এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  গপ্পো

  • এক বাক্স সিনেমা

    মোহাম্মদ কাজী মামুন লেখকের গ্রাহক হোন
    গপ্পো | ০২ এপ্রিল ২০২৩ | ৪৮৩ বার পঠিত | রেটিং ৪ (১ জন)
  • মেদহীন সিএনজিটা দূর থেকে দেখে লোভাতুর হয়ে উঠল, আধ ঘন্টার উপর দাঁড়িয়ে আছে। এই রাস্তার মোড়টা এমন রহস্যময়, শূন্য রাস্তাতেও লেগে থাকে অলৌকিক ভীড়, সে হাত এতটা বাড়িয়ে ধরল যেন মুঠি ধরে সিএনজির শেকলটা এক টানে পায়ের কাছে এনে ফেলতে পারে। কিন্তু চালক তোয়াক্কাই করল না, বা হয়ত অনুভব করল না সেই টান, ছায়াছবির মত উধাও হল নিমেষেই।

    আজ মনটা ভারহীন - কারো কোন অনুযোগের কারণ সে হয়নি, কেউ আশাহতও করেনি, নির্মম হয়নি তার উপর। যা যা করতে চেয়েছে, মোটের উপর করতে পেরেছে। বাতাস তার শার্টে ঢেউ খেলে যাচ্ছিল, পৃথিবীর সব কিছুর প্রতি কৃতজ্ঞতা থেকে সে ক্রমশ ওজন হারাচ্ছিল, সবাইকে ক্ষমা করতে ইচ্ছে করছিল। সে এমনই থাকবে সমস্তটা সময় যে সবাই তাকে ভালবাসবে!
    মোরসালিনের চোখ ক্রমশ ঈগল  হচ্ছিল ধুলোর ভিড়ে - বাসের কোণে, মানুষের ভীড়ে, সড়কের পাড়ে পাড়ে, ঘুপচিতে – সর্বত্র খুঁজে ফিরছিল সবুজ ফিতেয় মোড়া এক টুকরো স্টেইনলেস। হঠাৎ রকেট গতিতে ধেয়ে আসা একটি সিএনজি এক রকম তার মুখের উপরই ব্রেক কষল। চালকটি নেশাগ্রস্তের মত, গন্তব্য ভাল করে না শুনেই বললো, ‘ওঠেন’। সে যেন শুধু মোরসালিনকে বহন করতেই বহু দূরের পথ পাড়ি দিয়ে এসেছে; যেতে প্রস্তুত যেকোন ভাড়ায়, যেকোন শর্তে। সিএনজির এই বন্দরে কেউ কাউকে দয়া করে না। যাত্রীসেবা বা চালক পারিশ্রমিক - সবই ঘোরে নিয়তির অমোঘ টানে।

    সিএনজির ভেতরটায় অসহনীয় গরম, তার মাঝেই ধ্যানমগ্ন মোরসালিন। কেন জানি, বাসায় ফেরার ভাবনাটাও বের হয়ে গেছে। অফিস, বাসা, এই জীবন - সব কিছু কেমন অর্থহীন ঠেকে! মগ্ন হয়ে পড়ে দু ধারের দুই আয়নায় ধরা জীবন প্রবাহে। গাড়ির পাল ছুটছে স্বনির্ধারিত বেগে - কই যাচ্ছে সবাই এত রাতে? দূরে এবং আরও দূরের দালানগুলো কেমন দাঁড়িয়ে আছে হা করে, কত মানুষের বিন্দু বিন্দু চিত্র ফুটে উঠছে সেখানে। আচ্ছা, এই মুহুর্তে প্রতিটা মানুষই তো কিছু না কিছু করছে! আমেরিকান প্রেসিডেন্ট বিডেন কি করছে এই মুহুর্তে? বিশ্বের বিশালত্ব তাকে কেমন উদাস, ক্ষুদ্র করে তোলে!

