি বাঁধা ; তার বাইরে কিছু করতে চাইলে দরাদরি করতে হবে । প্রতিটি ঘরে লাল আলো । যে ঘরে নীল রঙের আলো সেঘরে অপেক্ষা করছে পুরুষ যৌনকর্মী । খালপাড়ে নানা রকমের যৌনকর্মের আর যৌনবস্তুর দোকান, ঘুরে-ঘুরে দেখলুম । চাবুক, চেস্টিটি বেল্ট, লিঙ্গের আকারের সিটঅলা সাইকেল, পর্নোগ্রাফির বই আর ফিল্ম, গাঁজা ফোঁকার দোকান, আবসাঁথ খাবার রেস্তরাঁ ইত্যাদি । দেখতে-দেখতে এগোচ্ছিলুম । হঠাৎ একজন মধ্যবয়সী হোঁচোট খেয়ে পড়ল আমাদের সামনে, ওপরে মুখ তুলে চলার ফল । মারিসকা মাজুর তাকে দুহাত ধরে টেনে তুলে দেখালেন রাস্তার ওপর ব্রোঞ্জের একটা ভাস্কর্য, অজস্র মানুষের চলার দরুণ চকচকে হয়ে গেছে । ভাস্কর্যটা হলো একজন পুরুষের ডান হাত একটি যুবতীর বাঁদিকের মাই টিপছে, ব্যাস ওইটুকুই, হাত আর একটা মাই । মারিসকা বললেন, আগে এই ভাস্করের নাম জানা যায়নি, এখন জানা গেছে ওনার নাম রব হজসন, লুকিয়ে ভোররাতে পুঁতে দিয়ে গেছেন।
    ১৯৬১ সালে একবার খালাসিটোলায় পাশের লোকটা হাতে গেলাস নিয়ে কাঁদছিল দেখে আমারও কান্না পেয়ে গিয়েছিল ; পিসেমশায় খালাসিটোলায় গেলে নির্ঘাৎ কাঁদতেন, মা ওগো মা, বলে বলে কাঁদতেন; তারপর যেতেন সোনাগাছি । আমিও কেঁদে নিয়েছিলুম, পিসতুতো দাদা সেন্টুদার সঙ্গে অবিনাশ কবিরাজ লেনে গিয়েছিলুম; সেন্টুদা বলেছিল, এখানেও স্কুল ফাইনাল, বিএ, এমএ করতে-করতে এগোতে হয়, সব শিখিয়ে দেবো তোকে, নিরোধ জানিস তো নিরোধ, সঙ্গে নিয়ে আসবি, ঠোঁটে চুমু খাবি না, ওখানে চাটবি না, দিনে-দিনে আসবি, দিনে-দিনে চলে যাবি, কেউ দেখতে পাবে না, রেটও দুপুর বেলায় হাফ, তখন কেউ শ্যাম্পু করা চুল আঁচড়ায়, কেউ পায়ের নখে নেলপেলিশ লাগায়, কেউ বারান্দায় বসে হাই তোলে, দিল খুশ হয়ে যাবে, ইচ্ছে করলে তুই পায়ে নেলপালিশ লাগিয়ে দিতে পারবি, চুল আঁচড়ে দিতে পারবি, এমনকি সেক্স করার আগে যদি গিল্টি ফিল করিস তাহলে সিঁথিতে সিঁদুর পরিয়ে দিতে পারবি, কালবৈশাখির ঝড় উঠলে আহিরিটোলা ঘাটে নেমে দুজনে চান করার ভান করতে পারবি ।
    ১৯৬৪ সালে যখন হাংরি মামলায় গ্রেপ্তার হলুম তখন বড়োজেঠিমা বলেছিলেন, যারা পরীর গপপো জানে, যারা দত্যিদানোর গপপো জানে, যারা পুরাণের ভগবানদের গপপো জানে, তাদের কাছে নোংরা বই, নোংরা গপপো বলে কিছু হয় না, কোনো বইকেই অচ্ছেদ্দা করা উচিত নয়, পুরাণের গপপো পড়লেই জানা যায় আমরা কোনো একজনের মতন ওই সব গপপোতে লুকিয়ে আছি, আমরা কি মহাভারতের গল্পতে নেই ? আছি, আছি ।
    ১৯৬৩ সালে অ্যালেন গিন্সবার্গ যখন পাটনায় আমাদের বাড়িতে ছিল, একটা শতচ্ছিন্ন বই পড়তে দিয়েছিল, ওর পড়া হয়ে গিয়েছিল বইটা, “জার্নি টু দি এন্ড অফ দি নাইট”, লুই ফার্দিনাঁ সেলিন-এর লেখা, কালো রঙের মলাট, দারুন উপন্যাস। পরে সেলিন সম্পর্কে খোঁজখবর করে জানতে পেরেছিলুম যে লোকটা ঘোর ইহুদি-বিদ্বেষী ছিল আর ইহুদিদের বিরুদ্ধে প্যামফ্লেট ছাপিয়ে গালমন্দ করতো । গিন্সবার্গের বাবা-মাও ইহুদি, তবু, উপন্যাসটা অসাধারণ বলে, গিন্সবার্গের মনে হয়েছিল, আমার পড়া উচিত । বইটা সুভাষ ঘোষকে পড়তে দিয়েছিলুম তারপর কী হলো কে জানে, ওরা মুচলেকা লিখে, দলবেঁধে ক্ষুধার্ত, ক্ষুধার্ত খবর, ক্ষুধার্ত প্রতিরোধ থেকে আমায় ভেন্ন করে দিলে, সেসময়ে ওদের ক্ষমা করা অসম্ভব ছিল আমার পক্ষে । দলটার ত্রিদিব মিত্র নাম দিয়েছিল “মুচলেকাপন্হী”, ত্রিদিব আর আলো মিত্রকেও বাদ দিয়েছিল রাজসাক্ষীরা । আমিও ১৯৬৭ সালে কেস জিতে ছেড়ে দিলুম ওদের ‘গরিব-হওয়া-ভালো’ সঙ্গ । এই হওয়া, হয়ে-ওঠা যে কি জিনিস তা আজও বুঝুনি ।
    ১৯৬৬ সালে বাসুদেব দাশগুপ্তকে দিয়েছিলুম লেনি ব্রুসের লেখা “হাউ টু টক ডার্টি অ্যান্ড ইনফ্লুয়েন্স পিপল” বইটা । ১৯৬৮ সালে, যখন আমি লেখালিখি ছেড়ে দিয়েছি, কৃষ্ণগোপাল মল্লিকের পত্রিকা “গল্পকবিতায়” বাসুদেব দাশগুপ্ত লিখেছিল “লেনি ব্রুস ও গোপাল ভাঁড়কে” । বাসুদেবের লেখাটা আমার পড়া হয়নি । কোনো কিছুই আর পড়তে ভালো লাগে না, স্তাবকদের গুণগান সত্বেও ।
    ১৯৯৪ সালে প্রথম উপন্যাস লিখলুম, “হাওয়া৪৯” পত্রিকার জন্যে, “ডুবজলে যেটুকু প্রশ্বাস”, বন্ধুদের নিয়ে । আমি প্রুফ দেখতে একেবারেই পারি না । দাদা কৃষ্ণগোপাল মল্লিককে বললেন প্রুফ দেখে দিতে । কৃষ্ণগোপাল ডেকে পাঠালেন ওনার বাড়িতে, বললেন, “টাকার ব্যাগটা অতনু রেখেছিল আলমারির ওপরে, বাড়ি ছেড়ে যখন চলে যাচ্ছে, তখন ব্যাগটা খাটের তলায় গেল কি করে ?” বার-বার চোখ চলে যাচ্ছিল মেঝেয়, ওনার পড়াশুনার টেবিলের পাশে মাকে চেন দিয়ে বেঁধে রেখেছেন, তিনি মাটিতে বিছানায় শুয়ে, চেন বাঁধা । বললেন, “প্রথম এসেছো তো, তাই অবাক হয়ে গেছো, আমার মায়ের খাই-খাই ব্যারাম, তাই বেঁধে রাখতে হয়ে।” শুনে, গায়ের লোম বেয়ে শিরশিরে হাওয়া বয়ে গেল। সিঁড়ি দিয়ে নেমে আমহার্স্ট স্ট্রিটে এসে আচমকা ফুঁপিয়ে উঠলুম ।
    ওই সময় নাগাদই এডওয়ার্ড সাইদ এসেছিলেন কলকাতায়, নেতাজি ভবনে, সৌগত বসুর ডাকে, বক্তৃতা দিতে । বক্তৃতা দিতে-দিতে সাইদ বার বার প্রতিষ্ঠানবিরিধিতার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করছিলেন । আমি বসে ছিলুম পেছনের সারিতে কেননা সামনের সারি ছিল কলকেতিয়া কেঁদোদের জন্য । আমন্ত্রিতরা, বলা বাহুল্য, সবাই ছিল কলকাতার প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার চাঁই । প্রশ্নোত্তরের সুযোগ আসতেই আমি বললুম যে, “স্যার, আপনি এতোক্ষণ প্রতিষ্ঠানবিরোধিতার কথা বলছিলেন, অথচ এখানে তো সামনের সারিগুলোয় বসে আছেন পশ্চিমবাংলার তথা ভারতের প্রাতিষ্ঠানিক কর্তারা ।” সৌগত বসু, আশা করেননি যে এরকম একটা প্রশ্ন কেউ ছুঁড়ে দিতে পারে । উনি তড়িঘড়ি উঠে দাঁড়িয়ে বললেন যে, “এই কনট্রোভার্সি ডিসকাস করার মতো আমাদের হাতে সময় নেই, পরের বার উনি আসলে আমরা বিষয়টা নিয়ে আলোচনা করব ।”
    ১৯৮৮ সালে যখন নাকতলার ফ্ল্যাটটা কিনলুম, মাত্র দু লাখ টাকায়, তখন ওই মাপের ফ্ল্যাট মুম্বাইতে কম করে হলেও পঁচিশ লাখ, তাই লোকে যেভাবে আলুপটল কেনে, কিনে নিলুম, সাত পাঁচ না ভেবে । আসলে একটুকরো পশ্চিমবঙ্গ কিনেছিলুম, চারিদিক খোলা, অথচ কোনো বাড়ি থেকে কেউই দেখতে পাবে না যে আমি অনেক সময়ে ল্যাংটো হয়ে থাকি, সলিলা চেঁচামেচি করলেও ল্যাংটো থাকতে ভাল্লাগে । বাড়ির পেছনে পলাশের জঙ্গল, গাছে-গাছে কতো রকমের পাখি যাদের অধিকাংশকে চিনি না, মীজানুর রহমানের ত্রৈমাসিক পত্রিকার পক্ষী সংখ্যার সঙ্গে মিলিয়ে দেখি পাখিগুলোর নাম কী হতে পারে, পেছনে বিশাল পুকুর, পুকুরে মাছেরা চাঁদের আলোয় ঘাই মারে, দিনের বেলায় পানকৌড়িরা মাছ খেতে নামে, উড়ে গিয়ে নারকেল গাছে জাপানি পাখার মতন ডানা ছড়িয়ে শোকায়, অনেক সময়ে পলাশের বনে শেয়াল আসে, শেয়ালের ডাক শোনা যায় রাতে, প্রচুর বেঁজি, বাড়ির সিঁড়িতে সাপ লুকিয়ে থাকে, মশারির ওপর ফ্যানের ব্লেডে লেগে জোনাকিরা ঝরে পড়ে, দূরে দেখা যায় কালবৈশাখীর মেঘ এদিকেই আসছে । হায়, সব ক্রমশ উধাও হয়ে গেল, পলাশগাছগুলো কেটে ফেলা হল, পুকুর হয়ে গেল জঞ্জাল ফেলার ডোবা, তার পাশে বাঁশের আড়ত, মেট্রো রেল এলো, বাড়ির পর বাড়ির পর দেশলাই-বাড়ি, তারপর পশ্চিমবঙ্গের পাড়া-সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয় হলো একটু-একটু করে, বাড়ির সামনেই, প্রথম দিনেই, কচ্ছপ কেটে বেআইনি মাংস বিক্রি, কেনার জন্য কী ভিড় আর ঠেলাঠেলি, তারপর কমরেডরা এলেন পুজোর চাঁদা চাইতে, তাদের মনের মতন না হওয়ায়, একজন হুমকি দিয়ে গেল এই বাড়ির ছাদে চারটে লাউডস্পিকার লাগানো হবে ।
    মেজমাসির সঙ্গে নিমতায় দেখা করতে গেলে বলেছিলেন, “ওখানে ফ্ল্যাট কিনেছিস ? আনওয়ার শা থেকে গড়িয়া পর্যন্ত তো রিফিউজিদের জঞ্জাল-পাবলিকে ঠাশা !” মেজমাসি রিফিউজিদের ওপর চটা ছিলেন কেননা তারা ওনার পুকুর থেকে মাঝরাতে মাছ ধরে নিয়ে চলে যেতো, সুপুরিগাছ থেকে সুপুরি আর নারকেল গাছ থেকে নারকেল পেড়ে নিয়ে যেতো ।
    ২০০০ সালে পাঁচ লাখ টাকায় ফ্ল্যাট বেচে দিলুম, পঞ্চাশ বছরের পুরোনো ফ্ল্যাট। বেচে, ১৯৮৮ সালে করা নিজের বোকামি থেকে মুক্ত হওয়া গেল । বেচার দু বছর পর গিয়েছিলুম ওই পাড়ায়, দেখলুম আর শুনলুম পাড়ার ছেলেরা ক্রেতার সঙ্গে আপোষ করতে না-পেরে বারান্দার কাচে ঢিল মেরে-মেরে ভেঙে দিয়েছে, যিনি কিনেছেন তিনি কাগজ সেঁটে রোদবৃষ্টি থামাচ্ছেন ।
    নাকতলায় অতিতরুণ কবি সুশান্ত দাশ আর কমরেড-কবি গৌতম নিয়োগী ১৯৯৫ সালে আমাকে ওদের পাড়ায় আবিষ্কার করে অবাক, হাংরি আন্দোলনের সঙ্গে মেলাতে পারছিল না আমাকে, ভেবেছিল শতচ্ছিন্ন পোশাকে একজন টিংটিঙে ভবঘুরেকে দেখবে, নাকে শিকনি চোখে পিচুটি, চামড়ায় চামউকুন, চুলে মৌমাছির চাক, দেখবে বাড়ি একেবারে আঁস্তাকুড়, কাকেরা শকড়ি খুঁটে খাচ্ছে । অফিসের বদান্যতায় কেনা সিনথেটিক কার্পেট, সোফা, টিভি ইত্যাদি দেখে আরও ঘাবড়ে গিয়ে থাকবে, রাজা সরকার আর অলোক গোস্বামীর মতন । তারপর যখন অফিস-প্রধানের কাজ করতে আরম্ভ করলুম, তখন অফিসের গাড়ি নিতে আসতো আর ফিরতুম তাতে । তবে গৌতম-সুশান্তর সঙ্গে পরিচয়ের পর পাড়ার লোকে আমাকে সিঁড়ির ওপরের পাদানিতে চাপিয়ে দিয়েছিল । সুশান্তর মা ছিলেন সিপিএম সমর্থক, দেয়ালে “গণশক্তি” সাঁটা হতো প্রতিদিন । মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় গদিতে বসার পর বললেন, সিপিএম তো আমাদের জন্য কিছুই করল না, সেই দেশভাগের সময়ের দুবেলা দুমুঠোর দারিদ্র্যেই পড়ে আছি। ভাতের হোটেল খুলে সংসার চালাতেন, আমরাও আনিয়ে খেতুম মাঝে-সাজে, রান্নার হাত খুবই ভালো।
    পশ্চিমবাংলার টেকটনিক প্লেটে যখন ধ্বস নামছিল, তখনই মুম্বাই চলে এলুম, শীতের পোশাক, বইপত্র আর আসবাব বিলিয়ে দিয়ে, গাড়িটা বেচে দিয়ে । বেচে, গাড়িকেনার বোকামি থেকে ছাড়ান পেলুম। বইপত্র নিতে কোনো লোকাল গ্রন্হাগার রাজি হল না, শেষে সপ্তর্ষি ভট্টাচার্য ওর অ্যামবাসাডর গাড়ির ডিকিতে ভরে-ভরে কয়েক খেপে নিয়ে গিয়েছিল । তারপর মা-মাটি-মানুষ করতে গিয়ে সিনডিকেটের হাতে এমন প্যাঁদানি খেয়েছিল সপ্তর্ষি যে ভেলোরে গিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারল; কিন্তু ভেলোরের প্রভাবে এখন যিশুখ্রিস্টের গুণগান করে বেড়ায়, কেউ-কেউ বলে খ্রিস্টান হয়ে গেছে । সিনডিকেটের লোকেরা আমার দেয়া বইগুলোও অন্য বইপত্রের সঙ্গে ছিঁড়েখুড়ে নষ্ট করে দিয়েছিল । নাকতলা, শ্রীপল্লী, যাদবপুরের যে লাইব্রেরিগুলোয় বই দিতে চেয়েছিলুম, তারা টিটকিরি মেরে বলেছিল, হেঁঃ হেঁঃ, কবিতার বই, এসব কে পড়ে মশায়, আপনি একটা র‌্যাক দান করলেও ওসব বই রাখার জায়গা আমাদের নেই । নবারুণ ভট্টাচার্য তাই বলেছিলেন এই চুতিয়াদের ‘দেশ’ আমার নয়, উনি অবশ্য সোভিয়েত রাষ্ট্রকে নিজের দেশ মনে করতেন ।
    শীতের পোশাক, ডবল-ব্রেস্ট স্যুট, সিঙ্গল-ব্রেস্ট স্যুট, থ্রিপিস স্যুট, টেরিউলের প্যাণ্ট, উলের সোয়েটারগুলো, ফুলশার্ট, সবই দিয়ে দিলুম পাড়ার বিহারি ধোপাকে । বললে, উঁচু জাতের লোকেরা এগুলো আমাদের গাঁয়ে পরতে দেবে না, ওদের মধ্যে যারা একটু গরিব তাদেরই বেচবো এগুলো । বেচে আমাদের পরার মতন সোয়েটার-চাদর কিনে মা আর বউকে দিয়ে আসবো । দোকান বন্ধ করে চলে গিয়েছিল পনেরো দিনের জন্যে, পাড়ার অনেকের জামা-কাপড় প্রেস করার জন্যে বাসায় রেখে কেটে পড়েছিল
    নিচেতলার ফ্ল্যাটমালিক ফণীবাবুর কাছে গ্যারেজ ভাড়া নিয়ে গাড়িটা রাখতুম ; একদিন গ্যারাজ খুলে দেখি গাড়ি থই-থই-গুয়ে ভাসছে ; নিচেতলার ভাড়াটেরা স্যানিটারি ন্যাপকিন ফেলে-ফেলে গু বেরোবার পথ বন্ধ করে দিয়েছে । কর্পোরেশান বললে পার্টি অফিসে যান, কর্মিদের সেখানেই পাবেন । পার্টি অফিস যিনি সামলাচ্ছিলেন তিনি বললেন, বাড়ির ভেতরের কোনো কাজের দায়িত্ব আমাদের নয়, ধাঙড়দের দিয়ে পরিষ্কার করান, বাঁশদ্রোণী বাজারে ভোরবেলা যে ধাঙড়রা কাজ পাবার জন্যে বসে থাকে তারা বলল, ও কাজ আমাদের নয়, মেথরদের কাজ, গাঙ্গুলিবাগানে মেথর কলোনিতে গেলুম, বাসিন্দারা বলল, ওরা শুধু ম্যানহোলের কাজ করে, গুয়ের কাজ করে না । অগত্যা ডাণ্ডালাগানো দুটো সুইপার কিনে, আমি খালি গায়ে গামছা পরে, সলিলা ব্লাউজ-শায়া পরে, গুয়ের পাঁক ঠেলে-ঠেলে, তিনতলা থেকে জলের পাইপ নামিয়ে গুয়ের ইঞ্চি দুয়েক হলুদ-সবুজ-কালচে চাদরকে পথে বের করে নর্দমায় ঢোকালুম । শিবুর চায়ের দোকানে তখন বামপন্হী দর্শকের পাল । নর্দমার মুখটা গ্যারেজের কোনেই ছিল বলে রাস্তা নোংরা করতে হয়নি । মানুষের গু ধোবার ধান্দায় সেদিন দুপুরে তো রান্না হয়নি, পার্ক স্ট্রিটে মোক্যামবোতে লাঞ্চ আর হুইস্কি খেতে গেলুম। জানি না আর কোনও সাহিত্যিকের দু-ইঞ্চি পুরু গু ধোবার অভিজ্ঞতা আছে কিনা । সেই যে হয়ে-ওঠা, এটা বোধ হয় মহাপুরুষ আর মহানারী হয়ে ওঠায় উত্তরণ ।
    নাকতলার লেটারবক্স পাড়ার আরেকটা ঝামেলা ছিল যখন-তখন মোহোল্লা কমিটির এক কমরেড ক্লাবের মাঠে তাঁবু খাটিয়ে, ভিয়েন বসিয়ে, লাউডস্পিকার লাগিয়ে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত অনুকুল ঠাকুরের শিষ্যদের দিয়ে বিটকেল বেসুরো গান গাওয়াতেন, খাবার জন্যে কি-ভিড় কি-ভিড়, তারপর মাঠময় স্টায়রোফোমের এঁটো থালা । এই গডম্যান জিনিসটা কিছুতেই বুঝতে পারি না ; যতোগুলো গডম্যানের কথা শুনি সকলেই তো পিঁজরেপোলের মালিক । বিজেপি এসে গডম্যানদের আর দ্যাখে কে ! মাঠের মাঝখানে একসময় পোস্টাল ডিপার্টমেন্টের লেটারবক্স ছিল বলে পাড়াটার নাম লেটারবক্স, কোনো এক সময়ে মাঠের একপাশে কেবল আমাদের বিল্ডিঙটাই ছিল ।
    হাংরি আন্দোলনের সুবো আচার্য গডম্যানের ওই প্রাতিষ্ঠানিক পিঁজরেপোলে ঢুকে চোপোররাত্তির অনুকুল ঠাকুরের গুণগান করে বেড়ায় । সুবোর বাড়ি বিষ্ণুপুরে গিয়েছিলুম আমি সুবিমল আর ত্রিদিব, তখন ও ত্রিপুরার গোপন ডেরা থেকে ফিরেছে, কেননা আমার বিরুদ্ধে মামলা শুরু হয়ে গেছে, সে ছিল এক ভিন্ন সুবো আচার্য, বিষ্ণুপুরে ঘোরাঘুরি করে ধানখেতের ভেতর দিয়ে ল্যাংটোপোঁদে চারজনে একটা নদী পার হয়েছিলুম মাথায় পোশাক চাপিয়ে, গাছতলায় ল্যাংটোপোঁদে চারজনে গাঁজা টেনেছিলুম । এখন সুবো অনিশ্চয়তাকে এতো ভয় পায় যে কথায় কথায় গুরুদেব গুরুদেব ভজন গায় অথচ আগে ওর গুরুদেব ছিল সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ; “সুনীল বলেছে মলয় লিখতে জানে না”, সেকথা শুনে ধেই-ধেই করে নেচেছে। অনুকুল ঠাকুরের শিষ্য হবার পর অনিশ্চয়তায় আক্রান্ত সুবো বেশ ঈর্ষাকাতর, হিংসুটে আর ঘুরিয়ে মিথ্যেকথা বলতে শিখে গেছে । শৈলেশ্বর ঘোষ নাকি ওকে বলেছিল,”মলয় এক রাতে বাসুদেবের বাড়িতে গেলে বাসুদেব গলায় রুমাল জড়িয়ে বলেছিল, ‘গরীবের বাড়িতে দুটো ডালভাত খাবেন দয়া করে’, তাইতে মলয় বলেছিল, ‘শুধু ডালভাত দিয়ে একথা বলতে নেই,’ ঘটনাটা শুনে আমি অবাক হয়ে গেছিলাম।” এই হল গডম্যান-শিষ্যদের অসততা । প্রদীপ চৌধুরী বলেছিল, ওটা সুবো আচার্যের ডিএনএতে রয়ে গেছে, গুরু, মন্ত্র, মনুসংহিতা, রক্ষণশীলতা ইত্যাদি ।
    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় নিজেই ‘দেশ’ পত্রিকায় ‘আত্মপ্রকাশ’ নামে যে উপন্যাস লিখেছিলেন তা নিয়ে সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের হাসির ছটা আজও মনে আছে । উপন্যাসে কোনো কাহিনি বা প্লট নেই, আর এমন নয় যে তা পোস্টমডার্ন উপন্যাস । নিজের মধ্যবিত্ত জীবনযাপনের অভিজ্ঞতা ফুটিয়ে তুলেছেন, যে বন্ধুদের বইটায় এনেছেন তারা ফিকটিশাস, ফলে তাদের চরিত্র ফুটে ওঠেনি । নিজের ‘অর্ধেক জীবন’-এ স্বীকার করেছেন যে যাহোক-তাহোক করে লিখেছিলেন টাকা রোজগারের জন্য । উপন্যাসটা দুম করে শেষ করে দিয়েছেন, বেশ্যা বীনার বোন নুরজাহানের উপকাহিনি দিয়ে, যার কোনো কার্যকারণ নেই । আমাকে একটা চিঠিতে লিখেছিলেন যে বালজাকের মতন নিজের ভোকাবুলারি তৈরি করে নিয়েছেন । আদপে নিজের ভাষাই গড়ে তুলতে পারেননি, যেমন শক্তি চট্টোপাধ্যায় অসাধারণ গদ্য গড়ে তুলেছেন ‘কুয়োতলা’ উপন্যাসে, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় ‘ক্রীতদাস ক্রীতদাসীতে’ । শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের আর্থিক অবস্হা সুনীলের চেয়ে অত্যন্ত খারাপ ছিল, বস্তিতে থাকতেন মায়ের সঙ্গে । আমি আমার প্রথম উপন্যাস ‘ডুবজলে যেটুকু প্রশ্বাস’ এক কপি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে পাঠিয়ে বলেছিলুম, এটা আমার প্রথম উপন্যাস, উত্তর দেননি ।
    আমি কখনও বাসুদেবের বাড়িতে রাতে যাইনি, ১৯৬৭-এ মামলা জিতে যাবার পর আমি শৈলেশ্বর, বাসুদেব, সুভাষ, সুবো প্রমুখ মুচলেকাপন্হীদের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ রাখিনি, সুবো আমাকে টেলিফোন করে বার-বার অনুরোধ করেছে যাতে সমীর চৌধুরী সম্পাদিত হাংরি সংকলনে লেখা দিই, যখন জানতে চাইলুম যে লোকটা হাংরি আন্দোলন সম্পর্কে জ্ঞান রাখে কি ? সুবো একেবারে বোবা । সুবোর আরেকটা মিথ্যা হল নিজের ধার্মিক মতামতকে বাসুদেব দাশগুপ্তের ওপর চাপিয়ে দেয়া । ‘বাঘের বাচ্চা’ (২০১৬ ) পত্রিকায় সুবো লিখেছে, বাসুদেব দাশগুপ্তের সঙ্গে “একবার হোমোসেকসুয়ালিটি নিয়েও দীর্ঘ আলোচনা হয়েছিল — আমরা দুজনেই শেষ পর্যন্ত এটাকে ‘জঘন্য’, ‘কদর্য’ বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছি।” আরে, তোরা নিয়েছিস তো পৃথিবীর সমকামীরা কি নেয়ানডারথালদের আশ্রমে পৌঁছে গেল ! দাদা মারা যাবার পর যে শোকসভা হয়েছিল সেখানে দাদার সম্পর্কে বলার বদলে সুবো আচার্য সমকামীদের বিরুদ্ধে বক্তৃতা দিয়ে শ্রোতাদের পিলে চমকিয়ে দিয়েছিল । হ্যালো, গুরুদেব কি বলেনি যে অনিশ্চয়তা হল কবিতার কম্পনকেন্দ্র যেখান থেকে সংবেদনের ঢেউগুলো পরিব্যপ্ত হয় ।
    “কল্কি” পত্রিকার তরুণী সম্পাদক কৃতী ঘোষ কিংবা গুরুচণ্ডালীর ঈপ্সিতা পাল যেমন বলেছেন, “ঝাঁট জ্বলে যায়”, আমারও ঠিক তাই । যতোটা জানি, ঝাঁট হল হিন্দি শব্দ ; এর বাংলা প্রতিশব্দ কেন নেই?
    নাকতলায় একদিন টেলিফোন পেলুম, “মলয়, আমি উদয়ন বলছি, উদয়ন ঘোষ, আপনাদের পাড়ায় এসে গেছি, রিকশঅলাকে বলবেন ট্রান্সফরমার স্ট্যাণ্ড” । ২০০১ সালে আমার ছোটোগল্প নিয়ে একটা প্রবন্ধে উদয়ন লিখেছিলেন, “যত দিন যাচ্ছে, মলয়ের লেখা যত পড়ছি, ততই মনে হচ্ছে, তাঁকে নিয়ে মহাভারত লেখা যায়।” তখনও পর্যন্ত ওনার সঙ্গে আমার সামনাসামনি দেখা হয়নি । ভাবলুম, যাক, কেদার ভাদুড়ির মতন আরেকজনকে পাড়ায় পাওয়া গেল মোদো-আড্ডা দেবার জন্য । একটা পিটার স্কটের বোতল কিনে হাজির হলুম, দেখি উদয়ন শয্যাশায়ী, মন খারাপ হয়ে গেল । আমায় দেখে বিছানা থেকে ধড়মড় করে উঠতে যাচ্ছিলেন, বারন করলেন ওনার স্ত্রী । হাঁপানিতে ধরেছে, লিখতে পারছেন না বলে ডিপ্রেশান, নানা রকম যন্ত্রপাতি ওনার বিছানা ঘিরে। আড্ডা হল কিছুক্ষণ, আমি যেমন শক্তি চট্টোপাধ্যায়কে বই ছাপাবার টাকা দিয়েছিলুম, উনিও দিয়েছিলেন, আমাদের দুজনের একই অভিজ্ঞতা । মাঝে-মাঝে যেতুম, উনি শয্যাশায়ী । ওনার আর শান্তিরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় আর শান্তি লাহিড়ীর একই অবস্হা, পঞ্চাশ দশকের তিনতিকুড়ি কবি-লেখকদের সঙ্গে চিপকে থেকে গর্ব বোধ করার দরুন নিজের লেখার সময় দুমড়ে ছোটো করে ফেলতে হয়েছিল । একদিন উদয়নের মেয়ের টেলিফোন পেলুম যে মারা গেছেন ।
    ২০১৪ সালে যখন “নখদন্ত” বইটার নতুন সংস্করণের মোড়ক উন্মোচন কাকে দিয়ে করানো হবে জানতে চাইলেন গুরুচণ্ডালীর কর্ণধার ঈপ্সিতা পাল, আমি বলেছিলুম, বইমেলায় যারা জিনিসপত্র ফিরি করে বেড়ায়, তাদের কাউকে দিয়ে । তেমনই একজনকে দিয়ে করিয়েছিলেন উনি । কলকাতায় থাকতে তরুণ কবিদের দেখেছি আগের দশকের কোনো টাকমাথা বা চুলে কলপদেয়া কাঁধে-চাদর কবি বা লেখককে দিয়ে “মোড়ক উন্মোচন”এর অনুষ্ঠান করিয়ে গদগদ হন, যেন ফুলশয্যায় কনডোমের প্যাকেট খোলাচ্ছে । আমার মনে হতো এইসব তরুণ কবি সারাটা জীবন অন্যের চিন্তাজগতে বসবাস করে কাটাবে, বেঁচে থাকার চারিদিকে যে সন্ত্রাস আর নোংরামি, তার সঙ্গে এদের পরিচয় হবে না কখনও । একজন ফিরিঅলাকে দিয়ে বইয়ের “মোড়ক উন্মোচন” করিয়ে কী যে আনন্দ কী বলব । আপনার যদি ঘুম না হবার ব্যামো থাকে তাহলে তিরিশ-চল্লিশজনের কবিতা পাঠের সভায় গিয়ে পেছনের দিকে বসবেন, ঘুমের গ্যারান্টি অনুষ্ঠান ।
    ১৯৯৬ সালে নাকতলায় বেশ আনন্দ হয়েছিল পাটনার এক ফুচকাঅলাকে দেখে, ফুচকা ভেজে, মশলা নিয়ে রোজ ময়দানে বিক্রি করতে যেতো । “পাটনাইয়া ফুচকাই বেচো, নাকি মশলায় অদল-বদল ঘটিয়েছো?” জিগ্যেস করতে বলেছিল, মিষ্টি সামান্য বেশি খায় বাঙালিরা, বাদবাকি পাটনাইয়া, পুরো কলকাতায় যতো ফুচকাঅলা আছে সবাই ভোজপুরি, বিহার আর পূর্ব উত্তরপ্রদেশের, তাই যতো ফুচকা বিক্রি হয় সব পাটনাইয়া । আমাকে কেউ যদি জিগ্যেস করে আপনার কী খেতে সবচেয়ে ভালো লাগে, তাহলে আমি ইলিশ-চিংড়ির কথা বলব না, ফুচকার কথা বলব । ফুচকায় আইরিশ ক্রিম ভরে খেতে দারুণ । যদি আমিষের কথা জিগ্যেস করে কেউ তাহলে বলব যে সুইডেনের আইকিয়ার মিট বল খেতে সবচেয়ে ভালো লাগে, গোরু-শুয়োরের মাংসকে জানিনা কী ভাবে স্পঞ্জের মতন নরম করে তোলে, এক ইউরোতে দশটা মিট বল, এক প্লেট আলুভাজা, একটা তিনকোনা প্যাসট্রি আর কফি, প্রতি রবিবার সকালে, আহা, আহা, আহা, তারপর আর লাঞ্চ করার প্রয়োজন হয় না । তবে ইউরোপের মাংসের প্রিপারেশন ভালো লাগে না, মনে হয় কাঁচা, অনেক সময়ে রক্ত বইতেও দেখেছি প্লেটের ওপর । হাংরি আন্দোলনের সময়ে শৈলেশ্বর ঘোষ আর সুভাষ ঘোষ গোরুর মাংস খেতে চাইত না, বেঁচে থাকলে বিজেপি দলের কর্মী হতে পারতো ।
    ১৯৬৬ সালে অনিল করঞ্জাই আর করুণানিধান মুখোপাধ্যায়কে তাক লাগিয়ে দেবার জন্যে দরিয়াপুরে আমার ঘরে একটা পেইনটিঙ তৈরি করে রেখেছিলুম ওরা দুজনে কাঠমাণ্ডু থেকে ফিরলে দেখাবো বলে, নাম দিয়েছিলুম “পেইনটিঙের ভাষাকে আক্রমণ” । কাজটা ছিল একটা সাদা কার্ডবোর্ডে আমার নুনুর চারিপাশের জমানো বাল, যাকে হিন্দিতে বলে ঝাঁট, আঠা দিয়ে সেঁটে তৈরি আমার আত্মপ্রতিকৃতি । ওরা দুজনে দেখেই থ, করুণা বললে, “শালা একেবারে ক্লাসিকাল আর্ট, যেন ইউলিসিস, বেনারস নিয়ে যাবো, হিপিগুলো দেখেই লেড়িয়ে যাবে, দশ-পনেরো ডলারে ঝেঁপে দেবো, বুঝলে, তোমার ইন্সটলেশান আর্ট পৌঁছে যাবে ইউউউউউ এসসসসসস এএএএএএএএ”। করুণা চুলগুলোতে উপযুক্ত রঙ লাগিয়ে মুখকে আকর্ষক করে তুলল । ওদের সঙ্গে আমিও গেলুম বেনারস, কোর্টে কেস কবে উঠবে ঠিক নেই, সুবিমল বসাক যোগাযোগ রেখেছে হাইকোর্টের অ্যাডভোকেটের সঙ্গে । বেনারসে যাবার লোভ করুণাই দেখিয়েছিল, “গাঁজা-চরস-আফিম মিশিয়ে চারমিনারে পুরে ফোঁকো আর হিপিনীসেক্স করো, একজন মোটা হিপিনী আছে, যাকে কেউ সঙ্গিনী করতে চায় না, এক ব্যাটা হিপি তাকে বেনারসে ছেড়ে আরেকজনকে নিয়ে চলে গেছে, তাকে পাইয়ে দেবো, অনিল ওর নিউড আঁকতে ডাকবে, তখন চাক্ষুষ করে নিও।” দেখলুম মোটা হিপিনীকে, ম্যাডেলিন করিয়েট, পোশাকহীন, ঝলমলে হলুদ আলোয়, অনিলের স্টুডিওতে, আর আবার শুরু হল আমার লুচ্চাপ্রেমিক অ্যাডভেঞ্চার, “অরূপ তোমার এঁটোকাঁটা”। করুণা তিরিশ বছর আগে, অনিল দশ বছর আগে মারা গেছে।
    ১৯৪৭ সাল থেকে, কী খাবো আর কী খাবো না তা প্রকাশ করার স্বাধীনতা আমিও নিজের হাতে তুলে নিয়েছিলুম । কুমড়ো, ঝিঁঙে, ধুঁধুল, কুচোপোনা, মৌরলা, ট্যাঙরা, বিউলির ডাল আমি ইমলিতলায় খেতুম না । দরিয়াপুরে রান্নার বউ রাখলুম ১৯৭০ সালে আর সবকিছুই খাওয়া আরম্ভ করলুম, কেননা রান্নার বউ ছিল বরিশালের আর আমি তাকে বলতুম ধুঁধুলে গোটা মশলা দাও আর কিমা দিয়ে রাঁধো, কুমড়োয় হিং ফোড়ন আর প্রচুর টোম্যাটো দাও, ঝিঁঙেতে রসুন দাও আর কাবলি ছোলা বাটা, বিউলির ডালে আস্ত রসুনকোয়া, বড়ি আর পালংশাক। সেই থেকে রান্নার রেসিপির একটা বই লেখার পরিকল্পনা মাথায় ঠাঁই করে নিয়েছে । ঠাকুমা ঠিকই বলতেন যে রান্নায় উচিত মশলা দিতে জানলে পাথরের টুকরোর তরকারিও খাওয়া যায় । আমি আসলে বেশ পেটুক । নোলা-সকসকে মানুষ বলতে যা বোঝায়। খিদে না থাকলেও ভালো খাবার দেখলে বা স্কচ বা সিঙ্গল মল্ট দেখলেই খেতে ইচ্ছে করে । খিদে ব্যাপারটা মনের স্হিতি, পেটের নয়।
    “দ্বন্দ্বশূক” পত্রিকায় দেয়া সাক্ষাৎকারে বাসুদেব দাশগুপ্ত বলেছে যে আমি আর সুবিমল ওর বাড়ি গিয়েছিলুম ১৯৬৮ সালে । তথ্যটা ভুল । “জেব্রা” দ্বিতীয় সংখ্যা বের করার পর, আমার কোর্টের রায় বেরিয়ে গেছে ১৯৬৭ সালে, তারপর মুচলেকাপন্হী গোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগ ছিন্ন, মুখে ওদের নাম পর্যন্ত আনি না । ওদের দোষ দিই না, ওদের বিপদে ফেলার জন্যে আমিই দায়ি । আমি আর সুবিমল গিয়েছিলুম বাসুদেবের বাড়ি, হাইকোর্টে কেস জেতার আগে, বাসুদেবের “দেবতাদের কয়েক মিনিট” শুনে বলেছিলুম উইলিয়াম বারোজের কাট-আপের প্রভাব আছে । বাসুদেব আমার কাছে অস্বীকার করেনি, কাট-আপের কথা বাসুদেব দাশগুপ্ত আগে থেকেই জানতো, আমিই ওকে ব্রায়ন জিসিনের নাম আর পদ্ধতির কথা বলেছিলুম । সাক্ষাৎকারে বলেছে যে ও ১৯৬৮-এর পরে “নেকেড লাঞ্চ” পড়েছে । অথচ “নেকেড লাঞ্চ” আমায় পাঠিয়েছিল লরেন্স ফেরলিংঘেট্টি আর আমি তা সুভাষ ঘোষকে পড়তে দিয়েছিলুম ; বাসুদেব সুভাষের কাছ থেকে নিয়ে পড়েছিল । বাসুদেবের বাড়িতে আমি রাতে কখনও থাকিনি, দিনে গিয়ে দিনেই ফিরেছি । রাতে আমি সোনাগাছিতেও কখনও থাকিনি তো বাসুদেবের বাড়িতে থাকবো কোন যুক্তিতে । বাসুদেব দাশগুপ্ত, শৈলেশ্বর ঘোষ কখনও ব্যাংকশাল কোর্টে আসতো না ।
    ১৯৭৯ সালে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের চাকরি ছেড়ে সিনিয়ার অ্যানালিস্ট হিসেবে অ্যাগ্রিকালচারাল রিফাইনান্স অ্যান্ড ডেভেলাপমেন্ট কর্পোরেশানের লখনউ দপতরে যোগ দিয়ে কয়েকদিন স্টেশানের কাছে হোটেলে ছিলুম আর প্রতিদিন রাতে ওল্ড মংক খেয়ে পাঞ্জাবি সরদারের দোকানে পুরো চিকেন তন্দুরি খেতুম কুড়ি টাকায় । আরও চারজন সিনিয়ার অ্যানালিস্ট, সকলেই ধনী চাষিবাড়ির কৃষি-বিজ্ঞানী, আবদুল করিম, শেট্টিখেড়ে প্রভাকর, ডক্টর কুরকুটে আর মদন মোহন যোগ দিলে, যতোদিন না বাড়ি পাচ্ছি, আমাদের থাকার ব্যবস্হা হল উত্তরপ্রদেশ ভূমি বিকাশ ব্যাংকের গেস্ট হাউসে । রান্নার ব্যবস্হা নিজেদের। প্রভাকর সম্পুর্ণ শাকাহারি, পেঁয়াজ রসুনও খায় না, আর করিমের আমিষ না হলে চলবে না । সিদ্ধান্ত হল একদিন প্রভাকর রাঁধবে একদিন করিম । আমরা বাসন মাজবো, ঝাড়ু দেবো, পোঁছাপুছি করব চারটে ঘর আর ড্রইং রুম । এই চাকরিতে প্রথমেই যেতে হয়েছিল হিমালয়ের তরাইতে আর্টেজিয়ান কুয়োগুলোকে কাজে লাগাবার প্রজেক্ট তৈরির কাজে, তার আগে জানতুম না যে মাটির তলা থেকে কনকনে ঠাণ্ডাজল আপনা থেকে ফোয়ারার মতন বেরোতে থাকে ।
    করিমের মাংস রাঁধা দেখে আমাদের মাংস খাওয়া টঙে উঠল । মাংস কিনে এনে সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত জলে ভিজিয়ে রাখত যাতে শেষ রক্ত ফোঁটাও বেরিয়ে যায়, তবুও খেলুম মাংস, তাতে সজনে ডাঁটা মুলো বেগুন দেয়া । মাংসের সাম্বর, হায়দ্রাবাদি বিরিয়ানি আর হালিম রাঁধা অন্ধ্রের আবদুল করিমের কাছে শিখলুম । ওকে তারিফ করে হায়দ্রাবাদি বিরিয়ানি আর হালিম রাঁধায় টেনে নিয়ে গিয়ে আমাদের স্বস্তি । মুর্গি কিনে এনে করিম তাকে উনুনে ঝলসে নিতো যাতে রক্তের রেশ না থাকে । আর তার ফলে গ্যাসের উনুন থেকে আগুন বেরোনো চৌপাট হয়ে যেতো । এখন অবসর নেবার পর নাভি পর্যন্ত পাকা দাড়ি নিয়ে করিম পাঁচবেলা নামাজ পড়ে, অন্ধ্রের গ্রামে একটা বাড়ি করেছে সাতটা ঘরের, বিশাল বাংলো, ভেবেছিল বউ আর নাতিপুতি নিয়ে থাকবে, তা বউটাই মারা গেল ক্যানসারে, একটাই ছেলে হাসন্যায়েন থাকতে চায় না বাপের সঙ্গে । করিম এখন কাউকে বিশ্বাস করে না । লখনউ থাকাকালে করিম যেখানেই ট্যুরে যেতো, আমার ছেলের জন্য কোনো উপহার সেই জায়গা থেকে আনতো, নাকতলার ফ্ল্যাট বেচার সময়ে সবই পাড়ায় বিলি করে দিতে হয়েছে ।
    প্রভাকর ব্রেকফাস্টে দোসা সাম্বর বা ইডলি বানিয়ে দিতো । দোসা ইডলি আর সাম্বর বানাতে শিখে গেলুম, শিখে ফেলার পুরস্কার হিসেবে ও কর্ণাটকে নিজের গ্রাম থেকে একটা দোসা বানাবার চাটু এনে দিয়েছিল, যা এতো ভারি যে এখন আর তুলতে পারি না । তিন মাস পরে ইন্দিরানগরে বাংলোবাড়ি পেয়ে নতুন আস্তানায় গিয়ে পাটনা থেকে সলিলা, ছেলে-মেয়ে আর জিনিসপত্র নিয়ে এলুম । যে বাংলো পেয়েছিলুম, তাতে প্রচুর সাহায্য পেলুম চার কৃষি বিজ্ঞানী বন্ধুর, নিজে চাষ করার, বাগান করার, এমনকি ঘাস লাগাবার। আর প্রচুর বই, চাষবাসের বই, কিছুই জানতুম না আগে । সেই থেকে আমার মস্তিষ্ক হয়ে গেছে ক্যালাইডোস্কোপিক । নতুন চাকরিটাও এমন যে গ্রামে-গ্রামে চাষের উন্নতির রিপোর্ট দিতে হতো । গোরু, ছাগল, মোষ, বলদ, ষাঁড়, শুয়োর, হাঁস, মুর্গির যে কতো রকম প্রজাতি হয় সেই প্রথম জানলুম । মোষ-ষাঁড়-শুয়োরের সিমেন বের করার টেকনিক, সেই সিমেন মাদিদের যোনিতে পোরার টেকনিক, দেখতে দেখতে বেশ উত্তেজনা হতো । তার আগে তো দূর থেকে বাজরা আর জোয়ার খেতের তফাত টের পেতুম না।
    ১৯৫০ সাল থেকেই ঠাকুমা গরমকালে কেবল একটা গামছা কোমরে জড়িয়ে উত্তরপাড়ার খণ্ডহরে ঘুরে বেড়াতেন, ভাড়াটেদের সঙ্গে গ্যাঁজাতেন, ওনার মাইদুটো শুকিয়ে আমসি হয়ে গিয়েছিল । যখনই যেতুম কিংবা ঠাকুমা পাটনায় আসতেন, বলতুম, “তোমার মাই নিয়ে খেলবো” । ঠাকুমার মাইয়ের বোঁটা দুটো দুহাতে ধরে জুড়ে ছেড়ে দিতুম আর বলতুম, “ঝমমমম”। ঠাকুমা বলতেন, যথেষ্ট বয়েস হয়েছে তোর, “এবার বে-থা কর আর বউয়ের মাই নিয়ে ঝম ঝম কর দিকিনি।” বলতুম, “বউয়ের মাই তো আর তোমার মতন হবে না যে এক বোঁটার সঙ্গে আরেক বোঁটাকে মেলাবো।” ঠাকুমা বলতেন, “আমার মাইও এককালে তোর বড়োজেঠিমার চেয়ে পেল্লাই ছিল, বুঝেছিস, তোর দাদুর কতো গর্ব হতো।” ঠাকুমা মারা যাবার চার বছর পরে বিয়ে করলুম, নয়তো ওনাকে বলতুম, আমিও আমার বউয়ের মাই নিয়ে গর্ব করি , তোমাকে দেখাতে বলব একদিন ।
    ২০১০ সালে মালাডের ইনঅরবিট মলের ফুড কোর্টে বসে অপেক্ষা করছিলুম এক দম্পতির, সেদিন তাদের বিবাহবার্ষিকী, খাওয়াবে বলে কয়েকজনকে ডেকেছে । প্রায় সকলেই পৌঁছে গিয়েছিলুম । একজন যুবতী এগিয়ে এলো আমার দিকে, দুহাতে বিয়ের মেহেন্দি, এক হাতে প্লাস্টিকের চালুনি, আরেক হাতে বাঙলা পাঁজি আর দামি ব্যাগ । ইংরেজিতে আমাকে বলল, স্যার আপনাকে বাঙালি বলে মনে হচ্ছে, আমি এই ফোরটিন গ্রিনস কিনতে বেরিয়েছি কিন্তু কোথাও পাচ্ছি না, ক্রফোর্ড মার্কেটেও পাইনি; আপনি কাইন্ডলি বলতে পারবেন কি যে এই গ্রিনগুলো কোথায় পাবো ? জিগ্যেস করে জানলুম ও কানপুরের মেয়ে, বিয়ে করেছে বাঙালি যুবককে, শশুর-শাশুড়িকে ইমপ্রেস করার জন্য চোদ্দশাক খুঁজে বেড়াচ্ছে । চালুনিটা করওয়া চৌথের জন্যে । পাঁজি খুলে দেখলুম শাকের নাম দেয়া আছে, ওলপাতা, কেঁউ, বেতো, সরিষা, কালকাসুন্দে, নিম, জয়ন্তী, শাঞ্চে, হিলঞ্চ, পলতা, শৌলফ, গুলঞ্চ, ভাটপাতা আর সুষণী । বললুম, এই ফোরটিন গ্রিনসের কথা আমি নিজেই আগে জানতুম না, আমাদের বাড়িতে যে চোদ্দশাক হতো তাতে পালংশাকের সঙ্গে নটে, ধনে, সোয়া, লাউ, কুমড়ো, পালং, কলমি, যার কোনোটাই এই লিস্টে নেই । আমার স্ত্রী যুবতীটিকে বলল, পালংশাক কিনে নাও আর যা-যা গ্রিনস পাওয়া যাচ্ছে কিনে নাও আর তা শ্রেডিং করে রেঁধো, তোমার ইনলজ আনন্দিত হবেন । নিজেরা যে বাঙালিত্ব ছেড়ে দিয়েছি একজন অবাঙালী যুবতীকে তা করতে দেখে, করুণার ভাষায়, লেড়িয়ে গেলুম ।
    মুম্বাই থেকে ফিরে সুভাষ ঘোষের বাড়ি চন্দননগরে গিসলুম ১৯৯৬ সালে, বহুকাল পর দেখা করার ইচ্ছে দমিয়ে রাখতে পারিনি বলে, স্টেশন থেকে বেরিয়ে দেখি সিপিএম-এর মিছিলে ঝাণ্ডা নিয়ে স্লোগান দিতে-দিতে যাচ্ছে সুভাষ ঘোষ, মন খারাপ হয়ে গেল । ওর বাড়ি গিয়ে দেখি বারান্দার এক কোণে সিপিএম-এর ঝাণ্ডার স্তুপাকার গোছা, ভেতরের ঘরে দেয়ালে ঝুলছে জ্যোতি বসুর ছবি, মনে হল ওর বাড়ি আসা বড্ডো ভুল হয়ে গেছে । প্রতিষ্ঠানবিরোধী ঢুকে গেছে প্রতিষ্ঠানের খাঁচায় । অবশ্য যখন ও মুচলেকা দিয়ে আমার বিরুদ্ধে রাজসাক্ষী হয়েছিল, তখনই হদিশ পেয়েছিলুম যে ও একা লড়তে ভয় পায়, ওর চাই মিছিলের আশ্রয়, ওর চাই কফিহাউসের তরুণদের জমঘট । বলল, “মফসসলে থাকলে বুঝতে এসব না করে টিকে থাকা কতো কঠিন”। নিজের বউ কণক ঘোষকেও হাংরি আন্দোলনের অন্তর্ভুক্ত করে ফেলেছে, যদিও কণক ঘোষের লেখার স্তর বাচ্চাদের । এদিকে সিপিএমের লুম্পেনরা তখন গ্রামে-গ্রামে অবর্ণনীয় অত্যাচার চালাচ্ছে, বাড়ি-ধানের গোলা পোড়াচ্ছে, মুণ্ডু নিয়ে ফুটবল খেলছে, পেট্রল ঢেলে মানুষ পোড়াচ্ছে, মানুষদের জ্যান্ত মাটিতে পুঁতে দিচ্ছে, সুভাষের লেখায় তাদের দেখা মেলে না। এই লুম্পেনরা এখন তৃণমূলে গিয়ে ভিড়েছে। শুভঙ্কর দাশ টেলিফোনে জানিয়েছিল সুভাষের মৃত্যুর কথা । শুভঙ্করের লেখাতেও এই লুম্পেনদের দেখা পাওয়া যায় না । কবিতার ভারে শুভঙ্কর বেশ অসুখী, নিজের বাচ্চার সঙ্গে খেলতেও ওর বাধো-বাধো ঠেকে । আমার কাছে অ্যালেন গিন্সবার্গ আর এজরা পাউণ্ডের স্বকন্ঠে কবিতাপাঠের রেকর্ডগুলো দিয়ে দিয়েছিলুম শুভঙ্করকে । মাঝে-মাঝে ইউরোপে কবিতা পড়তে যায় । আমি ইউরোপে গিয়ে কবিতা পড়ার ব্যাপারে নিজেকে জড়াইনি ; তার চেয়ে লেচারিগিরি বেশি জরুরি মনে হয়েছে ।
    মুম্বাই থেকে ফিরে ১৯৯৫ সালে প্রদীপ চৌধুরীর বাড়ি গিসলুম, দাদাকে আমাকে সলিলাকে শ্যাম্পেন খাওয়াবার নেমন্তন্ন করেছিল, শুনেছিলুম ফি বছর ফ্রান্সে কবিতা পড়তে যায় । শ্যাম্পেনের বোতলে ভরে দিশি বাংলা খাওয়ালো, ভেবেছিল আগে শ্যাম্পেন খাইনি কখনও । বহুকাল পর পুরোনো প্রদীপকে পেয়ে গেলুম, দেশ-বিদেশ ঘুরেও টসকায়নি, দি সেম ওল্ড কুমিল্লা ব্লোক, জিভের আড় ভাঙেনি । “হাওয়া ৪৯” পত্রিকায় প্রদীপ সম্পর্কে একটা লেখা লিখেছিলুম, প্রদীপের রাস্টিকেশানের যাবতীয় ডকুমেন্টসহ, প্রদীপ বলেছিল আমার গদ্যটার মতন আর কেউ ওকে বিশ্লেষণ করতে পারেনি । কিন্তু মুচলেকাপন্হীরা ওকে একঘরে করে দিতে পারে এই ভয়ে, লেখাটার সঙ্গে দেবার জন্যে একটা ফোটো তুলিয়ে দিয়ে গেল, যেন আমাকে লাথি দেখাচ্ছে । ওই ফোটোসহ ছেপে দিয়েছিলুম গদ্যটা । জানি না রাজসাক্ষীদের ও কেন এতো ভয় পেতো । তাদের অন্তর্ধানের পর পুরোনো প্রদীপ খোলোশ থেকে বেরিয়ে এসেছে । অভিমন্যু সিংহের সাইটে ইনটারভিউ দিয়ে যে ফোটো দিয়েছে তাতে প্রদীপের গলায় ঝুলছে বিজেপির পদ্মফুল ।
    মুম্বাই থেকে ফিরে ১৯৯৬ সালে শৈলেশ্বর ঘোষের বাড়ি গিসলুম, বেশ অনেকখানি জায়গা নিয়ে বাড়ি, পাঁচিলের গা ঘেঁষে দেবদারুর সারি বসিয়েছে, কিন্তু তা সত্ত্বেও পত্রিকার মলাটে ভিকিরির ছবি কেন, জিগ্যেস করতে বলল, ‘পাতা ফুঁকবে নাকি’ । আলমারি জুড়ে কেবল নিজের বই, সারি-সারি । মারা গেল অপারেশান থিয়েটারে । একে-একে মারা গেল ওর বউ, জামাই, মেয়ে । কিন্তু প্রচুর এনটিটি পয়দা করে গেছে ওর লেখাপত্তর সামলাবার ।
    আমি তো চিনতুম না, তাই প্রদীপ চৌধুরী বলেছিল শৈলেশ্বরের বাড়ি নিয়ে যাবে । যেদিন যাবার সেদিন গাপ মেরে শৈলেশ্বরকে আগাম খবর দিয়ে এলো, যাতে ও তৈরি থাকে। আমি আর দাদা ওর অপেক্ষায় গড়িয়ার বাস ডিপোয় দাঁড়িয়ে রইলুম ঘণ্টা দুয়েক । পরের দিন নিয়ে গিয়েছিল । মারা যাবার কয়েকদিন আগে শৈলেশ্বরের মেয়ে জীজা ঘোষ চিঠিতে প্রণবকুমার চট্টোপাধ্যায়কে লিখেছে যে, যে-পত্রিকায় মলয় রায়চৌধুরী আর সমীর রায়চৌধুরীর লেখা থাকবে তাতে যেন ওর বাবার লেখা প্রকাশ না করা হয় । মন্দ নয়, মারা যাবার আগে মুচলেকা-লেখক মেয়েকেও রাজসাক্ষ্যের দুর্গন্ধ মাখিয়ে যেতে পেরেছে। বেচারি । অনেক বকাসুর চেহারার অ্যাণ্ডাবাচ্চাও ছেড়ে গেছে আমার চোদ্দপুরুষ উদ্ধার করার জন্য।
    মুম্বাই থেকে ফিরে ১৯৯৬ সালে অবনী ধরের গল্পগুলো নিয়ে একটা বই যাতে বেরোয় তার চেষ্টা করলুম । বাসুদেব, সুভাষ, শৈলেশ্বর, প্রদীপ কেন যে অবনী ধরের গল্পগুলো নিয়ে বই করতে চায়নি জানি না। অবনীও, সোনাগাছিতে বাসুদেবের সঙ্গে গিয়ে বেবি-মীরা-দীপ্তির সঙ্গে শোবার আর ধেনো টানার খরচাপাতি করেছে, বই বের করার কথা ভাবেনি । অবনীর বই বের করার প্রস্তাবটা দিতেই রাজি হয়ে গেল শর্মী পাণ্ডে, আমি একটা ভূমিকা লিখে দিলুম । বাচ্চা হচ্ছে না বলে শর্মী পাণ্ডের তখন বেজায় মন খারাপ, নানা হাসপাতালে নানা টেস্ট করিয়ে চলেছে, বেশ ব্যস্ত । তা সত্বেও আগ্রহ নিয়ে বের করে দিল বইটা । অবনী ধর এক কপি দিতে এসেছিল আমায়, বলল বইটার নাম “ওয়ান শট” এর বদলে “ওয়ান সট” হয়ে গেছে। বললুম শর্মীও বোধহয় আমার মতন ঘটি । বইটা বের করার পূণ্য হিসেবে একটা সুন্দর বাচ্চা পেয়েছে শর্মী, নাম রেখেছে “রূপকথা” । দারুণ । অবনী ধর যে মারা গেছে তা ওর ছেলের টেলিফোনে জেনেছিলুম।
    ১৯৪৪ সালে ইমলিতলার গঞ্জেড়িরা কেউই বিশ্বাস করতে চায়নি যে ধবধবে শাদা শুয়োর হয় আর তার মাংস খেতে দিশি কালো শুয়োরের চেয়ে ভালো, ওরা ভেবেছিল আমি ইয়ার্কি করছি, “হাঃ হাঃ হমনিকে বুড়বক সমজ লইল কা ববুয়া” । আমি তাই আর ওদের ভুল ভাঙাইনি যে সূর্য পৃথিবীর চারিদিকে ঘোরে না ; জানি ওদের নাতিরা স্কুলে যেতে আরম্ভ করলে পাকা ভুরু কুঁচকে বসে থাকবে ।
    ১৯৬৫ সালে বেনারসে আমার “জখম” কবিতার হিন্দি অনুবাদ, যা কাঞ্চনকুমার করেছিল, তা লুকিয়ে সরকারি প্রেসে ছাপানোর ব্যবস্হা করে দিয়েছিলেন হিন্দি আর মৈথিলি ভাষার কবি নাগার্জুন । বাঁধানো অবস্হায় বইটা হাতে নিয়ে দেখলুম সাজাবার সময়ে কবিতার লাইন একেবারে ওলোট-পালোট হয়ে গেছে । এই-ই হল আমার কবিতার ফর্ম, বললুম নাগার্জুনকে, যেখান থেকে ইচ্ছে লাইন তুলে যেখানে চান বসিয়ে নিন, টোটাল কবিতায় কোনো হেরফের হবে না, আপনার বৌদ্ধধর্মের চত্বারি আর্যসত্যানি দুঃখই তো কবিতাটার বনেদ । ১৯৯৮ সালে মারা গেছেন নাগার্জুন ।
    ১৯৯৯ সালে ঈশ্বর ত্রিপাঠী এসেছিলেন নাকতলার ফ্ল্যাটে, একহাজার টাকা নিয়ে, আমাকে পুরস্কৃত করতে চান, ‘প্রমা’ পত্রিকায় প্রকাশিত আমার “উত্তরদার্শনিকতা” প্রবন্ধ পড়ে এতোই অভিভূত । আমি পুরস্কার নিই না বলে ওয়ান-টু-ওয়ান পুরস্কার দিতে এসেছিলেন, যাতে কেউ জানতে পারবে না, অথচ পুরস্কারও দেয়া হবে । টাকার তোড়াটা উনি সোফার কুশনের তলায় রেখে চলে যেতে চাইছিলেন । বললুম, আমি তো রামকৃষ্ণ নই, বইবাজারের কেষ্টবিষ্টুও নই, লেখার জন্যে পুরস্কার নিই না, সম্বর্ধনা নিই না । উনি মুষড়ে পড়লেন, তুলে নিলেন টাকাটা আর কোনো কথা না বলে সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেলেন । ওনার মৃত্যুর খবর পেয়েছি বেশ দেরিতে । “কবিতা পাক্ষিক” পত্রিকার প্রভাত চৌধুরীও সম্বর্ধনার প্রস্তাব দিয়েছিলেন, আবার বলতে হল যে, আমি এই সবেতে নেই । হয়তো ওনার পছন্দ হয়নি ; তারপর থেকে ওনার পত্রিকায় আমার লেখা ছাপা হয় না ।
    ইমলিতলার গঞ্জেড়িদের জমায়েতে ইঁদুর পুড়িয়ে খাওয়া হতো ; ১৯৪৫ সালে আমি খাইনি, বমি করে ফেলব আঁচ করে, তবু একটুকরো মুখে দিয়ে চেখেছিলুম, বিটকেল সোঁদা গন্ধ, চেখে বমি করলুম । দাদা খেয়ে দেখেছিল, তাড়ি দিয়ে ।
    ১৯৬২ সালে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের সহকর্মী শিউচন্দরের বাড়িতে ওর গ্রাম ছপৌলিতে গিয়েছিলুম। ওদের অনেক জমিজিরেত, ছাগল বলদ গোরু মোষ ঘোড়া । আমায় একটা ঘোড়ানীর পিঠে বসিয়ে, ঘোড়ানীর পিঠে জিন ছিল না, ঘোড়াটাকে শিস দিয়ে ওরা নিয়ন্ত্রণ করছিল, আমার লিঙ্গের তলায় ঘষটানি লেগে দাঁড়িয়ে গেল, ব্যাটারা জানতো কি হতে চলেছে, তাই শিস দিতে থাকলো, আর আমার বীর্যপাত ঘটা আরম্ভ হলে ঘোড়ানীর গলা জড়িয়ে ধরলুম, ঘোড়ানীর সঙ্গে এভাবে প্রেম করে ব্যক্তিগত প্রেমের ইতিহাস তৈরি করলুম। শিউচন্দর মারা গেছে কুড়ি বছর আগে । রিজার্ভ ব্যাঙ্কের চাকরি ছেড়ে দিতে হয়েছিল নোটের বিষাক্ত গন্ধ আর ছোঁয়াচে রোগের জন্য ।
    রাতে শিউচন্দরদের বারদেউড়ির যে ঘরে আমাকে শুতে দিয়েছিল, হঠাৎ তার মধ্যে একজন বিহারি যুবতীকে ঠেলে দিয়ে শিউচন্দরের বাবা বললে, “লে রে ববুয়া, দেশি ঘোড়ি পর চঢ়” । মেয়েটার গন্ধে আমার হাড়-হিম করা ভয় দেখা দিল, দরোজা খুলে বললুম, যাও এক্ষুণি পালাও । ভিতু ছিলুম বেশ । যৌনকর্মে নারীও ভীতির কারণ হতে পারে ।
    ১৯৮৯ সালে মুম্বাইতে ফিয়াট গাড়ি কিনেছিলুম অফিস থেকে লোন নিয়ে । ড্রাইভ করতে বেরিয়ে রিভার্স করার সময়ে একটা ট্রাককে ধাক্কা মারলুম, গাড়ির পেছন দিক চুরমার । ডিলারের কাছে নিয়ে যেতে, বলল, প্রথম গাড়ি কিনে ড্রাইভ করতে বেরিয়ে শতকরা পঁচাত্তর ভাগ লোক অমন দুর্ঘটনা ঘটায়, আপনার ভাগ্য যে সামনে থেকে কাউকে ধাক্কা মারেননি ।
    ১৯৮৯ থেকে ১৯৯৪ পর্যন্ত সান্টাক্রুজের ফ্ল্যাট থেকে নারিমন পয়েন্ট পর্যন্ত প্রত্যেক দিন সকালে আধ ঘন্টায় পৌঁছে যেতুম, মেরিন ড্রাইভে বসে হাওয়া খেতুম । নানা জায়গায় বেড়াতে যেতুম । এখন মুম্বাইতে এতো গাড়ি যে চালানো অসম্ভব, এখন সান্টাক্রুজ থেকে নারিমন পয়েন্ট যেতে তিনচার-ঘণ্টা লাগে। ১৯৯৫ সালে কলকাতায় গিয়ে গাড়ি চালাতে বেশ মুশকিল হতো কেননা নাকতলায় থাকতুম গলির ভেতরে আর সিপিএম দলের পাবলিক রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে গ্যাঁজাতো, গাড়ি দেখেও সরে যেতো না, কেউ-কেউ বলতো, “বাঞ্চোৎ গাড়ি দেখাতে এসেছে”, অর্থাৎ রিফিউজিদের মার্কসবাদ ব্যাখ্যা, এরাই পুরো পশ্চিমবাংলাকে ডুবিয়ে দিয়েছে ; লোকগুলো বুঝতেই পারেনি যে কিছুদিনেই গদি থেকে উৎখাত হয়ে যাবে । প্রায়ই ক্লাচ খারাপ হতো । বেচে দিলুম গাড়ি ।
    ২০০০ সালে নাকতলার ফ্ল্যাটও বেচে দিলুম, এমনই একজনকে যে নিজের নামের মাঝখানে “হার্মাদ” লিখে সিপিএম করতো । মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় গদিতে বসতেই, সাঙ্গোপাঙ্গোদের নিয়ে তৃণমূলে পালিয়েছে । বললুম, কি, শেষ পর্যন্ত হার্মাদকে হমদর্দ করে ফেললেন, তৃণমূলে যোগ দিলেন ; প্রত্যুত্তরে উনি হেঁঃ হেঁঃ দিয়ে নিজের ক্ষুদ্রতা মুখময় ছড়িয়ে দিলেন । বিল্ডিংটা ছিল পঞ্চাশ বছরের পুরোনো ।
    ২০১৬ সালের ঘটনা, আরেকজন হার্মাদকে নিয়ে, তিনি চিরঞ্জীব বসু, নামের মাঝে ‘হার্মাদ’। জীবনানন্দের “অন্ধকার” কবিতা থেকে এই উদ্ধৃতি দিয়েছিলুম ফেসবুকে : “আবার ঘুমোতে চেয়েছি আমি অন্ধকারের স্তনের ভিতর যোনির ভিতর।” চিরঞ্জীব মন্তব্য করলেন, “আপনি এতো আধুনিক কিন্তু বাল ‘ভিতর’ লেখেন কেন ?” আরও অনেকের মন্তব্য ছিল, সকলেই ভেবেছেন, লাইনটা আমার । বুঝতে অসুবিধে হল না যে জীবনানন্দকে পড়াও ছেড়ে দিয়েছে বাঙালি পাবলিক । মন্তব্যগুলো পড়ে “কল্কি” পত্রিকার তরুণী সম্পাদক কৃতী ঘোষের উক্তিটা মনে পড়ে গেল, ‘ঝাঁট জ্বলে যায়। আচ্ছা, মেয়েদের কি ঝাঁট হয় ? কেমন যেন আনরোমান্টিক । তার চেয়ে লোমনাশক লাগিয়ে জায়গাটায় আলতা মাখিয়ে রাখলে শরীর বেয়ে গান বইতে থাকবে ।
    ২০০০ সালে মুম্বাইতে দ্বিতীয়বার হার্ট অ্যাটাকের পরে যখন নানাবতী হাসপাতালে থিতু হলুম, কার্ডিওলজিস্ট আমার স্ত্রীকে বললে, তিন লাখ টাকা তাড়াতাড়ি যোগাড় করুন, বাই পাস করতে হতে পারে। প্রথম হার্ট অ্যাটাকের পর অ্যানজিওপ্লাস্টি করিয়েছিলুম । তিন লাখ টাকা চাইলেই তো আর পায়খানা বা পেচ্ছাপের মতন হাসপাতালে জমা দেয়া যায় না । কলকাতা পাড়ি মারলুম । প্রভাত চৌধুরী আমার হার্ট অ্যাটাকের খবর শুনে ভূমেন্দ্র গুহকে নিয়ে এলো, তার আগে আমার সঙ্গে ভূমেন্দ্র গুহর পরিচয় ছিল না । উনি এক মাসেই সারিয়ে তুললেন, বাংলায় প্রেসক্রিপশান লিখে দিতেন, আমার জন্য ওয়েইং স্কেল আর ব্লাড প্রেশার মেশিন কিনে এনে দিয়েছিলেন ; পরিবর্তে আমি মাছ ভাজা আর স্কচ খাওয়াতুম । প্রতি সপ্তাহে একবার দেখতে আসতেন । হঠাৎ আসা বন্ধ করে দিলেন । হয়তো শরীর খারাপ হয়েছে ভেবে,ওনার বাড়ি গিয়েছিলুম, ভালো ব্যবহার করলেন না, প্রেসক্রিপশান-রিপোর্ট ইত্যাদি ছুঁড়ে ফেলে দিলেন । চুপচাপ ফিরে এলুম, মনখারাপ করে । একবার মদের ঘোরে বলেছিলেন যে সরকারি হাসপাতালে এক্স রে করে করে ওনার শুক্রকীটগুলো বাঁচে না, তাই আর বাচ্চা হয়নি । দাদা পরে খবর নিয়ে জানতে পারল যে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ভূমেন্দ্র গুহকে বলেছেন, “মলয়ের জন্য অতো করার কি আছে, ওর তো কোনো সাহিত্যিক গুণই নেই।” এই একই কথা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বলেছিলেন মারাঠি লেখক-অনুবাদক অশোক সাহানেকে, মারাঠি নাট্যকার দিলীপ চিত্রেকে, ইংরেজি কবিতা লিখিয়ে আদিল জুসসাওয়ালাকে । আর অ্যালেন গিন্সবার্গকে তো বটেই ।
    ভূমেন্দ্র গুহর মৃত্যুর খবর জেনেছি ফেসবুকে ।
    ১৯৬২ সালে “ইল্লত” নামে একটা নাটক লিখেছিলুম, পড়ে প্রশংসা করেছিলেন সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, উনি “বহুরূপী” পত্রিকায় প্রকাশ করার জন্য দিলেন । বেশ কিছুকাল রেখে কুমার রায় বললেন, “আবোল-তাবোল হয়েছে, কোনো কল্পনা নেই, আধুনিকতার ছায়া নেই”। ফেরত নিয়ে “গন্ধর্ব” পত্রিকার নৃপেন সাহাকে দিলুম । উনি পড়ে বললেন ছাপবেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত ছাপলেন না, পাণ্ডুলিপি ফেরত নিয়ে আসার সময়ে দেখলুম ওর ওপরে চায়ের কাপ বা বিয়ারের বোতল রেখেছিলেন, টাকনা রেখেছিলেন । আমার পাণ্ডুলিপির প্রথম রিজেকশান । ফেরত নিয়ে নিজে একটা পত্রিকা বের করলুম, “জেব্রা” নামে, আর তাতে প্রকাশ করলুম । সুভাষ আর বাসুদেবের হিংসে হল নাটকটা পড়ে । আমার লেখা উতরেছে কিনা জানার প্রধান মাপকাঠি ছিল হাংরি আন্দোলনের চার-চৌকড়ির হিংসে । ওদের দাঁতক্যালানে হিংসুটে হাসি দেখে বুঝলুম যে নাটকটা তাহলে ভালোই লিখেছি ।
