বাপু অল্বট, চৈতন্যকে নিয়ে মুখস্থ বুলি উগরে দেওয়ার আগে এগুলো একটু দেখে নিলে হয় না? আর নবজাগরণ তার শুরু থেকেই ইসলামোফোবিক ও ছোটলোকফোবিক। কিঞ্চিৎ মহিলাফোবিকও বটে। কাজেই চাড্ডিদের আদি পুরুষেরা প্রায় সবাই প্রাতঃস্মরণীয় বাঙালি। সে তাতে হুতো একমত হন কিংবা ভিন্ন মত।
প্রথমত, শঙ্খবণিক ও তন্তুবায় অধ্যুষিত অঞ্চলে হরিসংকীর্তনের মধ্য দিয়ে চৈতন্য তাঁর প্রথম প্রচার শুরু করলেও তাঁর জীবদ্দশাতেই সেই আন্দোলনের রাশ চলে গিয়েছিল উচ্চবিত্ত ও উচ্চবর্ণের মানুষদের হাতে। মল্লরাজা বীর হাম্বির, পঞ্চকোটের রাজা হরিনারায়ণ, প্রাদেশিক শাসন কর্তা রায় রামানন্দ, প্রভূত বিত্তশালী উদ্ধারণ দত্ত, জমিদারপুত্র কৃষ্ণদাস প্রমুখেরা চৈতন্য-আন্দোলনের প্রাথমিক স্তর থেকেই নেতৃত্বে আসীন ছিলেন। এ ছাড়াও মনে রাখতে হবে হিরণ্যদাস ছিলেন সপ্তগ্রামের রাজা, অদ্বৈত আচার্যের পূর্বপুরুষ রাজা গণেশের মন্ত্রণাদাতা ছিলেন, জীব গোস্বামীর পূর্বপুরুষ ছিলেন কর্ণাটকের রাজা।
দ্বিতীয়ত, বিমানবিহারী মজুমদার ‘চৈতন্যচরিতের উপাদান’ গ্রন্থে চৈতন্য-আন্দোলনের প্রথম পর্বে হিন্দু ভক্তদের যে জাতিগত পরিসংখ্যান দিয়েছেন, তাতে ব্রাহ্মণের সংখ্যা ২৩৯, কায়স্থ ২৯, বৈদ্য ৩৭ ও সুবর্ণবণিক ১। অর্থাৎ চৈতন্য-আন্দোলন প্রথম থেকেই ব্রাহ্মণদের কব্জায় ছিল। কাজেই বর্ণাশ্রমশাসিত হিন্দু সমাজে চৈতন্য যতই ‘অস্পৃশ্য-দুষ্ট যবন চণ্ডাল’কে স্থান দিতে চান না কেন, এই আন্দোলনের আর্থ-সামাজিক চরিত্রের মৌল অসঙ্গতি কিন্তু প্রথম থেকেই ছিল।
তৃতীয়ত, চৈতন্যের জীবিতকালেই বৃন্দাবনে গড়ে উঠেছিল চৈতন্য-আন্দোলনের আরেকটি শক্তিশালী কেন্দ্র, যার যুগ্ম অধিকর্তা ছিলেন কর্ণাট ব্রাহ্মণ সনাতন ও রূপ গোস্বামী। চৈতন্যের প্রয়াণের পর গৌড়ীয় বৈষ্ণবরা নীলাচল থেকে উৎখাত হয়ে বৃন্দাবনে আশ্রয় নেন এবং প্রায় তখন থেকেই বৃন্দাবন গোস্বামীদের আধিপত্য শুরু হয়।
বিশেষত চৈতন্যের মৃত্যুর পরে, বিভিন্ন শাখায় বিভক্ত তাঁর অনুগামীদের একত্র করতে ষোড়শ শতকের আটের দশকে রাজশাহীর খেতুরিতে নিত্যানন্দপত্নী জাহ্নবা দেবীর নেতৃত্বে এক বিশাল বৈষ্ণব সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই খেতুরি উৎসবেই ‘ব্রাহ্মণ্যবাদী' গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্ম ঘোষিত ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। গৌড়ীয় বৈষ্ণববাদের রূপকার হলেন বৃন্দাবনের ষড়গোঁসাই, প্রধানত সনাতন গোস্বামী। এঁদের হাত ধরেই গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্মে ব্রাহ্মণ্যবাদ আসর জমিয়ে বসে, শুরু হয় গোঁসাই বনাম দাসেদের বাইনারির খেলা।
সুতরাং যে আন্দোলনের পরতে পরতে জড়িয়ে আছে ব্রাহ্মণ্যবাদ, সেখানে যে স্মার্ত রঘুনন্দনেরা মাথা চাড়া দেবেন - এতে আর আশ্চর্য কী?