আজ রাতে তৃতীয় ছায়া আমার সামনে দাঁড়িয়ে, তার মুখ অর্ধেক মোমবাতির আলোয়, অর্ধেক অন্ধকারে, তার হাতের আঙুলে একটি ছুরি ঘুরছে, সেই ছুরির ফলা থেকে বিন্দু বিন্দু রক্ত পড়ছে – কার রক্ত? জানি না, হয়তো তার নিজের, কারণ সে এতটাই হিসাবি যে নিজের মাংসও কেটে পরীক্ষা করে দেখে কতটা সহ্য করতে পারে।
তৃতীয় ছায়া বলে, আমার দিকে না, শূন্যে, যেন কেউ তাকে প্রশ্ন করছে, আর সে উত্তর দিচ্ছে – “হয়তো বনে যাবার আগে রাজপুত্র তার পুত্রকে হত্যা করবে। হয়তো সে তার পুত্রকে বন্দী করবে, অপমান করবে, ব্যবহার করবে অস্ত্র হিসেবে, সেই অস্ত্র দিয়ে আঘাত করবে আমাদের, তার শত্রুদের, তার প্রাসাদ দখলকারীদের। যদি সে তা করে, তাহলে আমাদের পরিকল্পনা ভেস্তে যাবে, কারণ পুত্রের রক্তে সে ফিরে আসবে, সিংহাসন দাবি করবে, তার অধিকার জানাবে, আর আমরা তখন কী করব? আমরা কি তাকে থামাতে পারব? আমরা কি তার ছুরি ঠেকাতে পারব? না, আমরা পারব না, কারণ ভাই ভাই রক্তের সম্পর্ক ছিন্ন করা যায় না, শুধু ক্ষত তৈরি করা যায়, আর সেই ক্ষত থেকে বেরোয় প্রতিশোধের আগুন, যা আমাদের সবাইকে পুড়িয়ে মারে।”
সে থামে, তার চোখ ঘোরে, তার জিভ ঠোঁট চাটে, যেন সে স্বাদ নিচ্ছে ভবিষ্যতের রক্তের, যে রক্ত হয়তো তার নিজের, হয়তো পুত্রের, হয়তোবা নির্বাসিত রাজপুত্রের। সে আবার বলে, “তাই আমাদের আগে থেকেই ব্যবস্থা করতে হবে। পুত্রকে সরিয়ে দিতে হবে, নিরাপদ জায়গায়, যেখানে তার কোনো কূট তাকে খুঁজে পাবে না, যেখানে তার ভ্রাতা তাকে হত্যা করতে পারবে না, যেখানে গূঢ় পুরুষ তাকে বন্দী করতে পারবে না। সেই জায়গা – মাতুলের গৃহ, যেখানে রাজার কোনো অধিকার নেই, যেখানে রাজার কোনো ক্ষমতা প্রবেশ করে না,মাতুল হলো রাজার চেয়েও বড়, মাতুল হলো রক্তের দ্বিতীয় সিংহাসন, যার ওপর বসে থাকে নিরাপত্তার প্রতীক।”
আমি হাসি। আমার হাসি দেয়ালে ধাক্কা খায়, ফিরে আসে, আবার ধাক্কা খায়, শেষে মিলিয়ে যায় কার্পেটের নরম বুননে। আমি ফিসফিস করি, কিন্তু তারা শোনে না, কারণ তারা ব্যস্ত তাদের পরিকল্পনায়, তাদের হিসাবে, তাদের পুত্র সরানোর ব্যবস্থায়। তারা জানে না আমি এখানে, আমি শুনছি, আমি দেখছি, আমি হিসাব করছি – পুত্রকে মামাবাড়ি পাঠানোর অর্থ কী? অর্থাৎ পুত্র বাঁচবে, পুত্র ফিরে আসবে, পুত্র দাবি করবে তার অধিকার, পুত্র হবে নতুন অস্ত্র, নতুন যুদ্ধ, নতুন রক্তপাত।
