• টইপত্তর  অন্যান্য

  • আমার সাহিত্য-বোধের গল্প

    কুলদা রায়
    অন্যান্য | ১১ মে ২০১৩ | ৪২৮ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কুলদা রায় | 34.90.93.220 | ১১ মে ২০১৩ ১০:১৬605776
  • আমার সাহিত্য-বোধের গল্প
    কুলদা রায়
    --------------------------
    আমার সাহিত্যবোধ নাই। এই সোজা কথাটা পণ্ডিত স্যার শুরুতেই ধরেছিলেন। মাথা নেড়ে বলেছিলেন, তোমার কিছুই হইবে নারে মনু। জেবন বেরথা।

    শুনে আমার ঠাকুরদা খুব চিন্তিত হয়ে পড়লেন। শহরের প্রবীণ বিজিতেন ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলেন। তিনি আমার জিব বের করে, চোখের পাতা টেনে দেখলেন। বুকেপিঠে স্টেটিস্কোপ বসিয়ে জোরে জোরে শ্বাস নিতে বললেন। জিজ্ঞেস করলেন, রাতে ঘুম হয়?
    আমার বদলে ঠাকুরদাই উত্তর দিলেন, হয় মানে-- একবার ঘুমোলে আর উঠতে চায় না।
    ডাক্তার পেট টিপে বললেন, ঘুমাইলে স্বপ্পন দেখো?
    ঠাকুদাই উত্তর দিলেন, স্বপ্পন একটু বেশীই দেখে।
    এবার ডাক্তার বাবু আমার বদলে ঠাকুরদার দিকে সন্দেহজনকভাবে তাকালেন। বললেন, আপনার স্বপ্পনের কথা না। আপনার নাতির স্বপ্পনের কথা বলছি।
    --ওই হল, আমার আর আমার নাতির মধ্যে কোনো পার্থক্য নাই। নাতি আমার স্বপ্পন ঘুমাইয়া ঘুমাইয়া তো দেখেই—আবার জাইগা জাইগাও দেখে।
    --কি কইরা বুঝলেন?
    --ঘুমের মইদ্যে দাঁত কিড়মিড় করে।

    এরপর বিজিতেন ডাক্তার কি মনে আমার দাঁত দেখলেন। আর কোনো কথা বললেন না। তার অন্য রোগী আছে। এরপর তিনি নদীর ঘাটে যাবেন। সেখানে টাবুরে নৌকায় গাঁও-গেরামের রোগী দেখবেন। ঠাকুরদা নাছোড়বান্দা। ডাক্তারের কাছ থেকে ওষুদ যোগাড় করবেন। ডাক্তার মাথা নেড়ে বললেন, এই রোগের চিকিৎসা নাই।

    ঠাকুরদা বললেন, তাইলে আপনে আছেন ক্যান। চিকিৎসায় না থাকতে পারে--আপনের না থাইকা যায় কুনহানে।
    এরপরে কথা নাই। বিজিতেন ডাক্তার আমাকে দুটো কৃমির বড়ি দিলেন।

    এতেও আমার সাহিত্যবোধের কোনো উন্নতি হল না। বিজিতেন ডাক্তার খুব হতাশ গলায় বললেন, বাবারে, এই অসুখ সারানোর বিদ্যা এ জগতে কারো জানা নাই। জানা থাকলে আমার নিজেরও কাজে লাগত। আমার সংসারটা ভাঙ্গত না।
    তিনি সেদিন আর রোগী দেখলেন না। সবাইকে বিদায় করে দিলেন। ঘরের মধ্যে তার তরুণ কালের স্ত্রীর ছবির নিচে মাথা নিচু করে বসে রইলেন। তার স্ত্রী কবিতা লিখতেন। সেকালে কোলকাতার পত্রিকার পাতায় ছাপাও হত। তার কবিতা বুঝতে পারেননি বলে ডাক্তার স্বামীকে প্রথম জীবনেই ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন। আজ সেই কথা মনে পড়ে তার চোখ থেকে জল পড়তে লাগল।

