এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  কাব্য

  • দেবতার নির্বাসন  

    Tanima Hazra লেখকের গ্রাহক হোন
    কাব্য | ০১ আগস্ট ২০২৩ | ৬০৬ বার পঠিত
  • সুসজ্জিত ফ্ল্যাটটিতে আজ
    কেমন যেন 
    গুমসুম ভাব, 

    ছেলেটি ছেলের ঘরে, 
    মেয়েটি মেয়ের ঘরে, 
    দুজনেই প্রাপ্তবয়স্ক, 
    তাদের আচরণে উষ্মা স্পষ্ট। 

    তাদের ডিভোর্সি মায়ের ঘরে আজ একজন পুরুষ  এসেছে, 
    পুরুষটি প্রেমিক কিনা মা'টি জানে না এখনো। 

    শুধু জানে মানুষটি তারই মতো একা, ক্লান্ত, সারাবেলা রোদে পুড়ে
    তারই মতন অবসন্ন,
    এতদূর হেঁটে  এসে একটু জল চায়,ছায়া চায়। 

    মানুষটি সোফায় বসে, কুন্ঠিত, 
    একটি পত্রিকা হাতে স্বাভাবিক হবার চেষ্টায় ব্যস্ত, 
    মা'টি রান্নাঘরে, কুটকাট, কুটকাট কিছু রান্নায়, 

    খুশি সে, কিন্তু অতিরিক্ত খুশি দেখানো চলবে না, পাছে ছেলেমেয়েরা প্রগলভ ভাবে, 
    পাছে এতে করে ছেলেমেয়েদের সাথে দূরত্ব তৈরি হয়ে যায়, 
    আহা! হৃদয়ের আঁকড় দুটি, 
    নাড়িছেঁড়া ধন, 

    পাছে তাদের মনে ব্যথা লাগে, 
    মা কে যে তারা বিন্দুমাত্র অযত্ন করেনি কখনোই, 
    উপরন্তু, রাজসাজে সাজিয়ে 
    দেবী বানিয়ে রেখেছে এতদিন, 
    মনের ভাবলেশহীন, শরীরের ক্ষিদেহীন এক পাথরের মূর্তি, 
    যে শুধু দেবে, 
    চাইবে না কিছু, নিজের জন্যে, 
    এমন মহৎ সাজে তাকে কীই যে অসামান্য মানায়, মুগ্ধ হয়ে থাকে সবাই সেই মূর্তির দিকে, 
    এমন দেবীর পবিত্র মূর্তির থেকে চোখ ফেরানো দায়।  

    আহা! দেবীটি আমাদের আজ বড় আস্পর্ধা ভরে এক প্রেমিক চেয়েছে,  শেষ বেলাকার ঘাটে বসে মনকথা কইবার এক বন্ধু চেয়েছে,  

    অত্যাচারী স্বামীর হাত থেকে আইনত মুক্তির পরে, এক উদার পুরুষ চেয়েছে, বাকিটি জীবনের জন্যে, 

    পুরুষের ঔদার্য কতটা সীমাবদ্ধ সে জানে না, 
     এমন স্বপ্নের মতন চাওয়া পাবে কি পাবে না তাও সে জানে না, তবুও চেয়েছে, 
    তবুও খেলতে চেয়েছে শেষ জুয়া 
    কাঁড়া আকাঁড়া সবটুকু বাজি রেখে, 
    সমস্ত দায় দায়িত্ব ভার মেটাবার শেষে একটা নিশ্চিন্ত ঘুম চেয়েছে প্রিয়তম কারো বুকে মাথা রেখে।

    সেই দেবী কুটকাট খুন্তি নাড়ে রান্নাঘরে, চা বানিয়ে এনে সসংকোচে টেবিলে নামায়, দ্বিধাগ্রস্ত পুরুষটির সামনে, 
    কি অদ্ভুত মায়াভরা চোখে যে চায় তার দিকে! 

    যা চায়,
     পাবে কি পাবে না সে জানে না, তবুও সে চায়, বড় 
    দ্ব্যর্থহীন ভাষায়, 

    চাওয়া তার অভ্যাস নয়, 
    তার মজ্জাগত অভ্যাস শুধু দিয়ে যাওয়া,  
    এতদিন এমনটাই তার কাছ থেকে দেখে এসেছে সবাই, 
    আজ অমন করে চায় কেন তবে, 
    মরণখাকি ওই নির্লজ্জ মেয়ে!

