ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • বুলবুলভাজা  ধারাবাহিক  উপন্যাস  শনিবারবেলা

  • দক্ষিণ দামোদর জনপদ

    কৃষ্ণা মালিক
    ধারাবাহিক | উপন্যাস | ৩০ জুলাই ২০২২ | ২০১ বার পঠিত | রেটিং ৪ (১ জন)
  • ছবিঃ ঈপ্সিতা পাল ভৌমিক


    চার



    রাধাকান্তপুর গ্রামটা বর্ধমান শহর থেকে প্রায় তিরিশ কিলোমিটার দূরে। ছোট থেকে গ্রামের পাশে যে ঝিলটা শান্তা দেখে এসেছে, সেটা বুজিয়ে প্লট করে বিক্রি করার ধান্দা শুরু হল। পঞ্চায়েতও নাকি তলে তলে যুক্ত, তবে তথ্যটার সত্য-মিথ্যা প্রমাণিত নয়। এই ঝিল তাদের সাদামাটা এলাকায় একটা বৈচিত্র্য। দীর্ঘদিনের বাস্তুতন্ত্রের অঙ্গ। শীতে সাইবেরিয়া থেকে, হিমালয় অঞ্চল থেকে আসে পরিযায়ীর দল। দেশ পেরিয়ে চলে যায় আরও দক্ষিণে। মাঝে দল ভেঙে কিছু পাখি ঝুপঝুপ করে নেমে পড়ে ছোটখাটো অনেক ঝিল-বিল-বাঁওড়-দিঘিতে। চৌধুরীদের ঝিলেও তারা নামে। তবে প্রতিবার আগের তুলনায় পাখিদের সংখ্যা কমে আসছিল। সব পরিযান কি তাহলে একদিন থেমে যায়! কিন্তু এ তো স্বাভাবিক নিষ্ক্রমণ নয়।মানুষের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ দায় রয়েছে এর পিছনে। 

    ঝিলের পাড়ে অন্য গাছের সঙ্গে একটা বিরাট কৃষ্ণচূড়া। একপাশে শিবমন্দির আর চাতাল। এই মন্দিরে নিত্যপূজা হয় না। শিবরাত্রির ব্রত, অম্বুবাচি ইত্যাদিতে গাঁয়ের মেয়ে-বৌরা আসে। শ্রাবণমাসে তারকেশ্বরে তারকনাথের মাথায় জল ঢালতে যাবার ধূম পড়ে। এদিকে রাধাকান্তপুরের সঙ্গে আশপাশের গ্রামগুলো থেকেও অনেকে দল বেঁধে বেরিয়ে পড়ে। প্রথমে চলে যায় শ্যাওড়াফুলি বা তার কাছাকাছি গঙ্গার কোনো ঘাটে। ঘাটগুলোও তখন পূণ্যার্থীদের সমাগমে জমজমাট। দোকানগুলোয় কেনাবেচার হিড়িক। ঘাটে স্নান করে মনস্কামনা পূরণ করতে নতুন জামাকাপড়, গামছায় সেজে কলসীতে গঙ্গাজল ভরে বাঁক তুলে নেয় কাঁধে। খালি পায়ে হাঁটা লাগায় তারকেশ্বরের মন্দিরের উদ্দেশ্যে। ভোলেবাবা পার করেগা। ত্রিশূলধারী পার করেগা। ব্যোম ব্যোম তারক ব্যোম! গাঁয়ের যারা তাদের সঙ্গী হতে পারেনি, তারা চলে আসে চৌধুরীদের ঝিলের পাড়ে এই বুড়োশিবের মাথায় জল ঢেলে মনোবাঞ্ছা পূরণ করতে।

    বছরে একবার খুব জাঁকজমকে মাঘী উৎসব হয়। এছাড়া কখনও কেমন অল্পবয়সী ছেলেছোকরারা, ক্যারাম অর্কেস্ট্রার জগঝম্প জুড়ে দেয়। মাঠে কাজ করতে আসা লোকজন, গরু-ছাগলের রাখালবাগাল রোদে জলে ঠাঁই নেয় এই চাতালে। যাত্রাটাত্রাও হয় গ্রামের উৎসব উপলক্ষে। বিশেষ করে বারোয়ারি পুজোয় গ্রামের দল যাত্রা করে। এ ব্যাপারে এদের বেশ সুনাম। আশেপাশের গ্রামের লোকজনের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় রাধাকান্তপুরের শখের যাত্রাদল সবসময়ই এগিয়ে। অনেকেই ভাল অভিনেতা। এই গাঁয়ের কালীচরণ একজন নামকরা আর্টিস্ট। কলকাতার নামী দলে যাত্রা করেন। লোকজন বেশ সমীহ করে থাকে এই কারণে। কেবল মহিলা চরিত্রের জন্য অভিনেত্রী ভাড়া করে আনতে হয় কামারপুকুর বা গোঘাট-টোঘাট থেকে। অভিনেত্রীরা যাত্রার আগের দিন বা দিনের দিন এসে পৌঁছোন। তাঁদের আগমন সংবাদে বেশ একটা চাপা উন্মাদনা লক্ষ্য করা যায় যুবকদের মধ্যে। কে, কীভাবে একটু কথা বলবে তাঁদের সঙ্গে, তাঁরা কাদের বাড়িতে খাবেন-থাকবেন, তাই নিয়ে কারো কারো মধ্যে সূক্ষ্ম প্রতিযোগিতাও থাকে। নিজেদের মধ্যে আলোচনা চলতে থাকে নায়িকা হতে পারেন কোন জনা।