    ঠাকুরদা এরপর এলাকার বিশিষ্ট গুণীন সায়েম কবিরাজের কাছে আমাকে নিয়ে গেলেন। তিনি দেখে শুনে নট করে দিলেন। বললেন, এইটা ভুতের কেস না। আমি ভুতের চিকিৎসা করি। সাহিত্যের না।

    শেষ চিকিৎসা হিসেবে ঠাকুরদাকে পণ্ডিত স্যার পরামর্শ দিলেন কাশেম রেজার কাছে যেতে। তিনি থাকেন কালীবাড়ির পাশে। বড় পুকুরের উপর তার ঘর। দক্ষিণ পাশটিতে বারান্দা। সেখান থেকে বড়শি পেতে মাছ ধরা যায়।
    কাশেম রেজা এ এলাকার বিশিষ্ট কবি। এবং লেখক। তার উজ্জ্বল দুটি চোখ। মুখে কাঁচাপাকা দাড়ি। আর বাহারী চুল। গলায় রিঠার মালা। খাদির পাঞ্জাবী পরা। তার পায়ের কাছে ঘুমিয়ে আছে একটা বিড়াল। কাশেম রেজা টেবিলে ঝুঁকে একটা জবেদা খাতায় কিছু লিখছিলেন।
    আমাদেরকে দেখে লেখা থামালেন। ঠাকুরদাকে শুধালেন, কী মনে করে বিধুবাবু?
    ঠাকুরদা বললেন, আমার নাতিরে সাহিত্যবোধ দেন।

    কবি কাশেম রেজা হাসলেন হা হা করে। সে হাসি শুনে ঘরের ভেতর থেকে কবির চার মেয়ে ছুটে এল। এই চার মেয়ে—আমাদের কচি আপা, কোকো আপা, সেকো আপা আর রেখা আপা। তারা বলল, বাবা, কি হইছে?
    কবি বললেন, কিছু হয় নাই মা। আমাকে দেখিয়ে বললেন, এই ছেলেটার সাহিত্যবোধ লাগবে।
    কচি আপা ছুটে গিয়ে ভেতর থেকে একটি গামলা নিয়ে এল। গামলার খোলা মুখটি একটা থালা দিয়ে ঢাকা। ভিতরে কি আছে দেখা যায় না। রেখা আপা আমাকে বলল, কওতো খোকন, গামলার মধ্যে কি?
    ঢাকনা না খুললে বলা যাবে না। সেকো আপা বলল, গামলার মধ্যে সাহিত্য আছে। গামলার মধ্যে কইরা তোমার জন্য সাহিত্যবোধ আনছি। কাইটা দিচ্ছি। খাও।
    চার চারটি পরীর মত আপা হি হি করে হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ল। বিড়ালটি একবার ঘাড় তুলে মিউ মিউ করে উঠল। কাশেম রেজা তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। আদর পেয়ে বিড়ালটি আবার চোখ বুজল। তার আরেকটু ঘুমাতে ইচ্ছে হচ্ছে।

    গামলা এসেছে। গামলার মধ্যে সাহিত্যবোধও এসেছে। তার চেহারা আমরা কেউ দেখিনি। সাহিত্যেবোধের চেহারা দেখার জন্য আমার চেয়ে ঠাকুরদাই বেশী উদ্গ্রীব হয়েছিলেন। উত্তেজনায় তার শ্বাস ঘণ হয়ে উঠেছে। এ জিনিস তিনি কখনো দেখেন নাই। তার বাবাও দেখেন নাই। তার ঠাকুরদারও দেখার কথা নয়। কবি মুচকি মুচকি করে হাসছেন। ঠাকুরদা বললেন, দেরী করেন ক্যান! ঢাকনা তোলেন।

    কাশেম রেজা গামলার মুখ থেকে থালাটি তুলে নিলেন। ভেতরে একটা হলুদ রঙের ফল দেখা গেল। ঠাকুরদার উত্তেজনা কমে গেল। অনেকটা হতাশ হয়ে বললেন, এইটা দেখছি ফাইয়া। কাঁচা ফাইয়া। ফাইয়া কি কইরা সাহিত্য হয়?

