এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • বিসর্জন

    আফতাব হোসেন লেখকের গ্রাহক হোন
    ২১ অক্টোবর ২০২২ | ১৫৮ বার পঠিত
  •                                                 (১)

    ঘোষেদের ছোট ছেলেই প্রথম দেখেছিল । মূর্তিটা জলে ফেলার পর ওজন এর ভারে ডুবে যাবার ঠিক আগে যখন কয়েকবার খাবি খেল জলের মধ্যে , যখন প্রায় আশি হাজারের মা দুর্গার ঘরসমেত খাবি খেতে খেতে জলসমাধি হবার অন্তিম মুহূর্ত , যখন হিন্দিগানের লাউড স্পিকারের বিষ তরঙ্গে ক্লান্ত ভাসান যাত্রীরা ভারাক্রান্ত হৃদয়ে ঘরমুখো , ঠিক তখনই ঘোষবাড়ির ছোট ছেলের চোখে পড়লো মা এর মুখ টা ভাঙ্গা । চোখ পুরোটা ফোকাস করে দেখলো ভাঙা না, মায়ের মুখটাই নেই । সামনে এগিয়ে রহস্য ভেদী দৃষ্টিতে চোখে পড়লো বছর এগারোর শেমিজ পরা লিকপিকে শরীরটা তীব্র বেগে সাঁতরে ওপারে , হৈ হৈ করে উঠতে টের পেল লিকপিকে শরীরটা ওপারে সাঁতরে উঠেই তীব্র বেগে দৌড় , গয়না সমেত …মায়ের মুখটা হাতে ধরা ।

                                                     (২)

    শনিদেব ইদানিং দুর্বল বড় । ওনার মধ্যেও উচ্ নিচের প্রভাব এসেছে মনে হয় । না হলে যত বিপদ গরিবদের মধ্যেই কেন আসে তা আজও বুঝতে পারেনি হারান ,মানে হারু । যেবার লোকাল ট্রেন বন্ধ হব হব করছিল,সেবার রুজি রুটির অভাব টা আগেই  টের পেয়ে ওভারটাইম শুরু করেছিল হারু । বউ কে বলেও ছিল সপ্তাহে চারদিন রাতের ট্রেনগুলো ও কভার করবে । রোজ দু হাড়ি ঘুগনি বিক্রি করলেও এই কতদিন আরো এক হাড়ি বাড়াতে গিয়ে বিপদ টা হল । বিক্রি বাটার সঙ্গে টেনশনটাও বাড়ছিল । শুনছিল রোজ যে কোনদিন ট্রেন বন্ধ হতে পারে । তারপর ঠিক যেদিন খবরের কাগজবালা পটল খবরটা দিল সেদিন অন্যমন করে নাকি কপালফেরে হাত টা স্লিপ করে পা গুলো রেলের চাকার তলায় গেল। হারুর বউ হারুকে ফেরালেও পা দুটো ফেরাতে পারলো না,সাথে পাঁচ অক্ষরের সামনের দিকে জমানো হারুর ব্যাংক এর পাস বই টা যখন এক অক্ষরে এসে থামলো তখন হারু ভাবলো ফাঁড়া কাটলো মনে হয় । বুঝলো কত অসহায় হতে হয় মানুষকে । বোঝেনি অসায়তায় মনে হয় শেষ বলে কিছু হয় না। শেষ হল যখন তখন হারুর লাজুক বউ পাশের হাসপাতালের আয়া । পা ছাড়া লোকটাকে নিজের বুকের মাঝে শক্ত করে বেঁধে শুনিয়েছিল হারুর বউ -

    - ' বুঝলা এবার আমি কাম না করলে সংসার চলবে না । ফুলিটাও এবার ফাইবে উঠবে , পাশের পেরাইভেট হাসপাতাল টায় করুনা রুগী দেখার লোক চাইছে, রোজ তিনশো দিবে । আমি যাবো ভাবছি ' হিসহিস করে ফর্সা গলাটা টিপে জোর দিয়ে হারু বললো ওর বউ কে…- ' কেনে ? আমি কদিন মাত্র বসেছি , পা নাই বলে কি আর তোকে সুখ দিতে পারবো নাই ?

