এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  ধারাবাহিক

  • হারানো গল্পের খোঁজে - একটি নভেলা

    Krishna Malik (Pal ) লেখকের গ্রাহক হোন
    ধারাবাহিক | ২২ নভেম্বর ২০২২ | ১৮৯ বার পঠিত
  • ভীষণ নিশ্চিন্ত লাগছে নিজেকে। ঘুমন্ত কুড়চির কপালে স্নেহচুম্বন এঁকে দিয়ে গায়ের কম্বল ঠিক করতে যেতেই ও উসখুশ করে উঠল। আস্তে আস্তে চাপড় দিতে ঘুমিয়ে পড়ল আবার। ওর ঘুম না ভাঙে, সাবধানে বালিশে মাথা রাখি। দু’চোখ বন্ধ করতে অবারিত উষ্ণ নোনাজল চোখ থেকে গড়িয়ে গেল দুদিকে। বাঁধভাঙা অলকানন্দার জল যেমন দেবভূমি প্লাবিত করে নেমে গেছে ঢাল বরাবর।  তবু এই মুহূর্তে খুব খুশি আমি, খুশিতেই হয়তো ঘুম আজ বিলম্বিত। একটা কথাই শুধু মনে হচ্ছে, পরিচয় পত্রে আমি মৃণ্ময়ী হলেও এখানে সবাই আমায় জানে বনবীথি নামে। অরণ্যের সন্ধান পাবার আগেই একটু বড়ো হয়ে কুড়চি যদি জানতে চায় মৃণ্ময়ী কে?
        আসলে আমি নিজেই বনবীথি নাম নিয়েছিলাম। অরণ্যকে ভালোবেসে ফেলেছিলাম। অরণ্য যে সমুদ্রগুপ্তের হারিয়ে যাওয়া গল্প নয় তা ভালো করেই আমি বুঝেছিলাম, বরং অরণ্যের গল্পটা আমার আবিষ্কার। তাই তাকে যত দেখেছি, তত পথ হারিয়েছি আরও গহীন – গহীনতর আরণ্যআত্মায়। তার সঙ্গে পরিচয়ও আমার এক অরণ্যেরই একেবারে অন্দরমহলে, তাই আমাকে বারমহলে দাঁড়িয়ে পরিচয় ঘোষণা করতে হয়নি।
           হয়তো বেশিদিন দেখিনিও তাকে, শুধুই অনুভব করেছি। আকাশচুম্বী যে বনষ্পতির অরণ্য, তার ভেতর ঢুকে পড়লে তোমায় সে জড়িয়ে নেবে, ঢেকে নেবে আপাদমস্তক। এ যেন এই পৃথিবীর ভেতর, অথচ তার বাইরে অন্য কোনো দিগন্ত, অন্য রকম মাপকযন্ত্রের অন্য নটিক্যালে, যা এই একই সময়ে এই পৃথিবীতে বিরাজ করছে, আবার তাকে সবাই দেখতে ছুঁতেও পারছে না – এমনই মনে হয়েছিল এই গল্পের বিশেষ অরণ্যটির গভীরতায় ঢুকে পড়ে।
           সেখানে কেউ পথ হারায় না জেনেও আমি একটু তো ভয় পেয়েইছিলাম। তার সঙ্গে সঙ্গে একটা বেশ রোমাঞ্চও। যেদিকে তাকাই, ছোট বড়ো মাঝারি শালবৃক্ষ, উন্নতমস্তক পুরুষের মতো হলেও তাদের হয়তো কিছু মায়া আছে মর্ত্যমানুষের প্রতি। মাঝে মাঝে সেগুন, শিশু, গামারও একটা দুটো; আর কোথাও কোথাও রুক্ষ রাঙামাটি ঢেকে রেখেছে হৃদয়সর্বস্ব লতাগুল্মাদি যারা কখনও ওই আত্মাভিমানী শালপ্রাংশুদের নাগাল পাবে না, কেবল পায়ের কাছে নত হয়ে পড়ে থেকে আকুতিভরা চোখে তাকিয়ে থাকবে ওদের মুখের দিকে। তবুও এই বনভূমি এক মিলিজুলি দেহাতি সমাজ। মাথার উপর আকাশটা নেই হয়ে গিয়ে ভেতরে একটা ছায়াচ্ছন্নতা কার বুকের ভেতর থেকে তুলে নেওয়া, আর গাছের ডালপালায় একটা চন্দ্রাতপ। ঝিঁঝিঁ ডাকছে,  থেকে থেকে  পাখিদের হরেক রকম ডাক। তাদের ওড়াউড়ি, কখনও উঁচু ডালে বসে রাজকীয় সময় কাটানো। কিন্তু আমি নীলকন্ঠটাকে খুঁজে পাচ্ছি না কোথাও। নীলকন্ঠ আগে কখনও চোখে দেখিনি ঠিকই, তবে ছবিতে দেখেছি বলে তাকে চিনতে অসুবিধা হলো না।

          মেদিনীপুরের গা ঘেঁষে ওই আরণ্যক ভূমিতে আনমনা পথিকের মতো একদিন গিয়ে পড়লাম। ভানুঠাকুমার মৃত্যুর পর প্রায় চার মাস পার হয়েছে, কিন্তু সেই শোক আমায় কিছুতেই ছেড়ে যেতে চাইছে না। কিচ্ছু ভালো লাগছিল না। সমুদ্রগুপ্তের মৃত্যুর শেকড় যেভাবে আমার অন্ধিসন্ধিতে বিস্তৃত হয়ে আমায় দেওয়ালের মতো ভেঙে ফেলেছিল ভানুঠাকুমার মৃত্যু অবশ্য সেই রকম করে অজস্র ফাটলে ধ্বসিয়ে দিতপ পারেনি।  কারণ ঠাকুমার মৃত্যুতে আমার  কোথাও কোনো আত্মগ্লানি নেই, দাহ নেই। তবে শূন্যতার কুয়াশা ছড়িয়ে আছে মনের প্রান্তরে, আর জানি যে তাকে অচিরেই ধীরে ধীরে রোদের হাত সরিয়ে দেবে, যেভাবে দুটিহাত পর্দার কাপড় দুদিকে সরিয়ে উন্মুক্ত করে জানালা। সেই রিফ্রেসমেন্টের জন্য সেই ভ্রমণ খুব দরকার হচ্ছিল।   

         অন্ধের মতো সামন্তবাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছিলাম ঠাকুমার শ্মশানযাত্রার আগে। অন্যমনস্কতার ভেতর ঠাকুমার উদ্দেশ্যে মনে মনে বলেছিলাম, বাকি জীবনের অনাগত দিনগুলিতে কী আছে যেমন অজানা, তেমনই এও তো ঠিক – যা যায় তা ফেরে না কখনও? কিন্তু তার রেশ, তার পরম্পরা কি বেঁচে থাকে কোথাও? যদি থাকে, তবে তাকে একবার ছুঁয়ে আশ্বস্ত হব এই কারণে যে সব ভালোগুলো আমাদের বেঁচে থাকা পৃথিবীতে আছে আজও, থাকবে আমাদের উত্তরাধিকারীদের জন্য।