    কবি সাহেব বললেন, হয় হয়। ফাইয়া যখন পেঁপে হয়ে যায়—তখন সেটা সাহিত্যও হয়। জানতে পারলে সবই হয়। জানাটাই আসল।

    কাশেম রেজা একটা ছুরি দিয়ে কাঁচা পেঁপেই কাটলেন। ঠাকুরদাকে এক ফালি দিলেন। ঠাকুরদা অনিচ্ছা সত্বেও মুখে দিলেন। তার মুখটা একটু কুঁচকে গেছে। কাশেম রেজা আমাকেও দিলেন। মুখে দিয়ে দেখি—স্বাদহীন। খানিকটা কষা। ফেলে দেব কিনা ভাবছি—এ সময় কোকো আপা ঘর থেকে একটি প্লেটে মধু নিয়ে এল। আমাকে বলল, পেঁপেতে স্বাদ না পাইলে মধু দিয়া খাও। মজা পাইবা।
    এই মধু কবি কাশেম রেজার নিজের ঘরের মধু। বসন্তে বারান্দায় চাক পড়ে। মৌমাছিরা ফুল থেকে মধু এনে চাকে রাখে। এই মধুতে কোনো ভেজাল নাই।

    এই খাওয়া দাওয়ার মধ্যেই চার আপা আমাকে বেশ সাজিয়ে গুজিয়ে দিল। চুলে দিল কলম্বো নারিকেল তেল। চিরুনী দিয়ে চুলটা আচঁড়ে দিল। বাম পাশে সিঁথি। মুখে একটু স্নো দিল কোকো আপা। রেখা আপার ইচ্ছে মাথায় একটা ময়ূরের পালক দেবে। চুল নষ্ট হবে বলে কচি আপা দিতে দিল না-- পালকটা হাতে দিলেন। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে বললেন—বাবা, দেখতো-- খোকনকে ঠিক কেষ্ট ঠাকুরের মত লাগছে না?
    কাশেম রেজা হেসে বললেন, কেষ্ট ঠাকুর নয়-- শিশু কৃষ্ণ।

    তিনি একটি কাগজে লিখলেন, পেঁপে। বাঁকা অক্ষরে পেঁপে লেখা কাগজটি তিনি এই শিশু কৃষ্ণের পকেটে পুরে দিলেন। বললেন, যত্ন কইরা রাইখো। ফেলে দিও না।

    সেদিন আসার সময় কচি আপা আমার হাতে দিল আরেকটি পেঁপে। কাঁচা নয়—গাছ পাকা। বর্ণ হলুদ। মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, ভাই, চিন্তা কইরো না। তোমার সাহিত্যবোধ হবে। আমার আব্বাজান কখনো মিথ্যে কথা কয় না। মিথ্যে কথা দিয়ে সাহিত্য হয় না।
    বিড়ালটি কবির পায়ের কাছ থেকে উঠে তার টেবিলে উঠল। আড়মোড়া ভেঙ্গে লেজটা তুলে ডেকে উঠল, মিয়াও।
    ঠাকুরদা সাহিত্যবোধের বদলে পেঁপে পেয়ে খুব হতাশ হয়েছেন। জীবনে প্রথম বারের মত তিনি আমাকে বাড়ীর দোর গোড়ায় ছেড়ে দিলেন। বাড়িতে ঢুকলেন না। বললেন, একা যাও। একা যাওয়া শেখো। বলে ঠাকুরদা তেতুলিয়ার হাঁটে চলে গেলেন। নতুন কোনো মুশকিল আসানের সন্ধান করবেন।