    বহুকাল পরে, ‘চন্দ্রগ্রহণ’ পত্রিকার সম্পাদক প্রণবকুমার চট্টোপাধ্যায়, যিনি পঙ্কজ চট্টোপাধ্যায় নামে গল্প-উপন্যাস লেখেন, ‘গাঙচিল’ নামে এক প্রকাশন সংস্হার সঙ্গে যোগাযোগ করে আমার প্রকাশিত বইগুলো আরেকবার প্রকাশ করার তোড়জোড় করেছিলেন । কোন লেখাগুলো প্রকাশ করতে হবে আমি তার তালিকা তৈরি করে দিয়েছিলুম । সংস্হার কর্ণধার অধীর বিশ্বাস ২০১৬ সালে একটা প্রবন্ধ সংকলন প্রকাশ করে, আর কোনও সংকলন প্রকাশ করলেন না । অথচ তিনি তিনটি উপন্যাস আর সাক্ষাৎকারসমগ্র ইতিমধ্যে কমপোজ করিয়ে ফেলেছিলেন । দেড় বছর ফেলে রাখার পর বললেন আর আমার বই বের করবেন না । প্রণবকুমার চট্টোপাধ্যায় ডিটিপি করার খরচ দিয়ে সিডিগুলো কিনে নিলেন অধীর বিশ্বাসের কাছ থেকে । আমার বেশ অপমানজনক মনে হয়েছিল ব্যাপারটা । উনি আর প্রকাশ করতে চাইলেন না কেননা যেসব এনটিটি আমার চোদ্দপুরুষ উদ্ধার করার জন্য বকাসুর এণ্ডাবাচ্চা ছেড়ে গেছে তারা অধীর বিশ্বাসের ঘাড়ের ওপর পচা লাশের গন্ধ ছড়াতে আরম্ভ করেছিল। জানতে পারলুম, যে-সংবাদপত্র গোষ্ঠিকে লোকে প্রতিষ্ঠান বলে মনে করে, তাদের খোচরদের চাপে উনি আর এগোননি, এদিকে উনি সুবিমল মিশ্র, সুভাষ ঘোষের বই বের করতে কিপটেমি করেননি । একদিক থেকে এটাকেও রিজেকশান বলতে হবে । রিজেকশানও আনন্দদায়ক হতে পারে, কেননা তা লেখকের বিরুদ্ধে তৈরি প্রাতিষ্ঠানিক ঘোঁটকে সহজেই ফাঁস করে ।
    ১৯৯০, ১৯৯৭, ২০০০ সালে সবসুদ্ধ তিনবার অ্যানজিওগ্রাফি করিয়েছি, ১৯৯৭ সালে একবার অ্যানজিওপ্লাস্টি । প্রতিবার নুনুর চারিধারের জঙ্গল পরিষ্কার করেছে একজন নার্স । তারপর অ্যানজিওগ্রাফি আর অ্যানজিওপ্লাস্টি করার সময়ে নুনু নিয়ে এদিক ওদিক নাড়াচাড়া করেছে কয়েকজন যুবতী নার্স । তাদের আচরণ দেখে মনে হতো যে নানারকম নুনু নিয়ে স্হাপত্য গড়ার অভ্যাস হয়ে গেছে । তাদের হাতে পড়ে নুনুর চরিত্রে বদল ঘটে গিয়েছিল, তা আর লিঙ্গ ছিল না ; হাসপাতাল থেকে ফিরে নুনুর লিঙ্গ হয়ে উঠতে কয়েকমাস লেগে গিয়েছিল ।
    ১৯৯৭ সালে যখন কলকাতার পিয়ারলেস হাসপাতালের আইসিইউতে ছিলুম প্রায় কুড়ি দিন, সেখানে যে ধরণের কাণ্ডকারখানা হতো তা লিখেছি “নামগন্ধ” উপন্যাসে । আমি সেসময়ে অফিসপ্রধান ছিলুম, আর বিকেলে একজন অফিসারকে নিয়ে গিয়ে ভর্তি করানো হয়েছিল, হেপাটাইটিস-বিতে আক্রান্ত, তার স্বাস্হ্য কেমন আছে জানাবার জন্য মাঝরাতে অ্যাডমিনিসট্রেটিভ ইনচার্জ ফোন করেছিল, ঘুমের ঘোরে ফোন তুলতে গিয়ে পড়ে গেলুম আর বাঁদিকের কানটা খাটের কোনায় লেগে রক্তারক্তি হয়ে গেল, রক্তচাপ নেমে গেল, সলিলা ট্যাকসি ডেকে ওই হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে ভর্তি করে দিলে । কান সেলাইয়ের পর ডাক্তাররা বললেন, ইসিজি নেয়া হয়েছে, এনার হার্টে ব্লকেজ আছে মনে হচ্ছে । ফলে প্রথমে অ্যাঞ্জিওগ্রাফি আর তারপর অ্যাঞ্জিওপ্লাস্টি । আই সি ইউতে, প্রত্যেকদিন কোনো-না-কোনো যুবতী নার্স লাঞ্চ আর ডিনার খাইয়ে যেতো, অতি যত্নে, হাসপাতালটায় মেয়েগুলোকে বলে সেবিকা । মুখের ভেতরে একজন কচি যুবতীর আঙুলের স্পর্শেই বোধহয় পনেরোদিনে চনমনে হয়ে গেলুম । মনে হতো, এদের জড়িয়ে ধরে শুয়ে থাকার মতন আনন্দ আর নেই, এদের সঙ্গে সেক্স করা যায় না, জড়িয়ে ধরে বুকে মাথা রেখে ফোঁপানো যায় ।
    ১৯৮৮ সালে মারাঠি কবি অরুণ কোলাটকর বলেছিলেন ওনার বাড়ি যে গলিতে তার মোড়ে একটা ‘নেকেড স্ট্যাচু’ আছে । বাস থেকে নেমে নেকেড স্ট্যাচু আর নংগা মুর্তি জিগ্যেস করে ঘণ্টাখানেক ঘুরেও যখন হদিশ পেলুম না তখন একজনকে জিগ্যেস করলুম অরুণ কোলাটকর কোথায় থাকেন ? সে বলল, মারাঠি কবি তো ? চলুন দেখিয়ে দিচ্ছি । কোলাটকর মারা গেছেন ২০০৪ সালে । বিয়ে করেছিলেন একটি পার্সি যুবতীকে । বাচ্চা হলে সে অসুবিধায় পড়বে বলে বাচ্চা হয়নি ওনাদের । একটা ছোট্ট ঘরে থাকতেন । সবকিছু খাটের তলায়, টেনে বের করলে ডাইনিং টেবিল, লেখার টেবিল । ঘরের চৌকাঠে বসে কবিতা লিখতেন । কারোর সঙ্গে বিশেষ মিশতেন না ।
    যে বছর জন্মেছিলুম, ১৯৩৯ সালে, সেই বছরে জন্মের এক মাস আগেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ আরম্ভ হয়ে গেছে, সংসারে টানাটানি, রাতে অন্ধকার । বাড়ির সবাই আমার জন্মকে দুষেছিল, দ্বিতীয় যুদ্ধ আর বোমার ভয় আর অনটন আনার জন্য, কলকাতা থেকে আত্মীয়-জ্ঞাতিরাও এসে উঠেছিল আমাদের বাড়িতে । বড়জ্যাঠা তখন থেকেই লুঙ্গির চারখুঁটে গিঁট বেঁধে মুসল্লাপুর হাট থেকে ঝড়টি-পড়তি সব্জি কেনা আরম্ভ করেছিলেন, সাইকেলের হ্যাণ্ডেলে ঝুলিয়ে আনতেন । ইমলিতলার বাড়িতে বিজলিবাতি ছিল না, কলের জলও ছিল না । সকলকে রাস্তার কলে গিয়ে স্নান করতে হতো, খাবার জল ভরে আনতে হতো ।
    ১৯৭২ সালে নতুনকাকার বড়ো মেয়ে পুটি উত্তরপাড়ার খণ্ডহরের বড়ো ঘরে, যা কখনও জমিদারের কাছারিবাড়ি ছিল, গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করে নিলে, দড়িটা বাছুরের গলা থেকে খুলে, বাছুরের ছোটাছুটি শুনে সবাই জড়ো হয়ে দেখলুম বরগা থেকে ঝুলছে পুটি, শাড়িতে গোঁজা দীর্ঘ চিঠি, পুলিশকে লেখা, তাদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে । পুটি যে ছেলেটিকে বিয়ে করতে চেয়েছিল সে নতুন কাকার রেলওয়ে ক্যাটারিঙের বেয়ারা ছিল আর গোপনে নকশাল আন্দোলনের কর্মীর কাজ করত । নতুনকাকা অনুমোদন করেননি । পুটি মারা যাবার কয়েকমাসের মধ্যেই ধ্বসে পড়েছিল বড়োঘরের বরোগা, বলা যায় সাবর্ণ ভিলার আত্মহত্যা । পুটির পরের বোন কল্পনা যখন একজন ধোপার প্রেমে পড়ল তখন নতুনকাকার বলার মতো ছিল না কিছু, বিয়ে দিতে বাধ্য হলেন ।
    নতুনকাকার বড়ো ছেলে নীলকুমার, ডাকনাম খোকা, ১৯৭৩ সালে একটি নিম্নবর্ণের মেয়েকে চুপচাপ বিয়ে করে উত্তরপাড়ার ভেঙেপড়া খণ্ডহর ছেড়ে চলে গেল, তখন নতুনকাকা দোষটা আমার ওপর চাপালেন, কেননা খোকা পাটনার দরিয়াপুরের বাড়িতে থেকে কলেজে পড়েছিল, আর আমার কুপথের সাক্ষী হিসেবে অংশও নিয়েছে আমাদের কর্মকাণ্ডে । খোকা চলে গিয়েছিল, বা উত্তরপাড়া ছেড়ে পালিয়েছিল হায়দ্রাবাদ, ভালো চাকরি পেয়ে । টাকার লোভে এতো খাটাখাটি করেছিল যে কুড়ি বছর হল মারা গেছে, মুম্বাইতেই, থানে শহরতলিতে । মারা যাবার কয়েকদিন আগে ফোনে বলেছিল, তিনটে ফ্ল্যাট কিনে ফেলেছে থানেতে, আলট্রামডার্ন । ওর একমাত্র মেয়ে বিয়ে করে চলে গেছে দুবাই, তারপর অসট্রেলিয়া, সেখানে সেও ফ্ল্যাট কিনে ফেলেছে । এখন এতোগুলো ফ্ল্যাট স্বর্গ বা নরকে বসে উপভোগ করছে খোকা । ওর নিজের ভাইরা উত্তরপাড়ায় সিপিএম করার পরে প্রলেতারিয়েতের জীবন কাটাচ্ছে ।
    ইমলিতলা পাড়া ছাড়ার কয়েক বছর পরে ওই পাড়ায় গেলে অনেকে আমাকে চিনতে পারছিল না, কিন্তু পাড়ার চারটে কুকুর, মোতি, টাইগার, ভুতুয়া, দিলের, বুড়ো হয়ে লোম প্রায় উঠে গেছে, আমাকে দেখেই ছুটতে-ছুটতে এসে ল্যাজ নাড়ানো আরম্ভ করে দিয়েছিল । চারটে কুকুরই মারা গেছে ; ওদের পুঁতে দেয়া হয়েছে গঞ্জেড়িদের মাটির উঠোনে ।
    ১৯৬৬ সালে বড়োজ্যাঠা মারা যাবার পর কিছুদিন ইমলিতলার বাড়িতে একা ছিলেন বড়জেঠিমা, স্টোভে রান্না করতেন, হরি হে হরি হে হরি হে বলে বলে স্টোভে পাম্প করতেন, ১৯৭৯ সালে একদিন স্টোভ ফেটে বেশ পুড়ে গিয়েছিলেন । দশ বছর পর ইমলিতলায়, নিজের পরিচয় দেবার আগে, কপিলের চাচিকে জিগ্যেস করেছিলুম, এই বাংগালি লোগ কোথায় চলে গেল । কপিলের চাচি, চিনতে পারেনি আমাকে, বলেছিল, ভস্মাসুরের বংশ, সবাই নিজের দৃষ্টিতে জ্বলেপুড়ে ছাই হয়ে গেছে । রাক্ষসের বংশ ! বাঙালিরা যাকে বলে ভস্মলোচন, তাকে বিহারিরা বলে ভস্মাসুর ।
    ইমলিতলার বাড়িতে একটা ফোটো ছিল বড়ো জ্যাঠাইমার, দুহাতে ব্লাউজ দুদিকে মেলে আছেন, টপলেস দেখিয়ে, কেননা ওনার মাপের মাই আর কারোর ছিল না বাড়িতে, পাড়াতে শুধু কালুটুয়ার চাচির ছিল, তামাটে, জেঠিমার মতন গোলাপি-ফর্সা নয় । কে তুলেছিল জানি না, হয়তো বাবা, হয়তো কোনও কাকা, হয়তো মেজ-জ্যাঠা । ফোটোটা যদি সঙ্গে থাকতো তাহলে নন্দনতাত্ত্বিক আবু সয়ীদ আইয়ুবকে দেখাতে পারতুম, “এই দেখুন স্যার, আমার বড়োজেঠিমা” । বুঝতে পারতেন আমি কেমনধারা পরিবারের প্রডাক্ট ।
    আমি আরেকবার প্রেমে পড়ে দুর্ভোগের জাঁতিকলে আটকাতে চাইনি বলে সলিলার সঙ্গে পরিচয়ের তিন দিনের মাথায়, ১৯৬৮ সালে বলেছিলুম,আমি আপনাকে বিয়ে করতে চাই, এ-ব্যাপারে কার সঙ্গে কথা বলতে হবে । ও বলেছিল মামাদের সঙ্গে । মনোনয়নে ইপিফ্যানির গর্ব হল ।
    ১৯৬৮ সালে সলিলাদের বাড়িতে সাজানো কাপ আর শিল্ড দেখে প্রশ্ন করে জেনেছিলুম, ওগুলো সলিলার, হকি খেলে পাওয়া, স্টেট প্লেয়ার ছিল, কালার হোল্ডার, ম্যাচ জিতলে কাপে রাম ভরে খেতো । বেশ আনন্দ হয়েছিল যে টিপিকাল বাঙালি মেয়ের মতন নয় ।
    ইমলিতলার বাড়িতে মা বেশির ভাগ সময়ে রান্নাঘরে, দুটো মাটির উনোনে রান্না করছেন, বাসন-কোসনের বিশেষ শব্দ নেই । রান্নার কতো রকমের সুবাস । রাতে কেরোসিনের লম্ফ জ্বেলে রান্না, উনোনের আলোয় মায়ের গনগনে মুখ । ঝুলকালি ভুষো পড়ে রান্নাঘর এতো অন্ধকার যে ছয়মাস অন্তর রামরস দিয়ে রঙ করানো হতো। সব ঘরের চেয়ে রান্নাঘরকে মা বেশি ভালোবাসতেন । জ্যাকসন পোলকের বহু আগেই মা রান্নাঘরের দেয়ালে অমন তুলিহীন পেইনটিং এঁকেছিলেন’কড়াই থেকে দেয়ালে ছিটকে লাগা হলুদ-লংকার দরানি । কোনো ধার্মিক অনুষ্ঠান না হলে মা সিঁদুর পরতেন না, সলিলাকেও পরামর্শ দিয়েছিলেন যে প্রতিদিন সিঁদুর পরলে চুল পেকে যায় আর ঝরে পড়ে, তাই পরার দরকার নেই, শাঁখা-ফাঁকাও দরকার নেই । ফলে সলিলা সিঁদুর-শাঁখার পাট চুকিয়ে দিয়েছে বিয়ের পর-পরই । কিন্তু কোনো বাঙালি বামুন পরিবার আমাদের বাড়িতে ভিজিট দিতে আসছে শুনলেই একটা টিপ আর সিঁদুর পরে নেয়, কেননা কেউ-কেউ কথা শোনাবার সুযোগ ছাড়ে না ।
    বউদির শালীরা, যারা দাদার বাড়ির কাছে বাঁশদ্রোণীতে থাকে, তাদের রক্ষণশীল টিটকিরির ভয়ে সলিলা বেশ কিছুকাল দাদার বাড়ি যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিল। যখন নাকতলার ফ্ল্যাট বেচা ফাইনাল করে ফেলেছি, তখন দাদাকে বলেছিলুম, তোমার ওপরতলাটা আমাদের ভাড়া দাও, আমি মার্কেট রেটই দেবো, তা বউদি বললেন, কোথাও একতলা ভাড়া করে থাকগে যাও । অগত্যা চলে এলুম মুম্বাই । দাদার ছোটো ছেলে বিটু দাদার কাছে জানতে চেয়েছিল যে কেন আমাদের ওপরতলাটা ভাড়া দেওয়া হয়নি, উত্তরে দাদা ওকে বলেছিল, পরে প্রবলেম হতো । দাদার বোধহয় ভয় ছিল যে যেহেতু পাটনার বাড়ির ওপর আমি আর আমার ছেলে-মেয়েরা কোনো দাবি-দাওয়া জানাইনি, তাই ওপরতলায় থাকলে হয়তো ছাড়তে চাইবো না । ওপরতলায় থাকলে দাদাকে বাজে মারোয়াড়ি হাসপাতালে ভর্তি হতে দিতুম না, তাড়াতাড়ি মৃত্যুর পথে যেতে দিতুম না ।
    ১৯৫০ সালে রামমোহন রায় সেমিনারিতে ঢিল ছোঁড়াছুঁড়ি খেলায় আমার মাথা ফেটে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলুম, সেই দাগ এখনও আছে । আক্রান্ত হবার চিহ্ণ । বিরূপ সমালোচনা পড়ে কপালের দাগটায় হাত বুলিয়ে আলোচককে ভুলে যাই ।
    ১৯৫৬ সালে “ইংরেজি দেখিয়ে দেবার” জন্যে খুকু পণ্ডিতের বাবাও, আমাকে ইংরেজিতে ভালো মনে করে পাঠিয়েছিলেন খুকু পণ্ডিতকে আমার কাছে । খুকু পণ্ডিতের বড়ো বোন টুকু পণ্ডিত বরং দেখতে সুশ্রী ছিল অথচ তাকে পড়াতে বলেননি । কেমনতরো বাবা ! কী করে ভাগানো যায় মেয়েটিকে, তা অনেক ভেবেচিন্তে সেসময়ে রেডিও চালিয়ে রাখতুম আর ছুতোনাতায় খুকু পণ্ডিতের কাঁধে আর হাতে হাত দিতুম, অনেক সময়ে ধরেও থাকতুম হাত । খুকু পণ্ডিতের বাবা খাটে বসে আমার আচরণে উদ্বিগ্ন হয়ে উঠলেন আর দিনপনেরো পরে দুজনেই আসা বন্ধ করে দিলেন । খুকু পণ্ডিতের আসা বন্ধ হওয়ায় সবচেয়ে আনন্দিত হয়েছিলেন আমার মা । খুকু পণ্ডিত এখন ইংল্যাণ্ডে ডাক্তার, বাবা মারা যাবার পর মাকে নিয়ে গেছে । খুকু পণ্ডিতের মা ইংরেজির কিছুই জানতেন না । ১৯৭৩ সালে একবার ইংল্যাণ্ড থেকে পাটনায় এসেছিলেন, ববছাঁট চুল, গলায় ডুমো-মুক্তোর মালা, ইংরেজিতে কথা বললেন আমার সঙ্গে, সম্ভবত ইশারা করে গেলেন যে তুই তো আমার মেয়েকে ইংরেজি দেখিয়ে দিসনি, এখন দ্যাখ, আমি কেমন ইংরেজি দেখাই তোকে ।
    বাবা যখন মারা গিয়েছিলেন, শ্রাদ্ধের সময়ে আমি ন্যাড়া হইনি । কিছুকাল পরে বাবার জন্য এতো মনকেমন করছিল যে একটা সেলুন দেখতে পেয়ে সোজা ঢুকে গিয়ে ন্যাড়া হয়েছিলুম, আর ফেরার সময়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে, কেঁদেছিলুম । পথচারীদের মাঝে দাঁড়িয়ে কেঁদে, ভালো লেগেছিল, যা সমবেত শোকের কান্নায় হয় না । আমি পাটনা থেকে লখনউ চলে যাবার পর দাদা সপরিবারে পাটনায় চলে এসেছিল। বড়ো ছেলে পড়াশোনায় ভালো ফলাফল করতে পারেনি বলে তাকেই দোকানে বসিয়ে দিয়েছিল । বাবা আমার কাছে চলে এসেছিলেন লখনউতে । মা লখনউতে মারা যেতে বাবা পাটনায় কিছুদিনের জন্য ফিরে গিয়েছিলেন, তারপর কোতরঙের ভদ্রকালীতে ছোটোকাকা বা বিশেখুড়োর বাড়িতে চলে গিয়েছিলেন, পশ্চিমবঙ্গে শেষজীবন কাটাবেন ভেবে । ছোটোকাকা বেশ প্যাঁচালো মানুষ ছিলেন, বাবার কেনা জমিজিরেত ঠাকুমাকে দিয়ে নিজের নামে লিখিয়ে নিয়েছিলেন । শেষে পাটনার বাড়িও ছোটোকাকা বাবাকে দিয়ে লিখিয়ে নিতে পারেন আঁচ করে দাদা বাবাকে পাটনায় নিয়ে চলে যান । আমি বাবাকে মুম্বাইতে নিয়ে আসিনি এটা আমার জীবনের একমাত্র রিগরেট হয়ে থেকে গেছে ।
    আমার বাবা রঞ্জিত রায়চৌধুরী জন্মেছিলেন বর্তমান পাকিস্তানের লাহোর শহরে, ১৯১২ সালে । পাঞ্জাবের মহারাজা রঞ্জিত সিংহ সম্পর্কিত গালগল্পে প্রভাবিত হয়ে ঠাকুমা বাবার অমন নাম রেখেছিলেন। রঞ্জিত সিংহ জন্মেছিলেন ১৩ই নভেম্বর ১৭৮০ । বাবাও জন্মেছিলেন ১৩ই নভেম্বর । ছয় ভাই আর এক বোনের মধ্যে বাবা ছিলেন তৃতীয় বা সেজ ভাই । অন্যান্য ভাইদের পোশাকি আর ডাক নাম দুটিই থাকলেও, বাবার ওই একটি নামই ছিল, রঞ্জিত । ঠাকুর্দার আদি নিবাস ছিল হুগলি জেলার উত্তরপাড়ায় । ১৭০৯ সালে উত্তরপাড়া শহরটির পত্তন করেছিলেন দাদুর পূর্বপুরুষ রত্নেশ্বর রায়চৌধুরী ।
    ঠাকুর্দা লক্ষ্মীনারায়ণ রায়চৌধুরী, পোরট্রেট আঁকতে পারতেন, এবং সেই সূত্রে তিনি বিভিন্ন রাজপরিবারের ডাকে সপরিবারে ভারতের এক রাজ দরবার থেকে আরেক রাজ দরবারে চলে যেতেন । লাহোরে গিয়ে তিনি ড্যাগেরোটাইপ ক্যামেরায় ফোটো তুলতে শেখেন, যাতে ফোটো তুলে তা থেকে ছবি আঁকতে সুবিধা হয় এবং রাজ পরিবারের মহিলাদের এক নাগাড়ে বসে থাকতে না হয় । সেসময়ে মেয়ো স্কুল অফ আর্টসের অধ্যক্ষ এবং লাহোর মিউজিয়ামের কিউরেটার ছিলেন রাডিয়ার্ড কিপলিঙের বাবা জন লকউড কিপলিঙ, যাঁর সঙ্গে পরিচয়ের ও তাঁর অধীনে কাজ করার সূত্রে তাঁর কাছ থেকেই তিনি ফোটো তোলা শেখেন । ফোটো তোলা হতো সরাসরি ব্রোমাইড পেপারে । পরে, কাচের প্লেটে নেগেটিভ ফিল্ম তোলা হতো, সেই নেগেটিভকে রসায়নে চুবিয়ে রেখে ফোটো গড়ে উঠত; তারপর সেই প্লেটের ওপর ফোটোর কাগজ রেখে, প্রয়োজনীয় আলো দেখিয়ে ফোটো প্রিন্ট করা হতো, আর সেই প্রিন্টকে রসায়নে চুবিয়ে, শুকিয়ে, স্হায়ীত্ব দেয়া হতো ।
    ড্যাগেরোটাইপ ক্যামেরা ছিল বেশ ভারি ; বাইরে গিয়ে ফোটো তুলতে হলে তাকে বয়ে নিয়ে যাবার লোক দরকার হতো । বাইরে তোলা হচ্ছে বলে একসঙ্গে অনেকগুলো তুলে যেটা ভালো হল সেটা থেকে ফোটো তৈরি করা হতো । ফোটো তোলা হতো ক্যামেরা স্ট্যাণ্ডের ওপরে ক্যামেরা রেখে । ফোটো তোলার সময়ে হাত দিয়ে লেন্সের ঢাকনা খুলে, ‘স্মাইল প্লিজ’ বলে দু’এক সেকেণ্ডে আবার লেন্স পরিয়ে দেয়া হতো । স্টুডিওতে ফোটো তুলতে হলে প্রথম দিকে কুঁজোর মাপের হাজার-দুহাজার ওয়াটের বাল্বের আলোয় ফোটো তুলতে হতো, পরে অবশ্য বাল্বের মাপ ছোটো হয় । এখন প্রযুক্তির এত উন্নতি হয়েছে যে ড্যাগেরোটাইপের ঝঞ্ঝাটকে মনে হয় প্রাগৈতিহাসিক । বাবা এই ডিজিটাল প্রযুক্তি দেখে যেতে পারলেন না । শৈশবে তাঁকে দেখতুম শহরের বাইরে ফোটো তুলতে যাচ্ছেন কাজের লোক রামখেলাওন সিংহের কাঁধে ক্যামেরার বাক্স চাপিয়ে, নিজে ক্যামেরা তিন-ঠেঙে স্ট্যান্ড আর মাথায় চাপা দেবার কালো মোটা কাপড় । বাবা মারা যাবার পর যখন পাটনার বাড়ি ছেড়ে চলে আসলুম, দেখেছিলুম তিনতলার একটা ঘরে থাক-থাক কাচের প্লেট, কড়িকাঠ থেকে র‌্যাকে সাজানো । ইতিহাসবোধ না থাকলে যা হয়, আমি বা দাদা আমরা কেউই সেগুলো সংরক্ষণের প্রয়াস করিনি । দাদার ছেলেরা কাচঅলাকে ওজন দরে বিক্রি করে দিয়েছে ।
    দাদুর ছেলেরাও ফোটো তোলা আর ছবি আঁকায় সড়গড় হলে দাদু ১৮৮৬ সালে ফোটোগ্রাফির ভ্রাম্যমান ব্যবসা আরম্ভ করেছিলেন, এবং সংস্হাটির তিনি নাম দেন ‘রায়চৌধুরী অ্যাণ্ড কোং’ । হুগলি জেলায় গঙ্গা নদীর ধারে উত্তরপাড়ার পাশে এখন যেখানে বালি ব্রিজের সংলগ্ন ফ্লাইওভার, তখন একটা রাস্তা ছিল, সেখানে একটা দপতর খুলে নকাকাকে চালাতে বলেছিলেন । কিন্তু নকাকা তা সামলাতে পারেননি, স্ত্রীর সঙ্গে অবনিবনার দরুণ হঠাৎ বৈরাগ্যে আক্রান্ত হবার কারণে ।
    দাদুর অমন ঘোরাঘুরির কারণে বড়জেঠা, মেজজেঠা, বাবা, পিসিমা আর নকাকার স্কুলে পড়া হয়ে ওঠেনি । দাদু হঠাৎ মারা যাবার পর তাঁর ছেলেরা পাটনায় থিতু হতে বাধ্য হন এবং তখন নতুনকাকা আর বিশেখুড়ো মানে ছোটোকাকাকে স্কুলে ভর্তি করা হয় । নতুনকাকা নিয়মিত স্কুল করলেও ছোটোকাকার আগ্রহ না থাকায় তিনি পড়াশোনা ত্যাগ করেন । জেঠাকাকাদের যেটুকু পড়াশোনা হয়েছিল তা রাজদরবারগুলোর শিক্ষকদের অবদান । দাদু সংস্কৃত আর ফারসি লিখতে-পড়তে পারতেন । বাবা ইংরেজি ভাষা আয়ত্ব করে ফেলেছিলেন ।
    দাদু বিভিন্ন সময়ে আফগানিস্তানের কাবুল-কান্দাহার এবং পাকিস্তানের বাহাওলপুর, চিত্রাল, হুনজা, ফুলরা, মাকরান ও লাহোরে ছিলেন। আফগানিস্তানে ব্রিটিশদের যুদ্ধ আরম্ভ হবার পর লাহোরে চলে যান । বড়জেঠার মুখে শুনেছি যে বাহাওলপুরের সেই সময়ের ডাকটিকিটে আমিরের পোরট্রেট ছিল দাদুর আঁকা । ওই অঞ্চলের ছাগল, ভেড়া, দুম্বা ইত্যাদির মাংস আর শুঁটকিমাংস খাওয়ার সঙ্গে ঠাকুমা আর বাবার ভাইরা নিজেদের মানিয়ে নিলেও বাবা পারেননি, এবং তিনি সারা জীবন শাকাহারী হয়ে যান । বাবার মুখে শুনেছি যে বাজারে ঝোলানো গোরু, মোষ, ইয়াক আর কাটা উটের মাংস দেখার পর উনি আর মাংস খেতে পারতেন না, তাই নিরামিশাষী হয়ে যান । দুম্বা একরকমের ভেড়া যার ল্যজের জায়গায় বাড়তি মাংস গজায়, আর বাড়তি লেজের মাংস, বড়জেঠার বক্তব্য অনুযায়ী, ছিল খুবই সুস্বাদু ।
    ফোটোগ্রাফির সূত্রেই দাদুর সঙ্গে উত্তর চব্বিশ পরগণার পাণিহাটি-নিবাসী আমার দাদামশায় কিশোরীমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরিচয় হয়েছিল । কিশোরীমোহন ছিলেন ম্যালেরিয়া রোগের উৎস আবিষ্কারক রোনাল্ড রসের সহগবেষক । রোনাল্ড রস স্বদেশে ফিরে যাবার পর কিশোরীমোহন ম্যালেরিয়া রোগের কারণ ও তা প্রতিরোধ করার জন্য গ্রামে-গঞ্জে ম্যাজিক লন্ঠনে স্লাইড দেখিয়ে প্রচার করতেন । এই স্লাইডগুলো তৈরি করে দিয়েছিলেন দাদু । কিশোরীমোহন তাঁর বড় মেয়ে অমিতার সঙ্গে বাবার বিয়ে দেন । বিয়ের সময়ে মায়ের বয়স ছিল ১৪ বছর আর বাবার ১৮ বছর । কিশোরীমোহন সম্পর্কে উইকিপেডিয়া আর নেটে অন্যত্র তথ্য আছে । বাবা নিজে শাকাহারী হলেও মাকে বাধ্য করেননি তাঁর আহারের রুচি অনুসরণ করতে ; আমি আর দাদা দুজনেই আমিষাশী । দাদু প্রতি বছর দুর্গা পুজোর সময়ে উত্তরপাড়া ফিরে যেতেন ; ছেলেদের বিয়ে দেয়ার কাজটাও সেরে নিতেন সেই সময়টুকুর মধ্যে ।
    দ্বারভাঙ্গা মহারাজের পরিবারের সদস্যদের ছবি আঁকার জন্য ডাক পড়লে দাদু সপরিবারে পাটনায় যান, আর সেখানেই হৃদরোগে মারা যান । পুরো পরিবার নির্ভরশীল ছিল দাদুর ওপর ; তিনি মারা যেতে ঠাকুমা বিপদে পড়েন । পাটনায় তাঁরা একটি মাটির দেয়ালের ওপর টালির চালার বাসা ভাড়া করে বিভিন্ন উপায়ে টাকা রোজগারের চেষ্টা করেন, কিন্তু কিছুতেই সফল না হতে পারায় বাবা দাদুর প্রতিষ্ঠিত সংস্হা ‘রায়চৌধুরী অ্যাণ্ড কোং’ এর সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে ছবি আঁকা আর ফোটো তোলার একটি স্হায়ী দোকান চালাবাড়ির কাছেই, বিহার ন্যাশানাল কলেজের সামনে, খোলেন । ঠাকুমার জাঠতুতো ভাই কলকাতা মিউজিয়ামের সহকিউরেটার লেখক ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়ের সুপারিশে বড়জেঠা পাটনা মিউজিয়ামে চতুর্থ বর্গের একটি চাকরি পান । পরে অবশ্য তিনি নিজের যোগ্যতার দরুন পদোন্নতি পেয়ে পাটনা মিউজিয়ামের ‘কিপার অব পেইনটিংস অ্যাণ্ড স্কাল্পচার’ হয়েছিলেন। বড়জেঠা মাটির মূর্তি তৈরি করায় আর অয়েল-পেইন্টিং আঁকায় দক্ষ ছিলেন । ছোটোবেলায় ছুটির দিনে আমি মিউজিয়ামের এক থেকে আরেক প্রান্ত ঘুরে বেড়াতুম, চৌকাঠ ডিঙোতেই প্রাগৈতিহাসিক থেকে মহেঞ্জোদরোয়, সেখান থেকে অশোকের রাজত্বে !
    দাদু মারা যেতে, ঠাকুমা উত্তরপাড়ার বসতবাড়িতে, যা অবহেলায় খণ্ডহরের চেহারা নিয়ে ফেলেছিল, থাকতে চলে গেলে, পরিবারের আর্থিক ভার পুরোপুরি এসে পড়েছিল বাবার কাঁধে । ঠাকুমা ছেলেদের আর তাদের বোউদের বলে দিয়ে যান যে আমার মা সংসারটাকে সামলাবেন । যেকোনো কারণেই হোক মেজজেঠা, নকাকা আর বিশেখুড়োর স্বভাব আর আচরণ এমন হয়ে দাঁড়িয়েছিল যে আমরা শৈশবে শুনতুম যে এঁরা কিছুটা অপ্রকৃতিস্হ, আধপাগল । দোকানের কাজে তাঁদের তেমন আগ্রহ ছিল না ; তাঁরা প্রকৃতই শিল্পীচরিত্রের বিপন্ন বিস্ময়ে আক্রান্ত অস্বাভাবিকতা পেয়েছিলেন । মেজজেঠা ঘুম থেকে উঠতেন দুপুরবেলা, তারপর জলখাবার খেতেন কোনো দোকান থেকে লুচি আলুর তরকারি কিনে রাস্তায় দাঁড়িয়ে, কখনও চুল আঁচড়াতেন না, বাড়ি ফিরে দাঁত মেজে স্নান করে বিকেলের দিকে দোকানে পৌঁছোতেন, এবং একটি ফোটোর সামনে বসে তাকে মাসখানেকে আঁকা অপূর্ব ছবিতে দাঁড় করাতেন । নকাকা অনেক ভোরে উঠতেন, সবাইকে, শিশুদেরও ‘আপনি’ সম্বোধন করতেন, স্ত্রীর সঙ্গে বিশেষ কথা বলতেন না, জুতো পরার অভ্যাস ছিল না, কোরা ধুতি পরতেন, নিজের ধুতি-শার্ট নিজেই কাচতেন, কোনো এক ফাঁকে দোকানে গিয়ে বাড়িতে করার জন্য বাবার কাছ থেকে ‘কাজ’ চেয়ে আনতেন । ছোটোকাকা মাঝরাতে নিজের ঘরে ছোটোকাকিমার নানা আঙ্গিকের পোশাকহীন ফোটো তুলতেন আর দোকানে গিয়ে বাবাকে সাহায্য করার নাম করে ডার্করুমে ঢুকে সেই ‘অপ্সরা’ ফোটোগুলো প্রিন্ট করে নিতেন । উনি যখন উত্তরপাড়ায় পাকাপাকি চলে গেলেন তখন তাড়াহুড়োয় অ্যালবামগুলো নিয়ে যেতে ভুলে যান । আমি আর পিসতুতো দাদা সেগুলো আবিষ্কার করেছিলুম । ছোটোকাকা ৯০ বছর বয়সে মারা যান, নিঃসন্তান ; উত্তরপাড়ার বাড়ির অংশ ছোটো শালার প্রথম পক্ষের মেয়েকে দিয়ে গেছেন ।
    বিহারের ভূমিকম্পে চালাবাড়ি ধ্বসে পড়ার পর বড়জেঠা ঠাকুমার আর বড়জেঠিমার গয়নাগাটি বেচে ইমলিতলা নামে একটি নিম্নবর্গ ও গরিব শিয়া মুসলমান অধ্যুষিত পাড়ায় বাড়ি কেনেন । তখন নিম্নবর্গের লোকেদের বলা হতো অস্পৃশ্য, আর সেকারণেই দুসাধ-মুসহর-কাহার-ডোম-চামার পরিবার অধ্যুষিত ঘিঞ্জি নিচুচালা-বস্তির সস্তা এলাকায় বাড়ি কেনা সহজ হয়। তেঁতুলগাছটা দাদার জন্মের সময়ে ছিল, আমি দেখিনি, কেননা তেঁতুলগাছটা কেটে সেই জায়গায় জলের কল আর গ্যাসবাতির থাম বসিয়েছিল ব্রিটিশ সরকার । পাটনার অন্যান্য বাঙালিরা ইমলিতলাকে বলতেন ছোটোলোকদের পাড়া । সেকারণে আমাদের পরিবারের সদস্যদের ওপর ওই ছোটোলোক ছাপ্পা পড়ে গিয়েছিল । পাটনার শিক্ষিত ও সংস্কৃতিবান বাঙালিরা ওই সরু গলির ভেতরে ঢুকে দিনের বেলাতেও আমাদের বাড়ি আসতেন না । বড়জেঠা যেতেন তাদের বাড়ি, সামাজিক সম্পর্ক বজায় রাখার জন্য । আমি যখন স্কুলে ঢুকলুম তখন স্কুলের বন্ধুরাও ইমলিতলা শুনে আমাদের বাড়ি আসতে চাইত না ; অনেকে নাম শুনেই ভয় পেত, অঞ্চলের কুখ্যাত নিবাসীদের কাজকর্মের দরুন । মেজদা, যাকে শিশু অবস্হায় এক বেশ্যার কাছ থেকে বড়জেঠা কিনেছিলেন, পাড়ার চাপ এড়াতে না পেরে পুলিশের নথিতে গুণ্ডা হয়ে গিয়েছিল, মাদকের দরুন আর বড়োজেঠিমার বশীকরণের বিভূতি খেয়ে কম বয়সে মারা গিয়েছিল ।
    বাবা ভোরবেলা বেরিয়ে যেতেন আর ফিরতেন বেশ রাত করে । ফোটো তোলা, জিনিসপত্র বিক্রি আর ডার্করুমের কাজ তাঁকে একা করতে হত বলে ভোরবেলা জলখাবার খেয়ে সোজা গিয়ে ডার্করুমে ঢুকতেন, তারপর রাতে দোকান বন্ধ করার পর আবার ঢুকতেন ডার্করুমে । বিহারে সেসময় তাঁর কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল না, তাই কাজ পেতে অসুবিধা হতো না । মা আর বাবা দুজনের চরিত্রেই যে বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল তা হল সবায়ের সঙ্গে মানিয়ে চলা । বাবা বাড়ির প্রধান রোজগেরে হলেও নিজের ভাইদের আর তাদের ছেলে-মেয়েদের, মানে আমাদের জাঠতুতো খুড়তুতো ভাইবোনদের, সমান চোখে দেখতেন। বড়জেঠা ইমলিতলা বাড়ির ট্যাক্স দিতেন আর সবজি কিনতেন, বাবা বাদবাকি সমস্ত খরচ করতেন, ঠাকুমাকে টাকা পাঠাতেন, উত্তরপাড়ার বাড়ির ট্যাক্স দিতেন । চালগমের দোকানদারকে মাসে একবার, মায়ের তৈরি ফিরিস্তির কাগজ, দোকানে যাবার পথে বাবা দিয়ে যেতেন আর সে ইমলিতলার বাড়িতে পাঠিয়ে দিত । পরিবারের সদস্যদের পোশাকের জন্য বাবা দর্জিকে বলে রেখেছিলেন, তার দোকানে গিয়ে মাপ দিয়ে দিতে হতো, সে তৈরি করে বাড়ি পাঠিয়ে দিত । একইভাবে ছিল জুতোর দোকানের সঙ্গে বন্দোবস্ত । চুল কাটার জন্য মাসে একবার নাপিত আসত, পরে বাবার কাছ থেকে টাকা সংগ্রহ করে নিত ।
    ইমলিতলার বাড়িতে বাবা-মা-দাদা-আমি যে ঘরটায় থাকতুম সেটাই ছিল বাড়ির সবচেয়ে ছোটো ঘর । লন্ঠনের আলোয় পড়াশুনা করতে হতো । চেয়ার-টেবিল ছিল না, দোকানের মালপত্র যে প্যাকিংবাক্সতে আসত তার ওপর চাদর পেতে বই রাখার ব্যবস্হা ছিল । পাড়ার কুসঙ্গ-কুখ্যাতির প্রভাব দাদার ওপর পড়তে পারে অনুমান করে ম্যাট্রিক পাশের পর ১৯৪৯ সালে দাদাকে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছিল পাণিহাটিতে থেকে কলকাতায় পড়াশোনা করার জন্য । কলকাতায় দাদা সিটি কলেজে ভর্তি হন । কলেজে বন্ধু হিসেবে পান সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, দীপক মজুমদার, আনন্দ বাগচী প্রমুখ তরুণ কবিদের । দাদা বিহার সরকারের মৎস্য বিভাগে চাকরি পেলে তাঁর পোস্টিঙের জায়গায় বন্ধুরা একা বা দলবল নিয়ে পৌঁছোতেন । ছোটোবেলায় আমি একবার তাড়ি খেয়েছিলুম, মানে পাড়ার এক সর্বজনীন দাদু খাইয়ে দিয়েছিল । মুখে তাড়ির গন্ধ পেয়ে মা আমায় আমাদের ঘরে শেকল তুলে বন্ধ করে দিয়েছিলেন ; বাবা রাতে বাড়ি ফিরলে শেকল খোলা হয় । মায়ের সব সময় আশঙ্কা ছিল যে আমরা দুই ভাইও মেজদার মতন অসামাজিক চরিত্রের মানুষ হয়ে যেতে পারি । পাড়ায় মেলামেশায় কোনো নিষেধাজ্ঞা কিন্তু ছিল না । ছোটোবেলায় চোর-পুলিশ খেলতে গিয়ে অনেকের শোবার ঘরে ঢুকে খাটের তলায় লুকোবার স্মৃতি আছে ।
    ইমলিতলার বাড়িতে জলের কল ছিল না ; বড়জেঠা তো অফিস চলে যেতেন, জল ভরে এনে দেবার লোক না এলে দুপুরে বাবা যখন দোকান থেকে আসতেন, অনেক সময়ে নিজের স্নান করার জল নিজেই কল থেকে ভরে আনতেন। শীতকালেও ঠাণ্ডা জলে স্নান করতেন । দাদা আর আমি ইমলিতলায় রাস্তার কল থেকে জল ভরে এনেছি, রাস্তার কলে স্নান করেছি । বাবার নির্দেশ ছিল যে বাড়ির সব কাজ আমাদেরও করতে হবে, প্রয়োজনে কয়লা ভাঙা আর উনোন পরিষ্কার, জঞ্জাল ফেলে আসাও । বাবা রাস্তার কলে স্নান করতে লজ্জা পেতেন । ২০০৫ – ২০০৮ নাগাদ আমি কলকাতার রাস্তা থেকেও খাবার জল ভরে আনতুম পেপসির বোতলে করে, কেননা তিন তলায় কোনো ভারি জলের টিন নিয়ে বা মিনারাল ওয়াটারের বড়ো বোতল নিয়ে রিকশাঅলা উঠতে চাইত না । মাঝে-মাঝে দাদার বাড়ি গিয়ে দুটো থলেতে পেপসির বোতলে জল ভরে আমি আর আমার স্ত্রী সলিলা রিকশা করে নিয়ে আসতুম নাকতলার বাড়িতে। এই সমস্ত অসুবিধার জন্যেই নাকতলার ফ্ল্যাটটা বেচে মুম্বাইতে একরুমের ফ্ল্যাটে চলে আসতে হয়েছে ।
    বাবা চিরকাল শাদা পাঞ্জাবি, ধুতি আর পায়ে পামশু পরতেন । তাঁর ভাইয়েরা শাদা ছাড়া অন্যান্য রঙের শার্ট বা পাঞ্জাবি পরলেও বাবার পোশাকের অন্যথা হতো না, শীতকাল ছাড়া, যখন উনি নস্যি রঙের শাল গায়ে দিতেন, বা ওই রঙের উলের পাঞ্জাবি পরতেন । দোকানে যাবার তাড়ায় বাবার দ্রুত হাঁটা অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল । ইমলিতলায় থাকতে দুবার ওনার পা দোকানে যাবার পথে ভেঙে গিয়েছিল ; বাবার পা ভাঙা মানে আর্থিক দিক থেকে বেশ বিপজ্জনক অবস্হা ; দাদাকে গিয়ে দোকানে বসতে হত । উত্তরপাড়া থেকে চাকুরিহীন কোনো জ্ঞাতির ছেলেকে নিয়ে এলেও তাদের অবাঙালি পরিবেশে মানিয়ে নিতে এতই অসুবিধা হত যে কয়েক দিনেই তারা ফেরত চলে যেত । পরে দরিয়াপুরে গিয়ে বাবার যখন আরেকবার পা ভেঙেছিল তখন আমি দোকানদারি করেছি । গরিব হলে যা হয়, গতি কেবল সরকারি হাসপাতাল, সেখানে কিউ, কেননা প্রায়ভেটে কোনো নার্সিং হোম ছিল না সেসময়ে ; এখন তো প্রতিটি রাস্তায় একজন করে হাড়ের ডাক্তার । বড়জেঠির এক বান্ধবীর স্বামী ছিল ছুতোর ; ওনার পা ভেঙে যেতে, জেঠিমার বান্ধবীর কথামতো বাবার পায়ে বসাবার জন্য ছুতোরকে দিয়ে কাঠের খাপ তৈরি করিয়ে পায়ে বেঁধে রাখার ব্যবস্হা হয়েছিল । প্রথমবার বানিয়ে দেয়া খাপটা দ্বিতীয়বার কাজে লেগে গিয়েছিল ।
    বিহার ন্যাশানাল কলেজের সামনে যে দোকান ছিল সেই বাড়ির মালিক উঠে যাবার নোটিস দিলে বাবা পড়েন মহাবিপদে । বিকল্পের সন্ধানে বেরিয়ে তিনি তখনকার বারি রোডে দরিয়াপুরে একটা চালাবাড়ি কেনেন ; সেটা ছিল একজন কামারের হাপর-বসানো ঘর, পেছনে আর পাশে সামান্য জমিতে গাঁজাগাছের ঝোপ । এই এলাকাটাও সেসময়ে গরিবদের পাড়া ছিল, ধারণার অতীত দুস্হ সুন্নি মুসলমানদের পাড়া । বিহার ন্যাশানাল কলেজের সামনে যে দোকান ছিল তার মালিকের বিরুদ্ধে মামলা চলে বেশ কয়েকবছর ; সেই সুযোগে দরিয়াপুরে দোকানঘর তৈরি করে ফেলা হয় । তৈরি হয়ে গেলে পুরোনো দোকানের পাট গুটিয়ে বাবা চলে আসেন দরিয়াপুরে । ‘রায়চৌধুরী অ্যাণ্ড কোং’-এর খ্যাতির কারণে পুরোনো খদ্দেররা দরিয়াপুরে আসত । এখন এই সংস্হা চালায় দাদার বড় ছেলে হৃদয়েশ, জাপানি কোম্পানির প্রস্তাবমতো দোকানের নাম পালটে ফেলেছে ।
    দরিয়াপুরে যখন দোকান তৈরি হচ্ছিল তখন আমি ওই বাড়িতে একা থাকতুম, কেননা ইমলিতলার প্রাত্যহিক মাতালদের চেঁচামেচি আর ঝগড়াঝাঁটির দরুন পড়তে বসে বেশ অসুবিধা হত । তাছাড়া দরিয়াপুরে ইলেকট্রিসিটি ছিল, কলের জল ছিল। ছোটোদের হাতখরচের জন্য বাবা টাকা দিতেন না ; বলতেন যার যা চাই জানিয়ে দাও, কিনে এনে দেব । স্কুলের বাৎসরিক ফলাফলের রিপোর্টে বাবা কখনও কাউকে ‘গুড’ দিতেন না । নব্বুইয়ের কোঠায় মার্কস পেলেও দিতেন না ; বলতেন আরও বেশি পেতে হবে । দরিয়াপুরের বাড়িতে একা থাকলে আমার চরিত্রদূষণ ঘটতে পারে অনুমান করে বছরখানেক পরে মা আর বাবা রাতে শুতে আসতেন । মা টিফিন ক্যারিয়ারে করে রাতের খাবার আনতেন । দিনের বেলা ইমলিতলায় গিয়ে খেতে হতো । দরিয়াপুরের বাড়িতে একা থাকার সময়ে বন্ধুদের নিয়ে কিঞ্চিদধিক চরিত্রদূষণ যে ঘটত না তা বলা যাবে না ।
    বাবা আর মা দুজনেই মন্দিরে গিয়ে পুজো দেয়া বা তীর্থকর্ম করা ইত্যাদিতে আগ্রহী ছিলেন না ; আমার মনে হয় কাজের চাপে উনি সংস্কারমুক্ত করে ফেলেছিলেন নিজেকে । পরে দোকানের কাজ ছেড়ে দেবার পর বাবা হিন্দুধর্ম আর ঈশ্বর দেবী-দেবতায় আশ্রয় নিয়েছিলেন । আমি কখনও বাবা-মাকে তীর্থক্ষেত্রে বেড়াতে যেতে দেখিনি । জেঠা-কাকারাও কেউ আগ্রহী ছিলেন না ; পাটনার বাইরে যেতে হলে তাঁরা যেতেন কেবল দেশের বাড়ি, অর্থাৎ উত্তরপাড়ায় । তবে বাবা নিয়মিত পৈতে বদলাতেন, একাদশীর দিন লুচি খেতেন । কালীঘাটের কালী আমাদের পারিবারিক দেবতা, যেহেতু তা আমাদের কোনো পূর্বপুরুষের প্রতিষ্ঠিত, সেকারণে বাড়িতে পারিবারিক দেবতা আর তার সেবাযত্ন করার প্রয়োজন হতো না । গলায় মালার মতন ঝুলিয়ে পৈতে পরতেন বড়জেঠা আর ছোটোকাকা, যদিও খাওয়ার কোনো নিষেধ মানতেন না, মেজজেঠা কখনও পৈতে পরতেন আবার কখনও কুলুঙ্গিতে তুলে রেখে দিতেন । দাদার আর আমার ছোটোবেলায় পৈতে হয়েছিল বটে কিন্তু আমরা বছর শেষের আগেই স্বরূপে এসে জলাঞ্জলি দিয়েছিলুম । পৈতেহীন হবার কারণে বাবা ক্ষুণ্ণ হয়েছিলেন বলে মনে হয় না ; এই প্রসঙ্গে কখনও কোনো কথা তোলেননি।
    মা, বাবা এবং শিক্ষক, যে তিনজন মানুষ ব্যক্তিজীবনের অভিমুখ গড়ে দেয়, আমার জীবনে মা আর বাবার ভূমিকাই প্রধান । প্রকৃত অর্থে আমি কোনো শিক্ষক সেই সময়ে পাইনি যখন তা জরুরি ছিল । প্রাইমারি স্তরে ক্যাথলিক কনভেন্টে পেয়েছিলুম সিসটার আইরিনকে আর যাযক ফাদার হিলম্যানকে । শৈশবের বইতে বর্ণিত সমস্ত জিনিস যাতে নিজের চোখে দেখে যাচাই করতে পারি তার দিকে খেয়াল রাখতেন সিসটার আইরিন আর স্বদেশ আয়ারল্যাণ্ডে গেলে অনেককিছু সংগ্রহ করে আনতেন, স্কুল সংল্গন ফার্মে নিয়ে গিয়ে ফল, ফুল, গাছ, জন্তুতের চাক্ষুষ করাতেন । ফাদার হিলম্যানের সৌজন্যে আমি কনভেন্টে ভর্তি হয়েছিলুম ; উনি ফোটো তুলতে ভালোবাসতেন আর বাবার সঙ্গে ওনার বন্ধুত্ব হয়ে গিয়েছিল, আমাকে দোকানে দেখতে পেয়ে সাড়ে তিন বছর বয়সে নিয়ে গিয়ে ট্রানজিশান ক্লাসে ভর্তি করে দেন; সপ্তাহে একদিন চার্চে বাইবেল ক্লাসে নিয়ে গিয়ে ওল্ড আর নিউ টেস্টামেন্টের কাহিনি শোনাতেন । পরে যখন ব্রাহ্ম স্কুল রামমোহন সেমিনারিতে ক্লাস সিক্সে গিয়ে ভর্তি হলুম, কোনো শিক্ষকের সঙ্গে নৈকট্য গড়ে উঠল না ; এই স্কুলে যিনি আমাকে বাংলা সাহিত্যে আগ্রহী করলেন, তিনি গ্রন্হাগারিক নমিতা চক্রবর্তী , আমার ‘রাহুকেতু’ উপন্যাসের সুমিতাদি।
    মা আর বাবার কাছ থেকে যা পেয়েছি তা হল সততা, নিজের বিশ্বাসের সমর্থনে একক লড়াই করার চারিত্র্য । বাবা দোকানদার হয়েও সৎ ছিলেন, যা আজকের দিনে অকল্পনীয় । কেবল সৎ নয়, তাঁর ছিল সৎসাহস । হাংরি আন্দোলনের সময়ে আদালতের মামলায় বন্ধুরা যখন আমার বিরুদ্ধে মুচলেকা লিখে রাজসাক্ষী হয়ে গেল, আর লড়াইটা আমার একক হয়ে দাঁড়াল, তখন আমি আমার চরিত্রগঠনে মা আর বাবার অবদানের গুরুত্ব বুঝতে পেরেছিলুম । বাবা কলকাতায় লালবাজারে গিয়ে পুলিশ কমিশনারের সঙ্গে তর্ক করেছিলেন যে অমন মকদ্দমা কেন করা হয়েছে আর তখনই জানা যায় যে কলকাতার কয়েকজন সমাজকর্তা-বুদ্ধিজীবীর নালিশ কাজ করেছে এর পেছনে, যাদের বলা হয় এসট্যাবলিশমেন্টের ধারক-বাহক । মকদ্দমা চলার সময়ে বাবা কয়েকবার পাটনা থেকে দুএক দিনের জন্য দোকান বন্ধ করে কলকাতার ব্যাংকশাল কোর্টে আসতেন । যারা আমার সঙ্গে গ্রেপ্তার হয়েছিল আর চামড়া বাঁচাবার জন্য রাজসাক্ষী বা সরকার পক্ষের সাক্ষী হয়ে গেল তাদের পরিবারের কাউকে কোনো দিন আসতে দেখিনি কোর্টে ; অর্থাৎ তাঁরা তাঁদের ছেলের সাহিত্যকর্মকে সমর্থন করতে পারেননি।
    বাবা আমাদের বাড়ির ক্ষমতাকেন্দ্র হলেও ছোটোদের কাউকে শাসন করতেন না । তাঁর কাছে অভিযোগ জানালে তিনি বলতেন, “অ, ও শুধরে নেবে ।” তারপর যার বিরুদ্ধে অভিযোগ তাকে বলতেন, “কী, শুধরে নিবি তো ? বড় হয়েছিস, শুধরে নিতে শেখ।” বড়জেঠা শাসন করতেন, নিজে থেকে নয়, জেঠিমা-কাকিমারা অভিযোগ করলে, কিন্তু অভিযোগ করলে তিনি বিরক্ত হতেন । বড়জেঠার দুই মেয়ের বিয়ে আমার শৈশবেই হয়ে গিয়েছিল । মেজজেঠা আর কাকাদের মেয়েদের বিয়ের ব্যবস্হা করেন বাবা, তাঁদের শৈল্পিক উদাসীনতায় ওদের বয়স বেড়ে যাচ্ছিল ; তাছাড়া বিয়ের খরচের ব্যাপারটাও ছিল । মেজজেঠার এক মেয়ে মীনাক্ষী একজন বিহারি ছেলেকে বিয়ে করতে চাইলে মেজজেঠা অমত জানান ; মেজজেঠার অমত হওয়ায় বাবা তাঁকে বোঝালেও তিনি রাজি হননি । বাবা তাঁর বিরুদ্ধতা করে মেজজেঠাকে অপমানিত করতে চাননি । শেষে আমাকে টাকাকড়ি দিয়ে বলেন যে ওরা কোথায় গিয়ে বিয়ে করতে চাইছে সেখানে গিয়ে সম্প্রদান করে আয় । আমার ছোটোশালী রমলা এক যুবককে বিয়ে করতে চাইলে নাগপুরে অভিভাবকরা রাজি হলেন না, তখন তার বিয়েও দরিয়াপুরের বাড়ি থেকে হল । রমলা ২০১৬ সালে হার্ট অ্যাটাকে মারা গেছে ।
    দাদা যখন চাইবাসায় পোস্টেড ছিলেন সেখানে সুধীর চট্টোপাধ্যায়ের মেয়ে বেলার সঙ্গে পরিচয় হয়, আর দাদা পাটনায় গিয়ে বাবাকে বিয়ের কথা জানাতে তিনি তক্ষুনি রাজি হয়ে যান । দাদা আসলে ওই বাড়ির সাহিত্যানুরাগী বিবাহিতা যুবতী মন্টিদির প্রেমে পড়েছিলেন, মন্টিদি আর দাদা দুজনেই স্হিতাবস্হা বজায় রাখা মনস্হ করেন । পরিবারটির সঙ্গে যাতে চিরকালীন যোগাযোগ থাকে তাই দাদা বেলাকে বিয়ে করেন । শক্তি চট্টোপাধ্যায় তাঁর উপন্যাস ‘কিন্নর কিন্নরী’তে বিস্তারিত লিখেছেন এ-ব্যাপারে ।
    আমি অফিসের কাজে নাগপুরে গিয়ে কয়েকদিনের পরিচয়ের পরই রাজ্যস্তরের হকি খেলোয়াড় আর সহকর্মী সলিলা মুখোপাধ্যায়কে বিয়ের প্রস্তাব দিতে ওর অভিভাবকরা সেদিনেই সায় দেন । বাবাও টেলিগ্রামে অনুমোদন জানিয়ে দেন । কয়েকদিনের পরিচয়ের পরই এই বিয়েকে মা আর বাবা বলতেন, “তোদেরটা বৈপ্লবিক বিয়ে, পরিবারদের মাথা গলাতে হল না, হপ্তার পর হপ্তা রোদ-বৃষ্টি ঠেঙিয়ে প্রেম করতে হল না, ব্যাস, একজন আরেকজনকে বললি বিয়ে করব, করে ফেললি ।”
    আমি লেখালিখির চেষ্টা করছি, মায়ের কাছে সেকথা জানতে পেরে ১৯৫৮ সালে বাবা আগফা-গেভার্ট কোম্পানির একটা দামি ডায়েরি দিয়েছিলেন, আর তাতেই আমি কবিতা মকসো করা শুরু করেছিলুম । বাড়িতে ইংরেজি ভাষার পছন্দের বইয়ের সংগ্রহ গড়তে চাই জানতে পেরে বাবা বলতেন বইয়ের তালিকা তৈরি করে দিতে । বইয়ের দোকানে গিয়ে বই পছন্দ করে নিতুম আর পেয়ে যেতুম । বাংলা বই, বিশেষ করে কবিতার বই দাদা কলকাতা থেকে নিয়ে আসতেন । পরে বিদেশি বন্ধুদের কাছ থেকেও প্রচুর বই আর পত্রিকা পেতুম । হাংরি আন্দোলনের সময়ে কলকাতার পুলিশ আমায় গ্রেপ্তার করতে এসে আমার বইগুলো নিয়ে সারা ঘরে ছুঁড়ে-ছুঁড়ে ফেলেছিল । বাবার দোকানের কাচের আলমারি ভেঙে দিয়েছিল । মায়ের বিয়ের তোরঙ্গ ভেঙে লণ্ডভণ্ড করার সময়ে ওনার বিয়ের পুরোনো বেনারসি ভাঁজ থেকে ছিঁড়ে গিয়েছিল । কিন্তু আমাকে যখন কোমরে দড়ি বেঁধে, হাতে হাতকড়া পরিয়ে রাস্তা দিয়ে হাটিয়ে নিয়ে গেল পুলিশ, তখন বাবাকে বেশ বিচলিত দেখেছিলুম, যা উনি সচরাচর হতেন না । ছোটোবেলায় আমি বাড়ি থেকে বেশ কয়েকবার পালিয়েছি ; ফিরে এসে মনে হয়নি যে বাবা বিচলিত ; উনি আমাকে এই প্রসঙ্গে কোনো কথা জিজ্ঞাসাও করতেন না । পরে, আমার মেয়ের কাছে গল্প করেছিলেন যে আমি ওনাদের না জানিয়ে বাড়ি থেকে পালাতুম।
    অ্যালেন গিন্সবার্গ আমাদের দরিয়াপুরের বাড়িতে এসে ছিলেন কয়েক দিন । তিনি নানা শহরে ঘুরে বেশ কিছু ফিল্মে ফোটোম তুলেছিলেন আর সেগুলো বাবাকে দেন ডেভেলাপ করার জন্য । বাবা ডেভেলাপ করে দ্যাখেন গিন্সবার্গ কেবল নুলো, ভিখারি, দুস্হ, পথের পাশে অসুস্হ লোক, কুষ্ঠরোগি– এদের ফোটো তুলেছে । তখন গিন্সবার্গের সঙ্গে ওনার একচোট ঝগড়া হয়েছিল । বাবা গিন্সবার্গকে বলেছিলেন, “তোমরা যতই বড় কবি-লেখক হওনা কেন, আমাদের দেশটাকে এইভাবেই দেখাতে চাইবে ; কেন ? ফোটো তোলার আর কোনো বিষয় কি নেই !” গিন্সবার্গ সম্পর্কে যে গবেষকরা আমার সঙ্গে দেখা করতে আসেন তাঁদের সবাইকে এই ঘটনার কথা জানালেও, কেউই নিজেদের লেখায় এই বিতর্কটা অন্তর্ভুক্ত করেননি । পরে , পাটনার বাড়িতে বা কলকাতায়, বিদেশিরা এলে আমি তাঁদের বলতুম যে ফোটো তুলে থাকলে দেশে ফিরে ডেভেলাপ আর প্রিন্ট করিও ।
    আমি প্রথম চাকরিটা পাই পাটনাতেই । তারপর ১৯৭৯ নাগাদ গ্রামোন্নয়নের চাকরি পেয়ে স্ত্রী আর ছেলে-মেয়েকে নিয়ে চলে যাই লখনউ । দাদা সপরিবারে পাটনা ফেরার পর মা আর বাবা আমার কাছে লখনউ চলে আসেন । লখনউতে ১৯৮২ সালের ১৮ই নভেম্বর হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মা মারা যান । মা মারা যেতে বাবা বেশ একা বোধ করতেন, কেননা আমি আর সলিলা দুজনেই অফিসে চলে যেতুম আর ছেলে-মেয়ে চলে যেতে স্কুলে । দাদা তাই বাবাকে পাটনায় নিয়ে যান । লখনউ থেকে আমি ১৯৮৭ সালে বদলি হয়ে মুম্বাই চলে যাই । বাবাকে তখন মুম্বাই নিয়ে গেলে ভালো হতো ; মুম্বাইতে চিকিৎসার সুযোগ-সুবিধা পাটনার চেয়ে উন্নত । ১৯৯১ সালের ৮ই অক্টোবর বাবা পাটনায় মারা যান ।
    বাবা আমাকে চিঠি লেখার বদলে আমার স্ত্রী আর মেয়েকেই চিঠি লিখতেন । পাটনা থেকে ১৭ আগস্ট ১৯৮৮ সালে আমার স্ত্রীকে লেখা বাবার একটা চিঠি তুলে দিচ্ছি :
    “স্নেহের সলিলা,
    তোমার চিঠি ঠিক সময়েই পেয়েছি, কিন্তু শরীরে ধৈর্যের অভাবে ঠিক সময়ে উত্তর দিতে পারি না । শরীরটা খুব ভালো নয় আর মনেও কোনো শান্তি নেই । বরং ভদ্রকালীতেই বেশ শান্তিতে ছিলাম । আর বেশিদিন এই পৃথিবীতে থাকতে আর ইচ্ছেও নেই । ফণার শরীর কেমন আছে জানাবে । হোমিওপ্যাথিক কিংবা বায়োকেমিক ঔষধ খেলে ঠিক হবে । রেগুলার বায়োকেমিক ওষুধ খেলে সকলেরই শরীর ঠিক থাকে । আমিও তাই খাই, কিন্তু শরীরের আর নেবার ক্ষমতা নেই । বারোটা বায়োকেমিক ওষুধ, জার্মানমেক, সিলড, কিনে রাখো । এবং একটা ভালো বায়োকেমিক বই । আর সিম্পটম দেখে ওষুধ দিতে হবে । কারণ বায়োকেমিক ঠিক ওষুধ নয় । ওটা শরীরে যে লবণের অভাব তৈরি হয় আর সিপ্মটম দেখা দেয়, তারই ওষুধ । অল্প পরিমাণ ব্যবহার করলে রোগ সারিয়ে দেয় । শরীরের কোনো ক্ষতি করে না । এখন অফিস জয়েন করেছ বোধহয় । এখানের খবর সেই একই রকম । আমি ওই ওপরে বসে থাকি । কাগজ পেলে পড়ি। শরীর ভালো থাকলে হাথুয়া মার্কেট পর্যন্ত ঘুরে আসি । দোকানে একদম যাই না । ওখানে আমার কোনো প্রয়োজনও নেই । বেলা আর চামার উপেন্দ্র ওরাই আসল আর অবসর সময়ে মিনু, টোটোন, বিটু, এরাই সব দোকান দেখাশোনা করে । এখন আমার কোনো দাম নেই । টোটোনের রেজাল্ট বেরোয়নি তবে খবর পেয়েছে, পাশ করেছে । সাইন্সে ভালোই নম্বর পেয়েছে । সাবিত্রীদের বাড়ির খবর সেই একই রকম । ধাবু অপারেশান করিয়েছিল, এখন ঠিক আছে, তবে মাঝে-মাঝে পেইন হয় । দেশের কোনো খবর পাইনি । আজ সেন্টুর সঙ্গে দেখা হলো রাস্তায় । ও তো এখানে আর আসে না । সাবিত্রীদের বাড়িতেই নাবে । তোমাদের সব খবর দেবে । সবাই আমার স্নেহ ভালোবাসা নেবে । ঈশ্বরে বিশ্বাস রাখবে । অনুশ্রীর চিঠি পেয়েছি । ওকে আর বাপ্পাকে চিঠি দেবো ।
    ইতি
    বাবু”
    চিঠিতে উল্লিখিত সাবিত্রী বড়ো জেঠার বড়ো মেয়ে, ধাবু ছোটো মেয়ে । সেন্টু পিসেমশায়ের বড়ো ছেলে যার সঙ্গে দাদার সম্পর্ক কেন যে খারাপ হয়ে যায় তা জানি না। অনুশ্রী আমার মেয়ে আর বাপ্পা আমার ছেলে । টোটোন দাদার বড়ো ছেলে । বিটু দাদার ছোটো ছেলে ।
    আমার মায়ের জন্ম ১৯১৬ সালে, পানিহাটিতে । মায়ের ডাক নাম ভুল্টি । মায়ের বাবা, কিশোরীমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়, পানিহাটির রামচাঁদ ঘাট রোডে ‘নিলামবাটী’ নামে এক একান্নবর্তি পরিবারের সদস্য ছিলেন । কিশোরীমোহন ছিলেন, কলকাতা ও সেকেন্দ্রাবাদে, ম্যালেরিয়া রোগের কারণ নির্ণয়কারী ও ১৯০২ সালে সেকালে নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত ডাক্তার রোনাল্ড রস-এর সহকারী । তাঁর অবদানের জন্য ১৯০৩ সালে দিল্লি দরবারের সময়ে কিশোরীমোহনকে সম্রাট সপ্তম এডওয়ার্ডের স্বর্ণপদক দেয়া হয়েছিল । ২০১৩ সালে প্রকাশিত তাঁদের ‘দি ফ্লাইং পাবলিক হেল্হ টুল : জেনেটিকালি মডিফায়েড মসকিটোজ অ্যান্ড ম্যালেরিয়া কন্ট্রোল’ ( সায়েন্স অ্যাজ কালচার, ল্যাংকাস্টার, ইউ কে ) গবেষণাপত্রে উলি বিজেল এবং ক্রিস্টোফ বোয়েট অধ্যাপকদ্বয় জানিয়েছেন যে উপনিবেশের নেটিভ হবার কারণে কিশোরীমোহনের নাম রোনাল্ড রসের সঙ্গে সুপারিশ করা হয়নি । সমাজ সেবার কাজে স্ত্রীর গয়না এবং পৈতৃক সম্পত্তি বেচে, আর সঞ্চয়ের পুঁজি খরচ করে তিনি দেউলিয়া হয়ে যান, আর মায়ের বিয়ের কয়েক বছর পরই মারা যান ।
    সংসারের ক্ষমতা মায়ের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়ে যাবার পর মায়ের চরিত্রে লুকোনো কিশোরীমোহন বেরিয়ে আসে । প্রায়ই দেখতুম ইমলিতলার প্রতিবেশিরা এসে মায়ের কাছে নিজেরদের আর্থিক দৈন্য আর পারিবারিক দুর্দশার গল্প করছে, আর মা তাদের সাহায্য করছেন, পয়সাকড়ি দিয়ে তো বটেই, চাল-ডাল, পুরোনো বাসনপত্র আর ব্যবহৃত জামাকাপড় দিয়ে । মায়ের বোনেদের বিয়ে আরও গরিব পরিবারে হয়েছিল বলে পুজোয় পাওয়া শাড়ি-চটি ইত্যাদি নিজে না পরে বোনেদের বা নিলামবাটীর দুস্হ জ্ঞাতিদের পাঠিয়ে দিতেন বা যখন নিজে যেতেন তখন নিয়ে যেতেন । যদিও মা পরিবারের ডি ফ্যাক্টো কর্ত্রী ছিলেন, কিন্তু ইমলিতলার বাড়িতে মা-বাবা-দাদা-আমি থাকতুম সবচেয়ে ছোটো ঘরটায় । লন্ঠনের আলোয় পড়াশোনা ।
    সবাইকে নিয়ে মিলেমিশে থাকার চারিত্রবৈশিষ্ট্যের দরুণ বড়জেঠা সংসারের সমস্ত ব্যাপারে মায়ের সঙ্গে পরামর্শ করতেন । আমার মনে আছে, ১৯৫১ সালে যে বছর প্রথম সাধারণ নির্বাচন হয়েছিল, কোন দলকে ভোট দেয়া হবে তা নিয়ে আলোচনার শেষে মায়ের নির্ণয় সবাই মেনে নিয়ে ছিলেন, অর্থাৎ যার যে দলকে ইচ্ছে ভোট দেবে । কলকাতায় নাকতলায় থাকতে অবাক লাগত দেখে যে বাড়ির কর্তা যে দলের সমর্থক, পরিবারের সকলেই সেই দলকে ভোট দ্যায়, অথচ তারাই আবার ডাইন্যাস্টিক পলিটিক্সের তর্ক তোলে !
