
আকাশ হল অনুভব মানে অনুর সৎ ভাই। মা মারা যাওয়ার পর বাবা মামণিকে নিয়ে এলেও ওর অত রাগ হয়নি যেমন চার দেওয়ালের চৌহদ্দিতে আকাশের আবির্ভাবে হয়েছিল। তার ওপর বাবার এক্সট্রা আদিখ্যেতা বরাদ্দ আছে ভাইয়ের জন্য, দেখলেই পিত্তির মৌচাকে ঢিল ছুঁড়ছে কেউ মনে হয়। তা সে বলা নেই কওয়া নেই, হঠাৎ হঠাৎ আকাশের শরীর খারাপ-শ্বাসকষ্টের জন্যই হবে হয়ত, কখনও ইনহেলার কখনওবা গুচ্ছের ওষুধ: কিছুতেই ব্যাটাকে বাগে আনা যায় না। তবু গুমোট গুমোট মেঘমার্কা কাশির দমকটা পর্যন্ত অনুর কোমিসারেশন কোটায় একটা পুঁট ফেলতে পারেনি কুড়ি বছরে। খাওয়ার সময় আকাশের পাতে পড়া মাংসের পিসটায় আধা ইঞ্চি মশলা বেশি উঠলেও অনুর মাথায় গুগল সার্চ কিলবিলিয়ে ওঠে, "হাউ টু প্রুভ ইওরসেল্ফ অ্যাজ আ প্যাট্রোফিল" ... ...

২০০৮-এর সারা বিশ্বের প্রবল অর্থসংকটের পরে দুনিয়া জুড়েই অর্থনীতি থমকে রয়েছে, এবং এখনো পর্যন্ত সেই আগের বৃদ্ধির ধারেকাছেও ফেরত আসতে পারে নি, তার মানে দাঁড়ায় বিদেশে রপ্তানি করে নিজের দেশের ম্যানুফ্যাকচারিং-এ বৃদ্ধি ঘটানো খুবই কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই অবস্থায় ২০১৪ সালে এসে চীনের ম্যানুফ্যাকচারিং সাফল্য ভারতে “কপি-পেস্ট” করাটা অনেকটাই অসম্ভব উচ্চাকাংখা বলেই বোধ হয়েছিল কিছু অর্থনীতিবিদের, কিন্তু নতুন সরকারের সাথে সাথে নতুন আশাবাদী ভাবনাচিন্তারও জন্ম হয়েছিল বলে সেই সব মতামত খুব একটা হালে পানি পায় নি। প্রায় তিন বছর হয়ে গেছে ‘মেক ইন ইণ্ডিয়া’ ঘোষণার পরে। এখন সময় এসেছে এই বহুল প্রচারিত প্রকল্পের একটা নিরপেক্ষ মূল্যায়নের ... ...

কমিশন উত্তর প্রদেশের তৎকালীন বিজেপি সরকারের মুখ্যমন্ত্রী কল্যাণ সিংকে কড়া ভাষায় অভিযুক্ত করে। সঙ্ঘ পরিবার যা যা চেয়েছিল কল্যাণ সিং এর সরকার তাই তাই করেছে বলে কমিশন মন্তব্য করে। পরিকল্পিতভাবে সরিয়ে দেওয়া হয় সেই সমস্ত আধিকারিকদের যারা সঙ্ঘের কার্যকলাপে বাধাস্বরূপ ছিলেন। নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে ইচ্ছাকৃতভাবে ঢিলেঢালা করে তোলা হয়। তারা হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্ট এর কাছেও মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দেয়। কলরাজ মিশ্র, উমা ভারতী, গোবিন্দাচার্য, শঙ্কর সিং বাঘেলা, বিনয় কাটিয়ার, সাক্ষী মহারাজ প্রমুখ বিজেপি নেতাদেরও কমিশন এই ঘটনার জন্য প্রত্যক্ষভাবে দায়ী করে। কমিশন অবশ্য নরসীমা রাও এর নেতৃত্বাধীন কংগ্রেস সরকারকে এই ঘটনার জন্য দায়ী বলে মনে করে নি, যা খানিকটা অবাক করার মতো ব্যাপার। ... ...