    কিন্তু আমার মা জননী বড় ভক্তিমতি। অপেক্ষা করছিল আমার জন্য। আমার সাজানো গোছানো চেহারা দেখে খুব খুশী। কোলের কাছে টেনে নিয়ে বলল, কি রে বাবা, তোরে দেখি চেনাই যায় না। কি, সাহিত্যবোধ পাইছিস নাকি? কই, দেখি?
    মায়ের দিকে পাকা পেঁপেটি তুলে দিলাম। মা কপালে ঠকিয়ে বলল, দুগগা দুগগা। আর চিন্তা নাই। ঠাকুর দিছে।
    মা পেঁপেটি ধুয়ে কাটল। একটা পুজার থালায় সাজিয়ে তুলসি তলায় রেখে ধুপ ধুনো জ্বালল। প্রণাম করে বলল, আশা পূর্ণ করো হে ঠাকুর।
    পেঁপে তখন ঠাকুরের প্রসাদ। সবার হাতে হাতে মা প্রসাদ তুলে দিল। প্রতিবেশিরাও বাদ গেলো না। সবাই খেয়ে বলল, অমৃত।

    এই পেঁপের খোসা বীজ আর শাঁস মা আমাকে দিয়ে বললেন, পুকুর পাড়ে গর্ত করে ফেলে দিয়া আয়। ঠাকুরের পেসাদ এখানে সেখানে ফেলা ঠিক নয়।

    পুকুরপাড়ে নিয়ে যাব, তখন আমাদের ধ্বলি গাইটা গোপাট থেকে ফিরছিল। বিকেল ফুরিয়ে আসছে। পেয়ারা গাছের মাথায় বাঁদুড় উড়ছে। গাইটা হাম্বা রবে ডাক দিয়ে আমার কাছে এলো। হাত থেকে বীজ সমেত পাকা পেঁপের খোসা খুব পরিতৃপ্তির সঙ্গে খেয়ে ফেলল। মাটিতে পুঁতে রাখার মত কিছুই রাখল না।
    আমি মা অন্তঃ ছেলে। মায়ের বাক্যির বাইরে যেতে পারি না। কিন্তু মাটিতে পুতে ফেলার মত আর কিছু নেই দেখে আমার কান্না পেল। মা ছুটে এসে বলল, দুঃখ পাস নে খোকা। তোর কোনো দোষ নাই। ঠাকুর সব দেখছেন। তিনি রাগ করবেন না।
    এ সময় আমার পকেট থেকে কবির লেখা কাগজটি সামান্য বের হয়ে ছিল। সেটা বের করে মা বলল, এটা কিরে বাবা?
    --কবি লিখে দিয়েছেন।
    --কি লিখছেন?
    --পেঁপে।
    মার মুখ এবার উজ্জ্বল হয়ে উঠল। বলল, এইতো পাইছি। এটারে তুই মাটিতে রাইখা দে।
    পুকুর পাড়ে ঝুরঝুরে মাটি। সহজেই মাঠি সরিয়ে একটা গর্ত করলাম। কাগজটি পুতে গর্তে রেখে দিলাম। মাটি দিয়ে ভরাট করা হল।
    আজলা করে জল এনে মা সেই মাটি ভিজিয়ে দিল। তখন সন্ধ্যে নামল।

    কিছুদিনের মধ্যেই পুকুরপাড়ের মাটি ফুঁড়ে একটি শিশু গাছ বের হল। তার সবুজ পাতা। খাড়া খাড়া ডগা। দেখে ঠাকুরদা খুব খুশী হয়েছেন। নিয়মিত মাটি খুঁড়ে দিতে লাগলেন। আগাছা তুলে গোড়া সাফ করলেন। মা সকাল-সন্ধ্যায় জলদান করল। ডগডগিয়ে গাছটি বেড়ে উঠল। হাওয়ায় হাওয়ায় তার পাতা কাপে। ফুল আসে।