    সিএনজিটা হঠাৎ ভীষণ দুলে ওঠে। নেশাগ্রস্ত চালকটি হঠাৎ গতি বাড়িয়ে সামনের বিশালকায় বাসটি টপকে যেতে চেয়েছিল। ক্ষুদে সিএনজির কাছে হারতে রাজী ছিল না বাসটির অধিকতর মাতাল চালক, মোরসালিনের কানের পাশ দিয়ে বিপুল বেগে ও শব্দে বিষ্ফোরিত হতে হতে সে বজায় রাখলো তার শৌর্যবীর্য। প্রায় পিষেই গিয়েছিল মোরসালিন। রাস্তা ও তার মানুষগুলি ক্ষণিকের এই ক্লাইমেক্স অবশ্য একদম খেয়াল করতে চায়নি, এতটুকু রূপান্তর নেই তাদের চরিত্র চিত্রনে। সিএনজিটা এগিয়ে যাচ্ছিল, তেজ খুইয়েছে যদিও অনেকখানি। ওদিকে ধীরে ধীরে চোখ মেলতে শুরু করেছে মোরসালিন, তার সামনে পড়ে রয়েছে উল্টানো, নাড়িভুড়ি বেরিয়ে থাকা একটি সিএনজি, সেখান থেকে উঁকি দিচ্ছে থ্যাতলানো মানব মাংসপিন্ড। মুহুর্তেই জনসভার ভীড় লেগে যায় স্পট-টিতে, পেছনে শয়ে শয়ে গাড়ির ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে যায়। কয়েক ঘন্টার নিশ্চিত বিরতি রাস্তাটির।

    কাঁপতে কাঁপতেই ছায়াছবির অনেক গভীরে ঢুকে পড়ে মোরসালিন। উৎসুক, বিপর্যস্ত যাত্রীদের চোখে জিজ্ঞাসা, সুস্থ-স্বাভাবিক শহরে কেন এই জ্যাম? উল্টো দিক থেকে আসা কোন গাড়িচালক বা পথচারী মলিন মুখে, ‘অ্যাক্সিডেন্ট, মানুষ মরছে’ বলতে বলতে দ্রুত সরে পড়তে চাইছে সিন থেকে। ইতোমধ্যে, উদ্ধারকারী মানুষ ও পুলিশ হাজির হয়েছে, যে মানুষটি তাকে টেনে বের করছিল, চিৎকার করে উঠে লাশের বিকৃত-নৃশংস রূপ দেখে, মুখ ঘুরিয়ে নেয় অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা প্রশাসনের বড় কর্তাও, দূরে যেয়ে খুব করে মাথা নাড়ায়, তার ছেলের বয়সী হবে! সমবেত জনতা গোল হয়ে ঘিরে থাকে, ইস ও আহা শব্দের জিকির মাতিয়ে তোলে দৃশ্যপট, একটা সম্মিলিত শোক-শ্বাসে বাতাস ভারী হয়ে উঠে, অশ্রুর উষ্ণ বাষ্প ক্রমেই স্ফীত হতে থাকে … এ পর্যন্ত এসে মোরসালিনের চোখের দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসে, খানিকটা কচলে নিয়ে ফের মিশে যায় ছবিটির সাথে, তন্ময় হয়ে দেখতে থাকে।