    এ কোন পুরুষ, এতদূর হেঁটে এলো তার জন্য, গায়ে যার ঝড়ের সংকেত, চরণে ভাঙনের কুচকাওয়াজ। 

    পুরুষটিরও একটি ছেলে আছে, 
    ভরসা করে আনতে পারেনি তাকে, দূরদেশে ছাত্রাবাসে সে থাকে, মাতৃহারা ছেলে, সেও হয়ত রুষ্ট হবে এমন উটকো খবর পেলে, 

    সেও হয়তো তার বাবাকে এক পাথরের দেবতাই ভাবে, 
    রক্তহীন, মাংসহীন, শরীরের ক্ষিদেহীন, কর্তব্যে ধীর স্থির  নির্লিপ্ত শ্রমিক, 
    গতি যার মার্জিত পরিশীলিত রুটিনমাফিক জীবনের প্রতি। 
    রুষ্ট নয় কিছুতেই, পদস্খলন নেই রিপুময়তার প্রতি, সর্বতো তুষ্ট থাকাই যাকে মানায়। 
    অভিষ্ট দেবতা যেমন তৃপ্ত দৈনিক ফুল ও বেলপাতায়, 

    সেই বিপত্নীক ঝড় ঝাপটায় এলোমেলো পুরুষ নারীটির দিকে সলজ্জে তাকায়, নামিয়ে নেয় চোখ অপরাধীর মতো,  যেন বড় বেশি কিছু চেয়ে ফেলেছে সে নিজের জন্য এক প্রকাণ্ড  স্বার্থপর লোভে। 

    চায়ের পাত্রে দেয় দীর্ঘ চুমুক, 
    যেন কতদিন পরে এক স্নেহজ্বর আবিষ্ট করেছে তার বরফ শরীর। 
    একটি একটি চুমুকে বরফের গিঁট খুলে যায়, সে অপ্রতিভ মুখে সেই  হড়কা বান সামলায় -

    আজ এই অপরাহ্ণবেলায়,
     একটি  দেবী ও একটি দেবতা মানুষ হবার লোভে,
      বড় সসংকোচে মুখোমুখি বসেছে, 

    তারা টের পাচ্ছে, 
    সন্তান মুখের ওপরে 
    সশব্দে দোর দিয়ে দিচ্ছে,
    রাগতস্বরে কেড়ে নিচ্ছে তাদের সামনে থেকে এতদিনকার দেওয়া নৈবেদ্যের প্রাত্যহিক  নকুলদানা আর গাঁদাফুল, 

    সমাজ তাদের বলছে, ইস! বুড়ো বয়সে কত্ত রস, 

    আত্মীয় স্বজন বা বন্ধু বলে যাদের ভেবেছিল এতদিন, তারা ডাকযোগে পাঠাচ্ছে দলা দলা থুতু, 

    গোধূলি লগ্নে তারা হাত ধরলো যখন পরস্পরের, 

    তখন সেইসব সুপ্রাচীন দেবতার দেউল ভেঙে পড়লো ঝনঝন করে,  

    ধ্বংসাবশেষ ফুঁড়ে পাথরের মূর্তি ফাটিয়ে  বেরিয়ে এলো খাঁটি দুটি রক্তমাংসের মানুষ, 
    ধমনীতে  রক্তচলাচল, ভরপেট ক্ষিদে -

    যারা এতো এতো কাঁড়ি কাঁড়ি  ফুল আর বেলপাতা চায়নি কোনোদিন , 

    কেবলমাত্র সামান্য সম্ভ্রম আর শ্রদ্ধাই  তো চেয়েছে তাদের নিতান্ত ব্যক্তিগত একটি
    স্বাভাবিক  সিদ্ধান্তের প্রতি।। ত নি মা।।

    #উৎসর্গ
    #সেইসবসাহসীমানুষদেরপ্রতিযারাদেবত্বথেকেমুক্তিচান
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • কাব্য | ০১ আগস্ট ২০২৩ | ৬০৬ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। না ঘাবড়ে প্রতিক্রিয়া দিন