    কবি কাশেম রেজা আমাদের বাড়িতে এলেন। সঙ্গে তাঁর চার মেয়ে আমাদের কচি আপা, কোকো আপা, সেকো আপা আর রেখা আপা। তারা সেদিন সারা বাড়ি ঘুরে ফিরে বেড়াতে লাগল। টগর ফুল তুলে চুলে পরল। মা তাদের জন্য লক্ষ্মীদীঘা চালের পায়েস রাঁধল। রূপেশ্বর ধানের মুড়ি ভেজে দিল-- সঙ্গে নারকেলের নাড়ু। খেয়ে দেয়ে পুকুর পাড়ে গাছটির নিচে পাটি পেতে বসল চার বোন। গান গাইল—
    আয় তবে সহচরি
    হাতে হাতেধরি ধরি
    নাচিবি ঘিরি ঘিরি, গাহিবি গান।।

    ঠাকুরদা একটু বিষণ্ন হয়ে ছিলেন। তার শরীরটা ভালো যাচ্ছিল না। মাথার চুল দ্রুত পড়ে যাচ্ছে। ওজন কমে যাচ্ছে। চোখে কম দেখতে শুরু করছেন। এক ফাঁকে কবি কাশেম রেজাকে একটু তফাতে ডেকে নিয়ে বললেন, আমার নাতিডা যে মূর্খ রইয়া গেল। তার কী এ জীবনে সাহিত্যবোধ হবে না?
    কবি তার হাত ধরে বললেন, হবে হবে। এই গাছে সাহিত্য ধরবে। চিন্তা কইরেন না।
    কিন্তু ঠাকুরদার চিন্তা শেষ হয় না। চিন্তা বেড়ে চলে। ফুল থেকে ফল হতে অনেকটা সময় লেগে যায়। গুটি থেকে বড় হতে আরো সময়। ঠাকুরদা শেষদিকে লাঠিতে ভর দিয়ে পুকুর পাড়ে যেতেন। হা করে তাকিয়ে থাকতেন। তার সময় দ্রুত শেষ হয়েযাচ্ছে। গাছটি তখন সামান্য দুলত। বাতাসে ফর ফর শব্দ হত।

    ঠাকুরদা লাঠি ভর দিয়ে যাওয়ার শক্তিও হারালেন। তাকে কিছুদিন ধরে ধরে আমরা পুকুর পাড়ে নিয়ে যেতাম। ফলে বর্ণ ধরা শুরু করল—গাঢ় সবুজ থেকে হালকা সবুজ। তারপর হালকা হলুদ। ঠাকুরদা তখন বিছানা ছেড়ে উঠতে পারেন না। বারান্দায় শুয়ে শুয়ে গাছটির দিকে তাকিয়ে থাকেন। থেকে থেকে হট হট করে শব্দ করেন। পাখি তাড়ান। বলেন, ও পাখি, ফলটা খাইস না। মাফ দে। আমার বাসনা পূর্ণ করতে দে।
    গাছটাকে ভালো করে দেখার জন্য ঠাকুরদার জীবনে প্রথম বারের মত চশমা এলো। গাছটি পুরোটা দেখতে অসুবিধা হচ্ছে দেখে সামনে থাকা দুটো কুল বরই গাছের ডাল কেটে দেওয়া হল।
    বিজিতেন ডাক্তারও একদিন এসে ঠাকুরদাকে জবাব দিয়ে গেলেন। সায়েম কবিরাজ কোনো তাবিজ দিতে পারলেন না। শুধু বলে গেলেন, আল্লা সাফি। আল্লা মাফি। তার স্মরণ নেন। ঠাকুর ঠাকুর করেন।