    তার মৃত্যুর খবর কি করে পেত সবাই? টিভির টেলপে ব্রেকিং নিউজ হিসেবে এলে খুব ভাল হয়। মিডিয়ার লোক অবশ্য দেরী করে না, মনে হয় কাছেই ওৎ পেতে ছিল চিত্রনাট্যটি লাইভ ধারণে। তাকে ঘিরে এখন ক্যামেরাগুলো, ‘মোরসালিন মারুফ, এক তরুন এনজিও অফিসার রোড অ্যাক্সিডেন্টে অকালেই ঝরে গেলেন’, ছিপছিপে গড়নের তরুনী রিপোর্টারের ধরে আসা কন্ঠে ছড়িয়ে পড়বে একটি মৃত্যু সংবাদ, শোকের শালে চেপে পৌঁছে যাবে বাংলাদেশের ঘরে ঘরে…গল গল করে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে মোরসালিনের দুগাল বেয়ে, পৃথিবীটা একটা দু;খের স্বর্গরাজ্য!
    তাকে ঘিরে আন্দোলনও হচ্ছে, তার লাশ নিয়ে মানুষের মিছিল, হুইসেল, হৈ হৈ, ধর ধর, ইট-পাটকেল, লাঠিচার্জ, আগুন, ধোঁয়া। বুক ধড়ফড় করতে শুরু করে মোরসালিনের, হৃদপিন্ডটা লাফাতে থাকে সজোরে! 
     
    এরই মাঝে তাকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে কাছের নিরিবিল একটি ভবনে, তারই একটি নীরব কক্ষে শুয়ে নিরবচ্ছিন্ন অবসর উপভোগ করছিল সে, অনেক ধকল গেছে! কিন্তু আবার ঘূর্ণিঝড় শুরু হল, তাকে উল্টেপাল্টে নিরীক্ষণ চলতে লাগলো, শরীর থেকে কাপড়গুলো খুলে নেয়ার সময় পাতলা মানিব্যাগটা প্যান্টের পকেট থেকে খস করে মাটিতে পড়ে গেল, ফরেনসিকের লোকটি কৌতূহলবশে মানিব্যাগটি তুলে নিয়ে যখন তার সিনিয়রকে দেখাচ্ছিল, মোরসালিনেরও চোখে পড়ল, সম্পূর্ণ ফাঁকা, কিচ্ছু নেই। বেশ ভাবনায় পড়ে গেল, কী এমন হতে পারে যে, তার ব্যাগের এই লজ্জাজনক হাল হবে? মাংসের তাল হয়ে পড়ে থাকার সময় শুরুতেই কিছু লোক দৌড়ে এসেছিল, তারা রীতিমত হাতাহাতি করছিল নিজেদের মধ্যে। তাহলে কি? মাত্র হাজার দুয়েক টাকা ছিল, আর ইলেকট্রনিক কার্ড নিয়েও কিছু করতে পারবে না, কিন্তু ভিজিটিং কার্ডগুলোও খোয়া গেছে! তাহলে তাকে আইডেন্টিফাই করবে কি করে প্রশাসন? মোবাইলটা থাকলেও না হয় কল লিস্ট থেকে তার নিকটজনের নাম্বার উদ্ধার করতে পেত? তাহলে টিভির টেলপে কি করে ভেসে উঠবে তার পরিচিতি, ‘মোরসালিন মারুফ, একজন তরুন অকালে …..’? নাহ, যুৎসই হচ্ছে না! কি বিদঘুটে পরিস্থিতি! মানুষ কি জঘন্য! একটি মৃতদেহেরও নিস্তার নেই! গা ঘুলিয়ে আসে তার! ক্ষোভে গজ গজ করতে হল থেকে বেরিয়ে যায় মোরসালিন।