            দুপুরে খাওয়ার পর রিসর্ট থেকে বেরিয়ে এতোলবেতোল হাঁটতে হাঁটতে সড়ক ধরে এগিয়ে যাই। তখনই দেখি সড়কের একদিকের অরণ্য থেকে আর একদিকের অরণ্যে উজ্জ্বল আশমানী আর সমুদ্র নীল রঙের পালকে শুভ্রতা মেশানো ডানা ছড়িয়ে উড়ে যাচ্ছে একটা – কী আশ্চর্য ! – একটা নীলকন্ঠ! আমি তার ডানার দিকে তাকিয়ে নিজের ইচ্ছেকেও মেলে দিলাম। উপরের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে  তাকে অনুসরণ করে ঢুকে পড়েছি অরণ্যে। সে আমাকে এ গাছ ও গাছ, এ ডাল ও ডাল করে , কখনও পুরো লুকিয়ে থেকে যেন , আয় না আয় - আর একটু আয় -! আমি সম্মোহিতের মতো চলেছিলাম। অরণ্যের নিজস্ব গন্ধ আছে, সেটাও টের পেলাম যখন সে আমাকে পুরো মাথাটি ঘুরিয়ে ছেড়ে দিয়ে কোথায় চলে গেল!

       সবদিকেই একইরকম গাছপালা। কিন্তু সড়কে উঠব কোনদিকে ঠাওর পাচ্ছি না। তারপর মনে পড়ল, কোথাও কোথাও ঘনত্ব থাকলেও এই ছোট জঙ্গলে কেউ হারায় না। তো যে কোন একদিক দিয়ে আগে বেরোই, তারপর দেখা যাবে। ঝোপজঙ্গল এড়িয়ে খুব সরু সিঁথির মতো পথরেখার আভাস দেখে দেখে যাচ্ছিলাম। কোথাও কাঁটাঝোপে পা ছড়ে যাচ্ছিল। চিনচিনে জ্বালা টের পাচ্ছিলাম। সময় কতটা পার হলো বুঝতে পারি না। কারণ হাতে ঘড়ি নেই, আর মোবাইলটাও রিসর্টে চার্জে বসিয়েছিলাম – সঙ্গে নিইনি। ভেবেছিলাম, একটু হেঁটে ফিরে আসব। কিন্তু এক রঙবাজ নীলকন্ঠের পাল্লায় পড়ব তা বুঝব কীকরে?

         কোথা থেকে খুব মৃদু সুবাস আসছে। ধীরে ধীরে সুবাসটা নিকটতর হচ্ছে। তারপর অরণ্য হালকা হতে শুরু করল। সূর্যকে গাছপালার ফাঁক দিয়ে ফ্লাস করতে দেখছি। অরণ্যের কিনারে এসে দেখি কয়েকটি গাছ পাশাপাশি, কাছে দূরে। মাঝখানের কিছুটা জায়গা ফাঁকা। এরকম স্থানকেই বোধহয় বলে বীথি। শাল সেগুনের বাইরে ওই গাছগুলোর সর্বাঙ্গ শ্বেতশুভ্র কুন্দ ও জুঁই সদৃশ সুবাসিত কুসুমে সাজিয়ে যেন আমারই অপেক্ষায়! নীলকন্ঠ তাহলে আমায় এই জন্যই এমন গভীর বুকজলে এনে ছেড়ে দিয়েছিল? আমি আবারও সম্মোহিত। এগিয়ে যাই অতুল আশ্লেষে সেই কুসুমৈশ্বর্যময় ঔদার্যের দিকে। মাথা ঈষৎ উঁচিয়ে বৃষ্টিমাখার মতো দুহাত ছড়িয়ে বন্ধ চোখে নাক টেনে প্রথমে সুবাস সেঁধিয়ে নিই বুকের অন্ধিসন্ধিতে। তারপর চোখ খুলে ওই হাত প্রসারিত রেখেই গোল হয়ে ঘুরতে ঘুরতে দেখতে থাকি সেই অপরূপ ফুলের বিচ্ছুরণ।

     “এই ফুলের নাম জানেন?”  ভীষণ চমকে থেমে গেলাম। কে রে বাবা! ঘুরে তাকাতে গিয়ে আবার চমক। দ্বিগুন চমক। নীলকন্ঠ? সেটাই কি? দেখি একটা মাঝারি শালগাছের নীচুডালে বসে সেই ফাজিল পাখিটা। আচমকা উড়ে গেল। দ্বিগুন চমকটা হলো,  পাখি দেখতে গিয়ে এক যুবককে দেখতে পেলাম। আমার নজর পড়ল একটা ফুলে ছাওয়া গাছের ছায়ার ভেতর আর এক ছায়ার দিকে। গাছের গোড়ায় পা তুলে অন্য একটা গাছের গুঁড়িতে ঠেস দিয়ে বসে আছে ঘেসুরে জংলা রঙা জামা প্যান্ট পরা এক যুবক। তার একই রঙের মাথার টুপি চোখের উপর পর্যন্ত নামানো । আশেপাশে আর কাউকে দেখলাম না।
    কথাটা কি আপনি বললেন?
    এখানে আর কেউ রয়েছে কি?
        একটু থেমে বললাম, কী নাম এই ফুলগুলোর?
    “কুড়চি! নাম শুনেছেন আগে?”
    “অদ্ভুত! আগে হয়তো দেখিনি, তা বলে এই গাছ এতও দুর্লভ নয় যে নামও শুনব না।”
    “তাহলে তো ভালই! কিন্তু জঙ্গলে এলে এমন লাল হলুদ ক্যাটক্যাটে উজ্জ্বল রঙা পোশাক যে পড়তে নেই সেটা জানেন না দেখছি।” বলে পা গুটিয়ে মাথার পিছনে আড়াআড়ি হাত রেখে বসল। তারপর কী মনে করে টুপিটা খুলে কোলে রেখে বলল, আমার নাম অরণ্য।
      জ্ঞান দেওয়া দেখে আমার তো গা জ্বলে গিয়েছিল! ওর নামের ধার না ধেরে বললাম, আরে বাবা, আমি তো একটু হাঁটতেই বেরিয়েছিলাম পাকা সড়ক ধরে। জঙ্গলের ভেতর তো আমার ঢোকার ইচ্ছে ছিল না এমন অসময়ে। তাহলে আমি অন্য পোশাকে আসতাম। তাছাড়া আমার পোশাক আপনি যেমন বলছেন মোটেই ওরকম নয়।”- আমি জানি মশাই, অরণ্যের ভেতর চলাচলের আর অবস্থানের নিয়মকানুন।” কথাগুলো জোরে হয়ে যচ্ছিল বিরক্তির কারণে, খেয়াল হতেই ওর দিকে এগিয়ে যেতে যেতে গলা আস্তে করলাম।
      -অসময় বলে কিছু নেই। অরণ্যের কাছে এলে সবসময় প্রস্তুত হয়ে আসতে হয়। কখন যে সে কীভাবে ডাক পাঠাবে বুঝতেই পারবেন না।
      -হুঁ! ঠিকই বলেছেন। একটা নীলকন্ঠই আমায় ডেকে আনল। ওই যে, একটু আগে উড়ে গেল, আর তখনই তো আপনাকে দেখলাম।
    “সেইজন্যেই তো বলছি, অসময় বলে কিছু হয় না। সবই নিয়মের চক্র। কে কখন কোথায় কোন কাঁটায় এসে থামবে কে বলতে পারে? লটারি টেনেছেন কখনও? আমাদের ছেলেবেলায় গ্রামে আসত আইসক্রিমওলা, ঝুড়িভাজাওলা, শোনপাপাড়িওলা, কটকটিওলা। ওদের সঙ্গে থাকত লটারি। পেরেক আঁটা , আর সংখ্যা লেখা এক একটা ঘর। আমরা পাঁচ পয়সা, দশ পয়সা দিয়ে একটার দামে লটারি টেনে মার্বেল ছেড়ে দিতাম। যে সংখ্যার ঘরে মারবেল পৌঁছত, সেটাতেই ফলাফল স্থির হতো। অনেক সময় হতো কোনো সংখ্যা লেখা ঘরেই মার্বেল গেল না। একটা আইসক্রিম অবশ্য পেতাম। তাই কে কখন কোন ঘরে দাঁড়িয়ে থাকবে কেউ বলতে পারে কি?”

