এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • হঠাৎ সুনামি পর্ব ১

    Rashmita Das লেখকের গ্রাহক হোন
    ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ | ২৪৩ বার পঠিত | রেটিং ৩ (১ জন)
  • আকাশে লালচে আভাযুক্ত সূর্যাস্তের স্বর্ণালী দ্যুতি ছড়িয়ে পড়েছে।পাখিদের বাসায় ফেরার কিচিরমিচির উল্লাসে চারদিকের বাতাস মুখরিত হয়ে উঠেছে।ফুটপাতের লাগোয়া বটগাছটির ক্রোড়দেশে অঘোরে ঘুমিয়ে থাকা বিশ বর্ষীয়া তিয়াসা চোখ কচলে জেগে উঠল। প্রাথমিক ঘোরটা কাটতে না কাটতেই সে তার সর্বনাশটা বুঝতে পারল।জনবহুল ভীড়ের রাস্তার মধ্যে সে "মামি মামি...তুমি কোথায়..." বলে ডুকরে কেঁদে উঠল।সে তো হারিয়ে গেছে।এখন এই অচেনা জায়গাটাতে মামা বা মামি তাকে কেমন করে খুৃঁজে পাবে!তাহলে কি আর তার ঘরে ফেরা হবে না?প্রবল আতঙ্কে তার গলা বুঁজে এল।আস্তে আস্তে করে তার মনে পড়তে লাগল সব।গতকাল সন্ধ্যার পর থেকেই তো হঠাৎ করে তার মামা আর মামি হঠাৎ কেমন ভালো হয়ে গিয়েছিলেন।বাবা মা অ্যাক্সিডেন্টে মারা যাওয়ার পর আজ মাস সাত কি আট হবে,সে মামা মামির কাছেই রয়েছে।মামির কাছে এত আদর আর যত্ন সে কোনোদিনও পায়নি।এমনকি তার জন্য মামি যখন এই নতুন সুন্দর লাল পোশাকটা কিনে আনলেন কোনো উপলক্ষ ছাড়াই,তখন মামাতো বোন হিংসা করায় মামি তাকে দু ঘা দিয়েছিলেন।দিদির সাথে সে আর কোনো খারাপ ব্যবহার করবে না,ব্যঙ্গ বিদ্রুপ করবে না এই কথা দিয়ে তবে সে রেহাই পেয়েছিল।তিয়াসার মনে জ্বলে উঠেছিল খুশির রোশনাই।বাবা মা মরার এতদিন বাদে হলেও যা হোক...তাকে আর মামা মামির অত্যাচার আর মারধোর সইতে হবে না।তার ওপর কাল রাতে শুতে যাবার সময় মামিমা যখন বলে গেলেন,তার যতগুলো জামা ছিঁড়ে গেছে ততগুলো জামা ই তাকে নিয়ে শপিং মলে গিয়ে নিজে কিনে দেবেন,তখন তার খুুশি যেন ধরছিল না।সে আজ সক্কাল সক্কাল ঘুম থেকে উঠে চেষ্টা করল নিজে নিজে দাঁত ব্রাশ করতে।মা চলে যাবার পর এইসব নিত্যনৈমিত্তিক কাজ নিজে নিজে সারতে তার ভীষণ সমস্যা হত।মামি তো একটু সাহায্য করা দুর...ঘরের মেঝেতে তার লালা ঝরছে দেখেই মেরে মেরে আধমরা করে দিতেন।মামাতো বোন তিতির তখন খিলখিল করে হাসত।আজ মামি নিজে হাতে তাকে ব্রাশ করিয়ে,ভালো করে সাবান আর শ্যাম্পু সহযোগে স্নান করিয়ে নিজে হাতে করে ব্রেকফাস্টে বানানো চাউমিন খাইয়ে নতুন জামাখানি পরিয়ে ওকে পরীর মতো সাজিয়ে তৈরি করে গাড়িতে বসিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল শপিং মলে তার জন্য নতুন জামাকাপড় কিনতে।