ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  আলোচনা  বই

  • জোহার জানলা ঃ এক নবীন  লেখকের  প্রথম উপন্যাস 

    Sandipan Majumder লেখকের গ্রাহক হোন
    আলোচনা | বই | ২৩ মে ২০২২ | ২২৭ বার পঠিত
  • প্রোজ্জ্বল পালের লেখার সঙ্গে আমি পরিচিত ফেসবুকে তাঁর সিনেমা সম্পর্কিত লেখালেখির সূত্রে। বিশ্ব সিনেমার  ধ্রুপদী এবং সমকালীন  উজ্জ্বল উদাহরণ যে ছবিগুলি, সেগুলি সম্পর্কে জার্গন  মুক্ত, অনুভবী সংবেদ থেকে লেখাগুলি ‘Mosaic of Time’ নামক যে ফেসবুক পেজে তিনি লেখেন, সেখান থেকে বহু ছবি সম্পর্কে তথ্য ও  ছবির  ভাবপ্রতিমা সম্পর্কে একটা প্রাথমিক ধারণা লাভ করা যায়। তাঁর অন্যান্য লেখায় রীতিমতো সার্থক অণুগল্পের স্বাদ পাচ্ছিলাম আমরা । কিন্তু তিনি   একেবারে উপন্যাস লিখে ফেলবেন  এবং সেই উপন্যাস  সাম্প্রতিক বাংলা উপন্যাসের ধারায় এক উল্লেখযোগ্য সংযোজনের দাবি রাখবে,  সেকথা  আগাম  জানার কোনো সুযোগ আমার ছিল না।
    প্রথম উপন্যাসে প্রোজ্জ্বল  কোনো দার্শনিক প্রস্তাবনা, ন্যারেটিভের জটিলতা , ব্যক্তিমনের  অন্তর্লীন  শুলুকসন্ধানে প্রবৃত্ত হন নি। একেবারে সোজাসাপটা গল্প বলতে চেয়েছেন তিনি। কিন্তু তাঁর  জোরের যে জায়গাটা সেটা হল এই কাজটুকু তিনি ভীষণ আন্তরিকতা আর সততার সঙ্গে করতে পেরেছেন। ফলে তার উপন্যাস এতটাই সুখপাঠ্য  যে আগ্রহী  পাঠক কোথাও  অমনোযোগী হওয়ার সুযোগ পাবেন না। তাহলে এই সহজপাঠ্য ভাষা , যেটা যে কোনো জনপ্রিয় উপন্যাসের  পাঠকপ্রিয়তার সঙ্গে  পাল্লা দেওয়ার ক্ষমতা রাখে – সেটা প্রোজ্জ্বলের উপন্যাসকে আলাদা করছে কীভাবে? করছে তার কল্পনাশক্তির বিস্তারে, প্লটের নিঁখুত নির্মাণে, বাস্তবতার নির্মাণের মুন্সীয়ানায়।  পাল্টা একটা প্রশ্ন বিতর্কের মত তোলা যায় যে  শুধু ভাষা ও ন্যারেটিভের সরলতার কারণে কোনো   উপন্যাসকে আমরা উপেক্ষা করতে পারি  কি  যখন  তার বিষয়বস্তুই দাবি করে এই  সারল্য ? তখন কি তা সেই লেখার গুণ বলেই বিবেচিত হয় না,বিশেষত যখন  সেই সহজতা একটা আড়াল মাত্র, যা বিষয়বস্তুকে স্পষ্ট করে প্রকাশ করে এবং যে সহজতার সাধনা অনায়াসসাধ্য নয়?