          এমন দার্শনিকসুলভ বক্তৃতায় তাকালাম ওর দিকে। রোগা,  মাঝারি উচ্চতার এক যুবক,  বয়স বুঝতে পারছি না, আমার থেকে বয়সে ছোটও হতে পারে। তবে চোখেমুখে সারল্য আছে। তাই বলে অরণ্য নাম হওয়াটা বাড়াবাড়ি। হুঁ! অরণা  না আরও কিছু! অরণ্যে দেখা হলো বলে নিশ্চয় নামটা ঢং করে বানিয়ে বলছে!
       চলুন! সড়কে পৌঁছে দিই। তা এসেচেন কোথায়?
        ধন্যবাদ। আমি একাই যেতে পারতাম।
      তা পারতেন, তবে পুরো জঙ্গল ঘুরে নদীর গা ঘেঁষে রাস্তা খুঁজে সড়কে ওঠা – দিনের আলো থাকতে থাকতে আপনার সাধ্যে কুলোবে না। সঙ্গে আর কেউ থাকলে আমি মোটেই নাক গলাতাম না। তাছাড়া আপনার সঙ্গে কেউ এসে থাকলে চিন্তা করবেন।
      কথাটায় যুক্তি আছে। তাই মেনে নিয়ে আর একবার ধন্যবাদ দিলাম।
      চুপচাপ হাঁটছি। পাখিদের কাকলি, ঝিল্লির ডাক, আমার পায়ের নীচে শুকনো পাতার ভেঙে পড়ার শব্দে নৈঃশব্দ বেশি করে যেন ঘনীভূত হচ্ছে। কিন্তু ওই অরণ্যের পা ফেলায় কোনো শব্দ নেই! খেয়াল হলো, আমাকে কয়েকটা প্রশ্ন করেছেন কিন্তু আমি উত্তর দিই নি।  অসভ্যতা হয়ে যাচ্ছে, তাই চলতে চলতে বললাম, আমি একাই আসলে বেড়াতে বেরিয়েছি। উঠেছি ওই বনবাংলোয়। তাই আমার জন্য চিন্তা করবার মতো তেমন কেউ উপস্থিত নেই।   
      ছেলেটা নিঃশব্দ। ঝোপঝাড় ভেঙে, কখনও সুঁড়ি রাস্তায় চলতে চলতে কোথায় যেন জলের শব্দ শুনলাম। কাছেই কোথাও স্বরলিপিতে নিজস্ব কথা বসিয়ে জল যেন সন্তুরবাদক।  
      জল বাজছে, না? ফিসফিস করে বললাম।
    কথাটা শুনেই হয়তো, হাঁটা থামিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে থাকল আধমিনিট, তারপর এই প্রথম মুখটা একটু হাসি হাসি করল, যে হাসিমুখ পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতার পরেও দেখতে পাওয়া ছিল দুষ্কর। তারপর হাঁটতে শুরু করে সামনে আঙুল দেখিয়ে বলল, ওই যে - গাছপালার ফাঁক দিয়ে তাকান -  
      দেখলাম জঙ্গলের কিনারায় নদী বয়ে যচ্ছে!
      নদীকে অল্প দূরে রেখে ঝোপঝাড় ভেঙে ধীরে ধীরে আমিও চুপচাপ হেঁটে চললাম।
      একটু পরে বললাম, এই জঙ্গল আপনার চেনা ? রোজই আসেন, আর কুড়চি বনে বসে থাকেন বুঝি? কী ভীষন সুন্দর জায়গাটা। এখানে একটা ছোট্ট কুঁড়ে বানিয়ে দিব্যি অনন্ত সময় বসে থাকা যায়। সূর্যোদয়, সূর্যাস্ত –  চন্দ্রোদয়,  চন্দ্রাস্ত এক একটা সময় – ওই বীথির  এক একরকম সৌরভ হয় নিশ্চয়।  পৃথিবীর সমস্ত শান্তি ওখানে, আপনার মনে হয় না?
         যা কিছু ভালো একটা সময় পর্যন্ত। যখনই নৈমিত্তিক জীবনের সঙ্গে তা জড়িয়ে যাবে, তখনই সংঘর্ষ হবে। আপনার শান্তি হয়তো অন্যের অশান্তির কারণ হয়ে উঠবে একদিন।
     কেন এমন বলছেন?
        আপনি জানেন না, এদেশে কোনো মেয়ের পক্ষে একা এখানে নিভৃতবাস সম্ভব নয়? মানুষের অনভ্যস্ত চোখ সন্দেহ উদ্রেক করে। তাতে বিপদ ঘাড়ে এসে পড়ে।
       সড়কে উঠে আমি তো উল্টোমুখে চলে যাচ্ছিলাম। অরণ্যই আমার ভুল ধরিয়ে দিল। তারপর সে নিজে উল্টোমুখে হাঁটতে হাঁটতে চলে যেতে লাগল। আমি বললাম, আমার নামটা জানবেন না?
          জেনেছি!
        দাঁড়িয়ে পড়ল ঘুরে। আমি খুব অবাক হয়ে জিগ্যেস করলাম, কীকরে?
        আপনার নাম আমি দিয়েছি।
          আমি আশ্চর্য হয়ে জিগ্যেস করলাম, কী নাম?
          বীথি।
       আমি নেতিবাচক ঘাড় নাড়লাম।  তাই দেখে জিগ্যেস করল, পছন্দ হয়নি বুঝি?
             খুব কমন নাম।
       তাহলে আপনার নামটাই বলুন!
               আপনারটাই থাক, শুধু “বন” যোগ করুন।
        একদম! বনবীথি ইজ দ্য পারফেক্ট নেম! চলি। টা টা!
                আর দেখা হবে না?
               কে জানে! বলেছি না, কেউ আগে থেকে কিচ্ছু বলতে পারে না?
             বনবাংলোয় কাল আসুন না! আমি দুপুর পর্যন্ত আছি।
      কিছু না বলে হাত নেড়ে চলে গিয়েছিল অরণ্য। বিকেলের আধো আলোয় বনবাংলোয় ফিরতে ফিরতে আমার কেন যেন পুরো ঘটনাটা মনে হচ্ছিল অবাস্তব। এরকম কিছু হয়নি, সবটাই আমার কল্পনা হয়তো। জঙ্গলের ভেতর আবোলতাবোল ঘুরে আমার বাই চেগেছে। এক যুবককে আমি দেখেছি ঠিকই, বাকিটা কেবলই আমার অলস মনের ভাবনা – নিশ্চিত তাই।
       কিন্তু ঘটনাটাকে সত্যি করে তুলতেই যেন পরের দিন বেলা দশটা নাগাদ সে সাইকেল ঠেলে বনবাংলোর গেটে ঢুকে পড়ল। দারোয়ান যে ওর চেনা লোক তা বোঝা গেল। আমি বাংলোর দোতলার বারান্দায় আধভেজা তোয়ালে মেলতে এসেছিলাম। প্রথমে বুঝতে পারিনি। তারপর মনে পড়ল। কী আশ্চর্য, আমি তো ভুলেই গিয়েছিলাম! জোরে ডাকলাম, এই যে অরণ্য! এদিকে -! আসছি।
           হাত তুলে হাসল এমন যে সকালটাতে বাড়তি আলো এসে পড়ল। সাইকেল একপাশে ঠেসিয়ে রাখল। আমি নেমে গেলাম বাগানে, প্রথম কথাই বললাম, আপনার নাম কি সত্যিই অরণ্য?
    “তা নয়তো কী? আমি মিথ্যে কথা বলেছি? দেখুন, আমি এমন অকারণে মিথ্যে বলি না।”
    “তার মানে আপনি মিথ্যে বলেন।”
    “কে না বলে? প্রয়োজনে যুধিষ্ঠিরও -!”
        হাঁটতে হাঁটতে কথা বলছিলাম আমরা। ছায়া বিছিয়ে আছে বস্তুর আগে, তার থেকে বড়ো হয়ে। তাতে ছায়ারও কিছু আসেছে না, বস্তুরও কিছু যাচ্ছে না। ছায়ার সৃষ্টি, আর সৃষ্ট ছায়া দুইই নির্বিবাদী। আমার মনে কেবল তার রেখাপাত হচ্ছে, কী যেন ভাঙাগড়া --- কী একটা বোধ অস্থির করছে আমায়। একটুপর শান্ত হলাম। আমার পরিপার্শ্বে তাকাই পূর্ণ চোখে। গাছগাছালির গন্ধ নাকে এসে লাগে, সবুজ রঙ –  আলোছায়া শরীর স্পর্শ করে। রিসর্টের ঘেরাটোপে সাজানো বাগান। পাখিদের আনন্দিত কলরব প্রবলভাবে তাদের অস্তিত্ব ঘোষণা করছে।  দীর্ঘ বয়সী বা যুবক গাছকে কবন্ধ করে তার দেহকান্ডে মানুষের বিলাসযাপনের জন্য বানানো কুটির – আমায় আর্ত করে তোলে। সব কিছু মিলিয়ে এই জগৎসংসার রত্নখচিত এক ধূসর জাজিমের উপর বিছিয়ে রয়েছে। সব কিছু প্রস্তুত হয়ে আছে, আরও কিছু হওয়ার কার্যকারণ হয়ে। নির্বাক চলচ্চিত্র মনের পর্দায় সরে সরে যাচ্ছিল।

