এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  ধারাবাহিক

  • হারানো গল্পের খোঁজে - একটি নভেলা

    Krishna Malik (Pal ) লেখকের গ্রাহক হোন
    ধারাবাহিক | ১৪ নভেম্বর ২০২২ | ১৭৪ বার পঠিত
  • দরজাটা ঠেলে খুলতেই একটা দুর্গন্ধের ঝাপট নাকে এসে যেন গুঙিয়ে উঠল। ঘরের জানলা দুটো বন্ধ থেকে আজীবনের আঁধার ঘনিয়েছে। মাটির মেঝেতে পাতলা পায়খানা শুকিয়ে, পেচ্ছাবের গড়িয়ে আসা দাগ। একঘর বিজলি আলোর ভেতর পায়খানা পেচ্ছাবের পাশে ভানুঠাকুমার এলোমেলো শরীরটা পড়ে আছে। সাদা থান ভিজে হলুদ হয়ে আছে। দেখেই বোঝা যায় নিথর হয়ে গেছে তাঁর শরীর। তাঁর মুখে বসা একটা মাছি ভন ভন করে উড়ে খুশিতে চারপো হয়ে মেঝের পায়খানার উপর বসল। কত ন্যক্কারজনক জিনিসও পৃথিবীতে কারও না কারও কাছে খুশির কারণ হয় – ভেবে বমি পেয়ে যায় আমার।

      আমি দু-চার মুহূর্ত অচল ও স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলাম, আচমকা পায়ের নীচের মাটি দুলে উঠলে টলতে টলতে পিছিয়ে যাই। সূর্য না উঠলেও মনের ভেতরকার মতন ঝুঝকো হয়েছে চারদিক। উঠোনের দক্ষিণ দিকে প্রাচিরের গায়ে কেবল আমগাছের ঘন ডালে পাতার ফাঁকে ফাঁকে তখনও ঘুম লেগে থাকা অন্ধকার; সেই অন্ধকারকে ঝাঁকুনি দিয়ে একটা কাক খুব কা কা করে ডাকতে থাকল। আরও একটা কাক উড়ে এলো কোথা থেকে। সেটাও গলা মেলাল চঞ্চল হয়ে, বিপদের গন্ধ পেয়ে যেমন প্রাণিকুল চঞ্চল হয় প্রাকৃতিক স্বভাববশত। বৃষ্টির আগে যেভাবে পূর্বাবাস পেয়ে ঘর-গেরস্থালী আর অনাগত সন্তানসম্ভবা ডিমগুলি সামলাতে উঠেপড়ে লাগে পিঁপড়ের দল। ঝড় বাদলের আগে পিঁপড়েদের এই দৃশ্য দেখলে আমার ভীষণ কান্না পায়। মনে হয়, যেন গাঙপাড়ের মানুষেরা কাঁথা-মাদুর আর সন্তান কোলে লন্ঠন হাতে উঠে আসছে কোন স্কুল ঘরে। কিংবা দেশ হারানো মানুষ কাঁটাতার ডিঙিয়ে, অথবা নিজভূমে পরবাসী উৎখাত হওয়া মানুষ মাথায় বগলে সংসারপাতি নিয়ে ক্রমাগত হেঁটে চলেছে নিজস্ব ঠিকানা আর আত্মপরিচয়ের সন্ধানে। এর ভেতর ডুবন্ত মানুষের হাঁসফাঁস আছে, অনেক অনেক কান্না আছে – না, ঠিক কান্না নয়, ক্রন্দন।
      কাক, কুকুর এই সব প্রাণীরা গেরস্তের বাড়িতে যে বিপদ আসতে চলেছে তা আগাম বুঝতে পারে, এই রকম নানান খনা বা ডাকপুরুষের বচন বয়স্করা বলে থাকেন বটে! ভানু ঠাকুমাও কখনও কখনও তাঁর জীবনের বিশ্বাস, সংস্কার ও অভিজ্ঞতাগুলি আমার সঙ্গে গল্প করতে করতে তুলে ধরতেন। নিজের জীবনেরও কত গোপন কথা অনায়াসে বলতে পারতেন। নিজের কাঁচাপাকা কদমছাঁট চুলে আত্মসান্ত্বনার মতো হাত বুলিয়ে নিতেন সেসব কথার ফাঁকে ফাঁকে।  

      এই তো মাত্র ক’মাস আগেই দুয়ারে পা ঝুলিয়ে বসে গল্প করছিলাম ঠাকুমা আর আমি। কথা নেই বার্তা নেই তাঁর পোষ্য কুকুরটা আচমকা আকাশের দিকে মুখ তুলে কেঁদে উঠল। একবার  - দু’বার – তিনবার – চারবার ---।
    “দূর বাবা! ভারী অস্বস্তিকর তো!” আমি বিরক্তি নিয়ে বলে উঠি।
    “দূর হ! কাঁদিস না তো ভোলা! ---জানি না, কারও আপদ বিপদ হলো কিনা!” ভানু ঠাকুমাও বেশ খানিকটা চিন্তাকুল গলায় বললেন।
             অথচ আজ এই বাড়িতে সত্যিই তো বিপদ! ভুলো ভোলা উঠোনে দাঁড়িয়ে আমার দিকে মুখ তুলে তাকিয়ে লেজ নেড়ে চলেছে।      

