এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  ধারাবাহিক  ভ্রমণ

  • দানিয়ুব ও দ্বিচক্রযান

    sumana sengupta লেখকের গ্রাহক হোন
    ধারাবাহিক | ভ্রমণ | ৩০ ডিসেম্বর ২০২৩ | ৩৪২ বার পঠিত
  • চতুর্থ দিন অবশেষে সত্যি সত্যি সাইকেল নিয়ে বেরোলাম দানিয়ুবের কিনারা বরাবর। একদম এসেনসিয়াল কিছু জিনিস সাইকেলের সাইডস্যাকে যাবে। বাকিসব লাগেজপত্র আলাদা ট্রান্সপোর্টে গন্তব্যে পৌঁছে যাবে। ভিয়েনা শহর থেকে বেরিয়ে  "কীপ টু রাইট" জপতে জপতে এসে পৌঁছলাম দানিয়ুবের কিনারায়। দূরের রঙিন জেটি, ঘাস জমির ঢালু কিনারা,নীল আকাশের ছায়াবিম্বিত নদীর বুকে গরবী রাজহাঁসের ঝাক,  চোখ জুড়িয়ে গেল। বিদেশের সঙ্গে তুলনা করে নিজের দেশকে ছোট করার ভিকিরিপনা আমি দুচক্ষে  দেখতে পারি না, তবু ভীষণ মন খারাপ হয়ে যায় আমাদের নদীমাতৃক দেশের সর্বঙসহা জীববৎসলা নদীদের মনে করে। এমন জগজ্জননী ত্রিভুবনপালিনী নদী আমাদের, কিন্তু কি অবহেলিত দূষণপঙ্কিল জলধারা!
    দানিয়ুবের ধার ঘেঁষে রওনা দিলাম সদলবলে। সরু পিচের রাস্তা, ডানদিকে দানিয়ুবের স্বচ্ছ কালো জল, নীচের কালচে সবুজ নুড়িপাথর অবদি পষ্ট দেখা যাচ্ছে, বামদিকে জমি ঢালু হয়ে নেমে গেছে, তারপর কোথাও বা চওড়া রাস্তা, কোথাও গুলে গুলশান লতাবিতান, মধ্যে মধ্যে জলের বোতল ভরে নেওয়ার জন্য টিউব ওয়েল, গোল করে পাথরে বাঁধানো বসার জায়গা। লম্বা লম্বা ঘাসের ডগায় কুট্টি কুট্টি ফুল ফুটে রয়েছে। ঘন নীল আকাশ জুড়ে কিউমুলোনিম্বাস মেঘের জটলা। পিচ রাস্তা ধরে একজন একজন করে লাইন দিয়ে সাইকেল চালাচ্ছি,সবার সামনে টুর অপারেটর ধীরজ, আর সবার শেষে undisputed leader জয়দীপদা। আমি লাইনের একদম শেষের দিকে, কোনো রকম বেচাল করলেই দাদা র কাছে বাঙলায় বকুনি খাচ্ছি। পুরো লাইন জুড়ে মোবাইল ক্যামেরা হাতে আগে পিছে চলাচল করছেন সৌরভ মালব্য, লাগাতার ভিডিওগ্রাফির সঙ্গে রানিঙ কমেন্ট্রি। আমাদের সফরসঙ্গী সৌরভ আর নীতু ইন্দোর শহরের সুপ্রতিষ্ঠিত ডাক্তার দম্পতি, মিয়া রিউম্যাটোলজিস্ট, বিবি অ্যানাস্থেটিস্ট। দুজনেই ভারী অমায়িক, সুদর্শন, পরোপকারী এবং রোজ ম্যাচিং রঙের পোশাকের কল্যাণে রীতিমত মূর্তিমান রিলেশনশিপ গোল। 
    ঘণ্টা খানেক সাইক্লিং করার পর বামহাতে বাক নিতে গিয়ে বোঝা গেল দলের অর্ধেক অলরেডি ৬ কিলোমিটার এগিয়ে চলে গেছে। নদীর ধারে এলোমেলো ছবি তুলতে তুলতে অপেক্ষা করছি, এমন সময়ে হুড়মুড় করে বৃষ্টি নামল। আমরা সব ছাগলছানার মতো দৌড়ে গিয়ে গাছপালার নীচে আশ্রয় নিলাম। পনের মিনিটের বৃষ্টিতে কাক ভেজা হয়ে গেলাম। বৃষ্টি থামার সঙ্গে সঙ্গে পথঘাট গাছপালা থেকে ধোঁয়া উঠতে শুরু করল যেন গরম ভাত। 