    তাঁরা এসে প্রথমে তো ওঠেন ক্লাবে। তখন দেখার মজা। জানলা-দরজায় অল্পবয়সী ছেলেদের ভিড়। ফিমেল আর্টিস্টদের দেখার জন্য কী কৌতূহল! তাঁরা যেন কোন অচিনপুরের মানুষ। দিনের আলোয় তাঁরা চোখেমুখে, পোশাক-আশাকে কত সাধারণ। এমনকি দারিদ্র্যের ছায়াও নজর এড়ায় না। তাঁরা সংসারের নিত্যদিনের “নেই নেই” থামানোর চেষ্টায় অভিনয়কেই বেছে নিয়েছেন। তাঁদের মেকাপহীন মুখের শুকনো টান ও চেহারার দিকে কল্পনাবিলাসী কোনো তরুণ বা যুবক অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখে। যাত্রা থিয়েটারে অভিনয়কে ভালবেসে বড়বাড়ির অনেক মেয়ে বা মহিলাও যে এই জগতে এসে পড়েন না এমন নয়। তবে সাধারণত এইসব পাড়াগেঁয়ে মানুষজন অভিনেত্রীদের সম্পর্কে ততটা শ্রদ্ধাশীল নয়।

    শহরের জৌলুস থেকে দূরে, সেই অজ পাড়াগাঁয়ে ফিমেল পার্ট করা দিনের আলোয় সাদামাটা মেয়েরাই রাতের যাত্রাার আসরে রূপসী ও লাস্যে কটাক্ষে চরম কলাবতী হয়ে ওঠেন। লাগামছাড়া কল্পনাবিলাসীর মানসসঙ্গীও হয়ে উঠতে কোনো বাধা থাকে না। ভুলেই যায় দিনের আলোয় দেখা অতি সাধারণ চেহারাগুলো।
    অল্পবয়সী ছেলেপুলে দর্শকদের যদি এই হয়, তবে হাত ধরে, জড়িয়ে ধরে অভিনয় করা গ্রামের পুরুষ অভিনেতাদের কী হয় ভাব? হাত-পা -বুক কাঁপবে না? সেই কালু-লালু-ভুলুরা যাত্রার ঘোর কাটাতে সাতদিন সময় নেবে বই কি! সেই সাতদিন তারা বড় বোকা বোকা হাসবে, হঠাৎ-হঠাৎ আনমনা হবে। এ তো আর গোঁফদাড়ি চেঁচে পুরুষের ফিমেল পার্ট করা নয়!
    কখনওবা বিরাট বড় করে প্যান্ডেল টাঙিয়ে নামকরা দলের যাত্রাপালা। কলকাতার ছোট-বড় দল আসে যাত্রা করতে। অনেক আগে থেকে দলের বায়না করা থাকে। দূর দূরান্ত থেকে তার দর্শক এসে জোটে তখন।

    যাত্রা দেখার নেশা ছিল বটে শান্তার বাবার! বাবার বন্ধু, বুদ্ধদেব জ্যেঠুর সঙ্গে কোথায় না কোথায় যাত্রা দেখতে গেছেন। একবার সাইকেল নিয়ে বেলা সরকারের দেবী সুলতানা পালা দেখতে দু’জনে দীঘলগ্রাম চলে গেলেন। ফিরলেন প্রায় ভোরের বেলা। ঠাকুমা বকলেন খানিক – “হ্যাঁরে দিলু? তোর কি কাণ্ডজ্ঞান কোনোদিন হবে না? বাড়ির লোকের চিন্তা হয় না?”
    জ্যেঠুও গজগজ করলেন, “বাড়ির কথা বাদই দে, বৌমার কথাও কি ভাববি না? সে নরম মানুষ, প্রশ্ন করে না। তাই বলে-! না না, এ তোর ঠিক নয়।”
    বাবার কোনো হেলদোল নেই। রাত জাগার ধকল সামলাতে খানিকটা ঘুম দরকার। ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়লেন। আবার ঠিক সময়ে স্নানখাওয়া সেরে অফিস যথারীতি। কত যাত্রাই না দেখেছেন ওই দুই বন্ধুতে! যাত্রাসম্রাট অশোক কুমার, নটসম্রাট স্বপন কুমার, শান্তিগোপাল, শেখর গাঙ্গুলী, বীণা দাশগুপ্তা, জ্যোৎস্না দত্ত, ছন্দা চ্যাটার্জী – কার নয়!

    মন্দিরের কয়েক হাত পিছনে আর একটা গাছ ছিল। একটা বড় শ্যাওড়া গাছ। ছোটবেলায় শান্তারা জানত গাছটায় ভূত থাকে। সন্ধের পর মন্দিরের পেছন দিকে কেউ যেতে চাইত না। আর যত ভূতুড়ে গল্পের মালিকানা ছিল বদবুদ্ধির জাহাজ সুশীল বাগের। অথচ নিজের স্বভাবে ভয়ডর ছিল না। কুকুরের মুখে আমের আচার গুঁজে দিয়ে, রোদে বসানো পাথরের থালা-ভর্তি আচার কবজা করেছিল। এক ঝড়বাদলের দিন ওই গাছের নীচে আশ্রয় নিয়ে বজ্রাঘাতে গাছ আর জ্যাঠা দু’জনেরই ভবলীলা শেষ।