    স্কুলে ভর্তি হয়ে টের পাই যে মা শুদ্ধ হিন্দি জানেন না, ইমলিতলার ‘ছোটোলোকি’ বুলি দখল করে ফেলেছেন, আর তার বহু শব্দ যে শুদ্ধ হিন্দিতে অশোভন, এমনকি অশ্লীল, তা উনি অনেক পরে জানতে পারেন, যখন আমরা ইমলিতলা ছেড়ে দরিয়াপুরে সুন্নি মুসলমান পাড়ায় চলে যাই । পানিহাটিতে মেয়েদের স্কুল তখনও ছিল না বলে মা নিরক্ষর ; নিজেকে শিক্ষিত করে তোলেন দাদা স্কুলে ভর্তি হবার পর ।
    ইমলিতলার বাড়িতে হিন্দুত্ব সামলাবার কাজ ছিল পুজারী বাড়ি থেকে আসা বড়-জেঠিমার । সেকারণে মা এবং কাকিমারা প্রতিদিনের ধর্মাচরণ থেকে নিজেদের আর আমাদের মুক্ত রাখতে পেরেছিলেন । জনৈক পাদরির আর্থিক সৌজন্যে প্রাইমারি স্তরে আমি ক্যাথলিক স্কুলে পড়েছিলুম ; মা ঘটিতে গরম জল ভরে আমার শার্ট-প্যান্ট আয়রন করে রাখতেন। আমার বাংলা বনেদ নষ্ট হয়ে যাচ্ছিল বলে মায়ের নির্দেশে আমাকে ব্রাহ্ম স্কুলে ক্লাস সিক্সে ভর্তি করা হয়েছিল ।
    দরিয়াপুরে পাকাপাকি চলে আসার পরও ইমলিতলার সদস্যদের দায়িত্ব মা ছাড়েননি ; সপ্তাহে এক দিন গিয়ে টাকাকড়ি আর চাল-ডাল-আনাজের ব্যাপারটা সামাল দিয়ে আসতেন । গোলা রোডের এক বানিয়ার দোকানে তালিকা দিলে সে যাবতীয় জিনিস ইমলিতলা আর দরিয়াপুরে পাঠিয়ে দিত । পুজোর সময়ে পোশাকের ভেদাভেদ মেটাতে সবায়ের জন্য ছিল একই কাপড়ের শার্ট আর ফ্রক, এমনকি জেঠা-কাকারাও সেই কাপড়ের শার্ট পরতেন ।
    দাদা চাকরি পাবার পর দাদার চাকুরিস্হলে গিয়ে মা মাঝেমধ্যে সপ্তাহখানেকের ছুটি কাটিয়ে আসতেন । দরিয়াপুরের বাড়িতে কাজের মাসি রান্না করে দিত । নিম্নবর্ণের হাতে রাঁধা ভাত বাবা খেতেন না বলে ভাতটা আমিই বসিয়ে দিতুম । রান্নায় মাকে সাহায্য করতে হতো বলে ডাল-তরকারিও রাঁধতে শিখে গিয়েছিলুম ।
    হাংরি আন্দোলনের সময়ে দাদার আর আমার বন্ধুরা কোর্টে আমার বিরুদ্ধে সাক্ষী হয়ে গেছেন শুনে মা, যিনি ছিলেন অত্যন্ত চাপা প্রকৃতির, নিজের ক্রোধ সামলাতে পারেননি । আমি তাদের চিঠি ইত্যাদি ছিঁড়ে ফেলছি দেখে বলেছিলেন, ‘সব নিয়ে গিয়ে গুয়ের ডাবায় ফ্যাল ; সব কটাই আহাম্মক, অকৃতজ্ঞ ।’ আমার আর দাদার লেখালিখি সম্পর্কে উনিই ছিলেন প্রধান উৎসাহদাত্রী । ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ নামে যে কবিতাটা নিয়ে মকদ্দমা হয়েছিল সেটা মা-বাবা-ঠাকুমা সকলেই পড়েছিলেন ।
    হৃদরোগের লক্ষণগুলোর সঙ্গে তখন আমরা ততটা পরিচিত ছিলুম না, মাও তাঁর কষ্টের কথা বলতেন না । লখনউতে তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ১৮ই নভেম্বর ১৯৮২ মারা যান ।
    ১৯৬৯ সালে, আমার স্ত্রী যখন প্রেগন্যান্ট, ডাক্তার আমাকে জিগ্যেস করলেন, নিপল দুটো কি আগের থেকে গাঢ় রঙের হয়েছে, কালচে হয়েছে ? বললুম, অতো খুঁটিয়ে তো দেখিনি আগে । ডাক্তার বললেন, এ কেমন কথা, নিজের স্ত্রীর নিপলও ভালো করে দ্যাখেন না !
    ১৯৯৯ সালে, নাগপুর থেকে মুম্বাই ট্রেনে যাবার সময়ে টয়লেটের কাছে ভিকিরির মতন দেখতে একজন লোককে দেখে সলিলা “বাবা বাবা” বলে চিৎকার করে উঠেছিল । শুনে ছুটে দেখতে গেলুম যখন, লোকটি দাদর স্টেশানে চলন্ত গাড়ি থেকে নেমে পড়েছে । সলিলার বাবা শৈশবে ওকে মামার বাড়িতে রেখে উধাও হয়ে গিয়েছিলেন ।
    ১৯৬৫ সালে,আদালতঘরে দাগি অপরাধিদের খাঁচায় পিঠ দিয়ে দাঁড়িয়ে আমার বিরুদ্ধে রাজসাক্ষীদের সাক্ষ্য শুনছিলুম । খাঁচার ভেতর থেকে এক ডাকাত বলে উঠল, “ইয়হ তুমহারা জোড়িদার থা? তুমহারে খিলাফ গবাহি দে রহা হ্যায় ? ছোড়না মত, ভুন দেনা সালোঁকো ।” ভাবি, ডাকাত হলেই ভালো হতো ।
    ২০১৫ সালে, “পাঠিকা দুই প্রকার : অলস আর বুদ্ধিমতী” শোনার পর তুষ্টি ভট্টাচার্যের প্রতিক্রিয়া, “হ্যাঁ, প্রথমজন পড়ে, দ্বিতীয়জন ভান করে” । তুষ্টি নিজেকে বুদ্ধিমতী মনে করে ।
    ১৯৫০ থেকে চিনতুম ফণীশ্বরনাথ রেণুকে, হিন্দি ভাষার সাহিত্যিক, যখন তিনি নেপালের রাণাদের বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে আহত হয়ে ভর্তি ছিলেন পাটনার ভোমরপোখরের নার্সিং হোমে, বড়দিদের বাড়ির ঠিক সামনে, লতিকাদি সেখানে নার্স ছিলেন, লতিকা রায়চৌধুরী, রেণু ওনার প্রেমে পড়ে দ্বিতীয়বার বিয়ে করে রাজেন্দ্রনগরের ফ্ল্যাটে থাকতেন, জানতেন না আমি লেখালিখি করি । ১৯৬৪ সালে গ্রেপ্তার হবার পর জানলেন, আর হিন্দি পত্র-পত্রিকায় আমাদের নিয়ে নিয়মিত লিখলেন, যখন কিনা বাঙালা পত্র-পত্রিকা সেসময়ে আমাদের পোঁদে বাঁশ করে চলেছে। রেণু উদ্বুদ্ধ করলেন এস এইচ বাৎসায়ন অজ্ঞেয়কেও, আর উনিও আমাদের হয়ে কলম ধরলেন । রেণুর “বনতুলসী কা গন্ধ” বইতে “রামপাঠক কা ডায়েরি” নামের গদ্যে দীর্ঘ আলোচনা করেছেন হাংরি আন্দোলন নিয়ে । ওনার রাজেন্দ্রনগরের বাড়িতে প্রায়ই যেতুম সন্ধ্যায় মদ খেতে, আমি নিয়ে যেতুম গাঁজা, বেশ জমতো, আমাদের আড্ডা, অনেক তরুণ হিন্দি কবি-লেখকও আসতো । সকালে পৌঁছোলে তাড়ি খাওয়া হতো, তাড়ির ওপর এলাচগুঁড়ো ছড়িয়ে দিয়ে । রেণু মারা গেছেন ১৯৭৭ সালে । লতিকাদিকে রেণুর প্রথম পক্ষের ছেলেরা গ্রামে নিয়ে গিয়েছিল, সেখানে মারা যান ।
    ১৯৬৫ সালে হিন্দি কবি রামধারীসিং দিনকর ডেকে পাঠিয়েছিলেন ওনার বাড়ি, রেণুর বাড়ি যাবার পথেই ওনার বিশাল বাড়ি, ১৯৬৪ পর্যন্ত এম পি ছিলেন, সবে ফিরেছেন দিল্লি থেকে, বললেন, “আমি তোদের সম্পর্কে শুনেছি আর তোদের বিপ্লবকে সমর্থন করি।” বিপ্লব শব্দটা ব্যবহার করতে শুনে কিছুটা অবাক লেগেছিল, বুঝতে পেরে উনি বললেন, উনি একজন “খারাপ গান্ধীবাদী” কেননা যখন দ্রোহ দরকার তখন গান্ধীবাদে নিজেকে বেঁধে রাখলে চলে না । বলেছিলেন, যেখানে-যেখানে বক্তৃতা দিতে ডাকবে সেখানে-সেখানে তোদের সম্পর্কে বলব।” ওনার বক্তৃতার ফলে বহু হিন্দি পত্রিকায় আমার ফোটো আর হাংরি আন্দোলনের খবর বেরোতো । দিনকর মারা গেছেন ১৯৭৪ সালে ।
    ১৯৬৪ সালে তারাশঙ্করের টালার বাড়িতে দেখা করতে গিয়েছিলুম, তারাশঙ্করের মামারা পাটনার, ওনারা বলেছিলেন দেখা করতে, তারাশঙ্কর কথা বলতে চান আমাদের সঙ্গে । ওনাকে আমাদের বুলেটিনগুলো দিলুম । রেখে নিলেন । মেদিনীপুরে বক্তৃতা দিতে গিয়ে হাংরি আন্দোলনের বিরুদ্ধে বলে এলেন । পরে যখন রামধারি সিং দিনকরকে তারাশঙ্করের বক্তৃতার কথা বলেছিলুম, দিনকর বলেছিলেন, “ওয়হ পুরানে খেয়ালাতকে হ্যাঁয়, জানতা হুঁ উনহে।”
    ১৯৭৫ নাগাদ কলকাতায় দেবী রায়ের সঙ্গে দেখা করতে গেলে দেবী জানালো যে অন্নদাশঙ্কর রায় আমার সঙ্গে দেখা করতে চান । জানি না ১৯৬৪-৬৫ সালে দেখা করতে চাননি কেন । আমি তখন লেখালিখি করতে পারছি না, মনেই আসতো না কোনো কথা গুছিয়ে লেখার । ওনার বাড়ি গেলুম । রফিক হায়দার নামে একজন বাংলাদেশী কবি ছিলেন ওনার বাড়িতে, কিন্তু মনে হল তিনি আমাদের আন্দোলনের কথা শোনেননি, সম্ভবত তখন কলকাতা থেকে আন্দোলন চলে গেছে উত্তরবঙ্গে আর ত্রিপুরায় । অন্নদাশঙ্কর নিজের কথাই বলে গেলেন, আমি আর দেবী শ্রোতা, কেন দেখা করতে চেয়েছিলেন বুঝতে পারিনি । ওনার কথাগুলো দেবী লিখে নিয়েছিল একটা খাতায় ।
    ১৯৪৮ সালে, প্রথম নিল ডাউন হয়েছিলুম রামমোহন রায় সেমিনারিতে, হিন্দি স্যারের ক্লাসের বাইরে বারান্দায়, বৃষ্টিতে হিন্দি বই ভিজে চুপচুপে হয়ে গিয়েছিল বলে, বলেছিলেন, “রাষ্ট্রভাষাকা সন্মান করনা সিখো গধহা কঁহিকা ।” বারান্দার বাইরে তখন বৃষ্টি পড়ছে, তখনও জানতুম না যে ওটা রাষ্ট্রভাষা নয়, সরকারি ভাষা । গাধাদের দেখেছি বটে চুপচাপ দাঁড়িয়ে বৃষ্টিতে ভিজছে, আর ছাতামাথায় মানুষদের দিকে তাকিয়ে কান নাচিয়ে হাসছে ।

    ১৯৮৮ সালে, ট্যুরে যাবো বলে লখনউয়ের বাস স্ট্যাণ্ডে অপেক্ষা করছিলুম ; হঠাৎ অধস্তন এক যুবতী অফিসার যার বয়স আমার অর্ধেক কোথা থেকে উদয় হয়ে আমার হাত ধরে বলে উঠল “চলুন পালাই” । বললুম, আমি রায়বরেলি গ্রামীণ ব্যাংকের বোর্ড মিটিং অ্যাটেণ্ড করতে যাচ্ছি । যুবতী বলল, “তাতে কী হয়েছে, আমিও যাবো আপনার সঙ্গে, অপেক্ষা করব ওদের দপতরে, মিটিং শেষ হয়ে গেলে দুজনে উধাও হয়ে যাবো কোথাও, আমার কাছে যথেষ্ট টাকা আছে, তৈরি হয়েই বেরিয়েছি ।” শুনে, মাথায় আর রগে হাতুড়ির আওয়াজ শুনতে পেলুম । এই অফিসার আমারই বিভাগের, প্রায় প্রতিদিন বাংলা শাড়ি আর শাঁখা-রুলি পরে অফিসে আসে, বলল, “আপনাকে যে ভালোবাসি তা আপনার স্ত্রী জানেন ।” কোনো রকমে ছাড়ালুম । মেয়েটি আত্মহত্যা করে নিলে । নিজের কাপুরুষ চরিত্রের জন্য বেঁচে গেলুম, ওফ । বিয়ের পর আমি আর কোনো লফড়ায় ফাঁসাতে চাইনি নিজেকে, সুযোগ পেলেও, মনে হয়েছিল এবার শান্তি দরকার, তবুও নিজেই অশান্তি ডেকে এনেছি, ভেতরের লোচ্চা-লোফার কামড়ে ধরেছে ।
    ১৯৯০ সালে,হিমালয়ের তরাইতে দেশি গোরুর সমীক্ষা করতে গিয়ে এক মরা বাঘিনীর প্রেমে পড়েছিলুম, মরা বাঘিনীর গোলাপি যোনি দেখে চাঞ্চল্য ঘটছিল লিঙ্গে । রাতের বেলায় বাঁশে চিৎ করে চার পা বেঁধে বাঘিনীকে রাখা হয়েছিল এক পাঞ্জাবি শিখের গ্যারাজে । প্রচুর ওল্ড মঙ্ক টেনে শুয়ে পড়েছিলুম বাঘিনীর বুকে, মাই চুষেছিলুম, আর কাঁদছিলুম, বাঘিনীকে ভালোবেসে, বীর্য ঝরিয়ে, উত্তরণের আরাম হল। কবিসন্মিলন পত্রিকার সহসম্পাদক শংকর চক্রবর্তী এই ঘটনা নিয়ে লেখা আমার কবিতা পড়ে ব্যোম ; মধ্যবিত্ত বাঙালির কল্পনাজগত আক্রান্ত হলে বুঝতে পারি অস্তিত্ব ফাটিয়ে চৌচির করে আত্মসন্দেহের নীহারিকাপূঞ্জ ভরে দিতে পেরেছি । আসলে তাদের অভিজ্ঞতা বেশ সীমিত, ভারতবর্ষকে দেখেছে পর্যটকের চোখ দিয়ে । এটা নিয়ে আমি একটা গল্প লিখেছিলুম, অজিত রায়ের ‘শহর’ পত্রিকায়, ‘দুধসন্দর্ভ’ নামে।
    ১৯৮০ সালে, কোমরের তলা থেকে বিকলাঙ্গ এক অপরূপ সুন্দরী তরুণী কেরানিকে বাড়ি নিয়ে যাবার জন্যে আয়া আসেনি একদিন, ও যেতো পেরামবুলেটারের মতন একটা গাড়ি করে, কী করা যায় ভেবে উঠতে পারছিলুম না, কেরানি আর বিভাগীয়প্রধানের শ্রেণি-বিভেদ বেশ দৃষ্টিকটু । অফিস ছুটির পর আরেকজন মুসলমান অফিসারই ছিলেন আমার সঙ্গে, তিনি হিন্দু তরুণীকে তুলতে চাইলেন না, বাবরি মসজিদ তখন ভাঙা হয়ে গেছে, আমি পাছার তলায় হাত দিয়ে তুলে নিলুম, মনে হল তরুণীটি ইচ্ছেকরে নিজের যোনিকে আমার লিঙ্গের সঙ্গে চেপে ধরল, ওর হুইলচেয়ার ঠেলাগাড়ি পর্যন্ত নিয়ে যাবার সময় আমার প্রেমিকা-নিরপেক্ষ লিঙ্গ ফুলে উঠল, তরুণীর ইশারার জন্য আপশোষ হল । ঘটনাটা নিয়ে আমার একটা ছোটোগল্প আছে, সুকুমার চৌধুরীর ‘খনন’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল, ‘অনিশ্চয়তা নিয়ে দুটি গল্পের বিনুনি : একটি প্রেমের অন্যটি রঙ্গকৌতুকের’ শিরোনামে । ।
    ১৯৪৯ সালে, প্রথম স্ট্যাণ্ড আপ অন দি বেঞ্চ হয়েছিলুম, ইংরেজি ক্লাসে, ওয়র্ডসওয়র্থের ড্যাফোডিল্স কবিতা ব্যাখ্যা করার সময়ে আমি সিসটার আইরিনের দেয়া শুকনো ড্যাফোডিল্স ফুল দেখিয়ে বলেছিলুম, জানি স্যার, এই যে, বইয়ের ভাঁজ থেকে বের করে । শিক্ষক বলেছিলেন, “ইয়ার্কি মারবার জায়গা পাওনি, স্ট্যাণ্ড আপ অন দি বেঞ্চ।” উনি বুঝিয়েছিলেন যে কচুরিপানার বেগুনি রঙের ফুলকে বলে ড্যাফোডিল্স। যখন ইউরোপে গেলুম তখন পথের ধারে-ধারে দেখলুম ড্যাফোডিল্স ফুল, দেখলুম লাল রঙের ফুল যাকে ইউরোপীয়রা বলে পপি, অথচ যা পোস্তগাছের ফুল নয় ।
    ১৯৪৯ সালে,দরিয়াপুর পাড়ায় সন্ধ্যায় মাতাল আর গঞ্জেড়ি মাস্তানদের মারামারি চেঁচামেচি চিৎকার শুরু হতো বলে, আমি তার চেয়েও জোরে চিৎকার করে পড়া মুখস্হ করার চেষ্টা করতুম। তার ফল হতো । বাইরের চেঁচামেচি বন্ধ হয়ে যেতো । দরিয়াপুরে আমাদের বাড়িটা ছিল একটা বাতিল গোরস্তানের ধারে ; গোরস্তানের কেয়ারটেকার আল্লু মিয়াঁ ঝুপড়ি তৈরি করে নিজের দুই মেয়েকে দিয়ে রাতের বেলায় ব্যবসা করাতো, তাদের বররা দালালের কাজ করতো, মাঝে-মাঝে টাকার বাঁটোয়ারা নিয়ে শশুর আর জামাইদের ভেতর ঝগড়া হতো, অকথ্য গালাগাল । সেটা ছিল ইমলিতলার পর আমার গালাগাল শেখার উঁচু ক্লাস ।
    ১৯৮৮ সালে কেনা, নাকতলার বাড়িতে যখন ১৯৯৪ সালে থাকতে গেলুম, যাঁর কাছ থেকে ফ্ল্যাট কিনেছিলুম, সেই চাটগাঁইয়া টাকমাথা শচীন চৌধুরীমশায়, ওপরতলায় পাটনার গঞ্জেড়িদের মতনই চেঁচামেচি করতেন । সিনেমার পরিচালক ছিলেন এককালে, তাই ফিলমি ঢঙে বুড়ি বউকে পেটাতেন । দুটো ফিল্ম প্রডিউস করেছিলেন, চলেনি, পাড়ার লোকেদের টিকিট বিলিয়ে দেখতে যেতে বলতেন । কালীপুজোর সময়ে ওনার বুড়ি বউ ব্লেড দিয়ে বুক চিরে কালীকে রক্ত উৎসর্গ করতেন । শচীন চৌধুরী মারা গেলেন যখন, ছেলে জাপানে, বরফে সিঁটকে পড়ে রইলেন দিন পাঁচেক, ছেলে ফিরলে ওনার লাশকে ফিসফিসে হরিবোল দিয়ে নিয়ে গেল পাড়ার ক্লাবের ছেলেরা । সকালে দেখলুম সিঁড়িতে ওনার নকল দাঁত পড়ে আছে । শচীন চৌধুরীর ছেলে ব্যাংক থেকে লোন নেবার সময়ে আমার ল্যাণ্ডলাইনের নম্বর দিয়েছিল আর ব্যাংক থেকে প্রতি মাসে তাগাদা আসত আমার ফোনে, চাটগাঁইয়া তিকড়মবাজি আর কাকে বলে ।
    ২০০৬ সালে শচীন চৌধুরীর ছেলে যাকে ফ্ল্যাটটা বেচলো, সে তার বউকে আরও বেশি পিটতো, মাঝরাতে বউটার সে কি আর্ত চিৎকার, যাতে না শুনতে হয় তাই রাত দুটোতেও ফুল ভলিউমে টিভি চালিয়ে দিতুম, তবুও চলতো ওদের কামড়া-কামড়ি লাথা-লাথি । লোকটার বাবা ছিল পাগল, চিকিৎসা করাতে নিয়ে যাবার সময়ে বাচ্চা মেয়েকে আমাদের ফ্ল্যাটে রেখে যেতো, বাচ্চাটাকে যদি আমরা খাওয়াতুম তাহলেও চটে যেতো লোকটা। যাক বউটা ডিভোর্স দিয়ে বাচ্চাসহ চলে গেল আর্তচিৎকার সঙ্গে নিয়ে । শেষে পাগল বাবা একতলায় নেমে পেছনের বাগানে গিয়ে ভাড়াটের স্নানের ঘরে উঁকি মেরে কিশোরীর স্নান দেখার সময়ে ধরা পড়ে দেম্মার দেম্মার খেলেন পাড়ার ছেলেদের হাতে, তাতে ওনার পাগলামি দিনকতকের জন্য সেরেছিল কিছুটা । এই বঙ্গসমাজের সঙ্গে আমার একেবারেই পরিচয় ছিল না ।
    ১৯৯৪ সালে সলিলা চাকরি ছেড়ে দেবার পর ওকে সঙ্গে নিয়ে ট্যুরে যেতুম, পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে পরিচয় করানোর জন্যে । ১৯৯৫ সালে মালদায় গিয়ে স্তম্ভিত হলুম টেরাকোটা মসজিদ দেখে, তার আগে কেউ এই মসজিদগুলোর সংবাদ দেয়নি, সকলেই বিষ্ণুপুরের টেরাকোটা মন্দিরের কথা বলতো । সুবো আচার্যের বাড়ি বিষ্ণুপুরে, যখন গিয়েছিলুম তখন টেরাকোটা মন্দির দেখেছিলুম, ষোলো থেকে উনিশ শতকের মাঝে তৈরি । মালদায় গিয়ে জানলুম যে মসজিদগুলো তার বহু আগের । আদিনা মসজিদ তৈরি করিয়েছিলেন সুলতান সিকন্দর শাহ ১৩৬৪ থেকে ১৩৭৫-এর মাঝে । লোটন মসজিদ তৈরি হয়েছিল ১৪৭৫ সালে । ১৪৮০ সালে মিরশাদ খান তৈরি করিয়েছিলেন তাঁতিপাড়া মসজিদ । ১৫৩১ সালে কদম রসুল মসজিদ তৈরি করিয়েছিলেন সুলতান নুসরত শাহ ; এই মসজিদের কেয়ারটেকার একটা পায়ের ছাপ দেখিয়ে বলেছিলেন যে ওটা হজরত মোহম্মদের , শুনে পিলে চমকে গিয়েছিল, দেওবন্দিরা জানতে পারলে আস্ত খেয়ে ফেলবে লোকটাকে, সে আবার প্রতি সকালে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশ থেকে আসতো আর সন্ধ্যায় ফিরে যেতো । মসজিদগুলো দেখতে-দেখতে শৈশবের ইমলিতলা পাড়ার মসজিদের কথা মনে পড়ছিল, তার ভেতরেও আমাদের প্রবেশ অবাধ ছিল, এই মসজিদগুলোর মতন ।
    ১৯৬৫ সালে কলেজ স্ট্রিটে ছাতার খোঁচা দিয়ে এক ভদ্রলোক বললেন, “এই, তোরা আমার বাড়ি আসিস না কেন রে”? সুবিমল বসাক ওনার কাছ থেকে ঠিকানা নিয়ে “আমরা যাবো যে কোনো দিন”, বলার পর উনি বললেন, “সকালের দিকে আসিস।” উনি চলে যাবার পর সুবিমল বলল, “জানো কে ? জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী।” গেলুম ওনার বাড়ি, মানিকতলায় নেমে, তারপর ধানখেতের ভেতরে আলের ওপর দিয়ে দূরে একটা চালাবাড়ি, সেরকমই নির্দেশ দিয়েছিলেন । আলের ওপর দিয়ে হাঁটার সময়ে বুঝতে পারলুম যে রাতের বেলায় সাপের ভয়ে ছাতাকে ছড়ির কাজে লাগান । ওনার বাড়িতে পৌঁছোলে, জানতে চাইলেন আমি কি-কি করেছি যে সবাই এতো চটে গেছে । সবই বললুম ওনাকে, মুখোশ, জুতোর বাক্সের রিভিউ, ব্ল্যাংক কাগজে গল্প, বিয়ের কার্ড, স্টেনসিল করা ড্রইং ইত্যাদি । বেশ হাসছিলেন শুনে, যখন শুনলেন যে জুতোর বাক্স রিভিউ করতে দিয়েছিলুম, তখন একেবারে জোরে-জোরে হাসতে লাগলেন । বললেন, “মামলা ঠুকেছে বলে বন্ধ করিসনি, তোরা না করলে কে-ই বা মুখোমুখি প্রতিবাদ করবে।” এখন ওই ধানখেতে আবাসনের পর আবাসন । বেশ কয়েকজন নামকরা কবি থাকেন সেই আবাসন-হয়ে-যাওয়া-ধানক্ষেতে । জানি না ধানক্ষেতের উড়ন্ত বাতাসের সবুজ গন্ধ তাঁরা পান কিনা ।
    ১৯৮৭ সালে,লখনউতে প্রচণ্ড বৃষ্টিতে সহকর্মীর স্কুটারে পেছনের সিটে বসে ইন্দিরানগর থেকে অফিস যাচ্ছিলুম, বৃষ্টিতে সামনেটা আবছা, সহকর্মীকে পৌঁছোতেই হবে অফিস খোলার জন্য, ওর কাছে বিভাগীয় চাবি ; পেছন থেকে একটা জিপ জোরে ধাক্কা মারল, আমরা দুজনে দুদিকে ছিটকে পড়লুম, প্লাসটিকের রেনকোট ছিল বলে রাস্তার ওপর দিয়ে পিছলে অনেকটা চলে গেছি যখন, একটা ট্রাক এসে আমার মাথার কাছে থামল । ট্রাক ড্রাইভার নেমে আমার দুকাঁধ ধরে তুলে বলল, “আজ আপনে মুঝে বচা দিয়া।”
    ১৯৪৬ সালে, ইমলিতলায় দোলের সময় যেমন ল্যাংটো পোঁদে পাড়ার বাচ্চাদের সঙ্গে নাচতুম, তেমনি ১৯৬৪ সালে, হাংরি আন্দোলনের সময়ে সুভাষ শৈলেশ্বর বাসুদেব সুবিমলের সঙ্গে ল্যাংটো হয়ে নেচেছি সুযোগ পেলেই, কোনো হিপি এলে তার বাথরুমে, কিংবা অবিনাশ কবিরাজ লেনের কোনো ঘরে, কিংবা অশোক ফকিরের চম্পাহাটির চালাবাড়ির অন্ধকারে । আমার গাম্ভীর্যের অন্তরালে শরীরে নাচ লুকিয়ে আছে, বেরোবার সুযোগ খোঁজে । লখনউতে ছেলে মেয়ে স্ত্রীর সঙ্গে অডিও বাজিয়ে নেচেছি, জুনিয়ার অফিসারদের জমঘটে মদ খেয়ে নেচেছি । মাতাল অবস্হায় কেদার ভাদুড়ির ঘরে নেচেছি আমি আর উত্তম দাশ । কেদার নাচতে চায়নি, না না আমি নয় আমি নয় বলে হাত ছাড়িয়ে নিতো । আমাদের ল্যাংটো নাচের বর্ণনা পড়ে কবি হিন্দোল ভট্টাচার্য খাপ্পা । উনি বুঝতে চেষ্টা করেননি যে ইমলিতলার ফেকলু মানুষ আর কলকাতার মধ্যবিত্ত বাঙালির মাঝে অসেতুসম্ভব পার্থক্য ।
    ১৯৯৮ সালে কেদার ভাদুড়ির গাঙ্গুলিবাগানের বাসায় বসে মদ খাচ্ছি, একটি তরুণ প্রবেশ করতেই গম্ভীর হয়ে গেল কেদার, আমাকে বলল, পুরোটা চোঁচোঁ করে খেয়ে বাড়ি চলে যাও, কালকে আবার বসা যাবে। পরের দিন গিয়ে জানলুম তরুণটি কেদারের প্রথম পক্ষের ছেলে । টিউশানি করবার সময়ে কচি এক তরুণীর প্রেমে পড়ে তার সঙ্গে দৈহিক সম্পর্ক করে ফেলেছিল কেদার, তারপর তাকে বিয়ে করতে হয়েছিল, প্রথম বউকে ডিভোর্স দিয়ে । প্রথম বউয়ের ছেলে প্রতিমাসে খোরপোষের টাকা নিতে আসতো । কেদারের তরুণী বউ কখনও আসতো না গাঙ্গুলিবাগানের বাড়িতে, প্রতিবেশীদের কেউ একজন বলেছিল, “ও মা আপনার নাতনিও আছে, বলেননি তো !” তরুণী বউয়ের একটা মেয়ে হয়েছিল, তাকেও আসতে বারণ করে দিয়েছিল কেদার । কয়েক পেগের পর বলতো, “বড়ো যন্ত্রণা হে, বড়ো কষ্ট, বড়ো দুঃখ, ও শূলযাতনা তুমি বুঝবে না, কবিতায় লুকিয়ে রেখেছি, কাকেই বা বলব, কবিতাকেই বলি ।” কেদারের একটা চল্লিশ পাতার সাক্ষাৎকারে দ্বিতীয় পক্ষের বউ আর তার সঙ্গে আকস্মিক প্রেমের ঘটনার উত্তর দিতে চায়নি কেদার । কেদারের মৃত্যুর কথা জেনেছিলুম উত্তম দাশের ফোনে ।
    অশোক ফকিরের চম্পাহাটির চালাঘরে গিয়েছিলুম আমি আর সুবিমল ১৯৬৫ সালে, উনি পানের পাতায় আফিম চাটতে দিলেন, বেশ সুন্দরী বউ, অজন্তার দেয়ালে আঁকা নারীদের মতন বৌদ্ধ চোখ । ওই বউকে ফেলে অশোক ফকির এক বিদেশিনীর সঙ্গে আমেরিকায় হাওয়া । বিদেশিনী বউটা কিছুদিন আগে ইমেল করে নিজের জটাজুট সঙ্গে হরেকৃষ্ণ ছাপানো উত্তরীয় কাঁধে অশোক ফকির, ওর আর মন্দিরের ছবি পাঠিয়েছিল, গিন্সবার্গের লেখা চিঠি পাঠিয়েছিল যেগুলোর কপি আমেরিকায় অনামিকা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পাঠিয়েছিলুম । বিদেশিনী বউ বলেছিল অশোক ফকিরের আমেরিকাবাস নিয়ে একটা বই লিখেছে, কোনো পাবলিশার ছাপতে রাজি নয় । মার্কিন কনসুলেটে গিয়ে অশোক ফকির খবর যোগাড় করতো যে কারা-কারা কলকাতায় এসেছে আর কোন হোটেলে আছে । অশোক ফকিরের কারবার শুনে বাঙালি বউটার জন্যে মায়া হল । আমার লম্পট চোখ বুজলেই তার মুখ ভেসে ওঠে। আমেরিকাতেই মারা গেছে অশোক ফকির । শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় অশোক ফকিরকে নিয়ে একটা উপন্যাস লিখেছেন শুনেছিলুম ।
    অশোক ফকিরের দেয়া আফিম খেয়ে প্রচণ্ড বৃষ্টিতে ওভারব্রিজের ওপর নেচেছিলুম আমি আর সুবিমল । অনেক রাত পর্যন্ত, সেসময়ে চম্পাহাটিতে এখনকার মতন নিত্যযাত্রীদের ভিড় ছিল না, একেবারে ফাঁকা স্টেশান, প্ল্যাটফর্মগুলোও ফাঁকা, অন্ধকারে ঢাকা । এখন চম্পাহাটিতে ট্রেন এলে নিত্যযাত্রীদের ঠেলাঠেলিতে অন্ধকার উধাও হয়ে যায়, ওরা সবাই যেন আফিম চেটে দৌড়োয় ।
    ২০০৭ সালে ইউরোপে গিয়ে নানা রকমের ওয়াইন খেয়ে আমি কোনো তফাত টের পাইনি, নেশার মাত্রাটুকু টের পেয়েছি, মদের চরিত্র নয় । গীর্জাতেও যে ওয়াইন তৈরি হয় তা জানতুম না ; গীর্জার ওয়াইন আর ফরাসিদেশের নাস্তিকদের কোম্পানির ওয়াইনে তফাত টের পাইনি । এদেশে কোনো মন্দিরে মদ তৈরি হলে ধুন্ধুমার বেধে যাবে । আসলে ইমলিতলার আর খালাসিটোলার দিশি মদ ঠররা আর বাংলার কয়েকটা আস্তরণ জমে গেছে আমার জিভের ওপর । বাংলা মদকে পিসেমশায় বলতেন ধান্যেশ্বরী ।
    ১৯৫৫ সালে সিংহ বাঘ চিতা বিড়ালের মতন আমিও শুভাকে চেটেছি, চাটতে আমার বেশি ভালো লাগত ; প্রেমিকার হিসির আওয়াজ শুনতেও ভালো লাগত । বলতুম, দরোজা খুলে কর, আমাকে যেমন লেচার খেতাব দিয়েছিস, লেচারি করি, এক স্বর্গ থেকে আরেক স্বর্গে উড়ে যাতায়াত করি ।
    ১৯৬৫ সালে বেনারসে একজন হিপি চরস দিয়ে হনুমান তৈরি করত আর তার ল্যাজ ভেঙে ফুঁকতে দিতো । আরেকজন হিপি গঙ্গাজলের ঘটিতে এল এস ডি মিশিয়ে আনতো, তার সামনে জিভ বের করলে সে কয়েক ফোঁটা ফেলে দিতো । গঙ্গা তখন থেকেই ভিষণ নোংরা অথচ হিন্দুরা হোলি গ্যাঞ্জেস বলে বলে দুয়েকজন হিপি ওই জলে স্নান করতো । তার আগে অ্যালেন গিন্সবার্গ ওই নোংরা জলে স্নান করে ফোটো তুলিয়ে হিপিদের জন্য পথ দেখিয়ে গেছে । পাটনায় গঙ্গার ধারে হিসি করতে বললে, গিন্সবার্গ বলেছিল, তোমার হোলি রিভার, আর তুমি বলছ তার তীরে হিসি করতে !
    ২০০৭ সালে ডেন হাগের একটা বাগানে দুপুর বেলায় চল্লিশ-পঞ্চাশজন যুবতীকে উলঙ্গ রোদ পোয়াতে দেখে আশ মিটছিল না বলে রাস্তায় পাক খেয়ে এসে আবার দেখতে দেখতে কতোবার যে রাস্তটা পাক খেলুম তবুও আশ মিটল না আসলে এতো বড়ো-বড়ো ফর্সা গোলাপি মাই আর পাছার ঢেউ দেখিনি আগে অনেকের যোনিতে সোনালি চুল অনেকের চুলহীন পুলিশ নিশ্চয়ই সিসিটিভিতে আমার হাঘরেপনা দেখে হাসাহাসি করে থাকবে, “দি গ্রেট ইনডিয়ান লেচার”।
    ১৯৮১ সালে লখনউতে চম্বল অঞ্চলের ট্যুরে বাবা মুস্তাকিম নামে এক ডাকাতের সঙ্গে দেখা হয়েছিল, যে আমার মাথায় হাত রেখে বলেছিল, “জিতে রহো” । ডাকাতের আশীর্বাদের দরুণ স্হানীয় কৃষি আধিকারিক বলেছিল, চম্বলে আর কেউ আপনার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না, যে গ্রামে ইচ্ছে যেতে পারবেন । সত্যিই, বহুবার চম্বলে ট্যুরে গেছি, প্রতিটি গ্রামে লোকেরা বেশ আপ্যায়ন করেছে, জমিদাররা তাদের বাড়ির পায়খানায় হাগতে দিয়েছে ।
    ১৯৮৩ সালে গোরখপুরে ট্যুরে গিয়েছিলুম, সেখানকার মন্দিরে শিবের পুজোয় ত্রিশূল উৎসর্গ করতে হয়, যা আমার অধস্তন অফিসার করতে চাইছিল । আমি বাইরে বাগানে ছায়ায় অপেক্ষা করছিলুম । আচমকা একজন জটাধারী সাধু, ঠোঁটের কোনে ছিলিমের ফেনা, জড়িয়ে ধরে বলে উঠেছিল, “জো তুমসে দুষমনি করেগা ওয়হ তুমসে পহলে মর জায়গা ।” কারোর মারা যাবার খবর পেলে তার সম্পর্কে সন্দেহ হয়, সাধুটার কথার জন্যে হয় না ।
    ১৯৫২ সালে শুভা আমাকে বলেছিল তাকে পর্নোগ্রাফি পড়াতে, আমি নিজেই তখনও কোনো পর্নোগ্রাফির বই পড়িনি, কোথায় পাওয়া যাবে তাও জানতুম না, বন্ধু তরুণ শূরকে বলতে ও যোগাড় করে দিয়েছিল । এখনকার প্রেমিকারা ভাবে তারাই বুঝি পর্নোগ্রাফি পড়তে উৎসুক । ষাট বছর আগেও প্রেমিকারা পর্ণোগ্রাফি পড়তে চাইতো । তখন অবশ্য নেটে থ্রি এক্স সাইট ছিল না ; যদি থাকতো আর প্রেমিকারা অমন কম্মো করার জন্য চাপ দিতো তাহলে জিভ বেরিয়ে আসতো । তরুণ শূর যে বইটা যোগাড় করে দিয়েছিল, লাইন ড্রইং আঁকা, তার নায়ক একটি বিশাল লিঙ্গ !
    প্রতিটি নির্বাচনে যাকে ভোট দিই সে জেতে না, তার দল জিতলেও সে জেতে না । আর সে জেতে না বলে আনন্দ হয়, যারা ভোট দ্যায় তাদের আকাঙ্খার সঙ্গে নির্বাচিত লোকেদের আকাঙ্খার মিল কখনও কি হতে পারে ? হয়েছে কি কোনও দেশে ? নির্বাচনের সবচেয়ে নোংরা ব্যাপার হল যে কুৎসিত নারী আর পুরুষরা “আমাকে নাও আমাকে নাও” বলে চেঁচিয়ে-চেঁচিয়ে মাস খানেক ধরে চলমান বাজার বসায়। বহুকাল আর ভোট দিই না, শরীরে কুলোয় না, নোটা আসা সত্বেও ভাল্লাগে না ।
    ১৯৫৫ সালে ইনফ্যানট্রির ক্যাম্পে গিয়ে ভোর রাতে উঠে কুড়ি-তিরিশজন সবাই ল্যাংটো হয়ে হাগতে যেতুম, গোল হয়ে হাগতে বসতুম, পাদবার খেলা খেলতুম, ছোঁচাতুম চা খাবার অ্যালুনিমিয়াম মগ দিয়ে, যৌথভাবে উলঙ্গ হতুম, কোনো লজ্জা-বালাই নেই, প্রাগৈতিহাসিক কালখণ্ডে ফেরার সুযোগের জন্য সকলে মিলে হইচই করতুম ।
    ১৯৬১ সালে অফিসের সহকর্মী সুশীল কুমার, মণিমোহন মুখোপাধ্যায়, অরুণ মুখোপাধ্যায় আর আমি চারজনে মিলে গিয়েছিলুম শিমুলতলায় । রাতের বেলায় একটা পাহাড়টিলায় চারজনে উলঙ্গ হয়ে ওঠার প্রতিযোগীতা করেছিলুম । সম্ভবত সুশীল কুমার জিতেছিল । পরের দিন একটা ছোট্টো পুকুর বা হাঁটুজল ডোবায় আমি, সুশীল আর অরুণ তিনজনে জলের তলায় লুকিয়ে লিঙ্গ দাঁড় করিয়ে জলের ওপরে ভাসিয়েছিলুম ; মণিমোহন চেঁচিয়ে উঠেছিল, “সাপ সাপ জলে সাপ আছে” । মণিমোহনকে সেই থেকে বলা হোতো “চপড়গাণ্ডু”; জল থেকে উঠে মণিমোহনকে বলেছিলুম, আপনাকে ওয়াটার অর্কিড দেখাতে চাইছিলুম। “ডুবজলে যেটুকু প্রশ্বাস” উপন্যাসে আছে ঘটনাটা । ওয়াটার অর্কিড প্রদর্শনীর কথা বুড়ো বয়সেও মনে রেখেছিল মণিমোহন । সুশীল লিভারের ক্যানসারে মারা গেছে, মণিমোহন কিডনির । অরুণ পাগলিয়ে গেছে ওর জামাইয়ের পাল্লায় পড়ে, ও অবশ্য রিজার্ভ ব্যাঙ্ক পাটনায় চাকরির সময়েও পাগলিয়ে ছিল, ঘটনাটা আছে আমার ‘ডুবজলে যেটুকু প্রশ্বাস’ উপন্যাসে । মণিমোহনের মেয়ের সঙ্গে দাদা নিজের বড়ো ছেলের বিয়ে দিয়েছিল । অরুণের সঙ্গে দাদা বিয়ে দিয়েছিল নিজের এক শালির ।
    ১৯৬৪ সালে অ্যালেন গিন্সবার্গ যখন আমার মামলার জন্য চারিদিকে লেখালিখি করছেন তখন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ওনাকে বোঝান যে মলয়ের কবিতা “স্টিংকি”, ওকে কলকাতায় কেউ সাহিত্যিক বলে মনে করে না ; গিন্সবার্গের উৎসাহে ভাটা পড়ে । আমেরিকায় বসে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের মনে হচ্ছিল, কলকাতায় কম বয়সীরা সব লুটেপুটে খেয়ে নিচ্ছে, ওনার জন্য বেঁচে থাকবে কেবল উচ্ছিষ্ট । বন্ধ করো বন্ধ করো বন্ধ করো, লোক জোটাও, বন্ধুদের হুমকি দাও । শরৎকুমার মুখোপাধ্যায় জানিয়েছেন গ্রেপ্তারি এড়াবার জন্য, ওদের সবাইকে, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, উৎপলকুমার বসুকে পুলিশের কাছে মুচলেকা লিখে দিতে হয়েছিল ; আর সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে লিখতে হয়েছিল আমাদের আন্দোলনের বিরুদ্ধে সম্পাদকীয়। মামলার কাগজপত্র আদালতে জমা দেবার সময়ে ওনাদের মুচলেকাগুলো লালবাজার পুলিশ কেন যে দ্যায়নি জানি না, কেবল শৈলেশ্বর ঘোষ আর সুভাষ ঘোষের মুচলেকার কপি দিয়েছিল, সম্ভবত ওরা রাজসাক্ষী হয়েছিল বলে । হাংরি মামলায় চার্জশিট পাবার আগে পর্যন্ত জানতে পারিনি যে এনারা আমার বিরুদ্ধে পুলিশের পক্ষের সাক্ষী, রাজসাক্ষী । উৎপল-সন্দীপনের সঙ্গে কতোবার দেখা হয়েছে, অথচ চুপচাপ যে পিঠে ছোরা মেরেছেন তা চেপে রেখেছিলেন। উৎপলকুমার বসু মারা গেছেন গত বছর, মানে ২০১৫ সালে । গিন্সবার্গ মারা গেছেন ১৯৯৭ সালে । শৈলেশ্বরের আগে সুভাষ ।
    ১৯৯৫ সালে মুম্বাই থেকে ফিরে সন্দীপনের সঙ্গে দেখা করতে গিসলুম ওনার চেতলার ফ্ল্যাটে, কি-নোংরা কি-নোংরা, ঘরে বসে আছেন মেঝেয়, সামনে একটা জলচৌকি, পাশে একটা থলে থেকে “আজকাল” সংবাদপত্রে জড়ো হওয়া পাঠকদের চিঠিতে চোখ বোলাচ্ছিলেন আর বাছাই করছিলেন । বললুম, লেখালিখি না করে এসব ফালতু কাজে সময় নষ্ট করছেন কেন, সামান্য টাকার জন্যে । উনি বললেন গল্পের ম্যাটার পেয়ে যাই । ভেতরে গিয়ে স্ত্রীকে কিছু বললেন, স্ত্রী সেজেগুজে বেরিয়ে গেলেন । যেমন কিপ্টে ছিলেন তেমনই, জামা-প্যান্ট পরে নিয়ে, দরোজায় তালা ঝুলিয়ে, বললেন, “চলো, সুকৃতিতে গিয়ে চা খাওয়া যাবে”। ট্যাকসির ভাড়া আমিই দিলুম, চা-কাটলেটের পয়সা আমিই দিলুম । মনে হল, এই একবার আড্ডাই যথেষ্ট, ওনার সেই উইট ফুরিয়ে গেছে, সেই যখন হাওড়ায় সাইকেলে চেপে ভোরবেলায় দেবী রায়ের বাড়িতে হাংরি বুলেটিনের জন্যে লেখা দিতে আসতেন । সন্দীপন মারা গেছেন ২০০৫ সালে । এখন বুড়ো হয়ে টের পাই যে এই বয়সে পৌঁছে ঘরদোরের ধুলোবালি জমে থাকাটা কোনো গুরুত্বের ব্যাপার নয় ।
    ১৯৬৪ সালে হাতকড়া পরাবার সময়ে, কোমরে দড়ি বাঁধার সময়ে, পুলিশের মুখময় আলো খেলা করছিল, যেন আধুনিকতার ওপর ওদের একচ্ছত্র অধিকার, যেন এনলাইটেনমেন্ট কাকে বলে ওরাই কেবল জানে । কোমরে দড়ি বাঁধা আর হাতে হাতকড়া পরানোর ব্যাপারটা এনলাইটেনমেন্টের সঙ্গেই এসেছিল। রাস্তা দিয়ে যখন হাঁটিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল, পাড়ার কুকুরগুলোও আমার পেছন-পেছন কৈলাশযাত্রায় হেঁটেছিল ।
    ১৯৫০ সালে পকেটে হাত ঢুকিয়ে লিঙ্গোথ্থান সামলাচ্ছি দেখে বাবা বললেন, “অতোগুলো জাঙিয়া কিনেছিলিস, এরই মধ্যে ছিঁড়ে ফেলেছিস, এতো আকখুটে কেন ?”
    প্রথম রেডিমেড মাই নিজের হাতে-মুখে পরখ করেছিলুম শুভার, পূর্ণিমার চাঁদের আলোয়, ফর্সা ত্বকে নীলাভ শিরা, গোলাপি ছোট্টো বোঁটা, খেমির মাই যখন দেখেছিলুম তখন তৈরি হয়নি, বোতামবুকো, কুলসুম আপা মাই দেখতে দেননি, শুধু যোনি, তাও অন্ধকার ঘরে, তারপর তিনজন হাফগেরস্হের কচুপোড়া শুকনো মাই দেখেছিলুম হাওড়া স্টেশানে, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দলবেঁধে ট্রেনের কামরা ভাড়া করে অধ্যাপকদের সঙ্গে, হাওড়ায় তখনও নতুন প্ল্যাটফর্মগুলো হয়নি, শেডে আশ্রয় নিয়েছিল উদ্বাস্তুদের ভিকিরি পরিবারেরা, প্রত্যেকে দুটাকার বদলে মাই দেখিয়েছিল, ব্লাউজ তুলে, ময়লা, স্নানহীন, নোংরা, তারপর মাই দেখেছিলুম অবিনাশ কবিরাজ লেনে, ডবকা, ফর্সা, চল্লিশ টাকায় সবাই মিলে, অতিব্যবহৃত হলেও একটুও টসকায়নি, তারপর নেপালে স্বাস্হ্যবতী হিপিনীর, বিনিপয়সায়, সোনালি ত্বক, চরসের ঘোরে, তার সঙ্গে দিনকতকের জীবনের কথা লিখেছি “অরূপ তোমার এঁটোকাঁটা” উপন্যাসে। আর দেখেছিলুম চিনা যুবতীর ফিকে হলুদ চ্যাপ্টা মাই, টেলিসকোপ দিয়ে ।
    যখন ইউরোপে গেলুম, শয়ে-শয়ে যুবতীর নানা মাপের মাই দেখলুম রোদ পোয়াচ্ছে, কিন্তু তখন প্রৌঢ় বলে মিউজিয়ামের বস্তুর মতন দেখাতেই সীমাবদ্ধ রাখলুম নিজেকে, তার কারণ অতো প্রায়-উলঙ্গ যুবতী দেখেও লিঙ্গোথ্থান হয়নি । থাইল্যাণ্ডে রেড জোনে মাই দেখেছিলুম, কিশোরীদের আর কচি-যুবতীদের, কাঁচের শোকেসের ওপারে ম্যানেকুইনের মতন দাঁড়িয়ে, যাকে পছন্দ বেছে নাও, শুতে চাও শোও, ম্যাসাজ করাতে চাও করাও, যৌন অসুখের ভয়ে আমি কেবল ম্যাসাজ করিয়েছিলুম, হাত কুঁচকির দিকে উঠে আসছিল যখন তখন বলতে হল, দ্যাটস অল দ্যাটস অল । শৈশবে পাড়ার বউদের মাই খেয়ে বেড়াতুম তা আর মনে নেই, শুধু কালুটুয়ার চাচির ঢাউস তামাটে মাই ছাড়া, কেননা তখন মনে রাখার বয়সে দেখেছিলুম । শুভা যোনি দেখতে দেয়নি, বলেছিল, না না না না, চুল পরিষ্কার করা নয়, সেক্স না করলেও ওর অরগ্যাজম হতো । শুভা ছিল রোমান্টিক প্রেমিকা, সে-ই একমাত্র নিয়মিত প্রেমপত্র লিখতো, ফিলমি স্টাইলে । তখন জানতুম না যে লেখকদের জীবনে যতো চিঠি আসে সব গুছিয়ে রাখতে হয় । আমি কোনো চিঠি-ফিটি রাখিনি, ত্রিদিবকে, সুবিমলকে দিয়ে দিয়েছি আর তারপর ছিঁড়ে ফেলে দিয়েছি ।
    একেবারে গোলাপি মাই দেখেছিলুম তিব্বতি তরুণীদের, যারা চিন থেকে পালিয়ে এসে ভারতে আশ্রয় নিচ্ছিল, তখনও ধরমশালা জায়গাটা তাদের আর দালাই লামার থাকার জন্যে নির্দিষ্ট হয়নি । পালিয়ে এলেও তিব্বতের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে ভারতীয় বাস্তবতার সঙ্গে নিজেদের মিশিয়ে ফেলতে পারেনি তখনও। রাজগীরের কুণ্ডের চারিধারে খালি গায়ে বসেছিল, আর আমরা, কলেজিয়ানরা, দুচোখ মেলে দেখছিলুম, যতক্ষণ ওরা স্নান করেছে ততক্ষণ “মেল গেজ” দিয়ে গিলেছি । ধরমশালায় বসবাস করতে-করতে তিব্বতি তরুণীরা হয়ে গেছে ভারতীয় তরুণীদের মতন, সেই গোলাপি পরাগ-মাখানো তিব্বতি আভা আর নেই । চিন তাইজন্যেই দলে-দলে হান পুরুষদের তিব্বতে পাঠিয়ে তিব্বতি তরুণীদের সঙ্গে সংসার পাততে উৎসাহ দিয়েছে, তিব্বতী যুবতীদের সৌন্দর্য নষ্ট করে দিয়েছে সাম্রাজ্যবাদী চিন । চিনারা চিরকালই সাম্রাজ্যবাদী ছিল, সেটাই এখনও বয়ে নিয়ে চলেছে । ধরমশালায় গিয়েছিলুম ট্যুরে, অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছিল না বলে দালাই লামার সঙ্গে দেখা করা যায়নি ।
    শুভা বলেছিল, প্রেমিকা এমন হওয়া উচিত যে ট্রয়ের যুদ্ধ বাধিয়ে দেবে, রামায়ণের রাম-রাবণ যুদ্ধ বাধিয়ে দেবে, কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ বাধিয়ে দেবে । হাংরি আন্দোলনে গ্রেপ্তার হবার পর মামলা আরম্ভ হলে তার আনন্দ আর ধরে না, সে-ই একটি কবিতার মাধ্যমে রাষ্ট্রের সঙ্গে আমার যুদ্ধ বাধিয়ে দিতে পেরেছে । সেসময়ের সংবাদপত্রে আমার গ্রেপ্তার হওয়া আর মামলার সংবাদে যেন এখনকার টিভির মতন ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোরসহ পৌঁছোচ্ছিল তার কানে । ঠিকই, অন্ধকারে, আলোয়, বিছানায়, মেঝেতে, দাঁড়িয়ে, বসে, চাদরের তলায়, চাদরের ওপরে আমরা কতো খুদে-খুদে যুদ্ধ করেছিলুম, নখে আর দাঁতে ফালাফালা । তবে, মামলার পর আমি বুঝতে পারছিলুম যে আমার মধ্যে অপ্রতিরোধ্য রদবদল ঘটে চলেছে, অনেকে আর অনেক সম্পর্ক ঝরে পড়ছে আমার মগজ থেকে, পরিপার্শ্ব থেকে।
    ২০১১ সালে সৃজিৎ মুখোপাধ্যায় “বাইশে শ্রাবণ” ফিল্মে গৌতম ঘোষকে একজন পাগল হাংরিয়ালিস্ট কবি হিসাবে তুলে ধরলে, নিবারণ, যার লেখা কোথাও কেউ ছাপতে চায় না, রবীন্দ্রনাথ নামে পুলিশের এক খোচরকে, যে আবার লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদক, মোবাইলে বারবার কবিতা ছাপানোর অনুরোধ করে, সেই চারশোবিশ ফিল্ম দেখে সবচেয়ে আনন্দ পেয়েছিল শুভা । কেন ? হাংরি আন্দোলনের কবিকে সৃজিৎ বদনাম করে, তাকে দিয়ে বইমেলায় আগুন ধরিয়ে, ধ্বসিয়ে দিয়েছে, তাই । না, সৃজিৎ আমার বা অন্য কোনো হাংরি কবির অনুমোদন নেয়নি, সম্ভবত এসট্যাবলিশমেন্টকে খুশ করার জন্য হাংরি আন্দোলনের কবিকে অহেতুক ঢুকিয়েছে কাহিনিতে । কাহিনি লেখককে অত্যন্ত অসৎ বলা ছাড়া আর কীই বা করা যেতে পারে। ফিল্মটায় যাদের নাম উল্লেখ করেছিল পরমব্রত, তাতে শৈলেশ্বরের নাম ছিল না, ও নিজের টাকলা গুরুদেবকে ধরে সৃজিৎকে দিয়ে আন্দোলনকারী হিসেবে নামটা ঢুকিয়েছিল, অথচ আন্দোলনের বিরুদ্ধে মুচলেকা দিয়ে মামলায় রাজসাক্ষী হয়েছিল ।
    সৃজিৎ ফিলমটায় একজন লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদককে পুলিশের খোচর হিসেবে দেখিয়েছে, এই ঘটনাটা সত্যি । পবিত্র বল্লভ নামে কুঁজো এক যুবক “উপদ্রুত” নামে একটা লিটল ম্যাগাজিন বের করত, বাসুদেব দাশগুপ্তের সঙ্গে বসত কফিহাউসে, সে ছিল পুলিশের ইনফরমার, হাংরি আন্দোলনের বুলেটিন, বই ইত্যাদি গিয়ে জমা দিত লালবাজার প্রেস সেকশানে । বাসুদেব মাঝে-মাঝে বলত বটে যে মুখোশ পাঠানো ঠিক হয়নি, জুতোর বাক্স দেয়া উচিত হয়নি, স্টেনসিল-ড্রইং কফিহাউসে বিলোনো ঠিক দেখায় না, ইত্যাদি-ইত্যাদি, কিন্তু সেই কথাগুলো যে পবিত্র বল্লভের, তা জানতে পারি যখন পবিত্র বল্লভ পুলিশের পক্ষের সাক্ষী হয়ে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে বেমালুম বলে গেল যে সে আমাকে চেনে, কফিহাউসে আমার সঙ্গে আড্ডা দিয়েছে, তার কাছে আমি লেখা চেয়েছি, ইত্যাদি ।
    ১৯৯২ সালের ৭ই ডিসেম্বর, তখন আমি মুম্বাইতে, ওয়েস্টার্ন এক্সপ্রেস থেকে ডান ডিকে টার্ন নিয়ে মাহিমে ঢুকবো, দেখি দু দল মানুষ লাঠি, তরোয়াল, বর্শা, বন্দুক নিয়ে মারামারি করছে, পুলিশের দেখা নেই, মানুষ তরোয়ালের আঘাতে লুটিয়ে পড়ছে দেখে আর এগোলুম না, সোজা ব্যাক করে বাড়িতে । তার আগের দিন বাবরি মসজিদ ভাঙা হয়েছে বলে দুএক জায়গায় মারপিট হয়েছিল, কিন্তু এরকম খুনোখুনি আমি আগে দেখিনি । দাঙ্গা কাকে বলে তার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা হল । ভাগ্যিস গাড়িটা ছিল, তাই পালাতে সুবিধে হল, কেননা রাস্তায় বাস, অটো, ট্যাক্সি কিছুই দেখিনি ফেরার সময়ে, কেবল পলায়নকারীদের গাড়ি । কেন যে দাঙ্গা হয়, কেন একজন মানুষ ভিড়ের অংশ হতে রাজি হয়, অন্য সম্প্রদায়ের মানুষকে কাটতে বেরিয়ে পড়ে, জানি না ।
    ১৯৯৩ সালের ১২ই মার্চ, আমি ভিলে পার্লে বিল্ডিঙের অফিসের অ্যাডমিনিসট্রেটিভ ইনচার্জ । অধস্তন অফিসার কয়েকজন, “বাড়িতে কাজ আছে”, বলে ছুটি নিয়ে কেটে পড়ল । একটু পরে মহিলা অফিসাররা এসে বলল যে শহরে গোলমাল চলছে স্যার আমরা বাড়ি যেতে চাই, কী গোলমাল জানে না, বললুম ঠিক আছে, যাও । তারপর শিব সেনা করে এমন একজন এসে বলল যে, স্যার শহরে পর-পর বোমা ফাটছে, কিছু একটা গোলমাল শুরু হয়েছে, হয়তো ট্রেন-বাস সব বন্ধ হয়ে যেতে পারে । হেড অফিসে ফোন করে জানতে পারলুম যে, হ্যাঁ, পুলিশ থেকে জানিয়ে দিয়েছে নানা জায়গায় বোমা ফাটানো হয়েছে, অফিস ছুটি করে বন্ধ করে দিন । পরের দিন কাগজে পড়লুম যে সন্ত্রাসবাদীরা ষড়যন্ত্র করে বোমা ফাটিয়েছে, অনেক মানুষ মারা গেছে । তার কিছুদিন পরে জানলুম কাণ্ডটা দাউদ ইব্রাহিম নামে একজন মাফিয়ার চেলাদের, যারা ঘটনার আগেই দুবাই পালিয়েছে । ঘটনাটার কথা মনে পড়লে ভয়ার্ত মহিলাদের মুখগুলো মনে ভাসে, তাঁদের কয়েকজন বুড়ি হয়ে স্বাস্হ্যের অবনতির কারণে মারা গেছেন ।
    ১৯৯৪ সালে সাক্ষাৎকার নিতে এসে মধ্যবিত্ত বাড়ির যুবক আভাস মিত্র আমতা-আমতা মুখে জিগ্যেস করেছিল, “আপনি ব্রথেলে যেতেন”? মানে, সোনাগাছি উচ্চারণ করতেও ভয় । বলেছিলুম যেতুম, আমার পিসতুতো দাদার সঙ্গে, হাংরি আন্দোলনের কবি-লেখকদের সঙ্গে, বিদেশ থেকে কোনো হিপি এসে যেতে চাইলে তার সঙ্গে। তার পরের প্রশ্ন ছিল , “রেড লাইট এরিয়ায় কী করতেন “? “সেখানের অভিজ্ঞতা কেমন, কতো রকমের” ? ব্রথেল আর রেড লাইট শব্দে অবিনাশ কবিরাজ লেনের নোংরা লেগে নেই, বেচারা মধ্যবিত্ত বাঙালি যুবক । ভেবেছে ব্রথেলে, সঙ্গম শেষেই, সোনাগাছির মতন ধুতে দৌড়োয় না, ঝপ করে শেমিজ ফেলে বলে না “আসুন”, পা দিয়ে পোঁদের ওপর গোড়ালির চাপ দিয়ে-দিয়ে ইজ্যাকুলেশান দ্রুত করার চেষ্টা করে না । ব্রথেলে তো ফিক্সড রেট, সময়ও নির্ধারিত, সোনাগাছির মতন দরাদরি নেই, মদ খেয়ে অপরাধবোধ কমাবার অপরাধ নেই, ফুলের মালা বা তোড়া কিনে উপহার দেবার প্রয়োজন নেই, প্রতিদিনের বাঁধা “বাবু” নেই, ব্যাকগ্রাউণ্ড মিউজিক নেই । পারভার্টের পকেটে টাকা থাকলেই প্রেম ।
    আমাদের বাড়িতে, ইমলিতলায়, দরিয়াপুরে, উত্তরপাড়ায়, জোরে পাদা আর ঢেঁকুরতোলায় কোনো বিধিনিষেধ ছিল না, বড়ো-ছোটো নির্বিশেষে সকলেই জোরে পাদতো আর ঢেঁকুর তুলতো । আমি এখনও জোরে পাদি, চেপে যাই না । এই এখন লিখতে-লিখতে পাদলুম বলে ইপিফ্যানির গর্ব হলো । কলকাতায় যে সাহিত্যসভাগুলো হয়, তাতে কাউকে পাদতে শুনিনি, কেউ কেউ পোঁদ একপাশে উঁচু করে, কবিতার শ্বাস নিচ্ছে তা দেখেছি ।
    ৩০শে এপ্রিল ২০০৪ সাহিত্য অকাদেমির টেলিগ্রাম পেলুম যে ওরা আমাকে পুরস্কৃত করেছে ধর্মবীর ভারতীর “সুরজকা সাতওয়াঁ ঘোড়া” অনুবাদের জন্যে । পেয়েই মাথা গরম হয়ে গেল, নিজেকে শুনিয়ে বললুম, “কোন ইডিয়ট আমার নাম সুপারিশ করেছে, স্কাউণ্ড্রেলরা তো জানে আমি এইসব সাহিত্যিক তিকড়মবাজিতে নেই”। তার আগে আর পরেও, বহু মানুষকে, যাদের ইনটেলিজেন্ট বলে চালানো হয়েছে, তাদের মনে হয়েছে স্টুপিড । প্রত্যাখ্যান করে সঙ্গে-সঙ্গে একখানা চিঠি দিলুম সাহিত্য অকাদেমিকে জানিয়ে যে, As a matter of priciple I do not accept literary and cultural prizes, awards, lotteries, grants, donations, windfalls etc. They deprave sanity. প্রত্যাখ্যান করে, ইপিফ্যানির গর্ব হল । পুরস্কার যে প্রত্যাখ্যান করেছি তা শঙ্খ ঘোষ জানতেন না, প্রণবকুমার চট্টোপাধ্যায়কে বলেছিলেন, তাই বুঝি, আমি জানতাম না তো ! প্রণব আবার চটে গিয়ে একটা কপি পাঠিয়েছিল ওনাকে!