    সেদিন ভোর বেলায় উঠোনে রোদ পড়েছে সবে। ছোটো পিসি ঘণ ঘণ চোখ মুছছে। বড় পিসি ঠাকুরদার শিয়রে বসে লক্ষ্মীর পাঁচালী পড়ছে। এর বাইরে আর কিছু পড়তে জানে না। ঠাকুরদা ঘোলা চোখে পুকুর পাড়ের গাছটির দিকে তাকিয়ে আছেন। খবর পেয়ে কাশেম রেজা এলেন। গাছটি থেকে ফল পাড়লেন নিজের হাতে। ফল পুরো হলুদ বর্ণ হয়ে গেছে। সেটা নিয়ে ঠাকুরদার কাছে এলেন। বললেন, এখন আর বাসনা রাইখেন না।
    ঠাকুরদা অনেক কষ্টে তাকে বললেন, কবিসাব, আমার নাতিডারে সাহিত্যবোধ দ্যান। এইটাই আমার শেষ বাসনা।
    কবি ছুরি দিয়ে ফলটি কাটলেন। থেতলে ফলের রস বের করলেন। চামচে করে ঠাকুরদার মুখের দিকে এগিয়ে দিলেন। বললেন, বিধুবাবু, সাহিত্য বোধ দিচ্ছি। হা করেন-- খান।

    ঠাকুরদা হা করলেন। তার মুখের ভিতরে কবি ফলের রস দিলেন। তিনি গভীর তৃপ্তিতে বলে উঠলেন, আহ। তার বাসনা পূর্ণ হয়েছে। তার চোখ থেকে দুফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল। কারা কারা উঠোনে জয়ধ্বনি করতে লাগল। মা জুকাড় দিচ্ছে। এবার ঠাকুরদা মহালোকে যাত্রা করবেন।

    আমাদের সবার মুখে তখন সেই ফল। আমি খাচ্ছি। আমার বোনেরা খাচ্ছে। বাবা খাচ্ছে। কাকা খাচ্ছে। জেঠা খাচ্ছে। মা খাচ্ছে। খেতে খেতে কবি কাসেম রেজা একটি সাদা কাগজ আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, লেখো তো বৎস।
    --কি লিখব?
    --সাহিত্য লেখো।
    আমি তখন তদগত। লিখলাম, পেঁপে ফল পাকিলে মিঠা লাগে। কাঁচা হইলে আনাজ।
    কবি আমার মাথায় হাত রেখে বললেন, তথাস্তু। বাইঁচা থাকো।*