    ঝিল ভরাটের প্রতিবাদে সেবার প্রফেসর সুপ্রভাত বক্সী একটা অনুষ্ঠানের আয়োজন করলেন। আসলে মানুষ ভেতরে ভেতরে প্রতিবাদটা চাইছিল, ঝিলটা বেঁচে যাক চাইছিল। তাঁকে যখন রাধাকান্তপুরের অল্পবয়সী ছেলেমেয়েরা গিয়ে বিষয়টা জানাল, তিনি সাগ্রহে এগিয়ে এলেন। সুপ্রভাতকাকু প্রায় সর্বজনপ্রিয়। রাধাকান্তপুর, নীলকান্তপুর-সহ এলাকার লোক তাঁকে নিয়ে গর্ব করে। বর্ধমান শহরের নামকরা কলেজের অধ্যাপক। গ্রাম থেকে তিনি প্রতিদিন কলেজে যাতায়াত করেন এতটা রাস্তা ঠেঙিয়ে, বাসে চড়ে। এটা একটা দৃষ্টান্ত বই কি! শান্তারা কয়েকজন জড়ো হল। বিষয়টা নিয়ে নানা পরিকল্পনার কথা হচ্ছিল। একসময় চা-চানাচুর দিয়ে গেল তাদের বাড়ির পুরনো ঝি খুকু। খেতে খেতে কাকু নানা বিষয়ে কথা বলছিলেন খুব সহজ ভঙ্গিতে। মনেই হয় না গুরুগম্ভীর এসব বিষয় শুনলে সবাই সাধারণত জ্ঞান দেওয়া বলে মনে করে থাকে। পার্থ একসময় বলল, “কাকু, আপনি এত অসুবিধার মধ্যেও বর্ধমান যাতায়াত করেন কেন? ওখানে থাকেন না কেন? ভাইবোনেরাও ওখানেই পড়াশুনা করতে পারে তাহলে ভাল স্কুলে! এখন তো এটাই চল।”
    - জানো তো, পরিযান মানুষের রক্তে। কিছু মানুষ জীবন ও জীবিকার কারণে ঘর ছেড়ে নতুন ঠিকানায় উঠে গেছে বারবার। বসত বাড়ি অভিমানে পড়ে থেকেছে, কোথাও ইঁদুরের মাটি, কোথাও বাস্তুসাপের খোলস। ঘাটের পৈঠে শ্যাওলা নিয়ে অপেক্ষা করেছে কারও মুখরতার, আর পুকুরের জল কচুরিপানার নীচে ঘুমিয়ে গেছে। আবার এরই পাশে কিছু মানুষ সেই গুহাকাল থেকেই বোধহয় রক্ষণশীল। পুরনো আস্তানা ছেড়ে যেতে তাদের বড় মায়া। সেই কারণেই বোধহয় জনপদগুলো পুরোপুরি মুছে যায় না কখনও।
    একটু থেমে আবার বলেছিলেন, “তবে আমাকেও বোধহয় এবার ওখানেই আস্তানা গাড়তে হবে। ওই ছেলেমেয়েদের জন্যই। গ্রামের স্কুলের পড়া শেষ হলেই সম্ভবত–” এটাও একটা দৃষ্টান্ত। গ্রামের প্রাইমারিতেই তিনি তাঁর ছেলেমেয়েকে পড়াচ্ছেন।

    আজকাল মানুষ সাফল্য পেলে, চাকরিবাকরি পেলে, প্রয়োজন না হলেও গ্রামটি ছাড়ে সবার আগে। অথচ তারাই গ্রামকে গড়ে তুলতে পারত, কিন্তু তাদের আপনি আর কোপনিতেই জীবন কেটে যায়। শান্তা নিজেও সে দলে পড়ে। মানুষের সংসর্গে থেকে গড়ার কাজে হাত লাগাতে পেরেছে কি? হালকা হাওয়ায় ভাটিতে আনমনা পানসির মত ভেসে চলেছে। এখানকার আঞ্চলিক বৈশিষ্ট্য ভেঙে ফেলার মত গুণ তার নেই।
    সুপ্রভাতকাকুর মত মানুষ তো ব্যতিক্রমী। তাঁর খুড়তুতো ভাইপো স্বর্ণেন্দু বক্সীর বলা সেই কথাগুলোর প্রতিটা শব্দ মনে আছে। নীলকান্তপুরের বাড়ি থেকে তিনি তখন বাৎসরিক পরিযান শেষে সপরিবার শহরের বাসায় ফিরে যাচ্ছেন। গাড়িতে উঠতে গিয়ে কাকাকে বলেছিল, “কেন ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়াচ্ছ বল তো? উল্টোদিকে দাঁড়িয়ে পড়াটাই আসল তোমাদের কাছে। কেউ হ্যাঁ বললে তোমরা না বল, আর না তে হ্যাঁ। তোমাদের মত লোকেদের এটা একটা ফ্যাশান – সমাজকর্মী! হুঁ! পারও বটে! কী পাও এসব করে?”

