এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • [বাংলা] ছবির ব্যবসা

    দীপাঞ্জন মুখোপাধ্যায় লেখকের গ্রাহক হোন
    ২৮ জানুয়ারি ২০২৩ | ৫১৮ বার পঠিত | রেটিং ৫ (১ জন)
  • | | | | | | | |
    সাবান শ্যাম্পু বৈদ্যুতিক গাড়িদের মত যেকোনো ভোগ্যপণ্য বাজারে ছাড়ার আগে মার্কেট রিসার্চ বলে একটা জিনিস করা প্রায় আবশ্যিক। এটা করলে জানা যায় ক্রেতারা ঠিক কিরকম জিনিস কিনতে চাইছেন , বাজারে সেই জিনিসটার অভাব আছে কিনা অভাব না থাকলে যে সব ব্র্যান্ডের জিনিস ইতিমধ্যেই বাজারে পাওয়া যায় তাদের সঙ্গে কিরকম প্রতিযোগিতা হতে পারে , তাদের থেকে আপনার পণ্য কতখানি আলাদা ইত্যাদি। ছবি পণ্য হলেও এরকম কোনো মার্কেট রিসার্চ বাংলা ছবিতে আজ পর্যন্ত করা হয়েছে বলে জানা যায়নি। নির্মাতারা কি আদৌ জানেন যে সাধারণ বাঙালি দর্শক কিরকম ছবি দেখতে চায় ? নিজেদের স্বচ্ছন্দ বৃত্ত থেকে বেরিয়ে কি বাংলা ছবির নির্মাতাদের এখন সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলার বেশী প্রয়োজন?

    নাকি আসলে বাংলা ছবির হাল বদলাতে সদিচ্ছার অভাব আছে কোথাও? বাংলায় এক্সরা সবাই টিভি সিরিয়ালও প্রযোজনা করেন। ছবি করাটা তার পাশাপাশি হাত ধরাধরি করে চলে। শুধু যেন তেন একটা ছোট ইন্ডাস্ট্রি চালিয়ে যাওয়া আর তার আড়ালে অজানা ফাইনান্সারদের কিছু টাকা বাজারে খাটানোই কি বছরের পর বছর ছবি বানিয়ে চলার মূল উদ্দেশ্য?

     এতদিন ছবি ছিল পরিচালকের মাধ্যম , তিনিই শেষ কথা । ছবির কপিরাইট এক্সের কাছে থাকলেও সৃষ্টির কৃতিত্ব পরিচালকের কাছেই থাকত, কিন্তু এখন সেটা দ্রুত বদলে যাচ্ছে। এখন পরিচালক এক্সের কোম্পানিতে একজন কর্মচারী মাত্র। বছরে একটা বা দুটো ছবি তাকে নিয়ম মাফিক করে যেতে হয় , বি এম ডব্লু বা পেন্টহাউসের ই এম আই দেবার জন্য। বাংলায় নায়ক নায়িকারা এখন নিজেদের ছবির প্রযোজনা নিজেরাই করেন। সেক্ষেত্রে তো পরিচালকের আরোই কিছু বলার সাহস থাকতে পারে না।  এক্স যা বলে দেবেন তাই তিনি করতে বাধ্য। 'ক্রিয়েটিভ প্রোডিউসার' বলে একটা নতুন ভূমিকাই চালু হয়ে গেছে। আগে এডিটিং রুমে শুধু পরিচালক আর এডিটর থাকতেন। এখন এক্সরাও অনায়াসে সেখানে ঢুকে বলে দেন ছবি কোথায় কতটা কাটতে হবে।

    অনুরাগ কশ্যপ সম্প্রতি বলেছেন ২০২২ সালে হিন্দি ছবি দক্ষিণের কাছে ব্যবসা হারিয়েছে কারণ হিন্দি ছবির নির্মাতারা আর হিন্দিভাষীদের জীবনের গল্পের সঙ্গে কানেক্ট করতে পারছেন না। ছবির চিত্রনাট্য লেখা থেকে শুটিং ফ্লোরে কথাবার্তা সবই নাকি হচ্ছে ইংরেজিতে। একটা ভাষার ওপর যথেষ্ট দখল না থাকলে সেই ভাষায় কি ভালো ছবি আদৌ বানানো যেতে পারে? এখানেও ব্যাপারটা তাই? নায়ক নায়িকাদের বাংলা ভাষাজ্ঞান ভালো নয়, অনেককে রোমান হরফে বাংলায় চিত্রনাট্য লিখে দিতে হয়। পরিচালকরাও বাংলার থেকে যেন ইংরেজিতে বেশি স্বচ্ছন্দ। তারা  অনায়াসে নতুন বাংলা ছবির ওপর সাক্ষাৎকার দিতে গিয়ে বহু বাক্য সম্পূর্ণ ইংরেজিতে বলেন। তাদের অবচেতনে কোথাও কি এরকম ভাবনাই কাজ করে যে এই ছবির জন্য ইন্টারভিউ যারা শুনছেন তারা সবাই বাইপাসের ধারের বহুতলে থাকেন? একটা বাংলা ছবিতে যদি দক্ষিণ কলকাতার বহুতল আবাসনে থাকা একটা চরিত্র দেখানো হয় যে কফি খেতে খেতে সারাদিন ইংরেজী বই পড়ে , সেই চরিত্রের সঙ্গে কি করে ফরাক্কা বা আসানসোলে থাকা বাঙালি যুবক যুবতীরা নিজেদের রিলেট করতে পারবে ?