    সিএনজিটা আবার গতি বাড়িয়ে দিয়েছে, সময়ের অক্সিজেন পুরে সে নতুন করে মাতাল হতে শুরু করেছে। ফিরে এসে চারপাশের যান-জীবনে মিশে যাওয়ার চেষ্টা করল মোরসালিন, কিন্তু ভুলতে পারছে না শেষের দৃশ্যটা, নাহ, এমন মৃত্যু যেন কারো বরাতে না জোটে! তার চেয়ে ভাল অসুখে মৃত্যু। ক্যান্সার হলে, যেমন সিনেমায় দেখে, দুঃখের অমানিষা নেমে আসবে, তবে তেমন সাড়া ফেলবে? খুব বেশী প্রচারিত ব্যাপারটি, মনে ধরল না মোরসালিনের। পরিচিত মানুষগুলোকে বেশী হাহাকারে ফেলতে চাই একটি করুনতর ও স্বল্পশ্রুত মৃত্যুকাহিনি। ধরা যাক, রাস্তায় মলম পার্টির শিকার হল, এই হঠাৎ মৃত্যু বরং বেশী ভাল, আচমকা ও অপ্রত্যাশিত হওয়ায় তা নিশ্চয়ই বেশী নাড়া দেবে? নাহ, আরও খানিকটা অন্তর্ঘাত চাই। ভাবতে ভাবতে মোরসালিন এসে পড়লো গুলিস্তান ক্রসিংয়ে, সিগনাল ছেড়ে দিয়েছিল, বা দিক থেকে আসা শিশুটির মাঝের সড়ক দ্বীপে পৌঁছুতে আর মাত্র কয়েক ফুট চাই, শিশুটি দৌড়ুনো শুরু করল, কাছেই জ্যামের আড়মোড়া ভাংগতে থাকা সিএনজিটার মধ্যে মোরসালিন আতঙ্কে সাদা হয়ে গেল, ষন্ডা বাসটা সড়ক দাঙ্গাতে দাঙ্গাতে শিশুটির দিকেই এগুচ্ছিল। মোরসালিন নিমিষে বাস ও শিশুটির মধ্যকার কয়েক ইঞ্চির গ্যাপে নিজেকে বসিয়ে দিল, শিশুটিকে এক ঝটকায় সড়ক দ্বীপে উঠিয়ে নিজেও উঠতে চাইলো, কিন্ত তার আগেই তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল যান-দানো, রক্তের গুড়ি গুড়ি ফোঁটা রাস্তা গড়িয়ে পড়তে শুরু পাশ্ববর্তী নালায়।

    মজিবর সাহেব রবীন্দ্রনাথের ছোট গল্পটির প্রায় শেষে এসে পৌঁছেছিলেন, যখন বিছানার শিয়রে রাখা প্রবল চিৎকার করতে থাকা ফোনটি ড্রইংরুমে ঢুকলো বাসার মেয়েটির হাতে চড়ে, ওপাশ থেকে ভেসে এল ‘আপনি মোরসালিন মারুফের কেউ হন?’ মুখটা কয়েকবার ভাঙ্গলো তার, যেন শুকিয়ে যাওয়া কূপের অতল থেকে টেনে হিচড়ে জল তোলার চেষ্টা, ঘন ও দীর্ঘ শ্বাসের বাষ্পে ঘর ভরে গেল। দাদূর মৃত্যুর সময়ও বিষয়টি লক্ষ্য করেছিল মোরসালিন, তার বাবার চোখে কেউ এক ফোঁটা অশ্রুও দেখেনি, অথচ দাদুকে নিয়ে মানুষে-যমে টানার সময় কি অমানুষিক ধকলটাই না গিয়েছিল তার উপর দিয়ে!