       আচমকা জেগে উঠি, সঙ্গা ফিরে আসে আমার। উঠোনের ওপাশের দক্ষিণ দুয়ারী বড়ো বাড়িতে বিভুকাকুরা আছেন, ওনাদের ডাকা দরকার।ভানুঠাকুমার চারচালা ঘরের উঁচু দুয়ার থেকে লাফ দিয়ে উঠোনে নেমে ছুটে পার হয়ে যাই। ভোলাও পিছনে ছোটে। একইভাবে লাফিয়ে ওই বাড়ির দুয়ারে উঠে দরজায় ধাক্কা দিলাম, “বিভুকাকু –  ও বিভুকাকু!
    ডাকতে গিয়ে কান্নায় আমার গলা কেঁপে ওঠে। দরজা খুলে বেরিয়ে আসেন কাকু কাকিমা দুজনেই।
      “ঠাকুমা! --”  আমি আর কিছু বলতে পারি না।
       বিভুকাকু দুয়ারে পাতা চেয়ারে বসে বিরস বদনে তাকিয়ে থাকেন সামনের দিকে। কাকিমা গায়ে আঁচলটা টেনে দিতে দিতে খুব অবাক হয়ে কপাল কুঁচকে জিগ্যেস করলেন, “এত সকালে তুমি কীকরে জানলে? আমরা শেষ রাতে দেখেছি, তখন কাউকে ডাকিনি, সকালের অপেক্ষায় ছিলাম। কিন্তু তুমি জানলে   কীকরে?”
      এর উত্তর দেওয়া কষ্টকর। অবিশ্বাস্য ও মিথ্যাচার মনে হবে। কীকরে বলব, ঠাকুমা নিজেই আমাকে ডেকে এনেছেন?
         অদ্ভুত একটা অস্বস্তি হচ্ছিল ঘুমের ভেতর। জল তেষ্টা পেয়েছিল কী? কিন্তু চোখ খুলতেও পারছিলাম না ঘুমের প্রাবল্যে, উসখুশ করতে করতে ঘুমটা ভেঙে গেল। দেখলাম সকাল হয়ে গেছে। ঘরের বাইরে থেকে ভানুঠাকুমা ডাকছেন, “ও মৃণ্ময়ী! ওঠ না রে! খুব কষ্ট হচ্ছে।”  ঠাকুমার গলা ক্ষীণ হয়ে এলো আসতে আসতে।
    “কী হয়েছে, ঠাকুমা? কী কষ্ট হচ্ছে?” বলে আমি ছুটে যেতে চেষ্টা করি, কিন্তু যেতে পারি না। এক পা-ও এগোতে পারি না আমি।
      আমায় মিতুন ঠেলা দিল, “এই দিদি, কী হলো? পাশ ফিরে শো”।
         তার মানে আমি ঠাকুমাকে স্বপ্নে দেখছিলাম? এত জীবন্ত স্বপ্ন হয় নাকি? ঘুম ভেঙে খুব বাজে গন্ধ পেলাম কী? নাকি আমার মনের ভুল ছিল? কোনো আধ পচা ফুলের গন্ধ জানলার বাইরে কোথাও থেকে আসতে পারে। কারণ বাড়ির পুজোর ফুল অনেক সময় ঠাকুরঘরের জানলা দিয়ে মা জ্যেঠিমা ফেলে দ্যান । কিন্তু এমন স্বপ্ন কেন দেখলাম? ভানুঠাকুমার কি কিছু হয়েছে? আজ ওনার শরীরটা খুব একটা ভালো ছিল না, তার উপর মনও খারাপ ছিল। ভাসুরপোর সঙ্গে জমিজায়গা বিক্রিবাটা নিয়ে মন কষাকষি চলছিল দুদিন ধরে। দুদিন খাওয়া দাওয়াও ঠিক করে করেননি।  ভাসুরপো বৌ কিছুটা জোর করেই খাওয়াতে পেরেছিলেন পড়তি দুপুরে। গতকালও একই ব্যাপার। এইসব ভাবতে ভাবতে ঘুম এসে গেল আবার। কিন্তু ঠিকঠাক হলো না, ছেঁড়া ছেঁড়া ঘুমের ভেতর একটা কাঁটা খচখচ করতে লাগল। কিছু কি সত্যিই হয়েছে ঠাকুমার?

         ভোর হতেই বাথরুম সেরে চলে এসেছি। সদরের দরজা ভেজানো থাকলেও হুড়কো ছিল না তাতে। ভোলা কুকুরটা – আশ্চর্য! দরজার সামনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিল নাকি কারও আসার?  আমাকে দেখে একবার ভৌ করে উঠেই কুঁইকুঁই করতে লাগল। বুকটা ছ্যাঁৎ করে উঠল আমার। ছুটে ঠাকুমার ঘরের কপাট খুলে দিলাম।

       এসব কথার কী বলব আমি? বরং উত্তরে বললাম, ঠাকুমার শরীর তো ঠিক ছিল না, তাই ঘুম ভাঙতে কী মনে হলো চলে এলাম। দরজা খুলে দেখি ঠাকুমা মেঝেতে পড়ে আছেন। ঠাকুমা আর বেঁচে নেই, বেশ বুঝতে পারছি।” আমার কান্না এবার চেহারা পায়। কাকিমা নাক টানতে থাকেন।
      আমি এবার ঠাকুমার ঘরে ঢুকে পড়ে তাঁর মাথাটা কোলে তুলে নিই। শরীরে তখন উষ্ণতা নেই একটুও, শক্ত হতে শুরু করেছে নিষ্প্রাণ দেহ। ফিসফিস করে বললাম, তুমি আমায় ডেকেছিলে ঠাকুমা, আমি বুঝতে পারিনি গো! ক্ষমা করো আমায়।