    বাকি দল যখন ভিজে চুপ্পুস হয়ে ফেরত এল আমরা নিরিবিলি  ক্ষেতখামারের ভিতর  দিয়ে গগনচুম্বী উইন্ডমিলের ছায়া পেরিয়ে গেলাম এক ছবির মতন সরাইখানায় পিকনিক লাঞ্চ করতে। তারপর আবার চরৈবেতি। দুধারে ঘন গাছপালার ফাকে ফাকে ছবির মতন ছোটো ছোটো গ্রাম, পথে দেখা পাচ্ছি অন্যান্য সাইক্লিস্ট দের। একজন, দুজন, তিনজন, কখনো বা পুরো ফ্যামিলি কুকুর বিড়াল সমেত পেডাল করে চলেছে এক শহর থেকে অন্য শহরে। এমনই করে সত্তর কিলোমিটার সাইকেল চালিয়ে আমাদের গন্তব্য বাড অল্টেনবুর্গ। পথে পড়লো  ডোনা-অরেন রিজার্ভড ফরেস্ট। হ্যাবসবুর্গ হাণ্টিঙ গ্রাউন্ড হিসাবে বিশেষ ভাবে সঙরক্ষিত এই জঙ্গলের ভিতরে আছে হিস্টোরিকালী ইম্পরট্যান্ট একার্ৎস হান্টিং লজ। রিপারিয়ান বনের ভেতর দিয়ে নুড়িপাথরের রাস্তার উপরে চিলিবিলি  রোদ্দুর এসে পড়েছে, সবুজে সোনালীতে বাদামিতে নীলে এমন আশ্চর্য আলপনা ছড়িয়ে আছে জমিনে আসমানে, মনে হচ্ছে যেন কোনো এক প্রবাদপ্রতিম ইম্প্রেশনিস্ট পেইন্টিং এর মধ্যে সাইকেল সমেত ঢুকে পড়লাম। 
    বনজঙ্গলের ভেতর দিয়ে যেতে যেতে সাইকেল বাহিনী থামল এক রঙিন ফুলের ফোয়ারা ফোটানো ফুটফুটে হলুদ ম্যানর হাউসের সামনে। ছোট্ট রেস্ট আর বাথরুম ব্রেক। বাগানের কোণে সাইকেল রেখে ভিতরে ঢুকে ইতিউতি চাইতে চমকে গেলাম। দেওয়ালে সিড়ি তে চতুর্দিকে অসঙখ্য স্টাফড পশুপাখি  টাঙানো, গা শিরশির করে উঠল। সিড়ি র নীচে আবার অপরূপ ম্যুরালে সাজানো এক কামরার এক ভারী নয়ন মোহন চ্যাপেল।এ কোথায় এলাম? 
     গুগলের কাছে উত্তর পেয়ে আরো স্তম্ভিত হয়ে গেলাম।এই হল একার্ৎস হান্টিং লজ, এককালে এটি ছিল এক নিছক পরিখা ঘেরা কাস্ল, তবে পরবর্তী কালে হ্যাবসবুর্গদের অন্যতম প্রিয় শিকারগৃহ হিসাবে ব্যবহৃত হত। তবে বিরাট পার্কল্যাণ্ডের ভিতর ফুলের বাগানে সাজানো সযত্নে সঙরক্ষিত এই লজটি ইতিহাসের পাতায় অমর হয়ে আছে শেষ হ্যাবসবুর্গ সম্রাটের অন্তিম বাসস্থান হিসাবে। এই লজের স্টাডিতেই শেষ সম্রাট প্রথম চার্লস অস্ট্রিয়ার গণতান্ত্রিক সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। জীবৎকালে abdicate করতে অস্বীকার করা গর্বোদ্ধত শেষ সম্রাট কি ভেবেছিলেন তার অন্তিম রাজপ্রাসাদে শেষে দেশবিদেশের অর্বাচীন সাইক্লিস্ট রা বাথরুম ব্রেক নিতে আসবে? 