    সিএনজির ভেতর রওশন আরাকে সামলানোই দায়, তার করুন সুরের আহাজারি রাস্তার লোকজনকে থমকে দিচ্ছিল, মজিবর সাহেব একবার বেশ ধমক দেন, ‘কি হইছে? মানুষ অ্যাক্সিডেন্ট করে না? হাসপাতালে নিয়া গেছে, চিকিৎসা চলবে’। কিন্তু করিডোর দিয়ে চলতে চলতে কেবিন, বেড, এমনকি সরকারী সেই হাসপাতেলের মেঝেও খুঁজে ফিরল চোখজোড়া - অবশেষে মর্গের শীতল কক্ষে রক্তশূণ্য নিথর দেহখানি ভালমত দেখার আগেই দাঁত লেগে যায় রওশন আরার। মজিবর সাহেব শক্ত করে ধরে রাখেন স্ত্রীকে, ছেলেটির জন্য কিছুই করতে পারেননি, একটি ভাল স্কুলে পড়াবার সামর্থ্য তার ছিল না, ব্রেইনের জোরে স্কুল-কলেজ-ইউনিভার্সিটি - সব জায়গাতেই স্কোলারশিপ পেয়েছে, টিউশানির পর টিউশানি করে গেছে, এখনো অফিস থেকে ফিরে টিউশানি করে, কিছুই করতে পারেননি ছেলেটার জন্য , নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ডুকরে উঠেন মজিবর সাহেব। ওদিকে মোরসালিনও ফুঁপিয়ে উঠে - বাবাকে দেখতে পায় তার হাতে চুমু খেতে, মুখে চুমু খেতে!
    পুরো বাড়ি ভরে উঠেছে পড়শি ও স্বজনের কুজনে – চেনা নাই, জানা নাই, অন্য মায়ের পেটের সন্তানের জন্য নিজের জান কোরবান? এত ভাল ছেলে হয় না, নিজের দিকে কখনো তাকায়নি, শুধ পরিবারের ভাল থাকা, খাওয়া, সন্মান এগুলিই ছিল খেয়াল, নিজের ভবিষ্যৎ একটুও ভাবেনি। একটা বোন ছিল মোরসালিনের, বিয়ে হয়েছে দুবছর হল, ‘একা একাই থাকতো আমার ভাই, কেন ওর দিকে একটুও খেয়াল করি নাই, আমের ঝুরি আচার বানাইয়া রাখছিলাম, ও ভাই, ভাই আমার…..’ তার থেমে থেমে চলা হৃদয়বিদীর্ণ আর্তনাদ প্রতিবেশীরা দুদিন ধরে শুনলো।
     
    একে একে আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা এসে যখন ভরে যায়, তখন জীবিত কাল থেকেও বেশী জীবন্ত থাকে মৃতের বাড়ি-ঘর । প্রথমে দূর আত্মীয়ের দল, পরে মাঝারি এবং সবার শেষে নিকটাত্মীয়রা ছেড়ে যায় একে একে – এ নিয়মের ব্যত্যয় হওয়ার সুযোগ নেই জগতে, সম্পর্কের মাত্রাগুলি ঠিকঠাক জানিয়ে বুঝিয়ে দিতেই! সবাই চলে যাওয়ার পর বাড়িটি সত্যি মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়, বাড়ির সার্বক্ষনিক বাসিন্দারা কবরে গেঁড়ে থাকে বেশ কিছুটা সময় - ঐ তো কবরের খুপরিতে রওশন আরাকে দেখা যাচ্ছে, তার জামাকাপড়গুলো দিয়ে দিচ্ছে সমবয়সী ভাই ও বন্ধুদের। মজিবর সাহেবকেও দেখা যাচ্ছে, সে ফোনে রয়েছে গ্রামে বসবাস করা তার ছোট ভাইয়ের সাথে, “আমার যা জমিজমা আছে, সব বিক্রি কইরা দাও। মোরসালিনের নামে একটা শিক্ষাবৃত্তি চালু করতে চাই, ছেলেটা আমার ব্রেইনি ছিল, কিন্তু কাজে লাগানোর সুযোগ পাইলো না, অন্যরা সুযোগ পাক। ও খুব বই ভালবাসতো, বই দিয়ে বাড়ি বোঝাই করে রাখতো, বাড়ির ঘাটায় একটা লাইব্রেরির কাজও শুরু করে দাও, নাম দিবা ‘মোরসালিন স্মৃতি পাঠাগার’’ … ডুকরে ডুকরে কাঁদতে লাগল মোরসালিন, ভালবাসার প্রবল ঢেউ আছড়ে পড়তে লাগল পৃথিবীর সবগুলো সৈকতে!
     