       ---
    ভানুঠাকুমা আমার নিজের কেউ নন, গ্রাম সম্পর্কে ঠাকুমা বলি। তিনি একা মানুষ।কোনো কোনো মানুষ যেমন বিশ্বসংসারে একা হন, নিরাসক্ত স্বভাবত উদাসীন ও বিষণ্ণ। ঠাকুমা বহুদিন হলো তাঁর স্বামীকে হারিয়েছেন। শৈশবে মাতৃহীন, কৈশোরে পিতৃহীন দুই ভাসুরপোকে তাঁরা স্বামীস্ত্রী বড়ো করেছিলেন। বড় ভাসুরপো কুড়-একুশ বছর বয়সে বোম্বে চলে গেলেন কী কাজ নিয়ে।কাকার মৃত্যুর বছরখানেক পর ফিরে এসে নিজের প্রাপ্য জমির ভাগ বিক্রি করে দিয়ে সেই চলে গেছেন, আর আসেননি কখনও। বিভুরঞ্জন কলকাতায় ছোটখাটো কী নাকি একটা কাজ করতেন, সেখানে নিজেই বিয়ে করে সংসার পেতেছিলেন। এখন তিনি নিজেই প্রৌঢ়। থাকেন ছোট ছোট দু-কামড়ার শোবার ঘর আর একফালি রান্নাঘরের ফ্ল্যাটে। ঠাকুমা বলেন, পায়রার খোপ।
    “আমার এত দমবন্ধ লাগছিল, দু-দিন থেকেই পালিয়ে এলাম।” ভানুঠাকুমা বলছিলেন। তুলসীতলা থেকে একটা শুকনো আমপাতা কুড়িয়ে একপাশে ফেলে এসে বললেন, “তুইই বল, মৃণ্ময়ী! এখানে অমন বাড়িঘর পুকুর জমি ছেড়ে সেই পায়রার খোপে কোন সুখে সে আছে? আমার কথা নাহয় নাই ভাবল, আমি তো আর মা নই। কিন্তু তার বৌ ছেলেদের সে ওইভাবে রাখে কীকরে? কোনো দায়িত্ববোধ নেই তার? বছরে দুবার আসবে, একবার চাষ করাতে আর একবার ফসল তুলতে। ইদানীং তার মাথায় চেপেছে সম্পত্তি বিক্রি করে পাকাপাকি গাঁয়ের সঙ্গে সম্পর্ক ছিঁড়ে ফেলার। ওই টাকায় বড়ো ফ্ল্যাট কিনবে। আমার ভাগ বেচে আমাকেও ওদের সঙ্গে যেতে হবে, আমাকে নাকি এই বয়সে একা ফেলে রেখে যেতে পারবে না -! হুঁ! সোমবচ্ছর গেল চোখের জলে, কী করব, মা বর্ষাকালে! বৌমা বলল, কাকিমা, আপনাকে আর এই বয়সে হাত পুড়িয়ে খেতে হবে না। আহা! কত দরদ ওদের। যেন ওরা আমাকে রেঁধে বেড়ে খাওয়াল সারা জীবন?  আমি বললাম, আমি তো একা নই? কঙ্কা বঙ্কা আছে, মৃণ্ময়ী আছে। আমি তো দিব্যি আছি, বাছা! কলকাতা ছেড়ে একবার এসেছি, সেখানে মরতে থাকতে যাব কেন এই বয়সে?
         হুঁ! সম্পত্তি বেচবে! পরে কীকরে সংসার চলবে সে চিন্তা নেই ছেলের। ওর দুই ছেলে তো বাপের কাছ থেকে সরে গেছে। তবে তাদিকে টাকার জোগান ওকেই দিতে হয়। তাদের রোজগারের টাকায় চলে না, ওই জমির ফসল বেচেই  তার সংসারের অভাবে ঠেকনা দিয়েছে, এখন ছেলেরাও তাতে ভাগ বসাতে চাইছে। সবই বুঝতে পারি ওদের কথার ভাঁজ থেকে। তো আমি বলি, তোমার কলকাতা শহরে এই বুড়ো বয়সে থাকার দরকার কী? নিজের গাঁয়ে ঘরে এসে থাকো। এখানে সংসার চালাতে খরচও কত কম। তা সে শুনলে তো! বোকার হদ্দ্ একটা।”
       এসব কথার উত্তর হয় না, তিনি চানও না।  তাঁর একজন শ্রোতা চাই কেবল। একা একা ঘুরে বেড়ান। এত বড়ো বাড়ি পাহারা দিয়ে চলেছেন।কঙ্কা-বঙ্কা দুই ভাই আর তাদের পরিবার ঠাকুমাকে আগলে আছে বহুদিন। ওই দুই বিশ্বস্ত সেনাপতিকে নিয়ে তাঁর সাম্রাজ্য রক্ষা করে চলেছেন তিনি। বিধবা হবার পর বিভুরঞ্জনের জমি, তাঁর জমি সবই চাষ করান কঙ্কা বঙ্কাকে দিয়ে। বাড়িঘর বাজারহাট – কিছুই তাঁকে চিন্তা করতে হয় না।