         কথা বলছিল অরণ্য, আমি শুনছিলাম। ছেলেটা কথা বলে সুন্দর। কিন্তু আমি যেন তাতেও মনোযোগী নই তত। যদিও কথা শোনার নামে, দৃশ্য দেখার নামে ওর দিকেই তাকিয়েছিলাম, আর আমার মনে পড়ছিল সমুদ্রগুপ্তকে। মনশ্চক্ষে দেখলাম, সে হাসছে।  হাসছে – আর সরে যাচ্ছে দূরে। আমার দাহ চলে গিয়ে প্রশান্ত হচ্ছে মন।   ঠাকুমার কথা শুনতে পাচ্ছি বাতাসের ওপার থেকে, আসলে তোর অপরাধবোধ ছিল বলে সমুদ্রের জন্য কষ্ট পাচ্ছিলি, মৃণ্ময়ী।
    “এই যে, আমার কথা শুনতে পাচ্ছেন? আশ্চর্য! সজ্ঞানে বোধি লাভ করলেন নাকি? এই যে – ” অরণ্য আমার মুখের সামনে টুসকি দিচ্ছে।
          আমি বুঝতে না দিয়ে কপট রাগ দেখাই, “এ আবার কী? আশ্চর্য তো, এমন আঙুল নাচানোর কী আছে?
    “নাহ্ ! দেখলাম আপনি আর যেখানেই থাকুন, এই জায়গায় মোটেই ছিলেন না। আপনি বুদ্ধদেবের মতো হাসছেন।” ওর কথা শুনে আমি হেসে ফেলি।ওর কাপট্যহীনতা আমার ভালো লাগে, পূর্ণ চোখে তাকাই ওর দিকে।
      
    -----
      আজও তাকিয়ে আছি, অরণ্য!  দু-বছরের সম্পর্ক ছেড়ে আমি পালিয়ে এসেছি আলমোড়ায়। সঙ্গে এনেছি ছোট্ট অরণ্যকে, ওকে নিয়ে কোনো জটিলতায় যেতে চাইনি। অরণ্যর সঙ্গে জীবন কাটাতে চেয়েছিলাম,  কিন্তু কী যে পাগলামি ওর -  বিয়ে করতে চাইল না, বিয়ের কনসেপ্টে ওর বিশ্বাস নেই নাকি!
    “তোমাকে ছেড়ে থাকতে পারছি না আর! কবে আমরা একসঙ্গে থাকব, অরণ্য?” মোবাইলের এপারে আমার গলার স্বর অকম্পিত, কিন্তু চোখে যে জল তা বুঝতে দিতাম না।
    “সম্পর্কটা ভেঙে ফেলতে চাইছ কী? ভালেবাসাকে খুন করতে চাইছ? শেষে আমরা খুনী হবো, বীথি?” আমি রাগ করে উত্তর দিই না।  ও বলে একটু পর, “বিয়ে হলেই প্রেমটা চলে যাবে, সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যাবে চাল চিনি তেল নুনের হিসাব করতে করতে। তাছাড়া এরকম একটা রাখালবাগালকে বিয়ে করে তুমি সুখী হবে না, আমার সঙ্গে বাহাত্তর ঘন্টা থাকলেই জীবন-মৃত্যুর সিদ্ধান্ত হয়ে যাবে, আর বুঝবে আমি কতটা গাঁওয়ার।   আমাকে বেশি পাবেও না, তুমি তো জানো, পথে প্রান্তরে জলে জঙ্গলেই আমি ভালো থাকি। ঘরের বাঁধনে আমি হাঁফিয়ে উঠব। তখন তুমিই বলবে, জংলীটার সঙ্গে থাকা যায় না, হয়তো আমার বাপ-ঠাকুর্দা-বংশ-টংশ তুলে ফেলবে। আমি সেটা সহ্যই কররতে পারব না! তাছাড়া আমার অনেক কাজ, বীথি! সংসারে ঢুকে গেলে সব পন্ড হয়ে যাবে। নিজের কাছে নিজের জীবনের অর্থটাই হারিয়ে যাবে। - বিয়ে সংসার আমার জন্য নয় গো! রাগ কোরো না তুমি।”
       অনেকগুলো বছর আমিও সমুদ্রকে মনের সঙ্গে সেলাই করে রেখে,  ওকে ভুলব না, ও যখন নেই তখন কাউকেই বিয়ে করব না –  এই ভাবনার ভেতয় পড়ে আমার করা হয়ে ওঠেনি বিয়ে। অরণ্য এক ঝলক শীতল বাতাসের মতো বয়ে এসে আমার মনের সব গুমোট কাটিয়ে দিয়েছিল। অনাড়ম্বর উপস্থিতি দিয়ে ও আমার মন দখল করে নিয়েছিল।  আমি ওর সঙ্গে জীবন কাটাতে চাইছিলাম।