    শান্তার মনে পড়ে, কয়েক বছর আগেও জীর্ণ পরিত্যক্ত স্টেশনের মত দেখতে লাগত গ্রামগুলোকে। একেবারে হালে অবশ্য মানুষের হাতে কিছু পাইয়ে দেওয়া কাঁচা টাকার দৌলতে আর কাজকর্ম জোটার কারণে গ্রামগুলোর ভগ্নদশা কিছুটা কমেছে। একসময় মনে হত ভাগের মা। যেমন কৃতী ও প্রতিষ্ঠিত সন্তান একাকী মাকে গ্রামে ফেলে রেখে শহরে বাসা বানায়, আর বৎসরান্তে একবার এসে মুখ দেখিয়ে যায়। ওই চৌধুরীদের ঝিলে আসা পরিযায়ী পাখিদের মতই। বছর বছর তাদের সংখ্যা কমতে থাকে, কমতেই থাকে। হয়তো এমন একদিন আসবে, যখন আর একটিও পরিযায়ী ঝিলের পুরনো ও চেনা পান্থশালায়, আর তার স্বাদ গন্ধ নিতে আসবে না।

    স্থানীয় পঞ্চায়েত, ব্লক অফিস, ডিএমের অফিস – সব জায়গায় এলাকার মানুষের স্বাক্ষরিত প্রতিবাদপত্র জমা দেওয়া হল উৎসবের কিছুদিন আগে। মাইকিং, লিফলেট বিলি, স্থানীয় কেবল চ্যানেলে ও স্থানীয় খুচরো সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন – এইসব করে রীতিমত অনুষ্ঠানের আগাম প্রচার করা হয়েছিল। কবি সম্পাদক বিনয়েন্দ্র দাশগুপ্ত আমন্ত্রিত হলেন উদ্বোধক হিসাবে। হাজির ছিলেন আরও কয়েকজন মোটামুটি খ্যাত ও উঠতি লেখক-কবি; জেলার বহু গুণী মানুষ। সে এক বিরাট জমজমাট ব্যাপার। 
    একপাশে বিপুল নন্দী আরও কয়েকজন চিত্রকরকে নিয়ে ক্যানভাসে ছবি আঁকার ব্যবস্থা করলেন। বিষয় – প্রকৃতি ও আমরা। 

    এমন অভিনব অনুষ্ঠান এর আগে এই গ্রামে কখনও হয়নি। শুধু এ গ্রামে কেন, আশপাশের কোনো গ্রামেও নয়। তাই শান্তাদের এই গ্রামাঞ্চলে বেশ একটা উন্মাদনা সৃষ্টি হল অনুষ্ঠানটাকে ঘিরে।
    এরই মধ্যে বেশ একটা মজার ব্যাপার ঘটল। মানুষের জীবনযাপনের সব ক্ষেত্রেই তো রাজনীতি ঢুকে পড়েছে! সে স্কুলের সুবর্ণজয়ন্তী, রৌপ্যজয়ন্তী হোক বা বার্ষিক সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা, পুজোর ফিতে কাটা ইত্যাদি। জনসংযোগ আর কি! এই প্রথম কোনো অনুষ্ঠানে রাজনৈতিক দাদাদিদিরা এসে গলা ফাটাতে পারলেন না। এসেছিলেন, শুভেচ্ছা জানিয়ে তাঁরাও প্রকৃতি সংরক্ষণের এই উদ্যোগে পাশে আছেন – এসব বলে তাড়াতাড়ি কেটে পড়লেন। বলবেনই বা কী? ঝিল ভরাটে তাঁদের ইন্ধন। তবু প্রতিবাদের অনুষ্ঠানে এসে দিব্যি বললেন, এ কাজ অন্যায়, বাস্তুতন্ত্রের বিরোধী, এলাকার এতবড় সম্পদ নষ্ট হতে দেওয়া যায় না – বাছা বাছা কিছু কথা। বলাটা অসম্ভব নয়। মাখন মাখিয়ে মাপমত কথাই তো শুধু বসানো! 

    লোকজন কম এল না। খানিকটা কৌতূহল তাদের থাকবেই। কিন্তু ঘণ্টাখানেক পর থেকে হাই তুলতে লাগল। টুকটুক করে উঠেও পড়তে থাকল। শুধু ছবি আঁকার জায়গায় ভিড়টাতে মৌমাছিদের কিছুক্ষণ গুনগুন চলে, তবে মধুর সন্ধান খুব একটা পায় না। ফলে অচিরেই তারা দুপুরের ভাত-তরকারির দিকে বাড়িমুখো উড়ে যায়। 
    অনুষ্ঠানটা ধীরে ধীরে নিজস্ব চেহারা পেয়ে যায় একসময়। যেমন হয় আর কি! গল্প কবিতার লেখক-পাঠক, স্কুল কলেজের কিছু শিক্ষক-শিক্ষিকা-পড়ুয়া থেকে যান। সাহিত্যানুষ্ঠানের ফাঁকে ফাঁকে নাচ-গান-আবৃত্তি ইত্যাদিতে অংশগ্রহণকারী আর সঙ্গের লোকজনও থাকলেন। 
    দুপুরে আহারের ব্যবস্থা ছিল। একপাশে ত্রিপল টাঙিয়ে রান্নার আয়োজন।

    উনুনের আগুন থেকে হলকা ওঠে, তাপ ছাড়ে। তা হিলহিলিয়ে মিশে যায় মেঠোমাটির ফাটল থকে উদ্গত গরম বাষ্পের সঙ্গে।