        এই তো মাত্র ক’মাস আগে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরেছিলাম। বিকেলে মা বলল, তোর ভানুঠাকুমাকে কয়েত দুটো দিয়ে আয়। কদিন আগে দেখা হতে কথায় কথায় বলছিলেন, বৌমা, কতদিন কয়েতমাখা খাইনি।আজ গনশা দিয়ে গেছে,  ঠাকুমাকেও দিয়ে আয় দুটো।
      -ভানুঠাকুমা! কোথায় গেলে? উঠোন থেকে ডাক দিলাম আমি।
         ঘরের ভেতর থেকে ডাকলেন, আয়! চা খাবি?
    “নাগো! এইমাত্র তো খেয়ে এলাম। তুমি চা নিয়ে বাইরে এসো। তোমার জন্য পাকা কয়েত নিয়ে এসেছি।”
       কয়েত দেখে বুড়ি খুব খুশি। নাক ঠেকিয়ে পাকা কয়েতের গন্ধ শুঁকলেন। -কোথায় পেলি রে? কাল তোর অফিস নেই তো? জলখাবার বেলায় আসবি। আমি মেখে রাখব।
    “অফিস তো আছেই। কয়েতমাখা খাবার জন্য ছুটি নিতে পারব না, ঠাকুমা! ও তুমি একাই খেও।”
    “একটা খাব, বাকিটা রোববারের জন্য রেখে দেব ফ্রিজে। সেদিন দুজনে একসঙ্গে খাব, বুঝলি?” ঠাকুমার কথায় আমি হেসে সম্মতি জানালাম।
       চায়ে চুমুক দিয়ে আমার গায়ে হাত বুলিয়ে দিলেন একবার।বললেন, “হ্যাঁরে! রাতে ঘুমোচ্ছিস না ভালো করে? চোখমুখের কী অবস্থা করেছিস, আয়নায় তাকিয়ে দেখেছিস একবার?  শোন, দুঃখকে বয়ে নিয়ে যেতে হয় ঠিকই, কিন্তু সে যেন ভার হয়ে না যায়, দেখিস। নিজেকেও তো বইতে দিতে হবে। যদি দুঃখ শুধু কষ্টই দেয়, তোর চলার রাস্তায় বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে তাকে ছেড়ে অন্য রাস্তায় সরে যাবি। কারণ সে তোকে আর কিছু দিতে পারবে না।”
      আমি ঠাকুমার কাঁধে হেলান দিয়ে বসে রইলাম।ভাবি, ঠাকুমার মতো অল্প শিক্ষিত মানুষও এমন করে কথা বলতে শিখলেন কীকরে? দাদু ভালোই গড়ে নিতে পেরেছিলেন তাহলে! সৎপথীর মৃত্যুর পর এতগুলো বছর পার হয়ে গেলো। তবু আজও কত সহজে তার নামে চোখে জল আসে আমার। রাতের পর রাত কয়েকটা স্মৃতি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে ভাবি। অনুশোচনা যেন আর যাবেই না।
      যে কথা বাড়ির বড়রা জানেন না, সে কথা ভানুঠাকুমাকে অনায়াসেই বলতে পারি।
      সমুদ্রগুপ্তের মৃত্যুর পর মনে মনে ভীষণ একলা হয়ে পড়েছিলাম যেমন, তেমনই অসহায় আর একলা মানুষদের প্রতিও খুব দরদ অনুভব করতে শুরু করেছিলাম। যতটা সম্ভব সাহায্য করতে চেষ্টা করতাম তাদের, আজও করি।তাঁর সংস্পর্শে এসে তাই আমরা দুজন দুজনের সহায় হয়েছিলাম। তিনি বলতেন, মৃণ্ময়ী, আমার জন্য কাল ফেরার সময় এই আনিস, ওই আনিস।আমাকে একটু এই খাওয়াস, ওই খাওয়াস ইত্যাদি।
      সে সময় কারও সঙ্গে আমার কথা বলতে ইচ্ছে করত না, বিষণ্ণ হয়ে থাকতাম। ভানুঠাকুমার বাড়ির সামনে পুকুর পাড়ে একটা তেঁতুলতলায় বসে ছিলাম চুপচাপ। হঠাৎ কারও গলা শুনে চমকে তাকিয়ে ওনাকে দেখি। আমার পাশে বসে বললেন,  কী হয়েছে, দিদি? এমন একা একা বসে আছো?
    “কিছু না তো ঠাকুমা!”
    “আমার মাথাটা দেখেছ? চুল একটাও কালো নেই, এমনি এমনি বুঝি?” বলে ছোট ছোট চুলগুলোতে একবার হাত বুলিয়ে নিলেন, যেটা তাঁর প্রায় একটা মুদ্রাদোষ। আমাকে এমনভাবে বাড়িতে ডাকলেন আমি না করতে পারলাম না। এর আগে এত ঘনিষ্ঠভাবে কখনও তাঁর সঙ্গে কথা হয়নি। বুদ্ধিমতি মহিলা, আমাকে কিচ্ছু বললেন না আর, নিজের কথা বলতে লাগলেন। উঠোনে দুটো বেতের মোড়া পেতে আমাকে বসতে বলে তিনিও একটাতে বসলেন। আমগাছের উপর দিয়ে মৃদু হাওয়া বয়ে যাচ্ছে, তখনও রোদ পাতার উপর দিয়ে পিছলে গিয়ে নেমে আসছে উঠোনের মাটিতে। আলোছায়ার জলীয় প্রাঙ্গনের ভেতর নির্ভার খেলে বেড়াতে লাগল ঠাকুমার কথার রূপোলি মৌরলা। 
        “তোমার দাদু যখন মারা গেলেন তখন আমার কত বয়স জানো?  বিয়াল্লিশ বছর। এ বাড়িতে তিনি আমাকে এনেছিলেন আমার চব্বিশ বছর বয়সে। বাড়িতে কোনো মেয়েমানুষ নেই। বাড়ির বড়ো বৌ মারা গেলে পর ছেলেদের দেখাশোনার জন্য কিছুদিন গাঁয়ের এক বৌকে সারাদিনের জন্য রাখা হয়েছিল নাকি। তবে বছর দুয়েক পর সে কাজ ছেড়ে দেয়। চক্রবর্তীদের সেজ বৌ রান্নার কাজ করেছে বহুদিন, আমি আসার পর তাকে আমিই ছাড়িয়ে দিতে বলি,  বৌটাও অনেকদিন গাঁইগুঁই করছিল, ছেড়ে দেবে ছেড়ে দেবে করে। অসুবিধাও ছিল না ছেড়ে দিলে, আমি থাকতে অন্য কারও রান্না করার দরকার কী? তখন বাড়িতে উনি ছাড়া ওনার দাদা, আর দুই ভাইপো। তাদের একজনের বয়স দশ, একজনের চোদ্দো। বছরখানেক পরে ওনার দাদাও হঠাৎই মারা গেলেন ঘুমের ভেতর। দুই ভাইপোকে তাদের কাকা প্রাণ দিয়ে ভালোবাসতেন। আমিও তাদের যতদূর সম্ভব যত্নআত্তি করেছি। তবু বড়ো ভাইপো বাড়ি ছেড়ে চলে গেল বোম্বে। তিনি আঘাত পেলেও আটকালেন না। তারপর তো একদিন তিনিও মায়া কাটালেন।”