    ১৯৬৩ সালে পিসতুতো দাদা মানে সেন্টুদা বলেছিলেন, বেপাড়ায় যেতে হলে সব সময় দুপুরবেলা যাবি, তখন ভিড় থাকে না, কেউ সাজগোজও করে না, আসল চেহারা দেখে পছন্দ করতে পারবি, আর সবচেয়ে সুবিধে হল যে হাফ রেটে পেয়ে যাবি, তাড়াহুড়োর বালাই নেই । পিসেমশায়ও রেগুলার ছিলেন এই অঞ্চলে । ১৯৬৪ সালে আমি, সুভাষ, প্রদীপ, শৈলেশ্বর, বাসুদেব তাই দুপুরে ঢুঁ মেরেছি, আর আশ্চর্য, মীরা, দীপ্তি ওরা, এতজন খদ্দের শুনেও বলেছে, “ও হয়ে যাবে, চলে এসো এক এক করে” । সুভাষ বেরিয়ে এসে বলেছিল, “শালা দাঁড়াতেই চাইল না”। বাসুদেব, শৈলেশ্বর আর অবনী পরে রেগুলার ভিজিটর হয়ে গিয়েছিল, বিশেষ করে বেবির আর দীপ্তির ঘরে । দীপ্তি ছিল বেশ ফর্সা, বড়ো-বড়ো চোখ, কোঁকড়ানো কোমর ওব্দি চুল, একটু মোটা, কি করে যে এই পাড়ায় তাকে ঢোকানো হলো তা রহস্য । বাসুদেবের গল্পে আছে এই দীপ্তি, অবিকল ।
    ১৯৬৪ সালে পিসেমশায় যে উকিলকে হাংরি মামলার জন্যে বাছাই করেছিলেন, তার দপতর সোনাগাছির ঠিক উল্টো দিকে । উনি অঞ্চলের রেগুলার ভিজিটার ছিলেন বলে তাদের উকিলকে চিনতেন । পিসেমশায় বলেছিলেন, “এর মতন ফৌজাদরি উকিল সস্তায় পাবিনে।” উকিলের ঘরে বসে দেখতে পেতুম ফি শনিবার পার্বতীচরণ মুখোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে পুরো কৃত্তিবাস গ্যাঙ চলেছে ভেতরে । সেন্টুদা একবার বললেন, চল চল, ওরা যে বাড়িটায় ঢুকবে তার উল্টো দিকের বাড়ির বারান্দায় উঠে ওদের কারবার দেখতে পাবি । সত্যিই তাই । উল্টোদিকের বাড়ির দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখতে লাগলুম বুদ্ধদেব বসুর বদল্যার বইয়ের প্রভাব । অর্ধেক জীবন, সম্পূর্ণ জীবন, টুকরো জীবন ইত্যাদি স্মৃতিকথায় এনারা সবকিছু চেপে গেছেন।
    ১৯৭৬ সালে ট্যুরে যাচ্ছিলুম হাজারিবাগে, একটা গাড়ি ভাড়া করে, সঙ্গে আমার অধস্তন অফিসার। অফিসের এক পিওন, তার নাম “ডুবজলে যেটুকু প্রশ্বাস” আর “জলাঞ্জলি” উপন্যাসে দিয়েছি রসিক পাসওয়ান। আসলে পিওনটা ছিল রাজপুত, গোপাল সিং, কিন্তু এক পাসওয়ান মেয়েকে বিয়ে করার ফলে উঁচু জাতের পিওনরা ওর সঙ্গে মিশত না, রাজপুত-ভূমিহার অফিসাররাও ওর সঙ্গে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করত । ও বলল ওকে ওর গ্রামে ড্রপ করে দিতে, আমাদের যাবার পথেই পড়বে । এক জায়গায় গাড়ি থামাতে বলে ও বলল, জঙ্গলের ভেতরে ওর গ্রামে যেতে । চললুম ওর সঙ্গে, এতো ভেতরে তো গ্রাম দেখিনি তখনও । একটা ফাঁকা জায়গায় পৌঁছে দেখলুম কিশোর-কিশোরীদের বিয়ে হচ্ছে । গোপাল সিং তখন জানালো যে ও “মালে পার্টি” করে । তখন মাওবাদীদের উদ্ভব হয়নি, মার্কসিস্ট-লেনিনিস্টদের সংক্ষেপে বলা হতো মালে । বলব না যে শুনে কিছুটা অস্বস্তি হয়নি । দেখলুম যে জোড়ায়-জোড়ায় কিশোর-কিশোরী আর যুবক-যুবতীরা বসে আছে আর তাদের বিয়ে দিচ্ছে একজন বাঙালি যুবক, ময়লা ধুতি-পাঞ্জাবি, কাঁধে ব্যাগ, যে বইটা থেকে মন্ত্র পড়ছে সেটা “রেড বুক” । আমি নেপাল থেকে “রেড বুক” কিনে এনেছিলুম বলে দেখেই টের পেলুম । আদিবাসী যুবক-যুবতীর বিয়ে হচ্ছে ইংরেজি মন্ত্র পড়ে । বিয়ে দিয়েই যুবকটি উধাও হয়ে গেল । গোপাল সিং ওর নাম বলতে চাইল না । আমি “ডুবজলে যেটুকু প্রশ্বাস” আর “জলাঞ্জলি” উপন্যাসে এই যুবকটির নাম দিয়েছি অতনু চক্রবর্তী, অবশ্য অতনু চরিত্রে বহু পরিচিত বন্ধুসহ আমার নিজের জীবনের উপাদান আছে । গোপাল সিং ওই বিয়ের পর অফিসে ফেরেনি। আমিও অফিসে ফিরে চেপে গেলুম যে ওকে আমরা লিফ্ট দিয়েছি ।
    ১৯৬৫ সালে ডেভিড গারসিয়া নামে এক হিপি এসেছিল, গ্রিসে জুতোর দোকানে কাজ করে টাকা যা জমিয়েছিল তা নিয়েই এসেছিল, বলল, বাঙালি মেয়ের সঙ্গে প্রেম করতে চায় । দুদিনে কোথ্থেকে পাওয়া যাবে বাঙালি প্রেমিকা । অগত্যা সোনাগাছিতে ঢুঁ, কিন্তু দুপুরে নয়, ভিজিটিং আওয়ার সন্ধ্যায় । একটা কচি মেয়েকে পছন্দ হল ডেভিডের । মেয়েটার নাম মনে আছে, বেবি । বেবি বলল, ও বাবা, এতগুলো হাঘরেকে সামলাতে পারবো না, এই সায়েব আর কোনো একজন । সকলে প্রস্তাব দিল ফষ্টিনষ্টি করতে দিতে হবে। তাতে বেবি রাজি । ঘরে ঢুকে মাটিতে পাতা বিছানায় বেবি বসতেই বাসুদেব চকাচক চুমু খেয়ে নিল জড়িয়ে। বেবির অনুরোধে আনানো হল দু-বোতল বাঙলা । খেলুম সবাই মিলে, টনক গোলমেলে হয়ে উঠলে কে যে বেবির কোথায় হাত ঢোকাচ্ছিল তার ঠিক নেই। বিপদ দেখে বেবি বলল, তোমরা বেরোও, আমি সায়েবের সঙ্গে পিরিত করে নিই । ডেভিড বেরোলো পিরিত করে, বলল, সাচ এ টিনিউইনি কান্ট অ্যান্ড স্মল বুবস, ইট ওয়াজ ওয়ানডারফুল । বেবি বুকের ওপর আঁচল ফেলে দরোজার ফাঁক থেকে মুখ বের করে বলল, আরেকজন কে আসবে চলে এসো । ঘোষভাইদের মধ্যে একজন তড়াক করে ঢুকে গেল আর মিনিট পাঁচেকেই সেরে বেরিয়ে এলো । হাঘরেদের খরচটা আমি দিয়েছিলুম । পরে, বেবির ঘরে বাসুদেব-অবনী-শৈলেশ্বর প্রায়ই যেতো, বাসুদেবের চিঠিতে বেবির বাড়ি বদলের দুঃখও আছে ।
    ডেভিড গারসিয়াকে নিয়ে দুমকা গিয়েছিলুম, দুমকায় দাদার বাড়িতে পায়খানার সামনে যে কাঁঠালগাছ ছিল তাতে এঁচোড়ের গা্য়ে প্যান্ট-শার্ট ঝুলিয়ে পায়খানায় ঢুকতে হতো । ডেভিড বলল ওদের গ্রামে ফিরে গিয়ে ও এই ধরনের বন্দোবস্ত করবে যাতে গাছে হয়ে থাকা ফলের গায়ে পোশাক ঝোলানো যায় । ভাঙের শরবত খেয়ে আমাদের সঙ্গে দোল খেলে ডেভিড জানতে চাইল এটা কি রিলিজিয়াস ফেসটিভাল । ওকে জানালুম যে হ্যাঁ, এটা একজন পলিগ্যামিস্ট ব্ল্যাক গডের স্প্রিং সিজন সেলিব্রেট করার ফেস্টিভাল ।
    পালামৌয়ের সদর শহর ডালটনগঞ্জে দাদার বাড়িতে ছিলুম ১৯৬৭ সালে, হরিণের ঠ্যাং দিয়ে গেল একজন সাঁওতাল, বঁটি দিয়ে কেটে রান্না হলো আর মহুয়ার রুটিসহ মহুয়ার মদ দিয়ে খাওয়া হলো, আমি কলকাতা থেকে কেস জিতে পৌঁছে গিয়েছিলুম ডালটনগঞ্জে, তাই সেলিব্রেট করা হলো বিহারি স্টাইলে, যদিও এখন শহরটা ঝাড়খণ্ডে ।
    ডালটনগঞ্জে পৌঁছেছি শুনে স্হানীয় কবিরা একটা আড্ডার ব্যবস্হা করেছিল, যাকে ওদের ভাষায় বলে “গোষ্ঠী”, তাতে আমি আর দাদা মহুয়ার মদ খেয়ে বেশ ভালো বক্তৃতা দিয়েছিলুম ; ওখানেই একটা প্রেসে ছাপিয়েছিলুম অশ্লীলতা সম্পর্কে ম্যানিফেস্টো, “ইন ডিফেন্স অফ অবসিনিটি” পরে যেটা নানা ভাষায় অনুবাদ হয়েছে, শুনেছি গবেষক ড্যানিয়েলা লিমোনেলার কাছে। ড্যানিয়েলা ইতালীয় ভাষায় আমাদের আন্দোলন নিয়ে গবেষণা করছেন, তথ্য সংগ্রহ করতে কলকাতায় এসেছিলেন ২০১৪ সালে ।
    ১৯৬৯ সালে আমি আর সলিলা গিয়েছিলুম ডালটনগঞ্জে, দাদা তখন অন্য একটা বাড়িতে, পিসতুতো দাদা সেন্টুদাও ছিল; আমাদের আপ্যায়ণের জন্যে গেঁড়ি-গুগলি দিয়ে বিরিয়ানি বানিয়েছিল, তা রাত জেগে খাওয়া হলো মহুয়ার মদ দিয়ে ।
    ২০১৪ সালে বিবিসির পক্ষ থেকে ডোমিনিক বার্ন এসেছিলেন হাংরি আন্দোলন নিয়ে রেডিও প্রোগ্রাম করার জন্য । হাংরি আন্দোলন সম্পর্কে উনি এতই ওয়াকিবহাল ছিলেন যে প্রশ্ন করলেন বঙ্গসংস্কৃতি, রবীন্দ্রনাথ, উনিশ শতক নিয়ে । পরে, ফোটোতে ওনার ঘামে ভেজা শার্ট দেখে সলিলা বলল, “এসিটা চালিয়ে নাওনি কেন ?” আসলে প্রতিটি ব্যাপারে অভ্যাস থাকা জরুরি ।
    ১৯৭৯ থেকে গ্রামীণ উন্নয়নের ট্যুরে ইংরেজি-বাংলা-হিন্দিতে বক্তৃতা দিতে হতো। একটা গ্রামে বক্তৃতা দিচ্ছিলুম, একজন চাষি বলে উঠল, “ এই চিন্তাটা আগে আসেনি কেন মাথায়, তাহলে গ্রামের কাজ এগিয়ে যেতো, পড়ে থাকতো না বছরের পর বছর।” বলে ফেললুম, “আপেল কেন গেছ থেকে পড়ে, তা তো আমরা আগে জানতুম না, নিউটন নামে একজন সায়ের বলার পরে জানতে পারলুম।” চাষি বলল, আপেল কেন, আম, কাঁঠাল, নারকেল পেকে গেলে সবই আপনা থেকে পড়ে যায়, ভগবান সেরকমই নিয়ম করেছেন।” টের পেলুম যে নিউটন সর্বত্র চলে না, অভিকর্ষও সকলকে বোঝানো যায় না । বললুম,”ঠিকই বলেছো, যতক্ষণ না কোনো চিন্তায় পাক ধরছে ততোক্ষণ কেউই তার বিষয়ে জানতে পারে না ।”
    ১৯৬৫ সালে, সুবিমল বসাকের মাসির বাড়ি গিয়েছিলুম মুর্শিদাবাদের এক গ্রামে । রাতে মশারি টাঙিয়ে শুয়েছিলুম, সকালে দেখি মশারির চালে একটা সাপ, মশারি বেশ ঝুলে এসেছে, আমাদের নড়াচড়া আর চেঁচামেচিতে সাপটা ফণা তুললো, মশারির ভেতরে হাংরি বুলেটিন ছিল কাগজে মোড়া, সেইটে দিয়ে সাপটাকে মশারি থেকে বাইরে ছিটকে ফেললুম । আমাদের চেঁচামেচি শুনে সুবিমলের মাসি আর অন্য আত্মীয়রা জড়ো হয়েছিলেন এসে, তাঁরা সাপটার পিছু নিলেন, সেটা ঢুকে গেল এক গর্তে । বেরোলুম মশারির বাইরে । এক বৃদ্ধা চিনির কৌটো নিয়ে এলেন আর কাঠপিঁপড়ে-ভরা গাছের কাছ থেকে সাপটা যে গাছের গোড়ায় ঢুকেছে সেখান পর্যন্ত লাইন করে চিনি ছড়িয়ে দিলেন, সাপের কোটরেও ছুঁড়লেন । দুপুরে ডেকে দেখালেন আধখাওয়া সাপ আর পিঁপড়ের ঝাঁক গাছের বাইরে, পিঁপড়েরা মাংসকণা নিয়ে নিজেদের বাড়ি নিয়ে যেতে অতিব্যস্ত । প্রেমিক-প্রেমিকার মতনই সাপ আর কাঠপিঁপড়েরা পরস্পরের নৈঃশব্দে আকৃষ্ট হয়।
    ১৯৭৯ সালে আমার লিঙ্গ দিয়ে পেচ্ছাপের বদলে রক্ত বেরিয়েছিল, রক্তচাপের দরুন, টাকার পাহাড়ের মাঝে দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে রক্তচাপ বেড়ে গিয়েছিল, ডাক্তার বললে ট্র্যাকিকার্ডিয়া, ছাতাপড়া-হিলহিলে-তেলচিটে নোটের পাহাড়, যা জ্বালিয়ে নষ্ট করতে হতো । তারপর দুমাস ছুটি নিয়ে দুবেলা ঘুমের ওষুধ খেতুম । “ডুবজলে যেটুকু প্রশ্বাস” উপন্যাসে আমি টাকার পাহাড় জ্বালানোর মারপ্যাঁচ ব্যবহার করেছি ।
    ১৯৯৩ সালে আমি একশো কোটি, দুশো কোটি, পাঁচশো কোটি টাকার চেক সই করতুম, কল মানি মার্কেটে অফিসের হয়ে বাড়তি টাকা খাটাবার জন্যে । অতো টাকার চেকে সই করে-করে মনে হতো রাজার কুর্সিতে বসে আছি । কোটি-কোটি টাকা নষ্ট করেছি এককালে, ১৯৯৩ সালে কোটি-কোটি টাকা খাটিয়ে আয় বাড়ালুম । পরির দেশের কোষাধ্যাক্ষের মতন দিনের পর দিন কোটি-কোটি টাকার চেক সই করতুম ।
    ২০১০ সালে আমার বাঁ পা ফুলে গেল একদিন । ডাক্তারের কাছে দৌড়োলুম, ডাক্তার দেখে বলল, এই রোগ তো পুলিশ কন্সটেবল, ইশকুল-কলেজের টিচার আর ডাকপিওনদের হয়, আপনার হল কেমন করে । বললেন উরু থেকে পায়ের পাতা পর্যন্ত মোজা পাওয়া যায়, একজোড়া কিনে আজ থেকেই পরে থাকুন, কেবল শোবার সময়ে খুলে রাখবেন । ভেরিকোজ ভেইনস আক্রমণ করেছে পায়ে । সেই থেকে ভেরিকোজ ভেইনসের মোজা পরে থাকি, উরু থেকে পায়ের পাতা পর্যন্ত । স্বপ্নে অনেকের পোঁদে লাথি মারি, তাই হয়তো।
    ১৯৯৯ সালে প্রথম অজ্ঞান হয়ে পড়ে গিয়েছিলুম বাঁশদ্রোণী বাজারে । পাবলিক আমাকে শাক-সবজির ওপর শুইয়ে মাছের জলের ঝাপটা দিতে জ্ঞান ফিরল । অনেকে হাসপাতালে নিয়ে যাবার জন্যে টানাটানি করছিল বলে সলিলা কেঁদে ফেলে থামালো । তার পরেও অজ্ঞান হয়েছি প্রায় সাত বার । মাথার এম আর আই করিয়েছি । নিউরোলজিস্ট বললে, মেডিটেশান করো । বাড়িতে বসে মেডিটেশান করায় একাগ্র হতে পারি না । মন উড়তে থাকে, নানা ভাবনায়, নানা মুখশ্রিতে, নানা সংবাদে, অতীতের ঘটনায় । মেডিটেশান ছেড়ে দিতে হল । ছোটো গল্প-লেখিকা ঝুমা চট্টোপাধ্যায় বলল, “সখা হে, সবসময় মাথাকে জাগিয়ে রাখলে অমন রোগ তো হবেই ।”
    প্রকৃত মেডিটাশান করতুম ১৯৯৭ সালে, অবসর নেবার আগে, গ্যাংটকের রুম থেগ গোম্পায় বসে, মোনাসটেরিটার নামই ধর্মচক্র কেন্দ্র । সিকিম স্টেট কোঅপারেটিভ ব্যাংকের রিস্ট্রাকচারিং পরিকল্পনা তৈরি করার জন্য পাঠিয়েছিল কলকাতা অফিস ; নিজে ফাঁকি দিয়ে যাতে সিকিম দেখার সুযোগ হয় তাই সঙ্গে এই বিষয়ে বিশেষজ্ঞ মুরলিধরণকে নিয়ে গিসলুম । মুরলিধরণ ভোর থেকে রাত পর্যন্ত কাজে লেগে থাকতো আর আমি ঘুরে বেড়াতুম । গ্যাংটকে রুমথেগ গোম্পায় গিয়ে একদিন চোখ বুজে কিশোর লামাদের ড্রামের ওপর কাঠি ঘষার রেশের মাঝে বসে থেকে মেডিটেশানের আবহ গড়ে উঠেছিল । দেয়ালে-দেয়ালে থাংপা, সামনে সোনালি বিশাল বুদ্ধ, কয়েকটা প্রদীপের আলো । পনেরো দিন গিয়েছি ওই গোম্পায়, আর রক্তচাপ কমে গেছে । মুম্বাইতে বাড়িতে বসে, হাইওয়ের অবিরাম আওয়াজ, আবাসনের লোকেদের চেঁচামেছি, পাশের মন্দিরের জগঝম্প, মেডিটেশানের উপযুক্ত নয়, তা ঝুমা চট্টোপাধ্যায় যতই যাই বলুন ।
    ১৯৫১ সালে মেজদা রাতের বেলায় লুকিয়ে একজন বেশ্যাকে নিজের ঘরে এনেছিল, তাকে দরোজা খুলে বিদেয় করার সময়ে খিল মাটিতে পড়ে যাবার আওয়াজে বাড়ির সবাই জেগে গিয়েছিল। আমাকে মজা লুটতে ডাকেনি বলে মেজদার ওপর রাগ হয়ে গিয়েছিল । আমাকে বলে রাখলে খিলটা চুপচাপ আগেই খুলে রেখে দিতুম । মেজদার কান ধরে বড়োজ্যাঠা দেম্মার দেম্মার দিয়ে বাড়ির বাইরে বের করে দিলেন । মেজদার কোনো প্রতিক্রিয়া হল না, দিব্বি বেরিয়ে গেল, যেন কিছুই হয়নি । মেজদা অনেক কম বয়সে মারা গিয়েছিল, জেঠিমার বশীকরণের বিভূতি ঘুগনির সঙ্গে খেয়ে ।
    ১৯৯৮ সালে, মুম্বাইতে আমার অফিস পুনম চেম্বার্সের ছাদ সাততলা থেকে একের পর এক যখন ভেঙে-ভেঙে সশব্দে নিচে নেমে আসছিল তখন আমার হাত ধরে কেবিন থেকে বের করে নিয়ে গিয়েছিলেন একজন তরুণী, যিনি প্রথম পরিচয়ে আমাকে বলেছিলেন যে ওনার জরায়ু নেই । ১৯৯৭ সালে অবসর নেবার পর আমি আরেক অফিসারের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলুম অথচ তাকে বাঁচাবার চেষ্টা করেনি মীরা। বাড়িটা পড়ার ফলে উনিশজন মারা গিয়েছিল। ইনিই একমাত্র মহিলা যাঁর সঙ্গে অশ্লীল গল্প করেছি, ব্যাপারটা অবশ্য তিনিই আরম্ভ করেছিলেন, “আজকে কলা কিনিনি, বেগুন কিনেছি, কোকোনাট অয়েল কিনেছি”, আমাকে হতবাক করে । নারীর সঙ্গে অশ্লীল কথাবার্তা ! ওর সঙ্গে কথা বলার সময়ে মনে হতো এই ধনী-তনয়াকে আবু সয়ীদ আইয়ুবের সঙ্গে ভিড়িয়ে দিতে পারলে ভালো হতো ।
    উনিশ শতক আর বিশ শতকের প্রথম দিকের গল্প-উপন্যাস পড়ার আগে আমি কবি-লেখকদের ছবির সঙ্গে পরিচিত হয়েছি, ১৯৪৯ সালে, মামার বাড়ি পাণিহাটির বৈঠকখানা-লাইব্রেরিতে, দেয়ালজুড়ে ছবি টাঙানো । কারোর দাড়ি, কারোর গোল চশমা, কারোর চোগা-চাপকান । কিছুদিন আগে ছোটোমামাকে ফোন করে ওই ছবিগুলোর কথা জিগ্যেস করতে বললেন, ওই পোরশানটা বেচে দিয়েছি, বড়ো বাড়ি আর জমি রাখার অনেক বিপদ এখন পশ্চিমবাংলায়, তোর ছোটোবেলার পাণিহাটি আর নেই, সেও মোচ্ছবতলাও আর নেই, কোঅপারেটিভ ব্যাংক থেকে তোর দাদামশায়ের ফোটোও ফেলে দিয়েছে এখনকার কর্তারা । ওই ব্যাংকটা আমার দাদামশায় আর তাঁর কয়েকজন বন্ধু নিজেদের বাড়ির গয়নাগাটি বেচে শুরু করেছিলেন ।
    ১৯৭৩ সালে কোচিতে ট্যুরে গিয়ে সিনেমা হলে ট্রিপল এক্স পর্ণোগ্রাফিক ফিল্ম দেখেছিলুম, অভিনেত্রীরা বিদেশি-বিদেশিনী নয়, সবাই কেরালার। অখদ্দে স্যাঁতসেতে হল। সহকারী বিভাগের সচিবের আত্মীয়ের । দর্শক শুধু আমি আর আমার অধস্তন অফিসার । এতোদিন পরে সেই ফিল্মটার রগরগে দৃশ্যগুলো যখন চোখ বুজে ভাবি, তখন একথাও মনে হয় যে ওই ধরণের ফিল্মগুলোকে কেন ম্যাজিক রিয়্যালিস্ট ফিকশান বলা হবে না । শুধু দুজন দর্শকের জন্যে একটা সিনেমা হল অমন ব্যবস্হা করেছিল, ভেবে অধস্তন অফিসারের কলার উঁচু হয়েছিল ।
    ১৯৯১ সালে জম্মু-শ্রীনগরে ট্যুরে গিয়ে বাস স্ট্যান্ডে একটা বাসে বসেছিলুম, আমি আর আমার সহযোগী অফিসারসহ স্হানীয় পাবলিক । বাসটা স্টার্ট নিয়েছে, বিস্ফোরণ, আগুন, ধোঁয়া । ভাগ্যিস বাসের সামনে দিকে বসেছিলুম । যারা পেছনের সিটে বসেছিল, তাদের দুজন ঘায়েল । ওই ঘটনার পর কাশ্মিরীদের সম্পর্কে কেউ আলোচনা করলে মেজাজ খারাপ হয়ে যায় ।
    ৪ঠা ডিসেম্বর ১৯৬৮ বিয়ের পর ১৯৬৯ সালের জানুয়ারিতে হনিমুন করার পরিকল্পনা করলুম শিমলা যাবার, শুনে সহকর্মী সুশীল বলল ওর গ্রাম চণ্ডীগড়ের কাছে রোপড় হয়ে যেতে, রোপড় যাবার পর ও আর ওর বউ-বাচ্চা আমাদের সঙ্গ নিল । রোপড়ে মাঠে হাগতে হতো ; আমার তো এনসিসির সময়ে মাঠে প্রতিদিন হাগার অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল । সলিলার ছিল না, কিন্তু নতুন অ্যাডভেঞ্চার মনে করে মাঠে গিয়ে ভোর রাতে হেগে নিয়েছিল যে কয়দিন ছিলুম । নতুন বউ মাঠে হাগতে যাচ্ছে, গ্রামীণ উন্নয়ন বিশেষজ্ঞের বউ বলে কথা।
    শিমলায় গিয়ে বাস থেকে নামতেই হাঁটু পর্যন্ত ঢুকে গেল তুষারে । বাসের ছাদে রাখা ছিল বেডিং আর স্যুটকেস, তার ওপর তিন ইঞ্চের তুষার । পিছল পথে গিয়ে উঠলুম হোটেলে, সেই হোটেলের ওপর তলায় আমাদের হনিমুন স্যুট, সেখান থেকে বেরোলেই রাস্তা । দুজনে মিলে দুটো ওল্ড মঙ্ক খেয়েও শীত গেল না, তখন জড়াজড়ি করে অবিরাম সঙ্গম করলুম সারা রাত । সুশীল আর ওর বউ একটা ঘরে ছিল, বেয়ারা বলল রাতভর ওরা ঝগড়া করেছে । শিমলা থেকে ফেরার পর সুশীলের বউ একজন পাঞ্জাবির সঙ্গে পালিয়ে গেল । লোকেদের বউ পালিয়ে যায় কেন ? মনে হয় দুর্বল যৌনতা তার মুখ্য কারণ । “কৌরব” পত্রিকার কমল চক্রবর্তীর বউও কারোর সঙ্গে পালিয়ে যাবার ফলে পত্রিকাটাই রোশনাই হারিয়ে ফেলল । কমল ওর পুরো যৌনতা লাগিয়ে দিয়েছিল পত্রিকায়, বউয়ের দিকে খেয়াল দেয়নি । তবে বউ পালিয়ে গেলেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দেয়া সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছে, বউয়ের বদলে পুরস্কার পেলুম টাক ডুমাডুম ডুম । এককালে কৌরবে লিখতুম । আর ডাক পাই না ।
    শিমলা থেকে ফেরার পথে চণ্ডীগড়ে বাসস্ট্যাণ্ডে এসে একদল পাঞ্জাবি আর হিন্দি কবিলেখকরা ঘিরে ধরল কয়েকদিন থেকে যাবার জন্যে, ওরা আমার জন্যে সাহিত্যসভা করবে, ওরা যাকে বলে “গোষ্ঠী”, মদ-মুর্গি খাবার লোভে থেকে যেতে রাজি হলুম । এদিকে লেখালিখি তখন আমাকে ছেড়ে উধাও হয়ে গেছে, সঙ্গে কবিতাও নেই । হিন্দি আর পাঞ্জাবি পত্রপত্রিকায় ছবিসহ আমার সম্পর্কে খবর পড়ে ওদের উৎসাহ । নিজেরাই যোগাড় করে ফেলেছে আমার কবিতার হিন্দি অনুবাদ । গোষ্ঠীতে একজন যুবতী কবি মাতাল হয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরলেন, চুমু খাবার উপক্রম করেছিলেন । স্ত্রী সলিলা বেজায় খাপ্পা, যুবতীকে বলল, “সাহিত্যসভা করছেন না অন্যকিছু !” সলিলার পজেসিভনেস দেখে আহ্লাদে আটখানা হলুম ।
    ১৯৭৫ সালে আমার ছেলেকে কোলে নিয়ে পিসিমার ছেলে ধনু, বাবার দোকানের টেবিলের ওপর রাখছে মনে করে ছেড়ে দিতেই ছেলে শান দেয়া মেঝেয় পড়ে মাথা ফাটালো । দৌড়োলুম পাটনা হাসপাতালের রাজেন্দ্র সার্জিকাল ব্লকে, সেখানে কারোর পাত্তা নেই, না ডাক্তার, না নার্স, সলিলা একজনকে দেখতে পেয়ে তাকে বলতে, সে বলল যে কাটা-ফাটা সে-ই সেলাই করে । তার বেঁকা ছুঁচে সেলাই করা দেখে অজ্ঞান হয়ে গেলুম, সলিলা আর ধনু আমায় বাইরে নিয়ে গিয়ে বসালো । কপালে স্টিচিং হয়ে যাবার পর যে সেলাই করেছিল সে টাকা চাইতে এলো । ধনু তাকে বলল, আরে এটা তো সরকারি হাসপাতাল, টাকা চাইছ ? সে বলল, হুজুর আমি এখানকার ডোম, যদিও সব সেলাই আমিই করি, ওষুধও আমিই দিই, ডাক্তারবাবুর সময় কোথায়, নার্সও হেলতে দুলতে আসে সেই এগারোটা নাগাদ, তিনটেয় বাড়ি চলে যায় । ভাগ্যিস একজন ডোম হাসপাতালে ছিল ।
    ১৯৮০, আমার ছেলে চার বছরের, হঠাৎ বাগানে, লখনউতে বাড়ির সামনের বাগানে, আমার লুঙ্গি ধরে ঝুলে পড়ল । খুলে পড়ে গেল লুঙ্গি ঘাসের ওপর, চারিদিকের বাংলো থেকে দর্শকদের হাসাহাসি । লুঙ্গি পরা ছেড়ে দিয়ে পায়জামা ধরলুম । আবার একদিন পায়জামা ধরে ঝুলে পড়ল আর দড়ি ছিঁড়ে পায়জামা নেমে গেল ঘাসে । আমি ছেলের সঙ্গে সামনের বাগানে ছুটির দিন এলে চারিদিকের বাংলোর জানলায় মহিলারা যেন ওৎ পেতে থাকতেন ।
    ১৯৬৭ সালে হিন্দি আর মৈথিলি ভাষার কবি রাজকমল চৌধারী, ভর্তি ছিল পাটনার রাজেন্দ্র সার্জিকাল ব্লকে, অত্যধিক মদ আর মাদকের দরুণ শরীর ঝাঁঝরা হয়ে গিয়েছিল । ওকে একটা আলাদা ঘরের ব্যবস্হা করে দিয়েছিল সরকার । হাসপাতালে বিছানায় শুয়ে রাজকমল বলেছিল, “ডাক্তার বলেছে অপারেশান করা যাবে না, অপারেশান করলে পুরো হাসপাতালে গাঁজা আর চরসের ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়বে।” মদ আর মাদকের লাইনে আমিই ওকে নিয়ে গিয়েছিলুম বলে প্রায়শ্চিত্ত হিসেবে প্রায়ই সন্ধ্যায় ওর সঙ্গে দেখা করতে যেতুম । একদিন ও বলল ওকে এক প্যাকেট কনডোম এনে দিতে। কনডোম কী করবে, শরীরের এই অবস্হায় ? বলল ওই তো নার্সকে জিগ্যেস করো, ও রাজি আছে । নার্স মাথা নেড়ে সায় দিল । পরের দিন কনডোমের প্যাকেট নিয়ে গিয়ে দেখি বিছানা খালি, নতুন চাদর আর বালিশের খোল, ওষুধ কিছুই নেই, ঘর ফাঁকা । সেই নার্সকে খুঁজে তাকে জিগ্যেস করতে সে বলল, আজ সকালেই উনি মারা গিয়েছেন, ওনার প্রথম পক্ষের স্ত্রী এসে শব নিয়ে গেছেন । কনডোমের প্যাকেটটা পাশেই গঙ্গায় ফেলে দিলুম ।
    ১৯৫৯ সালে আহিরিটোলায় পিসেমশায়ের বাড়ি গিয়েছিলুম বিজয়ার সময়ে। অন্ধকার রান্নাঘরে কাজ করে-করে পিসিমা প্রায় অন্ধ হয়ে গিয়েছিলেন । অন্ধ হয়ে গেলেও প্রতিটি রান্নায় স্বাদের তারতম্য হতো না । আহিরিটোলার বাড়ি ছেড়ে দিয়ে যখন কোতরঙে ঠাকুমার দেয়া জমিতে বাড়ি করলেন তখন তো একেবারেই দেখতে পান না চোখে অথচ রান্না সেই একই স্তরে । বললেন একজন লোকের পায়ে ছয়টা আঙুল আর হাতে ছয়টা আঙুল দেখে ফেলেছিলেন বলে অন্ধ হয়ে গেছেন । ওনার রাঁধা পাঁঠার মাংস ভোলা যায় না। পিসেমশায় আহিরিটোলার বাড়ির ছাদ থেকে লাফিয়ে আত্মহত্যা করেছিলেন ।
    ১৯৮৫ থেকে যখন আবার লেখা আরম্ভ করলুম ঢাকা থেকে মীজানুর রহমান বললেন ওনার পত্রিকার জন্যে হাংরি আন্দোলন নিয়ে ধারাবাহিক লিখতে । লেখা আরম্ভ করলুম “হাংরি কিংবদন্তি” । প্রতিবছর আসতেন আমার নাকতলার ফ্ল্যাটে, সিঁড়ি দিয়ে উঠতে কষ্ট হলেও । মীজানুর যাতে লেখাটা আর না ছাপেন তাই শামসুর রাহমানের মাধ্যমে সুনীল, শক্তি, তারাপদ অনুরোধ করলেন মীজানুরকে । উনি ওনাদের বললেন, ঠিক আছে, আপনাদের কার্টুন আর ছাপবো না, তবে লেখাটা চলবে । শামসুর রাহমান ওনাকে বললেন, “প্লিজ, ঢাকা থেকে “হাংরি কিংবদন্তি” গ্রন্হাকারে প্রকাশ করবেন না । মীজানুর “হাংরি কিংবদন্তি” গ্রন্হাকারে প্রকাশ করলেন না কিন্তু আমার উপন্যাস “নামগন্ধ” প্রকাশ করলেন ঢাকা থেকে । আমাকে নিয়ে সাংস্কৃতিক রাজনীতি কেবল পশ্চিমবাংলাতেই হয় না, তা বাংলাদেশ পর্যন্ত ছড়িয়ে গেছে । মীজানুর রহমান মারা গেছেন দশ বছর হল ।
    ঢাকা থেকে আরেকজন নিয়মিত আসতেন, তিনি বাংলাদেশের বিদ্যাসাগর সোসায়টির প্রধান । প্রতিবার এসে বলতেন যে তাঁকে হুমকি দেয়া হচ্ছে বন্ধ করে দেবার জন্য, বলা হচ্ছে যে বাংলাদেশে বিদ্যাসাগরের প্রয়োজন নেই । জানি না ওনার কী হল । আমি কলকাতা ছাড়ার পাঁচ-ছয় বছর আগেই ওনার আসা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল ।
    আরে না মশাই, গর্বের কি আর শেষ আছে, মনে করো মনে করো মনে করো মনে করো, নাঃ, এক্ষুণি আর মনে আসছে না কিছু, তবে এটা টের পেয়েছি, যুবতীদের সঙ্গে যেচে আলাপ করা বিপর্যয়কর, ভাববে লাইন মারছে, যেমন ঘুর্ণিঝড়ের চোখ ট্যারা হয়, ট্যারা যুবতীর দিকে তাকালে তার ঝড় যে কোথায় গিয়ে আছড়াবে বলা কঠিন, প্রেম পুরুষ মানুষকে দুর্বল করে দ্যায়, আর বাই দি ওয়ে, আমার ইচ্ছে করে অনেকগুলো জীবন নিয়ে একই সঙ্গে বাঁচি, মহাভারতের অর্জুন, সক্রেটিস, গৌতম বুদ্ধ, জুলিয়াস সিজার, লালন সাঁই, যাদের-যাদের ঈর্ষা করি। জিভের ওপর উক্তির স্বাদ আলাদা-আলাদা হয় । আমি একই সঙ্গে দেবতা আর দানবের মিশেল দিয়ে গড়া ।
    খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে পাশের পর্যটককে ঠেলে ফেলে দেবার ইচ্ছে হয়নি কি ? হয়েছে । ঠেলে ফেলে দিইনি, কেননা জীবনের কেচ্ছা তো ভেতরে, বাইরে বেরিয়ে পড়লে, জানা হয়ে যেত অমুকের বোন ভিকটোরিয়াজ সিক্রেট কোম্পানির আন্ডারগারমেন্ট পরে, তার সঙ্গে আমার হয়তো “রিলেশানশিপ” ছিল ।
    ২০০৪ সালের পর থেকে আমি এক ভ্যাবাচাকা মানসিকতায় ভোগা আরম্ভ করেছি ; নিজের ভেতর থেকে লাফিয়ে বেরোবার বিপজ্জনক আনন্দ ? যেন মানব-বোমা হবার জন্য তৈরি হয়ে আছি, উদ্দেশ্যহীন, কী বলব একে? রাস্তার ধারে ইঁটের ওপর বসে তেলমালিশ করাবার মতন নিঃসঙ্গতা এটা নয় । বা, হয়তো, বর্তমানে আমি সেই স্হিতিতে বসবাস করছি, যে পরিসরে একাকীত্ব ও নিঃসঙ্গতা মিলেমিশে গেছে । আমি অস্তিত্ববাদী নই যে আমার এই একাকীত্ববোধকে ‘হিউমান কাণ্ডিশন’ হিসাবে মেনে নেবো ; হিন্দু পরিবারে জন্মে একাকীত্ববোধের খ্রিস্টধর্মী ‘হিউমান কন্ডিশন’ সম্ভব বলে মনে হয় না । কিয়ের্কেগার্দ, জাঁ পল সার্ত্রে, আলবেয়ার কামু, মরিস মার্লো পন্টি, কার্ল জাসপার্স প্রমুখের ভাবনাচিন্তার সঙ্গে খাপ খায় না আমার ভাবনাচিন্তা । ১৯৯৭ সালে যে আরথ্রাইটিস হয়েছিল তার রেশ থেকে গেছে গাঁটে-গাঁটে, সবচেয়ে বেশি বুড়ো আঙুলে, যে কারণে কলম ধরে লিখতে পারি না । সইসাবুদের যাবতীয় কাজ আমার বুড়ি স্ত্রীকে করতে হয়, যে আমার চেয়ে মাত্র দু’বছরের ছোটো ।
    এখানে বলে নিই, আমি একজন ইন্সটিঙ্কটিভ হিন্দু, কেননা দুর্গাপুজো দোল কালিপুজোর সময়ে আমার প্রবৃত্তিগতভাবে ভালো লাগে, অথচ আমি ঈশ্বরে বিশ্বাস করি না, মনুস্মৃতিতে বিশ্বাস করি না, ঋগ্বেদের দেবী-দেবতায় বিশ্বাস করি না, কেননা ওটা আমার ভেতরে কাজ করে না, ওটা আপনা থেকে গড়ে-ওঠা ব্লকেজ, কমিউনিস্টদের মতন আমি ভেবেচিন্তে বা বই পড়ে দেয়াল তুলিনি, বলেছি তো আমি বুদ্ধিজীবি নই । কলকাতায় অনেককে দেখেছি, “আপনি কি হিন্দু” জিগ্যেস করলে ভ্যাবাচাকা খেয়ে যায়, উত্তর দিতে পারে না, কেউ-কেউ বোবা সাজে, কেউ-কেউ ভেবেচিন্তে মরে যাবার পর দেহের গতি নিয়ে কথা বলে । মরে যাবার পর ? ডেড বডিও তাহলে চিন্তাভাবনা করে ! বুঝতে পারি যে তারা নিজের সম্পর্কে খতিয়ে দেখে না, নিজেকে যাচাই করে না, কেবল অন্যে কী করছে আর বলছে তা-ই নিয়ে কিচাইন ।
    অস্তিত্ববাদকে মনে হয় হিলিয়ামভরা ফানুস, যা সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় কথায়-কথায় ওড়াতেন ১৯৬১ সালে । অবশ্য, আধুনিকতার প্রভাবে, পাশ্চাত্য ভাবধারার পাঁক যে চুয়ে-চুয়ে ব্যক্তিএককের অজান্তেই তার যাপনে সেঁদিয়ে যাবে না, তা আর জোর দিয়ে বলা চলে না । ভেবে দেখেছি যে আমার এই একাকীত্ব ব্যাপারটা কবিত্বের, দর্শনের, স্বপ্নদ্রষ্টার, সন্ন্যাসীর মানসিকতা নয় । আমি তো প্রচলিত অর্থে কবি বা দার্শনিক বা স্বপ্নদ্রষ্টা বা সন্ন্যাসী নই । আমি নিজেকে ভালোবাসি, আমার অনুভূতির মাত্রা আমায় অন্যদের থেকে আলাদা করে রাখে, সন্ত্রস্ত থাকতে পছন্দ করি, যেন সব সময়ে কোটি-কোটি টাকার পচা পাহাড়ের মাঝে দাঁড়িয়ে আছি ; আমার ভেতরের লোকটার সঙ্গে বাইরের লোকটার অবিরাম বোঝাপড়া চলতে থাকে ।
    অশেষ ভাগ্য যে হিন্দু পরিবারে জন্ম, একেশ্বরবাদের দৌরাত্ম্য থেকে মুক্তি; কিন্তু বাংলা অভিধান চিরকাল শ্বেতাঙ্গদের ধাতুরস বয়ে বেড়াবে, তাতে আবছা উঁকি মারবে রূপহীন একেশ্বর, আর মাঝেমধ্যে পুরুষেরা, ব্যাঙের ঢঙে, এক মাদি-ব্যাঙ-দর্শন থেকে আরেক মাদি-ব্যাঙ-দর্শনের পিঠে চেপে পাশ্চাত্য ভাবনাচিন্তার সঙ্গমঋতু কাটিয়েও তাদের প্রশ্নেরা উত্তরহীন থেকে যাবে । অশেষ ভাগ্য যে শেষ পর্যন্ত গ্রন্হদের ঘৃণা করতে শিখে যাবো, তাদের জড়ো করে ঘরের ভেতরে দেয়াল তোলার আগ্রহ কখনই উইপোকা আর শ্বেতাঙ্গ লেখকদের পর্যায়ে নামবে না।
    মৃত্যু সম্পর্কে, এই বয়সে যে ভীতি অনেকের হয়, তা দেখা দেয়নি এখনও । শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের সত্যিই ভীতি হয়েছিল, নাকি কবিতা লেখার জন্য মৃত্যুকে বিষয় করেছিলেন, মৃত্যু বিষয়ক কবিতা লিখেও তারপর চনমনে থাকতেন, মদ খাওয়াবার জন্যে আবদার করতেন । আমার তো যেন মনে হয় নিঃসঙ্গতার সঙ্গে মিশে-যাওয়া আমার বর্তমান একাকীত্বটা সহজাত, অন্তর্মুখ, স্বকীয় আত্মজ্ঞানের স্বনির্মিত ডামাডোল কারাগার, উন্মাদ প্রেমে আটক ব্যক্তিএককের মতন ; আমি যেন পুনরুদ্ধারের অযোগ্য এমন কোনো আত্মপরিসরে নিরুদ্দেশ হয়ে রয়েছি, আমাকে কেউ আর খুঁজে পাবে না । আমি নিজের বানানো স্বপ্রেমের বেদনাময় জেলখানা থেকে বেরোবার চেষ্টা করি, কয়েক দিনের জন্যে বেরোই, আবার নিঃসঙ্গতাময় একাকীত্ব কাবু করে ফ্যালে আমাকে । ইনটারনেটের অধিবাস্তব জগতে তৈরি মানব-সম্পর্কের মাধ্যমে দূর করার চেষ্টা করি নিঃসঙ্গতার একাকীত্ব ; অথচ পাঁচ হাজার বন্ধুর কেউ তো বাস্তব নয়, রক্তমাংসের নয় । তাছাড়া রক্তমাংসের মানুষ তো রয়েছে আশে-পাশে, কই কোনো রদবদল তো ঘটছে না আমার সন্ত্রস্ত আত্মবোধে ।
    নিঃসঙ্গতার সঙ্গে একাকীত্বের পার্থক্য হল যে নিঃসঙ্গতার স্হিতি স্বীকার করে নেয় যে ব্যক্তিএককের পাশে প্রচুর লোকজন রয়েছে, কয়েকজন স্বজনও রয়েছে । অর্থাৎ সেই স্হিতিটা সাময়িক, তাকে বদলে ফেলা যায়, অন্যান্য লোকজনের সঙ্গে অর্থবহ যোগাযোগের মাধ্যমে । এমনকি ব্যক্তিএকক নিঃসঙ্গতার আনন্দ উপভোগ করতে পারে, সৃষ্টিশীল হয়ে উঠতে পারে । কিন্তু একাকীত্বকে সে উপভোগ করতে পারে না, তা আত্মপ্রেমের গিলোটিনে মাথা রাখার ফলে যন্ত্রণাদায়ক, দুর্দশাসৃষ্টিকারী, হাহাকারময় । একাকীত্বের স্হিতি ব্যক্তিএককের বাইরের নয় বলেই মনে হয় ; তা ব্যক্তিএককের মনে গড়ে ওঠে, কেমন যেন ফাঁকা-ফাঁকা লাগে। একা, আলাদা হয়ে বসে থাকার ব্যাপার নয় একাকীত্ব । একাকীত্ব হল ফোঁটায় ফোঁটায় সঞ্চারিত উপলব্ধি, বিপত্তিমূলক উপলব্ধি । শৈশব থেকে বাইরের সাময়িক নিঃসঙ্গতাগুলোর সঙ্গে আমার পরিচয় আছে, আর সেগুলো স্মৃতিকে খামচে ঘায়ের মতন রয়ে গেছে । বাইরের এজন্য বলছি যে সেসব নিঃসঙ্গতা ছিল সম্পর্কজনিত । ওই আত্মভঙ্গুর ঘটনাগুলোর কথা আমি মাঝে-মাঝে রোমন্হন করে নিরাময় খুঁজি, এখন স্মৃতির জাবর কেটে দেখি ট্রমা থেকে কতোটা নিরাময় ঘটে ।
    আমি মনে-মনে ফিকশানগুলো মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেলে ছকে নিই, যেমন চোর-ডাকাতরা রাতের বেলায় পরিকল্পনা করে, তারপর যখন লিখতে বসি তখন নিজেকে খুঁচিয়ে-খুঁচিয়ে আবিষ্কার করতে থাকি, ফিকশানের চরিত্রগুলোর সঙ্গে নিজের সমস্যা ভাগ-বাঁটোয়ারা করি, লিখতে বসার আগে নিজের ভেতরে হারিয়ে যাবার চেষ্টা করি, তখন মনে হয় লেখালিখিই আমার প্রেমিকা, আমার লেখার শিকড় আমার চেতনায়, কেননা আমি একই ঘরে, একই বাড়িতে, একই পাড়ায়, একই রাস্তায়, একই শহরে, একই রাজ্যে সারা জীবন কাটাইনি । যখন গাঁজা-চরসের নেশা করতুম তখন নিজের আহ্লাদের জন্যেই করতুম, এখন লেখালিখির নেশা করি নিজের আহ্লাদের জন্যেই করি, পাঠক-পাঠিকাদের সঙ্গে সেই আহ্লাদের দুঃখ-কষ্ট ভাগ-বাঁটোয়ারা করে নিই । কেউ মনে রাখুক, এই ভেবে লিখি না । মরে যাবার পর আমার লেখার কি হবে তা নিয়ে চিন্তিত নই । লেখা শেষ হয়ে গেলে সাপের খোলোশ থেকে বেরিয়ে আসি টাটকা ত্বক নিয়ে ।

    আমাদের জন্মদিন নেই, আমাদের মৃত্যুদিন নেই
    আমি কবে জন্মেছিলুম, ম্যাট্রিকের সার্টিফিকেটে ১৯৩৯ থাকলেও, জানি না, তার কারণ, পাটনার মহাদলিতদের পাড়া ইমলিতলার বাড়িতে বয়স্করা মনে করতেন, ব্যাপারটা যে জন্মেছে তার হর্ষোল্লাসের নয়, যিনি প্রসব করেছেন তাঁর ; সুতরাং প্রসবদিন বলে কিছু হতে পারে, জন্মদিন আবার কি ? যে জন্মেছে তার তো কোনো অবদান নেই যে তার জন্মদিন নিয়ে হুজুগ করতে হবে, সে কি নয় মাস কষ্টে ভুগেছিল, সে তো দিব্বি মায়ের পেটে হাত-পা ছুঁড়ে সাঁতার শিখেছে, চব্বিশঘণ্টা খেয়েছে, তারপর তার মায়ের প্রসব বেদনা উঠলে তার মা তাকে প্রসব করেছে। জীবনে কক্ষুনো সে মায়ের কষ্ট বুঝবে না । ঠিকই তো, নাড়ি শুধু মায়েদের গর্ভেই তৈরি হয় ।
    প্রসবের জন্য বাড়ির বউরা যেতেন নিজের বাপের বাড়ি, প্রসবের দিনক্ষণের হিসেব রাখার দায়দায়িত্ব বাপের বাড়ির লোকেদের ; এখন তারা যদি মুকখু হয় তো কি আর করা যাবে ! তারা প্রসবের দিনটা লিখে রাখতে পারেনি ।
    আমার বাবা ছিলেন ছয় ভাই, প্রমোদ, সুশীল, রঞ্জিত, অনিল, সুনীল আর বিশ্বনাথ, এবং এক বোন কমলা । ঠাকুমা প্রসবের সময়ে নিজের বাপের বাড়ি যেতেন, কলকাতার পটলডাঙায়, বিরাট আঁতুড়ঘর ছিল সেখানে, আর সেই আঁতুড়ঘরে তাঁর পরপর ছেলে হয়েছে, মেয়ে হচ্ছে না বলে যখন ঠাকুর্দার মনখারাপ, তখন ঠাকুমা ওই আঁতুড়ঘরে মেয়ে প্রসব করেন । আমাদের আদি নিবাস, বড়িশা-বেহালা হলেও, ১৭০৯ সাল থেকে আদি নিবাস গঙ্গার পশ্চিম পাড়ে হুগলি জেলার উত্তরপাড়ায় চলে এসেছিল ; সেখানে “সাবর্ণ ভিলা” নামে একটা জমিদারি বাড়ি তৈরি করেছিলেন পূর্বপুরুষ রত্নেশ্বর রায়চৌধুরী, যে বাড়িটি শরিকি অবহেলায় এমনই পোড়োবাড়িতে রূপান্তরিত হয়েছিল, অশথ্থের শেকড়ের আলিঙ্গনে হাড়গোড়-ভাঙা যে, আবাসন তৈরির জন্য প্রোমোটারকে দিয়ে দেয়া হয়, আমিও তার ভাগ পেয়েছিলুম, ষাট হাজার টাকা ।
    বড়োজ্যাঠা, মানে প্রমোদের স্ত্রী নন্দরাণীকেও পাঠানো হয়েছিল বাপের বাড়ি হুগলি জেলার কোন্নোগরে । তাঁর মেয়ে হল, নাম রাখা হল সাবিত্রী বা সাবু । দ্বিতীয়বার প্রসবের জন্য গেলেন কোন্নোগর, আবার মেয়ে হল, ধরিত্রী বা ধাবু । ঠাকুমা হুকুম দিলেন যে নন্দরানীর আর বাপের বাড়ি গিয়ে প্রসব করা চলবে না, বড়োই অলুক্ষুণে ওনাদের আঁতুড়ঘর, ওদের বাড়ি ছেলে জন্মায় না । নন্দরাণীর ভাইয়ের বউ বাপের বাড়ি যাননি, কোন্নোগরের আঁতুড়ঘরেই পরপর দুটি মেয়ের জন্ম দিয়েছিলেন, আলো আর পূরবী, এবং তারপর আর সাহস করেননি, ভয়ে, যদি আবার মেয়ে হয় । নন্দরাণীও আর বাচ্চা প্রসব করতে রাজি হননি, কোন্নোগরে গিয়ে হোক বা ইমলিতলায়, যদি আবার মেয়ে হয় । সাবু-ধাবুর জন্মদিন বা নন্দরাণীর দুটি প্রসবের দিন মনে রাখা দরকার মনে করেননি ইমলিতলার বয়স্করা । ছেলে হল না বলে বড়োজেঠা একজন বেশ্যার কাছ থেকে দেড়শো টাকা দিয়ে মেজদাকে কিনেছিলেন ।
    মেজজ্যাঠা, মানে সুশীলের স্ত্রী করুণা আমাদের আদিবাড়ি উত্তরপাড়ার মেয়ে, তিনি প্রসবের জন্য গেলেন নিজের বাপের বাড়ি । ঠাকুমা আপত্তি করেননি, প্রসবের সময়ে করুণা বাপের বাড়ি গেলে, তিনি গঙ্গাস্নানে যাবার সময়ে একবার করুণাকে দেখে যেতেন, মাগঙ্গাকে রিকোয়েস্ট করতেন যেন করুণা অন্তত বংশরক্ষা করেন । মা গঙ্গা রিকোয়েস্ট রিফিউজ করে দিয়ে করুণাকে দিয়ে মেয়ে প্রসব করিয়েছিলেন, তাও মৃত । ঠাকুমা যাকে বলে আতঙ্কিত । স্ত্রী করুণাকে নিয়ে মেজজ্যাঠা চলে গেলেন ছাপরায় থাকতে, সেখানে তাঁর জন্য একটা ফোটোগ্রাফির দোকান খুলে দেয়া হয়েছিল । মেজজেঠিমার যখন যক্ষ্মারোগ হল তখন দোকানপাট লাটে উঠিয়ে দুই মেয়ে ডলি আর মনুকে নিয়ে পাটনায় চলে এলেন ।
    এরপর সেজভাই রঞ্জিতের স্ত্রী অমিতার পালা । ঠাকুমা নিষেধ করলেন না, কেননা আমার মায়ের বাপের বাড়ি ছিলই না, মায়ের বাবা কম বয়সে মারা যান, দিদিমা তিন ছেলে আর তিন মেয়ে নিয়ে ওঠেন গিয়ে তাঁর বাপের বাড়ি, মানে মায়ের মামার বাড়ি । বাপের বাড়ি তো আর নয়, মামার বাড়ি, ওদের ঘরের আঁতুড় ঘরে ছেলের পর ছেলে হবার রেকর্ড আছে । এবং লো অ্যাণ্ড বিহোল্ড, মা একটি ছেলে প্রসব করলেন। মামার বাড়িতে দাদার নাম রাখা হয়েছিল বাসুদেব । মামাদের দেয়া নাম, যে মামারা নিজেরাই নিজের মামার বাড়িতে থাকতেন । অমন নাম ঠাকুমার পছন্দ হল না, দাদার নাম রাখা হল সমীর, আদর করে সবাই মিনু বলে ডাকতেন ।
    বাড়ির পারিবারিক রাজনীতিতে মাকে অনেক ওপরে তুলে দিলেন ঠাকুমা, রান্নাঘর আর ভাঁড়ার ঘরের কর্তৃত্ব মায়ের, খরচের নির্দেশে দেবার অধিকার মায়ের । বলতেন, অজাতশত্রুদের মা । তখনও অজাতশত্রুর গল্প শুনিনি, লোকটা কে তাও জানতুম না, মানে বলা হয়েছিল, যার কোনো শত্রু নেই । আমরা শোত্তুরের মুখে ছাই দিয়ে পৃথিবীতে এসেছি ।
    আমাকে প্রসব করার সময়ে মায়ের মামার বাড়িতে আমাদের আর তেমন সামাজিক গুরুত্ব ছিল না। ইমলিতলার বাড়ি আর মহাদলিতদের কুঁড়েঘরের সারি, ওপচানো নর্দমা, পাড়ার বাচ্চাদের গলির নর্দমায় হাগা দেখে মায়ের ভাইদের, আর তাঁদের মুখে শুনে মায়ের মামাদের, আমাদের পরিবার সম্পর্কে ধারণাটা ঘা খেয়েছিল । ওনারা ভেবেছিলেন সাবর্ণ চৌধুরী পরিবার, বিরাট রোশনাই আর ঝালরঝোলানো ঝিকমিকে ব্যাপার হবে । সাবর্ণ চৌধুরীরা যে ষষ্ঠ শতকের অরিজিনাল সাবর্ণ চৌধুরী পুরুষটার পরের প্রজন্মে বিয়োতে বিয়োতে জ্যামিতিক লাফে তত দিনে তিরিশ হাজারে পৌঁছে গেছে, আর তাদের বেশিরভাগই দারিদ্দিরে পটকান্তি খেয়েছে, কেউ-কেউ রিকশা চালায়, মুটেগিরি করে, তা হদিশ করতে পারেননি ওনারা। মাকে দ্বিতীয়বার পাঠাতে রাজি হলেন না বাবা । মা আমাকে প্রসব করলেন হাসপাতালে, পাটনার প্রিন্স অব ওয়েল্স হাসপাতালে । ইমলিতলার বাড়িতে কোনো আঁতুড়ঘর ছিল না, মায়ের শরীরও, আমার কারণে, সুস্হ ছিল না । হাসপাতালের সেই বিলডিঙ, যে-হাসপাতাল বাড়িতে আমাকে মা প্রসব করেছিলেন, স্বাধীনতার পর তা ভেঙে ফেলে সেখানে রাজেন্দ্র সার্জিকাল ব্লক গড়ে উঠেছে । বড়োজ্যাঠা ডায়াবিটিসে আক্রান্ত হয়ে এই সার্জিকাল ব্লকে ছিলেন বেশ কয়েক মাস । আমার ছেলের মাথা ফাটলে কপালে স্টিচিঙের জন্যে গিয়েছিলুম এই হাসপাতালে ।
    —তোমরা হাসপাতালের কাগজপত্র রাখোনি ? রাখলে তো তা থেকে জানা যেত কবে কোন সালে মা আমাকে প্রসব করেছিলেন ।
    —ওসব কাগজপত্তর আবার বাড়িতে রাখে নাকি ? হাসপাতালের কাগজ, নার্সরা কতো রুগিকে ছুঁচ্ছে দিনভর, কাগজের সঙ্গে বাড়িতে আবার কোন ব্যামো ঢোকে তার কোনো নিশ্চয়তা আছে ?
    অন্তত আমার জন্মদিনের একটা পোক্ত প্রমাণের সম্ভাবনা ছিল ; কিন্তু জন্মদিনটা তো আর গুরুত্বপূর্ণ নয়, প্রসবের রুগি ভালোয়-ভালোয় বাচ্চা নিয়ে বাড়ি ফিরেছে, তাও দ্বিতীয়বারও কোলে ছেলে নিয়ে, এই তো যথেষ্ট ।
    —তোর ভাগ্য ভালো যে মেয়ে প্রসব করেনি তোর মা ।
    নককা, অনিলের বিয়ে হল কলকাতার ভবানীপুরের সেসময়ের আধুনিকা অমিয়ার সঙ্গে । প্রসবের জন্য তিনি গেলেন ভবানীপুরে । তাঁর মেয়ে হল, খুকু । দ্বিতীয়বার গেলেন । আবার মেয়ে হল, রাখি ।
    নতুনকাকা সুনীলের বিয়ে হল উত্তরপাড়ার মেয়ে কমলার সঙ্গে । তিনি প্রসবের জন্য বাপের বাড়ি গেলেন । মেয়ে হল, পুটি ।
    দাদা আর আমি জন্মাবার পর ঠাকুমা আর জোর দিতেন না ; ছেলেদের বলে দিয়েছিলেন যার যেখানে ইচ্ছে বউদের পাঠাও, ছেলে হোক বা মেয়ে হোক, তোমরা নিজেরা বুঝো । নতুনকাকা ঠাকুমাকে বলেছিলেন, উনি অনেকগুলো বাচ্চা চান, প্রথম মেয়ের পর ওনার ছেলে তারপর মেয়ে, এইভাবে ছেলে-মেয়ের ছন্দ মিলিয়ে ছয়টা মেয়ে আর তিনটে ছেলে হল । ঠাকুমা বলেছিলেন এবার ক্ষান্তি দে, তিনটে ছেলে যথেষ্ট, এই উত্তরপাড়ার বারো ঘর-চার সিঁড়ির বাড়ি ভাগ-বাঁটোয়ারা হলে সকলের ভাগ্যে একটা করে নোনা ইঁট জুটবে ।
    ছোটোকাকা বিশ্বনাথ বিয়ে করলেন, উত্তরপাড়ার বাড়িতে ভাড়া থাকতেন গঙ্গোপাধ্যায় পরিবার, চিৎপুরের যাত্রা দলের ছোটো ফণী নামে যিনি খ্যাত ছিলেন, তাঁদের বড়ো মেয়ে কুচির সঙ্গে প্রেম করে । ওনাদের কোনো বাচ্চা হল না । ঠাকুমা বলেছিলেন, প্রেম করে বিয়ে করলে বাচ্চা হয় না, তার ওপর এক গোত্তরের বিয়ে ; ভাড়াটের মেয়ের তো আঁতুড়ঘরও নেই । প্রসবের দিন আর বাচ্চার জন্মদিনের হিসেব রাখার ঝক্কিঝামেলা পোয়াতে হল না ওনাদের । তবে বিয়ে হয়ে যাবার পর ঠাকুমা বেয়াইকে চব্বিশঘণ্টার নোটিস দিয়েছিলেন উত্তরপাড়ার বাড়ি ছেড়ে অন্য কোথাও গিয়ে বাড়ি ভাড়া নিতে । ওনারা আদপে কোথাকার লোক ছিলেন জানি না, তবে উত্তরপাড়াতেই বিভিন্ন পাড়ায় বাড়ি ভাড়া করে থাকতেন ।
    ছোটোকাকার ছোটোশালী ক্ষ্যামাঙ্করী বা খেমি ফ্রকের ওপর তার উঁচু বুক আর ফ্রকের তলায় খোলতাই উরু নিয়ে গরমের ছুটিতে বেড়াতে আসতো ইমলিতলার বাড়িতে, জড়াজড়ির খেলা খেলে পরস্পরের চরিত্র আলোয় আলো করার এইটিই আমাদের প্রথম সুযোগ ছিল । গ্রীষ্মকালে, ইমলিতলার বাড়িতে, রাতের বেলায়, ছাদে মাদুর পেতে, গড়াগ্গড় শুতুম আমরা সবাই, মাঝরাত থেকে ঠাণ্ডার জন্য পায়ের কাছে গায়ে দেবার চাদর । আমার বয়স এগারো, খেমির তেরো । সবায়ের সামনে খেমিমাসি বলে ডাকতুম ।
    ১৯৫০ সালে, মাঝরাতে, খেমির ঠেলা, কি রে, তোর বাপ তো রোজ-রোজ টাকা রোজগার করে, দাঁত মাজার মলম বেরিয়েছে আজকাল, তাই দিয়ে দুজনে দাঁত মাজবো, তাহলে গন্ধ হবে না । আমাদের দুজনের গায়ে একটাই চাদর, আর আমাদের হাত দুজনের শরীরের রহস্য খুঁজে বেড়াতে ব্যস্ত । আমার মাথা ওর ফ্রকের তলায় , ওর হাত আমার প্যান্টুলের ভেতর । তারপর একজন আরেকজনের ঠোঁট খাওয়া আরম্ভ করলুম, আপনা থেকেই ঘটে গেল প্রথম দিন, তাই খেমি বললে, মুখ মাজার মলমের ব্যবস্হা করতে । পাকা তালশাঁসের ঠোঁট । খেমির কথা বলার ঢঙ আর বেপরোয়াভাব আমি ব্যবহার করেছি আমার ‘অলৌকিক প্রেম ও নৃশংস হত্যার রহস্যোপন্যাস’ নামের ডিটেকটিভ উপন্যাসের মিলি চরিত্রে ।
    কবে খেমি আবার গরমকালের ছুটিতে আসবে, এই আশায় থাকতুম । তিনবার তিন বছর এসেছিল, প্রতিবার বুকের তাপ আর তরাই বাড়িয়ে । তারপর খবর এলো যে খেমি মায়ের দয়ায় ভুগে মারা গেছে । মায়ের দয়া ! কোন মা ? শেতলাদেবী, দক্ষিণভারতে মারিআম্মান দেবী । রোগের বেলায় দেবী কেন জানি না, রোগ সারাবার বেলায় দেবতা । সাপে কামড়ালে, কিংবা যাতে না কামড়ায়, তাই মনসাদবীকে পুজো দাও । যাতে না মহামারী আরম্ভ হয় তাই ধূমাবতীর পুজো দাও, পর্ণশবরীর পুজো দাও । আর দেবতারা সকলের স্বাস্হ্য রক্ষা করে। অশ্বিনী যমজভাইরা, ধন্বন্তরী, ধাত্রীদেবতা আয়ুর্বেদের ডাক্তার !
    খেমির মা ওকে আমার মায়ের আগে প্রসব করেছিলেন, তাই খেমি অনেক কিছু জানত, শিখিয়ে দিয়েছিল, যা পরে কাজে লেগেছে আমার, নিজেকে হাঁদা-গঙ্গারাম, যা খেমি আমাকে বলত, তা আর হতে হয়নি । খেমির জন্মদিন-মৃত্যুদিন জানা হল না আমার । কুচি-খেমির মায়ের নাম ছিল বিবসনা । ভাবা যায় এরকম অতিআধুনিক নাম, যার দেহে বসন নেই ? জানি না ইনি কোন পুরাণের দেবী ।
    আমাদের দুজনের গা গরম হয়ে ওঠে, সেই গরমের যোগফল দুজনের গায়ের গরমের তিনচার গুণ বেশি । আকাশে তারায় তারা, দেখা যায় সপ্তর্ষি মণ্ডল, দেখা যায় চাঁদ । ইমলিতলা ছাড়ার পর অমন পরিষ্কার আকাশ কোথাও পাইনি আর ; খেমি ওই আকাশ নিয়ে গেছে নিজের সঙ্গে আর দিয়ে গেছে ধোঁয়াটে ডিজেলের কারখানার চিমনির শ্বাসের আকাশ ।
    ফিসফিস করে, খেমি অর্থাৎ মিলি : এরকম হয় বুঝি ? এই ফুলে যাচ্ছে রে, গরমও হয়ে যাচ্ছে, আমার গায়ে কাঁটা দিচ্ছে রে, বুক ঢিপঢিপ করছে ; তোর কিছু হচ্ছে না ? মানে এখানে নয়, যেটা ধরে আছি? মনের মধ্যে কিছু? কিংবা বুকে ?
    আমি হাত চালিয়ে দিতে ন্যাকড়া বাঁধা পেলুম । চাপা উত্তেজনায় বললুম, ও, নিজেরটা বেঁধে এনেছিস । কেন, চাস না যে হাত দিই ?
    খেমি বা মিলি : ধ্যাৎ বোকা, এখুন ধ্যাড়ানি চলছে, কালকে খুলব, তখন যতো ইচ্ছে হাত দিস ।
    খেমি বা মিলি ন্যাকড়া ঢিলে করতে হাত ঢোকালুম, কীরকম চটচটে । আমার হাতটা নিজের ফ্রকে পুঁছে খেমি বলেছিল, দেখলি তো ! কালকের দিনটা অপেক্ষা করতে পারলি না । তুই কিন্তু সত্যিই ষাঁড় । বড়বাজারে গিসলুম একবার, তখন দেখেছিলুম একটা ষাঁড় ওই করছে । একদম গোলাপি । কেন বলতো? তুই তো ফর্সা ।
    পরের দিন, মিলি বা খেমি আমার বাঁ হাতের মধ্যমা আঙুলটা নিয়ে বলেছিল, এইতে রাখ, শুধু রাখবি, নাড়াবি না কিন্তু, নাড়ালে কাল থেকে অন্য জায়গায় শোবো ।
    আমি আঙুলটা নাড়াতে-নাড়াতে বলেছিলুম, নাড়ালে কী হয় ?
    মিলি বা খেমি আমার বোতাম-খোলা প্যান্টে হাত ঢুকিয়ে টিপে-তিপে ফোলাতে লাগল আর বলতে লাগল, এই হয়, এই হয়, এই হয়, এই হয়, এই হয়, এটা আমার এটা আমার ।
    —কালকে দিনের বেলায় একটু দেখতে দিস ।
    —দেখে আবার কী করবি ? চুল দেখতে চাস ?
    খেমি দেখিয়েছিল, ছাদেতেই, দুপুর বেলায়, যখন সবাই ভাত খেয়ে ঝিমোচ্ছে । দেখেই বেশি ভালো লাগলো, হাত দেয়াদিয়ির চেয়ে । রগের কাছে দপদপানি ।
    খেমির আগে, ইমলিতলা পাড়ায়, কুলসুম আপার সঙ্গে একই ধরনের ব্যাপারে, আমার যে অভিজ্ঞতা হয়েছিল, আমি জানতুম যে বাড়াবাড়ি করলে ছড়ে গিয়ে কষ্ট হতে পারে ; ১৯৪৯ সালে, কুলসুম আপার সঙ্গে সম্পর্কের সময়ে আমার বয়স দশ । কুলসুম আপাদের ঘরটা ছিল অন্ধকার, ছাগল হাস মুর্গিদের ঘর, তাই দেখা হয়নি, তাছাড়া উনি ছিলেন বেশ কালো ।
    কুলসুম আপার চরিত্র আমি ব্যবহার করেছি ‘রাহুকেতু’ উপন্যাসে । ওনারা ছিলেন শিয়া মুসলমান পরিবার. ওয়াজেদ আলি শাহের পতনের পর পাটনায় পালিয়ে এসেছিলেন, বেশ গরিব হয়ে গিয়েছিলেন, একই শতচ্ছিন্ন পোশাক দিনের পর দিন, বোরখা পরতেন না কেউ, বাড়ির বউরা বিড়ি বাঁধতেন, হাসের ডিম, মুর্গির ডিম, হাস, মুর্গি, ছাগলের বাচ্চা বিক্রি করতেন । আমাদের বাড়িতে মুর্গির ডিম সেসময়ে নিষিদ্ধ ছিল বলে ওনাদের বাড়ি থেকে হাসের ডিম আনতে যেতুম । কুলসুম আপা গালিব আর ফয়েজ আহমদ ফয়েজ শোনাতে ভালোবাসতেন, আমার মতো নির্বাক মুগ্ধ শ্রোতা আর কোথায় পাবেন, যে ওনার কালো গভীর চাউনি গোল মোটা ঠোঁট গালে টোল দেখার নেশায় বুঁদ । ওনাদের বাড়িতে যে মাংস রাঁধা হচ্ছিল তার গন্ধে শ্রোতা মোহিত হয়ে খেতে চাইলে কুলসুম আপা বাটি করে এনে খাইয়েছিলেন, বলেছিলেন বাড়িতে কাউকে বলিসনি, পাড়ায় রটে যাবে । বলিনি কখনও যে গোরুর মাংস খেয়েছি । উনি জিভ দিয়ে আমার ঠোঁট পুঁছে দিয়েছিলেন । যেদিনই মাংস রান্না হয়েছে সেদিনই ব্ল্যাকমেল করেছি ঘষাঘষি খেলার আগে ।
    একদিন হাস-মুরগির অন্ধকার ঘরে শ্রোতার প্যান্ট খুলে নামিয়ে দিলেন, নিজের চুড়িদার নামিয়ে দিলেন আর শ্রোতাকে কষে জাপটে ধরে নিজেকে ঘষতে লাগলেন । শ্রোতার ভালো লেগেছিল বেশ, তাই রোজ যেতো, যদিও রোজ হাসের ডিম কেনার দরকার হতো না । এ-ব্যাপারেও কুলসুম আপা বলেছিলেন, তোর বাড়িতে কাউকে বলিসনি যেন । একদিন কুলসুম আপা শ্রোতাকে এতো বেশি জাপটে ধরে কাঁপতে লাগলেন যে শ্রোতার নুনু ছড়ে গেল, হাঁটতে অসুবিধা হল দুদিন । ভয়ে শ্রোতা তারপর কুলসুম আপার বাড়ি যাওয়া ছেড়ে দিয়েছিল । শ্রোতার জাঠতুতো-খুড়তুতো বোনরা ডিম কিনে আনতো । মেজজ্যাঠার ছোটো মেয়ে মনু জিগ্যেস করেছিল, “ছোড়দা, ওই কেলটে কালো কুচকুচে কুলসুমটা তুই কবে ওদের বাড়ি যাবি, জানতে চায় কেন রে ?”