    প্রোজ্জ্বল যখন সিনেমা নিয়ে আলোচনা করেন, তখন ভাষার অন্তর্গত কাব্যগুণ  যেভাবে হীরকদ্যুতির মত ঝকঝক করে সেটা আমরা দেখেছি। প্রথম উপন্যাস লিখতে গিয়ে অনেক ঔপন্যাসিককেই আমরা দেখেছি অতিরিক্ত কাব্যিকতার আশ্রয় নিতে। অথচ, প্রোজ্জ্বল , অনায়াসসাধ্য সেই আয়ুধ তাঁর হাতে থাকা সত্ত্বেও বিরত রইলেন তার প্রয়োগে। এ যেন চেষ্টাকৃত সংযম, কারণ তিনি জানেন ভাষা এবং ফর্ম  সামগ্রিকভাবে উপন্যাসটির কাঠামো অনুযায়ী হওয়া উচিত। এই  সংযম উপন্যাসটিকে একেবারে ‘আনপুটডাউনেবল’ হয়ে উঠতে সাহায্য করেছে।তাই জনপ্রিয় উপন্যাস হয়ে ওঠার সম্ভাবনা প্রোজ্জ্বলের এই উপন্যাসে প্রবলভাবে  আছে। কিন্তু উপন্যাসটি পাঠ করে কোনো  বর্গের পাঠকই প্রতারিত বোধ করবেন না, কারণ সর্বজনগ্রাহ্য থাকতে চেয়েও প্রোজ্জ্বল কোথাও আপোষ করেন নি। কল্পনার ঐশ্বর্যে প্রসারিত করেছেন বাংলা উপন্যাসের ভূগোল, এই সময়ের প্রধান সমস্যাকে  গৃহযুদ্ধর পটভূমিতে রেখে মানুষের  সম্প্রদায়গত  ও জাতিগত হিংস্রতার এক মর্ম্পস্পর্শী আখ্যান রচনা করেছেন। এক অর্থে তাই এই উপন্যাস এক অত্যন্ত জরুরী রাজনৈতিকতায় সম্পৃক্ত থাকে যার মধ্যে আমরা সমকালীন ইতিহাসের  হিংসা, জাতিদ্বন্দ্ব, যুদ্ধ সম্পর্কে এক সমালোচনামূলক অবস্থানে পৌঁছে যেতে পারি। এই উপন্যাস আমরা আমাদের নবীন প্রজন্মের হাতে অনায়াসে  তুলে দিতে পারি এবং সেই  আবশ্যিক কর্তব্যটুকু করতে গিয়ে আমরা খেয়াল করব যে এরকম চয়নযোগ্য উপন্যাস বাংলায়,  যা এই সময়ের রাজনৈতিকতায় নবীন প্রজন্মের কাছে জরুরী, তা কতটা দুর্লভ।
    প্রোজ্জ্বল একটি কাল্পনিক দেশ তৈরি করেছেন। ইউ আর জি বা ইউনাইটেড রিপাবলিক অব গ্যানোয়া । তারই অংশ ক্যানোলিয়া বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে চায়  ইউ আর জি থেকে। ক্যানোলিয়ার ওপর  ইউ আর জির  অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক নিপীড়ন এই বিচ্ছিন্নতার জন্ম দিয়েছে। এই ক্যানোলিয়াই জন্মস্থান জোহা নামে পঞ্চদশী এই উচ্চবিত্ত পরিবারের কিশোরীর। সে অবশ্য এসব কিছু বোঝে না। সে আছে তার ইউটিউব চ্যানেল নিয়ে যেখানে নতুন নতুন  ফ্যাশান প্রোডাক্ট নিয়ে আলোচনা করে আর স্বপ্ন দেখে এভাবেই বিখ্যাত হবার ।