       তাহলে এ বাড়ির গিন্নি হয়েই তুমি পা ফেলেছিলে, বলো?
            “বাইরে থেকে সব কিছু পরিপাটি লাগে বটে, কিন্তু একটা জায়গা তৈরি করতে সময় লাগে। শোন মেয়ে, তোকে বলি। একথা গাঁয়ে একসময় খুব কানাঘুষো হয়েছে, আর যা হয়েছে সেটাও সত্যি, তবে আমি নিজে কখনও কাউকে বলিনি। আমার সঙ্গে তোর দাদুর বিয়েই হয়নি। আমি এক গরীব ভদ্রবাড়ির মেয়ে ছিলাম। বিয়ে হয়েছিল বটে, তবে স্বামীর ঘর করতে হয়নি। তার অন্য সম্পর্ক ছিল,  ফুলশয্যার রাতেই প্রথম মাার খেলাম। দ্বিরাগমনে বাপের বাড়ি এসে আর যাইনি। তবে লোকটার বাই উঠলে এসে বাড়ি নিয়ে যাবার কথ বলত।  তোর দাদু যে ছোট একটি মেসে থাকতেন আমি সেখানে আমার মায়ের বদলে কোনো কোনোদিন রাঁধতে যেতাম। ডানাকাটা সুন্দরী না হলেও চেহারাখানা ভালো ছিল, দেখতে শুনতেও মন্দ নয়। তোর দাদুর বয়স আমার থেকে অনেকটা বেশি হলেও সে একেবারে রাজপুত্রের মতো। সামন্তবাড়ির মানুষ, এই লম্বা ফর্সা তাগড়াই চেহারা। আমি খুব পটে গিয়েছিলাম, আমাকে নিয়ে একদিন ভোর বেলা চুপিচুপি পালিয়ে এলেন।”
    “তোমায় কোনোদিন অসম্মান করেননি? রেগে টেগে গেলে ---যতই হোক, বিয়েতো হয়নি তোমাদের।”
    “মন্ত্র পড়ে বিয়েটাই কি শেষ কথা ? মনই হলো আসল। আমার তো মন্ত্র পড়েই বিয়ে হয়েছিল। তা অমন কত বিয়ের পরও মানুষ হাহাকার করে মরে বলতো? কতজনের সংসার ভেঙে যায়, কতজনের বিয়ের খাঁচাটাই শুধু থাকে। সেই তুলনায় আমি তো রাজরাণী ছিলুম রে, মেয়ে! একবার সেই যে  মেসের ঘরে আমাদের শরীর হলো, তারপর দুজন দুজনকে আঁকড়ে ধরেছিলুম, কোনোদিন ছাড়াছাড়ি হয়নি। তার সম্পত্তির ভাগ আমাকে সব লিখে দিয়েছিলেন মারা যাবার অনেক আগেই। আমি বারণ করলেও শোনেননি, বললেন, যা করেছি ভেবেচিন্তেই করেছি।
    “তোমার ভাসুরপোরা মেনে নিয়েছিল?”
    “সে কি অশান্তি! বিভু কিছু না বললেও, ওর দাদা সমররঞ্জন ছাড়ল না। কাদা ছুঁড়তে লাগল। আমাকে উদ্দেশ্য করে কাকাকে বলল, তোমার ভীমরতি হয়েছিল, তাই এক বেশ্যা ডাইনি তোমার মাথাটা সহজে খেতে পেরেছে।--- আমি তো বটেই, ওর কাকা খুবই দুঃখ পেলেন ওর কথা শুনে।
    যাদেরকে মাতৃসম যত্ন ভালোবাসা দিয়ে এতগুলো দিন আগলে রাখল তার সম্পর্কে একথা তুমি বলতে পারলে? – কাকার এ কথা শুনে কী ঠাট্টার হাসি তার! তারপর জিগ্যেস করল, তুমি পারলে একজন বাইরের লোককে তোমার সম্পত্তি লিখে দিতে?
    কাকা বললেন, কে বাইরের লোক? তোমার কাকিমা?
    “কাকিমা না আরো কিছু! বিয়ে হয়েছে নাকি তোমাদের? একটা অবৈধ সম্পর্ক তোমরা বাঁচিয়ে রেখেছ।”
      এরপর উনি  তো খাপ্পা হয়ে গেলেন। বললেন, কোনো কৈফিয়ৎ তোমাদের দেব না। আমার সম্পত্তি আমি যাকে খুশি দিতে পারি।
          আমাদের প্রতি এত অবিশ্বাস? – সমু বলল।
     অবিশ্বাস করে যে ভুল করিনি তুমি এখন তোমার আচরণ দিয়ে প্রমাণ দিচ্ছ  - এই বলে এগিয়ে গিয়ে তিনি সমুর জামাটা ডান কাঁধ থেকে নামিয়ে দিয়ে বললেন, এই যে কালসিটে দাগটা রয়েছে – এটাও তোমাদের অবিশ্বাস করার কারণ।
       “কাকার এই একটি কথাতেই ফণা গুটিয়ে নিয়ে সমু বোম্বে পালিয়ে গিয়েছিল। আর আমি তো একেবারে আকাশ থেকে পড়লাম।” এই পর্যন্ত বলে তিনি অকস্মাৎ চুপ করে গিয়েছিলেন। সন্ধ্যে হয়ে যাওয়ায় উঠে পড়লেন, আর কথার মৌরলা মাছেরা তলিয়ে গেল কোথায়!    
    “বঙ্কা, গোয়ালে ধোঁওয়া দে।”  বলতে বলতে আমাকে বললেন, “দিদি, বাড়ি যা। এখন আমি ঠাকুরঘরে ঢুকব। আবার আসিস।”