    ----------------------------
    গল্পপাঠের লিঙ্ক
    http://www.galpopath.com/
  • জয়ন্ত | 127.194.89.126 | ১১ মে ২০১৩ ১৩:১০605787
  • অহো কি পড়িলাম! জন্মজন্মান্তরেও ভুলিব না। এখন পাকিয়াছে, এবাবদে সিকি পয়হা সন্দেহও নাই।
  • কৃশানু | 213.147.88.10 | ১১ মে ২০১৩ ১৩:১৯605788
  • ভালো লাগলো।
  • san | 24.98.44.132 | ১১ মে ২০১৩ ১৪:১৮605789
  • আহা !
  • | 126.202.129.172 | ১১ মে ২০১৩ ১৪:৩৮605790
  • আহা। বড় ভালো লেখেন আপনি।
  • Blank | 69.93.245.88 | ১১ মে ২০১৩ ১৪:৪১605791
  • বাহ
  • dd | 132.166.83.101 | ১১ মে ২০১৩ ১৫:৪৮605792
  • সাংঘাতিক ল্যাখা। অ্যাজ ইউজুয়াল।
  • sosen | 111.63.157.152 | ১১ মে ২০১৩ ১৭:২৫605793
  • ভালো লাগলো।
  • kumu | 132.161.148.222 | ১১ মে ২০১৩ ১৭:৫৪605794
  • অসাধারণ।
  • aka | 84.82.68.160 | ১১ মে ২০১৩ ১৮:৩৭605777
  • এইটা দারুণ হয়েছে বাকিগুলো মাথায় রেখেও।
  • kk | 78.47.250.76 | ১১ মে ২০১৩ ২১:১৪605778
  • আপনার লেখা পড়ে বাক্যি হারিয়ে ফেলি। বারবার।
  • Shibanshu | 127.197.236.16 | ১১ মে ২০১৩ ২২:০১605779
  • স্বভাবসিদ্ধ সফল লেখা। ভারি ভালো লাগলো।
  • NINA | 79.141.168.137 | ১২ মে ২০১৩ ০২:৪৬605780
  • কুলদাভাই --
    লাজবাব!
  • Sankha | 118.35.9.186 | ১২ মে ২০১৩ ০৩:৩৯605781
  • ভালো লাগল লেখাটা।
  • সুকি | 212.160.16.175 | ১২ মে ২০১৩ ০৮:১৩605782
  • খুবই ভালো লেখা - অদ্ভূত যাকে বলে। আপনার লেখা যে কেন আরো বৃহত্তর পাবলিকের কাছে পৌঁছে যায় না কে জানে! ইহা বাঙলা সাহিত্যের লস্‌।
  • কুলদা রায় | 34.90.93.220 | ১৩ মে ২০১৩ ০১:১১605783
  • এই লেখাটার সব চরিত্র এবং ঘটনার সবটুকুই সত্যি। এর মধ্যে কবি কাশেম রেজা পেঁপে খাওয়া অবস্থায় মারা গেছেন। সেদিন আমিও শহরে ছিলাম। খবর পেয়ে গিয়ে দেখি তিনি তার চেম্বারে শুয়ে আছেন। পাশে কাটা পেঁপে। আর তার টেবিলে খোলা নীরেন চক্রবর্তীর কবিতার ক্লাশ বইটি। জলের উপর থেকে উড়ে আসা হাল্কা হাওয়ার বইটার পাতাগুলো ফর ফর করে উড়ছে। রুমী নামে তাঁর এক শিশু নাতী বড়শি দিয়ে মাছ ধরছে।

    তার ছেলে প্রতিক আমার বন্ধু ছিল। আর্টিস্ট। ১৯৯৪ সালে অকালে মরে গেছে। কাশেম রেজার এক মেয়ে কচি রেজা কবি--কবিতা লেখেন। তার কবিতা ভালো। মাঝে মাঝে নেটে পড়ি।

    ভাই সুকি, আমি লিখি আমার নিজের কথাটি। সেভাবে কোনো পাঠককে ভেবে লিখি না। যে জন্য কোথাও প্রকাশিত হোক সেটা আমার ভাবনায় নেই। নেটে লিখি। কোনো কাগজে লিখি না। হয়তো সাহিত্য করার ইচ্ছে থাকলে কাগজে লিখতাম। সে ক্ষমতা আমার নাই। আপনাদের ভালো লেগেছে জেনে ভালো লাগল।
    ধন্যবাদ।
  • lcm | 34.4.162.218 | ১৩ মে ২০১৩ ১১:৪৪605784
  • লেখার এই স্টাইলটা ভাল লাগে, ছোট ছোট বাক্য, ছোট ছোট প্যারা - পড়তে চাপ লাগে না।
  • Tripti | 138.210.206.145 | ১৫ মে ২০১৩ ২০:২৬605785
  • বড় ভালো লেখা।
  • keu na | 125.119.255.234 | ২১ মে ২০১৩ ১১:১০605786
  • দারুণ লাগলো !
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:

কুমুদি পুরস্কার   গুরুভারআমার গুরুবন্ধুদের জানান


  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
    • কি, কেন, ইত্যাদি
    • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
    • আমাদের কথা
    • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
    • বুলবুলভাজা
    • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
    • হরিদাস পালেরা
    • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
    • টইপত্তর
    • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
    • ভাটিয়া৯
    • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
    গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
    মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


    পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। মন শক্ত করে মতামত দিন