বিখ্যাত সে হয়  বটে কিন্তু অন্য ভাবে। তার বান্ধবী মিলার দাদারা  জোহার হাতে ক্যানোলিয়ার স্বাধীনতার প্রতীক  একটা পতাকা ধরিয়ে দিয়ে একটা ভিডিও শুট  করে যেখানে  এডিট করে ব্যাকগ্রাউণ্ড পালটে দেওয়ায় দেখা যায় জোহা আমিনি  পতাকাটি দোলাচ্ছে একটি ইউ আর জি পার্লামেন্টের সামনে ,সাউণ্ডট্র্যাকে একটা রাজনৈতিক গান। প্যারেডের মত। জোহা পতাকাটা দোলাচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে, পুলিস মেমোরিয়ালের সামনে। জোহা ভাইরাল হয়ে যায় ফ্ল্যাগ গার্ল নামে। আর ধূমায়মান ক্যানোলিয়ার  স্বাধীনতার আন্দোলনের  মুখ হয়ে ওঠে  নিজের অজান্তেই। অচিরেই দেশে শুরু হবে গৃহযুদ্ধ। রক্তপাত , হিংস্রতা , আদর্শবোধ ও তার অপব্যবহার এসবের মাঝে জোহা কীভাবে বেঁচে থাকবে , কিভাবে লেখকের ভাষায় ‘যুদ্ধকে আবিষ্কার করবে’ – এই নিয়েই জোহার জানালা।
    প্রোজ্জ্বল যে দেশটিকে রচনা করেছেন তার মধ্যে সমকালীন বাস্তবের স্পষ্ট প্রতিফলন আছে, বলাই বাহুল্য। কখনও মনে হয় এটি মধ্যপ্রাচ্যের কোনো দেশ, কখনও রাশিয়া বনাম ইউক্রেনের দ্বন্দ্বের কথা মনে হয়, কখনও মনে হয় ভারতবর্ষের আসন্ন ভবিষ্যতের কথা পড়ছি না তো আর সবশেষে মনে হয় আসলে তো এই গল্প আমরা দেশ ও রাষ্ট্রের নানা নির্মাণের অন্তর্গত হিংস্রতায়, উচ্ছেদে, দেশভাগের বেদনা্‌, আধুনিক ইতিহাসের বিভিন্ন  স্থানিকতায় আবিষ্কার করেছি বারবার।  লেখক বইয়ের শেষে দুটি ইংরেজি কাগজের কাটিং সংযোজিত করেছেন। প্রথমটি ক্যানোলিয়ার মুক্তিযুদ্ধের নেতা হাসিফ আফানের একটি সাক্ষাৎকার। দ্বিতীয়টি ক্যানোলিয়ার স্বাধীনতা যুদ্ধের কারণ এবং জোহা আমিনি সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন। এই দুটি কাটিংকেও উপন্যাসের অংশই ধরতে হবে। ক্যানোলিয়ার বাস্তবতাকে সত্য করে তোলার ঔপন্যাসিক বিভ্রম নির্মাণে দারুণ  কৌশল এই কাটিং দুটি। সবটা মিলিয়ে একথা বলাই যায় যে , স্পষ্ট এবং জরুরী রাজনৈতিক বক্তব্য নিয়ে  একটি সফল এবং সুখপাঠ্য উপন্যাস যে রচনা করা যায় প্রোজ্জ্বল আমাদের তা দেখিয়ে দিলেন। তার চেয়ে বড় কথা এই কাজটা জরুরী ছিল।  যাদের উদ্দেশ্যে তিনি এই লেখাটা লিখতে চেয়েছেন সেই নবীন প্রজন্মের জন্য তো বটেই।

    জোহার জানলাঃপ্রোজ্জ্বল পাল
    মূল্য ;২৫০ টাকা (অনলাইন মূল্য ১৯০ টাকা, শিপিং সহ)
    পঞ্চালিকা প্রকাশনী, www.panchalika,com
    ফোন ঃ৭০০৫৩০৯৬৩০

     
  • আলোচনা | ২৩ মে ২০২২ | ২২৭ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • | ২৩ মে ২০২২ ০৯:২৯507990
  • ইন্টারেস্টিং। 
    এখন কিনব না নিশ্চিত, তবু জানা রইল।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। লুকিয়ে না থেকে মতামত দিন