    টুটি চাপা গলায় ভেঙে ভেঙে বললো হারুর বউ,

    - 'পারবে গো … সুখ নিয়া চিন্তা নাই , চিন্তা  প্যাট নিয়ে '।

    সেদিন থেকেই ঘুগনি হারুর ল্যাংড়া হারু আর হারুর বউ লোকাল আয়া । করুণা রুগীদের আয়া ।
    হারু বুঝলো এই বেশ ।
    সুখ আবার দরজায় টোকা মারার আগেই,ব্যাংকের খাতা আবার তিন অক্ষরে আসার আগেই হারুর আয়া বউ লোকের বিষ নিজের শরীরে নিল।
    সব্বাই একঘরে করার আগেই বাতাস কমলো রক্তে , সংসারেও বাতাস কমার আগেই বাতাস শেষ হল হারুর বউ এর । হারু বুঝলো এটাই মনে হয় শনি বলে ।
    হাতের দুটা  আংটিি বাড়ালো হারু , সাথে সাথে রাতে নতুন সঙ্গী  । দু বোতল রোজ ।

                                                   (৩)

    পাড়ার নতুন মাস্টার প্রীতম ।
    মাস্টার বলে নাম ধাম আর টুকটাক ইমেজ তৈরী করেছে নিজেই । স্কুল পাড়ার মুরুব্বিরা মানে খুব ।কচিকাঁচা গুলো কয়েকদিন ধরেই মরচে লাগা নীল সাদার ফ্যাকাসে বিল্ডিং টার বাইরে । ভিড় করে । দেখতে পেলেই অমায়িক হাসি ,
    - ' সার , বেঞ্চে বসবো না আমরা , ছোট কিলাস এ ভূঁয়ে বসি বসি ভাল্লাগেনা যে '
    ছোটগুলো বড্ড প্রিয় প্রীতমের । আসলে প্রীতমের ছেলে ছোট বেশ । মাত্র ছয়ের কোটায় । সেদিন বলছিল মোবাইল স্ট্যান্ড না হলে নাকি অনলাইনে মাথা কাটে । কিনবো কিনবো করেও কেনা হয়নি প্রীতমের । ছেলে ছেড়ে স্কুলে এলে 'ভূঁয়ে' বসা ছেলেমেয়েগুলোকেই ছেলের মত লাগে ওঁর । ওদেরও মোবাইল স্ট্যান্ডের মত উচা বেঞ্চ লাগে , না হলে নাকি বড় ইস্কুলে পড়ার মজা নাই ।
    চোখ বড় করে প্রীতম বললো -' ওরে দাঁড়া , এখনো সরকার বলেনি বেঞ্চে বসতে । তোদের পাড়ায় যাবো। দাওয়ায় পড়াব । কাল থেকে ' ….
    চললো কদিন বেশ । ওই স্কুলেই সাতের ঘরের নামতা একটানা বলে যখন ত্রি থেকে ডাইরেক্ট ফাইভ ক্লাসে উঠেছিল ফুলি , তখন থেকেই পড়ায় আর মন নাই । সব্বাই যখন ভাবলো ট্রেনের হকারের ঘরে সরস্বতী জন্মেছে তখনই ফুলির ডাক ছেড়ে ইচ্ছে করতো সব্বাইকে বলতে যে ওর পড়তে ভালো লাগে না । বেশ কয়েকদিনের মধ্যেই যখন টপাটপ করে পুরো সংসারটা চোখের সামনে শেষ হতে দেখলো তখন এগারো বছরের মনের মধ্যে কি হয়েছিল কেউ না জানলেও সব্বাই দেখলো ফুলি কাঁদেনি এক ফোঁটাও । তারপর থেকেই ফুলি চুপচাপ খুব সারাদিন । বাপ মদ ধরতে ঝামেলা কমেছে ফুলির । সকাল বেলা শাক ভাত দুটো ফুটিয়ে দিয়ে হারুকে খাওয়াতে পারলেই ফুলির মুক্তি । বলেনি কাউকে কখনো এসব । শুধু নুরবাণু জানে , ওর ও মা নেই যে। নুর বানু জানে ওই আকাশের খুদার কাছে মা আছে , যে খুদাকে নুর বানু দেখেনি কখনো । নুরবাণু ওর একই ক্লাসের । অবসরে নতুন মাস্টারকে শুধায় নুরবানু - ' ' সার , ফুলির মা কে কে লিল ? কুথায় গেল ? উর যে খুব কস্ট '