    ********* 
    মধ্যাহ্নভোজের আগের পর্যায় শেষ হয় সায়নদীপ চক্রবর্তীর গল্পপাঠ দিয়ে। শান্তার সে সময় কলেজের শেষ বছর। সায়নদীপকে সে আগেই পড়েছে। তার প্রিয় কবি ও লেখক। কবিতা কম লেখেন, বেশি পরিচিতি গল্পকার হিসাবে। এখনও পর্যন্ত উপন্যাস একটাই। খুব সম্ভব একটা করে গল্প ও কবিতার বই প্রকাশিত। সবগুলোই সে পড়ে ফেলেছে। কত বয়স হবে সায়নের, সাতাশ-আঠাশ। শান্তার ধারণা ছিল বয়স আর একটু হয়তো বেশি হবে। সায়নের লেখা নিয়ে সে সাংঘাতিক অবসেশড্। 
    সেই সায়নদীপ স্বরচিত গল্প পড়ছেন! শব্দের আত্মারা প্রাণ পেয়ে অবয়ব নিয়ে তাকে যেন ঘিরে ফেলছে। পিসতুতো দাদাবৌদির সঙ্গে উচ্চ-মাধ্যমিকের পর প্রথম সিকিম বেড়াতে গিয়েছিল রিনচিঙপঙে। সায়নদীপের কন্ঠস্বর শুনে মনে হল রিনচিঙপঙে সূর্যোদয়ের আগে দূরের পাহাড় যেন গনগনে আগুনের লাল আভায় রাঙা হয়ে উঠেছে। আসলে পৃথিবীতে যা কিছু ভাল রয়ে গেছে, তারই আলোয় উষাকাল নিজের চোখ ধুয়ে নেয়।

    সম্ভবত ওই সময়টাকে বলে ব্রাহ্মমুহূর্ত। বিছানায় শুয়ে জানলা খুলে দেখেছিল কী আনন্দঘন আয়োজন! আকাশে আকাশে ভরাট গলায় তক্ষুণি যেন স্তোত্রপাঠের ধ্বনি ছড়িয়ে পড়বে। যেন মহালয়ার ভোরে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের উদাত্ত কন্ঠ শোনা যাবে। সেই প্রতিধবনিই হয়তো ছড়িয়ে পড়ল শিবতলার গাছে গাছে ঝিলের জলে। বাতাসে ভর করে ছুটে গেল মাঠ বরাবর। মাঠ পেরিয়ে গাঁয়ের উপর দিয়ে – যেখানে প্রান্তবাসীর জীবন বয়ে চলে। তাঁরাই যে তাঁর গল্প-উপন্যাসে জ্যান্ত হয়ে ওঠেন। তাঁদের জীবনের সুখ-দুঃখ-বিবেক-বিশ্বাস নিয়ে উপ আর ইতিকথা বলে যান বর্তমান সময়ের সঙ্গে দ্বন্দ্বাতুর অসহায়তায়।
    আগে ছিল লেখার সঙ্গে পহেচানি। এখন স্বকন্ঠের উদাত্তে পাঠ শোনা আর মানুষটিকে চাক্ষুষ করা। তার উপর সেই মানুষটি যখন শান্তার মত গ্রামীণ ও অখ্যাত এক কবিতা-প্রয়াসীর কবিতা শুনে সেধে আলাপ করেন, তখন মনে তো হবেই যে সে উড়ছে! তার হাত-পা তখন কেঁপেকুঁপে অস্থির।
    সায়ন তখনও পর্যন্ত তত নাম করেননি ঠিকই, তবে তাঁর গদ্যশৈলী ছিল নিজস্ব কৃতিত্ব। নানা জায়গাতেই শান্তা তাঁর কথা আলোচনা হতে শুনেছে। শব্দের মেধাবী ব্যবহারে, গল্প বলার নিজস্ব স্টাইলে তিনি তুলনাহীন। তাঁর কবিতাও তেমনি। বলতে গেলে সায়নের গল্প পড়েই তাঁর কবিতা ও উপন্যাসটি সম্পর্কে সে আগ্রহী হয়েছিল। উপন্যাসটা প্রকাশ পেয়েছে মাত্র কয়েকমাস আগে।  

    সেই মানুষের গল্পপাঠ শুনতে শুনতে একাগ্রতায় দেহের সমস্ত রোমকূপ দিয়ে যেন শুষে নিচ্ছিল উচ্চারিত প্রতিটি শব্দ। প্রিয় লেখক তার সামনে, সে ভাবতেই শিহরিত হচ্ছে। সে কি আলাপ করবে? কিন্তু কথা বলতে গেলেই তো আর কথা খুঁজে পায় না সে! 
    মধ্যাহ্ন ভোজনের পর একসময় সে একা হয়ে যায়। ঝিলের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়েছিল। একটু পর আবার অনুষ্ঠান শুরু হবে। ও প্যান্ডেলের দিকে যাবে বলে মুখ ফেরাতেই কেউ বলল, “আপনি শান্তা রায়?”
    চমকে গিয়েছিল সে। তাকিয়ে দেখে সায়নদীপ চক্রবর্তী! আগের কথার রেশ ধরে তিনি বলছেন, “ভাল লাগলো আপনার কবিতা।” 

    শান্তার বুক কাঁপতে থাকে। কোনোক্রমে বলে, “ধন্যবাদ। কিন্তু আমাকে আপনি বলবেন না, প্লিজ! আমি সবে সেকেন্ড ইয়ার।”
    মৃদু হেসে সায়ন বলেন, “কতদিন লিখছ?”
    - লিখছি – বছর দুই। আপনার মত যদি লিখতে পারতাম– 
    - আমার লেখা পড়েছ? 
    ঘাড় নাড়ে শান্তা। গলায় উত্তেজনা নিয়ে মুখস্থ বলার মত করে বলেছিল, “আপনার দু’খানা কবিতার বই, একটা গল্পের বই, আর উপন্যাস পড়েছি একটা। আর কোনো বই পাবলিশড কিনা জানি না।”
    সায়নকে চুপ করে থাকতে দেখে ও তাকায়। দেখে অবাক চোখে ওর দিকেই তাকিয়ে আছেন – “সব বইগুলোই তো পড়েছ!” 
    “অনেক সময় আপনার কবিতা পড়ে ঘুমোতে যাই।” শান্তার এই কথায় ঠাট্টা করেন, “ঘুমের ভেতর সেই কবিতার শব্দেরা জ্যান্ত হয়ে ছুটোছুটি শুরু করে না তো? হা হা হা–”