      আমি মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। মনে হয়েছিল, ওই মানুষটার মধ্যে কিছু আছে যা টেনে রাখতে পারে। একটা বিষণ্ণতার সঙ্গে প্রশান্তিও তিনি অর্জন করতে পেরেছেন। হয়ত‌ো পাওয়ার ভাঁড়ার পূর্ণ হলে তবেই এই প্রশান্তি আসে! আমার হৃদয়বেদনা যেন সেই বিকেলে তাঁর জীবনের কিছু ঘটনা বর্ণনাতেই অনেকটা প্রশমিত করতে পেরেছিলেন। আমাকে আমার জীবন পথে এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছিলেন, আর আমার আত্মার আত্মীয় হয়ে উঠেছিলেন তখন থেকেই।
      পরের দিন সত্যিই না গিয়ে পারলাম না ঠাকুমার কাছে। নাছ দুয়ারের বাইরে বাঁধানো ধাপে দুজনে বসেছিলাম। আগের দিন ঠাকুমা যে কথা দিয়ে শেষ করেছিলেন সে কথাটাই জিগ্যেস করলাম।
    “সমররঞ্জনের কাঁধে কীসের দাগের কথা বলেছিলে, ঠাকুমা?”
          উত্তরে যা আমি শুনেছলাম তাতে করে মনে হয়েছিল, মানুষের ক্ষমার গুণ কত অপার হতে পারে। এই নিঃসংশয় তিতিক্ষা আজকের পৃথিবীতে কতটা জরুরি। কতটা জরুরি সামন্তদাদু আর ভানুঠাকুমার মতো উদারতা আর শিক্ষিত মন।মানুষের অন্তর্গত স্বভাবের উচ্চতা যা সব কুশ্রীতাকে, সব সংকীর্ণতাকে মুছে ফেলতে সক্ষম – সেই সম্ভাবনা আজও যেন কোথাও কোথাও ক্ষীণভাবে প্রজ্জ্বলিত।
    “তোমার দাদু আমাকে এ বাড়িতে আনার পর সবাই মেনে নিলেও সমুর চোখের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি বুঝিয়ে দিত সে আমাকে ভালোভাবে নিচ্ছে না। পরে খানিকটা ঠিক হয়ে যায় বটে তবু আমাকে অতটা পুঁছত না কোনোদিনি। আর দু-চার বছর পর লক্ষ্য করলাম বাড়িতে অন্যদের অনুপস্থিতিতে সমুর ব্যবহার পালটে যেত। ওর ঘর থেকে এটা দাও, ওটা দাও অর্ডার করত। ইচ্ছে করে আমায় ধাক্কা দিত সামনাসামনি বুকে বুক ঠেকিয়ে, ভঙ্গি করত যেন অন্যমনস্কতার কারণে ধাক্কা লেগে গেছে। মুখে কিছু লেগে আছে কি নেই, জানি না, সরিয়ে দেবার ছুতো করে বুকে হাত ঠেকিয়ে দিত।”
    “তুমি দাদুকে বলোনি?”
    “আমার বিশ্বাস করতে কষ্ট হতো রে, দিদি! মনে হতো আমার বোঝার ভুল, কিংবা আমার মনই পাপী, তাই এসব মনে করছি। অন্য সময় সে যে একেবারে অন্য মানুষ, কঠোর! তাই নিজে সাবধানে থাকতাম, বাবা-বাছা করে কথা বলতাম। মনে হলো, মাকে ছোট বেলায় হারিয়েছে, মেয়েদের সম্পর্কে হয়তো কৌতুহলের বশে করে ফেলছে, ও ঠিক হয়ে যাবে। বয়সটাই তো এরকম! কিন্তু একদিন রান্নাঘরে এসে আমায় জড়িয়ে ধরে আচমকা বুকে হাত দিল, ভাবতে পারিস? আমি প্রথমে ভেবেছি তোর দাদু নাকি? কিন্তু এরকম তো সে করে না কখনও! ওই এক মুহূর্তেই আমি ঘুরে দেখি সমু! আর হাতে গরম খুন্তি ছিল, দিয়েছি সজোরে ঘা। ও ছিটকে উঠে পালিয়ে যায়। আমি কেঁদে ফেলি। একটু পরে তোর দাদু আসে রান্নাঘরে, নরম করে বলে, রান্না হলো? আমি কেঁপে উঠলাম তার গলা শুনে, তার তো এখন বাড়িতে থাকার কথা নয়?”
    “দাদুকে বললে না কেন?”
    “সমুর অপমান হবে বলেই বলতে পারলাম না। অত বড়ো ছেলেকে সন্তান ভাবা যায় না ঠিকই, তবে আমি তাকে সেরকমই স্নেহ করতাম। বিভুকে তো নিজের সন্তান ছাড়া ভাবিনি, তাকে ভাবতে পারলাম না তার নিজের মানসিকতার কারণে। তাই খুব রাগ আর ঘেন্না হলো নিজের উপর, দুদিন গুম মেরে গেলাম। তোর দাদু “কী হয়েছে, কী হয়েছে তোমার ” বলে জানতে চাইলেও আমি এড়িয়ে গিয়েছিলাম। পরে একদিন বললাম, “অজান্তে কিছু ভুল আচরণ করে ফেলছি নাতো গো? যাতে আমাদের ছেলেরা আমায় ভুল বোঝে”? “তোমার কোনো ভুল আমি দেখিনি ভানুমতি! তুমি খুব ভালো মানুষ একজন” একথা তোর দাদু আমাকে বলে একদিকে নিশ্চিন্ত করল, অন্যদিকে আমি কতটা সম্মান পেলাম, বল? তাই যেদিন সমুর জামা খুলে দাগটা দেখিয়ে তাকে প্রশ্ন করল, সেদিন বুঝলাম, তিনি কত বড়ো মনের মানুষ। সব জেনেও তিনি কিছু বুঝতে দ্যাননি, না আমাকে, না সমুকে। সমু যে আমায় কুদৃষ্টিতে দ্যাখে তা উনি জানতেন, রান্নাঘরের সবটাই তাঁর চোখে পড়েছিল বাইরের জানলা দিয়ে। লজ্জায় সংকোচে সমু বোম্বে চলে যাবার পর আমাকে সেকথা জানিয়েছিলেন তিনি।    