         ওর একটা গরীব স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা আছে –‘অমৃত’। সেটার আর ওর কীভাবে চলে ও-ই জানে। যারা ওর সংস্পর্শে এসেছে, তারা ওকে ভালো না বেসে পারে না,  একেবারে জন্মের শোধ বাঁধনে জড়ায়, তারাই ওকে অক্সিজেন দেয়। দু-তিনজন জুনিয়র ছেলেমেয়ে আছে কর্মী হিসাবে, তাদেরকে বেতন দিতে পারে না। তারা এবেলা ওবেলা কাজ ছাড়ে বটে, তবে পরের দিনই আবার হাজিরা দেয়। কিছু বিদেশবাসী বন্ধু ওকে ডোনেট করেন – তাতেই সার্থকনামা হয়েছে এনজি-র সঙ্গার “নন প্রফিটেবল অরগ্যানাইজেসন” শব্দবন্ধ। কর্মীরাই কাজ করেন, তবে ওর নজর ঠিকই থাকে, দায়িত্ব -কর্তব্যে অবহেলা করে না কখনও।  কারণ ‘অমৃত’ ওর প্রাণ। ও নিজেই বলে, “অমৃত আমার প্রাণ, ওর মাধ্যমেই স্বভূমি থেকে উৎখাত হওয়া এই দেহাতী যুবক নিজের ‘আইডেনটিটি’ খুঁজে ফেরে। অবহেলায় ডুবিয়ে দিয়ে ভুলিয়ে দিতে চাওয়া ইতিহাসকে প্রকাশ্যে আনার জোর পাই “অমৃত” আছে বলেই। --- এই জল-জঙ্গলের ভেতর ছিল আমার রাজ্যপাট, আর এরই ভেতর আমি একদিন ঠিক লীন হয়ে যাব, দেখো!” বলে হো হো করে দুর্লভ হাসিটা এক একসময় হাসত।

      এসব কথা প্রথম প্রথম শুনলে আমি আরও অনুরক্ত হয়ে পড়তাম, তবে পরের দিকে রক্তপাত হতো - অনিশ্চয়তার বোধ জন্মাত যা আমায় শান্তি দিত না একফোঁটাও। বুঝতে পারতাম, ও সংসার বাঁধবে না, অথচ আমি ভীষণ ভাবে চাইছিলাম।

        সে বছর মে মাসে রবীন্দ্রজয়ন্তীর সঙ্গে নিজের ছুটি জুড়ে নিয়ে ওর বাড়ি চলে গেলাম, নিজের বিয়ের প্রস্তাব নিজেই দেব বলে। বাড়িতে আছে কিনা জেনে নিয়ে সশরীরে হাজিরা দিলাম। এক দিদি ছাড়া আপন কেউ নেই ওর। দিদিও থাকে শ্বশুরবাড়িতে। আমি যখন পৌঁছোলাম ও তখন রান্নাঘরে খুন্তি নাড়ছে, কাঁধে গামছা ফেলা। বুঝতে না দিয়ে আমি চুপিচুপি গিয়ে চোখ টিপে ধরে পিছন দিক থেকে গালে চকাস করে চুমু খেয়েছি। ও চমকে চোদ্দ হয়ে হাঁসফাঁস করে হাত ছাড়িয়ে আমাকে দেখে  তো ভীষণ অবাক।
    “সারপ্রাইজ !” আমি বললাম। কপট রাগ দেখিয়ে আমার গলা জড়িয়ে ধরে রান্নাঘরের দেওয়ালের দিকে ঠেলে নিয়ে গেল।
    “আচ্ছা! বটে - !” বলে আমার ঠোঁট ভিজিয়ে দিল ওর উষ্ণ ঠোঁটজোড়া দিয়ে।
       দু-এক মুহূর্ত পরেই “যাহ্! তোমার তরকারি পুড়ে গেল” বলেই আমি হাসতে হাসতে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এসেছি।

      দুপুরে ওর বুকের উপর শুয়ে ডাকলাম, অরণ্যকুসুম!
    “এই নাম কবে থেকে?”
    “তোমার তো অনেক নাম, সব কি তোমায় জানতে হবে? তুমি বুনোফুলই তো! তাই এই নাম দিয়েছি”!
    “আচ্ছা! তাহলে আমায় মনে মনে গাধা গরুও ডাকা হয়?” বলে আমায় ঠেলে পাশে সরিয়ে দিয়ে আমার উপর শুয়ে পড়ে ঠোঁটে ঠোঁট ডুবিয়ে দিয়ে আমার বাকরুদ্ধ করে দিল। চঞ্চল হয়ে উঠেছে ওর করতল। শান্ত ছেলেটা অশান্ত হয়ে উঠল একসময়।