    কলকাতা রওনা দেবার আগে একগুচ্ছ কবিতার জেরক্স নিলেন সায়ন। কবিতার খাতায় মার্ক করে দিয়ে শান্তা পার্থকে পাঠিয়েছিল জেরক্স করাতে। পনেরো দিনের মাথায় সায়নদীপের চিঠি। কবিতাগুলো সম্বন্ধে পুঙ্খানুপুঙ্খ মতামত জানিয়েছেন। কয়েকটি কবিতা নাকি পত্রিকায় পাঠিয়েওছেন। 

    চিঠি হাতে নিয়ে শান্তার মনে হয়েছিল এই বুঝি হৃৎপিন্ডটা ছিটকে বেরিয়ে আসবে। এই বুঝি বাইরে থেকে কেউ শুনে ফেলল তার হার্টবিটের শব্দ। চিঠিতে লিখেছেন, “তুমি করেই বলছি। বয়সে বেশ খানিকটা আমি বড় বলেই নয়, নৈকট্যের মান তোমায় দেওয়া যায় বলে। তবে মনে রেখো, যতদিন লেখা চালিয়ে যাবে, ততদিন আমরা বন্ধু… তোমার কবিতা কপি করে কয়েকটি পত্রিকায় পাঠিয়েছি… লেখা থামাবে না। অনুভবের গভীরতার অভাব আজকের বাংলা আধুনিক কবিতার সাম্প্রতিকতম সংকট। সহজ আবেগে তুমি সেই সংকট কাটিয়ে উঠতে পেরেছ।” 
    ১৯৯৮ এর পর আজ ২০০৮ সাল। এতগুলো বছর পরেও শান্তার মনে হয়, “অনুভবের সংকট” কথাটা আজও সমান প্রাসঙ্গিক। পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে গিয়ে অনেক কবি কবিতার প্রাণটিকেই হারিয়ে বসেন।

    শান্তা চিঠির উত্তর দিয়েছিল। 
    “আপনার বন্ধুত্ব আমার জীবনের সম্পদ। তাকে হারানোর মতি কখনও যেন না হয় আমার। তবে ভয় হয়, যদি আমার কলম কখনও থেমে যায়? আশা একটাই, আপনার লেখা থেকে প্রেরণা পাবো। আপনার লেখা আমার শুধু ভাল লাগারই নয়, ওতপ্রোতভাবে আমার আত্মা তাকে জড়িয়ে নেয়। যতদিন আপনাকে চাক্ষুষ করিনি – কল্পনায় গড়ে নিতাম…  আমাদের এই ধেনো জমিসমৃদ্ধ বসবাসের জায়গাটিতে কোনো নদী, জঙ্গল বা পাহাড় নেই। বর্ষার জল টলটলে আদিগন্ত চাষের মাঠ আর দিগন্ত বিস্তৃত সোনালি ধানখেত পেরিয়ে আমার চোখ চলে যেত অন্যলোকে। সেই আবহে আপনাকে দেখতাম। রবিঠাকুরের সুরের ঝর্ণায় দাঁড়িয়ে ভিজতাম। এখনও ভিজি – তবে একা নই, আর একজন আমার পাশে দাঁড়িয়ে থাকেন। সেই ‘একজন’ যে কে – আপনিই তা বুঝে নিন। 
    আমায় পাগল ভাবছেন না তো? পাগলের জগতে সবই জীবন্ত, জানেন নিশ্চয় – আমার অনুভবের কথা বললাম। এর উত্তর না পেলেও দুঃখ নেই। আমি আমার আনন্দের কথা বলেছি কেবল।”

    ওই চিঠিরও উত্তর এসেছিল। তাতে ছিল তাঁর ঠিকানা পরিবর্তনের কথা, নতুন ঠিকানাটাও। খুব সংক্ষিপ্ত সেই চিঠি। তার প্রত্যেকটি শব্দ মনে আছে শান্তার, থাকবেও হয়তো সমস্ত জীবনকাল। সংক্ষেপের ভেতর বাজছিল মেঘমল্লার। কিন্তু সুরটা বড় দ্রুত ক্ষীণ হয়ে এল। চিঠিটা হারিয়ে গেল ঠিকানা ভাঁজে পুরে। ঠিকানাটা ততটা ভাল করে লক্ষ্য করেনি সে। আর ঠিকানার খুঁটিনাটি মনে না থাকায় কোনো ডাকপিয়নই সেই ঠিকানায় চিঠি পৌঁছে দিতে পারত না কোনোদিন। 
    সায়নদীপ হয়তো তাঁর অতি ব্যস্ত জীবিকা ও লেখায় ডুবে গেলেন। হতে পারে শান্তার চিঠি না পেয়ে, কিংবা তাঁর নিজস্ব স্বভাবে তিনিও নীরব থাকলেন। তিনি তাঁর বিশ্বাসের কথা লিখেছিলেন, “খুব খানিকটা কথাবার্তা হলেই যোগাযোগ গাঢ় হয় না। ঘনত্ব তৈরি হয় অন্তরে।” 