    ভারতবর্ষে যুগে যুগে একমাত্র বড় তারকারাই দলে দলে জনতাকে হলে টেনে আনতে পারেন। অতিমারী পরবর্তীকালে সেই দর্শকরা স্পষ্ট করে দিয়েছেন তারা শুধু বছরে বড় তারকাদের তিন চারটে স্পেক্টাকল হলে গিয়ে দেখতে আগ্রহী। স্পেক্টাকল মানে অনেকাংশ একটা সবুজ পর্দার সামনে অভিনীত , ভিএফএক্সে পরিপূর্ণ ছবি যা শুধুমাত্র বড় পর্দায় গিয়ে উপভোগ করার জন্য। তাহলে বাকি ছবিগুলো কিজন্য তৈরি হচ্ছে? কেউ উত্তর জানে না।

    একটা ছবিকে হিট , সুপারহিট বা ব্লকবাস্টার বলার প্যারামিটার গুলো কিন্তু বাজেটের দেড়গুণ বা দুগুণ টাকা ফেরত পাওয়া নয়। এগুলো বলা হয় কত শো হাউসফুল হচ্ছে , কত টিকিট বিক্রি হল , এরকম কিছু সংখ্যার নিরিখে। নন্দনে টিকিটের দাম তিরিশ টাকা , সেখানে সব সময়ই যেকোন ছবি হাউসফুল হয় , সেই নিরিখে কোনো ছবি থেকে এক্স টাকা ফেরত পেল কিনা তা মাপা যায় না। ছবি ব্লকবাস্টার হলেও এক্স কিছু সমস্যায় পড়তে পারেন।  কোনো ফ্র্যাঞ্চাইজির প্রথম পর্বের বাজেট চারশ কোটি টাকা হলে তাকে তুলতে হবে কম করে সাতশ কোটি টাকা। তবেই কিন্তু সে ছবির এক্স ফাইনান্সারের সাহায্য ছাড়াই ঝাড়া হাত পায়ে দ্বিতীয় পর্ব তৈরি করতে পারবেন। নাহলে আবার তাকে ফাইনান্সার খুঁজতে হবে। 

    সত্তর দশকে হলিউডে ষ্টুডিও ব্যবস্থার দানবীয় একচেটিয়া আধিপত্যকে ভেঙে নতুন ইন্ডি এক্সদের সাহায্যে মার্কিনি মূলধারার ছবিকে নতুন ভাবে তৈরি করা শুরু করেছিলেন একদল পরিচালক। তাদের মধ্যে স্টিভেন স্পিলবার্গ এবং জর্জ লুকাস একটা পুরো নতুন ব্যবসার ধারা শুরু করেছিলেন - 'সামার ব্লকবাস্টার' বলে। গরমকালে সমস্ত স্কুল ছুটি থাকে , বাবা মারা বাচ্চাদের নিয়ে এগুলো  দেখতে যেতেন । টেকনিক্যালি নিখুঁত ছবি যা হৈহৈ ব্যবসা করত - জস , ইটি , ষ্টার ওয়ারস , জুরাসিক পার্ক। বস্তুত এগুলো আজকের মার্ভেল ছবিগুলোর পূর্বসূরী। কিন্তু সাম্প্রতিক ২০১০ পরবর্তী সামার ব্লকবাস্টার ছবিগুলো নিয়ে এদেরই বন্ধু এবং আরেকজন বিখ্যাত পরিচালক মার্টিন স্করসিসি [নিজে কোনওদিন সামার ব্লকবাস্টার বানাননি] চমকে দেওয়া একটা মন্তব্য করেছেন -”Honestly, the closest I can think of them, as well made as they are, with actors doing the best they can under the circumstances, is theme parks. It isn’t the cinema of human beings trying to convey emotional, psychological experiences to another human being”

    এই কথার মধ্যে দিয়ে শুধু বাংলা নয় , সমস্ত পৃথিবীর মূলধারার ছবির ভবিষ্যতের কথা বলে দেওয়া হয়েছে। ছবি প্রায় ১৩০ বছরের পুরনো এবং প্রথম দৃশ্যশ্রাব্য মাধ্যম হলেও এখন তাকে লড়তে হচ্ছে ভিডিও গেম , পনেরো সেকেন্ডের অজস্র ছোট ছোট ভিডিও, ২৪*৭ খবরের চ্যানেল , ওয়েব সিরিজের মত আরও বেশী শক্তিশালী এবং উত্তেজক অ্যাড্রিনালিন নিঃসরণকারী  দৃশ্যশ্রাব্য মাধ্যমদের সঙ্গে।তাই ছবি আর নির্মাতাদের কাছে গল্প বলার নিরাপদ মাধ্যম নয় , ইচ্ছে না থাকলেও ব্যবাসাই মুখ্য হয়ে উঠছে। দর্শক আর দু ঘণ্টা ধৈর্য ধরে হলে বসে একটা ছবি দেখতে আগ্রহী নন, সেখানেও তাকে বসিয়ে রাখার জন্য কুড়ি মিনিট বাদে বাদে ডোপামিন রাশে ভরপুর অ্যাকশন দৃশ্য রাখতে হচ্ছে।

    তাই  হয়ত আজকের দিনে জন্মে  সের্গেই আইজেনস্টাইন রিল বানানোর জন্য নতুন রকমের মন্তাজ আবিষ্কার করছেন  , আকিরা কুরোসাওয়া ভিডিও গেম বানাচ্ছেন। ছবি বানাতে তারা এযুগে আর আগ্রহী হতেন না বলেই মনে হয়। শুধু ছবির ব্যবসা যেন এক ধ্রুব সত্য। যা ছিল , আছে এবং থাকবে। শিল্প বহুদিন নিরুদ্দেশ। 
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
    | | | | | | | |
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। না ঘাবড়ে প্রতিক্রিয়া দিন