      আমি সমুদ্রের কথা বললাম ঠাকুমাকে। শুনে বললেন, “তাই তো ভাবি, আমার নাতনিটা এত উদাস কেন!  এই বয়সেই যে অনেক বড়ো আঘাত পেয়ে বসেছিস রে!”
      দুঃখকে কীকরে নিজের অস্তিত্বের অঙ্গ করেও মাথায় চড়তে না দিতে হয়, তা শিখিয়েছিলেন তিনি। আমি বইকে সঙ্গী করে ফেললাম।  সারাক্ষণ বইতে মুখ গুঁজে থাকতাম, তাতেই মুক্তি পেলাম। এমএসসিতে দারুন রেজাল্টও হলো। মণিকা ম্যাডাম বললেন, “আমি নিজে তোকে রিসার্চে গাইড করব, তুই বিষয় ভেবে রাখ।”
      তখনই আমার মনে হয়, ছাত্র পড়াতে গেলে যে ধৈর্য লাগে, যেভাবে সবটুকু উজাড় করে দিতে হয়, ততটা আমি পারব না। আমার খুব শান্ত নিরুদ্বেগ এক কাজ চাই। প্রচুর পড়তে চাই আমি। মনে মনে এক বিরাট লাইব্রেরির সব বই পড়ে ফেলতে চাইতাম। এরই ভেতর মনে হলো, গ্রন্থাগারিক হলে বেশ হয়। আমার মনের মতো সবটুকুই হয়। তাই পিএইচডি, কলেজ-ইউনিভারসিটির ছাত্র পড়ানোর উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ ছেড়ে আমি লাইব্রেরি সায়েন্স পড়তে ভর্তি হলাম একই  বিশ্ববিদ্যালয়ে। মকালে ভদ্রে মণিকা ম্যাডামের সঙ্গে দেখা হয়ে গেলে রাগ করে কথাই বললেন না কতদিন। ফোন করলে ফোনও ধরতেন না কতদিন। কখনও ফোন ধরেই বলতেন, “কোনো স্পয়েলড স্টুডেন্টের সঙ্গে আমি কথা বলব না। ---শোন মৃণ্ময়ী, এখনও সময় আছে। ডিপার্টমেন্টে চলে আয়, কথা বলি তোর পিএইচডি নিয়ে। এমন উজ্জ্বল ভবিষ্যত জলাঞ্জলি দিস না”।  এসব কথা বললে তখন আবার আমি নিজে ম্যাডামকে এড়িয়ে চলতাম।

     পাশ করার পর দু’বছর একটা গ্রামীণ লাইব্রেরিতে কাজ করে জেলা গ্রন্থাগারে যোগদান করলাম। এরপর থেকেই বাড়িতে বিয়ের চাপ আসতে লাগল।

      ঠাকুমার সঙ্গে বসে চাল বাছছিলাম। বললেন,  তোর মা খুব দুঃখ করছিলেন। তুই নাকি সব সম্বন্ধই ফিরিয়ে দিচ্ছিস?
     “না গো! আমার বিয়েটিয়ে করার কথা মনেই হয় না।”
    “দ্যাখ, বিয়ে না করতেই পারিস, তবে কাউকে ভালোবাসলেও বিয়ে করতে অসুবিধা নেই কিন্তু। যাই করিস, ভালো করে ভেবে সিদ্ধান্ত নিবি। পরে কখনও যেন সেজন্য আফশোস না হয়।” তারপর একটু থেমে বললেন, “তোর ওসব ইচ্ছা হয় না? ”
    “ধূস! হয় না গো হয় না! হলে বিয়ে করে নেব। তোমাদের অত চিন্তা করতে হবে না।”
    “শোন, সবসময় মনের কথা শুনবি। জোর করে কাউকে দেবতা বানাবি না। তোর সৎপথীকে জোর করে মনে রাখতে চেষ্টা করিস না। যতদিন সে থাকার থাক, তারপর স্মৃতিটাকে সম্মান করেই তার পাশ থেকে চলে যাবি। যদি তোর তাই মনে হয়।”