গাড়িতে যেতে যেতে হঠাৎ গাড়ি থামিয়ে মামি ওকে এই গাছতলায় বসিয়ে একটা বোতলের থেকে একটু শরবোত খেতে বললেন।মামির কথা শুনে ঢকঢক করে সুস্বাদু মিষ্টি আমের শরবতটা খেয়ে নিল তিয়াসা।তারপর মামি বললেন,তুই এখানে লক্ষী হয়ে বোস,আমি গাড়িটা একটু পার্ক করিয়ে আসছি।কাছেই শপিং মল।অবোধ তিয়াসা হাসিমুখে বলেছিল,আচ্ছা মামি।তারপর সে ব্যাগ থেকে পুতুলখানা বার করে খেলতে খেলতে হঠাৎ কেমন তার দুচোখ জুড়ে ঘুম নেমে এল।তারপর তার আর কিছু মনে নেই।এখন সন্ধ্যে গড়িয়ে অন্ধকার নামছে।সে এখন মামার বাড়িতে কেমন করে ফিরবে!কোনো বড় নাম অথবা ঠিকানা সে কিছুতেই মনে রাখতে পারে না।চারপাশে প্রচুর লোকজন চলাফেরা করছে তার সামনে দিয়ে।মা বলতেন,অচেনা লোকের সাথে কখ্খোনো কথা বলতে নেই।কিন্তু এখন তো রাত নেমে আসছে।কাউকে যদি সে ডেকে অনুরোধ করে তার মামার বাড়িতে তাকে যেন একটু পৌঁছে দেয়,তাহলেও তো লাভ নেই কারণ সে মামার বাড়ির ঠিকানা আদ্যোপান্ত ভুলে বসে আছে।অবশ্য ঠিকানা যে ঠিক কিভাবে কাজে লাগে সেটাও তো সে জানে না।তার মনে হল,ঠিকানা না বলতে পারলে মামার বাড়ি তাকে কেউ কি পৌঁছে দিতে পারবে না?একবার চেষ্টা করেই দেখা যাক...
    সে ফুঁপিয়ে লাল হয়ে থাকা চোখদুটো দুহাত দিয়ে ভালো করে মুছে নিয়ে তাকাল সামনের দিকে।সামনে একটা পান সিগারেটের দোকান থেকে এক ভদ্রলোক সিগারেটের প্যাকেট কিনছে।সে কান্নাভেজা গলায় জড়ানো উচ্চারণে বলে উঠল,"এই লোকটা...একটু এদিকে শোনো..."
    কোনো সাড়াশব্দ পেল না।আচ্ছা ঝামেলা তো...সে গুটিগুটি গাছতলা উঠে দু পা এগিয়ে এসে ভদ্রলোকের কনুই ধরে ঝাঁকাল।চমকে গিয়ে অফিস ফেরত রাতুল তাকাল পিছন দিকে।একটা জড়বুদ্ধি হাবা গোছের তরুণী মেয়ে একটা করুণ আকুতিপূর্ণ চোখে তাকিয়ে আছে তার দিকে।জামাকাপড় দেখে তো ভিখারী বলে মনে হচ্ছে না।নিশ্চয়ই বাড়ির লোকেদের থেকে কোনোভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।রাতুল কিছু বলতে যাবে এমন সময় তিয়াসা কাতর কন্ঠে সজোরে বলে উঠল..."এই লোকটা...আমি হারিয়ে গেছি গো...আমায় একটু ঘরে পৌঁছে দাও না..."
    রাতুল বুঝল তার আন্দাজ ভুল নয়।সে শুধালো...তোমার বাড়ি কোথায়?আমায় তোমার বাবা মায়ের নাম্বার দাও আমি চেষ্টা করছি তোমাকে তোমার বাড়ি পৌঁছে দিতে।তিয়াসা শশব্যস্ত কন্ঠে বলল,"বাবা মা তো আকাশে তারা হয়ে গেছে।তুমি আমায় মামার বাড়ি পৌঁছে দাও না...ওই যে গোলাপী রংএর তিনতলা বাড়িখানা..."