হাতি পাঠিয়ে জমিদারি কেতায় যাঁদের বাড়ি ভাঙা হল সেই লোকগুলো কে? গৌহাটী হাইকোর্ট বলছে এরা বে-আইনি জবরদখলকারী। অভয়ারণ্যের জমি দখল করে বসে পড়েছে, এদের উচ্ছেদ করা আশু কর্তব্য। জমির প্রশ্নে পরে আসছি, আগে দেখা যাক লোকগুলো কারা। বিতর্কের অবকাশ নেই যে এঁদের সিংহভাগ পূর্ব আসামের জনজাতি গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। বন্যা ও ব্রহ্মপুত্রের অবিরত পাড় ভাঙার ফলে ভিটেমাটিকাজকম্মোহারা হয়ে এদিক ওদিক ঘুরতে ঘুরতে জীবিকার সন্ধানে গুয়াহাটিতে এসে পড়েছেন; কম দামের বাসস্থান খুঁজে শহরের উপকণ্ঠে আমসাং-এর হদিশ পেয়েছেন। ... ...

বস্তারের যেখানে অত্যাচার, সেখানেই অদম্য সোনি সোরি। স্কুল কর্তৃপক্ষ চূড়ান্ত অসহযোগিতা করলেও নির্যাতিতা মেয়েদের হয়ে মামলা রুজু করেছেন সোনি। পরিষ্কার বললেন, তার গুপ্তাঙ্গে পাথর ঢোকানো পুলিশ অফিসারটি এবার রাষ্ট্রপতি পুরষ্কার পেয়েছে, ওর সদম্ভ চলাফেরা দেখলে বুকের ভেতরটা জ্বলেপুড়ে যায়, মগর ক্যা করু, দেশ কা সংবিধানমে বহোত বিশোয়াস রখতি হুঁ। না, বন্দুক হাতে তুলে নেবার কথা একবারও ভাবেননি সোনি। বরং একবারই গলা ধরে এলো বাবাসাহেবের এই সত্যিকারের সন্তানের, যখন বললেন তার ভেঙে দেওয়া স্কুলহোস্টেলে পঞ্চাশটি অনাথ বাচ্চা থাকতো যাদের বাবা মায়েরা খুন হয়েছে রাষ্ট্রের পোষা আতঙ্কবাদী সালোয়া জুড়ুমের সদস্যদের হাতে। তাদের কি হল তিনি জেলে যাবার পর জানা নেই, শুধু এই সেদিন গহন বনের ছায়ায় এক গ্রামে ধর্ষণের ঘটনা শুনে সোনি যখন ছুটে যাচ্ছিলেন দুটি মাওবাদী তার পথ আটকায়। যাবার হুকুম নেই। কথা কাটাকাটি শুরু হতেই বন্দুক হাতে ছুটে আসে আর এক তরুণ, প্রাক্তন শিক্ষিকার পা ছুঁয়ে মাফি মাঙে। এ সেই অনাথদের একজন। ... ...

স্টেট ভার্সেস জোগা, জুগল অ্যান্ড সুদারের কেসে, পাঁচ মাসে তেরো খানা এফ আই আর দায়ের করা হয়েছিল নানা ব্যক্তির নামে। যদিও, সেই এফ আই আরে কোথাও জোগা, জুগল আর সুদারের নাম ছিল না। এর কিছুদিন পরেই, পুলিশের স্টেটমেন্টে ওই তিনজনের নাম যোগ করে তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে অবশ্য তিনজনেই বেকসুর খালাস হয়েছিল। আরেকটা কেসে ৫০ জনের নামে এফাইআর দায়ের হওয়ার পাঁচ মাস পরে পুলিশের হটাৎ করে আরো তিনজনের নাম মনে পড়ে যায় এবং তাদেরকে তৎক্ষণাৎ গ্রেপ্তার করা হয়। মানে ব্যাপারটা দাঁড়ালো এই যে, যত দিন যায়, পুলিশের মেমোরি তত শক্তিশালী হয়। অন্যদিকে,অপর আর একটি কেসের দুই অভিযুক্ত, মিদিয়াম লাচু ও পুনেম ভিমার নাম পুলিশের চার্জশিটে কোথাও ছিল না, শুধুমাত্র ইনভেস্টিগেটিং অফিসারের একটা রিপোর্টে তাদের নাম উল্লেখ করা ছিল।পুলিশ সেই রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে তাদের দুজনকে গ্রেপ্তার করে এবং বিনা বিচারে তারা জেল খাটছে আজ ছ'বছর ধরে। ... ...

সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার যেটা, সেটা হল রায়া সরকার এবং আরও কয়েকজন, যারা মেহমুদ ফারুকি আর খুরশিদ আলম ধর্ষণ মামলায় সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থান নিয়েছিলেন, তাঁদের ভোল বদলানো বা পালটি খাওয়া। কিছু স্বাক্ষরকারীর মতে উভয় ক্ষেত্রেই যেহেতু বিশেষভাবে ধর্ষণের অভিযোগই করা হয়েছে, তাই তার বিচারের ক্ষেত্রে নির্ধারিত পদ্ধতিতেই এগোন দরকার। মেহমুদ ফারুকির মত খুরশিদ আলমও আমাদের অনেকের কাছেই পরিচিত ছিলেন। উভয়ক্ষেত্রেই যে নারীবাদীরা অভিযোগ সমর্থন করেছিলেন, উদার বামপন্থী নারীবাদী বৃত্তের ভেতর থেকেই তাঁদের ‘ফেমিনাজি’ বলে আক্রমণ করা হয়েছিল। ‘ফেমিনাজি’ অর্থাৎ কোনও প্রমাণ ছাড়াই যারা পুরুষের বিরুদ্ধে আক্রমণে ঝাঁপিয়ে পড়েন। কিন্তু আমাদের অবস্থানটা হল এইরকম যে যেকোন অভিযোগকে বিচার পাওয়ার দিকে এগিয়ে দেবার আগে আমরা তার ‘প্রমাণ’ চাইব না কিন্তু আশা করব যে কি ধরণের অভিযোগ জানানো হছে সে বিষয়ে অভিযোগকারীর যেন পরিষ্কার ধারণা থাকে। আমরা জানি খুরশিদের ক্ষেত্রে অভিযোগকারিণী মধু কিশওয়র অভিযুক্তের সঙ্গে তাঁর একটা ভিডিও রেকর্ডিং বানিয়েছিলেন আর প্রথামাফিক অভিযোগ জানানোর আগেই সেটা গণমাধ্যমে ছেড়ে দিতে প্রস্তুত ছিলেন। কিন্তু এঁরা যখন অন্য নারীবাদীদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন তখন তাঁরা এইভাবে এগোনোর বদলে সঠিক পদ্ধতিতে অভিযোগ দায়ের করতে উৎসাহিত করেছিলেন। দুঃখজনকভাবে খুরশিদ আত্মহত্যা করায় এই মামলা বন্ধ হয়ে যায়। যে নারীবাদীরা এই দুই ক্ষেত্রে অভিযোগকারিণীদেরসমর্থন করেছিলেন, তাদেরই ফেমিনাজি বলা হয় কারণ তাঁরা গণমাধ্যমের বিচারে (মিডিয়া ট্রায়ালে) আগ্রহী, যার সবটা তাঁদের আয়ত্তে থাকে না। আশ্চর্যজনকভাবে রায়া সরকার, যিনি একদিন কবিতা কৃষ্ণণকে সাম্প্রদায়িক আর ফেমিনাজি হওয়ার জন্য ব্যক্তিগত আক্রমণ পর্যন্ত করেছিলেন (সেই সব পোস্ট অবশ্য পরে ডিলিট করে দিয়েছেন), তিনিই আজ কোনও প্রেক্ষিত বিচার না করেই যেকোনও পুরুষের ওপর যৌন হেনস্থার অভিযোগ আনাকে উৎসাহ দিচ্ছেন। অন্য নারীবাদীরা যারা সেই সময় আমাদের আক্রমণ করেছিলেন আশ্চর্যজনকভাবে তাঁরাও দিক বদলে অন্য দিকে চলে যাচ্ছেন অতি দ্রুত। তাহলে কে এই দুই বিপরীত পক্ষ তৈরী করে তাদের লড়িয়ে দিল আর কোন দিকটাই বা বেশি ক্ষমতাবান! ... ...