    ‘আমদের জন্মদিন হয় না’ এই তত্ত্ব সম্ভবত ইমলিতলা বাড়ির সৃষ্টি । ঠাকুর্দা লক্ষ্মীনারায়ণ ও তাঁর দুই ভাই হরিনারায়ণ এবং বৈকুণ্ঠ পর্যন্ত উত্তরপাড়ার সাবর্ণ চৌধুরীদের বংশলতিকা ১৯১১ সালে ‘বংশ পরিচয়’ নামে প্রকাশ করেছিলেন অমরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, যেটি বড়িশার সাবর্ণ চৌধুরী সংগ্রহালয়ে সংরক্ষিত । ঠাকুর্দার প্রজন্ম থেকে আমাদের আর্থিক ডামাডোল আরম্ভ হয়, আর ইমলিতলায় এসে তো আমরা একেবারে ফেকলু পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিলুম । কাগজ দেখিয়ে ভারতীয় আম আদমির আত্মপরিচয় প্রমাণ করার প্রথা বোধহয় স্বাধীনতার পরই আরম্ভ হয়েছে । ঠাকুর্দার পরিচয় উইকিপেডিয়ায় আছে, তা থেকে জানা যায় উনি ১৯৩৩ সালে মারা যান, যে বছর দাদাকে মা প্রসব করেন । মানে, উনি নিজের বংশধরকে দেখে গিয়েছিলেন ।
    ১৭০৯ সালে উত্তরপাড়া শহরের পত্তন করেছিলেন রত্নেশ্বর রায়চৌধুরী, যিনি বড়িশার একান্নবর্তি জমঘট থেকে বেরিয়ে নিজের একটা আলাদা জমিদারি চাইছিলেন । সাবর্ণ রায়চৌধুরীরা ভঙ্গ কুলীন ছিল, যাদের বাড়িতে খাঁটি-বামুনরা তাদের মেয়ের বিয়ে দিত না । রত্নেশ্বর রায়চৌধুরী টাকা আর জমিদারির অংশ দিয়ে গরিব ব্রাহ্মণ যুবকদের ফুসলিয়ে জামাই করে এনেছিলেন উত্তরপাড়ায় । ছোটোবেলায় দেখেছি যে আমাদের চেয়ে তাদের রমরমা বেশি । ঠাকুমার কথায়, “তোর পূর্বপুরুষরা মাগিবাজি করে আর মদ খেয়ে সব তবিল উড়িয়ে দিয়েছে, ওরা কোম্পানির কাগজ কিনে-কিনে নিজেদের তবিল বাড়িয়ে নিয়েছে ।” কোম্পানির কাগজ যে কেন দামি তা জানতুম না ।
    দাদুর প্রজন্মে পৌঁছে আমাদের তবিল ফাঁকা, বারোঘর চার সিঁড়ির খণ্ডহরের ইঁটে নোনা লাগা আরম্ভ, দিনে পায়রা রাতে চামচিকেতে ছয়লাপ । দাদু প্রথম সুযোগেই উত্তরপাড়া থেকে কেটে পড়েন । ওনার অন্য দুই ভাই খণ্ডহর ছেড়ে পালাননি, তাঁদের নাতিরা কেউ-কেউ হিন্দ মোটরে হাতুড়ি পেটার কাজে নেমে গিয়েছিল ।
    এখানে একটা ঘটনার কথা বলি । স্বাভাবিক যে দাদাকে ঠাকুমা সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতেন । আমাকেও বাসতেন, তবে তা যে দাদার চেয়ে কম তা ওনার আচরণে টের পাওয়া যেতো । কলকাতার সিটি কলেজে পড়ার সময়ে দাদা ঠাকুমার সঙ্গে থাকতেন । হাংরি আন্দোলনে দাদার গ্রেপতারির সংবাদে ১৯৬৪ সালের সেপ্টেম্বরে ঠাকুমার হার্ট অ্যাটাক হয়েছিল, আর তিন দিন কোমায় থাকার পর মারা যান । দাদার গ্রেপ্তারির কথা যাতে ওনার কানে না যায় তা বড়োজ্যাঠা আগে থেকেই হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন । কিন্তু গ্রেপ্তারির পর ব্যাংকশাল কোর্ট থেকে জামিন নেবার ব্যাপারে বাবা-কাকা-জ্যাঠা-পিসেমশায় উত্তরপাড়ার বাড়িতে একত্রিত হয়েছিলেন । এতোজনকে দেখে ঠাকুমার সন্দেহ হয় । তাঁকে জানানো হয় মামলার কথা । শোনামাত্রই তাঁর হার্ট অ্যাটাক হয়েছিল । ওনার শুকনো মাইয়ের বোঁটা ওপরে তুলে তার তলায় স্টেথোস্কোপ রেখে ডাক্তার ঘোষণা করেছিল, “ডেড”।
    ঠাকুমার মৃত্যুদিন মনে রাখার অসুবিধা হয় না, তার সঙ্গে জুড়ে আছে আমাদের কোর্টে দৌড়োনোর অভিজ্ঞতা । কিন্তু পরিবারের অন্য কারোর মৃত্যুদিনেরও, যেমন ঠাকুর্দার বা ঠাকুর্দার ভাইদের, জ্যাঠা-বাবার, কাকিমা-জেঠিমাদের, কোনো হদিশ নেই ।
    —মৃত্যু দিনগুলো কেন মনে রাখোনি তোমরা ?
    —তুই বোকা না গাধা ; মৃত্যু দিন মনে রাখার আবার কি দরকার ।
    —বাঃ, মৃত্যুর জন্য শোক প্রকাশ করবে না তোমরা ?
    —ওসব নাটোক-নবেলে হয় । পূর্বপুরুষরা মারা গেলে বছরে একটা দিনই তর্পণ করতে হয়, তিল-গঙ্গাজল দিয়ে, আত্মাদের অশান্তি করার মানে হয় নাকি, ওনারা যে যেখানে আছেন সেখান থেকে আমাদের সবাইকে আশির্বাদ করেন, তোকেও ।
    তার মানে, আমাদের যেমন জন্মদিন হয় না, তেমনিই, মৃত্যুদিনও হয় না । ইমলিতলার বাড়ির তত্ত্ব অনুযায়ী আমরা যেমন জন্মাই না, তেমনিই আমরা মরি না । আমরা অজাতশত্রু ।
    অজাতশত্রু, জানা গেল, এই পাটনা শহরেরই লোক, রাজা ছিলেন, এই শহরের পত্তন করেছিলেন, তখন এই শহরের নাম ছিল পাটলিপুত্র । পাটলিপুত্রর ধ্বংসাবশেষ দেখতে বড়োজ্যাঠা নিয়ে গিয়েছিলেন আমাদের । গাইডের কাছে জানা গেল যে অজাতশত্রু ছিলেন মগধের রাজা, যিশুখ্রিস্টের জন্মের চারশো বছরেরও বেশি আগে গঙ্গার ধারে একটা ছোটো দুর্গ তৈরি করেছিলেন ।
    —পাটলিপুত্র নাম কেন ?
    —পাটলি হল এক ধরণের চাল আর পুত্র মানে ছেলে ।
    —চালের ছেলে ? অমন হয় নাকি ?
    —তা নয়, পাটলিপুত্র মানে পাটলির ছেলে, যিনি রাজা সুদর্শনের মেয়ের সন্তান ।
    —যিশুখ্রিস্টের জন্মের তিনশো বছর আগে গ্রিক ইতিহাস-লেখক লিখেছিলেন যে পাটলিপুত্র বেশ বড়োসড়ো শহর ।
    —এ তো দেখছি আমাদের জন্ম হয় না আমাদের মৃত্যু হয় না ধরণেরই গল্প, বড়োজ্যাঠা ।
    —তবে আর ইতিহাস বলেছে কেন । তুই গাইডকে জিগ্যেস কর, অজাতশত্রু কবে জন্মেছিল, কবে মারা গিয়েছিল, বলতে পারবে না ।
    আমি জিগ্যেস করা আরম্ভ করেছিলুম, গাইড আবার গল্প ফাঁদতে আরম্ভ করল ; পাটলিপুত্র ছিল একটা জলদুর্গ, গঙ্গা, গণ্ডক আর শোন নদীর তৈরি ত্রিভুজের মধ্যে, নন্দরাজত্ব, মৌর্যরাজত্ব, শুঙ্গরাজত্ব, গুপ্তরাজত্ব আর পাল রাজাদের রাজধানী । নানা জায়গা থেকে জ্ঞানীগুণিরা এখানে এসে জড়ো হতেন, যেমন এসেছিলেন চাণক্য ।
    —তাদের ছেলেরা সব বাহুবলি,ডাকাত, খুনি, চোরছ্যাঁচোড় আর রাজনীতিক হয়ে জন্মাচ্ছে ।
    বাবার ফোটোগ্রাফির দোকানের চাকর রামখেলাওন সিং ডাবর, দেয়ালে হেলান-দেয়া বড়জ্যাঠার সাইকেলের সিটে আমাকে বসিয়ে ধরে থাকে, আরি আমি, অজাতশত্রু, হাতির ওপরে বসে রাজ্য জয় করতে বেরোই, হাতে তরোয়াল, যা ডাবরই তৈরি করে দিয়েছে, ফিলমে পাকানো লাল কাগজ মুড়ে-মুড়ে, ছড়ির মতন । তরোয়াল ঘোরাই, হাতির পিঠে সামলাতে না পারলে রামখেলাওন সিং ডাবর হুকুম করে, ‘ঠিক সে বয়ঠিয়ে মহারাজ’ ।
    দাদা, দেখতে পেয়ে বলে ওঠে, ওঃ, আমাকে সিংহাসন দিয়েছিলেন ঠাকুমা, তুই বেদখল করে রাজত্ব চালাচ্ছিস, জানিস কি যে অজাতশত্রুর একটা হাতে কড়ে আঙুল ছিল না ; আর অজাতশত্রুর নাক উঁচু ছিল বলে প্রজারা ওনাকে বলতো পীনোন্নত ।
    দাদার সঙ্গে আমার পাঁচ বছর বয়সের তফাত, ভয় দেখাবার অধিকার আছে মনে করে এড়িয়ে যেতে ডাবর বলে, ‘হাঁ, সচ্চিমুচ্চি, লোগ কহতে হ্যাঁয়, উ চার উংগলিকে রাজা থে; হমরে বৈশালি মেঁ সবকোই জানত হ্যায়।’
    ঠাকুমাকে জিগ্যেস করা যাবে না, উনি উত্তরপাড়া ফিরে গেছেন । ক্লাসে হিসি পেলে অজাতশত্রু কেমন করে পারমিশান চাইতো তাহলে, কাকে জিগ্যেস করি ? সিসটার আইরিনের ক্লাসে আমি তো ওই ভাবেই অনুমতি চাই । কনভেন্টে কেউই পীনোন্নতর বাংলা বলতে পারবে না, অজাতশত্রুর নামই শোনেনি হয়তো মাদার সুপিরিয়র, সিসটাররা, সিসটার আইরিন আর ফাদার হিলম্যান ।
    ছোটোকাকাকে জিগ্যেস করলুম । তখনও উনি উত্তরপাড়া গিয়ে প্রেমে পড়েননি, বউ কুচিকে পাটনায় আনেননি । “আরে ধ্যুৎ, সব গাঁজাখুরি, রাজাদের নিয়ে ওদের দরবারিরা নানা গপপো ফাঁদে।”
    —আর উনি নাকি পীনোন্নত রাজা ছিলেন ?
    ছোটোকাকার হাসি, গমকে গমকে পেট চেপে ধরে হাসি, ডেকে আনল জেঠিমা আর মাকে । ছোটোকাকা ব্যাপারটা ওনাদের বোঝাতে, জেঠিমা বললেন, “নাক উঁচুদের উন্নাসিক বলে রে, আর যাদের মাইয়ের বোঁটা উঁচু, তাদের বলে পীনোন্নত, এই যেমন আমার, এই দ্যাখ, একে বলে পীনোন্নত, এখনও পীনোন্নত আছে। তুই তো অনেক কাল অব্দি পাড়ার বউদের মি খেয়ে বেড়িয়েছিস, পীনোন্নত জানিস না ?”
    —মি-এর উঁচু বোঁটাকে বলে পীনোন্নত ? সুদামিয়ার, কপিলের মায়ের, কৃষ্ণন্নার মায়ের, কালুটুয়ার চাচির, বিরজুর মায়ের, মুনসিজির বউয়ের সকলের মি-ই তো পীনোন্নত । দাদা আমাকে পিটুনি খাওয়াবার জন্যে বলেছে, তার মানে !
    আমার মায়ের বুকে পর্যাপ্ত দুধ হতো না বলে আমি পাড়ার নার্সিং মাদারদের কোলে পৌঁছে যেতুম ছোটো বেলায় । জেঠিমার কথায়, আমি ভোরবেলা উঠেও কান্না জুড়তুম, “মি খাবো, মি খাবো”, আর ছোড়দি, ধরিত্রী, কোলে করে নিয়ে যেতো পাড়ার কোনো বাড়িতে আর সঁপে দিত তার কোলে ।
    অজাতশত্রুর কড়ে আঙুল ছিল কিনা তার ফয়সালা করার জন্য দুপুরে, বাবা যখন দোকানের কাজ সেরে লাঞ্চ খেতে এসেছেন, তখন জিগ্যেস করলুম ওনাকে । বাবা খেতে বসে গম্ভীর মুখে বললেন, “মা তোদের অজাতশত্রু খেতাব দিয়ে ভালো কাজ করেনি, অজাতশত্রুটা বাজে লোক ছিল, নিজের বাবা বিম্বিসারকে জেলে পুরে খুন করেছিল, কাকার রাজ্য কাশি আক্রমণ করে তাকে হারিয়ে দিতে, কাশির রাজা নিজের মেয়ের সঙ্গে অজাতশত্রুর বিয়ে দিয়ে দিলে, আর কাশি রাজত্বও দিয়ে দিলে, নিজের খুড়তুতো বোনকে বিয়ে করে নিলে, ছি ছি । ষোলো বছর যুদ্ধ করে গঙ্গার ওপারে লিচ্ছবিদের রাজত্ব দখল করে নিলে, এখন যাকে হাজিপুর বলে, নিজের ভাইদের রাজত্ব আক্রমণ করে সেগুলো দখল করে নিলে, অতো রক্তপাত ভালো নয় ।” বাবা শাকাহারি, তাই রক্তপাতের বিরুদ্ধে ।
    ডাবর বলেছিল, হাজিপুরের কলাকে বলে চিনিয়া কেলা, সবচেয়ে ছোটো মাপের কলা, অজাতশত্রুর ভয়ে কলাগুলো নাকি ছোটো আর একটু টোকো হয়ে গিয়েছিল ।
    —তাহলে বৈশালী আর মুজফফরপুরে এতো ভালো মিষ্টি লিচু কী করে হয় ?
    —চিন থেকে এনেছিল একজন পরিব্রাজক, তাই ওখানকার লিচুকে বলে শাহি লিচু, চায়না লিচু , আম্রপালী নামে একজন সুন্দরী ছিল, তার ছোঁয়া পেয়ে ওখানকার লিচু মিষ্টি।
    ঠাকুমা পাটনায় এলে বলেছিলুম, তুমি আমাদের অজাতশত্রু খেতাব ফেরত নাও ; বাবা বলেছে লোকটা বাজে ছিল। ঠাকুমা বললে, তোর দাদু তোর দাদাকে সমীর নাম দিয়ে গেছে, তার সঙ্গে মিলিয়ে তোর নাম তোর বাপ রেখেছে মলয়, আর কি, এই নামেই বংশের মুখ উজ্জ্বল কর ।
    —বংশের মুখ উজ্জ্বল ? সেটা কী ?
    —বড়ো হলে টের পাবি, অন্য লোকেরা যদি তোকে হিংসে করে তাহলে বুঝবি বংশের মুখ উজ্জ্বল করতে পেরেছিস । ।
    ঠাকুমা মারা গেলেন বলে আর বলার সুযোগ হয়নি যে, বড়ো হয়ে মুখ যা করেছি, বাড়ির লোকে তাকে মুখ উজ্জ্বল মনে করলেও, ব্যাঁকা মানুষরা তা মনে করে না । তারা নানারকম লেখালিখি করে, হিংসে করে ।
    বলেছিলুম, তুমি তোমার ছেলেদের ডাকনাম রাখোনি কেন ? ঠাকুমা বললে, “কেন ? তোর জ্যাঠাকে খোকা বলে ডাকি এখনও, তোর মেজজ্যাঠাকে মেজখোকা বলি, তোর বাপকে রঞ্জা বলি, তারপর আর কারোর ডাকনাম রাখিনি । তোর বাপের নাম তো মহারাজা রঞ্জিত সিং-এর নামে রেখেছিলুম, যখন তোর বাপকে প্রসব করেছিলুম, তখন লাহোরে থাকতুম, রঞ্জিত সিং এক-চোখ অন্ধ ছিল, ওর অনেকগুলো বউ ছিল, বাঁদিও ছিল, তাই বলে তোর বাপের রঞ্জিত খেতাব কি ফিরিয়ে নেবো ?
    —বাঁদি কি ?
    —যে বউদের লোকে বিয়ে করে না কিন্তু তাদের নিজের বাড়িতে বউদের মতন রাখে । অজাতশত্রুরও অনেকগুলো বউ আর বাঁদি ছিল ।
    —দারুণ ব্যাপার ; আমিও বড়ো হলে অনেকগুলো বাঁদি রাখব ; বাচ্চা হলে বাঁদিদের দুধ খেতে পারব।
    —তা রেখো, কিন্তু আমার বারো ঘর চার সিঁড়ির সাবর্ণ ভিলায় এনোনি তাদের ।
    আমার অজাতশত্রু হবার শখের এখানেই ইতি । ঠাকুমাকে বললুম, “অজাতশত্রু কতোদিন রাজত্ব করেছিল লোকে হিসেব রেখেছে, ওর বাবা বিম্বিসার কতোদিন রাজত্ব করেছিল তার হিসেব রেখেছে লোকে, কিন্তু ওদের জন্মদিনের আর মৃত্যুদিনের হিসেব রাখেনি । তুমিও কবে তোমার ছেলেদের প্রসব করেছিলে তার হিসেব রাখোনি।”
    ঠাকুমা জেনে যেতে পারেননি যে এখন একজন লোক যে আসলে সেই লোকটাই, তা প্রমাণ করার জন্য কতো কাগজপত্র সামলে রাখতে হয়, হাসপাতালের বার্থ সার্টিফিকেট, কর্পোরেশানের বার্থ সার্টিফিকেট, ভোটার কার্ড, র‌্যাশান কার্ড, আধার কার্ড, টেলিফোনের বিল, পাসপোর্ট, ইলেকট্রিক বিল । ভাগ্যিস বিম্বিসার আর অজাতশত্রুর সময়ে ওসব বালাই ছিল না ।
    বড়ো জ্যাঠা মারা যেতে জেঠিমার পেনশন তুলতে গিয়ে কি হ্যাঙ্গাম; হাতেখড়ির মতন কষ্ট করে শেখা কম বয়সের সইয়ের সঙ্গে বুড়ি বয়সের সই মেলে না, পঁয়তাল্লিশ টাকা পেনশন তোলার জন্য আদালতে গিয়ে এফিডেভিট করতে হয়েছিল যে উনিই নন্দরানি, বড়োজ্যাঠার বউ । আজকালকার মতন, কোনও কাগজে বড়োজ্যাঠাও জন্মাননি, বড়োজেঠিমাও জন্মাননি । বড়োজ্যাঠার চাকরি ছিল পাটনা মিউজিয়ামে মূর্তিদের আর পেইনটিঙগুলোর ঝাড়াই-পোঁছাই, যার জন্য কোনো কাগজের দরকার হয়নি, ধ্যুৎ ভাল্লাগে না বলে মাঝে চাকরি ছেড়ে দিলেও, কিউরেটার বাড়িতে লোক পাঠিয়ে বাবা-বাছা করে আবার চাকরিতে বহাল রেখেছিল, অথচ বড়োজ্যাঠা চাকরি পেয়েছিলেন ঠাকুমার জাঠতুতো দাদার সুপারিশে, তিনি কলকাতা মিউজিয়ামের অ্যাসিস্ট্যাণ্ট কিউরেটার ছিলেন, লেখক ছিলেন, ওনার নাম ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায় । ইংরেজরা যাবার পরে বড়োজ্যাঠার চাকরির নাম হয়ে গেল কিপার অফ পেইনটিংস অ্যাণ্ড স্কাল্পচার, মাইনেও বেড়ে গেল, রিটায়ার করার সময়ে নব্বুই টাকা ।
    মিউজিয়ামে বড়োজ্যাঠা একটা ঘর পেয়েছিলেন, গরমকালে ঘরের কল খুলে দিয়ে মেঝেয় জল ভরে দিতেন আর দুপুরে ইজি চেয়ারে শুয়ে নাক ডাকতেন । অফিস যেতেন পাঞ্জাবির ওপরে ধুতি, মাথায় হ্যাট, সাইকেলে তিন কিলোমিটার । আমার স্কুলের ছুটি পড়লে আমি ওনার সাইকেলের পেছনে ক্যারিয়ারে বসে চলে যেতুম ওনার অফিসে, দুপুরে খাবার জন্য টিফিনের কৌটো নিয়ে । টিকিট না কেটেই সারা মিউজিয়াম ঘুরে বেড়াতুম ।
    বড়োজ্যাঠা অনেকসময়ে আমাকে সঙ্গে করে ঘরগুলোয় নিয়ে গিয়ে দেখাতেন কোনটা কার মূর্তি, কোন জিনিস কতো হাজার বছর আগেকার । একজন অপ্সরার মাই আর একজন গলাকাটা পুরুষের মূর্তির নুনু চকচকে ছিল, কেন তা জানতে দেরি হয়নি, দেখি মহিলা দর্শকরা গলাকাটা মূর্তির নুনুতে হাত দিয়ে টুক করে কেটে পড়ছে, আর একই কাজ করছে পুরুষ দর্শকরা অপ্সরার মাইতে হাত বুলিয়ে । আমি অপ্সরার মাইতে হাত দিতে পারতুম না, কেননা আমার হাত পৌঁছোত না । খেমির মাই অপ্সরাদের চেয়ে ছোটো ছিল; কুলসুম আপার মাই অপ্সরাদের চেয়ে কালো ।
    বড়োজ্যাঠার টয়লেটে গিয়ে প্যান্টুলের বোতাম খুলে দেখেছিলুম, শ্বেতপাথরের গলাকাটা মূর্তির চেয়ে আমার নুনু বড়ো । গলাকাটা মূর্তি, পরে বলেছিলেন বড়োজ্যাঠা, আলেকজাণ্ডারের । শুনে বেশ ভালো লেগেছিল ; তার মানে আমিও আমার নুনু নিয়ে পৃথিবী জয় করতে যেতে পারব । খেমি যদি বেঁচে থাকত তাহলে ওর মাইও হাতের পালিশ খেয়ে অপ্সরার মতন চকচকে আর বড়ো হতো, পীনোন্নত । কিন্তু ওর তো বিয়ে হয়ে যেত, ওর বরকে লুকিয়ে খেমির মাইয়ে হাত বোলাতুম, ওর ঠোঁট চেবাতুম, তালশাঁসের মতন খেতুম ।
    বড়োজ্যাঠা মারা গেছেন, আমরা সেই দিনকার ঘটনা জানি । তবে তারিখটা কেউ মনে রাখেনি । বড়োজ্যাঠার জন্মদিন নেই, বড়োজ্যাঠার মৃত্যুদিন নেই । আলেকজাণ্ডারেরও নেই । বড়োজেঠা যেদিন মারা গেলেন, বাবা আমাকে অফিস থেকে ডেকে পাঠালেন জরুরি কাজ আছে, জানিয়ে । বাড়ি ফিরে দেখি কেবল নকাকিমা রয়েছেন, বললেন তাড়াতাড়ি খেয়ে নে, তোকে এক্ষুনি দিদিদের বাড়ি যেতে হবে । খেয়ে নিয়ে দিদিদের বাড়ি ছোটালুম সাইকেল । গিয়ে দেখি বড়োজেঠাকে বাঁশের মাচানে বেঁধে ফেলা হয়েছে । আমাকে যেতে হবে মুখাগ্নি করতে । সেই প্রথম শবকে ঘি মাখানো, পুরুত সতীশকাকার হুকুম অনুযায়ী মন্ত্র বলা আর কুশকাঠি-শরকাঠিতে আগুন ধরিয়ে মুখাগ্নি করার অভিজ্ঞতা, চিতাকে ঘিরে কাঁধে হাঁড়ি নিয়ে ফেলে দেয়া। শ্মশানে দাঁড়িয়েই কান্না পেয়ে গেলো, কাঁদলুমও, সতীশকাকা বললেন, হ্যাঁ, একে বলে শ্মশানবৈরাগ্য । হিন্দু মারা গেলে তার জ্বলন্ত দেহ থেকেও শেষবারের মতন শব্দগুলো পোড়া কাঠের সঙ্গে আকাশে ওড়ে, যাদের শব গোর দেয়া হয় তারা এই শেষ শব্দের গুঞ্জনের আহ্লাদ থেকে বঞ্চিত ।
    আমার এখন তিনটে জন্মদিন ; এগারোই কার্তিক, মায়ের বক্তব্য অনুযায়ী । উনত্রিশে অক্টোবর, স্কুলের সার্টিফিকেট অনুযায়ী । দোসরা নভেম্বর, ফাদার হিলম্যানের নির্ণয় অনুযায়ী । তিনদিন শুভেচ্ছা পাবার জন্য জন্মদিনের আর কীই বা চাই ।
    আমাদের বাড়িতে জন্মদিনকে উৎসব করায় আমার স্ত্রী সলিলার ভূমিকা আছে ; আমার মেয়ে হলে তার জন্মদিন পালন করা আরম্ভ হয় । তার আগে জন্মদিন যে অনুষ্ঠান হিসেবে আমোদ-আহ্লাদ করার দিন তা জানতেন না কেউ । মেয়ের জন্মদিন পালন করা আরম্ভ হলে দোসরা নভেম্বরকে আমার জন্মদিনের স্বীকৃতি দিয়ে খানাপিনার ব্যবস্হা আরম্ভ হয় । রেস্তরাঁয় গিয়ে ককটেল পার্টি করার সেই সূত্রপাত। এমনকি জন্মদিনে যে কেক কাটতে হয়, মোমবাতি নিভিয়ে হ্যাপি বার্থডে টু ইউ গাইতে হয়, তারও ।

    আমার বাবা, আমি আর দাদা যাঁকে বাবু বলে ডাকতুম
    আমার বাবার নাম রঞ্জিত, রঞ্জিতের বাবার নাম লক্ষ্মীনারায়ণ, লক্ষ্মীনারায়ণের বাবার নাম যদুনাথ, যদুনাথের বাবার নাম জয়গোপাল, জয়গোপালের বাবার নাম চণ্ডীচরণ, চণ্ডীচরণের বাবার নাম রত্নেশ্বর, রত্নেশরের বাবার নাম জগদীশ, জগদীশের বাবার নাম রাম, রামের বাবার নাম লক্ষ্মীকান্ত, লক্ষ্মীকান্তর বাবার নাম জিআ, জিআ’র সন্ন্যাস-পরবর্তী নাম কামদেব ব্রহ্মচারী । ওপর পর্যন্ত এই জন্যে গেলুম যাতে আমার ডিএনএ টের পাওয়া যায় । সন্ন্যাস নিয়েও পূর্বপুরুষ যদি নিজের নাম রাখেন কামদেব, তাহলে বুঝতেই পারছেন মলয় রায়চৌধুরীর একটাই জীবনে কতোগুলো জীবনযাপন থাকবে।
    বাবাকে বাবু বলে ডাকা দাদা আরম্ভ করেছিল, রামখেলাওন সিং ডাবর বাবাকে বাবু বলে ডাকত, ইমলিতলার লোকে ফোটুবাবু বলে ডাকত, বিহারি বন্ধুরা বাঙ্গালিবাবু বলে ডাকত, পরিচিতরা রঞ্জিতবাবু বলে ডাকত । তাদের দেখাদেখি দাদাও বাবু বলা আরম্ভ করেছিল। আমিও দাদার মতনই বাবু বলতুম । দাদা বড়োজেঠিমা নন্দরানিকে মা বলে ডাকত, দিদিদের দেখাদেখি, আর মাকে ডাকত ‘কাইয়া’ বলে, দিদিদের দেখাদেখি । আমি মাকে মা বলেই ডাকতুম, মা হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন, তুই আমাকে কক্ষুনো কাইয়া বলে ডাকবি নে, মা বলে ডাকবি ।
    বাবার জন্মদিন মনে রেখেছিল বাড়ির লোকে, মহারাজা রঞ্জিত সিংহের জন্য । মহারাজা রঞ্জিত সিংহের জন্মদিন পালন করা হতো ১১ই নভেম্বর, আর অমনই এক ১১ই নভেম্বরে লাহোরে জন্মেছিলেন বাবা। তা সত্ত্বেও বাবার জন্মদিন পালন করা হয়নি কখনও ।
    ঠাকুর্দা লক্ষ্মীনারায়ণ, পোরট্রেট আঁকতে পারতেন, এবং সেই সূত্রে তিনি বিভিন্ন রাজপরিবারের ডাকে সপরিবারে স্বাধীনতার আগের ভারতের এক রাজদরবার থেকে আরেক রাজদরবারে চলে যেতেন । লাহোরে গিয়ে তিনি ড্যাগেরোটাইপ ক্যামেরায় ফোটো তুলতে শেখেন, যাতে ফোটো তুলে তা থেকে পেইনটিঙ আঁকতে সুবিধা হয়, রাজপরিবারের সদস্যদের এক নাগাড়ে বসে থাকতে না হয় । সেসময়ে মেয়ো স্কুল অফ আর্টসের অধ্যক্ষ এবং লাহোর মিউজিয়ামের কিউরেটার ছিলেন রাডিয়ার্ড কিপলিঙের বাবা জন লকউড কিপলিঙ, যাঁর সঙ্গে পরিচয় ও তাঁর অধীনে কাজ করার সুবাদে জন লকউড কিপলিঙের কাছ থেকেই ঠাকুর্দা ফোটো তোলা শিখেছিলেন । ফোটো তোলা হতো সরাসরি ব্রোমাইড পেপারে । পরে, কাচের প্লেটে নেগেটিভ ফিল্মে তোলা হতো, সেই নেগেটিভকে রসায়নে চুবিয়ে রেখে ফোটো গড়ে উঠত, তারপর সেই প্লেটের ওপর ফোটোর কাগজ রেখে, প্রয়োজনীয় আলো দেখিয়ে ফোটো প্রিন্ট করা হতো, আর সেই প্রিন্টকে রসায়নে চুবিয়ে, শুকিয়ে, স্হায়ীত্ব দেয়া হতো ।
    ড্যাগেরোটাইপ ক্যামেরা ছিল বেশ ভারি, বাইরে গিয়ে ফোটো তুলতে হলে তাকে বয়ে নিয়ে যাবার লোক দরকার হতো । ইমলিতলার বাড়িতে এই সূত্রেই রামখেলাওন সিং ডাবরের প্রবেশ । বাইরে তোলা হতো বলে এক সঙ্গে অনেকগুলো ফোটো তুলে যেটা ভালো হল সেটা থেকে ফোটো তৈরি করা হতো, পেইনটিঙও আঁকা হতো সেই ফোটো থেকে, রাজপরিবারের অনুমোদন নিয়ে । ফোটো তোলা হতো তিনঠেঙে স্ট্যাণ্ডের ওপরে ক্যামেরা রেখে । ফোটো তোলার সময়ে হাত দিয়ে ঢাকনা খুলে, ‘স্মাইল প্লিজ’ বলে, দিনের আলোর ঔজ্জ্বল্য অনুযায়ী, দু-এক সেকেণ্ডে আবার লেন্স পরিয়ে দেয়া হতো । স্টুডিওতে ফোটো তুলতে হলে, প্রথম দিকে, হাজার-দুহাজার ওয়াটের কুঁজোর মাপের বালবের আলোয় ফোটো তুলতে হতো, পরে তো বালবের মাপ ছোটো হতে হতে অদৃশ্য হয়ে গেছে । এখন প্রযুক্তির এতো উন্নতি হয়েছে যে ড্যাগেরোটাইপকে মনে হয় প্রাগৈতিহাসিক । বাবা ডিজিটাল প্রযুক্তি দেখে যেতে পারলেন না, এখনকার মোবাইল ক্যামেরা, কমপিউটার, ফোটোশপিং ইত্যাদি ব্যবসাদার ফোটোগ্রাফারকে বিরল প্রকৃতির প্রাণী করে দিয়েছে ।
    পাটনার স্টুডিওতে বাবা উত্তরপাড়া থেকে ঠাকুর্দার বা তাঁর বাবার আমলের অ্যানটিক সোফা চেয়ার টেবিল ফুলদানির স্ট্যান্ড, ঘড়ার মাপের পেতলের ফুলদানি ইত্যাদি নিয়ে এসেছিলেন । আসবাবগুলোয় আমি ঠাকুর্দার আমিষপ্রিয় ঘামের গন্ধ পেতুম, পেশোয়ারে উটের মাংস, দুম্বার মাংস, ভেড়ার মাংস খাবার আনন্দের গন্ধ । দাদা বাঁশদ্রোণী যাবার সময়ে পাটনা থেকে নিয়ে গিয়েছিল ওগুলো। দরিয়াপুরে স্টুডিও আর নেই, দাদার ছেলে কমপিউটার আর নানা ফোটোগ্রাফিক গ্যাজেট বসিয়েছে সেখানে, ফলে অ্যান্টিক আসবাবের প্রয়োজন ফুরিয়েছে । এইসব অ্যান্টিক আসবাব দেখে অ্যালেন গিন্সবার্গের খুব ভালো লেগেছিল ।
    শৈশবে বাবাকে দেখতুম, শহরের বাইরে ফোটো তুলতে যাচ্ছেন রামখেলাওন সিং ডাবরের কাঁধে ক্যামেরার বাক্স চাপিয়ে, নিজে ক্যামেরার তিনঠেঙে স্ট্যাণ্ড আর মাথায় ঢাকা দেবার লাল-কালো কাপড়ের চাদর নিয়ে । ফোটো তোলার সময়ে যদি আকাশ মেঘলা হয়ে যেত তাহলে রামখেলাওন সিং ডাবরের হাতে একটা জ্বলন্ত ম্যাগনেসিয়াম তার ঝুলিয়ে দিতেন । আমি আর দাদাও অনেকসময়ে গেছি বাবা আর ডাবরের সঙ্গে, কেননা ডাবর ম্যাগনেসিয়াম ওয়ার স্হির ধরে থাকতে পারতো না । ডাবর, টাকমাথা, বেঁটে, গায়ের রঙ ময়লা, থাকতো বাবার স্টুডিও-দোকানের পাশের গলিতে, সেখানে একটা ঘর ওর জন্য ভাড়া নিয়েছিলেন বাবা । ডাবর চিরকাল কাচা ধুতি-পাঞ্জাবি পরতো, উৎসবের দিনে সিল্কের পাঞ্জাবি ; কখনও ওকে নোংরা অগোছালো পোশাকে দেখিনি । ওর বউ থাকতো গ্রামে, বাচ্চা হয়নি, বছরে দুবার যেতো বউয়ের সঙ্গে দেখা করতে । আগে ও বেশ ধনী ছিল, আমাদের চেয়ে যথেষ্ট অবস্হাপন্ন, জুয়া খেলে সব হারিয়েছিল, তাই বউ চটেমটে চলে গিয়েছিল গ্রামে । ওকে মহারাজ যুধিষ্ঠির বলে খেপাতুম । ওর জন্যে ছিল বেশ বড়ো একটা পেতলের কাঁসি, তাতে ভাতের আগ্নেয়গিরি তৈরি করে মাঝখানে ডালের লাভা ফেলে খেতে ভালোবাসতো ।
    বাবা মারা যাবার পর যখন পাটনার দরিয়াপুরের বাড়ি ছেড়ে চলে আসলুম, দেখেছিলুম তিন তলার একটা ঘরে থাক-থাক কাচের প্লেট, বাবা অতি যত্নে সংরক্ষণ করে রেখেছিলেন, বছর অনুযায়ী, কড়িকাঠ থেকে র‌্যাকে সাজানো । ইতিহাসবোধ না থাকলে যা হয়, আমি বা দাদা, সেগুলো সংরক্ষণের প্রয়াস করিনি । উনিশ শতক আর বিশ শতকের প্রথম দিকের সেই সমস্ত ফোটোর নতুন করে চাহিদা সৃষ্টি হয়েছে, শিল্পকর্ম হিসাবে । দাদা সমীরের দুই ছেলেও তা সংরক্ষণ করা প্রয়োজন মনে করেনি, সের দরে বিক্রি করে দিয়েছিল । ডিজিটাল ফোটোগ্রাফিতে প্রশিক্ষিত তাদের মনে হয়েছিল ডিজিটাল ক্যামেরা আর কমপিউটারের যুগে ওগুলো অচল । ইতিহাসবোধ না থাকার দরুণ, সাহিত্যিকদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে ফোটো তুলে রাখার প্রয়োজন বোধ করিনি আমি বা দাদা, নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়নি কখনও, টাইম ম্যাগাজিনে ছবি আর খবর বেরোবার পরও ।
    ঠাকুর্দার ছেলেরা ফোটো তোলা আর ছবি আঁকায় সড়গড় হলে ১৮৮৬ সালে দাদু ফোটোগ্রাফির ভ্রাম্যমান ব্যবসা আরম্ভ করেছিলেন, এবং সংস্হাটির নাম দেন ‘রায়চৌধুরী অ্যাণ্ড কোম্পানি’ । হুগলি জেলায় গঙ্গা নদীর পাশে, এখন যেখানে বালি ব্রিজের সংলগ্ন ফ্লাইওভার, তখন একটা পাকা রাস্তা ছিল, সেখানে একটা স্হায়ী দপতর খুলে নকাকা অনিলকে চালাতে বলেছিলেন, যাতে চিঠিপত্রের এবং সংবাদের আদানপ্রদানে সুবিধা হয় । হঠাৎ বৈরাগ্যে আক্রান্ত হবার ফলে নকাকা তা চালাতে পারেননি, এমনকি না-খোলা চিঠির স্তুপ জমে গিয়েছিল টেবিলের ওপর, আর উনি চুপচাপ বসে থাকতেন, ওনার খরচ দাদুকে, এবং পরে বাবাকে, দিতে হতো ।
    দাদুর ঘোরাঘুরির ফোটোগ্রাফি ব্যবসার কারণে বড়োজ্যাঠা, মেজজ্যাঠা, বাবা, নকাকা, ছোটোকাকা আর পিসিমার স্কুলে পড়া হয়ে ওঠেনি । দাদুর নিজের, বাংলার তুলনায় ব্যুৎপত্তি ছিল সংস্কৃত আর ফার্সি ভাষায় । দ্বারভাঙ্গা মহারাজের পরিবারের সদস্যদের পেইনটিঙ আঁকার নিমন্ত্রণ পেয়ে দাদু পাটনায় যান আর সেখানে হার্ট অ্যাটাকে মারা যান । দাদু হঠাৎ মারা যাবার ফলে তাঁর ছেলেরা পাটনায় বাজাজা নামে একটা দলিত পাড়ায় কুঁড়েঘর ভাড়া করে থিতু হতে বাধ্য হন । তখন নতুনকাকা আর ছোটোকাকাকে স্কুলে ভর্তি করা হয় । নতুনকাকা নিয়মিত স্কুল করলেও ছোটোকাকার আগ্রহ না থাকায় তিনি পড়াশুনা ছেড়ে দেন । ছোটোকাকা বলতেন, পড়তে পারি, সই করতে পারি, আবার কি চাই । জেঠা-বাবা-কাকাদের যেটুকু পড়াশুনা হয়েছিল তা রাজদরবারগুলোর শিক্ষকদের অবদান । কাজ চালাবার মতন ইংরেজি ভাষা আয়ত্ব করে ফেলেছিলেন বাবা ।
    ব্যবসার জন্য দাদু বিভিন্ন সময়ে আফগানিস্তানের কাবুল-কান্দাহার এবং পাকিস্তানের বাহাওলপুর, চিত্রাল, হুনজা, ফুলতা, মাকরান ও লাহোরে ছিলেন । আফগানিস্তানে ব্রিটিশদের যুদ্ধ আরম্ভ হবার পর দাদু লাহোরে চলে যান । বড়োজ্যাঠার মুখে শুনেছি যে বাহাওলপুরের সেই সময়ের ডাকটিকিটে আমিরের পোরট্রেট ছিল দাদুর আঁকা । ওই অঞ্চলের ছাগল, ভেড়া, দুম্বা ইত্যাদির মাংস আর শুঁটকিমাংস খাবার সঙ্গে দাদু-ঠাকুমা আর বাবার ভাইরা নিজেদের মানিয়ে নিলেও, বাবা পারেননি, এবং তিনি সারা জীবনের জন্য শাকাহারী হয়ে যান । বাবার মুখে শুনেছি যে বাজারে ঝোলানো চামড়া-ছাড়ানো গোরু, মোষ, ইয়াক, ভেড়া আর কাটা উটের মাংস দেখার পর উনি আর মাংস খেতে পারতেন না, তাই নিরামিষাশী হয়ে যান ।
    ঠাকুমার কাছে গল্প শুনেছি যে দুম্বা একরকমের ভেড়া যাদের ল্যাজের জায়গায় বাড়তি মাংস গজায়, আর বাড়তি লেজের মাংস, ঠাকুমা আর বড়োজ্যাঠার বক্তব্য অনুযায়ী, ছিল খুবই সুস্বাদু ।
    ফোটোগ্রাফির সূত্রেই দাদুর সঙ্গে উত্তর চব্বিশ পরগণার পানিহাটি নিবাসী আমার দাদামশায় কিশোরীমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরিচয় হয়েছিল । ও, হ্যাঁ, বলে রাখি যে আমার দিদিমার নাম ক্ষেত্রপ্রসাদী। দাদামশায় ছিলেন ম্যালেরিয়া রোগের উৎস আবিষ্কারক রোনাল্ড রসের সহগবেষকদের একজন । রোনাল্ড রস ব্রিটেনে ফিরে যাবার পর দাদামশায় ম্যালেরিয়া রোগের কারণ ও তা প্রতিরোধ করার জন্য গ্রামেগঞ্জে ম্যাজিক লন্ঠন দেখিয়ে প্রচার করতেন । এই স্লাইডগুলো তৈরি করে দিয়েছিলেন ঠাকুর্দা । কিশোরীমোহন তাঁর বড়ো মেয়ে অমিতার সঙ্গে বাবার বিয়ে দেন । দিদিমার গল্প অনুযায়ী, বিয়ের সময় মায়ের বয়স ছিল চোদ্দ বছর আর বাবার আঠারো বছর । বাবা নিজে শাকাহারী হলেও মাকে বাধ্য করেননি তাঁর আহারের রুচি অনুসরণ করতে । আমি আর দাদা দুজনেই আমিশাষী, বাড়িতে যে মাংস অনুমোদিত নয় তা খেতে হতো বাড়ির বাইরের রেস্তরাঁয় । দাদু প্রতি বছর দুর্গাপুজোর সময়ে উত্তরপাড়া ফিরে যেতেন, ছেলেদের বিয়ে দেবার কাজটাও সেরে নিতেন সেই সময়টুকুর মধ্যে । দাদু ছেলে-মেয়ে কারোরই কুষ্ঠী-ঠিকুজি মিলিয়ে বিয়ে দেননি, কেননা ওনার হাতে সময় থাকতো না, বিয়ে দিয়েই পুরো সংসার নিয়ে বেরিয়ে পড়তে হতো ।
    পাটনায় দাদু মারা যেতে তাঁর ছেলেরা এবং ঠাকুমা ভয়ানক বিপদে পড়েন, কেননা ভ্রাম্যমান ফোটোগ্রাফির ব্যবসা নির্ভর ছিল দাদুর গুডউইলের ওপর । বাজাজা পাড়ায় মাটির দেয়ালের ওপর যে চালাবাড়ি তাঁরা ভাড়া নিয়েছিলেন, সেখান থেকেই বিভিন্ন উপায়ে টাকা রোজগারের চেষ্টা আরম্ভ করেন । চাকরি করার মতন পড়াশুনা কারোরই ছিল না । প্রতিটি ব্যবসায়, যেগুলো ওনারা পাটনায় ফিরি করে বেড়াতেন, এমনকি জামের ভিনিগার, রঞ্জক সাবানেরও, অসফল হবার পর, বাবা দাদুর প্রতিষ্ঠিত সংস্হা ‘রায়চৌধুরী অ্যাণ্ড কোং’-এর সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে ছবি আঁকা আর ফোটো তোলার একটি স্হায়ী দোকান খুলে ফেললেন চালাবাড়ির কাছে, বিহার ন্যাশানাল কলেজের সামনে । ছাপরায় মেজজ্যাঠাকে একটা দোকান খুলে দেয়া হয়েছিল, বউবাচ্চা নিয়ে সেখানে সংসার চালাবেন এই আশায়, কিন্তু দুটো মেয়ে প্রসব করার পর মেজজেঠিমার শরীর খারাপ হয়ে যায়, মূলত মেজজ্যাঠার ব্যাখ্যাতীত চরিত্রের জন্য, আর ওনারা চারজনই ইমলিতলার বাড়িতে চলে আসেন। নকাকা তার আগেই উত্তরপাড়ার দোকানে তালা ঝুলিয়ে দুই মেয়ে আর নকাকিমাকে নিয়ে চলে এসেছেন পাটনায় ; বাবা গিয়ে দোকানের বিক্রয়যোগ্য জিনিসপত্র পাটনায় নিয়ে আসেন । দাদার ছেলে দোকানটার নাম পালটে ফেলেছে, কেননা পুরোনো নাম দেখে অনেকে বিহারে গ্রাম থেকে ফোটো তোলাবার জন্যে চলে আসতো ওর দোকানে ।
    দাদু মারা যেতে, ঠাকুমা উত্তরপাড়ার বসতবাড়িতে, যা অবহেলায় খণ্ডহরের চেহারা নিয়ে ফেলেছিল, থাকতে চলে গেলে, পরিবারের আর্থিক ভার পুরোপুরি এসে পড়েছিল বাবার কাঁধে । উত্তরপাড়ার বাড়ির ট্যাক্স, ঠাকুমার বুলিতে ‘টেসকো’, আর ঠাকুমার দৈনন্দিন খরচের ভারও বাবার ওপর বর্তায় । ঠাকুমা ছেলেদের আর তাদের বউদের বলে দিয়ে যান যে এবার থেকে আমার মা সংসারটাকে চালাবেন । যে কোনো কারণেই হোক, মেজজ্যাঠা, নকাকা আর ছোটোকাকার স্বভাব আর আচরণ এমন হয়ে দাঁড়িয়েছিল যে আমরা শৈশবে শুনতুম যে এনারা কিছুটা অপ্রকৃতিস্হ । দোকানের কাজে তাঁদের তেমন আগ্রহ ছিল না, তাঁরা প্রকৃতই শিল্পীচরিত্রের বিপন্ন বিস্ময়ে আক্রান্ত অস্বাভাবিকতা পেয়েছিলেন । আমি আর দাদা সন্ধ্যায় দেরি করে বাড়ি ফিরলে বা বাড়িতে গোলমেলে কাজ করে ফেললে বড়োজেঠিমা আর মা বলতেন যে তোমরাও দেখছি সাবর্ণ চৌধুরীদের মাথা-খারাপ রোগের খপ্পরে পড়েছ, এখন থেকেই সাবধান হও ।
    মেজজ্যাঠা ঘুম থেকে উঠতেন দুপুরবেলা, তারপর কোনো মিষ্টির দোকান থেকে লুচি আর রসুন-আলুর তরকারি কিনে রাস্তায় দাঁড়িয়ে খেতেন, আম, কলা, আইসক্রিম সবই রাস্তায় দাঁড়িয়ে খেতেন । আমাকে দেখতে পেলেও উনি তাতে বিব্রত না হয়ে আইসক্রিম চুযতে মগ্ন থাকতেন । ধুতির ওপর পকেটদেয়া ফতুয়া পরতেন, যা নিজেই কাচতেন, কখনও চুল আঁচড়াতেন না, কেননা বেশিরভাগ অংশে ছিল টাক, বাড়ি ফিরে দাঁত মেজে দুপুরের চাড্ডি ভাত খেয়ে বিকেলে দোকানে যেতেন, এবং একটি এনলার্জ-করা আবছা ফোটোর সামনে বসে তাকে মাসখানেকে অপূর্ব ছবিতে দাঁড় করাতেন । আমার সঙ্গে ওনার কোনো কমিউনিকেশান হতো না, কথা বলার চেষ্টা করলেও বিশেষ আগ্রহ দেখাতেন না । যদিও হাংরি আন্দোলনের মামলার সময়ে উনিও একবার বাবার সঙ্গে পাটনা থেকে ব্যাংকশাল কোর্টে এসেছিলেন । উনি হিন্দি সিনেমা দেখতে ভালোবাসতেন ; প্রায় প্রতি সপ্তাহে কোনো হলে ফিল্ম দেখতে যেতেন, সিনেমা দেখায় ওনার সঙ্গী ছিলেন সতীশ ঘোষাল, আমাদের বাড়ির পুরুত মশায় ।
    নকাকা অনেক ভোরে উঠতেন । সবাইকে, নিজের দুই মেয়েকে, এমনকি শিশুদেরও ‘আপনি’ সম্বোধন করতেন, স্ত্রীর সঙ্গে বিশেষ কথা বলতেন না, জুতো পরার অভ্যাস ছিল না, কোরা ধুতি পরতেন, প্রতিদিন নিজের শার্ট-প্যান্ট কাচতেন। ফিকে-নীল রঙের প্রতি ওনার বিশেষ আকর্ষণ ছিল, ফিকে-নীল ছাড়া অন্য কোনো শার্টে ওনাকে দেখেছি বলে মনে পড়ে না । কোনো এক ফাঁকে দোকানে গিয়ে বাড়িতে বসে করার জন্য ‘কাজ’ চেয়ে আনতেন । বাবার কাছ থেকে মুখ ফুটে টাকা চাইতেন না, বাবা ওনার প্রয়োজনের কথা জিগ্যেস করে খরচ দিতেন । নকাকিমা স্তনের ক্যানসারে মারা যান, তখনকার দিনে স্তনের ক্যানসার চিকিৎসার ব্যবস্হা পাটনায় ছিল না বলেই মনে হয় । আর এতোজনের খরচ চালিয়ে নকাকিমাকে কলকাতা বা অন্য কোনো শহরে কারোর সঙ্গে পাঠিয়ে চিকিৎসা করাবার মতন আর্থিক সামর্থ বাবার ছিল না । নকাকিমা মারা যাবার পর ভেঙে পড়েন নকাকা, অথচ বেঁচে থাকতে নিজেদের মধ্যে কথা বলাবলি বন্ধ ছিল ওনাদের । নকাকিমা মারা যাবার পর জানতে পারি যে ভবানীপুরে, যে পাড়ায় নকাকিমার বাপের বাড়ি, সেখানের এক যুবককে ভালোবাসতেন নকাকিমা, বিয়ের পরও তার সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছিলেন, বাপের বাড়ি প্রায়ই যেতেন তার সঙ্গে দেখা করতে ; সেই যুবকটি বিয়ে করেনি, গেরুয়াধারী সাধু হয়ে গিয়েছিল । নকাকিমা মারা যাবার পর স্মৃতি রোমন্হন করতে নকাকা উত্তরপাড়ার ঠাকুমাহীন খণ্ডহরে থাকতে চলে যান ; ভাড়াটেদের গল্প অনুযায়ী নকাকা প্রায় প্রতিদিন নকাকিমার জন্য কাঁদতেন । ওনার মৃত্যুর খবর পেয়েছি ঘটে যাবার দুবছর পর, তখন আমি লখনউতে । উত্তরপাড়ার খণ্ডহরের ঝুলে-পড়া ছাদ আর দেয়াল তখন দখল করে ফেলেছে অশথ্থ গাছ, বিনুনির মতন শেকড় ঝুলিয়ে ।
    ইমলিতলার বাড়িতে আমাদের চরিত্র দূষিত হবার সম্ভাবনা আছে অনুমান করে বাবা দরিয়াপুরে একটা একতলা বাড়ি করে সেখানে আমাদের নিয়ে চলে যাবার পরিকল্পনা করেছিলেন । ইমলিতলা পাড়ায় যে আমরা তাড়ি, সোমরস, গাঁজা, শুয়োরের মাংস খাবার সুযোগ পাই তা বাবা জানতেন ; দোলের সময়ে পাড়ার বউরা আমাদের জাপটে ধরে চুমু খাবার জন্য জোরাজুরি করতো, তাও দেখেছিলেন উনি । ইতিমধ্যে বিহার ন্যাশানাল কলেজের সামনে দোকানবাড়ির মালিক বাড়ি ছেড়ে দেবার মামলা করে, যার দরুন সেখান থেকে দোকান গোটাতে বাধ্য হন বাবা । কেস হেরে গেলে শেষ পর্যন্ত দরিয়াপুরের বাড়িতে দোকান তুলে আনা হয় । তার আগে আধখ্যাঁচড়া বাড়িটায় আমি আর ছোটোকাকার শালা, যাকে আমি বুজিদা বলে ডাকতুম, আমরা দুজনে থাকতুম । ওপরতলায় জানলা-দরোজা তখনও তৈরি হয়নি । নিচেরতলায় ছিল স্টুডিও, যার সূত্রপাত করার জন্য ছোটোকাকাকে দায়িত্ব দেন বাবা। ছোটোকাকা আর কাকিমা নিচের স্টুডিওতে শুতেন, আমরা দুজন ওপরতলায় । দরিয়াপুরের বাড়ির নতুন দরোজা-জানলার কপাট আর শিক আমিই রঙ করেছিলুম ; পরেও বার কয়েক রঙ করেছিলুম । এমনকি নাকতলার ফ্ল্যাটের যে গ্রিল ছিল তাতেও রঙ লাগিয়েছি, অবসর নেবার পর ।
    পুরোনো দোকানের সময় থেকেই, ছোটোকাকা মাঝরাতে ছোটোকাকিমার নানা আঙ্গিকের নগ্নিকা ফোটো তুলতেন, যেমনটা প্রখ্যাত চিত্রকরদের বইগুলোয় থাকে । দোকানে গিয়ে বাবাকে সাহায্য করার নাম করে ডার্করুমে ঢুকে সেই ‘অপ্সরা’ ফোটোগুলোর প্রিন্ট নিতেন । উনি যখন পাকাপাকি উত্তরপাড়ায় থাকতে চলে যান, তখন তাড়াহুড়োয় ফোটোগুলোর অ্যালবাম নিয়ে যেতে ভুলে যান । বাবা-মায়ের অজান্তে আমার আর পিসতুতো দাদা সেন্টুদার হাতে আসে অ্যালবামগুলো । নগ্নিকারূপে ছোটোকাকিমার দেহ অসাধারণ ছিল, যৌনতাউদ্রেককারী, সেন্টুদা একটা ফোটো নিজের কাছে রেখে নেন, যে ফোটোয় ছোটোকাকিমা অ্যান্টিক সোফায় শুয়ে আছেন দুদিকে দুই হাত মেলে, ওনার স্তন ফুলে উঠেছে, দেখা যাচ্ছে যোনির চুল । তখন কালার ফোটোগ্রাফি আরম্ভ হয়নি, সব কয়টা ফোটো, শতাধিক, ছিল সাদা-কালো । নকাকার ভালোবাসার পাশে আরেকরকম ভালোবাসা ।
    কোতরঙে ঠাকুমার নামে একটা বড়ো জমি কিনেছিলেন বাবা, তাতে পুকুর, আমলকির বাগান ছিল, তাঁর ইচ্ছে ছিল বার্ধক্যে “নিজের দেশে” গিয়ে থাকবেন । ছোটোকাকা উত্তরপাড়ায় গিয়ে সেটা নিজের নামে লিখিয়ে নিয়ে কোতরঙের জমির অর্ধেক বিক্রি করে দেন আর বাকি অর্ধেকে একটা মন্দির তৈরি করে, লিফলেট ছাপিয়ে মন্দিরের প্রাচীন স্হানমাহাত্য প্রচার করা আরম্ভ করেন । আমি ওনার গল্পকে বুজরুকি মনে করছি জেনেও, আমাকেও বিস্তারিত শুনিয়েছিলেন, কোথায় রামকৃষ্ণদেব এসে বসেছিলেন, কোথায় কোন সন্ন্যাসী বসে তপস্যা করেছিলেন ইত্যাদি। যারা পুজো দিতে আসতো তাদের চাল-কলায় আর সেভিংসের সুদ থেকে চলে যেতো ওনাদের দুজনের সংসার । অনেক সময়ে কোতরঙ বাজারে গিয়ে “জয় মা” বলে-বলে আনাজপাতি যোগাড় করে আনতেন । বয়সের কারণে দুজনে অকর্মণ্য হয়ে যেতে থাকলে নিজের ছোটোশালার প্রথম পক্ষের মেয়েকে দত্তক নিয়ে, মন্দিরের যাবতীয় জিনিসপত্র আর প্রাচীন স্হানমাহাত্মের কল্পকাহিনি তুলে নিয়ে, জমি বিক্রি করে, উত্তরপাড়ায়, সাবর্ণ ভিলার কাছাকাছি একটা ফ্ল্যাট কিনে সেখানে থাকতে চলে যান । ছোটোকাকা মারা যান নব্বুই বছর বয়সে, ছোটোকাকিমা চুরাশি বছর বয়সে, কিন্তু ওনাদের জন্মদিন-মৃত্যুদিন জানি না, ওনাদের মৃত্যুর খবরও পেয়েছি মুম্বাইতে আসার পর, লোকমুখে । “জানো ছোড়দা, কাকাবাবু গতবছর মারা গেছেন, তোমাদের টেলিফোন নম্বর জানা ছিল না ।”
    বিহারের ১৯৩৪ সালের ভূমিকম্পে, দাদার জন্মের একবছর আগে, মাটির দেয়ালের চালাবাড়ি ধসে পড়ার পর, বড়োজ্যাঠা, নতুন চাকরি পেয়ে, ঠাকুমার আর বাড়ির বউদের গয়নাগাটি বেচে, ইমলিতলা নামে এক মহাদলিত ও গরিব শিয়া মুসলমান অধ্যুষিত পাড়ায়, বাড়ি কেনেন, ক্রমে তার ওপরতলায় ঘর তৈরি হয়, আর একান্নবর্তী পরিবার সেখানে থাকতে চলে যায় । তখন মহাদলিত লোকেদের বলা হতো অস্পৃশ্য, আর সেকারণেই দুসাধ মুসহর পাশি কাহার ডোম চামার কুশওয়াহা পরিবারদের ঘিঞ্জি সস্তা পাড়ায় বাড়ি কেনা হয় । ইমলি, অর্থাৎ তেঁতুলগাছটা আমি দেখিনি, কেননা তেঁতুল গাছটা কেটে সেই জায়গায় জলের কল আর গ্যাসবাতির থাম বসিয়েছিল ব্রিটিশ সরকার । এমন বদনাম পাড়া যে লালপাগড়ি টহলদার পুলিশের জন্য সারারাত আলো ছিল জরুরি । তেঁতুলগাছটা দাদার জন্মের সময়ে ছিল, আমি দেখিনি । বদনাম আর অতিগরিব বাসিন্দাদের জন্য পাটনার অন্যান্য বাঙালিরা ইমলিতলাকে বলতেন ছোটোলোকদের পাড়া । সেকারণে আমাদের পরিবারের ওপরে ওই ছোটোলোকের ছাপ্পা পড়ে গিয়েছিল, নিষ্কৃতি দিয়েছিল সাবর্ণ চৌধুরীর ফালতু ধোঁয়াটে গৌরব থেকে ।
    পাটনার শিক্ষিত সংস্কৃতিমান বাঙালিরা, উপচে-পড়া নর্দমার পাঁক আর গু-ছড়ানো সরু গলির নর্দমা ডিঙিয়ে দিনের বেলাতেও আমাদের বাড়ি আসতেন না । বড়োজ্যাঠা যেতেন তাদের কারোর কারোর বাড়ি, সামাজিক সম্পর্ক বজায় রাখার জন্য । ক্যাথলিক স্কুল ছেড়ে আমি যখন রামমোহন রায় সেমিনারিতে ভর্তি হলুম, তখন সহপাঠীরা ইমলিতলা নাম শুনে আমাদের বাড়ি আসতে চাইতো না, বস্তুত আমার স্কুলের বন্ধুরা কেউ কখনও ইমলিতলার বাড়িতে আসেনি ; দরিয়াপুরে বাবা বাড়ি করার পর সেই বাড়িতে আমার বন্ধুরা সবাই আসত, গান-বাজনা-তাস-মুর্গি-বিয়ারের আসর বসে যেতো । সহপাঠীদের অনেকে ইমলিতলা নাম শুনেই ভয় পেতো, পাড়ার কুখ্যাত নিবাসীদের কাজকর্মের দরুণ, বলতো, “বাপরে, কী করে থাকিস অমন পাড়ায় ? যতো চোর ডাকাত পকেটমার খুনি গাঁটকাটা মাতালের গ্যাঞ্জাম তো ?” মেজদা, যাকে শিশু অবস্হায় এক বেশ্যার কাছ থেকে বড়োজ্যাঠা কিনেছিলেন, পুত্রসন্তানের অভাব মেটাতে, পাড়ার চাপ এড়াতে না পেরে পুলিশের নথিতে গুণ্ডা হয়ে গিয়েছিল, মাদক আর ধুতরোবীজের স্লো পয়জনের দরুণ কম বয়সে মারা যায় । বশীকরণ করার উদ্দেশে অজান্তে স্লো পয়জন করে ফেলেছিলেন বড়োজেঠিমা ।
    বাবা ভোরবেলা বেরিয়ে যেতেন আর ফিরতেন বেশ রাত করে । ফোটো তোলা, জিনিসপত্র বিক্রি, ডার্করুমের কাজ তাঁকে একা করতে হতো বলে ভোরবেলা জলখাবার খেয়ে সোজা গিয়ে ডার্করুমে ঢুকতেন, দুপুরে খেতে আসতেন, খেয়ে ফের দোকানে গিয়ে ডার্করুমে ঢুকতেন, রাতে দোকান বন্ধ করার পর আবার ঢুকতেন ডার্করুমে । বিহারে সেসময়ে তাঁর কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল না, তাই কাজ পেতে অসুবিধা হতো না । মা আর বাবার দুজনের চরিত্রেই যে বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল, তা হল সবার সঙ্গে মানিয়ে চলা, সকলের ট্যানট্রাম সহ্য করা, যে যা চায় তা পূরণের চেষ্টা । বাবা বাড়ির প্রধান রোজগেরে হলেও, ভাইদের আর তাদের ছেলেমেয়েদের, মানে আমার খুড়তুতো-জাঠতুতো ভাইবোনদের, সমান চোখে দেখতেন । বড়োজ্যাঠা ইমলিতলা বাড়ির ট্যাক্স দিতেন আর সপ্তাহান্তে মুসল্লাপুর হাটে গিয়ে সাইকেলের দুই হ্যাণ্ডেলে লুঙ্গি ঝুলিয়ে তাতে করে এক সপ্তাহের সবজি কিনতেন, সবই ছাঁটাই সস্তা সবজি । বাবা বাদবাকি সমস্ত খরচ করতেন, ঠাকুমাকে টাকা পাঠানো, উত্তরপাড়ার বাড়ির ট্যাক্স দেয়া, উত্তরপাড়ায় একটা ফাঁকা জমি কেনার জন্য তহবিল তৈরি করার টাকা পাঠানো, যেখানে বার্ধক্যে গিয়ে মা-বাবা থাকতে পারবেন, চালগমের দোকানদারকে মাসে একবার, মায়ের তৈরি ফিরিস্তির কাগজে, যা আমি বা দাদা লিখে দিতুম, দোকানে যাবার পথে বাবা দিয়ে চলে যেতেন, আর সে ইমলিতলার বাড়িতে পাঠিয়ে দিতো । পরিবারের সদস্যদের পোশাকের জন্য বাবা এক মুসলমান বোবা দর্জিকে বলে রেখেছিলেন, তার দোকানে গিয়ে মাপ দিয়ে দিতে হতো, শার্ট, প্যান্ট, ফ্রকের, সে তৈরি করে বাড়ি পাঠিয়ে দিতো । দর্জির পরিবারের পুরুষরা সকলেই ছিল বোবা, তাদের স্ত্রীরা বোরখার ভেতর থেকে আমাদের নির্দেশ শুনে স্বামী বা ভাসুরকে বুঝিয়ে দিতো । আমাদের কখনও খটকা লাগেনি যে দাঙ্গা আর দেশভাগের পরেও বাবা বোবা দর্জিকে পায়ে দাঁড়াতে সাহায্য করছেন । এইভাবে ছিল জুতোর দোকানের সঙ্গে বন্দোবস্ত, যার যখন ইচ্ছে গিয়ে কিনে আনতুম, ছেলেদের জন্য কেবল কাবলি স্যান্ডাল আর স্কুলের জন্য বুট ও ক্যাম্বিশের জুতো, দোকানদার গিয়ে বাবার কাছ থেকে টাকা নিয়ে আসতো । চুলকাটার জন্য মাসে একবার নাপিত শিউনারায়ন হাজাম আসতো, বড়ো-ছোটো সবাই দলবেঁধে চুল আর নখ কাটাতুম । জেঠা-কাকা ওনারা ওপরে দুহাত তুললে, শিউনারায়ণ বগলের চুল কামিয়ে দিতো ।
    ইমলিতলার বাড়িতে বাবা-মা-দাদা-আমি দোতলার যে ঘরটায় থাকতুম সেটাই ছিল বাড়ির সবচেয়ে ছোটো ঘর । লন্ঠনের আলোয় পড়াশুনা করতে হতো, চেয়ার-টেবিল ছিল না, দোকানের জন্য মালপত্র যে সমস্ত কাঠের প্যাকিংবাক্সে আসতো, তার ওপর চাদর পেতে, ঘরজোড়া খাটের একপাশে, বইপত্র রাখার ব্যবস্হা ছিল । প্যাকিং বাক্সের সামনে দিক খোলা, তার ভেতরে আমাদের বইখাতা থাকত, দাদার বই তুলনায় বেশি কেননা দাদা আমার চেয়ে পাঁচ ক্লাস ওপরে । দিনেরবেলায়, ছুটির দিনে আমি খাটের ওপরে বসে পড়তুম, আর দাদা প্যাকিংবাক্সের সামনে মাটিতে । রাতে দাদা প্যাকিং বাক্সের ওপরে লণ্ঠন রেখে পড়ত, আমি নিচে দালানে ভাইবোনদের সঙ্গে একটা লণ্ঠন ঘিরে সবাই মিলে পড়তে বসতুম । ১৯৪৯ সালে দাদা কলকাতায় পড়তে চলে যায় ।