        জামাকাপড় গুছিয়ে নিয়ে ওর রমণক্লান্ত শরীরের পাশে শুয়ে ওর কপালের চুলগুলো গুছিয়ে দিতে দিতে বললাম, যদি একটা ছোট্ট অরণ্য এসে যায়?
    “সম্ভাবনা আছে নাকি?”
    “যদি -?”
    “আসবে। সে আমার কাছে থাকবে। আমার আইডেনটিটি খোঁজার একার লড়াইএ আমি তাকে এই জলজঙ্গলের সেনাপতি বানাব নিজের মনের মতো করে। তাকে দেশ চেনাব, প্রকৃতিকে চেনাব, আমাদের অতীত গৌরব তুলে ধরবে সে। এ দেশের প্রকৃত ইতিহাসের ধুলো ঢাকা মলাটটা সে উন্মোচন করবে।”
      আমি খুব অবাক হই, এভাবে তো সে কখনও কথা বলে নি আমার সঙ্গে! সেইভাব চেপে আমি রাগ দেখিয়ে অতি পাতি একটি কথা বলি, “কিন্তু তাকে বড়ো করবে কে, কে দেখবে তাকে?”
    “তুমি বছরখানেক থেকো এখানে  আমার বৌ হয়ে।  তারপর তুমি তোমার কাজে ফিরে যেও।”
    “অসাধারণ! কিছু বলার নেই আমার!” এবার আমার সত্যি সত্যি রাগ হয়ে যায়। চলে আসি বাইরের বারান্দায়। এক মুহূর্তও থাকতে ইচ্ছে করে না ওখানে।
      একটু পরে বাইরে এসে দাঁড়ায় আমার পাশে।  ওর হাত চেপে ধরে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে জিগ্যেস করি, “আমায় সত্যিই ভালোবাসো কিনা জানি না। অবশ্য বাসো বা না বাসো তাতেই বা কী করার আছে আমার!”
    “স্থির বিশ্বাস যখন কিছু নেই, তাহলে জানতেও চেয়ো না।”
    “অনিশ্চয়তা আমার ভালো লাগে না”। আমার উত্তর শুনে ওর মুখ গম্ভীর হয়ে উঠল, আর বিদ্যুৎচমকের মতো আমার মগজে খেলে গেল সমুদ্রগুপ্তের সঙ্গে শেষের দিনের সাক্ষাৎ। তখন আমি এখনকার থেকে উল্টো রোল প্লে করে বলেছিলাম, ‘আমার ভালো বাসা, না বাসায় যখন কিছু এসে যায় না তাহলে জানতেই বা চাইছ কেন?” তখন সেও বলেছিল ঠিক এই কথাটাই –“অনিশ্চয়তা আমার ভালো লাগে না।” সমুদ্রগুপ্ত সৎপথীকে এভাবে ভুলে গেলাম আমি? কতদিন তার কথা মনেও পড়ে না।  ইতিহাত কি এভাবেই ফিরে আসে?
          অরণ্যের উপর ক্রোধের বশে ভাবি সমুদ্রের অভিশাপ এটা। তার প্রতি একমুখী থাকতে পারিনি আমি।
     
            শেষ পর্যন্ত রাতে থাকতেই হলো।  অতদূর থেকে বাড়ি ফিরতে অনেকটা রাত হয়ে যেত। একটু আগেই সূর্য পিছলে নেমে গেছে পশ্চিম দিগন্তের রহস্যময় বনভূমির আড়ালে, যেমন করে আমার মনও অরণ্যের নির্জন বাড়িতে রাত্রিবাসের অসম্মতি থেকে সম্মতির দিকে পিছলে গেল! মনও কি কম রহস্যময়?  নিশ্চয় আমার অবচেতন মন থাকতেই চাইছিল।  যৌবনের প্রায় শেষের দিকে এসে দ্বিতীয়বার শরীরের স্বাদ পেয়ে ক্যাংলা হয়ে উঠেছিল এ শরীর, সম্ভবত অরণ্যও। আমাদের প্রথম মিলন বক্সার জঙ্গলে বেড়াতে গিয়ে। একরাত সেখানে থেকে পরের দিনই ফিরে এসেছিলাম। জোর করে ওকে নিয়ে গিয়েছিলাম সেবার।

       সম্পর্কের ভবিষ্যত বিষয়ে একটা হেস্তনেস্ত করে ফেরবার বাসনায় অরণ্যর বাড়ি গিয়েছিলাম। সেখান থেকে ফিরে সিদ্ধান্ত সেই নিতেই হলো আমাকে। মাসখানেক পর একটা অচেনা নম্বর থেকে ফোন আসে। ফোনটা ধরে “হ্যালো” বলতেই ওদিক থেকে এক মহিলা বললেন, “বনবীথি বলছ?”
          আমি ভীষন অবাক হয়ে যাই। এ নাম দ্বিতীয় কোনো ব্যক্তির তো জানার কথা নয়? তাহলে? ওই বিস্ময় নিয়েই জিগ্যেস করলাম, “আপনি কে বলছেন?”
    “আমি অরণ্যর দিদি। ওর বিয়ে ঠিক হয়েছে সামনের মাসে। তোমার নেমন্তন্ন রইল, ভাই! অবশ্যই আসবে। অরণ্য পরে তোমাকে কার্ড পাঠিয়ে দেবে। আসবে কিন্তু!” মহিলা ফোন ছেড়ে দিলেন।
            আমি হতোদ্যম হয়ে বসে থাকলাম, মাথা কাজ করছে না আমার। কী করব বুঝতে পারছি না।  অরণ্যকে ফোন করব? পরে ভাবলাম –  না, কখনও না, একটা হিপোক্রিটের সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক থাকতে পারে না। এদিকে পিরিয়েড হয়নি এ মাসে,  টেস্ট করলাম বাড়িতে কিট এনে। তখনই আমি মনস্থির করে ফেলেছি। পরের ক’টা দিন খুব সংগোপনে চাকরি থেকে অব্যাহতি নেবার প্রক্রিয়া সমাধা করলাম। কাউকে একটুও জানান না দিয়ে চলে এলাম আলমোড়া।

      কিন্তু আলমোড়াই কেন এলাম – এই নিয়ে ভেবেছি পরে। আলমোড়া অরণ্য আর আমার গল্পে বারবার আসত। দুজনে এখানে একসাথে বেড়াতে আসার পরিকল্পনাও করেছি আমরা। রবিশঙ্করের সেতারের আমি ভক্ত, আর অন্নপূর্ণারও। তাদের স্মৃতিময় এই জায়গা। অরণ্য বলত, “বেশ, আমরা একবার আলমোড়া বেড়াতে যাবই।” 

        তবে কি আমি পালিয়ে এসেও, দূরে সরে গিয়েও ফিরে আসতে চাইছিলাম?  এমন জায়গায় যাবো – একটু চেষ্টা করলেই আমাকে খুঁজে পাওয়া যাবে – এই গোপন বাসনাই কি ছিল আমার মনের অন্দরে? তাই শেষমেশ মনকে শক্ত করে আলমোড়া ছেড়ে কাছাকাছি একটা গ্রামে চলে গেলাম।