    শান্তার কবিতার বই বেরোল দু’বছর পর। তখন কবিতা আর সায়নে যাপন যুগপৎ চলছে। বেদনা ও আকুতি প্রতিদিন চোখ ধুয়ে দিয়েছে তার। যাকে দেখতে চায় আর খোলা আকাশের নীচে গায়ে গা লাগিয়ে সময় কাবার করে দিতে চায় অজস্র কথায় – তাকে দেখা হয় না। শূন্যে মিলিয়ে গেছে যেন! নীরব ছটফটানিতে সে চুরমার হয়। সান্ত্বনা বলতে পত্র-পত্রিকায় পেয়ে যাওয়া সায়নদীপের লেখাগুলো। একদিকে একটা সর্বগ্রাসী প্রেম সে অন্তরে লালন করেছে। অন্যদিকে প্রতিটি সামাজিক, দেশজ, বৈদেশিক আর প্রাকৃতিক ঘটনার অভিঘাতে ছটফট করেছে একা। 

    সব মানবীয় সংকট থেকে তাঁর সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ত্রাণ পেতে পারেনি। নিজেকেই উত্তরণ ঘটাতে হয়েছে। সব সময় তার প্রকাশ নিজের লেখায় ঘটাতে পেরেছে এমনও নয়। তবে এটুকু বুঝেছে, প্রতিটি মানুষ সমস্ত ঘটনার দ্বারা একই শেকলে বাঁধা। ছিটকে বেরিয়ে যাওয়ার উপায় নেই। সব অভিঘাত শেষ পর্যন্ত ব্যক্তির উপর এসে পড়ে। তাই সামাজিক কারাগারে আটক তারা দু’জনেই। একে অপরকে ছোঁওয়ার, একে অপরের কাছে পৌঁছবার উপায় নেই। তাই সর্বগ্রাসী প্রেমকে হতে হল সর্বংসহা। অন্তঃসলিলা ভালবাসা দিনমানে নিঃশব্দ মার্জার পায়ে চলে বেড়ায়, রাতের বেলা গুমরে কাঁদে। 

    ********* 
    ‘পাটশাড়ি’, গহনা আর স্বামীর মিষ্টিকথায় প্রতারিত লহনা ধনপতিকে দ্বিতীয় বিবাহের অনুমতি দিয়ে দেয়। মস্ত বড় ভুল যে করেছে, তা পরে বুঝতে পারে। লীলাবতীর কাছে ক্লিষ্ট লহনা মনোবেদনা প্রকাশ না করে পারে না – 


           দিনে থাকি ভাল        রাত্রি হয় কাল 
                     দুঃসহ বিরহ ব্যথা। 


    স্বামী ছাড়াই শান্তার নিরন্তর সেই বিরহব্যথা! 
    ঠিকানা নেই বলে সায়নদীপকে তার বই পড়াতে পারবে না এটা মানতে পারছিল না সে। অথচ কিছু করারও নেই। সময়ের ধুলো জমতে থাকে বইটার গায়ে। 

    রান্নাঘরে ওভেনে দুধ বসিয়ে রাতের সামান্য রান্না সেরে রাখতে চাইল সে। খাবার পর দেবদাস আচার্যের বইটা নিয়ে বসবে।
    বইটা শান্তাকে দেবার সময় অমিয় বলেছিল, “পড়ে দেখিস! একদম সারির বাইরের লোক। তুই স্বদেশ সেন, আলোক সরকার, নিত্য মালাকর এনাদের কথা বলিস তো? দেবদাসও তাই। পড়ে দ্যাখ তোর খুব ভাল লাগবে। তবে বইটা আমায় ফেরত দিস কিন্তু!”

    “তুই কিনে নিবি! এটা আমি রেখে দিলাম।” বলেই শান্তা পিছু ফিরে নিজের আসনে বসতে যায়। কবিতা পাঠের অনুষ্ঠানটায় শান্তা আসবে না ভেবেছিল। শেষে অমিয়র কাছে বইটার কথা জানতে পেরে ও এসেছে। বইটার জন্যই আসা। না হলে ওর খুব একটা ইচ্ছে ছিল না। যদিও পলেমপুর থেকে বর্ধমান আসা এমন কিছু ব্যাপার না। গ্রাম থেকে হলেও নাহয় কথা ছিল। তাই অমিয়কে কী বলে কবিতা পড়তে আসাটা ক্যানসেল করবে ভেবে পাচ্ছিল না। বই রেখে দেবার কথা বলতেই অমিয়  হাঁ—হাঁ করে ওঠে।
    “মাইরি! ফেরত দিস! বইটা আর পাওয়া যায় না। কেউ কেন ভাল ভাল বইগুলো রিপ্রিন্ট করে না, বলতো?” অমিয় যেন হতাশ হয়ে পড়ে। ওর মুখটা মনে পড়তে হাসি পেয়ে যায় ওর।

    ফেরত দেবার আগে তাই আর একবার মাটির কাছাকাছি কান পাতবে। সোঁদা মাটির গন্ধ পাওয়া যায় দেবদাসের কবিতায়। তাঁর কবিতা কেবল কিছু উজ্জ্বল পংক্তিই নয়, তা তাঁর জীবন দর্শনের প্রতিবেদও বটে। মনে পড়ে, 


    “এ জীবন আত্মমোচনের 
     এ জীবন পাপস্খলনের
     এ জীবন শুদ্ধিকরণের
              আর কিছু নয়।” 


    একা খেতে বসলে দেবদাস সরে যান। আগে আগে একা খেতে বসে তার মন খারাপ লাগত। ধীরে ধীরে অভ্যেস হয়ে যাচ্ছে। তার মনে হয় জীবনকে ভরপুর করে তোলার ভান করার খুব দরকার ছিল না তার। যে একাকীত্ব রক্তের ভেতর বাসা বেঁধেছে, তাকে নির্মূল করতে গিয়ে প্রকারান্তরে সে পাপ করেছে। আরেকটা মানুষকে নষ্ট করতে বসেছে সে। এর অধিকার তার ছিল না, নেইও। তাই এবার তার জীবনে আত্মমোচনের সময় আগত। পাপ স্খালন করতে হবে, শুদ্ধিকরণ করতে হবে। তাতে যা হয় হোক। সত্যিকে আর আড়াল করা চলবে না।