বনারসি গানের একটা অন্য ঐতিহ্য রয়েছে। শাস্ত্রীয় গায়নে লোকজ আবেগের উৎসার বনারসের মতো আর কোথাও দেখা যায়না। যদি শাস্ত্রীয় গায়ন, অর্থাৎ ধ্রুপদ, ধমার, চতুরঙ্গ,খ্যয়াল, ইত্যাদি সব ধারাতেই এই মাটির আঘ্রাণ এতো স্পষ্ট হয়, তবে উপশাস্ত্রীয় সঙ্গীত, অর্থাৎ, টপ্পা, ঠুমরি, দাদরা, কাজরি, হোরি, চৈতি, তরানা, ঘাটো ইত্যাদি শৈলীতে তো কথাই নেই। এইসব ধারার সব থেকে বৈচিত্র্যপূর্ণ রূপায়ণ আমরা বনারসি বনাওটে খুঁজে পাই। এছাড়া অপ্রচলিত তিরওয়ত, সদরা, খামসা, লাওনি, কীর্তন, ভজন, কথাগায়ন, রামায়নগায়ন, রাগমালা, কব্বালি ইত্যাদি সব ধরণের সঙ্গীতধারাই বনারসে চর্চিত হয়েছে। এখানে কেতাবি শাস্ত্রীয়তা আর লোকজ সঙ্গীত কেতা চিরকাল সমান ইজ্জতের সঙ্গে মানুষের কাছে আদৃত রয়ে গেছে। গান শোনার জন্য বনারসের নানা ঠেকে তাঁরা জড়ো হ'ন। তা সে সংকটমোচন মন্দিরে হোক বা গঙ্গা উৎসবে, তুলসিঘাটের ধ্রুপদমেলা বা বালাজিমন্দিরে। শ্রোতাদের মধ্যে কেউ পানবিক্রেতা, কেউ রাবড়িওয়ালা, কেউ বিখ্যাত অধ্যাপক, কেউ বা বরিষ্ঠ রাজপুরুষ বা যজমান পুরোহিত, অথবা পরিচয়হীন, ধারালো, বনারসি ভবঘুরে পথের লোক। এমন কি তথাকথিত লপুয়া'লফঙ্গা 'ইতর'সমাজের লোকজনকেও দেখা যাবে এককোণে মাটিতে বসে দাদ দিয়ে চলেছেন গানের সঙ্গে। সব মিলিয়েই ফুটে ওঠে বনারসি চাল। বনারসি অদার সঠিক এই ধরণ। লোকজ গানের সম্ভ্রম আর সম্ভ্রান্ত গানের লোকজ উল্লাস সবই বনারসে পরস্পর আলিঙ্গন করে চলে। এই ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারিনী গিরিজা দেবী'র গায়নেও বনারসি অদার ছাপ চিরকাল অতি স্পষ্ট বিরাজমান ছিলো। ... ...

সত্যিই টিভি সিরিয়ালের এক একটি কেস মহিলা কমিশনে দাখিল হওয়া এক একটি আবেদন। ব্যক্তি আর সমাজ জীবনের জলছবি। মেয়েরা মাথা নীচু করে আর সবকিছু মেনে নিচ্ছেন না। কিন্তু সংসারের কর্ত্রী হয়ে থাকবো এই বাসনা থেকে এখনো বেরোতে পারেননি। স্বামী নিজের বোনকে নিয়ে চলে গেছে, এগারো মাস বাদে ফিরে এসেছে, তবু স্ত্রী ছেলেকে নিয়ে আবার সংসারের পুনঃপ্রতিষ্ঠা চায়। ছেলে ডিপিএসেই পড়ুক চায়। টাকা দেবে কে, একথার উত্তরে একুশ বাইশের মেয়েটি জানায়, ----ওকে রাজারহাট নিউটাউনে সবাই চেনে। সিন্ডিকেট করে ও। এখানকার কাউন্সিলরের ঘর থেকে বেরিয়ে আমায় সেদিন বলছে, কত টাকা পেলে আমায় ছাড়বি ? কুড়ি লাখ, ত্রিশ লাখ ? আপনারা সিসিটিভি দেখুন। বলেছে কিনা। ও ইচ্ছে করলেই আমার ছেলেকে পড়াতে পারে। ... ...

ফারুকি সংক্রান্ত রায়ের পর ধর্ষণ আইন এবং আদালতের রায় নিয়ে নতুন করে কথাবার্তা শুরু হয়েছে। এই লেখাটা ঠিক ফারুকি বিষয়ক নয়। কিন্তু আলোচনা যখন হয়েছে, এবং ধর্ষণের নতুন আইনটির বেশ ক বছর হয়ে গেল, তার এবার একটা পুনর্মূল্যায়নও দরকার, এই জায়গা থেকে কয়েকটা লেখা ফেসবুক গ্রুপে লিখেছিলাম। সেগুলোই একটু নেড়েচেড়ে তুলে রাখলাম। পাবলিক ফোরামের লেখা। একটু তাড়াহুড়োতে। বাক্যগঠন ইত্যাদি বদলালামনা। এক্ষেত্রে বিষয়বস্তুইআসল, এই অজুহাতটুকু রইল। ... ...