    রাতুল মৃদু হেসে বলল,"বাড়ির রং নয়,তুমি আমায় তোমার মামার বাড়ির ঠিকানা টা বলো।"
    তিয়াসা মাথা চুলকাতে লাগল তীব্র উৎকন্ঠায়।আমতা আমতা করে বলল,"ওই যে ব্যাচারামদার দোকানের পাশ দিয়ে গলি।তিনতলা বাড়ির ছাদে কত্তগুলো ফুলের টব আছে...ওই বাড়িখানা..."ফোঁপাতে লাগল তিয়াসা।ওই বাড়িতেই জানোয়ারের মতো ব্যবহার পেয়েছে তিয়াসা।ওই বাড়িতে ফিরে যাওয়ার চাইতে তার কাছে হয়তো চিরকালের জন্য হারিয়ে যাওয়াটাই ভালো।কিন্তু এখন তার পেট ক্ষিদেয় কাতরাচ্ছে।জড়বুদ্ধি হাবা হলেও কোনো অচেনা মানুষকে সে কখনোই মুখ ফুটে সে কথা বলতে পারছে না লজ্জায়।সেই যন্ত্রণাটাই কান্না হয়ে বেরিয়ে আসছে।রাতুলেরও সেটা বুঝতে খুব বেশি বেগ পেতে হল না।সাথে সে এটাও বুঝতে পারল যে এই অবোধ নারীর পক্ষে নিজের থাকার জায়গার সঠিক ঠিকানা বলতে পারা এক কথায় অসম্ভব। সে সহানুভূতিপূর্ণ কন্ঠে তিয়াসা কে শুধালো,তোমার খুব ক্ষিদে পেয়েছে তাই না?
    চাতকের দৃষ্টিতে তাকালো তিয়াসা রাতুলের চোখের দিকে।রাতুল কোমল কন্ঠে বলল,এসো আমার সাথে।
    রাতুল তিয়াসাকে একটা রেস্টুরেন্টে নিয়ে গেল।পেট ভরে তাকে মাছ ভাত খাওয়াল।রাতুল ভেবেছিল খাওয়া শেষে  মেয়েটাকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে কথা বলে বলে চেষ্টা করবে যদি কোনোভাবে তার বাড়ির ঠিকানা টা বেরিয়ে আসে...।কিন্তু খাওয়ার সময় যখন তিয়াসা ভাত সব্জি ঝালঝোল সবকিছু সারা মুখমন্ডলে আর সমস্ত জামাকাপড়ে ফেলে মাখিয়ে একশা করল আর শিশুর মতো অস্ফুটে রাতুলের কাছে তার মাছ বেছে দেবার জন্য দাবী জানাল, তখন রাতুল ঠিকানা জানতে পারার আশা পরিপূর্ণভাবে ত্যাগ করল এবং বুঝতে পারল,সর্বশরীরে যৌবন বিকশিত এই অবোধ মেয়েটিকে রাস্তায় একটু বেশিরাতে একা পেলে তো সব নিশাচর নরপিশাচেরা একেবারে ছিঁড়েখুঁড়ে খাবে।সে কোনোভাবে তখনকার মতো পকেট থেকে রুমাল বার করে মায়ের মতো তার মুখ হাত মুছিয়ে যতটা সম্ভব পরিষ্কার করে নিজের হাতে মাছের কাঁটা বেছে খাইয়ে দিল।তারপর তিয়াসাকে শুধালো,"তুমি আমার সাথে আমার বাড়িতে যাবে?"
    পেট ভরে খেয়ে পরিতৃপ্ত তিয়াসা হাসিমুখে জবাব জানাল,"হ্যাঁ অ্যা অ্যা যাব"।


     
     
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। পড়তে পড়তে মতামত দিন