    ইমলিতলার কুখ্যাতি-কুসঙ্গের প্রভাব দাদার ওপর পড়তে পারে অনুমান করে, তখনও দরিয়াপুরের বাড়ি তৈরি হয়নি, ১৯৪৯ সালে দাদাকে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছিল মামার বাড়ি বা মায়ের মামার বাড়ি পাণিহাটিতে, কলকাতার কলেজে পড়াশোনার জন্য ; মামার বাড়িতে মানিয়ে নিতে পারেননি বলে দাদা চলে যান উত্তরপাড়ায় ঠাকুমার সঙ্গে থাকতে । কলকাতায় দাদা সিটি কলেজে ভর্তি হন, কলেজে বন্ধু হিসাবে পান সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, আনন্দ বাগচী, দীপক মজুমদার, শংকর চট্টোপাধ্যায়, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, তারাপদ রায়, শরৎকুমার মুখোপাধ্যায়, উৎপলকুমার বসু প্রমুখ তরুণ কবিদের । উত্তরপাড়ার বাড়ির চিলেকোঠার ঘরে আস্তানা নিয়েছিলেন দাদা । উনি বিহারে মৎস্য দপতরে চাকরি পাবার পর তাঁর পোস্টিঙের জায়গায়, ধানবাদ, মুজফফরপুর, ভাগলপুর, দুমকা, ডালতনগঞ্জ, চাইবাসা, দ্বারভাঙ্গা ইত্যাদি জায়গায় কবি বন্ধুরা একা বা দলবল নিয়ে, পরে বউ-ছেলেমেয়ে নিয়ে, পৌঁছোতেন ।
    তাঁর বন্ধুদের সঙ্গে একবার চাইবাসা গিয়েছিলেন শক্তি চট্টোপাধ্যায়, যিনি সেসময়ে ‘কুয়োতলা’ নামে একটা উপন্যাস লিখছিলেন । তিনি স্হানীয় মধুটোলার সুধীর চট্টোপাধ্যায়ের মেয়ে শীলার প্রেমে পড়েন এবং মেয়েটির উদ্দেশে প্রচুর কবিতা লিখে তাকে শোনাতেন। এই কবিতাগুলো নিয়ে শক্তি চট্টোপাধ্যায় প্রকাশ করেছিলেন তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্হ “হে প্রেম হে নৈঃশব্দ্য”। নিজের প্রেমের আখ্যান লিখেছেন.”কিন্নর-কিন্নরী” উপন্যাসে । তাঁর হাংরি চরিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন ‘হৃদয়পুর’ উপন্যাসে, তাতে তিনি বাড়ি থেকে বেরিয়ে মোটরগাড়ি, বিরাট মদের বোতল, বিরাট ফুটবল ইত্যাদি যা দেখতে পাচ্ছেন, খাচ্ছেন । ‘কুয়োতলা’র পাণ্ডুলিপি আমি দেখেছিলুম, তাতে মাঝে-মাঝে স্পেস ছাড়া ছিল । প্রশ্ন করতে শক্তি বলেছিলেন, ;ওই প্যারাগুলোয় সাহিত্য খেলাবো । বিভূতিভূষণের অপু চরিত্রে উনি নিজের মিল খুঁজে পেয়েছিলেন, আর নিজের নিরুপম চরিত্রটি সেই আদলে গড়তে চেয়েছিলেন ।
    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের “অরণ্যের দিনরাত্রী” উপন্যাস মূলত চাইবাসার ঘটনাবলী নিয়ে লেখা । ওই উপন্যাসে পঞ্চাশ দশকের যুবক চরিত্ররা নিজেদের মধ্যে স্ল্যাঙ ব্যবহার করে না, যুবতীদের সামনে খালিগা হতে লজ্জা পায় ; হাফপ্যান্ট পরে তাদের সামনে যেতে বাধোবাধো ঠেকে। এই “আধুনিক” যুবকদের নিয়ে ফিল্ম করেছিলেন সত্যজিৎ রায় ।
    ইমলিতলায় শৈশবে, একবার তাড়ি খেয়েছিলুম, শুয়োরের মাংসের সঙ্গে, মানে গঞ্জেড়িরা খাইয়েছিল । মুখে তাড়ির গন্ধ পেয়ে মা আমায় ঘরে শেকল তুলে বন্ধ করে দিয়েছিলেন, তাড়ির গন্ধ আমায় বাঁচিয়েছিল, শুয়োরের মাংস খেয়েছি জানতে পারলে মাঝরাতে গঙ্গায় নিয়ে গিয়ে চান করিয়ে আনতেন বড়োজ্যাঠা । বাবা রাতে বাড়ি ফিরলে শেকল খোলা হয় । মায়ের সবসময় আশঙ্কা ছিল যে আমরা দুই ভাইও মেজদার মতন অসামাজিক চরিত্রের মানুষ হয়ে যেতে পারি । পাড়ায় কারোর সঙ্গে মেলামেশায় নিষেধাজ্ঞা ছিল না । পাড়ার বউরাও মা-জেঠিমার সঙ্গে দুপুরের গল্প করতে আসতো । তাঁরা যে বুলিতে গালগল্প করতেন তাকে হিন্দিভাষীরা এখন মনে করেন ভালগার ।
    ইমলিতলার কাউকে কখনও লটারির টিকিট কিনতে দেখিনি । আমি নিজেও লটারির টিকিট কিনিনি, পনজি স্কিমে টাকা খাটাইনি । লটারির টিকিট দেখলেই আমার বাল জ্বলে ঝাঁট হয়ে যায় । এখন দেখি পনজি স্কিমের ঘোড়েলরা ভোটারদের “বন্ধুগণ” সম্বোধন করছে ; ভোটারগুলো জানেই না যে তারা আসলে গণতন্ত্রের নতুন ক্রীতদাস । তবে জুয়া খেলেছি মালয়েশিয়ার জেনটিং হাইল্যাণ্ড ক্যাসিনোয় আর ডেন হাগের সিটি সেন্টার ক্যাসিনোয়, দুবারই হেরেছি রাশিয়ান রুলেটে, কত টাকা লিখছিনা, কেননা তা অনেকটা, ফিলমে দেখে-দেখে খেলার ইচ্ছে হয়েছিল ।
    ইমলিতলার বাড়িতে কলের জল ছিল না ; বড়োজ্যাঠা তো এক বালতিতে চান সেরে অফিসে চলে যেতেন, জল ভরে এনে দেবার লোক না এলে, দুপুরে বাবা যখন দোকান থেকে আসতেন, অনেকসময়ে নিজের চান করার জল নিজেই কল থেকে ভরে আনতেন । শীতকালেও ঠাণ্ডা জলে স্নান করতেন । দাদা আর আমি ইমলিতলার রাস্তার কলে, শৈশবে ল্যাংটো পোঁদে, আর পরে গামছা পরে, চান করেছি, আর মা-জেঠিমার জন্য জল ভরে এনেছি । খুড়তুতো-জাঠতুতো ভাইবোনরাও ফ্রক-প্যান্টুল পরে রাস্তার কলে চান করে আসতো । পরে চান করার ঘরে একটা জলের চৌবাচ্চা তৈরি করানো হয়েছিল, শিউনন্নি নামে যে খাওয়া-পরার চাকর রাখা হয়েছিল, সে ভরে এনে দিতো। দাদা-মেজদা-আমি তবুও রাস্তার কলে চান করে আনন্দ পেতুম, হইচই চেঁচামেচি করতে পারতুম পাড়ার অন্য ছেলেদের সঙ্গে । বাড়িতে বন্ধু বলতে আমার কেউ ছিল না ; দাদা আমার চেয়ে পাঁচ বছরের বড়ো, মেজদা মনে করতো আমি ওর চেয়ে ছোটো আর আমার অভিজ্ঞতা ওর চেয়ে কম, বন্ধু হবার অযোগ্য । বোনেরা নিজেদের পুতুল ঘরকন্না নিয়ে খেলতো । আমি এই সময় থেকেই একা থাকায় অভ্যস্ত হয়ে যাই । ঘরে বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত অন্ধকারে বন্ধ থাকার দরুনও একাকীত্ববোধ গড়ে উঠেছিল শৈশব থেকেই ।
    বাবার নির্দেশ ছিল যে বাড়ির সব কাজ আমাদেরও করতে হবে, খাবার জল ভরে আনা ছাড়াও, প্রয়োজনে কয়লা ভাঙা, উনোন পরিষ্কার, জঞ্জালের গাদায় গিয়ে জঞ্জাল ফেলে আসা । ২০০৫-২০০৮ নাগাদ আমি কলকাতায় নাকতলা পাড়ায় রাস্তা থেকে খাবার জল ভরে আনতুম, পেপসির বোতলে করে, কেননা পঞ্চাশ বছরের পুরোনো বাড়ির তিনতলায় কোনো ভারি জলের টিন নিয়ে, বা মিনারাল ওয়াটারের কুড়ি লিটার বোতল নিয়ে কোনো রিকশাঅলা বা দোকানদারের লোক উঠতে চাইতো না, হয়তো পারতো না, বেশিরভাগই তো প্যাংলা, কিংবা পাড়ার রাজনীতির দরুণ কেউ সাহায্য করতে চাইতো না । বাড়ির সিঁড়িগুলোর ধাপ বেশ উঁচু আর অন্ধকার ছিল, উইপোকা ধরা আরম্ভ করেছিল সারা দেয়াল জুড়ে । দাদার ব্রহ্মপুরের বাড়ি বেড়াতে গেলে সেখান থেকেও থলেতে বোতল ভরে আমি আর আমার স্ত্রী সলিলা দুজনে জল আনতুম ।
    বাবা চিরকাল সাদা পাঞ্জাবি, ধুতি আর পায়ে পামশু পরতেন । তাঁর ভাইয়েরা সাদা এবং অন্যান্য রঙের শার্ট-পাঞ্জাবি পরলেও বাবার পোশাকের অন্যথা হতো না, শীতকাল ছাড়া, যখন উনি নস্যি রঙের শাল গায়ে দিতেন, বা ওই রঙের উলের পাঞ্জাবি পরতেন । দোকানে যাবার তাড়ায় বাবার দ্রুত হাঁটা অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল । ইমলিতলায় থাকতে দুবার দোকানে যাবার পথে ওনার পা ভেঙে গিয়েছিল, যে পথ দিয়ে যেতেন তা ছিল গ্র্যানাইট পাতা, চালডালের পাইকারি আড়ত ছিল সে রাস্তায়, আর গোরুর গাড়ি চলাচলের ফলে চকচকে হয়ে গিয়েছিল পাথরগুলো । ইংরেজদের সময়ে পাতা, কখনও বদলাতে দেখিনি । বাবার পা ভাঙা মানে আর্থিক দিক দিয়ে বেশ বিপজ্জনক অবস্হা ; দাদাকে গিয়ে দোকানে বসতে হতো । উত্তরপাড়া থেকে চাকুরিহীন কোনো জ্ঞাতির ছেলেকে নিয়ে এলেও তাদের অবাঙালি পরিবেশে মানিয়ে নিতে এতোই অসুবিধা হতো যে কয়েক সপ্তাহেই ফেরত চলে যেত । নিতাই নামে পঁচিশ বছরের এক জ্ঞাতি-যুবক এসেছিল, সে বলত মায়ের জন্য ওর ভিষণ মনকেমন করে, কাঁদতো রাতের বেলায় । পরে দরিয়াপুরে গিয়ে বাবার যখন আরেকবার পা ভেঙেছিল, আমি দোকানদারি করেছি ।
    গরিব হলে যা হয়, গতি কেবল সরকারি হাসপাতাল, সেখানে কিউ, কেননা প্রাইভেট কোনো নার্সিং হোম ছিল না পাটনায় সেসময়ে ; এখন তো প্রতিটি রাস্তায়-গলিতে একজন করে হাড়ের ডাক্তার । বড়োজেঠিমার এক বিহারি বান্ধবি, সেই বাজাজা পাড়ায় থাকার সময় থেকে জানাশোনা, তার স্বামী ছিল ছুতোর । বাবার পা ভেঙে যেতে জেঠিমার বান্ধবীর কথামতো, বাবার পায়ে বসাবার জন্য ছুতোরকে দিয়ে কাঠের খাপ তৈরি করিয়ে পায়ে বেঁধে রাখার ব্যবস্হা হয়েছিল । প্রথমবার বানিয়ে দেয়া খাপটা দ্বিতীয়বার কাজে লেগেছিল । হাংরি আন্দোলনের সময়ে কলকাতার পুলিশ এসে দরিয়াপুরের বাড়ি লণ্ডভণ্ড করার সময়ে, এটা আবার কি প্রশ্ন তুলে একটা খাপকে, যেটায় ফাটল ধরে গিয়েছিল, ভেঙে ফ্যালে ।
    বিহার ন্যাশানাল কলেজের সামনে যে দোকান ছিল, সেই বাড়ির মালিক উঠে যাবার নোটিস দিলে, বাবা পড়েন মহাবিপদে । বিকল্পের সন্ধানে বেরিয়ে, তিনি তখনকার নিচলি সড়ক, যার নামকরণ হয়েছে বারি রোড, পাটনা কলেজিয়েট স্কুলের সামনে, দরিয়াপুর পাড়ায় একটা চালাবাড়ি কেনেন ; সেটা ছিল একজন কামারের হাপর বসানো ঘর, পেছনে আর পাশে সামান্য ঝোপ । এই এলাকাটাও সেসময়ে গরিবদের পাড়া ছিল বলে কেনা সম্ভব হয়েছিল, ধারণার অতীত দুস্হ সুন্নি মুসলমানদের পাড়া, ছাইয়ের গাদা, জঞ্জালের পাহাড়ের ভেতর দিয়ে যাতায়াত তাদের, ইমলিতলার শিয়া মুসলমানদের চেয়েও দয়নীয় হালত । কিন্তু আমি এই পাড়ায় এসে প্রথম জানতে পেরেছিলুম যে মুসলমানদের মধ্যেও ভাগাভাগি আছে, পরবের আচরণের তফাত আছে, এমনকি তাদের মসজিদও আলাদা, নিজেদের মধ্যে দাঙ্গাও বাধায় । ইমলিতলার শিয়া মুসলমানরা মহরমের সময়ে তাজিয়া বের করত তা দরিয়াপুরের মুসলমানরা অনুমোদন করত না, শিয়ারা নিজের পিঠ চাবকে রক্তারক্তি করত তাও অনুমোদন করত না এরা । শৈশবেই জেনে গিয়েছিলুম যে এক পক্ষের আলোচনা করা যাবে না আরেকপক্ষের সঙ্গে । ইমলিতলায় চোর-পুলিশ খেলার সময়ে শিয়া মসজিদে দাঁড় করানো মাদুরের পেছনে লুকোলে ইমাম সাহেব কিছু বলতেন না ; দরিয়াপুরের পাড়ার মসজিদের দরোজায় গিয়ে দাঁড়ালেও জিগ্যেস করা হতো কী চাই, জুতো চুরি করতে এসেছিস বোধহয়, ইত্যাদি।
    দরিয়াপুরে যখন বাড়ি তৈরি হচ্ছিল তখন ওই বাড়িতে আমি একা থাকতুম, কেননা ইমলিতলার প্রাত্যহিক মাতালদের চেঁচামেচি আর ঝগড়াঝাঁটির দরুন পড়তে বসতে অসুবিধা হতো । তাছাড়া দরিয়াপুরে ইলেকট্রিসিটি ছিল, জলের কল ছিল । ছোটোদের হাতখরচের জন্য বাবা টাকা দিতেন না, বলতেন, যার যা চাই জানিয়ে দাও, কিনে এনে দেব । স্কুলের ফলাফলের রিপোর্টে বাবা কখনও কাউকে গুড দিতেন না, ভাইবোন সকলের রেজাল্ট তদারক করার দায়িত্ব ওনার ওপরেই বর্তেছিল । নব্বুইয়ের কোটায় মার্কস পেলেও গুড দিতেন না, বলতেন, আরও ভালো ফলাফল করতে হবে । দরিয়াপুরের বাড়িতে একা থাকলে আমার চরিত্রদূষণ ঘটতে পারে অনুমান করে বছরখানেক পরে মা আর বাবা রাতে শুতে আসতেন । মা টিফিন ক্যারিয়ারে করে রাতের খাবার আনতেন ; ইমলিতলা থেকে দরিয়াপুর এককিলোমিটার পথ হেঁটেই আসতেন আর সকালে ফিরে যেতেন । দিনের বেলায় ইমলিতলায় গিয়ে খেতে হতো । দরিয়াপুরের বাড়িতে একা থাকার সময়ে বন্ধুদের সাথে চরিত্রদূষণের সুযোগ যে নিইনি, তা নয় । কনভেন্ট ছেড়ে রামমোহন রায় সেমিনারি স্কুলে পড়ার সময়ে স্কুলের আর তারপর কলেজের সহপাঠীরা এসে জড়ো হতো ।
    বাবা আর মা দুজনেই মন্দিরে গিয়ে পুজো দেয়া বা তীর্থে যাওয়া ইত্যাদিতে আগ্রহী ছিলেন না, দোকান বন্ধ করে বাবার পক্ষে যাওয়া অসম্ভব ছিল ; আমার মনে হয় কাজের চাপে উনি আচরণ-আলগা করে ফেলেছিলেন নিজেকে । আমি তাঁদের কখনও বাড়ি ছেড়ে বাইরে বেড়াতে যেতে দেখিনি ; মায়ের পাণিহাটি যাবার ইচ্ছে হলে, বাবা পৌঁছে দিয়েই পাটনা ফিরে আসতেন, উত্তরপাড়াতেও থাকতেন না, কেবল ঠাকুমার সঙ্গে দেখা করে আসতেন । বড়োজ্যাঠা ছাড়া মেজজ্যাঠা আর কাকারা কেউ মন্দির যাওয়া বা তীর্থভ্রমণ ইত্যাদিতে আগ্রহ দেখাননি, কখনও তাঁদের দেখিনি কোথাও বেড়াতে যেতে । তাই কোতরঙের জমিতে মন্দির তৈরি করে ছোটোকাকা যখন ধর্মকর্ম শুরু করলেন তখন বাড়ির সবাই তাঁর ও ছোটোকাকিমার উদ্দেশ্য সম্পর্কে সন্দিহান ছিলেন ; তাঁদের সন্দেহ যে অহেতুক ছিল না তা ওনাদের কাজকারবার থেকে পরে টের পাওয়া যায় ।
    উত্তরপাড়ায় যেতে হলে প্রথমে হাওড়া গিয়ে ফিরতি প্যাসেঞ্জার ট্রেনে কিংবা ব্যাণ্ডেলে নেমে স্টিম ইনজিনে টানা প্যাসেঞ্জার ট্রেন নিয়ে উত্তরপাড়া যেতে হতো । হাওড়া বা ব্যাণ্ডেলে নেমে ইমলিতলার পোশাক পালটে ‘ভদ্র’ পোশাক পরতে হতো আমাকে-দাদাকে । একবার তাড়াহুড়োয় হাওড়া স্টেশানে আমাকে ভদ্র পোশাক পরাতে গিয়ে পোঁদ-ছেঁড়া প্যাণ্টের ছেঁড়ার ভেতর একটা পা পরিয়ে উত্তরপাড়া পৌঁছোলে ঠাকুমা প্যান্টটা তখনই খুলে জঞ্জালে ফেলে দিয়ে বলেছিলেন, “একে ল্যাংটো পোঁদেই এর মামাদের কাছে নিয়ে যা” ।
    ধর্মকর্ম বলতে বাবা নিয়মিত পৈতে বদলাতেন, পৈতে তৈরি করে দিয়ে যেতেন পুরুতমশায় সতীশ ঘোষাল, জ্যাঠা-কাকা সকলেরই, বাবা ছাড়া জ্যাঠা-কাকারা গলায় মালার মতন করে পরতেন, মেজজ্যাঠা কখনও পরতেন, কখনও পরতেন না, কুলুঙ্গিতে তুলে রেখে দিতেন, জিগ্যেস করলে বলতেন, গলায় ফাঁসের মতন লাগে বলে পরি না । ফলে ওনার পৈতে এক বছর চলে যেতো । বাবা একাদশীর দিন রাতে লুচি খেতেন, দিনের বেলা উপোস করতেন । তাঁর ভাইরা কেউই একাদশী পালন করতেন না । ইমলিতলার বাড়িতে আমিষের দিন নিরামিষের দিন বলে কোনো ব্যাপার ছিল না । একাদশী রবিবারে পড়লে বড়োজ্যাঠা অবশ্যই মাংস আনতেন । পাঁঠার মাংস । মুর্গি আর মুর্গির ডিম ছিল নিষিদ্ধ, বিনা আঁশের মাছ ছিল নিষিদ্ধ।
    কালীঘাটের কালী আমাদের , মানে সাবর্ণ চৌধুরীদের, পারিবারিক দেবতা, কোনো পূর্বপুরুষ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, সেকারণে বাড়িতে পারিবারিক দেবতা আর তার সেবাযত্নের আড়ম্বরের প্রয়োজন হয়নি। দাদার আর আমার ছোটোবেলায় পৈতে হয়েছিল বটে, তবে আমরা বছরখানেকেই স্বরূপে এসে তাকে জলাঞ্জলি দিয়েছিলুম। পৈতেহীন হবার ফলে বাবা ক্ষুন্ন হয়েছিলেন বলে মনে হয় না ; এই প্রসঙ্গে কখনও কোনো কথা তোলেননি । শৈশবে বাবা পাকা চুল তুলে দিতে বলতেন, পাকাচুল তোলার সময়ে মনু, মেজজ্যাঠার মেয়ে মীনাক্ষী, দুষ্টুমি করে বাবার পৈতে কাঁচি দিয়ে কেটে দিয়েছিল, ওর সুতোর প্রয়োজন ছিল ; বাবা কিন্তু বিরক্তি প্রকাশ করেননি, বলেছিলেন, “সুতো চাই বললেই তো হতো, কতো টোয়াইন সুতোর রিল পড়ে আছে দোকানে।”
    বাবা আমাদের বাড়ির ক্ষমতাকেন্দ্র হলেও, ছোটোদের কাউকে শাসন করতেন না, তাঁর কাছে অভিযোগ জানালে তিনি বলতেন, “অ, ও শুধরে নেবে ।” তারপর যার বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়েছে তাকে বলতেন, “কী, শুধরে নিবি তো ? বড়ো হয়েছিস, শুধরে নিতে শেখ।” শাসন করতেন বড়োজ্যাঠা, নিজে থেকে সচরাচর নয়, জেঠিমা-কাকিমারা অভিযোগ করলে, যদিও শাসন করতে হবে বলে বিরক্ত হতেন । ওনার নস্যতে মেলাবার আতরে হাত দিলে অবশ্য ক্রুদ্ধ হতেন, তখন যে অপকর্মটি করেছে তার হাতের চেটোয় পড়ত শরকাঠির বাড়ি, যা দুয়েকবার মারলেই ভেঙে যেতো, রাগ প্রশমিত করার জন্য । এতো ঝাঁঝালো গন্ধ ছিল যে হাত শুঁকেই টের পেয়ে যেতেন কে অপরাধটি করেছে । বড়োজ্যাঠা নস্য সুগন্ধী করে একটা ছোটো কৌটো মাকে দিতেন, কেননা পায়খানায় ঢোকার সময়ে তলাকার ঠোঁটে এক টিপ নস্য চিপে পায়খানায় যাওয়ার অভ্যাস ছিল ওনার ।
    বড়োজ্যাঠার দুই মেয়ে, সাবিত্রী আর ধরিত্রীর বিয়ে আমার শৈশবেই হয়ে গিয়েছিল, তার কোনো স্মৃতি ধরে রাখতে পারিনি । মেজজ্যাঠা আর কাকাদের মেয়ের বিয়ের ব্যবস্হা করেছিলেন বাবা, কেননা তাঁদের শৈল্পিক উদাসীনতায় ওদের বয়স বেড়ে যাচ্ছিল ; তাছাড়া বিয়ের খরচের ব্যাপারটাও ছিল । মেজজ্যাঠার ছোটো মেয়ে মনু বা মীনাক্ষী একজন বিহারি ছেলেকে ভালোবেসে বিয়ে করতে চাইলে, মেজজ্যাঠা অমত জানান । মেজজ্যাঠার অমত হওয়ায়, বাবা তাঁকে বোঝানো সত্ত্বেও তিনি রাজি হননি ; তাঁর বিরুদ্ধতা করে বাবা নিজে অংশ নিতে চাননি, আমাকে টাকাকড়ি দিয়ে বলেন, “ওরা কোথায় গিয়ে বিয়ে করতে চাইছে, সেখানে গিয়ে সম্প্রদান করে আয়।” সে এক মজার অভিজ্ঞতা, যেতে হয়েছিল খুসরুপুর নামে একটা ধাদ্ধাড়া গোবিন্দপুরের মন্দিরে, গিয়ে দেখি, সার বেঁধে বিয়ে হচ্ছে চত্ত্বরে । আমাকে একটা গোলাপি ধুতি দেয়া হয়েছিল, প্যাণ্ট খুলে পরে নিয়েছিলুম, তারপরে সম্প্রদান, বাঙালিদের বিয়ের মতন নয়, বা শহুরে বিহারিদের বিয়ের মতন নয় । ফেরার সময়ে পাটনা স্টেশানে নেমে রঙিন ধুতি খুলে প্যান্ট পরে নিয়েছিলুম ।
    মা মারা যান লখনউতে আমার কাছে থাকার সময়ে, ১৯৮২ সালের ১৮ই নভেম্বর হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে । বাবা মারা যান পাটনায়, ১৯৯১ সালের ৮ই অক্টোবর, তখন তিনি কাজ থেকে অবসর নিয়েছেন আর দোকান চালানো আরম্ভ করেছে দাদার বড়ো ছেলে টোটোন বা হৃদয়েশ । আমার এটাই প্রধান রিগরেট যে বাবাকে আমি মুম্বাইতে নিয়ে আসিনি, তখন তো আমি মুম্বাইতে চাকরি করছি, বেশ বড়ো ফ্ল্যাট পেয়েছি সান্টাক্রুজে, আশেপাশে নামকরা হাসপাতাল । মায়ের মৃত্যু সম্পর্কেও রিগরেট থেকে গেছে যে প্রতিবেশী হায়দার আলিকে না জানিয়ে প্রাইভেট হাসপাতালে ভর্তি করেছিলুম । নবাব পরিবারের হায়দার আলির প্রভাব ছিল সরকারি হাসপাতালে, আর লখনউতে সেসময়ে প্রাইভেট হাসপাতালের তুলনায় সরকারি হাসপাতালে যন্ত্রপাতি আধুনিক ছিল, ডাক্তাররা ছিল অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ।

    আকস্মিক শিক্ষাছত্র
    আমার চরিত্রগঠনে বা বিগঠনে খাঁটি অবদান মহাদলিতদের পাড়া ইমলিতলা ; সেখানকার অভিজ্ঞতা আমাকে শিক্ষিত করে তুলেছে, শিখিয়েছে মানসিক-ঔদার্য, সারগ্রাহীতা, তার প্রতিটি বাসিন্দা ছিল প্রতিষ্ঠানবিরোধী, বেপরোয়া, গোলমালকারী, স্হিতাবস্হাবিরোধী, যারা নিজেদের বলতো “দুনিয়াকা নাসুর”, মানে পৃথিবীর এমন নালি-ঘা যা সারে না, প্রথমে বিদেশি ও পরে স্বদেশি সরকার তাদের জীবনযাত্রার লড়াইকে মনে করেছে প্রতিরোধ-প্রতিবাদ, মনে করেছে মৌরসি-পাট্টার শত্রু, তাদের মনে করেছে বিপজ্জনক, অথচ তা ছিল ওদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা । জীবনকেচ্ছা প্রায় প্রতিদিনই ঘটতো ইমলিতলা পাড়ায় কিন্তু সেসব নিয়ে বাঙালি মধ্যবিত্তের মতন কেউই খিক-খিকে হাসি হাসতো না ।
    আর অবশ্যই বাড়ির-দোকানের দুই কাজের লোক, শিউনন্নি আর ডাবর । ১৯৫৫ সালে বি এন কলেজের ছাত্র ইউনিয়ানের জুলুসে আমি সামনের দিকে হাঁটছিলুম, আমার আর তরুণ শুরের হাতে ব্যানার, কোথা থেকে ডাবর ছুটে এসে আমার হাত ধরে বলল, “ই সব মত কিজিয়ে, মারে যাইয়েগা।” কয়েকদিন আগেই পুলিশের গুলিতে দীনানাথ পাণ্ডে নামে এক ছাত্র মারা গিয়েছিল, অকারণেই পুলিশ গুলি চালিয়েছিল, কেননা ছাত্রদের দাবি ছিল বাসের সংখ্যা আর সময় বাড়ানোর । প্রতিবাদ করতে বেরিয়েছিলুম আমরা, দাবি ছিল জুডিশিয়াল এনকোয়ারির । শেষে নেহেরুকে এসে বক্তৃতা দিয়ে ছাত্রদের শান্ত করতে হয়েছিল ; মুখ্যমন্ত্রী এস কে সিং অবস্হা সামলাতে হেগে ফেলার পর । তখনই নেহেরুকে একেবারে সামনে থেকে দেখেছিলুম । হাবভাব দেখে মনে হয়েছিল বেশ উন্নাসিক মানুষ ।
    আমি আমার সহ্যশক্তি আর যুঝে যাবার ক্ষমতা ইমলিতলা পাড়া থেকেই পেয়েছি : হাতকড়া, কোমরে দড়ি, জেলহাজত, শত্রুদল, কুখ্যাতি, অপমান, অপপ্রচার, বিরোধিতা, কটূ মন্তব্য, বিশ্বাসঘাতকতা ।
    ইমলিতলাতেই জেনেছি, প্রতিটি নারীর দেহে নিজস্ব সুগন্ধ থাকে যা শহুরে মহিলারা পারফিউম মেখে নষ্ট করে ফ্যালে , পারফিউম জিনিসটা তাই আমার পছন্দও নয় , পাড়ার সকলের বাসার মতনই আমাদের বাড়িতেও কলিং বেল ছিল না, বাড়ির কারোর সঙ্গে দেখা করতে হলে তার নাম ধরে ডাকতে হতো , নাম ধরে ডাকার এই বাচনিক সম্পর্ক হারিয়ে গেল ইমলিতলা ছাড়ার পর , ইমলিতলার দিনগুলো নিজস্ব রঙে আর গন্ধে দেখা দিতো, রাতগুলো দেখা দিতো কেরোসিন লন্ঠন আর রেড়ির তেলের লম্ফর শিখায় । কাউকে কখনও সোনার গয়না পরতে দেখিনি ইমলিতলায়, রুপোর গয়না কেবল বিয়েতে । আমি সোনার আঙটি পেয়েছিলুম আমার উপনয়নে, যা আমি খুলে পরিয়ে দিয়েছিলুম আমার প্রথম আর শেষ রোমান্টিক প্রেমিকাকে, সে পরে ওই আঙটি পরিয়ে দিয়েছিল তার নতুন প্রেমিককে, যাকে সে বিয়ে করেছিল আর পরে ডিভোর্স দ্যায় ; জানিনা সেই আঙটির কী হল শেষ পর্যন্ত, কেননা ওর বর ছিল স্মাগলার । স্মাগলারকে বিয়ে করে ওর বিখ্যাত বক্তব্য মনে রেখেছি, “টাকা হল ডলারের বেজন্মা বাচ্চা”।
    ইমলিতলার মসজিদে লাউডস্পিকার ছিল না ; রমজানের সময়ে একজন ফকির ভোর রাতে গান গাইতে-গাইতে যেতো যাতে পাড়ার মুসলমান পরিবারের সদস্যদের ঘুম ভেঙে যায় । সেই ফকিরের এক হাতে সাপের মতন ব্যাঁকা ছড়ি আর অন্য হাতে লাউয়ের মোটা খোসা শুকিয়ে তাতে লোবানের ধোঁয়া।
    মা, বাবা আর শিক্ষক, যে তিনজন মানুষ ব্যক্তিজীবনের অভিমুখ গড়ে দ্যান, আমার জীবনে মা আর বাবার ভূমিকাই প্রধান । প্রকৃত অর্থে প্রাইমারি স্তরে কনভেন্ট ছাড়া, রামমোহন রায় সেমিনারি স্কুলে এবং পরে কলেজে ও বিশ্ববিদ্যালয়ে, আমি কোনো শিক্ষকের নৈকট্য এবং পথনির্দেশ ও বন্ধুত্ব পাইনি, সমাজে শিক্ষকের অবদানের অবনমন তখন থেকেই শুরু হয়ে গিয়ে থাকবে । এখন তো শিক্ষকতা ব্যবসায়ের পর্যায়ে চলে গেছে । স্কুল শিক্ষকরা স্কুল ছেড়ে কোচিং আর প্রাইভেটে পড়ানোয় বেশি রোজগার করছেন । রামমোহন রায় সেমিনারিতে আমি ক্রমশ মূর্খ হয়ে যাচ্ছিলুম ; বেঁচে গিয়েছিলুম উঁচু ক্লাসের ছাত্রী আর স্কুলের লাঞ্চ পিরিয়ডের সময়ের গ্রন্হাগারিক নমিতা চক্রবর্তীর কারণে ; সিসটার আইরিনের পর উনিই আমার প্রকৃত শিক্ষক । সিসটার আইরিন আর নমিতা চক্রবর্তীকে মনে করলেই আঁচ করতে পারি যে ওনাদের অস্তিত্বে কোথাও অবিনশ্বরতা ছিল, যার কিছুটা ধুলো আমায় মাখিয়ে দিয়ে গেছেন ওনারা ।
    কনভেন্ট বা ক্যাথলিক ইশকুলে ভর্তি হবার ঘটনাটাও ঐন্দ্রজালিক কেননা স্হানীয় ক্যাথেড্রালের যাযক ফাদার হিলম্যান, যিনি প্রচুর ফোটো তুলতেন, প্রায়ই আসতেন বাবার ফোটোর দোকানে, ওনার তোলা ফোটো ডেভেলাপ ও প্রিন্ট করাবার জন্য আর উনি বলতেন ভারত হল রামধনুর সাতটি রঙের বিস্ফোরণ । বাবার সঙ্গে ওনার প্রায় বন্ধুত্বের সম্পর্ক হয়ে গিয়েছিল । একদিন বাবা আমাকে দোকানে নিয়ে গিয়েছিলেন, খেলছিলুম, অসিযুদ্ধ করছিলুম অদৃশ্য দৈত্য-দানবদের সঙ্গে, সেসময়ের বক্স ক্যামেরায় ব্যবহৃত ফোটোর নেগেটিভের আস্তরণ, লম্বা লাল রঙের কাগজ দিয়ে পাকানো লাঠি নিয়ে, যা বাবার দোকানের কাজের লোক রামখেলাওন সিং ডাবর তৈরি করে দিয়েছিল। সেসময়ে ডিজিটাল ফোটোগ্রাফি আবিষ্কার হয়নি, শৌখিন ফোটো-তুলিয়েরা ক্যামেরাগুলো দিয়ে সাধারণত বারোটা বা ষোলোটা সাদা-কালো ফোটো তুলতো । ফিল্মের রিলগুলো হতো কাচকড়ার আর তার ওপরে লাল কাগজের আস্তরন । ফাদার হিলম্যানের মতন ধবধবে ফর্সা মানুষ আমি তার আগে দেখিনি ; মানুষের গায়ের রঙ এরকমও হয়, জেনে অবাক লেগেছিল ; ওনার পোশাকও এমন যে পুরো শরীর শাদা কাপড়ে ঢাকা, শুধু হাত দুটো বেরিয়ে, চুল সোনালী, চোখ কটা, এরকম চুলও দেখিনি আগে ।
    ফাদার হিলম্যান বাবাকে বলেন, “একে স্কুলে ভর্তি করেননি কেন এখনও ? এই বয়সে যা পড়বে স্মৃতিতে আজীবন থেকে যাবে ।” বাবা জানান, “কোনো স্কুলে তো এতো ছোটো বাচ্চাকে ভর্তি করা হয় না, আর কনভেন্টে পড়াবার সামর্থ আমার নেই, কেননা আমার আর আমার ভাইদের খরচের পর কিছুই বাঁচে না । আমার বড়ো ছেলে যে সরকারি স্কুলে পড়ে সেখানেই একে ভর্তি করব দুই বছর পরে।” ফাদার হিলম্যান বাবাকে বলেছিলেন. কনভেন্টে এতো ছোটো বাচ্চাদের একটা ক্লাস আছে, তার নাম ট্র্যানজিশান ক্লাস, আপনি কালকে একে নিয়ে আসুন আমি ভর্তি করে নেবো, নেভি ব্লু হাফপ্যান্ট, শাদা হাফ শার্ট আর নটিবয় শুজ কিনে নিন আজকে, টাই স্কুল থেকেই দেয়া হয়, ফিসের কথা ভাববেন না, মুকুব করার ক্ষমতা আমারই । সেদিনই বিকেলে স্কুলের ড্রেস কিনে দিলেন বাবা, এতো বাবুলাট পোশাক আগে পরিনি কখনও, জুতো পরে বাড়িতে গটগটিয়ে হেঁটে দেখালুম সবাইকে । রান্নাঘরের সারাদিনের কাজ সত্ত্বেও মা ঘটিতে গরম জল ভরে শার্ট-প্যান্ট ইস্তিরি করে দিতেন ।
    পরের দিন সকাল নটায় গিয়ে ভর্তি হয়ে গেলুম কনভেন্ট স্কুলে । জন্মদিন নির্ধারণ করলেন ফাদার হিলম্যান, দোসরা নভেম্বর । ভর্তি হয়ে টের পেলুম যে ইংরেজি ছাড়া অন্য ভাষায় কথা বললে শাস্তি পেতে হয় । ইংরেজি কেন, আমি তখন বাংলা আর হিন্দিও ভালো করে বলতে পারতুম না । চুপ থেকে, মাথা নেড়ে, কাজ চালাতে চালাতে রপ্ত হল ভাঙা-ভাঙা ভাষা । ফাদার হিলম্যান ছিলেন জার্মান, কিন্তু ইংরেজি আর হিন্দিতে কথা বলতে পারতেন ।
    ভর্তি করিয়ে বাবা বলেছিলেন, “দুপুরে রাম খেলাওন সিং ডাবর টিফিন নিয়ে আসবে, আর ছুটির সময়ে ওর সাইকেলে করে বাড়ি ফিরবি । রোজই রামখেলাওন নিয়ে আসবে আর নিয়ে যাবে, কাল থেকে টিফিন নিজের সঙ্গে আনবি ।” এই স্কুলটা দাদার পাটনা কলেজিয়েট স্কুল থেকে আলাদা ; দাদার স্কুলে ঢুকেই দুধারে দুতলা ক্লাসবাড়ি, মাঝখানে সোজা পিচরাস্তা, বাড়ির পেছন দিকে দুটো বিশাল খেলার মাঠ, যেখানে ফুটবল আর ক্রিকেট খেলা হয়, আমি ওই মাঠে স্কুটার চালাতে শিখেছিলুম । ক্যাথলিক স্কুলে ঢুকেই একজন বউয়ের পাথরের মূর্তি, তার কোলে বাচ্চা, পেছনদিকে একজন লম্বা-দাড়ি মানুষ দাঁড়িয়ে, তার পায়ের কাছে দুটো ভেড়ার বাচ্চা । পরে ফাদর হিলম্যান হিন্দিতে জানিয়েছিলেন যে মাদার মেরির কোলে যিশু আর পেছনে সেইন্ট জোসেফ । মাদার মেরি ভার্জিন আর যিশুর বাবা হলেন ঈশ্বর স্বয়ং, মাদার মেরির বিয়ে হয়নি কেননা ঈশ্বরের সঙ্গে তো বিয়ে হতে পারেনা । ভার্জিন বলতে যে কী বোঝায় তার জ্ঞান হয়েছিল পরের স্কুল রামমোহন রায় সেমিনারিতে গিয়ে ।
    কনভেন্টের গেটের ভেতর ঢুকলে বাঁদিকে একটা সবুজ ঘাসের মাঠ, ছাত্র-ছাত্রীরা খেলছে, ডানদিকে ফুলের বাগান। যে ছাত্র-ছাত্রীরা খেলছে, কয়েকজনের গায়ের রঙ ফাদার হিলম্যানের মতন ফর্সা, চুলও সোনালী, কালো তো নয়ই । কেউই ওই বাগানে যাচ্ছে না, ফুল তুলছে না দেখে অবাক লাগল । ইমলিতলার ছেলেরা দেখতে পেলে সব ফুল উজাড় করে তুলে নিয়ে গিয়ে দুর্গামাতার মন্দিরের সামনে বিক্রি করতে বসে যেতো, বিক্রি না করলেও চিবিয়ে মুচড়ে নষ্ট করে হাহা হিহি হাসতো সবাই মিলে । দাদার স্কুলে মাঠগুলো কনভেন্টের মাঠের চারগুণ বড়ো, তাতে বিশেষ ঘাস নেই । কনভেন্টের মাঠের মাঝখানে একটা গাছ, তার তলায় অজস্র ছোটো-ছোটো সাদা ফুল পড়ে রয়েছে, সেগুলোও কেউ তুলছে না । বাবা বলেছিলেন, ওটা বকুল ফুলের গাছ । তার আগে আমি বকুল ফুল দেখিনি ; ডানদিকের বাগানে যে ফুলগুলো হয়ে আছে সেগুলোও দেখিনি আগে । বাড়িতে দেখেছি শুধু গ্যাঁদা, গোলাপ, রজনীগন্ধা, বেলি, জবা আর জুঁইফুল, যখন বড়োজেঠিমা সত্যনারায়ণ পুজোর ব্যবস্হা করেন সংক্রান্তির দিন তখন; রামখেলাওন সেসব ফুল গিয়ে গঙ্গায় ফেলে আসে । কনভেন্টের ফুল গাছেই শুকিয়ে ঝরে যায় ।
    ঢং ঢং করে ঘণ্টা বাজতেই, ছাত্র-ছাত্রীরা, কোথায় সবাই এতক্ষণ ছিল জানি না, ছুটে এসে ডানদিকের বকুলগাছের মাঠে সার দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল ; ছোটোরা সামনে আর বড়োরা পেছনে, পাঁচটা সারি। একজন সিসটার, তিনিও ধবধবে সাদা, আমার হাত ধরে নিয়ে গিয়ে একটা সারির সামনের দিকে ছোটোদের সঙ্গে দাঁড় করিয়ে দিলেন আর আমার হাত দুটো নিয়ে হাতজোড় করিয়ে দিয়ে চলে গেলেন । সিসটাররা আর ফাদার হিলম্যান আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে আমাদের দিকে মুখ করে ইংরেজিতে গানের মতন করে কথা বলা আরম্ভ করলেন আর ছাত্র-ছাত্রীরা সকলে তাঁদের সঙ্গে সেগুলো বলতে লাগল । প্রতিদিন শুনে-শুনে একসময়ে মুখস্হ হয়ে গেলে আমিও বলতুম, কিন্তু তখন মানে জানতুম না, জানতুম না যে একে বলে প্রেয়ার বা প্রার্থনা। না জেনে যে ঈশ্বরের বন্দনা গান গেয়েছি, জানার পর যাঁর সম্পর্কে আমি আজও কিছুই জানি না, তার প্রার্থনাটা এরকম :-
    আওয়ার ফাদার ইন হেভেন
    হোলি বাই ইয়োর নেম
    ইয়োর কিংডাম কাম
    ইয়োর উইল বি ডান অন আর্থ অ্যাজ ইন হেভেন
    গিভ আস টুডে
    আওয়ার ডেইলি ব্রেড
    অ্যাণ্ড ফরগিভ আস আওয়ার সিনস
    অ্যাজ উই ফরগিভ দোজ
    হু সিন এগেইনস্ট আস
    ডু নট ব্রিং আস টু দি টেস্ট
    বাট ডেলিভার আস ফ্রম ইভিল
    আমেন ।
    প্রার্থনা শেষ হতেই সবাই নিজের ক্লাসের দিকে দৌড়োলো । আমাকে একজন সিসটার হাত ধরে একটা ঘরে নিয়ে গিয়ে সেই ঘরে যে সিসটার তখনই এসেছিলেন, তাঁকে কিছু বললেন ।
    ‘সিন’ ব্যাপারটা যে কি তা তখন জানতে পারিনি, এখনও জানি না । এখন যা জানি তার নাম গিল্ট।
    স্কুলে আমার ট্র্যানজিশান ক্লাসের শিক্ষিকা ছিলেন সিস্টার আইরিন, আমার প্রথম ক্রাশ, যাঁকে পরে সেকেন্ড স্ট্যাণ্ডার্ডেও পেয়েছিলুম । উনি এসেছিলেন আয়ারল্যাণ্ড থেকে । ফাদার হিলম্যানের মতন উনিও ধবধবে ফর্সা, কিন্তু ওনার মাথা পুরোপুরি ঢাকা, শরীরও শাদা কাপড়ে ঢাকা । ওনার চোখের তারা কালো আর গভীর ছিল, দাঁত ঝকঝকে সাদা, ঠোঁট গোলাপি । প্রথমদিন উনি নিচু হয়ে আমার মুখের কাছে মুখ এনে যা বলেছিলেন তা আমি বুঝতে পারিনি ; মনে আছে সিসটার আইরিনের চোখের তারায় আমার প্রতিচ্ছবি । উনি কয়েকটা পুস্তিকা আর একটি বই দিলেন, সবই ব্রিটেনে ছাপা, কার্ডও দিলেন একগোছা। মনে আছে, সেগুলো ছিল যিশুখ্রিস্টের, মাদার মেরির আর সান্টাক্লজের । বইটিতে প্রায় প্রতিটি পাতায় ছবি আঁকা ছিল । অন্য একটা পুস্তিকায় প্রতিটি পাতায় একটা করে ইংরেজি অক্ষর ছিল, সেগুলোর দিকে তাকিয়ে-তাকিয়ে সবাই সময় কাটাচ্ছিল, সিস্টার আইরিন আমার হাত থেকে পুস্তিকাটা নিয়ে খুলে ইশারায় দেখালেন যে সবাই যা করছে আমিও যেন তাই করি । পাতা উল্টে অক্ষর আর সঙ্গের ছবিগুলো দেখলুম ।
    পরে আরেকটা রঙিন পুস্তিকা খুলে সিসটার আইরিন নিজেই শোনাতে লাগলেন, পরের ক্লাসে যাকে নার্সারি রাইম বলে জেনেছি, “হে ডিডল ডিডল, দি ক্যাট অ্যন্ড দি ফিডল, দি কাউ জাম্পড ওভার দি মুন, দি লিটল ডগ লাফড টু সি সাচ স্পোর্ট, অ্যান্ড দি ডিশ র‌্যান অ্যাওয়ে উইথ দি স্পুন।” আরেকটা, “পিটার পিটার পাপ্মকিন ইটার, হ্যাড এ ওয়াইফ অ্যাণ্ড কুড নট কিপ হার, হি পুট হার ইন এ পাম্পকিন শেল, অ্যাণ্ড দেয়ার হি কেপ্ট হার ভেরি ওয়েল।” এই দুটো আমার মনে থাকার কারণ পরের ক্লাসেও এগুলো সবাই মিলে আবৃত্তি করতে হয়েছে, অভিনয় করে, আর তিন দশক পরে আমার মেয়েকে যখন এই স্কুলে ভর্তি করি, তখন তাকেও একই নার্সারি রাইম মুখস্হ করতে হয়েছে, অথচ ততদিনে পুরো স্কুলে কেরালিয় সিসটারদের নিয়ন্ত্রণ, বিদেশিনী কেউ নেই । পরের ক্লাসে এবিসিডি শিখতে হয়েছিল গেয়ে গেয়ে । ওয়ান টু থ্রি ফোরও গেয়ে । একটা নার্সারি রাইম মনে আছে, যেটা পরেও কাজে লাগত, “থার্টি ডেজ হ্যাথ সেপ্টেম্বর, এপ্রিল জুন অ্যাণ্ড নভেম্বর, থার্টি ওয়ান দি আদার্স ডেট, এক্সেপ্ট ইন ফেব্রুয়ারি টোয়েন্টি এইট, বাট ইন লিপ ইয়ার উই অ্যাসাইন, ফেব্রুয়ারি টোয়েন্টি নাইন।” তখন এগুলোর মানেই বুঝতে পারতুম না । নার্সারি রাইমের ছন্দ মনের ভেতরে বিরক্তির বীজ হয়ে থেকে গিয়েছিল, যে কারণে কবিতা লিখতে আরম্ভ করে ছন্দ ব্যাপারটাকে পছন্দ হতো না । দাদা শিখিয়েছিল গুণে-গুণে পয়ার ছন্দে লেখার কায়দা, কিন্তু তাতে আমি স্পিড বা গতি খুঁজে পাইনি ।
    বাংলা “আইকম বাইকম তাড়াতাড়ি, যদুমাস্টার শশুর বাড়ি, রেলকম ঝমাঝম, পা পিছলে আলুর দম”, আমার জাঠতুতো-খুড়তুতো বোনেরা মাটিতে হাঁটুমুড়ে বসে খেলতো, হাঁটুতে চাপড় মেরেমেরে, এক একটা হাঁটু আউট হয়ে গেলে যার হাঁটু বাঁচতো সে জিতে যেতো । সেরকমই, “ঝাঁকড়া চুলে তালগাছ তুই দাঁড়িয়ে কেন ভাই, আমার মতো পড়া কি তোর মুখস্হ হয় নাই, দাঁড়িয়ে আছিস কান ধরে ঠায়, একটুখানি ঘুমায় না তোর পণ্ডিত মশাই”, এটাও ছিল ওদের খেলা, কে এক পায়ে কতোক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে পারে, যে সবচেয়ে বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতো সে জিতে যেতো । এগুলো তাই আমার কখনও নার্সারি রাইম মনে হয়নি।
    কনভেন্ট স্কুলে, টিফিনের সময় গেটের কাছে ছোট্ট দরোজা দিয়ে রামখেলাওন আমাকে টিফিনকৌটো এগিয়ে দিয়ে জিগ্যেস করল, “ইংরেজিতে কথা বলতে শিখে গেছেন তো, এবার থেকে আমার বাড়িতে টাকা পাঠাবার মানি অর্ডার আপনি ভরে দেবেন ।” আমি মাথা নাড়িয়ে সায় দিয়েছিলুম । স্কুলে টিফিন খাবার হলঘরে ঢুকে খালি জায়গা দেখে খেতে আরম্ভ করেছিলুম ; অন্য ছাত্ররা প্রায় সবাই ইংরেজিতে নিজেদের মধ্যে কথা বলছে। একটা মেয়ে আমার পাশে এসে বসে ফিসফিসিয়ে বলল, হিন্দিতে, ও ইংরেজি বলতে পারে না, এমন করে হিন্দিতে কথাগুলো বলল, যে মনে হল বাঙালি, আমি বাঙলাতেই জিগ্যেস করলুম, “তোর নাম কী” । হাসি ফুটল ওর মুখে, ওর নাম নন্দিতা, ন্যানডি । আমিও আমার নাম বললুম । ন্যানডি বলেছিল, “ওঃ, তোর নাম ময়লা !” ফিসফিসিয়ে কথা বলার সম্পর্ক তৈরি হল আমাদের । এই সম্পর্ক বহুদিন বজায় ছিল, তার কারণ নন্দিতাও কনভেন্ট ছেড়ে আমার সঙ্গেই রামমোহন রায় সেমিনারিতে গিয়ে ভর্তি হয়েছিল । সেখানে গিয়ে আমাকে ময়লা নামে ডাকার ফলে বেশ কয়েকজন সহপাঠী ময়লা বলে ডাকতো । ধনী পরিবারের ছিল নন্দিতা, হাইকোর্টের জজ ছিলেন ওর ঠাকুর্দা, টিফিনে আনতো অমলেট-টোস্ট আর স্যালাড, প্রতিদিন, তাই আমার আলুছেঁচকি বা আলুপটল বা টমেটো-কুমড়োর সঙ্গে রুটি ওর খেতে ভালো লাগত, যেমন আমার লাগত ওর অমলেট-টোস্ট-স্যালাড । আমরা দুজনে কনভেন্ট ছেড়েছিলুম আর রামমোহন রায় সেমিনারিতে গিয়ে বাংলা মিডিয়ামে ভর্তি হয়েছিলুম একই কারণে, ভারত স্বাধীন হয়ে গিয়েছিল আর আমাদের মাতৃভাষা বাংলা, ইংরেজির দাপটে আমাদের জিভ থেকে খসে-খসে ভুল পথে চলে যাচ্ছিল।
    টিফিনের পরের ক্লাসে ফাদার হিলম্যান এসে আমাদের নিয়ে চললেন স্কুল সংলগ্ন গীর্জায়, বাইবেল ক্লাস করার জন্য । গীর্জার ছাদ অনেক উঁচু, বিরাট হলঘর, দুপাশে বসার বেঞ্চ আর সামনে টেবিল, চারিদিকের দেয়ালে সন্তদের ছবি, তাদের সকলের মাথার পেছনে গোল জ্যোতি, আরও ওপরে, রঙিন কাঁচ দিয়ে তৈরি ভেড়া, দাড়িওলা মানুষ, ঘোমটা-দেয়া বউ, আরও নানা রঙের নকশা । একেবারে সামনে একজন মানুষের মূর্তি, তার হাতে পেরেক মেরে আর দুই পা জোড়া করে পেরেক মেরে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে । দেখে, সবচেয়ে প্রথমে আমার মনে হয়েছিল, এই ভাবে হাতে-পায়ে পেরেক ঠুকে কি একজন মানুষকে ঝুলিয়ে রাখা যায়, লোকটা কি খসে পড়বে না, লোকটা তো কাঠের সঙ্গে দড়ি দিয়ে বাঁধা নেই !
    ফাদার হিলম্যান একবার ইংরেজিতে, আরেকবার হিন্দিতে বুঝিয়ে বললেন যে যাঁকে অমনভাবে দেখা যাচ্ছে তাঁর নাম জিজাস খ্রাইস্ট, আর তার গল্প, তার বলা কথাগুলো, তিনি প্রতিদিন আমাদের শোনাবেন । যে কাঠে ওনাকে বিঁধে রাখা হয়েছে তার নাম ক্রস । আমাদের বললেন, হাতজোড় করে এক বুড়ো আঙুলের ওপর আরেক বুড়ো আঙুল রেখে ক্রস তৈরি করে টেবিলের ওপরে রেখে ওনার গল্প শুনতে । উনি একথাও বললেন যে টিফিনের পর সকলেরই একটু ঘুম পায়, তাই এই বাইবেলের গল্পের ক্লাস, ঘুম পেলেও ক্ষতি নেই । তারপর ওপরে রঙিন কাচে গড়া সন্তদের নাম বললেন ; প্রতিদিন বলতেন বলে মনে রয়ে গেছে, আরও মনে থেকে গেছে এইজন্য যে পাড়ার শিয়া মুসলমান পরিবারের মেয়ে কুলসুম আপাকে যখন কনভেন্ট স্কুলের আর সন্তদের বিষয়ে গল্প করেছিলুম, তখন উনি বলেছিলেন যে ওই সন্তরা ইসলাম ধর্মেও আছে, কিন্তু নামগুলো উচ্চারণ করা হয় আরবিতে, যেমন এনোখ হল ইদ্রিস, নোয়া হল নুহ, অ্যাব্রাহাম হল ইব্রাহিম, জেকব হল ইয়াকুব, অ্যারন হল হারুন, মোজেস হল মুসা, ডেভিড হল দাউদ, জোনা হল ইউনুস, জন হল ইয়াহায়া, জিজাস খ্রাইস্ট হল ইসা মসিহ । বেশ ভালো লেগেছিল শুনে, কনভেন্ট আমার আর কুলসুম আপাদের বাড়ির মাঝে সেতুবন্ধনের কাজ করেছে যেন ।
    পরে আজব লাগত যে জেকব লোকটার নামেই পাকিস্তানের ইয়াকুব খান, জন লোকটার নামে পাকিস্তানের ইয়াহিয়া খান । ডেভিড লোকটার নামে মাফিয়া-নেতা দাউদ ইব্রাহিম । ফাদার হিলম্যান এসব গল্প জেনে যেতে পারলেন না । দাউদ ইব্রাহিম দাঙ্গা, ডাকাতি, র‌্যানসাম, হুমকি, চোরাচালান করেও হিরো, ফিলমের পর ফিলম হয়ে চলেছে, খবরের কাগজের পাতা জুড়ে, টিভির পর্দাজুড়ে তাকে নিয়ে হইহই রইরই, আর গরিবগুলো দুটো রুটি চুরি করলেই প্যাদানির নাম গঙ্গারাম, লকআপে মৃত্যু । আসলে নিজের দুঃখ কষ্ট যন্ত্রণা খিদে প্রকাশ করার জন্যে শিক্ষা দরকার, চাকরি না পেলেও ক্ষতি নেই, যেমন দাউদ ইব্রাহিম, যৎসামান্য শিক্ষাকে কাজে লাগিয়ে পোঁদে বাঁশ করে দিতে পেরেছে । মানুষ “শব্দ” আবিষ্কার করেছে মৃত্যুদণ্ড লেখার জন্য ; তারপর মৃত্যুদণ্ড লিখে কলমের নিব ভেঙে ফেলার খেলা, এদিকে কলম কবেই তামাদি হয়ে গেছে, টিকে আছে কেবল মৃত্যুদণ্ড লেখার জন্য ।
    কুলসুম আপার গভীর প্রভাব থেকে গেছে আমার জীবনে ; কবিতার জগতে প্রবেশ ওনার মাধ্যমেই। কনভেন্টের গির্জায় গাওয়া গান যেমন শৈশবে বুঝতে পারতুম না, অথচ শুনতে ভালো লাগতো, তেমনি কুলসুম আপার বলা কবিতা বুঝতে পারতুম না, অথচ ওনার গলায় শুনতে ভালো লাগত । রামখেলাওন সিং ডাবর রহিম, দাদু, কবীরের কিছু-কিছু দোহা জানত আর আমাদের শাসন করার জন্য সেগুলো সময়মতন বলত ; শিউনন্দন কাহার বা শিউনন্নি নামে বাড়ির কাজের লোক তুলসীদাসের রামচরিতমানস মুখস্হ বলতে পারত, শিউনন্দনও রামচরিতমানস থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে শাসন করত আমাদের । শিউনন্নি বজরংবলীর ভক্ত ছিল, বিয়ে করেনি, পাড়ার আখাড়ায় গিয়ে কুস্তি লড়ত, মুগুর ভাঁজত, চেহারা ছিল কুস্তিগীরের, অনেক বয়সে বিয়ে করেছিল, যাকে বিয়ে করেছিল তার দুটো বাচ্চা ছিল আগের পক্ষের । শিউনন্নি আমাকে ওর কুস্তি লড়ার আখাড়ায় নিয়ে গিয়েছিল আমার বয়সীদের সঙ্গে কুস্তি লড়ে স্বাস্হ ফেরাবার জন্য, কেননা আমি রোগাটে ছিলুম । কুস্তি শেখার ড্রেস, মানে ল্যাঙোট, মায়ের কাছ থেকে দাম চেয়ে নিয়ে কিনে এনেছিল শিউনন্নি । ল্যাঙোট পরা বেশ কঠিন ছিল ওই বয়সে, কয়েকবার পেছনে নিয়ে গিয়ে সামনে এনে বাঁধতে হয় । কুস্তি শিখতে অসুবিধা ছিল না, অসুবিধা হতো কুস্তির আখাড়ার গেরুমাটি গা থেকে ধুয়ে তোলবার জন্য রাস্তার কলে গিয়ে স্নান করার, পাড়ার বউদের জল ভরা হয়ে গেলে তারপর আমার পালা, যদিও শিউনন্নি আমাকে কলের তলায় ঠেলে দিত যাতে স্নানটা সেরে ফেলতে পারি । কয়েকটা রবিবারের পরই পালোয়ান হবার উচ্চাকাঙ্খা ছেড়ে দিতে হলো । কুস্তির প্যাঁচ কাজে দিত যখন পাড়ার কারোর সঙ্গে লাট্টু বা গুলি খেলা নিয়ে বচসা আরম্ভ হতো ।
    সাঁতারও পুরো শেখা হয়ে ওঠেনি আমার । মামার বাড়িতে দাদা যখন ছিল, ১৯৫১ সালে,একবার পুকুরে শেখানোর চেষ্টা করেছিল, পুরো শেখার আগেই পাটনা ফিরতে হয়েছিল । দাদা মামার বাড়ি ছেড়ে উত্তরপাড়ায় থাকতে চলে গেলে, ১৯৫৩ সালে গঙ্গার ঘাটে নিয়ে গিয়ে শেখানোর চেষ্টা করেছিল, তা সত্ত্বেও শেখা হয়ে ওঠেনি । আরেকটু হলে তলিয়ে যাচ্ছিলুম, তাই ।
    ডাবর আর শিউনন্নির উদ্ধৃতি শুনতুম, কিন্তু পরোয়া করতুম না, কিন্তু গালে টোল ফেলে কুলসুম আপার কবিতা বলায় এমন আবহ গড়ে উঠত যেন উনি কবিতার মধ্যে দিয়ে নিজের দিকে টেনে নিয়ে চলেছেন । ফয়েজ আহমদ ফয়েজ আর গালিব ছিল ওনার প্রিয় কবি। কুলসুম আপা ইশতিমালিয়তের কথা বলতেন, যা পরে জেনেছিলুম, সাম্যবাদ ; ইশতিরাকিয়াতের কথা বলতেন, যা পরে জেনেছিলুম, সমাজবাদ ; মাসাওয়াতের কথা বলতেন যা পরে জেনেছিলুম সকল মানুষকে সমান মনে করা । ওনাদের পরিবারের কারণেই ইমলিতলা পাড়ায় দেশভাগের দাঙ্গার কোনো প্রভাব পড়েনি। স্কুল থেকে পাওয়া দুটো কার্ড উনি চেয়ে নিয়েছিলেন, একটা মুসার অন্যটা ইসা মসির ।
    কুলসুম আপার স্মৃতি জেগে উঠলেই ফয়েজের এই বিখ্যাত কবিতাটা মনে পড়ে যায়, যদিও কুলসুম আপা বেশির ভাগ প্রেমের কবিতা শোনাতেন :
    “মাতা-এ-লৌহ-ও-কলম ছিন গয়ি তো ক্যা গম হ্যায়
    কি খুন-এ-দিল মেঁ ডুবো লি হ্যায় উংগলিয়া ম্যায়নে

    জুবাঁ পে মোহর লগি হ্যায় তো ক্যা, কি রখ দি হ্যায়
    হর ইক হলকা-এ-জঞ্জির মেঁ জুবাঁ ম্যায়নে”

    যৌনতা ও স্পন্দিত ছোঁয়ার মাধ্যমে একজন কৌতূহলী বালকের মর্মে কবিতার গভীর ছাপ রেখে দেবার প্রথম শিক্ষাও কুলসুম আপার কাছে পেয়েছিলুম, আর বহুকাল পরে, তাঁর স্মৃতিতে, তাঁর খোঁজে ইমলিতলা পাড়ায় গিয়ে তাঁকে না পেয়ে, লিখেছিলুম এই কবিতাটা, “প্রথম প্রেম : ফয়েজ আহমদ ফয়েজ” শিরোনামে । কবিতাটার প্রথম লাইনটা মনে ছিল, এতোবার উনি শুনিয়েছিলেন, লেখার সময়ে ফয়েজের সংকলন থেকে বাকি অংশটা সংগ্রহ করেছিলুম :-
    গরমের ছুটিতে খালি-গায়ে যখন নাজিমদের বাড়িতে
    লুডো খেলতে যাই, কুলসুম আপা রাস্তা পেরোবার ঢঙে
    বাঁদিক-ডানদিক তাকিয়ে দুহাতে দড়াম করে দরজা বন্ধ করে দ্যান
    আমার অন্ধকার স্যাঁতসেতে ঘরে এক হ্যাঁচকায় টেনে নিয়ে ।
    আমি বলি, ‘ভোজপুরি বলবেন, আমি উর্দু বুঝতে পারি না ।’
    উনি বলেন, ‘তুই চোখ বোজ, তাহলেই বুঝতে পারবি,
    এ তো খুব সহজ রে ।’ আমি চোখ বুজে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকি
    একগাদা হাঁসমুর্গির মাঝে ।
    কুলসুম আপা বলেন, ‘মুঝে দে দে রসিলে হোঁঠ, মাসুমানা
    পেশানি, হসিঁ আঁখেঁ কে ম্যায় একবার ফির রঙ্গিনিয়োঁ মেঁ
    গর্ক হো জাউঁ…’
    আমি বলি, ‘ধ্যাৎ, কী করছেন কী, আমার লজ্জা করে।’
    উনি ওনার কালো মোটা ঠোঁটে বলতে থাকেন, ‘মেরি হস্তিকো
    তেরি ইক নজর আগোশ মেঁ লে লে হমেশা কে লিয়ে
    ইস দাম মেঁ মহফুজ হো জাউঁ জিয়া-এ হুস্ন সে জুল্মত-এ দুনিয়া
    মেঁ ফির না আউঁ…’
    আমি বলি, ‘আঃ, ছাড়ুন না, এরকম করছেন কেন আপা ?’
    উনি বলেন, ‘গুজিশতাঁ হসরতোঁ কে দাগ মেরে দিল সে
    ধুল জায়েঁ…’
    আমি বলি, ‘ না না না…’
    আপা ওনার ঘুমন্ত কন্ঠস্বরে, ‘ম্যায় আনে ওয়ালে গম কি
    ফিকর সে আজাদ হো জাউঁ মেরে মাজি ও মুস্তকবিল সরাসর
    মাভ হো যায়েঁ মুঝে ওয়হ ইক নজর, ইক জাভেদানিসি
    নজর দে দে ।’
    আমি বললুম, ‘রোজ রোজ এরকম করেন কেন ?’
    উনি বললেন, ‘তবে যে তুই বলছিলিস উর্দু বুঝতে পারিস না !’