ঝলসানো চামড়ার ও ফোসকার ড্রেসিং করাতে আমার পরিচিত একটি ক্লিনিকে গেলাম। সেখানে এক অপরিচিতা নার্স আমার চিকিৎসা করলেন। তিনি ড্রেসিং করার সময় থমথমে মুখে কাগজ দেখে মন দিয়ে কাজ করে গেলেন, আমার সঙ্গে একটি কথাও বললেন না। আমার কেমন যেন অস্বস্তি হচ্ছিল যে তাঁর সামনে একজন মানুষ বসে আছে, সে মাঝে মাঝে যন্ত্রণায় আর্তনাদ করে উঠছে, তাকে আমল দেওয়া দূরের কথা, যন্ত্রণা হচ্ছে কি না, একবার জিজ্ঞেসও করলেন না, খস খস করে কাঁচি দিয়ে, এমন ভাবে পোড়া চামড়া কেটে দগদগে কাটা ঘায়ের ওপর মলম আর পটি দিয়ে ড্রেসিং করলেন হাতটা যেন শরীরের বাইরের কোন একটা অংশ, তারপর নিপুণ হাতে পরিপাটি করে ব্যাণ্ডেজ বেঁধে দিলেন। দিয়ে আমাকে মৃদু শাসনের সুরে বললেন, এই ভাল করে ড্রেসিং করে দিলাম, বাইরে বসে একটু জিরিয়ে নিয়ে বাড়ি চলে যান। দেখবেন যেন একটুও জল লাগাবেন না, সাত দিনে সেরে যাবে। চিকিৎসা শুরু হবার দশ দিনের মাথায় হাতের ঘা সেরে গেল, পটি খোলা হল। আমি সুস্থ হলাম। আমার চিকিৎসা যে চিকিৎসক, ফিজিওথেরাপিস্টরা, নার্স-রা করেছেন তাঁরা সকলে অভিজ্ঞ ও দক্ষ, তাঁদের পেশাগত নৈপুণ্য প্রশ্নাতীত, ক্লিনিকটি পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন, তাতে প্রায় যত রকমের আধুনিক ব্যবস্থা থাকা প্রত্যাশিত সব ছিল। আমার দেশ, নিউজিল্যাণ্ডে, সরকার দেশের মানুষের চিকিৎসার ব্যয়ভার বহন করেন, তাই আমার চিকিৎসার মোট খরচ নামমাত্র, এবং আমি যথাসময়ে কোন রকম গোলমাল ছাড়াই পুরোপুরি ভাল হয়েও গেছি। ... ...

পশ্চিম য়ুরোপের লোকজন আর পূর্ব য়ুরোপের স্লাভ-স্লোভাকদের মধ্যে সম্পর্ক আমাদের দেশের মতো বর্ণাশ্রমের নিয়ম মেনে চলেছে। একজন জর্মন, থাকতেন ইংলন্ডে, আদৃত ছিলেন ফ্রান্সে, ভাবতেন আমেরিকাকে নিয়ে। কিন্তু তাঁর পথ নিলো একটা স্লাভ-কসাকদের দেশ। যাদের পশ্চিম য়ুরোপে মানুষই মনে করা হতনা। য়ুরোপের 'যুক্তিবোধ' অর্থোডক্স চার্চের 'গণতন্ত্রহীন' আনুগত্যকেই সাম্যবাদের বীজতলা হিসেবে ভেবে নিয়েছিলো। সেই কোনকালে যখন মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ পাহাড়ে থাকতেন, সারদাদেবী খুব উদ্বিগ্ন, রাতে ঘুম আসেনা। তাঁকে লোকজন বলেছে রাশিয়ান দানবরা আসবে পাহাড় পেরিয়ে। সব্বাইকে জ্যান্ত খেয়ে নেবে। তখন কোথায় মার্ক্স-এঙ্গেলস, কোথায় লেনিন? তার পর আবার সেই দাড়িওয়ালা জর্মনের পথ নিল য়ুরোপের বিচারে একটা অর্ধসভ্যদেশ, চিন। কেন ফ্রান্স পৃথিবীর প্রথম সমাজতান্ত্রিক দেশ হলনা? সেটাই তো স্বাভাবিক ছিলো। ভলতেয়রের থেকে মার্ক্সের বিবর্তনটিই সরলতম উপপাদ্য হতে পারতো। চিরন্তনভাবে অ্যাডাম স্মিথ বা হেগেলের পথ দিয়ে ডিসকোর্সটিকে ব্যাখ্যা করার থেকে একটা ব্যতিক্রমী সমান্তরাল বিকল্পও তো সম্ভব ছিলো। সত্যিকথা বলতে কী, একসময় রাশিয়ার সব চিন্তাশীল, অগ্রণী মানুষেরা প্রশ্নহীনভাবে ফরাসি মননকেই অনুসরণ করতেন। তবু ফ্রান্স সমস্ত সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও সারোগেট মা হয়েই থেকে গেলো। অথবা জর্মনটির নিজের দেশ? তারা হয়ে গেল নাৎসি। পশ্চিম য়ুরোপের কোনও দেশ এই দর্শনটিকে আত্মসাৎ করার হিম্মত দেখাতে পারলে সমাজতন্ত্রকে আর জুজু ভাবার অবকাশ থাকতো না কারো কাছে। রইলো বাকি, বাজার, বাজার, তোমার মন নাই, মানুষ? ... ...