       ঠাকুমা আমার জীবনে অভ্যাসের ভেতর ঢুকে গিয়েছিলেন। খুব কষ্ট পেলাম, তাঁর ওভাবে মৃত্যুতে। তবে বিভুকাকু আর কাকিমাকে ক্ষমা করতে পারলাম না। সব জমিজায়গা বিক্রি করে আশি বছরের বুড়ো মানুষটাকে নিয়ে যেতে চাইলেন। যদিও আশি বছর বয়সটা ঠাকুমার কাছে একটা বড়োসড়ো সংখ্যা মাত্র। ওই বয়সেও তাঁর চোখ কান দাঁত সব কার্যক্ষম ছিল। আসলে ঠাকুমার প্রতি ওনাদের থোড়ি প্রেম? ভানুমতির সম্পত্তিটা দরকার ছিল, বড়ো ফ্ল্যাট বুক করেছিলেন বিভুকাকু। এই বয়সে ভিটেমাটি, এখানের অভ্যস্ত নিজস্ব জীবন ছেড়ে তাঁর পক্ষে যাওয়া সম্ভব কিনা তা ভেবে দেখেননি তিনি। অন্ধ হয়ে গিয়েছিলেন স্বার্থে।
     
       এমনই স্বার্থ যে একটা অসুস্থ মানুষকে রাতে একা ফেলে রাখলেন, তাঁর অসুস্ততার খবর পেলেন না, বা নিলেন না।কিংবা জেনেও কিছু করলেন না, মৃত্যুই চেয়েছিলেন হয়তো! উপরন্তু মারা গেছেন জেনেও মৃতদেহ ফেলে রেখে রাত দুপুরে অসুবিধা হবে বলে নিশ্চিন্তে ঘরে দোর দিয়ে ঘুমোলেন। আমাকে ক্ষমা কোরো, ঠাকুমা! আমি তোমার বিভুরঞ্জনকে ক্ষমা করতে পারব না এ জীবনে। ক্ষমার পাঠ তোমার কাছে শিখেছি বটে, তবে সে পরীক্ষায় ডাহা ফেল করতে প্রস্তুত, তবু ওই লোকটিকে ক্ষমা করে উত্তীর্ণ হতে চাই না আমি।

       একটা কথা আমি উথালপাথাল করে ভেবে চলেছি, রাতে ঘুমের ভেতর কে আমাকে ডেকেছিল? ঠাকুমা নিজেই যদি আমায় ডেকে থাকেন তবে তাঁর জীবিত আত্মা ডাকল, না কি তাঁর ভূত?

        এ’জীবনে গল্পগুলোকে আবার কী ছুঁতে পারব? আমি জানি না, তবু ছুটে চলেছি ব্যাটন হাতে নিয়ে।কেউ না কেউ সেই ব্যাটন কখনও আমাকে এগিয়ে দিয়েছে, কখনও আমার হাত থেকে নিয়ে এগিয়ে গেছে। সে রিলে রেসে জীবনের খেলায় কার কার হাতে ব্যাটন গেল, ফের আমার হাতে এলো সবটা বুঝব কীকরে আমার এই সাধারণ দৃষ্টিতে? শেষ চরম সীমায় অবশ্য ব্যাটন হাতে ছুটতে হবে আমাকেই। কোন এক অজানা রহস্যময় ‘মামা’ জীবনের ভিত রচনা করে প্রথম এগিয়ে দিয়েছিলেন। সমুদ্রগুপ্ত জীবন দিয়ে হলেও আমাকে অনেকটা এগিয়ে দিয়েছে বৈকি! আর আমার এই অকিঞ্চিৎকর জীবনে ভানুঠাকুমা অনেক বড়ো এক দৌড়বিদ।
      আস্তে আস্তে লোকজন এসে জুটতে লাগল। উঠোন ভরে গেছে ভানুঠাকুমার মরার খবর পেয়ে। সংকীর্তনের দলও জুটল। কঙ্কা  আর বঙ্কাদাদা কাঁদতে কাঁদতে এসে পড়েছিল খবর পেয়ে। ঘরের গু-মুত ওরাই পরিস্কার করে দিলো। ওই দুই প্রৌঢ় আর ওদের বাড়ির লোকজন ঠাকুমাকে ঘিরে বসে কাঁদছিল এতক্ষণ গুনগুণ করে। আমার হুঁশ এলো যখন ঘর থেকে মরা বের করবার জন্য শ্মশানবন্ধুরা তাড়া দিতে লাগল। আমি ধীরে ধীরে ঠাকুমার মাথা নামিয়ে রাখি মাটিতে।
           
            রমাকাকীমা সম্ভবত গঙ্গাজল, আমার গায়ে ছিটিয়ে দিয়ে আমাকে শুদ্ধু করে দিয়ে বললেন, “আলনা থেকে একটা কাচা থান দাও, পরনেরটা পাল্টাতে হবে”। আমি কাঠের পুতুলের মতো তাই করলাম। কঙ্কা আর বঙ্কাদাদার বৌ ঠাকুমার নোংরা কাপড় পাল্টে কাচাটা পরিয়ে দিলেন। কাকীমা পুরোনো দিনের কাঠের আলমারি থেকে ঠাকুমার জন্য একখানা নতুন থান বের করে কার হাতে যেন দিয়ে বললেন, “এটা শ্মশানে দরকার হবে”।  

          আমি বুঝতে পারছিলাম এখানে আমার আর থাকার প্রয়োজন নেই। এ বাড়িতে আর আমি আসব না কখনও। ঘরের চৌকাঠ পেরোনোর সময় ঠাকুমার গলা শুনতে পেলাম। বলছেন, “মৃণ্ময়ী,  ছোটার কৌশল শিখিয়ে দিয়েছি তোকে। দাঁড়াবি না কোথাও। নিজের ছন্দে এগিয়ে যা। কখনও জলদ, কখনও ধীর, কখনও কিছুটা পাশে সরে গিয়ে। যা –  এগিয়ে যা” !
       
     
  • ধারাবাহিক | ১৪ নভেম্বর ২০২২ | ১৭৪ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ভ্যাবাচ্যাকা না খেয়ে মতামত দিন