আমি তৃতীয় ছায়ার কাছে যাই, আমি তার পিছনে দাঁড়াই, আমার নিঃশ্বাস তার ঘাড়ে লাগে, সে চমকে ওঠে, ঘুরে তাকায়, কিন্তু দেখে না আমাকে, আমি অদৃশ্য, আমি ছায়ার ছায়া, সেই গন্ধ যা সে চেনে না, সেই স্পর্শ যা সে অনুভব করতে পারে না, শুধু তার মেরুদণ্ড বেয়ে একটি শীতল কম্পন চলে যায়, সে কাঁপে, কিন্তু বুঝতে পারে না কেন, সে আবার তার পরিকল্পনায় ডুবে যায়, তার পুত্র সরানোর তালিকা তৈরি করে, তার চিঠি লেখে ভ্রাতার উদ্দেশ্যে। হাতের লেখা কাঁপে, কিন্তু থামে না, কারণ থামলে ভয় পায়, থামলে তার মাথায় ঢুকে পড়ে প্রশ্ন – “যদি পুত্র মামাবাড়িতে গিয়েও নিরাপদ না হয়? যদি মামা তাকে হত্যা করে? যদি মামা তাকে ব্যবহার করে নিজের সিংহাসনের জন্য? তখন কী হবে? তখন আমরা কি আরেকটি পরিকল্পনা করব? আরেকটি পুত্র সরানোর ব্যবস্থা? সাথে আরো একজনের নির্বাসন? অন্য রানীর আরো এক পুত্র? ”
তৃতীয় ছায়া তার মুখে হাত দেয়, তার চোখের জল আটকাতে চায়, কিন্তু জল বেরোয়, গড়িয়ে পড়ে, চিঠির ওপর, কালি ছড়ায়, শব্দগুলো ভেজা হয়ে যায়, ঝাপসা হয়ে যায়, অর্থহীন হয়ে যায়। সে চিঠি ছিঁড়ে ফেলে, নতুন কাগজ নেয়, আবার লিখতে শুরু করে – “প্রিয় ভ্রাতা, এই পুত্রটি আমাদের কাছে বিপজ্জনক, কারণ তার ভ্রাতা নির্বাসিত হবে, তার ভ্রাতার আকাঙ্খীরা হয়তো তাকে ব্যবহার করবে আমাদের বিরুদ্ধে, তাই আমরা তাকে পাঠাচ্ছি আপনার কাছে, তাকে রাখবেন নিরাপদে, তাকে শেখাবেন আপনার রাজনীতি, আপনার যুদ্ধ, আপনার ধর্ম, কিন্তু তাকে এখন ফিরতে দেবেন না এই প্রাসাদে, কারণ ফিরলে সে হবে নতুন আগুন, নতুন ধ্বংস, নতুন রক্তপাত, যা আমরা চাই না, যা আমরা সহ্য করতে পারব না, তাই দয়া করে তাকে আটকে রাখুন, যতদিন না আমরা ব্যবস্থা করি, যতদিন না আমরা জানি তার পিতা মরে গেছে, তার ভ্রাতা চিরতরে বনে হারিয়ে গেছে, নাকি আমরা নিজেরাই তাকে শেষ করে দিয়েছি গোপনে, নিঃশব্দে, ছুরির আঘাতে, বিষের ফোঁটায়, বা শ্বাসরোধের দড়িতে।”
তার পুত্র এখনও এখানে, সেই পুত্র যে তার গর্ভে জন্মেছিল, তার গর্ভে অন্য পুরুষের বীজও মিশে আছে, তাই পুত্রটি কার? রাজার নিয়োজিত পুরুষের ? নাকি অন্য পুরুষের? কেউ জানে না, কেউ জানতে চায় না, কিন্তু তৃতীয় ছায়া জানে, কারণ ছায়ারা সব জানে, তারা দেয়ালের ফাটলে, মেঝের ফাঁকে, ছাদের কাঠের বুকে জমা থাকে, তারা শোনে প্রতিটি ফিসফিস, প্রতিটি চিৎকার, প্রতিটি স্তব্ধতা।
আমি চিঠি পড়ি, তার কাঁধের ওপর থেকে, আমার চোখের আলো অদৃশ্য, কিন্তু আমি দেখতে পাই প্রতিটি অক্ষর, প্রতিটি দাগ, প্রতিটি সংশোধন, আমি মনে করি – এই চিঠি পৌঁছাবে মামার কাছে, মামা পড়বে, মামা ভাববে, মামা সিদ্ধান্ত নেবে, কিন্তু মামা কি জানবে যে এই চিঠির পেছনে আমি আছি?
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।