কিন্তু এই কাজগুলোর সবকটাতেই সেই সময়ের দুটি চরিত্র স্পষ্ট। এক, এই সেই সময় যখন শিক্ষিত চাকরি করা স্বচ্ছল মধ্যবিত্তের সাথে নিম্নবিত্তের মানসিক দূরত্ব অনেক কম ছিল। দুই, ভারতীয় সমাজে তখনও ব্যক্তির থেকে সমষ্টির ভালোমন্দ বেশি গুরুত্ব পেত। এই দুটি ঘটনাই এখন অতীত, এবং ব্যক্তি বা সমষ্টির মধ্যে কার গুরুত্ব বেশি, সেই বিষয়ে আমার কোন মন্তব্য নেই, কুন্দন শাহের ছবিতে কালের নিয়ম মেনেই সেই চিহ্নগুলো ফুটেছে শুধু এট্কুই বক্তব্য। কুন্দন শাহের বংশে সিনেমার কোন ইতিহাস নেই। পরিচালক হিসেবেও তিনি নিজেকে বর্ননা করেছেন বৃত্তের বাইরের একজন হিসেবে, যাঁকে মেইনস্ট্রিমে ফেলা যায়নি, এবং তথাকথিত প্যারালাল সিনেমার কুশীলবদের তালিকাতেও রাখা হয়নি। এমনও নয়, তিনি একমাত্র পরিচালক যিনি মধ্যবিত্তের সুখদুঃখ নিয়ে কাজ করেছেন। কুন্দন শাহকে শুধু আলাদা করেছে তাঁর গল্পের চরিত্রেরা, কারণ তারাও আসলে অনেকেই পরিচালকের মতই সাফল্য-ব্যর্থতার বৃত্তের বাইরের মানুষ, তাদেরও কোন হিসেবে এঁটে ফেলা যায় না। দেগে দেওয়া যায়না "ব্যর্থ" হিসেবে। বরং তারা অবলীলায় ব্যর্থতার লাশ বয়ে হাসি ঠাট্টায় মেতে উঠে পরবর্তী ব্যর্থ প্রোজেক্টের অনুসন্ধানে যাত্রা করে। ... ...

আলাউদ্দিনঃ দেখো দিকি আবার মালা ক্যানো! রবীন্দ্রনাথঃ নন্দলাল খাঁ সাহেব বলছেন; ‘এ মণিহার আমায় নাহি সাজে’, ভেবে দেখতে হবে কে কার অলঙ্কার! মালা খাঁ সাহেবের না খাঁ সাহেবের মালা। খাঁ সাহেব স্মিত হেসে আসন গ্রহণ করেন। রবীন্দ্রনাথঃ সাহানা ‘সুরের রসে হারিয়ে যাওয়া সেই তো দেখা সেই তো পাওয়া--- বিরহ মিলন মিলে গেলো আজ সমান সাজে’।। রবীন্দ্রনাথঃ নির্মল থামলে কেন ? ভয় পেয়ো না, খাঁ সাহেবও একদিন শিখেছেন তুমিও তো শিখছো। তফাৎ হল খাঁ সাহেব ওস্তাদ আহমদ আলীকে গুরু পেয়েছিলেন তুমি স্বয়ং খাঁ সাহেবকেই পাচ্ছ। আসলে ‘অরূপরতন’ নাটক মঞ্চস্থ হবে। তারই প্রস্তুতি চলছে। খাঁ সাহেব সঙ্গীত ভবনে যারা তারের যন্ত্র বাজায় তাদের তার যতটা যত্নে টেনে বাঁধা, সুর ততটা নয়। আপনি যে ক'দিন আছেন, একটু সুর বেঁধে দিন। আলাউদ্দিনঃ গুরুদেব আমি তো বেসুরা আতাই, জীবনে তো একটা সুর লাগাইতে পারলাম না। আমি হলেম গিয়ে ম্লেচ্ছ, ডাকাতের বংশ। রবীন্দ্রনাথঃ ডাকাতের বংশ বলেই তো খাঁ সাহেব যখন যাকে গুরু পেয়েছেন প্রকাশ্য দিবালোকে তাঁর সুরের নির্যাসটুকু এমন করে নিজের করে নিয়েছেন যে, সে বেচারা নিজের ধন আর নিজের কাছে রাখতে পারলো না। এমন ডাকাত তো আমার সঙ্গীত ভবনে আরও কয়েকটা চাই। ... ...