          চেনা পৃথিবী ছেড়ে ছোট্ট পুতুলটাকে শরীরে নিয়ে আসার সাহস যুগিয়েছিলেন আমার মধুসূদনমামা, ভানুঠাকুমা আর হয়তো বা সমুদ্রগুপ্তও! ভানুঠাকুমা তো বলেইছিলেন, নিজের মনের কথা শুনবি। সেইজন্যই অরণ্যকে আমি ক্ষমা করতে পারছি না, একটা মানুষ আপাদমস্তক এত ভন্ড হতে পারে আমি ভাবতে পারিনি। কেন এমন করল?  নিজের কথা নিজে বলতে পারল না?  সে তো এত দুর্বল নয়!  ধরে নিলাম, আমার প্রতি প্রেম বাঁচিয়ে রাখতেই আমাকে বিয়ে না করে অন্য কাউকে করছে। তাহলে ভাবী অরণ্যকে নিয়ে স্বপ্ন দেখল কীকরে?  সবটাই কি তার কথার কথা!। এই যদি তার বিবেচনায় আসে, তাহলে ছোট্ট অরণ্যের সত্যি আগমন সংবাদ পেলে সে  কি মেনে নিতে পারত?  কে জানে! দিদির মাধ্যমে অপমান করার দরকার ছিল না। সরাসরি বললে আমি তাকে কখনই বাধা দিতাম না। অত নির্বোধ, আত্মসম্মানবোধহীন আমি নই সে তো জানত।
         এরপর অরণ্য যখনই আমায় কল করেছে আমি ফোন কেটে দিয়েছি, বারবার। দিদিকে আমার ফোন নাম্বার সে না দিলে দিদি পেলেন কীকরে, কীকরে জানলেন আমার বনবীথি নাম?    লজ্জায় অপমানে আয়নায় নিজের মুখের দিকে তাকানো ছেড়ে দিয়েছিলাম আমি।

       অরণ্যকে এভাবে ছেড়ে আসা কি ঠিক হলো?  ওর পক্ষে এটা শাস্তি হয়ে গেল না তো?  অনেক দিক দিয়ে ভেবেছি। ভুল কিছু করিনি বলেই মনে হয়েছে আমার। ভুল করেছিলাম অরণ্যকে চিনতে। একটা হিপোক্রিট!
          এখানে এসে একটা বেসরকারী স্কুলে বাচ্চাদের পড়ানোর চাকরি নিলাম। এছাড়া ওই স্কুলেই লাইব্রেরির বাড়তি দায়িত্ব সপ্তাহে তিনদিনের। আমার ছেলে কুড়চি গুটিগুটি হাঁটতে শিখেছে। আমি হাত বাড়ালে খিলখিল করে হেসে ঝাঁপিয়ে পড়ে আমার কোলে। অরণ্য এসব স্বর্গীয় দৃশ্য ও আনন্দ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে ভেবে ওকে মনে মনে করুণা করি। কুড়চির পোশাকি নাম রেখেছি অরণ্যবীথি।  
      এখানে জীবনযাত্রা খুব সহজসরল, মানুষগুলিও। অহেতুক নাক গলায় না আমাদের মা ছেলের সংসারে। তবে গ্রামের মানুষজন ভালোবাসে ভীষণ। নিজের ছেলে আর গ্রামের অন্য বাচ্চাদের সঙ্গে দিব্যি সময় কেটে যাায় আমার। একটা ছোট্ট বাগান করেছি, সবজি আর ফুলের। এরকম বাগান এখানে সব বাড়িতেই থাকে। রমাদিদি আছে আমার আর কুড়চির দেখাশুনা করার জন্য। রমাদিদি পাহাড়ি মানুষ, বড়ো ভালোবেসে আমাদের মা -বেটাকে আগলে রাখে।

       শুধু রুটিন মাফিক দিন কাটাতে কাটাতে মাঝে মাঝে বড়ো ক্লান্ত হয়ে পড়ি। নিজের গ্রাম, বাড়ির মানুষগুলোকে, বৃদ্ধা মাকে, বিগত কর্মক্ষেত্রটিকে কখনওবা কোনো অলস অবসরে মনে পড়লে কষ্ট পাই।  ভুলতে চেষ্টা করি না আমি, তার দরকার নেই তো! এগুলোর সঙ্গে তো কোনো তিক্ততা লেগে নেই আমার।
     

      এতকাল জীবনের হারিয়ে যাওয়া পুরোনো গল্পগুলোকে খুঁজে বেড়িয়েছি। আজ পরিচিত জগৎ ছেড়ে একার বর্তমানে এসে বুঝেছি পিছনের দিকে হাঁটার কোনো মানে হয় না। তাই এখন আমি আমার নিজের গল্প নিজে তৈরি করছি, এক মধ্যবিত্তের সাধারণ গল্প। আর সেই গল্প কেবল আমার আর কুড়চির, মা আর ছেলের গল্প। সেই গল্প বাবা-চরিত্র বর্জিত। তবু নিজের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে  ভাবি, তার বাবাকে শাস্তি দিতে গিয়ে কুড়চিকে বঞ্চিত করছি কিনা। ভাবতে গিয়ে ফুঁসে উঠি, সে শুধু অরণ্যের সন্তান নয়, সে যে বনবীথিরও সন্তান। তাই সে সবটা বঞ্চিত হচ্ছে না;  তার ইতিহাস, তার পরম্পরার একটা অংশ তার অজানা থেকে যাবে হয়তো। না, তাও তো নয়! সময় হলে তার সামনে আসবে কুড়চি। তারপরের সিদ্ধান্ত হবে কুড়চির নিজের, আর বাকিটা ভবিষ্যতের হাতে।
          বিকেলে যখন অন্যান্য বাচ্চাদের সঙ্গে কুড়চি খেলা করে, রমাদিদিকে তত্ত্বাবধানে রেখে আমি পাহাড়ি রাস্তায় নেমে যাই। প্রতিটি বাঁকের মুখে থমকে দাঁড়াই, আর অকারণেই মনে হয় খুব চেনা কেউ ওই বাঁক পেরিয়ে আমার সামনে এসে দাঁড়াবে।

       সমস্ত বাঁক অতিক্রম করে আমার সামনে তুমি কবে এসে দাঁড়াবে, অরণ্য?  

           দূরের পাহাড়ি শহরের টুনি আলোগুলো সব নিভে গেল। ঝিঁঝিঁ-র ডাকে আর রাতচরা প্রাণীদের চলাচলে রাতের পৃথিবী জেগে উঠছে। রাত নটাতে এই গ্রামে নিশুতি নেমে আসে। কুড়চি দুষ্টুমি করছিল, হাসছিল, ছুটছিল, তারপর ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। রমাদিদিও পাশের ঘরে ঘুমিয়ে। বারান্দায় পা ঝুলিয়ে বসেছিলাম মাথা ও গা চাদরে ঢেকে। মোবাইলে নেট অন করে উপর নীচ  বাম ডান করতে করতে নেমে এসেছি বারান্দা থেকে। নেট এলে আমি প্রথমেই অরণ্যর প্রোফাইলে ঢুকি। ওর প্রোফাইল অধিকাংশ সময় নীরব থাকে। যখন সরব হয় হতাশার ছায়া লক্ষ্য করি সেখানে। আমার পুরনো ফেসবুক অ্যকাউন্ট বীরভূমের বাড়িতে থাকতেই মুছে ফেলেছিলাম। এখন অনামিকা নামে একটা অ্যাকাউন্ট খুলেছি দূর থেকে কেবল অরণ্যকে দেখব বলে। ব্যক্তিগত জীবন ও কখনও ভার্চুয়াল দুনিয়ায় আনে না, তাই ওর নবনির্মিত সংসারের খবর পাই নি এখনও পর্যন্ত । কিন্তু আজ কী দেখছি!  বড়ো বড়ো করে লেখা, বীথি! যা জেনেছিলে সব ভুল। ভুল থেকে কখনও কিছু সৃষ্টি বা নির্মাণ হয় না। তবু সিদ্ধান্ত তোমারই।  

         কিচ্ছু দেখতে পাই না, মোবাইলের স্ক্রিন ঝাপসা, পাহাড়ী নদীর মতো খরস্রোতা কান্না আমার ঠান্ডা গালকে আরাম দিলো।  অপমানে যে কান্নার উৎস বন্ধ হয়ে গিয়েছিল একদিন আজ অপমানের মোচনে সেই উৎস খুলে গেলো।  অরণ্যের দ্বারা প্রতারিত হতে হয়নি আমাকে!