    এখন জানি পেশানি মানে কপাল, গর্ক মানে ডুবে যাওয়া, রঙ্গিনিয়োঁ মানে অলঙ্কৃত, হস্তি মানে অস্তিত্ব, আগোশ মানে আলিঙ্গন, দাম মানে ফাঁদ, মহফুজ মানে সঞ্চিত, জিয়া-এ-হুস্ন মানে সৌন্দর্য্যের আলো, জুল্মত-এ-দুনিয়া মানে অত্যাচারী জগত, গুজিশ্তা মানে অতীত, হসরতে মানে দুঃখ প্রকাশ, মুস্তকবিল মানে ভবিষ্যত, মাভ মানে মুগ্ধতা, সরাসর মানে পুরোপুরি, জাভেদানি মানে অনন্তকালীন । কবিতা কিন্তু তখনও আমাকে আকৃষ্ট করেনি, আকৃষ্ট করেছিল কুলসুম আপার বড়ো-বড়ো চোখ, গালের টোল আর বুকের দেহতাপ । কবিতা বলতে বাড়িতে সকলের ধারণা ছিল গান । কবিতার কোনো বই ছিল না ইমলিতলার বাড়িতে, বস্তুত কোনো বইই ছিল না । উত্তরপাড়ার খণ্ডহরে ফারসি আর সংস্কৃতভাষার বই ছিল, ঠাকুর্দার সময়কার । ঠাকুর্দার আগের পূর্বজদের তালপাতায় লেখে পুঁথি ছিল, আমাদের ইতিহাসবোধ না থাকায়, সেগুলো উত্তরপাড়া থেকে পাটনায় নিয়ে আসিনি, শরিকরা গেঁড়িয়ে বেচে দিয়া থাকবে ।
    কুলসুম আপাদের বাড়িতে রাস্তার সামনে বিড়ি-সিগারেটের যে ঘুপচি দোকানঘর ছিল, সেখানে বসে পরিবারের সবাই বিড়ি বাঁধত । আমার বিড়ি বাঁধার শিক্ষাও ওনাদের পাশে বসে ওই ঘরে । আরেকটা ব্যাপার জেনেছিলুম, ওনাদের দোকানের ঘরে ফ্রেমে বাঁধানো একটা মন্দিরের ছবি, আমি একদিন বলেছিলুম, তোমরা তো মুসলমান, মন্দিরের ছবি টাঙিয়েছ কেন ? কুলসুম আপার আব্বু বলেছিলেন, ওটা মন্দির নয়, ওটা আমাদের তীর্থক্ষেত্র কারবালা, পয়গম্বরের নাতি ইমাম হোসেনের সমাধি, যেমন তোদের কাশি । কুলসুম আপার দাদা মানে ঠাকুর্দা ওই তীর্থ করতে গিয়ে ছবিটা এনেছিলেন, নজাফ নামে একটা তীর্থ থেকে কারবালা পর্যন্ত তিরিশ ক্রোশ, মানে ষাট মাইল, হাঁটতে হয়েছিল, হাজার-হাজার তীর্থযাত্রীর সঙ্গে, রাতে রাস্তার ধারে ঘুমোতো সবাই । আরেকটা ছিল ফ্রেমে বাঁধানো সোনালী রঙের টিনের ডানাঅলা উড়ন্ত ঘোড়া, যার মুখটা মেয়েদের মতন ; ঘোড়াটার নাম ওনারা বলেছিলেন বুরাক, যাতে চেপে পয়গম্বর মক্কায় গিয়েছিলেন ।
    কুলসুম আপাদের বাড়িতে সময় কাটাতে ভালো লাগত তার কারণ আমাদের বাড়িতে দাদা আমার চেয়ে পাঁচ বছরের বড়ো, ওনার নিজের বন্ধুদের দল ছিল, বাঙালিদের পাড়া কদমকুঁয়ায় । মেজদা আমার চেয়ে তিন বছরের বড়ো, পাড়ার যে-সব ছেলেদের বখাটে বলে মনে করা হতো, মেজদার বন্ধু ছিল তারা, আমাকে তাই মেজদা পাত্তা দিত না । বড়োজ্যাঠার দুই মেয়ে আমার চেয়ে অনেক বড়ো, তাঁরা বিয়ে হয়ে শশুরবাড়ি চলে গিয়েছিলেন । অন্য বোনেরা সকলেই আমার চেয়ে বেশ ছোটো, ওরা নিজেদের মেয়েলি খেলা নিয়ে ব্যস্ত থাকতো । বাড়িতে নিঃসঙ্গতা কাটাবার জন্য পাড়ার সমবয়সী ছেলেদের সঙ্গে চোর-পুলিশ, গুলি বা লাট্টু বা ড্যাঙগুলি খেলতুম কখনও-সখনও। গু আর পাঁকের নর্দমায় লাট্টু বা গুলি পড়ে গেলে তুলে নিয়ে কলের জলে ধুয়ে নিতুম, অনেক সময়ে জাঠতুতো বা খুড়তুতো বোনেরা দেখে ফেললে বড়োজেঠিমাকে নালিশ করতো আর শুদ্ধ হবার জন্যে আমাকে সন্ধ্যাবেলায় ঠাণ্ডাজলে চান করতে হতো ।
    মনে পড়ছে, কুলসুম আপার সঙ্গে আমার যৌন সম্পর্কের কথা কেবল ঠাকুমাকে বলেছিলুম কেননা কেবল ওনার সঙ্গেই গোপন ব্যাপার শেয়ার করতে পারতুম । শুনে উনি বলেছিলেন, জীবনে আর কখনও একথা কাউকে বলিসনি, আমাকে বলেছিস বলেছিস, আর কারো কানে যেন না যায় । খেমির কথা চেপে গিয়েছিলুম ওনার কাছে, কেননা খেমির বেলায় কোনো অপরাধবোধ ছিল না । প্রথম রোমান্টিক প্রেমিকার বেলাতেও অপরাধবোধ ছিল না, তবুও ঠাকুমাকে বলিনি ।
    চোর-পুলিশ খেলার একটা স্মৃতি আমার পিঠে ব্যথা হয়ে রয়ে গেছে আজও, ১৯৪৪ সালের । ইমলিতলায় যেকোনো চালাবাড়িতে যেকোনো ঘরে যখন ইচ্ছে ঢুকে পড়ায় কোনো বাধা ছিল না বলে, একবার চোর-পুলিশ খেলার সময়ে গিয়ে লুকিয়েছিলুম কালুটুয়াদের বাড়িতে ওর চাচির দড়ির খাটের তলায় । প্রতিটি চালাবাড়ির যেন এক রহস্যের গুনগুনানিতে মেতে থাকতো । চাচি শুয়ে ঘুমোচ্ছিলেন খাটে ; খাটটা একটু ঝুলে গিয়েছিল বলে আমার সুবিধাই হল, কেউ সহজে দেখতে পাবে না । দরোজা দিয়ে দেখতে পাচ্ছিলুম আমার খোঁজে হন্যে হয়ে এলো-গেলো পুলিশ, ঘরের ভেতরে উঁকি দিয়ে গেল, আমি উপুড় হয়ে শুয়ে রইলুম চুপচাপ । কিছুক্ষণ পর কালুটুয়ার চাচা খালি গায়ে লুঙ্গি পরে এসে দরোজায় খিল তুলে দিলেন ; আরও ভালো হল, ভাবলুম । খাটের তলা থেকে চাচার দুটো পা দেখতে পাচ্ছিলুম, লুঙ্গি খুলে ফেলে দিলেন আর খাটে চাচির পাশে শুয়ে পড়লেন । কিছুক্ষণ পর শুনতে পেলুম চাচা-চাচি সেই রকম আওয়াজই করছেন, যেমন কুলসুম আপাদের রামছাগলটা ছাগলি দেখলে জিভ দিয়ে করে । চাচা শোবার ফলে খাটটা নিচে নেমে আমার পিঠে ঠেকছিল । দুতিন বার খাটের দড়ি পিঠে এসে ধাক্কা দিল, একবার এতো জোরে দড়ির ধাক্কা লাগল যে কেঁদে ফেললুম, চুপচাপ কাঁদলুম । পিঠে ভীষণ ব্যথা, বাড়ি গিয়ে চুণ-হলুদ লাগাতে বলতে হবে বড়োজেঠিমাকে। একটু পরে দেখলুম চাচা মেঝে থেকে লুঙ্গি তুলে, পরে নিয়ে, খিল খুলে বেরিয়ে গেলেন, চাচিও নামলেন খাট থেকে । আমি পালাবার জন্য খাটের তলা থেকে বেরোতেই চাচি নিজের ঢাউস তামাটে বুক দেখিয়ে বললে, কি রে খাবি না, যখন বাচ্চা ছিলিস তখন তো কতো খেয়েছিস । আমি পিঠে হাত দিয়ে পালালুম বাড়ি । যখন বাচ্চা ছিলুম, মায়ের বুকে দুধ হতো না বলে, ছোড়দি পাড়ার নার্সিং মাদারদের কাছে নিয়ে গিয়ে দুধ খাইয়ে আনত, চাচির দুধও খেয়ে থাকব । এখন পিঠের ওই জায়গাটা ব্যথা করলেই চাচির দুটো ঢাউস তামাটে বুক চোখের সামনে ভেসে ওঠে ।
    আরেকটা ঘটনা মনে পড়ছে । পাঁচ বছর বয়সে মা আমাকে ইমলিতলার একটা ঘরে শেকল তুলে বিকেল থেকে বন্ধ করে রেখে দিয়েছিলেন, তার কারণ পাড়ায় আমাকে তাড়ি খাইয়ে দিয়েছিল, ‘পি লে পি লে, কুছ না হোতউ’ বলে । ইমলিতলার অন্য বিহারি বাচ্চাদের সঙ্গে আমিও দু-ঢোঁক খেয়েছিলুম, আর তাড়ির গন্ধে ধরা পড়ে গিয়েছিলুম । তাড়ি খাবার জন্য মা শাস্তি দেননি, দিয়েছিলেন যাতে আমি মেজদার মতন কুসঙ্গে পড়ে কুপথে না যাই । ইমলিতলায় বিজলিবাতি ছিল না । অন্ধকার ঘরে রাত দশটা পর্যন্ত একা বসেছিলুম এক কোণে । বাবা রাতে কাজ থেকে ফিরলে শেকল খোলা হয়েছিল । হয়তো এই ঘটনার আর এই রকম আরও কিছু ঘটনার চাপে আমি ক্রমশ অমিশুকে, হিন্দু-নাস্তিক, অন্তর্মুখ, অন্তেবাসী, সীমালঙ্ঘনকারী, দ্রোহী হয়ে গিয়ে থাকব ; গ্রন্হকীট হয়ে গিয়ে থাকব । আত্মসন্ত্রস্ত থাকার উদ্বেগ ও উৎকন্ঠার বীজ পোঁতা হয়ে গিয়ে থাকবে মনের ভেতরে ।
    ক্যাথলিক স্কুলে ফিরি । একদিন ক্লাসের সবাইকে রাস্তার অন্য পারে একটা বাগানে নিয়ে যাওয়া হল , সেটার নাম ফার্ম, সেখানে দেখলুম সাদা রঙের শুয়োরদের লোহার জাল দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে একটা জায়গায়, তার আগে আমি সাদা রঙের শুয়োর দেখিনি, বাচ্চা শুয়োর যাদের আস্ত পুড়িয়ে ‘সাকলিং পিগ’ রান্না হয় ক্রিস্টানদের ভোজে । নন্দিতা বলেছিল, এই শুয়োরগুলো সিসটাররা খায়, এদের গা্য়ে এতো চর্বি যে চোখ বুজে আসছে, এর সসেজ খুব ভালো হয় খেতে, একদিন তোকে খাওয়াব । ইমলিতলায় গঞ্জেড়ি-জমঘটে কালো ছোটো মাপের শুয়োর এনে কানাগলির লোকেরা খায় জানি, পুড়িয়ে খায়, সেগুলোকে দেখে নোংরা লাগত । আমরা বাচ্চা শুয়োরদের সঙ্গে খেলার জন্য একটা আলাদা ঘেরায় ঢুকলুম, বেশ লাগছিল জড়িয়ে ধরতে, নাদুস-নুদুস ফর্সা শুয়োর । দেখলুম বিদেশি গোরু, কখনও দেখিনি আগে এতো বড়ো গোরু, বাঁটও অনেক বড়ো, দুধে ভর্তি মনে হল । তার মানে খাঁটি দুধ খায় সিসটার আইরিন আর ফাদার হিলম্যান ; আমাদের বাড়িতে রাজু গোয়ালা দুধ দিতে আসে যখন, মা ওকে জিগ্যেস করেন, আজকে কতোটা জল মিলিয়েছিস, জল মেলালে নোংরা জল মেলাবি না, কলের পরিষ্কার জল মেলাবি ।
    ফার্মে দেখেছিলুম কালো রঙের, প্রায় শকুনের মতন মাথা, ততই বড়ো পাখি, ওড়ে না, জাল দিয়ে ঘেরা একটা জায়গায় । ন্যানডি বলেছিল, ওগুলো টার্কি পাখি, খ্রিসমাসের বড়োদিনে যে ভোজ হয় তাতে খায়, বেশ নরম আর ভালো খেতে । ফার্মের মুর্গিগুলোও বড়ো মাপের । আমাদের ইমলিতলার বাড়িতে মুর্গির ডিম আর মুর্গি খাওয়া বারণ । নন্দিতার বাড়িতে কিছুই বারণ নয় । ওর টিফিনের দৌলতে প্রায় রোজই মুর্গির ডিমের অমলেট খেয়েছি ।
    ফাদার হিলম্যানের কাছে যিশুখ্রিস্টের গল্প শুনে আমি একদিন প্যাকিং বাক্সের দুটো কাঠ পাড় দিয়ে বেঁধে ক্রুসকাঠ বানিয়ে ইমলিতলার সমবয়সী বন্ধুদের নিয়ে পাড়ার গলিতে ঘোরা আরম্ভ করেছিলুম । পছনে যারা অনুসরণ করছিল তারা নিজেরাই “হিপ হিপ হুররে” স্লোগান দেয়া আরম্ভ করল, কেননা পাড়ার ফুটবল দল, কাবাড্ডি দল বা কুস্তিগির জিতলে এই ভাবেই স্লোগান দেয়া হতো । স্লোগান দিতে-দিতে দলবল নিয়ে বিরজুর বাড়ির কাছে পৌঁছোলে দেখলুম ওর মা মুখ গোমড়া করে বসে আছে, অন্যদের মতন আমায় দেখে হাসলেন না, আমি কী হয়েছে জানতে চাইলে বললেন ওনার ছোটো ছেলে চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়ে জেল খাটতে চলে গেছে, ছোলা ভেজে বিক্রি করার মতন কাঠ নেই । আমি ওনাকে ক্রুসকাঠ পিঠ থেকে নামিয়ে দিয়ে দিলুম, উনি জানতে চাইলে যতোটা পারি জিজাস খ্রাইস্টের গল্প বললুম, উনি শুনে বললেন, তুইই আমার ‘জিজুয়া’ । স্কুল থেকে ফিরে প্রতিদিনই জিজাসের ‘জুলুস’ বের করতুম দুটো কাঠ দড়ি দিয়ে বেঁধে আর নানা গলি ঘুরে দিয়ে আসতুম বিরজুর মাকে ।
    স্ট্যাণ্ডার্ড ফোরে উঠলুম ভারতের স্বাধীনতার সময়ে । কনভেন্টের মাঠে বিশাল সিল্কের ঝাণ্ডা টাঙানো হলো । সবাইকে এক প্যাকেট করে খাবার দেয়া হল । কিন্তু লক্ষ্য করলুম যে ফর্সা-সোনালী চুল ছাত্রীরা নেই, সিস্টার আইরিন আর ফর্সা সিসটাররা নেই, ফাদার হিলম্যানও নেই । বাড়ি ফিরে বাবাকে জিগ্যেস করতে উনি বলেছিলেন যে ওনারা আর ইনডিয়ায় থাকতে চান না, এতো দাঙ্গা আর গণ্ডোগোল হয়েছে আর চলছে, ওনারা নিরাপদ মনে করেননি, নিজেদের দেশে চলে গেছেন । শুনে মন খারাপ হয়ে গিয়েছিল । কনভেন্টে আর ভালো লাগছিল না । বাবা-মা নির্ণয় নিলেন যে আমার বাংলা কথাবার্তায় বিটকেল ইংরেজি আর পাটনাই হিন্দি বুলি ঢুকে গেছে, আমকে এবার বাংলা মাধ্যম স্কুলে দেয়া হবে, দাদার স্কুলে নয়, দাদার স্কুলে হিন্দি আর ইংরেজিতে পড়ানো হয় । স্বাধীনতার পরের বছর ভর্তি হলুম গিয়ে রামমোহন রায় সেমিনারিতে।
    বাংলা মাধ্যমের একটাই স্কুল ছিল পাটনায়, রামমোহন রায় সেমিনারি, ভর্তি হয়ে গেলুম । ভর্তির সময় আমার জন্মতারিখের কথা মনে পড়ল বাবা-মার, কেননা এই জন্মতারিখ ম্যাট্রিকের সার্টিফিকেটে থাকবে । কনভেন্টে ভর্তির সময়ে জন্মদিন নিয়ে ভাবেনি কেউ ; ফাদার হিলম্যান জন্মতারিখ জানতে চেয়েছিলেন, বাবা ওনাকে বলেছিলেন, আমার বড়োছেলের পাঁচ বছর পর ও জন্মেছে, শীতকালে, বোধহয় তখন নভেম্বর মাস । ফাদার হিলম্যান আমার জন্মদিন ধার্য করলেন দোসরা নভেম্বর ১৯৩৯ ।
    রামমোহন রায় সেমিনারিতে ভর্তি হবার সময়ে সেই বছরের পাঁজি খুলে দেখা গেল যে দোসরা নভেম্বর পড়ছে অমাবস্যা, ১৯৩৯-এর বছর নয়, যে বছর ভর্তি হতে গেলুম সেই বছরের পাঁজি দেখে । ২৯ অক্টোবর সব দিক থেকে ভালো পাওয়া গেল, পুরুতমশায় সতীশ ঘোষালও বললেন, এই দিনটা অনেক শুভ। ব্যাস, আমার জন্মদিন ধার্য হয়ে গেল ২৯ অক্টোবর ।
    কনভেন্টে ছিলুম স্ট্যাণ্ডার্ড ফোরে । ইংরেজিতে কথা বলতে পারার দরুন রামমোহন রায় সেমিনারিতে ভর্তি হয়ে গেলুম ক্লাস সিক্সে, বাংলা মিডিয়ামে । বড়ো হয়ে গিয়েছিলুম বলে ডাবরকে পৌঁছে দেবার আর নিয়ে আসার কর্তব্য থেকে মুক্তি দেয়া হল । বাড়ি থেকে স্কুল প্রায় দেড় কিলোমিটার, হেঁটেই যাতায়াত করতে লাগলুম, কী শীত কী বর্ষা । বর্ষাকালে ভিজে-ভিজেই ইশকুলে যেতুম, তখন কিন্তু অমন ভিজলে জ্বর হতো না । জ্বরজারি হবার জন্যেও বোধহয় যৎসামান্য পয়সাকড়ি হওয়া দরকার ।এই ইশকুলের কোনো ইউনিফর্ম ছিল না, এখন হয়েছে শুনি । তখন বাড়ির পোশাক পরেই স্কুলে যাওয়া যেতো ; ইচ্ছে হলে ইস্তিরি করা পোশাকে, নয়তো যার যেমন ইচ্ছে । আমার কনভেন্টের পোশাক যতোদিন চলেছিল ততোদিন ওই পোশাকেই যেতুম । ভর্তির সময়ে বাঙালি কেরানিবাবু, যাঁর ছেলে রতন আমাদের ক্লাসে পড়তো, বলেছিলেন, “এই স্কুল অনেক পুরোনো, ১৮৯০ সালে ব্রাহ্মসমাজের স্হাপন করা, ওপরে ওই দুই ছাত্রের ফোটো দেখছো, ওরা ১৯৪২ সালের অগাস্ট ক্রান্তির সময়ে রাজ্যের অ্যাসেমব্লি ভবনে জাতীয় পতাকা টাঙাতে গিয়ে পুলিশের গুলিতে মারা যায়, ক্লাস নাইনের উমাকান্ত প্রসাদ সিনহা আর রামানন্দ সিংহ, অমন ডাকাবুকো হতে হবে তোমাকেও।” ইশকুলে যাবার পথে আর ফেরার পথে রাস্তার ইঁটে নটি বয় শু দিয়ে লাথি মেরে-মেরে ডাকাবুকোপনা ফলাতুম ।
    এই কেরানিবাবুর সামনে, ১৯৫১ সালে, শাস্তি পেয়ে, ওনার ঘরে, সারাদিন ঠায় একা দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছিল, দেয়ালে হেলান দেবারও অনুমতি ছিল না । এই শাস্তি ছিল আরেক ধরণের ডাকাবুকোভাব দেখাবার ফল । কয়েকজন সহপাঠী ক্লাসের একটি মেয়েকে বিরক্ত করছিল বলে আমি জিওমেট্রি বক্স খুলে কম্পাস হাতে মোকাবিলার চেষ্টা করতে গিয়ে আহত করে দিয়েছিলুম দুজনকে । ইশকুল ছুটি হয়ে যাবার পর বিভিন্ন ক্লাসের ছেলে-মেয়েরা চলে গিয়েছিল, সন্ধ্যাও নেমে এসেছিল, শীতের সন্ধ্যায় অন্ধকারও ঘনিয়ে আসছিল, কেরানিবাবু চলে গিয়েছিলেন, একাই দাঁড়িয়েছিলুম, ভয়াবহ একাকীত্বের মাঝে, তারপর হেডমাস্টার ক্ষেত্রমোহন পোদ্দার মশায় স্কুল সংলগ্ন কোয়ার্টার থেকে এসে বাড়ি যাবার অনুমতি দিলেন । কনভেন্টে নানরা কখনও একা বোধ করতে দেননি, যদিও ইংরেজিতে কাজ চালাবার মতন সড়গড় হতে সময় লেগেছিল, তবুও ।
    রামমোহন রায় সেমিনারিতে, সবকটা ক্লাসঘরের বাইরে কালো বোর্ডে লেখা ছিল সেটা কোন ভাষার মিডিয়ামের কোন ক্লাস । আমি বাংলা মিডিয়ামের ক্লাস সিক্স বোর্ড দেখে পেছনের দিকে একটা সিটে বসতে যাচ্ছিলুম, একজন সহপাঠী বললে, তুই নতুন এসেছিস বোধহয়, এটা আমার সিট, তুই সামনের বেঞ্চে চলে যা। ক্লাসের দুটি সারিতে মেয়েরা, প্রায় সকলেই শাড়ি পরে, কয়েকজনের বয়স ছেলেদের তুলনায় বেশি ।এই স্কুলে ঘণ্টা বাজলে ক্লাস ঘরেই প্রেয়ার আরম্ভ হল, বাংলায় প্রার্থনা, কাউকে হাত জোড় করতে হলো না, বেশিরভাগ ছাত্র-ছাত্রী ক্লাস ফোর থেকে পড়ছে বলে তাদের মুখস্হ, গাইতে অসুবিধে হলো না, গলা ছেড়ে গাইতে লাগল সবাই, মনে হচ্ছিল স্কুলবাড়িটাই যেন গাইতে আরম্ভ করেছে । এই গান সম্পর্কে পরে আমাকে বোঝান ক্লাস নাইনের নমিতা চক্রবর্তী, যিনি সেসময়ে স্কুলের বাংলা লাইব্রেরির গ্রন্হাগারিকের দায়িত্বও টিফিনের সময় পালন করতেন । জীবনে প্রথমবার, ক্লাস সিক্সে আমি রবীন্দ্রনাথের গান আর কবিতার কথা শুনলুম ওনার কাছে । এখন স্কুলটির দুটো ভাগ হয়ে গেছে, সিনিয়ার আর জুনিয়ার; শুনেছি যে কেবল জুনিয়ার বিভাগেই প্রার্থনাটি সীমিত :-
    আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে বিরাজ সত্যসুন্দর ।।
    মহিমা তব উদ্ভাসিত মহাগগন মাঝে
    বিশ্বজগত মণিভূষণ বেষ্টিত চরণে ।।
    গ্রহতারক চন্দ্রপতন ব্যাকুল দ্রুত বেগে
    করিছে পান, করিছে স্নান, অক্ষয় কিরণে ।।
    ধরণী পরে ঝরে নির্ঝর, মোহন মধুশোভা
    ফুলপল্লব-গীতবন্ধ-সুন্দর বরণে ।।
    বহে জীবন রজনীদিন চিরনূতন ধারা
    করুণা তব অবিশ্রাম জন্মে মরণে ।।
    স্নেহ প্রেম দয়া ভক্তি কোমল করে প্রাণ,
    কতো সান্ত্বন করো বর্ষণ সন্তাপ হরণে ।।
    জগতে তব কী মহোৎসব বন্দন করে বিশ্ব
    শ্রীসম্পদ ভূমাস্পদ নির্ভয়শরণে ।।

    আমার পাশে দাঁড়িয়ে যে ছেলেটা গাইছিল, তার নাম তরুণ শূর, বেঁটে, দোহারা, কালো তেল চুকচুকে চেহারা, গলায় যেন কিছু আটকে আছে বলে মাঝে-মাঝে ঘোঁৎ-ঘোঁৎ করে, তার মৃত্যু পর্যন্ত আমাদের বন্ধুত্ব বজায় ছিল, তাকে গানটা এতো খটমট কেন, আর গানটার মানে কী, জিগ্যেস করতে, বলেছিল, ওসব জেনে কী করবি, গাইতে হয় গেয়ে যা, এটা পরীক্ষায় আসে না, এটা বেমমোদের গান, রবিবাবুর লেখা ।
    —রবিবাবু আবার কে ?
    —রবিবাবু জানিস না ? ওই যিনি নোবেল প্রাইজ পেয়েছিলেন, লম্বা দাড়ি আর চুল ।
    বুঝতে পারলুম, স্কুলটা ব্রাহ্মসমাজ পরিচালিত, তাই এই গান । এই প্রার্থনার মাধ্যমে আমি গলা ছেড়ে গান গাইবার সাহসও জুটিয়ে ফেলেছিলুম। আরও দুজন সহপাঠী বারীন গুপ্ত আর সুবর্ণ উপাধ্যায়, আমরা চারজন মিলে দরিয়াপুরের ফাঁকা বাড়িতে একসঙ্গে জড়ো হলে বাংলা হিন্দি গানের আসর বসিয়ে ফেলতুম । কিন্তু বড়োজ্যাঠা আর ঠাকুমা যদি জানতে পারেন যে আমি বেমমোদের স্কুলে ভর্তি হয়েছি, রবিবাবুর গান গাইছি, তাহলে গঙ্গায় নিয়ে গিয়ে স্নান করাবেন, বাবাকেও নির্ঘাত গঙ্গাস্নান করাবেন, নতুন পৈতে পরাবেন ।
    ইমলিতলার বাড়িতে, পাটনায়, উত্তরপাড়ার বসতবাটিতে আর মামার বাড়ি পাণিহাটিতে, রবিঠাকুর নিষিদ্ধ ছিলেন ; তাঁর লেখা আর গানের প্রবেশাধিকার ছিলনা বাড়িতে । পাটনা আর উত্তরপাড়ায়, ঠাকুমা আর বড়োজ্যাঠা-জেঠিমার নিষেধাজ্ঞা অমান্য করার সাহস বয়স্কদেরও ছিল না । রবিঠাকুর লোকটি যে ঠিক কে, আর কেনই বা তাঁর নাম বা কাজ মুখে আনা যাবে না সে কৌতূহল নিরসনের প্রয়াস বড়োরাও করতেন না ।
    রবিবাবু লোকটিই যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, তা আমরা ভাইবোনরা, ইমলিতলায় টের পাই, আমি এই ব্রাহ্ম স্কুলে ভর্তি হবার দরুণ । রবিবাবুদের সম্পর্কে উষ্মার বীজ দাদু-ঠাকুমা বয়ে এনেছিলেন রাওলপিণ্ডি লাহোর কোয়েটা কোনো এক শহর থেকে । প্রথম আভাস মেলে একটি গানকে কেন্দ্র করে। বড়দি-ছোড়দি পণ্ডিত বুলাকিলালের কাছে শাস্ত্রীয় সঙ্গীত শিখতেন । বড়োজেঠিমা সংক্রান্তির দিন ইমলিতলার বাড়িতে সত্যনারায়ণের পুজো করতেন আর সেই উপলক্ষে ব্রাহ্মণ সমাবেশ হতো । পুরুতমশায় সতীশ ঘোষালের চাঁদ সদাগর হিতোপোদেশ শেষ হলে দিদিরা ঈশ্বর বন্দনার গান গাইতেন, ব্রজভাষা বা হিন্দি বা সংস্কৃতে । পুরুতমশায়ের অনুরোধে পণ্ডিত বুলাকিলাল একটা বাংলা ঠুংরি, সিন্ধু ভৈরবী রাগিনীতে, শিখিয়েছিলেন ছোড়দি সাবিত্রীকে । ছোড়দি সেতার বাজিয়ে গেয়েছিলেন, সঙ্গতে পণ্ডিতজি:-
    কে ভুলালে হায়
    কল্পনাকে সত্য করি জান, এ কি দায়,
    আপনি গড়হ যাকে
    যে তোমার বশে তাঁকে
    কেমনে ঈশ্বর ডাকে কর অভিপ্রায় ?
    কখনো ভূষণ দেও, কখনো আহার ;
    ক্ষণেকে স্হাপহ, ক্ষণেকে করহ সংহার ।
    প্রভূ বলি মান যারে, সন্মুখে নাচাও তারে–
    হেন ভুল এ সংসারে দেখেছ কোথায় ?
    গান শেষ হলে বড়োজ্যাঠা আর পুরুতমশায় দুজনেই দুষলেন পণ্ডিতজিকে, অমন ম্লেচ্ছ গান শেখাবার জন্য । পণ্ডিতজি তর্ক দিয়েছিলেন যে শহরের বহু গণ্যমান্য পরিবারে তিনি এই গান শিখিয়েছেন । তাঁকে জানানো হয়েছিল যে তারা ম্লেচ্ছ । ইমলিতলা পাড়ার কাউকে কিন্তু কখনও ম্লেচ্ছ তকমা দেয়া হতো না । গানটা ভুলেই যেতুম, যদি না রামমোহন রায় সেমিনারিতে ভর্তি হতুম । এই স্কুলে প্রতিবছর ভাদ্রোৎসব হতো, কোনও এক রবিবারে, ছাত্রছাত্রী শিক্ষক-শিক্ষিকারা নৃত্যগীত ও নাটকের সন্ধ্যানুষ্ঠানে অংশ নিতেন, এবং অভিভাবকদের বলা হতো সেই অনুষ্ঠান দেখার জন্য । আমাদের বাড়ি থেকে মা-কাকিমারা আর বড়দি-ছোড়দি ছিলেন দর্শকাসনে । তাঁদের স্তম্ভিত আর আনন্দিত করে এই গানটি গেয়ে অনুষ্ঠানের সূত্রপাত হয়েছিল । ক্ষেত্রমোহন পোদ্দার যতকাল হেডমাস্টার বা প্রিন্সিপাল ছিলেন, ততদিন এই অনুষ্ঠান হতো ; তাঁর অবসরের পর, হিন্দিভাষীদের সংখ্যাধিক্যে, বন্ধ হয়ে গিয়েছিল বসন্ত উৎসব ।
    পুরুতমশায়-বড়োজ্যাঠার গানটি সম্পর্কে উষ্মার কারণ জানতে পারি বাবাকে জিগ্যেস করে । দাদু-ঠাকুমা যে-সময়ে লাহোর ইত্যাদি অঞ্চলে ট্যুর করে বেড়াচ্ছেন, সে-সময়ে ব্রাহ্মধর্মের প্রচারক নবীনচন্দ্র রায়ও ওই অঞ্চলে প্রচারে গিয়েছিলেন, এবং তাঁর মতাদর্শ, দাদু ও আরও কয়েকজন, বাঙালি ও পাঞ্জাবি, মেনে নিতে পারেননি। দাদু-ঠাকুমা নিজেদের গোঁড়ামি চাউর করে দিতে পেরেছিলেন বড়োজ্যাঠার মনে, আর বড়োজেঠিমা তো এসেইছিলেন পুরুতবাড়ি থেকে ।
    আমার শৈশবে পাটনার অধিকাংশ বাঙালি এলিট পরিবার ছিলেন ব্রাহ্ম, আদিধর্মের ব্রাহ্ম । পণ্ডিত নবীনচন্দ্র রায় সেই অংশেরই প্রতিনিধি ছিলেন । দাদু যখন আপার ইনডিয়ায় ছিলেন, তখনই পাঞ্জাব হাইকোর্ট আর ব্রিটেনের প্রিভি কাউন্সিল রায় দিয়েছিল যে আদি ধর্মের বা ‘আনুষ্ঠানিক’ ব্রাহ্মরা হিন্দু নয় । কেশবচন্দ্র সেনের নববিধান ব্রাহ্মরা ছিলেন ‘আনুষ্ঠানিক’ । প্রথমত, একান্নবর্তী পরিবারের গৃহকর্তা ও কর্ত্রীর ধার্মিক গোঁড়ামি এবং দ্বিতীয়ত বাঙালি এলিটসমাজ থেকে দূরত্বের কারণে, টুকরো হতে থাকা যাবতীয় ব্রাহ্মদের ‘বেমমো’ তকমা দিয়ে পরিত্যাজ্য করে দিয়েছিল ইমলিতলার বাড়ি। রামমোহন রায়ের লেখা ব্রহ্মসঙ্গীত সম্পর্কে সেকারণেই উষ্মা। ‘বেমমোদের’ হেয় করার বীজ আমার মাও এনেছিলেন পাণিহাটির ওনার মামার বাড়ি থেকে । তার কারণ সেকালের স্নাতকোত্তর, মায়ের মামারা বা আমার দাদুরা, ব্রাহ্মদের বিরোধীতা করতেন, কারণ ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের বিরোধিতা করে ব্রাহ্মসমাজের প্রায় প্রতিটি ট্রাস্টি ইংলণ্ডেশ্বরকে সমর্থন করে বিদ্রোহী সেপাইদের কড়া শাস্তি দাবি করেছিলেন ; ১৮৭১ সালে দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ঘোষণা করেছিলেন যে তাঁরা প্রথমে ব্রাহ্ম, তারপর ভারতীয় । ১৮৭২এর ম্যারেজ অ্যাক্ট অনুযায়ী একজন ব্রাহ্মকে লিখে দিতে হয় যে, “আমি হিন্দু বা মুসলিম বা খ্রিস্টান বা ইহুদি নই ।” মায়ের মামার বাড়ির লাইব্রেরিঘরে উনিশ শতকের মনীষীদের ছবি টাঙানো থাকতো, কিন্তু নোবেল প্রাইজ পাবার পরও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছবি টাঙানো হয়নি । মায়ের বড়োমামা অনাদিনাথ চট্টোপাধ্যায় বলতেন যে, “রবিবাবু ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতকে বিকৃত করেছেন” ; যতোদিন তিনি বেঁচেছিলেন, ওই বাড়িতে রবীন্দ্রসঙ্গীতের কদর হয়নি ।
    বাবা দরিয়াপুরে চলে আসার পর, কালক্রমে কাকারা কোতরঙ আর উত্তরপাড়ায় চলে যাবার পর, মেজো জেঠিমাও তখন মারা গেছেন, ইমলিতলার বাড়ি প্রায় ভুতুড়ে হয়ে গিয়েছিল বলে বড়োজ্যাঠা আর জেঠিমা দিদিদের বাড়িতে থাকতে চলে গিয়েছিলেন । দিদিদের বাড়িতে প্রায়ই গানের আসর বসত । ক্লাস নাইনের পর আমি বড়ো একটা যেতুম না, ভাইফোঁটা ছাড়া । কেননা গেলেই দিদিরা বলতেন, তোর বিষয়ে অনেককথা কানে আসছে । বড়োজেঠিমা বলতেন, কুপথে যেওনি বাপু ।
    একবার বড়োজ্যাঠা দিদিদের বাড়িতে ওনার পরিচিতদের ডেকেছিলেন সত্যনারায়ণ পুজোর সান্ধ্যবাসরে । গিয়ে দেখি হলঘরে কার্পেটে বসে গান গাইছে বড়ো ভাগ্নি মঞ্জু, ওর সামনে ‘গীতবিতান’ খোলা, ছোড়দি সেতার বাজাচ্ছেন, হারমোনিয়ামে বড়দি আর তবলায় সঙ্গত দিচ্ছেন বৃদ্ধ বুলাকিলাল । ইজিচেয়ারে চোখ বুজে গান শোনায় বিভোর বড়োজ্যাঠা । বড়োজেঠিমা দেয়ালে ঠেসান দিয়ে হাতজোড় করে বসে আছেন। গানটা এই, গীতবিতান পূজা পর্যায় থেকে, এখন সর্বত্র গেয়, ব্রহ্মসঙ্গীত :
    অন্তর মম বিকশিত করো
    অন্তরতর হে ।
    নির্মল করো, উজ্জ্বল করো
    সুন্দর করো হে ।
    জাগ্রত করো, উদ্যত করো,
    নির্ভয় করো হে ।
    মঙ্গল করো, নিরলস নিঃসংশয় করো হে ।
    অন্তর মম বিকশিত করো
    অন্তরতর হে ।
    যুক্ত করো হে সবার সঙ্গে
    মুক্ত করো হে বন্ধ,
    সঞ্চার করো সকল মর্মে
    শান্ত তোমার ছন্দ ।
    চরণপদ্মে মমচিত্ত নিস্পন্দিত করো হে,
    নন্দিত করো, নন্দিত করো,
    নন্দিত করো হে ।
    অন্তর মম বিকশিত করো
    অন্তরতর হে ।
    বাড়ির বয়স্কদের অজান্তে, রবীন্দ্রনাথ, রবিবাবু থেকে রবিঠাকুর হয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরে পৌঁছে আমাদের বাড়িতে প্রবেশ করে গিয়েছিলেন । ভারতীয় সংবিধান লাগু হবার পর, সমাজে ক্রমশ ক্ষমতা-নকশায় রদবদল ঘটতে থাকে, পাটনার সমাজকর্তাদের আসন থেকে বিদায় নিতে থাকেন ব্রাহ্মরা । ব্রাহ্মমন্দির মেয়েদের স্কুল, যে স্কুলে আমার জাঠতুতো-খুড়তুতো বোনেরা পড়ত, তা বন্ধ হয়ে যায়, মন্দির ভেঙে মার্কেট কমপ্লেক্স গড়ে ওঠে । বিধানচন্দ্র রায়ের প্রতিষ্ঠিত তাঁর বাবা-মায়ের নামাঙ্কিত মেয়েদের হাতের কাজ শেখার সংস্হা “অঘোর-কামিনী বিদ্যালয়” অবহেলায় ধুঁকতে থাকে । অথচ কেবল আমাদের আর আত্মীয়দের বাড়িতেই নয়, ব্রহ্মসঙ্গীত ওপরতলা থেকে চুয়ে গরিব বাঙালিদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়েছিল । পাণিহাটিতেও, একান্নবর্তী পরিবার যখন ভেঙে গেল, দাদুদের প্রজন্মের তিরোধানের পর, রবীন্দ্রনাথ তাঁর গান নিয়ে প্রবেশ করেছিলেন । অবশ্য ততদিনে রবীন্দ্রসঙ্গীত হয়ে গিয়েছিল পণ্যায়নের অন্তর্গত ।
    ফিরে আসি রামমোহন রায় সেমিনারিতে । ক্লাস টিচার, তরুণ শূর বললে, অধিকারীবাবু, উনিই ইতিহাস, ভূগোল আর সোশাল স্টাডিজ পড়ান, অন্য টিচার না এলে তার ক্লাস নেন । অধিকারীবাবু ক্লাস ঘরে ঢুকলে কেউই সম্ভাষণ জানালো না, যেমন কনভেন্টে গুড মরনিং সিসটার বা ফাদারকে দেখলে গুড মরনিং ফাদার বলার রেওয়াজ ছিল । অভ্যাসবশত আমি আর নন্দিতা দুজনে একইসঙ্গে বলে ফেলেছিলুম “গুড মর্নিং স্যার” । অধিকারীবাবু বললেন, “অ, তুই এসেছিস, ক্যাথলিকদের স্কুল ছেড়ে, তা ভালো করেছিস, মন দিয়ে পড়াশুনা করবি, স্কুলের নাম উজ্জ্বল করবি। গুড মরনিং ব্যাড মরনিং করার দরকার নেই ।” নন্দিতার দিকে তাকিয়ে বললেন, “তুইও ওর সঙ্গে এসেছিস, ভালো করেছিস, মেয়েদের জন্যে এর চেয়ে ভালো বাংলা মিডিয়াম স্কুল আর নেই ।” তারপর আমাদের দুজনের উদ্দেশে বললেন, “তোদের যে বাংলাভাষার জ্ঞান হয়নি তা আর বলতে হবে না, লাইব্রেরি থেকে বাংলা বই নিয়ে পড়বি, আমি নমিতাকে তোদের কথা বলে দেবো । তোদের বাড়িতে বাংলা থেকে ইংরেজি আর ইংরেজি থেকে বাংলা ডিকশনারি আছে নিশ্চয়ই, না থাকলে আজকেই কিনে নিস । বিজয়বাবুকে বলে দেবো তোদের দুজনের বাংলার উন্নতির দিকে লক্ষ্য রাখতে, শ্যামবিহারীবাবুকেও বলে দেবো তোদের হিন্দিটা যাতে সামলে দ্যায় । মনে রাখিস, আমার ক্লাসে কেউ ফেল করলে আমারই দুর্নাম ; ওই পেছনের সিটে কয়েকজন বসে রয়েছে, দেখছিস তো, ওদের মধ্যে দুজন দুবছর ধরে আটকে আছে, কিছুতেই ওপরে তুলতে পারছি না ।” দুজন ঢ্যাঙা সহপাঠী দাঁত বের করে মৃদু হাসি ঠোঁটে খেলিয়ে স্বীকার করে নিল । পেছনের দিকে তাকিয়ে দেখলুম, কয়েকজন সহপাঠী, দেখেই বোঝা গেল অন্যান্যদের চেয়ে বয়স বেশি ।
    এই ঢ্যাঙা সহপাঠীদের কাছে ছোট্ট একটা প্লাসটিকের জিনিস থাকতো, যাতে চোখ রেখে কোন মেয়ের মাই কতো বড়ো তা দেখা যেতো । আমিও আমন্ত্রিত হয়ে দেখতুম, ম্যাগনিফাই হয়ে যেতো, মাই আর পাছা, ঠোঁট দেখতে চাইলে ঠোঁট । কেন ওরা একই ক্লাসে আটকে থাকে তা স্পষ্ট হলো ওদের ওই মাই দূরবীক্ষণ গ্যাজেটে ।
    অধিকারীবাবুর বলা শেষ হলে তরুণ শূর ফিসফিসিয়ে বলল, “চিন্তা করিসনি, সব সাবজেক্টের মানে বই বাজারে পাওয়া যায়, কিনিয়ে দেবো তোকে, তা থেকেই সব জেনে যাবি, কোয়েশ্চেন-আন্সার দেয়া থাকে । কিন্তু তোর বাবাকে বলিস বাড়িতে একটা ভালো দেখে টিউশন পড়াবার লোক রাখতে । আমাকে যে টিউশন পড়ায় সে অতোদূরে তোদের পাড়ায় যেতে পারবে না, নয়তো ওনাকেই বলতুম তোকে পড়াতে ।” আমাদের বাড়ি থেকে তরুণের বাড়ি প্রায় পাঁচ কিলোমিটার ।
    ইংরেজি শিক্ষকের বাৎসল্য, পড়ানোর তুলনায় বেশি ছিল । উনি গুরুত্ব দিতে বলেছিলেন ইংরেজি ব্যকরণ, পার্টস অফ স্পিচ আর কমপ্রিহেনসানে ; প্রথম দিনেই সকলকে বললেন নেসফিল্ডের গ্রামারের একটা পৃষ্ঠা দেখতে ; আমার কাছে দাদার বইটা ছিল, নতুন করে বাঁধানো, আমার যে বইগুলো লাগতে পারে সেগুলো দাদা কলকাতা যাবার আগে দপতরিকে দিয়ে বাঁধাই করিয়ে দিয়ে গেছে । এই ইশকুলে শিক্ষকদের নামের সঙ্গে বাবু যোগ করা হয়, টের পেলুম, তখনও শিক্ষকদের নামের অ্যাব্রিভিয়েশান আরম্ভ হয়নি । অন্যান্য শিক্ষদের নাম জানতে পারলেও, অধিকারীবাবু পরিচিত ছিলেন ওনার পদবী দিয়ে । অধিকারীবাবুর বলা একটা কথা বেশ লেগেছিল আমার যখন উনি বলেছিলেন, “শিখে নিবি, বাংলা শিখে নিবি, পশুপাখিদেরও নিজস্ব অক্ষর আর ভাষা হয়, মানুষ মনে করে ওদের অক্ষর হয় না, ওটা ভুল ধারণা, ওরা কী করে শেখে, তেমন করেই আমরা শিখি।”
    ক্লাসটিচার অধিকারীবাবুর বয়স চল্লিশের কাছাকাছি হবে, চুল ব্যাকব্রাশ করা, তেল চুকচুকে, ধুতির ওপর পাঞ্জাবি, শীতকালে পাঞ্জাবির ওপর পুরোহাতা সোয়েটার । ভুঁড়ি উপচে উঠেছে পাঞ্জাবি ফুলিয়ে । উনি ব্রাহ্ম নন, হেডমাস্টার আর কর্মকারবাবু ছাড়া আর কোনো শিক্ষকই ব্রাহ্ম নন, ব্রাহ্ম শিক্ষক আর পাওয়া যায় না, সবাই পাটনা থেকে শান্তিনিকেতনে ভাগলবা, বলেছিল তরুণ শূর । অধিকারীবাবু ক্লাসে একটা টাস্ক দিয়ে চুপচাপ বসে থাকতেন, তারপর ওনাকে খাতা জমা দিলে উনি বাড়ি নিয়ে যেতেন, কারেকশান করে পরের দিন বকুনিসহ ফেরত দিতেন ।
    ইংরেজি বিষয়ের শিক্ষক ইংরেজি বই থেকে প্রশ্নোত্তর, ইংরেজি থেকে বাংলা আর বাংলা থেকে ইংরেজি অনুবাদ, সারসংক্ষেপ, সারাংশ আর এসে লেখার অনুশীলন করাতেন, একাধিকবার করাতেন । হোমওয়র্ক দিতেন না, কেননা জানতেন হোমওয়র্ক দিলে ছাত্ররা মানে বইয়ের বা বাজারে যে নোটস বিক্রি হয় তার সাহায্য নেবে । এই একটি বিষয়েই আমি ভালো ফলাফল করতুম, ক্লাস টিচার অধিকারীবাবুর প্রিয় ছাত্রদের একজন হয়ে গিয়েছিলুম ।
    বাংলার শিক্ষক ছিলেন বিজয় কর্মকার, ইশকুলের একমাত্র ব্রাহ্ম টিচার ; তাঁকে কখনও সন্তুষ্ট করতে পারতুম না । ময়লাটে, ঢ্যাঙা, অগোছালো চুল । উনি বলেছিলেন যে আমার সবচেয়ে বড়ো দুর্বলতা হল যে আমি মুখস্হ করতে পারি না । সত্যি কথা । নিজের কবিতাও আমি আজও সম্পূর্ণ মনে রাখতে পারি না । ক্লাসে যারা প্রথম-দ্বিতীয় হয়েছে, তারা গড়গড় করে একটা চ্যাপটার পুরো মুখস্হ বলে দিতে পারত, আমি পাঠ্য কবিতাও মনে রাখতে পারতুম না। ষষ্ঠ শ্রেনি থেকে ম্যাট্রিক পর্যন্ত উনি বাংলা পড়িয়েছেন । ক্লাস নেয়ায় বিশেষ আগ্রহ ছিল না ওনার ; ব্রাহ্মদের বিয়ে, দীক্ষা, পৌষ উৎসব নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন । আমি যখন বি এন কলেজে গেলুম তখন উনি্ বাংলার অধ্যাপক হয়ে পৌঁছেছিলেন সেখানে ।
    রবীন্দ্রনাথ যে কেন ইশকুলে যাওয়া বন্ধ করে স্বশিক্ষিত করতে চাইলেন নিজেকে তা রামমোহন রায় সেমিনারীর শিক্ষকদের ক্লাস নেয়া দেখে স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল ; যে-ভাবে উনি একাই ইশকুলের শিক্ষার বাইরে স্হিতাবস্হার বিরুদ্ধে লড়ে গেছেন তা বিস্ময়কর ।
    দেশ স্বাধীন হবার দরুন পঞ্চাশ নম্বরের হিন্দিও ঢুকে গিয়েছিল কোর্সে, তার শিক্ষক ছিলেন শ্যামবিহারী প্রসাদ । হিন্দিতেও আমাকে বেশ পরিশ্রম করতে হতো, তার প্রধান কারণ ইমলিতলা পাড়ায় সবাই পাটনাই বুলি বলে, যা হিন্দি থেকে আলাদা। তাছাড়া বাক্যগঠনের লিঙ্গ সামলাতে পারতুম না। রামমোহন রায় সেমিনারিতে ভর্তি হয়ে টের পাই যে মা-জেঠিমা-কাকিমারা শুদ্ধ হিন্দি জানেন না, ইমলিতলার বুলি দখল করে ফেলেছেন, আর তার বহু শব্দ বা অভিব্যক্তি যে শুদ্ধ হিন্দিতে অশোভন, এমনকি অশ্লীল, তা ওনারা অনেক পরে জানতে পারেন । লাঞ্চ ইশকুলেই দেয়া হতো । হিন্দি টিচার পেটুক ছিলেন, স্লিপ লিখে দিতেন যে যতোজন ছাত্র-ছাত্রী তার চেয়ে কম প্লেট এসেছে, সেই স্লিপ নিয়ে যে ক্যান্টিনে যেতো সে নিজের জন্যেও বাড়তি প্লেট নিয়ে আসতো। ক্যান্টিনের ম্যানেজার বলত, “আচ্ছা, আজ টিফিনকে পহলে শ্যামবিহারীবাবু কা ক্লাস থা !”
    বিজ্ঞান আর গণিতের শিক্ষক ছিলেন নীলাংশু মল্লিক, পায়জামা আর নীল রঙের ঢোলা শার্ট পরতেন । ক্লাসে ঢুকেই প্রথমে ব্ল্যাকবোর্ডে পাঠ্য বিষয় সম্পর্কে বিস্তারিত লিখতেন, তারপর ব্যাখ্যা করতেন । বিজ্ঞান সবে আরম্ভ হয়েছিল স্কুলে, তাই কোনো ল্যাবরেটরি ছিল না । সবকিছুই উনি বোর্ডে এঁকে বোঝাতেন। অঙ্ক আর জ্যামিতি আমি সহজভাবে গ্রহণ করে নিয়েছিলুম, কিন্তু অ্যালজেবরা বা বীজগণিত আর ট্রিগনোমেট্রি বা ত্রিকোণমিতির ভয় আমাকে কলেজ পর্যন্ত তাড়া করেছিল । এছাড়া ছিলেন কমলাকান্ত চট্টোপাধ্যায় আর দীনেশ চক্রবর্তী ; হেডমাস্টারমশায় ওনাদের যে ক্লাস নিতে বলতেন, সেই ক্লাসেই পড়াতে চলে যেতেন, বিষয় যাই হোক ।
    রামমোহন রায় সেমিনারীতে আমি বয়ঃসন্ধি পেরোলুম আর বুঝতে পারলুম আমার ভালো লাগে সামান্য ময়লা যুবতীরা, বড়ো-বড়ো চোখ, বড়ো-বড়ো মাই, গালে টোল, ঢ্যাঙা, মাথায় পর্যাপ্ত চুল, ছোট্ট গোল ঠোঁট, কথা বলার ঢঙে ন্যাকামি নেই । আমার উপন্যাসগুলোয় এই যুবতীদের আধিক্য । নমিতা চক্রবর্তী ফর্সা ছিলেন কিন্তু তবুও ওনাকে, যতোদিন উনি বেঁচে ছিলেন, একপেশে ভালোবাসা জানিয়ে গেছি, হয়তো উনিও ভালোবাসতেন আমায়, ওনার আদেশ মেনে পড়াশুনা করতুম বলে।
    পিটি আর খেলার শিক্ষককে সবাই বলতো দীপকবাবু, বেশ স্মার্ট, পালোয়ান টাইপ, আমার প্যাংলা চেহারা দেখে বলেছিলেন, “আরে রোজ-রোজ মাছ-মাংস খেতে কে বলেছে, পেট ভরে ভাত খা দুবেলা, তাতেই হবে ।” ফুটবল খেলার সময়ে উনি বলেছিলেন, “ফুটবল হল একজন সুন্দরী যুবতী যাকে পাবার জন্যে এগারোজন তরতাজা মরদ জি-জান লড়িয়ে দ্যায়, তোদেরও তাই ভেবে খেলতে হবে।” তবে আমি বেশিদিন টিমে টিকিনি, বল ট্যাকল করা শিখতে পারিনি, পায়ের কোথা দিয়ে মারলে বল কোথায় যায়, তাও শিখতে পারিনি, তার ওপর প্রতিদিন শার্ট-প্যান্ট স্কুলের মাঠের ধুলোয় নোংরা হলে কাচার সমস্যা । ক্রিকেট টিমে আমার জায়গা হয়নি কারণ বাবা বলেছিলেন দু-জোড়া শাদা শার্ট-প্যান্ট করিয়ে দেবার মতন, আর ক্রিকেট ব্যাট কিনে দেবার মতন টাকা নেই । সেই থেকে আমি আমার ভেতরের জংলি বাইসনদের পোষ মানাতে চেষ্টা করে গেছি ; কিন্তু একজন মানুষ যখন ফাটে তখন সে কামানের গোলা বা হ্যাণ্ড গ্রেনেডের মতন ফাটে না, আণবিক বোমার মতন ফাটে ।
    শিক্ষকদের আচরণে মনে হতো ওনারা যন্ত্র হয়ে গিয়েছেন, নতুন ছাত্রদল পেয়ে নতুনত্বের বোধে আক্রান্ত নন, তাঁরা প্রতিটি বইয়ের প্রতিটি পাতা, প্রতিটি পাতার প্রতিটি প্যারাগ্রাফ, প্রতিটি প্যারাগ্রাফের প্রতিটি যতি, ছেদ, সেমিকোলনের সঙ্গে বহু বছর যাবত পরিচিত । তাঁদের কাছে বইগুলো ছিল মৃত আর ক্লাসঘর একটি গোরস্তান । স্বাভাবিক যে ছাত্র-ছাত্রীরা ওনাদের গতানুগতিক জীবনে তোলপাড় ঘটিয়ে নিজেদের জীবন্ত প্রমাণ করতে চাইবে । শিক্ষকদের যদি মনে হতো কোনো ছাত্র ওনাদের চেয়ে বেশি শিখে ফেলেছে, তাহলে তার ওপর চটে থাকতেন ।
    ক্লাসের কয়েকজন সহপাঠিনী সম্পর্কে তরুণ শূর বলেছিল, “জানিস তো ওই কটা ভার্জিন নয়।”
    —ভার্জিন ?
    —ভার্জিন জানিস না ? কুমারী মেয়ে নয়, খুইয়েছে ।
    —বুঝিয়ে বল ।
    —মেয়েদের সেক্স করার জায়গায় একটা ফিনফিনে পর্দা থাকে, সেটা যতদিন থাকে ততদিন ভার্জিন। সেক্স করলেই কিংবা নিজেরা কলা-বেগুন-মোমবাতি দিয়ে ম্যাস্টারবেট করলেই পর্দাটা ছিঁড়ে যায়, তখন ভার্জিন থাকে না ।
    শুনেই কুলসুম আপা আর খেমির কথা মনে এসেছিল । আমি কি কুলসুম আপার আর খেমির পর্দা ছিঁড়ে ফেলেছি ! প্রথম রোমান্টিক প্রেমিকার ?
    ক্লাসের সকলের প্রভাবে আমিও, জেঠিমার কথায়, ডানপিটে হয়ে উঠলুম । তবে কয়েকজন সহপাঠী ছিল আরও বেপরোয়া, তারা লাঞ্চের প্লেটগুলো ছাদের দিকে ছুঁড়ে-ছুঁড়ে খেলতো আর সিলিং ফ্যানের ব্লেড বেঁকিয়ে ফেলতো, তার ফলে পুরো ক্লাসকে শাস্তি পেতে হতো, কেননা কেউ কারোর চুকলি করতো না । সহপাঠীরা নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের, তবু ইমলিতলার কথায় ওদের গায়ে কাঁটা দিতো আর আমি সেই সুযোগ নিয়ে বদনাম পাড়ার নায়কত্ব উপভোগ করতুম । লক্ষ্য করেছিলুম যে নোংরা অগোছালো পোশাক বেশ পুরুষত্ব এনে দিতে পারে আমার মতন টিপিকাল বাঙালি চেহারার তরুণকে, বিশেষ মস্তানি বা হিন্দি গালাগাল প্রয়োগ করার তেমন দরকার হয় না । আমার মনে হয়েছে যে মারামারি ব্যাপারটা ছিল আত্মপ্রকাশের উপলক্ষ, তাতে ঘৃণা বা আঘাত করাটা উদ্দেশ্য ছিল না ।
    মনে পড়ছে, ইতিহাসে যখন জিগ্যেস করা হতো, সম্রাট আকবর কতো সালে সিংহাসনে আসীন হলেন, অনিমেষ গুপ্ত ওয়াক তোলার ভান করতো । নেপাল চেঁচিয়ে উঠতো, নির্মলবাবু, ও অণ্ডকোষের নতুন ব্যাঙাচি সামলাতে পারছে না, তার পর “গেট আউট ফ্রম দি ক্লাস” শুনে দুজনেই বেরিয়ে যেতো ম্যাটিনি শো দেখতে ।
    মনে পড়ছে, নমিতা চক্রবর্তী একদিন আমায় জিগ্যেস করেছিলেন, কোন বছর কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো লেখা হয়েছিল ? শুনে আমিও বমির ভান করেছিলুম । উনি যখন জানতে চাইলেন, কি রে, শরীর খারাপ নাকি, বদহজম হয়েছে ? বলেছিলুম, ব্যাঙাচিদের সামলাতে পারছি না আজকাল। শুক্রকীটদের যে ব্যাঙাচি বলা হয় ইশকুলে তা উনি জানতেন না, পরে নৈকট্য গড়ে উঠলে, মনে করিয়ে দিয়েছিলুম ।

    হয়ে ওঠা : আচাভুয়ার বোম্বাচাক
    দরিয়াপুর যাবার পর পড়াশুনায় সুবিধা হলেও প্রথম-দ্বিতীয়-তৃতীয় যে তিনজন হতো তারা নিজেদের জায়গা ছাড়েনি কখনও । আমি তাই চতুর্থ বা পঞ্চম হয়েই সন্তুষ্ট থেকেছি । এই করেই রামমোহন রায় সেমিনারি থেকে বেরোলুম ১৯৫৪ সালে । জীবনে কী হবো, তা নিয়ে কারোর মাথা ব্যথা ছিল না, কিছু হতে হয় কিনা তা আমি জানতুম না । একজন মানুষকে, নিজেকে যে কিছু-একটা হয়ে উঠতে হয়, তার যে প্রতিস্ব হয়, সে যে একজন সাবজেক্ট, সাবজেক্টের বিপরীতে যে অবজেক্ট জগতসংসার, এ-সমস্ত ভাবনাচিন্তা, আমাদের পরিবারে আর যে পাড়ায় শৈশব কাটিয়েছি, সেখানকার লোকেদের ছিল না । এখন বুড়ো বয়সে পৌঁছে, যখন এসমস্ত ব্যাপার এবং তাকে ছাপিয়ে, অনেককিছু জানা হয়ে গেছে, পড়ে ফেলেছি, অভিজ্ঞতা হয়েছে, অতীতকে বানিয়ে ফেলা সহজ । ইমলিতলায়, আর তার পরেও বহুকাল, জানতুম, চারিপাশের লোকজন ঘটনাবলী থেকে টের পেতুম যে একজন মানুষের নানারকম প্রয়োজন মেটাবার দরকার হয়, আর সেসব প্রয়োজন মেটাবার জন্যে তাকে নানা উপায়, ফন্দিফিকির খুঁজতে হয় । এই কাজটা তার জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার । এর বাইরে, লোকটাকে নিজেকেই কিছু একটা হয়ে উঠতে হবে, সেরকম ধ্যানধারণা বা শিক্ষা, আমার বাবা-জ্যাঠা-কাকা বা প্রতিবেশীদের কারোর কাছ থেকে পাইনি । কিছু জিনিশপত্র পেলে ভালো হয়, অমুক কাজটা বড়ো হয়ে করতে পারলে ভালো হয়, এরকম আকাঙ্খা পেয়ে বসত বটে পারিবারিক টানাপোড়েনের কারণে ।
    আমাকে নিজেকে কিছু একটা হয়ে উঠতে হবে, সেই হয়ে ওঠার জন্যে থাকা প্রয়োজন দার্শনিক পরিকল্পনা এবং স্বপ্ন, তাকে বাস্তবায়িত করার মতন প্রজ্ঞা ও ক্ষমতা, এই ধরণের ভাবনাচিন্তা ভারতবর্ষে ইংরেজরা আসার আগে ছিল না । ব্যক্তির হয়ে ওঠার তত্ত্বটা ইউরোপের, খ্রিস্টধর্মের । অতীত বাঙালিসমাজের পৃষ্ঠভূমিতে যে নামগুলো আমরা পাই, এবং যাঁদের আমরা মনে করি “হয়ে উঠেছিলেন”, যেমন অদ্বয়বজ্র, ক্রমদীশ্বর, ইন্দ্রভূতি, অতীশ দীপঙ্কর, চৈতন্যদেব, জগৎমল্ল, জহুরি শাহ প্রমুখ, তাঁরা কেউই নিজেদের কিছু একটা “হয়ে ওঠার”, অথবা প্রতিস্ব নির্মাণের, অথবা সাবজেক্টকে অবজেক্ট জগৎ থেকে পৃথক ও স্বনির্ভর মনে করার, কিংবা ব্রহ্মাণ্ডপ্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন সংস্কৃতি নামের কৃত্রিম জ্ঞানপরিধির কথা চিন্তা করেননি । তাঁদের তত্ত্ববিশ্বে তা সম্ভব ছিল না । তাঁদের আমরা যে কারণে জানি ও শ্রদ্ধা করি, ইউরোপীয় তত্ত্ববিশ্বে নির্মিত হলে তা সম্ভব হতো না ।
    ব্যক্তিসৃজনশীলতা ও ব্যক্তিস্বপ্নের বাস্তবায়ন সম্পর্কিত ইউরোপীয় মননবিশ্বের বাইরে বেরিয়ে, প্রজ্ঞাকে কৌমনিরপেক্ষ ব্যক্তিলক্ষণ হিসেবে আঁকড়ে না থেকে, ব্যক্তির কাজকে সমাজসৃজনরূপে কীভাবে আবার প্রতিষ্ঠা দেয়া যায়, আমার পক্ষে, কলেজে ঢোকার সময়ে তো বটেই, এখন সাতাত্তর বছর বয়সে পৌঁছেও, ভেবে কুলিয়ে ওঠা অসম্ভব । প্রাক ইংরেজ যুগের প্রকৃতি ও প্রকৃতিসঞ্জাত অজস্র দেবীদেবতাকে তাঁদের সিংহাসন থেকে তুলে ফেলে দিয়ে, ব্যক্তিমানুষকে অস্তিত্বের কেন্দ্রে বসিয়েছে ইউরোপীয় দর্শন । গ্রামীণ উন্নয়নের কাজে সারা ভারতে ঘোরাঘুরি করে, সাধারণ ভারতীয়দের দেখে এখন টের পাই কী ভয়ংকর সংকট তৈরি করে দিয়ে গেছে ইউরোপীয় দর্শন । পশ্চিমবঙ্গের বাঙালির সমাজ এখন ইউরোপীয় দর্শনে নির্মিত প্রতিস্বের ব্যক্তিএককে গড়া । আমার শৈশব যেহেতু ব্যক্তিএকক নির্মাণের কারখানায় গড়ে ওঠেনি, ইমলিতলা আর রামমোহন রায় সেমিনারি ইশকুলকে তার জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে বলতে পারি যে ব্যাপারটাকে আমি বেশ দূরত্ব থেকে অনুধাবন করতে পারি । তার মানে এই নয় যে আমি নিজস্ব একটা দার্শনিক স্হিতি গড়ে তুলেছি । আমার সাহিত্যকর্ম, সাহিত্যের প্রচলিত ধারণাকে ছাপিয়ে বৃহত্তর এলাকায় একারণেই প্রবেশ করে ।
    সনাতন বাঙালিসমাজে যাঁরা কিছু হয়ে উঠেছিলেন বলে এখন আমরা মনে করি, যাঁদের নাম আমি একটু আগে উল্লেখ করেছি, কিংবা বাউল, ফকির, সন্ন্যাসী, যা ইউরোপে ছিল না, নেই, তাঁরা এবং তাঁদের কাজকর্ম, আমরা সমাজ বলতে এখন যা বুঝি, তার বাইরে ঘটেছে । অর্থাৎ নিজের সামনে “অপর” মানুষকে দাঁড় করিয়ে নিজেদের “হয়ে ওঠা” প্রতপন্ন করতে হয়নি তাঁদের । তার মানে ইউরোপীয় স্বপ্নের বাস্তবায়নের জন্যে আসেপাশে লোকজন দরকার । ঠিক যেমন নেতা “হবার” জন্যে সভায় বক্তৃতা জরুরি ; লেখক “হবার” জন্য পুরস্কার ; কবি “হবার” জন্যে সম্বর্ধনা ।
    নিজের কাছে নিজে সৎ হওয়া ছাড়া আর কোনোকিছু কেনই বা হতে যাবে মানুষ ? অপরের জন্যে কিছু করা, এবং নিজের “হবে ওঠার” জন্যে নিজের সামনে অপর বা অপরদের দাঁড় করানো, দুটো একেবারে আলাদা ব্যাপার । অপরদের নিজের মালমশলা মনে করাটা মোনোসেন্ট্রিক, ইউনিপোলার, ইউনিলিনিয়ার । কেবল মানুষ নয়, সমস্ত ধারণাই দেখা যায় তাদের অপরের বিপরীতে নির্মিত । আমি বড়ো হয়ে “অমুক হবো” ভাবতে গেলে শৈশব থেকে আমার সামনে তমুক-তুসুক থাকা জরুরি । সবাই সৎ হলে কারোর আর আলাদা ভাবে সৎ হবার দরকার হয় না । ভাবনাটাই আসবে না মাথায় । সত্যি কথা বলতে কী, হয়ে ওঠার খপ্পরে পড়লে, বাঙালির আর সনাতন বাঙালিত্ব টেঁকে না ।
    চাকরি করার সময়ে দেখেছি, একজন নবযুবক অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার সতত চিন্তিত থাকে কীভাবে ম্যানেজার “হবে”, ম্যানেজার “হয়ে গেলে” অ্যাসিস্ট্যান্ট জেনেরাল ম্যানেজার, ডেপুটি জেনেরাল ম্যানেজার, জেনেরাল ম্যানেজার, চিফ জেনেরাল ম্যানেজার ইত্যাদি “হবার” চিন্তায় বিভোর থাকে । অবসরপ্রাপ্তি ঘটলেই যাবতীয় “হওয়াহয়ির” হাওয়া বেরিয়ে যায় । কবি-লেখকরা দেখি একইভাবে নানা পুরস্কারের সিঁড়ি বেয়ে কবি থেকে সুপারকবি “হবার” দিকে দৌড় দ্যান । প্রতিস্ব ব্যাপারটাই শেষে ফালতু হয়ে দাঁড়ায় । এ প্রসঙ্গে বলা চলে যে, ইংরেজরা আসার পর, বাঙালি ভাবুক ও শিল্পীসাহিত্যিক “চেতনা” নিয়ে যে সমস্ত গর্ব প্রদর্শন করেছেন, তার পৃষ্ঠভূমিটি ছিল দান-বিলোনো বলবান উপনিবেশবাদীর এবং অধীনস্হ সহজবশ্য গ্রাহীর । অনুশাসন কাঠামোটাই তো হেলেনিক । সে অনুশাসনের উৎসসূত্র ইউরোপের জ্ঞানভাণ্ডার, এবং ওই জ্ঞানকে প্রতিষ্ঠা দিয়েছিল তাঁদের শাসনক্ষমতা । তাঁদের জ্ঞানকাঠামো দিয়ে, তাঁদের নির্মিত বাস্তব দিয়ে তাঁরা জ্ঞানী, মনীষী, পপতিভাবান, নায়ক, ভাবুক, দার্শনিক ইত্যাদি চিহ্ণিত করার নকশাজাল বানিয়ে দিয়েছিলেন । ওই সমস্তের কোনোকিছু “হবার” স্বপ্ন কারোর থাকলে, তাঁকে ক্ষমতাজালটিকে মেনে নিয়ে, নিজের প্রতিস্বকে সেইমত নথি করাতে হবে । বলাবাহুল্য যে আমি শৈশব থেকে ওই ক্ষমতাজালটিকে অস্বীকার করার চেষ্টা করে গেছি, প্রান্তিক থেকেছি ।
    প্রান্তিকতার কারণে, যা আমার “ছোটোলোকের ছোটোবেলা” পড়লে জানা যাবে, ইংরেজরা আর ভারতীয় জাতিয়তাবাদীরা ভূমিপুত্রদের পিটিয়ে নিজেদের প্রতিবিম্ব বানাবার যে বিশাল জাল ফেলেছিল, তাতে ধরা দিতে অস্বীকার করার প্রবৃত্তি আমার আপনা থেকেই গড়ে উঠেছিল । যে দার্শনিকতা সবাইকে পিটিয়ে সমান করতে চায়, সেখানে বাউল, ফকির, সাধু-সন্ন্যাসীর উদ্ভব ঘটে না । ইংরেজদের সরবরাহ করা বাঙালি আত্মপরিচয়ের জগৎটিতে, আমাদের ইমলিতলার একান্নবর্তী পরিবারটি, তার অদ্ভুত ও অযাচিত প্রান্তিকতার দরুণ, প্রবেশ করার সুযোগ পায়নি । তা ছিল “নতুন”, এবং যাঁরাই সুযোগ পেয়েছেন, তাঁরাই আশ্রয় নিয়েছেন অবধারণাটিতে । অবধারণাটি বিশাল সময়প্রবাহে একটি প্রাথমিক মুহূর্ত চিহ্ণিত করতে চেয়েছিল, এবং তাতে শামিল হয়েছিলেন, কেন্দ্রস্হানীয় বাঙালি ; যখন কিনা আমাদের পরিবার ছিল প্রান্তিক।
    একজন মানুষের এই আকাঙ্খা যে, “আমি অমুক হবো”, অনিশ্চয়তার এলাকায় লুকিয়ে থাকে । কিছু একটা “হতে চেয়ে” সফল হতে হলে তো নিখুঁত হতে হবে । সর্বজনীনতার কারখানায় গড়া নিখুঁত । নিখুঁত হবার প্রধান বাধা অনিশ্চয়তা । আমার শৈশব-কৈশোর কেটেছে অমন অনিশ্চয়তার পরিমণ্ডলে । যা অনিশ্চিত তা অন্যরকম । যারা অন্যরকম তারা অপর । তারা ব্যবস্হাটিতে খাপ খায় না । অপর হতে হবে এই ভাবনা অপর লোকটি ভাবে না নিশ্চয়ই । আমি জানতুম যে আমি মিসফিট, গোলমাল সৃষ্টিকারী, স্হিতাবস্হার বিরোধী ; কিন্তু তাই বলে নিজেকে অপর ভাবিনি । কুলসুম আপাদের পরিবারকে অপর মনে হয়নি । পাড়ার মহাদলিতদের অপর মনে হয়নি । তারা নানা জীবিকার মাধ্যমে সংসার চালিয়েছে, যেমন বাবা ফোটোর দোকানের মাধ্যমে চালিয়েছেন ইমলিতলা, দরিয়াপুর আর উত্তরপাড়ার সংসার । ফলে আমার জীবনকে একটি ইউনিলিনিয়ার গল্পে বেঁধে ফেলা কঠিন । একজন মানুষের জীবনী সেহেতু বিভিন্ন লেখকের হাতে বিভিন্ন হতে বাধ্য । কেননা সময়প্রবাহ মালটিলিনিয়ার, এই ধারণা আমি ১৯৫৯ সালে পেয়েছিলুম অসওয়াল্ড স্পেংলারের “ডিক্লাইন অফ দি ওয়েস্ট” বই থেকে । কেন্দ্র থেকে বৃত্তপরিধির দিকে যে পরিবর্তনশীল রেখাগুলো টানা যায় তা অসংখ্য, তা গোনা যায় না । কেউ যদি হয়ে ওঠার বা আকাঙ্খাপূর্তির কাহিনি বাঁধতে চান, তাহলে ওই অজস্র পরিবর্তনশীল রেখা থেকে যে কোনো একটি বেছে নিয়ে বৃত্তের মাঝখান থেকে বেরিয়ে পরিধিতে পৌঁছোবার গল্প লিখতে হয় । অথচ যতোগুলো পরিবর্তনশীল রেখা সম্ভব ততোগুলো গল্প দিয়ে তো লোকটা গড়ে উঠেছে ।
    ধরা যাক শৈশব থেকে আমি বহু প্রাণী ও বস্তুর দিকে কেবল তাকিয়েছি, তাকাই, কারণে-অকারণে । শুধুমাত্র তাকাবার ইতিহাস আছে আমার । শুধুমাত্র স্পর্শের ইতিহাস আছে । কথা বলার ইতিহাস আছে । শোনার ইতিহাস আছে । সাক্ষাতের ইতিহাস আছে । বহু বাড়িতে ঢোকার আর বেরোনোর ইতিহাস আছে । হাঁটার ইতিহাস আছে । পোশাক পরার ইতিহাস আছে । চুল কাটার ইতিহাস আছে । তা থেকে কী-কী ছাঁটাই করে আমি আমার “হয়ে ওঠার” গল্প লিখব ? যে গল্পই লিখি না কেন, তা হবে সময়ের প্রতি একচোখোমি। স্হান বা স্পেসকে গুরুত্বহীন করে দেবে, এমন গল্প ।
    “হয়ে ওঠার” একটা পথ হিসাবে দাদা, কলকাতায় বহুকাল কাটিয়েছে, বলল কলেজে ইকোনমিক্স আর ম্যাথামেটিক্স নিয়ে পড় । কলেজে ভর্তি হয়ে গেলুম আর ভর্তি হয়ে বুঝলুম ম্যাথামেটিক্স ব্যাপারটা আমার আয়ত্বের বাইরে তো ছিলই, ইকোনমিক্সেও গণিত লুকিয়ে আছে, তার নাম ইকনোমেট্রিক্স ।
    ১৯৫৬ সালে এই বেড়া টপকে বেরিয়ে ইকোনমিক্সে স্নাতক পড়তে ঢুকলুম । মুখস্হ করতে আমি কোনো কালেই পারি না, তাই একটা বই ধরে-ধরে পুরোটা কয়েকবার লিখে নিতুম যাতে মনে থাকে । এই লেখালিখির দরুণ আকর্যণ করতে পারলুম নেপালি সহপাঠিনী ভূবনমোহিনী রাণা নামে মোটা কাচের চশমা পরা মোঙ্গোল সুন্দরীকে ; তার খাতাগুলো দরকার। দুজনে বন্ধু হয়ে গেলুম, আমার চুমু খাবার প্রস্তাবে রাজি হয়ে গেল ভূবনমোহিনী, ‘রাহুকেতু’ উপন্যাসে যার নাম রাণো । ওর জন্যে ইংরেজিতে একটা কবিতা লিখেছিলুম, সেটাই আমার শেষ ইংরেজি কবিতা । মেয়েরাও যে মদ খায় তা ভূবনমোহিনীকে চুমু খেতে গিয়ে টের পাই । পরে ঘটনাটা হিন্দি লেখক ফণিশ্বরনাথ রেণুকে বলতে, উনি বলেছিলেন, কী করেছ কি, জানো কি রাণারা নেপালে কতো ক্ষমতাবান, জানতে পারলে তোমায় জ্যান্ত পুঁতে দেবে । আমি ভূবনমোহিনীকে তাড়ি খাইয়েছিলুম । চুমুর প্রতিদানে ওর জন্যে ‘এক্সচেঞ্জ এ কিস’ নামে এই কবিতাটা লিখেছিলুম :
    লেট ইওর পারফিউমড হ্যালো
    ফল ফর এ ফিউ সেকেণ্ডস
    টু এনাবল মি ইন পিকিং আপ
    দি মেমরি অফ ইওর গ্ল্যানসেস
    ইউ লেফ্ট ইন দি নোটস আই লেন্ট ইউ
    নট ফর নাথিং ! অ্যাট লিস্ট ইউ শুড
    এক্সচেঞ্জ এ কিস, ইভন ফ্লাইং উইল ডু ।
    ভূবনমোহিনী রাণা একমাত্র যুবতী যে আমাকে চুমু খাবার প্রতিদানে চড় মেরেছিল, কষে চড় । ‘রাহুকেতু’ উপন্যাসে লিখেছি ঘটনাটা । ফরাসি যুবতীকে চুমু খাবার ইচ্ছে পুরো হলো না, ওদের চুমুতে ফরাসি ভাষার নাকিসুর বাজনা থাকে বলে জানিয়েছিল উলিয়াম গথ নামে এক হিপি, কাঁচা মাছের সুবাস থাকে, কাঠমাণ্ডুতে একজনও ফরাসী যুবতী হিপি পাইনি, নইলে নির্ঘাৎ চুমু খেতুম, কচি ডাবের জল খাবার মতন করে, যে ভাষার সঙ্গে পরিচয় নেই সেই ভাষার যুবতীদের যোনি থেকেও গোপন সঙ্গীত ভেসে বেড়ায়, এটা আমার অভিজ্ঞতা।
    স্নাতকস্তরে দ্বিতীয় হয়ে বেরোলুম ১৯৫৮ সালে । ১৯৫৯ সালে বাংলায় লেখা কবিতায় বাবার দেয়া ডায়েরির পাতা ভরে উঠেছিল, যা ইচ্ছে লিখছিলুম, বেপরোয়া হয়ে, ইমলিতলার বেপরোয়াভাব চলে এসেছিল কবিতা লেখাতেও ।
    স্নাতকোত্তরে ইকোনমিক্সে স্পেশাল পেপার নিলুম মনিটারি থিয়োরি, আর সেখানেও গণিতের ভুত পিছু ছাড়লো না । ১৯৬০ সালে স্নাতাকোত্তরেও দ্বিতীয় হলুম । আমার মতন আমার প্রিয় দুই অধ্যাপক, ডক্টর আর এন ত্রিপাঠী আর ডক্টর জে এন সিনহার মনও খারাপ হয়ে গিয়েছিল আমার ফলাফলে । জীবনে পরীক্ষায় প্রথম হওয়া আর হলো না । নমিতাদির চাপানো মার্কসবাদ তখন মাথায় পোকা হয়ে ঘুরছে, হয়তো কুলসুম আপার প্রভাবও থাকতে পারে, ইমলিতলার জীবন তো বটেই। ডক্টর জে এন সিনহা একবার রিজার্ভ ব্যাঙ্কের অফিসে এসেছিলেন জমিদারি বণ্ড ভাঙাবার জন্যে, আমাকে দেখে বললেন, “ইকোনমিক্স পড়ে শেষে এই কাজ করতে হচ্ছে!”