    রওশন আরার বাড়ির দুয়ারে দাঁড়িয়ে রয়েছে বাড়িওয়ালা, প্রথম কয়েক মাস সংকোচেই আসেননি। কপাটে ভর দিয়ে করুন চোখে তাকিয়ে আছে মোরসালিনের মা; দুর্বল, ও শীর্ন শরীর থেকে কোন শব্দ বের হয় না। বাড়িওয়ালা মজিবর সাহেবের খোঁজ করেন, সে দুদিন ধরে গ্রামের বাড়িতে, জমি বিক্রির খোঁজে। মেয়েটা কিছুদিন চালিয়েছে, কিন্তু জামাইও একজন বাড়িওয়ালা, প্রথম কয়েক মাস তেমন নজর দেয়নি। নিজের জনক-জননীর এই তীব্র বিড়ম্বনা মোরসালিনের গায়ে আগুন ধরিয়ে দিচ্ছে -নাহ, এ হতে পারে না, তার বৃদ্ধ বাবা-মা এতটা আর্থিক সংকটে থাকবে, এতটা রুগ্ন-জীর্ণ দেখাবে তাদের, এ সে মেনে নিতে পারে না, একটা কিছু করতেই হব, সব থেকে ভাল, মাসিক সঞ্চয় স্কীম করে রাখবে একটা। কিন্তু ভাবনাটা মুহুর্তেই মারা গেল, বাড়ি ভাড়া, বাজার খরচ আর বাবা-মার ঔষুধের পেছনে চলে যায় বেতনের সবকটা টাকা, মাঝে মাঝে সাময়িক ঋণ পর্যন্ত করতে হয়….নাহ, ভীষন বেখাপ্পা, অসংলগ্ন সব কিছু! এভাবে হয় না, এভাবে হবে না - শরীরটা প্রেক্ষাগৃহের আরামদায়ক সিট থেকে উঠিয়ে নিল মোরসালিন, কন্ঠে ধ্যাত, ধুর, বাজে। 

    কিছুক্ষণ আগের ফুরফুরে বাতাসটা নেই, ভ্যাপসা গরম রোমকুপকে পুড়িয়ে যাচ্ছে, সিএনজিটা ইতোমধ্যে রাস্তার দুই তৃতীয়াংশ পাড়ি দিয়ে এসেছে। মোরসালিন খুব রিলাক্স থাকলে ধুমপান করে, বা, খুব চাপে থাকলেও। ধোঁয়াটা উদযাপনের অংশ, থ্রি চিয়ার্স এর অনুভূতির মত। আবার, খুব বেদনাহত হলে, প্রতারিত বা পরাজিত, তখন বিদ্রোহ, যেমন, দাড়ি কাটবো না, দাঁত ব্রাশ করবো না, এবড়ো থেবড়ো পোশাক চাপাব ইত্যাদি, তখনোও ধোঁয়ার জওয়াব নেই। মোরসালিনের ঠোটের ধোঁয়াটা একটা সাপের মত আকৃতি নিয়ে সিএনজির স্টিল জানালায় একটুখানি পথের জন্য বাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে কিম্ভুতকিমাকার মিনতি জানাতে থাকে।

    এনজিওটাকে সে নিজের মা মনে করে, সেইরকমই যে ভালবাসে, বিশ্বাস করেনি অনেকে। তবে সে সবচেয়ে বিশ্বস্ত শ্রমিক এই সাম্রাজ্যের, তা নিয়ে দ্বিধা নেই প্রায় কারোরই। প্রতিষ্ঠানের বড় কর্তা তার কাছে একজন যুগস্রষ্টা, সবার বিশ্বাস, স্যারের মৃত্যু হলে সেই সব থেকে বেশী কাঁদবে। সবাই মনে করে, সে সব থেকে কাছের মানুষ স্যারের। আচ্ছা তার মৃত্যুতে কি হবে? স্যারও ভেঙ্গে পড়বে? মোরসালিন অনেক বড় সম্পদ ছিল তার প্রতিষ্ঠানের!