শেষ বিকেলের মরা আলোয় চিকচিক করে ওঠে রিকশচালক হরেন দাসের চোখ। খালপাড়ের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন, ‘‘অঙ্কটা খুব সহজ, দাদাভাই। বাইরের দেশের লোকজনের সামনে দেখাবে সল্টলেকে কোনও গরীব নেই, নোংরা নেই। সব ঝকঝকে চকচকে। তাই আমদের চলে যেতে বলেছে। কালো প্লাস্টিক না কী রাখা যাবে না। কালো প্লাস্টিক মানেই নোংরা, জঞ্জাল।’’ হরেনের ছেলে আকাশ লেবার খাটেন। তাঁর প্রশ্ন, ‘‘আপনাদের যাদবপুর, টালিগঞ্জ, নেতাজিনগর, বাঘাযতীন কী করে তৈরি হয়েছিল? সেগুলো জবরদখল নয়? তাহলে ওই এলাকাগুলো ফাঁকা করা হোক। একতা হাইটস ভাঙা পড়ুক। আমরা গরীব, আপনাদের সরকারের আমাদের কাজ দিতে পারে না, তাই আমরা ঝুপড়িতে থাকি। সেটা অন্যায়?’’ ... ...

যেহেতু লঘু-গুরুর প্রসঙ্গ হাঁটি-হাঁটি-পা-পা করে এসে থেবড়ে বসেই পড়ল, তখন বলেই ফেলি, অফিস- কাছারিতে একটা দিনও যে ঈদের জন্য বরাদ্দ নেই (ফ্লেক্সি আছে খালি) - এইটা সারারাত পুজোয় ঘুরে রোল-বিরিয়ানি-আইসক্রিম-চাউমিন-ফুচকা একসাথে হজম করার থেকেও সত্যি বেশ কষ্টকর। শুধু এটুকুই 'অভিযোগ' ভেবে যেসব চরমপন্থী হনুর আঁতে হওয়া ঘা'য়ে কয়েক চিমটে নুন পড়ে গেছে বলে রে-রে করতে আসবেন ভেবে আস্তিন গুটাচ্ছেন, তাদের বলি, বাংলাদেশে এই লঘু-গুরুর হিসেবটা এ বঙ্গদেশের মাপে এক্কেরে লুডোর গুটি - ছক্কা আর পুঁটের মাপজোখ : সেখানে পুজোর বদলে তাই ঈদসংখ্যা বেরোয়, তিনদিন ছুটি বরাদ্দ, সাথে টিভিতে বিশেষ অনুষ্ঠান এবং 'দ্য কাউন্টডাউন বিগিন্স' জাস্ট লাইক বঙ্গদেশের পুজো। কিন্তু তবুও ঈদ, দুর্গাপুজোর মতো 'সার্বজনীন' হয়ে উঠতে পারেনি ধর্মীয় বেড়াজালে অক্সিজেন লেভেল কমিয়ে। ... ...

পুজোয় ছুটি বেশি, ঈদে দুদিন ছুটি দিলেই তোষণ থিওরি চলে আসে। সরকার প্রতিমা বিসর্জন সংক্রান্ত দূষণ নিয়ে যতটা চিন্তিত, কুরবানিতে তেমন ব্যবস্থা নিলে অনেক অভিযোগের অবকাশ থাকে না। এইসব বহুকালের ব্যক্তিগত অভিযোগ স্বজাতি বাঙালীর কাছে, বাঙালী হিসেবে খানিক আত্মসমালোচনার। ঈদ নিয়ে মিডিয়ার হইচই নেই, বিজ্ঞাপনদাতাদের দাপাদাপি নেই, এমনকি জরুরী খবর ছেড়ে উৎসব কভার হয় না। যদিও সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের মধ্যে ভাইচারার জায়গাটা থাকে। মুসলমানরা পুজোয় অঞ্জলি দেন না ঠিকই, মুসলিমদের সহযোগিতাপূর্ণ অংশগ্রহণ নতুন কিছু নয়। অথচ দুঃখের বিষয় সেটিকে উপপাদ্য আকারে প্রমাণ করতে হয়। কখনো মন্ডপে টুপিওয়ালা কিশোরের ছবি, কিংবা মন্ডপের সামনে কর্মরত দাড়িওয়ালা মুসলমান বৃদ্ধের ছবি সহকারে বর্ণনা দিয়ে। নতুন করে প্রমান করার কিছু নেই! পশ্চিমবঙ্গের অনেক পুজোর কমিটিতে মুসলমানদের অংশগ্রহণ বহুকাল থেকেই। সারা পশ্চিমবাংলার পাশাপাশি মুসলিম প্রধান এলাকা গাডেনরিচ, মেটিয়াবুরুজ এলাকায় মুসলমানরাই পুজোর দায়িত্ব নেন। ... ...