    মহাকাব্য বা মঙ্গলকাব্যের যুগ এটা নয়। এ যুগ অধিবাস্তবতার। ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের। তবু দেবতার ছদ্মবেশে সবলের অত্যাচার নেমে আসে আজও চাঁদবেনে, ধনপতি, বেহুলাদের উপর। সনকার হাহাকার, সরল যুবতী ফুল্লরার করুণ শুকনো মুখে অভাবের কলঙ্ক – সে দেখবার চোখকে শানিত করবে সে। এভাবেই বর্ধমানের ফসল ফলানো স্বর্ণমৃত্তিকাকে ফলবতী করে তোলার একজন শরিক হবে। এছাড়া তার পরিত্রাণ নেই। 

    রূপকথার দুয়োরাণী সুয়োরাণীর মত লহনা, খুল্লনা, রঞ্জাবতীদের চাওয়া-পাওয়ার ভেতর লুকিয়ে আছে বিদেশী শাসকের মতই আজকের দেশীয় শাসকের রাজনীতি। দারিদ্র্যের কাছে, সামাজিক আর রাষ্ট্রিক বঞ্চনা ও অত্যাচারের কাছে নিজেদের সঁপে দেয় কবিকঙ্কণের মতই আজকের কলমচি। নুনপান্তায় কায়ক্লেশে দিন কাটিয়েও চোখ মুছে নিয়ে কমদামী কাগজে ফুটিয়ে তোলেন কবিতার নক্সা। কাগজের পাতা থেকে চুঁইয়ে পড়া কালির ধেবড়ে যাওয়া দাগ লেগে যায় আধ-ময়লা বিছানার চাদরে। কোনো ব্লটিং পেপার তা শুষে নিতে পারে না। 

    ভাবনা আসলে ভাবনার স্রোত। এক ভাবনা থেকে অন্য ভাবনায় এগিয়ে যাওয়া। ভাবনা মাথায় নিয়েই শান্তা বিছানায় এসে বসে। দুটো বালিশ পিঠে রেখে ঠেস দিয়ে বসে হাতে তুলে নেয় ‘আচার্যর ভদ্রাসন’, দেবদাস আচার্যের পেপারব্যাক কবিতাগ্রন্থ। 
    ক্লান্ত, দারিদ্র্য পীড়িত কবি, অথবা সিদ্ধাচার্য মগ্ন হ’ন গূঢ়লোকে মানসভ্রমণে। দেখেন – 


                       “পৃথিবীও কাঁদে মধ্যরাতে,  
                        কাঁদে অনন্ত খেচর 
                        তারাগুলি, কাঁদে খণ্ড চাঁদ,  
                        কাঁদে অরণ্য ও নদী” 


    শান্তা চোখভর্তি জল নিয়ে ঘুমিয়ে পড়তে চায়। আঃ! ঘুম আসে না! চোখের ভেতর, মনের ভেতর স্মৃতির পলি। সন্দীপনের জন্য মায়া হয়। বড় কষ্ট হয় তার।
    ফোন করে সন্দীপনকে। রিং হচ্ছে। কেটে গেল লাইনটা। ধরল না। আবার রিং করল। ভগবান! সুইচ অফ করে দিয়েছে সে। করারই তো কথা। এত অপমান সহ্য করবে কেন সে? ফোনে না পেয়ে একটা এসএমএস লিখল, তোকে আঘাত দিয়ে আমিও যে কষ্ট পাই! ক্ষমা করিস, কাল দেখা হচ্ছে। 

    অভিমান আসে নিজের মনের দুকূল ছাপিয়েও। কী করছেন এখন, সায়নদীপ? রাতের নরম অন্তঃস্থল স্পর্শ করে তিনি কি তাঁর নিজস্ব নারীকে বুকে নিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছেন? নাকি তাঁর ঘরের মধ্যযামের বাতাস শিউরে উঠছে তাঁদের মিলিত শীৎকারে! নিজের মনেই কথা বলে সে, বিশ্বাস করুন, সায়ন! আমার রাগ হয় না, না-দেখা না-জানা আপনার স্ত্রীর প্রতি। বরং আপনাকে ভালবাসি বলে আপনার আপনজনদেরও ভালবাসি আমি। কষ্ট হয় শুধু আপনাকে দেখতে পাই না বলে।

    ডাইরিটা টেনে নেয় সে। কয়েকটা লাইন লেখে।  


            মরমের কাছে ঋণ জমে। 
            আকিঞ্চনে সাজিয়েছি নিবেদন, 
            তবু ভরা ঘট বাম চোখে নস্যাৎ করে
            ধনপতি গেছেন বানিজ্যভ্রমণে 

          বনে বনে খেচরের মত 
          খুঁটে খু্টে বেঁচে থাকে খুল্লনা
          নিহত তারায় অতীতের গোপন তিল 
         শেষবার জীবনের আশ্লেষ;
        মরে যেতে যেতে দুই চোখে জিওল মাছের 
               কানকোয় কিছুটা লাল তবু জেগে  




    (ক্রমশঃ)

  • ধারাবাহিক | ৩০ জুলাই ২০২২ | ২০১ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। পড়তে পড়তে মতামত দিন