         বারান্দায় বসে ঠকঠক করে কাঁপতে থাকি। ঠান্ডায়, নাকি মানসিক উত্তেজনায় তা জানার দরকার হয় না আমার।  কয়েক পল ভাবনার অতলে ডুব দিলাম। মদুসূদনমামা, সমুদ্রগুপ্ত আর ভানুঠাকুমার দিকে তাকাই –  কী নির্দেশ আসে দেখি, নীরব প্রকৃতিও কিছু সংকেত দেয় কিনা! কিন্তু কিচ্ছু না, সব স্থির।
           বুক ভরে শ্বাস নিই, মন বলে, ফিরে যাব না আমি। কুড়চি শুধু আমার। অরণ্যের সঙ্গে ওকে ভাগ করে নিতে পারব না, ওর পরিচয় নিয়ে কাউকে বিদ্রুপ করার সুযোগও আমি দেব না।

           অরণ্যের প্রস্তাবের সবটুকু তো  গ্রহণযোগ্য ছিল না!  সে ওকে একপেশে শিক্ষায় শিক্ষিত করত, তা আমি হতে দিতে পারি না। এ দেশ শুধু ওর পূর্ব পুরুষদের ভূমি নয়,  বরং তাঁদের পরম্পরা ও সময়ের ধারা বেয়ে পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে যেভাবে এসে আজ এখানে পৌঁছেছে এ দেশ যে তারও অংশ! ভালো বা মন্দ সে নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে, কিন্তু তাকে অস্বীকার করলে দেশের ইতিহাস খন্ডিত হয়ে যায় নাকি?  তাই আমার ছেলে একজন পরিপূর্ণ মানুষ হবে –  একজন স্কয়ার মানুষ হয়ে সে সিদ্ধান্ত নেবে কোন পথে সে যাবে। সেই ভিত সম্পূর্ণ না হলে মধ্যবিত্ত জীবনের কুটিলতা ও অসুস্থ প্রতিযেগিতার দুনিয়ায় ওকে নিয়ে ফেলতে চাই না। তাই এখান থেকে ফিরে যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। প্রাত্যহিক জীবনের শুধু রণ রক্ত সফলতাই নয়, পরম্পরাই নয়, উদার শান্তি ও সামান্যে সন্তুষ্টির ভেতর দিয়ে জীবনোপলব্ধিরও প্রযোজন আছে। সে উপলব্ধি এই মহিমময় উত্তুঙ্গ হিমালায় পর্বতের কোলে এর উদার প্রকৃতির সান্নিধ্যেই কেবল সম্ভব। এর বেশি আর কিছুই এখন আর ভাবার নেই আমার।

       দৃঢ় পদক্ষেপে ঘরে এসে কুড়চির পাশে বসে তাকিয়ে দেখি ওর পবিত্র মুখখানা। পরম নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে থাকা এই শিশু আমার শরীরের অংশ, অরণ্যের অংশ!  – ভাবতে আমার সর্বদাই আশ্চর্য লাগে। অবাক চোখে তাকিয়ে আছি, তবু ওকে দেখার আশ মিটছে না। তাকিয়ে থাকতে থাকতে বিভ্রম জাগে যেন অরণ্যই ঘুমিয়ে আছে এই শয্যায়! এই বোধের জাগরণে পুলকিত হচ্ছি, আর সব অবিশ্বাস, দ্বিধা –  সব বেদনা কেটে যাচ্ছে একটু একটু করে। সহজ সত্যিটা উপলব্ধি করে অনাবিল একটা সুখের মতো বোধ চারিয়ে যাচ্ছে হৃদয়ের চরাচরে; অরণ্য তো আছে এখানেই!   কুড়চির মধ্যেই তো রয়েছে ওর বাবা! আর অরণ্য যেখানে, বনবীথিও সেখানেই থাকবে! গল্পটা যে আমার নিজের তৈরি, তাই এতে কোনো বিচ্ছেদ থাকবে না, একে আমাদের জীবনে, আমাদের পরবর্তী প্রজন্মে কখনও লুপ্ত হয়ে যেতে দেব না। এই গল্প থেকেই অরণ্যের শেকড় কুড়চির ভেতর দিয়ে তাদের পুর্বপুরুষদের প্রকৃত ইতিহাসের প্রতিষ্ঠায় যাত্রা করবে।

      কিন্তু কুড়চি – এই ঘুমন্ত অরণ্যকুসুম কি নিজেকে শূন্যে বিস্তার করবে? তার মাটি, তার শেকড়কে তাকে তো জানতেই হবে!  যে অরণ্যে তার শেকড় তার সঙ্গে সংযোগ ঘটাবে কে – এই বনবীথি ছাড়া?  কিংবা আরও দূরগামী হারিয়ে থাকা শেকড়ের সঙ্গে সংযোগসূত্র যে ওই অরণ্য! তাই এই গল্পের ক্ষীণতোয়া নদী উৎস থেকে সমুদ্রগামী মোহনার দিকে এগিয়ে যাবে আবার উৎসে ফেরার জন্য।         

     
            
         
       
               
     

     
  • ধারাবাহিক | ২২ নভেম্বর ২০২২ | ১৮৯ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • নন্দিতা পাল। কৃষ্ণনগর। | 117.227.33.139 | ২৪ নভেম্বর ২০২২ ২০:০৯514120
    • অনন্য সাধারণ ভাবনা এবং যোগ্য সঙ্গতে বিস্তার। পাঁচটি পর্বে জীবনের পাঁচ দিকদর্শন একমুখি চলনে একজীবনকে পূর্ণতা দিয়েছে।  
    • ভালো লেগেছে নতুন শব্দ তৈরি করা, চরিত্র অনুযায়ী ভাষার চলন বদলে যাওয়া,  চরিত্রের পাশে থাকা সমান্তরাল প্রকৃতিকে, দেশীয় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির মূল্যবোধকে চরিত্রের অনায়াস অর্জিত উত্তরাধিকারে পরিণত করার মুন্সিয়ানায় একটি নিটোল গল্পে ফুটিয়ে তোলায়, এবং সর্বাত্মক ইতিবাচক দিকদিশায়।
    • ভালো লেগেছে। পরিতৃপ্ত। 
  • Krishna Malik (Pal ) | ২৪ নভেম্বর ২০২২ ২২:৩০514125
  • ধন্যবাদ ও শুভেচ্ছা। নন্দিতা পাল।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। আলোচনা করতে মতামত দিন