    বিষাদে ডুব দিয়ে মোরসালিন দেখতে পেল, ডেস্ক থেকে মাথা ঘুরে যাবার পর ধরাধরি করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে তাকে, নিকটস্থ হাসপাতালের কর্তব্যরত ডাক্তার তাকে মৃত ঘোষনা করলেন, ঘটনার তাৎক্ষনিকতায় স্তম্ভিত স্যার শোক বার্তা দিতে নির্দেশ দিচ্ছিলেন কাউকে। এরপর পূর্ব ঘোষিত মিটিংয়ে চলে গেলেন, প্রাতিষ্ঠানিক লাভ-লোকসানের দৈনন্দিন খতিয়ান নিয়ে হবে দীর্ঘ আলোচনা। শোক বার্তার নির্দেশটুকুতে কয়েক সেকেন্ডের জন্য অফিসে ছিল মোরসালিন। সংবাদ প্রাপ্তির শুরুর কথোপকথন ছাড়া সারাদিন আর কোথাও দেখতে পেল না নিজেকে। কাজে ব্যস্ত মানুষগুলো জানাজায় যোগদানের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেনি তা নয়, কিন্তু করোনা বিধিনিষেধ তাদের ডেস্ক ছাড়তে দিল কই!

    সে একটা কাজ করেছিল, সবচেয়ে কাছের একজনকে ইমেইল করে রাখছিল তার এ যাবৎকাল ধরে জমানো লেখাগুলি, তার মেধা ছিল পৃথিবীর নামকরা লেখক হওয়ার, একজন নিকোলাই গোগোল। সে জানে, তার মুদ্রিত লেখাগুলি সাড়া ফেলে দেবে, সবার হাতে হাতে থাকবে। সবার মুখে মুখে ফিরবে সে, আফসোসের করুণ সুরে বাজতে থাকবে, ‘এমন প্রতিভা! বড্ড অনাদর, অবহেলা, আহা….।'

    আচমকা একটা খটখট শব্দটা শুনতে পেল - বন্ধুটির ট্যবলেট পর্দায় স্থির হল মোরসালিনের প্রজেক্টর। ভাবনায় ডুবে রয়েছে তার হৃদয়ের বন্ধু; তার আচমকা, অস্বাভাবিক মৃত্যুতে স্তব্ধ হয়ে গেছে মনে হচ্ছে। হঠাৎ কি মনে করে মোরসালিনের লেখাসমেত ইমেইলগুলো এক সাথে করল সে। নিঃশ্বাস পড়ছে না মোরসালিনের, শিহরিত নেত্রে চেয়ে রয়েছে বন্ধুটির ইমেইল পেইজে, হয়ত এখুনি কোন সম্পাদকের কাছে প্রেরিত হবে।

    এরপর যা ঘটল তা স্বপ্নেও ভাবেনি, স্থায়ী অবলুপ্তি ঘটছে মেইলগুলোর, চিরদিনের মত তাদের কবর হতে যাচ্ছে মহাবিশ্বে! হতভম্ব! নির্বাক! মাথাটা ভীষন চক্কর দিল মোরসালিনের, হাতের পপকর্নটা ছুড়ে ফেলে হন হন করে বেরিয়ে এল।

    অভ্যন্তরে সিনেমা তখনো চলছিল, বাহিরে অবশ্য নেশাগ্রস্ত চালক সিএনজিকে দাবড়ে নিয়ে যাচ্ছিল, গাড়ির যাত্রীকে গন্তব্যে পৌঁছে দেয়ার এক মহাজাগতিক সফরে রয়েছে সে।

    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • গপ্পো | ০২ এপ্রিল ২০২৩ | ৪৮৩ বার পঠিত
  • আরও পড়ুন
    ইঁদুর  - Anirban M
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। লুকিয়ে না থেকে মতামত দিন