ওই পাড়াতেই দেখা হয়ে গেল কোহিনূর বেগম, আয়েশা বিবি, সাবিনা বেগমের সঙ্গে। জাহাঙ্গীরের বন্ধু বিকাশ রায়ের স্ত্রী পূজার সঙ্গে সিঁদুর খেলবেন তাঁরা। প্রসাদের ফল কাটা থেকে শুরু করে বরণ— অন্য বছরগুলির মতো এ বারও সব কিছুই করবেন একসঙ্গে। ঠিক যেমন জাহাঙ্গীর, সালাউদ্দিন, আল আমিনদের সঙ্গে প্রতি বছর নিয়ম করে ঈদের সময় রোজা রাখেন বিকাশ। ... ...

হুমায়ুনপুরের ইতিহাস নিয়ে অনেক গল্প আছে। শোনা যায় ১৬৭৫ সালে রূপা রাম আর রতিয়া সিং টোকাস এই গ্রাম স্থাপন করেন। আরও একটি কাহিনী বলে ১৬৭৫ নয়, ১৬৮৩ সালে চৌধুরী দেবী সিং ফোগাট এই গ্রামের পত্তন করেন। আরেকটা গল্প আছে, সে তো আরও রোমাঞ্চকর — বাদশা ঔরঙ্গজেবের বিরুদ্ধে জাট বিদ্রোহের নায়ক গোকুলা জাট স্বয়ং নাকি এই গ্রামের পত্তন করেন! তবে এ নেহাতই কিম্বদন্তী, লড়াকু জাট নেতা গোকুলা দিল্লীতে তাঁর জীবদ্দশায় কোনোদিন পা রাখেননি। ইতিহাস বলছে যে শেষ পর্যন্ত ধরা পড়ার পরে আগ্রাতেই বাদশা ঔরঙ্গজেবের আদেশে তাঁকে হত্যা করা হয়। মূল ধারার ইতিহাসের বইয়ের পাতায় দিল্লী শহরের অলিগলির এ হেন লোকশ্রুতি-মিশ্রিত ইতিহাস কমই উঠে আসে। হুমায়ুনপুরের জমির মালিক আজও কিছু জাট পরিবার। নগরায়নের কবলে পড়ে এক এক করে তাঁদের জমি চলে গেছে সফদরজং এনক্লেভের দখলে — বড় বড় অট্টালিকা উঠেছে, দক্ষিণ দিল্লীর অভিজাত মানুষজনের ঠাঁই হয়েছে সেখানে। পাশে গড়ে উঠেছে আরকে খান্না টেনিস স্টেডিয়াম, হৌজ খাস ডিসট্রিক্ট পার্ক, হৌজ খাস ডিয়ার পার্ক, অভিজাত দিল্লীবাসী সেখানে হাওয়া খেতে আর শরীরচর্চা করতে আসেন। কখনো কখনো ইতিহাসপ্রেমী কেউ হয়তো চলে আসেন হুমায়ুনপুরের পুরাতন ঐতিহ্যের টানেও, হৌজ খাসে ঘুরতে ঘুরতে ডিয়ার পার্কের ভিতরে কালি গুমটি বা বাগ-এ-আলম গুম্বদটাও দেখে যান। এইসবের মাঝে হুমায়ুনপুর গ্রামের এঁদো গলি বড় বেমানান, যেন অন্য একটা জগৎ। সন্ধ্যাবেলা গেলে এখনো দেখতে পাবেন খাটিয়ায় বসে হুঁকো টানছেন বিশাল পাগড়ি পরা একেকজন প্রৌঢ় চৌধুরী। ... ...

'পেশোয়ারে যখন থেকে ছিলাম, তখন থেকেই আমি কমিউনিস্ট'।উনি উপলব্ধি করলেন আইপিটিএ র অধ্যায় উনি অনেক আগে ছেড়ে চলে এসেছেন।একবার ঘরে জ্বলতে থাকা টিউব লাইটটার দিকে তাকালেন।এই সময়ে আমি ওনার কাছে আরেকটু এগিয়ে এলাম যাতে ওনার কথা আরো পরিষ্কার ভাবে শুনতে পারি আর আমার রেকর্ডিং করার যন্ত্রটাতেও যাতে ভালোভাবে রেকর্ডিং করা যায়।ঘরের এয়ার কন্ডিশনের ঘড়ঘড় আওয়াজটা বিরক্তি উদ্রেক করছিল আমার।এই আওয়াজটার জন্যও ওনার কথা শুনতে অসুবিধা হচ্ছিল।কিন্তু সঙ্কোচের কারনে বলতে পারছিলাম না।কিছুটা আমার মনের কথা আন্দাজ করেই হয়ত উনি বলে উঠলেন 'এসিটা বন্ধ করে দেব'? হেসে না বললাম।উনি আবার শুরু করলেন। ... ...