                                                (৪)

    নতুন মাস্টার ভালো খুব । মুসলমান না হিন্দু এখনো বুঝে উঠতে পারেনি নুর বানু ,তবে স্যারকে ওর আব্বা আব্বা মনে হয় । ওর আব্বা কেরালায় থাকে বছরভর । কুরবানীর শেষে যাবার আগে  আব্বা ওকে বলে গেছে '  শুন বিটি , তুই এখন ম্যায়াছেনা ,মায়ের জাত , অন্য বিটি গুলার দায়িত্ব নিস ' । 
    ওর স্যার ও সবসময় জিজ্ঞাসা করে নূর বানুকে , তোর আব্বা তো বাইরে রে বছরভর, তুই একা হাতে সংসার সামলাস কি করে ? নূর বানু হ্যাংলা হাসে খালি , সাথে শুধায় মাস্টার কে , ও সার ফুলির মা কে কে লিল ? কুথায় গেল ? উর যে খুব কস্ট ।

    মাস্টার জানে এর উত্তর নেই । ফিসফিসিয়ে উত্তর দেয় তোর আল্লা জানে।

    আজ নুরবানুর মন খারাপ। কেরালায় চাচা ফোনে বলেছে ওর আব্বার কাশি থামে না । ওকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে যেন গ্রামের কেউ আসে । ফোন পেয়ে নুর বানু খুঁজেছে খুব সব্বাইকে । কেউ কথা দেয়নি । তবে হাসিম চাচা একশ দিয়েছে । মাস্টার বলেছে টিকিটের দাম জোগাড় করতে আরো পাঁচশো লাগবে। না আনলে আল্লা রহম করবে নুরবানুর বাপকেও । ফুলি আর নুর বানু চুপ করে শুনেছে সব ।

                                            (৫)

    ফুলি প্রানপনে ছুটছে…
    গয়না গুলো ওর চাইই চাই…
    মাস্টার বলেছে আল্লা জানে ফুলির মা কোথায় ,মাস্টার বলেছে হিন্দুদের ঠাকুর মানেই মুসলমানের আল্লা ।ফুলি জানে আল্লার কাছে গেলে কেউ ফেরে না । ফুলি জানে নুরবানুর আর কেউ নাই । ফুলি জানে টিকিটের দাম মাত্র পাঁচশো টাকা ।
    ছোট ঘোষ গলা ছেড়ে চিৎকার…ওরে ধর ধর…গয়না সমেত নিয়ে পালাল সালী ছোটলোকের মেয়েটা … ধর ধর…ওই ... সব্বাই … ধর….
    মাস্টার এখন মিষ্টির দোকানে । নূর বানুকে মিষ্টি খাওয়াচ্ছে বিজয়ার । ল্যাংড়া হারু আজ চার বোতল মেরেছে ..একসাথে..

    সাথে চিল চিৎকার…কুথাই গেলি ফুলির মা.. ও ঠাকুর … ফিরাই দে ফুলির মাকে.. ফিরাই দে…

    এ  দিকে  ঠাকুরটা ডুবছে…ডুবেই যাচ্ছে…ওজনে , না কি বিসর্জনের নিয়মে...কে জানে….
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। কল্পনাতীত প্রতিক্রিয়া দিন