    ওই সময়টা, ১৯৫৬ সালে ইনটারমিডিয়েট পাশ করে বেরিয়ে স্নাতকোত্তর হওয়া পর্যন্ত, আমি জীবনকে যতোটা পারা যায় জটিল করে তোলার চেষ্টা করে গেছি, যৌনতা, মাদক,যৌনতা, মাদক,যৌনতা, মাদক, যৌনতা, যখন কিনা সহপাঠীরা সবাই স্নাতক পড়তে ঢুকেই আরম্ভ করে দিয়েছে আইপিএস আইএএস আইএফএস, নিদেন স্টেট সার্ভিস কমিশনে ঢুকে যেতে । অনেকেই মাঝপথে পড়ে ছেড়ে আইপিএস আইএএস “হয়ে” গেল, আমি যখন স্নাতকোত্তর পাশ করলুম তখন ওরা প্রায় সবাই ঘুষের প্রাসাদ খাড়া করে ফেলেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের দরোজা দিয়ে বেরিয়েই ঘুষ নিতে পারা চাড্ডিখানি কথা নয় । আমার কোনো উচ্চাকাঙ্খা ছিল না, হবি ছিল না, পার্কে দৌড়োনো ছিল না, রোয়াকে বসে মেয়েদের সিটি বাজানো ছিল না । ছিল না ছিল না ছিল না ছিল না । অতীত জিনিসটাই যেন পচধরা । অতীতের কিছু ঘটনা থেমে যায়, কিছু ঘটনা চলতেই থাকে চলতেই থাকে চলতেই থাকে ।
    কেবল রোমান্টিক প্রেমিকা শুভা ! ওকে অবন্তিকাও বলা যেতে পারে । সে বনলতা সেন নয়, তার পক্ষে হওয়া সম্ভব ছিল না । সে নীরা নয় । সে সুপর্ণা নয় । সে চোরাবালি । প্রেমে কিছুটা লাম্পট্যের বিকৃতি জরুরি । ব্যাপারটা শরীরের জৈবিক আত্মস্বীকৃতি । জীবনের ইতরতাকে স্পর্শমণিতে পালটে দিতে পারে ঘৃণা । রামমোহন রায় সেমিনারীতে ফেলটু ছেলেদের একজন, রক্ষিত, পুরো নাম ভুলে গেছি, একবার বলেছিল, মনে আছে, “প্রেম হলো বইয়ের মতন, একবার পড়া হয়ে গেলে অন্য ক্লাসে উঠে অন্য বই পড়ো, একই বইতে জীবনকে আটকে রাখলে চলবে না ।” বহুকাল পরে যখন আমার মামলা চলছে, দেখা হয়েছিল রক্ষিতের সঙ্গে কলকাতায়, বলেছিল, “কী রে, দেখলি তো, তুই সমাজকে যতোই পালটাবার চেষ্টা করিস না কেন, তোর চারিপাশের লোকেরা তোকে জোর করে পালটে দেবার চেষ্টা করবে।”
    কলকাতার পুলিশ কমিশনার আমাকে বলেছিলেন, “সো ইউ আর দি টপ ডগ” । তখন “টপ ডগ” এর মানে জানতুম না বলে খারাপ লেগেছিল, মনে করেছিলুম কুকুর বলছেন । উকিলকে কথাটা বলতে উনি যখন মানে বোঝালেন তখন মন্দ লাগেনি । তবে উকিল বলেছিলেন যে, “পুলিশ কমিশনারের কথা থেকে মনে হচ্ছে আপনাকে একাই কেস লড়তে হবে ।”
    কাঁচা ঠোঁটের স্বাদ আর কবিতা । ঘুম আসতো না ঘুম আসতো না ঘুম আসতো না । ম্যাস্টারবেট করার বয়স আর ধাতুরসের প্রাচুর্য ছিল এখন বুড়ো বয়সে ঘুম আসে না ঘুম আসে না ঘুম আসে না ধাতুরস নেই লিঙ্গোথ্থান নেই , কিন্তু এই ঘুম না আসার সঙ্গে ওই ঘুম না আসার কোনো মিল নেই । এখন তো ঠাকুমা নেই জেঠিমা নেই জেঠা নেই বাবা নেই মা নেই কাকারা নেই কাকিমারা নেই মেজদা নেই খুড়তুতো বোন পুটি নেই গলায় দড়ি দিয়েছিল খুড়তুতো ভাই খোকা নেই তরুণ শূর নেই বারীন গুপ্ত নেই এখন কেবল নেই নেই নেই নেই নেই নেই আছে । গভীর দুঃখ গভীর দুঃখ গভীর দুঃখ গভীর দুঃখ গভীর দুঃখ ।
    ১৯৫৪ থেকে ১৯৫৬র মাঝে, রোমান্টিক প্রেমিকা শুভা লাথি মেরে চলে গেছে একজন হাঞ্চব্যাকের সঙ্গে, ‘রাহুকেতু’ উপন্যাসে যার নাম অঞ্জলি দাশ, যাকে ভেবেছিলুম চরম, অতুলনীয়া, অদৃষ্ট, নিয়ন্তা, অথচ আমার টেম্পটেশান, মালিকানার উদ্দেশ্যে ছিল না, জানলুম সুন্দরীরা চিরকাল গণ্ডমূর্খদের চায়, গণ্ডমূর্খরা তাদের ডানা গড়ে দ্যায়, আমার মূর্খতা যে লম্বা ঠ্যাঙের যুবতীদের আমার পছন্দ, একজনের স্মৃতিকে মুছে ফেলার জন্য আরেকজনকে তাজা স্মৃতিতে না আনলে নয়, স্মৃতিরা নির্যাতনকারী আর ভয়াবহ, অক্ষর সাজিয়ে বাক্য লিখে তার ফাঁদ থেকে বেরোবার চেষ্টা করি, আমার অবস্হা আরও জটিল করে তুলতে দাদা কলকাতা থেকে স্নাতক হয়ে এলো, সঙ্গে নিয়ে এলো অজস্র উপন্যাস, গল্প আর কবিতার বই, কোনোটা ছেঁড়া কোনোটায় চায়ের দাগ কোনোটায় মদের ছোপ কোনোটা সিগারেটের আগুনে ছ্যাঁদা, প্রেমেন্দ্র মিত্র, সুধীন দত্ত, বিষ্ণু দে, জীবনানন্দ দাশ, বুদ্ধদেব বসু, অমিয় চক্রবর্তী, অচিন্ত্য সেনগুপ্ত আর ওনার কল্লোল যুগ, বনফুল, বিভূতিভূষণ, তারাশঙ্কর, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, পরে যাঁদের জেনেছি খ্যাতনামা সাহিত্যিক হিসাবে, বিভাস মামা মানে ছোটো মামা মার্কসবাদে বিরক্ত হয়ে ওনার যাবতীয় সংগ্রহ দিয়ে দিলেন স্নাতকোত্তরের ইকোনমিক্স বইপত্রের সঙ্গে, সুমিতা চক্রবর্তী নিজের স্টক ক্লিয়ারেন্সের জন্যে নিয়মিত সোভিয়েত দেশের বিদকুটে গন্ধের বই দিতে লাগলেন আর দিতে লাগলেন ব্রিটেনের রোমান্টিক কবিদের বই, উলিয়াম ব্লেক, ওয়র্ডসওয়র্থ, কোলারিজ, বায়রন, শেলি, কিটস, কিন্তু রবীন্দ্রনাথকে দেবেন না, রবীন্দ্রনাথ রবীন্দ্রনাথ রবীন্দ্রনাথ ওনার পাশে শুয়ে থাকেন দিনেরবেলা রাতেরবেলা, ভালো ভালো ভালো ভালো, নেহেরু আর গান্ধীকে ঘৃণা করতে শেখান, বন্ধু সুবর্ণর সঙ্গে জার্মান ভাষা শেখার ক্লাস আরম্ভ করলুম বিশ্ববিদ্যালয়ের জার্মান শিক্ষকের কাছে, ওরই সঙ্গে ওস্তাদের কাছে শেখা আরম্ভ করলুম ভায়োলিন কিনে বেহালা বাজানো, রেকর্ড প্লেয়ার কিনে পড়ার সময় গান শোনার অভ্যাস করলুম, গানের রেকর্ডের তালিকা বন্ধু বারীন গুপ্তের দেয়া, রাইফেল আর পিস্তল চালিয়ে টার্গেট প্র্যাকটিস করার লোভে তরুণ শূরের সঙ্গে ন্যাশানাল ক্যাডেট কোরের ইনফ্যানট্রিতে ঢুকলুম, ক্যাপস্টানের তামাকে গাঁজা মিশিয়ে রাইস পেপারে মুড়ে খাওয়া আরম্ভ করলুম, যা সরকারি দোকানে সত্যমেব জয়তে ছাপমারা পুরিয়ায় সস্তায় পাওয়া যেতো, মদ খাওয়া আরম্ভ করলুম চাপ কমাবার জন্যে, এতো কিছু একই সঙ্গে করার চেষ্টায় বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম হওয়া হল না । চলমান আগ্নেয়গিরি হয়ে উঠলুম ।
    দরিয়াপুরের দেয়াল আলমারি জুড়ে আমার ব্যক্তিগত গ্রন্হাগার বন্ধুদের ঈর্ষার ব্যাপার হয়ে উঠল। বিরল বই থাকলে নানান কিসিমের বন্ধুরা জুটে যায় । পুস্তক মহল থেকে সাম্প্রতিক ইংরেজি বই কিনে আনতুম আর বাবা বিল পেমেন্ট করে দিতেন । আমার মামলার সময়ে আমার অনুপস্হিতিতে অনেক বই চুরি হয়ে গিয়েছিল, মার্কুইস ডি সাডের “হানড্রেড টৌয়েন্টি ডেজ অফ সোডোম”, হ্যাভলক এলিসের “কমপ্লিট ওয়র্কস”, জঁ জেনের “আওয়ার লেডি অফ দি ফ্লাওয়ার্স”, ম্যালকম এক্সের জীবনী, ডস্টয়েভস্কির “কমপ্লিট ওয়র্কস”, বিট আন্দোলনের পত্র-পত্রিকা, অভিধানগুলো, অনেক বই, অনেক বই ।
    অনেক জীবন একই সঙ্গে অনেক আমি, জিততে হবে অথচ জানি না কি জিততে হবে, পারতে হবে অথচ জানি না কি পারতে হবে, পৌঁছোতে হবে অথচ জানি না কোথায় পৌঁছোতে হবে, কারণ নেই, মগজে মৌমাছির ঘামগান, জীবনের মানে খুঁজতে চোখ বুজে লাফিয়ে-পড়া, হয়তো, হতে পারে, পোশাকের আগ্রহ ছিল না, নিয়মিত কাচার দরকার ছিল না, জুতোর আগ্রহ ছিল না, নিয়মিত পালিশের দরকার ছিল না, হাতঘড়ির আগ্রহ ছিল না, কেবল মনে হচ্ছিল দেশে-দেশে স্টুপিডরা রাষ্ট্রকে চালায়, ইমলিতলার লোকগুলো সপরিবারে গরিবই থেকে যাবে হাজার বছর । মনুস্মৃতির পাহাড় মাথায় চাপিয়ে লোকে কী করে সাম্যবাদের স্বপ্ন দেখে জানি না, ভারতীয় সমাজ সম্পর্কে পশ্চিমবঙ্গীয় আঁতেলদের কোনো ধারণাই নেই , স্বাধীনতার ছয়টা দশক পেরিয়েও গ্রামগুলো জাতিপ্রথা দিয়ে ভাগবাঁটোয়ারা করা, জলভরার কুয়ো আলাদা, উঁচু জাতে প্রেম করলে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারা হয় বা কোতল করা হয়, কলেজে তারা ব্র্যাণ্ডেড জুতো, পোশাক, চশমা, পারফিউমসহ গেলে ধনী উঁচুজাতের আক্রমণে পড়ে, যুবতীরা নখপালিশ লাগিয়ে মুখ ব্লিচিং করে গেলে কুকথা শুনতে হয় । তাই আমার কাছে লেখালিখি আর সাহিত্য-শিল্প এক জিনিস নয় । আমি লেখালিখির শুরু থেকেই নিজেকে যাচাই করে নিয়েছিলুম, সাহিত্য-শিল্প বলতে যা বোঝায় তা করব না, বরং আমার লেখালিখি হবে শিল্পবিরোধী ।
    ১৯৩৯ : জন্মালুম, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছে ।
    ১৯৪০ : ইমলিতলার মহাদলিত পাড়ায় মি খেয়ে বেড়াচ্ছি, এর কোলে তার কোলে । সেজোমামা পাণিহাটি থেকে দেখতে এসেছিলেন আমায়, ছাদে আমায় নিয়ে লোফালুফি করছিলেন, হাত ছেড়ে মেঝেতে পড়ে যাই, আরেকটু হলে আলসের অন্য দিকে রাস্তায় গিয়ে ডিগবাজি খেতুম । পড়ে গিয়ে আমি উঠে দাঁড়িয়ে হাঁটতে আরম্ভ করেছিলুম, তার আগে শুধু হামাগুড়ি দিতুম । হাংরি মামলায় সময়ে সেজোমামার সঙ্গে দেখা করতে গেলে বলেছিলেন, “তুই ঠিক উঠে দাঁড়িয়ে ওদের পেছনে তাড়া দিতে পারবি”।
    ১৯৪১ : ইমলিতলার মহাদলিত পাড়ায় মি খেয়ে বেড়াচ্ছি, এর কোলে তার কোলে ।
    ১৯৪২ : সেইন্ট জোসেফস কনভেন্টে ট্রানজিশান ক্লাসে ভর্তি হলুম । নান সিসটার আইরিন । শৈশবে আমি বড়োজেঠিমার গল্পের পরী, দেবতা, দানব, উড়ন্ত জাজিম, ভুত, রাক্ষস সবকিছু বিশ্বাস করতুম, কৈশোরেও বহুকাল পর্যন্ত বিশ্বাস করেছি, তাদের মনে হতো বাস্তব জগতের প্রাণী । কবে তারা অবাস্তব হয়ে উঠল জানি না । কুইট ইনডিয়া আন্দোলন, ব্রিটিশের জোরজুলুম পাটনার কদমকুঁয়ায়, বাঙালিদের পাড়া, দাদার বন্ধুরা থাকে ।
    ১৯৪৩ : ঐ ইশকুলে জুনিয়ার কেজিতে উঠলুম । গিরজায় যিশু খ্রিস্ট ঝুলছেন, কেমন করে মানুষ স্রেফ হাতে পেরেক পায়ে পেরেক নিয়ে ঝোলে আজও বুঝতে পারি নি অঙ্কটা । পাড়ার বউরা, “কেতনা নিমন গোরাচিট্টা হো গেলে তু”, বলে আমায় চুমু খাবার স্বাধীনতা পেয়ে গেছে, চুমু খেয়ে বলে, নজর নামিয়ে দিলুম। তাড়ির, খইনির, বিড়ির, গুগগুলের, তামাকপাতার, পানজর্দার চুমু ।
    ১৯৪৪ : ঐ ইশকুলে সিনিয়ার কেজিতে উঠলুম । পাড়ার বউদের চুমু বজায় ; তাড়ির নিশিডাক পাওয়া আরম্ভ করেছি। কপিলের দাদুর রোয়াকের ক্লাসে হিন্দিতে অশ্লীল গালাগাল শিখতে আরম্ভ করলুম, যেগুলো রামমোহন রায় সেমিনারিতে ভর্তি হয়ে কাজে লাগত, গায়ে জোর না থাকলে গালাগাল ভালো কাজ দ্যায়, যা এখনও অনেককে চুপচাপ দিই।
    ১৯৪৫ : ঐ ইশকুলে ফার্স্ট স্ট্যাণ্ডার্ডে উঠলুম । পাড়ার বউদের চুমু বজায়, হাতের পেছন দিয়ে ঠোঁট মোছা শুরু । ইমলিতলার বাড়িতে “লিটল বয়” আর “ফ্যাট ম্যান” আলোচনা, যেগুলো দরিয়াপুরে যাবার পর জানতে পারব, হিরোশিমা আর নাগাসাকিতে ফেলা আণবিক বোমার নাম, আমার আর মেজদার নাম নয় । বিশ্বযুদ্ধ শেষ হল, আমার শুরু হল পাড়ায় সকলের বাড়ির অন্দরমহলে ঢোকবার স্বাধীনতা।
    ১৯৪৬ : ঐ ইশকুলে সেকেন্ড স্ট্যাণ্ডার্ডে উঠলুম । ফাদার হিলম্যান হোলি বাইবেল কেন বলেন বুঝতে পারি না । পুজোর বই মানেই কি পবিত্র । তুলোট মলাটের বাইবেলকে তো মাথার তলায় রেখেও শোয়া যায়, যেমন কপিলের চাচা “রামচরিতমানস” মাথার তলায় রেখে ঘুমোয় । তাই যদি হবে তাহলে বালিশকে কেন পবিত্র বলা হবে না, ভাবতুম ।
    ১৯৪৭ : ঐ ইশকুলে থার্ড স্টাণ্ডার্ডে উঠলুম । কুলসুম আপা কবিতা আর যৌনতার আওতায় নিয়ে গেলেন । মেয়েদের শ্বাসের গন্ধ তাদের দেহের তাপ অনুযায়ী বদলায় ।
    ১৯৪৮ : ঐ ইশকুলে ফোর্থ স্ট্যাণ্ডার্ডে উঠলুম । মিউজিক মিসের দু’পায়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে পিয়ানো বাজার ক্লাস আরম্ভ হল, আমার মাথার পেছন দিকে মিউজিক মিসের দুটো মাই ডো-রে-মি-ফা-সো-লা-টি বাজানো শিখতে লাগল ।
    ১৯৪৯ : রামমোহন রায় সেমিনারিতে ক্লাস সিক্সে ভর্তি হলুম । দাদা কলকাতায় পড়তে চলে গেল । ইংরেজি থেকে বাংলায় অনুবাদ করে বাংলা শেখা, হাহা হাহা হাহা, ওদের মতন বাক্য গঠনের ম্যাকলে ম্যাজিকের ভুলভুলাইয়ায়, আদি বাংলা শব্দ সাজানোর ম্যাজিক হাপিশ ।
    ১৯৫০ : ঐ ইশকুলে ক্লাস সেভেন্হে উঠলুম । নির্ণয় নিতে হল কোন কিশোরীর মনের ভেতরে ঢুকে পড়ব । ক্লাসে কাউকে পাওয়া গেল না, সকলেই দাগ-দেয়া পোস্তফুলের কুঁড়ি, সহপাঠীদের ভাষায় “লবড়ধোধো” । ক্লাস নাইনের নমিতা চক্রবর্তীর মনের ভেতরে ঢুকে পড়লুম । উনি আমার মগজে প্রতিদিন বাংলা বই চালান করতে লাগলেন । ফর্সা, গালে টোল, ছোট্ট গোল ঠোঁট, গালফোলা, কোঁকড়া চুল, বড়ো-বড়ো চোখ। হরমোন, ফেরোমোন, টেসটোসটেরোন, এসট্রোজেন, প্রজেসটেরোন, অক্সিটোসিন । গালে টোল চিরকাল আকর্ষণ করেছে ।
    ১৯৫১ : ঐ ইশকুলে ক্লাস এইটে উঠলুম । জানতে পারলুম বন্ধুদের শুয়োরাত্মা খচ্চরাত্মা কুকুরাত্মা ইঁদুরাত্মা গাধাত্মা হয় ; এই রকম বন্ধু হাংরি আন্দোলনেও পেয়েছি । বারীন বলতো স্বপ্নের ভেতরে নিয়ে এসে ওদের পোঁদ মার । সত্যি, জীবনে কখনও পোঁদ মারা হয়ে ওঠেনি । কারোর পোঁদে লিঙ্গ ঠেকালে কি দাঁড়াবে? মনে হয় না, তারও তো প্রেফারেন্স আছে । মুম্বাইতে এসে ব্যান্ড্রায় দেখেছি পোঁদ মারার সান্ধ্যেয় বাজার, যুবকেরা সেজেগুজে দাঁড়িয়ে আছে সমুদ্রের ধারে ।
    ১৯৫২ : ঐ ইশকুলে ক্লাস নাইনে উঠলুম । খেমির সঙ্গে রাসলীলা । আমরা হামাগুড়ি দিয়ে একে আরেকজনের ভেতরে ঢুকে পড়লুম ; দুজনেরই প্রথম স্বাদের আহ্লাদ । যতোদিন খেমি ছিল ততোদিন হামাগুড়ি দিয়েছি দুজনে ।
    ১৯৫৩ : ঐ ইশকুলে ক্লাস টেনে উঠলুম । কয়েকজন সহপাঠীর সঙ্গে মারামারি করলুম । হিন্দি ফিলমের মতন মারামারির প্রতিদান । আমি গভীর সমুদ্রে মাছধরা জালে কিলবিলোনো নোনতা মাছের রূপালি ঝাঁক । রোমান্টিক প্রেমিকা বলল, “তুই এক নম্বরের লেচার”।
    ১৯৫৪ : ম্যাট্রিক, মানে এগারো ক্লাস করে রামমোহন রায় সেমিনারি ছাড়লুম । সাইকেলে চেপে আমি বারীন সুবর্ণ আর তরুণের ছুট্টল ষাঁড় দোলখেলা, ছেঁড়া শার্ট পুরোনো প্যান্টে, সঙ্গে অশ্লীল হিন্দি আর ভোজপুরি গান যতো জোরে চেঁচানো যায়, নানা দলের সঙ্গে হাতাহাতি, শার্ট ছেঁড়াছিঁড়ি, তেলালো রঙ, দুধে সিদ্ধি গেলাস গেলাস মোড়ে-মোড়ে বিনি পয়সায় । বি এস এ সাইকেল কিনে দিলেন বাবা । শুরু হলো সাইকেলে টোটো । তরুণ শূর, বারীন গুপ্ত আর সুবর্ণ উপাধ্যায়ের বাড়ি বেশ কাছে চলে এলো সাইকেলের দরুণ । সুবর্ণর বাড়ির বাগানে শুরু হল আমাদের ব্যাডমিন্টন । সুবর্ণর বাড়িতেই প্রথম দেখলুম টেলিফোন কাকে বলে, টেলিফোনের কোন দিক দিয়ে শুনতে হয় আর কোন দিক দিয়ে কধা বলতে হয় ।
    ১৯৫৫ : বিহার ন্যাশানাল কলেজে ইনটারমিডিয়েটে ঢুকলুম । সিগারেট খাওয়া, সিগারেটে পুরে গাঁজা খাওয়া আর স্বমেহন করা শুরু করলুম, অনেক সময়ে দিনে আর রাতেও। দুর্গাপুজোর ভিড়ে নারীমাংসের গন্ধ, পারফিউম ছাপিয়ে, ঢোলের তালে ধুনুচির ধোঁয়ায় ভলকে ভলকে, স্যানিটারি ন্যাপকিনের সুবাস, কার্তিকের লিঙ্গ উঁচু হয়ে আছে, লক্ষ্মীর একটা মাই বড়ো একটা ছোটো, সরস্বতীর মাই লক্ষ্মীর চেয়ে বড়ো, মহিষাসুরের এরেকটাইল ডিসফাংকশান, দেখে বেড়াই চারজনে, এক যুবতীমণ্ডপ থেকে আরেক যুবতীমণ্ডপ, ডুবতে থাকার আহ্লাদ, ভোগীরা কখনও সন্তুষ্ট হয় না বলে ভোগ তাদের কুরে খেয়ে ফুরিয়ে ফ্যালে । খুচরো আনন্দ : মেয়েদের দিকে তাকানো । চুমুর প্রধান রুকাওট হল শ্বাস, ছাড়া নয়, নেয়া । উপযুক্ত আড়াল না থাকলে দুজনের পক্ষে কতো অসুবিধা । প্রেম হল আপৎকাল, জরুরি অবস্হা, এমারজেন্সি ।
    ১৯৫৬ : ইনটারমিডিয়েট করে বেরোলুম । পড়ায় মন না বসলে এই মহিলাদের কন্ঠস্বরের সঙ্গে শোয়া আরম্ভ করলুম : কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, রাজেশ্বরী দত্ত, সাহানা দেবী, মালতী ঘোষাল, সুচিত্রা মিত্র, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, লতা মঙ্গেশকর, গীতা দত্ত । পরীক্ষার ফলাফল মোটেই ভালো হল না। জীবনে একবার, মাত্র একবার, পটাশিয়াম ফেরিসায়েনাইড খেয়ে আত্মহত্যা করার ইচ্ছে চাগাড় দিয়ে উঠেছিল । বাবার ফোটোগ্রাফির কেমিকালের আলমারিতে রাখা থাকতো, ছবিকে সেপিয়া করার জন্য । আলমারি খুলে শিশিটা নিয়েছিলুম হাতে কিন্তু পেছন থেকে পিসেমশায় ধরে ফেললেন । বললেন, “প্রেমে ফেল”, জবাবে আমি বলেছিলুম, রেজাল্ট অত্যন্ত বাজে হয়েছে । উনি বাবাকে নালিশ করেননি। বলেছিলেন, “ জীবনের দুঃখের কোটা শেষ না হওয়া পর্যন্ত বেঁচে থাকতে হবে, দুঃখ দাবিয়ে রাখার জন্যে মানুষ কতো কি করে, আত্মহত্যাকেও হাসিমুখে দাবিয়ে রাখে।” কুড়ি বছর পর নিজে কলকাতায় ছাদ থেকে লাফিয়ে আত্মহত্যা করেছিলেন, পকেটে চিরকুটে লেখা ছিল, “আনন্দধারা বহিছে ভূবনে”। আমার “অপ্রকাশিত ছোটোগল্প” বইতে ওনাকে নিয়ে একটা গল্পহীন-গল্প আছে “তিনকড়ি হালদার” শিরোনামে ।
    ১৯৫৭ : পাটনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইকনমিক্সে সান্মানিক স্নাতক পড়তে ঢুকলুম । সান্মানিক স্নাতক পড়তে ঢুকে নির্ণয় নিতে হল কোন সহপাঠিনীর মনের ভেতরে ঝাঁপ দিয়ে ঢুকে পড়ব । নেপালের ভূবনমোহিনী রাণা সুযোগ করে দিল ওর মনের ভেতরে ঢোকবার । ঢুকে পড়লুম আর চড় খেলুম । চুমুও খেলুম, মোদো গন্ধের চুমু । “কালচারাল বাস্টার্ড”-এর খেতাব পেলুম । শুনে খুবই ভালো লেগেছিল “কালচারাল বাস্টার্ড” গালাগালটা, একেবারে আমার মতন বাঙালিখোট্টার উপযুক্ত । সুন্দরী প্রেমিকার সৌন্দর্যও ক্রমে বাসি হয়ে যায়, তার অবিবাহিত শরীর হয়ে ওঠে অতিপরিচিত, তখন চাউনি ইদিক-উদিক সটকায় । পরে শুনেছিলুম ভূবনমোহিনী আত্মহত্যা করেছে । পরিচিত কোনো যুবতীর আত্মহত্যার খবর পেলেই আমার মনে হতো এই ঘটনার জন্য আমিই দায়ি ।
    ১৯৫৮ : ইকোনমিক্সে সান্মানিক স্নাতক হয়ে বেরোলুম । নমিতাদির খপ্পরে । সোভিয়েত দেশ সোভিয়েত দেশ সোভিয়েত দেশ সোভিয়েত দেশ আরামসে বেঁচে থাকার উৎসগুলোর অন্যতম হলো আলস্য। খুচরো আহ্লাদের উৎস, চাউনি বিনিময়, হিন্দির পুষ্পলতা অগ্রবাল, বিভা নাথ, সুশীলা দেবী আর সুশীলা ভর্মা । ইংরেজির বাসন্তী বসুধা, আমানদা স্বামী, শারদা সিনহা আর লীলা সিংহ । মনোবিজ্ঞানের মাধুরী ভর্মা, সাবিত্রী সিনহা, বিদ্যাবতী শর্মা, আর রাগিনী সহায় । ইতিহাসের রীতাম্ভরী দেবী আর শৈলকুমারী যাদব । রাষ্ট্রবিজ্ঞানের লক্ষ্মী রাও, শীলা প্রসাদ, ইন্দিরা সিংহ আর শান্তা শেঠ । বাংলার পারুল মুখার্জি । দর্শনের বিমল ভর্মা, মীরা দত্ত, শারদা কোহলি, চন্দা কুমারী, ইতি চ্যাটার্জি আর গৌরী সরকার । ওরা ছিল “ছুঁইমুই”, মানে ছুঁয়ে ফেললেই সতীত্ব চলে যাবে । কিন্তু ফেরোমোন থেকে তো নিষ্কৃতি নেই । ইংরেজি ক্লাসে শেক্সপিয়ার পড়ানোর সময়ে অধ্যাপক ডি পি সেনগুপ্ত বলতেন, “এই সায়েবকবি লাইনগুলো বেশ জটিল করে লিখেছেন, জটিল করে লিখেছেন বলে উনি জিনিয়াস, তোমরা কিন্তু পরীক্ষার খাতায় এনাকে অতিসরল করে লিখবে ।”
    ১৯৫৯ : ইকোনমিক্সে স্নাতকোত্তর করতে ঢুকলুম । কৃত্তিবাস পত্রিকায় কবিতা বেরোলো । কবিতা এলে ঘুম আসে না , খামখেয়ালি উন্মাদত্বকে জিইয়ে রাখতে হবে, হাতছাড়া হলেই বিপদ । বিংশ শতাব্দী পত্রিকায় ধারাবাহিক “ইতিহাসের দর্শন” প্রকাশিত হলো । বারীন তাড়ি খেয়ে দরিয়াপুরের বাড়িতে গলা ছেড়ে : ঘর আয়ে মেরা পরদেশি, দমভর জো উধর মুঁহ ফেরে, সুন যা দিল কি দাস্তান, শাম ঢলে খিড়কি তলে, শোলা যো ভড়কে, প্যার হুয়া ইকরার হুয়া, অ্যায় মেরে দিল কহিঁ অওর চল, বাবুজি ধীরে চলনা, জীবনকে সফর মেঁ রাহি । বড়জ্যাঠা স্টুডিওতে যে অরগ্যান রেখে গেছেন তাতে আমি, অবশ্যই তাড়ির নেশায়, টিং টং টাং টুং । অনেক সময়ে রাজেন্দ্রনগরে তালগাছের তলায় তিনজনে বসে তাড়ির হাঁড়ি নিয়ে বারীনের সঙ্গে গলা মিলিয়ে ‘নিঁশিঁতে যাঁইওঁনা ফুঁলোঁবোঁনেঁ ওঁ ভোঁমোরাঁ’ ।
    ১৯৬০ : স্নাতকোত্তর করে বেরোলুম বটে কিন্তু প্রথম হতে পারলুম না, জাতপাতের রাজনীতির কারণে । হারাধন ধাড়ার সঙ্গে পরিচয় হল । ওনার মা-বাপের দেয়া নাম পছন্দ নয় বলে পালটে এফিডেভিট করে হয়ে গেলেন দেবী রায়, কেননা বুদ্ধদেব বসু সাগরময় ঘোষরা হারাধন বা ধাড়া থাকলে কবিতা ফেলে দেন বাজে কাগজের ঝুড়িতে । সারা ভারতের গ্রামাঞ্চল ঘুরে বুঝেছি যে ভারতীয়রা দুরকম, উঁচুজাত আর নিচুজাত, নিচু জাতের হাগবার মাঠও আলাদা, যা কলকাতার রাস্তায় ঝাণ্ডা উড়িয়ে জানা যায় না । ধনীদের জঞ্জাল সাফ করা ছাড়া আর কিই বা করার আছে ভারতীয় গরিবদের ? দেয়ালের পোঁদ মেরে দেয়াল লিখন, “কমরেড তুমি আর গাঁড় মারবে না” ?
    ১৯৬১ : বাবার উপদেশ মেনে লেকচারারের চাকরি করতে গেলুম না, ওনাদের কে দেখবে, দাদা তো বাইরে-বাইরে । রিজার্ভ ব্যাংকে নষ্ট নোট পোড়াবার চাকরিতে ঢুকলুম । হাংরি আন্দোলন আরম্ভ হল । আমার মনে হল যে স্বদেশি আন্দোলনের সময়ে জাতীয়তাবাদী নেতারা যে সুখী, সমৃদ্ধ, উদার, কুসংস্কারমুক্ত, উন্নত ভারতবর্ষের স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন, তা টকে পচতে শুরু করেছে উত্তরঔপনিবেশিক কালখণ্ডে । চাকরি পেতেই কন্যাদায় মা-বাপেরা মেয়েকে নিয়ে আমার মায়ের দরবারে, মেয়েরা যেন দুশ্চিন্তার জোঁক, পণ্ডিত মশায়ের মেয়ে, নাগ ডাক্তারের মেয়ে, রেডিও ব্যানার্জির মেয়ে, আরও নানা বাড়ির মেয়ের পর মেয়ের পর মেয়েরা, কেননা পাটনায় প্রেম করার তেমন আবহ তখনও গড়ে ওঠেনি, কলেজের ক্যান্টিন আর গঙ্গার পাড় ছাড়া তেমন এলাকা ছিল না । এখন তো মেয়েরা কোমরে বেল্টের ফুটো কমলে খুশি হয়, তখন ছুঁচালো বডিস পরলে খুশি হতো । ওইসব ছুঁছালো বডিসই আজ চোখে ভাসে, যৌনতার হাসি মাখানো ঠোঁটের ওঠানামা ভাসে, মেয়েগুলোর মুখ ভুলে গেছি । সব মেয়ে কেন সুচিত্রা সেনের মতন ঠোঁট-কাঁপানো যৌনতা আনতে পারে না তাদের কথায় !
    ১৯৬২ : জীবনের আনন্দ সাধ-আহ্লাদগুলোর সঙ্গে মায়ের পরিচয়ের সময় হয়নি ইমলিতলার বাড়িতে, সারাটা সময় সবায়ের জন্য স্যাক্রিফাইস করে গেছেন । ইমলিতলায় রান্নাঘরের পরিশ্রম লঘু করার জন্যে মা নিজের মনে ছড়া তৈরি করতেন যার কয়েকটা মনে আছে, যেমন, “জোরে-জোরে পড়ো, জ্ঞান করো জড়ো” ; “শার্ট-প্যান্ট কাচো, জানবো ভালো আছো”; “নাবছে উনুনে কয়লা, এখুনো এলো না গয়লা”; “নুনতেলে মেজে ফ্যালো দাঁত, বুড়ো হলে বুঝবে তফাত”, ইত্যাদি ।
    দরিয়াপুরে, রান্নাঘরে মায়ের কষ্ট কমাবো ভেবে, মা এবার জীবন উপভোগ করুন ভেবে, ইনডেন গ্যাস সিলিণ্ডার কিনে দিলুম, ফ্রিজ কিনে দিলুম যাতে রোজ না রান্না করতে হয়, যাতে ওনার প্রিয় মাছের স্টক করে রাখতে পারেন, রাইস কুকার কিনে দিলুম যাতে ভাতের দিকে তাকিয়ে ঠায় বসে থাকতে না হয়, প্রেশার কুকার কিনে দিলুম যাতে রান্না তাড়াতাড়ি হয় । এই জিনিশগুলোকে রপ্ত করতে মায়ের অনেকদিন লেগে গেল, প্রায় বছর চারেক, ভয় পেতেন ওগুলোকে ; যুক্তি দিতেন যে ওগুলোর দরুণ রান্নায় স্বাদ হয় না । গ্যাস থাকতেও মা কয়লার উনুনের সামনে উবু হয়ে বসে রান্না করতে ভালোবাসতেন, পরে আমাকে বলতেন গ্যাসটা জ্বালিয়ে দিয়ে যা, নিভিয়ে দিয়ে যা । ফ্রিজ খুলতেন দূর থেকে একটা তোয়ালে দিয়ে হাতল ধরে, যদি শক মারে তার ভয়ে । প্রেশার কুকারের সিটির সঙ্গে তাল মেলাতে না পেরে পুড়িয়ে ফেলতেন । রাইসকুকার কোনোদিন ব্যবহার করলেন না । তবু মায়ের আনন্দ হল যে ওনার শ্রম কমাবার জন্য খেয়াল রেখেছি, বুড়ি বান্ধবীরা বেড়াতে এলে তাদের দেখাতেন । রান্নাঘর থেকে মাকে বের করে আনার জন্যে শেষে রান্নার বউ রাখতে হল, তারও যথেষ্ট বয়স হয়েছিল, তবু সিলিণ্ডারের গ্যাস, ফ্রিজ, প্রেশার কুকারে সড়গড় । পাটনা শহরে টিভি আসতেই, তখন শাদা-কালো, রঙিন হয়নি, মায়ের জন্যে একটা টেলিরামা টিভি কিনেছিলুম, প্রোগ্রাম সরকারি হলেও, দেখে আনন্দ পেতেন আর পাড়ার যতো বাচ্চারা, বেশিরভাগই দরিয়েপুরের মুসলমান পরিবারের, এসে জড়ো হতো ওনার চারিধারে মেঝের ওপর ।
    মা বলেছিলেন, একটা গাড়ি কেন এবার, লোকেদের বাড়ি যাই । কিন্তু কেনা হয়নি, পাটনার বাড়িতে গ্যারাজ তৈরির জায়গা ছিল না । কিনলুম বটে, ফিয়াট, পরে মুম্বাইতে, নাবার্ডে অ্যাসিস্ট্যান্ট জেনেরাল ম্যানেজার হয়ে, অফিস থেকে লোন নিয়ে । মা আর বাবা দুজনেই তখন মারা গেছেন । যখন লখনউতে বদলি হয়ে গেলুম তখন লখনউয়ের হেড পোস্টঅফিসে গিয়ে প্রতি শনিবার মাকে এসটিডিতে ফোন করতুম; পোস্ট অফিসে বুক করে অনেকের সঙ্গে লাইন দিয়ে অপেক্ষা করতে হতো, আধঘণ্টা পঁয়তাল্লিশ মিনিট পরে ডাক আসতো । এখনকার মতন মোবাইল হলে মায়ের সঙ্গে প্রতিদিন দুবেলা কথা বলা যেতো ।

    স্লেট-খড়ির অ্যাডিকশান
    ইশকুল থেকে বেরিয়ে কলেজে ঢুকে জেনে গিয়েছিলুম যে আমিই আমার মালিক । নিজের সঙ্গে নিজে কথোপকথনের শুরু । ততদিনে গড়ে ফেলেছি ভগবানবর্জিত আচরণবর্জিত নিজের জাগতিক-ধর্ম । ঘুমের ভেতরে কুমিরেরা হাঁ-করে রোদ পোহায় ।
    উত্তরপাড়ার চিলেকোঠার ঘরে, কলকাতায় পড়াশুনার সময়ে আস্তানা নিয়েছিল দাদা, বইয়ের স্তুপ, বন্ধুদের গ্যাঞ্জাম, সিগারেটের ধোঁয়া, আমি গিয়ে পড়েছি অনেক সময়ে, পরিচিত হয়েছি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, দীপক মজুমদার, আনন্দ বাগচির সঙ্গে । সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে মনে হতো ঘরণী টাইপের মানুষ । তার আগে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় আর শক্তি চট্টোপাধ্যায় আমাদের দরিয়াপুরের বাড়িতে এসে পাটনার ঠররা খেয়ে বারান্দায় বমি করে গেছেন । সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বলে গেছেন ওনাকে পাঠালে উনি আমার লেখা প্রকাশ করার ব্যবস্হা করবেন । দাদা চাকরি পাবার পর ধানবাদে থাকার সময়ে দীপক মজুমদারের সঙ্গে আড্ডায় উনি বলেন “ফিলজফি অফ হিসট্রি” পড়তে, দীপক মজুমদারকে দেখেছি ধানবাদে দাদার বাসন মাজছেন । দীপক মজুমদারকে মনে হয়েছে চাষি টাইপের মানুষ । ওনার বলা বিষয়ে বই পড়া আরম্ভ করি, আর লিখে ফেলি “ইতিহাসের দর্শন” যা পরে “বিংশ শতাব্দী” পত্রিকায় ধারাবাহিক প্রকাশিত হয়েছিল, সম্পাদক যদি জেনে যেতেন আমার বয়স কতো তাহলে ছাপতেন কিনা সন্দেহ । তারপর নমিতা চক্রবর্তীর প্ররোচনায় আরম্ভ করলুম মার্কসবাদ নিয়ে একটা দীর্ঘ প্রবন্ধ, যা বিমান মজুমদারের ছেলে, দাদার বন্ধু বুজলুদাকে পড়তে দিলে, বললেন, বই করে ফেলতে পারিস ।
    দাদা কলকাতার কলেজে পড়ার সময়ে প্রায়ই যেতুম উত্তরপাড়া, পাণিহাটি, কোন্নোগর আর আহিরিটোলা । পাণিহাটি থেকে আহিরিটোলা যেতে হলে শেয়ালদা স্টেশান হয়ে যেতে হতো । শেয়ালদা স্টেশান তখন উদ্বাস্তুদের ভাঙা সংসারে ছয়লাপ, কলকাতার রাস্তায় মিছিল, বাস-ট্রাম পুড়ছে, দেখে মনে হতো কেউ শোনার নেই । সেসময়ে সদ্য-সদ্য ট্র্যাজেডি থেকে জন্ম হয়েছে পশ্চিমবঙ্গের, আর নিজেকে মনে হতো শেকসপিয়ারের ট্র্যাজেডিগুলোর ভাঁড়দের মতন, কিং লিয়ারের ফুল, হ্যামলেটের কবরখুঁড়িয়েরা, ওথেলোর ক্লাউন, ম্যাকবেথের পোর্টার, অ্যাজ ইউ লাইক ইটের টাচস্টোন, টুয়েল্থ নাইটের ফেসটে । কলকাতার ওই সময়ের দুর্দশার জোয়ারের ঢেউগুলোকে আমি ধরার চেষ্টা করেছি আমার ‘নামগন্ধ’ উপন্যাসে । মানুষের পীড়া দুর্ভোগ বাঁচার লড়াইয়ের যন্ত্রণা দেখে, তাদের অসহায় গোঙানি শুনে, নিজের ব্যর্থতা অনুভব করা সহজ হয়, টের পাওয়া যায় যে আমি একটা গাছের পাতাও নড়াবার সামর্থ রাখি না । শহরের হাওয়ায় তাদের বিলাপ আজও অভিশাপ হয়ে ভেসে বেড়ায় । নিজেকেই প্রশ্ন করি, কী করা যেতে পারে ? কলম দিয়ে ফোঁটায় ফোঁটায় বিষের চোলাই !
    দাদার সব বন্ধুদের দেখেছি তো ! কাউকেই মনে হয়নি দাদার মতন আর আমার মতন মিসফিট, গোলমালকারী, স্হিতাবস্হাবিরোধী ইমলিতলা-মার্কা ইনসেন টাইপের ; ওনাদের উচ্চাকাঙ্খা সাহিত্যকে আঁকড়ে কেরিয়ার করার । অথচ আমার আর দাদার মতন ইমলিতলাপন্হী ইনসেন না হলে আন্দোলন গড়ে তোলা যাবে না । এনাদের বহু বাক্যের সঙ্গে মুখের দুর্গন্ধ লেগে থাকে, পায়োরিয়ার, বদহজমের, বায়ুর, দাঁতের ফাঁকে পচা ছাগলের, শব্দের অর্ধেক মানে তাতেই আটকে যায় । পরে এনাদের কাজকারবার দেখে পায়খানাগুলো পর্যন্ত লজ্জায় লাল হয়ে উঠেছে টাকা টাকা টাকা টাকা টাকা টাকা টাকা টাকা টাকা টাকা টাকা টাকা । আর সেই মোক্ষম দর্শন । টাকা হল ডলারের বেজন্মা বাচ্চা । ওনাদের সমবেত বা একক কাজকারবার দেখে মনে হয়েছে, আমি বোধহয় একরকম স্টুপিড গর্ববোধে ভুগি, সুপিরিয়রিটি কমপ্লেক্সে, যাকে অ্যালেন গিন্সবার্গ বলেছিল “নাঈভ”, যার দরুন পরীক্ষায় দ্বিতীয় স্হান, প্রেমে লাথি, বন্ধুদের বিশ্বাসঘাতকতা, জোচ্চুরি, টাকা হাপিশ। পৃথিবীর সঙ্গে আমিও পাক খাই । ওহ, বলতে ভুলে গেছি, দাদার রোলেক্স ঘড়িটা এক বন্ধু হাপিশ করে দিয়েছিল চাইবাসায়, তারপর থেকে দাদা ঘড়ি পরা ছেড়ে দিলো ।
    পশ্চিমবঙ্গ কি সেই পঞ্চাশ-ষাটের ট্র্যাজেডি থেকে বেরোতে পেরেছে ? না, পারেনি, জানি না কখনও পারবে কিনা । তা থেকে গেছে, স্হায়ী বিশৃঙ্খলা, অকারণ ক্রোধ, অরাজকতা, নৃশংসতা, গণধর্ষণ, নারীপাচার আর ঘৃণা নিয়ে । ওপর থেকে চুয়ে-চুয়ে পৌঁছে গেছে নিচের তলায়, যেখানে সামান্য কিছু নড়ে উঠলেই মানুষ ভয়ে আঁৎকে ওঠে, আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে, প্রতিপক্ষ থাকুক বা না থাকুক । যারা নায়ক হয়ে উঠতে চেয়েছিল তারাও কালক্রমে খোলোশ থেকে বেরিয়ে নির্মল জোকারের চেহারার সঙ্গে জনগণের পরিচয় করিয়ে দিয়েছে , জনগণ জোয়ারের সঙ্গে আসে ভাটার সঙ্গে যায়, তাদের জানা নেই যে শহর আর শহরতলিগুলো থেকে সৌন্দর্য্য কবেই পালিয়েছে, কেউই আর প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম হতে পারে না, বহু পরিবার ওই ট্র্যাজেডিকে পারিবারিক স্মৃতির আনন্দের সঙ্গে জড়িয়ে ফেলেছে, মাছের বদলে সেই আনন্দে তারা নিয়ে এসেছে বিরিয়ানি, স্টিউ, সসেজ, পাস্তা, হ্যামবার্গার, হটডগ — মাছেরাও বিদায় নিচ্ছে এক-এক করে, তৈরি হয়েছে চাষের মাছ, বিয়েতে টকটকে লাল ধুতি আর উত্তর ভারতের শেরোয়ানির মতন ।
    প্রথম উপন্যাস ‘ডুবজলে যেটুকু প্রশ্বাস’ লেখার সময়ে নমিতা চক্রবর্তীকে যেমন দেখেছি তা তুলে ধরার চেষ্টা করেছিলুম মানসী বর্মণ নামের চরিত্রে । ওই উপন্যাসেই বারীন গুপ্তের মহেন্দ্রু মোহোল্লার বাড়ি আর পাড়া ব্যবহার করেছি অতনু চক্রবর্তীর বেলায় । রাঘব আর রমা চরিত্র হল আমার সহকর্মী সুশান্ত চক্রবর্তী আর টেলিফোন অপারেটার রত্না আতর্থী । অরিন্দম চরিত্রটা সহকর্মী অরুণ মুখোপাধ্যায়ের আদলে, যে পরে দাদার শালিকে বিয়ে করে, ও সত্যিই পাগল হয়ে গিয়েছিল বিবাহিতা মহিলার প্রেমে পড়ে, যে ওকে নিজের সঙ্গে শুতে দিলেও যৌনকর্ম করতে দিচ্ছিল না । মৌলিনাথ চরিত্রটা হল সহকর্মী মণিমোহন মুখোপাধ্যায়, যার মেয়ের সঙ্গে দাদার ছেলের বিয়ে হয় । আর আছে বিহারের জাতপাতের লড়াই, মাওবাদি-লেনিনবাদিদের লড়াই ।
    ‘ডুবজলে যেটুকু প্রশ্বাস’ উপন্যাসে মিজোরামের উল্লেখ না থাকলেও, পার্থসারথী চৌধুরী, আইএএস, ধরে ফেলেছিলেন যে জুডি-জুলির সঙ্গে অতনুর যৌনজীবনের ঘটনা মিজোরামে ঘটেছে । আমাকে আরও জেরা করেছিলেন জানার জন্য যে ওগুলো আমার জীবনের ঘটনা কিনা । পার্থসারথী চৌধুরীর কসবার বাড়ি গিয়েছিলুম একবার, উনি ম্যাজিশিয়ান পি সি সরকারের জামাই । পাত্র বইপত্র পড়তে ভালোবাসে শুনে পি সি সরকার একঘর বইসুদ্দু একটা বাড়ি দিয়ে দিয়েছিলেন পার্থসারথীকে । সারাদিন বইয়ে মলাট দেয়া, নম্বর দিয়ে তালিকা তৈরি করা, আলমারি অনুযায়ী সাজানোয় এমন জড়িয়ে গিয়েছিলেন যে তাঁর লেখার অভ্যাস চলে গিয়েছিল । বলেছিলেন, তোমার লেখা কোনো বই কখনও দরকার হলে বোলো, সব আছে আমার কাছে । এতো তাড়াতাড়ি মারা গেলেন যে যখন রচনাসংগ্রহের জন্যে দরকার তখনই উনি নেই ।
    ‘ডুবজলে যেটুকু প্রশ্বাস’ পড়ে একদিন লাল টিশার্ট আর জিনস পরে শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় এসে হাজির । নিজে ফিকশান লিখলেও, আমার উপন্যাসের ঘটনাগুলোকে সত্যি মনে করে ‘আজকাল’ দৈনিকের জন্য ফিচার লিখতে চান । বললুম বাঙ্গালোরে যান, পাবেন হয়তো, তখন অবশ্য বেঙ্গালুরু হয়নি । ফিরে এসে বললেন, কিছুই ঘটেনি ওখানের রিজার্ভ ব্যাঙ্কে । বললুম, আপনিও তো উপন্যাস লেখেন, আমি তো পড়ার পর খুঁজতে যাই না, কোনো পাঠকই যায়না । ক্রুদ্ধ শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় ‘আজকাল’ দৈনিকে লিখলেন, বিয়েতে উপহার দেবার জন্য ‘ডুবজলে যেটুকু প্রশ্বাস’ উপযুক্ত বই ।
    স্নাতক পড়ার সময়ে সহপাঠী রাজনারায়ণ দাসের ডাকে গেলুম ওর চিলতে ঘরে, পাটনা মার্কেটের পেছনে, ঘরের আলো নিভিয়ে একটা টেলিস্কোপ দিয়ে বলল, দ্যাখো জানলা দিয়ে । দেখলুম দুজন চিনা যুবতী, ভারতীয় চিনা, পোশাক খুলে, এখন যাকে বলে, লেসবিয়ান প্রেম, তাই করছে । রাজনারায়ণ বলল, দেখলি তো, চিনা মেয়েদের স্লিট হরাইজনটাল হয়, ভারতীয় মেয়েদের মতন ভার্টিকাল নয় । আমি কেবল ওদের গোলাপি মাই আর চুলহীন যোনি দেখে উত্তেজনা সামলাচ্ছিলুম । রাজনারায়ন এম এ পড়া ছেড়ে দিয়ে আইপিএস হয়ে চলে গিয়েছিল, দ্বারভাঙ্গা বিলডিঙের গেটে সরকারি গাড়ি দাঁড় করিয়ে আমাদের মনে করিয়ে দিত যে ও রাষ্ট্রযন্ত্রের ওপরতলায় আর আমি তার বাইরে, ফেকলু, উচ্চাকাঙ্খাহীন।
    উচ্চবিত্ত বা মধ্যবিত্ত মুসলমান যুবতীর মুখ দেখার লোভে স্নাতক ক্লাসের বন্ধুনি ভূবনমোহিনী রাণাকে পটিয়েছিলুম, ওদের হোস্টেলে উম্মা হাবিবা নামে একজন সুন্দরী ধনী বাড়ির যুবতী আছে শুনে । উচ্চবিত্ত ছাত্রীরা সেময়ে বোরখা পরত । হোস্টেলের গেটের কাছে এসে উম্মা হাবিবা বোরখার নকাব মাথার ওপর তুলতে ওর লিপ্সটিক বোলানো ঠোঁট আর সুর্মামাখা গভীর চোখ দেখে ঘাবড়ে গিয়েছিলুম, বেশ ফর্সা, অত্যন্ত ফর্সা, বলেছিল, “দেখ লিয়া ?” আমি বলেছিলুম “জি”। আর মনে হয়েছিল, আহা, এই মেয়েটা যদি কুলসুম আপা হতো একে নির্ঘাৎ প্রেম নিবেদন করতুম, লিঙ্গের চামড়া ছিঁড়ে ফর্দাফাঁই হয়ে গেলেও ছাড়তুম না একে, মার খেলেও, দাঙ্গা হলেও, ছাড়তুম না ।
    খবরের কাগজে যখন পড়লুম যে কলকাতায় একজন লোক তার বোনের শবের পাশে বহুকাল শুতো আর তার বোন কবে যে কঙ্কাল হয়ে গেছে তা তার খেয়াল হয়নি ; আমারও ইচ্ছে করে রোমান্টিক প্রেমিকার শবের পাশে শুয়ে থাকি আর ও ক্রমশ কঙ্কালে রূপান্তরিত হোক, সারা দেহে ম্যাগটেরা কিলবিল করুক, ওর ফিসফিসে ভ্যাজাইনার স্বগতসংলাপ শুনি । তবুও, যারা মারা গেছে, তাদের ফিরিয়ে আনার ইচ্ছে হয় । অতীত বেশ শোকাবহ, তার জাঁতিকল থেকে যতো তাড়াতাড়ি বেরিয়ে আসতে পারা যায় ততোই মঙ্গল ।
    ১৯৬৪ সালে লালবাজারে পুলিশ কমিশনার বলেছিলেন, “আপনারা সাহিত্য করছেন নাকি হ্যাণ্ডবিলে দাঁতের মাজন বিক্রি করছেন ।” একফালি কাগজে কবিতা ছাপিয়ে যে রাস্তায় দাঁড়িয়ে বিলি করা যায়, দাঁতের মাজনের প্রচারের মতনই, তা ওনার ধারণায় ছিল না । সেসময়ে কোনো সাহিত্যিকেরই ছিল না, ব্যাপারটা ওনাদের মতে “শিল্পের দেবীকে পথের মাঝে নামিয়ে আনা”। কেবল ভাষাকে আক্রমণ করিনি, তার প্রণালীকেও আক্রমণ করেছি ।
    ২০০০ সালে ইমলিতলা পাড়ায় দাদার ছোটোবেলাকার বন্ধু বদ্রি পাটিকমার হয়ে গেল বাহুবলি, কেমন করে লোক যোগাড় করে লন্দিফন্দি করে রাজনৈতিক দলে সেঁদিয়ে ও পকেটমার থেকে নেতা হয়ে গেল সে এক রহস্য ; নেতারা নিজে কিছু করে না, ওকে দেখে টের পেয়েছি, সবকিছুর জন্য লোক আছে, পেঁদাবার, লোপাট করার, খুন করার, এমনকি ছুঁচিয়ে দেবার। আহা, বদ্রি পাটিকমারের সঙ্গে যদি জীবন অদল-বদল করে নেয়া যেতো । “হয়ে ওঠা” স্পষ্ট হতো ।
    বুজলুদাকে জিগ্যেস করেছিলুম, কে পড়বে আমার বই ?
    —কেন ? রবীন্দ্রনাথ যেমন খামে ভরে-ভরে একে-তাকে বই পাঠাতেন, তুইও পাঠাবি ।
    জনে-জনে পাঠাবার এই আইডিয়াটা বেশ ভালো লেগেছিল । হাংরি আন্দোলনের সময়ে কাজে লাগিয়েছিলুম , লিফলেট কার্ড আর প্যামফ্লেট ছাপিয়ে বিলি ।
    বইয়ের জন্য, লেখালিখির জন্যে টাকা তো দরকার । শিলঙে একটা কলেজে দরখাস্ত করে অধ্যাপনার চাকরি পেলুম, ইকোনমিক্স পড়াবার জন্য । তখন “বঙাল খেদা” চলছিল, বাবা বললেন, ‘পাটনাতেও খুঁজে দ্যাখ না কোনো চাকরি পাওয়া যায় কিনা, এখানে তো তোর দাদাও নেই, তুইও চলে যাবি, আমাদের জ্বরজারি অসুখ-বিসুখ হলে কে দেখবে ?’ স্কুলের সহপাঠী নেপালের দাদা সমরেন্দ্র চক্রবর্তী, রামমোহন রায় সেমিনারিতে আমার চেয়ে দু’ক্লাস উঁচুতে, একদিন এসে বলল, ‘তুমি এই কাগজটায় সই করে দাও দিকিনি, চাকরির দরখাস্ত লিখেই এনেছি, আমার অফিসে লোক নেয়া হচ্ছে, নতুন অফিস খুলবে, বেশি লোকেরা জানে না, কাউকে বোলো না যেন ।’ আমার অফিস মানে রিজার্ভ ব্যাংক, উনিও নোট পোড়াবার দপতরে তখন, দুপুর বেলাতেই ছুটি হয়ে যায়, তারপর টিউশানি করে বেড়ান, সংসার ওনাকেই চালাতে হয়, বাবা ওনার ছোটোবেলায় আত্মহত্যা করেছিলেন, কোনো বিদেশি কোম্পানির ওষুধ জাল করে বিক্রির জন্য ধরা পড়েছিলেন ।
    খড়ি-স্লেটের কৃষ্ণগহ্বরের আহ্লাদ শুষে নিচ্ছিল আমাকে, বইয়ের হাঙরেরা আমার ছাড়ানো দেহ থেকে মাংসের টুকরো ছিঁড়ে-ছিঁড়ে আনন্দে ভোগাচ্ছিল আমায়, অক্ষরের জোঁকেরা চামড়ায় বসে রক্ত চুষে আমার হরমোন বাড়িয়ে তুলছিল । চোখ, কান আর জিভ দিয়ে লেখা আরম্ভ করলুম । আর পড়া, বই বই বই বই বই বই, বাছবিচার নেই, এ-বই, সে-বই, অমুক বই, তমুক বই, জ্ঞান জ্ঞান জ্ঞান জ্ঞান । আরেক লাইন, আরেক বাক্য, আরেক প্যারা, বেঁচে থাকার আনন্দ আর দুঃখ, সারাজীবন বেঁচে থাকার ইচ্ছে। আমি শব্দপূঞ্জ আর অ্যাকশানের মাঝে ঝুলছিলুম, শান্তিময় আরামপ্রদ জীবন অসম্ভাব্যতার পথে ছুটতে লেগেছিল, জীবনের এক চতুর্থাংশ কাটিয়ে সব কিছুই জানা হয়ে গিয়েছিল, কৌতুহলে লুকোনো নোংরামি অনৈতিকতা অবৈধতা থেকে আরম্ভ করে অনিশ্চয়তার ভীতি পর্যন্ত, ফুরিয়ে গিয়েছিল অজ্ঞানতার পর্ব ।
    বাবাকে তো প্রতিদিন দেখছিলুম, নিজেকে শিল্পী বলে মনে করছেন না, মনে করছেন, তাঁর কাজ হল মৃতদের প্রাণ দেয়া যা পেয়ে তাদের বংশধরদের আহ্লাদ হয়, কিন্তু এও দেখছিলুম যে শিল্পীদের মতন মানসিক-শারীরিক অসুস্হতায় আক্রান্ত হয়ে ওনার স্বাস্হ্য ভেঙে পড়ছে ক্রমশ । উনিও যেন প্রতিটি ছবিতে বিষের চোলাইকারীর ভূমিকা নিচ্ছেন, যা আমি তখন করছিলুম আমার ডায়েরিতে আর নোটখাতার পাণ্ডুলিপিতে । এখন যখন জীবনের বাঁকবদলগুলোর কথা ভাবি, মনে হয় যেন তা কয়েক বছর অন্তরই ঘটেছে ।
    সিনেমা দেখার অভ্যাস ছেড়ে যেতে লাগল, কেননা সিনেমা তো দেখতুম যৌন আবেদনের জন্যে, শ্বেতাঙ্গিনীর উরু আর ক্লিভেজের আকর্ষণে, সত্যজিৎ রায় ঋত্বিক ঘটক মৃণাল সেন আকিরো কুরোসাওয়া ফগেদেরিকো ফেলেনি রোমান পোলানস্কি ইঙ্গমার বার্গম্যান জাঁ লুক গোদার লুই বুনুয়েল ফ্রাঁসোয়া ত্রুফো ফেদেরিকো ফেলিনির জন্য নয় । সাবটাইটেল দেয়া ফিল্ম আমি দেখতে পারি না ; পড়া আর ফ্রেম দেখা আর শোনা এক সঙ্গে তিনটে ব্যাপার সম্ভব হয়নি কখনও ।
    অড্রে হেপবার্ন, ব্রিজিত বার্দো আনা কারিনা মারিনা ভ্লাদি বেরুয়াদেতে লাফোঁ ক্লদ জেড জিন মোরেয়া ভেরগানো মারিয়ন কিকা মারখাম শার্লি আমাগুচি মিসা উয়েহারা অ্যানিটা একবার্গ জিউলিয়েতা মাসিনা সান্দ্রা মিলো ক্লদিও কার্দিনাল অনুক আইমি ক্যারোল বোক অ্যানজেলা মোলিনা ক্যাথারিন দেনেউভ সোফিয়া লোরেন এলিজাবেথ টেলর আরও কতো আরও কতো আরও কতো আরও কতো , তাদের ঠোঁট নড়া দেখলে আমি পায়ের ওপর পা রেখে লিঙ্গকে সামাল দিই ।
    কাজলচোখ গাঢ় ভুরু মিষ্টি হাসি কাঁপানো ঠোঁট সুচিত্রা সেন সাবিত্রী দেবী সুপ্রিয়া চৌধুরী সন্ধ্যা রায় মাধবী মুখার্জি আরও কতো আরও কতো আরও কতো । নিজেকে সামাল দিই ।
    স্তনের ভাঁজ কাঁচা গোলাপি ঠোঁট দীর্ঘ উরু শিফন শাড়ি মধুবালা মীনাকুমারী নিম্মি নার্গিস শ্যামা মীনা শোরে রেহানা কুলদীপ নায়ার গীতাবালি নূতন সুরাইয়া আশা পারেখ সাধনা মুমতাজ ওয়াহিদা রহমান হেলেন নলিনী জয়ন্ত বীনা রায় বৈজয়ন্তিমালা মালা রায় আরও কতো আরও কতো । নিজেকে সামাল দিই ।
    ফিল্ম পরিচালকদের ভাবনাচিন্তার সঙ্গে আমার লেখালিখির কোনো যোগসাজস কখনও গড়ে ওঠার সুযোগ পায়নি, নিজের মগজে যা আসে তাই কলমে চলে আসে । কলম চাইলে মগজ তাকে ইরটিক হয়ে ওঠার বন্দোবস্ত করে দ্যায় । আমার তো বিশ্বাস নেই, যা আছে তা প্রত্যয় । সমসাময়িকদের বিরুদ্ধে আমি একাই দাঁড়িয়ে থেকেছি, কোনো ফিল্ম নয়, বই নয়, নির্দেশ নয়, তত্ত্ব নয় । জানতুম ইর্ষনীয়-গন্তব্যে শত্রুসংখ্যা বাড়বে, এও জানতুম যে লড়ে যেতে হবে । নমিতা চক্রবর্তী উত্তর দিতে পারেননি যখন ওনার দেয়া তোড়া-তোড়া পত্রিকা হাতে নিয়ে জানতে চেয়েছিলুম যে সোভিয়েত দেশের এতো চকচকে প্রচারের কাগজপত্র কেন, প্রপাগাণ্ডা কেন, গোপনীয়তা কেন ? তা সত্ত্বেও যেতুম ওনার ফ্ল্যাটে, প্রেম আমার জীবনের প্রধান সমস্যা বলে, ভালোবাসা পাবার ধান্দায় লালায়িত বলে । কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টোর আকর্ষণ স্তালিনের ছাড়া গোখরোদের কামড়ে ততদিনে হাপিশ ।
    আমার যাবতীয় কাজকারবারের, যাকে কলকাতার লোকে সেসময়ে বলত বোহেমিয়ান জীবন, তার উৎস হল ইমলিতলা ; বাঙালির দৃষ্টিতে সকলেই সেখানে বোহেমিয়ান । ক্রোধ আর অসহায়তার আগ্নেয়গিরির উৎসও ইমলিতলা । ওই পাড়ার গড়ে দেয়া সামুরাইরা আমার মগজে যুদ্ধ আরম্ভ করে দিয়েছিল, উপলব্ধিদের ফাটিয়ে চৌচির করে বেরিয়ে পড়তে চাইছিল জীবন, বুঝে গিয়েছিলুম যে লেখালিখি ওপিনিয়নেটেড হওয়া জরুরি । বলতে হলে বলতে হয়, পৃথিবীর জন্মই তো হয়েছে বিশ্বজাগতিক সন্ত্রাস থেকে। আর আমার লেখালিখি তো আপামর জনসাধারণকে খুশি করার জন্য নয় । মৌমাছির কথা ভাবলে কেবল তার গুনগুন আর মধুর কথা ভাবলেই তো হবে না, তার হুলের কথাও মনে রাখতে হবে । আপনি যদি মনে করেন যে আপনার বিশ্বাসই পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ, তাহলে রক্তের বহু নদী বইতে থাকবে, আর তাতে ভেসে যাবে আপনার ঘৃণার শবের পর শবের পর শব ।
    ইমলিতলা থেকে দরিয়াপুরে যাবার পর, দাদার বিয়ে হয়েছে, নতুন বউ এসে তো খাটা পায়খানায় হাগবে না, তাই ফ্