    একার্ৎস থেকে বেরিয়ে চলতে চলতে এক ছোট গ্রামের ছোট নদীর ছোট কাঠের ব্রিজের উপর ফুলকারির ছবি নিতে গিয়ে আবার দলছুট হয়ে পড়লাম। কেউ কোথাও নেই, ফোনে ও কাউকে পাওয়া যাচ্ছে না, গ্রামের লোকজন অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখছে একা বোকা সাইক্লিস্টকে। সাইকেল নিয়ে একটা গাছের নিচে চুপচাপ বসে পড়লাম লিটল মিস মাফএটের মতন। কেউ না কেউ ঠিক ই খেয়াল করে খুজতে আসবে। অন্য লোকের কাণ্ড জ্ঞানের ভরসাতেই তো গোটা জীবনটা কাটাচ্ছি। দু মিনিট পরেই অবশ্য  দেখা পাওয়া গেল আমাদেরই দলের rear end সঙ্গে। ঘড়ি ঘড়ি হারিয়ে যাবার অপবাদের হাত থেকে রক্ষা পেতে এমন ভাব দেখালাম যেন সাধ করেই একটু রেস্ট নিচ্ছিলাম। 
    আমাদের রাতের ঠিকানা দানিয়ুবের তীরে ছোট্ট স্পা ভিলেজ বাড অল্টেনবুর্গ। ছবির মতন সাজানো গ্রাম, ছোটবেলায় পড়া রাশিয়ান ম্যাগাজিনের পাতা থেকে যেন কেউ হুবহু কপি করে এনেছে। বিকেল ছটার নরম গোলাপি আলোয় বাগান ঘেরা ছোট্ট ছোট্ট ঘরবাড়ি, লম্বা লম্বা গাছের ছায়ায় মোড়া পিচ রাস্তা, বাদামি রঙের খেলনাবাড়ির মতন সিটি হল, সবাই যেন অলরেডি আধঘুমে। আমরা রাত কাটাবো এক ছিমছাম মম অ্যান্ড পপ হোটেলে। পৌছে দেখি লাগেজপত্র সব উপস্থিত।ডিনার করে নদীর ধারে গেলাম সকলে মিলে, সন্ধের  আকাশে তখন অন্ধকারে মিলিয়ে যাচ্ছে শেষ অস্তরাগ। ভীষণ গান গাইতে ইচ্ছে করছিল। কিন্তু সভ্যভব্য ইউরোপীয়ানরা নাকি রাত আটটায় এরকম ভূতের কীর্তন শুনলে দলে দলে মুচ্ছো যাবে তাই মনের সাধ মনেই চেপে রেখে হোটেলে এসে ঘুম দিলাম। বাইরে তখন কৃষ্ণাষ্টমী চাদের মিহিন আলোয় জগৎসঙসার নিবিড় নিদ্রালীন।
     
    ও হঙসিনী

     
     
    জলে হারিয়েছে কারু সোনা কি

     
    দানিয়ুব

     
    যেতে যেতে পথে

     
     
    বর্ষণ বন্দিশ

     
     
    Scloss Eckartsau hunting lodge

     
    Stuffed and strung

     
     
    Chapen in Scloss Eckartsau

     
    No, not by Monet

     
    After the sunset

     
    Bad-Altenbourg

     
    ছোট গায়ে ছোট ছোট ঘর

     
    Good night

    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • ধারাবাহিক | ৩০ ডিসেম্বর ২০২৩ | ৩৪২ বার পঠিত
  • আরও পড়ুন
    ** - sumana sengupta
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। লাজুক না হয়ে প্রতিক্রিয়া দিন